অট্টহাসি রোগ ও অনিষ্টের রূপ

কখনো কখনো আমরা সবকিছু ভিন্ন চোখে দেখতে বাধ্য হই। তবে এটা মোটেও সহজ নয়। মানুষ অভ্যাসের দাস। তাই আমরা প্রথম দর্শনে যা ভাবতে অভ্যস্ত হই তার শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে যাই। প্রিয়নদের ব্যপারে ঠিক এরকমই ঘটেছে। প্রিয়ন এক ধরনের প্রোটিন। এদের আকার নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে বদলে যায়। ফলাফলে এরা মারাত্মক রোগের মূল কারণ হয়ে পড়ে। কোনো প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন বদলে গেলে তা অনেক ব্যাধির কারণ হতে পারে। তাই প্রিয়ন-প্রোটিনের আকার বদলে গিয়ে রোগের কারণ হয়ে যাওয়াটা অণুপ্রাণবিজ্ঞানে নতুন কোনো ধারণা নয়। যে ধারণা নতুন তা হলো প্রোটিন নিজেই রোগ সংক্রমণের মূল কারণ হতে পারে।

সংক্রমক বলতে একটি অস্তিত্বকে বোঝানো হয় যা কোনো জীব থেকে অন্য জীবে (বা এক কোষ থেকে অন্য কোষে) ছড়ানোর মাধ্যমে রোগ বিস্তারে ভূমিকা রাখে। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া কোনো জীবে সংক্রমিত হওয়ার সময় নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধি করে। এসময় বিভিন্ন কোষ মেরে ফেলে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। যেমন উদাহরণ টানা যায় মেনিনজাইটিস, ফ্লু কিংবা এইডস রোগের ক্ষেত্রে। তেমনি কিছু কিছু প্রিয়ন প্রোটিন আছে যাদের আকার বদলে গেলে সংক্রমণশীল হয়ে পড়ে। ফলে ভেড়ার স্ক্র্যাপি বা মানুষের ক্রুয়েটজফেল্ড-জ্যাকব রোগের মতো স্নায়ু্ক্ষয়জনিত অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এরা। সম্প্রতি এমন একটি প্রিয়ন আবিষ্কৃত হয়েছে যার স্বভাব ভিন্ন প্রকৃতির। এটি নিজের রূপ বদলাতে চায় না। এর নাম PrP V127

প্রচলিত মতের বিপরীতে প্রিয়ন (PrP) মাত্রই যে ক্ষতিকর এমনটা নয়। বিভিন্ন জীবে এরা প্রাকৃতিকভাবেই

বিরাজ করে (PrPc)– বিশেষত মগজে। কোষ দৃঢ়সংলগ্ন হয়ে লেগে থাকাতে আর কোষের ভেতরে সংকেত পরিবহনে এরা ভূমিকা পালন করে বলে ভাবা হয়। তবে ত্রিমাত্রিক গঠন ভুলভাবে ভাঁজ হয়ে গেলে (PrPSc) এরা অনিষ্টকারী হয়ে পড়ে। রূপের পরিবর্তনের কারণে কেন এরা নির্দোষ থেকে অনিষ্টকারীতে পরিণত হয় তা এখনো বোঝা যায়নি। হয়তো কোনো তাপগতীয় বাঁধ রয়েছে যার ফলে নির্দোষ ভাজ বদলে রূপটি অনিষ্টকারী রূপে পরিবর্তিত হয়ে যায়। তখন নির্দোষ রূপে (PrPc) ফেরত যাবার জন্য দরকারী তাপ এতো বেশি যে অনিষ্টকারী রূপটি (PrPSc) এর নতুন আকৃতিতে আটকা পড়ে যায়। এ দুই আকৃতি এতটাই ভিন্ন যে তা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। PrPc একদিকে আলফা হেলিক্সের প্যাঁচ দিয়ে পূর্ণ, অন্যদিকে PrPSc বিটা শিটের আস্তরনে স্ফীত।

এই গাঠনিক পার্থক্যটি লক্ষণীয় কারণ এদের অ্যামিনো এসিড অনুক্রমে (বা প্রোটিন সিকোয়েন্স) কোনো পরিবর্তন হয় না। ভুলভাবে ভাঁজ হওয়া প্রিয়ন তারপর জমা হতে থাকে। প্রথমে একটি PrPSc বীজ হিসেবে কাজ করে যা এই প্রিয়নের অনিষ্টকারী রূপটিকে স্থিতিশীল করে। এ প্রক্রিয়া খুব দ্রুতগতিতে চলতে থাকে। একসময় ছোট ছোট অলিগোমার ফাইব্রিলের তন্তুতে রূপ নেয়, যারা পরে একে অপরে জড়ো হয়ে বৃহত্তর জমায়েতে পরিণত হয়। এ বৃহত্তর জমায়েত মস্তিষ্কে থোক তৈরি করে করে স্নায়ু ক্ষয়কে এগিয়ে নিতে থাকে।

প্রিয়ন প্রোটিন আবিষ্কারের বহু আগেই এর কারণে সৃষ্ট অসুখ সম্পর্কে জানা যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে স্প্যানিশ মেষপালকরা তাদের মেরিনো জাতের ভেড়ায় অদ্ভূত আচরণ খেয়াল করেন।

চিত্রঃ PrPC প্রিয়নে চারটি প্যাঁচালো আলফা হেলিক্স দেখা যাচ্ছে (a)। এটি যখন PrPSc-তে রূপান্তরিত হয় তখন চারটি বিটা শিটের আস্তরণ তৈরি হয় (b)। দুইটির গঠনে ভিন্নতা লক্ষ্যণীয়।

ভেড়াগুলোর হাঁটার চাল বদলে যায়, চাটাচাটি বেড়ে যায় আর তীব্র চুলকানি দৃষ্টিগোচর হয়। এরা ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করে বেড়ার গায়ে নিজেদের দেহ ঘষাতে। স্পানিশ রাখালরা এ রোগের নাম দিয়েছিল ‘স্ক্র্যাপি’। এর প্রায় দুইশ’ বছর পর জার্মান স্নায়ুবিদ এইচ.জি. ক্রুটজফেল্ড ও এ.এম. জ্যাকব এক ধরনের স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগ চিহ্নিত করেন যার লক্ষণ ছিল স্ক্রাপির অনুরূপ। এ রোগের নাম দেয়া হয় ক্রুটজফেল্ড-জ্যাকব রোগ (সিজেডি)। এই রোগটি ধীরগতির হলেও সময়ের সাথে সাথে অবস্থার অবনতি হতে থাকতো। এ ধরনের ধীরগতির অবনতির পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? কোনো কোনো বিজ্ঞানী ভাবলেন হয়তো কোনো ‘ঢিলা ভাইরাস’ এর পেছনে দায়ী।

১৯৬৭ সালে ব্রিটিশ জৈবপদার্থবিদ জে.এস. গ্রিফিথ প্রস্তাব করলেন যে স্ক্র্যাপির পেছনে সম্ভবত প্রোটিন নির্মিত কোনোকিছু দায়ী। তবে সংক্রামক প্রতিনিধি হিসেবে প্রোটিন দায়ী এ মতামতটি সংশয়ের মুখে পড়ে। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মতটি উপেক্ষা করা হচ্ছিল। প্রোটিনরা যে সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে, বিশ বছর পর এই ধারণাটিকে পুনরিজ্জীবিত করেন আমেরিকান স্নায়ুবিদ এস.বি. প্রুশিনার ও সুইস অণুপ্রাণবিজ্ঞানী চার্লস উইসম্যান।

শেষ পর্যন্ত গত শতাব্দীর শেষ দিকে আর একবিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে বিশেষতঃ ম্যাড কাউ রোগের প্রাদুর্ভাবের সাথে সাথে প্রোটিন নির্মিত সংক্রামক কণার ধারণাটি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। অবশ্য কয়েকজন বিজ্ঞানী এখনো এ বিষয়টিতে সন্দেহমুক্ত নন। তবে সম্প্রতি প্রিয়নের সূক্ষ্মতর প্রকারভেদ করা গেছে। মানুষে প্রিয়ন-ভিত্তিক ব্যাধির সংক্রমণ অত্যন্ত দূর্লভ। শুধুমাত্র টিস্যুকলা প্রতিস্থাপন, শল্যচিকিৎসার

অস্ত্র বা দূষিত মাংস-পণ্য থেকে প্রিয়নের সংক্রমণ হয়। যেমন এখন মানুষে প্রিয়নের ব্যাধিকে সংক্রমণশীল হিসেবে ধরা হয় না। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে এ ব্যাধিকে ধরা হয় এমন শারিরীক বিপর্যয় হিসেবে যেখানে মস্তিষ্কের ভেতরে দলা তৈরি ও জমা হতে থাকে। এ প্রক্রিয়াটি অন্যান্য স্নায়ুক্ষয়ী রোগের অনুরূপ।

তবে অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানী মাইকেল আলপের্স ১৯৬০-র দশকে কুরু নামক স্নায়ুক্ষয়ী প্রিয়ন রোগের কথা উল্লেখ করেছিলেন। পাপুয়া নিউগিনির ফোর নৃজাতিগোষ্ঠীর উপর মাঠ পর্যায়ের গবেষণা থেকে তিনি এ রোগের কথা জানতে পারেন। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ করে অট্টাহাসি হাসা শুরু করতো। তাই ঐ জাতির মধ্যে এ রোগটি ‘অট্টহাসি রোগ’ নামে পরিচিত ছিল। কুরু শব্দটির আক্ষরিক অর্থই হলো ‘ঝাঁকানো’। পরবর্তীতে দেখা গেল আত্মীয়ের মৃত্যুর পর তার মাংস খাওয়া থেকে এ রোগটি ছড়ায়। ফোর নৃজাতিগোষ্ঠী সমাধিসংক্রান্ত অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে মৃতের মাংশ ও মগজ কাঁচা খাওয়া হতো।

