স্টিফেন হকিং কেন স্পেশাল?

মাঝে মাঝে মনে হয় লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যদি তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা না আঁকতেন তাহলে ভালো হতো। কারণ মোনালিসার এত আলো যে সে আলোর প্রাবল্যে ঢাকা পড়ে গেছে দ্য ভিঞ্চির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও উদ্ভাবন।

গণিত, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা সহ অন্যান্য অনেক শাখায় তার এমন অনেক অবদান আছে যে সেগুলো নিঃসন্দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তার নাম যখন মানুষের মনে আসবে তখন সেগুলোও যদি মনে আসে তাহলে তার মেধার সত্যিকার বিস্তৃতি সম্বন্ধে মানুষ অনুধাবন করতে পারতো।

আলবার্ট আইনস্টাইনের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। তার আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এতই উজ্জ্বল হয়ে আছে যে সে উজ্জ্বলতার চাপে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার বিজ্ঞানে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান। পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় জটিল জটিল বিষয়ে এত চমৎকার সব গবেষণা তিনি করে রেখেছেন যে সেগুলোর জন্য তাকে আরো পাঁচ বার নোবেল পুরষ্কার দেয়া যায়। কিন্তু আপেক্ষিকতা তত্ত্বের তীব্রতায় সেগুলো সম্বন্ধে মানুষ তেমন জানেই না।

আইজ্যাক নিউটনের বেলাতেও তা-ই। বিজ্ঞান, গণিত এমনকি রসায়নেও তার এমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে যে সেগুলোর প্রত্যেকটিই যুগান্তকারী। কিন্তু মহাকর্ষ তত্ত্বের বিশালতায় মানুষ ভালোভাবে জানেই না তার অবদানের কথা।

সম্প্রতি (১৪ই মার্চ, ২০১৮) পরলোকগত হয়েছেন বিখ্যাত কসমোলজিস্ট স্টিফেন হকিং। তার বেলাতেও এমনই ঘটনা ঘটেছে। আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম বইয়ের মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞান ও না-বিজ্ঞানের মানুষদের মাঝে যে পরিমাণ বিখ্যাত হয়েছেন, ইতিহাসে অন্য কোনো বিজ্ঞানীই তাদের বইয়ের মাধ্যমে সে পরিমাণ বিখ্যাত হননি।

স্টিফেন হকিংয়ের নাম নিলে মানুষের মনে অবশ্যই এ বইটির নাম চলে আসবে। মহাবিশ্বের প্রকৃতি অনুসন্ধানে বইটি তখনকার সময়ের জন্য এক বিপ্লব ছিল। যারা সাম্প্রতিক বিজ্ঞানের খোঁজ খবর রাখেন তারা হয়তো ২০১০ সালে প্রকাশিত তার আরেকটি বই দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন-এর কথাও বলবেন। এ বইটির কারণেও তিনি নতুন করে আলোচিত ও বিতর্কিত হন।

কিন্তু স্টিফেন হকিংয়ের মূল গুরুত্ব সেখানে নয়। যে যে বিষয় নিয়ে তার বিখ্যাত হওয়া উচিত ছিল, যে যে বিষয়ে বিখ্যাত হলে তার মেধার ক্ষমতা ও বিচরণের বিস্তৃতি সম্বন্ধে প্রকৃত মূল্যায়ন করা হতো সে সে বিষয় সম্বন্ধে অধিকাংশ মানুষ জানেই না। যারা জানে তাদের পরিমাণ খুবই অল্প। অথচ তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী বলা যায়।

বিংশ শতাব্দীর সেরা বিজ্ঞানী কে, এ প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জরিপ পরিচালনা করা হয়। সেসব জরিপে স্টিফেন হকিংয়ের নাম থাকে না বললেই চলে[1] থাকলেও তার অবস্থান হয় একদম তলানিতে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার গবেষণাগুলো খুবই উঁচু মানের এবং নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।

সকলেরই উচিত তার কাজগুলো সম্বন্ধে ধারণা রাখা। তার উপর তাকে যদি একজন বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাহলে পপুলার সায়েন্সের বইগুলো নয়, অবশ্যই পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার গবেষণাকে সর্বাগ্রে রাখতে হবে। সেজন্য বিজ্ঞানে তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ নিয়ে আলোচনা করা হলো এখানে।

হকিং তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেছেন মূলত মহাকর্ষ তত্ত্ব, সৃষ্টি তত্ত্ব (Cosmology), কোয়ান্টাম তত্ত্ব, তাপগতিবিদ্যা (Thermodynamics) ও ইনফরমেশন তত্ত্বে।

হকিংয়ের কাজ ব্যাখ্যা করতে গেলে শুরু করতে হবে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দিয়ে। ১৯১০ সালে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করার জন্য আলবার্ট আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রদান করেন। আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বে যে সীমাবদ্ধতা ছিল তা দূর হয় এ তত্ত্বের মাধ্যমে।

চিত্র: স্টিফেন হকিং (১৯৪২–২০১৮); ছবি: Steemit

নিউটনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মহাকর্ষ হলো বস্তুর ভরের সাথে সম্পর্কিত একটি জিনিস। ভারী বস্তু তার চারপাশের এলাকায় মহাকর্ষের ক্ষেত্র তৈরি করে। অনেকটা চুম্বকের মতো। চুম্বক যেমন তার চৌম্বকক্ষেত্রের মাঝে অবস্থান করা বস্তুকে আকর্ষণ করে তেমনই ভারী বস্তুও তার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মাঝে অবস্থান করা বস্তুকে আকর্ষণ করে। যেমন চাঁদ ও পৃথিবী।

পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ভেতরে চাঁদ অবস্থান করছে বলে পৃথিবী তার আকর্ষণ বলের মাধ্যমে চাঁদকে নিজের চারপাশে আটকে রাখছে। অন্যদিকে, দূরের গ্রহ পর্যন্ত পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র বিস্তৃত নয়, তাই তাদেরকে আকর্ষণ করে ধরে রাখতে পারে না পৃথিবী।

এ মহাকর্ষ জিনিসটি কী? কী কারণে এর অস্তিত্ব আছে তা ব্যাখ্যা করেননি নিউটন। নিউটনের সূত্র শুধু এটিই বলছে যে, যার ভর আছে তাতে প্রাকৃতিক কোনো উপায়ে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তৈরি হয়।

এর বিপরীতে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে, মহাকর্ষ শূন্যের মাঝে বা স্থানের মাঝে তৈরি হওয়া বিশেষ কোনো ‘ক্ষেত্র’ নয়। স্থানের নিজেরই বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হলো মহাকর্ষ।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- একটি প্লাস্টিকের গামলা (bowl)-র মাঝে যদি একটি ছোট বল (ball)-কে রেখে কৌশলে চরকির মতো ঘোরানো হয় তাহলে ছোট বলটি গামলার দেয়ালে ঠেকে ঘুরতে থাকবে। আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে সূর্য ও পৃথিবীর আকর্ষণও অনেকটা গামলার দেয়ালে বলের ঘোরার মতো।

সূর্য তার প্রবল ভরের প্রভাবে চারপাশের স্থানকে এমনভাবে বাকিয়ে নিয়েছে যে তা অনেকটা এখানের গামলার দেয়ালের মতো হয়ে গেছে। এই দেয়ালকে ঘেঁষে প্রতিনিয়ত ঘুরে চলছে পৃথিবী। অর্থাৎ স্থান নিজেই এমন রূপ ধারণ করে আছে যে এতে আটকা পড়ে প্রতিনিয়ত ঘুরছে পৃথিবী।

স্বাভাবিক বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে হিসেব করলে এ ব্যাখ্যা অনুধাবন করা যাবে না। এর জন্য কাল্পনিকভাবে ধরে নিতে হবে স্থান একটি নিরবিচ্ছিন্ন চাদরের মতো। এই চাদরের যেখানে কোনো ভারী জিনিস (সূর্য বা নক্ষত্র) রাখা হয় সে অঞ্চলের চাদর নীচের দিকে দেবে যায়। দেবে যাওয়া অংশে দেয়ালের মতো অংশ তৈরি হয়। ঐ দেয়ালে আটকা পড়ে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগুলো বৃত্তাকার পথে ঘুরে চলে।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বিশেষ একটি বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে যে, যথেষ্ট পরিমাণ ভারী বস্তু, যেমন খুব বড় কোনো নক্ষত্র, বিশেষ এক প্রক্রিয়ায় তার নিজের মহাকর্ষের চাপে নিজেই সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। সংকুচিত হয়ে সকল ভর একত্রিত হতে পারে একটি অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দুতে। তখন এর ঘনত্ব হবে প্রায় অসীম। অতি ক্ষুদ্র বিন্দুতে প্রায় অসীম ঘনত্বের এ অবস্থাটিকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি।

এই সংকোচন তার আশেপাশের স্থানকে এমনভাবে বাকিয়ে ফেলে যে সেখান থেকে কোনোকিছুই আর বের হয়ে আসতে পারবে না। এমনকি আলোও সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারবে না।[2] ঐ সিঙ্গুলারিটি বিন্দুকে আজকে আমরা বলি ব্ল্যাক হোল।

স্থানের বক্রতা, সিঙ্গুলারিটি বিন্দু এবং ব্ল্যাক হোল সম্পর্কিত এ ব্যাপারটি প্রথম প্রস্তাব করেন আমেরিকান পদার্থবিদ রবার্ট ওপেনহেইমার। ১৯৩৯ সালে ফিজিক্যাল রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে[3] তিনি এটি উপস্থাপন করেন। কিন্তু তখনকার সময়ের পদার্থবিদরা এ প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি।[4] একটি অদ্ভুত বিন্দুতে এমন অদ্ভুত দশার সৃষ্টি হবে এমনটি তারা গ্রহণই করতে পারেনি। তাই অল্প ক’দিনেই এটি চাপা পড়ে যায়।

