রাইনো ভাইরাসের পৃথিবী জয়

আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা। মিসরীয় এক পণ্ডিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ ‘এবারস পাপিরাস’ লিখছলেন। তার বইয়ে বর্ণীত অনেক রোগের মাঝে একটি রোগের নাম ছিল ‘রেশ’। রোগের নাম অদ্ভুত হলেও তার উপসর্গ ছিল আমাদের চিরচেনা কফ ও সর্দি। এর রেশ হলো সাধারণ সর্দিজ্বর। এক হিসাবে দেখা গেছে একজন মানুষ তার জীবনের গোটা একটা বছর শুধু ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়ে বিছানায় শুয়েই কাটিয়ে দেয়।

চিত্রঃ এবারস পেপিরাসের অংশ।

এই ধরনের সাধারণ সর্দিজ্বর হবার কারণ হচ্ছে রাইনো ভাইরাস। রোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে রাইনো ভাইরাসগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ভাইরাস।

গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস বিশ্বাস করতেন হাসি ঠাট্টা করার ক্ষমতা নষ্ট হলে ঠাণ্ডা লাগে। দুই হাজার বছর পরে ঊনিশ শতকের প্রথমদিকেও আমাদের জ্ঞানের খুব একটা উন্নতি ঘটেনি। ঐ সময় শরীরতত্ত্ববিদ

লিওনার্ড হিল বলেছিলেন সকালে বাইরে হাঁটাহাঁটি করলে কিংবা গরম থেকে ঠাণ্ডা পরিবেশে গেলে ঠাণ্ডা লাগে।

চিত্রঃ রাইনো ভাইরাস

প্রথমে অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করেছিলেন যে এটা হয়তো কোনো ব্যাকটেরিয়া হবে। কিন্তু মার্কিন চিকিৎসক এলফন্স ডচেজ ১৯২৭ সালে এই ধারণা উড়িয়ে দেন। তিনি মানুষের সর্দি ফিল্টার করেন। ফিল্টারের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া সরিয়ে ফেলার পরেও তা রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম ছিল। ব্যাকটেরিয়া আকারে তুলনামূলকভাবে বড় হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার পক্ষে এই ফিল্টার ভেদ করে পার পাওয়া সম্ভব নয়। শুধুমাত্র অতি-ক্ষুদ্র ভাইরাসের মাধ্যমেই তা সম্ভব।জার্মান অণুজীববিজ্ঞানী ওয়ালথার ক্রুস ১৯১৪ সালে সাধারণ ঠাণ্ডা জ্বরের কারণ সম্বন্ধে প্রথম সঠিক অনুমান করেন। তিনি তার সহকারীর সর্দি নিয়ে তা লবণের দ্রবণে দ্রবীভূত করেন। এরপর তা ফিল্টার করেন। ফিল্টারকৃত সর্দি আরো বারো জন সহকর্মীর নাকে প্রবেশ করান। তাদের মধ্যে চার জন সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হয়। তিনি একই কাজ ত্রিশ জন শিক্ষার্থীদের মাঝেও করেন। তাদের মধ্যে পনেরো জন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়। তিনি আরো পঁয়ত্রিশ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখেন যাদের উপর কোন পরীক্ষা চালানো হয়নি। তাদের মধ্যে কেবল একজন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হন। এর ফলে মোটামুটিভাবে প্রমাণ হলো আক্রান্ত সর্দি অন্য কারো নাকে প্রবেশ করালেই কেবল রোগ ছড়াচ্ছে। ক্রুসের এই পরীক্ষা থেকে ধারণা পাওয়া গেল যে সর্দিজ্বরের জন্য কোনো একটি ক্ষুদ্র জীবাণু দায়ী যা রোগীর সর্দিতে উপস্থিত থাকে।

বিজ্ঞানীদের আরো তিন দশক লেগে যায় কাঙ্ক্ষিত এই ভাইরাসের পরিচয় জানতে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল রাইনো ভাইরাস। ‘রাইনো’ শব্দটির মানে হলো নাক। প্রতিটি রাইনো ভাইরাসে দশটি করে জিন আছে। অন্যদিকে মানুষের প্রায় ২০ হাজার জিন আছে। তবে রাইনো ভাইরাস তার অল্প সংখ্যক জিন নিয়েই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

নাক থেকে সর্দি ঝাড়ার মাধ্যমে রাইনো ভাইরাস চারদিকে ছড়িয়ে যায়। মানুষ যখন নাক ঝাড়ে তখন জীবাণু হাতে লেগে যায়। হাত থেকে আবার দরজার হাতলে লাগে। এভাবে সে যেখানেই ছোঁয় রাইনো সেখানেই ছড়িয়ে যায়। একইভাবে কোন মানুষকে ছুঁলে তা ঐ মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এধরনের ভাইরাস মানুষের নাক, গলা এবং ফুসফুসের কোষ ভেদ করতে পারে। এরা কোষের ভেতরে ঢুকে পোষকের কোষকে ব্যবহার করে তার ডিএনএ’র কপি এবং তার প্রোটিন আবরণ তৈরি করে। তারপর পোষক কোষ ভেঙ্গে নতুন রাইনো ভাইরাস বেরিয়ে আসে শয়ে শয়ে।

চিত্রঃ ভাইরাসের প্রতিলিপিকরন

এবারস পেপারাসের লেখক রেশের চিকিৎসা লিখে যান। চিকিৎসাটি হলো মধু, লতাপাতা ও ধোঁয়া মিশিয়ে নাকে মালিশ করা। এরকম আরো অদ্ভুত অদ্ভুত চিকিৎসার কথা পাওয়া যায় এখানে। পনেরো শতকের দিকে রোমান পণ্ডিত প্লিনি বললেন যে নাকে ইঁদুর ঘষলে ঠাণ্ডা সেরে যাবে। সতেরো শতকে ইংল্যান্ডে ধারণা ছিল বারুদ, ডিম, গরুর মল এবং চর্বি একসাথে মিশিয়ে খেলে রোগ সেরে যাবে। লিওনার্ড হিল মনে করতেন তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে ঠাণ্ডা লাগে। তার মতে বাচ্চারা সকাল সকাল গোসল করলে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে পারবে।রাইনো ভাইরাস তুলনামূলক-ভাবে খুব কম কোষকে আক্রান্ত করে। কিন্তু তাও ঠাণ্ডা লাগলে আমাদের এত অস্বস্তি লাগে কেন? এর জন্যে যদি কাউকে দোষ দিতে হয় তাহলে তা আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই দিতে হবে। আক্রান্ত কোষ কিছু সিগন্যাল অণু তৈরি করে যাদের সাইটোকাইন বলে। সাইটোকাইন নিকটবর্তী প্রতিরক্ষা কোষকে নিয়ে আসে। ওই প্রতিরক্ষা কোষগুলোর কারণে আমাদের অস্বস্তি অনুভূত হয়। এই কারণে আমাদের গলায় খুসখুসে অনুভূতি সৃষ্টি হয়। সাথে তৈরি হয় কফ। তাই ঠাণ্ডা থেকে মুক্তি পেতে কেবল ভাইরাস থেকে মুক্তি পেলেই হবে না। সাথে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি শান্ত হওয়ার জন্যেও অপেক্ষা করতে হবে।

এই ধারণাগুলো নিয়ে হাঁসি পেতে পারে। মনে হতে পারে সেকালের মানুষেরা কত অদ্ভুত ছিল। আর কত উদ্ভট ছিল তাদের চিন্তাভাবনা। সত্যি কথা বলতে এখানে নিজেদেরকে আধুনিক ভাবার কিছু নেই। কারণ এখনো আমাদের কাছে সর্দি-জ্বরের উপযুক্ত ওষুধ নেই। সর্দিজ্বরের কোনো প্রতিষেধক এখনো আমাদের জানা নেই ।

এসবের মাঝে জিংক এক্ষেত্রে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জিংক রাইনো ভাইরাসের বংশবিস্তার বন্ধ করে দেয়। যারা ঠাণ্ডা লাগার এক দিনের মধ্যেই জিঙ্ক নেয় তারা অন্যদের চেয়ে দুয়েক দিন আগেই সুস্থ হয়ে যায়। বাবা মা অনেক সময় ঠাণ্ডা লাগলে বাচ্চাদের কফ সিরাপ দেয়। দেখা গেছে কফ সিরাপ ঠাণ্ডায় কোন উপকার করে না বরং উলটো এর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তার মধ্যে খিঁচুনি, হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যাওয়া অন্যতম। এমনকি এতে মৃত্যুও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ অধিদপ্তর শিশুদের কফ সিরাপ খাওয়ার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছে।

বেশিরভাগ সময় ডাক্তাররা ঠাণ্ডা লাগলে রোগীদের এন্টিবায়োটিক দেন। এই ধরনের চিকিৎসা পুরোপুরি বিবেচনাহীন। কারণ এন্টিবায়োটিক কাজ করে ব্যাকটেরিয়ার উপর। ভাইরাসের উপর এদের কোন কার্যকরিতা নেই। ডাক্তাররা এন্টিবায়োটিক দেবার একটি কারণ হলো তারা নিশ্চিতভাবে জানে না এটা সাধারণ ঠাণ্ডা নাকি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। অনেক সময় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অবিভাবকের চাপে পড়ে চিকিৎসকরা এন্টিবায়োটিক দেন। কিন্তু এন্টিবায়োটিকের এধরনের যথেচ্ছ ব্যবহার খুবই ভয়ঙ্কর। এতে আমাদের শরীরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি হয়। ফলে পরবর্তীতে ডাক্তারদের দেয়া এন্টিবায়োটিক তো কাজ করেই না উলটো আমাদের জন্যে মরণঘাতি হয়ে ওঠে।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক আসলে ভালো কোনো সমাধান নয়।

সাধারণ সর্দিজ্বরের কোন চিকিৎসা না থাকার একটা কারণ হলো রাইনো ভাইরাসকে আমরা খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। রাইনো ভাইরাসকে অনেক রূপে পাওয়া যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা সবেমাত্র রাইনো ভাইরাসের জেনেটিক বৈচিত্র্য বুঝতে শুরু করেছেন। বিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের প্রায় বারোটি স্ট্রেইন শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এদের মধ্যে দুটো হচ্ছে HRA-A এবং HRA-B।

কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান লিপকিন এবং থমাস ব্রিজ মিলে নিউইয়র্ক শহরের এমন কিছু বাসিন্দাদের নিয়ে গবেষণা করেন যাদের ঠাণ্ডার কারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস নয়। তারা গবেষণা করে দেখেন যে ঐসব লোকের রোগের কারণ HRA-A এবং HRA-B নয় বরং রাইনো ভাইরাসের অন্য আরেকটি স্ট্রেইন। তারা এর নাম দেন HRA-C। বিভিন্ন স্থানের HRA-C স্ট্রেইনের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। এ থেকে এটা বোঝা যায় যে এই স্ট্রেইন উদ্ভুত হয়েছে বেশিদিন হয়নি। বেশি দিন না হওয়া সত্ত্বের এটি খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের যতই স্ট্রেইন আবিষ্কার করছেন ততোই তাদের বিবর্তন সম্বন্ধে জানছেন। সকল রাইনো ভাইরাস কিছু সাধারণ জিনোম বহন করে। সাধারণ বা কমন জিনোমগুলো সকল প্রকার স্ট্রেইনের রাইনো ভাইরাসে বিদ্যমান। রাইনো ভাইরাসের এই অংশ বিবর্তনে খুব অল্পই পরিবর্তিত হয়েছে। বাকি জিনোমগুলো অনবরত পরিবর্তিত হয়ে চলছে। জিনোমের এই অংশগুলো রাইনো ভাইরাসকে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে দেহের ক্ষতি সাধন করে। আমাদের দেহ যখন এক স্ট্রেইনের জন্য এন্টিবডি তৈরি করে তখন অন্য স্ট্রেইনগুলো পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কারণ এন্টিবডিগুলো রাইনো ভাইরাসে যুক্ত হওয়ার জন্য উপযুক্ত সারফেস প্রোটিন পায় না। ফলে তা ঐ স্ট্রেইনের ভাইরাসগুলোকে মারতে পারে না।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করে ভাইরাসগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠলে তা মারাত্মক সমস্যায় পরিণত হবে।

রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা এত কঠিন হওয়া স্বত্বেও বিজ্ঞানীরা এর প্রতিরোধের ব্যাপারে আশাবাদী। আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল রাইনো ভাইরাসের একটা সাধারণ জিনোম আছে যার খুব একটা পরিবর্তন হয় না। বিজ্ঞানীরা এমন একটি ভ্যাক্সিন তৈরি করতে চাইছেন যা রাইনো ভাইরাসের জিনোমের এই অংশকে আক্রমণ করে ধ্বংস করতে পারবে। ফলে রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।রাইনো ভাইরাসের এই বৈচিত্র্যের ফলে এর উপযুক্ত প্রতিরোধ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি ভ্যাক্সিন যদি একটি স্ট্রেইনের জন্য কার্যকর হয় দেখা যায় তা অন্য আরেকটি স্ট্রেইনের জন্য কাজ করছে না। আবার কোনো স্ট্রেইনের যদি সেই ভ্যাক্সিনের বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকে তাহলে পরবর্তীতে মিউটেশনের মাধ্যমে সেটা আরো শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা তাকে ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী করে তোলে।

রাইনো ভাইরাসের এই সাধারণ জিনোম অংশটি দেখতে অনেকটা লবঙ্গের মতো। বিজ্ঞানীদের গবেসনায় প্রত্যেক রাইনো ভাইরাসে এই লবঙ্গের গঠনটি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা যদি এই লবঙ্গের মতো গঠনকে ভেঙ্গে দিতে পারেন তাহলে তারা পৃথিবীর সকল সর্দি-জ্বর প্রতিরোধে সক্ষম হবেন।

কিন্তু তা কি আসলেই ঠিক হবে? উত্তর এখনো অজানা। রাইনো ভাইরাসের ফলে আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। ঠাণ্ডা তো বাধায়ই, পাশাপাশি এটি অন্যান্য ভাইরাসকে আক্রমণের সুযোগও করে দেয়। কিন্তু রাইনো ভাইরাস নিজে আসলে আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি করে না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এধরনের ছোটখাটো ও তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর রোগ আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পরিণত ও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে তা আমাদের নানা ধরনের ইমিউন ডিজঅর্ডার রোগ যেমন এলার্জি ও ক্রন হওয়া থেকে বাঁচায়। তাই রাইনো ভাইরাসকে আমাদের পুরনো শত্রু না ভেবে পুরনো শিক্ষক হিসেবে ভাবা উচিৎ।

তথ্যসূত্র

A planet of viruses (Second edition), Carl Zimmer, 2015

https://en.wikipedia.org/wiki/Walther_Kruse

 

 

ডায়নোসরের ক্লোন করা কি সম্ভব?

আজকের মানুষ যেমন বিভিন্ন জাতি গোত্রে ভাগ হয়ে সমস্ত পৃথিবী জুড়ে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে, মানুষের আবির্ভাবের আগে ঠিক এমন একটা রাজত্ব ছিল ডায়নোসরদের। জলে-স্থলে সবখানেই। কোনো এক দুর্ঘটনায় বৈচিত্র্যময় ডায়নোসররা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও তাদের কোনো কোনোটির দেহাবশেষ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়। এই দেহাবশেষের সূত্র ধরে কারো কারো মনে প্রশ্ন জাগে, বিজ্ঞান এখন অনেক উন্নত হয়েছে, উন্নত বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে কি সেই ডায়নোসরদের আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যায় না?

এই চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটেছিল হলিউড চলচ্চিত্র ‘জুরাসিক পার্ক’ এর মাঝে। জুরাসিক পার্ক চলচ্চিত্রে দেখা যায় বিজ্ঞানীরা এম্বারে আটকানো অবস্থায় ডায়নোসরের সচল DNA উদ্ধার করতে পারে, এবং সফলভাবে একে কাজে লাগিয়ে ডায়নোসর উৎপাদন করতে পারে।

উল্লেখ্য এম্বার হচ্ছে এক ধরনের আঠা জাতীয় পদার্থ। প্রাগৈতিহাসিক যুগে কোনো মশা যদি কোনো ডায়নোসরকে কামড়ে এম্বারে গিয়ে বসে এবং ঘটনাক্রমে ঐ মশা এম্বারের ভেতর আটকা পড়ে যায় এবং আঠা শুকিয়ে যায় তাহলে বছরের পর বছর মশার ভেতরে থাকা ডায়নোসরের রক্ত সুরক্ষিত অবস্থায় থাকে। এমনকি কোটি কোটি বছর পর্যন্ত তা সংরক্ষিত থাকে। এই অনুকল্পকে ব্যবহার করেই গড়ে উঠেছিল স্টিভেন স্পিলবার্গের জুরাসিক পার্ক চলচ্চিত্রটি।

চিত্রঃ এম্বারে আটকে যাওয়া প্রাগৈতিহাসিক পোকা। ছবিঃ American Museum of Natural History

কিন্তু বাস্তবতা সিনেমার মতো নয়। এম্বারে আটকে থাকা দেহাবশেষ হতে ঐ প্রাণী পুনরুৎপাদন সম্ভব নয়। ২০১৩ সালে প্রকাশিত একটি জার্নাল এই কথাই বলে। এম্বারে হয়তো প্রাগৈতিহাসিক সময়ের DNA-র অনেক তথ্য থাকে কিন্তু তা একটি প্রাণীকে পুনরুৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয়।

DNA কতদিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে?