এই মহামারীর শুরু হয়েছিল সম্ভবত ১৯০০-শতকের শুরুর দিকে যখন ঐ জনগোষ্ঠীর কোনো সদস্য CJD রোগের একটি ধরণে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে অবশ্য এখন এ রোগটি নেই। এ রোগে ২০০৫ সালে সর্বশেষ মৃত্যু হয়। বিস্ময়ের ব্যপার হলো পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে কিছু কিছু ব্যক্তি কুরু রোগে একেবারেই অপ্রভাবিত ছিল। তারা একধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছিল। দেখা গেল PrP V127 নামক PrP-র একটি ভিন্ন প্রকরণের কারণে এমনটা হচ্ছে। PrP V127 তে ১২৭ নম্বর অ্যমিনো এসিডে গ্লাইসিনের স্থলে ভ্যালিন স্থানান্তরিত হয়েছিল। ইঁদুরে জেনেটিক পরিবর্তন করে দেখা গেছে তাদের PrP V127 প্রিয়ন তৈরি হলে তা কুরু ও ধ্রুপদী CJD প্রিয়ন প্রতিরোধ করে। কিন্তু কীভাবে? PrP V127 রূপ বদলিয়ে PrP-র অনিষ্টকারী চেহারায় বদলায় না। ফলে এই প্রকরণ বহন করা ব্যক্তি স্নায়ুক্ষয় রোগে আক্রান্ত হয় না।

আরেকটি PrP প্রকরণের কথা জানা যায় যা বিক্ষিপ্ত CJD রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে মানুষকে রক্ষা করে। তবে এর কর্মকৌশল PrP V127 এর মতো নয়। বরং এটি প্রিয়ন উৎপাদন চলমান থাকা অবস্থায় প্রোটিন-প্রোটিন মিথষ্ক্রিয়া আটকে রাখে। কীভাবে PrP V127 প্রিয়নের রূপ-বদলানো প্রতিরোধ করে তা বুঝতে পারলে বিজ্ঞানীরা প্রিয়নের রোগতত্ব ও উৎপাদনের প্রাণ-রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি উপলদ্ধি করতে পারবেন। এছাড়াও ঔষুধ তৈরিতেও এটি অন্তর্দৃষ্টি দেবে। স্বজাতিভক্ষণ নিষিদ্ধ করে দেয়ার ফলে ফোর জনগোষ্ঠি চলমান কুরু মহামারী থেকে বেঁচে যায়। তবে PrP V127 প্রকরণের উপস্থিতি এটাই নির্দেশ করে যে সময়ের সাথে সাথে কুরু-প্রতিরোধি ব্যক্তির সংখ্যা বাড়তে থাকতো। এটা মহামারীর পাল্টা জবাব হিসেবে প্রাকৃতিক বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার মধ্যমেই হতো। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকৃতির নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে।

তথ্যসূত্র

  • এক্সপ্যাসি প্রোটিন স্পটলাইটের ১৭৯ ইস্যু The shape of harm-র অনুবাদ। লেখকঃ ভিভিয়েন বেইলি গ্যারিস্টেন।
  • org/spotlight/back_issues/179/

শরীর বাঁকানো রোগ ধনুষ্টঙ্কারের গল্প

ছোটবেলায় দুষ্টুমি করতে গিয়ে কতো লোহা-পেরেকের গুঁতো খেয়েছি। মায়ের কাছ থেকে শুনতে হতো- ‘লোহার গুঁতো খেলে কিন্তু টিটেনাস ইনজেকশন দিতে হবে’। এর অভিজ্ঞতাও আছে, লোহার গুঁতো খেয়ে আমাকে ইনজেকশনের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। তখন মনে করতাম, ধনুষ্টঙ্কার হলে ঘাড় মটকিয়ে যায়। তাই ছোটবেলায় পেরেককে ভয় পেতাম খুব। আজ এতদিন পর আমি সেই ধনুষ্টঙ্কারের জন্য দায়ী অণুজীব নিয়েই আলোচনা করতে বসেছি।

ধনুষ্টঙ্কার সৃষ্টির জন্য দায়ী মূল অণুজীব হলো Clostridium tetani. কিতাসাতো নামের একজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম মানবদেহ থেকে ক্লস্ট্রিডিয়াম টিটানি আলাদা করেন। এরা কীভাবে রোগ সৃষ্টি করে তা জানার আগে এদের সাথে একটু পরিচিত হওয়া দরকার। এদের প্রথম পরিচয় এরা গ্রাম পজিটিভ ব্যাকটেরিয়া। দেখতে রডের মতো এবং অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এরা বাঁচতে পারে না। এজন্য এদেরকে অবাত শ্বসনকারী বলা হয়। এমনিতে অধিক তাপ সহ্য করতে পারে না, কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে স্পোর সৃষ্টি করে।

মাটিতে, মানুষ ও পশুর মলে এদের বিচরণ। তবে এরা এমনিতেই মানবদেহে সংক্রমিত হয় না। শরীরে কোনো ক্ষত সৃষ্টি হলে সেই ক্ষতে যদি এরা প্রবেশ করে তবে ধনুষ্টঙ্কার হয়। এরা ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ও লসিকার মাধ্যমে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষত হওয়ার পর উপসর্গ দেখা দিতে সাধারণত কয়েক মাস সময় লাগতে পারে তবে গড়ে ৮ দিনের মতো সময় লাগে। নবজাতকের ক্ষেত্রে সময় লাগে গড়ে ৭ দিনের মতো।

একটি অণুজীব শরীরে প্রবেশ করলেই রোগ সৃষ্টি করবে, এমন কিন্তু না। প্রত্যেক অণুজীবের নিজস্ব উপাদান থাকে যার মাধ্যমে সে রোগ সৃষ্টি করে। ইংরেজিতে যাকে বলে virulence factor. C.tetani’র ক্ষেত্রে সেই উপাদানটি হলো একটি টক্সিন, টিটানোস্পাসমিন (Tetanospasmin).

আমাদের শরীরের পেশী সংকোচন করে এসিটাইলকোলিন। ইনহিবিটোরি নিউরো-ট্রান্সমিটার এসিটাইলকোলিনকে শরীরে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়। ফলে পেশী স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে। কিন্তু টিটানোস্পাসমিন ইনহিবিটোরি নিউরোট্রান্সমিটারকে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়। ফলে শরীরে অস্বাভাবিক পেশী সংকোচন দেখা দেয়।

image source: medicalnewstoday.com

প্রথম দিকের এ রোগের উপসর্গ, মুখের চোয়াল লেগে যাওয়া। যাকে ‘লক জ’ (Lock jaw) বলে। অন্যান্য উপসর্গগুলো হলো খিঁচুনি, খাবার গিলতে সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ঘাম, জ্বর ইত্যাদি। পেশীর অত্যধিক সংকোচনের ফলে স্পাইনাল কর্ড কিংবা শরীরের হাড় ভেঙ্গে যেতে পারে। শ্বাস প্রক্রিয়াও ব্যহত হতে পারে। এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

ধনুষ্টঙ্কার চার ধরনের হতে পারে। একটি হলো সাধারণ ধনুষ্টঙ্কার। আমরা ধনুষ্টঙ্কার বলতে মূলত একেই বুঝি। এটা আক্রান্ত স্থান থেকে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রথম উপসর্গ হলো ‘লক জ’ বা চোয়াল লেগে জাওয়া। ধীরে ধীরে বাকি উপসর্গগুলো দেখা দেয়। সাধারণ ধনুষ্টঙ্কার থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে কয়েক মাস সময় লাগে।

দ্বিতীয় প্রকার ধনুষ্টঙ্কার হলো লোকালাইজড (Localized) ধনুষ্টঙ্কার। এর মানে হলো আক্রান্ত স্থানেই এই ধনুষ্টঙ্কার সীমাবদ্ধ থাকে। এই ধনুষ্টঙ্কার খুবই কম হয়। এই রোগ থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে।

তিন নম্বর ধনুষ্টঙ্কারটি হলো সেফালিক (Cephalic) ধনুষ্টঙ্কার। এটাও এক ধরনের লোকালাইজড ধনুষ্টঙ্কার। এটা আমাদের ক্রেনিয়াল নার্ভকে আক্রান্ত করে। ফলে মুখের পেশী আক্রান্ত হয়।

চিত্রঃ স্টেইনিংয়ের পর C.tetani কে টেনিস রেকেটের মতো দেখায়

সর্বশেষ ধনুষ্টঙ্কারটি হলো নবজাতকের ধনুষ্টঙ্কার। জন্মের পর নাড়ি কাটার সময় যদি জীবাণুযুক্ত কাচি ব্যবহার করা হয় তখন এ রোগের সংক্রমণ হয়। কিছু কিছু সংস্কৃতিতে নাড়ি কাটার পর তাতে গরুর গোবর দেয়া হয়। কি সাঙ্ঘাতিক! এ যেন দাওয়াত দিয়ে ধনুষ্টঙ্কার ডেকে নিয়ে আসা! যদিও এই রোগ ধীরে ধীরে কমছে তবুও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনও এই রোগের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ধনুষ্টঙ্কার নির্ণয় করা যায় না। ধনুষ্টঙ্কার নির্ণয় মূলত রোগের উপসর্গ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে করা হয়। কারণ C.tetani চিহ্নিত করার সমস্যা। আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ৩০% C.tetani শনাক্ত করা যায়। এমনকি সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রেও C.tetani চিহ্নিত হতে পারে। ধনুষ্টঙ্কার নির্ণয়ের আরেকটি উপায় হলো স্পাটুলা টেস্ট।