চিত্র: রবার্ট ওপেনহাইমার; ছবি: US Department of Energy

দীর্ঘদিন পর ১৯৫৯ সালের দিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়য়ের একজন গ্র্যাজুয়েট ছাত্র এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে। ছাত্রটির নাম স্টিফেন হকিং। অক্সফোর্ডে তার পড়াশোনা শেষ করার পর পিএইচডির জন্য ভর্তি হলেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়য়ে। সেখানে তার আগ্রহের বিষয় ছিল সাধারণ আপেক্ষিকতা ও ব্ল্যাক হোল। তার পিএইচডি সুপারভাইজর ডেনিস সায়ামা এ ক্ষেত্রগুলোতে তার আগ্রহের ব্যাপারটি লক্ষ্য করেন।

সায়ামার অধীনে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এটি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও ব্ল্যাক হোলের সাথে সম্পর্কিত। বিগ ব্যাং তত্ত্ব বলছে আমাদের মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দু থেকে। সময়ের সাথে সাথে এটি প্রসারিত হয়ে আজকের এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।

বর্তমানে বিগ ব্যাং তত্ত্ব সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সকলের কাছে স্বাভাবিক। কিন্তু স্টিফেন হকিং যখন এটি নিয়ে কাজ করছিলেন তখন বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক প্রচলিত ছিল। এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল।

হকিং এখানে বিগ ব্যাং ও ব্ল্যাক হোলের মাঝে একটি সম্পর্ক খুঁজে পান। তিনি অনুধাবন করেন ব্ল্যাক হোল তৈরি হবার ঠিক উলটো প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছে এই মহাবিশ্ব। এ বিষয়টি নিয়ে তিনি রজার পেনরোজের সাথে গবেষণা করেন এবং ১৯৭০ সালে রয়্যাল সোসাইটির প্রসিডিংসয়ে তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন[5] এখানে তারা দেখিয়েছেন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এমন আভাষ দিচ্ছে যে এ মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল অতিক্ষুদ্র এক সিঙ্গুলারিটি বিন্দু থেকে।

এ সময়টায় হকিং অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলেন। ক্র্যাচের উপর ভর দিয়েও চলাফেরা করতে পারছিলেন না। শুয়ে থাকাটাই দিনের বেশিরভাগ সময়ের কাজ। ১৯৭০ এর শেষ দিকে শুয়ে রয়েছেন এমন অবস্থায় তার মাথায় হঠাৎ কিছু আইডিয়া খেলে গেল। গাণিতিক হিসাব নিকাশ কষে তিনি অনুধাবন করলেন, ব্ল্যাকহোল শুধুমাত্র আকারে বৃদ্ধিই পেতে পারে, কখনোই হ্রাস পেতে পারে না। অথচ তার পূর্ববর্তী গবেষকরা বলেছিলেন ব্ল্যাকহোল সংকুচিত হতে হতে অতি ক্ষুদ্র সিঙ্গুলারিটি বিন্দুতে পরিণত হতে পারে।[6]

চিত্র: তরুণ বয়সে স্টিফেন হকিং। ছবি: Liam White/Alamy Stock Photo

ব্ল্যাক হোলের আকার কখনো কমতে পারে না, ধীরে ধীরে বেড়েই চলে- স্বাভাবিক দৃষ্টিতে এটাই হবার কথা। কারণ ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে যা-ই আসুক না কেন তাকেই নিজের দিকে টেনে নেয়। ফলে ভর ও আকার বাড়তেই থাকবে।

ভরের কথা আসলে চলে যেতে হবে ঘটনা দিগন্ত (event horizon) নামের আরেক বিষয়ে। কোনো ব্ল্যাক হোলের আকার কেমন হবে তা নির্ভর করে ব্ল্যাক হোলটির ভরের উপর। উল্টোভাবে দেখলে, কোনো ব্ল্যাক হোলের আকার যদি জানা যায় তাহলে এর ভর কত তা জানা যাবে। ব্ল্যাক হোলের আকার নির্ণয় করা যায় ঘটনা দিগন্ত হতে। ঘটনা দিগন্ত হচ্ছে ব্ল্যাক হোলের একটি প্রান্তিক সীমানা, যেখানের পর থেকে কিছু আর ফেরত আসতে পারে না।

দিগন্তকে একটি বৃত্তাকার সীমানা বলে বিবেচনা করা যায়। এই সীমানার বাইরে কোনো বস্তু থাকলে তাকে দেখা সম্ভব কিন্তু সীমানা স্পর্শ করে ফেললে কিংবা সীমানা পার করে ফেললে তাকে আর দেখা সম্ভব নয়।

একদিকে ব্ল্যাক হোল তার পেটে বস্তু গ্রহণ করে করে আকারে বড় হয়েই চলছে আর অন্যদিকে ঘটনা দিগন্ত তার সীমানা হিসেবে কাজ করছে। তার মানে দাড়ায়, ঘটনা দিগন্তের আকার বেড়েই যাবে দিন দিন। অনেকটা বেলুনের পৃষ্ঠের মতো, ফুঁয়ের সাথে সাথে যার আকার ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকে।

চিত্র: ঘটনা দিগন্তের ভেতরে পড়ে গেলে কোনোকিছুই আর ফিরে আসে না। ছবি: Mark Garlick/Science Photo Library

হকিং দেখান যে ব্ল্যাক হোল আকারে ছোট হতে পারে না, ভেঙে ছোট টুকরোও হতে পারে না। এমনকি অন্য একটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষেও না।[7]

তারপর তিনি আরো একটি হেঁয়ালি কাজ করেন। তিনি বলেন, পদার্থবিজ্ঞানের অন্য একটি নিয়মও ব্ল্যাক হোলের ক্রম প্রসারমান দিগন্তের ব্যাপারটি সমর্থন করে। নিয়মটি হলো এনট্রপি।

এনট্রপিকে অনেকটা বিশৃঙ্খলার সাথে তুলনা করা যায়। দুটি তাপীয় উৎসের তাপমাত্রা যদি ভিন্ন হয়, এবং এদেরকে যদি কোনো একভাবে সংযোগ করিয়ে দেয়া হয় তাহলে সেখানে তাপের আদান প্রদান হবে। তাপীয় পার্থক্য বেশি হলে এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে এনট্রপি কম।

[তাপের এই আদান প্রদান থেকে আমরা অনেক কিছু করে নিতে পারি। আমরা যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি তা আসে অনেকটা এরকম প্রক্রিয়া থেকেই। এখন তাপমাত্রার পার্থক্য যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে তাপের আদান প্রাদানও শেষ হয়ে যাবে। ফলে সভ্যতার অবস্থা কেমন হবে তা না বলে দিলেও অনুমান করা যায়। তাপমাত্রার পার্থক্য না থাকার এই অবস্থাকে বলা যেতে পারে বেশি এনট্রপি।]

পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম যেহেতু পুরো মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য তাই এনট্রপির হিসেবও পুরো মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য। বর্তমানে মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রার বিভিন্ন অবস্থা রয়েছে। বাস্তবতা বলছে মহাবিশ্বের এমন একদিন আসবে যেদিন সকল স্থানের তাপমাত্রা এক হয়ে যাবে। কোনোপ্রকার তাপীয় আদান-প্রদান ঘটবে না, ফলে তাপীয়ভাবে মৃত্যু ঘটবে এই মহাবিশ্বের। এটি হবে মহাবিশ্বের সর্বাধিক এনট্রপি।

চিত্র: মহাবিশ্ব ক্রমান্বয়ে সর্বাধিক বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ছবি: ES Sense Club

মহাবিশ্বের বিভিন্ন কোনায় নানাভাবে হয়তো আমরা তাপীয় পার্থক্যের নানান কিছু দেখতে পাই। ক্ষুদ্র একটি অঞ্চল বিবেচনা করলে হয়তো দেখতে পাই তাপীয় পার্থক্য বাড়ছে। কিন্তু তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র বলছে, কোনায় কানায় যা-ই হোক না কেন, ‘সামগ্রিকভাবে’ পুরো মহাবিশ্বের এনট্রপি বেড়েই চলছে। কখনোই কমছে না।

হকিং এই দুই নিয়মের মাঝে একটি মিল খুঁজে পেলেন। তিনি দেখালেন ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের আকারের বৃদ্ধি এবং মহাবিশ্বের এনট্রপি বৃদ্ধি সাদৃশ্যপূর্ণ। অর্থাৎ ব্ল্যাক হোলের মাঝে চলে এলো এনট্রপির ব্যাপার।

হকিং তার এই হেঁয়ালি ধারণাটি প্রদান করেন ১৯৭০ সালের শেষ দিকে। সে সময়ই জ্যাকব বেকেনস্টাইন নামে এক তরুণ পদার্থবিজ্ঞানী হকিংয়ের ধারণা নিয়ে অদ্ভুত এক প্রস্তাব করে বসেন। হকিং তার ধারণাটি উপমা কিংবা কল্পনা হিসেবেই প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বেকেনস্টাইন বলেন হতেও তো পারে এটি শুধুই কোনো কল্পনা নয়, শুধুই কোনো উপমা নয়। কী হবে যদি এই উপমাটিই সঠিক হয়? তিনি প্রস্তাব করেন ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি থেকেই তার পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বের করা যেতে পারে। পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল পাওয়া মানেই এর আকার আকৃতি ও ভর সম্পর্কে জানা।

কিন্তু ঢালাওভাবে এটি মেনে নিতে একটু সমস্যা আছে। কোনো বস্তুর যদি এনট্রপি থাকে তাহলে তাহলে অবশ্যই তার তাপমাত্রা থাকতে হবে। আর যদি তার তাপমাত্রা থাকে তাহলে অবশ্যই সেখান থেকে শক্তির বিকিরণ নির্গত হবে। কিন্তু ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রে ঝামেলা হলো কোনো কিছুই সেখান থেকে নির্গত হতে পারে না, এমনকি নগণ্য বিকিরণও না। তাহলে?

