পার্কার সোলার প্রোব: ১২ আগস্ট উৎক্ষেপিত যে মহাকাশযান অর্জন করবে মহাকাশ অভিযাত্রার ইতিহাসের রেকর্ড বেগ

নাসা এবং United Launch Alliance মিলে উৎক্ষেপণ করল সবচেয়ে দ্রুতগামী মহাকাশযান পার্কার সোলার প্রোব। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই স্পেসপ্রোবটি যাত্রা করে সূর্যের দিকে। সম্মিলিত উৎক্ষেপণ জোট বা ইউএলএ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মহাকাশে যান উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অভিজ্ঞ। এই কোম্পানির রয়েছে একাধারে ১২০টি উৎক্ষেপণ পরিচালনা করার রেকর্ড এবং উৎক্ষেপণে ১০০% সফলতা। এ প্রকল্পটির আর্থিক খরচ ১.৫ বিলিয়ন ডলার।

মহাকাশযানটি গতকাল (১১ই আগস্ট ২০১৮) উৎক্ষেপণের কথা ছিল, কিন্তু উৎক্ষেপণের শেষ মিনিটে ত্রুটি ধরা পড়ায় সময় পিছিয়ে দেয়া হয়। উৎক্ষেপণের নতুন সূচি ঠিক করা হয় আজ রবিবার (১২ আগস্ট ২০১৮) ফ্লোড়িডার কেপ ক্যানাভারালের স্থানীয় সময় রাত ৩:৩১ এ। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সময় দুপুর ১টা ৩১ মিনিটে এর উৎক্ষেপণের সম্ভাব্য সময় এটি উৎক্ষেপিত হয়েছে। পার্কার সোলার প্রোব উৎক্ষেপণের ভিডিও অবলোকন করা যাবে এখানে

এই প্রোবকে মহাকাশে নিয়ে গেছে ইউএলএ এর শক্তিশালী রকেট ডেল্টা IV। আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৪ এর ডিসেম্বরে পার্কার সোলার প্রোব হবে ইতিহাসের দ্রুততম মহাকাশযান। এ ঘটনাটি ঘটবে যখন প্রোবটি সূর্যের সবচেয়ে কাছে পৌঁছুবে। এ অভিযানের রূটম্যাপ বলছে এটি সূর্য থেকে ৩.৮৩ মিলিয়ন মাইল (৬ মিলিয়ন কিলোমিটার) দূর দিয়ে যাবে। ঐ বিন্দুতে গিয়ে প্রোবটির গতি হবে ৬৯২,০০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। অর্থাৎ সেকেন্ডে ১৯২ কিলোমিটারেরও বেশি।

এ দূরত্ব কত বড় আন্দাজ করতে পৃথিবীর সাথে তুলনা করে দেখা যেতে পারে। এই গতিতে প্রোবটির ওয়াশিংটন ডিসি থেকে টোকিওতে যেতে ১ মিনিটেরও কম সময় লাগত। আর টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া যেতে চার সেকেন্ডের চেয়ে একটু বেশি সময়!

নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে পার্কার সোলার প্রোব টিম প্রোবের পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন তাপীয় বায়ুশূন্য চেম্বারে; Image Credit: Ed Whitman/Johns Hopkins APL/Nasa

পার্কার স্পেসপ্রোবের পেছনে কাজ করা দলটি অবশ্য নির্বিকার এই রেকর্ডভাঙা কাজে। তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ অভিযানের খুঁটিনাটিতে। এই প্রজেক্টের ম্যানেজার এন্ড্রু ড্রিসম্যান নিযুক্ত আছেন জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটির ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ল্যাবরেটরিতে। তিনি বলেন, “মহাকাশে কোনো কিছু দ্রুতবেগে ছোটার জন্য সেটার ডিজাইন করা যতটা কঠিন তেমনি ধীরে ছোটার ডিজাইন করাও সমান মাত্রার কঠিন। কারণ হল, মহাশূন্যে তো একটা চালু দশাকে ঠেকানোর মত কিছু নেই।”

এ ব্যাপারগুলো অরবিটাল মেকানিক্সে ধারণা থাকলে খুব স্পষ্ট হয়ে যায়। গতি বাড়ানো যেমন সমস্যা, তেমনি মহাকাশযান টিকিয়ে রেখে এমন গতিপথ বাছাই করাও সমস্যা যা ঐ গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে মহাকর্ষের আকর্ষণে বিচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করবে। উল্লেখ্য মহাকাশে কোনো মহাকাশযানের গতিবৃদ্ধির এখনো পর্যন্ত সেরা উপায় হল কোনো গ্রহের বা সূর্যের মাধ্যাকর্ষণক্ষেত্রকে কাজে লাগানো। ড্রিসম্যান অবশ্য মজা করে বলেন, “মহাকাশযান কেবল জানে না এটি যে দ্রুতগতিতে ছুটছে।”

পার্কার সোলার প্রোবের অভিযানের গতিপথ | Image Credit: HORIZONS System, JPL, NASA

যাই হোক, এটা যে নিতান্ত ঝামেলাবিহীন অভিয়ান নয় তা স্পষ্ট। স্পেসপ্রোব না জানলেও, বিজ্ঞানীদের ঠিকই স্পেসপ্রোবকে সম্মুখীন হতে হবে এমন বিবিধ পরিস্থিতির কথা মাথায় রাখতে হয়। পার্কার সোলার প্রোব অতিদ্রুতবেগে ছোটার সাথে হিসেবে রাখতে হচ্ছে কোন মহাকাশীয় পরিবেশের মধ্য দিয়ে এটি গমন করছে। এটির অভিযানপথে রয়েছে এমন ধুলোময় পরিবেশ যাকে বলা হয় হাইপারভেলোসিটি ডাস্ট এনভায়রনমেন্ট। অর্থাৎ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বহু ধুলিকণাময় পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাবে পার্কার।

হাইপারভেলোসিটি অর্থাৎ উচ্চগতি বলতে প্রচলিতভাবে ধরা হয় ৩ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড বেগকে। এই বেগের ফলে দ্রুত ছোটা কণাগুলোর ভরবেগও যথেষ্ঠ মাত্রায় বেশি। ফলে এরা প্রবল ভরবেগে আঘাত করবে পার্কার সোলার প্রোবকে যার কারণে প্রোবের বেগের দিক বিদিকও হয়ে যেতে পারে। আসলে মহাকাশে অল্প আঘাতই বিশাল দূরত্বে ছোটা বস্তুর জন্য যথেষ্ঠ দিক বিদিকের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। এ সমস্যা নিরসণে বিজ্ঞানীরা স্পেসক্রাফটে ব্যবহার করবেন কেভলার কম্বল। এ বিশেষ কম্বল অধিক তাপসহ আর সিন্থেটিক ফাইবারের তৈরি। এ ধরণের ফ্যাব্রিকের বহুল ব্যবহার রয়েছে বুলেট প্রতিরোধী জ্যাকেট, শরীরের বর্ম, বোমার চাদর ইত্যাদি নির্মাণে। অর্থাৎ এই সমাধান বহু আঘাতে টেকসই থাকার সুবিধা দিতে পারছে।

শুক্রের অভিকর্ষকেও পার্কার সোলার প্রোব কাজে লাগাবে। শুক্রের কাছ দিয়ে পার্কার সোলার প্রোব ৭ বার অতিক্রম করবে। সূর্যের দিকে পাঠিয়ে সূর্য ওপাশ দিয়ে প্রোবকে ফেরত আনার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পৃথিবী নিজেই সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াচ্ছে, সে অনুসারে এই আদিবেগ পেয়ে যাচ্ছে প্রোব। কিন্তু এটি সূর্যের দিকের সাথে সমকোণে হলে পথ বেঁকে বড় হয়ে যাবে। ফলে সময় লাগবে আরো বেশি, উদ্দিষ্ট লক্ষ্যও টিকবে না। বেগ সংক্রান্ত সমস্যা বুঝতে দেখতে পারেন এই ভিডিওটি।

 

অভিযানের পথ অনুযায়ী, পার্কার সোলার প্রোব যখন সূর্যের সবচেয়ে নিকট বিন্দু দিয়ে যাবে তখন এর বেগ হবে ভয়েজার ১ এর বেগেরও দশগুণের বেশি। ভয়েজার ১ উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল ১৯৭৭ এ, পাঁচ বছর আগে এটি সৌরজগতের বাইরে চলে গিয়েছে। প্রক্সিমা সেন্টরাইয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঘণ্টায় ৬১,০০০ কিলোমিটার বেগে

 

পার্কার সোলার প্রোবের গতিপথে শুক্রের এবং সূর্যের অভিকর্ষ যেভাবে ব্যবহার করে উচ্চগতি অর্জিত হবে; Image Credit: Guardian graphic | Source: The Johns Hopkins University Applied Physics Laboratory

স্বাভাবিক হিসেবে গতি অর্জনের কৌশলের দিক থেকে ভয়েজার ১-ই ইতিহাসখ্যাত। তবে ২০১৬ এর জুলাইতে নাসার জুনো প্রোব বৃহস্পতির অভিকর্ষের প্রভাবে কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে বৃহস্পতির গ্যাসীয় জমিনে পড়ে ধ্বংস হয়। তখন এর বেগ পৌঁছে গিয়েছিল ঘণ্টায় ২৬৬,০০০ কিলোমিটারে। এ গতিবেগ কাজে না লাগলেও কতদূর অর্জনযোগ্য এটার একটা নমুনা পাওয়া গিয়েছিল।

গ্রহের অভিকর্ষকে ব্যবহার না করে, কেবল সূর্যের অভিকর্ষকে ব্যবহার করে রেকর্ডধারী স্পেসক্রাফট দুটি হল হেলিওস I এবং II. ১৯৭০ এর দশকে এরা উৎক্ষেপিত হয়েছিল। বুধ সূর্যের যত কাছে হেলিওস মহাকাশযান-যুগল তার চেয়েও কাছে প্রবেশ করেছিল। এরা অর্জন করেছিল ঘণ্টায় ২৪১,০০০ কিলোমিটার বেগ বা সেকেন্ডে ৭০ কিলোমিটার।

পার্কার সোলার প্রোব দৃশ্যমান সৌরপৃষ্ঠ থেকে চার মিলিয়ন মাইল (৬.৪ মিলিয়ন কিলোমিটার) নিকট দিয়ে যাবে। ফলে হেলিওসের চেয়েও প্রায় তিনগুণ বেগে দৌঁড়াবে এটি। সূর্যের উত্তাপকে আরেক ধাপ এগিয়ে চ্যালেঞ্জ জানানোর পথে অভিযাত্রা শুরু হয়ে গেছে… গতি অর্জন মানে তো আমাদের স্বপ্নে আশার সঞ্চার… বহুদূর ছুটে যেতে।

 

তথ্যসূত্র:

  1. https://www.space.com/41447-parker-solar-probe-fastest-spacecraft-ever.html
  2. https://www.theguardian.com/science/2018/aug/10/mission-to-touch-the-sun-nasa-to-launch-parker-solar-probe
  3. https://blogs.scientificamerican.com/life-unbounded/the-fastest-spacecraft-ever/
  4. https://www.space.com/41461-parker-solar-probe-launch-delayed.html
  5. https://voyager.jpl.nasa.gov/mission/status/

সূর্যের কেন্দ্র থেকে পৃথিবীতে যেভাবে আলো আসে

নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার নাম শুনে থাকবো নিশ্চয়। সূর্যের কেন্দ্রে অবিরাম সংঘটিত হচ্ছে এই বিক্রিয়া। উৎপন্ন করছে ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন তাপমাত্রা এবং বিপুল শক্তি। মানুষের বেঁচে থাকতে হলে যেমন হার্টের কার্যকারিতা প্রয়োজন, তেমনি সূর্যের তেজ বা জীবন এই ফিউশন বিক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল।

