স্ট্রোকের সময় কী ঘটে দেহে?

প্রতি ২ সেকেন্ডে পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও একজন মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এবং প্রতি ৬ জন মানুষের একজন তার জীবনকালে একবার হলেও স্ট্রোকের শিকার হয়।

মস্তিষ্কের রক্তনালী আঘাতগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গেলে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে অপর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহের ফলে স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ বাঁধাগ্রস্ত হয় এবং স্নায়ুকোষের মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনাকে স্ট্রোক বলে।

স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী প্যারালাইসিসের শিকার হওয়াটা স্বাভাবিক। বর্তমানে মানুষের মৃত্যূর জন্য খুব সাধারণ একটি কারণ হলো স্ট্রোক। যখন কেউ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় তখন তাৎক্ষণিক চিকিৎসা অপরিহার্য। নইলে মস্তিষ্কে হয়ে যেতে পারে চিরস্থায়ী ক্ষতি।

স্ট্রোকে কেন মানুষ আক্রান্ত হয়?

আমাদের দেহের প্রতিটি কোষের স্বাভাবিক কাজ সম্পন্ন করার জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন। অক্সিজেনের অভাবে কোনো কোষ জীবিত থাকতে পারে না। এই অক্সিজেন প্রতিটি কোষে সরবরাহ হয় রক্তের মাধ্যমে। আমাদের মস্তিষ্ক যদিও সমগ্র দেহের ভরের মাত্র ২% বহন করে কিন্তু সারা দেহে সরবরাহকৃত অক্সিজেনের ২০% খরচ করে এই মস্তিষ্ক।

মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ধমনীর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ক্যারোটিড ধমনী মস্তিষ্কের সম্মুখ অংশে এবং ভার্টিব্রাল ধমনী মস্তিষ্কের পশ্চাৎ অংশে অক্সিজেন সরবরাহ করে।

এই দুই ধমনী পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে Circle Of Willis গঠন করে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর রক্তনালীতে বিভক্ত হয়ে যায়। ক্ষুদ্রতুম অংশে বিভক্ত হয়ে সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ করে। এ সকল রক্তনালীতে রক্ত চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি হলে স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং অক্সিজেনের অভাবে স্নায়ুকোষগুলো মারা যেতে শুরু করে। একেই আমরা স্ট্রোক বলি।

চিত্রঃ ক্যারোটিড ও ভার্টিব্রাল ধমনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় Circle of Willis

স্ট্রোক দুই প্রকার। হ্যামোরেজিক স্ট্রোক (Hemorrhagic Stroke) ও ইসকিমিক স্ট্রোক (Ischemic Stroke)। আঘাত বা অন্য কোনো কারণে যখন মস্তিষ্কের রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়ে রক্তপাত হতে থাকে এবং রক্তচলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয় তখন ঐ ব্যক্তি হ্যামোরেজিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। আর ইসকিমিক স্ট্রোকে রক্তনালী আঘাতপ্রাপ্ত না হয়ে জমাট বাঁধা রক্ত, মস্তিষ্কের রক্তনালীকে বন্ধ করে দেয়। ফলে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং ঐ ব্যক্তি ইসকিমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এই স্ট্রোকই বেশি পরিমাণে ঘটে থাকে।

এখন প্রশ্ন হলো, আঘাত বা রক্তপাত ব্যতীত এই রক্ত জমাট বাঁধে কীভাবে?

মাঝে মাঝে, হৃৎপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণের ছন্দে গড়মিল দেখা দেয়। হৃৎপিণ্ডে দুটি অলিন্দ থাকে। মাঝে মাঝে অলিন্দ দুটির স্বাভাবিক সংকোচন ঘটে না। ফলশ্রুতিতে হৃৎপিণ্ড থেকে রক্তের সঞ্চালনের গতি ধীর হয়ে যায়। এই সুযোগে রক্তে বিদ্যমান অণুচক্রিকা, ক্লটিং ফ্যাক্টর এবং ফাইব্রিন একত্রিত হয়ে জমাট বাঁধা কুণ্ডলী গঠন করে। সেটি রক্তেই ভাসমান থাকে। জমাটবাধা অংশটি রক্তে সাথে প্রবাহিত হতে হতে একসময় মস্তিষ্কের অতি সরু রক্তনালীতে এসে আঁটকে যায়। এই ঘটনাকে বলে এম্বোলিজম (Embolism)।

এম্বোলিজমের কারণে উক্ত রক্তনালীতে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। ঐ রক্তনালী যেসকল কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করতো, সেসকল কোষ অক্সিজেনের অভাবে মারা যেতে শুরু করে। মস্তিষ্ক ব্যতীত অন্য কোনো অঙ্গে এ ঘটনা ঘটলে আমরা ব্যথা পাই। কিন্তু মস্তিষ্কে ঘটলে ব্যথা পাওয়া যায় না। কারণ মস্তিষ্কে ব্যথা-সংবেদী স্নায়ুকোষ থাকে না।

অক্সিজেন সরবারহ না হওয়ায় স্ট্রোকের ফলে মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশ সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে কিছু কিছু আচরণগত অস্বাভাবিকত্ব ও লক্ষণ দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশটি ভাষা প্রকাশের কাজ করে থাকে তাহলে ঐ বক্তির স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে সমস্যা হবে।

যদি আক্রান্ত অঞ্চল পেশি সঞ্চালনের কাজ করে তবে দেহের কোনো অঙ্গ দূর্বল হয়ে পড়বে এবং নড়াচড়া করতে সমস্যা হবে। এভাবে যদি মস্তিষ্কের অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে তবে চিরস্থায়ী সমস্যা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। তাই দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে রক্তে টিস্যু প্লাজমিনোজেন একটিভেটর (TPA) প্রবেশ করানো হয়। এটি রক্তনালীতে আটকে থাকা রক্তকুণ্ডলীকে ভেঙ্গে দেয় এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া রক্ত নালীতে পুনরায় রক্ত প্রবাহ শুরু হয়।

