যারা বাগিয়ে নিলেন ফিল্ডস পদক ২০১৮: সংখ্যাতত্ত্বের জয়জয়কার

চার বছর পর পর চারজন গণিতবিদ বের হয় স্বীকৃতির মুকুটে। সংখ্যাতত্ত্ববিদ পিটার শোলজ ছিলেন জার্মানির সবচেয়ে কমবয়স্ক পূর্ণ অধ্যাপক। তখন তার বয়স মাত্র ২৪ বছর। আর জ্যামিতিবিদ কচের বীর্কার যে কিনা একজন কুর্দিশ শরনার্থী— গণিতের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরষ্কার ফিল্ডস পদক বরণ করেছেন। আরো দুজন— ইতালির আলেসসিও ফিগাল্লি এবং ভারতীয় অক্ষয় ভেঙ্কটেশ যাদের কাজ যথাক্রমে নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ এবং সংখ্যাতত্ত্বের উপর। এই চারজনের নাম একে একে ধ্বনিত হয়েছে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব ম্যাথমেটিসিয়ান্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে।

ফিল্ডস পদক গণিতের শীর্ষ সম্মানজনক স্বীকৃতি যা ভূষিত করা হয় ৪০ বছর অনূর্ধ্ব ব্যক্তিদের গণিতে বিশেষ অবদানের জন্য; ছবি কৃতজ্ঞতা: Stefan Zachow

ফিল্ড পদক প্রদান করে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব ম্যাথমেটিক্স। চার বছর পর পর কনফারেন্সে চারজন তরুণ গণিতবিদকে এই পুরষ্কারে সম্মানিত করা হয়। গণিতের পুরষ্কারে অবশ্য তরুণ বলতে সুনির্দিষ্ট করা রয়েছে— ৪০ বছরের অনুর্ধ্ব। এবারের চারজন একটি ইতিহাস ভাঙার ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। ১৯৩৬ থেকে সেই যে শুরু হয়েছে ফিল্ডস পদক— এই ৮২ বছরে প্রথমবারের মত কোনো আমেরিকান বা ফরাসি গণিতবিদ এবার পুরষ্কার পাননি! এই দুই দেশ মিলে ফিল্ডসের প্রায় অর্ধেক পদক বাগিয়ে বসে আছে। বিজ্ঞান ও গণিতের যুগলের যুগ্মজয়ীর উদাহরণ বুঝি এরাই! আর অদ্যাবধি ৬০ জন পদকজয়ীর মধ্যে সবেধন একমাত্র নারী ২০১৪ এর বিজয়ী মারিয়াম মির্জাখানি।

ইউনিভার্সিটি অব বন, জার্মানিতে পিটার শোলজ। ছবি কৃতজ্ঞতা: Nyani Quarmyne

পিটার শোলজ যে এ বছর ফিল্ডস জিততে যাচ্ছেন এ ব্যাপারে কারও সন্দেহ ছিল না বললেই চলে। বরং হিসেবটা ছিল শোলজের সাথে আর কোন তিনজন এবার এতে ভূষিত হতে যাচ্ছেন? গণিত সম্প্রদায়ের মধ্যে এ প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যেত কবে শোলজের নাম শোনা যাবে। ৩০ বছর বয়সী শোলজ বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন ২২ বছরেই। তখন তিনি গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থী, পাটিগণিতীয় জ্যামিতির একটি বই-সম আকার প্রমাণকে অনেক সংক্ষেপে প্রমাণ করার উপায় বের করে ফেলেন। পাটিগণিতীয় জ্যামিতি বলতে গণিতের যে শাখাকে বোঝায় তা হল বীজগণিতীয় জ্যামিতি আর সংখ্যাতত্ত্বের মাঝামাঝি অবস্থান করে। তখনই তিনি জিতে নেন শাস্ত্র রামানুজন পুরষ্কার

শোলজের অধিকাংশ কাজ সংযুক্ত সংখায়তত্ত্বের সাথে যেগুলো মৌলিক সংখ্যার গবেষণা নিহিত। তিনি ফ্র্যাক্টালের মত কাঠামো নিয়ে পারফেক্টয়েড স্পেসের উপর কাজ করেন। সোজা কথায় একাজ জ্যামিতি এবং টপোগণিতের মধ্যকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য উপযোগী।