প্রাণী ক্লোন করার প্রথম শর্তটি হচ্ছে ঐ প্রাণীর অবিকৃত ও নিখুঁত DNA-র উপস্থিতি। সাম্প্রতিক সময়ে অস্তিত্ব আছে এমন প্রাণীর বেলায় অবিকৃত DNA পাওয়া খুবই সহজ। কিন্তু সেই প্রাণীটি যদি হয় লক্ষ কোটি বছরের আগের তাহলে সেখানে অবিকৃত DNA প্রাপ্তি নিয়ে কিছু সমস্যা আছে।

কোনো একটা প্রাণী (বা জৈবিক সিস্টেম) মারা যাবার পর থেকেই তার DNA ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। এই ক্ষয়ের পেছনে কাজ করে বিভিন্ন এনজাইম যা মাটির বিভিন্ন অণুজীব বা দেহের বিভিন্ন কোষে উপস্থিত থাকে। পাশাপাশি সূর্যের অতি-বেগুনী রশ্মিও এই ক্ষয়ের পেছনে কাজ করে। উপরি পাওনা হিসেবে পানির কণা কিংবা বাতাসের অক্সিজেনও DNA-র ক্ষয়িষ্ণুতার জন্য দায়ী হতে পারে। যে যে উপাদানগুলোর কথা বলা হয়েছে তারা ততদিন পর্যন্ত DNA-র ক্ষয় করেই যাবে যত দিন না পুরো DNA টা শেষ হয়ে যায়। যখন আর কোনো কিছুই বাকি থাকবে না তখন তাদের কার্যকরীতা শেষ হবে। পরিবেশে যেহেতু এদের কোনো অভাব নেই, তাই কোনো অবিকৃত DNA-র আশা না করাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

এমন পরিস্থিতিতে একটি DNA কতদিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে তা কিছুটা ঘোলাটে। বিজ্ঞানীদের ধারণা একটি DNA অনায়াসেই ১ মিলিয়ন বছর টিকে থাকতে পারে। কিন্তু কখনোই ৫/৬ মিলিয়নের বেশি সময় টিকে থাকা সম্ভব নয়। যা ডায়নোসরের DNA-র বেলায় খুবই অপ্রতুল। কম করে হলেও ৬৫ মিলিয়ন বছর টিকে থাকা লাগবে। ৬৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন বছর আগে ডায়নোসরেরা পৃথিবীতে বিরাজ করেছিল।

সত্যি কথা বলতে কি অনেক গবেষকই ডায়নোসরের ক্লোন করতে আগ্রহী, কিন্তু ক্লোন করার জন্য যতটুকু অপরিবর্তিত DNA দরকার তারা তা কখনোই সংগ্রহ করতে পারেননি।

একবার একদল গবেষক ডায়নোসরের হাড়ের ভেতর এমন এক উপাদান পেয়েছিল যা গবেষকদের আশা যোগায়। গবেষকদের ধারণা এখানে প্রাপ্ত DNA দিয়ে বিশেষভাবে হলেও ডায়নোসর ক্লোন করা যাবে।

কিন্তু এখানেও সমস্যা দেখা দেয়। ঐ উপাদান ছিল এক কপি-ই। তার উপর এটি যে ডায়নোসরের তা শতভাগ নিশ্চিত নয়। হতে পারে এটি ডায়নোসরের ভেতরে বাসা বাধা কোনো জীবাণুর, কিংবা হতে পারে ঐ সময়ে বাস করা অন্য কোনো প্রজাতির। শতভাগ নিশ্চিত হতে হলে এর সিকোয়েন্স করতে হবে, সিকোয়েন্স করলে DNA টি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। যা আগের অবস্থা আর ফিরে পাবে না। সবদিক বিবেচনা করে সবেধন নীলমণি উপাদানটিকে অক্ষত রাখতেই সম্মত হয়েছেন বিজ্ঞানী দল।

চিত্রঃ কোনোভাবে মেসোজয়িক পিরিয়ডের DNA আজকের যুগে টিকে থাকলেও তা এতটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হবে যে এটি দিয়ে উল্লেখ করার মতো কিছু করা যাবে না।

তাহলে ডায়নোসরদের হাড়গুলো? হাড়গুলো আসলে ‘হাড়’ নয়। এগুলো ফসিল। ফসিলগুলো ডায়নোসরের দেহের ছাচে তৈরি হয়েছে। ডায়নোসরের হাড়ের প্রতিটি অণু-পরমাণু প্রতিস্থাপিত হয়ে তৈরি হয়েছে এই ফসিল। মৃতদেহ যখন কাদার মাঝে নিমজ্জিত হয় তখন দেহের প্রতিটি অণু-পরমাণু একটি একটি করে খনিজ পদার্থের অণু-পরমাণু দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। খনিজ পদার্থের অণু-পরমাণুগুলো পানিতে/কাদায় নিমজ্জিত থাকে। প্রতিস্থাপিত হওয়া অণু-পরমাণুগুলো পরবর্তীতে পাথরে রূপান্তরিত হয়। এগুলোকেই আমরা ফসিল হিসেবে জানি।

যুক্তির খাতিরে

তারপরও যদি যুক্তির খাতিরে ধরে নেই ডায়নোসরের DNA ঠিকঠাক মতোই সংরক্ষিত আছে এবং তা থেকে ডায়নোসর ক্লোন করা সম্ভবও, তাহলেও এখানে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হবে। প্রথমত ক্লোন করতে হলে একটি পেটে ধারণকারী ‘মা’ লাগবে, যা পৃথিবীতে নেই। ডায়নোসরেরা অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এদের বংশধর বিবর্তনের মাধ্যমে পাখি হয়ে আজকের যুগে উড়ছে, কিন্তু প্রজাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা অনেক দূরে চলে গিয়েছে, তাদের মাঝে আজ অনেক পার্থক্যের দেয়াল তৈরি হয়ে আছে।

অন্য কোনো বিকল্প না থাকাতে যদি গর্ভ হিসেবে পাখিকে বেঁছে নেয়া হয় তাহলেও সমস্যা দেখা দিবে। ওখান থেকে জন্ম নেয়া প্রাণীতে পাখির বৈশিষ্ট্যও সঞ্চারিত হবে। অর্থাৎ উৎপাদিত প্রাণীটি ঠিক ঠিক কাঙ্ক্ষিত থাকবে না। কিছুটা সংকর হয়ে যাবে।

চিত্রঃ ডায়নোসরদের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হলে কম করে হলেও ৫ হাজার ডায়নোসর (যে কোনো প্রজাতির) তৈরি করতে হবে। ছবিঃ Todd Marshall

তার উপর বর্তমানের পরিবেশ সমস্যা করবে। যে DNA থেকে মানুষ ডায়নোসর ক্লোন করবে ঐ DNA-র প্রাণী এমন একটা পরিবেশে বেঁচে ছিল যা আজকের পরিবেশ থেকে একদমই আলাদা। কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ, অক্সিজেনের পরিমাণ, তাদের তুলনামূলক অনুপাত এখনকার পরিস্থিতির চেয়ে অনেক ভিন্ন ছিল। তাপমাত্রাও ভিন্ন ছিল। দূষিত, বিপর্যয়গ্রস্ত ও অপরিচিত একটা পরিবেশে তার টিকে থাকাই কষ্টকর হবে। একটি ডায়নোসরকে এই পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে বাঁচিয়ে রাখা বেশ চেলেঞ্জিং হবে। জীবাশ্মবিদ সুইটজার মনে করেন, নবসৃষ্ট প্রাণীর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হলে কম করে হলেও ৫ হাজার পরিমাণ ডায়নোসর তৈরি করতে হবে। যা সমস্যার পিঠে সমস্যাই তৈরি করে চলবে।

তথ্যসূত্র

  1. লাইভ সায়েন্স, http://www.livescience.com/54574-can-we-clone-dinosaurs.html
  2. মাসিক জিরো টু ইনফিনিটি (জুন ২০১৫)
  3. বিজ্ঞান ব্লগ, org/?p=6019

 

 

মৃতদেহের রূপান্তর প্রক্রিয়া

জনের মৃত্যুর পর প্রায় চার ঘন্টা কেটে গেছে। মৃতদেহ সৎকারের জন্য আনা হয়েছে। জীবনের বেশিরভাগ সময়ে সুস্থ থাকা জন কাজ করতেন টেক্সাসের তেল খনিতে। কাজের ধরনের জন্যই শারীরিকভাবে ছিলেন বেশ কর্মঠ আর শক্তিশালী। বছর দশেক আগেই ধূমপান আর মদ্যপান দুটোই ছেড়েছিলেন। তবুও একসময় হঠাৎ তার শরীরের অবনতি হতে থাকে এবং তারপর জানুয়ারির এক হিমশীতল সকালে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

এই মুহুর্তে তার মৃতদেহ রাখা হয়েছে সৎকারকর্মীর একটি ধাতব টেবিলে। ঠাণ্ডা আর প্রায় শক্ত হয়ে আসা শরীর আর ত্বকের ধূসর রক্তাভ বর্ণ ইতিমধ্যেই পচন শুরু হবার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমাদের কেউই সাধারণত মৃত্যুর পর নিজের কিংবা পরিচিতজনদের দেহের কি হাল অবস্থা হবে তা নিয়ে ভাবতে পছন্দ করি না। বেশিরভাগ মানুষই স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। ঐতিহ্য অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়। মাঝে মাঝে হিমাগারে রেখে কিংবা বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে মৃতদেহ কিছু সময়ের জন্য তাজা রাখার চেষ্টা করা হয়, যা শবের পচন প্রক্রিয়াকে কিছুক্ষণের জন্য ধীর করে দেয়। অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অবশ্য ফরেনসিক সায়েন্স ব্যবহার করা হয় যেন মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সময়, কারণ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সম্বন্ধে জানা যায়। এক্ষেত্রে শবের পচনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপকে কাজে লাগানো হয়।

মরদেহ নিজে মৃত হলেও তা অন্য অনেক জীবের জীবনের সূচনা করে। অনেক বিজ্ঞানী মৃতদেহকে জটিল বাস্তুতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ বাস্তুতন্ত্র মৃত্যুর ঠিক পরপরই শুরু হয়। ধীরে ধীরে দেহকে পচিয়ে ফেলার মাধ্যমে এই তন্ত্র বিস্তার লাভ করে।

আত্ম-পরিপাক

‘অটোলাইসিস’ বা ‘আত্ম-পরিপাক’ নামে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় মৃত্যুর কয়েক মিনিট পর থেকেই মৃতদেহে পচন শুরু হয়। হৃৎস্পন্দন বন্ধ হবার সাথে সাথে কোষে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। কোষের অম্লতা বেড়ে গিয়ে বিষাক্ত পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এনজাইম কোষপর্দাকে হজম করে কোষের ভাঙ্গনের সূত্রপাত ঘটায়। এটা সাধারণত যকৃতেই প্রথম ঘটে, কেননা যকৃতে এনজাইমের পরিমাণ বেশি থাকে। রক্তকণিকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালী ভেদ করে বের হয়ে আসে এবং অভিকর্ষের টানে কৈশিক নালিকা, ছোট শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে যায়। এতে করে মৃতদেহের চামড়া বিবর্ণরূপ ধারণ করতে থাকে। পাশাপাশি দেহের তাপমাত্রাও পড়তে শুরু করে। এরপর দেখা যায় ‘রিগর মর্টিস’- যার কারণে চোখের পাতা, চোয়াল, ঘাড়ের পেশী, হাত, পা সব শক্ত হয়ে যায়। জীবিত অবস্থায় আমাদের পেশীতে থাকা অ্যাকটিন আর মায়োসিন নামে দুটি সূত্রবৎ প্রোটিনের কারণে আমরা পেশী সংকুচিত-প্রসারিত করতে পারি। কিন্তু মারা যাবার পর পেশীতে শক্তি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবার কারণে এ প্রোটিনগুলো এক জায়গায় আটকা পড়ে যায়, ফলে পেশীসহ বিভিন্ন অস্থিসন্ধিকে নড়নে অক্ষম করে ফেলে।

মৃতদেহ থেকে নির্গত তীব্র গন্ধ প্রায় ৪০০ রকমের উদ্বায়ী জটিল রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণে গঠিত। এই গ্যাস মিশ্রনের সঠিক গঠন মৃতদেহের পচন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। শব-বাস্তুতন্ত্রের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার আধিপত্য থাকে। আমাদের শরীর কিন্তু অসংখ্য ব্যাকটেরিয়ার পোষক হিসেবে ভূমিকা রাখে।

অনাক্রম্যতার অবসান

বেঁচে থাকাকালে দেহের বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ অঙ্গ অণুজীবমুক্ত থাকে। মৃত্যুর কিচ্ছুক্ষণের মাঝেই দেহের অনাক্রম্যতা বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে অণুজীবগুলো সুযোগ পেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে পাকস্থলি, ক্ষুদ্রান্ত্র আর বৃহদান্ত্রের সংযোগস্থলে অণুজীবগুলোর আক্রমণ শুরু হয়। অন্ত্রের অণুজীব অন্ত্রকে হজম করে ফেলে। এরপর চারপাশের কোষকে হজম করতে করতে ভিতর থেকে বাইরের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত কোষ থেকে নির্গত রাসায়নিক মিশ্রণকে এরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

২০০৪ সালের আগস্টে ‘আলাবামা স্টেট ইউনিভার্সিটির’র ফরেনসিক বিজ্ঞানী গুনাল্‌জ জাভান এবং তার সহকর্মীরা প্রথমবারের মতো ‘থ্যাটানোমাইক্রোবায়োম’ নামে নতুন একটি বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। গ্রীক শব্দ ‘থ্যাটানোস’ অর্থ ‘মৃত্যু’। জাভান ও তার দল মৃত্যুর পর ২০ থেকে ২৪০ ঘন্টা সময়ের মধ্যে প্রায় ১১ টি মৃতদেহ থেকে যকৃত, প্লীহা, মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড এবং রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। তারা ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের দুটি ভিন্ন পদ্ধতির সাথে জৈবতথ্যপ্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে প্রতিটি নমুনার ব্যাকটেরিয়াল বস্তুর বিশ্লেষণ করে দেখেন। এর আগে ‘ইঁদুরের মৃতদেহ পচনপ্রক্রিয়া’ সম্পর্কিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, মৃত্যুর পর দেহে থাকা অণুজীবগুলোর নাটকীয় পরিবর্তন ঘটলেও তা একটি সুনির্দিষ্ট এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকে। এতে করে গবেষকরা মৃত্যুর তিন দিন থেকে তিন মাসের মধ্যে মৃত্যুর সময় সম্পর্কে একটি সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য ধারণা দিতে পারেন।

ব্যাকটেরিয়া পর্যবেক্ষণ

জাভান লক্ষ্য করে দেখেন, মৃত্যুর বিশ ঘন্টার মধ্যে ব্যাকটেরিয়াগুলো যকৃতে এসে পৌঁছায় এবং প্রায় ৫৮ ঘন্টার মধ্যে এরা সংগৃহীত নমুনাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এর অর্থ ব্যাকটেরিয়াগুলো একটি সুশৃঙ্খল নিয়মানুসারে মৃতদেহের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করে। এর ফলে কত সময়ের মাঝে এরা এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গে পরিব্যাপ্ত হয় তা ব্যবহার করে মৃত্যুর পর কত সময় অতিবাহিত হয়েছে তা জানার একটা পথ খুলে যায়। জাভান বলেন- ‘মৃত্যুর পর দেহে থাকা ব্যাকটেরিয়ার কার্যপ্রণালী বদলে যায়। এরা হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কে প্রবেশ করে এবং এক সময় প্রজনন সম্পর্কিত অঙ্গগুলোকেও ধ্বংস করে ফেলে। একটা বিষয় পরিষ্কার যে, ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত পরিবর্তন মৃতদেহ পচনের বিভিন্ন ধাপের সাথে সম্পর্কিত।’

প্রাকৃতিক ক্ষয়

অধিকাংশ মানুষের কাছে পচা, গলিত লাশের বীভৎস দৃশ্য অনেকটা বিরক্তিকর ভয়ানক দুঃস্বপ্নের মতো। কিন্তু কিছু গবেষকের কাছে বিষয়টি এতটা বিভীষিকাময় নয়। যেমন ‘সাউথঈস্ট টেক্সাস এপ্লাইড ফরেনসিক সায়েন্স’ ফ্যাকাল্টির গবেষকদের জন্য এটা নিতান্ত মামুলি ব্যাপার। ২০১১ সালের শেষের দিকে গবেষক সিভিল রুচেলি, অ্যারন লিন আর তাদের সহকর্মীরা ফ্যাকাল্টির একটা নির্দিষ্ট স্থানে দুটি নতুন মৃতদেহ এনে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয় হবার জন্য রেখে দেন।

মৃতদেহে যখন আত্ম-পরিপাক প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং একইসাথে ব্যাকটেরিয়াও আন্ত্রিক অংশে বিস্তার করে তখনই শুরু হয় ‘পচন প্রক্রিয়া’। এটাকে বলা হয় মৃতদেহের ‘আণবিক মৃত্যু’। নরম টিস্যুর ভাঙ্গনের মাধ্যমে তরল, গ্যাস কিংবা লবণে পরিণত হওয়া ইত্যাদি- এসবই দেহের আণবিক মৃত্যুর সূচনা করে।

এ পচন প্রক্রিয়া অক্সিজেন নির্ভর এক বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সাথে সম্পর্কিত। ব্যাকটেরিয়াগুলো দেহকে খেতে শুরু করে আর দেহে থাকা চিনিজাতীয় পদার্থকে গাঁজানোর মাধ্যমে মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়াসহ বিভিন্ন গ্যাসীয় পদার্থ জমা করতে থাকে। ফলে মৃতদেহ ফুলে যায়। এ ফুলে যাওয়াকে বলা হয় ব্লোটিং (Bloating)। এর পরের ধাপে শুরু হয় বিবর্ণতা। ক্ষতিগ্রস্ত নালী থেকে নির্গত রক্তকণিকার মাঝে থাকা হিমোগ্লোবিনকে এক ধরনের অবাত ব্যাকটেরিয়া (বেঁচে থাকার জন্য যাদের অক্সিজেন অপরিহার্য নয়) সালফো-হিমোগ্লোবিনে রূপান্তরিত করে। এদের উপস্থিতির কারণেই চামড়া শক্ত, সবুজাভ-কালো বর্ণ ধারণ করে।

বিশেষ ধরনের আবাসস্থল

দেহের ভেতরে গ্যাসের চাপ বৃদ্ধির সাথে সাথে নরম এবং আলাদা হয়ে যাওয়া চামড়া ফেটে পড়ার উপক্রম হয়। এক পর্যায়ে গ্যাস এবং তরলীকৃত টিস্যু বিশোধিত হয়ে দেহের মলদ্বারসহ অন্যান্য ছিদ্রাংশ সহ অন্যান্য ছেঁড়া চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসে।‘ব্লোটিং’ বা ফুলে যাওয়াকে পচন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক এবং শেষ ধাপের মধ্যে একটি চিহ্নিত অংশ হিসেবে ধরা হয়। সাম্প্রতিক আরেক পরীক্ষায় জানা যায়, এ রূপান্তর কিছু বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত পরিবর্তন লক্ষ্য করার মাধ্যমেও চিহ্নিত করা যায়। একজন পতঙ্গবিশারদ হিসেবে বুচেলি প্রধানত পোকামাকড় কীভাবে মৃতদেহে উপনিবেশ গড়ে তুলে সে ব্যাপারে আগ্রহী। তিনি লক্ষ্য করেন, মৃতদেহ কিছু বিশেষ ধরনের নেক্রোফ্যাগাস (মড়া-ভক্ষক) পতঙ্গের আবাসভূমি। এবং এদের সমগ্র জীবনচক্র মৃতদেহকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

শূককীট চক্র

দুই প্রজাতির মাছি মৃতদেহের পচন প্রক্রিয়ার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। মৃতদেহ থেকে এক ধরনের দুর্গন্ধময় এবং একইসাথে পল্কা-মিষ্টি গন্ধ ছড়ায় যা এই মাছিগুলোকে আকৃষ্ট করে। এরা এসে মৃতদেহের উপর বসে এবং খোলা ক্ষত স্থানে ডিম পাড়া শুরু করে। প্রতিটি মাছি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে প্রায় ২৫০ টি ডিম দেয় এবং এই সময়ের মাঝে ডিম থেকে শূককীট বের হয়ে আসে। এরা পচা মাংস ভক্ষণ করে বড় শূককীটে পরিণত হয়। কয়েক ঘন্টা বাদে খোলস নির্মোচন করে আরো খাদ্য গ্রহণ করে বড় আকারের মাছিতে পরিণত হয়। এ মাছিগুলো আবার ডিম পাড়া শুরু করে এবং এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত খাবার জন্য কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকে। এ মাছিগুলোর উপস্থিতি আবার অন্যান্য শিকারী প্রাণীকে মৃতদেহের অবস্থানের নিশানা দেয়। গুবরে পোকা, পরজীবী কীট, পিঁপড়ে, বোলতা, মাকড়সা এসে মৃতদেহে ভাগ বসানো শুরু করে। শকুন এবং বাকি আবর্জনা-ভুক এবং মাংসাশী জীবও মৃতদেহ ভোজনক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সুযোগ ছাড়ে না।

প্রতিটি মৃতদেহেরই একটি অনন্য অণুজৈবনিক ভূমিকা আছে। মৃতদেহে অণুজীব-সম্প্রদায়ের গঠন, তাদের আন্তঃসম্পর্ক, পচনপ্রক্রিয়ার উপর তাদের প্রভাব ইত্যাদি ব্যাপারে আরো বিশদ ধারণা একদিন ফরেনসিক দলকে কোথায়, কীভাবে একজন মানুষ মারা গেল সে সম্পর্কে নিখুঁতভাবে জানতে সাহায্য করবে।

মৃতদেহের ডিএনএ সিকুয়েন্সিং কিংবা এতে লেগে থাকা মাটির ধরণ অপরাধ তদন্তকারীদের অপরাধস্থলের ভৌগোলিক অবস্থান, সূত্র খোঁজার এলাকা কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যাপারে সহায়তা করে।