স্ট্রোকের কয়েক ঘণ্টার মাঝে এটি প্রদান করতে পারলে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবার সম্ভাবনা কমে যায়। যদি কোনো কারণে স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে TPA প্রদান করা সম্ভব না হয় (রক্ত কুণ্ডলী অনেক বড় হলে কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তি কর্তৃক গৃহীত কোনো মেডিসিন এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলে) তবে চিকিৎসকরা Endovascular Thrombectomy নামক পদ্ধতি অবলম্বন করেন।

এ পদ্ধতিতে প্রথমে রক্তে ইনজেকশনের মাধ্যমে ফ্লোরোসেন্ট ডাই প্রদান করা হয়। এরপর শক্তিশালী এক্স-রে যন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কোথায় এবং কোন রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে আছে তা নির্ণয় করা হয়। তারপর একটি অতি সূক্ষ্ম নল পায়ের ধমনী দিয়ে প্রবেশ করিয়ে মস্তিষ্কের আক্রান্ত অঞ্চল পর্যন্ত প্রেরণ করা হয়। এই নলের ভিতর দিয়ে খুব সূক্ষ্ম তন্তুর মাধ্যমে জমাট রক্তকুণ্ডলী বাইরে বের করে আনা হয়।

চিত্র: তন্তু ব্যবহার করে জমাট রক্তকুন্ডলী বের করে আনার কৌশল

স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ককে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা প্রদান করতে হবে এবং এক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত জরুরী। কেননা সময় যত যেতে থাকবে ক্ষতির পরিমাণ ও তীব্রতা ততই বাড়তে থাকবে। তাই রোগীর আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে স্ট্রোক বা স্ট্রোকের সম্ভাবনা শনাক্ত করতে পারলে দ্রুত চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হবে।

কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তি স্ট্রোকে আক্রান্ত কিনা তা সনাক্ত করার জন্য Fast Test পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। পদ্ধতিটি নিম্নরূপ।

১) ব্যক্তিকে হাসতে বলা। মুখমণ্ডলে সংকুচিত কিংবা বাঁকা পেশি দুর্বলতার সংকেত বহন করে। যা স্ট্রোকের ফলে হতে পারে।

২) ব্যক্তিকে দুই হাত উপরে তুলতে বলা। যদি পেশি দুর্বলতার জন্য হাত উপরে তুলতে না পারে তবে এটিও স্ট্রোকের লক্ষণ।

৩) কোনো একটি শব্দ বার বার বলতে বলা। যদি ব্যক্তি এটি স্বাভাবিকভাবে বলতে না পারে তবে হতে পারে স্ট্রোকের কারণে তাঁর মস্তিষ্কের ভাষা প্রকাশ কেন্দ্রে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

উক্ত তিনটি লক্ষণের একটি দেখা মাত্র চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে স্ট্রোকের প্রকটতা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব।

তথ্যসূত্র

https://ed.ted.com/lessons/what-happens-during-a-stroke-vaibhav-goswami

featured image: thinkhealth.priorityhealth.com

সময়

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
কাল অথবা সময় যে নামেই ডাকা হোক না কেন, চলছে যেন চলছেই।
ঘড়ির কাঁটা আমাদেরকে বলে দেয় বর্তমান সময় কত। কিন্তু, ঘড়ির কাঁটা বলে না সময় নিজে বিষয়টা কী?

সময় হচ্ছে ঈশ্বর

হিন্দুদের সময় সংস্কৃতে কাল বলা হয়। এটা ঈশ্বরের একটা অংশ। এটা শুরু হয় যখন ঈশ্বর সকল কিছুকে চালু করে এবং শেষ হয় যখন তিনি এটা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এবং এটাই হচ্ছে অচল হবার সময়। ঈশ্বর সময়ের বাহিরে। সময় চিরন্তর এবং সকল সময় চলছে, কিন্তু তিনি এটার মধ্যে থাকেন না। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত তার ভিতরেই আছে।

প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আইনস্টাইন যুগের আগ পর্যন্ত, মানুষ সময়কে সদা চলমান একটি রাশি হিসেবেই দেখেছে।যার হয়তোবা শুরু অথবা শেষ নেই।
আগেকার যুগের দার্শনিক চিন্তা এরকমই, সময় কখনো থামে না। প্রাচীনকালের লোকেরাও সময়কে পরিমাপ করত। তাদের পরিমাপ পদ্ধতি অবশ্য ভিন্ন ছিল। যেমন- তারা বালু ঘড়ি ব্যবহার করত।

বালু ঘড়ি

শুরু হোক বিজ্ঞান- 

সময়ের সৃষ্টি-
মহাশূণ্যের জন্ম হয়েছে ১৩.৭ বিলিয়ন বছর পূর্বে। একটি Big Bang বা ‘মহাবিস্ফুরণের’ কারণে মহাশূণ্যের জন্ম হয়েছে। তারপর থেকে সেটা একটি বেলুনের মত অবিরাম বিস্তৃত হচ্ছে। মহাবিস্ফোরণ আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। কিন্তু, মহাস্ফোরণের সাথে সময় সম্পর্কিত।
কীভাবে?