সূর্য গাঠনিকভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত। যেমন: কেন্দ্রীয় অঞ্চল, বিকিরণ অঞ্চল, পরিচলন অঞ্চল ইত্যাদি। কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সূর্যের জ্বালানী ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বাকি অঞ্চলগুলো কেন্দ্রে উৎপন্ন ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন তাপমাত্রাকে বাইরে ছড়িয়ে দেয়।

সূর্যের কেন্দ্রে প্রতিনিয়ত বিলিয়ন বিলিয়ন পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে চলছে। প্রতি সেকেন্ডে ৫৬৪ মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন থেকে ৫৬০ মিলিয়ন টন হিলিয়াম তৈরি হচ্ছে। আর বাকি চার মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন থেকে উল্লেখিত শক্তি তৈরি হচ্ছে। ফিউশন বিক্রিয়ায় সূর্যের কেন্দ্রে উৎপন্ন এই শক্তি সূর্যের বহিরাংশের দিকে ফোটন তথা তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গ হিসেবে আলোক কণা সৌর পৃষ্ঠ থেকে বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

সূর্যের কেন্দ্রের ঘনত্ব পানির ঘনত্বের ১৫ গুন বেশি। আবার সূর্যের বিষুবীয় অঞ্চল বরাবর মোট ব্যাসার্ধ ৬,৯৫,৭০০ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর মোট ব্যাসার্ধের ১০৯ গুন। সূর্যের কেন্দ্রে উৎপন্ন তাপ ও আলোকে এই বিশাল অঞ্চল পাড়ি দিতে হয়। যদিও সূর্যের কেন্দ্র থেকে বাইরের অঞ্চলের দিকে ঘনত্ব পর্যায়ক্রমে হ্রাস পায়,তবুও কেন্দ্রে উৎপন্ন তাপ ও আলোকে এই বিশাল অঞ্চল পাড়ি দিতে অনেক সময় লাগে। আপনারা জেনে আশ্চর্য হবেন যে, বিকিরণ অঞ্চলকে পাড়ি দিতে একটি গামা রশ্মির তথা ফোটন কণার গড়ে ১,৭১,০০০ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ বছর সময় লাগে এবং সৌর পৃষ্ঠ হতে পৃথিবীতে আসতে লাগে মাত্র সোয়া আট মিনিট।

সুতরাং চিন্তা করতেও অবাক লাগে, আমরা পৃথিবীতে বসে আজকে যে আলো পাচ্ছি তা কত লক্ষ বছর পূর্বে সূর্যের কেন্দ্রের ফিউশন বিক্রিয়ার ফল? একারণেই বলতে হয়, আমরা মহাবিশ্বের দিকে তাকালে শুধু অতীতকেই দেখতে পাই। আমরা আজ আলোচনা করব কীভাবে তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গ এই বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে সৌরজগতে ছড়িয়ে পড়ছে।

সূর্যের কেন্দ্রকে ঘিরে রাখা প্লাজমার ( ইলেকট্রন ও আয়নের মিশ্রণ) ঘনত্ব অনেক বেশি। তাইতো ফিউশন বিক্রিয়ায় নির্গত গামা রশ্মি( ফোটনের সর্বনিম্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্য) খুব কম দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার পূর্বে ইলেকট্রন দ্বারা শুষিত হয়। এই ইলেকট্রন সমূহ শোষিত ফোটনকে সকল দিকে পুনরায় নির্গমন করে, কিন্তু এই ঘটনায় কিছু পরিমান শক্তি খোয়া যায়। পরবর্তীতে এই ফোটন সমূহ বিকিরণ অঞ্চলে প্রবেশ করে।

বিকিরণ অঞ্চল সূর্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের জন্য অন্তরকের আবরণ হিসেবে কাজ করে, যাতে ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন তাপ ধরে রেখে ফিউশন বিক্রিয়া ঘটার পরিবেশ তৈরি হয়। এই অঞ্চল পাড়ি দিতে একটি ফোটন অসংখ্য বার ইলেকট্রন কর্তৃক শোষিত ও নির্গত হয়, ফলে নেট শক্তি প্রবাহের গতি ধীর হয়ে যায় এবং শক্তির পরিমান কমে যায়। ফলে গামা রশ্মি থেকে এক্সরে তে পরিণত হয়।

চিত্র : সূর্যের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল সমূহ

কেন্দ্রে উৎপন্ন তাপ ও আলোক শক্তি তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গ তথা ফোটন ( প্রধানত এক্সরে) হিসেবে বিকিরণ, তাপীয় পরিবহন প্রক্রিয়ায় বিকিরণ অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ অঞ্চলের ঘনত্ব ও তাপমাত্রা কেন্দ্র থেকে কম কিন্তু পরবর্তী অঞ্চল থেকে বেশি।

কেন্দ্রে উৎপন্ন এক্সরে বাবল তৈরি করে কম তাপমাত্রা, ঘনত্ব, চাপের পথ অনুসরণ করেন সূর্য পৃষ্ঠের দিকে ধাবিত হয়। হাইড্রোজেন, হিলয়াম, অসম্পৃক্ত ইলেকট্রন দ্বারা বিকিরণ অঞ্চল পূর্ণ থাকে। এ অঞ্চলের গভীরে, এক্সরে বিভিন্ন কনার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বারবার সংঘর্ষের ফলে এক্সরের দিক বারবার পরিবর্তন হয়। দুটি ধাক্কার মধ্যে এক্স রে মাত্র কয়েক মিলিমিটার পথ অতিক্রম করে।

এভাবে ধাক্কার পর ধাক্কা খেয়ে এক্সরে সৌর পৃষ্ঠের দিকে গমন করে। তাই ফোটন তথা এক্সরের এই অঞ্চল পাড়ি দিতে ১৭১,০০০ থেকে ১ মিলিয়ন বছর সময় লাগে। ধাক্কার দরুন এক্সরের শক্তি প্লাজমা অনু কর্তৃক শোষিত হওয়ায় এক্সরে এর শক্তি কমে যায় কিন্তু তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়। ধীরে ধীরে এই তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে এবং পৃষ্ঠে এসে দৃশ্যমান আলোয় পরিনত হয়। একই সাথে এই অঞ্চলে তাপমাত্রা ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন থেকে ১.৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিনে হ্রাস পায়।

বিকিরণ অঞ্চলকে বেষ্টন কারী পরবর্তী পরিচলন অঞ্চলের ব্যাসার্ধ সূর্যের মোট ব্যাসার্ধের প্রায় ৩০% হয়ে থাকে। এটি সূর্যের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলসমূহের মধ্যে সর্ববহিঃস্থস্তর। এর তাপমাত্রা ও ঘনত্ব বিকিরণ অঞ্চল থেকে কম।

প্রথমত, এ আবরণের নিন্ম প্রান্তে অবস্থিত গ্যাসীয় অনুসমুহ বিকিরণ অঞ্চল থেকে বিকিরিত তাপ গ্রহণ করে। ফলে অনুসমুহের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এরা প্রসারিত হয়ে বেলুনের তথা বাবলের মত ফুলে যায়। ফলে এদের ঘনত্ব কমে যায়। তখন তারা পরিচলন অঞ্চলের উপরে অংশে তুলনামূলক কম তাপমাত্রার দিকে ধাবিত হওয়া শুরু করে।

image source: scienceisntscary.wordpress.com

যখন এই উত্তপ্ত গ্যাসীয় অনুসমুহ পরিচলন অঞ্চলের বহির্ভাগে পৌঁছায়, তখন এরা তাপ বিকিরণ করে ঠান্ডা হয়। ফলে তাদের আয়তন কমে গিয়ে ঘনত্ব বেড়ে যায়। এরা আবার পরিচলন অঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে আসে এবং পূর্ববর্তী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।

এর তাপ পরিবহন দৃশ্য অনেকটা পানির স্ফুটন দৃশ্যের মত, যেখানে বাবল ( bubble) তৈরি হয়। বাবল তৈরির এ প্রক্রিয়াকে গ্রানুলেশন বলা হয়। এখানে তাপ স্থানান্তর প্রক্রিয়া এতই দ্রুত যে, এক গুচ্ছ ফোটনের এ অঞ্চল পাড়ি দিতে মাত্র এক সপ্তাহ থেকে তিন মাস সময় লাগে।

চিত্র : সূর্যের পরিচলন অঞ্চল দিয়ে তাপের পরিবহন

আমরা জানি তড়িচ্চুম্বক বর্ণালীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র তরঙ্গ হলো গামা রশ্মির।তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ছোট বলে গামা রশ্মির শক্তি অনেক বেশি। সূর্যের কেন্দ্র থেকে এই রশ্মি বিভিন্ন অঞ্চল অতিক্রম করে দৃশ্যমান আলোতে পরিনত হয়।

আমরা সূর্যের দিকে তাকালে সূর্যে আলোক মন্ডল নামক অঞ্চল টি দেখতে পাই, কারণ তা দৃশ্যমান আলো বিকিরণ করে।গামা রশ্মি বিভিন্ন কনার সাথে ধাক্কা খেয়ে কিংবা ইলেকট্রন কর্তৃক শোষিত হয়ে শক্তি হারিয়ে ফেলে। শক্তি হারানোর ফলে ফোটনের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। তাইতো দৃশ্যমান আলো সূর্য থেকে পাওয়া যায়। এভাবেই সূর্য থেকে তড়িচ্চুম্বক বর্ণালীর ক্ষুদ্র বর্ণালী থেকে বহৎ বর্ণালী পাওয়া যায়।

উৎস:

১. http://sciexplorer.blogspot.com/2013/03/the-sun-part-5-how-inner-layers-work.html?m=1

২. http://www.astronoo.com

৩. https://www.universetoday.com/40631/parts-of-the-sun/

৪.http://solar.physics.montana.edu/ypop/Spotlight/SunInfo/Radzone.html

featured image: planetfacts.org

সৌরমডেলের ক্রমান্বয়িক পরিবর্তন

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বা কোনো কিছুর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে আমাদের ইন্দ্রিয়ের সাহায্য নিতে হয়। পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে কোনোকিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হলে আমরা তাকে বলি ‘বাস্তব’। কোনো কিছু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অস্তিত্ব সম্পন্ন হলে তাকে সত্যিকার জিনিস বা সত্যিকার ঘটনা বা বাস্তবতা বলে ধরে নেয়া হয়। যেমন শব্দ বাস্তব, কারণ তা শুনতে পাই। তেঁতুল টক, কারণ তার স্বাদ নিতে পারি। পাতার রঙ সবুজ, কারণ তা দেখতে পাই।

তবে সবসময় সবকিছু ইন্দ্রিয়ে ধরা দেয় না। ধরা না দিলেও তারা বাস্তব বা সত্য হবার দাবী রাখে। যে সকল ক্ষেত্রে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারে না সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা মডেলের সাহায্য নেন।

আশেপাশের বাস্তব জগতের কোনো একটা ক্ষেত্রে কী ঘটে চলছে তার একটা সুচিন্তিত মতামতই হচ্ছে মডেল। আমরা হয়তো সচরাচরই ভাবি আমাদের আশেপাশের এখানটাতে কী হচ্ছে ঐখানটাতে কী ঘটে চলছে। চুলগুলো কীভাবে লম্বা হচ্ছে, নখগুলো কীভাবে বড় হচ্ছে। মনে মনে কিছু একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করি। এই ব্যাখ্যাটাই হচ্ছে মডেল।