উন্নত-উর্বর মাটি

মানবদেহ প্রায় ৫০-৭৫% পানি দিয়ে গঠিত। শুষ্ক দেহের প্রতি কেজি হতে প্রায় ৩২ গ্রাম নাইট্রোজেন, ১০ গ্রাম ফসফরাস, ৪ গ্রাম পটাশিয়াম আর ১ গ্রাম ম্যাগনেসিয়াম মাটিতে মুক্ত হয়। প্রথমদিকে এ কারণে মাটির উপরিভাগের কিছু ছোট গাছপালা মরে যায়। নাইট্রোজেনের বিষাক্ততা কিংবা দেহনির্গত এন্টিবায়োটিক পদার্থের জন্য এমনটি হয়ে থাকতে পারে। তবে সব মিলিয়ে মৃতদেহের জৈবিক রূপান্তর মাটিকে করে তোলে উন্নত আর উর্বর। পাশাপাশি এ পচনপ্রক্রিয়া চারপাশের পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের জন্যও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া কবরের মাটি পরীক্ষা করে মৃত্যুর সময় বের করার একটা সম্ভাব্য উপায় আছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। পচন প্রক্রিয়ার ফলে মৃতদেহে সংঘটিত রাসায়নিক পরিবর্তন সম্পর্কিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, লাশ থেকে নির্গত লিপিড-ফসফরাস ৪০ দিন পর্যন্ত মাটির সাথে মিশতে থাকে যেখানে নাইট্রোজেন আর পৃথকযোগ্য ফসফরাস সময় নেয় প্রায় ৭২ থেকে ১০০ দিন। এ প্রক্রিয়ার আরো গভীর বিশ্লেষণ এবং কবরের মাটির বায়োরাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে হয়তো একদিন বের করা যাবে কতদিন আগে কোনো দেহকে মাটিতে কবরস্থ করা হয়েছে।

চিত্রঃ মৃতদেহের বিভিন্ন খনিজ পদার্থ মাটিকে জৈবশক্তি সম্পন্ন করে তোলে।

বলে রাখা ভালো, মমিকৃত লাশও একসময় পচনের শিকার হয়। কিন্তু এটা নির্ভর করে ঠিক কখন কোন পদ্ধতিতে মৃতদেহটিকে মমিকরণ করা হয়েছে তার উপর। তাছাড়া কফিনের ধরণ, কবর দেয়ার প্রক্রিয়ার উপরও মমিকৃত লাশের পচনের সময়সীমা নির্ভর করে।

আমাদের শরীরকে বলা যায় শক্তির এক আঁধার। যে শক্তি দেহের মধ্যে আটকা পড়ে অপেক্ষা করছে কখন মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। জীবিত অবস্থায় আমাদের শরীর তার অগণিত অণু-পরমাণুতে এ শক্তি ধরে রেখে স্থিতিশক্তি হিসেবে ব্যয় করে। এভাবেই দেহ নিজেকে শক্তির সাহায্যে প্রতিনিয়ত সচল রাখে।

তাপগতিবিদ্যার সূত্রানুসারে, শক্তি সৃষ্টি হয় না আবার ধ্বংসও হয় না। কেবল এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত হয় মাত্র। মহাবিশ্বে মোট মুক্ত শক্তির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অন্যভাবে বলা যায়, বস্তু প্রতিনিয়ত ভেঙ্গে পড়ছে আর তাদের ভর রূপান্তরিত হচ্ছে শক্তিতে। মৃতদেহের পচনপ্রক্রিয়া যখন চুড়ান্তরূপ ধারণ করে তখন এটা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্বের সকল পদার্থই এই মৌলিক

আইন অনুসরণ করে চলে। আমাদের শরীর নশ্বর; পচনের মাধ্যমে এটা চারপাশের বস্তুজগতের সাথে ভারসাম্য তৈরি করে এবং অন্যান্য জীবিত প্রাণীর বেঁচে থাকায় সহায়তা করার জন্য পরিণত হতে থাকে শক্তিতে। যে শক্তি ছড়িয়ে পড়ে ছাই থেকে ছাইয়ে, ধূলা থেকে ধূলাতে।

(মোজাইক সায়েন্স, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি ফিউচার-সহ বিভিন্ন বিখ্যাত অনলাইন পত্রিকাতে প্রকাশিত মোহেব কস্ট্যান্ডির প্রবন্ধ ‘This is what happens after you die’ এর সংক্ষেপিত বঙ্গানুবাদ)

খাবার কেন পচে?

খাদ্য যে খাওয়ার অযোগ্য বা নষ্ট হয়ে গেছে তা খাবারের বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ প্রভৃতি দেখে সহজেই আঁচ করা যায়। কোনো খাবার তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়, কোনোটা আবার অনেকদিন ভালো থাকে। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই ঘটে। কেন হচ্ছে এরকম পচনশীলতার তারতম্য? বুঝতে হলে চিনতে হবে সৃষ্টির সেই অংশকে যাদের একটি বড় অংশ আমাদের খালি চোখে সাধারণত দৃশ্যমান নয়।

বিভিন্ন অণুজীব খাবার নষ্টের জন্য দায়ী। খাবারে যেসব পুষ্টি উপাদান থাকে এরা সেগুলোকে ভেঙ্গে ফেলে ছোট ছোট অংশে। এসব খাবারের ক্ষুদ্রাংশ সহজেই তাদের কোষ প্রাচীরের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারে। এতে খাবারের স্বাভাবিক গঠন আর আগের মতো থাকে না। এ প্রক্রিয়ার ফলে যেসব উপজাত তৈরি হয় সেগুলোই মূলত দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে এবং খাবারকে বিস্বাদ করে একেবারেই খাওয়ার অনুপযোগী করে তোলে।

অণুজীবগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক (ঈস্ট, মোল্ড) ইত্যাদি। খাবারে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে মোল্ড। মোল্ডের সূক্ষ্ম শাখাতন্তু হাইফির বর্ধিষ্ণু অগ্রভাগে একপ্রকার এনজাইম তৈরি হয় যা সেলুলোজ বা স্টার্চ এর মতো মজবুত অণুকে ভেঙ্গে কম মজবুত নরম পদার্থে রূপান্তর করে। খাবারের গায়ে বা ওপরে যে দাগ এবং স্তর দেখা যায় তা প্রকৃতপক্ষে জালের মতো পরষ্পর সংযুক্ত বৃহৎ হাইফি কলোনি, যা খাদ্য দ্রব্যের পৃষ্ঠদেশের উপরে থেকে বেড়ে চলে।

ঈস্ট এবং ব্যাকটেরিয়াও খাবার নষ্টের ব্যপারে কম যায় না। খাবারের বারোটা বাজাতে ঈস্ট বেছে নেয় গাঁজন প্রক্রিয়া। আচারের উপর আমরা যে শুকনো স্তর জমতে দেখি তা মহামান্য ঈস্টেরই কাণ্ড। বিভিন্ন স্পোর এবং নন-স্পোর গঠনকারী ব্যাকটেরিয়াও খাদ্যকে অখাদ্য বানাতে কম ভূমিকা রাখে না।

কিছু কিছু খাবার যেমন- দুধ, মাংস, মাছ প্রভৃতি খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। আবার কিছু কিছু ফল, শস্য এবং সবজি অনেকদিন ভালো থাকে। এর কারণ হলো অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য পূরণ হওয়া চাই কিছু শর্ত- সঠিক তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, অক্সিজেনের উপস্থিতি, পুষ্টি, খাদ্যদ্রব্যের ভেদ্যতা ইত্যাদি। ৪০-১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য অনুকূল। কিছু কিছু ফল বা সবজির বহিরাবরণ অণুজীবের জন্য দুর্ভেদ্য। তাই সেগুলো দেরিতে পচে। আবার খাবারে পানির পরিমাণ বেশি হলে সেটি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। কেননা এ পানিকে অণুজীব তাদের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার রসদ হিসেবে ব্যবহার করে।

শুকনো শস্য বা খাবারে পানি কম থাকায় সেটি অনেক দিন ভালো থাকে। অনুরূপভাবে অক্সিজেনের উপস্থিতি পচনকে ত্বরান্বিত করে। শুষ্ক ফল ও উচ্চমাত্রায় চিনি বা লবণযুক্ত খাবার অনেকদিন ভালো থাকে। কেননা শুষ্ক ফলে পানি খুবই কম থাকে আর উচ্চমাত্রার চিনি, এসিড কিংবা লবণযুক্ত খাবারে অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় অণুজীবের কোষ ধ্বংস হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করার কারণেই ৫ হাজার বছর পুরনো মিশরীয় ফারাওয়ের পিরামিড থেকে আবিষ্কৃত মধু অদ্যাবধি অক্ষত আছে!

খাবার পচানোর একচ্ছত্র অধিপতি কিন্তু অণুজীব নয়, খাদ্যের ভেতরের এনজাইমসমূহের নানা কার্যক্ষমতাও খাবার পচাতে ভূমিকা রাখে। যেমন- কলা কেটে রাখলে তার সাথে বাতাসের অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় তৈরি হয় মেলানিন, যা কলার গায়ে বাদামী রঙ সৃষ্টির জন্য দায়ী। আপেল কুচির বাদামী হয়ে যাওয়ার নেপথ্যেও রয়েছে অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া।

এতক্ষণে কি দুষতে শুরু করেছেন ‘খলনায়ক’ অণুজীবদের? এই বেলা অণুজীবদের নায়কোচিত অবদানের কথা দিয়ে শেষ করছি। অণুজীবগুলোর মহান কীর্তিকলাপে খাবার নষ্ট হলেও এই অণুজীব ব্যবহার করেই তৈরি করা যায় সুস্বাদু সব খাবার। দই থেকে শুরু করে সয়া সস কিংবা মুখরোচক পনির থেকে শুরু করে দামি ওয়াইন, বিয়ার সবই তৈরি হয় অণুজীবের সাহায্যে। সুস্বাদু বেকারী পণ্য থেকে শুরু করে জিভে জল আনা চকলেট তৈরিতেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

তথ্যসূত্র

১। https://www.leaf.tv/articles/how-does-food-decompose/

২। http://www.wonderpolis.org/wonder/why-does-food-rot/

৩। https://www.reference.com/food/food-rot-b4d00189173c0c70

৪। http://www.eng.buffalo.edu/shaw/student/m2_design/01_home/ksb/ KSB_S2/old_FoodSpoilage.htm

সোঁদা মাটির মন মাতানো গন্ধের উৎস

অনেকেই বৃষ্টির গন্ধ পছন্দ করে। বৃষ্টির মিষ্টি গন্ধ অনেকের কাছে সজীবতা, পরিচ্ছন্নতা বা আর্দ্রতার প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়। কিন্ত পানির তো নিজস্ব কোনো গন্ধ নেই, তাহলে এই ভেজা সুগন্ধটি কোথা থেকে আসে?

বৃষ্টির গন্ধের একটি সুন্দর বৈজ্ঞানিক নাম আছে- পেট্রিকোর (petrichor)। ১৯৬৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ এর দুই গবেষক ইসাবেল জয় বেয়ার এবং রিচার্ড জি. থমাস নেচার পত্রিকায় বৃষ্টির গন্ধ নিয়ে তাঁদের গবেষণা প্রবন্ধ Nature of Argillaceous Odor লেখার সময় এই নামটি প্রদান করেন। এর বাংলা করলে দাঁড়াবে ‘মৃন্ময় গন্ধের প্রকৃতি’। এই শব্দটি গ্রীক petra (বা পাথর) আর ichor (গ্রীক দেবতাদের শরীরে রক্তের মতো যে পদার্থ প্রবাহিত হয়) এর সমন্বয়ে তৈরি।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, যদিও বৃষ্টির গন্ধের মাঝে আমরা একটি সজীব পরিচ্ছন্ন ভাব খুঁজে পাই, কিন্ত এই গন্ধ আসলে মাটির ধুলা-ময়লা আর পাথর থেকে তৈরি হয়। অবশ্য পাথর নিজেও এই গন্ধের উৎস নয়, পাথর এখানে গন্ধের বাহক হিসেবে ভূমিকা রাখে। এই গন্ধের পেছনে দায়ী যৌগগুলো আসে প্রধানত বিভিন্ন গাছপালা থেকে। সাধারণত শুষ্ক আবহাওয়ায় বিশেষ করে যখন দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টি হয় না, তখন কিছু উদ্ভিদ উদ্বায়ী ফ্যাটি এসিডে সমৃদ্ধ তেল মাটিতে নিঃসরণ করে। এই ফ্যাটি এসিডগুলোর কয়েকটি আমাদের বেশ পরিচিত। এদের কোনো কোনোটি যেমন পামিটিক বা স্টিয়ারিক এসিড আমাদের খাবারে পাওয়া যায়।

অবশ্য, এই তেলের সব উপাদান এখনো পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি। ১৯৭০ এর দশকে বিজ্ঞানী ন্যান্সি এন. জার্বার এই তেল থেকে ‘২-আইসোপ্রোপাইল-৩-মিথোক্সি পাইরাজিন’ পৃথক করেন। এই যৌগটির বেশ তীব্র ‘বৃষ্টির মতো’ গন্ধ আছে।

২-আইসোপ্রোপাইল-৩-মিথোক্সি পাইরাজিন

শুষ্ক আবহাওয়ায় মাটিতে পানির পরিমাণ যখন খুব কমে যায়, তখন কিছু গাছপালা টিকে থাকার জন্য এই তেল নিঃসরণ করে। সময়ের সাথে সাথে মাটি এবং পাথরে তেল জমতে থাকে। এমন অবস্থায় বৃষ্টি হলে সেগুলো মাটি থেকে বাতাসে ব্যাপিত হয়ে ভেঙে সুগন্ধি উদ্বায়ী যৌগ তৈরি করে। ফলে আমরা সেই সজীব, উদ্ভিজ্জ আর সবমিলিয়ে সুন্দর গন্ধটি পাই।

জিওস্মিন

কিন্ত এই সুগন্ধি উদ্ভিজ্জাত তেল অবশ্য বৃষ্টির গন্ধের একমাত্র উপাদান নয়। পেট্রিকোরের আরেকটি বড় উপাদান হচ্ছে জিওস্মিন (geosmin) নামের একটি যৌগ। গ্রীক ভাষায় জিওস্মিন শব্দের অর্থ ‘পৃথিবীর গন্ধ’। মাটিতে থাকা কিছু ব্যাকটেরিয়া (যেমন একটিনোব্যাকটেরিয়া) এই যৌগটি উৎপাদন করে আর এই যৌগটিই মাটির নিজস্ব গন্ধের জন্য দায়ী। মানুষের নাক এই যৌগের গন্ধে খুবই সংবেদনশীল, বাতাসে এর পরিমাণ প্রতি ট্রিলিয়নে ৫ ভাগ, অর্থাৎ প্রতি কেজি বাতাসে মাত্র ৫ ন্যানোগ্রাম (৫ × ১০-৯ গ্রাম) থাকলেই মানুষের নাক তা শনাক্ত করতে পারে।

রসায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে জিওস্মিন যৌগটি আসলে একধরনের অ্যালকোহল। এতে –OH গ্রুপ উপস্থিত আছে। জিওস্মিন আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। কিন্ত ওয়াইনে এই যৌগের উপস্থিতি ওয়াইনের স্বাদে কিছুটা ‘স্যাঁতসেঁতে’ ভাব এনে দেয় যা তার গুনাগুণ বা গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। একইভাবে, পানিতে এই যৌগ উপস্থিত থাকলে পানির স্বাদ ‘কর্দমাক্ত’ হয়ে যায়, যা ঐ পানির পানযোগ্যতা কমিয়ে দেয়।

মাটিতে উপস্থিত কিছু ব্যাকটেরিয়া মারা গেলে বা সুপ্তাবস্থায় যাবার সময় মাটিতে জিওস্মিন নিঃসরণ করে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে খরা চললে এই নিঃসরণের হার আরো বেড়ে যায়। এরপর যখন বৃষ্টি হয় তখন এই যৌগটি মাটি থেকে নির্গত হয়ে মিহি কুয়াশার মতো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

চিত্রঃ বৃষ্টির মন মাতানো গন্ধ আসলে মাটির গন্ধ।

যেহেতু দীর্ঘদিন খরা চললে মাটিতে এসব যৌগের ঘনত্ব বেড়ে যেতে থাকে, তাই অনেকদিন পর বৃষ্টি হলে এর গন্ধও তীব্র হয়। বৃষ্টির গন্ধের আরো একটি উৎস বাকি আছে, যার গন্ধ আমরা এমনকি বৃষ্টি শুরু হবার আগে থেকেই পাওয়া শুরু করি। এটি হচ্ছে ওজোন গ্যাস। এর গন্ধ এতোই আলাদা যে এর নাম থেকেই তা অনুমান করা যাবে। এর নাম এসেছে গ্রীক শব্দ Ozein থেকে, যার অর্থ To smell।

বাতাসে বিদ্যুৎক্ষরণ ঘটালে ঝাঁঝালো গন্ধের এই ওজোন গ্যাস তৈরি হয়

3O2 (g) → 2O3 (g)

উল্লেখ্য, জিওস্মিনের মতো মানুষের নাক ওজোনের গন্ধের প্রতিও খুবই সংবেদনশী। বাতাসে এর পরিমাণ প্রতি বিলিয়নে মাত্র ১০ ভাগ হলেই অর্থাৎ প্রতি কেজি বাতাসে ওজোন গ্যাসের পরিমাণ মাত্র ১০ মাইক্রোগ্রাম থাকলেই আমরা যৌগটির গন্ধ শনাক্ত করতে পারি।

বজ্র-বৃষ্টির সময় বজ্রপাতের বিদ্যুৎ বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন গ্যাসের অণুকে ভেঙে ফেলে। কিছু পরিমাণ নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন একত্রে যুক্ত হয়ে নাইট্রিক অক্সাইড (NO) তৈরি করে। এই নাইট্রিক অক্সাইড পরে বায়ুমণ্ডলের অন্যান্য যৌগের সাথে বিক্রিয়া করে ওজোন গ্যাস উৎপন্ন করে।এই গ্যাস পরে নিম্নমুখী বাতাসে ভেসে আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়। আর আমরা এর গন্ধ পেয়ে বৃষ্টি হবার আগেই বুঝতে পারি যে কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি হবে।

মানুষের গন্ধের ইন্দ্রিয় কয়েক ট্রিলিয়ন পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন গন্ধ শনাক্ত করতে পারে। এর অনেক গন্ধই আমাদের স্মৃতিতে জমা হয়ে যায়। যেমন আপনার মায়ের গায়ের ঘ্রাণ, আপনার প্রথম পোষা প্রাণীটির ঘ্রাণ, অথবা বৃষ্টির এই গন্ধ (পেট্রিকোর) ইত্যাদি।

চিত্রঃ মানুষের ইন্দ্রিয় কয়েক ট্রিলিয়ন পরিমাণ গন্ধ শনাক্ত করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পেট্রিকোর পুরনো স্মৃতি জাগিয়ে দিয়ে আমাদের শুধু আনমনাই করে না, এটি অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রাণীর জীবনচক্রেও ভূমিকা রাখে। যেমন, কোনো কোনো জীববিজ্ঞানী ধারণা করেন, জলপথে পেট্রিকোর ছড়িয়ে পড়লে তা মিঠাপানির মাছদের ডিম পাড়ার সংকেত দেয়। যেমন আমরা জানি প্রতিবছর হালদা নদীতে একটি বিশেষ মূহুর্তে ও বিশেষ পরিবেশে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউস ও কার্প জাতীয় মাছ প্রচুর পরিমাণ ডিম ছাড়ে। মা মাছেরা এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত শুধু অমাবস্যা বা পূর্ণিমার তিথিতে অনুকূল পরিবেশে ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার এই বিশেষ সময়কে স্থানীয়রা ‘জো’ বলে।

জো হবার জন্য অমাবস্যা বা পূর্ণিমা হবার সাথে সাথে প্রচণ্ড বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হতে হয়। অর্থাৎ হালদা নদীতে মাছের ডিম পাড়ার সময় বৃষ্টির গন্ধের ভূমিকা থাকতে পারে, যা ঐ জীববিজ্ঞানীদের সন্দেহকেই সমর্থন করে। আবার ইংল্যান্ডের জন ইনস সেন্টারের অণুজীববিজ্ঞানী কিথ চেটার প্রস্তাব করেন, জিওস্মিনের গন্ধ হয়তো মরুভূমিতে উটকে মরূদ্যান খুঁজে পেতে সংকেতের মতো কাজ করে।

সেই হিসেবে বৃষ্টির এই গন্ধ কি মানুষের জীবনযাত্রাতেও এভাবে প্রভাব রাখে? অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ডানা ইয়াং অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমির আদিবাসীদের উপরে গবেষণা চালিয়ে দেখতে পান এই সম্প্রদায়ের কাছে শীতকাল আর গ্রীষ্মকালের প্রথম বৃষ্টির গুরুত্ব অনেক। এই বৃষ্টির ফলে ক্যাঙ্গারু আর ইমু প্রাণীদের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং মরুভূমিতে গাছপালা জন্মে সবুজ ভূপ্রকৃতির সৃষ্টি হয়। ইয়াং বলেন, এই জনগোষ্ঠীর কাছে বৃষ্টির গন্ধ তাই ‘সবুজ রঙ’য়ের সাথে সম্পর্কিত।

এখানের আলোচনার সারকথা হলো উদ্ভিজ্জাত তেল, ব্যাকটেরিয়া ও ওজোন গ্যাসের সমন্বয়ে পেট্রিকোর গঠিত। কিন্ত পেট্রিকোরের গন্ধ মাটি থেকে আমাদের নাকে এসে পৌঁছায় কেমন করে?

