নিমগ্নতা, কাজ ও খেলা

বিজ্ঞানী সত্যেনন্দ্রনাথ বসুর কথা বলা যাক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় তার মেয়ে একবার সিনেমা দেখার বায়না ধরেন। সে সময় তিনি জটিল একটি গাণিতিক সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এদিকে মেয়ে নাছোড়বান্দা। শেষে মেয়ের জেদের কাছে হার মেনে ঘোড়ার গাড়িতে করে মেয়েকে নিয়ে গেলেন মুকুল সিনেমা হলে। সেখানে পৌঁছে দেখেন তিনি বাসায় টাকা ফেলে এসেছেন। মেয়েকে সেখানে রেখে গাড়োয়ানকে নিয়ে বাসায় ফিরলেন টাকা নিতে।

বাসায় পৌঁছে টাকা নেয়ার সময় টেবিলে দেখেন অসমাপ্ত গাণিতিক সমস্যাটা পড়ে আছে। তখন তিনি মেয়ের কথা ভুলে সেখানেই বসে পড়েন সমস্যা সমাধানে। এদিকে গাড়োয়ান যখন দেখলেন অনেকক্ষণ সময় পার হয়েছে তখন আর অপেক্ষা না করে বাড়িতে ঢুকে পড়লেন। ঢুকে দেখেন, সত্যেন বসু টেবিল-চেয়ারে নিমগ্নভাবে অঙ্ক কষে চলছেন। গাড়োয়ান সত্যেন বসুকে মেয়ের কথা মনে করিয়ে দিলে তিনি সম্বিত ফিরে পান।[১]

সত্যেন বসু

এরকম অনেক গল্প আমরা শুনেছি। যেমন আইনস্টাইন হোটেলের ঠিকানা হারিয়ে ফেলেন। আর্কিমিডিস গোসল করতে নেমে স্বর্ণ-খাদের সমস্যা সমাধান খুঁজে পেয়ে দিগম্বর অবস্থায় রাস্তায় বের হয়ে পড়েন “ইউরেকা! ইউরেকা!” চিৎকার করতে করতে।

এ ধরনের মুখরোচক গল্পগুলো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এর কারণ হলো আমরা বিজ্ঞানীদের আত্মভোলা মানুষ হিসেবে ভাবতে পছন্দ করি। তবে বিজ্ঞানীদের এভাবে চিহ্নিত করায় একটা সমস্যা রয়েছে। তারা আসলে আত্মভোলা নন। অনেক সময় বিজ্ঞানীরা গভীর সমস্যা সমাধানে এতোটাই নিমজ্জিত হয়ে যান যে অন্য কোনো কিছুর কথা তাদের মনেই থাকে না। এটাকেই মনস্তত্বে নিমগ্ন-দশা বা flow বলা হয়।

মনোযোগ দেয়ার প্রক্রিয়া

নিমগ্ন দশার কিছু বৈশিষ্ট্য আমাদের চেনা। প্রথমত নিমগ্নতা হলো কোনো কাজে গভীর মনোযোগ দেবার ফলে উৎপন্ন একটি পরিস্থিতি। দ্বিতীয়ত, ঐ কাজটি চ্যালেঞ্জিং। তৃতীয়ত, কাজটির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা প্রয়োজন।

আমরা যখন কোনো বিষয়ে মনোযোগ দেই তখন মস্তিষ্কে কী ঘটে সে প্রক্রিয়া সম্বন্ধে জানা যাক। যখন আমরা ঠিক করি কোনো বিষয়ে মনোযোগ দেব, তখন মস্তিষ্কের মনোযোগ-ব্যবস্থাটি দুটি ধাপে কাজ করে।[২] ধাপ দুটি হলো ইন্দ্রিয়প্রাপ্ত তথ্য বাছাই করে সেখানকার অর্থ উদ্ধার করা। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে-

১) কোনো দৃশ্যপটে যত তথ্য আছে তা চোখের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। তথ্যগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে খুঁজতে হয় কী বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। প্রক্রিয়াটিকে কোনো ঝাপসা ছবির সাথে তুলনা করা যায় যা ধীরে ধীরে পরিস্কার হওয়া শুরু করছে।

চিত্রঃ একটি রাস্তার দৃশ্যপট। ছবিঃ লাইফহ্যাকার।

২) দ্বিতীয় ধাপটি হলো প্রাপ্ত তথ্যগুলোর একটিমাত্র অংশে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা। প্রক্রিয়াটি তুলনা করুন প্রথম ধাপে দেয়া ছবির উদাহরণের সাথে। ঝাপসা ছবিটি পরিস্কার হবার সময় মস্তিষ্ক এর একটি অংশে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে অংশটি বিবর্ধিত করতে থাকে। ছবিটির বাকি অংশের তুলনায় ঐ অংশটি অধিক স্বচ্ছ ও বিস্তৃত থাকে।