এই মডেল সঠিকও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে। একজনের দেয়া মডেল পরবর্তীতে অন্যজন ভুল প্রমাণ করতে পারে। আজকে যে মডেল সঠিক বলে ধরে নেয়া হয়েছে আগামীতে সেটা বাদ যেতে পারে।

চিত্রঃ পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে বাস্তবতা সম্বন্ধে জানা যায়।

মডেলের এরকম নাটকীয় গ্রহণ-বর্জন-পরিবর্তন ঘটেছে সৌরজগতের ক্ষেত্রে। প্রাচীনকাল থেকেই অনেক বিজ্ঞানী অনেকভাবে সৌরজগৎকে ব্যাখ্যা করার জন্য অনেক রকমের মডেল প্রদান করেছেন। তাদের কারো কারোটা ছিল যৌক্তিক, কারো কারোটা ছিল আংশিক যৌক্তিক আবার কারো কারো দেয়া মডেল ছিল একদমই অযৌক্তিক।

সুদূর প্রাচীনকালে মননশীল সত্ত্বার বিকাশের সময় থেকেই মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়েছে, তারাখচিত রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করেছে এবং আকাশজগতকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। আকাশকে ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা হিসেবে সৌরজগৎ তথা বিশ্বজগতের গঠন বর্ণনা করতে বিভিন্ন রকমের মতবাদ বা মডেল প্রদান করেছে সময়ে সময়ে।

সেসব মডেলই যুগ যুগ ধরে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হতে হতে বর্তমান উন্নত অবস্থানে এসেছে। সেই এরিস্টার্কাস-টলেমীর যুগ থেকে শুরু করে বর্তমানে এডুইন হাবল-এলান গুথ পর্যন্ত। যেন ছলনাময়ীর মতো বিশ্বজগতের মডেল কিছুদিন পরপরই তার রূপ পাল্টায়। আজকে সৌরজগতের মডেলের ক্রমান্বয়িক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা রইলো।

প্রাচীন যুগ

প্রাচীন মানুষের বিশ্বাস ছিল তাদের বসবাসের পৃথিবী হচ্ছে সমগ্র বিশ্বজগতের কেন্দ্র। সূর্য সহ অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রগুলো পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। নিজেদের বসবাসের স্থলকে কেন্দ্রে রাখার পেছনে কাজ করেছে মানুষের স্বভাবজাত সেরা হবার প্রবণতা। তখনকার মানুষের একটা অলিখিত নিয়ম ছিল বৃত্তাকার যেকোনো জিনিসই সুন্দর এবং বৃত্তের মাঝে সেরা অংশটি হচ্ছে তার কেন্দ্র। কেন্দ্রই মুখ্য আর কেন্দ্রের বাইরের সমস্ত এলাকা গৌণ।

তার উপর মানুষ নিজেকে প্রাণিজগতের সেরা সৃষ্টি বা দেবতাদের সেরা কৃপা বলে মনে করতো। জাগতিক সবকিছুই সেরা জিনিসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে এটা সাধারণ যুক্তির কথা। এখনো মানুষ নিজেকে সৃষ্টির সেরা হিসেবে ভাবে। আশরাফুল মাখলুকাত নামে চমৎকার একটি টার্মও আছে মানুষকে ঘিরে।

যদিও বিজ্ঞানের দিক থেকে মানুষ সব দিক থেকে সেরা নয়। মানুষের কিছু কিছু দিক আছে উন্নত আবার কিছু কিছু দিক আছে অনুন্নত। কোনো ঘটনা, সময় বা অবস্থানের প্রেক্ষিতে মানুষ সেরা আবার কোনো ঘটনা, সময় বা অবস্থানের প্রেক্ষিতে মানুষের শারীরিক গঠন ও মনন নিম্ন পর্যায়ের। যা হোক এটা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। তবে এটা সত্য যে মানুষ সব সময়ই নিজেকে সেরা হিসেবে ভেবে এসেছে এবং নিজেকে সেরা ভাবতে স্বছন্দ বোধ করে।

নিজেকে সেরা মনে করার প্রভাব থেকে মানুষ নিজেই নিজেদের বসিয়ে দিয়েছে বিশ্বজগতের কেন্দ্রে। কারণ নিজেরা কেন্দ্রে না থাকলে কিংবা অন্য কোনো কিছুকে কেন্দ্রে রেখে নিজেরা বাইরে থেকে ঘুরলে সেটা একদমই মর্যাদাহানিকর ব্যাপার। মহাজাগতিক মান সম্মান বলে কথা!

এরিস্টার্কাস থেকে টলেমী

এতসব প্রভাবের মাঝে থেকেও তখনকার কিছু পর্যবেক্ষণ-দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের নাম শোনা যায়। তাদের একজন এরিস্টার্কাস (খ্রি. পূ. ৩১০-২১০)। এই আয়োনিয়ান (গ্রীক) বিজ্ঞানী খ্রিষ্টের জন্মের অনেক আগেই বলেছিলেন পৃথিবী বিশ্বজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত নয়।

ঐতিহাসিক বিবেচনায় ধারণাটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। এর জন্য তিনি একটি চন্দ্রগ্রহণকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের উপর পৃথিবীর ছায়ার আকার নির্ণয় করে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তের সাহায্যে সিদ্ধান্তে আসেন, সূর্য পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড়। ছোট জিনিস সবসময়ই বড় জিনিসকে কেন্দ্র করে ঘুরে। যেহেতু সূর্য বড় এবং পৃথিবী ছোট তাই পৃথিবী বিশ্বজগতের কেন্দ্র হতে পারে না।

চিত্র: এরিস্টার্কাস

শুধু তাই নয়, তিনি এও ধারণা করেছিলেন, রাতের আকাশে আমরা যে তারাগুলো দেখি সেগুলো দূরবর্তী সূর্য ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের সূর্য পৃথিবী থেকে অনেক বড়, কিন্তু দূরে অবস্থান করার কারণে ছোট থালার সমান বলে মনে হয়। তেমনই তারাগুলোও হয়তো এতটাই বেশি দূরে অবস্থান করছ যে অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও ক্ষুদ্র বিন্দু বলে মনে হয়। এরিস্টার্কাসের অনুমান আজকের আধুনিক মহাকাশবিদ্যার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এত প্রাচীনকালে কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়া এমন সিদ্ধান্তে আসা সত্যিই একটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

এরপর উল্লেখ করা যায় গণিতবিদ টলেমীর (আনুমানিক ৮৫-১৬৫) কথা। প্রাচীন মিশরের জ্ঞানের রাজধানী ছিল আলেক্সান্দ্রিয়া। আলেক্সান্দ্রিয়ার গণিতবিদ ছিলেন টলেমী। টলেমী বিশ্বজগৎ সম্বন্ধে তার করা পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক হিসাব নিকাশ থেকে বলেন, বিশ্বজগতের কেন্দ্র হলো আমাদের পৃথিবী। পৃথিবীর চারপাশেই ঘুরছে বিশ্বজগতের সবকিছু। ভুল হোক বা সঠিক হোক তিনি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণে চমৎকার একটি কাজ করেছিলেন। বিশ্বজগৎ নিয়ে তিনিই প্রথম একটি মডেল তৈরি করেন।

যদিও তার মডেলে পৃথিবী ছিল কেন্দ্রে কিন্তু তারপরেও এটি মডেল এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষায় মডেল গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। পরে হয়তো কোনো মডেল ভুল প্রমাণিত হতে পারে কিন্তু তার মতবাদের সাথে গাণিতিক যুক্তি কিংবা সৌরজগতের অনুমান নির্ভর একটি রেপ্লিকা (প্রতিলিপি) তৈরি করেছিলেন। তার এই মডেলটি পৃথিবীকেন্দ্রিক মডেল বা geocentric model নামে পরিচিত।

চিত্র: টলেমী ও টলেমীর মডেলের রেপ্লিকা। ছবি: westsea.com

উল্লেখ্য, টলেমীর এই মডেলটি ছিল অনেক ঝামেলাপূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। জটিল গাণিতিক হিসাব নিকাশে ভরা। এই মডেল দূরবর্তী তারকাগুলো আসলে কী তার সামান্য ধারণাও দিতে পারে না। এই মডেলে তিনি সকল তারাগুলোকে একত্রে একটি স্তর কল্পনা করেছিলেন এবং সেটিই ছিল বিশ্বজগতের সর্বশেষ স্তর। তারাগুলো ঐ স্তরে থেকেই নিজেরা নিজেদের মাঝে অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। তবে কখনোই অন্য স্তরে যেতে পারে না। আর তারকা স্তরের সকলটা ছিল ফাঁকা স্থান।

চিত্রঃ টলেমীর দৃষ্টিতে বিশ্বজগৎ। এই মডেলে তারার স্তর ছিল বিশ্বজগতের সর্বশেষ সীমা। 

আরো উল্লেখ্য, টলেমীর এই মডেল চার্চ মেনে নিয়েছিল এবং ধর্মীয় সমর্থন পেয়েছিল। মেনে নেবার কারণ এই মডেল বিশ্বজগৎ সম্বন্ধে বাইবেলের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন দেয়। তারার সর্বশেষ স্তরের বাইরে স্বর্গ ও নরকের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা পাওয়া যায়, যা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে খুব দরকারি। ধর্মের প্রতি মানুষের স্বভাবজাত শ্রদ্ধা থাকাতে এবং এই মডেল ধর্মের সমর্থন পাওয়াতে এটি পরবর্তীতে অনেক বছর পর্যন্ত টিকে রয়েছিল।

কোপার্নিকান যুগ

নাম করা যায় একজন বিজ্ঞানীর যিনি অনুমান এবং কল্পনাকে পাশ কাটিয়ে পর্যবেক্ষণের আলোকে বলেছিলেন পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র নয়। সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে না বরং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। ষোড়শ শতাব্দীর এই বিজ্ঞানীর নাম নিকোলাস কোপার্নিকাস। তার দেয়া মতবাদ প্রথম থেকেই বাধার সম্মুখীন হয়। তাদের বক্তব্য ছিল নিজের চোখে এবং খোলা চোখেই তো দেখা যাচ্ছে সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। তাহলে কেন বলবো সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্র?

আর যদি পৃথিবীই ঘুরবে তবে তো ঘূর্ণনের ফলে তার বায়ুমণ্ডল মহাশূন্যে হারিয়ে যাবার কথা। তার উপর যদি পৃথিবীই ঘুরে থাকে তবে তো পাখিরা বাসা ছেড়ে উড়ে যাবার পর বাসায় আর ফিরে আসতে পারতো না। হারিয়ে যেতো। পৃথিবী যদি ঘুরে তবে তার সাথে সাথে গাছপালাও ঘুরবে। গাছপালার সাথে সাথে পাখির বাসাও ঘুরবে। তবে কীভাবে পাখিরা তাদের বাসায় ফিরে যায়? শুধুমাত্র পৃথিবী স্থির থাকলেই এরকমটা সম্ভব।

চিত্র: কোপার্নিকাস

তখন পর্যন্ত এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়নি যে, বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর অভিকর্ষে বাধা এবং পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে সাথে বায়ুমণ্ডলও ঘুরছে। বায়ুর স্তরের পরে আছে শূন্যস্থান। শূন্যস্থানে কোনো কিছুর সংঘর্ষ হবার প্রশ্নই আসে না সেটা বায়ু হোক আর যাই হোক। সংঘর্ষ না হলে বায়ুর মহাশূন্যে হারিয়ে যাওয়াটাও অযৌক্তিক। বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর সাথে সাথেই ঘুরছে। এর সাথে ঘুরছে পাখিরাও। তবে তাদের হারিয়ে যাবার প্রশ্ন কেন?

