পার্কার সোলার প্রোব: ১২ আগস্ট উৎক্ষেপিত যে মহাকাশযান অর্জন করবে মহাকাশ অভিযাত্রার ইতিহাসের রেকর্ড বেগ

নাসা এবং United Launch Alliance মিলে উৎক্ষেপণ করল সবচেয়ে দ্রুতগামী মহাকাশযান পার্কার সোলার প্রোব। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই স্পেসপ্রোবটি যাত্রা করে সূর্যের দিকে। সম্মিলিত উৎক্ষেপণ জোট বা ইউএলএ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মহাকাশে যান উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অভিজ্ঞ। এই কোম্পানির রয়েছে একাধারে ১২০টি উৎক্ষেপণ পরিচালনা করার রেকর্ড এবং উৎক্ষেপণে ১০০% সফলতা। এ প্রকল্পটির আর্থিক খরচ ১.৫ বিলিয়ন ডলার।

মহাকাশযানটি গতকাল (১১ই আগস্ট ২০১৮) উৎক্ষেপণের কথা ছিল, কিন্তু উৎক্ষেপণের শেষ মিনিটে ত্রুটি ধরা পড়ায় সময় পিছিয়ে দেয়া হয়। উৎক্ষেপণের নতুন সূচি ঠিক করা হয় আজ রবিবার (১২ আগস্ট ২০১৮) ফ্লোড়িডার কেপ ক্যানাভারালের স্থানীয় সময় রাত ৩:৩১ এ। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সময় দুপুর ১টা ৩১ মিনিটে এর উৎক্ষেপণের সম্ভাব্য সময় এটি উৎক্ষেপিত হয়েছে। পার্কার সোলার প্রোব উৎক্ষেপণের ভিডিও অবলোকন করা যাবে এখানে

এই প্রোবকে মহাকাশে নিয়ে গেছে ইউএলএ এর শক্তিশালী রকেট ডেল্টা IV। আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৪ এর ডিসেম্বরে পার্কার সোলার প্রোব হবে ইতিহাসের দ্রুততম মহাকাশযান। এ ঘটনাটি ঘটবে যখন প্রোবটি সূর্যের সবচেয়ে কাছে পৌঁছুবে। এ অভিযানের রূটম্যাপ বলছে এটি সূর্য থেকে ৩.৮৩ মিলিয়ন মাইল (৬ মিলিয়ন কিলোমিটার) দূর দিয়ে যাবে। ঐ বিন্দুতে গিয়ে প্রোবটির গতি হবে ৬৯২,০০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। অর্থাৎ সেকেন্ডে ১৯২ কিলোমিটারেরও বেশি।

এ দূরত্ব কত বড় আন্দাজ করতে পৃথিবীর সাথে তুলনা করে দেখা যেতে পারে। এই গতিতে প্রোবটির ওয়াশিংটন ডিসি থেকে টোকিওতে যেতে ১ মিনিটেরও কম সময় লাগত। আর টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া যেতে চার সেকেন্ডের চেয়ে একটু বেশি সময়!

নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে পার্কার সোলার প্রোব টিম প্রোবের পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন তাপীয় বায়ুশূন্য চেম্বারে; Image Credit: Ed Whitman/Johns Hopkins APL/Nasa

পার্কার স্পেসপ্রোবের পেছনে কাজ করা দলটি অবশ্য নির্বিকার এই রেকর্ডভাঙা কাজে। তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ অভিযানের খুঁটিনাটিতে। এই প্রজেক্টের ম্যানেজার এন্ড্রু ড্রিসম্যান নিযুক্ত আছেন জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটির ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ল্যাবরেটরিতে। তিনি বলেন, “মহাকাশে কোনো কিছু দ্রুতবেগে ছোটার জন্য সেটার ডিজাইন করা যতটা কঠিন তেমনি ধীরে ছোটার ডিজাইন করাও সমান মাত্রার কঠিন। কারণ হল, মহাশূন্যে তো একটা চালু দশাকে ঠেকানোর মত কিছু নেই।”