মনোযোগ প্রক্রিয়াটি ঐচ্ছিক হোক, কিংবা স্বয়ংস্ক্রিয় হোক, উভয় ক্ষেত্রে দুই ধাপে সম্পন্ন হয়। আপনি যখন কোনো বিষয়ের উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন তখন চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে আপনার চেতনা বদলে যায়। এসময় চারপাশের ঘটনাগুলো অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা বেড়ে যায়।

কিন্তু মনোযোগ ভেঙে যাবার ব্যপারটি কীরকম? মনোযোগ ভেঙে যাবার প্রক্রিয়াও মনোযোগ দেয়ার সাথে যুক্ত। মনোযোগ ভাঙার মূলে রয়েছে একটি প্রাচীন বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া। অতর্কিত বিপদে মানুষকে সচেতন করে আত্মরক্ষা করার জন্য এর উৎপত্তি। কোনো কাজে সক্রিয়ভাবে মনোযোগ দিতে সময় ও শ্রম দিতে হয়। অন্যদিকে মনোযোগ ভাঙার প্রক্রিয়াটি মানুষের স্বভাবজাত।

হঠাৎ উজ্জ্বল রঙ বা আলো এবং জোড়ালো শব্দ মনোযোগ ভাঙার জন্য মূল ভূমিকা রাখে। সুদূর অতীতে বুনো জন্তুর গোঙানী বা গাছের ফাঁকে হলুদ রঙের ঝিলিক শিকারী-সংগ্রাহক মানুষকে সতর্ক করে তুলতো। এখনো অ্যাম্বুলেন্স তীক্ষ্ম শব্দ ও লাল-নীল আলোর মাধ্যমে আমাদের সতর্ক করে দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, একবার কোনো কারণে মনোযোগ ভেঙে গেলে তা আবার কেন্দ্রীভূত হতে ২৫ মিনিটের মতো সময় লাগতে পারে।[৩] অর্থাৎ মনোযোগ দেয়াটা একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। সুতরাং কোনো কাজে মনোযোগ দিতে চাইলে বুদ্ধিমানের কাজ হবে মনোযোগ ভাঙতে পারে এমন জিনিস দূরে রাখা।

যেমন মুঠোফোন বন্ধ বা নীরব করে রাখা। ইন্টারনেট প্রয়োজন না হলে বন্ধ করে রাখা। এমন কোনো জায়গায় কাজ করা যেখানে অন্য কেউ বিরক্ত করার সম্ভাবনা কম। এছাড়া যে টেবিলে কাজ করা হবে সেখানে কাজের জিনিস (বই-পত্র ইত্যাদি) ছাড়া অন্যান্য জিনিসপত্র দূরে সরিয়ে রাখা।

নিমগ্ন দশা এক ধরনের অতি-মনোযোগের ফলে সৃষ্ট অবস্থা। এ সময় আমরা নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলে যাই, সময়জ্ঞান থাকে না। একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে পড়ে হাতের কাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা। কাজ করতে তখন অন্যরকম আনন্দ ও উদ্দীপনা পাওয়া যায়।

তবে শুধু মনোযোগী হলেই হবে না। এ দশায় প্রবেশ করতে হলে কঠিন কাজের চ্যলেঞ্জের পাশাপাশি সে কাজ সম্পাদনের জন্য দরকারী দক্ষতাও থাকতে হবে। নিমগ্ন দশার সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো এ সময় কাজকে আর অপ্রিয় মনে হয় না। এ দশাতে কাজ হয়ে যায় উত্তেজনাকর খেলা।

কাজ যখন খেলা

আমরা জীবনে অধিকাংশ কাজ করে থাকি দ্বিতীয় কোনো কাজের উদ্দেশ্যে। আমরা পেশাগত জীবনে যেসব কাজ করি তার প্রধান উদ্দেশ্য থাকে অর্থ উপার্জন। উপার্জিত অর্থ ব্যয় করি নিজের এবং পরিবারের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে। নতুন নতুন প্রয়োজন মেটাতে পুনরায় অর্থ উপার্জনের দরকার হয়। তাই জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করতেই হয়। চক্রটি পুনরায় একইভাবে ঘুরতে থাকে।

শিক্ষার্থীরা অবশ্য সরাসরি জীবিকা নির্বাহের সাথে জড়িত নয়। তবে তাদের লেখাপড়ার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যও হলো শিক্ষা শেষে জীবিকা খুঁজে নেয়া। অর্থাৎ আমরা অধিকাংশ সময়েই শুধুমাত্র হাতের কাজটি ‘করা’র খাতিরেই কাজ করি না। কাজ করার পেছনে অন্য দ্বিতীয় একটি উদ্দেশ্য থাকে। এ দ্বিতীয় উদ্দেশ্য আবার তৃতীয় কোনো প্রয়োজন মেটায়। এভাবে একটি কাজের উদ্দেশ্যের সাথে অন্যটির প্রয়োজন যুক্ত থাকে।[৪]