শোলজ বর্তমানে এবিসি কনজেকচারের উপর একটি ঢাউশ আকার প্রমাণ যাচাই করছেন। এবিসি কনজেকচার সংখ্যাতত্ত্বের একটি অন্যতম বড়  অসমাধিত কনজেকচার। কনজেকচার হল গাণিতিক অনুমান। এবিসি কনজেকচারটি তিনটি সহমৌলিক সংখ্যার সম্পর্ক বর্ণনা করে যেখানে A+B=C এবং এর তৃতীয় সংখ্যার (C) উৎপাদকের ঘাত প্রথম দুটি সংখ্যার (A এবং B) উৎপাদকের ঘাতের চেয়ে কম হবে। ২০১২ তে শিনিচি মচিজুকি এই কনজেকচারের একটি প্রমাণ প্রকাশ করেন অনলাইনে কিন্তু কেউ নিশ্চিতভাবে এটাকে যাচাই করতে পারেন নি প্রমাণটি সিদ্ধ কিনা। শোলজ এবং তার সহকর্মীরা এই প্রমাণে তাৎপর্যপূর্ণ ত্রুটি পেয়েছেন বলে মনে করছেন। শোলজ ইউনিভার্সিটি অব বনের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। একই সাথে তিনি বন শহরেরই ম্যাক্স-প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ম্যাথমেটিক্সের পরিচালনা করছেন।

কচের বীর্কারের, বয়স ৪০ বছর। তিনি মূলত কুর্দিশ, তার জন্ম ১৯৭৮ এ ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে। ৮০’র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের মাঝে বেড়ে উঠেছেন বীর্কার। তার বাবা-মা ছিল কৃষক-কৃষাণী। সে কারণে তাকেও বেশ দীর্ঘ একটা সময় চাষাবাদ করে কাটাতে হয়েছে। বহু দিক থেকে হিসেব করেও এমন পরিবেশ একটা বাচ্চার গণিতে আগ্রহের জন্য অনুপ্রেরণার ছিল না।

বীর্কার পড়াশোনা করেছেন ইউনিভার্সিটি অব তেহরানে। ২০০০ সালে তিনি ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথমেটিক্স কম্পিটিশন ফর ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টসে তৃতীয় হন। এর পরপরই ইরান থেকে যুক্তরাজ্যে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন। ২০০১-২০০৪ এ পিএইচডি সম্পন্ন করেন ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যাম থেকে। তিনি বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ইউনিভার্সিটির ক্যামব্রিজের অধ্যাপক হিসেবে।

কচের বীর্কার ছোট্ট থাই ড্রামে তুলছেন কুর্দিশ তাল, নিজে নিজেই শিখেছেন। ছবিটি তোলা হয়েছে তার ক্যামব্রিজের বাসায়। ছবি কৃতজ্ঞতা: Philipp Ammon

তিনি ফিল্ডস পেয়েছেন বীজগাণিতিক প্রকরণের শ্রেণীবিন্যাসে বিরাট সাফল্য অর্জন করেছেন বলে। বহুপদী সমীকরণ থেকে জ্যামিতিক বস্তু বর্ণনার কাজই এর বিষয়বস্তু। একটা বহুপদী সমীকরণের উদাহরণ: y = x^2. পদকের ব্যাপারে তিনি নিজের অর্জনকে মনে করেন ৪ কোটি কুর্দির ঠোঁটের কোণে একটু হাসি। নিজ দেশ, মাতৃভূমি ছেড়ে পরদেশে অভিবাসী হিসেবে থাকা যে পরম সুখের নয় তার নাম থেকেই সেটা স্পষ্ট। তার আসল নাম ছিল ফারিইদুউন দারাখশানি। অভিবাসী হয়ে নাম গ্রহণ করেন ‘কুচের বীর্কার’ যে কুর্দিশ শব্দের অর্থ অভিবাসী গণিতবিদ।