বহু পদার্থবিজ্ঞানী এমনকি স্টিফেন হকিং নিজেও ধরে নিলেন বেকেনস্টাইনের প্রস্তাবের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এদিকে বেকেনস্টাইন নিজেও ভাবলেন যেহেতু এই প্রস্তাবে এক প্যারাডক্সের[8] জন্ম হচ্ছে সেহেতু এটি বাস্তব হতে পারে না।

বেকেনস্টাইনের প্রস্তাবনা তো ব্ল্যাক হোল অঙ্গনে একটি লেজুড় সদৃশ ঝামেলা হয়ে ঝুলে আছে। এ লেজুড় দূর করতে হলে তার প্রস্তাবনাকে তো ভুল প্রমাণ করা দরকার। স্টিফেন হকিং নামলেন তাকে ভুল প্রমাণ করার কাজে। কিন্তু মাঠে নেমে দেখেন বেকেনস্টানই আসলে সঠিক। দুই মেরুর প্যারাডক্স সদৃশ অবস্থার মীমাংসা করার জন্য তিনি এমন একটি কাজ করেন যা এর আগে কোনো বিজ্ঞানী করতে পারেনি। তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের সমন্বয় ঘটান এখানে।

চিত্র: জ্যাকব বেকেনস্টাইন; ছবি: পিন্টারেস্ট

পদার্থবিজ্ঞান মোটা দাগে কয়েক ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে একটি হলো- ক্ষুদ্র বস্তুর নিয়মনীতি দিয়ে বৃহৎ বস্তুকে ব্যাখ্যা করা যায় না আবার বৃহৎ বস্তুর নিয়মনীতি দিয়ে ক্ষুদ্র বস্তুকে ব্যাখ্যা করা যায় না। সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সূত্র কাজ করে বৃহৎ ও ভারী বস্তু যেমন নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ইত্যাদির ক্ষেত্রে। আর কোয়ান্টাম তত্ত্বের সূত্র কাজ করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু, পরমাণু, মৌলিক কণা প্রভৃতির ক্ষেত্রে। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে স্থান চাদরের মতো মসৃণ, আর কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে জাগতিক সকল কিছুই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার সমন্বয়ে গঠিত। দুই তত্ত্ব অনেকটা একে অন্যের বিপরীতই যেন।

অন্যদিকে পদার্থবিজ্ঞান সার্বজনীন। একইরকম সূত্র দিয়ে জাগতিক সকলকিছুর ব্যাখ্যা দেয়াটাই যৌক্তিক। সেজন্য বিজ্ঞানীরা এক জগতের সাথে আরেক জগতের মেলবন্ধন ঘটাতে যুগের পর যুগ ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। পদার্থবিজ্ঞানের বিভক্ত শাখাগুলোকে একইরকম সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা গেলে তারা পেয়ে যাবেন একটি ‘থিওরি অব এভরিথিং’ বা ‘সার্বিক তত্ত্ব’।

বিজ্ঞানীদের কাছে থিওরি অব এভরিথিং অনেকটা হলি গ্রেইলের মতো। এটি না হলে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান যেন কোনোভাবেই পূর্ণ হচ্ছে না। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেক কিছু আছে, কিন্তু তারপরেও যেন পূর্ণতা পাচ্ছে না একটি থিওরি অব এভরিথিং-এর অভাবে।

একটি থিওরি অব এভরিথিং তৈরিতে বিজ্ঞানীরা রাত দিন খেটে যাচ্ছেন। কিন্তু খেটে গেলে কী হবে? পদার্থবিজ্ঞানের আলাদা জগতগুলোর মেলবন্ধন তো আর ঘটে না সহজে। সেদিক থেকে স্টিফেন হকিংয়ের কাজটি ছিল বেশ বিপ্লবী। তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বকে সাধার আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তার এই কাজ থিওরি অব এভরিথিং-এর বাস্তবায়নে নিঃসন্দেহে এগিয়ে নিয়েছে অনেকটা পথ।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে শূন্যস্থান আসলে শূন্য নয়। কোয়ান্টাম স্কেলে শূন্যস্থান যথেষ্ট সক্রিয় ও জীবন্ত। প্রতিনিয়ত সেখানে জোড়ায় জোড়ায় বিভিন্ন কণার জন্ম হচ্ছে। জোড়ার একটি ম্যাটার এবং অপরটি অ্যান্টি-ম্যাটার। ম্যাটারে আছে ধনাত্মক শক্তি আর অ্যান্টি-ম্যাটারে আছে ঋণাত্মক শক্তি। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক মিলে কাটাকাটি হয়ে যায়। তাই সার্বিক হিসেবে নতুন কোনো শক্তি তৈরি হচ্ছে না তাদের দ্বারা। কণা জোড়ার সৃষ্টির পরপরই তারা একে অন্যকে ধ্বংস করে দেয়।[9]

কাজটি এতই দ্রুততার সাথে ঘটে যে সরাসরি তাদের পর্যবেক্ষণ করা যায় না। আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়তই ম্যাটার এবং এন্টি-ম্যাটারের সৃষ্টি ও ধ্বংস হয়ে চলছে, কিন্তু আমরা তাদের দেখতে পারছি না। ঘটে চলছে কিন্তু ধরা-ছোঁয়া যাচ্ছে না- সেজন্য এদেরকে বলা হয় ‘ভার্চুয়াল কণা’।

চিত্র: প্রতিনিয়ত জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে কণা। ছবি: University of California

হকিং বলছেন যে, ভার্চুয়াল কণাকে বাস্তব কণায় পরিণত করা সম্ভব। যদি ভার্চুয়াল কণার জোড়াটি ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি তৈরি হয় তাহলে শর্ত সাপেক্ষে তারা বাস্তব কণা হিসেবে রূপান্তরিত হতে পারে। ভার্চুয়াল কণার জোড়াটি যদি ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের প্রান্তে তৈরি হয় তাহলে সম্ভাবনা আছে যে জোড়ার একটি কণা ব্ল্যাক হোল কর্তৃক গৃহীত হবে, আর অপরটি বাইরে থাকবে। সেটি দিগন্ত থেকে বাইরে মহাশূন্যে নিক্ষিপ্ত হতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানের জটিল কিছু নিয়ম কাজ করে এই বাইরে যাবার ঘটনার পেছনে।

জোড়ার ঋণাত্মক শক্তির কণাটি যদি ব্ল্যাক হোল কর্তৃক গৃহীত হয় তাহলে সেটি ভেতরে গিয়ে ব্ল্যাক হোলের মোট শক্তিকে কমিয়ে দেবে। শক্তি কমে যাওয়া মানে ভর কমে যাওয়া।[10] একদিক থেকে বলা যায় জোড়ার অপর যে কণাটি বাইরের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল সেটি ব্ল্যাক হোলের শক্তিকে ক্ষয় করে নিয়ে যাচ্ছে।

এখন সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে ব্ল্যাক হোল থেকে শক্তির বিকিরণ হচ্ছে! অথচ স্বাভাবিকতা বলছে ব্ল্যাক হোল থেকে কোনোকিছুই বের হয়ে আসতে পারে না। ব্যতিক্রমী এই বিকিরণকে বলা হয় ‘হকিং বিকিরণ’। এই বিকিরণ প্রদান করেই ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে ভর হারিয়ে ক্ষুদ্র হয়ে আসে।

হকিংই বলেছিলেন ব্ল্যাক হোল শুধু আকারে বড়ই হতে পারে, কখনোই ছোট হতে পারে না। আবার এখানে দেখিয়েছেন বিকিরণের মাধ্যমে ছোট হতে পারে। তারমানে হকিং নিজেই নিজেকে ভুল প্রমাণ করেছেন।

এই বিকিরণ থেকে তাত্ত্বিকভাবে বলা যায় ব্ল্যাক হোল ক্ষয় হতে হতে একদময় উবে যাবে। আর এটি যেহেতু কোনো না কোনোকিছু বিকিরণ করে তাই বলা যায় ব্ল্যাক হোল পুরোপুরিভাবে কালো নয়। যখন একটি বস্তু থেকে কোনো কিছুই বেরিয়ে আসতে পারে না তখনই শুধু সেটি পুরোপুরি কালো হয়। যদি সামান্যতম বিকিরণও সেখান থেকে বের হয় তাহলে বলা যায় সেটি শতভাগ কালো নয়। সে হিসেবে ব্ল্যাক হোলও শতভাগ কালো নয়।

চিত্র: ব্ল্যাকহোল থেকে প্রতিনিয়ত হচ্ছে বিকিরণ। ছবি: Quora

১৯৭১ সালে স্টিফেন হকিং ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা নিয়ে হাজির হন। তিনি প্রস্তাব করেন, বিগ ব্যাংয়ের সময় কিছু ক্ষুদ্রাকার ব্ল্যাক হোল (miniature black hole) তৈরি হয়েছিল। এসব ব্ল্যাকহোলের ভর ছিল বিলিয়ন বিলিয়ন টন। শুনতে খুব বড় কিছু মনে হলেও এসব ব্ল্যাকহোলের আকার ছিল খুবই ছোট। তাত্ত্বিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় এর আকার এতই ছোট হতে পারে যে তা একটি পরমাণুর চেয়েও ক্ষুদ্র হয়ে দাড়ায়।

এদিকে দিগন্ত থেকে হকিং বিকিরণের মাধ্যমে ব্ল্যাক হোলের আকার ছোট হয়ে আসছে। আকারে যেহেতু ছোট হচ্ছে, মানে ভর হারাচ্ছে, তার অর্থ হলো ভেতরে ভেতরে এটি গরম হচ্ছে। এই বিশেষ ধরনের উত্তপ্ত হবার ঘটনাকে হকিং নাম দিয়েছেন শুভ্র উত্তাপ বা White hot। ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোলগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হবার আগ পর্যন্ত উত্তপ্ত হতেই থাকে।