এর ব্যতিক্রম হলো খেলা। ছোটবেলায় যখন আমরা খেলতাম, তখন খেলার পেছনে দ্বিতীয় কোনো উদ্দেশ্য থাকতো না। খেলায় প্রতিটি ধাপ, প্রতিটি পদক্ষেপ ও গতিবিধি শুধুমাত্র ঐ মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার আনন্দ নেয়ার জন্য সম্পাদিত হতো। ছোটরা খেলার মধ্যে একেবারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে ‘খেলা’। খেলার প্রতিটি মুহুর্তে নিঙরে নিঙরে তারা উত্তেজনার আনন্দ লাভ করে।

সেই ছোট্ট আমরা বড় হবার জীবনব্যাপী খেলাটি খেলতে গিয়ে খেলার আনন্দের কথা ভুলে যাই। আমাদের কাজের উদ্দেশ্য হয়ে পড়ে দ্বিতীয় একটি প্রয়োজন সাধন। এই চক্রটি এভাবে চলতেই থাকে।

চিত্রঃ শিশুদের খেলায় দ্বিতীয় কোনো উদ্দেশ্য থাকে না।

তবে যখন কোনো দুরূহ কাজ করার দক্ষতা আমাদের থাকে, কাজটাও হয় চ্যালেঞ্জিং ও তাৎপর্যপূর্ণ। তখন আমরা নিজেদের মধ্যে flow অনুভব করি। তখন ঐ কাজে আমরা নিমজ্জিত হয়ে যাই। লাভ করি নিমগ্নতার সুখ। তখন কাজ হয়ে পড়ে খেলা। তখন কাজটা যত কঠিনই হোক না কেন আমরা কোনো ক্লান্তি অনুভব করি না।

নিমগ্নতা একটা চমৎকার অভিজ্ঞতা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো এই দশায় ইচ্ছে হলেই প্রবেশ করা যায় না। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছতে হলে নতুন নতুন কাজ করার দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। কিংবা এমন কোনো দুরূহ কাজ হাতে নেয়া যায়, যা চ্যলেঞ্জিং হলেও সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা কারো রয়েছে। অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির পেছনে না ছুটে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা জীবনে আনন্দময় সুখ লাভের নিশ্চিত উপায় হতে পারে।

নিমগ্নতা আমাদের দ্বিতীয় শৈশবে ফিরিয়ে নিতে পারে।

তথ্যসূত্র

[১] ছোটদের বিজ্ঞান-মনীষাঃ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, সাদ আব্দুল ওয়ালী, http://e-learningbd.com/

[২] Train Your Brain for Monk-Like Focus, Thorin Klosowski, http://lifehacker.com/

[৩] Meet the Life Hackers, Clive Thompson, http://www.nytimes.com/

[৪] Tennis with Plato, Mark Rowlands, https://aeon.co

featured image: blog.bufferapp.com

লাইফ-স্ট্র

বর্তমান বিশ্বের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ মানুষ বিশুদ্ধ পানির অভাবে ভোগছে। water.org সংস্থার তথ্য-উপাত্ত মতে, প্রতি বছর প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ বিশুদ্ধ পানি, অপুষ্টি ও যথোপযুক্ত বর্জ্য-ব্যবস্থাপনার অভাবে মৃত্যুবরণ করছে। দৈনিক প্রায় ৬ হাজার শিশু অকালেই মারা যাচ্ছে। বিশুদ্ধ পানি এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোসহ অন্যান্য দেশের মানুষের অন্যতম প্রধান সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের একটি প্রচেষ্টা হচ্ছে ‘লাইফ স্ট্র’।

এটি একটি শক্তিশালী ফিল্টার যা দিয়ে অতি সহজে পানি পরিশুদ্ধ করা যায়। নলাকার এ টিউবটি লম্বায় ২৫ সে.মি. এবং ব্যাসার্ধে ২৯ মি.মি.। এর এক প্রান্ত পানিতে প্রবেশ করিয়ে অপর প্রান্ত দিয়ে সেই পানি মুখ অথবা কোনো ভ্যাকুয়াম দিয়ে টানা হয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এটি পানিকে কেবল ময়লা-আবর্জনামুক্তই করে না, সেই সাথে পানিবাহিত বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া স্যালমোনেলা, শিজেলা, এন্টারোকক্কাস এবং স্টেফাইলোকক্কাসের হাত থেকেও রক্ষা করে।