২০১৫ সালে এম.আই.টি’র বিজ্ঞানীরা হাই স্পিড ক্যামেরা (প্রতি সেকেন্ডে ২৫০ বা ১০০০ এর উপরে ফ্রেম ধারণ করতে পারে) ব্যবহার করে বাতাসে সুগন্ধের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য গবেষণা চালান। এই গবেষণায় প্রায় ২৮ টি ভিন্ন ভিন্ন পৃষ্ঠতল, ১২ টি কৃত্রিম পৃষ্ঠতল এবং ১৬ টি মাটির নমুনার উপরে ৬০০ টি পরীক্ষা চালানো হয়।

আবার বিভিন্ন ধরনের বৃষ্টির জন্য সুগন্ধের চলাচল পর্যবেক্ষণ করেন। বৃষ্টির পানি যত উপর থেকে ফেলা হয় মাটিতে পড়ার আগে তার গতি তত বেশি হয়। এতে দেখা যায়, যখন বৃষ্টির ফোঁটা কোনো সচ্ছিদ্র পৃষ্ঠতলের (যেমন মাটি) উপরে এসে পড়ে, তখন ছিদ্রের বাতাসের সাথে মিশে বুদবুদ তৈরি হয়। বুদবুদে করে সুগন্ধের পাশাপাশি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া এরোসল আকারে বাতাসে নিঃসৃত হয়। এ পরীক্ষায় আরো দেখা যায়, বৃষ্টির ফোঁটার গতি কম হলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া এরোসলের পরিমাণ বেড়ে যায় কারণ গতি বেশি হলে বুদবুদ তৈরি হবার সময় হয় না। এ কারণেই হাল্কা বৃষ্টির পরে পেট্রিকোরের তীব্রতা বেশি থাকে।

কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন আমাদের পূর্বপুরুষদের টিকে থাকার জন্য বৃষ্টির উপরে নির্ভর করতে হতো, যার কারণে আমাদের কাছে বৃষ্টির গন্ধ এতো ভাল লাগে।

বিজ্ঞানীরা এখনো কৃত্রিমভাবে পেট্রিকোর তৈরির উপায় বের করতে পারেননি। কারণ এর রাসয়নিক গঠন এত জটিল আর এর কিছু উপাদান এত অল্প পরিমাণে থাকে যে আমাদের নাক তা শনাক্ত করতে পারলেও কোনো মেশিন তা আলাদা করতে পারে না। তাই এই মিষ্টি সুবাস বোতলজাত অবস্থায় বাজারে থরে থরে সাজানো অবস্থায় দেখা যায় না। বাজারে সজ্জিত দেখতে হলে আরো বেশ কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।

এর পর থেকে যখন বৃষ্টি উপভোগ করবেন, তখন আপনাকে আনমনা করে দেওয়া ঐ বৃষ্টির গন্ধের জন্য এর পেছনের রসায়নকেও একটা ধন্যবাদ দিতে ভুলবেন না।

তথ্যসূত্র

  1. https://youtube.com/watch?v=PDrElHWBT6A
  2. http://winespectator.com/drvinny/show/id/5453
  3. http://winespectator.com/drvinny/show/id/5453
  4. Section 21.5 Oxygen and Sulfur, Subsection: Ozone (Page 916) Chemistry (Ninth Edition) Raymond Chang
  5. https://youtube.com/watch?v=K8_05IpT7cA
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Petrichor
  7. https://youtube.com/watch?v=DyFm-UQ5-ag
  8. http://climatecentral.org/news/thunderstorms-ozone-atmosphere-18600
  9. http://huffingtonpost.com/2012/07/19/rain-smells-approaching-storm_n_html
  10. http://smithsonianmag.com/science-nature/what-makes-rain-smell-so-good-13806085/
  11. http://todayifoundout.com/index.php/2014/05/causes-smell-rain/

কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের কারসাজি

পৃথিবীপৃষ্ঠে বসিয়ে রাখা একটি রকেট নিয়ে চিন্তা করতে করতেই কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের প্রভাব বুঝে ফেলা যায়। কিছুক্ষণ পরেই তা করতে যাচ্ছি আমরা। তবে তার আগে কিছু কথা বলে রাখা জরুরী।

এরিস্টটল মনে করতেন, স্থান ও কাল দুটোই পরম। কোনো ঘটনা কোথায় এবং কখন ঘটেছে সে সম্পর্কে সকল পর্যবেক্ষক একমত হবেন। নিউটন এসে পরম স্থানের ধারণাকে বিদায় জানিয়ে দেন। পরবর্তীতে আইনস্টাইন এসে বিদায় দেন পরম সময়কেও। তবে পরম সময়ের কফিনে মাত্র একটি পেরেক ঠুকে তার মন ভরেনি। ১৯০৫ সালে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রকাশ করে বলেছিলেন, আলোর কাছাকাছি বেগে গতিশীল অভিযাত্রীর সময় চলবে তুলনামূলকভাবে অনেক ধীরে। ১৯১৫ সালে তিনি প্রকাশ করেন আরো যুগান্তকারী একটি তত্ত্ব। এটিই হলো মহাকর্ষের সর্বাধুনিক তত্ত্ব যাকে বলা হয় সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General theory of relativity)। অবশ্য উচ্চ গতির মতো মহাকর্ষও যে কাল দীর্ঘায়ন ঘটাতে সক্ষম তা তিনি ১৯০৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধেই অনুমান করেন।

আপেক্ষিক তত্ত্বের দুই রূপেই একটি করে মৌলিক নীতি মেনে চলা হয়। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে সেটি হলো আপেক্ষিকতার মৌলিক স্বীকার্য। এর বক্তব্য হলো- মুক্তভাবে গতিশীল সকল পর্যবেক্ষকের কাছে বিজ্ঞানের সূত্রগুলো একই থাকবে। বেগ যাই হোক তাতে কিছু আসে যায় না। এখানে ত্বরণ সম্পর্কে কিছু বলা হয় না। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের মৌলিক নীতিটি হলো সমতুল্যতার নীতি (Principle of equivalence)। এ নীতির বক্তব্য হলো- যথেষ্ট ক্ষুদ্র স্থানের অঞ্চলে অবস্থান করে এটি বলা সম্ভব নয় যে, আপনি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছেন, নাকি শূন্য স্থানে সুষম হারের ত্বরণ নিয়ে চলছেন।

এই গুরুগম্ভীর কথাটি বুঝতে অসুবিধা হলে সমস্যা নেই। বরং চলুন একটি উদাহরণ দেখি। মনে করুন, আপনি মহাশূন্যের মধ্যে এমন একটি লিফটে আছেন, যেখানে মহাকর্ষ বল অনুপস্থিত। ফলে এখানে উপর

বা নিচ বলতে কিছু নেই। আপনি মুক্তভাবে ভেসে আছেন। একটু পর লিফটটি সমত্বরণে চলা শুরু করলো। এখন কিন্তু হঠাৎ করে আপনি ওজন অনুভব করবেন। লিফটের এক প্রান্তের দিকে একটি টান অনুভব করবেন। এখন এ দিকটিকেই আপনার কাছে মেঝে বলে মনে হবে!

এখন হাত থেকে একটি আপেল ছেড়ে দিলে এটি মেঝের দিকে চলে যাবে। আসলে এখন আপনার মতোই লিফটের ভেতরের সব কিছুর ত্বরণ হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন আসলে লিফটটি মোটেই গতিশীল নয়, বরং এটি একটি সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছে। আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন যে, ট্রেনের ভেতরে বসে যেমন আপনি বলতে পারেন না যে আপনি সমবেগে চলছেন নাকি চলছেন না, তেমনি লিফটের ভেতরে বসেও আপনি বুঝতে পারবেন না আপনি সুষম ত্বরণে চলছেন, নাকি কোনো সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্যে আছেন। আইনস্টাইনের এ চিন্তার ফলাফলই হলো সমতুল্যতার নীতি।

সমতুল্যতার নীতি এবং এর উপরের উদাহরণটি সত্য হলে বস্তুর জড় ভর ও মহাকর্ষীয় ভরকে অবশ্যই একই জিনিস হতে হবে। বল প্রয়োগের ফলে কতটুকু ত্বরণ হবে তা নির্ভর করে জড় ভরের ওপর। এই ভর নিয়েই বলা হয়েছে নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্রে। অন্য দিকে মহাকর্ষীয় ভরের কথা আছে নিউটনের মহাকর্ষীয় সূত্রে। আপনি কতটুকু মহাকর্ষীয় বল অনুভব করবেন তা নির্ভর করে এ ভরের ওপর।

সমতুল্যতার নীতি জানলাম। আইনস্টাইনের যুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবার একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। থট এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে যে পরীক্ষা বাস্তবে করা যায় না, চিন্তা করে করে বুঝতে হয়। এখানের থট এক্সপেরিমেন্ট বা চিন্তন পরীক্ষা আমাদেরকে দেখাবে মহাকর্ষ সময়কে কীভাবে প্রভাবিত করে।

মহাশূন্যে অবস্থিত একটি রকেটের কথা চিন্তা করুন। সুবিধার জন্যে মনে করুন রকেটটি এত বড় যে এর শীর্ষ থেকে তলায় আলো পৌঁছতে এক সেকেন্ড লাগে, অর্থাৎ এর দৈর্ঘ্য ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। আরো মনে করুন, রকেটের সিলিং ও মেঝেতে একজন করে দর্শক আছেন। দুজনের কাছেই অবিকল একই রকম একটি করে ঘড়ি আছে যা প্রতি সেকেন্ডে একটি করে টিক দেয়।

মনে করুন, সিলিংয়ের দর্শক ঘড়ির টিকের অপেক্ষায় আছেন। টিক পেয়েই তিনি মেঝের দর্শকের দিকে একটি আলোক সঙ্কেত পাঠালেন। পরে ঘড়িটি আবারো টিক দিলে তিনি আরেকটি সঙ্কেত পাঠালেন। এ অবস্থায় প্রতিটি সঙ্কেত এক সেকেন্ড পর মেঝের দর্শকের কাছে পৌঁছায়। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যাবধানে দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত দুটি পাবে।

মহাশূন্যে মুক্তভাবে ভেসে না চলে রকেটটি যদি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানের মধ্যে থাকতো তাহলে কী ঘটতো? নিউটনীয় তত্ত্বানুযায়ী এ ঘটনায় মহাকর্ষের কোনো হাত নেই। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের মধ্যেই তা পাবেন। কিন্তু সমতুল্যতার নীতি ভিন্ন কথা বলে। চলুন দেখা যাক নীতিটি কাজে লাগিয়ে আমরা মহাকর্ষের বদলে সুষম ত্বরণ নিয়ে চিন্তা করে কী পাই। নিজের মহাকর্ষ থিওরি তৈরি করতে আইনস্টাইন সমতুল্যতা নীতিকে যেভাবে কাজে লাগিয়েছেন এটি হলো তার একটি উদাহরণ।

মনে করুন রকেটটি ত্বরণ নিয়ে চলছে। অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তে এর বেগ বেড়ে যাচ্ছে। আমরা আপাতত ধরে নিচ্ছি এর ত্বরণের মান ক্ষুদ্র, তা না হলে এটি আবার একসময় আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে! রকেটটি উপরের দিকে গতিশীল বলে প্রথম সঙ্কেতটিকে আগের চেয়ে (যখন রকেট স্থির ছিল) কম দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। কাজেই সঙ্কেতটি এখন এক সেকেন্ড পার হবার আগেই নীচে পৌঁছে যাবে। রকেটটি যদি নির্দিষ্ট বেগে (ত্বরণহীন) চলতো, তাহলে আগে-পরের সব সঙ্কেত এক সেকেন্ড পরপরই পৌঁছাতো। কিন্তু এখানে ত্বরণ আছে বলে দ্বিতীয় সঙ্কেতকে আরো কম দূরত্ব পার হতে হবে। ফলে এটি পৌঁছতেও আরো কম সময় লাগবে। কাজেই মেঝের দর্শক দুই সঙ্কেতের মাঝে সময় ব্যাবধান পাবেন এক সেকেন্ডের চেয়ে কম। অথচ সিলিং-এর দর্শক তা পাঠিয়েছেন ঠিক এক সেকেন্ড পরে। হয়ে গেলো সময়ের গরমিল।

ত্বরণপ্রাপ্ত রকেটের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটা নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে না। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে যে, সমতুল্যতার নীতি বলছে রকেটটি যদি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রেও স্থির থাকে তবু একই ঘটনা ঘটবে। অর্থাৎ রকেটটি যদি ত্বরণপ্রাপ্ত না-ও হয় (যেমন ধরুন এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে উৎক্ষেপণের জন্যে বসিয়ে রাখা আছে) তাহলেও সিলিং এর দর্শক এক সেকেন্ড পর দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শক তা পাবেন এক সেকেন্ডের কম সময়ের মধ্যেই। এবার অদ্ভুত লাগছে, তাই না!

হয়তো মাথায় প্রশ্ন আসবে, এর অর্থ তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে- মহাকর্ষ কি সময়কে বিকৃত করছে, নাকি ঘড়িকে অচল করে দিচ্ছে? ধরুন, মেঝের দর্শক উপরে উঠে সিলিংয়ের দর্শকের সাথে ঘড়ি মিলিয়ে নিলো। দেখা গেলো দুটো ঘড়ি অবিকল একই রকম। তারা এটিও নিশ্চিত যে, দুজনে এক সেকেন্ড বলতে সমান পরিমাণ সময়কেই বোঝেন। মেঝের দর্শকের ঘড়িতে কোনো ঝামেলা নেই। এটি যেখানেই থাকুক, তা তার স্থানীয় সময়ের প্রবাহই মাপবে। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব আমাদের বলছে, ভিন্ন বেগে চলা দর্শকের জন্য সময় ভিন্ন গতিতে চলে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব বলছে, একই মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের গতি আলাদা। সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বানুসারে, মেঝের দর্শক এক সেকেন্ডের চেয়ে কম সময় পেয়েছেন, কারণ পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছে সময় অপেক্ষাকৃত ধীরে চলে। মহাকর্ষ ক্ষেত্র শক্তিশালী হলে এ প্রভাবও হবে বেশি। নিউটনের গতি সূত্রের মাধ্যমে বিদায় নিয়েছিল পরম স্থানের ধারণা। এবার আপেক্ষিক তত্ত্ব পরম সময়কেও বিদায় জানিয়ে দিলো।

১৯৬২ সালে এই অনুমান একটি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। একটি ওয়াটার টাওয়ারের উপরে ও নীচে দুটি অতি সূক্ষ্ম ঘড়ি বসানো হয়। দেখা গেল নীচের ঘড়িটিতে (যেটি পৃথিবীর পৃষ্ঠের বেশি কাছে আছে) সময় ধীরে চলছে, ঠিক সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব যেমনটি অনুমান করেছিল তেমনই। এ প্রভাব খুব ক্ষুদ্র। সূর্যের পৃষ্ঠে রাখা কোনো ঘড়িও পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় মাত্র এক মিনিট পার্থক্য দেখাবে। কিন্তু পৃথিবীর উপরের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের এ ক্ষুদ্র পার্থক্যই বর্তমানে বাস্তব ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্যাটেলাইট থেকে আসা সঙ্কেতের মাধ্যমে আমাদের নেভিগেশন সিস্টেমকে ঠিক রাখার জন্যে এর প্রয়োজন হয়। এ প্রভাব উপেক্ষা করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অবস্থান বের করলে ভুল হয়ে যাবে কয়েক মাইল!

সময়ের প্রবাহের পার্থক্য ধরা পড়ে আমাদের শরীরেও। এমন এক জোড়া যমজের কথা চিন্তা করুন, যাদের একজন বাস করছে পাহাড়ের চূড়ায় এবং আরেকজন সমুদ্র সমতলে। প্রথম জনের বয়স অপরজনের চেয়ে দ্রুত বাড়বে। দুজনে আবার দেখা করলে দেখা যাবে একজনের বয়স আরেকজনের চেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য যদিও খুব ক্ষুদ্র হবে, কিন্তু তারপরেও এটি একটি পার্থক্য। অন্যদিকে এদের একজন যদি আলোর কাছাকাছি গতিতে মহাকাশযানে করে দীর্ঘ ভ্রমণ করে ফিরে আসে তাহলে দেখা যাবে যমজের চেয়ে তার বয়স অনেক বেশি পরিমাণে কম হচ্ছে।

বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে পৃথিবী থেকে দূরে গিয়ে অনেক বেশি বেগে ভ্রমণ করে এলে আপনার বয়স অপেক্ষাকৃত কম হবে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বে আপনি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে দূরে অবস্থান করলে বয়স

দ্রুত বাড়বে। একটি প্রভাব আপাত দৃষ্টিতে আরেকটি থেকে উল্টোভাবে কাজ করে। অবশ্য বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব কার্যকর হবার জন্যে আপনাকে রকেটে চড়ে মহাশূন্যেই যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি যদি পৃথিবীতেই একটি অসম্ভব দ্রুতগামী ট্রেনে চড়েও ভ্রমণ করেন, তবু ট্রেনের বাইরে থাকা আপনার বন্ধুর চেয়ে আপনার বয়স কম হবে।

একে বলা হয় টুইন প্যারাডক্স। তবে মাথার মধ্যে পরম সময়ের ধারণাকে স্থান দিলে তবেই একে প্যারাডক্স (পরস্পর বিরোধী বা আপাত দৃষ্টিতে অসম্ভব ঘটনা) মনে হবে। আপেক্ষিক তত্ত্বে একক পরম সময় বলতে কিছু নেই। বরং প্রত্যেক দর্শক তার নিজের মতো করে সময় মাপেন। এটি মেনে নিলেই আর কোনো প্যারাডক্স থাকে না।

প্রজেক্ট সীলঃ সমুদ্রের বুকে মানবসৃষ্ট সুনামী

২০০৪ সালের কথা। তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সেদিন খবর দেখতে টিভি চালু করেই বেশ বড় রকমের ধাক্কা খেলাম। স্ক্রিনের নীচে ভেসে চলা ব্রেকিং নিউজে দেখাচ্ছে ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সুনামির খবর। একটু পরেই ঢেউয়ের তোড়ে গাড়ি-বাড়ি-নৌকা-মানুষ ভেসে যেতে দেখে আমার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষমতা যে এত ভয়াবহ হতে পারে সেদিন স্বচক্ষে দেখেও যেন তা বিশ্বাস হচ্ছিল না। ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ সংঘটিত সেই দুর্যোগের জন্য দায়ী ছিল ৯.১ – ৯.৩ মাত্রার ভূমিকম্প, যার ফলশ্রুতিতে মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২ লক্ষ ৩০ হাজার থেকে ২ লক্ষ ৮০ হাজারের মতো। নীচের ছবিগুলো দেখলেই সুনামিটির ভয়াবহতা আঁচ করা সম্ভব।

