সময়

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
কাল অথবা সময় যে নামেই ডাকা হোক না কেন, চলছে যেন চলছেই।
ঘড়ির কাঁটা আমাদেরকে বলে দেয় বর্তমান সময় কত। কিন্তু, ঘড়ির কাঁটা বলে না সময় নিজে বিষয়টা কী?

সময় হচ্ছে ঈশ্বর

হিন্দুদের সময় সংস্কৃতে কাল বলা হয়। এটা ঈশ্বরের একটা অংশ। এটা শুরু হয় যখন ঈশ্বর সকল কিছুকে চালু করে এবং শেষ হয় যখন তিনি এটা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এবং এটাই হচ্ছে অচল হবার সময়। ঈশ্বর সময়ের বাহিরে। সময় চিরন্তর এবং সকল সময় চলছে, কিন্তু তিনি এটার মধ্যে থাকেন না। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত তার ভিতরেই আছে।

প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আইনস্টাইন যুগের আগ পর্যন্ত, মানুষ সময়কে সদা চলমান একটি রাশি হিসেবেই দেখেছে।যার হয়তোবা শুরু অথবা শেষ নেই।
আগেকার যুগের দার্শনিক চিন্তা এরকমই, সময় কখনো থামে না। প্রাচীনকালের লোকেরাও সময়কে পরিমাপ করত। তাদের পরিমাপ পদ্ধতি অবশ্য ভিন্ন ছিল। যেমন- তারা বালু ঘড়ি ব্যবহার করত।

বালু ঘড়ি

শুরু হোক বিজ্ঞান- 

সময়ের সৃষ্টি-
মহাশূণ্যের জন্ম হয়েছে ১৩.৭ বিলিয়ন বছর পূর্বে। একটি Big Bang বা ‘মহাবিস্ফুরণের’ কারণে মহাশূণ্যের জন্ম হয়েছে। তারপর থেকে সেটা একটি বেলুনের মত অবিরাম বিস্তৃত হচ্ছে। মহাবিস্ফোরণ আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। কিন্তু, মহাস্ফোরণের সাথে সময় সম্পর্কিত।
কীভাবে?

মহাবিস্ফোরণ থেকে সৃষ্টি হল পদার্থ, প্রতি পদার্থের আরো সৃষ্টি হল আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়- সময়!
সময় 1 x 10-43 সেকেন্ড, একদম শুরুর কথা-
এটাই পরম শুরুর সময়, যে সময় পর্যন্ত বর্তমান পদার্থবিজ্ঞান যেতে পেরেছে।এর আগের মূহুর্তে কী হয়েছে তা আমরা জানি না।

মহাবিস্ফোরণের আগে কোনো সময় ছিল না, থাকতে পারে না।

নিউটনীয় যুগ- 

রেনেসাঁ যুগে এলেন গ্যালিলিও, এর পরে স্যার আইজ্যাক নিউটন। সময়ের বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা দাড় করালেন।
একটি মতানুসারে সময় মহাবিশ্বের মৌলিক কাঠামোর একটি অংশ যেটি একটি বিশেষ মাত্রা এবং যেখানে ভৌত ঘটনাসমূহ একটি ক্রমধারায় ঘটে। যেমন- আপনি এই লিখাটি পড়ছেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ের আপনার পড়ার ঘটনাটি ঘটছে।

এটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি যা স্যার আইজ্যাক নিউটনের তত্ত্বসম্মত। এই মতানুসারে সময় একটি ভৌত রাশি, যা পরিমাপযোগ্য।

আমদের ত্রিমাত্রিক শরীর আর আমাদের মহাবিশ্ব চতুর্মাত্রিক।সকল ত্রিমাত্রিক বস্তু চলেছি কালের মধ্য দিয়ে।মাত্রাগুলো এতটাই আন্তঃসম্পর্কিত যে এরা প্রকৃতিতে বিচ্ছিন্নভাবে বিরাজ করেনা,মিলেমিশে থাকে একটা সত্তা হিসেবে। আর একেই বলে স্পেস-টাইম। সাধারনভাবে একে অপরের থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়।

ফিলোসোফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা (Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica) থেকে-

Absolute, True, and mathematical Time
in and of itself and of its own nature without reference to anything external
flows uniformly
-Sir Isaac Newton 

এরপর কী?
আসলেন মহান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein)
তিনি বলেছেন-
“The distinction between the past, present and future is only a stubbornly persistent illusion.
অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে শুধুমাত্র একটি ক্রমাগত একগুঁয়েমি বিভ্রম” 

সময় আসলেই কি বিভ্রম?
পদার্থবিজ্ঞানে ঘোর নিয়ে এলেন আলবার্ট আইনস্টাইন, নিয়ে এলেন স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি অথবা অপেক্ষবাদ তত্ত্ব। মাথা ঘুরিয়ে ফেললেন, বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরাও বুঝতে পারছেন না থিওরি অব রিলেটিভিটিকে!

চিরায়ত বলবিদ্যা অনুযায়ী স্থান,কাল এবং ভরকে পরম বলে ধরা হয়। কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইন সর্বপ্রথম দাবী করেন যে পরমস্থান, পরমকাল এবং পরমভর বলতে কিছুই নেই। স্থান,কাল এবং ভর তিনটিকেই আপেক্ষিক ধরে তিনি তার বিখ্যাত আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রস্তাব করেন।

সমবেগে চলমান সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলী অভিন্ন (আপেক্ষিকতাবাদের মূলনীতি)।
তাহলে কি বেগ ভিন্ন হয়ে গেলে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলীও ভিন্ন হয়ে যাবে?

হ্যাঁ মশাই!
চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিষ্ঠিত হল আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। এর ফলে এমন একটা অবস্থা, সবকিছুই যেন উলটপালট হয়ে যায়।

তিনটি বিষয় সামনে চলে এলো।
১)সময় প্রসারণ- একজন চলন্ত পর্যবেক্ষকেরের ঘড়ি, স্থীর পর্যবেক্ষকেরের ঘড়ির চেয়ে ধীরেধীরে টিক্ পরিমাপ করে।
২)দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- বস্তুর গতির দিকে তার দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটে বলে পর্যবেক্ষকের কাছে পরিমিত হয়।
৩)ভর-শক্তির সাম্যতা- E = mc2 (শক্তির পরিমাণ = বস্তুর ভর × আলোর বেগের বর্গ), শক্তি এবং ভর সমতুল্য এবং পারস্পরিক পরিবতনযোগ্য।
অকি!

আমাদের আলোচনার বিষয় ১ নম্বর- সময় প্রসারণ। সময় ক্যামনে প্রসারিত হয়?
ভাউ প্রসারিত হয়।
আপনাকে যদি আলোর বেগে ( সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিঃমিঃ) ছোড়া হয় তাহলে আপনি শক্তিতে পরিণত হবেন, বেঁচে থাকলে অতীত ভবিষ্যৎ সব দেখতে পারবেন!
অকি! ফাজলামো করেন মিয়া? না ভাউ, সত্য কথা।

১৯৭১ সাল- বিজ্ঞানীরা এটমিক ঘড়িকে বিমানে করে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে পাঠালেন। ঘড়ি পাঠানোর আগে পৃথিবীর স্থির একটি ঘড়ির সাথে সময় মিলিয়ে নেয়া হল। যা প্রায় এটোসেকেন্ড ১০−১৮ এস (10−18 s) ক্ষুদ্রতম সময় পরিমাপ করতে পারে।

পৃথিবী ঘুরে বিমানটি ফিরে আসার পর, পুনরায় সময় মিলিয়ে নেয়া হল। দেখা গেল সময়ের পার্থক্য। পৃথিবীতে সময় বেশি অতিবাহিত হয়েছে, যদিও তা খুবই কম। কিন্তু, পরীক্ষিত হল সময়ের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব।

তাহলে আমরা বুঝলাম তাত্ত্বিকভাবে সময় ভ্রমণ (Time Travel) সম্ভব। শুধু সম্ভব না, আমরা আসলে এখনো সময় ভ্রমণ করতেছি।

কীভাবে?
আমরা সৌরজগতের পৃথিবী নামক গ্রহে বাস করি। সূর্য নিজে একটা নক্ষত্র। পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে।আবার এরকম ১০০-৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র নিয়ে আকাশগঙ্গা(milky way) ছায়াপথ। এর মাঝখানে আছে একটা বিশাল ভরের ব্লাকহোল, যাকে কেন্দ্র করে সূর্য ঘুরে।

এরকম বিলিয়ন বিলিয়ন ছায়াপথ নিয়ে নিয়ে আমাদের মহাবিশ্ব।তাহলে সমস্যা কী?
সমস্যা এই ছায়াপথ গুলোকে নিয়ে। সাধারণত প্রত্যেকটি ছায়াপথের মাঝখানেই একটা মেসিভ ব্লাক হোল থাকে। সেই ব্লাকহোলকে কেন্দ্র করেই ছায়াপথের সবকিছুই ঘুরতে থাকে।

এই ব্লাক হোল সব নক্ষত্রকে নিজের দিকে টানতে থাকে। সজোরে টান মারে- সূর্যের টানে পৃথিবী ঘুরে, আকাশগঙ্গা ছায়পথের টানে সূর্য ঘুরে। সৃষ্টি হয় বিশাল টানাটানি যজ্ঞ। আর এর ফলেই সৃষ্টি হয় সুন্দর জিনিস- সময়!

আবার বিভিন্ন ছায়াপথের টানাটানির ধরণ বিভিন্ন, কমবেশি হইতে পারে। তাই সময়ও বিভিন্ন! আপনি যে সময় নিয়ে এই লিখটি পড়ছেন- আমাদের ছায়াপথের বাইরে, বহুদূরের কোনো গ্রহে হয়তোবা এই সময়ে শতবর্ষ পার হয়ে গিয়েছে। আবার আমাদের গ্রহের শতবর্ষ হয়তোবা অন্য কোনো গ্রহের কয়েক মিনিট মাত্র!