এ ব্যাপারগুলো অরবিটাল মেকানিক্সে ধারণা থাকলে খুব স্পষ্ট হয়ে যায়। গতি বাড়ানো যেমন সমস্যা, তেমনি মহাকাশযান টিকিয়ে রেখে এমন গতিপথ বাছাই করাও সমস্যা যা ঐ গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে মহাকর্ষের আকর্ষণে বিচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করবে। উল্লেখ্য মহাকাশে কোনো মহাকাশযানের গতিবৃদ্ধির এখনো পর্যন্ত সেরা উপায় হল কোনো গ্রহের বা সূর্যের মাধ্যাকর্ষণক্ষেত্রকে কাজে লাগানো। ড্রিসম্যান অবশ্য মজা করে বলেন, “মহাকাশযান কেবল জানে না এটি যে দ্রুতগতিতে ছুটছে।”

পার্কার সোলার প্রোবের অভিযানের গতিপথ | Image Credit: HORIZONS System, JPL, NASA

যাই হোক, এটা যে নিতান্ত ঝামেলাবিহীন অভিয়ান নয় তা স্পষ্ট। স্পেসপ্রোব না জানলেও, বিজ্ঞানীদের ঠিকই স্পেসপ্রোবকে সম্মুখীন হতে হবে এমন বিবিধ পরিস্থিতির কথা মাথায় রাখতে হয়। পার্কার সোলার প্রোব অতিদ্রুতবেগে ছোটার সাথে হিসেবে রাখতে হচ্ছে কোন মহাকাশীয় পরিবেশের মধ্য দিয়ে এটি গমন করছে। এটির অভিযানপথে রয়েছে এমন ধুলোময় পরিবেশ যাকে বলা হয় হাইপারভেলোসিটি ডাস্ট এনভায়রনমেন্ট। অর্থাৎ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বহু ধুলিকণাময় পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাবে পার্কার।

হাইপারভেলোসিটি অর্থাৎ উচ্চগতি বলতে প্রচলিতভাবে ধরা হয় ৩ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড বেগকে। এই বেগের ফলে দ্রুত ছোটা কণাগুলোর ভরবেগও যথেষ্ঠ মাত্রায় বেশি। ফলে এরা প্রবল ভরবেগে আঘাত করবে পার্কার সোলার প্রোবকে যার কারণে প্রোবের বেগের দিক বিদিকও হয়ে যেতে পারে। আসলে মহাকাশে অল্প আঘাতই বিশাল দূরত্বে ছোটা বস্তুর জন্য যথেষ্ঠ দিক বিদিকের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। এ সমস্যা নিরসণে বিজ্ঞানীরা স্পেসক্রাফটে ব্যবহার করবেন কেভলার কম্বল। এ বিশেষ কম্বল অধিক তাপসহ আর সিন্থেটিক ফাইবারের তৈরি। এ ধরণের ফ্যাব্রিকের বহুল ব্যবহার রয়েছে বুলেট প্রতিরোধী জ্যাকেট, শরীরের বর্ম, বোমার চাদর ইত্যাদি নির্মাণে। অর্থাৎ এই সমাধান বহু আঘাতে টেকসই থাকার সুবিধা দিতে পারছে।

শুক্রের অভিকর্ষকেও পার্কার সোলার প্রোব কাজে লাগাবে। শুক্রের কাছ দিয়ে পার্কার সোলার প্রোব ৭ বার অতিক্রম করবে। সূর্যের দিকে পাঠিয়ে সূর্য ওপাশ দিয়ে প্রোবকে ফেরত আনার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পৃথিবী নিজেই সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াচ্ছে, সে অনুসারে এই আদিবেগ পেয়ে যাচ্ছে প্রোব। কিন্তু এটি সূর্যের দিকের সাথে সমকোণে হলে পথ বেঁকে বড় হয়ে যাবে। ফলে সময় লাগবে আরো বেশি, উদ্দিষ্ট লক্ষ্যও টিকবে না। বেগ সংক্রান্ত সমস্যা বুঝতে দেখতে পারেন এই ভিডিওটি।