ধনুষ্টঙ্কার প্রতিরোধের জন্যে Tetanus toxoid টীকা নেয়া হয়। CDC এর মতে প্রতি দশ বছর পর পর ধনুষ্টঙ্কারের টীকা নেয়া উচিৎ। ধনুষ্টংকার চিকিৎসার জন্যে metronidazole, diazepam ব্যবহার করা হয়। শুরুতে পেরেক আর ধনুষ্টংকার নিয়ে যে কথা বলেছিলাম সেক্ষেত্রে বলে রাখি পেরেক বা লোহা বিঁধলেই যে ধনুষ্টংকার হবে এমন কোন কথা নেই। ধনুষ্টংকার হতে হলে সেই পেরেকে C.tetani থাকতে হবে।

featured image: oshatrainingu.com

রোগ সংক্রমণবিদ্যার মাঝে লুকিয়ে থাকা গণিত

. রোগতত্ত্ববিদ্যার মশকীয় উদ্ভব

রোনাল্ড রস তখন মাত্র ব্রিটিশ আর্মির সার্জন হিসেবে ভারতের ব্যাঙ্গালোরে কাজ শুরু করেছেন। সব মিলিয়ে খুশিই ছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের রয়েল কলেজ অব সার্জন থেকে বের হয়েছেন মাত্র বছর-দুই হলো। তরুণ বয়সে ইচ্ছে ছিল লেখক হবেন; কিন্তু তার বাবা তাকে লন্ডনের একটি মেডিকেল কলেজে পড়াশুনার ব্যবস্থা করে দেন। রস যে মেডিকেল কলেজে কঠোর পরিশ্রমে পড়াশুনা করতেন এমন না। তার অনেকটা সময় চলে যেত কবিতা লিখে,নাটক আর সঙ্গীত রচনা করে।

সময়টা ১৮৮৩ সাল,পেশাগত জীবন মাত্র শুরু তখন। ভারতের ব্যাঙালোর বেশ পছন্দই হলো তার। ব্যাঙ্গালোরের রৌদ্রজ্বল দিন, বাগান আর ভিলা তার মতে দক্ষিণ ভারতের অন্যতম সুন্দর জায়গা। কিন্তু রোনাল্ড রস যখন মশার উপদ্রপে অতিষ্ট হয়ে তার বাংলোর বাইরে পানির ট্যাঙ্কি উপর করে দেন,তখন কি তিনি জানতেন মশাদের বিরুদ্ধে এটা তার জীবন-যুদ্ধ হতে যাচ্ছে?

ব্যাঙ্গালোরে পৌঁছে রস দেখলেন তার ঘর মশাদের গুঞ্জনের শব্দে ভরে আছে। তখন ঠিক করলেন মশাদের সংখ্যা কমাতে হবে, এদের আর প্রজনন করতে দেয়া যাবে না। তাই বাংলোর আশেপাশে যেখানে যেখানে বদ্ধ পানি জমে থাকতে দেখলেন সেখানকার পানি সরিয়ে দিলেন। এ পদ্ধতি কাজ করলো, কমে গেল মশকীর সংখ্যা।

স্যার রোনাল্ড রস।

ঐ অঞ্চলে দিনযাপনের সাথে সাথে রোনাল্ড রস ক্রমেই একটা ধারণা বদ্ধমত হতে থাকেন যে সেখানকার মশারা সম্ভবত ম্যালেরিয়া রোগ ছড়াচ্ছে। ম্যালেরিয়া একটা প্রাণঘাতী রোগ। প্রচন্ড জ্বরের সাথে সাথে ফ্লু-এর বিভিন্ন লক্ষণ সাথে নিয়ে হাজির হয় এই রোগটি। বর্তমান মানব প্রজাতী, Homo sapiens এর উদ্ভবের প্রায় শুরু থেকেই এই রোগটি ছিল। পূর্বে ধারণা ছিল কোনো খারাপ বাতাসের সংস্পর্শে আসলে মানুষের এই রোগটি হয়। ম্যালেরিয়া শব্দটা এসেছে ইতালিয় ভাষার ‘ম্যালএরিয়া’ থেকে যার অর্থ খারাপ বাতাস।

মশা ও ম্যালেরিয়া রোগের মধ্যকার সম্পর্ক প্রমাণের জন্য রোনাল্ড রস পাখি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা শুরু করেন। তিনি ম্যালেরিয়া আক্রান্ত পাখিকে মশা কামড়ানোর ব্যবস্থা করেন। তারপর ওই মশাদের সুস্থ পাখির রক্ত চোষার ব্যবস্থা করেন। দেখা গেল কিছু দিনের মধ্যেই সুস্থ পাখিগুলোও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গেছে।

তার এই মশকী-তত্ত্ব যাচাই করে দেখার জন্য রস এই মশকীগুলোর ব্যবচ্ছেদ করেন। এই মশকীগুলোর লালাগ্রন্থিতে ম্যালেরিয়ার জীবাণু খুঁজে পান তিনি। পরবর্তীতে একজন ফরাসি মিলিটারী ডাক্তার এই জীবাণুকে প্লাজমোডিয়াম (Plasmodium) হিসেবে সনাক্ত করেন। সেই ফরাসী ডাক্তার মাত্র কয়েক বছর আগেই ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর রক্তকোষে এই জীবাণু আবিষ্কার করেছিলেন।

ম্যালেরিয়া রোগ বিস্তার কীভাবে থামানো যায় তা রোনাল্ড রসের গবেষণার পরবর্তী আগ্রহ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাঙ্গালোর জীবনে প্রবেশ করার সময় বদ্ধ ট্যাঙ্কি থেকে পানি ফেলে দেয়ার পদ্ধতিটা এ সময় আবারো উপযুক্ত মনে হয় তার কাছে। তিনি প্রস্তাব করেন,মশকীর সংখ্যা যথেষ্ট পরিমাণে কমাতে পারলে ম্যালেরিয়ার বিস্তার এমনিতেই কমে আসবে। ছাত্রজীবনে গণিত প্রেমী রোনাল্ড রস তার এই তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এবার তার গণিতজ্ঞান কাজে লাগালেন। তিনি একটি গাণিতিক

মডেল তৈরি করলেন, যাকে বলা যায় মশকী তত্ত্ব। এই মশকী তত্ত্ব গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করলো কীভাবে একটি নির্দিষ্ট মানব জনপুঞ্জে (human population) মশকী ম্যালেরিয়া ছড়াতে পারে। তিনি সেই মডেলে মানব জনপুঞ্জকে দু’ভাগে বিভক্ত করেন– একদলে রইলো সুস্থ,অন্যদলে আক্রান্ত। তারপর তিনি বেশ কিছু গাণিতিক সমীকরণ লিখে ফেললেন যারা ব্যাখ্যা করে যে মশার সংখ্যা কীভাবে এই রোগের বিস্তারকে প্রভাবিত করতে পারে।

ম্যালেরিয়ার জীবাণু প্লাজমোডিয়াম হলো পরজীবী। প্লাজমোডিয়ামের জীবনচক্র সম্পূর্ণ করার জন্য ওর মানুষ ও মশা দুই বাহকেরই প্রয়োজন হয়। দেখা যায় কারো ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হবার হারের সঙ্গে তিনি কতবার প্লাজমোডিয়াম-বাহক মশার কামড় খেয়েছেন তার একটা সম্পর্ক আছে। প্লাজমোডিয়াম-বাহক মশার সাথে আবার সম্পর্ক রয়েছে কতজন ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর রক্তে প্লাজমোডিয়াম কীট রয়েছে। অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর রক্তে প্লাজমোডিয়াম কীট থাকা অবস্থায় রোগীর রক্ত চুষে ফেললে একটি সাধারণ মশা প্লাজমোডিয়ামে আক্রান্ত হয়ে যাবে। এই সম্পর্কগুলোকেই রোনাল্ড রস গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করেন।

তিনি দেখলেন ভারতের মতো জায়গায় ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ স্থায়ীভাবে ঘটতে হলে সেখানে প্রতি মাসে কত জন নতুন করে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হবে তা অবশ্যই ঐ মাসে কতজন রোগী ম্যালেরিয়া থেকে সুস্থ হয়ে উঠছে তার সমান হতে হবে।

এক প্রকার প্লাজমোডিয়াম

এই গাণিতিক মডেলটি ব্যবহার করে রস দেখালেন ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য সব মশা মেরে ফেলার কোনো দরকার নেই। যথেষ্ট পরিমাণ মশা মেরে ফেলো,তাহলে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগী যথেষ্ট পরিমাণ মশা কামড়ানোর আগেই সে সেরে উঠবে। ফলে রোগসংক্রামণের হারও আর আগের মতো থাকবে না। ফলশ্রুতিতে ম্যালেরিয়া রোগের বিস্তার কমে আসা শুরু করবে।

অন্যভাবে বলা যায় সংক্রামণের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে। এ পরিমাণের চেয়ে বেশি সংক্রামণ হলে তা মহামারীতে পরিণত হবে আর কম হলে রোগটি আপনা আপনিই কমে যাবে।

রসের এই কাজ ১৯০২ সালে তাকে চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল এনে দেয়। বিভিন্ন রোগের বিস্তার ও মহামারীকে যে গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব সেই সম্ভাবনার ভিত্তিরোপন করে রসের এই কাজটি। রোনাল্ড রসের এই অন্তর্দৃষ্টি ভ্যাক্সিন প্রয়োগের নীতিকেও প্রভাবিত করে দলীয়-অনাক্রম্যতা বা দলীয়-রোগ-প্রতিরোধ-ব্যবস্থার (Herd Immunity) ধারণার মাধ্যমে।

দলীয়-অনাক্রম্যতার মূল ধারণা হলো একটি জনপুঞ্জে যথেষ্ট সংখ্যক মানুষকে কোন রোগের টীকা দিয়ে দাও;তাতে ওই রোগ বিস্তার কমে যাবে আপনা আপনিই। তার মানে টীকা দেয়া কর্মসূচী থেকে কিছু মানুষ বাদ গেলেও সে কর্মসূচী সফলভাবে কাজ করতে পারে। যদিও টীকা দেয়ার থেকে রোনাল্ড রসের কর্মসূচী ভিন্ন ছিল। রস টীকা দেননি;তিনি মশার পরিমাণ কমানোর ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু তবুও উভয়ক্ষেত্রে মূলনীতিটা একই।

কোনো জনপুঞ্জে সকলকে টীকা দেয়ার দরকার নেই বা সকল মশা সরানোর দরকার নেই। প্রয়োজন একটি নির্দিষ্ট সংকট সীমায় (critical threshold) পৌঁছানো। যদি সে সীমায় পৌঁছানো যায় তাহলে ওই রোগটির নিজেকে ছড়ানোর জন্য ভীষণ মুশকিলে পড়তে হবে।