আরো বুঝার জন্য- Interstellar নামের একটা মুভি আছে, না দেখে থাকলে অবশ্যই দেখবেন।

Once confined to fantasy and science fiction, time travel is now simply an engineering problem.
MICHIO KAKU, Wired Magazine, August 2003

এইটা কি কইল মিচিও কাকু? সময় ভ্রমণ শুধুমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমস্যা। আসেলেই তাই।

কিন্তু, আরো কিছু সমস্যা আছে। আলোর গতি অর্জন করার জন্য আমরা যদি কোনো যান বানিয়ে ফেলি, তারপরেও সমস্যা মিটবে না। তখন সমস্যা করবে নিউটনের তৃতীয় সূত্র- “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।”

তাই উড্ডয়নের সময় মানুষের তৈরি সময় যান পৃথিবীকে এমন ধাক্কা দিবে, যার ফলে পৃথিবী তার কক্ষচ্যুত হবে।

তাহলে তো আর হচ্ছে না। আরো একটা নিরাশার কথা শুনাই-

তবু আমরা আশা রাখি। জানি সময় চলে যায়, আমিও চলে যাব। তাই শেষ করি-

আমার যাবার সময় হল, আমায় কেন রাখিস ধরে। চোখের জলের বাঁধন দিয়ে বাঁধিস নে আর মায়াডোরে॥ ফুরিয়েছে জীবনের ছুটি, ফিরিয়ে নে তোর নয়ন দুটি–. নাম ধরে আর ডাকিস নে ভাই, যেতে হবে ত্বরা করে।
-রবি ঠাকুর।

তথ্যসূত্র-
1.http://www.physicsoftheuniverse.com/topics_bigbang_timeline.html
2.Wikipedia
3.http://www.notablequotes.com/t/time_travel_quotes.html#m6L7OzqUT7AX4iCT.99

featured image: mks-onlain.ru

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

featured image: motive4you.com

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।

প্রতিদিনের জীবনে আপেক্ষিকতার নিদর্শন

পদার্থবিজ্ঞানকে কাঁপিয়ে দেয়া আবিষ্কারগুলোর মাঝে অন্যতম হলো আইন্সটাইনের আপেক্ষিক ত্বত্ত। সময় আর স্থান নিয়ে আমাদের চিরায়ত ধারণা পুরোপুরি পাল্টে দেয় এটি। আপেক্ষিক ত্বত্তের একটি স্বীকার্য হলো কোনো একটি ঘটনার ফলাফল ভিন্ন ভিন্ন গতিতে চলমান সিস্টেমে ভিন্ন হতে পারে। যদিও ভিন্ন ফলাফলের সবকটিই গাণিতিক ও পদ্ধতিগতভাবে সঠিক। কারণ সবকিছুই আপেক্ষিক।

যেমন আলোক বেগের কাছাকাছি গতিতে ছুটে চলা কোনো রকেটে কয়েক ঘন্টা পার করে কেউ পৃথিবীতে ফিরে এলে দেখবে এখানে কয়েকশ বছর পার হয়ে গেছে। আবার পর্যবেক্ষক কোনো স্থির গাড়ির যে দৈর্ঘ্যে মাপবে, গাড়িটি অতি দ্রুত বেগে চলা শুরু করলে স্থির পর্যবেক্ষক গাড়ির বেগের দিক বরাবর এর দৈর্ঘ্য আগের তুলনায় কম পরিমাপ করবে। এই দুই প্রতিক্রিয়াকে বলা হর কাল দীর্ঘায়ন আর দৈর্ঘ্য সংকোচন।

সাধারণভাবে মনে হতে পারে যেহেতু কেবলমাত্র আলোর গতির কাছাকাছি অতি দ্রুত বেগে চলতে গেলেই আপেক্ষিকতা বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন তাই এটি দৈনন্দিন জীবনে কোনোরূপ প্রভাব ফেলে না।

কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রতিদিন খুব সাধারণ কাজের মধ্যেও আমরা আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা ব্যবহার করছি! আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রকাশের ১০০ বছরেরও বেশি সময় পর দেখা যাক আপেক্ষিকতা কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে চলেছে। এখানে চারটি ঘটনার উল্লেখ করছি।

জিপিএস

স্মার্টফোন হাতে পাওয়ার পর আমরা সবাই কমবেশি জিপিএস বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম ব্যবহার করেছি। কোনো স্মার্টফোনের বর্তমান অবস্থান জানতে জিপিএস সিস্টেম একে প্রতিবার স্যাটেলাইটের সাথে সংযোগ প্রদান করে। স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে নির্দিষ্ট উচ্চতার কক্ষপথে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার বেগে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে।

যদিও এই বেগ আলোর বেগের প্রায় হাজার গুণ কম, আপেক্ষিকতার প্রভাবে বিশাল কোনো সময়ের পার্থক্য ঘটে যাওয়ার মতো কোনো ভয় নেই, তারপরও এই স্যাটেলাইটগুলোতে প্রায় ৪ মাইক্রোসেকেন্ডের মতো সময় ব্যবধান ঘটে। সেই সাথে মহাকর্ষের প্রভাবে সৃষ্ট কাল দীর্ঘায়ন যোগ করলে সময় ব্যবধান হয় ৭ মাইক্রোসেকেন্ড।

আপেক্ষিক তত্ত্বের রহস্যটাই এখানে। স্যাটেলাইটের সময় পৃথিবীর সময়ের তুলনায় দ্রুত যেতে থাকে এবং প্রতি ঘন্টায় আমাদের কাছে তার বয়স/সময় তার আসল বয়সের চেয়ে ৭ মাইক্রোসেকেন্ড বেশি বলে গণ্য হয়।

৭ মাইক্রোসেকেন্ডে চোখের পাতাও ফেলা যায় না কিন্তু কাল দীর্ঘায়নের প্রভাব বিবেচনায় না নিলে জিপিএস পৃথিবীতে আমাদের সঠিক অবস্থান দেখাতে পারবে না। এক দিন পর দেখা যাবে সে আমাদের আসল অবস্থানের চেয়ে ৮ কিলোমিটার দূরের কোথাও আমাদের অবস্থান দেখাচ্ছে। এজন্য স্যাটেলাইটে কাল দীর্ঘায়ন প্রভাব বিবেচনা করে অবস্থান নির্ণয়ের জন্য বিশেষভাবে প্রোগ্রাম করা থাকে।

স্বর্ণের রং

স্বর্ণের উজ্জল হলদে বাদামী রঙের কারণে হাজার বছর ধরে এটি অলংকার উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু আমরা কি জানি এই রঙের অন্যতম কারণ আপেক্ষিকতা! স্বর্ণ থেকে যে আলো বেরিয়ে আসে, আপেক্ষিকতা বিবেচনায় না নিলে তা হওয়ার কথা সিলভার রঙের। কিন্তু আমরা স্বর্ণের রঙ দেখি প্রায় লাল হলুদ। কেন এটা ঘটছে সেটি ব্যাখ্যা করার জন্য স্বর্ণের ইলেকট্রন বিন্যাসের দিকে একটু মনযোগ দিতে হবে।

এর পরমাণুতে মোট ৭৯ টি ইলেকট্রন আছে যারা কেন্দ্রের ৭৯ টি প্রোটন ও নিউট্রনকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। সবচেয়ে কাছের 1s অরবিটালের ইলেকট্রন দুটি আলোর গতির প্রায় অর্ধেক (0.5c) বেগে ঘুরছে। এই মাত্রাতিরিক্ত গতিবেগ না থাকলে তারা কেন্দ্রের ধনাত্মক চার্জের প্রচণ্ড আকর্ষণকে কাটাতে পারতো না, কেন্দ্রেই পড়ে বিলিন হয়ে যেত।

আপেক্ষিক ত্বত্ত অনুযায়ী আমরা জানি বেগ বৃদ্ধি পেলে গতির দিক বরাবর দৈর্ঘ্য সংকোচন ঘটে। 1s ইলেকট্রনের প্রচণ্ড গতির কারণে এই অরবিটালকে গোলাকারের বদলে লম্বাটে দেখায় এবং ইলেকট্রন দুটি কেন্দ্রের আরো কাছে চলে এসেছে বলে মনে হয়। ইলেকট্রনের লাফ দিয়ে উচ্চ কক্ষপথে যেতে শক্তি শোষণ করে নিতে হয় এবং স্বর্ণ এক্ষেত্রে অতিবেগুনী রশ্মি শোষণ করে যা আমাদের দৃষ্টি সীমার বাইরে।

কিন্তু রিলেটিভিটি বিবেচনায় নিলে, যা স্বর্ণের ইলেকট্রন কক্ষপথগুলোকে সংকুচিত ধরে নেয়, গোল্ড অতিবেগুনীর চেয়ে কম কম্পাঙ্কের নীল দৃশ্যমান আলো শোষণ করে। ফলে বর্ণালীর লাল রঙের আলোগুলোই কেবল আমাদের চোখে এসে পৌছতে পারে এবং আমরা স্বর্ণের রং দেখতে পাই লালচে হলুদ।

তড়িৎচুম্বক

প্রাকৃতিকভাবে চুম্বক ধর্ম থাকে লোহার মতো অল্পসংখ্যক কিছু ফেরোম্যাগনেটিক ধাতুতে। কিন্তু যেকোনো ধাতুকে তারের মত পেঁচিয়ে কয়েল বানিয়ে তার মধ্য দিয়ে তড়িৎ চালনা করা হলে, সেটি যে ধাতুই হোক না কেন তা চুম্বকত্ব বা চুম্বক ধর্ম লাভ করে। এভাবে তৈরী করা চুম্বককে বলা হয় তড়িৎচুম্বক। তড়িৎচুম্বকের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি কেবল গতিশীল চার্জের উপর প্রভাব ফেলে, স্থির চার্জের উপর এর কোনো প্রভাব পড়ে না। কারণ ব্যাখ্যার জন্য আবারো উপস্থিত স্পেশাল রিলেটিভিটি।

তড়িৎ প্রবাহ মূলত মুক্ত ইলেকট্রনের প্রবাহ। ধাতুতে পরিবহণ ব্যান্ডের মুক্ত ইলেকট্রনসমূহ তড়িত প্রবাহের সময় সমস্ত ধাতুতে গতিশীল হয় এবং ধাতুর প্রোটন বা নিউক্লিয়াস স্ট্রাকচার স্থির থাকে।

এখন কোনো স্থির চার্জকে যদি তড়িত চুম্বকের কাছে রাখা হয়, যদিও তড়িত প্রবাহ ঘটছে কিন্তু একক আয়তনে ইলেকট্রন ও প্রোটনের পরিমাণ সমান থাকায় ধাতুর নিট চার্জ থাকছে না যা ওই স্থির চার্জকে আকর্ষণ করবে। যদি গতিশীল চার্জ হয় এবং সেটি ধাতব তারের সমান্তরালে চলে তখন রিলেটিভিটির কারণে তারের আপাত দৈর্ঘ্য সংকোচন ঘটে এবং স্থির প্রোটনের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। ফলে ধাতব তারটি ধনাত্মক আধানে আহিত বলে বিবেচিত হয় এবং এটি গতিশীল চার্জ আকর্ষিত বা বিকর্ষিৎ হয়।

পুরাতন টিভি সেট

যারা এখনো LED মনিটরে টিভি দেখেন না, পুরাতন বাক্স সাইজ টিভির যুগে আছেন তারা নিজেদের ভাগ্যবান ভাবতে পারেন, কারণ টিভি দেখার প্রতি মুহূর্তে নিজের অজান্তেই হয়ত মহান রিলেটিভিটির সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পারছেন।

পুরাতন টিভি বাক্সের সাইজ বিশাল হবার কারণ হলো এর পিছনে একটি কেথোড রশ্মি টিউব থাকে যা ইলেকট্রনকে প্রচণ্ড গতিতে টিভি স্ক্রিনে নিক্ষেপ করতে পারে। টিভি স্ক্রিনটি বিশেষ প্রলেপ দেয়া যা ইলেকট্রনের আঘাতে নির্দিষ্ট বর্ণের আলোকরশ্মি বিকিরণ করতে পারে। এভাবেই আমরা টিভি স্ক্রিনে রঙ্গিন ছবি দেখতে পাই। কিন্তু কেথোড টিউব থেকে ইলেকট্রন নিক্ষেপ করে করে সঠিক জায়গায় ফেলা এত সহজ কাজ না, এজন্য স্ক্রিনে তড়িত চুম্বক ব্যবহার করা হয়, যাতে ছবি পরিষ্কার দেখা যায়।