৩৬ বছর বয়সী অক্ষয় ভেঙ্কটেশ কাজ করেন সংখ্যাতত্ত্বের চিরায়ত সমস্যাগুলোর উপর। সংখ্যাপদ্ধতি কিভাবে কাজ করে এবং সংখ্যার মূলসমূহ নিয়েও, যেমন- একটি মূলের উদাহরণ √2। তিনি হাতেগোনা অল্প কজন গণিতবিদের মধ্যে একজন যারা কার্ল ফ্রিডরিখ গাউসের করা প্রশ্নের উপর বলিষ্ঠ উন্নয়ন করেছেন। ভেঙ্কটেশের জন্ম ভারতের নয়াদিল্লীতে। অবশ্য বেড়ে উঠেছেন অস্ট্রেলিয়ায়, বর্তমানে কাজ করছেন ইন্সটিটিউট ফর এডভান্সড স্টাডি ইন প্রিন্সটন, নিউ জার্সিতে।

উক্ত তিনজনের কাজ বলতে গেলে পুরোদস্তুর সংখ্যার বিমূর্ত জগতের সাথে। সে তুলনায় এ বছরের অপর ফিল্ডস পদকজয়ী ৩৪ বছর বয়স্ক আলেসসিও ফিগাল্লি কাজ করেন বাস্তব জগতের কাছাকাছি বিষয়ে— অপ্টিমাল ট্রান্সপোর্ট। অর্থাৎ কোনো পরিবহন বা যোগাযোগের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম সমাধান কী হতে পারে সেটা বের করা। অর্থাৎ একটা নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা। ফিগাল্লি এটি আংশিক ডিফারেন্সিয়াল সমীকরণে প্রয়োগ করেন। এ ধরণের সমীকরণ কয়েক একাধিক চলক নিয়ে কাজ করে এবং পদার্থবিজ্ঞানের সাথে অধিক সম্পর্কিত এ ক্ষেত্র। ফিগাল্লির জাতীয়তা ইতালিয়, তিনি কর্মরত জুরিখের সুইস পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে।

 

সায়েন্টিফিক আমেরিকানকোয়ান্টা ম্যাগাজিন অবলম্বনে।

৩ স্মরণীয় নারী গণিতবিদ জুলিয়া-এমি-আডা

যখন সবাই বলে গণিতের ইতিহাস পুরুষের ইতিহাস, তখন সবার ভুলই ইতিহাস হয়ে রয়।  

বিশাল মহাশূন্যের রহস্য উন্মোচন থেকে শুরু করে যত দূর পর্যন্ত মানুষের আবিষ্কার অর্জিত হয়েছে তা সে কল্পনা বা যুক্তি যে দৃষ্টিকোণেরই হোক, গণিতের ইতিহাস আদ্যন্তই দেখা দেখা হয়েছে পুরুষিক প্রচেষ্টা হিসেবে। গাউস, অয়লার, রিম্যান, পয়েনকেয়ার, এরডস এবং বর্তমান আধুনিক যুগের উইলস, টাও, পেরেলমান, ঝাং যার নামই নেই না কেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম যে গণিতগুলো আবিষ্কার হয়েছে মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে সকল অবদানই যেন পুরুষের। ১৯৩৭ এ এরিক টেম্পল বেলের লেখা বই গণিতের মানুষেরা(পুরুষেরা) [Men of Mathematics] একটি উদাহরণ যা প্রকাশ করে গণিতে কতটা লিঙ্গভেদ ধারণা কাজ করছে গণমানুষের মাঝে।

এমনকি আজ পর্যন্তও, এটা বলা বাহুল্য যে গণিত হচ্ছে পুরুষ গণিতবিদদের একক প্রচেষ্টাক্ষেত্র। কিন্তু এ থেকেই আমাদের কিছু নারী গণিতবিদের যুগান্তকারী অবদানকে ভুলে যাওয়াও উচিত নয়। আমরা এমন কিছু উল্লেখযোগ্য নারী গণিতবিদ পেয়েছি  যারা কম্পিউটার বিজ্ঞান, মহাশূন্যের জ্যামিতি, বিমূর্ত বীজগণিতের ভিত্তি গঠনে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গণিত তত্ত্ব, সংখ্যাতত্ত্বে এবং মহাশূন্য বলবিদ্যায় অবদান রেখেছেন যা আমাদের আধুনিক যুগের বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় পাথেয়। এসকল অবদানের উপর ভিত্তি করে প্রশস্ততর হয়েছে ক্রিপ্টোগ্রাফি, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞানের জগত।