তাদের বিপক্ষে কোপার্নিকাসের যুক্তি কী ছিল? তিনি আঙুল তুলেছিলেন, যদি পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র হয় তবে কেন বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঋতু দেখা যায়? এবং কেন ঠিক এক বছর পর পর একই ঋতু ফিরে আসে? সূর্য যদি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতো তাহলে এরকমটা পাওয়া যাবার কথা নয়। এরকমটা ব্যাখ্যা করা যায় সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর বার্ষিক গতির মাধ্যমে। অর্থাৎ এই সমস্যার সহজ সমাধান পাওয়া যায় যদি ধরে নেয়া হয় পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।

কোপার্নিকাসের সময়কালে চার্চের বিরুদ্ধে যায় এমন কথা উচ্চারণ করা ছিল মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সমতুল্য। তাই কোপার্নিকাস তার সৌর-মডেল বিষয়ক বইটি প্রকাশ করেছিলেন কথোপকথন আকারে। চার্চের রোষের মুখে যেন না পড়েন সেজন্য বইটি উৎসর্গ করে দেন চার্চের একজন পাদ্রিকে।

বইয়ের কথোপকথনে সূর্যকেন্দ্রীক সৌরজগতে বিশ্বাসী ব্যক্তির তুখোড় যুক্তিতে পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতে বিশ্বাসী ব্যক্তি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। বইটি প্রকাশ করেছিলেন তার জীবনের একদম শেষ পর্যায়ে। যখন বইটি মুদ্রিত হয়ে তার হাতে এসেছিল তখন তিনি বার্ধক্যের শয্যায়। বইটি কয়েকবার নাড়াচাড়া করে দেখতে পেরেছিলেন মাত্র। এর পরপরই তিনি পরলোকগত হন।

চিত্র: জাদুঘরে সংরক্ষিত কোপার্নিকাসের বই।

চার্চের প্রবল প্রতাপের সময় বইটি যিনি প্রকাশ করেছিলেন তার সাহস আছে বলা যায়। তবে এখানে প্রকাশক একটা কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। কথিত আছে, প্রকাশক বইয়ের শুরুতেই বলে দিয়েছিলেন, বইয়ে ব্যবহৃত তত্ত্বগুলো সত্য নয়! এই তত্ত্বগুলোর মাধ্যমে সৌরজগতকে সহজে ব্যাখ্যা করা যায়। জটিলতার পরিমাণ কমে যায়। অপেক্ষাকৃত সহজে ব্যাখ্যা করা যায় বলে এটি প্রকাশ করা হলো। বাস্তবের সাথে এর কোনো মিল নেই।

টলেমীর মডেল প্রায় ১২০০ বছর পর্যন্ত টিকে ছিল। কোপার্নিকাসই প্রথম এর বাইরে গিয়ে মতবাদ প্রদান করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে সৌরজগতের গঠন ব্যাখ্যায় গাণিতিক মডেলসহ তার তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। টলেমীর মডেল যেখানে অনেক জটিলতায় পূর্ণ ছিল সেখানে কোপার্নিকাসের মডেল ছিল অপেক্ষাকৃত সরল। তার দেয়া তত্ত্বটি Heliocentrism নামে পরিচিত। হিলিয়াস অর্থ সূর্য (গ্রিকদের দেবতা), আর সেন্টার অর্থ কেন্দ্র। দুটি মিলে হেলিওসেন্ট্রিজম শব্দের অর্থ হয় সূর্যকেন্দ্রিক।

যাহোক, কোপার্নিকাস মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি যদি জীবিত থাকতেন বা তার জীবনের মাঝামাঝিতে বইটি প্রকাশ করতেন তাহলে গ্যালিলিওর মতো তাকেও অপমানের শিকার হতে হতো। নিজের দাবীগুলোকে ভুল বলে স্বীকার না করলে বা ক্ষমা না চাইলে হয়তোবা জিওর্দানো ব্রুনোর মতো তাকেও পুড়িয়ে মেরে ফেলা হতো।

উল্লেখ্য, কোপার্নিকাসের মডেলেও ত্রুটি ছিল। তার মডেল অনুসারে পৃথিবী সহ সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো বৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরছে। কিন্তু আদতে গ্রহগুলো বৃত্তাকারে নয়, উপবৃত্তাকারে ঘুরছে। সত্যি কথা বলতে কি, তখনকার সময়ে উপবৃত্তের ধারণা এখনকার মতো এতটা প্রতিষ্ঠিত ছিল না। ঐ সময়ে বৃত্তাকার যেকোনো জিনিসকেই সুন্দর বলে মনে করা হতো।

কোনো কিছু বৃত্তাকার, তার মানে হলো এটি সুন্দর ও সুস্থিত। পৃথিবীর গতিপথ উপবৃত্তাকার হতে পারে এই ভাবনাটাই আসেনি তখন। কোপার্নিকাস প্রথা বা প্রভাবের বাইরে গিয়ে বিপ্লবী একটা কাজ করে ফেলেছিলেন, কিন্তু এই তিনিই বৃত্তাকারের প্রভাবের বলয় থেকে বের হতে পারেননি।

চিত্রঃ কোপার্নিকান বৃত্তাকার মডেল। ছবিঃ chronozoom.com

টাইকো ব্রাহে ও কেপলারের যুগ

পরবর্তীতে সৌরমডেলে সর্বপ্রথম উপবৃত্তের ধারণা নিয়ে আসেন ডাচ বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার (১৫৭১-১৬৩০)। কেপলার ছিলেন জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহের শিষ্য। টাইকো ব্রাহে ছিলেন খুব গোছালো মানুষ। তিনি তার জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত সকল পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করে রাখতেন।

তার ব্যক্তিগত একটি মানমন্দির ছিল। বোঝাই যায় পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি কী তখনকার সময়ে কী পরিমাণ সুবিধা পেয়েছিলেন। একটু সন্দেহবাতিকও ছিলেন, তার করা পর্যবেক্ষণগুলো কেপলারকে দিতে চাইতেন না, লুকিয়ে রাখতেন। আবার অন্যদিকে কেপলারকে ছাত্র হিসেবে পেতেও চাইতেন, কারণ কেপলার মেধাবী।

১৬০১ সালে হঠাৎ করে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে টাইকো ব্রাহের মৃত্যু হয়। এর ফলে লিপিবদ্ধ পর্যবেক্ষণগুলো কেপলারের হাতে আসে। কেপলার দেখতে পান মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথের যেসব পর্যবেক্ষণ আছে তা কিছুতেই বৃত্তাকার কক্ষপথের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। তারপর আরো পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্ত নিলেন পৃথিবী ও সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে। গ্রহদের এই ঘূর্ণন সংক্রান্ত ৩ টি সূত্রও প্রদান করেন। একদম পাক্কা আধুনিক বিজ্ঞানীর মতো কাজ। কোনো ঘটনা গাণিতিকভাবে প্রমাণ হয়ে গেলে তাকে আর সহজে বর্জন করা যায় না।

এখানেও উল্লেখ্য যে, কেপলার বিশ্বাস করতেন গ্রহগুলোর অনুভূতি ও চেতনা আছে। অর্থাৎ এদের প্রাণ আছে। এরা কোনো এক সত্তার আদেশে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। গ্রহগুলো কেন ঘুরছে এবং কোনো শক্তির প্রভাবে ঘুরছে সে ব্যাখ্যা কেপলার দিতে পারেনি।

নিউটন-আইনস্টাইনের যুগ

পরবর্তীতে পদার্থবিজ্ঞানী বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন তার মহাকর্ষ সূত্রে এর কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। নিউটন তার মহাকর্ষ সূত্রের মাধ্যমে কেন এবং কীভাবে গ্রহগুলো সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। পরবর্তীতে দেখা গেল তার দেয়া মহাকর্ষের সূত্র সৌরজগতের বাইরে অন্যান্য গ্রহের কক্ষপথের বেলায়ও সঠিক। এই সূত্রের সাহায্যে জোয়ার-ভাটার কারণ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করা যায়। এমনকি এর সাহায্যে পৃথিবীতে বসেই চাঁদের ঘূর্ণন বেগ বের করেছিলেন নিউটন।

চাঁদ কেন ঝুলে আছে? চাঁদ কেন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে? বস্তুগুলো যদি পারস্পরিকভাবে একে অপরকে আকর্ষণ করে তাহলে চাঁদ কেন পৃথিবীর আকর্ষণে পড়ে যাচ্ছে না? তিনি হিসাবের মাধ্যমে দেখালেন চাঁদ আসলে পৃথিবীতে পড়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর আকর্ষণের কারণে সর্বদাই পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই বল ও বেগের পাশাপাশি চাঁদে আরো একটি বেগ কার্যকর।

চাঁদ পৃথিবী থেকে বহির্মুখী একটা বলে সর্বদা পৃথিবী থেকে বাইরের দিকে ছুটছে। সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহ যখন তৈরি হয় কিংবা মহাজাগতিক সংঘর্ষে পৃথিবীর পাশে চাঁদ যখন তৈরি হয় তখন থেকেই বাইরের দিকে এই বেগ কার্যকর ছিল। চাঁদের উপর পৃথিবীর আকর্ষণ বল এবং বাইরের দিকে বহির্মুখী বল পরস্পর কাটাকাটি যাচ্ছে। কাটাকাটি যাবার ফলে এটি একূল ওকূল না গিয়ে চারপাশে ঘুরছে।

চাঁদের ঘূর্ণন বেগ কত হলে তা পৃথিবীর আকর্ষণ দ্বারা নাকচ হতে পারে তা অংকের মাধ্যমে হিসাব করে বের করলেন নিউটন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো পরবর্তীতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পরিমাপকৃত বেগের সাথে তার নির্ণয় করা বেগ প্রায় মিলে যায়। একেই বলে গণিতের শক্তি। বেশিরভাগ সময়েই গণিত অকাট্য হয়।

নিউটনের তত্ত্ব এখনো নির্ভুলভাবে আছে। এখনো পড়ানো হয় দেশে দেশে বিজ্ঞানের সিলেবাসে। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে হলেও সার্বিক বিবেচনায় নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব তার নির্ভুলতা হারায়। মহাকর্ষকে নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য পরবর্তীতে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তার আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব (General Theory of Relativity) প্রদান করেন।

আইনস্টাইনের তত্ত্বটি জটিল হলেও এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে নির্ভুল তত্ত্ব। এই তত্ত্ব প্রদান করার পর অনেকবার এর সত্যতা যাচাই করে দেখা হয়েছিল। সকল ক্ষেত্রেই এর নির্ভুলতা প্রমাণিত হয়েছে।

আধুনিক যুগ

এরপর চলে আসে মহাবিশ্বের উৎপত্তি প্রসঙ্গ। ইতিহাসের সমস্ত সময় জুড়েই ছিল ঐশ্বরিক ধারণার প্রভাব। দেব-দেবতারা মানুষের জন্য জগৎ সৃষ্টি করে দিয়েছে এবং মানুষ এতে বসবাস করছে এর বাইরে যাওয়া বলতে গেলে অসম্ভবই ছিল। এর মানে হচ্ছে আজকে আমরা মহাবিশ্বকে যেমন দেখছি একশো বছর এক হাজার বছর এক লক্ষ বছর আগেও এরকমই ছিল। আজ থেকে শত হাজার লক্ষ বছর পরেও এরকমই থাকবে। মহাবিশ্বের এরকম ধারণার নাম স্টিডি স্টেট মহাবিশ্ব।