লাইফ-স্ট্রকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন এর কোনো অংশ কিছুদিন পরপর পরিবর্তন না করতে হয়। সব অংশগুলো দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ। বিদ্যুত ছাড়াই এটিকে সহজে ব্যবহার করা যায়। মূল পরিকল্পনাকারী ভেস্টারগার্ড ফ্রান্ডসেনের মতে, এমনকি ছোট শিশুরাও ফিডারের মতো করে এর থেকে চুষে পানি পান করতে পারবে।

কার্যপ্রণালী

(১) প্রান্ত পানিতে ডুবিয়ে (৪) প্রান্ত দিয়ে টান দেওয়া হয়। (৪) প্রান্তে রয়েছে পলিয়েস্টারের সূক্ষ্ম জালিকা যার ছিদ্রপথ ১০০ মাইক্রন। পরবর্তীতে পানি পলিএস্টারের দ্বিতীয় জালক দিয়ে প্রবেশ করে যার ছিদ্রপথ ১৫ মাইক্রন। এরপর পানি নলাকৃতির ফাঁপা ফাইবারগুলোতে (২) প্রবেশ করে। পানি এর ভিতর দিয়ে উপরে যাওয়ার সময় পাশে অবস্থিত ০.২ মাইক্রন সরু ছিদ্র পথে (৩) পরিষ্কার পানি বের হয়ে আসে।

সবগুলো ফাইবার থেকে বের হওয়া পানিই উপরে (১) প্রান্ত দিয়ে মানুষের মুখে প্রবেশ করে। আর কাদা, ময়লা-আবর্জনা, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ফাইবারগুলোতে আটকা পড়ে যায়। পানি পান করার পর কেবল ফুঁ দিলেই এটি পুনরায় ব্যবহার উপযোগী হয়ে যায়।

লাইফ-স্ট্রর জীবনকাল ১ হাজার লিটার, যা একজন মানুষের সারা বছরের পানির চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এটি কেবল বিশুদ্ধ পানিরই ব্যবস্থা করেনি, পাশাপাশি কলেরা, ডায়রিয়া এবং ডিপথেরিয়ার হাত থেকেও মানুষকে রক্ষা করছে। এটি সহজলভ্য হওয়ায় এবং বিশুদ্ধ সুপেয় পানির সুযোগ সৃষ্টি করার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

featured image: groupon.com

তিন পিতা-মাতার ডিএনএ বহনকারী শিশু

আমরা জানি সন্তানের পঞ্চাশ ভাগ ডিএনএ আসে মায়ের কাছ থেকে ও বাকি পঞ্চাশ ভাগ পিতার কাছ থেকে। কিন্তু নব জন্ম নেয়া এই শিশুটির ক্ষেত্রে তিনজন “পিতামাতার” ডিএনএ আছে।

গতবছর ব্রিটেনে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এই প্রক্রিয়া- যার ফলে কোনো শিশুর মায়ের মাইটোক্রন্ডিয়া (কোষের শক্তি-কেন্দ্র) ডিএনএ’তে গুরুতর মিউটেনশন থাকলে অন্য মহিলার মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ নিয়ে নিষিক্ত কোষের সৃষ্টি করা হয়- অর্থাৎ মূল বাবা-মায়ের ডিএনএ’র সাথে অন্য মহিলার মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ যুক্ত করা হয়। উল্লেখ্য সন্তানরা মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ পায় শুধুমাত্র মায়ের কাছ থেকে।

নবজাত শিশুর মাথায় নরম অংশটি কেন থাকে?

সকল নবজাত শিশুর ক্ষেত্রেই দেখা যায় এদের মাথার খুলির উপরে একটি অংশ নরম, শুধু চামড়া দ্বারা আবৃত, কোনো অস্থি নেই। শিশুদের মাথায় অস্থিবিহীন, ঝিল্লী দ্বারা আবৃত নরম এই অংশকে বলে ফন্টান্যাল (Fontanelle)

ঘুমন্ত শিশুর মাথায় ফন্টান্যাল; image source: en.wikipedia.org

নবজাতক শিশুদের মাথায় জন্মের সময় সকল অস্থি পূর্ণ গঠিত অবস্থায় থাকে না। জন্মের পরে ধীরে ধীরে সে অস্থিগুলো বৃদ্ধি লাভ করে। যেসকল স্থানে অস্থি সম্পূর্ণরূপে গঠিত হয় না সে সকল স্থানই ফন্টান্যাল নামে পরিচিত। এমন ফন্টান্যাল নবজাত শিশুর মাথায় প্রায় ৬টি থাকে। এর মাঝে প্রধান দুটি হলো-