সংখ্যাতত্ত্বে হিলবার্টের দশম গাণিতিক সমস্যার উপর জুলিয়া রবিনসনের কাজ, এমি নোয়েথারের বিমূর্ত বীজগণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের কাজ আর আডা লাভলেসের কম্পিউটার বিজ্ঞানে সৃষ্টিপ্রচেষ্টা— কেবল তিনটি উদাহরণ নারীদের পক্ষ থেকে। এই তিনজনকে আজ একটু চেনার চেষ্টা থাকবে।

জুলিয়া রবিনসন (১৯১৯-১৯৮৫)

বিংশ শতাব্দী উঁকি দিতে দিতে বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট এক সেট গাণিতিক সমস্যার সংকলন প্রকাশ করলেন। সেটে ছিল ২৩টি সমস্যা— আগড় বাগড় কোনো সমস্যা না, বরং যেগুলো গণিতবিদদের ধাঁধায় ফেলে রেখেছে। আরো বলে দিলেন সামনের ১০০ বছর এই সমস্যাগুলো নিয়ে গণিতবিদেরা ব্যস্ত থাকবেন। এ কথাটির সোজাসুজি অর্থ হচ্ছে ১০০ বছরের চেষ্টায়ও সবগুলো সমাধান করা যাবে না।

১৯৭৫ সালে বার্কলেতে তোলা ছবিতে জুলিয়া রবিনসন; source: George Bergman

তো সেগুলোর মধ্যে দশতম সমস্যাটির দাবি ছিল ডায়োফ্যান্টাইনের সমীকরণের সমাধানযোগ্যতা নিরূপণে একটি সাধারণ অ্যালগরিদম গঠন করা যাবে কি না। ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণ হল যেসকল বহুপদী সমীকরণের সহগ এবং সমাধান সকলই পূর্ণসংখ্যা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, কল্পনা করুন এমন কোনো যন্ত্র যা কিনা সকল ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণের অসীমসংখ্যক সমাধান সেট থেকে বলে দিবে সেটি সমাধান করা সম্ভব নাকি সম্ভব না। গণিতবিদরা প্রায়শই এ ধরনের অসীমতক ধারণার প্রশ্নের মুখোমুখি হন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সমাধান বের করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে থাকে। তো এই নির্দিষ্ট সমস্যাটি বার্কলের গণিতবিদ জুলিয়া রবিনসনকে আগ্রহী করে তুলেছিল। কয়েক দশক ধরে তিনি মার্টিন ডেভিস এবং হিলারি পুটনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছিলেন। এর ফলস্বরূপ, হিলবার্টের এই সমস্যাটির  একটি শর্ত বাতলানো গিয়েছিল যে এটি হিলবার্টের প্রশ্নের না বোধক উত্তর দিবে।

১৯৭০ এ এক তরুণ রাশিয়ান গণিতবিদ ইউরি মাতিয়াসেভিচ এই সমস্যাটির পূর্ণাঙ্গ সমাধান করেন রবিনসন, ডেভিস এবং পুটনামের দেখানো পথে। সংখ্যাতত্ত্বে উজ্জ্বল অবদান রাখা রবিনসন ছিলেন একজন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গণিতবিদ যিনি বিশুদ্ধ গণিতের কোনো এক সমস্যার সমাধানের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস এর প্রথম নারী গণিতবিদ। ১৮৮৮ এ আমেরিকান ম্যাথমেটিকাল সোসাইটি প্রতিষ্ঠার ৯৫ বছর অপেক্ষার পর একজন নারী প্রেসিডেন্ট পাওয়া গিয়েছিল— জুলিয়া বাউমেন রবিনসনকে। তার উপর লেখা জীবনীগ্রন্থ “The Autobiography of Julia Robinson“.