 

অভিযানের পথ অনুযায়ী, পার্কার সোলার প্রোব যখন সূর্যের সবচেয়ে নিকট বিন্দু দিয়ে যাবে তখন এর বেগ হবে ভয়েজার ১ এর বেগেরও দশগুণের বেশি। ভয়েজার ১ উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল ১৯৭৭ এ, পাঁচ বছর আগে এটি সৌরজগতের বাইরে চলে গিয়েছে। প্রক্সিমা সেন্টরাইয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঘণ্টায় ৬১,০০০ কিলোমিটার বেগে

 

পার্কার সোলার প্রোবের গতিপথে শুক্রের এবং সূর্যের অভিকর্ষ যেভাবে ব্যবহার করে উচ্চগতি অর্জিত হবে; Image Credit: Guardian graphic | Source: The Johns Hopkins University Applied Physics Laboratory

স্বাভাবিক হিসেবে গতি অর্জনের কৌশলের দিক থেকে ভয়েজার ১-ই ইতিহাসখ্যাত। তবে ২০১৬ এর জুলাইতে নাসার জুনো প্রোব বৃহস্পতির অভিকর্ষের প্রভাবে কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে বৃহস্পতির গ্যাসীয় জমিনে পড়ে ধ্বংস হয়। তখন এর বেগ পৌঁছে গিয়েছিল ঘণ্টায় ২৬৬,০০০ কিলোমিটারে। এ গতিবেগ কাজে না লাগলেও কতদূর অর্জনযোগ্য এটার একটা নমুনা পাওয়া গিয়েছিল।

গ্রহের অভিকর্ষকে ব্যবহার না করে, কেবল সূর্যের অভিকর্ষকে ব্যবহার করে রেকর্ডধারী স্পেসক্রাফট দুটি হল হেলিওস I এবং II. ১৯৭০ এর দশকে এরা উৎক্ষেপিত হয়েছিল। বুধ সূর্যের যত কাছে হেলিওস মহাকাশযান-যুগল তার চেয়েও কাছে প্রবেশ করেছিল। এরা অর্জন করেছিল ঘণ্টায় ২৪১,০০০ কিলোমিটার বেগ বা সেকেন্ডে ৭০ কিলোমিটার।

পার্কার সোলার প্রোব দৃশ্যমান সৌরপৃষ্ঠ থেকে চার মিলিয়ন মাইল (৬.৪ মিলিয়ন কিলোমিটার) নিকট দিয়ে যাবে। ফলে হেলিওসের চেয়েও প্রায় তিনগুণ বেগে দৌঁড়াবে এটি। সূর্যের উত্তাপকে আরেক ধাপ এগিয়ে চ্যালেঞ্জ জানানোর পথে অভিযাত্রা শুরু হয়ে গেছে… গতি অর্জন মানে তো আমাদের স্বপ্নে আশার সঞ্চার… বহুদূর ছুটে যেতে।

 

তথ্যসূত্র:

  1. https://www.space.com/41447-parker-solar-probe-fastest-spacecraft-ever.html
  2. https://www.theguardian.com/science/2018/aug/10/mission-to-touch-the-sun-nasa-to-launch-parker-solar-probe
  3. https://blogs.scientificamerican.com/life-unbounded/the-fastest-spacecraft-ever/
  4. https://www.space.com/41461-parker-solar-probe-launch-delayed.html
  5. https://voyager.jpl.nasa.gov/mission/status/

সৌর কোষের গঠন ও ব্যবহার

জ্বালানী ছাড়া এ গতিশীল বিশ্ব ফিরে যাবে সেই আদিম যুগে। যখন পায়ে হেঁটে যেতে হতো দেশান্তরে,পাথরে পাথর ঘষে তৈরি আগুনে করতে হতো রান্নাবান্না,গাছের বাকল গায়ে জড়ালে প্রকাশ পেতো শালীনতা আর বৃষ্টির দিনে কোনো এক গাছের নিচে খুঁজতে হতো মাথা গুঁজবার জন্য একটুখানি আশ্রয়।