. অঙ্ক যখন মহামারীর গল্প বলে

রোনাল্ড রসের আগেও বিজ্ঞানীরা রোগব্যাধি বিষয়ক গবেষণায় গণিতকে প্রয়োগ করেছিলেন। তবে তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল অতীতের ঘটনা। যেমন জন স্নো নামের একজন চিকিৎসক ১৮৫৪ সালে লন্ডনে কলেরা রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণ খোঁজার জন্যে যুক্তিবিদ্যার সহায়তা নিয়েছিলেন। তখন বেশিরভাগ মানুষই ম্যালেরিয়ার মতো কলেরাও “খারাপ বাতাস”-এর প্রভাবে হয়ে থাকে বলে মনে করতেন।

কলেরা কোনো কোনো স্থানে ঘটেছিল জন স্নো সেটা ম্যাপে চিহ্নিত করা শুরু করেন। তখন তিনি খেয়াল করলেন লন্ডনের সোহো পাড়ার পানির পাম্প থেকে কলেরা আক্রান্ত বাড়িগুলোতে পানির সরবরাহ করা হয়। তিনি যুক্তি দিলেন যে রোগীরা কলেরা আক্রান্ত হচ্ছে দূষিত পানি থেকে আর বোর্ড স্ট্রিটের ওই পানির উৎস সরিয়ে ফললে কলেরার বিস্তার থেমে পড়বে।

অতীতের ঘটনায় না তাকিয়ে রোনাল্ড রস দেখলেন ভবিষ্যতের দিকে। মহামারী কিংবা রোগবিস্তারের গতিপথ ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্যে তার উৎসাহ-উদ্দীপনার মাধ্যমে প্রভাবিত হলেন রোনাল্ড রসের সহকর্মীদের। এন্ডারসন ম্যাককেন্ড্রিক নামের একজন তরুণ স্কটিশ গণিতবিদ রসের সাথে দেখা করেছিলেন সিয়েরা লিয়নের একটি ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ কার্যক্রমে।

ম্যাককেন্ড্রিক তখন ভারতীয় মেডিক্যাল সার্ভিসের একজন সদস্য হিসেবে কাজ করছিলেন। তবে ১৯২০ সারে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি ভারত ছেড়ে চলে যান স্কটলান্ডে। রাজধানী এডিনবার্গে তিনি রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান-এর গবেষণাগারে যোগ দেন সুপারইন্ডেন্ট হিসেবে। সেখানে ম্যাককেন্ড্রিকের কথা হয় সংক্রামক রোগ বিষয়ে আগ্রহী একজন রসায়নবিদ উইলিয়াম কারম্যাকের সঙ্গে।

প্লেগের মতো রোগের সাথে ম্যালেরিয়ার মতো রোগের পার্থক্য হলো ম্যালেরিয়ার মতো মহামারী একটি জনপুঞ্জে সবসময়ে টিকে থাকে পারে। আর প্লেগের মতো রোগ একটি জনপুঞ্জ থেকে চলে যাওয়ার আগে বিষ্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ে। রোনাল্ড রস মহামারীর গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন,সে পদ্ধতিকে আরো সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য ম্যাককেন্ড্রিক ও কারম্যাক কাজ শুরু করেন। ম্যালেরিয়ার মতো রোগের পাশাপাশি তারা প্লেগের মতো মহামারী নিয়েও গবেষণা করতে থাকেন।

রসের মতোই একটি কাল্পনিক জনপুঞ্জের সদস্যদের স্বাস্থ্যবান কিংবা রোগাক্রান্ত এই দুইটি দলে বিভক্ত করেন তারা। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো মশা বাহক মধ্যবর্তী হিসেবে রোগ সংক্রমণ না করে বরং মানুষ থেকে মানুষেই রোগটি সংক্রমিত হচ্ছে। আগের মতোই জনপুঞ্জের সদস্যরা শুরুর দিকে রোগের প্রতি সংবেদনশীল থাকে। জীবাণুর সংস্পর্শে এসে তারা সুস্থ দল থেকে রোগাক্রান্ত হিসেবে চলে আসে। শেষে হয়তো তারা রোগাক্রান্ত দল থেকে আবার সুস্থ দলে চলে আসে (তাদের দেহ ঐ রোগের বিরুদ্ধে অনাক্রম্যতা গড়ে তোলে। যেমন হাম কিংবা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া ইনফ্লুয়েঞ্জা) কিংবা রোগে ভুগে মারা যায় (যেমনটা হয় প্লেগের ক্ষেত্রে)।

অগ্রগতির পথ সবসময় মসৃণ হয় না। ১৯২৪ সালে ল্যাবের এক দূর্ঘটনায় কারম্যাক অন্ধ হয়ে পড়েন। সে সময় থেকে তিনি দমে না গিয়ে মাথার মধ্যেই দরকারী হিসেব কষা শুরু করেন। তিনি ও ম্যাককেন্ড্রিক দুজনে মিলে তাদের গবেষণার ফলাফল ১৯২৭ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন লন্ডনের রয়েল সোসাইটির প্রসেডিংসে। গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল ‘A Contribution to the Mathematical Theory of Epidemics’। বিশ পৃষ্ঠার এই গবেষণাপত্রে তারা রোগতত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনাসামনি হয়ে একটি ব্যাখ্যা দেয়ার প্রচেষ্টা চালান। সে প্রশ্নটি হলো ঠিক কোন কারণে কোন মহামারীর অবসান হয়?

ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা প্লেগ- যেকোনো মহামারীর শুরুতে রোগাক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায়ই সূচকীয় হারে বাড়তে থাকে। কিছু সময় পর মহামারী একটি সর্বোচ্চ সীমার চূড়ায় পৌঁছে যায়। তারপর ঐ মহামারীতে রোগাক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। ম্যাককেন্ড্রিক ও কারম্যাক তাদের গবেষণা শুরু করেন তখন সমকালীন বিজ্ঞানী মহলে এই কমতি-র দুইটি ব্যাখ্যা প্রচলিত ছিল।

হয়তো জীবাণুর ক্ষমতা সময়ের সাথে কমে এসেছে;কিংবা ঐ রোগের প্রতি সংবেদনশীল মানুষ ঐ জনপুঞ্জে আর নেই। ঐ জনপুঞ্জের সকলেই রোগাক্রান্ত হয়েছিল- প্রত্যেকে হয় মারা গেছে কিংবা ঐ রোগের বিরুদ্ধে অনাক্রম্যতা অর্জন করে ফেলেছে।

ম্যাককেন্ড্রিক ও কারম্যাকের মডেলে তারা ধরে নিলেন যে সময়ের সাথে মহামারীর জীবাণু দূর্বল হয়ে যায়নি, একই রকম রয়েছে। তারপরও তাদের গাণিতিক মডেলে দেখা গেল এক সময় ঠিকই রোগাক্রান্তের সংখ্যা কমে আসছে। যখন বিজ্ঞানী-যুগল ভারতের বোম্বে শহরে (এখনকার মুম্বাই) ১৯০৫ সালে প্লেগ মহামারীর তথ্য নিয়ে কাজ করলেন দেখা গেল তাদের মডেল বিভিন্ন সময়ে রোগাক্রান্তের যে সংখ্যা পূর্বানুমান করছে তা প্রকৃত রোগীর সংখ্যার সাথে মিলে যাচ্ছে।

তাহলে কি মহামারীর এই কমতি রোগের প্রতি সংবেদনশীল মানুষের অভাবেই ঘটছে? আপাতদৃষ্টিতে না। ম্যাককেন্ড্রিক ও কারম্যাকের মডেল মহামারীর শেষ পর্যায়েও বেশ কিছু সংবেদনশীল ব্যক্তি রয়েই যান। ম্যাককেন্ড্রিক ও কারম্যাক দেখান যে মহামারীর শেষ দিকে রোগীর সংখ্যা কমে আসার কারণ এই নয় যে জনপুঞ্জের সকলেই রোগাক্রান্ত হয়েছে। রোগীর সংখ্যা কমার আরেকটি কারণ হলো ওই জনপুঞ্জে যথেষ্ট সংখ্যক রোগাক্রান্ত ব্যক্তি থাকে না যারা রোগসংক্রমণ জিইয়ে রাখবেন।

যখন কোনো জনপুঞ্জে যথেষ্ট সংখ্যক সদস্য রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছেন তখন রোগাক্রান্ত ব্যক্তিরা আরেকজন সংবেদনশীল সদস্যের সাথে সংস্পর্শে আসবেন সেই সম্ভাব্যতা কমে আসে। তার মানে তখন সচরাচর রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে অন্য ব্যক্তিদের দেহে রোগ ছড়িয়ে পড়ার পূর্বেই তারা সুস্থ হয়ে উঠছেন।

কোনো মহামারীর শেষ দিকে এই পরিণতি অনিবার্যভাবে ঘটবে। এর বাইরেও মহামারীকে এই অবস্থায় চলে যেতে বাধ্য করা যেতে পারে। রসের মডেল অনুযায়ী ম্যালেরিয়া সংক্রমণ কমানো হয়েছিল মশার সংখ্যা কমিয়ে। আর টিকা দান কর্মসূচীতে এই পরিস্থিতি জনপুঞ্জে রোগের প্রতি সংবেদনশীল একটি বড় অংশকে লক্ষ্য করে রোগ ছড়ানো বন্ধ করা হয় (কিংবা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়)।

ম্যাককেন্ড্রিক ও কারম্যাকের মডেলের পরবর্তী বড়সড় মৌলিক আবিষ্কারের জন্য রোগতত্ত্বকে অপেক্ষা করতে হয় আরো কয়েকটি দশক। ১৯৭০ এর দশকে গণিতবিদ ক্লাউস ডিয়েট্জ এবং দুই বাস্তুবিদ (ecologist) রয় এন্ডারসন ও রবার্ট মে ‘পুনরুৎপাদন সংখ্যা’ বা reproduction number ধারণার উপর তাদের অগ্রণী গবেষণা শুরু করেন। রোগতত্ত্বে পুনরুৎপাদন সংখ্যা বলতে বোঝায় একটি রোগে আক্রান্ত রোগী রোগে ভোগা অবস্থায় গড়ে নতুন কতজন সুস্থ ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারে।