১. সম্মুখ ফন্টান্যালঃ মাথার সামনে ফ্রন্টাল ও দুটি প্যারাইটাল অস্থির মিলিত হওয়ার স্থানে থাকে । এটি শিশুর ১-৩ বছর বয়সের মাঝে অস্থি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। তাই বয়স বৃদ্ধির পর শিশুর দেহে এই নরম জায়গা আর দেখা যায়না।

২. পশ্চাৎ ফন্টান্যালঃ মাথার পেছনে প্যারাইটাল অস্থি ও অক্সিপিটাল অস্থির মিলিত হওয়ার স্থানে থাকে। এটি শিশুর ৬ মাস বয়সের মাঝে অস্থি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।

সম্মুখ ও পশ্চাৎ ফন্টান্যাল; image source: en.wikipedia.org

শিশুদেহে এই ফন্টান্যালগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জন্মের সময় এতো সরু নালী দিয়ে শিশুর মাথা বের হয়ে আসা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ফন্টান্যালগুলোর স্থানে শিশুর মাথার অস্থি একটার সাথে আরেকটা উপরিপাতিত হয়। ফলে শিশুর মাথা স্বাভাবিক থেকে ছোট আকার লাভ করে এবং মায়ের প্রসব কষ্ট অনেকটা হ্রাস পায়।

অন্যদিকে নবজাত শিশুর মস্তিষ্ক প্রাপ্তবয়ষ্ক মস্তিষ্কের প্রায় ২৫ ভাগ হয়, যা এক বছরে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৫০ ভাগ। মস্তিষ্কের এই বৃদ্ধি  প্রায় ২০ বছর বয়স পর্যন্ত চলে। ফন্টান্যাল না থাকলে জন্মের পর মস্তিষ্কের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হত। ফন্টান্যাল থাকায়, এগুলো অস্থি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার আগ পর্যন্ত শিশুর মস্তিষ্কে স্বাভাবিক বৃদ্ধি চলতে থাকে।

Feature image: heylittleyou.co.uk

জিকা ভাইরাসঃ পৃথিবীবাসীর নতুন আতঙ্ক

মানুষ আর প্রকৃতি এক অটুট বন্ধনে আবদ্ধ। প্রকৃতি সর্বদাই মানুষের জীবনকে প্রাণপ্রাচুর্যে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। মানুষের উপর প্রকৃতির ঋণাত্মক প্রভাবও হয় খুব ভয়ংকর। প্লেগ, কলেরা, বসন্তের মতো দুর্যোগগুলো মানব সম্প্রদায়কে যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন করেছিল, জিকা ভাইরাস যেন তার স্মৃতি মনে করিয়ে দিতেই নতুন এক আতংকের নাম হিসেবে পদার্পণ করেছে পৃথিবীর বুকে।

জিকা ভাইরাস কী?

জিকা ইনফেকশন রোগটি আমাদের অতি পরিচিত ডেঙ্গু রোগের মতো। এটি ছড়ায়ও এডিস মশার মাধ্যমেই। আজকাল এ রোগের কথা সংবাদমাধ্যমে, টিভি মিডিয়ায় প্রচুর পরিমাণে শোনা গেলেও এমন কিন্তু না যে এ রোগের উৎপত্তি হয়েছে অল্প কয়েকদিন হলো। ১৯৪৭ সালে উগান্ডার জিকা ফরেস্টে এ রোগ সর্বপ্রথম রেসাস বানরের মধ্যে থেকে মশাদের শরীরে ছড়ায়।

সর্বপ্রথম এ রোগে আক্রান্ত মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৪৮ সালে নাইজেরিয়ায়। আফ্রিকায় এ রোগ কিছু কিছু সময় দেখতে পাওয়া গেলেও পশ্চিমা বিশ্বে এর প্রাদুর্ভাব শুরু হয় গত মে মাস থেকে। এখন পর্যন্ত এ ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে কোনো সুদূরপ্রসারী ক্ষতির চিহ্ন নিয়ে আসেনি। কিন্তু গর্ভবতী মহিলাদের জন্য এ রোগ মহামারীর থেকেও বেশি ভয়ানক। কেন? সেই কথায় আসছি কিছুক্ষণ পরেই।

জিকা ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়?