এর বাইরে চিন্তাভাবনা করা উচ্চ ও আধুনিক দার্শনিকতার দাবী রাখে বলে ইতিহাসের প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই স্থিতিশীল মহাবিশ্ব জায়গা করে নিয়েছিল। কারণ এর বাইরে চিন্তা করতে গেলে পর্যবেক্ষণ পরীক্ষা নিরীক্ষা তথ্য উপাত্ত লাগবে। আধুনিক টেলিস্কোপ ছাড়া এরকম ভাবনা নিয়ে খেলা করা তো প্রায় অসম্ভবই বলা যায়।

পরবর্তীকালে বিগ ব্যাং তত্ত্বের মাধ্যমে এর গণ্ডি ভাঙে। প্রায় একশত অনেক আগে থেকেই বিগ ব্যাং তত্ত্ব প্রচলিত ছিল, কিন্তু কারো নজর তেমন কাড়েনি। পরবর্তীতে এডুইন হাবল তার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এর সত্যতা খুঁজে পান। এরপর রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যায় এই তত্ত্বটি।

বিগ ব্যাং থিওরি বা মহা বিস্ফোরণ তত্ত্ব মতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল ক্ষুদ্র বিন্দুবৎ অবস্থা থেকে। বিস্ফোরণের ফলে এটি প্রসারিত হয়। প্রসারিত হতে হতে অনেক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আজকের এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে আবার এই অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যাবে।

বর্তমান কালের জনপ্রিয় বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তার ‘কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (A Brief History Of Time)’ বইতে বিগ ব্যাং থিওরির উপর যুক্তি দিয়েছেন। সাম্প্রতিক কালে NASA কর্তৃক উৎক্ষেপিত হাবল টেলিস্কোপের পাঠানো বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও ছবি বিগ ব্যাং থিওরির সত্যতা প্রমাণ করে যাচ্ছে। বিগ ব্যাং থিওরিই সর্বপ্রথম প্রসারমাণ মহাবিশ্ব সম্বন্ধে ধারণা প্রদান করে আমাদের।

তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। বিগ ব্যাং তত্ত্ব প্রদান করার পর থেকে মহাবিশ্বকে ভালোভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারছিল। এবং এর সত্যতার পেছনে সমর্থন দেবার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য-প্রমাণও আছে। তবে প্রচুর তথ্য-প্রমাণ ও সমর্থন থাকলেও তা সকল প্রশ্ন বা সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। যেমন মহাবিশ্বের একদম প্রাথমিক পর্যায়ে অতি-ছোট বিন্দুবৎ অবস্থায় থাকার সময়ের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না বিগ ব্যাং তত্ত্বের মাধ্যমে।

যখন থেকে বিগ ব্যাং তত্ত্বের এই সীমাবদ্ধতা ধরা দেয় তখন থেকেই এর বিকল্প তত্ত্ব অনুসন্ধান শুরু হয়। সময়ে সময়ে মহাবিশ্বকে পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য বেশ কয়েকটি জটিল তত্ত্ব প্রস্তাবও করা হয়। এর মাঝে একটি হচ্ছে ‘বিগ বাউন্স তত্ত্ব’।

এই তত্ত্ব আজ থেকে অনেক আগেই প্রস্তাবিত হয়েছিল। তবে প্রস্তাবিত হলেও যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষক এটি নিয়ে কাজ করে একে অধিকতর উপযুক্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং বলছেন মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য এটি বিগ ব্যাং এর চেয়েও বেশি কার্যকর।

এই তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্ব কোনো একটি বিন্দুবৎ অবস্থা থেকে বিস্ফোরণের মাধ্যমে তৈরি হয়নি। মহাবিশ্ব চিরকালই অস্তিত্ববান ছিল। এই তত্ত্ব শুনতে অনেকটা স্থির মহাবিশ্ব তত্ত্বের মতো হলেও এটি স্থির মহাবিশ্বকে বাতিল করে দেয়।

এই তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্ব সংকোচন ও প্রসারণের চক্রের মাধ্যমে চলছে। অনেকটা বেলুনের মতো, খুব স্থিতিস্থাপক কোনো বেলুনকে ফোলালে ফুলতে ফুলতে একসময় তা ক্রান্তি অবস্থানে এসে পৌঁছাবে। তারপর অল্প অল্প করে বাতাস চলে যেতে দিলে তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হবে।

সর্বনিম্ন পরিমাণ সংকোচনের পর তা আবার প্রসারিত হওয়া শুরু করবে। বিগ বাউন্স অনুসারে মহাবিশ্ব অনেকটা এরকমই। চক্রাকারে সংকুচিত হচ্ছে এবং প্রসারিত হচ্ছে। যখন সংকোচনের ক্রান্তি পর্যায়ে চলে আসে তখন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কিছু নিয়মের প্রভাবে আরো সংকোচিত হয়ে ক্ষুদ্র বিন্দু বা সিঙ্গুলারিটি তৈরি করতে পারে না। ঐ অবস্থান থেকে আবার প্রসারণ শুরু হয়ে যায়।

চিত্র: বিগ ব্যাং তত্ত্বের বিকল্প হিসেবে বিগ বাউন্স তত্ত্বকে ভাবা হচ্ছে।

পরিশিষ্ট

এখানে আরো একজন মহান বিজ্ঞানীর কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি হলেন গালিলিও গ্যালিলি। তিনিই নভো দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা টেলিস্কোপ নির্মাণ করেছিলেন, আজ থেকে ৪০০ বছর আগে ১৬০৯ সালে। নতুন তৈরি করা টেলিস্কোপ চোখে লাগিয়ে দেখতে লাগলেন চাঁদ, সূর্য ও অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্র।

এর সাহায্যে চাঁদের বুকে পাহাড়-পর্বত ও নানা রকম খানাখন্দ দেখতে পেলেন। সূর্যের গায়ে খুঁজে পেলেন কালো কালো দাগ। ১৬১০ সালে বৃহস্পতি গ্রহ পর্যবেক্ষণের সময় দেখতে পেলেন চারটি বস্তু। এগুলো বৃহস্পতির চাঁদ (উপগ্রহ) এবং এরা বৃহস্পতির চারপাশে ঘুরছে।

তখনো পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের ধারণাই প্রবল ছিল। কিন্তু তিনি তো নিজের চোখে দেখলেন সবকিছু পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে না। বৃহস্পতি এর জ্বলন্ত প্রমাণ। তাই তার পর্যবেক্ষণের কথা জানালেন সবাইকে। আর সবাই কেন তার কথা মেনে নিবে? ফলে সকলে বলতে লাগলো, গ্যালিলিও নামের এই লোকটা মাথায় ছিট আছে। হয়তো মানসিক সমস্যায় পড়ে এসব উল্টাপাল্টা জিনিস দেখছে।

তাদেরকে ডেকে এনে টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে দেখালে তারা বলে হয়তো যন্ত্রের মাঝে সমস্যা আছে। চাঁদের মতো সুন্দর জিনিসে খানাখন্দ খালবিল পাহাড় পর্বত কীভাবে থাকবে? সূর্যে কালো দাগ থাকা মানে তো কলঙ্ক হয়ে যাওয়া।

তার এই মতবাদে রোমান ক্যাথলিক চার্চ খুবই নাখোশ হয়। চার্চ তার এই মতবাদ তো গ্রহণ করেইনি উপরন্তু বৃদ্ধ বয়সে গ্যালিলিওকে অমানুষিক শাস্তি দিয়েছিল। জোর করে তাকে বলিয়েছিল এর সব মিথ্যা। নিজ মতামতকে মিথ্যা বলতে এবং বাইবেলের সাথে সামঞ্জস্য নয় এমন কথা বলাতে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য তাকে বাধ্য করা হয়েছিল। বাধ্য না হলে হয়তো তার গর্দান চলে যেত কিংবা তাকে পুড়িয়ে মারা হতো।

কথিত আছে প্রহসন মূলক ক্ষমা প্রার্থনার নাটক ও শাস্তির পর অসুস্থ গ্যালিলিও বিড়বিড় করে বলেছিলেন ‘Eppur si muove’। এর বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘কিন্তু এটি (পৃথিবী) এখনো ঘুরছে।’। অর্থাৎ আমি নিজেও যদি মুখে হাজার বার বলি ‘পৃথিবী স্থির’ তারপরও এটি ঘুরেই চলবে।

কালের প্রবাহে কালের মঞ্চে অনেক নাটকই প্রদর্শিত হয়। কালের শত শত বছরের অতিক্রমের পর দেখা যায় প্রায় ২৮০ বছর পর ১৯৯২ সালে ক্যাথলিক চার্চ স্বীকার করেছে, গ্যালিলিও নির্দোষ ছিলেন। গ্যালিলিওকে দোষী সাব্যস্ত করাটা ভুল ছিল। চার্চ যে এর জন্য তাদের ভুল স্বীকার করেছে এটাই তো অনেক কিছু। এরকম প্রতিষ্ঠান থেকে এরকম কিছু আশা করা যায় না সচরাচর।

চিত্র: গ্যালিলিও

প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা বলা দরকার। আগে ল্যাটিন ছিল আভিজাত্যের ভাষা। ল্যাটিন ছাড়া অন্য ভাষায় কেউ লিখলে তাকে ভালো লেখক বলে গণ্য করা হতো না। গ্যালিলিওই প্রথম পণ্ডিতদের ভাষা ল্যাটিনকে বর্জন করে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা লিখেছিলেন। আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটা গুরুত্বপূর্ণ একটা বার্তা। বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চা অন্য ভাষার মতো বেশি একটা হয় না। ছাত্ররা বাংলায় লেখা বিজ্ঞান বইয়ের অভাব অনুভব করে। এর জন্য বাংলা ভাষায় প্রচুর বিজ্ঞান চর্চা দরকার।

তবে আশার কথা বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা দিন দিন বেড়ে চলছে। এই ধারায় চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে সত্যিই সমৃদ্ধ হয়ে যাবে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা। অন্তত গাণিতিক বাস্তবতা তা-ই বলে।

তথ্যসূত্র

  1. মহিমান্বিত নকশা (The Grand Design), স্টিফেন হকিং ও লিওনার্ড ম্লোডিনো, (অনুবাদ আশরাফ মাহমুদ), রাত্রি প্রকাশনী।
  2. আবিষ্কারের নেশায়, আব্দুল্লাহ আল-মুতী, অনুপম প্রকাশনী।
  3. ইউডক্সাসের গোলক ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, শুদ্ধস্বর, ২০১৩
  4. মহাকাশে কী ঘটছে, আব্দুল্লাহ আল-মুতী, অনুপম প্রকাশনী।
  5. বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী (The 100), মাইকেল এইচ. হার্ট।
  6. বিগ ব্যাং নাকি বিগ বাউন্স, বিজ্ঞান পত্রিকা
  7. http://sciencelearn.org.nz/Contexts/Satellites/Looking-Closer/Our-solar-system-revolutionary-ideas
  8. http://www.tiki-toki.com/timeline/entry/76343/Astronomy-Model-Timeline/
  9. https://en.wikipedia.org/wiki/Copernican_Revolution

featured image: orcadian.co.uk

জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে এক দুর্ভাগা

খুব কাছের এক বন্ধু। নানা কারণে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছাত্রজীবনের আপাত ব্যর্থতা মেনে নিতে পারছে না। তার মতে সে যা-ই করে তাতেই বিপত্তি বাঁধে। ‘সাফল্য’ শব্দটা নাকি তার অভিধানেই নেই। এই দুঃখে কিছু করতেও চায় না। কিছুদিন আগে পথ চলতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে বসেছে। হাসপাতালের বেডে বসে ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে দিয়ে কবিতা লিখে।