একটি রোগের ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে অনেক ধরনের প্রক্রিয়া ভূমিকা পালন করে। রোগীর সামাজিক মেলামেশা থেকে শুরু করে জীবাণুর আক্রমণ করার জৈবিক ক্ষমতা সহ অনেক কিছুই। পুনরুৎপাদন সংখ্যার মাধ্যমে এসব প্রক্রিয়াকে একটি মাত্র পরিমাপে নিয়ে আসা যায়। যদি পুনরুৎপাদন সংখ্যা ১ এর চাইতে ছোট হয়,প্রতিটি রোগীর মাধ্যমে গড়ে একের চেয়ে কম সংখ্যায় কোনো সুস্থ ব্যক্তিকে আক্রান্ত করবে ঐ রোগ। সেক্ষেত্র কোনো বড় আকারে ছড়িয়ে না পড়ে রোগটি জনপুঞ্জ থেকে চলে যাবে। কিন্তু এই সংখ্যাটা যদি ১ এর চেয়ে বেশি হয় তাহলে সময়ের সাথে সাথে জনপুঞ্জে তা ছড়িয়ে পড়তে থাকবে।

কোনো রোগের পুনরুৎপাদন সংখ্যা অনেকভাবেই গোনা যায়। যদি জানি একটি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কত দিনের জন্য অন্য সুস্থ ব্যক্তিদের আক্রান্ত করাতে পারে, আর যদি জানি একটি নতুন রোগের ঘটনা থেকে অন্য একটি রোগের ঘটনার মধ্যকার গড় সময় পার্থক্য, তাহলে কতো দ্রুত মহামারী বেড়ে উঠছে সেখান থেকে পুনরুৎপাদন সংখ্যা আমরা বের করতে পারবো। কিংবা কোনো রোগে মানুষ গড়ে কত বছর বয়সে আক্রান্ত হয় সেটা জানা থাকলেও পুনরুৎপাদন সংখ্যা বের করা যায়। একটি রোগ যত বেশি সংক্রামক হবে তত দ্রুত কোনো ব্যক্তি রোগাক্রান্ত হবে।

বিভিন্ন রোগের পুনরুৎপাদন সংখ্যা তুলনা করে বিভিন্ন রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। যেমন হাম খুবই সংক্রামক রোগ। টিকা দেয়া হয়নি এমন জনপুঞ্জে এর পুনরুৎপাদন সংখ্যা ১২ থেকে ১৮ হতে পারে। এ থেকে বোঝা যায় যে কেন হামকে ছোটদের রোগ হিসেবে ধরা হয়।

অন্যদিকে কুখ্যাত স্প্যানিশ ফ্লু-র পুনরুৎপাদন সংখ্যা ২ থেকে ৩-র মাঝামাঝি। ১৯১৮/১৯ সালে স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে আক্রান্ত করেছিল। এ রোগে মারা গিয়েছিল তখনকার পৃথিবীর ৩ থেকে ৫ শতাংশ অধিবাসী। এ রোগে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় তুলনামূলক কম পুনরুৎপাদন সংখ্যা হলেও তা পৃথিবী জুড়ে একটা ধ্বংসযজ্ঞ ছড়াতে পেরেছিল। পুনরুৎপাদন সংখ্যার স্কেলে মাঝামাঝি আছে পোলিও (৫ থেকে ৭) ও মাম্পস (৪ থেকে ৭)।

একটি রোগ কত দ্রুত ছড়াবে সে সম্পর্কে পুনরুৎপাদন সংখ্যা কোনো তথ্য দেয় না। তবে টিকা দান কর্মসূচীর মাধ্যমে কোনো রোগকে নির্মূল করে ফেলতে কী পরিমাণ প্রচেষ্টা চালানো লাগবে তার একটা ধারণা পাওয়া যায়।

যেমন হামের মতো রোগের ক্ষেত্রে জনপুঞ্জের ভালো পরিমাণ সদস্যকে টিকা দিতে হবে যাতে প্রাথমিক রোগী থেকে হাম তেমন একটা না ছড়ায়,যাতে পুনরুৎপাদন সংখ্যা ১ এর নিচে চলে আসে। এমন নয় পুনরুৎপাদন সংখ্যা মানুষের পরিচিত রোগের ক্ষেত্রেই সহায়ক। ইবোলার মতো নতুন রোগ কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে সেক্ষেত্রেও এ সংখ্যাটি আমাদের সহায়তা করে।

. ইবোলার লড়াইয়ে গাণিতিকরণকৌশল

২০০৩ সাল। হংকং-এর মেট্রোপোল হোটেল। রুম নম্বর ৯১১। এক ব্যক্তি সে হোটেলে ২১ তারিখ চেক-ইন করলেন। অসুস্থ বোধ করছিলেন তিনি। এক চাচাতো ভাইয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণে এসেছিলেন তিনি। দক্ষিণ চিন থেকে আসার পথে কোনো কিছু তাকে সংক্রমিত করে। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে তাকে নিতে হয়। এর মাত্র দশ দিনের মধ্যেই তিনি মারা যান।

ওই সংক্রমণের নাম দেয়া হয় Severe Acute Respiratory Syndrome (SARS)। কিছুদিনের মধ্যেই অন্যান্য শহরে সার্স ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে- সিঙ্গাপুর,ব্যাংকক এমনকি টরেন্টো। তখন স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর সামনে বেশ কিছু প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে- ভাইরাসটি কী করে সংক্রমিত হচ্ছে;কে কে এই ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন;কী জরুরী ব্যবস্থা নিলে সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে?

২০০৩ এর বসন্তকালে লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষকরা বিভিন্ন গাণিতিক মডেল ব্যবহার করতে শুরু করলেন হংকং-এর সার্স মহামারীর উপাত্ত বিশ্লেষণের জন্য। তারা দেখলেন যখন সার্স নিয়ন্ত্রণের কোনো উপায় থাকে না তখন এর পুনরুৎপাদন সংখ্যা ২ থেকে ৩ এর মাঝামাঝি হয়।

পুনরুৎপাদন সংখ্যা ৩ এমন কোনো মহামারীর বিরুদ্ধে টিকা কার্যক্রম সফল হতে হলে জনপুঞ্জের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যকে টিকা দিতে হবে। সেক্ষেত্রে বাকি এক-তৃতীয়াংশ সদস্যরা ঐ রোগের প্রতি সংবেদনশীল রয়েই যায়। তবে ঐ মহামারীর পুনরুৎপাদন সংখ্যা ১ এর চেয়ে কমে যায়। তখন এমনি এমনিই মহামারীর বিস্তার কমে যায়।

টিকা দেয়ার এই পদ্ধতি হামের মতো রোগ বিস্তার রুখতে সাহায্য করলেও সার্সের জন্য করবে না। কারণ সার্স যখন প্রথম দেখা দেয় তখনতো এর বিরুদ্ধে কোনো টিকাই নেই। মিডল ইস্ট রেস্পিরেটরি সিন্ড্রম বা মার্স (MERS) কিংবা ইবোলার মতো নতুন রোগের ক্ষেত্রেও একই সমস্যার মুখোমুখি পড়তে হয়।

কোনো টিকা আবিষ্কার ও মানুষের ব্যবহার উপযোগী করতে বহু বছর সময় লেগে যায়। বিশেষ করে যে ভাইরাস পূর্বে কেউ দেখেইনি,তাদের বিরুদ্ধে টিকা আবিষ্কার বেশ জটিল। তাই সার্স মহামারীর সময়ে বিশেষজ্ঞরা টিকার বাইরে অন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যায় কিনা তা ভাবতে শুরু করেন।

যখন দ্রুত সংক্রমণশীল রোগের বিরুদ্ধে কোনো টিকা না থাকে তখন স্বাস্থ সংস্থাগুলো দুটি খুব জরুরী কাজ করতে পারে। প্রথমতঃ কোনো ব্যক্তি যদি ঐ রোগের কোনো লক্ষণ দেখান তাহলে নিশ্চিত করতে হবে তাকে অন্য সবার মাঝ থেকে আলাদা করে ফেলা। এর মাধ্যমে ঐ ব্যক্তি আর রোগ ছড়াবেন না সেটা নিশ্চিত করা যায়। দ্বিতীয়তঃ ঐ ব্যক্তিকে সবার কাছ থেকে আলাদা করার আগে তিনি যেসব ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন তাদেরকেও খুঁজে বের করতে হবে। তারপর তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে যে তাদের রোগ হয়েছে কিনা।

সার্স মহামারীর গাণিতিক বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখলেন রোগীদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সংক্রমণের বিরুদ্ধে বেশ কার্যকরী ব্যবস্থা। যখন আক্রান্ত ব্যাক্তিরা তাদের চলাফেরা সীমিত করে ফেলে সামাজিক মেলামেশা বন্ধ করে দেন তা তখন মহামারীকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কাজে দেয়।

২০০৩ সালের ৫ জুলাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা দেয় যে সার্স মহামারী নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে এসেছে। তবে লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষকরা আরো স্বচ্ছভাবে বুঝতে চাচ্ছিলেন রোগীদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলা কেন এতো কাজে দিলো; আর একই পদ্ধতি অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যাবে কিনা।

তারা একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করলেন যা দিয়ে ব্যখ্যা করা যাবে কীভাবে রোগীদের বিচ্ছিন্ন করে ফেললে সেটা রোগ সংক্রমণকে ব্যাহত করে। সে মডেল থেকে তারা দেখলেন যে বিচ্ছিন্নতার কার্যকরিতা শুধু যে পুনরুৎপাদন সংখ্যার উপর নির্ভর করে তা নয়। রোগের লক্ষণ প্রকাশের আগে কতটুকু সংক্রমণ ঘটে তার উপরেও বিচ্ছিন্নতা পদ্ধতির সফলতা নির্ভর করে।