মহাবিস্ফোরণ থেকে সৃষ্টি হল পদার্থ, প্রতি পদার্থের আরো সৃষ্টি হল আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়- সময়!
সময় 1 x 10-43 সেকেন্ড, একদম শুরুর কথা-
এটাই পরম শুরুর সময়, যে সময় পর্যন্ত বর্তমান পদার্থবিজ্ঞান যেতে পেরেছে।এর আগের মূহুর্তে কী হয়েছে তা আমরা জানি না।

মহাবিস্ফোরণের আগে কোনো সময় ছিল না, থাকতে পারে না।

নিউটনীয় যুগ- 

রেনেসাঁ যুগে এলেন গ্যালিলিও, এর পরে স্যার আইজ্যাক নিউটন। সময়ের বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা দাড় করালেন।
একটি মতানুসারে সময় মহাবিশ্বের মৌলিক কাঠামোর একটি অংশ যেটি একটি বিশেষ মাত্রা এবং যেখানে ভৌত ঘটনাসমূহ একটি ক্রমধারায় ঘটে। যেমন- আপনি এই লিখাটি পড়ছেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ের আপনার পড়ার ঘটনাটি ঘটছে।

এটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি যা স্যার আইজ্যাক নিউটনের তত্ত্বসম্মত। এই মতানুসারে সময় একটি ভৌত রাশি, যা পরিমাপযোগ্য।

আমদের ত্রিমাত্রিক শরীর আর আমাদের মহাবিশ্ব চতুর্মাত্রিক।সকল ত্রিমাত্রিক বস্তু চলেছি কালের মধ্য দিয়ে।মাত্রাগুলো এতটাই আন্তঃসম্পর্কিত যে এরা প্রকৃতিতে বিচ্ছিন্নভাবে বিরাজ করেনা,মিলেমিশে থাকে একটা সত্তা হিসেবে। আর একেই বলে স্পেস-টাইম। সাধারনভাবে একে অপরের থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়।

ফিলোসোফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা (Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica) থেকে-

Absolute, True, and mathematical Time
in and of itself and of its own nature without reference to anything external
flows uniformly
-Sir Isaac Newton 

এরপর কী?
আসলেন মহান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein)
তিনি বলেছেন-
“The distinction between the past, present and future is only a stubbornly persistent illusion.
অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে শুধুমাত্র একটি ক্রমাগত একগুঁয়েমি বিভ্রম” 

সময় আসলেই কি বিভ্রম?
পদার্থবিজ্ঞানে ঘোর নিয়ে এলেন আলবার্ট আইনস্টাইন, নিয়ে এলেন স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি অথবা অপেক্ষবাদ তত্ত্ব। মাথা ঘুরিয়ে ফেললেন, বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরাও বুঝতে পারছেন না থিওরি অব রিলেটিভিটিকে!

চিরায়ত বলবিদ্যা অনুযায়ী স্থান,কাল এবং ভরকে পরম বলে ধরা হয়। কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইন সর্বপ্রথম দাবী করেন যে পরমস্থান, পরমকাল এবং পরমভর বলতে কিছুই নেই। স্থান,কাল এবং ভর তিনটিকেই আপেক্ষিক ধরে তিনি তার বিখ্যাত আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রস্তাব করেন।

সমবেগে চলমান সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলী অভিন্ন (আপেক্ষিকতাবাদের মূলনীতি)।
তাহলে কি বেগ ভিন্ন হয়ে গেলে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলীও ভিন্ন হয়ে যাবে?

হ্যাঁ মশাই!
চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিষ্ঠিত হল আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। এর ফলে এমন একটা অবস্থা, সবকিছুই যেন উলটপালট হয়ে যায়।

তিনটি বিষয় সামনে চলে এলো।
১)সময় প্রসারণ- একজন চলন্ত পর্যবেক্ষকেরের ঘড়ি, স্থীর পর্যবেক্ষকেরের ঘড়ির চেয়ে ধীরেধীরে টিক্ পরিমাপ করে।
২)দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- বস্তুর গতির দিকে তার দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটে বলে পর্যবেক্ষকের কাছে পরিমিত হয়।
৩)ভর-শক্তির সাম্যতা- E = mc2 (শক্তির পরিমাণ = বস্তুর ভর × আলোর বেগের বর্গ), শক্তি এবং ভর সমতুল্য এবং পারস্পরিক পরিবতনযোগ্য।
অকি!

আমাদের আলোচনার বিষয় ১ নম্বর- সময় প্রসারণ। সময় ক্যামনে প্রসারিত হয়?
ভাউ প্রসারিত হয়।
আপনাকে যদি আলোর বেগে ( সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিঃমিঃ) ছোড়া হয় তাহলে আপনি শক্তিতে পরিণত হবেন, বেঁচে থাকলে অতীত ভবিষ্যৎ সব দেখতে পারবেন!
অকি! ফাজলামো করেন মিয়া? না ভাউ, সত্য কথা।

১৯৭১ সাল- বিজ্ঞানীরা এটমিক ঘড়িকে বিমানে করে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে পাঠালেন। ঘড়ি পাঠানোর আগে পৃথিবীর স্থির একটি ঘড়ির সাথে সময় মিলিয়ে নেয়া হল। যা প্রায় এটোসেকেন্ড ১০−১৮ এস (10−18 s) ক্ষুদ্রতম সময় পরিমাপ করতে পারে।

পৃথিবী ঘুরে বিমানটি ফিরে আসার পর, পুনরায় সময় মিলিয়ে নেয়া হল। দেখা গেল সময়ের পার্থক্য। পৃথিবীতে সময় বেশি অতিবাহিত হয়েছে, যদিও তা খুবই কম। কিন্তু, পরীক্ষিত হল সময়ের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব।

তাহলে আমরা বুঝলাম তাত্ত্বিকভাবে সময় ভ্রমণ (Time Travel) সম্ভব। শুধু সম্ভব না, আমরা আসলে এখনো সময় ভ্রমণ করতেছি।

কীভাবে?
আমরা সৌরজগতের পৃথিবী নামক গ্রহে বাস করি। সূর্য নিজে একটা নক্ষত্র। পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে।আবার এরকম ১০০-৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র নিয়ে আকাশগঙ্গা(milky way) ছায়াপথ। এর মাঝখানে আছে একটা বিশাল ভরের ব্লাকহোল, যাকে কেন্দ্র করে সূর্য ঘুরে।

এরকম বিলিয়ন বিলিয়ন ছায়াপথ নিয়ে নিয়ে আমাদের মহাবিশ্ব।তাহলে সমস্যা কী?
সমস্যা এই ছায়াপথ গুলোকে নিয়ে। সাধারণত প্রত্যেকটি ছায়াপথের মাঝখানেই একটা মেসিভ ব্লাক হোল থাকে। সেই ব্লাকহোলকে কেন্দ্র করেই ছায়াপথের সবকিছুই ঘুরতে থাকে।

এই ব্লাক হোল সব নক্ষত্রকে নিজের দিকে টানতে থাকে। সজোরে টান মারে- সূর্যের টানে পৃথিবী ঘুরে, আকাশগঙ্গা ছায়পথের টানে সূর্য ঘুরে। সৃষ্টি হয় বিশাল টানাটানি যজ্ঞ। আর এর ফলেই সৃষ্টি হয় সুন্দর জিনিস- সময়!