এমি নোয়েথার (১৮৮২-১৯৩৫)

অ্যাবস্ট্রাক্ট অ্যালজেব্রার কোর্স করা মানেই কেউ এমি নোয়েথারের নাম শুনতে বাধ্য। তার কাজ বিস্তৃত পদার্থবিজ্ঞান থেকে আধুনিক বীজগণিত পর্যন্ত। যে কারণে নোয়েথার গণিতের ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণদের একজন হিসেবে। তার ১৯১৩ সালে করা ক্যালকুলাস অব ভেরিয়েশনস এর কাজ যা নোয়েথার থিওরেমে পরিণত হয়েছে পরবর্তীতে— বিবেচনা করা হয় গণিতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বগুলোর একটি হিসেবে। নোয়েথার থিওরেম যে পদার্থবিজ্ঞানকে প্রভাবিত করেছে তাও স্বীকৃত। উচ্চতর বীজগণিতের যে কোনো গবেষকের জন্য নোয়েথারের তত্ত্বের নীতি এবং কমিউটেটিভ রিঙ এই ক্ষেত্রের ভিত্তি প্রস্তুত করে দেয়। নোয়েথারের তত্ত্ব আর বিনিময়যোগ্য রিঙ কী তা বলতে গেলে নোয়েথার লেখা থেকে হারিয়ে যেতে পারেন। যথেষ্ঠ নয় এমন বর্ণনার আদলে বলতে পারি কমিউটেটিভ রিঙ হচ্ছে যেকোনো অশূন্য উপাদানের পরিপূরক বিপরীত রাশি থাকবে।

তাঁর কাজের পরিধি বাতিঘর থেকে বিচ্ছুরিত আলোর মত বুদ্ধিদীপ্ত অনুমানের পথ দেখায় যারা বাস্তবতাকে আরো গভীরতর দৃষ্টিকোণের মাধ্যমে দেখতে চান। কিন্তু এ দেখতে চাওয়া বা বুঝতে চাওয়ার ব্যাপারটি কিন্তু বিমূর্ত, কল্পনার।  গণিতবিদ এবং পদার্থবিদেরা তার এই যুগজয়ী অবদানকে সম্মানের সাথে স্বীকার করেন তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে গভীর দৃষ্টিকোণ অর্জনের পথ সৃষ্টি করার জন্য। ১৯৩৫ এ আলবার্ট আইনস্টাইন নিউইয়র্ক টাইমসকে এমির ব্যাপারে লিখেন, “সবচেয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন জীবিত গণিতবেত্তাদের বিচারে, অবিবাহিত জার্মান গৃহশিক্ষিকা নোয়েথার হচ্ছেন নারীদের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যবহ গাণিতিক প্রতিভা। ”

আডা লাভলেস (১৮১৫-১৮৫২)

 

আডা লাভলেস; source: উন্মুক্ত লাইসেন্সের আওতায়।

১৮৪২ এ ক্যামব্রিজের গণিতের অধ্যাপক চার্লস ব্যাবেজ ইতালিতে ইউনিভার্সিটি অব তুরিনে বিশ্লেষণ করতে পারে এমন মেশিন বিষয়ে লেকচার দেন। লুইগি মেনাব্রিয়া নামের এক গণিতবিদ পরবর্তীতে সেই বক্তৃতার লিখিত নোটকে ফ্রেঞ্চে অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। ব্যাবেজের এক বন্ধু চার্লস হুইটস্টোন তরুণী আডা লাভলেসকে নিযুক্ত করেন মেনাব্রিয়ার ফ্রেঞ্চে লেখা নোটটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে। আডা লাভলেস সেই ট্রান্সক্রিপ্টের উন্নতি করে প্রকাশ করেন যার মাঝে তার নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়। এ কারণে তাকে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রামার। ১৮৪৩ এ প্রকাশিত সে অনুবাদে একটি অংশে লাভলেস নিজের তৈরি নোট যুক্ত করে দেন, যে অংশটিতে একটি অ্যালগরিদমের রূপরেখা দিয়েছিলেন বেরনুলির সংখ্যা হিসেব করার জন্য। ব্যাবেজ যা করেছিলেন তা ছিল একটি তত্ত্বীয় ইঞ্জিন, লাভলেস সেটাকে কম্পিউট করার বাস্তবতার সীমারেখায় এনে দেন। সে পথ ধরে উন্মোচিত হয় কম্পিউটার বিজ্ঞানের গণনা বা হিসেব করার নতুন মাত্রার, নতুন বহু কিছু হিসেবের আওতায় আসার সুযোগ। প্রযুক্তি বিপ্লবের বীজ থেকে অঙ্কুর মেলে এই ফাঁকেই।