‘সুনামি’ একটি জাপানী শব্দ যার অর্থ পোতাশ্রয়ে ঢেউ। ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, সমুদ্রের তলদেশে কোনো বিষ্ফোরণ, আগ্নেয়গিরির উদ্‌গীরণ ইত্যাদির প্রভাবে নদী, সাগর প্রভৃতি জলাধারে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসকে বলে সুনামি।

প্রজেক্ট সীলের শিরোনামে কেন সুনামির কথা বলছি? এর উত্তর কিছু দূর গেলেই পাওয়া যাবে। তার আগে প্রাসঙ্গিক আরেকটি বিষয় সম্পর্কে জেনে নেই। ‘টেকটোনিক ওয়েপন’ এটি এমন একটি হাইপোথেটিক্যাল যন্ত্র বা প্রক্রিয়া যার সাহায্যে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে চাহিদামতো ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্ম দেয়া যাবে! ১৯৯২ সালে রুশ বিজ্ঞান একাডেমির অ্যালেক্সে সেভোলোভিদিচ নিকোলায়েভ এটির সংজ্ঞা

দিয়েছিলেন এভাবে- “A tectonic or seismic weapon would be the use of the accumulated tectonic energy of the Earth’s deeper layers to induce a destructive earthquake”।

‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ এই শব্দ দুটি কানে গেলেই মানসপটে দু’জোড়া শব্দ ভেসে ওঠে- ‘অ্যাডল্‌ফ হিটলার’ এবং ‘পারমাণবিক বোমা’। হিটলার কিংবা পারমাণবিক বোমা যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরই প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে তা বোধহয় না বললেও চলে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানুষ তার স্বজাতির উপর কত রকম অমানবিক অত্যাচার, নির্যাতন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে তার ইতিহাস কম-বেশি আমাদের সবারই জানা। আবার এক পক্ষ অপর পক্ষকে ঘায়েল করতে আশ্রয় নিয়েছিল নানান রকমের কৌশলের। পাশাপাশি উদ্ভাবন করেছিল ভয়ানক সব মারণাস্ত্র। প্রজেক্ট সীল ছিল তেমনই এক মারণাস্ত্র উদ্ভাবনের পরিকল্পনা।

প্রায় ৭০ বছর আগেকার কথা। ১৯৪৪ সালের দিকে মার্কিন নৌবাহিনীর কমান্ডার ই. এ. গিবসন এক অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলেন। তিনি দেখলেন, সাগরের পানিতে ডুবে থাকা বিভিন্ন প্রবাল প্রাচীর দূরীকরণে যে বিষ্ফোরণ ঘটানো হয় তার ফলে বেশ বড় রকমের ঢেউয়ের উৎপত্তি ঘটে। এখান থেকেই তার মাথায় অন্য এক পরিকল্পনা জন্ম নিল- আচ্ছা, এ ঢেউকে কাজে লাগিয়ে কি শত্রুপক্ষের কোনো নির্দিষ্ট এলাকাকে ভাসিয়ে দেয়া যায় না? যেমন চিন্তা তেমন কাজ। সাথে সাথেই যোগাযোগ করলেন নিউজিল্যান্ডের চিফ অব জেনারেল স্টাফ স্যার এডওয়ার্ড পুটিকের সাথে, খুলে বললেন তার বিস্তারিত পরিকল্পনা। গিবসনের পরিকল্পনাটি মনে ধরলো পুটিকের। তাই তিনি যুদ্ধ পরিষদের পরবর্তী সভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। সেখানেও প্রস্তাবটিকে সমর্থন করে সবাই। ফলে সিদ্ধান্ত হলো আমেরিকা এবং নিউজিল্যান্ড যৌথভাবে নিউ ক্যালিডোনিয়ায় প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবে।

এখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল প্রজেক্ট সীল। এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল- ‘আক্রমণের উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে তৈরী জলোচ্ছ্বাসের সাহায্যে প্লাবন তৈরির সম্ভাব্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধান করা’।

প্রজেক্ট সীলের গবেষণাগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস লীচ। গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো হচ্ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার কমান্ডার অ্যাডমিরাল হ্যালসিকে। হ্যালসি প্রাথমিক পরীক্ষার ফলাফলে এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, নিউজিল্যান্ডের কর্তৃপক্ষকে তিনি অনুরোধ জানিয়েছিলেন প্রজেক্টটি যথাসম্ভব এগিয়ে নিতে। তিনি চাইছিলেন মানবসৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের সাহায্যে শত্রুপক্ষের বিভিন্ন স্থাপনা যতদূর সম্ভব ভাসিয়ে দিতে। এজন্য তিনি লিখেছিলেন- “আমার মতে- এ পরীক্ষাগুলোর ফলাফল বলছে যে, উভচর যুদ্ধে শত্রুপক্ষের এলাকা প্লাবিত করে দেয়া বেশ সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী এক সম্ভাবনময় আক্রমণাত্মক যুদ্ধাস্ত্র হতে পারে।

প্রজেক্ট সীলের গবেষণামূলক কাজগুলো বেশ দ্রুততার সাথেই এগোচ্ছিল। ১৯৪৪ সালের ৫ মে নিউজিল্যান্ডের যুদ্ধ পরিষদে হ্যালসির প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। প্রফেসর লীচের নেতৃত্বে গঠন করা হয় অ্যারে রিসার্চ ইউনিট, যার কাজ ছিল একেবারেই নতুন ঘরানার এ বোমাটি নিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো। প্রায় ১৫০ জন ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল এই ইউনিটটি। তাদের কাজের জন্য ঠিক করা হয়েছিল হ্যাঙ্গাপারাওয়া উপদ্বীপে অবস্থিত একটি দূর্গ। এখানেই গোপনীয়তার সাথে এগিয়ে চলেছিল প্রজেক্ট সীলের কাজকারবার। এগোচ্ছিল স্বজাতিকে শেষ করার আরো কার্যকরী পদ্ধতি উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা। প্রজেক্টের কাজগুলো মূলত নিউজিল্যান্ডের প্রকৌশলীরাই করতেন কিন্তু বিষ্ফোরক সরবরাহ করা কিংবা আদেশ দেয়ার কাজটি করে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রই।

প্রজেক্টটি সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে বিপুল পরিমাণ বিশেষায়িত উপকরণের প্রয়োজন ছিল। এগুলোর মাঝে ছিল রিমোট-ওয়েভ রেকর্ডিং ডিভাইস, রেডিও কন্ট্রোল্‌ড ফায়ারিং মেকানিজম, মেরিন এক্সপ্লোসিভ ইত্যাদি। ব্রিটিশ ও মার্কিন বিজ্ঞানীদেরও সমুদ্রে বিষ্ফোরণ ঘটানোর এ মহাযজ্ঞ নিয়ে আগ্রহের কমতি ছিল না। তাই একদল ব্রিটিশ ও মার্কিন বিজ্ঞানীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল প্রজেক্টটির অগ্রগতি দেখে যাবার জন্য।

নতুন আঙ্গিকে গঠিত হবার পর প্রজেক্ট সীলের প্রথম পরীক্ষামূলক বিষ্ফোরণটি ঘটানো হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ৬ জুন। আর এটি চলেছিল পরের বছরের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।

প্রজেক্ট সীলের পুরো সময়কাল জুড়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ টি সুনামি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। বোমাগুলো দিয়ে কৃত্রিমভাবে সুনামির মতো পরিস্থিতি তৈরি করাই ছিল উদ্দেশ্য, তাই এগুলোর এরূপ নামকরণ করা হয়েছিল। বোমাগুলোতে বিষ্ফোরকের পরিমাণ কয়েক গ্রাম থেকে শুরু করে ৩০০ কেজি পর্যন্ত পরিবর্তন করে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। বিষ্ফোরক হিসেবে মূলত টিএনটি ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে কখনো কখনো নাইট্রো-স্টার্চ কিংবা গেলিগনাইটও ব্যবহার করা হতো।

শুরুতে অবশ্য প্রজেক্ট সীলের গবেষকেরা ভুল উপায়ে পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। ব্রিটিশরাও সমুদ্রের তলদেশে বিষ্ফোরণ নিয়ে কাজ চালাচ্ছিল। তাদের কাজ থেকে ধারণা করা হচ্ছিল যে, বোমটি সমুদ্রের যত তলদেশে থাকবে, বিষ্ফোরণের ফলে সৃষ্ট গ্যাসের বুদবুদ ততটাই কার্যকর উপায়ে নির্ধারিত এলাকায় প্লাবন ঘটাতে সক্ষম হবে। অবশ্য পরবর্তীতে প্রজেক্ট সীলের অনেক অনেক গবেষণার পর ব্রিটিশদের সেই তত্ত্বটি বাতিল হয়ে যায়। তারা দেখান, বোমটি সমুদ্রপৃষ্ঠের যত কাছাকাছি থাকবে, এটি ততই কার্যকর ঢেউ তৈরি করে প্লাবনের উদ্ভব ঘটাতে সক্ষম হবে। গবেষকেরা সেই সাথে বুঝেছিলেন, মাত্র একটি বোমার বিষ্ফোরণ দিয়ে সৃষ্ট ঢেউয়ের সাহায্যে কেবল ঢেউয়ের বুকে সার্ফিং করাই সম্ভব, শত্রুর স্থাপনা ভাসিয়ে নেয়া তো বহু দূরের কথা। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিলেন একসাথে অনেকগুলো সুনামি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানোর।

এজন্য প্রায় ২০ লক্ষ কেজি বিষ্ফোরক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। বিষ্ফোরককে সমান ১০ ভাগে ভাগ করে সমুদ্র উপকূল থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে বিষ্ফোরিত করলেই তা সমুদ্রের বুকে ভয়াবহ আলোড়ন তুলতে সক্ষম হবে। এর ফলে ১০ – ১২ মিটার উচ্চতার যে ঢেউ তৈরি হবে সেটিই ভাসিয়ে দিবে শত্রুর সব স্থাপনা। তবে এখানেও সমস্যা ছিল। গবেষকরা দেখেছিলেন, সমুদ্রের কতটা তলদেশে বোমটি রাখা হচ্ছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। কারণ উচ্চতার সামান্য হেরফেরও ঢেউয়ের শক্তি অনেকখানি কমিয়ে দিচ্ছিল।

প্রজেক্ট সীল যখন শৈশব থেকে কৈশোরের দিকে যাচ্ছিল, তখন একে পারমাণবিক বোমার বিকল্প হিসেবেই ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু ১৯৪৫ সালের শুরুর দিকে এসে দৃশ্যপট পাল্টে যেতে শুরু করে। তখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মিত্রপক্ষের আধিপত্য বিস্তার পেতে শুরু করে। এর ফলে ধীরে ধীরে প্রজেক্ট সীলের মাধ্যমে তৈরি সুনামি বোমার সাহায্যে কৃত্রিম সুনামী তৈরির প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে ১৯৪৫ সালের ৮ জানুয়ারি প্রজেক্টটি বন্ধই করে দেয়া হয়। তখন পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য কোনো সুনামী বোমা বানানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি, সবই ছিল পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। তাই বাস্তবক্ষেত্রে এ বোমাটির কার্যকারিতা কেমন হতে পারে তা আসলে কেউই আর বলতে পারবে না।

প্রজেক্ট সীলের আয়ু ফুরিয়ে গেলেও ১৯৫০ সালে অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের চল্লিশের দশকের সেই প্রজেক্টটি নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে দেখা গেছে। রিপোর্টটির শিরোনাম ছিল- The Generation of Waves by Means of Explosives।

১৯৯৯ সালে নিউজিল্যান্ডের মিনিস্ট্রি অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স এন্ড ট্রেড প্রজেক্ট সীলের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কিত তথ্য সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। বর্তমানে এ সংক্রান্ত তথ্যাদি ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের জাতীয় আর্কাইভে এবং ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগোতে অবস্থিত স্ক্রিপ্‌স ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফি আর্কাইভসে রাখা আছে।

এতক্ষণ ধরে একবারও বলিনি ঠিক কোনো দেশকে আক্রমণ করতে এ বোমাটি বানানো হচ্ছিল। প্রতিবার শুধু ‘শত্রুপক্ষ’ কথাটি লিখেই পার পেয়ে গেছি। আসলে ১৯৯৯ সালে যে গোপন নথিগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল, সেখানেও বিশেষ কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে এ ব্যাপারে মুখ খুলেছিলেন তখন বেঁচে থাকা প্রজেক্ট সীলেরই এক সদস্য। ১৯৯৯ সালে তার বয়স ছিল ৮৭ বছর।

তার মতে, প্রজেক্টটিতে কাজ করা সবাই জানতো যে এই বোমা জাপানকে ভাসিয়ে দিতেই তৈরি করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র

 (১) en.wikipedia.org/wiki/Tsunami_bomb
 (২) nbr.co.nz/article/best-kept-secret-world-war-two-—-project-seal-tsunami-bomb-ck-134614
 (৩) cnsnews.com/news/article/new-details-emerge-world-war-ii-tsunami-bomb-project

প্রাণিবৈচিত্র্যে বিচ্ছিন্নতার শক্তিশালী অবদান

উদ্ভিদ বা প্রাণী প্রজাতির DNA অনেকটা ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের মতো, ভাষা তার অবস্থান থেকে বিচ্যুত হলে শব্দের মাঝে একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। এই বিচ্ছিন্নতা থেকে ধীরে ধীরে একটি ভাষা থেকে আরেকটি নতুন ভাষার জন্ম হয়। ভাষা যেমন তার অবস্থান থেকে বিচ্যুত হলে শব্দের মাঝে একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় তেমনই প্রাণীরাও তাদেরর অবস্থান থেকে বিচ্যুত হলে DNA-র মাঝে একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।

দেশ, অঞ্চল ও আবহাওয়াভেদে ভাষার পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রজাতির ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা কেন ঘটে? কী কারণে পৃথকীকরণ সম্পন্ন হয়? এর প্রধান একটি কারণ ও উদাহরণ হচ্ছে সমুদ্র। ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপের প্রজাতিরা একে অপরের সংস্পর্শে আসতে পারে না। তাই এমন পরিস্থিতিতে তাদের পরস্পরের মাঝে বিচ্ছিন্নতা তৈরির জোর সম্ভাবনা থাকে। আলাদা থাকার কারণে নতুন প্রজাতির উৎপত্তির ক্ষেত্রে দ্বীপ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে কাজ করে।

এখানে দ্বীপের ধারণাটা একটু পরিষ্কার করা দরকার। এখানে দ্বীপ বলতে শুধু সমুদ্রের মাঝখানে চারদিকে জল দিয়ে ঘেরা এক টুকরো ভূমিকেই বোঝানো হচ্ছে না, এর পাশাপাশি অন্যান্য জিনিসকেও বোঝানো হচ্ছে। নিঃসঙ্গ মরুভূমিতে বিচ্ছিন্নভাবে একটি ব্যাঙ থাকলে ধরা যায় ঐ ব্যাঙটি দ্বীপে আছে। চারদিকে বালু দিয়ে ঘেরা, এর সাথে অন্যান্য সদস্যদের কোন যোগাযোগ নেই। মাছের ক্ষেত্রে একটি পুকুর হচ্ছে দ্বীপ। একটি পুকুরে বাস করা প্রজাতির সাথে অন্য পুকুরে বাস করা প্রজাতির কোনো যোগাযোগ নেই। একটুখানি পানি আর চারদিকে মাটি দিয়ে ঘেরা স্থান, এটাও একধরনের দ্বীপ। ভাষা ও প্রজাতির পরিবর্তনে দ্বীপই

আসল জিনিস, দ্বীপের বিচ্ছিন্নতার কারণে দ্বীপবাসীরা অন্য এলাকার সদস্যদের সাথে মিশতে পারে না, ফলে আলাদা আলাদা বিচ্ছিন্ন এলাকায় আলাদা আলাদাভাবে ভাষা ও প্রাণীর পরিবর্তন হয়। প্রত্যেক এলাকাই তার নিজের সুবিধামতো স্বাধীনভাবে পরিবর্তিত হয়।

এরকম একটি ঘটনার কথা বলি। ৪ অক্টোবর ১৯৯৫ সালে একটি উপড়ে যাওয়া গাছ ভাসতে ভাসতে এসে হাজির হয় ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপে। গাছটির সাথে ভেসে আসে ১৫ টি সবুজ ইগুয়ানা। (ইগুয়ানা হচ্ছে একধরনের গিরগিটি সদৃশ প্রাণী, এরা নিজেদের রঙ পরিবর্তন করতে পারে। যখন যে পরিবেশে যে রঙ থাকে সে পরিবেশ অনুসারে গায়ের রঙ পরিবর্তন করার চমৎকার দক্ষতা আছে এদের।)

চিত্রঃ ইগুয়ানা। ছবিঃ পিন্টারেস্ট।

এর কিছুদিন আগে ঐ এলাকার আশেপাশে দুটি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। ধারণা করা হয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ১৬০ মাইল দূরের আরেক দ্বীপ গুয়াডেলুপ থেকে তারা ভেসে ভেসে এখানে এসেছিল। এই প্রজাতির ইগুয়ানাগুলো গাছে চড়তে পছন্দ করে। হয়তো গাছে থাকা অবস্থায় ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটায় গাছ উপড়ে গিয়েছিল এবং গাছ ছেড়ে ঐ মুহূর্তে অন্য কোথাও যাবার উপায় ছিল না। শেষমেশ জীবিত অবস্থায় ১৫ টি সদস্য এসে পৌঁছায় ক্যারিবীয় দ্বীপে। এই দ্বীপে আবার আগে থেকে কোনো ইগুয়ানা ছিল না। একদমই নতুন পরিবেশ। পরিবেশ নতুন হলেও তারা তাদের সনাতন জীবন-যাপন ছেড়ে ঐ দ্বীপের সাথে মানানসই হয়ে নিজেদের মাঝে বংশবিস্তার শুরু করেছিল।

তারা যে এখানে এসেছিল এই ব্যাপারটা আমরা জানি কারণ স্থানীয় মাছ শিকারিরা এদেরকে দেখেছিল। কেউ যদি না দেখতো তাহলে জানা হতো না ১৯৯৫ সালে এরা এখানে ভেসে এসেছিল। ওরা যেখান থেকে এসেছে সেখানেও হয়তো এমনই কোনো ঘটনা ঘটেছিল। কয়েক শতাব্দী আগের কোনো এক সময়ে কোনো একভাবে গুয়াডেলুপ দ্বীপে এসে পৌঁছেছিল ইগুয়ানার কিছু সদস্য। এদের পৌঁছার দৃশ্য হয়তো তখন কেউ দেখেনি। এই লেখাটির পরবর্তী অংশে এই দ্বীপ সম্পর্কিত বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করা হবে। তবে তার জন্য আমরা বেছে নেব অন্য একটি দ্বীপকে, এটি ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপটির নাম গ্যালাপাগোস। এই দ্বীপের প্রাণবৈচিত্র্যই চার্লস ডারউইনকে বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে ভাবতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল।