তাদের শেষটা শান্তশিষ্টভাবে হয় না। ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোলগুলো যত ক্ষুদ্র হয় তার উত্তাপ ততই বেড়ে যায়। একপর্যায়ে এটি মিলিয়ন মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন বোমার সমপরিমাণ শক্তি নিয়ে বিস্ফোরিত হয়।

চিত্র: মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় তৈরি হয়েছিল কিছু পরিমাণ ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল। ছবি: John Cramer

১৯৭৪ সালে নেচার সাময়িকীতে তার একটি গবেষণাপত্রের[11] মাধ্যমে তিনি ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল ও হকিং বিকিরণের কথা উল্লেখ করেন। সে সময় এই প্রস্তাব ছিল খুবই বিতর্কিত। অনেকেই মেনে নিতে পারেনি এই বক্তব্য। এতদিন পর বর্তমানে অনেক বিজ্ঞানীই তার বক্তব্য সঠিক বলে মনে করেন।

কিন্তু এখন পর্যন্ত এত বছর পরেও কেউ ব্ল্যাক হোলের এই বিকিরণ শনাক্ত করতে পারেনি। এটা অবাক হবার মতো কিছু নয়, এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। সাধারণ ব্ল্যাকহোলের তাপমাত্রা এতই কম হবে যে বলা যায় এটি পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি। অর্থাৎ হকিং বিকিরণের মাত্রা হবে অতি ক্ষীণ। মহাকাশের এত এত বিকিরণের মাঝে এত দুর্বল বিকিরণ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এর সাত বছর পর হকিং ব্ল্যাকহোল সম্বন্ধে আরো এক মজার বিষয় নিয়ে হাজির হলেন। এবারের প্রসঙ্গ আগের প্রসঙ্গগুলো থেকে একদমই ভিন্ন। তিনি বললেন ব্ল্যাকহোল তথ্য (Information) ধ্বংস করে।

শক্তির বেলায় আমরা জেনেছি, শক্তিকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় মাত্র। তেমনই কথা তথ্য বা ইনফরমেশনের বেলাতেও প্রযোজ্য। ইনফরমেশনকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় মাত্র।

কিন্তু ব্ল্যাক হোলের আচরণ সে নীতি ভঙ্গ করছে। যখন কোনো কণা বা তরঙ্গ ব্ল্যাক হোলের ভেতর পতিত হয় তখন সেটি আর কখনোই মহাবিশ্বের কোথাও ফিরে আসে না। কণা, তরঙ্গ কিংবা যেকোনো কিছুই তথ্য বহন করে। ব্যাপারটা কীরকম? একটি কণার কথা বিবেচনা করা যাক। এটি তার সাথে তার অবস্থান ও ভরবেগের তথ্য বহন করে। যখন সেটি কোনো ব্ল্যাক হোলে পতিত হয় তখন সেই তথ্যগুলো চিরতরে হারিয়ে যায়।

ব্যাপারটা এভাবে বিবেচনা করতে পারি। একটি কণা যদি ব্ল্যাক হোলে পতিত হয় তাহলে সেটি সেখানেই থেকে যায় সবসময়। আবার আমরা এ-ও জেনেছি ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে উবে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। যখন সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাবে তখন সেসব কণার অবস্থান ও ভরবেগের তথ্যগুলো কোথায় যায়? এ এক জটিল প্যারাডক্স।

চিত্র: ব্ল্যাকহোলে কোনো তথ্য পতিত হলে তার পরিণতি কী হয়? ছবি: Jean-Francois Podevin/Science Photo Library

এ সমস্যার সম্ভাব্য দুটি উত্তর আছে। এক, এটি কোনো এক অজানা প্রক্রিয়ায় হকিং বিকিরণের সাথে সম্পর্কিত। হকিং বিকিরণের মাধ্যমে তথ্যগুলো মহাবিশ্বে ফেরত আসে। দুই, তথ্যগুলো চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়।

১৯৮১ সালে স্টিফেন হকিং যখন সান ফ্রান্সিস্কোতে ব্ল্যাক হোলের ইনফরমেশন প্যারাডক্স নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন মার্কিন পদার্থবিদ লিউনার্ড সাসকিন্ড তাতে আপত্তি তোলেন। তিনি দেখান মহাবিশ্ব থেকে তথ্য হারিয়ে গেলে কী কী জটিলতার জন্ম হবে। আসলেই, তথ্য হারিয়ে যাবার ব্যাপারটা শুনতে হালকা মনে হলেও এর প্রভাব হতে পারে সমগ্র মহাবিশ্বব্যাপী। এর প্রভাবে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে মহাবিশ্বের সকল ক্ষেত্রে।

যেহেতু মহাবিশ্ব স্বাভাবিকভাবে বিরাজ করছে তার মানে তথ্য হারিয়ে যাবার ব্যাপারটায় কিছুটা কিন্তু আছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই বিতর্ক চলতেই থাকে। ১৯৯৭ সালের দিকে এই বিতর্ক আরো জোরদার হয় হয় এবং নতুন নাটকীয়তার জন্ম নেয়। সে সময় ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পদার্থবিদ জন প্রেসকিলের সাথে স্টিফেন হকিং বাজি ধরেন। হকিং বলছেন তথ্য ধ্বংস হয় আর প্রেসকিল বলছেন হয় না। বাজিতে জিতলে প্রেসকিল তাকে এনসাইক্লোপিডিয়ার একটি সেট কিনে দেবেন আর হারলে তিনি প্রেসকিলকে এনসাইক্লোপিডিয়ার একটি সেট কিনে দেবেন।

এই ঘটনার কয়েক বছর পরের কথা। ২০০৪ সালে আয়ারল্যান্ডের এক কনফারেন্সে বক্তব্য দিচ্ছেন হকিং। সেখানে তিনি স্বীকার করেন লিওনার্ড সাসকিন্ডই আসলে সঠিক ছিলেন। সেজন্য জন প্রেসকিল তার বাজির এনসাইক্লোপিডিয়া পাওয়ার দাবী রাখেন।

তবে এখানেও তিনি একটা ‘কিন্তু’ রেখে দেন। তিনি বলেন তথ্য ফিরে আসবে ঠিক আছে, তবে তা আসবে বিকৃত রূপে (in a corrupted form)।[12] এই রূপ থেকে তথ্যকে পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব।

চিত্র: ব্ল্যাক হোল থেকে তথ্য ফিরে আসতে পারে, তবে সে তথ্য হবে বিকৃত। ছবি: নাসা

এটাই যেন তার স্বভাব। আগের আবিষ্কারগুলো অনেকটা এরকম কথাই বলে। হুট করে এমন যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রদান করেন যেগুলো কারো ভাবনাতেও আসে না। আসলেও তাত্ত্বিক নিয়ম দিয়ে বাধতে পারে না। আবার কিছুদিন পর নিজের দাবীর ঠিক বিপরীত দাবী নিজেই উপস্থাপন করেন। আর সেগুলোও হয় মহাকাব্যিক। মাঝে মাঝে ভুলও করেন, যেমন করেছিলেন আইনস্টাইন সহ অন্যান্য বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা।

সমস্ত পৃথিবীতে আলোড়ন ফেলে দেয়া হিগস বোসনের আবিষ্কারের ব্যাপারে স্টিফেন হকিংয়ের অবস্থান ছিল নেতিবাচক। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অধ্যাপক গর্ডন কেইনের সাথে তিনি বাজি ধরেছিলেন, হিগস বোসন পাওয়া যাবে না[13] কিন্তু তিনি হেরে যান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন,

এ আবিষ্কারের জন্য অধ্যাপক পিটার হিগস নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার দাবী রাখেন। কিন্তু নতুন কণার এই আবিষ্কার এমনি এমনি হয়ে যায়নি। এর জন্য আমাকে ১০০ ডলার খোয়াতে হয়েছে।

চিত্র: হিগস বোসন আবিষ্কৃত হওয়ায় স্টিফেন হকিংকে গুনতে হয়েছিল ১০০ ডলার। ছবি: টাইম

১৯৮০ সালের দিকে স্টিফেন হকিং কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্যে বিগ ব্যাংকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। পদার্থবিদ জেমস হার্টলের সাথে মিলে এমন একটি কোয়ান্টাম সমীকরণ তৈরি করেন যা মহাবিশ্বের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যকে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু এটি তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

সে গ্রহণযোগ্যতা তার না পেলেও হবে। তিনি তার বিকলতার জীবনে সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে যেভাবে একের পর এক অবিস্মরণীয় সব বৈজ্ঞানিক উপহার দিয়েছেন তা-ই তাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে।

কিন্তু তারপরেও আক্ষেপ হয়, তার এত চমৎকার চমৎকার কাজগুলো মানুষের দ্বারা চর্চিত হয় না। তাকে নিয়ে সকল আলোচনা হয় তিনি ঈশ্বর নিয়ে কী বললেন, এলিয়েনের অস্তিত্ব নিয়ে কী বললেন, মানব সভ্যতার টিকে থাকা নিয়ে কী বললেন, নতুন লেখা বইতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে কী দাবী করলেন ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ এগুলোর কোনোটিই স্টিফেন হকিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে পারে না।

অনেকেই তার লেখা বই, আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম কিংবা দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু সেগুলোও তার গুরুত্বকে পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে পারে না। স্টিফেন হকিংয়ের সত্যিকার গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে ঘেটে দেখতে হবে তার বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো।

চিত্র: হকিংয়ের সাড়া জাগানো দুইটি বইয়ের প্রছদ।

সত্যি কথা বলতে কি এসকল হাইপের কারণেই স্টিফেন হকিংয়ের চমৎকার কাজগুলো চাপা পড়ে গেছে। মাঝে মাঝে প্রবল আলোতে ছবি তুললে ছবিতে কিছু উঠে না, ছবির কিছু বোঝা যায় না। প্রবল আলোর দিকে তাকালে অন্যকিছু দেখাও যায় না। হকিংয়ের লেখা প্রথম বইটি এতই আলোচিত হয়েছে যে সেই আলোচনার আলোতে ঢাকা পড়ে গেছে অন্যান্য সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যেটা আইনস্টাইন, নিউটন, ভিঞ্চি সহ অনেকের ক্ষেত্রে হয়েছে।

