আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

featured image: motive4you.com

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের আয়না এবং স্পেশাল রিলেটিভিটির দুইটি স্বীকার্য

স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী। সবচেয়ে আলোচিত এবং মেধাবীও বলা চলে। বিজ্ঞানী মাইকেলসন আর মর্লি আলোর বেগের আপেক্ষিকতার পরীক্ষা করেছিলেন পরীক্ষাগারের, যন্ত্র পাতির সাহায্য নিয়ে। আর কিশোর আইনস্টাইন সেটা করেছিলেন তার মাথার পরীক্ষাগারে, একটি ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে। আজ আমরা সেই পরীক্ষার কথায় জানবো। তার সাথে সাথে জানবো এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে কিভাবে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে যাই।

Image result for albert einstein wallpaper

তখন ১৮৯৬ সাল। আইনস্টাইনের বয়স কেবল ষোল। আইনস্টাইন তখনও মাইকেলসন আর মর্লির ইথারের পরীক্ষার বিষয়ে একদমই জানতেন না। ইথারের অস্তিত্ব যে কিছুটা সন্দেহের মুখে পড়ে গেছে তা না জেনেই আইনস্টাইন তার জীবন্ত পরীক্ষাগার, নিজের মাথায় একটি থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। আইনস্টাইন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন, “কি ঘটবে যদি আমি এখন আমার দুই হাতে একটি আয়না ধরে আলোর বেগে দৌড়াতে শুরু করি। আমি নিজে কি নিজের প্রতিচ্ছবি সেই আয়নায় দেখতে পাবো?” বলে রাখা ভাল যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতায় শুধু আলোর বেগ কেন, আলোর চেয়ে বেশি বেগে যাওয়ার বিষয়েও কোন রকম বিধি নিষেধ ছিল না।

বিজ্ঞানীরা আরো আগে থেকেই জানতেন যে, আলোর বেগ ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ড। কিন্তু কার সাপেক্ষে আলোর এই বেগ? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য তারা ইথারের ধারণার অবতারণা করেছিলেন। অর্থাৎ, আইনস্টাইন যখন আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেবেন তখন আলো ইথার মাধ্যমে ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আইনস্টাইনের হাতে ধরে রাখা আয়নাটির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করবে। আইনস্টাইন নিজেও আলোর বেগে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে আলো আর আইনস্টাইনের বেগ সমান বলে আলো কখনই আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আয়নায় পৌঁছাতে পারবে না।

এ পর্যন্ত বুঝতে কারো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এবার আমরা মনে করি দেখি যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটিতে কি বলা হয়েছিল। এই স্বীকার্য আমাদের বলেছিল যে, “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”। যার অর্থ আমরা যদি একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি বস্তু বিবেচনা করি তাহলে আমরা কোনভাবেই বলতে পারব না যে কে গতিশীল আছে আর কে স্থির আছে।

চলুন, এখন আবার আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্টে ফিরে যাই। আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে এই বিষয়টি নিশ্চিত যে, আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড়ালে আসলে আমাদের প্রতিবিম্ব আয়নাতে আমরা দেখতে পারবো না। ফলে নিজেদের মুখ আমরা আয়নায় দেখতে পাবো না। তাহলে কি দাঁড়ালো? একজন যদি আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেয় এবং আয়নায় দেখে নিজের প্রতিবিম্ব সেখানে পরছে না তখনই সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে, সে আসলেই আলোর বেগে গতিশীল আছে। কিন্তু গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার স্বীকার্য আমাদের বলেছিল কোন একটি পরীক্ষা স্থির অবস্থায়ই করা হোক বা, সমবেগে গতিশীল থাকা অবস্থায়ই করা হোক না কেন একই ফলাফল দেবে। কিন্তু এই থট এক্সপেরিমেন্টে এই স্বীকার্যটি তো ভুল প্রমাণ হয়ে গেল!! তাহলে?