গ্যালাপাগোস আসলে অনেকগুলো দ্বীপের সমাহার। সবগুলোকে একত্রে বলা হয় ‘গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ’। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ৫০০ মাইল দূরে বিষুবরেখার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে এদের অবস্থান। এরা আসলে আগ্নেয়গিরিজাত দ্বীপ। সমুদ্রতলের আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত তথা লাভা উদগিরণের ফলে এই দ্বীপপুঞ্জের সৃষ্টি হয়েছিল। পৃথিবীর বয়সের সাথে তুলনা করলে এই দ্বীপের বয়স খুব একটা বেশিও না। মাত্র কয়েক মিলিয়ন বছর মাত্র। অর্থাৎ একসময় এই দ্বীপের সমস্তটাই জলের নীচে ছিল। সমুদ্রতল থেকে আগ্নেয়গিরির ঊর্ধ্বমুখী চাপে ধীরে ধীরে ভূমি উপরে ভেসে উঠেছে। তার মানে এখন যদি এই দ্বীপে প্রাণের অস্তিত্ব থাকে তাহলে ঐ প্রাণ বাইরে থেকে কোনো না কোনো একভাবে এখানে এসেছিল। সম্ভবত দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে কোনো এক দুর্ঘটনায় এখানে এসে পৌঁছেছিল প্রাণী ও উদ্ভিদের বীজ। অনেক দূরের মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপপুঞ্জের কোনো একটা দ্বীপে প্রাণী বা উদ্ভিদ এসে পৌঁছে গেলে বাকি দ্বীপগুলোতে ছড়িয়ে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। কারণ এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়।

চিত্রঃ গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ। ছবিঃ mqltv.com

গ্যালাপাগোসেও অনেক ইগুয়ানা আছে। কেউই জানে না প্রথম ইগুয়ানাটি কখন এই দ্বীপে আরোহণ করেছিল। ১৯৯৫ সালের ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের ইগুয়ানার মতো তারাও হয়তো মূল ভূখণ্ড থেকে ভেসে ভেসে এসে পৌঁছেছিল। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে এখনকার সময়ে মূল ভূখণ্ড থেকে সবচেয়ে কাছের দ্বীপটি হলো ‘স্যান ক্রিস্টোবাল’। স্যান ক্রিস্টবালে আজকের দিনে আমরা একটি মাত্র দ্বীপ দেখতে পাই, কিন্তু লক্ষ লক্ষ বছর আগে আরো কতগুলো দ্বীপের অস্তিত্ব ছিল, এরা এখন পানির নীচে নিমগ্ন। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে সময়ের সাথে সাথে পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়াতে এরা ধীরে ধীরে পানির নীচে নিমগ্ন হয়ে যায়।

মূল ভূখণ্ড থেকে কিছু ইগুয়ানা এসে পৌঁছানোর পর সেখানে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা তথা প্রচুর পরিমাণে জন্ম লাভ করে বিস্তৃত হবার অফুরন্ত সুযোগ আছে। এখানকার পরিবেশ মূল ভূখণ্ড থেকে একদমই আলাদা। আগ্নেয়গিরির এলাকা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে একদমই ভিন্ন। কোনো একভাবে তারা নতুন পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পেরেছিল।

অন্য দিকে এক দ্বীপের সাথে আরেক দ্বীপের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। তাই কোনো এক দ্বীপে আশ্রয় পাওয়া ইগুয়ানা নানা ধরনের প্রাকৃতিক কারণে সহজেই অন্য দ্বীপে পৌঁছে যেতে পারবে। মূল ভূখণ্ড থেকে কোনো দুর্ঘটনায় এখানে প্রাণী এসে পৌঁছার সম্ভাবনা হয়তো লক্ষ লক্ষ বছরে একবার, কিন্তু সেই তুলনায় কয়েক শত বছরের মাঝেই এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যাবার সম্ভাবনা বাস্তব।

চিত্রঃ সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে ভাষা ও প্রাণী প্রজাতির মাঝে অনেক মিল আছে।

এর ফলাফল হিসেবে আজকে আমরা দেখতে পাই গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে ল্যান্ড ইগুয়ানা (Land iguana)-র তিনটি প্রজাতি আছে। এদের কেউই কারো সাথে মিলে সন্তান উৎপাদনে সক্ষম নয়। উল্লেখ্য সারা পৃথিবীতে শুধুমাত্র গ্যালাপাগোসেই ল্যান্ড ইগুয়ানা পাওয়া যায়। ল্যান্ড ইগুয়ানা পরিবারের প্রজাতি কনোলোফাস পেলিডাস (Conolophus pellidus) পাওয়া যায় শুধুমাত্র সান্টা ফে দ্বীপে। কনোলোফাস সাবক্রিসটাটাস (Conolophus subcristatus) বেশ কয়েকটি দ্বীপে বাস করে। এর মধ্যে ফার্নান্দিনা, ইসাবেলা ও সান্টা ক্রুজ অন্যতম। ধারণা করা হয় এই দ্বীপগুলোতে কনোলোফাস সাবক্রিসটাটাস বিভক্ত হয়ে কয়েকটি ভিন্ন প্রজাতি তৈরি হবার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় হয়তো এদের মাঝেও প্রজাতিগত ভিন্নতা দেখা দিবে। তৃতীয় প্রকার ল্যান্ড ইগুয়ানা কনোলোফাস মার্থি (Conolophus marthae) পাওয়া যায় একদম উত্তরের দিকের ইসাবেলা দ্বীপে। এই দ্বীপ পাঁচটি আগ্নেয়গিরির একটি সারি নিয়ে গঠিত। এই দ্বীপটি আকারে অন্য দ্বীপের তুলনায় কিছুটা বড়।দ্বীপগুলোর পরিবেশ আবার একটির তুলনায় আরেকটি ভিন্ন। ভিন্ন ভিন্ন হবার কারণে এবং যোগাযোগ না থাকার কারণে দূরত্ব কম হলেও পরিবেশ অনুসারে তারা ভিন্ন ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়েছে। যেমনটা সাধারণত দেখা যায় ভাষার ক্ষেত্রে। দূরত্ব কম হলেও শক্ত সীমানা বা বিচ্ছিন্নতার ফলে একটি ভাষা থেকে উপভাষা কিংবা নতুন আরেকটি ভাষার জন্ম হয়। ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের সাথে নিজেদেরকে উপযুক্তভাবে মানিয়ে নেবার জন্য অর্থাৎ আরোপিত প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য দ্বীপের ইগুয়ানাগুলো ভিন্ন ভিন্নভাবে নিজেদেরকে পরিবর্তন করে নিয়েছে। ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন এত বেশি হয়ে গেছে যে ভিন্ন দ্বীপের সদস্যরা মিলে যৌন প্রজননে অংশগ্রহণ করলে কোনো সন্তান উৎপাদিত হয় না। পরস্পর মিলে সন্তান উৎপাদন করতে না পারার অর্থ হচ্ছে এরা পরস্পর ভিন্ন প্রজাতি। অথচ এরা একই পূর্বপুরুষ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছিল।

এই দ্বীপটি আরো একটি আগ্রহোদ্দীপক বিষয় সম্পর্কে ইঙ্গিত করে। সমুদ্রে যদি পানির স্তর আরো উপরে উঠে যায় তাহলে ইসাবেলার নিচু ভূমির সম্পূর্ণটা ডুবে যাবে। অর্থাৎ এখানে পাঁচটি আগ্নেয়গিরিকে ঘিরে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপের সৃষ্টি হবে। ফলে তৈরি হবে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ। পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের প্রভাবে একই প্রাণী বিশ্লিষ্ট হতে পারে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিতে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা

পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হচ্ছে ঠিক একই প্রক্রিয়ায় পৃথিবীতে রাজত্ব করে বেড়ানো বৈচিত্র্যময় প্রজাতির সবগুলোরই উৎপত্তি হয়েছিল।

কিছু দিক থেকে গ্যালাপাগোস দ্বীপের পরিবেশ একদমই ব্যতিক্রমী। এই দ্বীপ প্রাণবৈচিত্র্যে এমন কিছু প্রজাতি উপহার দিয়েছে, যা দ্বীপের পরিবেশতাত্ত্বিক গুরুত্বকে বাড়িয়ে তুলেছে। দ্বীপপুঞ্জের কোনো একটি দ্বীপের পরিবেশ ল্যান্ড ইগুয়ানার স্বভাব চরিত্র একদমই বদলে দিয়েছিল। পরিবেশগত কারণে হয়তো তারা একসময় অগভীর সমুদ্রতলের শৈবাল খেতে শিখেছিল। ডুব দিয়ে দিয়ে শৈবাল সংগ্রহ করতো। ডুব দেবার দক্ষতা তাদেরকে প্রকৃতিতে টিকে থাকতে বাড়তি উপযোগ প্রদান করেছিল। এদের থেকেই স্থায়ী পরিবর্তনের মাধ্যমে উৎপত্তি ঘটেছে জলজ ইগুয়ানা বা Marine iguana-র। জলজ ইগুয়ানাও গ্যালাপাগোস ব্যতীত পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।

তাদের এমন কতগুলো ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য আছে যা তাদেরকে অন্য প্রজাতি থেকে একদমই ভিন্ন সারিতে ফেলে দিয়েছে। একদিন হয়তো এমন দৃশ্য দেখা যাবে যেখানে জলজ ইগুয়ানারাই একাধিক প্রজাতিতে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং জলজ ইগুয়ানার নতুন গণ (Genus) তৈরি হয়েছে।

গ্যালাপাগোসের অন্যান্য প্রজাতির বেলাতেও একই গল্প প্রযোজ্য। যে কারণে ইগুয়ানার বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে একই কারণে বৃহৎ কচ্ছপ, লাভা লিজার্ড, মকিং বার্ড, ফিঞ্জ সহ অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে গ্যালাপাগোস দ্বীপে।

চিত্রঃ জলজ ইগুয়ানা। ছবিঃ lemon.hu

একই ধরনের প্রক্রিয়া ঘটেছে সমগ্র বিশ্বে, সমস্ত বিশ্বের প্রাণীজগৎ ও উদ্ভিদজগতে। গ্যালাপাগোস হচ্ছে ছোট একটি এলাকার ছোট একটি উদাহরণ মাত্র। গ্যালাপাগোসের মতো অন্যান্য কত এলাকায় এমন বিচিত্র ঘটনা ঘটে চলছে তার কোনো হিসেব নেই। শুধু বিচ্ছিন্ন দ্বীপই নয়, খাল-বিল-নদী-পাহাড়-মরুভূমির কারণেও নতুন নতুন প্রজাতির উৎপত্তি হয়। প্রশস্ত ও বহমান একটি নদীও প্রজাতিকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। নদীর দুই পাশের জলবায়ু ও এলাকা এক হলেও তাদের এক পারের সদস্যরা আরেক পারে যাওয়া খুব কষ্টকর ব্যাপার (বুদ্ধিমান মানুষের কথা বাদ দিলাম)। বিচ্ছিন্ন হবার কারণে এক পারের সদস্যদের

তুলনায় অন্য পারের সদস্যদের মাঝে কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়। অনেকটা ভাষার মতো। যেমন করে বিচ্ছিন্নতার কারণে একটি ভাষা থেকে একটি উপভাষার সৃষ্টি হয়, একসময় উপভাষা যেমন ভিন্ন একটি ভাষায় পরিণত হয় তেমনই আরো পরিবর্তনের মাধ্যমে নদীর দুই পারও পরস্পর ভিন্ন প্রজাতির এলাকায় পরিণত হয়। কোনো একভাবে এদেরকে একত্র করলে দেখা যাবে এদের দিয়ে আর সন্তান উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ তারা প্রজাতিগতভাবে ভিন্ন হয়ে গেছে। যদিও তাদের উভয়ের পূর্বপুরুষ একসময় একই প্রজাতির সদস্য ছিল।

বিস্তৃত পর্বতমালাও নদীর মতো বিচ্ছিন্নকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশাল এলাকাব্যাপী ধু ধু মরুভূমিও এই ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের ইঁদুর এবং কানাডার ইঁদুর দেখতে হয়তো এক কিন্তু তারা যদি পরিবর্তিত হয় তাহলে নিশ্চয়ই নিজ নিজ পরিবেশ অনুসারে পরিবর্তিত হবে। এক অঞ্চলের পরিবর্তনের ধারা আরেক অঞ্চলের পরিবর্তনের ধারা থেকে ভিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক।

গ্যালাপাগোস দ্বীপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনের মাধ্যমে তিন প্রজাতির ল্যান্ড ইগুয়ানার উৎপত্তি হতে কয়েক হাজার বছর লেগেছে মাত্র। কয়েক মিলিয়ন বছর পর্যন্ত যদি অপেক্ষা করি পরিবর্তিত হওয়া ঐ সময়ের প্রাণীগুলোর সাথে যদি আজকের তুলনা করে দেখি তাহলে উভয়ের পার্থক্য হবে কল্পনাতীত পরিমাণ বিশাল। অনেকটা তেলাপোকার সাথে কুমিরের তুলনা করে দেখার মতো। এখানেও আবার উল্লেখ করছি এই ব্যাপারটাই ঘটেছে সমস্ত জীবজগতের ক্ষেত্রে। এটা সত্য যে তেলাপোকার দাদার দাদার দাদার … … … দাদা’র এমন একটি পূর্বপুরুষ ছিল যে কিনা আজকের কুমিরেরও দাদার দাদার দাদার … … … দাদা’র পূর্বপুরুষ। তেলাপোকা ও কুমির একই পূর্বপুরুষ থেকে বিশ্লিষ্ট হয়েছিল, কিন্তু আজ তাদের মাঝে আকাশ পাতাল পার্থক্য।

সময়ের উল্টোদিকে এগিয়ে যেতে থাকলে একসময় না একসময় তেলাপোকা ও কুমিরের পূর্বপুরুষ একই সদস্যে গিয়ে মিলিত হবে। এর জন্য হয়তো আমাদেরকে বিলিয়ন বিলিয়ন বছর পরিমাণ পেছনে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু তারপরেও অনেক পূর্বপুরুষ অতিক্রম করে তেলাপোকা ও কুমিরের একই পূর্বপুরুষের দেখা পাবো।

এত বছর আগে তাদের প্রজাতিগত বিভাজনের জন্য কোন পরিবেশটি বাধা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল তা এতদিন পরে এসে ঠিক ঠিকভাবে জানা কষ্টকর। যেভাবেই এটা হয়ে থাকুক তা হয়েছে সমুদ্রের পরিবেশে। কারণ তখন ডাঙায় কোনো প্রাণীর অস্তিত্বই ছিল না। সম্ভবত তেলাপোকা ও কুমিরের অতি-আগের পূর্বপুরুষের সন্তান অগভীর সমুদ্রের শৈবাল সম্বলিত এলাকায় বসবাস করেছিল এবং অনুধাবন করেছিল গভীর সমুদ্রের বৈরি পরিবেশের তুলনায় এই পরিবেশ বেশ উত্তম। অন্তত তাদের জন্য উত্তম। অগভীর সমুদ্র থেকেই ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তন ও অভিযোজনের মাধ্যমে ডাঙায় এসেছিল তেলাপোকার পূর্বপুরুষ।

মাত্র ৬ মিলিয়ন বছর আগে ফিরে গেলেই আমরা মানুষের এমন পূর্বপুরুষের দেখা পাবো যে কিনা আজকের শিম্পাঞ্জীদেরও পূর্বপুরুষ। এই সময়টা খুব একটা বেশি নয়। ফলে তেলাপোকা ও কুমিরের মতো এখানে মানুষ ও শিম্পাঞ্জীদের বিভাজনে বাধা হিসেবে কী কাজ করেছে তার সম্পর্কে ধারণা লাভ করা খুব একটা কঠিন নয়। ধারণা করা হয় আফ্রিকার গ্রেট রিফট ভ্যালি এখানে বাধা হিসেবে কাজ করেছিল। গ্রেট রিফট ভ্যালি হচ্ছে ৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উপত্যকা যা এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ হতে শুরু করে আফ্রিকা মহাদেশের পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত।

চিত্রঃ গ্রেট রিফট ভ্যালির পরিবেশ। ছবিঃ Zohar African Safaris

গ্রেট রিফট ভ্যালির পূর্বদিকে বিবর্তিত হয়েছে মনুষ্য প্রজাতি আর পশ্চিম দিকে বিবর্তিত হয়েছে শিম্পাঞ্জী প্রজাতি। পরবর্তীতে শিম্পাঞ্জীদের ধারা দুটি ভাগে বিভক্ত হয় সাধারণ শিম্পাঞ্জী ও পিগমি শিম্পাঞ্জীতে (বেবুন)। ধারণা করা হয় বিভক্ত হবার জন্য কঙ্গো নদী তাদের মাঝে বাধা হিসেবে কাজ করেছিল। এই হিসেবে ১৮৫ মিলিয়ন বছর আগের সময়ে গেলে আমরা এমন এক প্রাণীর দেখা পাবো যে কিনা আজকের যুগের সকল প্রকার স্তন্যপায়ী প্রাণীর পূর্বপুরুষ।

স্তন্যপায়ীরা প্রাণিজগতে তুলনামূলকভাবে উন্নত মস্তিষ্কের অধিকারী। অতি-আগের পূর্বপুরুষের বংশধরদের মাঝে প্রজাতিগতভাবে একের পর এক বিভাজন সম্পন্ন হয়েছে। অল্প সময়ের মাঝেই স্তন্যপায়ীর হাজার হাজার প্রজাতিতে ছেয়ে গেছে সমস্ত পৃথিবী। স্তন্যপায়ীর ঘরে আছে ২৩১ প্রজাতির মাংসাশী (কুকুর, বিড়াল, বাঘ, ভালুক ইত্যাদি), ২ হাজার প্রজাতির ইঁদুর জাতীয় প্রাণী বা Rodent, ৮৮ প্রজাতির তিমি ও হাঙর জাতীয় প্রাণী, ১৯৬ প্রজাতির দ্বি-খণ্ডিত ক্ষুর বিশিষ্ট প্রাণী (গরু, ভেড়া, হরিণ, শূকর ইত্যাদি- এদের পায়ের ক্ষুর দ্বি-খণ্ডিত বা দুই ভাগে বিভক্ত থাকে), ১৬ প্রজাতির ঘোড়া জাতীয় প্রাণী (ঘোড়া, জেব্রা, গণ্ডার ইত্যাদি), ৮৭ প্রজাতির খরগোশ জাতীয় প্রাণী, ৯৭৭ প্রজাতির বাদুড়, ৬৮ প্রজাতির ক্যাঙ্গারু, ১৮ প্রজাতির এপ (এদের মাঝে মানুষও আছে), এবং অন্যান্য অনেক অনেক অনেক প্রজাতি যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এত পরিমাণ স্তন্যপায়ী প্রাণীর পূর্বপুরুষ যিনি তার দেখা যদি পেতাম তাহলে বাংলাদেশের সাংবাদিক ধাঁচে প্রশ্ন করতাম “সমস্ত পৃথিবী তো আণ্ডাবাচ্চা দিয়ে ছেয়ে ফেলেছেন! পৃথিবী ভরিয়ে দেয়া এত পরিমাণ প্রজাতির পূর্বপুরুষ হতে পেরে আপনার অনুভূতি কী?”