সেদিন তাকে দেখতে গেলাম। একথা সেকথা বলার পর বন্ধু আমার জিগ্যেস করে বসল- ‘দুনিয়ার সবচেয়ে অভাগা কে বলতে পারিস?’। জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেই বললো- ‘এই যে মূর্তিমান আমি।’ হেসে মাথা নাড়লাম, ‘উহু। তোর চেয়েও অভাগা আছে রে।’ এই বলে তাকে এক দুর্ভাগা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাহিনী বললাম। শুনে তার মুখে আর রা কাড়ে না।

গুইলিয়াম জোসেফ হায়াসিন্থ জাঁ বাপটিস্ট লে জেন্টিল ডে লা গ্যালাইসিয়েরে। এই ইয়া বড় নামখানা আমাদের আলোচ্য ভদ্রলোকের। আমরা তাকে লে জেন্টিল সাহেব বলবো। জন্ম ১৭২৫ সালে। জাতে ফরাসী। কাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা আর অংক কষা। মানে জ্যোতির্বিদ। এগারোটি বছর বেচারা এমন এক কাজের পিছনে সারা দুনিয়া জুড়ে দৌড়েছেন যেটা সম্পন্ন করতে পারলে অন্যভাবে তার নাম ইতিহাসে লেখা হতো।

চিত্রঃ জ্যোতির্বিদ লে জেন্টিল।

এই ট্রানজিটগুলো খুবই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা। একটি নির্দিষ্ট লম্বা সময় পর পর ট্রানজিট ঘটে থাকে। শুক্র গ্রহের ক্ষেত্রে এ ক্রমটিকে এভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে- একটি শুক্র সরণের ঠিক ১০৫.৫ বছর পর আরেকটি শুক্র সরণ হয় যার ঠিক আট বছর পর আরো একটি শুক্র সরণ হয় আবার এই শুক্র সরণটির ১২১.৫ বছর পর একটি শুক্র সরণ হয় এবং এর আট বছর পর আবার একটি শুক্র সরণ ঘটে এভাবে প্রতি ২৪৩ বছরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।সেটা বলার আগে কিছু ভারী কথা বলে নেই।

১৫৪৩ সালে কোপার্নিকাসের এবং ১৫৮৮ সালে টাইকো ব্রাহের কোপার্নিকাসকে সমর্থন করে দেয়া সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করলেন, পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী গ্রহ দুটির (বুধ ও শুক্র) ট্রানজিট ঘটে। ট্রানজিট মানে অতিক্রম। সূর্যকে পরিক্রমণ করতে করতে এই গ্রহগুলো এক সময় পৃথিবীর সামনে দিয়ে যাবে। তখন সূর্য থেকে আসা আলোর কিছু অংশ এই গ্রহ বা জ্যোতিষ্ক ঢেকে দিবে যার ফলে পৃথিবী থেকে এদের স্পষ্ট দেখা যাবে এবং শনাক্ত করা যাবে।

কেপলার সর্বপ্রথম ১৬৩১ সালে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করলেও তার পর্যবেক্ষণে ত্রুটি ছিল। এর চেয়ে বড় কথা হলো তিনি এর আট বছর পরের শুক্র সরণটি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তার হিসাব-নিকাশকে সংশোধন করে পরবর্তী শুক্র সরণের দিন তারিখ সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে সমর্থ হন আরেক প্রতিথযশা মেধাবী জ্যোতির্বিদ জেরেমিয়াহ হরকস্‌। তিনি সূর্য আর শুক্রের আকারের উপর ভিত্তি করে একটি প্যারালাক্স বা লম্বন পদ্ধতি ব্যবহার করেন এবং তা থেকে পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী দূরত্ব সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে সমর্থ হন।

চিত্রঃ শুক্রের ট্রানজিট। সূর্যের সামনে শুক্রকে একটি বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তার ধারণা সঠিক ছিল না। এখন কী করা যায়? আমাদের তো সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব জানতে হবে। সেই লক্ষ্যে আরেক বিজ্ঞানী জেমস গ্রেগরি তার ‘Optica promota’ গ্রন্থে একটা ট্রানজিট শুরু ও শেষ হবার সময়কে হিসেবে ধরে আর সেই সাথে ত্রিকোণমিতির সূত্রকে কাজে লাগিয়ে একটা প্যারালাক্সের স্কেচ আঁকেন। এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ভুবন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এডমন্ড হ্যালি ১৫৭৭ সালে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বুধের ট্রানজিট নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

তিনি ১৭১৬ সালে এক সম্মেলনে এই ধরনের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করার জন্য সকল জ্যোতির্বিদদের অনুরোধ করেন। কারণ এ থেকে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্ব আরো নির্ভুলভাবে বের করা সম্ভব হবে। এবং আশা করেন যে, পৃথিবীর সকল জায়গা থেকেই পর্যবেক্ষণ কাজ পরিচালনা করা হবে। হ্যালি যদিও অনেকদিন বেঁচে ছিলেন কিন্তু তিনি ১৭৬১ সালে সংঘটিত শুক্রের ট্রানজিট দেখে যেতে পারেননি।

১৭৫০ সালের দিকে জ্যোতির্বিদ মিখাইল লোমোনোসভ প্রায় শ’খানেক বিজ্ঞানীকে ১৭৬১ সালের শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের সেরা সেরা টেলিস্কোপ আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যাবার জন্য আহ্বান জানালেন।

আমাদের লে জেন্টিল সাহেব French Academy of Science থেকে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য নির্বাচিত হলেন। তিনি ঠিক করলেন এই পর্যবেক্ষণের কাজ করার জন্য ভারতের ফরাসী উপনিবেশ পন্ডিচেরিতে যাবেন। সেই লক্ষ্যে জাহাজে উঠলেন ১৭৬০ সালে। যেহেতু তখন সুয়েজ খাল বলে কিছু ছিল না তাই তাকে আফ্রিকা ঘুরে অনেক পথ অতিক্রম করে ভারতের পথে যেতে হবে। প্রায় পনের মাসের জাহাজ ভ্রমণ। ট্রানজিট হবে ১৭৬১ সালের জুন মাসে। তার আগেই তাকে পন্ডিচেরি পৌঁছতে হবে।

যাত্রাপথে তিনি থামলেন তখনকার Isle De France-এ, বর্তমানে যা Mauritis নামে পরিচিত। ১৭৬০ সালের মার্চে ফ্রান্স ছাড়েন আর মরিশাসে এসে পৌঁছেন জুলাইতে। এখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে পন্ডিচেরির উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেন।

এই সময়ে তিনি জানতে পারেন, পন্ডিচেরিতে ব্রিটিশ আর ফরাসীদের মধ্যে ধুন্ধুমার যুদ্ধ চলছে। ওখানে যাওয়া নিরাপদ নয়। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এবার তিনি একটা ফরাসী রণতরীতে উঠলেন যেটা যাচ্ছিল নিউজিল্যান্ডের করোমানডেলে। হাতে আছে মাত্র তিন মাস।

কিন্তু এই না শুরু ভাগ্যের খেল। যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেন ব্রিটিশদের সাথে ফরাসীদের যুদ্ধের উন্নতির খবর পেয়ে জাহাজের নাক ঘুরিয়ে দিলেন আবার মরিশাসের দিকে। আর জেন্টিলকে জাহাজের উপর থেকেই শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের মহামূল্যবান উপদেশ দিলেন। বেচারা জেন্টিল আর কী করবে! জাহাজের উপর থেকেই কাজ চালালেন। কিন্তু জাহাজ তো নড়ছিল সবসময়ই। মাপজোখ সঠিক হলো না। তার পর্যবেক্ষণ বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো কাজেই আসবে না। হতাশ মনোরথে তিনি ফিরে এলেন মরিশাসে।

এবার সিদ্ধান্ত নিলেন, আট বছর পরে আবার যে ট্রানজিট হবে তা তিনি এশিয়াতে থেকেই পর্যবেক্ষণ করবেন। এই সময় আর কোথাও যাবেন না। আট বছর থেকে যাবেন পন্ডিচেরির আশেপাশে। আবিষ্কারের নেশায় মানুষ কত কিছুই না করে। ১৭৬৯ সালের পর শুক্রের ট্রানজিট হবে আবার ১৮৬৯ সালে। মানে ঠিক একশ বছর পর। জেন্টিলের হাতে আর একবারই সুযোগ আছে।

সময় যেতে থাকলো। জেন্টিলও বসে রইলেন না। ভারত মহাসাগরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক তথ্য-উপাত্ত, প্রাণীদের নমুনা এইসব সংগ্রহ করতে লাগলেন। মাটি, জোয়ার-ভাটা, চুম্বকত্ব, বায়ু ইত্যাদি সম্পর্কেও পড়াশুনা চালালেন। সাথে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যাটাও ঝালিয়ে নিলেন। বিখ্যাত মাদাগাস্তার দ্বীপে ঘুরাঘুরি করলেন এইসব কাজে।

চিত্রঃ জেন্টিলের গমনপথ।

সময় যায় আর শুক্রের সাথে তার অ্যাপয়নমেন্টও এগিয়ে আসে। এদিকে একাডেমী ঘোষণা দিলো যে, ফিলিপাইনের ম্যানিলা শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য সবচেয়ে আদর্শ জায়গা হবে। ম্যানিলা তখন ছিল স্প্যানিশ উপনিবেশ।

তিনি শেষমেশ ম্যানিলা যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৭৬৬ সালে একটা স্প্যানিশ জাহাজে চড়ে চলে এলেন ফিলিপাইনে। কিন্তু ফিলিপাইনে দিন খুব একটা ভালো কাটলো না। সেখানকার স্প্যানিশ গভর্নর তার সাথে বাজে ব্যবহার করলো এবং তাকে স্পাই ভেবে বসলো। ফলস্বরূপ ম্যানিলা থেকে বিতাড়িত জেন্টিল কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরলেন আবার সেই পন্ডিচেরিতে।

ভালো খবর এই যে, ইতোমধ্যে ফরাসী এবং ব্রিটিশদের মধ্যে একটা শান্তি চুক্তি হয়েছে। ব্রিটিশরাও তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানালো, এমনকি তাকে উন্নতমানের একটি টেলিস্কোপ ও পর্যবেক্ষণের অন্যান্য সব ব্যবস্থাও করে দিলো। তার হাতে এক বছর সময়। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। আবহাওয়ার প্রতিও নজর রাখছেন।

১৭৬৯ সালের জুনের তিন তারিখ। ট্রানজিটের আগের দিন। ব্রিটিশ গভর্নরকে বৃহস্পতির দারুণ সব ভিউ দেখিয়ে সন্তষ্ট করালেন তিনি। পর্যবেক্ষণের জন্য মোটামুটি সবকিছুই তার অনুকূলে। ঐদিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি খুবই উত্তেজিত ছিলাম। কোনোমতে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুতেই চোখ বন্ধ করতে পারছিলাম না।’

পরদিন ট্রানজিটের সময়কাল জুড়ে হঠাৎ করেই সূর্যের সামনে কালো কালো মেঘ জমতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে কুয়াশা আর মেঘে ঢেকে গেল পুরো আকাশ। ট্রানজিট শেষ হলো আর আকাশও পরিষ্কার হয়ে গেল। জেন্টিল হতাশায় নিমগ্ন হয়ে গেলেন। আট বছরের অপেক্ষা পুরো মাটি হয়ে গেল। কাটা গায়ে নুনের ছিটা হিসেবে সেদিন ম্যানিলার আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল। ঐ জায়গা ছিল ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য পারফেক্ট।