জিকা ভাইরাস ছড়ায় মূলত মশার মাধ্যমে। তবে সব ধরনের মশা নয়, শুধু এডিস গণের (genus) মশাই এ রোগের জন্য দায়ী। এ মশা যেমন একটি বড়সড় পুলের মধ্যে বিস্তার লাভ করতে পারে, ঠিক তেমনি একটি বোতলের মুখের মধ্যে রাখা পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে।

এডিস মশা সাধারণত দিনে কামড়ায়। এদের গোত্রের সবচেয়ে ভয়াবহ সদস্য হলো এডিস এজিপ্টি যারা জিকা রোগের প্রধান বাহক। এদের বিচরণ আমেরিকায় শুধুমাত্র ফ্লোরিডা, গালফ কোস্ট আর হাওয়াই-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে খুব গরমের সময় এদের ওয়াশিংটনেও দেখা যায়। এশিয়ার টাইগার মশা এডিস এল্বোপিকটাসও এ রোগ ছড়ায়, কিন্তু পরিসরে এজিপ্টির থেকে কম।

এসব মশা যখন কোনো আক্রান্ত মানুষকে কামড়ায়, তখন রোগীর কাছ থেকে মশা জিকা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। পরবর্তীতে সংক্রমিত মশা সুস্থ মানুষকে কামড়ালে সে আবার জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যায়। জিকা ভাইরাস এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সবার মনে কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। চলুন এ প্রশ্নের জটগুলো খোলার চেষ্টা করে দেখি।

১. জিকা ভাইরাস কি মায়ের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে ছড়ায়?

এখন পর্যন্ত এক কথায় উত্তর হলো, হ্যাঁ! সন্তান প্রসবের পূর্ব মুহূর্তে মায়ের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে এ রোগ প্রবেশ করতে পারে। মাইক্রোফেলি নামক ভয়ংকর ধরনের এক জন্মগত ত্রুটি নিয়ে অনেক শিশু জন্ম নেয়ার রিপোর্ট পাওয়া গেছে সম্প্রতি। এ রোগাক্রান্ত শিশুদের মাথা অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় ছোট আর এ সমস্ত শিশুদের মায়েরা গর্ভকালীন সময়ে জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন।

মাইক্রোফেলি রোগে যেসব শিশুরা আক্রান্ত হয় এদের মধ্যে সৌভাগ্যবান ১৫% থাকে যাদের শুধু মাথাটাই ছোট হয়, কিন্তু অভাগা বাকি ৮৫% শিশুর মস্তিষ্কের উপর মাইক্রোফেলি ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে এদের বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না এবং এরা বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী হয়। জিকা ভাইরাস আর অদ্ভুত এ সমস্যার একদম ঠিকঠিক যোগসূত্রটা যে কোথায় তা এখনো আবিষ্কৃত না হলেও বিশেষজ্ঞগণ গর্ভবতী মায়েদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেছেন।

ব্রাজিলে এ রোগে আক্রান্ত প্রায় ৪,০০০ শিশুর রিপোর্ট পাওয়া গেছে এবং এর মধ্যে ৩৮ জন মারা গেছে। এমনকি ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, এল সালভাদরে আপাতত সন্তান ধারণ না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

২. রক্ত বা শুক্রাণু কি জিকা ভাইরাস বহন করে?

সম্প্রতি মানুষের রক্ত আর শুক্রাণুতেও এর উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। রক্ত নেয়া বা শারীরিক সম্পর্কের ফলে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে এমন রোগীর রিপোর্ট পাওয়া গেলেও সংখ্যায় তা অতি নগণ্য। আবার ভেবে দেখুন, যদি রক্তের মাধ্যমে রোগ আসলেই ছড়াত তাহলে রোগীকে কামড়ালে যেকোনো ধরনের মশাই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে যেতো। এমনটি কিন্তু হচ্ছে না। তাই আপাতত সঠিকভাবে এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া না গেলেও সাবধানতা অবলম্বন করতে তো মানা নেই।

. জিকা ভাইরাস কি জিবিএস এর জন্ম দেয়?

জিবিএস (Guillain–Barré Syndrome) নামের এক বিশেষ ধরনের রোগ আছে যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শরীরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়। তখন এরা রোগজীবাণু ধ্বংস করা বাদ দিয়ে স্নায়ুকোষগুলোকে ধ্বংস করা শুরু করে। এর ফলে মাংসপেশির দুর্বলতা, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্যারালাইসিসও দেখা যায়। সাধারণত এর প্রভাব কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত থাকে। তবে অল্প কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মানুষ এর প্রভাব সারাজীবন বয়ে নিয়ে বেড়ায়, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

আসলে জিকা কিংবা অন্য কোনো ভাইরাস এ রোগের উৎপত্তি ঘটায় কিনা তা এখনও বলা সম্ভব হয়নি। তবে জিকা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাড়ার সাথে সাথে ব্রাজিলে জিবিএসও তীব্র আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই গবেষকরা মাথা চুলকাতে বসে গেছেন- আসলেই কি জিকা ভাইরাস টেনে আনছে জিবিএস এর মতো মারাত্মক রোগকেও?