 

তাদের অসামান্য অবদান সত্ত্বেও, এ তিন নারীর আবিষ্কার ঢাকা পরে যায় তাদের গণিতক্ষেত্রের পুরুষ সারথিদের অর্জনের কাছে। অথচ ইতিহাস ঘেঁটে খুঁটিয়ে দেখলে এমন আরো বহু নারী গণিতবিদের কথা বলা যাবে। নারী অবদান ছায়ায় পড়ে থাকার একটি বড় কারণ—- আমরা আমাদের ইতিহাস নির্মাণে ব্যর্থতার গল্পগুলো আড়াল করে ফেলি। ক্রমিক পর্যায়ে মানুষের সাফল্যের পথ সৃষ্টিতে আপাত ব্যর্থতাও দীর্ঘ ইতিহাসের সময়ের মাপকাঠিতে অর্জনের অংশ। সভ্যতার বিকাশে নারীদের অবদান সৃষ্টি ও স্বীকারে তাদের অর্জনকেও সমানভাবে স্বীকার করা আবশ্যক। জ্ঞানের রাজ্যের লিঙ্গভেদ না থাকলেই বরং সবচেয়ে ফলপ্রসু ভবিষ্যতের সৃষ্টি হয়।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

featured image: dawn.com

গণিতের একীভূত তত্ত্বের জালে আটকে গেল আবেল ২০১৮

কানাডিয়ান গণিতবিদ রবার্ট ফেলান ল্যাঙল্যান্ডস (Robert Phelan Langlands) জিতে নিলেন ২০১৮র আবেল পুরস্কার— গণিতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার। নরওয়েজিয়ান একাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড লেটারস গত ২০শে মার্চ তার নাম ঘোষণা করে বীজগণিত, সংখ্যাতত্ত্ব ও বিশ্লেষণ এর মধ্যকার চমকপ্রদ ও সুদূরপ্রসারী যোগসূত্র আবিষ্কার করার জন্য।

ল্যাঙল্যান্ডসের ঘড়িতে বলছে ৮১ বছর। এখনো তিনি প্রিন্সটন, নিউ জার্সিতে অবস্থিত ইন্সটিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডির সক্রিয় সদস্য। তিনি যে অফিসটিতে বসেন ঠিক ওখানেই একদা বসতেন মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রোজেটা স্টোন। Source: Hans Hillewaert

গণিতবিদদের রূপরেখা দাঁড় করিয়েছিলেন ল্যাঙল্যান্ডস প্রোগ্রামকে। রবার্ট ল্যাঙল্যান্ডস ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে সংখ্যাতত্ত্ব এবং জ্যামিতির গুরুত্বপূর্ণ অনুমান বা প্রকল্পগুলো (conjectures) মধ্যকার সম্পর্কসূচক প্রোগ্রাম প্রস্তাবনা করেন। এ প্রোগ্রামের ব্যাপারটি অনেকটা প্রাচীন মিশরের রোজেটা স্টোনের মত। রোজেটা স্টোনে খোদাই করা আছে প্রাচীন তিন ধরনের লিপি।

 

তিন লিপিতে একই কথা বলা আছে তবে কী বলা আছে তা এখনো পড়তে শেখা বাকি। ল্যাঙল্যান্ডসের প্রোগ্রামও এমন বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রস্তাবিত। গণিতের বিভিন্ন শাখার সাথে এ প্রোগ্রামটি আসলে একটি যোগসূত্র বা অনুবাদকের মত কাজ করবে। তাহলে, যখন কোনো সমস্যা সমাধান করা অসম্ভব বলে মনে হবে তখন অন্য কোনো গণিতের ক্ষেত্রে নিয়ে একে যাচাই করা হবে। হয়ত গণিতের ঐ শাখা সমস্যাটির সমাধান বলে দিতে পারে। দুটি শাখার মধ্যে এই সংযোগ আসলে আরো নিগুঢ় রহস্যকে তুলে আনে।