এতো প্রয়োজনীয় এ জ্বালানিগুলো কী কী? তেল,গ্যাস আর কয়লাই তো। একবিংশ শতাব্দীতে যে সভ্যতার বিকাশ আমরা দেখছি,এর পেছনে মুখ্য অবদান এ তিন প্রকারের জৈব বস্তুর। ভাবছেন এ বস্তুত্রয় মানব সভ্যতার বিকাশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে আরো কয়েক শতাব্দী ধরে? নিশ্চিত করে বলতে পারি, ভুল ভাবছেন আপনি! সারা বিশ্বে জ্বালানী ব্যবহারের বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে তেলের মজুদ ফুরোতে সময় লাগবে মাত্র ৩৫ বছর। গ্যাস আরো দু’বছর বেশি টিকবে। আর কয়লা টিকবে সর্বসাকুল্যে আর ১০৭ বছর। ততদিনে পৃথিবীর জনসংখ্যা কতো হবে ভেবেছেন একবার। ২১২২ সালে কেমন পৃথিবী আমরা রেখে যাব পরবর্তী প্রজন্মের জন্য?

বিজ্ঞানী আর সচেতন মানুষের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠতে এটুকুই যথেষ্ট। তাই সময়ের প্রয়োজনে গবেষণা চলছে বিকল্প জ্বালানী সন্ধানের। এ পর্যন্ত যতোগুলো বিকল্প আমরা খুঁজে পেয়েছি,তার মাঝে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হলো সৌর শক্তির ব্যবহার।

২০১২ সালে পৃথিবীতে মোট শক্তি ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ১,৫৫,৫০৫ টেরা ওয়াট-আওয়ার (TWh)। একটি রোদ্রৌজ্জ্বল দিনে প্রতি বর্গমিটারে সৌর শক্তির অপচয় হয় প্রায় ১০০০ ওয়াট,যা শক্তির চাহিদার তুলনায় বহুগুণে বেশি। এ বিপুল পরিমাণ শক্তির পুরোটাই প্রাকৃতিক এবং পাওয়া যায় বিনামূল্যে। অফুরন্ত শক্তির উৎস তাই আমাদের চারপাশেই আছে। শুধু উপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহারের অপেক্ষা মাত্র।

আলো থেকে তড়িৎ শক্তির রূপান্তর

তড়িৎ শক্তি হলো পরিবাহীর ভেতর দিয়ে কোনো চার্জের প্রবাহ। সাধারণত ইলেকট্রনের প্রবাহকে আমরা তড়িৎ প্রবাহ বলি। ইলেকট্রন যখন পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চারিদিকে আবদ্ধ থাকে তখন এর কোনো প্রবাহ থাকে না। তড়িৎ প্রবাহ পেতে হলে তাই প্রথমে ইলেকট্রনকে নিউক্লিয়াসের আকর্ষণ থেকে মুক্ত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন শক্তির, যা আমরা পেতে পারি আলো থেকে।

শক্তির ধ্বংস বা সৃষ্টি নেই,শুধু তার রূপের বদল হয়। আলোক শক্তি থেকে তড়িৎ শক্তির এ রূপান্তর যে যন্ত্রে ঘটে,তাকে সৌর কোষ (Photovoltaic Cell) বলে। ফটো মানে আলো,আর ভোল্টেইক মানে তড়িৎ শক্তি। অর্থাৎ আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরির কোষই হলো সৌর কোষ।

সৌর কোষ তৈরি করা হয় বিশেষ ধরনের অর্ধপরিবাহী দিয়ে, যেমন- সিলিকন। যখন আলো এ কোষের উপর পড়ে,তখন এর কিছু অংশ এ অর্ধপরিবাহী শুষে নেয়। এই শক্তিই নিউক্লিয়াসের আকর্ষণ থেকে ইলেকট্রনকে মুক্ত করে। ইলেকট্রনগুলো তখন প্রবাহিত হতে শুরু করে। আর ইলেকট্রনের প্রবাহ থেকেই আমরা পাই তড়িৎ শক্তি।