Image result for looking in mirror

আইনস্টাইন তার এই থট এক্সপেরিমেন্টে ইথার ধারণাটিকে প্রথমে সত্য বলে ধরে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, আলোর বেগ শুধু ইথারের সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড থাকে। অর্থাৎ, ইথার ধারণা সঠিক হলে গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটি ভুল হয়ে যায়।

যদি গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যকে সত্য হতে হয় তাহলে নিজের প্রতিবিম্ব আয়নায় দেখা যেতে হবে স্বাভাবিকভাবেই। আর সেটা তখনই সম্ভব হবে যখন আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই ধ্রুব বা, একই হবে। তাহলে আইনস্টাইন যদি আলোর বেগেও যান তাহলেও আলো তার সাপেক্ষে আলোর বেগেই চলবে। ফলে আলো স্বাভাবিকভাবেই আয়নায় পৌঁছাবে আর আইনস্টাইন তার মুখমন্ডল দেখতে পাবেন।

বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কারভাবে বলা যাক। ধরি, আইনস্টাইন একটি আয়না নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তাহলে তিনি যদি এখন তার ডান হাতটি হালকা নাড়ান তবে খুব কম সময়ের মাঝে সামনের আয়নাতে তিনি তার ডান হাত নাড়ানোটি দেখতে পাবেন। এখন যদি তিনি আলোর কাছাকাছি বেগে আয়নাটি নিয়ে দৌড় দেন তবে গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে তার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাবে (যদি কোন গাড়ি ১০ মি./সেকেন্ড বেগে যায় আর আপনি ৫ মি./সেকেন্ড বেগে সেই একই দিকে দৌড়ান তাহলে আপনার কাছে মনে হবে গাড়ির বেগ কমে ৫ মি./সেকেন্ড হয়ে গিয়েছে। একই যুক্তিতে আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলে আপনার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাওয়ার কথা)। তাহলে ডান হাত নাড়ানোর অনেক পরে তিনি আয়নাতে তার হাত নাড়ানো দেখতে পাবেন। সময়ের এ পার্থক্য দিয়েও যে কেউ বলে ফেলতে পারবেন যে তিনি আসলে স্থির নয় বরং গতিশীল আছেন। অর্থাৎ, আপনি স্থির থাকলে আলোর বেগ আপনার কাছে যত হবে আপনি যদি আলোর কাছাকাছি বেগেও দৌড়ানো শুরু করেন তবেও আলোর বেগ আপনার সাপেক্ষে ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ডই থাকতে হবে। তবেই শুধুমাত্র গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকে বাঁচানো সম্ভব হবে। আর এটি সত্য হলে আলোর বেগের ওপড় ইথারের আর কোন প্রভাব থাকে না। সুতরাং ইথার ধারণাটিও অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।

অর্থাৎ, গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্য এবং ইথার ধারণা এ দুটোই একই সাথে সত্য হতে পারেনা। এদের যেকোন একটাকে মিথ্যা হতেই হবে। এর আগেই মাইকেলসন-মর্লির এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা দেখেছি ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হয় নি। আইনস্টাইনও দেখলেন আলোর বেগকে যদি সব কিছুর সাপেক্ষে সর্বদা একই ধরে নেয়া হয় তাহলে ইথারের আর প্রয়োজন পড়ে না। এভাবেই ইথার ধারণাটি আইনস্টাইন বাতিল করে দিলেন আর গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকেই নিজের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিরও প্রথম স্বীকার্য বানিয়ে নিলেন। আর দ্বিতীয় স্বীকার্যতে বললেন, আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব যা আমরা উপড়ের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে দেখলাম।

আলোর বেগ সব কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব এই কথাটি মেনে নিতে অনেকেরই প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট হয়। তাই বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করা যাক। ধরুন, পৃথিবীর মানুষ আর এলিয়েনদের মাঝে একটি যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। আপনি একটি স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে গেলেন। একজন এলিয়েনও তাদের স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে চলে গেলো। দুজনের স্পেস শিপেই কিন্তু হেডলাইটের মতো লাইট জ্বলার ব্যবস্থা আছে। হঠাৎ জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়াই আপনি আপনার স্পেস শিপটি নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তখনই এলিয়েন স্পেস শিপটি ২,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ছুঁটে আসল। আর আসতে আসতে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গুলি ছুঁড়তে পারে এমন একটি বন্দুক থেকে আপনার দিকে গুলি ছুঁড়তে লাগলো। তাহলে আপনি গুলিগুলোর বেগ কত দেখবেন? নিশ্চয় উত্তর দেবেন যে, আপনি দেখবেন গুলিগুলো ২,০০,০১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ধেয়ে আসছে। কারণ গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা বলে যে, গুলির বেগের সাথে স্পেস শিপের বেগ যোগ হয়ে যাবে। এখন স্পেস শিপটি যদি হঠাৎ করে তার তার হেড লাইটটি জ্বালিয়ে দেয় তাহলে কি দেখবেন? আলোর বেগ কত হবে? স্পেস শিপের বেগ + আলোর বেগ? মানে ৫,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড? গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা তো তাই বলে। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, না। তখনও আপনি দেখবেন আলোর বেগ শুধু আলোর বেগের সমানই। মানে সর্বদাই ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড। এক ফোঁটা কমও নয় আবার এক ফোঁটা বেশিও নয়। এটাই আইনস্টাইনের দ্বিতীয় স্বীকার্য। এটাই সত্য!

আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যায়। এ কারণেই মাইকেলসন-মর্লি যখন তাদের পরীক্ষাটি করেন তখন তাদের পরীক্ষায় সোজা পাঠানো আলো আর সমকোণে পাঠানো আলোর বেগের মাঝে কোন পার্থক্য ধরা পড়েছিলো না। পরবর্তিতেও অনেক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে।

অর্থাৎ, দেখা গেলো আইনস্টাইনের এই ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে গেলাম। এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। তাই চলুন এ স্বীকার্য দুটি আরেকবার সুন্দর করে আমরা লিখে ফেলি। আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি হলঃ

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করে আমরা কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধেও বুঝতে পারি। গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার দ্বিতীয় স্বীকার্য, যেখানে সময়কে পরম হিসেবে ধরা হয়েছিল তা যে ভুল তা আমরা আইনস্টাইনের উপড়ের দুটি স্বীকার্য থেকে পাই। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্য ঠিক হলেও দ্বিতীয় স্বীকার্যে পরম সময়ের বদলে পরম আলোর বেগ ব্যবহার করলেন আইনস্টাইন। এছাড়াও আমরা দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন, ভর বা, ভরের আপেক্ষিকতা এবং ভর আর শক্তি যে একই জিনিস এমন অনেক কিছু আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি থেকে পরবর্তিতে জানতে এবং বুঝতে পারি। এ বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তি কোন এক লেখায় কথা বলা যাবে। আজ এ পর্যন্তই। কষ্ট করে এতদূর পড়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব

গ্যালিলিও ছিলেন আপেক্ষিকতার জনক। আগের লেখায় আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি সম্বন্ধে জেনেছি। তার এ তত্ত্বের আরো একটি স্বীকার্য রয়েছে। গ্যালিলিও তার দ্বিতীয় স্বীকার্যে সময়কে পরম হিসেবে ধরে নিলেন। অর্থাৎ, সকাল বেলা যদি আপনি এবং আপনার এক বন্ধু একদম ঠিক ঠিক দুজনের ঘড়ি একই সময়ে মিলিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে দুদিকে নিজেদের কাজের জন্য চলে যান, তবে রাতে ফিরে এসে আপনারা দুজন আবার একে অপরের ঘড়ির সময় মিলিয়ে নিলে দেখবেন দুজনের ঘড়ি এখনও একই সময় দেখাচ্ছে। বিষয়টা এতই অবশ্যম্ভাবী এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িত যে গ্যালিলিওর এ ২য় স্বীকার্য সম্বন্ধে মনে হয় কারো কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। তাই এ স্বীকার্যটি নিয়ে আর বেশি কিছু বলার মনে হয় প্রয়োজন নেই। আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতাটাকে এখন বুঝতে চেষ্টা করি।

Image result for galileo
আপেক্ষিকতার জনক গ্যালিলিও গ্যালিলি

ধরুন, আপনি একটি ট্রেনে করে ভ্রমণ করছেন। জানালার পাশে আপনার বসার জায়গা। আপনার ট্রেনটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রতি সেকেন্ডে ২০ কি.মি. বেগে ছুটে চলেছে। তাহলে আপনার বেগ হবে ২০ কি.মি. প্রতি সেকেন্ড বা, ২০ কি.মি./সেকেন্ড। এখন বাইরে একজন লোক ঠিক পূর্ব থেকে পশ্চিমে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার বরাবর পাশ দিয়ে যাচ্ছে। লোকটির কাছে কিন্তু মনে হবে আপনার ট্রেনের বেগ আসলে,

আপনার ট্রেনের বেগ-লোকটির গাড়ির বেগ= (২০ কি.মি./সেকেন্ড-১০ কি.মি./সেকেন্ড)= ১০ কি.মি./সেকেন্ড।

আবার আপনার কাছে মনে হবে লোকটির গাড়ির বেগ= লোকটির গাড়ির বেগ-আপনার ট্রেনের বেগ= (১০ কি.মি./সেকেন্ড-২০কি.মি./সেকেন্ড)= – ১০ কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, মাইনাস বা, ঋণাত্মক দিকে ১০কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, আপনি দেখবেন লোকটি ১০কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। স্টেশনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন কিন্তু ঠিকই আপনার ট্রেনকে ২০ কি.মি./সেকেন্ড এবং লোকটির গাড়িকে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছুঁটে যেতে দেখবে।