আবার বিভিন্ন ছায়াপথের টানাটানির ধরণ বিভিন্ন, কমবেশি হইতে পারে। তাই সময়ও বিভিন্ন! আপনি যে সময় নিয়ে এই লিখটি পড়ছেন- আমাদের ছায়াপথের বাইরে, বহুদূরের কোনো গ্রহে হয়তোবা এই সময়ে শতবর্ষ পার হয়ে গিয়েছে। আবার আমাদের গ্রহের শতবর্ষ হয়তোবা অন্য কোনো গ্রহের কয়েক মিনিট মাত্র!

আরো বুঝার জন্য- Interstellar নামের একটা মুভি আছে, না দেখে থাকলে অবশ্যই দেখবেন।

Once confined to fantasy and science fiction, time travel is now simply an engineering problem.
MICHIO KAKU, Wired Magazine, August 2003

এইটা কি কইল মিচিও কাকু? সময় ভ্রমণ শুধুমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমস্যা। আসেলেই তাই।

কিন্তু, আরো কিছু সমস্যা আছে। আলোর গতি অর্জন করার জন্য আমরা যদি কোনো যান বানিয়ে ফেলি, তারপরেও সমস্যা মিটবে না। তখন সমস্যা করবে নিউটনের তৃতীয় সূত্র- “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।”

তাই উড্ডয়নের সময় মানুষের তৈরি সময় যান পৃথিবীকে এমন ধাক্কা দিবে, যার ফলে পৃথিবী তার কক্ষচ্যুত হবে।

তাহলে তো আর হচ্ছে না। আরো একটা নিরাশার কথা শুনাই-

তবু আমরা আশা রাখি। জানি সময় চলে যায়, আমিও চলে যাব। তাই শেষ করি-

আমার যাবার সময় হল, আমায় কেন রাখিস ধরে। চোখের জলের বাঁধন দিয়ে বাঁধিস নে আর মায়াডোরে॥ ফুরিয়েছে জীবনের ছুটি, ফিরিয়ে নে তোর নয়ন দুটি–. নাম ধরে আর ডাকিস নে ভাই, যেতে হবে ত্বরা করে।
-রবি ঠাকুর।

তথ্যসূত্র-
1.http://www.physicsoftheuniverse.com/topics_bigbang_timeline.html
2.Wikipedia
3.http://www.notablequotes.com/t/time_travel_quotes.html#m6L7OzqUT7AX4iCT.99

featured image: mks-onlain.ru

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

featured image: motive4you.com

ক্ষুদ্র প্রাণীর কালের দীর্ঘায়ন

সারাদিনের ব্যস্ততার পর একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন একাকী বসে। কানের কাছে গুণগুণ করে গান ধরলো মশার দল। ক্লান্ত হাত দু’টোয় কিছুটা শক্তি এনে বসিয়ে দিলেন প্রচণ্ড এক চড়! খুশি হবেন কিনা, হাতের তালু উলটে হতাশ হলেন আপনি। মশার তো কোনো নামগন্ধ নেই-ই বরং ব্যথা পেলেন নিজেই!

আরেকদিন খাবার টেবিলের কথা। আপনার প্রিয় খাবারগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছির পাল। নিতান্ত অসহায়ের মতোই চেয়ে চেয়ে দেখতে হচ্ছে আপনাকে। যতো চেষ্টাই করুন না কেন, মাছিকে উচিত শিক্ষা দেয়া খুব কঠিন!

আপনার ঘরের বাতিটির কথাই ভাবুন। প্রতি সেকেন্ডে ওটা যে ৫০ বার করে জ্বলছে আর নিভছে- সে খেয়াল আছে? প্রথমবার শুনেই কথাটি বিশ্বাস করেছে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আচ্ছা, মশা-মাছি এতো দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে, বিদ্যুৎ প্রতি সেকেন্ড এতোবার যাওয়া-আসা করে; এগুলো দেখেও আমরা টের পাই না কেন?

ছোট্ট এই প্রশ্নটাই চিন্তার রেখা ফুটিয়েছে বিজ্ঞানীদের কপালে। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা খানিকটা অবাক করবে আপনাকে। তাদের কথায়- প্রাণীর আকার যতো ছোট হয়, চারপাশের সব কিছুকে তারা ততোই ‘স্লো-মোশন’ এ দেখে!