তবে এখন সময় এসেছে ভেবে দেখার। যদি স্টিফেন হকিং আমাদের মুখে মুখে চর্চিত হয় তাহলে আমরা তার গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কাজগুলোকেই আলোকিত করে তুলে ধরবো সবার আগে। অন্যান্য বিষয়গুলোও আলোচিত হবে তবে সেগুলোর আগে যেন অবশ্যই তার সত্যিকার মেধার যাচাই হয় এমন কাজগুলো আসে।

মানুষ যেন মনে করতে পারে, ডিরাক, শ্রোডিঙ্গার, ফাইনম্যান প্রভৃতির চেয়েও কোনো দিক থেকে কম নন। তিনি শুধুই বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য বিখ্যাত নন, তার বিখ্যাত হবার পেছনে ভালো কিছু কারণ আছে। সেরা সেরা বিজ্ঞানীদের নিয়ে আলোচনা করার সময় তার নামটিও চলে আসার যোগ্যতা তিনি রাখেন।

গত ১৪ই মার্চ স্টিফেন হকিং পৃথিবীর মায়া ছেড়ে মহাবিশ্বের অন্তিম ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের ওপারে চলে গিয়েছেন। তার মৃত্যুতে এই মহাবিশ্ব তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক মেধাকে হারালো।

[1] http://technologyreview.com/view/414117/the-worlds-greatest-physicists-as-determined-by-the-wisdom-of-crowds/ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ে দু’জন গবেষক মিখাইল সিমকিন ও বাণী রায়চৌধুরীর করা এক জরিপে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনুসারে বিংশ শতাব্দীর সেরা ১০ জন বিজ্ঞানী হলো- ১) আলবার্ট আইনস্টাইন; ২) ম্যাক্স প্ল্যাংক; ৩) মেরি কুরি; ৪) নিলস বোর; ৫) এনরিকো ফার্মি; ৬) জি মার্কোনি; ৭) ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ; ৮) অরভিন শ্রোডিংগার; ৯) পিয়েরে কুরি; ১০) উইলহেম রন্টজেন

[2] আলোর কণার কোনো ভর নেই। এর বেগও জাগতিক সকল জিনিসের মাঝে সর্বোচ্চ। ভর নেই, তার উপর বেগও সর্বোচ্চ এরকম কোনোকিছুকে সাধারণত কোনো বস্তুই তার আকর্ষণে আটকে রাখতে পারে না। কিন্তু মাঝে মাঝে কোনো নক্ষত্র ভরের দিক থেকে এতোই বেশি হয়ে যায় যে এ ভর থেকে সৃষ্ট বক্রতায় আলো পর্যন্তও আটকা পড়ে যায়। অতি ভরের এ ধরনের নক্ষত্রকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল।

[3] J. R. Oppenheimer and H. Snyder, On Continued Gravitational Contraction, Phys. Rev. 56, 455 – Published 1 September 1939

[4] Philip Ball, These are the discoveries that made Stephen Hawking famous, BBC Earth

[5] S. W. Hawking, R. Penrose, The singularities of gravitational collapse and cosmology, Proceedings of the Royal Society, 27 January 1970. DOI: 10.1098/rspa.1970.0021

[6] J. R. Oppenheimer and H. Snyder, On Continued Gravitational Contraction, Phys. Rev. 56, 455 – Published 1 September 1939

[7] Philip Ball, These are the discoveries that made Stephen Hawking famous, BBC Earth

[8] সহজ অর্থে, কোনো বক্তব্য যা একইসাথে সঠিক এবং ভুল বলে প্রতীয়মান হয় তাকে প্যারাডক্স বলে। দুটি পরস্পর বিপরীতমুখী কথাও যদি একইসাথে সঠিক হয় তাহলে তাও প্যারাডক্স বলে গণ্য হয়। এখানে এক তত্ত্ব বলছে ব্ল্যাকহোল থেকে কোনোকিছু বের হতে পারে না, এবং এর পেছনে বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতাও আছে। আবার আরেক তত্ত্ব বলছে বের হতে পারে। এখানে শেষোক্ত বক্তব্যটিকে যদি সঠিক বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে প্রথম বক্তব্যটির সঠিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে এবং উভয় বক্তব্য মিলে একটি প্যারাডক্সের সৃষ্টি করবে।

[9] ম্যাটার এবং এন্টি-ম্যাটার পরস্পর বিপরীতধর্মী। তারা যখনই একত্রে আসে তখনই একে অপরকে ধ্বংস করে দেয়। অনেকটা সমান মানের যোগ বিয়োগের কাটাকাটির মতো।

[10] আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে ভর ও শক্তি আদতে একই জিনিস। কোনো বস্তুর ভর কমে যাওয়া মানে তার শক্তি কমে যাওয়া। তেমনই কোনো বস্তুর শক্তি কমে যাওয়া মানে তার ভর কমে যাওয়া।

[11] S. W. Hawking, Black Hole Explosions? Nature Volume 248, Pages 30–31 (01 March 1974) Doi:10.1038/248030a0

[12] S. W. Hawking, Information loss in black holes, Phys. Rev. D 72, 084013 – Published 18 October 2005, doi.org/10.1103/PhysRevD.72.084013

[13] https://www.telegraph.co.uk/news/science/large-hadron-collider/9376804/Higgs-boson-Prof-Stephen-Hawking-loses-100-bet.html

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

featured image: motive4you.com

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।

দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- ছোট যদি হতে চাও, বড় হও আগে

আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা ইতোমধ্যেই টুক টাক জানতে শুরু করে দিয়েছি। আমরা ইতোমধ্যেই কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধে কিছুটা জানি, আর এবার জানবো দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন সম্বন্ধে।

প্রথমেই আমরা জেনে নেই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন বলতে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি অনুসারে যদি কোন বস্তু তোমার সাপেক্ষে স্থির অবস্থায় থাকে তখন তার দৈর্ঘ্য মাপলে তুমি যে মান পাবে যদি, বস্তুটি তোমার সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল হয় তবে তার দৈর্ঘ্য মাপতে গেলে দেখবে যে বস্তুটির দৈর্ঘ্য কমে গেছে। বস্তুটি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যাক বা, কাছেই আসতে থাকুক না কেন সবসময়ই দেখবে যে বস্তুটি বড় থেকে সমবেগে গতিশীল হওয়ার পরপরই ছোট হয়ে গেছে। আমরা আগেও দেখেছি ইথার ধারণাকে বাঁচানোর জন্য ফিটজগোরাল্ড প্রথম এই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। আর লরেন্টজ সেই সঙ্কোচনের পরিমাণটিকে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন।

length_cont2

আমরা কাল দীর্ঘায়নের বাস্তব উদাহরণে দেখেছি যে, বায়ুমন্ডলে মহাজাগতিক রশ্মির সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট হওয়া মিউওন মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড টিকে থাকে। সেই মিউওনগুলোর বেগ অনেক বেশি হয়ে থাকে, প্রায় আলোর বেগের কাছাকাছি। কিন্তু এত বেগ নিয়েও ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের যাওয়ার কথা মাত্র ৬৬০ মিটারের মত। কিন্তু এরপরও মিউওন কিন্তু অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসে। এর কারণ হল মিউওনের বয়স মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড হলেও আমাদের কাছে তা কাল দীর্ঘায়নের ফলে আমাদের কাছে ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড। এই বেগে মিউওন অতিক্রম করবে প্রায় ১৯ কি.মি. পথ। যা পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসার জন্য যথেষ্ট দূরত্ব।

Image result

কিন্তু কাল দীর্ঘায়নের হিসেব মতে মিউওন নিজে কিন্তু তার সময় ঠিকই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড দেখবে। এ সময়ে যদি সে ১৯ কি.মি. দূরত্ব অতিক্রম করে তবে তার বেগ আলোর বেগের প্রায় ২৯ গুন হতে হবে। কিন্তু আলোর চেয়ে বেশি বেগে তো কিছু যেতে পারে না। তাহলে এই ১৯ কি.মি. দূরত্ব মিউওন অতিক্রম করল কিভাবে? একটা অসাধারণ প্যারাডক্স বা, ধাঁধা তৈরি হয়ে গেল দেখা যাচ্ছে। তাহলে এখন চলো এই প্যারাডক্সটির সমাধান করে ফেলা যাক।

পৃথিবী থেকে আমরা দেখব মিউওনের আসতে সময় লেগেছে t=৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড(কাল দীর্ঘায়নের ফলে)। বায়ুমন্ডল থেকে পৃথিবী পৃষ্ঠের দূরত্ব কিন্তু বিজ্ঞানীরা মেপে রেখেছেন। যদি ধরে নেই মিউওন কোনভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠে এসেই রুপান্তরিত হয়ে যায় তাহলে ধরে নিতে পারি এ দূরত্ব হল  =১৯ কি.মি.।

তাহলে মিউওনের বেগ v হলে বেগ=দূরত্ব/সময় অনুসারে আমরা লেখতে পারি,

v= /t ………………………………………………(1)

আবার মিউওন দেখবে পৃথিবীটাই মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের কাছে চলে গেছে। তাহলে মিউওন তার সময় মাপবে,
মাইক্রোসেকেন্ড। এই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের মনে হবে পৃথিবীটা v বেগে (পৃথিবীর কাছে মিউওনের বেগ

যত, মিউওনের কাছেও পৃথিবীর বেগ তত! আপেক্ষিকতা!) তার কাছে চলে গেছে। এ সময় পৃথিবী অতিক্রম করেছে L দূরত্ব। তাহলে,

v=L/vbn(2)