 

কম্পাঙ্ক ৫২০১ হার্জ এর অনুনাদ চিত্র
কম্পাঙ্ক ৩২৪০ হার্জ এর অনুনাদ চিত্র

অন্যান্য গবেষকরা এই প্রোগ্রামের সুবিধা অর্জনে বিস্তর কাজ করতে থাকেন। নিদেনপক্ষে, তিনজন গণিতবিদ এই মহাপরিকল্পনার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে কাজ করে ফিল্ডস পদক জিতে নিয়েছেন। সময় গড়াতে গড়াতে গবেষকরা অচিরেই বুঝে ফেললেন গণিতবিদদের সমাধান করা ইতিপূর্বের কিছু প্রাচীন সমস্যা আসলে এই বিরাট অনুক্রমের বিশেষ অংশ। একটি হল ভেইল কনজেকচার (Weil Conjecture) যেটা সমাধান করে বেলজিয়ামের গণিতবিদ পিয়েরে ডিলাইন (Pierre Deligne) দখল করে নিয়েছেন ২০১৩ এর আবেল পুরস্কার। আরেকটি— গণিতের মোটামুটি খোঁজখবর রাখেন এমন সর্বসাধারণের জানাশোনার মাঝে— ৯০ এর দশকে এন্ড্রু উইলস এক সহলেখকের সাথে ফার্মার শেষ উপপাদ্য প্রমাণ করেন, যেকারণে ২০১৬তে তিনি আবেলে অলংকৃত হন।

একের সাথে আরেকটির সম্পর্কের বিস্তার এত বড় যে সত্যি সত্যি তার এই প্রোগ্রামটি “গণিতের একীভূতকরণ তত্ত্ব” নামে পরিচিত হতে লাগল— ব্যাপারটি ল্যাঙল্যান্ডসকেই হতবুদ্ধ করে। এই চমকপ্রদ অনুভূতিটি সুন্দর করে বুঝিয়েছেন ইন্সটিউটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডির প্রধান রবার্ট ডাইক্সগ্রাফ (Robbert Dijkgraaf)— “এটা অনেকটা এমন যে, আপনি একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ। মরুভূমিতে বালি খুঁড়ে একটি পাথর খুঁজে পেলেন— আর দেখা গেল এ পাথরটি যেন একটা পিরামিডের শীর্ষে ছিল!” উল্লেখ্য, ডাইক্সগ্রাফ নিজে একজন গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানী।

আবেল পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে ২০০৩ সাল থেকে।

আবেল পুরস্কারের উত্থান নোবেল পুরস্কারের অনুকরণেই। গণিত এত গুরুত্বপূর্ণ শাখা অথচ নোবেলে গণিতের জন্য কোনো জায়গা নেই সেই অভাব পূরণেই ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর ঘোষণা করা হচ্ছে। এর অর্থমূল্য ৬ মিলিয়ন ক্রোনার (ডলারে ৭৭৭,০০০ বা সাড়ে ৬ কোটি টাকা)।

ল্যাঙল্যান্ডস প্রথম এই প্রোগ্রামটির রূপরেখা তৈরি করেন ১৯৬৭ সালে যখন কিনা তিনি একই ইন্সটিটিউটে তরুণ গণিতবিদ ছিলেন। শুরু করেছিলেন সরল বীজগাণিতিক সমীকরণ দিয়ে, যেমন- দ্বিঘাত সমীকরণ; বাচ্চারা যা স্কুলেই শিখে ফেলে। একটু পেছনে, ১৮০০ এর দিকে এভারিস্ট গ্যালোয়া বের করেছিলেন, সাধারণভাবে, উচ্চঘাতের সমীকরণগুলো কেবল আংশিক সমাধান করা সম্ভব। অবশ্য গ্যালোয়া আরো দেখান, এ ধরনের প্রতিটি সমীকরণের সমাধানগুলোর মধ্যে একটি প্রতিসাম্যতা বজায় থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, x^5 = 1 সমীকরণের সমাধানে বীজগুলো একটা বৃত্তে অবস্থিত যে বৃত্তটি লেখচিত্রে এক অক্ষে বাস্তব সংখ্যা ও অন্য অক্ষে জটিল সংখ্যাকে নির্দেশ করে আঁকা। তিনি দেখান, যখন এমন উচ্চঘাতের সমীকরণগুলো সমাধান করা যাবে না, তারপরও তাদের প্রতিসাম্যতা থেকে সমাধানের আভাস বের করে নেয়া সম্ভব।