এই বিষয়টিই আপেক্ষিকতা এক একজন দর্শকের সাপেক্ষে একই ট্রেন বা, গাড়ির বেগ একেক রকম মনে হওয়া। এখন লোকটি যদি গাড়িটি ট্রেনের সমান বেগে অর্থাৎ। ২০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে যেত তাহলে কি হত? আপনি লোকটিকে সব সময় আপনার পাশে দেখতেন। আপনার কাছে মনে হত লোকটি যেনো স্থির। অর্থাৎ, লোকটির বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আবার লোকটিও দেখত আপনার ট্রেনটি তার গাড়িকে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে না। আপনিও সবসময় তার পাশেই ট্রনে স্থির হয়র বসে আছেন। গাড়ির লোকটির কাছে মনে হত আপনি আসলে স্থির। আপনার বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আমি আশা করছি এই লেখাটির পাঠকরা অবশ্যই আপেক্ষিকতার এই মূল বিষয়গুলো সম্বন্ধে আগে থেকেই কিছুটা জ্ঞান রাখেন বা, লেখাটি পড়ার পর বিষয়টা মোটামুটিভাবে বুঝে গেছেন। তাই এ বিষয়টি নিয়ে আর বেশি কথা না বাড়িয়ে আমরা স্পেশাল রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার দিকে অগ্রসর হতে থাকি।

বিজ্ঞানীরা এক সময় আলোর বেগ অসীম নাকি এর কোন নির্দিষ্ট বেগ আছে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। একেক মুনীর একেক মত ছিল তখন। তবে বিজ্ঞানী রোমার প্রথম প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে আলোর বেগ আসলে সসীম, কোনভাবেই অসীম নয়। তিনি আলোর বেগ মেপেছিলেন ১ লক্ষ ৯০ হাজার কি.মি./সেকেন্ড। পরবর্তিতে ম্যাক্সওয়েল দেখিয়েছিলেন যে আলো আসলে এক ধরনের তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। শব্দও কিন্তু এক রকমের তরঙ্গ। বিজ্ঞানীরা তাদের আশে পাশের পর্যবেক্ষণ থেকে জানতেন কোন তরঙ্গই মাধ্যম ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে না। আলোর ক্ষেত্রেও কি কথাটি সত্য? আলো কিভাবে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসে? সূর্য থেকে পৃথিবীর মাঝে কি কোন মাধ্যম রয়েছে? এ বিষয়ে একটা মজার পরীক্ষার কথা বলি।

File:Ole Rømer (Coning painting).jpg
ওলে রোমার, যিনি আবিষ্কার করেছিলেন আলোর বেগ অসীম নয়।

আলোর চলাচলের জন্য কোন মাধ্যমের প্রয়োজন আছে কিনা তা বোঝার জন্য পরীক্ষাটি করেছিলেন বিজ্ঞানী ভন গুইরিকে। তিনি একটি কাঁচের জার নিলেন। এ কাঁচের জারের মাঝে একটি ঘন্টা ছিল যা অনবরত শব্দ করছিল। এবার জারটি থেকে সব বাতাস একদম বের করে নেয়া হল। জারের মধ্যে শুধু থাকল ফাঁকা স্থান। ফলে যারা এ পরীক্ষাটি দেখতে এসেছিল সেই দর্শকরা আর কোন ঘন্টা বাজার শব্দ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু তারা দেখতে পাচ্ছিলেন যে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি তখনও ঘন্টার সাথে ধাক্কা খেয়েই চলেছে।

Image result for ringing bell vacuum
জারের মাঝে রিঙ্গিং বেল

প্রমাণ হয়ে গেল যে শূন্য মাধ্যমে শব্দ চলাচল করতে না পারলেও আলো চলাচল করতে পারে। তা না হলে আমরা ঘন্টাটিতে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি ধাক্কা খেতে দেখতাম না বরং ঘন্টাটিও শব্দের সাথে অদৃশ্য হয়ে যেত এবং জারটি সম্পূর্ণ কালো হয়ে যেত। সুতরাং শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়ে কোন তরঙ্গ চলাচল করতে পারে তা তখনকার বিজ্ঞানীরা মানতে পারছিলেন না। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যে, শূন্য মাধ্যম কি আসলেই শূন্য? এ প্রশ্নের উত্তর পরবর্তি কোন লেখায় খোঁজার চেষ্টা করা হবে। ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের আয়না এবং স্পেশাল রিলেটিভিটির দুইটি স্বীকার্য