এই ফায়ার করা ইলেকট্রনগুলো আলোর গতির প্রায় এক তৃতীয়াংশ গতিতে চলে। এজন্য রিলেটিভিটির কারনে সৃষ্ট দৈর্ঘ্য সংকোচনকে বিবেচনায় নিয়েই ইঞ্জিনিয়াররা তড়িত চুম্বক ডিজাইন করেন, যা স্ক্রিনে ক্লিয়ার আর অডিওর সাথে মিল রেখে সঠিক সময়ে ছবি তৈরী করে।

তথ্যসূত্রঃ IFLScience, http://www.iflscience.com/physics/4-examples-relativity-everyday-life

featured image: helix.northwestern.edu

সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গের আদ্যোপান্ত

আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (থিওরি অব রিলেটিভিটি) সম্ভবত বিংশ শতকে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় আবিষ্কার। যারা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের তেমন কিছুই জানেন না তারাও হালকা গোঁফ, উঁচু কপাল, এলোমেলো চুলের একজন বিজ্ঞানীকে খুব ভালমতো চেনেন, যিনি ১৯০৫ সালে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানের জগতেও আপেক্ষিকতা তত্ত্বের গুরুত্ব একটু অন্যরকম। এই একটিমাত্র তত্ত্ব প্রায় ১০০ বছর আগে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তা এখনো শেষ হয়নি।

আইনস্টাইন আপেক্ষিকতাকে বর্ণনা করেছেন দুই ভাগে। একবার ১৯০৫ সালে ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’, পরের বার ১৯১৫ সালে ‘আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব’। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিশেষ তত্ত্ব নিশ্চয়ই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কাজ করবে, আর সাধারণ তত্ত্ব সাধারণভাবে সকল ঘটনার জন্য কাজ করবে। বিশেষ তত্ত্বের বিশেষ ক্ষেত্র বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে তা বুঝতে হলে প্রসঙ্গ কাঠামো বা রেফারেন্স ফ্রেম নিয়ে একটু ধারণা দরকার হয়। নাম শুনে যতটা কঠিন আর খটমটে মনে হয় সত্যিকার অর্থে প্রসঙ্গ কাঠামোর ধারণা ঠিক ততটাই সহজ আর সরল।

ধরা যাক, ভোরবেলা দুজন মানুষ পার্কে দৌড়াচ্ছে, একজনের চেয়ে অন্যজন একটু দ্রুত। এখন পার্কের বেঞ্চিতে বসে থাকা যে কেউ কোনোরকম যন্ত্রপাতি ছাড়া শুধুমাত্র দেখেই বলে দিতে পারবে তাদের মধ্যে কে দ্রুত দৌড়াচ্ছে। যখন আমরা শুধু চোখে দেখে কোনো গতি বোঝার চেষ্টা করি তখন নিজের অজান্তেই একটা কাজ করতে থাকি, আশেপাশের কোনো স্থির বস্তুর সাথে সাথে সেই গতিশীল বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে কিনা তা খেয়াল করি। যদি আমাদের বস্তুটি স্থির বস্তুটিকে রেখে (আমরা যে বস্তুটিকে মনে মনে স্থির বলে ধরে নেই) সরে যেতে থাকে তবে আমরা বুঝি আমাদের বস্তুটি গতিশীল, যে বস্তুটি যত দ্রুত সরে যাচ্ছে তার গতি তত বেশি। এখানে এই স্থির বস্তুটি, যার সাথে তুলনা করে আমরা গতিশীলতা বুঝতে পারলাম তাকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলবেন প্রসঙ্গ কাঠামো।

যেকোনো কিছুই প্রসঙ্গ কাঠামো হতে পারে, যদি কেউ একজন ল্যাবে বসে একটা পরীক্ষা করে তাহলে সে পুরো ল্যাবটাকে প্রসঙ্গ কাঠামো ধরতে পারে, আবার চলন্ত গাড়িতে বসে একই পরীক্ষাটা করতে চাইলে পরীক্ষকের সাপেক্ষে ‘স্থির’ গাড়ির কামরাকেই প্রসঙ্গ কাঠামো হিসেবে ধরে নেয়া যায়।

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বে আইনস্টাইন দুটি সূত্র দিয়েছিলেন, ১. সকল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো একইরকম। ২. সব জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে আলোর গতি সমান। জড় প্রসঙ্গ কাঠামো হলো বিশেষ ধরনের কিছু প্রসঙ্গ কাঠামো যারা একে অন্যের সাপেক্ষে ধ্রুব বেগে গতিশীল।

প্রথম সূত্রটিতে বলা হয়েছে প্রসঙ্গ কাঠামো যদি জড় হয় তবে পদার্থবিজ্ঞানের সব সূত্র একরকম হবে। অর্থাৎ সব জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে সবসময় ভরের সাথে ত্বরণ গুন করে বল বের করে ফেলা যাবে। খুবই সোজা সরল কথা। সে তুলনায় দ্বিতীয় সূত্রটা মেনে নিতে কষ্ট হয়।

অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখি দুজন মানুষ যদি একই দিকে দৌড়াতে থাকে তবে তাদের একজনের সাপেক্ষে আরেকজনের যে গতি, সে তুলনার স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কারো সাপেক্ষে তাদের গতি বেশি হবে। আবার তাদের বিপরীত দিক থেকে দৌড়ে আসা কারো সাপেক্ষে তাদের গতিবেগ আরো বেশি হবে। এটাই আমাদের পরিচিত আপেক্ষিক গতি। একটা গতি থেকে অন্য গতি বিয়োগ করে এই আপেক্ষিক গতিটা বের করে ফেলা যায়। কিন্তু দ্বিতীয় সূত্রটা বলছে আলোর বেলায় আমাদের পরিচিত আপেক্ষিক গতির ধারণাটা কাজ করবে না।

তার মানে কেউ যদি স্থির দাঁড়িয়ে থেকে আলোর গতি মাপে তাহলে দেখবে আলো সেকেন্ডে একলক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে ছুটে যাচ্ছে। আবার কেউ যদি সেকেন্ডে ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে ছুটে যেতে যেতে আলোর গতি মাপে তাহলেও কিন্তু আলোর গতিবেগ আমাদের জানাশোনা পুরনো পদ্ধতি অনুযায়ী  সেকেন্ডে একলক্ষ মাইল পাবে না, একলক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইলই পাবে। দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে ব্যাপারটা মেনে নিতে কষ্ট হলেও বিজ্ঞানীরা অসংখ্যবার পরীক্ষা করার পরেও সূত্রটাতে কোনো ভুল পাওয়া যায়নি।

এই সূত্র দুটি মেনে নিয়ে যদি এগিয়ে যাওয়া হয় তাহলে দেখা যায় সময়, দূরত্ব আর ভরকে আমরা যেমন অপরিবর্তনীয় ভাবি, তেমনটা নয়। দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝতে পারি না, তার কারণ আমরা কখনোই আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ছোটাছুটি করি না। কিন্তু কেউ একজন যদি স্থির অবস্থায় থেকে আর অন্য একজন যদি আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ছুটতে ছুটতে দুটি একই ঘটনার মধ্যবর্তী সময়ের পার্থক্য মাপতে চেষ্টা করেন তাহলে দেখা যাবে ঘটনা দুটির সাপেক্ষে যিনি আলোর কাছাকাছি বেগে ছুটে যাচ্ছিলেন তার মাপা সময়ের পার্থক্য যিনি স্থির ছিলেন তার মাপা সময়ের পার্থক্যের চেয়ে বেশি হবে!

আবার ধরে নেয়া যাক একজন মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার সামনে দিয়ে একটা গাড়ি ছুটে চলে যাচ্ছে, গাড়িটার গতিবেগ যদি আলোর কাছাকাছি হয় তাহলে মাটিতে দাঁড়ানো ব্যক্তি দেখবেন গতিশীল গাড়িটা যেন সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। এইটুকুই কিন্তু শেষ না, গাড়িটাতে যদি যাত্রী থাকেন তাহলে তার সাপেক্ষে কিন্তু গাড়িটা স্থির এবং মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা আলোর কাছাকাছি বেগে সরে যাচ্ছে, কাজেই যাত্রী দেখবেন মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা সঙ্কুচিত হয়ে গেছেন!

আইনস্টাইন আরেকটা কাজ করলেন। আমাদের জগতটা ত্রিমাত্রিক অর্থাৎ সবকিছুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা এই তিনটা মাত্রা আছে। যেকোনো স্থানে কোনো বস্তুকে যদি কেউ খুঁজে বের করতে চায় তাহলে কোনো একটা প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে বস্তুটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা বরাবর দূরত্বগুলো জেনে নিতে হবে।

চিত্রঃ প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা জানা থাকলে বস্তুকে চট করে খুঁজে বের করে ফেলা যায়।

আইনস্টাইন যুক্তি দেখালেন কেউ শুধু দূরত্বগুলো জেনে নিলেই সবসময় বস্তুটি খুঁজে বের করতে পারবে না। কারণ বস্তুটি যদি গতিশীল হয় তাহলে কোনো সময়ে প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে বস্তুটির দূরত্ব কত হচ্ছে তা জানতে হবে। অর্থাৎ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতার মতো সময়ও একটা মাত্রা, শুধু পার্থক্য হলো সময়কে আমরা একটু ভিন্নভাবে অনুভব করি। আইনস্টাইন একে বললেন স্পেস-টাইম বাংলায় বললে স্থান-কাল। আগের তিনটা মাত্রার সাথে সময়কে জুড়ে দিলে দেখতে কেমন হয়?

ব্যাপারটা খুব সহজে বোঝার জন্য ধরে নেই স্থানের মাত্রা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা এই তিনটা না, স্থানের মাত্রা শুধু একটা যাকে আমরা একটা সুতার সাথে তুলনা করতে পারি। আর সময় তো নিজেই একটা মাত্রা, একেও একটা সুতার সাথে তুলনা করি। এবার যদি এই দুটি সূতা দিয়ে একটা কাপড় বুনে ফেলা হয় তাহলে দেখতে নিচের ছবিটার মতো হওয়ার কথা।

চিত্রঃ হালকা রঙের সুতাগুলো সময়ের জন্য আর গাড় রঙের সুতোগুলো স্থানের জন্য। (সহজে বোঝার জন্য তিনটা মাত্রাকে একটা ধরে নেয়াতে কিন্তু তেমন কোনো সমস্যা নেই, বিজ্ঞানীরাও হরহামেশাই এভাবে বর্ণনা করেন।)

এই ছিল মোটামুটি ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’। এতক্ষণে নিশ্চয় অনেকেই ধরে ফেলেছেন বিশেষ তত্ত্ব কেন বিশেষ। কারণ এই তত্ত্বের সূত্রগুলো কাজ করবে শুধুমাত্র যতক্ষণ প্রসঙ্গ কাঠামোগুলোর মধ্যে গতির পরিবর্তন (ত্বরণ) হবে না ততক্ষণ।

