স্বপ্নে পাওয়া রাসায়নিক সংকেত

রসায়ন পড়েছে আর বেনজিন চক্রের নাম শোনেনি এমন ব্যক্তি কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। জার্মান বিজ্ঞানী অগাস্ট কেকুল দীর্ঘদিন বেনজিন নিয়ে কাজ করেছেন। এর রাসায়নিক সংকেতও জানা হয়ে গেছে ততদিনে। কিন্তু এর গাঠনিক সংকেত বের করতে পারছিলেন কেউই। এক্স-রে ক্রিস্ট্রালোগ্রাফি কিংবা আইআর বর্ণালী বিশ্লেষণ করে গাঠনিক সংকেত নিরূপণের পন্থা তখনো বের হয়নি।

দীর্ঘদিনের জল্পনা শেষে বিজ্ঞানী অগাস্ট কেকুল ১৮৬৫ সালে বেনজিন নিয়ে তার গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন নামক একটি বৈজ্ঞানিক জার্নালে। এখান থেকেই প্রথম জানা যায় বেনজিনের গাঠনিক সংকেত চক্রাকার। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো কেকুল বেনজিনের এই চক্রাকৃতি গাঠনিক সংকেতটি নাকি পেয়েছিলেন স্বপ্নযোগে!

image source: horasarvam.blogspot.com

১৮৬৫ সাল, জার্মানিতে সে বছর তীব্র শীত পড়েছে। অগাস্ট কেকুল গভীর রাতেও আগুনের পাশে বসে বেনজিনের গাঠনিক সংকেত নিয়ে কাজ করছেন। মাসের পর মাস কাজ করেও কূলকিনারা করতে পারছেন না কোনোক্রমে। প্রতিদিনের মতোই কাজ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেদিন হটাৎ স্বপ্নে দেখলেন একটি সাপ নিজেই তার লেজকে খেয়ে ফেলছে। ঠিক যেন প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় ব্যবহৃত এক প্রতীক ‘অরোবরোস’-এর মতো দেখতে।

স্বপ্নেই যেন তাকে কেউ বলে দিচ্ছিল বেনজিন দেখতে অনেকটা এইরকমই হবে। ঘুম থেকে জেগে উঠেও বিজ্ঞানী কেকুল অনেকটা আর্কিমিডিসের ইউরেকা ইউরেকা করার মতই আউরে যাচ্ছিলেন, “It’s a ring. The molecule is in the form of a ring.”

image source: web.chemdoodle.com

সেখান থেকে কেকুল নতুন করে গবেষনা শুরু করেন এবং প্রমাণ করেন বেনজিন আসলেই একটি চক্রাকৃতি যৌগ। অ্যারোমেটিক যৌগের রসায়নকে নতুন করে বোঝা শুরুর হয়েছিল এই বেনজিন রিং আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই। তাই ১৮৯০ সালে বেনজিনের চক্রাকৃতি ফর্মুলা আবিষ্কারের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ‘জার্মান কেমিকাল সোসাইটি’ কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞানী অগাস্ত কেকুলকে সংবর্ধনা প্রদান করে। সেখানে তাকে তার স্বপ্নের বিষয়টি জিজ্ঞেস করা হলে তিনি ব্যাপারটি স্বীকার করেন। তবে এ স্বপ্ন দেখার আগে বেনজিন নিয়ে তার ২ বছরের দীর্ঘ পরিশ্রমের কথা উল্লেখ করতে ভুলেননি তিনি।

ধূমপানের মহাবিপদ সংকেত

একজন মানুষের শরীরে ক্যান্সার বাসা বাঁধতে কার্যত দীর্ঘ সময় নিয়ে থাকে। হতে পারে সেটি কয়েক বছর বা এমনকি কয়েক দশকও। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে একজন ৭০ বছর বয়সী ব্যক্তির মলাশয় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি একজন ১০ বছর বয়সী বালকের চেয়ে প্রায় ১০০০ গুণ বেশি। ঠিক একইভাবে, ফুসফুস ক্যান্সারও একজন মানুষের শরীরে খুব দীর্ঘ সময় নিয়েই বাসা বেঁধে থাকে। মূলত, ফুসফুস ক্যান্সার শরীরে বাসা বাঁধার জন্য তিন দশক বা তারও অধিক পর্যন্ত সময় নিতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ধূমপান আদৌ জনপ্রিয় ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সর্বপ্রথম যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের একটা বড় অংশ ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

image source: dailymail.co.uk

এর কারণ হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তাদের রেশনের অংশ হিসেবে সিগারেট পেতেন। এর প্রায় ত্রিশ বছর পরে, ১৯৭০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকে। ঠিক একই সময়ে ধূমপান সমস্ত বিশ্বে বিস্তার লাভ করতে শুরু করে এবং এর সবচেয়ে বেশি বিস্তৃতি ঘটে নব্বই এর দশকে। এতে করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, ফুসফুস ক্যান্সারে মৃত্যুর বৈশ্বিক হার ২০২০ সাল পরবর্তী সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে।

বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচারে প্রকাশিত বিজ্ঞানী রবার্ট এন. প্রক্টর এর একটি গবেষণাপত্র থেকে সংগৃহীত নিচের গ্রাফটি থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এখন পর্যন্ত ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হারটা হয়তো খুব বেশি নয়। কিন্তু এ কথা খুব জোর দিয়েই বলা যায়, খুব শীঘ্রই এই হারটা আশঙ্কাজনক হারেই বৃদ্ধি পাবে। তাই যে সমস্ত ধূমপায়ী প্রায়শই প্রশ্ন তুলে থাকেন, “ধূমপানের কারণে আপনি কি কাউকে ক্যান্সারে মারা যেতে দেখেছেন?”, তারা হয়তো খুব শীঘ্রই তাদের সেই প্রশ্নের উত্তরটা পেতে চলেছেন।

তথ্যসূত্রঃ

১. Proctor RN (2001) Tobacco and the Global Lung Cancer Epidemic. Nat Rev Cancer; 1(1):82-6.

২. Weinberg RA (2013), the Biology of Cancer. Garland Science, New York.

featured image: choicesdomatter.org