সার্স রোগের ক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগী সবচেয়ে বেশি রোগ ছড়ান কেবলমাত্র দৃশ্যমানভাবে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর। ঠিক এজন্যেই বিচ্ছিন্নতা পদ্ধতি এ মহামারীতে এতটা কার্যকরী ছিল। কিন্তু ইনফ্লুয়েঞ্জার (ফ্লু)ক্ষেত্রে অবস্থা একেবারেই ভিন্ন। ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি রোগ ছড়ান তিনি দৃশ্যমানভাবে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার আগেই। ফ্লু মহামারীর সময় রোগীদের বিচ্ছিন্ন করে আলাদা রাখার কার্যকারিতা কম। কারণ রোগী নিজে অসুস্থ হওয়ার আগেই অন্যদের মাঝে রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে এ রোগে।

রস তার মশকীয় তত্ত্ব প্রকাশের এক শতাব্দীর মাঝেই এ ধরনের গবেষণা বিভিন্ন মহামারীর বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সর্বজনীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা মহামারীর মতো নতুন রোগের মুখোমুখী হয়ে আমরা এ ধরনের গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখতে পারি এ রোগটির পুনরুৎপাদন সংখ্যা কত। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে কিছু কিছু জায়গায় এ রোগের পুনরুৎপাদন সংখ্যা ২ এর কাছাকাছি। তাই এই রোগটি সূচকীয় হারে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

মহামারীকে একটি গতিশীল,পরিবর্তনীয় ব্যবস্থা হিসেবে চিন্তা করা যেতে পারে। তাহলে মহামারীর বিরুদ্ধে সাম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও আমরা মূল্যায়ন করতে পারবো। যেমন আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই যুক্তরাজ্য নতুন একটি গাণিতিক মডেলের উপর ভিত্তি করে শিশুদের টিকা দেবে।

গবেষকরা এর আগে দেখেছেন বিভিন্ন বয়সী ব্যক্তিদের ভিন্ন সমন্বয়ে টিকা দিলে কী হয়,আর জনপুঞ্জের কেবল নির্দিষ্ট অংশকে টিকা দিলে কী হয়। গবেষণার ফলাফল বলছে বয়সে ছোট ও বৃদ্ধদের লক্ষ্য করে টিকা দেওয়াই হলো শ্রেয় পদ্ধতি;এর মাধ্যমেই ইনফ্লুয়েঞ্জার অসুস্থতা কমানো যাবে।

মহামারীর বিভিন্ন অবস্থার পূর্বাভাস দিতে পারাটাই গাণিতিক মডেলগুলোর সবচেয়ে শক্তিশালী দিকের মাঝে অন্যতম। এসব মডেল ব্যবহার করে মহামারী নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ব্যবস্থা তুলনা করতে পারি।

আমরা যদি অনেকগুলো পদ্ধতি মহামারীর সময় প্রয়োগ করে তার ফলাফল দেখে সিদ্ধান্ত নেই কোনোটি ভালো,তাহলে অনেক বেশি সময় চলে যাবে সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই। ততক্ষণে হয়তো ভুল পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে মহামারী ছড়াবে আরো বেশি। তবে এখন আমরা গাণিতিকভাবে দ্রুত পরীক্ষা করতে পারি কোন পদ্ধতিটি মহামারী মোকাবেলায় সবচেয়ে ভালো কাজে দেবে;আর সেই পদ্ধতিই বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারি।

ধন্যবাদ রোনাল্ড রস ও তার উত্তরসূরীদের। আমাদের এখন জমে থাকা পানিটার ট্যাঙ্কি উল্টিয়ে অপেক্ষা করে দেখতে হয় না মহামারী প্রতিরোধে সেটা ভালো উপায় কিনা।

[এ লেখাটি The Calculus of Contagionর ভাষান্তর]

অন্যান্য তথ্যসূত্র:

১) Malaria, mosquitoes and the legacy of Ronald Ross: http://www.who.int/bulletin/volumes/85/11/04-020735/en/

২) Ross and the Discovery that Mosquitoes Transmit Malaria Parasites: http://www.cdc.gov/malaria/about/history/ross.html

feature image: tuasaude.com

অট্টহাসি রোগ ও অনিষ্টের রূপ

কখনো কখনো আমরা সবকিছু ভিন্ন চোখে দেখতে বাধ্য হই। তবে এটা মোটেও সহজ নয়। মানুষ অভ্যাসের দাস। তাই আমরা প্রথম দর্শনে যা ভাবতে অভ্যস্ত হই তার শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে যাই। প্রিয়নদের ব্যপারে ঠিক এরকমই ঘটেছে। প্রিয়ন এক ধরনের প্রোটিন। এদের আকার নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে বদলে যায়। ফলাফলে এরা মারাত্মক রোগের মূল কারণ হয়ে পড়ে। কোনো প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন বদলে গেলে তা অনেক ব্যাধির কারণ হতে পারে। তাই প্রিয়ন-প্রোটিনের আকার বদলে গিয়ে রোগের কারণ হয়ে যাওয়াটা অণুপ্রাণবিজ্ঞানে নতুন কোনো ধারণা নয়। যে ধারণা নতুন তা হলো প্রোটিন নিজেই রোগ সংক্রমণের মূল কারণ হতে পারে।

সংক্রমক বলতে একটি অস্তিত্বকে বোঝানো হয় যা কোনো জীব থেকে অন্য জীবে (বা এক কোষ থেকে অন্য কোষে) ছড়ানোর মাধ্যমে রোগ বিস্তারে ভূমিকা রাখে। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া কোনো জীবে সংক্রমিত হওয়ার সময় নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধি করে। এসময় বিভিন্ন কোষ মেরে ফেলে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। যেমন উদাহরণ টানা যায় মেনিনজাইটিস, ফ্লু কিংবা এইডস রোগের ক্ষেত্রে। তেমনি কিছু কিছু প্রিয়ন প্রোটিন আছে যাদের আকার বদলে গেলে সংক্রমণশীল হয়ে পড়ে। ফলে ভেড়ার স্ক্র্যাপি বা মানুষের ক্রুয়েটজফেল্ড-জ্যাকব রোগের মতো স্নায়ু্ক্ষয়জনিত অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এরা। সম্প্রতি এমন একটি প্রিয়ন আবিষ্কৃত হয়েছে যার স্বভাব ভিন্ন প্রকৃতির। এটি নিজের রূপ বদলাতে চায় না। এর নাম PrP V127

প্রচলিত মতের বিপরীতে প্রিয়ন (PrP) মাত্রই যে ক্ষতিকর এমনটা নয়। বিভিন্ন জীবে এরা প্রাকৃতিকভাবেই

বিরাজ করে (PrPc)– বিশেষত মগজে। কোষ দৃঢ়সংলগ্ন হয়ে লেগে থাকাতে আর কোষের ভেতরে সংকেত পরিবহনে এরা ভূমিকা পালন করে বলে ভাবা হয়। তবে ত্রিমাত্রিক গঠন ভুলভাবে ভাঁজ হয়ে গেলে (PrPSc) এরা অনিষ্টকারী হয়ে পড়ে। রূপের পরিবর্তনের কারণে কেন এরা নির্দোষ থেকে অনিষ্টকারীতে পরিণত হয় তা এখনো বোঝা যায়নি। হয়তো কোনো তাপগতীয় বাঁধ রয়েছে যার ফলে নির্দোষ ভাজ বদলে রূপটি অনিষ্টকারী রূপে পরিবর্তিত হয়ে যায়। তখন নির্দোষ রূপে (PrPc) ফেরত যাবার জন্য দরকারী তাপ এতো বেশি যে অনিষ্টকারী রূপটি (PrPSc) এর নতুন আকৃতিতে আটকা পড়ে যায়। এ দুই আকৃতি এতটাই ভিন্ন যে তা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। PrPc একদিকে আলফা হেলিক্সের প্যাঁচ দিয়ে পূর্ণ, অন্যদিকে PrPSc বিটা শিটের আস্তরনে স্ফীত।

এই গাঠনিক পার্থক্যটি লক্ষণীয় কারণ এদের অ্যামিনো এসিড অনুক্রমে (বা প্রোটিন সিকোয়েন্স) কোনো পরিবর্তন হয় না। ভুলভাবে ভাঁজ হওয়া প্রিয়ন তারপর জমা হতে থাকে। প্রথমে একটি PrPSc বীজ হিসেবে কাজ করে যা এই প্রিয়নের অনিষ্টকারী রূপটিকে স্থিতিশীল করে। এ প্রক্রিয়া খুব দ্রুতগতিতে চলতে থাকে। একসময় ছোট ছোট অলিগোমার ফাইব্রিলের তন্তুতে রূপ নেয়, যারা পরে একে অপরে জড়ো হয়ে বৃহত্তর জমায়েতে পরিণত হয়। এ বৃহত্তর জমায়েত মস্তিষ্কে থোক তৈরি করে করে স্নায়ু ক্ষয়কে এগিয়ে নিতে থাকে।

প্রিয়ন প্রোটিন আবিষ্কারের বহু আগেই এর কারণে সৃষ্ট অসুখ সম্পর্কে জানা যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে স্প্যানিশ মেষপালকরা তাদের মেরিনো জাতের ভেড়ায় অদ্ভূত আচরণ খেয়াল করেন।

চিত্রঃ PrPC প্রিয়নে চারটি প্যাঁচালো আলফা হেলিক্স দেখা যাচ্ছে (a)। এটি যখন PrPSc-তে রূপান্তরিত হয় তখন চারটি বিটা শিটের আস্তরণ তৈরি হয় (b)। দুইটির গঠনে ভিন্নতা লক্ষ্যণীয়।