স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী। সবচেয়ে আলোচিত এবং মেধাবীও বলা চলে। বিজ্ঞানী মাইকেলসন আর মর্লি আলোর বেগের আপেক্ষিকতার পরীক্ষা করেছিলেন পরীক্ষাগারের, যন্ত্র পাতির সাহায্য নিয়ে। আর কিশোর আইনস্টাইন সেটা করেছিলেন তার মাথার পরীক্ষাগারে, একটি ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে। আজ আমরা সেই পরীক্ষার কথায় জানবো। তার সাথে সাথে জানবো এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে কিভাবে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে যাই।

Image result for albert einstein wallpaper

তখন ১৮৯৬ সাল। আইনস্টাইনের বয়স কেবল ষোল। আইনস্টাইন তখনও মাইকেলসন আর মর্লির ইথারের পরীক্ষার বিষয়ে একদমই জানতেন না। ইথারের অস্তিত্ব যে কিছুটা সন্দেহের মুখে পড়ে গেছে তা না জেনেই আইনস্টাইন তার জীবন্ত পরীক্ষাগার, নিজের মাথায় একটি থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। আইনস্টাইন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন, “কি ঘটবে যদি আমি এখন আমার দুই হাতে একটি আয়না ধরে আলোর বেগে দৌড়াতে শুরু করি। আমি নিজে কি নিজের প্রতিচ্ছবি সেই আয়নায় দেখতে পাবো?” বলে রাখা ভাল যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতায় শুধু আলোর বেগ কেন, আলোর চেয়ে বেশি বেগে যাওয়ার বিষয়েও কোন রকম বিধি নিষেধ ছিল না।

বিজ্ঞানীরা আরো আগে থেকেই জানতেন যে, আলোর বেগ ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ড। কিন্তু কার সাপেক্ষে আলোর এই বেগ? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য তারা ইথারের ধারণার অবতারণা করেছিলেন। অর্থাৎ, আইনস্টাইন যখন আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেবেন তখন আলো ইথার মাধ্যমে ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আইনস্টাইনের হাতে ধরে রাখা আয়নাটির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করবে। আইনস্টাইন নিজেও আলোর বেগে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে আলো আর আইনস্টাইনের বেগ সমান বলে আলো কখনই আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আয়নায় পৌঁছাতে পারবে না।

এ পর্যন্ত বুঝতে কারো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এবার আমরা মনে করি দেখি যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটিতে কি বলা হয়েছিল। এই স্বীকার্য আমাদের বলেছিল যে, “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”। যার অর্থ আমরা যদি একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি বস্তু বিবেচনা করি তাহলে আমরা কোনভাবেই বলতে পারব না যে কে গতিশীল আছে আর কে স্থির আছে।

চলুন, এখন আবার আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্টে ফিরে যাই। আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে এই বিষয়টি নিশ্চিত যে, আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড়ালে আসলে আমাদের প্রতিবিম্ব আয়নাতে আমরা দেখতে পারবো না। ফলে নিজেদের মুখ আমরা আয়নায় দেখতে পাবো না। তাহলে কি দাঁড়ালো? একজন যদি আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেয় এবং আয়নায় দেখে নিজের প্রতিবিম্ব সেখানে পরছে না তখনই সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে, সে আসলেই আলোর বেগে গতিশীল আছে। কিন্তু গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার স্বীকার্য আমাদের বলেছিল কোন একটি পরীক্ষা স্থির অবস্থায়ই করা হোক বা, সমবেগে গতিশীল থাকা অবস্থায়ই করা হোক না কেন একই ফলাফল দেবে। কিন্তু এই থট এক্সপেরিমেন্টে এই স্বীকার্যটি তো ভুল প্রমাণ হয়ে গেল!! তাহলে?