কিন্তু প্রকৃতিতে সবসময়ই সবকিছুতেই ত্বরণ হচ্ছে। তার মানে হচ্ছে তত্ত্বটা অসম্পূর্ণ এবং প্রকৃতিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে চাইলে আরো বড় পরিসরে চিন্তা করে করে তত্ত্বকে নতুন করে দাঁড় করাতে হবে, সোজা কথায় প্রসঙ্গ কাঠামোর শুধু ধ্রুব বেগের জন্য কাজ করলে হবে না, ত্বরণের জন্যও ‘আপেক্ষিকতা তত্ত্ব’ বের করতে হবে। তাই ১৯০৫ সালে বিশেষ তত্ত্ব দেয়ার পর পরই আইনস্টাইন নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন কীভাবে ত্বরণের জন্য আসল আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বের করা যায়।

প্রকৃতিতে ত্বরণের কথা ভাবতে গেলে প্রথমেই মাথায় আসবে মহাকর্ষজ ত্বরণের কথা। পৃথিবীতে উপর থেকে ফেলে দিলে যেকোনো বস্তুর ত্বরণ হয় বা বেগ বাড়তে থাকে। প্রতি সেকেন্ডে এই বেগ বাড়াটাই হল মহাকর্ষজ ত্বরণ। এই ব্যাপারটা নিয়ে নিউটন ভাবনা-চিন্তা করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যেহেতু বল প্রয়োগ করলে ত্বরণ হয় তার মানে মহাকর্ষজ ত্বরণও নিশ্চয়ই কোনো বলের কারণে হচ্ছে। তিনি এর নাম দিলেন মহাকর্ষ বল। অবশ্য এই বলের উৎস সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

মহাকর্ষ বল কেমন হতে পারে, তার জন্য গাণিতিক সমীকরণ কেমন হতে পারে সব নিউটন ভেবে ভেবে বের করে রেখেছিলেন এবং এসব সমীকরণ দিয়ে প্রকৃতিকে বেশ ভালোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল। আইনস্টাইন তার আশেপাশে গেলেন না। একদিন অফিসের জানালা দিয়ে পাশের বিল্ডিঙের ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মাথায় এল কেউ যদি হঠাৎ পা পিছলে ছাদ থেকে পড়ে যায় এবং অভিকর্ষের প্রভাবে ত্বরণ নিয়ে নিচে পড়তে থাকে তাহলে মাটিতে পড়ার আগে সে কেমন অনুভব করবে? আইনস্টাইন ভাবনাটা আরেকটু এগিয়ে নিয়ে গেলেন, ভাবলেন কেউ যদি একটা বাক্সের ভেতর থাকেন এবং তাকে যদি বাক্সটা সহ ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয় তখন কী হবে? লিফটের কর্ড ছিঁড়ে গেলে ঠিক এই অবস্থাটাই হয়।

বাক্সটি ফেলে দেয়ার আগ পর্যন্ত লোকটি বাক্সের ভিতরে দাঁড়িয়ে বাক্সের তলায় ওজনের সমান বল প্রয়োগ করছিলেন, তাই বাক্সটিও তার ওজনের সমান এবং বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া বল ব্যক্তিটির উপর প্রয়োগ করছিল বলে তিনি তার ওজনটা অনুভব করছিলেন। যখনই বাক্সটাকে ফেলে দেয়া হবে সাথে সাথে বাক্সের ভেতরের মানুষটা মহাকর্ষজ ত্বরণের জন্য নিচে পড়তে থাকবেন এবং প্রতি সেকেন্ডে তার বেগ ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড করে বাড়তে থাকবে। কিন্তু বাক্সটাও মহাকর্ষজ ত্বরণের প্রভাবে পড়ে যাচ্ছে তাই পড়তে পড়তে সেটার বেগও প্রতিসেকেন্ডে ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড করে বাড়তে থাকবে, অর্থাৎ বাক্সটি মানুষটার পায়ের নিচ থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড বেগে সরে যেতে থাকবে। তার মানে কিন্তু মানুষটা আর বাক্সটার তলায় বল প্রয়োগ করতে পারছেন না ফলে কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই, তাই তিনি নিজের ওজনটাও অনুভব করতে পারছেন না।

ব্যাপারটা কেমন হলো? বাক্স এবং মানুষ দুজনেরই ত্বরণ হচ্ছে কিন্তু তারা কেউই কোনো বল অনুভব করছে না। মহাকর্ষ বলহীন কোনো স্থানে স্থির অবস্থায় থাকলে যে অনুভূতি হবে, পৃথিবীতে মহাকর্ষজ ত্বরণের সমান ত্বরণে পড়তে থাকলে ঠিক সেই অনুভূতি হবে। ঠিক এই ভাবনাটাকেই একটু উল্টো করে ভাবলে বলা যায় বাক্সটা যদি শূন্যস্থানে কোনোরকম আকর্ষণের আওতায় না থেকে মহাকর্ষজ ত্বরণের সমান ত্বরণ নিয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে তাহলে ভিতরের কোনো মানুষ যেমন অনুভব করবে, পৃথিবীর পৃষ্ঠে স্থির অবস্থায় থাকলেও ঠিক তেমনই অনুভব করবে।

আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন মহাকর্ষ বল আর ত্বরণ আসলে একই জিনিষ এবং একে বললেন, “the happiest thought in my life”। এই মহাকর্ষ আর ত্বরণ সমান হওয়াকে নাম দিলেন “equivalence principle”।

এবার উপরের ছবিটা একটু দেখা যাক। আইনস্টাইন ঠিক এই থট এক্সপেরিমেন্টটাই করেছিলেন ভেবে ভেবে। দেখা যাচ্ছে লিফটের বাইরের লোকটা সামনের দিকে একটা আলোকরশ্মি নিক্ষেপ করেছেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির সাপেক্ষে যখন লিফটটা স্থির (চিত্রের প্রথম অংশে) তখন লিফটের ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোক রশ্মিটা একপাশ থেকে এসে সোজা অন্য পাশের দেয়ালে আঘাত করছে। বাইরের ব্যক্তির সাপেক্ষে লিফটটা যখন ধ্রুব বেগে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে তখন ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোকরশ্মিটা চিত্রের মতো বেঁকে যাচ্ছে এবং পাশের দেয়ালে আঘাত করার আগে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হচ্ছে, সময়ও বেশি লাগছে (ধ্রুব বেগের জন্য যে এমনটা হয় তা আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব থেকে আমরা আগেই জেনে গেছি)।

বাইরের ব্যক্তির সাপেক্ষে লিফটটার যখন উপরের দিকে ত্বরণ হচ্ছে তখন ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোকরশ্মিটা বেঁকে যাচ্ছে এবং পাশের দেয়ালে আঘাত করার আগে, আগের চেয়েও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করছে, সময়ও বেশি লাগছে। এর কারণ কী হতে পারে? আইনস্টাইন ভাবলেন, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি যেহেতু আলোক রশ্মিটাকে কখনোই বেঁকে যেতে দেখবেন না কিন্তু লিফটের সাথে ত্বরণে ছুটে চলা মানুষটা যেহেতু দেখবেন, আলোকরশ্মিটা বেশি সময় ধরে বেঁকে গিয়ে গিয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলছে তার মানে নিশ্চয়ই স্থির ব্যক্তির স্থান-কালের তুলনায় ত্বরণে থাকা ব্যক্তির স্থান-কালটাই বেঁকে যাচ্ছে। ত্বরণের জন্য স্থান-কাল বেঁকে যাচ্ছে। আবার “equivalence principle” অনুযায়ী যেহেতু ‘মহাকর্ষ’ আর ‘ত্বরণ’ একই জিনিস সেহেতু অভিকর্ষের জন্যও স্থান-কাল এভাবে বেঁকে যাবে।

অর্থাৎ আমরা যদি বলি, মহাকর্ষ বল বলে কিছু নেই কিংবা ‘ভারী বস্তুর মহাকর্ষ বল বেশি, হালকা বস্তুর মহাকর্ষ বল কম- এমনটা সত্য হবে না। ভারী বস্তু আসলে তার চারপাশের স্থান-কালকে বেশি করে বাঁকায় আর হালকা বস্তু কম বাঁকায়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। শুনে মনে হতে পারে গালগল্প কিন্তু আইনস্টাইন সত্যি সত্যি এই বাঁকানো স্থান-কালের ধারণা দিয়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করে ফেললেন। যেমন সূর্য যদি পৃথিবীকে আকর্ষণ না করে শুধু স্থান-কালকে বাঁকিয়ে বসে থাকে তাহলে পৃথিবী কেন সূর্যের চারিদিক ঘুরবে না?

চিত্রঃ সূর্যের চারিদিকে বাঁকানো স্থান-কালে আটকা পড়ে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে।

 

ঠিক যে কারণে পানি গড়িয়ে নিচু জায়গায় পড়ে যেতে চায় সেই একই কারণে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে বাঁকা স্থান-কালের মধ্যে পড়ে ঘুরতে থাকে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলে, পরবর্তী ছবির মতো করে একটা টানটান করে রাখা চাদরের মাঝখানে ভারী কিছু রেখে আরেকটু হালকা একটা গোলককে কিছু গতি দিয়ে ছেড়ে দিয়ে দেখতে পারেন। এখানে চাদরটা স্থান-কালের মতো ভারী বস্তুটার ভরের জন্য বেঁকে যাবে। পৃথিবী কেমন করে সূর্যকে ঘিরে ঘুরতে থাকে, হালকা গোলকটার গতি দেখলেই সেটা বুঝে ফেলা সম্ভব।

এখানে অবশ্য চাদরের সাথে গোলকের ঘর্ষণে শক্তি কমতে কমতে একটা সময় গোলকটা মাঝখানের ভারী বস্তুতে গিয়ে আঘাত করবে, কিন্তু পৃথিবী যেহেতু শূন্যস্থানে ঘুরছে তাই তার সাথে কোনোকিছুর ঘর্ষণে গতিশক্তি কমে যায় না, পৃথিবীও সূর্যে গিয়ে আঘাত করে না।

আইনস্টাইন ত্বরণের জন্য আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বের করতে গিয়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করে ফেললেন। নিউটনের পুরনো তত্ত্বকে পাশ কাটিয়ে আইনস্টাইন তার এই নতুন তত্ত্বটি দিয়ে ভরযুক্ত বস্তুর পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় আলোক রশ্মির বেঁকে যাওয়া (Gravitational Lensing), ভরযুক্ত বস্তুর কাছে সময়ের ধীর হয়ে যাওয়া (time dilation), ঘূর্ণায়মান ভরের দিকে স্থান-কালের টান ইত্যাদি ঘটনা ব্যাখ্যা করে ফেললেন, যেগুলো নিউটনের মহাকর্ষ বলের ধারণা দিয়ে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না।

আইনস্টাইন কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে শুধুমাত্র ভেবে ভেবেই বের করে ফেলেছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা অনেকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এই তত্ত্বের সবগুলো ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য প্রমাণ করেছিলেন। শুধু একটা ছাড়া। সেটি “মহাকর্ষীয় তরঙ্গ”।

আইনস্টাইন তার নতুন তত্ত্বটা দিয়ে অনেক কিছুই ঠিকঠিক ব্যাখ্যা করে ফেললেন কিন্তু ভারী বস্তু যে ভরের জন্য সত্যি সত্যিই চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে তা সরাসরি প্রমাণ করা যায় কীভাবে? আইনস্টাইন আবার ভেবে ভেবে বের করলেন, দুটি ভারী বস্তু যদি একে অন্যকে ঘিরে ঘুরতে ঘুরতে কাছাকাছি আসতে থাকে তবে তারা যে তাদের ভরের জন্য স্থান-কালকে বাঁকিয়ে রেখেছিল সেই বাঁকানো ভাবটার খুব দ্রুত একটা পরিবর্তন ঘটবে।