সিলিকন-এ তড়িৎ প্রবাহ

সিলিকনের ১৪ টি ইলেকট্রন একটি সিলিকন পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে ঘিরে থাকে। তিনটি আলাদা শক্তিস্তরে এ ইলেকট্রনগুলো অবস্থান করে। প্রথমটিতে ২ টি,দ্বিতীয়টিতে ৮ টি আর শেষ শক্তিস্তরে ৪ টি। অষ্টক পূর্ণ করতে হলে সিলিকনের আরো চারটি ইলেকট্রন প্রয়োজন। এ ঘাটতি পূরণে দুটি সিলিকন পরমাণু একে অপরের সাথে বন্ধন তৈরির করে। এতে প্রতিটি সিলিকন পরমাণু ৪ টি করে ইলেকট্রন শেয়ার করে। তড়িৎ প্রবাহ পেতে হলে চাই মুক্ত ইলেকট্রন। কিন্তু বন্ধনে আবদ্ধ ইলেকট্রনগুলো মুক্ত নয়। এ ঘাটতি পূরণ করতে কিছু অংশে এমন একটি মৌল মেশানো হয় যার বাইরের শক্তিস্তরে ইলেকট্রনের সংখ্যা ৪ টির চেয়ে বেশি (ধরা যাক ৫ টি)। এতে ১ টি ইলেকট্রন বন্ধনে অংশ নেয় না। এ ইলেকট্রনটিকে আলো থেকে শোষিত শক্তি দিয়ে সহজেই মুক্ত করা যায়।

ইলেকট্রনের চার্জ ঋণাত্মক বলে এর আধিক্য থাকা অংশকে বলা হয় negative type বা সংক্ষেপে n-type। একইভাবে ইলেকট্রনের ঘাটতি অংশের নাম দেয়া হয়েছে positive type বা p-type।

সৌর কোষের গঠন

p-type ও n-type সেমিকন্ডাক্টরকে একসাথে করলে একটি জাংশন তৈরি হয় যাকে বলে p-n junction। তখন n-type অংশ থেকে ইলেকট্রন p-type অংশের দিকে প্রবাহিত হয়। এতে p-type অংশে ইলেকট্রনের শূন্যতা (hole) পূরণ হতে থাকে। p ও n জাংশন সংলগ্ন হোলগুলো এভাবে খুব দ্রুতই ইলেকট্রন দিয়ে পূর্ণ হয়। হোলগুলো ইলেকট্রন দিয়ে পূর্ণ হওয়ায় নতুন করে ইলেকট্রন প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করে। এ ডিপ্লেশন লেয়ারে তখন তৈরি হয় একটি তড়িৎ ক্ষেত্র।

তড়িৎ ক্ষেত্রটি কাজ করে একটি ডায়োড হিসেবে। এর কাজ হলো ইলেকট্রনকে p-type অংশ থেকে n-type অংশের দিকে প্রবাহিত হতে দেয়া। কিন্তু এটি n-type অংশ থেকে p-type অংশে ইলেকট্রনের প্রবাহকে বাধা দেয়। অর্থাৎ ডায়োড তড়িৎ প্রবাহকে একটি নির্দিষ্ট দিকেই শুধু প্রবাহিত হতে দেয়। সেমিকন্ডাক্টরের উপর যখন আলো আপতিত হয়, তখন যথেষ্ট শক্তি সম্পন্ন ফোটন কণা ইলেকট্রন আর ফোটনকে আলাদা করে। এরপর তড়িৎ ক্ষেত্র ইলেকট্রনকে n-type অংশে ও হোলকে p-type অংশে পাঠিয়ে দেয়। এভাবে এদের মাঝে বিভব পার্থক্যের (potential difference) সৃষ্টি হয়। এখন যদি দুটি অংশকে পরিবাহী দিয়ে যুক্ত করা হয়, তবে তড়িৎ প্রবাহ পাওয়া যাবে।