জিকা ভাইরাসে আক্রান্তের লক্ষ্মণ

জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রতি পাঁচ জনের একজন মানুষের মধ্যে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায়। কিছু সাধারণ লক্ষণের মধ্যে আছে জ্বর, শরীরে র‍্যাশের সৃষ্টি, হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথার অনুভূতি, চোখ ওঠা ইত্যাদি। এছাড়াও এ সময় মাথা ব্যথা আর মাংসপেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হবার সাথে সাথেই কিন্তু এসব উপসর্গ দেখা যায় না, বেশ কয়েক দিন বা সপ্তাহ পর রোগীর মধ্যে এ লক্ষণগুলো দেখা যেতে থাকে।

জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে অসুস্থতা বড়জোর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। হাসপাতালে যাবার মতো অবস্থাও কিন্তু তৈরি হয় না। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পরিমাণ খুবই নগণ্য। আপনার অসুস্থতা কমে গেলেও রক্তের মধ্যে এ ভাইরাস কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত তার উপস্থিতি জানান দিতে পারে। র‍্যাশ ওঠার কারণে অনেকেই এ অসুখটিকে ডেঙ্গু বা হামের সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারে। তাই সঠিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় অত্যন্ত জরুরী।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার

জিকা ভাইরাস আপাতদৃষ্টিতে খুব ভয়ংকর না হলেও এর ক্ষতিকর দিক কিন্তু অনেক। এখন পর্যন্ত এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক তৈরি হয়নি। কিন্তু তাই বলে আমরা তো আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। যেহেতু এডিস মশা যেকোনো জায়গায় জমে থাকা পানিতে জন্ম নেয়, তাই আশেপাশের কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল করতে হবে। এরা দিনের বেলাতেই আপনাকে আক্রমণ করবে। তাই দিনের বেলা ঘুমালেও মশারী টানাতে ভুলবেন না।

খেয়াল রাখবেন যে, কোনো মশা যেন আপনাকে না কামড়ায়। জানালার চারিদিকে আলাদা করে এমন জালিকা স্থাপন করতে পারেন যাতে মশা ঘরে না ঢুকতে পারে। যেকোনো রোগে আক্রান্ত হবার আগেই সবথেকে ভালো উপায় হলো নিজেকে সতর্ক রাখা। এলাকার মানুষজন মিলে কিছুদিন পরপর বিভিন্ন কীটনাশক দূরীকরণের স্প্রে প্রয়োগ একটি ভালো উদ্যোগ। তবে ঝুঁকি আছে এমন এলাকায় যদি আপনি ভ্রমণ করতে চান তাহলে অবশ্যই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করুন।

জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধক

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধক আমাদের হাতের নাগালে আসতে আসতে পার হয়ে যাবে আরও প্রায় দেড় বছর। প্রায় ১৫টি প্রতিষ্ঠান এ দৌড়ে সামিল হয়ে থাকলেও তাদের কাজ একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে। জেনেভার এক সম্মেলনে এ সংস্থার মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্রে খুব শীঘ্রই এর পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হলেও তা পুরোপুরি স্বীকৃত হয়ে মানুষের নাগালে পৌঁছাতে অপেক্ষা করতে হবে আরও অনেকটা সময়।

বাংলাদেশ এবং জিকা ভাইরাসঃ আমরা কি হুমকির মুখে?

জিকা ভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। বাংলাদেশে কি এই রোগে আক্রান্ত হবার কোনো সম্ভাবনা আছে? চিন্তার বিষয়। প্রতিষেধকবিহীন এ রোগ খুব দ্রুত বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই আমরা যে একেবারে হুমকির সম্মুখে না, তা বলা যায় না।

তবে আশার কথা এই যে, দক্ষিণ এশিয়াতে এখন পর্যন্ত জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তাই আশা করা যায় আমাদের সেই খারাপ দিন দেখার সম্ভাবনা খুব কম, যেখানে ফুটফুটে একটি শিশুকে অপরিণত মস্তিষ্ক আর ছোট্ট একটি মাথা নিয়ে চলাচল করতে দেখতে হবে।

জিকা ভাইরাসের গোপন নথি!

এতক্ষণ যা বললাম তা নিত্যদিনের খবর হয়ে গেছে। কিন্তু আপনার আমার জানার বাইরেও কিছু খবর আছে, যা হয়তো ইচ্ছে করেই রাখা হচ্ছে সবার অগোচরে। বিল গেটস-মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের নাম নিশ্চয় সবাই শুনেছেন। এ ফাউন্ডেশনের ব্রিটিশ বায়োটেক কোম্পানি ডেঙ্গু মশার প্রাদুর্ভাব থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য বিশেষ ধরনের জেনেটিকালি ইঞ্জিনিয়ার্ড এক ধরনের মশার উদ্ভাবন করে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বিশেষ ধরনের মশাই আসলে জিকা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী।

হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। যে ভাইরাস মানুষের জীবনে আতংক বয়ে নিয়ে এসেছে, যে রোগ নিয়ে নিত্যদিন মিডিয়া এত বিপুল পরিমাণে মেতে উঠেছে তা প্রাকৃতিক কোনো রোগ নয়! ২০১১ সাল থেকে অক্সিটেক নামের এ কোম্পানি ব্রাজিলের গহীন অরণ্যে এ মশার বংশবিস্তার করে চলেছে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য। এক সপ্তাহে তারা প্রায় দুই মিলিয়ন মশা উৎপাদন করে ব্রাজিলের ক্যম্পিনাসে অবস্থিত ফ্যাক্টরিতে।

আরেকটি রহস্যময় তথ্য জেনে নিন। ২০১৫ সাল থেকে ব্রাজিল সরকার গর্ভবতী মায়েদের একটি নতুন ভ্যাক্সিন নেয়া অত্যাবশ্যক করেন। টিডিএপি নামক এ ভ্যাক্সিনের সঠিকভাবে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই হঠাৎ এভাবে আবশ্যকীয় করে দেয়া আর ঠিক একই সময়ে এরকম অদ্ভুত শিশু জন্মের হার হুহু করে বেড়ে যাওয়াটা আসলে কাকতালীয় ঘটনা থেকে একটু বেশি কিছুই বলে মনে হয়।

এ ভ্যাক্সিনের উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে একটু খোঁজ নিতে শুরু করলেই একটি নাম আবার সামনে পেয়ে যাবেন- বিল গেটস-মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। এমনকি এ ভ্যাক্সিন লাইসেন্সড হবার আগে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে অর্থাৎ গর্ভবতী মায়ের শরীরে গিয়ে আসলেই কাজ করে কিনা সেই ব্যাপারে পরীক্ষা করার কোনো নথিপত্রও পাওয়া যায়নি।

একটু যদি অন্যভাবে ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে দেখি তাহলে কি এটাই মনে হয় না, জন্মগত এ ত্রুটি আর জিকা ভাইরাসকে একই সময়ে সামনে আনা হয়েছে? ব্রাজিলই বা কেন আমেরিকা থেকে এমন একটি ভ্যাক্সিন কিনে তার দেশে অত্যাবশ্যক করে দিলো যার কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষার ইতিহাস নেই? নাকি এজন্য তারা উপযুক্ত পরিমাণে পকেট গরম করার সুযোগ পেয়েছে?

এখন আবার আমেরিকা জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধকের পেছনে ছুটছে। চেষ্টা করে দেখুন তো এমনই কোনো ঘটনার কথা স্মৃতিতে আসে কি না? হ্যাঁ, একইভাবে মিডিয়া ইবোলা ভাইরাস নিয়েও মানুষের মনে আতংক সৃষ্টি করেছিল।

যেমনটি আগেই বলেছি অনেক দেশে গর্ভধারণ এরই মধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে আসলেই বিল গেটস এর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এজেন্ডা বাস্তবায়িত হচ্ছে। সম্প্রতি মাত্র একজন মানুষের শুক্রাণুতে এ ভাইরাসের উপস্থিতি টের পাওয়ার সাথে সাথেই একে শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ানো রোগের কাতারে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে মানব মনে শারীরিক সম্পর্ক এবং সন্তান ধারণের প্রতি আতঙ্কের সৃষ্টি হচ্ছে। ২০০৩ সাল থেকেই বিল গেটস জোরপূর্বক ভ্যক্সিনাইজেশন করে জন্মনিয়ন্ত্রণের সপক্ষে কথা বলেছেন।

তবে এ রহস্যের কূলকিনারা এতো সহজে সম্ভব নয়। বিশ্বের বড় বড় ব্যক্তিত্বের বিপক্ষে বা সপক্ষে কথা বলার মানুষের অভাব কখনোই ছিল না। তাই আমরা শুধু আপনাদের চলতি বিশ্বের পরিস্থিতির কাছাকাছিই নিয়ে যেতে পারি। সত্য-মিথ্যা জানার জন্য আমাদের হয়ত অপেক্ষা করতে হবে আরও বেশ কিছু সময়।

কিন্তু উন্নত বিশ্বের অনেক ঘটনার সুরাহা যে আমাদের কান পর্যন্ত আসে না, এ নতুন কিছু নয়। তাই আপাতত এসব কোন্দলে না পড়ে আমরা নিজেদের ও নিজ নিজ সন্তানদের নিরাপত্তা প্রদানের দিকেই বেশি মনোযোগী হওয়া উচিৎ। আশা করি বিশ্বে বিরাজমান এ জিকা ভাইরাস আতঙ্ক আমাদের দ্বারপ্রান্তে এসে কখনোই হানা দেবে না।

featured image: blog.muipr.com