এই দ্রুত পরিবর্তনটার জন্য একটা খুব শক্তিশালী তরঙ্গ উৎপন্ন হয়ে হয়ে ছড়িয়ে পড়ার কথা, এই তরঙ্গটাকে তিনি নাম দিলেন ‘মহাকর্ষীয় তরঙ্গ’। কোনোভাবে যদি এইরকম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুঁজে পাওয়া যায় তাহলেই প্রমাণ হয়ে গেল যে ভারী বস্তু আসলেই স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে এত এত লেখালেখি হচ্ছে যে সেগুলো পড়ে পড়ে আমরা সবাই এ সম্পর্কে কমবেশি জানি।

সবাই অনুপ্রস্থ তরঙ্গ চিনি। যে তরঙ্গ নিচের ছবির মতো মাধ্যমের কণাগুলোকে উপরে নিচে কাঁপাতে কাঁপাতে কণার গতির দিকের সাথে সমকোণে এগিয়ে যায় সেটাই অনুপ্রস্থ তরঙ্গ। যেমন পানির ঢেউ।

চিত্রঃ অনুপ্রস্থ তরঙ্গ।

আবার যে তরঙ্গ মাধ্যমের কণাগুলোকে সামনে পিছনে কাঁপাতে কাঁপাতে কণার গতির দিকে সমান্তরাল দিকে এগিয়ে যাবে তাকে আমরা বলি অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ। যেমন শব্দের তরঙ্গ।

চিত্রঃ অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ।

তবে মহাকর্ষ তরঙ্গ কিন্তু আমাদের পরিচিত অনুপ্রস্থ বা অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ না, একটু বিশেষ ধরনের তরঙ্গ। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘কোয়াড্রুপল তরঙ্গ’। এই তরঙ্গ স্থানকে মাধ্যম হিসেবে ব্যাবহার করে এবং অনুপ্রস্থ আর অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের মতোই মাধ্যমের সংকোচন প্রসারণ করে আলোর বেগে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কোয়াড্রুপল তরঙ্গ স্থানের মধ্য দিয়ে ছুটে চলার সময় স্থানকে যদি আনুভূমিক দিকে সংকুচিত করে তবে উলম্ব দিকে সম্প্রসারিত করে। একইভাবে, যদি আনুভূমিক দিকে সম্প্রসারিত করে তবে উলম্ব দিকে সংকুচিত করে, নিচের ছবির মতো। বোঝার সুবিধার জন্য এখানেও ধরে নিলাম স্থানের মাত্রা দুটি, দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ।

চিত্রঃ প্রথম চিত্রে স্থান-কাল আনুভূমিক দিকে প্রসারিত, উলম্ব দিকে সংকুচিত হয়েছে। দ্বিতীয় চিত্রে ঠিক উল্টো ঘটনাটা ঘটেছে।

কিন্তু এই কোয়াড্রুপল মহাকর্ষজ তরঙ্গ এত বেশি দুর্বল যে, যত সহজে মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্তকরণের কথা বলা হলো, সত্যি সত্যি সনাক্ত করতে গেলে ঠিক ততটাই সূক্ষ্ম আর সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি দরকার। আইনস্টাইনের সময় এত সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির কথা চিন্তাও করা যেত না।

বেশ কিছু বছর পরে পদার্থবিজ্ঞানী Ray Weiss মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার জন্য একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি বের করলেন। তার পদ্ধতিটা সহজ, এতে থাকবে দুটি সমান দৈর্ঘ্যের টানেল, যেগুলো পরস্পর সমকোণে অবস্থান করবে। প্রত্যেকটি টানেলের শেষ মাথায় লাগানো থাকবে প্রতিফলক আয়না, দুটি টানেলের দৈর্ঘ্য খুব সূক্ষ্মভাবে সমান হতে হবে। টানেলগুলো দিয়ে আলোর ব্যতিচার মাপা হবে কাজেই সূক্ষ্মভাবে সমান করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

একটি লেজার বিমকে বিশেষ কৌশলে দুইভাগে ভাগ করে টানেলগুলো দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হলে (নিচের ছবির মতো) লেজার রশ্মিগুলো টানেলের শেষ মাথার প্রতিফলক আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে। বিজ্ঞানীরা অনেক বছর ধরে অনেক খেটেখুটে টানেল দুটিকে খুব সূক্ষ্মভাবে সমান করে তৈরি করেছেন তাই ফিরে আসা রশ্মি দুটো ব্যতিচার করে পরস্পরকে নাই করে দিবে।

চিত্রঃ LIGO Interferometer.

এখন যদি পৃথিবীর মধ্য দিয়ে মহাকর্ষ তরঙ্গ ছুটে যায় তাহলে স্থানের একবার সংকোচন আরেকবার প্রসারণ হবে। যেহেতু এই যন্ত্রটিও স্থানের মধ্যেই আছে সেহেতু টানেল দুটিতেও নিচের চিত্রের মতো সংকোচন-প্রসারণ হবে।

চিত্রঃ উলম্ব টানেলটা সংকুচিত আর আনুভূমিক টানেলটা প্রসারিত হচ্ছে।
চিত্রঃ উলম্ব টানেলটা প্রসারিত আর আনুভূমিক টানেলটা সংকুচিত হচ্ছে।

এই সংকোচন প্রসারণের জন্যই আগের মতো প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসা রশ্মি দুটো ব্যতিচারের মাধ্যমে আর পরস্পরকে নাই করে দিতে পারবে না। রশ্মি দুটো মিলে আরেকটু বেশি শক্তিশালী রশ্মি তৈরি করে শনাক্তকারকে আঘাত করবে (নিচের ছবি)। শনাক্তকারক থেকে এই রশ্মির তীব্রতা মাপা আর মহাকর্ষ তরঙ্গ মাপা আসলে একই কথা।

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ বেঙ্গলেনসিস (ইমতিয়াজ আহমেদ)।

বাস্তবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে গিয়ে কিন্তু বিজ্ঞানীদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। কারণ মহাকাশের অনেক অনেক দূরে পরস্পরকে ঘিরে ঘুরতে থাকা দুটি নিউট্রন তারা বা ব্ল্যাকহোল থেকে আসা মহাকর্ষ তরঙ্গ পৃথিবীতে স্থানকে এত কম বিচ্যুত করবে যে তা শনাক্ত করতে হলে প্রায় অসাধ্য সাধন করতে হবে। তাই তারা প্রত্যেকটি টানেলকে ৪ কিলোমিটার লম্বা করে তৈরি করলেন (টানেলের দৈর্ঘ্য যত বেশি হবে বিচ্যুতি ধরতে পারার সম্ভাবনাও তত বাড়ে)।

এতটুক পড়ে এসে অনেকে নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন, এতটা সংবেদনশীল করে তৈরি করার একটা অসুবিধাও আছে, যন্ত্রটার কাছাকাছি খুব অল্প কোনো নয়েজও যন্ত্রটাতে প্রভাব ফেলবে। যন্ত্রটার সংবেদনশীলতা এতই বেশি যে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে একটা তালি দিলেই একটা বিক্ষেপ দেখা যাবে। এই সমস্যাটা যাতে না হয় এবং পৃথিবীর কোনো নয়েজকে যাতে মহাকর্ষ তরঙ্গ ভেবে ভুল না হয় তাই বিজ্ঞানীরা দুটি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় দুটি একইরকম যন্ত্র তৈরি করে রেখে দিয়েছিলেন কারণ দুই জায়গায় দুটি ভিন্ন যন্ত্রে একই সাথে বাইরে থেকে একই পরিমাণ নয়েজ ঢুকে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এই ধরনের ব্যবস্থা আর এত এত সতর্ক পদ্ধতি নিয়ে ২০০১ সালে LIGO প্রকল্প শুরু হয়েছিল। ২০১০ পর্যন্ত এর মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার মতো সংবেদনশীলতা ছিল না। শেষপর্যন্ত ২০৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করে এর সংবেদনশীলতা ১০ গুন বাড়িয়ে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আবার চালু করা হয়। নতুন আপগ্রেডেড যন্ত্রপাতি নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসেই বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করে ফেললেন।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করে শুধুমাত্র আইনস্টাইনের বক্র স্থান-কালের ধারণা প্রমাণ করা হলো কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের সামনে একটা বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে গেল। ব্ল্যাকহোল থেকে কোনো তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ বের হতে পারে না। আমরা যেহেতু এতদিন শুধু তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গকেই যোগাযোগের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হিসেবে জানতাম তাই ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণাও হালে খুব একটা পানি পায়নি।

আবার বিগ ব্যাং এর পরে একটা নির্দিষ্ট সময় পর থেকে মহাবিশ্ব কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা আমরা জানি। কিন্তু বিগ ব্যাং এর ঠিক পর পরই মহাবিশ্বের ঘনত্ব এত বেশি ছিল যে সেখান থেকে কোনো রকম তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ বের হতে পারেনি। তাই বিগ ব্যাং এর ঠিক পর পরই মহাবিশ্ব কেমন ছিল তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গের আচরণ থেকে তার কোনোরকম তথ্য পাওয়া যায় না।

কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা নেই, মহাবিশ্বের একেবারে শুরুতে উচ্চ ঘনত্ব যেমন এই তরঙ্গকে আটকে রাখতে পারেনি তেমনি ব্ল্যাক হোলের উচ্চ ঘনত্বেও এই তরঙ্গ আটকা পড়ে থাকবে না। তাই এই সংক্রান্ত গবেষকদের কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে গেল। আমাদের জীবদ্দশাতেই হয়ত আমরা জানতে পারবো মহাবিশ্ব একেবারে জন্মের সময়টা কীভাবে পার করেছে অথবা ব্ল্যাক হোলের ভিতরে কেমন সব আশ্চর্য ঘটনা ঘটে চলছে।

তথ্যসূত্রঃ

১. https://blog.mukto-mona.com/2016/02/12/48439/

২. https://blog.mukto-mona.com/2016/02/12/48447/

৩. https://www.youtube.com/watch?v=J9Zs-CjybTc

৪. http://csep10.phys.utk.edu/astr161/lect/history/einstein.html

৫. http://www.ceder.net/def/quadruple.php4?language=usa

৬. http://www.pitt.edu/~jdnorton/Goodies/Chasing_the_light/

৭. http://www.einstein-online.info/spotlights/equivalence_principle

৮. https://www.youtube.com/watch?v=RzZgFKoIfQI

featured image: rsi.ch

দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- ছোট যদি হতে চাও, বড় হও আগে

আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা ইতোমধ্যেই টুক টাক জানতে শুরু করে দিয়েছি। আমরা ইতোমধ্যেই কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধে কিছুটা জানি, আর এবার জানবো দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন সম্বন্ধে।