কোনো বস্তু থেকে আলো চোখে এলে, তবেই আমরা তা দেখতে পাই। চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আলো একটি মাধ্যম। প্রাণীর আকার যত ছোট হয়, তথ্য সংগ্রহের হারও তত বেড়ে যায়। মশা-মাছি একই সময়ে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ আমাদের চলাফেরাও ওদের কাছে ধীর গতির মনে হয়। আর এজন্যই! হাত ওঠানোর পরপরই চোখের পলকে কেটে পড়ে পাজীগুলো।

মানুষের চেয়ে মাছির তথ্য সংগ্রহের হার ৬.৭ গুণ বেশি, কুকুরের ২ গুণ, আর বিড়ালের ১.৪ গুণ। অন্যদিকে হাঙর, কচ্ছপ আর ঈল মাছের জন্য এই হার মানুষের চেয়ে কম।

বিভিন্ন প্রাণীর তথ্য সংগ্রহের কীভাবে মাপে? খুব সহজ একটি পদ্ধতির নাম “Critical Flicker Fusion Frequency”। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাণীর সামনে বাতি রেখে বারবার জ্বালানো আর নেভানো হয়। একবার জ্বলা আর একবার নেভাকে এক হার্জ ধরে হার্জ সংখ্যা কমানো অথবা বাড়ানো হয়। একটি ইলেক্ট্রোডের সাহায্যে রেকর্ড করা হয় প্রাণীটির মস্তিষ্কের সংবেদন। সর্বোচ্চ যে কম্পাঙ্কে (হার্জ) কোনো প্রাণী আলোর জ্বলা-নেভা সনাক্ত করতে পারে, তা হলো ঐ প্রাণীটির তথ্য সংগ্রহের হার।

মানুষের তথ্য সংগ্রহের হার ৬০ হার্জ। পৃথিবীর অনেক দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের কম্পাঙ্ক (চলতড়িৎ) ৬০ হার্জ। এর অর্থ ৬০ হার্জের চল তড়িৎ ব্যবহার করে বাতি জ্বালালে, আমাদের চোখে তা সবসময় প্রজ্জলিত বলেই মনে হবে। অন্যদিকে মাছির কম্পাঙ্ক ২৫০ হার্জ! বুঝতেই পারছেন মাছি কীভাবে এত দ্রুত আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, আর জান বাঁচিয়ে সরে পড়তে পারে!

কোনো এক অবসন্ন বিকেলে ঘরে বসে টিভিতে মুভি দেখছেন আপনি। পোষা কুকুরটাও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পাশে বসলো আপনাকে সঙ্গ দেবে বলে। সত্যি বলতে আপনার চোখে যেটি মুভি, পোষা প্রাণিটির চোখে তা ছবির স্লাইড-শো মাত্র! মানুষের ১ মিনিট তুলনামূলকভাবে কুকুরের কাছে প্রায় ৭ মিনিট বলে মনে হয়! এখন আপনিই বলুন- “কুকুর কি টেলিভিশন দেখতে পারে?”

প্রাণীদের মাঝে প্রকৃতির এমন অদ্ভুত খেয়াল কেবলই জীববৈচিত্র্য নয়। সেই আদিকাল থেকেই প্রাকৃতিক খাদ্য-শৃঙ্খলে এক প্রাণী অপর প্রাণীর খাদ্য হয়েছে। শিকারীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য শিকারকে দক্ষ হতে হয়। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা বিবর্তনের এই ধারায় স্লো-মোশন দৃষ্টি শিকারের জন্য খুবই প্রত্যাশিত এক অভিযোজন। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে আকার, বুদ্ধিমত্তা আর শক্তির পাশাপাশি এটিও এক অনন্য দক্ষতা হয়ে উঠেছে।

শুধু টিকে থাকাই নয়, স্লো-মোশনের ধারণা কাজে লাগিয়ে একই প্রজাতির প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। তা আবার শত্রুকে অগোচরে রেখেই! গভীর সমুদ্রের কিছু প্রাণী কৃত্রিম আলো তৈরি করতে পারে। এরা শত্রুর অবস্থান আর খাবারের সন্ধান আদান প্রদান করে আলোক-তরঙ্গের মাধ্যমে।

শুধু আকারই নয়, কালের দীর্ঘায়ন নির্ভর করে বয়সের উপরেও। একই প্রজাতির প্রাণীদের মাঝে কম বয়সীরা বেশি বয়সীদের চেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। আর এজন্যই আমাদের ছেলেবেলা অনেক ধীর গতিতে কাটে। আবার প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের কাছে ছোটদের অনেক চঞ্চল বলে মনে হয়!

শুধু দৃষ্টিই নয়, বরং শ্রবণ আর ঘ্রাণের মতো ইন্দ্রিয়গুলোও কালের দীর্ঘায়ন মেনে চলে। যেমন: মানুষ সর্বোচ্চ ২০ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। কুকুর প্রায় ৪০ হাজার, ডলফিন প্রায় দেড় লক্ষ হার্জ আর বাদুড় দুই লক্ষ হার্জেরও বেশি কম্পাঙ্ক শুনতে পায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই কুকুর, ডলফিন আর বাদুড়ের কাছে সময় মানুষের চেয়ে ধীরে চলে।

স্লো-মোশন দৃষ্টির এই ধারণা প্রকৃতির রহস্যময়তার আরেকটি উদাহরণ। এমন আরো কতো বিষ্ময়কর তথ্য যে লুকিয়ে আছে আমাদের চারপাশে- চেনার মাঝে অচেনা হয়ে! তার সবকিছু প্রকৃতি হয়তো কখনোই জানতে দেবে না। তবুও কৌতূহলী মনের অনুসন্ধিৎসা চলবে নিরন্তর।

তথ্যসূত্রঃ

লেখকঃ আবু শাকিল আহমেদ

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

ক্ষুদ্র প্রাণীর কালের দীর্ঘায়ন

সারাদিনের ব্যস্ততার পর একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন একাকী বসে। কানের কাছে গুণগুণ করে গান ধরলো মশার দল। ক্লান্ত হাত দু’টোয় কিছুটা শক্তি এনে বসিয়ে দিলেন প্রচণ্ড এক চড়! খুশি হবেন কিনা, হাতের তালু উলটে হতাশ হলেন আপনি। মশার তো কোনো নামগন্ধ নেই-ই বরং ব্যথা পেলেন নিজেই!

আরেকদিন খাবার টেবিলের কথা। আপনার প্রিয় খাবারগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছির পাল। নিতান্ত অসহায়ের মতোই চেয়ে চেয়ে দেখতে হচ্ছে আপনাকে। যতো চেষ্টাই করুন না কেন, মাছিকে উচিত শিক্ষা দেয়া খুব কঠিন!