সিলিকন দেখতে খুব চকচকে। তাই এর উপর আলো পড়লে বেশিরভাগ অংশই প্রতিফলিত হয়। এজন্য প্রতিফলনরোধী একটি বিশেষ আবরণ দেয়া হয় এর উপর। সবশেষে একটি কাচের প্লেট দিয়ে সুরক্ষিত করা হয় সৌর কোষকে। শক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো কখনো একাধিক সৌর কোষকে একসাথে ব্যবহার করা হয়। ২০০৬ সাল পর্যন্ত সৌর কোষের কর্মদক্ষতা অর্থাৎ আলোক শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করার হার ছিল মাত্র ১২ থেকে ১৮ শতাংশ। বর্তমানে এই হার বেড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

p-type ও n-type সেমিকন্ডাক্টর ও p-n জংশন

সৌর কোষে শক্তির অপচয়

সৌর কোষে যে আলো আপতিত হয়,তা একবর্ণী নয়। আপতিত আলোতে ভিন্ন ভিন্ন শক্তির ফোটন পাওয়া যায়। তড়িৎ শক্তি উৎপাদনের জন্য ফোটন কণার একটি নূন্যতম শক্তি থাকা চাই। যেসব কণার শক্তি এর চেয়ে কম,সেগুলো সৌর কোষ দিয়ে প্রতিসরিত হয়। আর যেসব কণার শক্তি নূন্যতম শক্তির চেয়ে বেশি,সেগুলোর বাড়তি শক্তিটুকুর অপচয় হয়। এ নূন্যতম শক্তিকে বলা হয় ব্যান্ড পার্থক্য। বিশুদ্ধ সিলিকনের জন্য ব্যান্ড পার্থক্য হলো ১.১ ইলেকট্রন-ভোল্ট (eV)। ব্যান্ড পার্থক্যকে ইচ্ছামতো কমানো কিংবা বাড়ানো যায়। এটি কমালে শক্তির অপচয় কমে যাবে। কিন্তু ব্যান্ড পার্থক্যের সাথে সৃষ্ট বিভব পার্থক্যেরও সম্পর্ক রয়েছে। এটি কমালে বিভব পার্থক্যও কমে যাবে। এতে শক্তি উৎপাদনের হার কমে যাবে। তাই ব্যান্ড পার্থক্যকে একটি সুবিধাজনক মানে স্থির করা হয়। সিলিকনের জন্য এটি ১.৪ ইলেকট্রন-ভোল্ট।

বাসার ছাদে স্থাপিত সৌর কোষ

শক্তির অপচয় রোধে আরো কিছু পরিবর্তন আনা হয় সৌর কোষে। উপরের দিকের অংশের পরিবাহী তারকে যতটা সম্ভব স্বচ্ছ রাখা হয়। এতে আলো সহজে কোষে প্রবেশ করতে পারে। তবে নিচের অংশের পরিবাহীকে রাখা হয় অস্বচ্ছ। এভাবে আলোক শক্তির উল্লেখযোগ্য অংশকে ব্যবহার করা সম্ভব। এছাড়াও খেয়াল রাখতে হবে সেমিকন্ডাক্টরের মধ্যকার সংযোগগুলো যেন কাছাকাছি থাকে। কারণ সেমিকন্ডাক্টরের উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রোধ থাকে। রোধ বাড়লে শক্তির অপচয় বেড়ে যাবে।

বাড়িতে সৌর শক্তির ব্যবহার

বাড়ির ছাদে কিংবা টিনের চালে সৌর কোষ এমনভাবে বসাতে হবে যেন সর্বোচ্চ পরিমাণ সূর্যের আলো এর উপর আপতিত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া আর জলবায়ু অনুযায়ী ছাদের সাথে উপযুক্ত কোণ করে স্থাপন করতে হবে। ধরা যাক, আপনার বাসা পৃথিবীর উত্তর মেরুর কাছাকাছি। তাহলে বাসার ছাদে সৌর কোষ স্থাপন করতে হবে দক্ষিণ দিকে মুখ করে। এতে সর্বোচ্চ পরিমাণ সূর্যালোক পাওয়া যাবে। আবার ধরুন, দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে আপনার শক্তির প্রয়োজন হয় সবচেয়ে বেশি। তাহলে ঠিক ঐ সময়টাতে সূর্যের অবস্থান অনুসারে বসাতে হবে সৌর কোষটিকে। সহজ কথায়,সৌর