প্রথমেই আমরা জেনে নেই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন বলতে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি অনুসারে যদি কোন বস্তু তোমার সাপেক্ষে স্থির অবস্থায় থাকে তখন তার দৈর্ঘ্য মাপলে তুমি যে মান পাবে যদি, বস্তুটি তোমার সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল হয় তবে তার দৈর্ঘ্য মাপতে গেলে দেখবে যে বস্তুটির দৈর্ঘ্য কমে গেছে। বস্তুটি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যাক বা, কাছেই আসতে থাকুক না কেন সবসময়ই দেখবে যে বস্তুটি বড় থেকে সমবেগে গতিশীল হওয়ার পরপরই ছোট হয়ে গেছে। আমরা আগেও দেখেছি ইথার ধারণাকে বাঁচানোর জন্য ফিটজগোরাল্ড প্রথম এই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। আর লরেন্টজ সেই সঙ্কোচনের পরিমাণটিকে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন।

length_cont2

আমরা কাল দীর্ঘায়নের বাস্তব উদাহরণে দেখেছি যে, বায়ুমন্ডলে মহাজাগতিক রশ্মির সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট হওয়া মিউওন মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড টিকে থাকে। সেই মিউওনগুলোর বেগ অনেক বেশি হয়ে থাকে, প্রায় আলোর বেগের কাছাকাছি। কিন্তু এত বেগ নিয়েও ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের যাওয়ার কথা মাত্র ৬৬০ মিটারের মত। কিন্তু এরপরও মিউওন কিন্তু অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসে। এর কারণ হল মিউওনের বয়স মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড হলেও আমাদের কাছে তা কাল দীর্ঘায়নের ফলে আমাদের কাছে ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড। এই বেগে মিউওন অতিক্রম করবে প্রায় ১৯ কি.মি. পথ। যা পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসার জন্য যথেষ্ট দূরত্ব।

Image result

কিন্তু কাল দীর্ঘায়নের হিসেব মতে মিউওন নিজে কিন্তু তার সময় ঠিকই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড দেখবে। এ সময়ে যদি সে ১৯ কি.মি. দূরত্ব অতিক্রম করে তবে তার বেগ আলোর বেগের প্রায় ২৯ গুন হতে হবে। কিন্তু আলোর চেয়ে বেশি বেগে তো কিছু যেতে পারে না। তাহলে এই ১৯ কি.মি. দূরত্ব মিউওন অতিক্রম করল কিভাবে? একটা অসাধারণ প্যারাডক্স বা, ধাঁধা তৈরি হয়ে গেল দেখা যাচ্ছে। তাহলে এখন চলো এই প্যারাডক্সটির সমাধান করে ফেলা যাক।

পৃথিবী থেকে আমরা দেখব মিউওনের আসতে সময় লেগেছে t=৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড(কাল দীর্ঘায়নের ফলে)। বায়ুমন্ডল থেকে পৃথিবী পৃষ্ঠের দূরত্ব কিন্তু বিজ্ঞানীরা মেপে রেখেছেন। যদি ধরে নেই মিউওন কোনভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠে এসেই রুপান্তরিত হয়ে যায় তাহলে ধরে নিতে পারি এ দূরত্ব হল  =১৯ কি.মি.।

তাহলে মিউওনের বেগ v হলে বেগ=দূরত্ব/সময় অনুসারে আমরা লেখতে পারি,

v= /t ………………………………………………(1)

আবার মিউওন দেখবে পৃথিবীটাই মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের কাছে চলে গেছে। তাহলে মিউওন তার সময় মাপবে,
মাইক্রোসেকেন্ড। এই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের মনে হবে পৃথিবীটা v বেগে (পৃথিবীর কাছে মিউওনের বেগ

যত, মিউওনের কাছেও পৃথিবীর বেগ তত! আপেক্ষিকতা!) তার কাছে চলে গেছে। এ সময় পৃথিবী অতিক্রম করেছে L দূরত্ব। তাহলে,

v=L/vbn(2)

আমরা লক্ষ্য করি যে, দুবার আমরা দৈর্ঘ্যের জন্য দুইরকম সঙ্কেত ব্যবহার করেছি। একবার  আরেকবার L. কারণ আমরা আগেই দেখেছি রিলেটিভিটির হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে সময়ই আপেক্ষিক হয়ে যায়। তাই দৈর্ঘ্যও আপেক্ষিক হতে পারে এই সন্দেহ থেকেই এই কাজটি করা। দৈর্ঘ্য যদি আপেক্ষিক না হয় তাহলে একটু পরেই আমরা হয়ত দেখব যে,  ।

তাহলে এখন, (1) এবং (২) নং সমীকরণ থেকে পাই,

                                                                                                                 ……………………………………………..….(3)

আমরা কাল দীর্ঘায়নের সূত্র থেকে জানি,

                                                                                                                   ..…………………………………….………..(4)

 

(3) এবং (4) নং সমীকরণ থেকে পাওয়া যায়,

বা,

বা,

এটিই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র।  হল স্থির অবস্থায় মাপা কোন কিছুর দৈর্ঘ্য, আর L হল সেই কোন কিছুর গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্য। কোন কিছুই আলোর বেগে চলতে পারেনা। তাই এই সমীকরণের  এর মান সর্বদাই ১ এর চেয়ে বেশি হবে (লব ছোট আর হর বড় হওয়ার কারণে)। আবার  এর মানও ১ এর চেয়ে ছোট কিন্তু ধনাত্মক একটি দশমিক সংখ্যা হবে। স্থির অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যকে এই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করলে আমরা যে গুনফল পাব সেটিই হবে গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যের সমান।  সবসময় ১ এর চেয়ে ছোট বলে এই গুনফলও সর্বদাই  এর চেয়ে কম হবে। তাই গতিশীল অবস্থায় আমাদের কাছে মনে হবে সবকিছুই তার দৈর্ঘ্যের দিক থেকে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। মিউওনের কাছেও পৃথিবীর দূরত্ব সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়াই সে ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডেই পৃথিবীতে এসে পৌঁছে গেছে বা, পৃথিবী তার কাছে পৌঁছে গেছে। সুতরাং দৈর্ঘ্য সঙ্কুচিত করে ফেললেই কিন্তু মিউওনের প্যারাডক্সটি সুন্দরভাবে সমাধান হয়ে যায়।

 এই সূত্রটিই হল দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র। এর আগেও ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টজ যে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র দিয়েছিলেন সেই সূত্র আর এটি কিন্তু হুবুহু এক। শুধু পার্থক্য হল তারা পদার্থের নিজেদের সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন আর আইনস্টাইন তার স্পেশাল রিলেটিভিটিতে স্পেস বা, স্থানের নিজেরই সঙ্কোচনের কথা বললেন।

Image result

আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন দেখতে পাইনা। এর কারণ হল, আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু এর প্রভাবটা আমাদের চোখে পরে। তখন এ সঙ্কোচনের মান অনেক বেশি হয়ে যায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যেসব বেগ দেখি তা আলোর বেগের তুলনায় এতই কম যে এর ফলে দৈর্ঘ্যের সঙ্কোচন ঘটলেও তা আমাদের সূক্ষাতিসূক্ষ যন্ত্র দিয়েও আমরা তা ধরতে পারবো না। তাই আমরা দৈনন্দিন জীবনে বিষয়টি আসলে বুঝতেও পারবো না। আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু বিষয়টি আমরা বুঝতে পারব। যদি কোন কিছু আলোর ৮৭% গতিতে চলত তাহলে আমরা দেখতাম স্থির অবস্থার চেয়ে তার দৈর্ঘ্য একদম অর্ধেক হয়ে গেছে!! আর যদি তা আলোর গতিতে চলতে পারতো তবে তা হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখতাম! কিন্তু কোন কিছু একদম শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া তো আর সম্ভব নয়। আর এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, কোন কিছুই আসলে আলোর বেগে চলতে পারে না।

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের আয়না এবং স্পেশাল রিলেটিভিটির দুইটি স্বীকার্য

স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী। সবচেয়ে আলোচিত এবং মেধাবীও বলা চলে। বিজ্ঞানী মাইকেলসন আর মর্লি আলোর বেগের আপেক্ষিকতার পরীক্ষা করেছিলেন পরীক্ষাগারের, যন্ত্র পাতির সাহায্য নিয়ে। আর কিশোর আইনস্টাইন সেটা করেছিলেন তার মাথার পরীক্ষাগারে, একটি ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে। আজ আমরা সেই পরীক্ষার কথায় জানবো। তার সাথে সাথে জানবো এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে কিভাবে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে যাই।

Image result for albert einstein wallpaper

তখন ১৮৯৬ সাল। আইনস্টাইনের বয়স কেবল ষোল। আইনস্টাইন তখনও মাইকেলসন আর মর্লির ইথারের পরীক্ষার বিষয়ে একদমই জানতেন না। ইথারের অস্তিত্ব যে কিছুটা সন্দেহের মুখে পড়ে গেছে তা না জেনেই আইনস্টাইন তার জীবন্ত পরীক্ষাগার, নিজের মাথায় একটি থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। আইনস্টাইন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন, “কি ঘটবে যদি আমি এখন আমার দুই হাতে একটি আয়না ধরে আলোর বেগে দৌড়াতে শুরু করি। আমি নিজে কি নিজের প্রতিচ্ছবি সেই আয়নায় দেখতে পাবো?” বলে রাখা ভাল যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতায় শুধু আলোর বেগ কেন, আলোর চেয়ে বেশি বেগে যাওয়ার বিষয়েও কোন রকম বিধি নিষেধ ছিল না।

বিজ্ঞানীরা আরো আগে থেকেই জানতেন যে, আলোর বেগ ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ড। কিন্তু কার সাপেক্ষে আলোর এই বেগ? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য তারা ইথারের ধারণার অবতারণা করেছিলেন। অর্থাৎ, আইনস্টাইন যখন আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেবেন তখন আলো ইথার মাধ্যমে ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আইনস্টাইনের হাতে ধরে রাখা আয়নাটির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করবে। আইনস্টাইন নিজেও আলোর বেগে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে আলো আর আইনস্টাইনের বেগ সমান বলে আলো কখনই আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আয়নায় পৌঁছাতে পারবে না।

এ পর্যন্ত বুঝতে কারো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এবার আমরা মনে করি দেখি যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটিতে কি বলা হয়েছিল। এই স্বীকার্য আমাদের বলেছিল যে, “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”। যার অর্থ আমরা যদি একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি বস্তু বিবেচনা করি তাহলে আমরা কোনভাবেই বলতে পারব না যে কে গতিশীল আছে আর কে স্থির আছে।

চলুন, এখন আবার আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্টে ফিরে যাই। আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে এই বিষয়টি নিশ্চিত যে, আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড়ালে আসলে আমাদের প্রতিবিম্ব আয়নাতে আমরা দেখতে পারবো না। ফলে নিজেদের মুখ আমরা আয়নায় দেখতে পাবো না। তাহলে কি দাঁড়ালো? একজন যদি আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেয় এবং আয়নায় দেখে নিজের প্রতিবিম্ব সেখানে পরছে না তখনই সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে, সে আসলেই আলোর বেগে গতিশীল আছে। কিন্তু গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার স্বীকার্য আমাদের বলেছিল কোন একটি পরীক্ষা স্থির অবস্থায়ই করা হোক বা, সমবেগে গতিশীল থাকা অবস্থায়ই করা হোক না কেন একই ফলাফল দেবে। কিন্তু এই থট এক্সপেরিমেন্টে এই স্বীকার্যটি তো ভুল প্রমাণ হয়ে গেল!! তাহলে?