আপনার ঘরের বাতিটির কথাই ভাবুন। প্রতি সেকেন্ডে ওটা যে ৫০ বার করে জ্বলছে আর নিভছে- সে খেয়াল আছে? প্রথমবার শুনেই কথাটি বিশ্বাস করেছে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আচ্ছা, মশা-মাছি এতো দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে, বিদ্যুৎ প্রতি সেকেন্ড এতোবার যাওয়া-আসা করে; এগুলো দেখেও আমরা টের পাই না কেন?

ছোট্ট এই প্রশ্নটাই চিন্তার রেখা ফুটিয়েছে বিজ্ঞানীদের কপালে। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা খানিকটা অবাক করবে আপনাকে। তাদের কথায়- প্রাণীর আকার যতো ছোট হয়, চারপাশের সব কিছুকে তারা ততোই ‘স্লো-মোশন’ এ দেখে!

কোনো বস্তু থেকে আলো চোখে এলে, তবেই আমরা তা দেখতে পাই। চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আলো একটি মাধ্যম। প্রাণীর আকার যত ছোট হয়, তথ্য সংগ্রহের হারও তত বেড়ে যায়। মশা-মাছি একই সময়ে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ আমাদের চলাফেরাও ওদের কাছে ধীর গতির মনে হয়। আর এজন্যই! হাত ওঠানোর পরপরই চোখের পলকে কেটে পড়ে পাজীগুলো।

মানুষের চেয়ে মাছির তথ্য সংগ্রহের হার ৬.৭ গুণ বেশি, কুকুরের ২ গুণ, আর বিড়ালের ১.৪ গুণ। অন্যদিকে হাঙর, কচ্ছপ আর ঈল মাছের জন্য এই হার মানুষের চেয়ে কম।

বিভিন্ন প্রাণীর তথ্য সংগ্রহের কীভাবে মাপে? খুব সহজ একটি পদ্ধতির নাম “Critical Flicker Fusion Frequency”। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাণীর সামনে বাতি রেখে বারবার জ্বালানো আর নেভানো হয়। একবার জ্বলা আর একবার নেভাকে এক হার্জ ধরে হার্জ সংখ্যা কমানো অথবা বাড়ানো হয়। একটি ইলেক্ট্রোডের সাহায্যে রেকর্ড করা হয় প্রাণীটির মস্তিষ্কের সংবেদন। সর্বোচ্চ যে কম্পাঙ্কে (হার্জ) কোনো প্রাণী আলোর জ্বলা-নেভা সনাক্ত করতে পারে, তা হলো ঐ প্রাণীটির তথ্য সংগ্রহের হার।

মানুষের তথ্য সংগ্রহের হার ৬০ হার্জ। পৃথিবীর অনেক দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের কম্পাঙ্ক (চলতড়িৎ) ৬০ হার্জ। এর অর্থ ৬০ হার্জের চল তড়িৎ ব্যবহার করে বাতি জ্বালালে, আমাদের চোখে তা সবসময় প্রজ্জলিত বলেই মনে হবে। অন্যদিকে মাছির কম্পাঙ্ক ২৫০ হার্জ! বুঝতেই পারছেন মাছি কীভাবে এত দ্রুত আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, আর জান বাঁচিয়ে সরে পড়তে পারে!

কোনো এক অবসন্ন বিকেলে ঘরে বসে টিভিতে মুভি দেখছেন আপনি। পোষা কুকুরটাও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পাশে বসলো আপনাকে সঙ্গ দেবে বলে। সত্যি বলতে আপনার চোখে যেটি মুভি, পোষা প্রাণিটির চোখে তা ছবির স্লাইড-শো মাত্র! মানুষের ১ মিনিট তুলনামূলকভাবে কুকুরের কাছে প্রায় ৭ মিনিট বলে মনে হয়! এখন আপনিই বলুন- “কুকুর কি টেলিভিশন দেখতে পারে?”

প্রাণীদের মাঝে প্রকৃতির এমন অদ্ভুত খেয়াল কেবলই জীববৈচিত্র্য নয়। সেই আদিকাল থেকেই প্রাকৃতিক খাদ্য-শৃঙ্খলে এক প্রাণী অপর প্রাণীর খাদ্য হয়েছে। শিকারীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য শিকারকে দক্ষ হতে হয়। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা বিবর্তনের এই ধারায় স্লো-মোশন দৃষ্টি শিকারের জন্য খুবই প্রত্যাশিত এক অভিযোজন। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে আকার, বুদ্ধিমত্তা আর শক্তির পাশাপাশি এটিও এক অনন্য দক্ষতা হয়ে উঠেছে।

শুধু টিকে থাকাই নয়, স্লো-মোশনের ধারণা কাজে লাগিয়ে একই প্রজাতির প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। তা আবার শত্রুকে অগোচরে রেখেই! গভীর সমুদ্রের কিছু প্রাণী কৃত্রিম আলো তৈরি করতে পারে। এরা শত্রুর অবস্থান আর খাবারের সন্ধান আদান প্রদান করে আলোক-তরঙ্গের মাধ্যমে।

শুধু আকারই নয়, কালের দীর্ঘায়ন নির্ভর করে বয়সের উপরেও। একই প্রজাতির প্রাণীদের মাঝে কম বয়সীরা বেশি বয়সীদের চেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। আর এজন্যই আমাদের ছেলেবেলা অনেক ধীর গতিতে কাটে। আবার প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের কাছে ছোটদের অনেক চঞ্চল বলে মনে হয়!