কোষকে পর্যাপ্ত পরিমাণ সূর্যের আলো দিতে হবে। তবেই চাহিদামতো শক্তির উৎপাদন নিশ্চিত করা যাবে।

আইল্যান্ডিং


ধরুন আপনার বাসার সৌর কোষটি বাইরের সাপ্লাই লাইনের সাথে যুক্ত। হঠাৎ একদিন লাইনে কোনো ত্রুটি দেখা দিয়েছে। তাই স্টেশন থেকে পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ রাখা হয়েছে। ঠিক এ সময়েও আপনি ও আপনার প্রতিবেশি ঠিকই বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করতে পারবে। তবে যদি কোনো ইলেক্ট্রিশিয়ান এ লাইনে কাজ করতে আসেন, তবে তার পরিণতি কী হবে ভেবেছেন! যখন চারিদিকে ব্ল্যাক-আউট (blackout) অথচ আপনার বাসায় বিদ্যুৎ আছে, তখন এ অবস্থাকে বলে আইল্যান্ডিং। বিষয়টা অনেকটা সাগরের মাঝে হঠাৎ একটা দ্বীপ জেগে ওঠার মতোই। আর এর সম্ভাব্য পরিণতি বেচারা ইলেক্ট্রিশিয়ানের মৃত্যু! এমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়, তাকে বলে এন্টি-আইল্যান্ডিং।

নিয়ন্ত্রিত চার্জিং- চার্জ কন্ট্রোলারের ব্যবহার 

সৌর কোষের উৎপাদিত বিদ্যুৎ শক্তি সঞ্চয়ের জন্য যে ব্যাটারি ব্যবহার করা হয় তা অনিরাপদ চার্জিং এর জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এজন্য ব্যাটারির সাথে চার্জ কন্ট্রোলার ব্যবহার করা হয়। পুরোপুরি চার্জ হলে,চার্জ কন্ট্রোলার নতুন উৎপন্ন বিদ্যুৎকে আর ব্যাটারিতে জমা হতে দেবে না। এছাড়াও এটি ব্যাটারিকে চার্জ-শূন্য হওয়া থেকে রক্ষা করে। চার্জ কন্ট্রোলার ব্যবহারে উৎপন্ন বিদ্যুতের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এতে ব্যাটারির স্থায়িত্বও বাড়ে।

ডিসি প্রবাহকে এসি প্রবাহে রূপান্তর- ইনভার্টারের ব্যবহার

সৌর কোষে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়,তা একমুখী (dc)। বাড়িতে ব্যবহার উপযোগী করা জন্য একে দিক পরিবর্তী প্রবাহে (ac) রূপান্তরিত করতে হয়। ইনভার্টারের মাধ্যমে এই কাজটি করা হয়। ইনভার্টার ডিসি তড়িৎকে এসি তড়িতে রূপান্তরিত করে। কখনো কখনো ইনভার্টারকে আইল্যান্ডিং প্রতিরোধেও ব্যবহার করা হয়। কিছু কিছু উন্নত সৌর কোষে ইনভার্টার যুক্ত থাকে। এতে সরাসরি এসি তড়িৎ পাওয়া যায়।