Image result for looking in mirror

আইনস্টাইন তার এই থট এক্সপেরিমেন্টে ইথার ধারণাটিকে প্রথমে সত্য বলে ধরে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, আলোর বেগ শুধু ইথারের সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড থাকে। অর্থাৎ, ইথার ধারণা সঠিক হলে গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটি ভুল হয়ে যায়।

যদি গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যকে সত্য হতে হয় তাহলে নিজের প্রতিবিম্ব আয়নায় দেখা যেতে হবে স্বাভাবিকভাবেই। আর সেটা তখনই সম্ভব হবে যখন আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই ধ্রুব বা, একই হবে। তাহলে আইনস্টাইন যদি আলোর বেগেও যান তাহলেও আলো তার সাপেক্ষে আলোর বেগেই চলবে। ফলে আলো স্বাভাবিকভাবেই আয়নায় পৌঁছাবে আর আইনস্টাইন তার মুখমন্ডল দেখতে পাবেন।

বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কারভাবে বলা যাক। ধরি, আইনস্টাইন একটি আয়না নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তাহলে তিনি যদি এখন তার ডান হাতটি হালকা নাড়ান তবে খুব কম সময়ের মাঝে সামনের আয়নাতে তিনি তার ডান হাত নাড়ানোটি দেখতে পাবেন। এখন যদি তিনি আলোর কাছাকাছি বেগে আয়নাটি নিয়ে দৌড় দেন তবে গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে তার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাবে (যদি কোন গাড়ি ১০ মি./সেকেন্ড বেগে যায় আর আপনি ৫ মি./সেকেন্ড বেগে সেই একই দিকে দৌড়ান তাহলে আপনার কাছে মনে হবে গাড়ির বেগ কমে ৫ মি./সেকেন্ড হয়ে গিয়েছে। একই যুক্তিতে আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলে আপনার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাওয়ার কথা)। তাহলে ডান হাত নাড়ানোর অনেক পরে তিনি আয়নাতে তার হাত নাড়ানো দেখতে পাবেন। সময়ের এ পার্থক্য দিয়েও যে কেউ বলে ফেলতে পারবেন যে তিনি আসলে স্থির নয় বরং গতিশীল আছেন। অর্থাৎ, আপনি স্থির থাকলে আলোর বেগ আপনার কাছে যত হবে আপনি যদি আলোর কাছাকাছি বেগেও দৌড়ানো শুরু করেন তবেও আলোর বেগ আপনার সাপেক্ষে ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ডই থাকতে হবে। তবেই শুধুমাত্র গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকে বাঁচানো সম্ভব হবে। আর এটি সত্য হলে আলোর বেগের ওপড় ইথারের আর কোন প্রভাব থাকে না। সুতরাং ইথার ধারণাটিও অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।

অর্থাৎ, গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্য এবং ইথার ধারণা এ দুটোই একই সাথে সত্য হতে পারেনা। এদের যেকোন একটাকে মিথ্যা হতেই হবে। এর আগেই মাইকেলসন-মর্লির এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা দেখেছি ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হয় নি। আইনস্টাইনও দেখলেন আলোর বেগকে যদি সব কিছুর সাপেক্ষে সর্বদা একই ধরে নেয়া হয় তাহলে ইথারের আর প্রয়োজন পড়ে না। এভাবেই ইথার ধারণাটি আইনস্টাইন বাতিল করে দিলেন আর গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকেই নিজের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিরও প্রথম স্বীকার্য বানিয়ে নিলেন। আর দ্বিতীয় স্বীকার্যতে বললেন, আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব যা আমরা উপড়ের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে দেখলাম।

আলোর বেগ সব কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব এই কথাটি মেনে নিতে অনেকেরই প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট হয়। তাই বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করা যাক। ধরুন, পৃথিবীর মানুষ আর এলিয়েনদের মাঝে একটি যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। আপনি একটি স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে গেলেন। একজন এলিয়েনও তাদের স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে চলে গেলো। দুজনের স্পেস শিপেই কিন্তু হেডলাইটের মতো লাইট জ্বলার ব্যবস্থা আছে। হঠাৎ জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়াই আপনি আপনার স্পেস শিপটি নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তখনই এলিয়েন স্পেস শিপটি ২,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ছুঁটে আসল। আর আসতে আসতে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গুলি ছুঁড়তে পারে এমন একটি বন্দুক থেকে আপনার দিকে গুলি ছুঁড়তে লাগলো। তাহলে আপনি গুলিগুলোর বেগ কত দেখবেন? নিশ্চয় উত্তর দেবেন যে, আপনি দেখবেন গুলিগুলো ২,০০,০১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ধেয়ে আসছে। কারণ গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা বলে যে, গুলির বেগের সাথে স্পেস শিপের বেগ যোগ হয়ে যাবে। এখন স্পেস শিপটি যদি হঠাৎ করে তার তার হেড লাইটটি জ্বালিয়ে দেয় তাহলে কি দেখবেন? আলোর বেগ কত হবে? স্পেস শিপের বেগ + আলোর বেগ? মানে ৫,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড? গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা তো তাই বলে। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, না। তখনও আপনি দেখবেন আলোর বেগ শুধু আলোর বেগের সমানই। মানে সর্বদাই ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড। এক ফোঁটা কমও নয় আবার এক ফোঁটা বেশিও নয়। এটাই আইনস্টাইনের দ্বিতীয় স্বীকার্য। এটাই সত্য!

আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যায়। এ কারণেই মাইকেলসন-মর্লি যখন তাদের পরীক্ষাটি করেন তখন তাদের পরীক্ষায় সোজা পাঠানো আলো আর সমকোণে পাঠানো আলোর বেগের মাঝে কোন পার্থক্য ধরা পড়েছিলো না। পরবর্তিতেও অনেক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে।

অর্থাৎ, দেখা গেলো আইনস্টাইনের এই ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে গেলাম। এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। তাই চলুন এ স্বীকার্য দুটি আরেকবার সুন্দর করে আমরা লিখে ফেলি। আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি হলঃ

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করে আমরা কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধেও বুঝতে পারি। গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার দ্বিতীয় স্বীকার্য, যেখানে সময়কে পরম হিসেবে ধরা হয়েছিল তা যে ভুল তা আমরা আইনস্টাইনের উপড়ের দুটি স্বীকার্য থেকে পাই। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্য ঠিক হলেও দ্বিতীয় স্বীকার্যে পরম সময়ের বদলে পরম আলোর বেগ ব্যবহার করলেন আইনস্টাইন। এছাড়াও আমরা দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন, ভর বা, ভরের আপেক্ষিকতা এবং ভর আর শক্তি যে একই জিনিস এমন অনেক কিছু আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি থেকে পরবর্তিতে জানতে এবং বুঝতে পারি। এ বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তি কোন এক লেখায় কথা বলা যাবে। আজ এ পর্যন্তই। কষ্ট করে এতদূর পড়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ।

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- ছোট যদি হতে চাও, বড় হও আগে

আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা ইতোমধ্যেই টুক টাক জানতে শুরু করে দিয়েছি। আমরা ইতোমধ্যেই কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধে কিছুটা জানি, আর এবার জানবো দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন সম্বন্ধে।

প্রথমেই আমরা জেনে নেই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন বলতে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি অনুসারে যদি কোন বস্তু তোমার সাপেক্ষে স্থির অবস্থায় থাকে তখন তার দৈর্ঘ্য মাপলে তুমি যে মান পাবে যদি, বস্তুটি তোমার সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল হয় তবে তার দৈর্ঘ্য মাপতে গেলে দেখবে যে বস্তুটির দৈর্ঘ্য কমে গেছে। বস্তুটি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যাক বা, কাছেই আসতে থাকুক না কেন সবসময়ই দেখবে যে বস্তুটি বড় থেকে সমবেগে গতিশীল হওয়ার পরপরই ছোট হয়ে গেছে। আমরা আগেও দেখেছি ইথার ধারণাকে বাঁচানোর জন্য ফিটজগোরাল্ড প্রথম এই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। আর লরেন্টজ সেই সঙ্কোচনের পরিমাণটিকে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন।

length_cont2

আমরা কাল দীর্ঘায়নের বাস্তব উদাহরণে দেখেছি যে, বায়ুমন্ডলে মহাজাগতিক রশ্মির সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট হওয়া মিউওন মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড টিকে থাকে। সেই মিউওনগুলোর বেগ অনেক বেশি হয়ে থাকে, প্রায় আলোর বেগের কাছাকাছি। কিন্তু এত বেগ নিয়েও ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের যাওয়ার কথা মাত্র ৬৬০ মিটারের মত। কিন্তু এরপরও মিউওন কিন্তু অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসে। এর কারণ হল মিউওনের বয়স মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড হলেও আমাদের কাছে তা কাল দীর্ঘায়নের ফলে আমাদের কাছে ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড। এই বেগে মিউওন অতিক্রম করবে প্রায় ১৯ কি.মি. পথ। যা পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসার জন্য যথেষ্ট দূরত্ব।

Image result

কিন্তু কাল দীর্ঘায়নের হিসেব মতে মিউওন নিজে কিন্তু তার সময় ঠিকই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড দেখবে। এ সময়ে যদি সে ১৯ কি.মি. দূরত্ব অতিক্রম করে তবে তার বেগ আলোর বেগের প্রায় ২৯ গুন হতে হবে। কিন্তু আলোর চেয়ে বেশি বেগে তো কিছু যেতে পারে না। তাহলে এই ১৯ কি.মি. দূরত্ব মিউওন অতিক্রম করল কিভাবে? একটা অসাধারণ প্যারাডক্স বা, ধাঁধা তৈরি হয়ে গেল দেখা যাচ্ছে। তাহলে এখন চলো এই প্যারাডক্সটির সমাধান করে ফেলা যাক।

পৃথিবী থেকে আমরা দেখব মিউওনের আসতে সময় লেগেছে t=৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড(কাল দীর্ঘায়নের ফলে)। বায়ুমন্ডল থেকে পৃথিবী পৃষ্ঠের দূরত্ব কিন্তু বিজ্ঞানীরা মেপে রেখেছেন। যদি ধরে নেই মিউওন কোনভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠে এসেই রুপান্তরিত হয়ে যায় তাহলে ধরে নিতে পারি এ দূরত্ব হল  =১৯ কি.মি.।

তাহলে মিউওনের বেগ v হলে বেগ=দূরত্ব/সময় অনুসারে আমরা লেখতে পারি,

v= /t ………………………………………………(1)

আবার মিউওন দেখবে পৃথিবীটাই মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের কাছে চলে গেছে। তাহলে মিউওন তার সময় মাপবে,
মাইক্রোসেকেন্ড। এই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের মনে হবে পৃথিবীটা v বেগে (পৃথিবীর কাছে মিউওনের বেগ