Image result for looking in mirror

আইনস্টাইন তার এই থট এক্সপেরিমেন্টে ইথার ধারণাটিকে প্রথমে সত্য বলে ধরে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, আলোর বেগ শুধু ইথারের সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড থাকে। অর্থাৎ, ইথার ধারণা সঠিক হলে গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটি ভুল হয়ে যায়।

যদি গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যকে সত্য হতে হয় তাহলে নিজের প্রতিবিম্ব আয়নায় দেখা যেতে হবে স্বাভাবিকভাবেই। আর সেটা তখনই সম্ভব হবে যখন আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই ধ্রুব বা, একই হবে। তাহলে আইনস্টাইন যদি আলোর বেগেও যান তাহলেও আলো তার সাপেক্ষে আলোর বেগেই চলবে। ফলে আলো স্বাভাবিকভাবেই আয়নায় পৌঁছাবে আর আইনস্টাইন তার মুখমন্ডল দেখতে পাবেন।

বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কারভাবে বলা যাক। ধরি, আইনস্টাইন একটি আয়না নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তাহলে তিনি যদি এখন তার ডান হাতটি হালকা নাড়ান তবে খুব কম সময়ের মাঝে সামনের আয়নাতে তিনি তার ডান হাত নাড়ানোটি দেখতে পাবেন। এখন যদি তিনি আলোর কাছাকাছি বেগে আয়নাটি নিয়ে দৌড় দেন তবে গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে তার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাবে (যদি কোন গাড়ি ১০ মি./সেকেন্ড বেগে যায় আর আপনি ৫ মি./সেকেন্ড বেগে সেই একই দিকে দৌড়ান তাহলে আপনার কাছে মনে হবে গাড়ির বেগ কমে ৫ মি./সেকেন্ড হয়ে গিয়েছে। একই যুক্তিতে আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলে আপনার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাওয়ার কথা)। তাহলে ডান হাত নাড়ানোর অনেক পরে তিনি আয়নাতে তার হাত নাড়ানো দেখতে পাবেন। সময়ের এ পার্থক্য দিয়েও যে কেউ বলে ফেলতে পারবেন যে তিনি আসলে স্থির নয় বরং গতিশীল আছেন। অর্থাৎ, আপনি স্থির থাকলে আলোর বেগ আপনার কাছে যত হবে আপনি যদি আলোর কাছাকাছি বেগেও দৌড়ানো শুরু করেন তবেও আলোর বেগ আপনার সাপেক্ষে ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ডই থাকতে হবে। তবেই শুধুমাত্র গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকে বাঁচানো সম্ভব হবে। আর এটি সত্য হলে আলোর বেগের ওপড় ইথারের আর কোন প্রভাব থাকে না। সুতরাং ইথার ধারণাটিও অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।

অর্থাৎ, গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্য এবং ইথার ধারণা এ দুটোই একই সাথে সত্য হতে পারেনা। এদের যেকোন একটাকে মিথ্যা হতেই হবে। এর আগেই মাইকেলসন-মর্লির এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা দেখেছি ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হয় নি। আইনস্টাইনও দেখলেন আলোর বেগকে যদি সব কিছুর সাপেক্ষে সর্বদা একই ধরে নেয়া হয় তাহলে ইথারের আর প্রয়োজন পড়ে না। এভাবেই ইথার ধারণাটি আইনস্টাইন বাতিল করে দিলেন আর গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকেই নিজের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিরও প্রথম স্বীকার্য বানিয়ে নিলেন। আর দ্বিতীয় স্বীকার্যতে বললেন, আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব যা আমরা উপড়ের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে দেখলাম।

আলোর বেগ সব কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব এই কথাটি মেনে নিতে অনেকেরই প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট হয়। তাই বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করা যাক। ধরুন, পৃথিবীর মানুষ আর এলিয়েনদের মাঝে একটি যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। আপনি একটি স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে গেলেন। একজন এলিয়েনও তাদের স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে চলে গেলো। দুজনের স্পেস শিপেই কিন্তু হেডলাইটের মতো লাইট জ্বলার ব্যবস্থা আছে। হঠাৎ জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়াই আপনি আপনার স্পেস শিপটি নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তখনই এলিয়েন স্পেস শিপটি ২,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ছুঁটে আসল। আর আসতে আসতে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গুলি ছুঁড়তে পারে এমন একটি বন্দুক থেকে আপনার দিকে গুলি ছুঁড়তে লাগলো। তাহলে আপনি গুলিগুলোর বেগ কত দেখবেন? নিশ্চয় উত্তর দেবেন যে, আপনি দেখবেন গুলিগুলো ২,০০,০১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ধেয়ে আসছে। কারণ গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা বলে যে, গুলির বেগের সাথে স্পেস শিপের বেগ যোগ হয়ে যাবে। এখন স্পেস শিপটি যদি হঠাৎ করে তার তার হেড লাইটটি জ্বালিয়ে দেয় তাহলে কি দেখবেন? আলোর বেগ কত হবে? স্পেস শিপের বেগ + আলোর বেগ? মানে ৫,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড? গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা তো তাই বলে। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, না। তখনও আপনি দেখবেন আলোর বেগ শুধু আলোর বেগের সমানই। মানে সর্বদাই ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড। এক ফোঁটা কমও নয় আবার এক ফোঁটা বেশিও নয়। এটাই আইনস্টাইনের দ্বিতীয় স্বীকার্য। এটাই সত্য!

আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যায়। এ কারণেই মাইকেলসন-মর্লি যখন তাদের পরীক্ষাটি করেন তখন তাদের পরীক্ষায় সোজা পাঠানো আলো আর সমকোণে পাঠানো আলোর বেগের মাঝে কোন পার্থক্য ধরা পড়েছিলো না। পরবর্তিতেও অনেক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে।

অর্থাৎ, দেখা গেলো আইনস্টাইনের এই ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে গেলাম। এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। তাই চলুন এ স্বীকার্য দুটি আরেকবার সুন্দর করে আমরা লিখে ফেলি। আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি হলঃ

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করে আমরা কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধেও বুঝতে পারি। গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার দ্বিতীয় স্বীকার্য, যেখানে সময়কে পরম হিসেবে ধরা হয়েছিল তা যে ভুল তা আমরা আইনস্টাইনের উপড়ের দুটি স্বীকার্য থেকে পাই। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্য ঠিক হলেও দ্বিতীয় স্বীকার্যে পরম সময়ের বদলে পরম আলোর বেগ ব্যবহার করলেন আইনস্টাইন। এছাড়াও আমরা দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন, ভর বা, ভরের আপেক্ষিকতা এবং ভর আর শক্তি যে একই জিনিস এমন অনেক কিছু আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি থেকে পরবর্তিতে জানতে এবং বুঝতে পারি। এ বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তি কোন এক লেখায় কথা বলা যাবে। আজ এ পর্যন্তই। কষ্ট করে এতদূর পড়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ।

গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব

গ্যালিলিও ছিলেন আপেক্ষিকতার জনক। আগের লেখায় আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি সম্বন্ধে জেনেছি। তার এ তত্ত্বের আরো একটি স্বীকার্য রয়েছে। গ্যালিলিও তার দ্বিতীয় স্বীকার্যে সময়কে পরম হিসেবে ধরে নিলেন। অর্থাৎ, সকাল বেলা যদি আপনি এবং আপনার এক বন্ধু একদম ঠিক ঠিক দুজনের ঘড়ি একই সময়ে মিলিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে দুদিকে নিজেদের কাজের জন্য চলে যান, তবে রাতে ফিরে এসে আপনারা দুজন আবার একে অপরের ঘড়ির সময় মিলিয়ে নিলে দেখবেন দুজনের ঘড়ি এখনও একই সময় দেখাচ্ছে। বিষয়টা এতই অবশ্যম্ভাবী এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িত যে গ্যালিলিওর এ ২য় স্বীকার্য সম্বন্ধে মনে হয় কারো কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। তাই এ স্বীকার্যটি নিয়ে আর বেশি কিছু বলার মনে হয় প্রয়োজন নেই। আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতাটাকে এখন বুঝতে চেষ্টা করি।

Image result for galileo
আপেক্ষিকতার জনক গ্যালিলিও গ্যালিলি

ধরুন, আপনি একটি ট্রেনে করে ভ্রমণ করছেন। জানালার পাশে আপনার বসার জায়গা। আপনার ট্রেনটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রতি সেকেন্ডে ২০ কি.মি. বেগে ছুটে চলেছে। তাহলে আপনার বেগ হবে ২০ কি.মি. প্রতি সেকেন্ড বা, ২০ কি.মি./সেকেন্ড। এখন বাইরে একজন লোক ঠিক পূর্ব থেকে পশ্চিমে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার বরাবর পাশ দিয়ে যাচ্ছে। লোকটির কাছে কিন্তু মনে হবে আপনার ট্রেনের বেগ আসলে,

আপনার ট্রেনের বেগ-লোকটির গাড়ির বেগ= (২০ কি.মি./সেকেন্ড-১০ কি.মি./সেকেন্ড)= ১০ কি.মি./সেকেন্ড।

আবার আপনার কাছে মনে হবে লোকটির গাড়ির বেগ= লোকটির গাড়ির বেগ-আপনার ট্রেনের বেগ= (১০ কি.মি./সেকেন্ড-২০কি.মি./সেকেন্ড)= – ১০ কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, মাইনাস বা, ঋণাত্মক দিকে ১০কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, আপনি দেখবেন লোকটি ১০কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। স্টেশনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন কিন্তু ঠিকই আপনার ট্রেনকে ২০ কি.মি./সেকেন্ড এবং লোকটির গাড়িকে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছুঁটে যেতে দেখবে।