ভেড়াগুলোর হাঁটার চাল বদলে যায়, চাটাচাটি বেড়ে যায় আর তীব্র চুলকানি দৃষ্টিগোচর হয়। এরা ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করে বেড়ার গায়ে নিজেদের দেহ ঘষাতে। স্পানিশ রাখালরা এ রোগের নাম দিয়েছিল ‘স্ক্র্যাপি’। এর প্রায় দুইশ’ বছর পর জার্মান স্নায়ুবিদ এইচ.জি. ক্রুটজফেল্ড ও এ.এম. জ্যাকব এক ধরনের স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগ চিহ্নিত করেন যার লক্ষণ ছিল স্ক্রাপির অনুরূপ। এ রোগের নাম দেয়া হয় ক্রুটজফেল্ড-জ্যাকব রোগ (সিজেডি)। এই রোগটি ধীরগতির হলেও সময়ের সাথে সাথে অবস্থার অবনতি হতে থাকতো। এ ধরনের ধীরগতির অবনতির পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? কোনো কোনো বিজ্ঞানী ভাবলেন হয়তো কোনো ‘ঢিলা ভাইরাস’ এর পেছনে দায়ী।

১৯৬৭ সালে ব্রিটিশ জৈবপদার্থবিদ জে.এস. গ্রিফিথ প্রস্তাব করলেন যে স্ক্র্যাপির পেছনে সম্ভবত প্রোটিন নির্মিত কোনোকিছু দায়ী। তবে সংক্রামক প্রতিনিধি হিসেবে প্রোটিন দায়ী এ মতামতটি সংশয়ের মুখে পড়ে। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মতটি উপেক্ষা করা হচ্ছিল। প্রোটিনরা যে সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে, বিশ বছর পর এই ধারণাটিকে পুনরিজ্জীবিত করেন আমেরিকান স্নায়ুবিদ এস.বি. প্রুশিনার ও সুইস অণুপ্রাণবিজ্ঞানী চার্লস উইসম্যান।

শেষ পর্যন্ত গত শতাব্দীর শেষ দিকে আর একবিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে বিশেষতঃ ম্যাড কাউ রোগের প্রাদুর্ভাবের সাথে সাথে প্রোটিন নির্মিত সংক্রামক কণার ধারণাটি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। অবশ্য কয়েকজন বিজ্ঞানী এখনো এ বিষয়টিতে সন্দেহমুক্ত নন। তবে সম্প্রতি প্রিয়নের সূক্ষ্মতর প্রকারভেদ করা গেছে। মানুষে প্রিয়ন-ভিত্তিক ব্যাধির সংক্রমণ অত্যন্ত দূর্লভ। শুধুমাত্র টিস্যুকলা প্রতিস্থাপন, শল্যচিকিৎসার

অস্ত্র বা দূষিত মাংস-পণ্য থেকে প্রিয়নের সংক্রমণ হয়। যেমন এখন মানুষে প্রিয়নের ব্যাধিকে সংক্রমণশীল হিসেবে ধরা হয় না। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে এ ব্যাধিকে ধরা হয় এমন শারিরীক বিপর্যয় হিসেবে যেখানে মস্তিষ্কের ভেতরে দলা তৈরি ও জমা হতে থাকে। এ প্রক্রিয়াটি অন্যান্য স্নায়ুক্ষয়ী রোগের অনুরূপ।

তবে অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানী মাইকেল আলপের্স ১৯৬০-র দশকে কুরু নামক স্নায়ুক্ষয়ী প্রিয়ন রোগের কথা উল্লেখ করেছিলেন। পাপুয়া নিউগিনির ফোর নৃজাতিগোষ্ঠীর উপর মাঠ পর্যায়ের গবেষণা থেকে তিনি এ রোগের কথা জানতে পারেন। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ করে অট্টাহাসি হাসা শুরু করতো। তাই ঐ জাতির মধ্যে এ রোগটি ‘অট্টহাসি রোগ’ নামে পরিচিত ছিল। কুরু শব্দটির আক্ষরিক অর্থই হলো ‘ঝাঁকানো’। পরবর্তীতে দেখা গেল আত্মীয়ের মৃত্যুর পর তার মাংস খাওয়া থেকে এ রোগটি ছড়ায়। ফোর নৃজাতিগোষ্ঠী সমাধিসংক্রান্ত অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে মৃতের মাংশ ও মগজ কাঁচা খাওয়া হতো।

এই মহামারীর শুরু হয়েছিল সম্ভবত ১৯০০-শতকের শুরুর দিকে যখন ঐ জনগোষ্ঠীর কোনো সদস্য CJD রোগের একটি ধরণে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে অবশ্য এখন এ রোগটি নেই। এ রোগে ২০০৫ সালে সর্বশেষ মৃত্যু হয়। বিস্ময়ের ব্যপার হলো পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে কিছু কিছু ব্যক্তি কুরু রোগে একেবারেই অপ্রভাবিত ছিল। তারা একধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছিল। দেখা গেল PrP V127 নামক PrP-র একটি ভিন্ন প্রকরণের কারণে এমনটা হচ্ছে। PrP V127 তে ১২৭ নম্বর অ্যমিনো এসিডে গ্লাইসিনের স্থলে ভ্যালিন স্থানান্তরিত হয়েছিল। ইঁদুরে জেনেটিক পরিবর্তন করে দেখা গেছে তাদের PrP V127 প্রিয়ন তৈরি হলে তা কুরু ও ধ্রুপদী CJD প্রিয়ন প্রতিরোধ করে। কিন্তু কীভাবে? PrP V127 রূপ বদলিয়ে PrP-র অনিষ্টকারী চেহারায় বদলায় না। ফলে এই প্রকরণ বহন করা ব্যক্তি স্নায়ুক্ষয় রোগে আক্রান্ত হয় না।

আরেকটি PrP প্রকরণের কথা জানা যায় যা বিক্ষিপ্ত CJD রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে মানুষকে রক্ষা করে। তবে এর কর্মকৌশল PrP V127 এর মতো নয়। বরং এটি প্রিয়ন উৎপাদন চলমান থাকা অবস্থায় প্রোটিন-প্রোটিন মিথষ্ক্রিয়া আটকে রাখে। কীভাবে PrP V127 প্রিয়নের রূপ-বদলানো প্রতিরোধ করে তা বুঝতে পারলে বিজ্ঞানীরা প্রিয়নের রোগতত্ব ও উৎপাদনের প্রাণ-রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি উপলদ্ধি করতে পারবেন। এছাড়াও ঔষুধ তৈরিতেও এটি অন্তর্দৃষ্টি দেবে। স্বজাতিভক্ষণ নিষিদ্ধ করে দেয়ার ফলে ফোর জনগোষ্ঠি চলমান কুরু মহামারী থেকে বেঁচে যায়। তবে PrP V127 প্রকরণের উপস্থিতি এটাই নির্দেশ করে যে সময়ের সাথে সাথে কুরু-প্রতিরোধি ব্যক্তির সংখ্যা বাড়তে থাকতো। এটা মহামারীর পাল্টা জবাব হিসেবে প্রাকৃতিক বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার মধ্যমেই হতো। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকৃতির নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে।

তথ্যসূত্র

  • এক্সপ্যাসি প্রোটিন স্পটলাইটের ১৭৯ ইস্যু The shape of harm-র অনুবাদ। লেখকঃ ভিভিয়েন বেইলি গ্যারিস্টেন।
  • org/spotlight/back_issues/179/

অট্টহাসি রোগ ও অনিষ্টের রূপ

কখনো কখনো আমরা সবকিছু ভিন্ন চোখে দেখতে বাধ্য হই। তবে এটা মোটেও সহজ নয়। মানুষ অভ্যাসের দাস। তাই আমরা প্রথম দর্শনে যা ভাবতে অভ্যস্ত হই তার শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে যাই। প্রিয়নদের ব্যপারে ঠিক এরকমই ঘটেছে। প্রিয়ন এক ধরনের প্রোটিন। এদের আকার নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে বদলে যায়। ফলাফলে এরা মারাত্মক রোগের মূল কারণ হয়ে পড়ে। কোনো প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন বদলে গেলে তা অনেক ব্যাধির কারণ হতে পারে। তাই প্রিয়ন-প্রোটিনের আকার বদলে গিয়ে রোগের কারণ হয়ে যাওয়াটা অণুপ্রাণবিজ্ঞানে নতুন কোনো ধারণা নয়। যে ধারণা নতুন তা হলো প্রোটিন নিজেই রোগ সংক্রমণের মূল কারণ হতে পারে।

সংক্রমক বলতে একটি অস্তিত্বকে বোঝানো হয় যা কোনো জীব থেকে অন্য জীবে (বা এক কোষ থেকে অন্য কোষে) ছড়ানোর মাধ্যমে রোগ বিস্তারে ভূমিকা রাখে। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া কোনো জীবে সংক্রমিত হওয়ার সময় নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধি করে। এসময় বিভিন্ন কোষ মেরে ফেলে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। যেমন উদাহরণ টানা যায় মেনিনজাইটিস, ফ্লু কিংবা এইডস রোগের ক্ষেত্রে। তেমনি কিছু কিছু প্রিয়ন প্রোটিন আছে যাদের আকার বদলে গেলে সংক্রমণশীল হয়ে পড়ে। ফলে ভেড়ার স্ক্র্যাপি বা মানুষের ক্রুয়েটজফেল্ড-জ্যাকব রোগের মতো স্নায়ু্ক্ষয়জনিত অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এরা। সম্প্রতি এমন একটি প্রিয়ন আবিষ্কৃত হয়েছে যার স্বভাব ভিন্ন প্রকৃতির। এটি নিজের রূপ বদলাতে চায় না। এর নাম PrP V127

প্রচলিত মতের বিপরীতে প্রিয়ন (PrP) মাত্রই যে ক্ষতিকর এমনটা নয়। বিভিন্ন জীবে এরা প্রাকৃতিকভাবেই