গ্যালোয়ার তত্ত্বের উত্তরকালীন উন্নয়নের অনুপ্রাণিত হয়ে ল্যাঙল্যান্ডসের এগুনোর পদ্ধতি গবেষকদের সুযোগ করে দিল বীজগাণিতিক সমস্যাকে হারমোনিক এনালাইসিসে রূপান্তর করতে। হারমোনিক এনালাইসিস বলতে সোজা কথায় কোনো ফাংশন অথবা সংকেতের উপস্থাপন। হারমোনিক এনালাইসিসের মাধ্যমে জটিল তরঙ্গরূপকে ভেঙে সাইন ও কোসাইন তরঙ্গে রূপান্তরিত করে।

‘৮০র দশকে, এক ইউক্রেনীয় গণিতবিদ ভ্লাদিমির দ্রিনফেল্ড আরো কয়েকজনের সাথে মিলে জ্যামিতি আর হারমোনিক এনালাইসিসের মধ্যে অনুরূপ একটি সম্পর্কের প্রস্তাবনা আনলেন। যদিও এই ব্যাপারটি আসলে মোটাদাগে ল্যাঙল্যান্ডসের ধারণা থেকেই অনুপ্রাণিত বলে মনে হয়, গণিতবিদরা পরবর্তীতে এই দুই শাখার মধ্যে আন্তঃসম্পর্কের শক্ত প্রমাণ পেলেন। সে সুবাদে দ্রিনফেল্ড ১৯৯০ এ পেয়ে গেলেন ফিল্ডস পদক। তিনি বর্তমানে ইলিনয়তে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে অধ্যাপনা করছেন।

এই জ্যামিতির প্রোগ্রাম আবার পুরনো এক কনজেকচারকেও (অনুমান) অন্তর্ভুক্ত করে, যা আবার হারমোনিক এনালাইসিসের সাথে সম্পর্কিত। ফার্মার শেষ উপপাদ্যের উইলসের প্রমাণের মাধ্যমে সেটি নিশ্চিত হয়েছিল। ফার্মার উপপাদ্যটি সংখ্যাতত্ত্বের এমন এক সমস্যা ছিল যা সমাধান করতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৩০০ বছরেরও বেশি সময়। উইলস তাদের প্রমাণের কাজে ল্যাঙল্যান্ডসের কিছু কাজ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, অর্থাৎ কাজে লাগিয়েছিলেন। সে সূত্রে, ২০০৭ এ ল্যাঙল্যান্ডস কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “এটা ছিল আমার জন্য আনন্দের এবং একই সাথে বিস্ময়েরও।”

অধ্যাপক রবার্ট ল্যাঙল্যান্ডস ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডির এক কনফারেন্সে (২০১৬); Source:Dan Komoda

ল্যাঙল্যান্ডস প্রোগ্রামের মাধ্যমে যেভাবে গণিতের শাখা এত বিশাল হয়ে উঠেছে তার সবটা নাকি তিনি নিজেও বোঝেন না। আন্তঃসম্পর্কগুলো কিভাবে কাজ করে তাও পুরোপুরি বোধগম্য নয়। বিশেষত, জ্যামিতিক ক্ষেত্রের কিছু কিছু প্রভাব পদার্থবিজ্ঞানে কাজে লাগবে। তার ইন্সটিটিউশনাল সহকর্মী তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড উইটেন মনে করেন তিনি ল্যাঙল্যান্ডস প্রোগ্রামের খুব ক্ষুদ অংশই ধরতে পারেন। উল্লেখ্য, উইটেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হলেও একজন ফিল্ডস পদকজয়ী ১৯৯০ এ। ২০০০ এর দশকে তিনি এ প্রোগ্রামের সম্পর্কগুলো নিয়ে কাজ করেছিলেন।

 

—নেচার অবলম্বনে