জেন্টিল তার জার্নালে লিখেন ‘আমি প্রায় দশ হাজার লিগ (এক লিগ প্রায় তিন মাইলের সমান) অতিক্রম করেছি। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে নিজের মাতৃভূমি থেকে এতদূরে এসে রইলাম শুধু পর্যবেক্ষণের সময় সূর্যের সামনে এক টুকরো মেঘ দেখার জন্য? আমার কষ্ট আর ধৈর্য্যের ফলটাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্যই যেন এই মেঘের আবির্ভাব হয়েছিল।’

এখানেই শেষ না। হতাশ, ক্লান্ত এবং ব্যর্থ জেন্টিল নয় বছর আগে ছেড়ে আসা নিজ ভূমিতে ফিরে যাবার জন্য রওনা দিলেন। এখানে বলে নেই, রওনা হবার আগে তিনি ডায়রিয়াতে ভুগছিলেন। ফ্রান্সে যাবার পথে থামলেন মরিশাসে। সাল ১৭৭০। এখানে কিছুদিন থেকে আবার রওনা হলেন। এবার জাহাজ ‘কেপ অব গুড হোপ’ দ্বীপের কাছাকাছি জায়গায় ঝড়ের কবলে পড়ল। এবং ভাঙ্গা নড়বড়ে জাহাজ আবার ফিরে এলো মরিশাসে। সাল ১৭৭১।

এদিকে এখানে এসে ইউরোপে ফিরে যাবার জন্য কোনো জাহাজ পাচ্ছেন না। অনেক চেষ্টা আর খোঁজাখুঁজির পরে এক স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন তাকে ইউরোপে নিতে রাজি হলো। এরপর কাডিজ নামক একটা বন্দর হয়ে ফ্রান্সে ফিরে এলেন ১৭৭১ সালের ৮ই আগস্ট। ১১ বছর পর।

কিন্তু না। এখানেই শেষ নয়। কাহিনীর নাটকীয়তা এবার চরমে। বহুদিন জেন্টিলের কোনো খবর না পাওয়ায় তার আত্মীয় স্বজনরা ধরে নিয়েছিল সে মারা গেছে। সে এসে জানল তার স্ত্রী অন্য একজনকে বিয়ে করে ফেলেছে। স্বজনরা তার সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে। অন্যদিকে একাডেমীতে তার সদস্যপদও অন্য একজনকে দিয়ে দেয়া হয়েছে।

সম্পত্তি ফিরে পেতে জেন্টিল আত্মীয়দের বিরুদ্ধে মামলা করল। তাকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে সে এখনো জীবিত! এই মামলা পরিচালনার জন্য যে টাকা দরকার তা ছিল মামলা পরিচালনা করার জন্য যে অ্যাটর্নি নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তার কাছে। অ্যাটর্নি আবার তার সাথে দেখা করতে আসার সময় ডাকাতদের কবলে পড়ে টাকা-পয়সা সব খোয়ায়।

মামলা পরিচালনার টাকা না থাকায় জেন্টিল হেরে যান। সম্পত্তি আর একাডেমীর সদস্যপদ হাতছাড়া হয়েই রইলো। বরং উল্টো তাকেই বিচারের রায়ে দণ্ডিত করা হয়। তবে কোথাও কোথাও বলা হয়েছে মামলাটা একাডেমির বিরুদ্ধে ছিল। অবশ্য একাডেমি কিংবা আত্মীয় স্বজনদের দোষ ছিল না। তার এতদিনের বাইরে সফরকালে কোনো চিঠিই এসে ফ্রান্সে তার স্ত্রীর কাছে পৌঁছায়নি।

তিনি আবার বিচারের জন্য আবেদন করেন। এবার রাজার সরাসরি হস্তক্ষেপে তিনি তার সদস্যপদ আর সহায়-সম্পত্তি ফিরে পান। কাহিনী শেষটুকু ভালোই। তিনি আবার বিয়ে করেন এবং সেই সংসারে তার একটা কন্যাসন্তান হয়। শেষজীবনে এই কন্যার সেবা পেয়েই কাটে তার।

তবে আরো একটু দুঃখের খবর দেই। তার সংগৃহীত সকল প্রাকৃতিক নমুনা মরিশাস থেকে প্রথমবার ফ্রান্সে আসার সময় জাহাজ ঝড়ে কবলিত হওয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। এরপর ১৯৩৫ সালে, বিজ্ঞানীরা তার নামে একটা লুনার ক্রেটারের নামকরণ করেন ‘লে জেন্টিল’। লুনার ক্রেটার হলো চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা বিভিন্ন গর্ত। জেন্টিলের নিজেরও কিছু অবদান আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানিক একশটি বস্তুর সেট- মেজার বস্তু, এম-৩২, এম-৩৬ এবং এম-৩৮ আবিষ্কার করেন। পাশাপাশি একটি নীহারিকার ক্যাটালগও তৈরি করেন তিনি।

তথ্যসূত্র

১. https://princetonastronomy.wordpress.com/2012/02/06/the-ordeal-of-guillaume-le-gentil

২. http://www.astroevents.no/venushist2aen.html

৩. https://thonyc.wordpress.com/2010/09/13/born-under-a-bad-sign

৪. https://www.youtube.com/watch?v=Qa8hFCoxx2E

featured image: astroevents.no

কেন্দ্রহীন মহাবিশ্বের কেন্দ্রের গল্প

প্রতিদিন সকালে সূর্য পূর্বদিকে উঠে দিন শেষে পশ্চিমে গিয়ে অস্ত নামে। তার পেছন পেছন দেখা দেয় রাতের আকাশের অগণিত তারা। রাত যত রাত বাড়ে তারার দল ততই পূর্ব থেকে পশ্চিমে হেলে পড়ে। একসময় রাতের শেষে সূর্যকে পূর্বদিকে আগমণ জানিয়ে বিদায় নেয়। বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন তারা দেখা গেলেও প্রতিবছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

একজন আকাশ পর্যবেক্ষক খুব সহজেই এসব দেখে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, সূর্য সহ সকল তারকারাজি আমাদের কেন্দ্রকরে ঘুরে। বিশেষ করে সময়টা যখন খ্রিষ্টপূর্ব শতাব্দীর। তখন জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি যেমন অ্যারিস্টটল, টলেমি প্রমুখ এমন মত-ই পোষণ করেছিলেন। এমনকি টলেমি পৃথিবীকে কেন্দ্রে রেখে মহাবিশ্বের একটা ভূকেন্দ্রিক মডেলও তৈরি করেছিলেন।

টলেমির ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্বচিত্র

সেই সময়েই স্রোতের বিপরীতে চলে সর্বপ্রথম গ্রিসের সামোস দ্বীপে জন্মগ্রহণকারী জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞ এরিস্টকাস বলেন সৌরকেন্দ্রিক মডেলের কথা। তিনি গণিতের সাহায্য নিয়ে সূর্য এবং চাঁদের আকৃতি ও দূরুত্ব বের করেন। প্রকৃত মানের সাথে তা না মিললেও তাঁর এই সিদ্বান্ত ঠিক ছিল যে সূর্য পৃথিবী থেকে অনেক বড় এবং অনেক দূরে।

তিনি বিশ্বাস করতেন তারকাদের অবস্থান অনেক দূরে বলে সূর্যের মতো তাদের অবস্থান দ্রুত পরিবর্তনের বদলে স্থির মনে হয়। যাকে বলে লম্বন। সূর্যের আকৃতি বিশাল হওয়ায় এবং আগুনের মতো আলোক বিকিরণ করায় ঐ মডেলের মাঝখানে সূর্য হবে। এখানে ‘ঐ মডেল’ বলতে এরিস্টকাসেরও আগে এমন একজনের মডেল বুঝানো হয়েছে যার ধারণা ছিল পৃথিবী, সূর্য, চাঁদ, তারা সবকিছু একটা আগুনের উৎসকে কেন্দ্র করে ঘুরে। তিনি হলেন ফিলোলাউস।

ফিলোলাউস ছিলেন একজন পিথাগোরিয়ান দার্শনিক যিনি প্লেটোনিজম এবং পিথাগোরিয়নিজমের মাঝে সমন্বয় ঘটান। ফিলোলাউস সেই আগুনের নাম দিয়েছিলেন কেন্দ্রিক আগুন। এটাই ছিল মানুষের তৈরি প্রথম মহাবিশ্বের মডেল যেখানে সবকিছু বৃত্তপথে কোনো কিছুকে কেন্দ্র করে ঘুরে।

কিন্তু কেন তিনি আগুনকে কেন্দ্রে রাখতে গেলেন? মানুষের সভ্য হয়ে ওঠার প্রথম সোপান ছিল আগুন আবিষ্কার। হয়তো তিনি আগুনকে অলৌকিক কিছু ভাবতেন। তবে তিনি যাই ভাবতেন না কেন এরিস্টকাসের মাথায় সৌরকেন্দ্রিক মডেলের অবতারণা করার জন্য তার ভাবনা অনেক সাহায্য করেছিল।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে টলেমিরে ভূকেন্দ্রিক মতবাদ এতোটাই গ্রহণযোগ্য ছিল যে তা তারকাসমূহের ভবিষ্যত অবস্থানও বলে দিতে পারতো। ফলশ্রুতিতে সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ অগ্রাহ্য এবং অবহেলিতভাবে পড়ে থাকে। এর দীর্ঘকাল পর ১৬শ শতকে সৌরকেন্দ্রিক জগতের একটি যুক্তিযুক্ত ও সঠিক গাণিতিক মডেল উপস্থাপন করেন ইউরোপীয় রেনেসাঁ যুগের গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং ক্যাথলিক ধর্মবেত্তা পোল্যান্ডের নিকোলাস কোপের্নিকাস।

কোপার্নিকাস একটা জ্যোতির্বিদ্যা-সংক্রান্ত টেবিল তৈরি করেন যার দ্বারা তারাদের অতীত এবং ভবিষ্যত অবস্থান বলে দেয়া যেতো। কিন্তু গ্রহদের একটু ব্যতিক্রমি গতি থাকায় এদের অবস্থান একমাত্র টলেমির মডেল অনুসারেই অধিক গ্রহণযোগ্য ছিল।

চিত্রঃ কোপানিকার্সের মডেল, যেখান সর্বপ্রথম প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদের কক্ষপথ চিহ্নিত করা হয়েছিল।

কোপার্নিকাসের পর আরো একজন জ্যোতির্বিদের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি টাইকো ব্রাহে। তিনি কোপার্নিকাসের টেবিলের ভুলটি ধরতে পেরেছিলেন অরো গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। কোপার্নিকাস গ্রহগুলোর গতিপথ বৃত্তাকার ভেবেছিলেন। টাইকো ব্রাহে দেখলেন গতিপথ বৃত্তাকার হলে এদের লম্বন অনুপস্থিত। তাই তিনি ভুলটা একটু শুধরে গ্রহদের সূর্যকেন্দ্রিক রাখলেও সেই সূর্যকে পৃথিবী কেন্দ্রিকই রেখে দিলেন।

বিজ্ঞানের বিবর্তন আসলে একজনের ভুল আরেকজন শুধরে সামনে এগোয়। পরবর্তীতে জোহানেস কেপলার টাইকো ব্রাহের নির্ভূল পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করে তাঁর তিনটা সূত্র প্রদান করেন। যেখানে পৃথিবী সহ গ্রহগুলোর উপাবৃত্তার গতিপথের কথা বলেছিলেন। ফলে তিনি সৌরকেন্দ্রিক মডেলকে ভূকেন্দ্রিক মডেলের সমকক্ষ করতে সক্ষম হন। বাকি ছিল শুধু হাতে নাতে অর্থাৎ পর্যবেক্ষণলব্ধ প্রমাণ।