সৌর কোষ প্রযুক্তির অগ্রগতি

স্বল্পমূল্যের সৌর কোষ উৎপাদনঃ সৌর কোষ ব্যবহারের প্রধান অসুবিধা হলো এর উচ্চমূল্য। একই উৎপাদন ক্ষমতার প্রচলিত যেকোনো তড়িৎ শক্তি উৎপাদনকারী ব্যবস্থা থেকে সৌর কোষ পদ্ধতির ব্যবহার বেশি ব্যয়বহুল। তবে এর সুবিধা হলো, একবার স্থাপন করতে পারলে বিনামূল্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। গবেষকেরা প্রাথমিক পর্যায়ে এর মূল্য কমানোর জন্য একক ক্রিস্টাল সিলিকনের পরিবর্তে পলিক্রিস্টালাইন সিলিকন ব্যবহার করতেন। এর কর্মদক্ষতা ছিল বেশ কম। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এখন পাতলা ফিল্মের সৌর কোষ ব্যবহার করা হয় যার কর্মদক্ষতা পলিক্রিস্টালাইন সিলিকন থেকে বেশি এবং উৎপাদন খরচ বেশ কম। অ্যামোরফাস সিলিকন,Ga-As, Cu-In-Se2, Cd-Te ইত্যাদি ব্যবহার করা হয় এ সৌর কোষ তৈরিতে।

কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিঃ সৌর কোষে একটি স্তরের পরিবর্তে ভিন্ন ভিন্ন ব্যান্ড পার্থক্যের একাধিক স্তর ব্যবহার করে কর্মদক্ষতা বাড়ানো যায়। সবচেয়ে বেশি ব্যান্ড পার্থক্যের স্তরকে উপরে রেখে,ক্রমান্বয়ে ছোট ব্যান্ড পার্থক্যের স্তরগুলো একে একে সাজালে বিভিন্ন শক্তির ফোটন শোষিত হবে। এতে কর্মদক্ষতা অনেক গুণে বেড়ে যায়।

সূর্যালোকের পরিমাণ বৃদ্ধিঃ শুধুমাত্র আপতিত আলোর উপর নির্ভর না করে বরং লেন্স আর আয়না ব্যবহার করে সূর্যের আলোকে ঘনীভূত করা হয়। এতে তড়িৎ শক্তির উৎপাদন অনেকখানি বেড়ে যায়।

সৌর কোষ ব্যবহারে ব্যয়

সৌর কোষের জ্বালানী সূর্যের আলো,যা বিনামূল্যে পাওয়া যায়। শুধুমাত্র স্থাপনের খরচটুকু যোগাতে পারলে দীর্ঘদিন এর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। তাই দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের জন্য সৌর কোষ অনেক সাশ্রয়ী।

প্রাথমিকভাবে স্থাপনের জন্য সৌর কোষের খরচ অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতি থেকে কিছুটা বেশি। প্রতিটি ১০০০ ওয়াট সৌর প্যানেলের বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ২৫ হাজার টাকা। তবে আশার কথা হলো, সৌর কোষ নিয়ে ক্রমবর্ধমান গবেষণার ফলে এর বাজারমূল্য কমে আসছে। এর সাথে বাড়ছে কর্মদক্ষতাও। বাসা বাড়ির বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সৌর কোষের ব্যবহার দ্রুতই বেড়ে চলেছে। তবে এর বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেকটাই আবহাওয়া নির্ভর। মেঘলা দিনে কিংবা রাতের বেলায় এটি কাজ করে না। তাই সৌর কোষের সাথে ব্যাটারি যুক্ত করা হয়। এতে চার্জ সঞ্চয় করে রাখা যায়। প্রচলিত পাওয়ার সাপ্লাইয়ের সহায়ক হিসেবেও সৌর কোষ ব্যবহার করা যায়।

বিজ্ঞানীদের ধারণা- সূর্য আরো প্রায় পাঁচ বিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীকে আলোকিত করে যাবে। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে একদিন হয়তো পুরো পৃথিবীর জ্বালানী চাহিদা পূরণ হবে সৌর শক্তি দিয়ে। সেদিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয়।

তথ্যসূত্রঃ

  1. http://science.howstuffworks.com/environmental/energy/solar-cell.htm
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/World_energy_consumption
  3. http://cleantechnica.com/2013/06/19/forecast-cost-of-pv-panels-to-drop-to-0-36watt-by-2017

featured image: solarpowerportal.co.uk