আমরা লক্ষ্য করি যে, দুবার আমরা দৈর্ঘ্যের জন্য দুইরকম সঙ্কেত ব্যবহার করেছি। একবার  আরেকবার L. কারণ আমরা আগেই দেখেছি রিলেটিভিটির হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে সময়ই আপেক্ষিক হয়ে যায়। তাই দৈর্ঘ্যও আপেক্ষিক হতে পারে এই সন্দেহ থেকেই এই কাজটি করা। দৈর্ঘ্য যদি আপেক্ষিক না হয় তাহলে একটু পরেই আমরা হয়ত দেখব যে,  ।

তাহলে এখন, (1) এবং (২) নং সমীকরণ থেকে পাই,

                                                                                                                 ……………………………………………..….(3)

আমরা কাল দীর্ঘায়নের সূত্র থেকে জানি,

                                                                                                                   ..…………………………………….………..(4)

 

(3) এবং (4) নং সমীকরণ থেকে পাওয়া যায়,

বা,

বা,

এটিই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র।  হল স্থির অবস্থায় মাপা কোন কিছুর দৈর্ঘ্য, আর L হল সেই কোন কিছুর গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্য। কোন কিছুই আলোর বেগে চলতে পারেনা। তাই এই সমীকরণের  এর মান সর্বদাই ১ এর চেয়ে বেশি হবে (লব ছোট আর হর বড় হওয়ার কারণে)। আবার  এর মানও ১ এর চেয়ে ছোট কিন্তু ধনাত্মক একটি দশমিক সংখ্যা হবে। স্থির অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যকে এই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করলে আমরা যে গুনফল পাব সেটিই হবে গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যের সমান।  সবসময় ১ এর চেয়ে ছোট বলে এই গুনফলও সর্বদাই  এর চেয়ে কম হবে। তাই গতিশীল অবস্থায় আমাদের কাছে মনে হবে সবকিছুই তার দৈর্ঘ্যের দিক থেকে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। মিউওনের কাছেও পৃথিবীর দূরত্ব সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়াই সে ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডেই পৃথিবীতে এসে পৌঁছে গেছে বা, পৃথিবী তার কাছে পৌঁছে গেছে। সুতরাং দৈর্ঘ্য সঙ্কুচিত করে ফেললেই কিন্তু মিউওনের প্যারাডক্সটি সুন্দরভাবে সমাধান হয়ে যায়।

 এই সূত্রটিই হল দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র। এর আগেও ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টজ যে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র দিয়েছিলেন সেই সূত্র আর এটি কিন্তু হুবুহু এক। শুধু পার্থক্য হল তারা পদার্থের নিজেদের সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন আর আইনস্টাইন তার স্পেশাল রিলেটিভিটিতে স্পেস বা, স্থানের নিজেরই সঙ্কোচনের কথা বললেন।

Image result

আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন দেখতে পাইনা। এর কারণ হল, আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু এর প্রভাবটা আমাদের চোখে পরে। তখন এ সঙ্কোচনের মান অনেক বেশি হয়ে যায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যেসব বেগ দেখি তা আলোর বেগের তুলনায় এতই কম যে এর ফলে দৈর্ঘ্যের সঙ্কোচন ঘটলেও তা আমাদের সূক্ষাতিসূক্ষ যন্ত্র দিয়েও আমরা তা ধরতে পারবো না। তাই আমরা দৈনন্দিন জীবনে বিষয়টি আসলে বুঝতেও পারবো না। আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু বিষয়টি আমরা বুঝতে পারব। যদি কোন কিছু আলোর ৮৭% গতিতে চলত তাহলে আমরা দেখতাম স্থির অবস্থার চেয়ে তার দৈর্ঘ্য একদম অর্ধেক হয়ে গেছে!! আর যদি তা আলোর গতিতে চলতে পারতো তবে তা হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখতাম! কিন্তু কোন কিছু একদম শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া তো আর সম্ভব নয়। আর এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, কোন কিছুই আসলে আলোর বেগে চলতে পারে না।

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের আয়না এবং স্পেশাল রিলেটিভিটির দুইটি স্বীকার্য

স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী। সবচেয়ে আলোচিত এবং মেধাবীও বলা চলে। বিজ্ঞানী মাইকেলসন আর মর্লি আলোর বেগের আপেক্ষিকতার পরীক্ষা করেছিলেন পরীক্ষাগারের, যন্ত্র পাতির সাহায্য নিয়ে। আর কিশোর আইনস্টাইন সেটা করেছিলেন তার মাথার পরীক্ষাগারে, একটি ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে। আজ আমরা সেই পরীক্ষার কথায় জানবো। তার সাথে সাথে জানবো এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে কিভাবে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে যাই।

Image result for albert einstein wallpaper

তখন ১৮৯৬ সাল। আইনস্টাইনের বয়স কেবল ষোল। আইনস্টাইন তখনও মাইকেলসন আর মর্লির ইথারের পরীক্ষার বিষয়ে একদমই জানতেন না। ইথারের অস্তিত্ব যে কিছুটা সন্দেহের মুখে পড়ে গেছে তা না জেনেই আইনস্টাইন তার জীবন্ত পরীক্ষাগার, নিজের মাথায় একটি থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। আইনস্টাইন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন, “কি ঘটবে যদি আমি এখন আমার দুই হাতে একটি আয়না ধরে আলোর বেগে দৌড়াতে শুরু করি। আমি নিজে কি নিজের প্রতিচ্ছবি সেই আয়নায় দেখতে পাবো?” বলে রাখা ভাল যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতায় শুধু আলোর বেগ কেন, আলোর চেয়ে বেশি বেগে যাওয়ার বিষয়েও কোন রকম বিধি নিষেধ ছিল না।

বিজ্ঞানীরা আরো আগে থেকেই জানতেন যে, আলোর বেগ ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ড। কিন্তু কার সাপেক্ষে আলোর এই বেগ? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য তারা ইথারের ধারণার অবতারণা করেছিলেন। অর্থাৎ, আইনস্টাইন যখন আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেবেন তখন আলো ইথার মাধ্যমে ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আইনস্টাইনের হাতে ধরে রাখা আয়নাটির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করবে। আইনস্টাইন নিজেও আলোর বেগে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে আলো আর আইনস্টাইনের বেগ সমান বলে আলো কখনই আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আয়নায় পৌঁছাতে পারবে না।

এ পর্যন্ত বুঝতে কারো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এবার আমরা মনে করি দেখি যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটিতে কি বলা হয়েছিল। এই স্বীকার্য আমাদের বলেছিল যে, “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”। যার অর্থ আমরা যদি একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি বস্তু বিবেচনা করি তাহলে আমরা কোনভাবেই বলতে পারব না যে কে গতিশীল আছে আর কে স্থির আছে।

চলুন, এখন আবার আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্টে ফিরে যাই। আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে এই বিষয়টি নিশ্চিত যে, আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড়ালে আসলে আমাদের প্রতিবিম্ব আয়নাতে আমরা দেখতে পারবো না। ফলে নিজেদের মুখ আমরা আয়নায় দেখতে পাবো না। তাহলে কি দাঁড়ালো? একজন যদি আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেয় এবং আয়নায় দেখে নিজের প্রতিবিম্ব সেখানে পরছে না তখনই সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে, সে আসলেই আলোর বেগে গতিশীল আছে। কিন্তু গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার স্বীকার্য আমাদের বলেছিল কোন একটি পরীক্ষা স্থির অবস্থায়ই করা হোক বা, সমবেগে গতিশীল থাকা অবস্থায়ই করা হোক না কেন একই ফলাফল দেবে। কিন্তু এই থট এক্সপেরিমেন্টে এই স্বীকার্যটি তো ভুল প্রমাণ হয়ে গেল!! তাহলে?

Image result for looking in mirror

আইনস্টাইন তার এই থট এক্সপেরিমেন্টে ইথার ধারণাটিকে প্রথমে সত্য বলে ধরে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, আলোর বেগ শুধু ইথারের সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড থাকে। অর্থাৎ, ইথার ধারণা সঠিক হলে গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটি ভুল হয়ে যায়।

যদি গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যকে সত্য হতে হয় তাহলে নিজের প্রতিবিম্ব আয়নায় দেখা যেতে হবে স্বাভাবিকভাবেই। আর সেটা তখনই সম্ভব হবে যখন আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই ধ্রুব বা, একই হবে। তাহলে আইনস্টাইন যদি আলোর বেগেও যান তাহলেও আলো তার সাপেক্ষে আলোর বেগেই চলবে। ফলে আলো স্বাভাবিকভাবেই আয়নায় পৌঁছাবে আর আইনস্টাইন তার মুখমন্ডল দেখতে পাবেন।

বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কারভাবে বলা যাক। ধরি, আইনস্টাইন একটি আয়না নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তাহলে তিনি যদি এখন তার ডান হাতটি হালকা নাড়ান তবে খুব কম সময়ের মাঝে সামনের আয়নাতে তিনি তার ডান হাত নাড়ানোটি দেখতে পাবেন। এখন যদি তিনি আলোর কাছাকাছি বেগে আয়নাটি নিয়ে দৌড় দেন তবে গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে তার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাবে (যদি কোন গাড়ি ১০ মি./সেকেন্ড বেগে যায় আর আপনি ৫ মি./সেকেন্ড বেগে সেই একই দিকে দৌড়ান তাহলে আপনার কাছে মনে হবে গাড়ির বেগ কমে ৫ মি./সেকেন্ড হয়ে গিয়েছে। একই যুক্তিতে আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলে আপনার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাওয়ার কথা)। তাহলে ডান হাত নাড়ানোর অনেক পরে তিনি আয়নাতে তার হাত নাড়ানো দেখতে পাবেন। সময়ের এ পার্থক্য দিয়েও যে কেউ বলে ফেলতে পারবেন যে তিনি আসলে স্থির নয় বরং গতিশীল আছেন। অর্থাৎ, আপনি স্থির থাকলে আলোর বেগ আপনার কাছে যত হবে আপনি যদি আলোর কাছাকাছি বেগেও দৌড়ানো শুরু করেন তবেও আলোর বেগ আপনার সাপেক্ষে ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ডই থাকতে হবে। তবেই শুধুমাত্র গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকে বাঁচানো সম্ভব হবে। আর এটি সত্য হলে আলোর বেগের ওপড় ইথারের আর কোন প্রভাব থাকে না। সুতরাং ইথার ধারণাটিও অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।