সময়টা ১৬১০ সাল। নিজের বানানো টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশের অদ্ভূৎ সৌন্দর্য্যকে সর্বপ্রথম উপভোগ এবং পর্যবেক্ষণ করছিলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি। তিনি দেখলেন বৃহস্পতির চারপাশে কিছু তুলনামূলক ছোট বস্তু নির্দিষ্ট সময় পরপর লুকিয়ে যাচ্ছে। আরো কিছু সময় পর্যবেক্ষণের পর তার আর বুঝার বাকি রইলো না যে ঐ বস্তুগুলো বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এগুলোকে আমরা বৃহস্পতির উপগ্রহ হিসেবে চিনি। যা টলেমির ভূকেন্দ্রিক মডেলকে একদম বাতিল করে ছাড়লো। টিকে রইল সৌরকেন্দ্রিক মডেল।

টেলেস্কোপের উন্নতির ফলে ১৭৮৫ সালে উইলিয়াম হার্শেল আকাশগঙ্গা ছায়াপথ আবিষ্কার করেন। এমনিতে খালি চোখে আলো দূষণহীন অকাশে উজ্জ্বল মেঘের মতো উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত আকাশগঙ্গার একটা বিশাল অংশ চোখে পড়ে।

হার্শেল তাঁর টেলিস্কোপ সে দিকে তাক করে বার বার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এটি অনেক অনেক তারা সমষ্টি, যার কেন্দ্র অনেক বেশি উজ্জল। যখন এন্ড্রোমিডা ছায়াপথ আবিষ্কৃত হয় তখন বুঝা গেল আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথটিও এমনই একটি ছায়াপথ। এরপর থেকে এত এত ছায়াপথ আমরা দেখেছি যে ‘অগণিত’ শব্দ দিয়ে একে সম্বোধন করতে হয়। ফলশ্রুতিতে বহু বছর ধরে সৌরজগতের ভেতর আটকে থাকা মহাবিশ্বের কেন্দ্রের ইতিহাসের ভাটা পড়ে।

চিত্রঃ হার্শেল তার পর্যবক্ষেণ দ্বারা আকাশগঙ্গাকে প্রথমে যেমন ভেবেছিলেন।

১৯২৬ সালে এডুইন হাবল তাঁর সবচেয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টেলিস্কোপে যখন অগণিত ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তখন এক অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলেন। দূরবর্তী ছায়াপথ থেকে আসা আলোকের তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরিবর্তিত হবার হার সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে ছায়াপথ যত দূরে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ছায়াপথগুলোর বেগ দূরত্বের সমাণুপাতিক।

হাবলের পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বের কেন্দ্রের ইতিহাসের ইতি টেনে দেয় এই সিদ্বান্ত দিয়ে যে আমরা এক প্রসারণশীল মহাবিশ্বে বাস করছি। যার ফলে আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেছে। কেন্দ্র খোঁজা বাদ দিয়ে আমরা শুরু করলাম আমাদের অতীতকে জানতে।

সূর্য থেকে আলোক রশ্মি আমাদের নিকট আসতে ৮ মিনিট সময় নেয়। সূর্যের নিকটবর্তী তারকা প্রক্সিমা সেন্টৌরি থেকে আলো আসতে ৪ বছর সময় নেয়। আমরা যত দূরে তাকাতে পারব তত দূরের অতীত আমাদের পক্ষে দেখা সম্ভব হবে।

রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় বিভিন্ন যানবাহনকে দূর থেকে হর্ণ বাজাতে বাজাতে পাশ দিয়ে সামনে চলে যেতে দেখি। এক্ষেত্রে একটা জিনিস যদি খেয়াল করি তবে বুঝতে পারবো, গাড়িটি দূরে থাকা অবস্থায় হর্ণের শব্দটা একটু ক্ষীণ থাকে এবং যত নিকটবর্তী হয় শব্দ তত তীক্ষ্ণ হয়। এমনটা হবার কারণ আসলে গাড়ির গতির ফলে গাড়ি থেকে বেরুনো শব্দ তরঙ্গের পরিবর্তন। গাড়ি যত কাছে অগ্রসর হয়েছে তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত ক্ষুদ্র হয়েছে। একে বলে ডপলার ইফেক্ট।

আলোর ক্ষেত্রে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় থেকে ছোট হওয়া মানে রং লাল থেকে নীল হওয়া, যার নাম ব্লু শিফট্। এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোট থেকে বড় হওয়া মানে রং নীল থেকে লালে পরিণত হওয়া, যাকে বলে রেড শিফট্।

আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে গেলে ডপলার ইফেক্ট গবেষণার প্রাণ হিসেবে কাজ করে। দূরবর্তী তারকা থেকে আসা আলোকের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিবর্তন দেখে বলে দেয়া যায় সেটি কত দূরে অবস্থিত। যত দূরের বস্তু হবে তত তার রেড শিফট্ হবে। যদি সবচেয়ে অতীত অর্থাৎ সময়ের শুরুটা দেখতে চাই তাহলে ঠিক কতটা দূরে তাকাতে হবে?

সত্তরের দশকে অতীততম সময়ের সেই আলোকটিই খুঁজে বের করেন দুই জ্যোতির্বিদ আর্নো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন। এ আলোক ছিল আমাদের থেকে সবচেয়ে দূরের এবং সবচেয়ে অতীতের একদম মহাবিস্ফোরণের পরবর্তী মুহুর্তের। সবচেয়ে দূরের হওয়ায় এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বড়। তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় বলে বর্ণালীতে এর অবস্থান অণুতরঙ্গ (microwave) পরিসরে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ’। দূরত্ব নির্ধারণ করলে দাড়ায় ৪৬ বিলিয়ন আলকবর্ষ। সময় ১৩.৭ বিলিয়ন হলেও দূরত্ব ব্যাতিক্রম হওয়ার কারণ একটু পরেই বলছি। একটা প্রশ্ন মনে উঁকি দেয়া খুব স্বাভাবিক, এ আলোকই যে মহাবিস্ফোরণের সময়কার তার প্রমাণ কী?

চিত্রঃ মহা বিস্ফোরণের ঠিক পরের মহাবিশ্বের আদিম চেহারা।

যেহেতু এখন আমরা মহাবিশ্বকে প্রসারিত হতে দেখছি তাহলে নিশ্চয়ই আগে সবকিছু সংকুচিত অবস্থায় ছিল। যে সংকুচিত অবস্থার নাম অনন্যতা বা অদ্বৈত বিন্দু (Singularity)। শব্দখানা শুনে মনে হতে পারে হয়ত একটা একক বিন্দুর কথা বলা হচ্ছে যেখানে সবকিছু পুঞ্জীভূত ছিল। কিন্তু আসলে এটা কোনো একক বিন্দু নয়। স্থান-কালকে অসীম ধরা হয়। এখন যদি অসীম বিস্তৃত স্থান-কাল কে সংকুচিত করা হয় তাহলে কি কখনও সংকোচন শেষ হবে? হবে না।

আমরা বরং অসীম স্থান-কালের অসীম সংখ্যাক বিন্দুর কথা ভাবতে পারি। এখন অসীম বিন্দুর একটিকে আবার চিহ্নিত করতে গেলে বাধে বিপত্তি। কারণ তখন তাকে প্রকাশ করতে হবে ১/অসীম দিয়ে, যেখানে ১/অসীম মানে গণিতের ভাষায় শূন্য। অর্থাৎ এখানে এসে আমাদের সব সূত্র অকেজো হয়ে পড়ে। তবে যদি একটা একক বিন্দুর ক্ষেত্রে চিন্তা করি তবে ভাবা যায় ঐ বিন্দুর চারপাশের সবকিছু ঐ বিন্দুতে সংকুচিত হয়ে ছিল। তারপর হঠাৎ সেখান থেকে প্রসারণ শুরু হয়। মহা বিস্ফোরণ।

অসীম সংখ্যাক বিন্দু থেকে অসীম সংখ্যাক প্রসারণ হয়েছে। যা ১৩.৭ বিলিয়ন বছর পাড়ি দিয়ে আজকের জানা বিশাল অবস্থায় পরিণত হয়েছে। তাই মহাবিস্ফোরণকে বিস্ফোরণ না বলে ‘সর্বত্র প্রসারণ’ বলা চলে।

মহাবিস্ফোরণের পর প্লাজমা অবস্থায় যে ফোটনগুলো ছিল স্থান-কালের প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি আপনি যেখানে আছেন সেখানেও আছে। তাই যে দিকেই এন্টেনা তাক করি না কেন আমরা একে ধরতে পারব। চাইলে আপনিও পারবেন। এখনই টিভি বা রেডিও অন করে রিমোটটা হাতে নিন এবং একটা অব্যবহৃত চ্যানেলে যান, নিশ্চয়ই ঝির ঝির করা শো শো শব্দর ছবি দেখছেন। এটাই সেই মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ। আবিষ্কারের আগে একে যান্ত্রিক গোলযোগ ধরে নিয়ে সংকেত আদান প্রদান করা হতো।

আমাদের পক্ষে কি ১৩.৭ বিলিয়ন অলোকবর্ষের চেয়ে দূরের কোনো বস্তুকে দেখা সম্ভব হবে না? এক্ষেত্রে আমরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করতে পারি। আমাদের অবস্থান থেকে যে বস্তুগুলো যত দূরে তাদের প্রসারণ বেগ তত বেশি। ১৩.৭ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের বস্তুগুলোর প্রসারণ বেগ আলোর থেকেও বেশি। তাই তাদের থেকে নিঃসৃত আলো আরো বেশি বেগে দূরে চলে যায়।

আমরাও যেহেতু প্রসারিত হচ্ছি এক পর্যায় সে আলোককে আমাদের ধরে দেখা সম্ভব। এভাবে আরো ৩২ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দেখা সম্ভব। তাহলে সব মিলিয়ে ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ পর্যন্ত আমাদের দেখা সম্ভব। এই হলো আমাদের পর্যবেক্ষণ যোগ্য মহাবিশ্বের সীমানা।

চিত্রঃ পর্যবেক্ষণ যোগ্য মহাবিশ্ব।

আমি যদি পৃথিবী থেকে বেরিয়ে মহাবিশ্বের অন্য কোনো স্থানে যেতাম তবে সে অবস্থানের চারদিকে ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ পর্যন্ত হত আমার দৃশ্যমান মহাবিশ্ব। তবে আমি যদি যেতে যেতে ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে চলে যাই তখন আর পৃথিবীতেই ফিরে আসতে পারব না। বস্তুগুলোর মতো স্থানকালের প্রসারণের ফলে আমরাও পৃথিবীর সাপেক্ষে আলোর চেয়ে বেশি বেগে দূরে চলে যেতে থাকব।

অণুসন্ধিৎসু মানব মন সবকিছুর পরও একটা কেন্দ্র ঠিক করে যদি সুস্থির থাকতে চায় তবে এই বলে উপসংহার টানা যায় যে, প্রকৃত অর্থে মহাবিশ্ব অসীম। তাই এর কোনো কেন্দ্র নেই। তবে আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের কেন্দ্র আছে। সে কেন্দ্র আমরা নিজেরাই!

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Geocentric_model
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Heliocentrism
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/History_of_the_center_of_the_Universe
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Cosmic_microwave_background
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Big_Bang

featured image: thephysicsmill.com