শুধু দৃষ্টিই নয়, বরং শ্রবণ আর ঘ্রাণের মতো ইন্দ্রিয়গুলোও কালের দীর্ঘায়ন মেনে চলে। যেমন: মানুষ সর্বোচ্চ ২০ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। কুকুর প্রায় ৪০ হাজার, ডলফিন প্রায় দেড় লক্ষ হার্জ আর বাদুড় দুই লক্ষ হার্জেরও বেশি কম্পাঙ্ক শুনতে পায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই কুকুর, ডলফিন আর বাদুড়ের কাছে সময় মানুষের চেয়ে ধীরে চলে।

স্লো-মোশন দৃষ্টির এই ধারণা প্রকৃতির রহস্যময়তার আরেকটি উদাহরণ। এমন আরো কতো বিষ্ময়কর তথ্য যে লুকিয়ে আছে আমাদের চারপাশে- চেনার মাঝে অচেনা হয়ে! তার সবকিছু প্রকৃতি হয়তো কখনোই জানতে দেবে না। তবুও কৌতূহলী মনের অনুসন্ধিৎসা চলবে নিরন্তর।

তথ্যসূত্রঃ

লেখকঃ আবু শাকিল আহমেদ

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের আয়না এবং স্পেশাল রিলেটিভিটির দুইটি স্বীকার্য

স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী। সবচেয়ে আলোচিত এবং মেধাবীও বলা চলে। বিজ্ঞানী মাইকেলসন আর মর্লি আলোর বেগের আপেক্ষিকতার পরীক্ষা করেছিলেন পরীক্ষাগারের, যন্ত্র পাতির সাহায্য নিয়ে। আর কিশোর আইনস্টাইন সেটা করেছিলেন তার মাথার পরীক্ষাগারে, একটি ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে। আজ আমরা সেই পরীক্ষার কথায় জানবো। তার সাথে সাথে জানবো এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে কিভাবে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে যাই।

Image result for albert einstein wallpaper

তখন ১৮৯৬ সাল। আইনস্টাইনের বয়স কেবল ষোল। আইনস্টাইন তখনও মাইকেলসন আর মর্লির ইথারের পরীক্ষার বিষয়ে একদমই জানতেন না। ইথারের অস্তিত্ব যে কিছুটা সন্দেহের মুখে পড়ে গেছে তা না জেনেই আইনস্টাইন তার জীবন্ত পরীক্ষাগার, নিজের মাথায় একটি থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। আইনস্টাইন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন, “কি ঘটবে যদি আমি এখন আমার দুই হাতে একটি আয়না ধরে আলোর বেগে দৌড়াতে শুরু করি। আমি নিজে কি নিজের প্রতিচ্ছবি সেই আয়নায় দেখতে পাবো?” বলে রাখা ভাল যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতায় শুধু আলোর বেগ কেন, আলোর চেয়ে বেশি বেগে যাওয়ার বিষয়েও কোন রকম বিধি নিষেধ ছিল না।

বিজ্ঞানীরা আরো আগে থেকেই জানতেন যে, আলোর বেগ ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ড। কিন্তু কার সাপেক্ষে আলোর এই বেগ? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য তারা ইথারের ধারণার অবতারণা করেছিলেন। অর্থাৎ, আইনস্টাইন যখন আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেবেন তখন আলো ইথার মাধ্যমে ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আইনস্টাইনের হাতে ধরে রাখা আয়নাটির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করবে। আইনস্টাইন নিজেও আলোর বেগে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে আলো আর আইনস্টাইনের বেগ সমান বলে আলো কখনই আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আয়নায় পৌঁছাতে পারবে না।

এ পর্যন্ত বুঝতে কারো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এবার আমরা মনে করি দেখি যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটিতে কি বলা হয়েছিল। এই স্বীকার্য আমাদের বলেছিল যে, “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”। যার অর্থ আমরা যদি একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি বস্তু বিবেচনা করি তাহলে আমরা কোনভাবেই বলতে পারব না যে কে গতিশীল আছে আর কে স্থির আছে।

চলুন, এখন আবার আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্টে ফিরে যাই। আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে এই বিষয়টি নিশ্চিত যে, আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড়ালে আসলে আমাদের প্রতিবিম্ব আয়নাতে আমরা দেখতে পারবো না। ফলে নিজেদের মুখ আমরা আয়নায় দেখতে পাবো না। তাহলে কি দাঁড়ালো? একজন যদি আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেয় এবং আয়নায় দেখে নিজের প্রতিবিম্ব সেখানে পরছে না তখনই সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে, সে আসলেই আলোর বেগে গতিশীল আছে। কিন্তু গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার স্বীকার্য আমাদের বলেছিল কোন একটি পরীক্ষা স্থির অবস্থায়ই করা হোক বা, সমবেগে গতিশীল থাকা অবস্থায়ই করা হোক না কেন একই ফলাফল দেবে। কিন্তু এই থট এক্সপেরিমেন্টে এই স্বীকার্যটি তো ভুল প্রমাণ হয়ে গেল!! তাহলে?

Image result for looking in mirror

আইনস্টাইন তার এই থট এক্সপেরিমেন্টে ইথার ধারণাটিকে প্রথমে সত্য বলে ধরে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, আলোর বেগ শুধু ইথারের সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড থাকে। অর্থাৎ, ইথার ধারণা সঠিক হলে গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটি ভুল হয়ে যায়।

যদি গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যকে সত্য হতে হয় তাহলে নিজের প্রতিবিম্ব আয়নায় দেখা যেতে হবে স্বাভাবিকভাবেই। আর সেটা তখনই সম্ভব হবে যখন আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই ধ্রুব বা, একই হবে। তাহলে আইনস্টাইন যদি আলোর বেগেও যান তাহলেও আলো তার সাপেক্ষে আলোর বেগেই চলবে। ফলে আলো স্বাভাবিকভাবেই আয়নায় পৌঁছাবে আর আইনস্টাইন তার মুখমন্ডল দেখতে পাবেন।

বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কারভাবে বলা যাক। ধরি, আইনস্টাইন একটি আয়না নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তাহলে তিনি যদি এখন তার ডান হাতটি হালকা নাড়ান তবে খুব কম সময়ের মাঝে সামনের আয়নাতে তিনি তার ডান হাত নাড়ানোটি দেখতে পাবেন। এখন যদি তিনি আলোর কাছাকাছি বেগে আয়নাটি নিয়ে দৌড় দেন তবে গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে তার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাবে (যদি কোন গাড়ি ১০ মি./সেকেন্ড বেগে যায় আর আপনি ৫ মি./সেকেন্ড বেগে সেই একই দিকে দৌড়ান তাহলে আপনার কাছে মনে হবে গাড়ির বেগ কমে ৫ মি./সেকেন্ড হয়ে গিয়েছে। একই যুক্তিতে আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলে আপনার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাওয়ার কথা)। তাহলে ডান হাত নাড়ানোর অনেক পরে তিনি আয়নাতে তার হাত নাড়ানো দেখতে পাবেন। সময়ের এ পার্থক্য দিয়েও যে কেউ বলে ফেলতে পারবেন যে তিনি আসলে স্থির নয় বরং গতিশীল আছেন। অর্থাৎ, আপনি স্থির থাকলে আলোর বেগ আপনার কাছে যত হবে আপনি যদি আলোর কাছাকাছি বেগেও দৌড়ানো শুরু করেন তবেও আলোর বেগ আপনার সাপেক্ষে ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ডই থাকতে হবে। তবেই শুধুমাত্র গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকে বাঁচানো সম্ভব হবে। আর এটি সত্য হলে আলোর বেগের ওপড় ইথারের আর কোন প্রভাব থাকে না। সুতরাং ইথার ধারণাটিও অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।

অর্থাৎ, গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্য এবং ইথার ধারণা এ দুটোই একই সাথে সত্য হতে পারেনা। এদের যেকোন একটাকে মিথ্যা হতেই হবে। এর আগেই মাইকেলসন-মর্লির এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা দেখেছি ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হয় নি। আইনস্টাইনও দেখলেন আলোর বেগকে যদি সব কিছুর সাপেক্ষে সর্বদা একই ধরে নেয়া হয় তাহলে ইথারের আর প্রয়োজন পড়ে না। এভাবেই ইথার ধারণাটি আইনস্টাইন বাতিল করে দিলেন আর গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকেই নিজের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিরও প্রথম স্বীকার্য বানিয়ে নিলেন। আর দ্বিতীয় স্বীকার্যতে বললেন, আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব যা আমরা উপড়ের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে দেখলাম।

আলোর বেগ সব কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব এই কথাটি মেনে নিতে অনেকেরই প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট হয়। তাই বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করা যাক। ধরুন, পৃথিবীর মানুষ আর এলিয়েনদের মাঝে একটি যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। আপনি একটি স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে গেলেন। একজন এলিয়েনও তাদের স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে চলে গেলো। দুজনের স্পেস শিপেই কিন্তু হেডলাইটের মতো লাইট জ্বলার ব্যবস্থা আছে। হঠাৎ জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়াই আপনি আপনার স্পেস শিপটি নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তখনই এলিয়েন স্পেস শিপটি ২,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ছুঁটে আসল। আর আসতে আসতে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গুলি ছুঁড়তে পারে এমন একটি বন্দুক থেকে আপনার দিকে গুলি ছুঁড়তে লাগলো। তাহলে আপনি গুলিগুলোর বেগ কত দেখবেন? নিশ্চয় উত্তর দেবেন যে, আপনি দেখবেন গুলিগুলো ২,০০,০১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ধেয়ে আসছে। কারণ গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা বলে যে, গুলির বেগের সাথে স্পেস শিপের বেগ যোগ হয়ে যাবে। এখন স্পেস শিপটি যদি হঠাৎ করে তার তার হেড লাইটটি জ্বালিয়ে দেয় তাহলে কি দেখবেন? আলোর বেগ কত হবে? স্পেস শিপের বেগ + আলোর বেগ? মানে ৫,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড? গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা তো তাই বলে। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, না। তখনও আপনি দেখবেন আলোর বেগ শুধু আলোর বেগের সমানই। মানে সর্বদাই ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড। এক ফোঁটা কমও নয় আবার এক ফোঁটা বেশিও নয়। এটাই আইনস্টাইনের দ্বিতীয় স্বীকার্য। এটাই সত্য!

আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যায়। এ কারণেই মাইকেলসন-মর্লি যখন তাদের পরীক্ষাটি করেন তখন তাদের পরীক্ষায় সোজা পাঠানো আলো আর সমকোণে পাঠানো আলোর বেগের মাঝে কোন পার্থক্য ধরা পড়েছিলো না। পরবর্তিতেও অনেক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে।

অর্থাৎ, দেখা গেলো আইনস্টাইনের এই ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে গেলাম। এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। তাই চলুন এ স্বীকার্য দুটি আরেকবার সুন্দর করে আমরা লিখে ফেলি। আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি হলঃ

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করে আমরা কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধেও বুঝতে পারি। গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার দ্বিতীয় স্বীকার্য, যেখানে সময়কে পরম হিসেবে ধরা হয়েছিল তা যে ভুল তা আমরা আইনস্টাইনের উপড়ের দুটি স্বীকার্য থেকে পাই। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্য ঠিক হলেও দ্বিতীয় স্বীকার্যে পরম সময়ের বদলে পরম আলোর বেগ ব্যবহার করলেন আইনস্টাইন। এছাড়াও আমরা দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন, ভর বা, ভরের আপেক্ষিকতা এবং ভর আর শক্তি যে একই জিনিস এমন অনেক কিছু আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি থেকে পরবর্তিতে জানতে এবং বুঝতে পারি। এ বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তি কোন এক লেখায় কথা বলা যাবে। আজ এ পর্যন্তই। কষ্ট করে এতদূর পড়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ।

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।