অর্থাৎ, গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্য এবং ইথার ধারণা এ দুটোই একই সাথে সত্য হতে পারেনা। এদের যেকোন একটাকে মিথ্যা হতেই হবে। এর আগেই মাইকেলসন-মর্লির এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা দেখেছি ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হয় নি। আইনস্টাইনও দেখলেন আলোর বেগকে যদি সব কিছুর সাপেক্ষে সর্বদা একই ধরে নেয়া হয় তাহলে ইথারের আর প্রয়োজন পড়ে না। এভাবেই ইথার ধারণাটি আইনস্টাইন বাতিল করে দিলেন আর গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকেই নিজের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিরও প্রথম স্বীকার্য বানিয়ে নিলেন। আর দ্বিতীয় স্বীকার্যতে বললেন, আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব যা আমরা উপড়ের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে দেখলাম।

আলোর বেগ সব কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব এই কথাটি মেনে নিতে অনেকেরই প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট হয়। তাই বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করা যাক। ধরুন, পৃথিবীর মানুষ আর এলিয়েনদের মাঝে একটি যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। আপনি একটি স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে গেলেন। একজন এলিয়েনও তাদের স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে চলে গেলো। দুজনের স্পেস শিপেই কিন্তু হেডলাইটের মতো লাইট জ্বলার ব্যবস্থা আছে। হঠাৎ জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়াই আপনি আপনার স্পেস শিপটি নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তখনই এলিয়েন স্পেস শিপটি ২,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ছুঁটে আসল। আর আসতে আসতে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গুলি ছুঁড়তে পারে এমন একটি বন্দুক থেকে আপনার দিকে গুলি ছুঁড়তে লাগলো। তাহলে আপনি গুলিগুলোর বেগ কত দেখবেন? নিশ্চয় উত্তর দেবেন যে, আপনি দেখবেন গুলিগুলো ২,০০,০১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ধেয়ে আসছে। কারণ গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা বলে যে, গুলির বেগের সাথে স্পেস শিপের বেগ যোগ হয়ে যাবে। এখন স্পেস শিপটি যদি হঠাৎ করে তার তার হেড লাইটটি জ্বালিয়ে দেয় তাহলে কি দেখবেন? আলোর বেগ কত হবে? স্পেস শিপের বেগ + আলোর বেগ? মানে ৫,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড? গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা তো তাই বলে। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, না। তখনও আপনি দেখবেন আলোর বেগ শুধু আলোর বেগের সমানই। মানে সর্বদাই ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড। এক ফোঁটা কমও নয় আবার এক ফোঁটা বেশিও নয়। এটাই আইনস্টাইনের দ্বিতীয় স্বীকার্য। এটাই সত্য!

আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যায়। এ কারণেই মাইকেলসন-মর্লি যখন তাদের পরীক্ষাটি করেন তখন তাদের পরীক্ষায় সোজা পাঠানো আলো আর সমকোণে পাঠানো আলোর বেগের মাঝে কোন পার্থক্য ধরা পড়েছিলো না। পরবর্তিতেও অনেক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে।

অর্থাৎ, দেখা গেলো আইনস্টাইনের এই ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে গেলাম। এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। তাই চলুন এ স্বীকার্য দুটি আরেকবার সুন্দর করে আমরা লিখে ফেলি। আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি হলঃ

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করে আমরা কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধেও বুঝতে পারি। গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার দ্বিতীয় স্বীকার্য, যেখানে সময়কে পরম হিসেবে ধরা হয়েছিল তা যে ভুল তা আমরা আইনস্টাইনের উপড়ের দুটি স্বীকার্য থেকে পাই। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্য ঠিক হলেও দ্বিতীয় স্বীকার্যে পরম সময়ের বদলে পরম আলোর বেগ ব্যবহার করলেন আইনস্টাইন। এছাড়াও আমরা দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন, ভর বা, ভরের আপেক্ষিকতা এবং ভর আর শক্তি যে একই জিনিস এমন অনেক কিছু আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি থেকে পরবর্তিতে জানতে এবং বুঝতে পারি। এ বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তি কোন এক লেখায় কথা বলা যাবে। আজ এ পর্যন্তই। কষ্ট করে এতদূর পড়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ।

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- ছোট যদি হতে চাও, বড় হও আগে

আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা ইতোমধ্যেই টুক টাক জানতে শুরু করে দিয়েছি। আমরা ইতোমধ্যেই কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধে কিছুটা জানি, আর এবার জানবো দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন সম্বন্ধে।

প্রথমেই আমরা জেনে নেই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন বলতে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি অনুসারে যদি কোন বস্তু তোমার সাপেক্ষে স্থির অবস্থায় থাকে তখন তার দৈর্ঘ্য মাপলে তুমি যে মান পাবে যদি, বস্তুটি তোমার সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল হয় তবে তার দৈর্ঘ্য মাপতে গেলে দেখবে যে বস্তুটির দৈর্ঘ্য কমে গেছে। বস্তুটি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যাক বা, কাছেই আসতে থাকুক না কেন সবসময়ই দেখবে যে বস্তুটি বড় থেকে সমবেগে গতিশীল হওয়ার পরপরই ছোট হয়ে গেছে। আমরা আগেও দেখেছি ইথার ধারণাকে বাঁচানোর জন্য ফিটজগোরাল্ড প্রথম এই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। আর লরেন্টজ সেই সঙ্কোচনের পরিমাণটিকে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন।

length_cont2

আমরা কাল দীর্ঘায়নের বাস্তব উদাহরণে দেখেছি যে, বায়ুমন্ডলে মহাজাগতিক রশ্মির সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট হওয়া মিউওন মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড টিকে থাকে। সেই মিউওনগুলোর বেগ অনেক বেশি হয়ে থাকে, প্রায় আলোর বেগের কাছাকাছি। কিন্তু এত বেগ নিয়েও ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের যাওয়ার কথা মাত্র ৬৬০ মিটারের মত। কিন্তু এরপরও মিউওন কিন্তু অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসে। এর কারণ হল মিউওনের বয়স মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড হলেও আমাদের কাছে তা কাল দীর্ঘায়নের ফলে আমাদের কাছে ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড। এই বেগে মিউওন অতিক্রম করবে প্রায় ১৯ কি.মি. পথ। যা পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসার জন্য যথেষ্ট দূরত্ব।

Image result

কিন্তু কাল দীর্ঘায়নের হিসেব মতে মিউওন নিজে কিন্তু তার সময় ঠিকই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড দেখবে। এ সময়ে যদি সে ১৯ কি.মি. দূরত্ব অতিক্রম করে তবে তার বেগ আলোর বেগের প্রায় ২৯ গুন হতে হবে। কিন্তু আলোর চেয়ে বেশি বেগে তো কিছু যেতে পারে না। তাহলে এই ১৯ কি.মি. দূরত্ব মিউওন অতিক্রম করল কিভাবে? একটা অসাধারণ প্যারাডক্স বা, ধাঁধা তৈরি হয়ে গেল দেখা যাচ্ছে। তাহলে এখন চলো এই প্যারাডক্সটির সমাধান করে ফেলা যাক।

পৃথিবী থেকে আমরা দেখব মিউওনের আসতে সময় লেগেছে t=৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড(কাল দীর্ঘায়নের ফলে)। বায়ুমন্ডল থেকে পৃথিবী পৃষ্ঠের দূরত্ব কিন্তু বিজ্ঞানীরা মেপে রেখেছেন। যদি ধরে নেই মিউওন কোনভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠে এসেই রুপান্তরিত হয়ে যায় তাহলে ধরে নিতে পারি এ দূরত্ব হল  =১৯ কি.মি.।

তাহলে মিউওনের বেগ v হলে বেগ=দূরত্ব/সময় অনুসারে আমরা লেখতে পারি,

v= /t ………………………………………………(1)

আবার মিউওন দেখবে পৃথিবীটাই মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের কাছে চলে গেছে। তাহলে মিউওন তার সময় মাপবে,
মাইক্রোসেকেন্ড। এই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের মনে হবে পৃথিবীটা v বেগে (পৃথিবীর কাছে মিউওনের বেগ

যত, মিউওনের কাছেও পৃথিবীর বেগ তত! আপেক্ষিকতা!) তার কাছে চলে গেছে। এ সময় পৃথিবী অতিক্রম করেছে L দূরত্ব। তাহলে,

v=L/vbn(2)

আমরা লক্ষ্য করি যে, দুবার আমরা দৈর্ঘ্যের জন্য দুইরকম সঙ্কেত ব্যবহার করেছি। একবার  আরেকবার L. কারণ আমরা আগেই দেখেছি রিলেটিভিটির হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে সময়ই আপেক্ষিক হয়ে যায়। তাই দৈর্ঘ্যও আপেক্ষিক হতে পারে এই সন্দেহ থেকেই এই কাজটি করা। দৈর্ঘ্য যদি আপেক্ষিক না হয় তাহলে একটু পরেই আমরা হয়ত দেখব যে,  ।

তাহলে এখন, (1) এবং (২) নং সমীকরণ থেকে পাই,

                                                                                                                 ……………………………………………..….(3)

আমরা কাল দীর্ঘায়নের সূত্র থেকে জানি,

                                                                                                                   ..…………………………………….………..(4)

 