যত, মিউওনের কাছেও পৃথিবীর বেগ তত! আপেক্ষিকতা!) তার কাছে চলে গেছে। এ সময় পৃথিবী অতিক্রম করেছে L দূরত্ব। তাহলে,

v=L/vbn(2)

আমরা লক্ষ্য করি যে, দুবার আমরা দৈর্ঘ্যের জন্য দুইরকম সঙ্কেত ব্যবহার করেছি। একবার  আরেকবার L. কারণ আমরা আগেই দেখেছি রিলেটিভিটির হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে সময়ই আপেক্ষিক হয়ে যায়। তাই দৈর্ঘ্যও আপেক্ষিক হতে পারে এই সন্দেহ থেকেই এই কাজটি করা। দৈর্ঘ্য যদি আপেক্ষিক না হয় তাহলে একটু পরেই আমরা হয়ত দেখব যে,  ।

তাহলে এখন, (1) এবং (২) নং সমীকরণ থেকে পাই,

                                                                                                                 ……………………………………………..….(3)

আমরা কাল দীর্ঘায়নের সূত্র থেকে জানি,

                                                                                                                   ..…………………………………….………..(4)

 

(3) এবং (4) নং সমীকরণ থেকে পাওয়া যায়,

বা,

বা,

এটিই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র।  হল স্থির অবস্থায় মাপা কোন কিছুর দৈর্ঘ্য, আর L হল সেই কোন কিছুর গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্য। কোন কিছুই আলোর বেগে চলতে পারেনা। তাই এই সমীকরণের  এর মান সর্বদাই ১ এর চেয়ে বেশি হবে (লব ছোট আর হর বড় হওয়ার কারণে)। আবার  এর মানও ১ এর চেয়ে ছোট কিন্তু ধনাত্মক একটি দশমিক সংখ্যা হবে। স্থির অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যকে এই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করলে আমরা যে গুনফল পাব সেটিই হবে গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যের সমান।  সবসময় ১ এর চেয়ে ছোট বলে এই গুনফলও সর্বদাই  এর চেয়ে কম হবে। তাই গতিশীল অবস্থায় আমাদের কাছে মনে হবে সবকিছুই তার দৈর্ঘ্যের দিক থেকে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। মিউওনের কাছেও পৃথিবীর দূরত্ব সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়াই সে ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডেই পৃথিবীতে এসে পৌঁছে গেছে বা, পৃথিবী তার কাছে পৌঁছে গেছে। সুতরাং দৈর্ঘ্য সঙ্কুচিত করে ফেললেই কিন্তু মিউওনের প্যারাডক্সটি সুন্দরভাবে সমাধান হয়ে যায়।

 এই সূত্রটিই হল দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র। এর আগেও ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টজ যে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র দিয়েছিলেন সেই সূত্র আর এটি কিন্তু হুবুহু এক। শুধু পার্থক্য হল তারা পদার্থের নিজেদের সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন আর আইনস্টাইন তার স্পেশাল রিলেটিভিটিতে স্পেস বা, স্থানের নিজেরই সঙ্কোচনের কথা বললেন।

Image result

আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন দেখতে পাইনা। এর কারণ হল, আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু এর প্রভাবটা আমাদের চোখে পরে। তখন এ সঙ্কোচনের মান অনেক বেশি হয়ে যায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যেসব বেগ দেখি তা আলোর বেগের তুলনায় এতই কম যে এর ফলে দৈর্ঘ্যের সঙ্কোচন ঘটলেও তা আমাদের সূক্ষাতিসূক্ষ যন্ত্র দিয়েও আমরা তা ধরতে পারবো না। তাই আমরা দৈনন্দিন জীবনে বিষয়টি আসলে বুঝতেও পারবো না। আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু বিষয়টি আমরা বুঝতে পারব। যদি কোন কিছু আলোর ৮৭% গতিতে চলত তাহলে আমরা দেখতাম স্থির অবস্থার চেয়ে তার দৈর্ঘ্য একদম অর্ধেক হয়ে গেছে!! আর যদি তা আলোর গতিতে চলতে পারতো তবে তা হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখতাম! কিন্তু কোন কিছু একদম শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া তো আর সম্ভব নয়। আর এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, কোন কিছুই আসলে আলোর বেগে চলতে পারে না।

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব

গ্যালিলিও ছিলেন আপেক্ষিকতার জনক। আগের লেখায় আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি সম্বন্ধে জেনেছি। তার এ তত্ত্বের আরো একটি স্বীকার্য রয়েছে। গ্যালিলিও তার দ্বিতীয় স্বীকার্যে সময়কে পরম হিসেবে ধরে নিলেন। অর্থাৎ, সকাল বেলা যদি আপনি এবং আপনার এক বন্ধু একদম ঠিক ঠিক দুজনের ঘড়ি একই সময়ে মিলিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে দুদিকে নিজেদের কাজের জন্য চলে যান, তবে রাতে ফিরে এসে আপনারা দুজন আবার একে অপরের ঘড়ির সময় মিলিয়ে নিলে দেখবেন দুজনের ঘড়ি এখনও একই সময় দেখাচ্ছে। বিষয়টা এতই অবশ্যম্ভাবী এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িত যে গ্যালিলিওর এ ২য় স্বীকার্য সম্বন্ধে মনে হয় কারো কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। তাই এ স্বীকার্যটি নিয়ে আর বেশি কিছু বলার মনে হয় প্রয়োজন নেই। আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতাটাকে এখন বুঝতে চেষ্টা করি।

Image result for galileo
আপেক্ষিকতার জনক গ্যালিলিও গ্যালিলি

ধরুন, আপনি একটি ট্রেনে করে ভ্রমণ করছেন। জানালার পাশে আপনার বসার জায়গা। আপনার ট্রেনটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রতি সেকেন্ডে ২০ কি.মি. বেগে ছুটে চলেছে। তাহলে আপনার বেগ হবে ২০ কি.মি. প্রতি সেকেন্ড বা, ২০ কি.মি./সেকেন্ড। এখন বাইরে একজন লোক ঠিক পূর্ব থেকে পশ্চিমে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার বরাবর পাশ দিয়ে যাচ্ছে। লোকটির কাছে কিন্তু মনে হবে আপনার ট্রেনের বেগ আসলে,

আপনার ট্রেনের বেগ-লোকটির গাড়ির বেগ= (২০ কি.মি./সেকেন্ড-১০ কি.মি./সেকেন্ড)= ১০ কি.মি./সেকেন্ড।

আবার আপনার কাছে মনে হবে লোকটির গাড়ির বেগ= লোকটির গাড়ির বেগ-আপনার ট্রেনের বেগ= (১০ কি.মি./সেকেন্ড-২০কি.মি./সেকেন্ড)= – ১০ কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, মাইনাস বা, ঋণাত্মক দিকে ১০কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, আপনি দেখবেন লোকটি ১০কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। স্টেশনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন কিন্তু ঠিকই আপনার ট্রেনকে ২০ কি.মি./সেকেন্ড এবং লোকটির গাড়িকে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছুঁটে যেতে দেখবে।

এই বিষয়টিই আপেক্ষিকতা এক একজন দর্শকের সাপেক্ষে একই ট্রেন বা, গাড়ির বেগ একেক রকম মনে হওয়া। এখন লোকটি যদি গাড়িটি ট্রেনের সমান বেগে অর্থাৎ। ২০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে যেত তাহলে কি হত? আপনি লোকটিকে সব সময় আপনার পাশে দেখতেন। আপনার কাছে মনে হত লোকটি যেনো স্থির। অর্থাৎ, লোকটির বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আবার লোকটিও দেখত আপনার ট্রেনটি তার গাড়িকে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে না। আপনিও সবসময় তার পাশেই ট্রনে স্থির হয়র বসে আছেন। গাড়ির লোকটির কাছে মনে হত আপনি আসলে স্থির। আপনার বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আমি আশা করছি এই লেখাটির পাঠকরা অবশ্যই আপেক্ষিকতার এই মূল বিষয়গুলো সম্বন্ধে আগে থেকেই কিছুটা জ্ঞান রাখেন বা, লেখাটি পড়ার পর বিষয়টা মোটামুটিভাবে বুঝে গেছেন। তাই এ বিষয়টি নিয়ে আর বেশি কথা না বাড়িয়ে আমরা স্পেশাল রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার দিকে অগ্রসর হতে থাকি।

বিজ্ঞানীরা এক সময় আলোর বেগ অসীম নাকি এর কোন নির্দিষ্ট বেগ আছে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। একেক মুনীর একেক মত ছিল তখন। তবে বিজ্ঞানী রোমার প্রথম প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে আলোর বেগ আসলে সসীম, কোনভাবেই অসীম নয়। তিনি আলোর বেগ মেপেছিলেন ১ লক্ষ ৯০ হাজার কি.মি./সেকেন্ড। পরবর্তিতে ম্যাক্সওয়েল দেখিয়েছিলেন যে আলো আসলে এক ধরনের তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। শব্দও কিন্তু এক রকমের তরঙ্গ। বিজ্ঞানীরা তাদের আশে পাশের পর্যবেক্ষণ থেকে জানতেন কোন তরঙ্গই মাধ্যম ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে না। আলোর ক্ষেত্রেও কি কথাটি সত্য? আলো কিভাবে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসে? সূর্য থেকে পৃথিবীর মাঝে কি কোন মাধ্যম রয়েছে? এ বিষয়ে একটা মজার পরীক্ষার কথা বলি।

File:Ole Rømer (Coning painting).jpg
ওলে রোমার, যিনি আবিষ্কার করেছিলেন আলোর বেগ অসীম নয়।

আলোর চলাচলের জন্য কোন মাধ্যমের প্রয়োজন আছে কিনা তা বোঝার জন্য পরীক্ষাটি করেছিলেন বিজ্ঞানী ভন গুইরিকে। তিনি একটি কাঁচের জার নিলেন। এ কাঁচের জারের মাঝে একটি ঘন্টা ছিল যা অনবরত শব্দ করছিল। এবার জারটি থেকে সব বাতাস একদম বের করে নেয়া হল। জারের মধ্যে শুধু থাকল ফাঁকা স্থান। ফলে যারা এ পরীক্ষাটি দেখতে এসেছিল সেই দর্শকরা আর কোন ঘন্টা বাজার শব্দ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু তারা দেখতে পাচ্ছিলেন যে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি তখনও ঘন্টার সাথে ধাক্কা খেয়েই চলেছে।

Image result for ringing bell vacuum
জারের মাঝে রিঙ্গিং বেল

প্রমাণ হয়ে গেল যে শূন্য মাধ্যমে শব্দ চলাচল করতে না পারলেও আলো চলাচল করতে পারে। তা না হলে আমরা ঘন্টাটিতে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি ধাক্কা খেতে দেখতাম না বরং ঘন্টাটিও শব্দের সাথে অদৃশ্য হয়ে যেত এবং জারটি সম্পূর্ণ কালো হয়ে যেত। সুতরাং শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়ে কোন তরঙ্গ চলাচল করতে পারে তা তখনকার বিজ্ঞানীরা মানতে পারছিলেন না। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যে, শূন্য মাধ্যম কি আসলেই শূন্য? এ প্রশ্নের উত্তর পরবর্তি কোন লেখায় খোঁজার চেষ্টা করা হবে। ধন্যবাদ।