বিরাজ করে (PrPc)– বিশেষত মগজে। কোষ দৃঢ়সংলগ্ন হয়ে লেগে থাকাতে আর কোষের ভেতরে সংকেত পরিবহনে এরা ভূমিকা পালন করে বলে ভাবা হয়। তবে ত্রিমাত্রিক গঠন ভুলভাবে ভাঁজ হয়ে গেলে (PrPSc) এরা অনিষ্টকারী হয়ে পড়ে। রূপের পরিবর্তনের কারণে কেন এরা নির্দোষ থেকে অনিষ্টকারীতে পরিণত হয় তা এখনো বোঝা যায়নি। হয়তো কোনো তাপগতীয় বাঁধ রয়েছে যার ফলে নির্দোষ ভাজ বদলে রূপটি অনিষ্টকারী রূপে পরিবর্তিত হয়ে যায়। তখন নির্দোষ রূপে (PrPc) ফেরত যাবার জন্য দরকারী তাপ এতো বেশি যে অনিষ্টকারী রূপটি (PrPSc) এর নতুন আকৃতিতে আটকা পড়ে যায়। এ দুই আকৃতি এতটাই ভিন্ন যে তা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। PrPc একদিকে আলফা হেলিক্সের প্যাঁচ দিয়ে পূর্ণ, অন্যদিকে PrPSc বিটা শিটের আস্তরনে স্ফীত।

এই গাঠনিক পার্থক্যটি লক্ষণীয় কারণ এদের অ্যামিনো এসিড অনুক্রমে (বা প্রোটিন সিকোয়েন্স) কোনো পরিবর্তন হয় না। ভুলভাবে ভাঁজ হওয়া প্রিয়ন তারপর জমা হতে থাকে। প্রথমে একটি PrPSc বীজ হিসেবে কাজ করে যা এই প্রিয়নের অনিষ্টকারী রূপটিকে স্থিতিশীল করে। এ প্রক্রিয়া খুব দ্রুতগতিতে চলতে থাকে। একসময় ছোট ছোট অলিগোমার ফাইব্রিলের তন্তুতে রূপ নেয়, যারা পরে একে অপরে জড়ো হয়ে বৃহত্তর জমায়েতে পরিণত হয়। এ বৃহত্তর জমায়েত মস্তিষ্কে থোক তৈরি করে করে স্নায়ু ক্ষয়কে এগিয়ে নিতে থাকে।

প্রিয়ন প্রোটিন আবিষ্কারের বহু আগেই এর কারণে সৃষ্ট অসুখ সম্পর্কে জানা যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে স্প্যানিশ মেষপালকরা তাদের মেরিনো জাতের ভেড়ায় অদ্ভূত আচরণ খেয়াল করেন।

চিত্রঃ PrPC প্রিয়নে চারটি প্যাঁচালো আলফা হেলিক্স দেখা যাচ্ছে (a)। এটি যখন PrPSc-তে রূপান্তরিত হয় তখন চারটি বিটা শিটের আস্তরণ তৈরি হয় (b)। দুইটির গঠনে ভিন্নতা লক্ষ্যণীয়।

ভেড়াগুলোর হাঁটার চাল বদলে যায়, চাটাচাটি বেড়ে যায় আর তীব্র চুলকানি দৃষ্টিগোচর হয়। এরা ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করে বেড়ার গায়ে নিজেদের দেহ ঘষাতে। স্পানিশ রাখালরা এ রোগের নাম দিয়েছিল ‘স্ক্র্যাপি’। এর প্রায় দুইশ’ বছর পর জার্মান স্নায়ুবিদ এইচ.জি. ক্রুটজফেল্ড ও এ.এম. জ্যাকব এক ধরনের স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগ চিহ্নিত করেন যার লক্ষণ ছিল স্ক্রাপির অনুরূপ। এ রোগের নাম দেয়া হয় ক্রুটজফেল্ড-জ্যাকব রোগ (সিজেডি)। এই রোগটি ধীরগতির হলেও সময়ের সাথে সাথে অবস্থার অবনতি হতে থাকতো। এ ধরনের ধীরগতির অবনতির পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? কোনো কোনো বিজ্ঞানী ভাবলেন হয়তো কোনো ‘ঢিলা ভাইরাস’ এর পেছনে দায়ী।

১৯৬৭ সালে ব্রিটিশ জৈবপদার্থবিদ জে.এস. গ্রিফিথ প্রস্তাব করলেন যে স্ক্র্যাপির পেছনে সম্ভবত প্রোটিন নির্মিত কোনোকিছু দায়ী। তবে সংক্রামক প্রতিনিধি হিসেবে প্রোটিন দায়ী এ মতামতটি সংশয়ের মুখে পড়ে। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মতটি উপেক্ষা করা হচ্ছিল। প্রোটিনরা যে সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে, বিশ বছর পর এই ধারণাটিকে পুনরিজ্জীবিত করেন আমেরিকান স্নায়ুবিদ এস.বি. প্রুশিনার ও সুইস অণুপ্রাণবিজ্ঞানী চার্লস উইসম্যান।

শেষ পর্যন্ত গত শতাব্দীর শেষ দিকে আর একবিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে বিশেষতঃ ম্যাড কাউ রোগের প্রাদুর্ভাবের সাথে সাথে প্রোটিন নির্মিত সংক্রামক কণার ধারণাটি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। অবশ্য কয়েকজন বিজ্ঞানী এখনো এ বিষয়টিতে সন্দেহমুক্ত নন। তবে সম্প্রতি প্রিয়নের সূক্ষ্মতর প্রকারভেদ করা গেছে। মানুষে প্রিয়ন-ভিত্তিক ব্যাধির সংক্রমণ অত্যন্ত দূর্লভ। শুধুমাত্র টিস্যুকলা প্রতিস্থাপন, শল্যচিকিৎসার

অস্ত্র বা দূষিত মাংস-পণ্য থেকে প্রিয়নের সংক্রমণ হয়। যেমন এখন মানুষে প্রিয়নের ব্যাধিকে সংক্রমণশীল হিসেবে ধরা হয় না। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে এ ব্যাধিকে ধরা হয় এমন শারিরীক বিপর্যয় হিসেবে যেখানে মস্তিষ্কের ভেতরে দলা তৈরি ও জমা হতে থাকে। এ প্রক্রিয়াটি অন্যান্য স্নায়ুক্ষয়ী রোগের অনুরূপ।

তবে অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানী মাইকেল আলপের্স ১৯৬০-র দশকে কুরু নামক স্নায়ুক্ষয়ী প্রিয়ন রোগের কথা উল্লেখ করেছিলেন। পাপুয়া নিউগিনির ফোর নৃজাতিগোষ্ঠীর উপর মাঠ পর্যায়ের গবেষণা থেকে তিনি এ রোগের কথা জানতে পারেন। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ করে অট্টাহাসি হাসা শুরু করতো। তাই ঐ জাতির মধ্যে এ রোগটি ‘অট্টহাসি রোগ’ নামে পরিচিত ছিল। কুরু শব্দটির আক্ষরিক অর্থই হলো ‘ঝাঁকানো’। পরবর্তীতে দেখা গেল আত্মীয়ের মৃত্যুর পর তার মাংস খাওয়া থেকে এ রোগটি ছড়ায়। ফোর নৃজাতিগোষ্ঠী সমাধিসংক্রান্ত অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে মৃতের মাংশ ও মগজ কাঁচা খাওয়া হতো।

এই মহামারীর শুরু হয়েছিল সম্ভবত ১৯০০-শতকের শুরুর দিকে যখন ঐ জনগোষ্ঠীর কোনো সদস্য CJD রোগের একটি ধরণে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে অবশ্য এখন এ রোগটি নেই। এ রোগে ২০০৫ সালে সর্বশেষ মৃত্যু হয়। বিস্ময়ের ব্যপার হলো পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে কিছু কিছু ব্যক্তি কুরু রোগে একেবারেই অপ্রভাবিত ছিল। তারা একধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছিল। দেখা গেল PrP V127 নামক PrP-র একটি ভিন্ন প্রকরণের কারণে এমনটা হচ্ছে। PrP V127 তে ১২৭ নম্বর অ্যমিনো এসিডে গ্লাইসিনের স্থলে ভ্যালিন স্থানান্তরিত হয়েছিল। ইঁদুরে জেনেটিক পরিবর্তন করে দেখা গেছে তাদের PrP V127 প্রিয়ন তৈরি হলে তা কুরু ও ধ্রুপদী CJD প্রিয়ন প্রতিরোধ করে। কিন্তু কীভাবে? PrP V127 রূপ বদলিয়ে PrP-র অনিষ্টকারী চেহারায় বদলায় না। ফলে এই প্রকরণ বহন করা ব্যক্তি স্নায়ুক্ষয় রোগে আক্রান্ত হয় না।

আরেকটি PrP প্রকরণের কথা জানা যায় যা বিক্ষিপ্ত CJD রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে মানুষকে রক্ষা করে। তবে এর কর্মকৌশল PrP V127 এর মতো নয়। বরং এটি প্রিয়ন উৎপাদন চলমান থাকা অবস্থায় প্রোটিন-প্রোটিন মিথষ্ক্রিয়া আটকে রাখে। কীভাবে PrP V127 প্রিয়নের রূপ-বদলানো প্রতিরোধ করে তা বুঝতে পারলে বিজ্ঞানীরা প্রিয়নের রোগতত্ব ও উৎপাদনের প্রাণ-রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি উপলদ্ধি করতে পারবেন। এছাড়াও ঔষুধ তৈরিতেও এটি অন্তর্দৃষ্টি দেবে। স্বজাতিভক্ষণ নিষিদ্ধ করে দেয়ার ফলে ফোর জনগোষ্ঠি চলমান কুরু মহামারী থেকে বেঁচে যায়। তবে PrP V127 প্রকরণের উপস্থিতি এটাই নির্দেশ করে যে সময়ের সাথে সাথে কুরু-প্রতিরোধি ব্যক্তির সংখ্যা বাড়তে থাকতো। এটা মহামারীর পাল্টা জবাব হিসেবে প্রাকৃতিক বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার মধ্যমেই হতো। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকৃতির নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে।

তথ্যসূত্র

  • এক্সপ্যাসি প্রোটিন স্পটলাইটের ১৭৯ ইস্যু The shape of harm-র অনুবাদ। লেখকঃ ভিভিয়েন বেইলি গ্যারিস্টেন।
  • org/spotlight/back_issues/179/