(3) এবং (4) নং সমীকরণ থেকে পাওয়া যায়,

বা,

বা,

এটিই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র।  হল স্থির অবস্থায় মাপা কোন কিছুর দৈর্ঘ্য, আর L হল সেই কোন কিছুর গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্য। কোন কিছুই আলোর বেগে চলতে পারেনা। তাই এই সমীকরণের  এর মান সর্বদাই ১ এর চেয়ে বেশি হবে (লব ছোট আর হর বড় হওয়ার কারণে)। আবার  এর মানও ১ এর চেয়ে ছোট কিন্তু ধনাত্মক একটি দশমিক সংখ্যা হবে। স্থির অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যকে এই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করলে আমরা যে গুনফল পাব সেটিই হবে গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যের সমান।  সবসময় ১ এর চেয়ে ছোট বলে এই গুনফলও সর্বদাই  এর চেয়ে কম হবে। তাই গতিশীল অবস্থায় আমাদের কাছে মনে হবে সবকিছুই তার দৈর্ঘ্যের দিক থেকে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। মিউওনের কাছেও পৃথিবীর দূরত্ব সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়াই সে ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডেই পৃথিবীতে এসে পৌঁছে গেছে বা, পৃথিবী তার কাছে পৌঁছে গেছে। সুতরাং দৈর্ঘ্য সঙ্কুচিত করে ফেললেই কিন্তু মিউওনের প্যারাডক্সটি সুন্দরভাবে সমাধান হয়ে যায়।

 এই সূত্রটিই হল দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র। এর আগেও ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টজ যে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র দিয়েছিলেন সেই সূত্র আর এটি কিন্তু হুবুহু এক। শুধু পার্থক্য হল তারা পদার্থের নিজেদের সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন আর আইনস্টাইন তার স্পেশাল রিলেটিভিটিতে স্পেস বা, স্থানের নিজেরই সঙ্কোচনের কথা বললেন।

Image result

আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন দেখতে পাইনা। এর কারণ হল, আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু এর প্রভাবটা আমাদের চোখে পরে। তখন এ সঙ্কোচনের মান অনেক বেশি হয়ে যায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যেসব বেগ দেখি তা আলোর বেগের তুলনায় এতই কম যে এর ফলে দৈর্ঘ্যের সঙ্কোচন ঘটলেও তা আমাদের সূক্ষাতিসূক্ষ যন্ত্র দিয়েও আমরা তা ধরতে পারবো না। তাই আমরা দৈনন্দিন জীবনে বিষয়টি আসলে বুঝতেও পারবো না। আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু বিষয়টি আমরা বুঝতে পারব। যদি কোন কিছু আলোর ৮৭% গতিতে চলত তাহলে আমরা দেখতাম স্থির অবস্থার চেয়ে তার দৈর্ঘ্য একদম অর্ধেক হয়ে গেছে!! আর যদি তা আলোর গতিতে চলতে পারতো তবে তা হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখতাম! কিন্তু কোন কিছু একদম শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া তো আর সম্ভব নয়। আর এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, কোন কিছুই আসলে আলোর বেগে চলতে পারে না।

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব

গ্যালিলিও ছিলেন আপেক্ষিকতার জনক। আগের লেখায় আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি সম্বন্ধে জেনেছি। তার এ তত্ত্বের আরো একটি স্বীকার্য রয়েছে। গ্যালিলিও তার দ্বিতীয় স্বীকার্যে সময়কে পরম হিসেবে ধরে নিলেন। অর্থাৎ, সকাল বেলা যদি আপনি এবং আপনার এক বন্ধু একদম ঠিক ঠিক দুজনের ঘড়ি একই সময়ে মিলিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে দুদিকে নিজেদের কাজের জন্য চলে যান, তবে রাতে ফিরে এসে আপনারা দুজন আবার একে অপরের ঘড়ির সময় মিলিয়ে নিলে দেখবেন দুজনের ঘড়ি এখনও একই সময় দেখাচ্ছে। বিষয়টা এতই অবশ্যম্ভাবী এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িত যে গ্যালিলিওর এ ২য় স্বীকার্য সম্বন্ধে মনে হয় কারো কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। তাই এ স্বীকার্যটি নিয়ে আর বেশি কিছু বলার মনে হয় প্রয়োজন নেই। আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতাটাকে এখন বুঝতে চেষ্টা করি।

Image result for galileo
আপেক্ষিকতার জনক গ্যালিলিও গ্যালিলি

ধরুন, আপনি একটি ট্রেনে করে ভ্রমণ করছেন। জানালার পাশে আপনার বসার জায়গা। আপনার ট্রেনটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রতি সেকেন্ডে ২০ কি.মি. বেগে ছুটে চলেছে। তাহলে আপনার বেগ হবে ২০ কি.মি. প্রতি সেকেন্ড বা, ২০ কি.মি./সেকেন্ড। এখন বাইরে একজন লোক ঠিক পূর্ব থেকে পশ্চিমে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার বরাবর পাশ দিয়ে যাচ্ছে। লোকটির কাছে কিন্তু মনে হবে আপনার ট্রেনের বেগ আসলে,

আপনার ট্রেনের বেগ-লোকটির গাড়ির বেগ= (২০ কি.মি./সেকেন্ড-১০ কি.মি./সেকেন্ড)= ১০ কি.মি./সেকেন্ড।

আবার আপনার কাছে মনে হবে লোকটির গাড়ির বেগ= লোকটির গাড়ির বেগ-আপনার ট্রেনের বেগ= (১০ কি.মি./সেকেন্ড-২০কি.মি./সেকেন্ড)= – ১০ কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, মাইনাস বা, ঋণাত্মক দিকে ১০কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, আপনি দেখবেন লোকটি ১০কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। স্টেশনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন কিন্তু ঠিকই আপনার ট্রেনকে ২০ কি.মি./সেকেন্ড এবং লোকটির গাড়িকে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছুঁটে যেতে দেখবে।

এই বিষয়টিই আপেক্ষিকতা এক একজন দর্শকের সাপেক্ষে একই ট্রেন বা, গাড়ির বেগ একেক রকম মনে হওয়া। এখন লোকটি যদি গাড়িটি ট্রেনের সমান বেগে অর্থাৎ। ২০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে যেত তাহলে কি হত? আপনি লোকটিকে সব সময় আপনার পাশে দেখতেন। আপনার কাছে মনে হত লোকটি যেনো স্থির। অর্থাৎ, লোকটির বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আবার লোকটিও দেখত আপনার ট্রেনটি তার গাড়িকে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে না। আপনিও সবসময় তার পাশেই ট্রনে স্থির হয়র বসে আছেন। গাড়ির লোকটির কাছে মনে হত আপনি আসলে স্থির। আপনার বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আমি আশা করছি এই লেখাটির পাঠকরা অবশ্যই আপেক্ষিকতার এই মূল বিষয়গুলো সম্বন্ধে আগে থেকেই কিছুটা জ্ঞান রাখেন বা, লেখাটি পড়ার পর বিষয়টা মোটামুটিভাবে বুঝে গেছেন। তাই এ বিষয়টি নিয়ে আর বেশি কথা না বাড়িয়ে আমরা স্পেশাল রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার দিকে অগ্রসর হতে থাকি।

বিজ্ঞানীরা এক সময় আলোর বেগ অসীম নাকি এর কোন নির্দিষ্ট বেগ আছে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। একেক মুনীর একেক মত ছিল তখন। তবে বিজ্ঞানী রোমার প্রথম প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে আলোর বেগ আসলে সসীম, কোনভাবেই অসীম নয়। তিনি আলোর বেগ মেপেছিলেন ১ লক্ষ ৯০ হাজার কি.মি./সেকেন্ড। পরবর্তিতে ম্যাক্সওয়েল দেখিয়েছিলেন যে আলো আসলে এক ধরনের তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। শব্দও কিন্তু এক রকমের তরঙ্গ। বিজ্ঞানীরা তাদের আশে পাশের পর্যবেক্ষণ থেকে জানতেন কোন তরঙ্গই মাধ্যম ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে না। আলোর ক্ষেত্রেও কি কথাটি সত্য? আলো কিভাবে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসে? সূর্য থেকে পৃথিবীর মাঝে কি কোন মাধ্যম রয়েছে? এ বিষয়ে একটা মজার পরীক্ষার কথা বলি।

File:Ole Rømer (Coning painting).jpg
ওলে রোমার, যিনি আবিষ্কার করেছিলেন আলোর বেগ অসীম নয়।

আলোর চলাচলের জন্য কোন মাধ্যমের প্রয়োজন আছে কিনা তা বোঝার জন্য পরীক্ষাটি করেছিলেন বিজ্ঞানী ভন গুইরিকে। তিনি একটি কাঁচের জার নিলেন। এ কাঁচের জারের মাঝে একটি ঘন্টা ছিল যা অনবরত শব্দ করছিল। এবার জারটি থেকে সব বাতাস একদম বের করে নেয়া হল। জারের মধ্যে শুধু থাকল ফাঁকা স্থান। ফলে যারা এ পরীক্ষাটি দেখতে এসেছিল সেই দর্শকরা আর কোন ঘন্টা বাজার শব্দ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু তারা দেখতে পাচ্ছিলেন যে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি তখনও ঘন্টার সাথে ধাক্কা খেয়েই চলেছে।

Image result for ringing bell vacuum
জারের মাঝে রিঙ্গিং বেল

প্রমাণ হয়ে গেল যে শূন্য মাধ্যমে শব্দ চলাচল করতে না পারলেও আলো চলাচল করতে পারে। তা না হলে আমরা ঘন্টাটিতে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি ধাক্কা খেতে দেখতাম না বরং ঘন্টাটিও শব্দের সাথে অদৃশ্য হয়ে যেত এবং জারটি সম্পূর্ণ কালো হয়ে যেত। সুতরাং শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়ে কোন তরঙ্গ চলাচল করতে পারে তা তখনকার বিজ্ঞানীরা মানতে পারছিলেন না। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যে, শূন্য মাধ্যম কি আসলেই শূন্য? এ প্রশ্নের উত্তর পরবর্তি কোন লেখায় খোঁজার চেষ্টা করা হবে। ধন্যবাদ।

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।