এই বিষয়টিই আপেক্ষিকতা এক একজন দর্শকের সাপেক্ষে একই ট্রেন বা, গাড়ির বেগ একেক রকম মনে হওয়া। এখন লোকটি যদি গাড়িটি ট্রেনের সমান বেগে অর্থাৎ। ২০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে যেত তাহলে কি হত? আপনি লোকটিকে সব সময় আপনার পাশে দেখতেন। আপনার কাছে মনে হত লোকটি যেনো স্থির। অর্থাৎ, লোকটির বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আবার লোকটিও দেখত আপনার ট্রেনটি তার গাড়িকে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে না। আপনিও সবসময় তার পাশেই ট্রনে স্থির হয়র বসে আছেন। গাড়ির লোকটির কাছে মনে হত আপনি আসলে স্থির। আপনার বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আমি আশা করছি এই লেখাটির পাঠকরা অবশ্যই আপেক্ষিকতার এই মূল বিষয়গুলো সম্বন্ধে আগে থেকেই কিছুটা জ্ঞান রাখেন বা, লেখাটি পড়ার পর বিষয়টা মোটামুটিভাবে বুঝে গেছেন। তাই এ বিষয়টি নিয়ে আর বেশি কথা না বাড়িয়ে আমরা স্পেশাল রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার দিকে অগ্রসর হতে থাকি।

বিজ্ঞানীরা এক সময় আলোর বেগ অসীম নাকি এর কোন নির্দিষ্ট বেগ আছে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। একেক মুনীর একেক মত ছিল তখন। তবে বিজ্ঞানী রোমার প্রথম প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে আলোর বেগ আসলে সসীম, কোনভাবেই অসীম নয়। তিনি আলোর বেগ মেপেছিলেন ১ লক্ষ ৯০ হাজার কি.মি./সেকেন্ড। পরবর্তিতে ম্যাক্সওয়েল দেখিয়েছিলেন যে আলো আসলে এক ধরনের তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। শব্দও কিন্তু এক রকমের তরঙ্গ। বিজ্ঞানীরা তাদের আশে পাশের পর্যবেক্ষণ থেকে জানতেন কোন তরঙ্গই মাধ্যম ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে না। আলোর ক্ষেত্রেও কি কথাটি সত্য? আলো কিভাবে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসে? সূর্য থেকে পৃথিবীর মাঝে কি কোন মাধ্যম রয়েছে? এ বিষয়ে একটা মজার পরীক্ষার কথা বলি।

File:Ole Rømer (Coning painting).jpg
ওলে রোমার, যিনি আবিষ্কার করেছিলেন আলোর বেগ অসীম নয়।

আলোর চলাচলের জন্য কোন মাধ্যমের প্রয়োজন আছে কিনা তা বোঝার জন্য পরীক্ষাটি করেছিলেন বিজ্ঞানী ভন গুইরিকে। তিনি একটি কাঁচের জার নিলেন। এ কাঁচের জারের মাঝে একটি ঘন্টা ছিল যা অনবরত শব্দ করছিল। এবার জারটি থেকে সব বাতাস একদম বের করে নেয়া হল। জারের মধ্যে শুধু থাকল ফাঁকা স্থান। ফলে যারা এ পরীক্ষাটি দেখতে এসেছিল সেই দর্শকরা আর কোন ঘন্টা বাজার শব্দ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু তারা দেখতে পাচ্ছিলেন যে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি তখনও ঘন্টার সাথে ধাক্কা খেয়েই চলেছে।

Image result for ringing bell vacuum
জারের মাঝে রিঙ্গিং বেল

প্রমাণ হয়ে গেল যে শূন্য মাধ্যমে শব্দ চলাচল করতে না পারলেও আলো চলাচল করতে পারে। তা না হলে আমরা ঘন্টাটিতে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি ধাক্কা খেতে দেখতাম না বরং ঘন্টাটিও শব্দের সাথে অদৃশ্য হয়ে যেত এবং জারটি সম্পূর্ণ কালো হয়ে যেত। সুতরাং শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়ে কোন তরঙ্গ চলাচল করতে পারে তা তখনকার বিজ্ঞানীরা মানতে পারছিলেন না। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যে, শূন্য মাধ্যম কি আসলেই শূন্য? এ প্রশ্নের উত্তর পরবর্তি কোন লেখায় খোঁজার চেষ্টা করা হবে। ধন্যবাদ।