লক্ষ লক্ষ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের উপস্থিতিতে পৃথিবীতে বিরাজ করছে চমৎকার এক বৈচিত্র্য। আর এই বৈচিত্র্যময়তার পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে কাজ করেছে বিচ্ছিন্নতা। একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে থাকা। বিচ্ছিন্নতা নেতিবাচক, আমরা কেউ বিচ্ছিন্ন হতে চাই না। কিন্তু তারপরেও বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর জন্য বিচ্ছিন্নতার শক্তিকে ধন্যবাদ দিতে হয়।

তথ্যসূত্র

১. The Magic of Reality, D Richard, Free Press, New York, 2011 (3rd Chapter)

২. সাগরের বুকে ডারউইনের পাঁচটি বছর, মাসিক জিরো টু ইনফিনিটি, আগস্ট ২০১৩

৩. https://thenanitesolution.wordpress.com/2015/08/18/islands-of-the-galapagos-archipelago-part-ii/

 

 

নক্ষত্র যাত্রাঃ সায়েন্স ফিকশন থেকে বাস্তবতায়

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের ফিল্ড ইকুয়েশন অনুসারে আলোর চেয়ে বেশি গতিতে ভ্রমণ করা অসম্ভব নয়। এই সূত্রের উপর ভরসা করে স্টারট্রেক সিনেমার ওয়ার্প ড্রাইভ বা কৃত্রিম ওয়ার্মহোল নিয়ে গবেষকরা দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এধরনের প্রযুক্তি মানুষের আয়ত্বে আসলে এখনো অনেক সময় বাকি। তবে তার মধ্যে কিছু আশার কথাও শোনা যায়। যেমন ১৯০৩ সালে রাইট ব্রাদার্স মানবজাতির প্রথম ফ্লাইট সম্পন্ন করে। এর পরের ১০০ বছরে তাদের সেই আনাড়ি উড্ডয়নের অকল্পনীয় উন্নয়ন হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই মানুষ এখন এই দেশ থেকে ঐ দেশে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে। কোটি কোটি কিলোমিটার দূরের গ্রহে নভোযান পাঠাচ্ছে অনায়াসে। এরকম উদাহরণ থেকে বলা যায় সৌরজগতের বাইরে দূরের কোনো নক্ষত্রে পৌঁছার কল্পনা আজকে অবাস্তব বলে মনে হলেও সময়ের প্রবাহের সাথে সাথে আগামী কয়েক শতকের মাঝে তা মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে।

সঠিক গ্রহ নির্বাচন

খোলা চোখেই হাজার হাজার নক্ষত্রম দেখা যায়। টেলিস্কোপ দিয়ে তাকালে নক্ষত্রের পরিমাণ তো প্রায় অসীমের পর্যায়ে চলে যায়। এক্ষেত্রে দূরের বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র আর তাদের মধ্যে জীবন ধারনের উপযোগী সঠিক গ্রহটি খুঁজে বের করাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। জীবন ধারণের উপযোগী পৃথিবী সদৃশ কোনো গ্রহ যদি পাওয়া যায় এবং সেটিকে টার্গেট করা হয় তাহলে সেই মিশনে প্রচুর অর্থ আর সময় দরকার হয়। সাথে দরকার হয় হাজার হাজার গবেষকের মেধা। তার উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্বদিচ্ছাও থাকতে হবে। কারণ অর্থ সরবরাহ করতে তারা অস্বীকৃতি জানালে মিশন আটকে যাবে।

এরকম মিশনে সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণ বিষয় হলো কম দুরত্বের মাঝে পৃথিবী সদৃশ গ্রহ খুঁজে পাওয়া। দূরত্ব যত বেশি হবে অর্থ ও সময়ও তত বেশি লাগবে। কাছে কোনো প্রাণবান্ধব এলাকায় গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেলে তাহলে তা সময় ও অর্থ উভয়ই বাঁচিয়ে দেবে।

মানুষ তার মহাকাশ অভিযানের প্রথম ধাপ অতিক্রম করেছে চাঁদে অবতরণের মধ্যে দিয়ে। স্থায়ীভাবে বসবাস না করলেও সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে গবেষণা করার মতো ঘাঁটি এই শতকের ভেতরেই তৈরি সম্ভব। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে নক্ষত্রের সংখ্যা ১০ হাজার কোটিরও বেশি। ১৫-২০ আলোক বর্ষের ভেতর নক্ষত্র আছে ৬০-৬৫ টি। প্রাথমিক অবস্থায় কাছের এই নক্ষত্রের দিকেই যাত্রা করতে হবে।

সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশি নক্ষত্র হচ্ছে আলফা সেন্টারি। কম দূরত্ব মানে ৪.৩৭ আলোকবর্ষ। প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার করে গেলেও সেখানে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে ৪ বছর লেগে যাবে। ২০১২ সালে আলফা সেন্টারির পাশে একটি পৃথিবী সদৃশ গ্রহের অস্তিত্ব খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা। গ্রহটি পৃথিবী সদৃশ হলেও জীবন ধারনের জন্য যে অতিরিক্ত উত্তপ্ত হবে সেটা প্রায় নিশ্চিত। মিশনের আগে গ্রহের তাপমাত্রা সম্পর্কে জানা জরুরি। নক্ষত্রের আকৃতি, বয়স, তাপমাত্রা, চম্বুকত্বের তীব্রতা ইত্যাদির উপর গ্রহের অবস্থা নির্ভর করে। মিশনের আগে এগুলোও জানা জরুরী। ২০১৮ সালে নাসার পরিকল্পনামতো জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) উৎক্ষেপণ করা হলে এসব অজানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে বলে আশা করেন গবেষকরা।

চিত্রঃ যেমন ওয়েবার স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে অনেক নক্ষত্রের অজানা তথ্য। ছবিঃ Northrup Gruman

রকেট প্রোপালশন 

মহাকাশ নিয়ে আগ্রহ নেই এমন জাতি সম্ভবত একটিও পাওয়া যাবে না। তবে শুধু আগ্রহ দিয়ে হবে না, মহাকাশ নিয়ে ভালো কিছু করতে হলে বিশাল অর্থ ভাণ্ডারও দরকার। এযাবৎ কালে মহাকাশে সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢেলে আসা দেশটি হলো যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৪৬ সালে পারমাণবিক বোমা নিয়ে কাজ করা ম্যানহাটন প্রজেক্টের একজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম নিউক্লিয়ার বোমার বিপুল শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর প্রস্তাব করেন। নিউক্লিয়ার বোমাগুলো হবে ছোট আকারের। যুদ্ধের জন্য বানানো বোমার মতো এত বড় ও বিধ্বংসী না। ষাটের দশকে ‘ওরিয়ন’ নামে একটি গোপন প্রজেক্ট শুরু করে নাসার গবেষকরা। এখানে বিজ্ঞানীরা শিপের জ্বালানী হিসেবে নিউক্লিয়ার পালস ইউনিটের কথা ভাবেন অর্থাৎ পারমাণবিক শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। নীল গ্রহ পৃথিবী থেকে লাল গ্রহ মঙ্গলে যাওয়া এবং আসা মিলে মাত্র ১২৫ দিন লাগতো তাদের প্রস্তাবিত নিউক্লয়ার শক্তি চালিত নভোযানে। এ ধরনের স্পেসশিপে বিস্ফোরণ গ্রাহক অংশে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। নভোচারীদের থাকার স্থান বিস্ফোরণ অংশ থেকে কিছুটা দূরে থাকবে যেন তাদের নিরাপত্তাজনিত সমস্যা না হয়। ওরিয়ন বিস্ফোরণের শক্তিকে ব্যবহার করে স্পেসশিপকে সামনে ঠেলে দিতো। নিউক্লিয়ার শক্তি ব্যবহার করে এধরনের স্পেসশিপ আলোর গতির ৫% গতি অর্জন করতে সক্ষম। ওরিয়ন স্পেসশিপ সেকেন্ডে ৩০কিমি অর্জন করতে পারবে বলে বিজ্ঞানীরা হিসাব করেন। কিন্তু ১৯৬৩ সালে পারমাণবিক বিস্ফোরণ বিরোধী চুক্তি এবং ১৯৬৭ সালে এরকমই আরেকটি চুক্তি অনুসারে মহাশূন্যে কোনো ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো যাবে না। তাই এধরনের কাজে বেশ জটিলতা তৈরি হয় এবং পরে সোভিয়েত রাশিয়া ও আমেরিকা এ সম্পর্কিত গবেষণা গুটিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে ওরিয়নের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায় এবং এই গবেষণার মৃত্যু ঘটে।

নিউক্লয়ার শক্তি বিপজ্জনক। এ থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সরানোও ঝামেলার কাজ। তাছাড়া স্পেসশিপ পরিচালনার জন্য যে নিউক্লয়ার ইঞ্জিন হতে হবে তার ভর সাধারণ ইঞ্জিন থেকে ১০ গুণ বেশি, যা উড্ডয়নের সময় সমস্যা সৃষ্টি করবে। পাস্পাশি এর রক্ষণাবেক্ষণও বেশ ঝামেলার।

ব্রিটিশ ইন্টারপ্ল্যানেটারি সোসাইটি ৭০ এর দশকে প্রজেক্ট ডায়েডেলাস হাতে নেয়। লক্ষ্য আলফা সেন্টারি ছাড়িয়ে দ্বিতীয় নিকটবর্তী নক্ষত্র বার্নার্ডা পৌঁছানো। আলোর ১২% গতি লাভ করতে সক্ষম এধরনের যান ৪০ বছরে আলফা সেন্টারি পৌছাতে পারে।

এই ধরনের স্পেসশিপের নকশা অনুসারে ইঞ্জিনের পারমাণবিক চেম্বারে থার্মোনিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ ঘটানো হবে। বিস্ফোরণে পারমাণবিক ভাঙন হবে এবং এতে উত্তপ্ত প্লাজমা হতে প্রচণ্ড শক্তিশালী প্রবাহ মহাকাশযানের পেছন দিয়ে নিঃসরিত হবে। প্রবাহের উল্টমুখি ধাক্কার ফলে স্পেসশিপ সামনে এগিয়ে যাবে নিউটনের ৩য় সূত্র অনুসারে।

অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প

সুবিধা থাকলেও এরকম ভারী মহাকাশযান উৎক্ষেপণের জন্য কোনো স্টেশন তৈরি হয়নি এবং অদূর ভবিষ্যতে তৈরির সম্ভাবনাও নেই। এর একটি সমাধান হতে পারে বাসার্ড র‌্যামস্কোপ এর ধারণা। আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট বাসার্ডের নাম থেকেই বাসার্ড র‌্যামস্কোপের উৎপত্তি।

মহাকাশের বিশাল শূন্যতার পরতে পরতে হাইড্রোজেন ভেসে বেড়াচ্ছে। যদি মহাকাশযান এমন হয় যে এটি কোনো একভাবে মহাকাশ থেকেই হাইড্রোজেন সংগ্রহ করবে এবং ইঞ্জিনের রিঅ্যাক্টরে হাইড্রোজেনের বিস্ফোরণ ঘটাবে, আর এই শক্তিকেই মহাকাশযানের জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। মহাকাশের সবখানে হাইড্রোজেন পাওয়া গেলেও এর ঘনত্ব এত বেশি নয়। প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে একটি বা দুটি কণা আছে বড়জোর। মহাকাশযানের শক্তিশালী ইঞ্জিন চালাতে যে পরিমাণ হাইড্রোজেন লাগবে তা সংগ্রহ করতে বিশাল আকারের সংগ্রাহক লাগবে। সংগ্রাহককে হতে হবে অনেকটা মাছের হাঁ আকৃতির জাল বা ফাঁদের মতো মতো। মাত্র কয়েকশো মিটারের নয়, এই ফাঁদ হতে হবে কয়েক হাজার কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী। ছোট্ট র‌্যামজেটের বিশাল সংগ্রাহক নিয়ে চলা অসম্ভব। আর সংগ্রাহকে হাইড্রোজেনের পাশাপাশি অন্যান্য অণু পরমাণুও ধরা পড়বে। এসব কণাগুলোকে নিয়ে কী করা যায় তার ভালো কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। এমন বিশাল আকৃতির র‌্যামজেট বানানোও প্রায় অসাধ্য। তাত্ত্বিককভাবেই এই ধারণাটি অনেক সীমাবদ্ধ।

জেনারেশন স্টারশিপ

দূর দূরান্তের নক্ষত্ররাজ্যে এক জীবনে কি যাওয়া সম্ভব? এমন প্রশের মুখে দূর নক্ষত্রে যাবার জন্য দুটো উপায় খোলা আছে। মহাকাশযানকে হতে হবে অনেক বেশি গতি-সম্পন্ন, যেন চোখের পলকে আলোকবর্ষ পরিমাণ দূরত্ব পার হয়ে যাওয়া যায়। অথবা মহাকাশযানেই এক বা একাধিক প্রজন্ম তৈরি করে লম্বা সময় নিয়ে যাওয়া। যুগের পর যুগ স্পেসশিপ মহাকাশ ভ্রমণ করে বেড়াবে আর এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম তার দায়িত্ব নিবে। এভাবে চলতে চলতে একদিন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।

বলতে যতটা সহজ আসলে তা কিন্তু মোটেও এত সহজ না। স্টারশিপকে পৃথিবীর পরিবেশের মতো করে তৈরি করতে হবে যেন সেখানে উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল থাকে। উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল ছাড়া জেনারেশান স্টারশিপ অনেকটা ডাঙ্গায় মাছ উঠে আসার মতো হবে। মাধ্যাকর্ষণ বল আনতে স্টারশিপের মডেলটি হতে হবে চাকতি আকৃতির। চাকতির ভেতরটি হবে ফাঁপা এবং ভেতরে হাজার খানেক মানুষের স্থান থাকতে হবে। শুধু মানুষ নয় সঙ্গী হিসেবে কিছু প্রাণীরও দরকার হবে। কৃত্তিম উপায়ে চাষাবাদ, অক্সিজেন সরবরাহ, বর্জ্য নিষ্কাশন, বিনোদনের সুবিধাও থাকতে হবে। আর গন্তব্যে পৌঁছানোর পর নতুন গ্রহে কলোনি স্থাপনের সব উপকরণও থাকা চাই।

চিত্রঃ কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ তৈরির জন্য স্টারশিপগুলো হতে হবে চাকতি আকৃতির।

এবার সামাজিক সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করা উচিৎ। স্টারশিপে গড়ে উঠবে বিচ্ছিন্ন ও নিজস্ব একটি সংস্কৃতি। নির্ধারিত গ্রহে যেতে ১০ হাজার বছর সময়ও লেগে যেতে পারে। এমনও হতে পারে পৃথিবী থেকে তাদের যাত্রা শুরুর কিছুদিন পর পৃথিবী থেকেই তাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এমন অবস্থায় স্টারশিপের ছোট্ট গণ্ডিই নিজেদের সব।

নিজেদের মধ্যে বিবাদ তৈরি করে মিশনের দায়িত্ব পালন না করে কেউ যেন বিচ্যুত হয়ে না যায় তাও গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, স্টারশিপে লোকবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্টারশিপে লক্ষ্য থাকবে নতুন কোনো গ্রহে কলোনি স্থাপন করে বসবাসযোগ্য আরেকটি পৃথিবী তৈরি করা। কলম্বাস যেমন সামনে কোনো ডাঙ্গা আছে কিনা না জেনেই বেড়িয়ে গিয়েছিলেন জেনারেশান স্টারশিপের ব্যাপারটাও অনেকটা তেমন। সীমাহীন মহাকাশে আদৌ কিছু মিলবে কিনা তা না জেনেই বেড়িয়ে পড়া।

এগশীপ

এগশীপ স্টারশিপেরই অন্য আরেকটি রূপ। এখানে বেশিরভাগ কাজ করবে সুপার কম্পিউটার অথবা পৃথিবীর কোনো নিয়ন্ত্রক। স্টারশিপে দূরের কোনো গন্তব্যে যাবে কিন্তু কলোনি স্থাপন বা আনুষঙ্গিক কাজগুলো কে করবে? এই সমস্যায় এগশিপ মডেলের মহাকাশযানের হিমাগারে সংরক্ষিত থাকবে মানব ভ্রূণ। সময়মতো তাদেরকে কৃত্তিম জন্ম দেয়া হবে। জৈব প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে মাতৃহীন জন্ম সম্ভবত কয়েক দশকের ভেতরেইই রপ্ত হয়ে যাবে। তবে সেটাকে মহাকাশ ভ্রমণে ব্যাবহার খুব সহজ নয়। হাজার খানেক ভ্রূণ কৃত্তিম জরায়ুতে পুষ্টি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা এবং দৈনিক তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ বেশ চ্যালেঞ্জিং কাজ। রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃত্রিম জরায়ু, সুপার কম্পিউটারের সক্ষমতা এবং সবশেষে সদ্য জন্ম নেয়া মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই এগশীপ এখনো একটি কল্পকাহিনী।

সাসপেনশন অ্যানিমেশন

এটি একটি বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। কোনো প্রাণকে আকস্মিকভাবে যদি স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় পৌঁছে দেয়া যায় তাহলে ঐ প্রাণের যাবতীয় কর্মকাণ্ড মুহূর্ত থেমে যাবে। আক্ষরিক অর্থে সে মৃত। হৃদযন্ত্র এবং কোষ বিভাজন বন্ধ। ফলে তার আয়ু থেমে যাবে অর্থাৎ বয়স বাড়বে না। এধরনের কারিগরি দিকের একটি সম্ভাবনা হলো সদ্য মৃত জীবদেহকে তাৎক্ষণিকভাবে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি তাপমাত্রার নাইট্রোজেনে ডুবিয়ে রাখলে এবং উপযুক্ত পদ্ধতি আয়ত্বে থাকলে কোনো একদিন ঐ জীবের প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সাসপেনডেড অ্যানিমেশন থেকে জাগিয়ে তোলার পদ্ধতি হচ্ছে আকস্মিকভাবে তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলা। এতে জীবটির জৈবিক ক্রিয়া আবার শুরু হতে পারে। সফলভাবে সম্পন্ন হলে মনে হবে একটা দারুণ লম্বা ঘুম দিয়ে উঠেছে সে। মনেই হবে না যে ঘুমিয়ে শত বছর পার করে দিয়েছে।

তবে দুঃখের বিষয় যে এটা এখনো কল্পনা। কিছুক্ষণের জন্য জীবদেহের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হলেও স্থায়ীভাবে তা করা সম্ভব নয়। যেমন সাপ বা ব্যাঙ গোটা শীতকাল ঘুমিয়ে কাটায়। দেহের কার্যক্রম একদম সীমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু একেবারে থেমে যায় না। এরা ছাড়া অন্যান্য অনেক প্রাণীর মধ্যেই এই শীতনিদ্রা দেখা যায়। এদের কেউই একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না। মানুষকে এখনো শীতনিদ্রায় পাঠানো সম্ভব হয়নি। ক্যালিফোর্নিয়ার ক্রায়োনিক সোসাইটি বিশ্বাস করে আগামী কয়েক দশকেই এধরনের কোনো প্রযুক্তি আবিস্কার হবে যা দিয়ে মানুষকে শীতনিদ্রায় পাঠানো যাবে। বাস্তবে এখন পর্যন্ত সম্ভব না হলেও মানুষের দীর্ঘ শীতনিদ্রা নিয়ে মুভি-সিনেমা কম তৈরি হয়নি।

সাসপেনডেড অ্যানিমেশন সম্ভব হলে স্পেস মিশনে যে বিপ্লব আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্পেসশিপে প্রাথমিক কিছু কাজ করে সুপার কম্পিউটারের হাতে নিয়ন্ত্রণ দিয়ে ঘুমিয়ে যাও তারপর যখন দরকার কম্পিউটারই ডেকে তুলবে। দিনের পর দিন কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসে বুড়িয়ে যাবার প্রয়োজন নেই।

এই ধরনের প্রজেক্ট আরো একটি উচ্চাভিলাশী চিন্তা। তবে উচ্চাভিলাশ থেকেই বিজ্ঞান অগ্রগতি। আজকের সায়েন্স ফিকশনই আগামী দিনের বাস্তবতা।

তথ্যসূত্র

  1. http://blogs.discovermagazine.com/crux/2016/08/10/interstellar-warp-drive-space-travel/#.WCV_ydJ97IX
  2. http://www.eyewitnesstohistory.com/wright.htm
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/General_relativity
  4. http://earthsky.org/brightest-stars/alpha-centauri-is-the-nearest-bright-star
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/James_Webb_Space_Telescope
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Project_Orion_(nuclear_propulsion)
  7. https://www.youtube.com/watch?v=pBenHWEGozE
  8. http://i4is.org/the-starship-log/interstellar-ramjets
  9. https://www.youtube.com/watch?v=Z-Zs0q6cDPI
  10. http://www.sf-encyclopedia.com/entry/generation_starships
  11. https://www.kirkusreviews.com/features/generation-starships-fiction-and-fact/
  12. http://www.eetimes.com/author.asp?doc_id=1285658
  13. http://www.astrosociology.org/Library/PDF/Caroti_SPESIF2009.pdf
  14. http://www.mybestbuddymedia.com/2016/03/9-reasons-space-dreams-will-die.html
  15. https://en.wikipedia.org/wiki/Suspended_animation

 

এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

তোমরা কি আমার লেখাটা পড়ছো? সবার হাতে হাতে লেখাটা পৌঁছে গেছে না? কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এটা? যে যুগের মানুষ পাথর দিয়ে আগুন ধরাতো, তাদের কাছে কি সম্ভব ছিল এটা করা? টাইম ট্রাভেল করে আমি যদি সেই যুগে যাই, এইরকম একটা কাগজের বই বানিয়ে দেখাই তখন তাদের কাছে কি মনে হবে জানো? তারা ভাববে আমি ভয়ংকর কোন এক জাদুকর, জাদুটোনা দেখাচ্ছি। সেই যুগে এতদ্রুত দূর-দূরান্তে যোগাযোগ করা যেতো না, যোগাযোগের দ্রুততা নির্ভর করতো ঘোড়া কত দ্রুত দৌড়াতে পারে তার উপর।

কিন্তু কীভাবে আমরা পারলাম এই অসাধ্য সাধন করতে? এই কাজগুলোর পেছনে ছিল একজন মানুষের হাত। দরিদ্র এক বালকের হাত, যার থেকে এত কিছু কেউ আশাই করেনি।

ঐ মানুষটি যদি জন্ম না নিতো তাহলে বর্তমানের পৃথিবীর রূপটাই অন্যরকম হতো, আমরা সেই রূপ দেখতে পেলে ভয় পেয়ে যেতাম এখন। পৃথিবীটা তো ওরকমই হতো যদি জন্মই না হতো মাইকেল ফ্যারাডের।

চিত্র ১: মাইকেল ফ্যারাডে।

হতদরিদ্র এক পরিবারে জন্ম মাইকেল ফ্যারাডের। স্কুলে পড়ার সুযোগ পাননি। ছোটবেলায় অবশ্য স্কুলে একবার গিয়েছিলেন তিনি। ইংরেজি R শব্দটি উচ্চারণ করতে পারতেন না বলে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। তিনি নিজের নামটিও উচ্চারণ করতেন “মাইকেল ফ্যাওয়াডে”। ইতিহাস স্বাক্ষী যে, তিনি আর কোনোদিন স্কুলে যাননি। এই মানুষটিই বদলে দেন দুনিয়ার রূপ।

তিনি যখন কৈশোরে পা দেন, তখন একটা বই বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ পান। দিনের বেলা বই বাঁধাই করতেন, আর রাতে সেগুলো পড়তেন। এভাবেই বিজ্ঞানের জগতে ফ্যারাডের প্রবেশ, বিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসার জন্ম।

২১ বছর বয়সটা ফ্যারাডের জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। এই বছরটাই তার জীবন বদলে দেয়। লন্ডনের রয়্যাল ইন্সটিটিউটে যান তিনি, হামফ্রে ডেভীর বক্তৃতা শুনতে। বক্তৃতা শুনে মুগ্ধতা আরো বেড়ে যায় বিজ্ঞানের প্রতি। হামফ্রে ডেভীর কথাগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে লিখে একটা বই আকারে বাঁধাই করেন। ফ্যারাডের কাছে রয়্যাল ইন্সটিটিউট তখন এক স্বপ্নরাজ্য। সেখানে কাজ করার সুযোগ পেলে হাতছাড়া করবেন না তিনি, এমন মনোভাব। বাঁধাইকৃত বইটি তাই পাঠিয়ে দেন হামফ্রে ডেভীর নাম করে রয়্যাল ইন্সটিটিউটে।

এর কিছুদিন পর, ডেভী একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে যেয়ে আহত হন। তার তখন মনে হয় সেই ছেলেটির কথা, যে তার বক্তৃতায় তালি না বাজিয়ে কথাগুলো টুকে নিচ্ছিল, সেই লেখাগুলোকে বই আকারে বাঁধাই করে দিয়েছিল। বিজ্ঞানের প্রতি অপার ভালবাসা লক্ষ্য করেই তিনি ফ্যারাডেকে তার সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন র‍য়্যাল ইন্সটিটিউটে।

তখনকার সময়ে বিজ্ঞানী ওয়েরস্টেড তার অসাধারণ আবিষ্কারটি সম্পন্ন করেন; তড়িৎবাহী তারের চুম্বকের ন্যায় আচরণ। ডেভীর কাছে সেটা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার মনে হয়নি, কিন্তু Faraday was on fire. তিনি এটাকে ব্যবহার করে এমন এক যন্ত্র তৈরি করেন, যা এক নতুন যুগের সূচনা করে; এই যুগের সূচনা করে। তিনি তৈরি করেন বৈদ্যুতিক মোটর। হাজার হাজার জিনিসের নাম বলে যেতে পারব, এই বইয়ের পাতা শেষ হয়ে যাবে, তবু উদাহরণের তালিকা শেষ হবে না। কত সময় প্রবাহিত হয়ে গেছে, কিন্তু এখন ভাবলে মনে হয় মুহুর্তেই বদলে গেছে দুনিয়া। সবখানে মোটরের ব্যবহার, যেখানেই কিছু ঘুরছে সেখানেই মোটর। এটাই হলো বিদ্যুৎ থেকে গতিশক্তি পাওয়ার সূচনা।

কিন্তু সহকারীর এরূপ রাতারাতি বিখ্যাত বনে যাওয়া ডেভীর কাছে ভাল লাগেনি। ডেভী ফ্যারাডের কাজ বন্ধ করে দিয়ে পাঠিয়ে দেন কাঁচের কারখানায়। যে কাঁচের ব্যাপারে ফ্যারাডে কিছুই জানতেন না, তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় বেলজিয়াম কাঁচ থেকেও ভালো মানের কাঁচ বানাতে হবে। কাঁচ বানানোতে বিশেষ কিছু করতে পারেননি তিনি। ডেভীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ফ্যারাডে এই কাজ থেকে মুক্তি পান। তখন তিনি হন রয়্যাল ইন্সটিটিউটের নতুন পরিচালক। কাঁচ নিয়ে কাজ করার সময় বাজে মানের যে কাঁচ তৈরি হয়েছিল, সেটা থেকে সামান্য কাঁচ স্মৃতিস্বরূপ রেখে দেন তার ল্যাবে। এই কাঁচটাই পরবর্তীতে আরেকটি নতুন আবিষ্কারের সূচনা করে।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের পরিচালক হিসেবে তিনি তার ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করতে শুরু করেন। আবিষ্কার করেন তড়িৎ-চৌম্বকীয় আবেশ; যা ছাড়া বর্তমান পরিবর্তী প্রবাহের কথা চিন্তাই করা যায় না। তিনি আবিষ্কার করেন, পরিবাহীর তার কুন্ডলীর মাঝ দিয়ে চৌম্বক ফ্লাক্সের পরিবর্তন বিদ্যুৎ তৈরি করে। ওটাই ছিল প্রথম জেনারেটর। এখন জেনারেটরের কতশত রূপ দেখা যায়। বিদ্যুৎ থেকে গতি, গতি থেকে বিদ্যুৎ; শক্তির এরূপ পরিবর্তন দু’টোই ছিল ফ্যারাডের দখলে।

চিত্র ৩: পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র থেকে তৈরি হয় বিদ্যুৎ।

হঠাৎ করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, বার্ধক্য ঝেঁকে বসে, তার কাছে মনে হয় তিনি সবকিছু যেন ভুলে যাচ্ছেন, কোনো কিছু মনে থাকছে না। তাও তিনি তার সাফল্য চালিয়ে যান। আবিষ্কার করেন চৌম্বক বলরেখা, কাল্পনিক এই বলরেখার কারণেই চুম্বকের আচরণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। বিজ্ঞানের পাতায় যুক্ত হয় ক্ষেত্রতত্ত্ব।

চৌম্বকক্ষেত্র আর তড়িৎক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা চিন্তা করে তিনি ভাবেন এই দুইটি অদৃশ্য বস্তুর সাথে কি আরও একটি অদৃশ্য বস্তুর সম্পর্ক থাকা সম্ভব? আলো, আলোকরশ্মির সাথে কি চৌম্বকত্ব আর তড়িৎক্ষেত্রের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে? তিনি একটা এক্সপেরিমেন্ট করলেন। আমরা জানি যে, আলোকরশ্মি চারিদিকে সঞ্চারিত হয়। ফ্যারাডে পোলারাইজার ব্যবহার করে আলোকে আনুভূমিকভাবে সমান্তরাল একক রশ্মিতে পরিণত করেন, তারপর চেষ্টা করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে আলোকতরঙ্গকে আবারো উল্লম্ব তরঙ্গে পরিবর্তন করা যায় কিনা। লেন্সের অপর পাশে একটি মোমবাতি হলো আলোর উৎস। তড়িৎচৌম্বক বলরেখা দ্বারা সেই পোলারাইজড আলোর ফাংশন পরিবর্তন করা গেলেই কেবল উৎস মোমবাতিটি দেখা যাবে।

চিত্র ৪: আলোকরশ্মিকে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে পরিবর্তন করার চেষ্টা।

কিন্তু কোনো ফল আসলো না। তড়িৎচৌম্বক বলরেখার মধ্য দিয়েই সমান্তরাল আলোকরশ্মি অতিক্রম করতে লাগলো। ফ্যারাডে ভাবলেন, হয়তো বায়ু মাধ্যমে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা আলোকরশ্মির উপর প্রভাবিত করতে পারছে না।

শতশত পদার্থ তড়িৎবাহী তারের উপর বসিয়ে চেষ্টা করেন তিনি; তরল, কঠিন, গ্যাস কিছুই বাদ দেননি। একসময় ল্যাবের এক জায়গায় তার নজরে আসে সেই কাঁচটি যেটি তিনি রেখেছিলেন। এনে বসিয়ে দেন তারের উপর। চোখ রাখেন লেন্সে। অপর পাশে রাখা মোমবাতিটি সাথে সাথে দৃশ্যমান হয়ে যায়।

যদি বুঝতে একটু কঠিন মনে হয়, তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। ফ্যারাডের এই আবিষ্কারটি বিজ্ঞানীদের বুঝে উঠতে একশো বছরের মতো লেগেছিল।

এটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার ছিল সেটা কখনো বোঝা যাবে না, যদি আমি না বলি যে এটা দিয়েই নতুন এক দরজা খুলে দেয়া হয় আইনস্টাইন আর তার পরবর্তী সকল পদার্থবিদের জন্যে। এখানে আমি ইচ্ছাকৃত ভাবে ব্যাখ্যা দিলাম না, রেখে দিলাম পাঠক-পাঠিকাদের জন্য। বিজ্ঞানের প্রতি এতটুকু ভালবাসাও যদি থাকে, তাহলে তারাই খুঁজে বের করবে এটা কী জিনিস। অবশ্য বিজ্ঞান শিক্ষানবিশদের ইতিমধ্যে বুঝে যাওয়ার কথা আলোক তরঙ্গ পরিবর্তন করে কি বানানো যেতে পারে।

৪০ বছর বয়সের মধ্যেই তিন বাঘা আবিষ্কার ফ্যারাডের ঝুলিতে; ইলেকট্রিক মোটর, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার। এবার ফ্যারাডে কাজ শুরু করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা নিয়ে। তিনি লৌহ গুড়ো ছড়িয়ে দেখতে পান যে, তড়িৎবাহী তারের চারপাশে অনেকগুলো বৃত্ত তৈরি করে। ফ্যারাডে ভাবেন যে তড়িৎবাহী তারের প্রতি কণার চারপাশেই এমন কতগুলো বৃত্ত রয়েছে, যা হলো তার বলরেখা, এর আয়ত্তে আনা হলে চুম্বকের আচরণ পরিবর্তিত হয়। তিনি এর দ্বারা পৃথিবী যে চুম্বকের ন্যায় আচরণ করে, তার ব্যাখ্যাও দেন।

চিত্র ৫: একটি চুম্বকের চৌম্বক বলরেখা।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের অন্যান্য সকল বিজ্ঞানীরা তার আবিষ্কারের কদর করতেন, কিন্তু অদৃশ্য বলরেখার ধারণা তারা মেনে নেয়নি। ব্যাখ্যা শুনিয়ে অভিভূত করতে পারলেও ফ্যারাডে বিজ্ঞানীকুলকে দিতে পারেননি কোনো সূক্ষ্ম গাণিতিক ব্যাখ্যা। গাণিতিক ব্যাখ্যা কীভাবে দিতেন তিনি? তিনি যে কখনো স্কুলেই যাননি। বিজ্ঞানের গাণিতিক তত্ত্বগুলোর উপর একদম দখল ছিল না তার। জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি মুষড়ে পড়েন।

ফ্যারাডের কাজের স্বীকৃতি দিতেই যেন জন্ম হলো ম্যাক্সওয়েলের। জেমস্ ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। রাজপরিবারে জন্ম নেয়া এক শিশু, যৌবনে পা দেয়ার আগেই পড়ে শেষ করে ফেললেন তখনকার সময়ে আবিষ্কৃত বিজ্ঞানের সকল ধ্যান-ধারণা। ফ্যারাডের বই হাতে নিয়ে পড়লেন তিনি। অভিভূত হয়ে গেলেন ফ্যারাডের আবিষ্কারে। ইলেকট্রিসিটির উপরে লেখা ফ্যারাডের সব জার্নাল পড়ে ফেললেন তিনি। কিন্তু দেখলেন যে, ফ্যারাডের ব্যাখ্যার সাথে পদার্থবিজ্ঞান আর গণিতের কোনো সম্পর্ক নেই। ফ্যারাডের আবিষ্কার ছিল বৈপ্লবিক, ব্যাখ্যাগুলোও অভিভূতকারী, কিন্তু অভাববোধ করেন পদার্থবিজ্ঞানের গাণিতিক ভাষার। তিনি বুঝতে পারেন তাকে কী করতে হবে।

ম্যাক্সওয়েল ফ্যারাডের সব বই, আর্টিক্যাল খুঁজে নিয়ে পড়লেন। ফ্যারাডের চৌম্বক বলরেখার কথা পড়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন, এমন অদৃশ্য বস্তু কি আসলেই আছে? তিনি শুরু করলেন বলরেখার গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে, সমীকরণরূপে দাঁড় করাতে লাগলেন, যার অভাবে ফ্যারাডে তার অতি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের স্বীকৃতি পাননি।

ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যাগুলি বই আকারে বাঁধাই করে নিয়ে গেলেন ফ্যারাডের কাছে। বইটা হাতে পেয়ে ফ্যারাডের মনে পড়ে গেল বহুপুরনো একটি ঘটনা, তিনিও একদিন এভাবে কারও কাছে একটি বই লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন।

চিত্র ৭: নিজেরই প্রতিচ্ছবি যেন নিজের সামনে দেখতে পান তিনি।

ফ্যারাডে দেখলেন যে, ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তড়িৎচৌম্বক বলরেখার একটা সমীকরণ মেলাতে পারছিলেন না। ম্যাক্সওয়েল তখন ছোট্ট এক পরিবর্তন করে দেয়, এতেই সবকিছু মিলে যায়। ফ্যারাডে ধারণা করেছিলেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখাগুলো স্থির বৃত্ত তৈরি করে থাকে তড়িৎবাহী পরিবাহীর চারপাশে। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের সংশোধনে সেটি হয়ে যায় এরূপ, বৃত্তাকার বলরেখাগুলো আলোকতরঙ্গের গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানের মাইক্রোফোন, স্পীকার এই তত্ত্বকে ভিত্তি করেই নির্মাণ করা হয়েছে।

ফ্যারাডের গল্প বলা তো শেষ, কিন্তু শেষ হয়নি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার প্রিয় বিজ্ঞানী কে? বুঝে না বুঝে উত্তর আসবে, নিউটন, আইনস্টাইন, কেউ কেউ হকিং এর নামও হয়তো নিবে। কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তাদের কোন আবিষ্কারটির জন্য তারা প্রিয়? তখন অনেকেই চুপ করে যাবে।

আমি বিজ্ঞানের প্রতি সবসময় ঋণবোধ করি, বিজ্ঞানীকুলের মাঝে শুধুমাত্র মাইকেল ফ্যারাডের প্রতি ঋণবোধ করি। তিনি জন্মেছেন, অনেক কিছু দেখিয়ে গিয়েছেন, পৃথিবী এগিয়ে যাবে, হয়তো আরও বড় কিছু তৈরি করবে মানুষ, কম্পিউটার-ইন্টারনেট তৈরি করেছে। কেউ কি বলতে পারবে যে কম্পিউটার-ইন্টারনেটের মাঝে ফ্যারাডের কোন আবিষ্কারকে ব্যবহার করা হয়নি? ডেক্সটপ কম্পিউটারের সিপিইউ তে কমপক্ষে দুইটা কুলিং ফ্যান ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য আবিষ্কারগুলি না হয় নাই ধরলাম, ফ্যারাডের মোটরকে ব্যবহার করা হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। দুনিয়া আরও এগিয়ে যাবে, কিন্তু মোটর আবিষ্কার করা শেষ হয়ে গেছে সেই উনবিংশ শতাব্দীতেই, স্কুলে না পড়া এক ছেলের হাত ধরে।

মাইকেল ফ্যারাডে কী করে গিয়েছেন আমাদের জন্য সেটা সবাইকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয়াটাই ছিল আমার এই লেখার উদ্দেশ্য। আমার ধারণা পাঠক-পাঠিকাদের একটি বার হলেও ভাবাবে যে, মাইকেল

ফ্যারাডে নামের কোনো একজন বিজ্ঞানী ছিলেন, যিনি কখনো স্কুলে যাননি, কিন্তু মানবজাতির জন্য অনেক কিছু করে গিয়েছেন।

একটা কথা বলে শেষ করছি আমি। হামফ্রে ডেভী বেশকিছু মৌলিক পদার্থ আবিষ্কার করেছিলেন। সোডিয়াম আর ক্যালসিয়াম আবিষ্কারের কৃতিত্ব তারই। কিন্তু বলা হয়ে থাকে যে, ডেভীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ছিল মাইকেল ফ্যারাডে।

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Michael_Faraday
  2. http://www.thefamouspeople.com/profiles/michael-faraday-549.php
  3. http://www.famousscientists.org/michael-faraday/
  4. Cosmos: A Spacetime Odyssey: The Electric Boy
  5. 5.http://science.howstuffworks.com/dictionary/famous-scientists/physicists/michael-faraday-info.htm

নতুন পৃথিবীর সন্ধানেঃ ‘প্রক্সিমা সেন্টরি-বি’

গ্রীক পুরাণে ভিনগ্রহবাসীদের নিয়ে অনেক রকমের কল্পকথা আছে। মানুষের এই কল্পনার জগতই পরবর্তীতে বিজ্ঞানের হাত ধরে অপার সম্ভাবনার নতুন এক দ্বার খুলে দিয়েছে। মহাশূন্যে কি আর কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব আছে? আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় এই প্রশ্নের উত্তরে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে নতুন একটি নাম, ‘প্রক্সিমা সেন্টরি-বি’।

কী এটি

‘প্রক্সিমা সেন্টরি-বি’কে আমাদের প্রতিবেশিই বলা যায়। প্রক্সিমা সেন্টরি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা অনেকটাই পৃথিবীর মতো এ গ্রহটি সৌরজগত থেকে মাত্র ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আমাদের সবচেয়ে কাছের এ নক্ষত্র কিন্তু সূর্যের মতো এতটা উত্তপ্ত নয়। বামন আকৃতির শান্তশিষ্ট এই নক্ষত্রটিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘রেড ডোয়ার্ফ স্টার’ বা লাল বামন নক্ষত্র।

গ্রহটি মোটামুটি পৃথিবী থেকে ২৫ ট্রিলিয়ন মাইল দূরে অবস্থিত। এর ভর পৃথিবীর ভরের থেকে ৩০% বেশি। গ্রহটিতে গেলে মাত্র ১১ দিন পরপরই আপনার জন্মদিন পালন করতে পারবেন। কারণ পৃথিবীর মাত্র ১১ দিন সময়ে গ্রহটি তার নক্ষত্রের চারপাশে একবার ঘুরে আসে, পৃথিবীর ১১ দিনে সেখানে এক বছর হয়।

কোন বৈশিষ্ট্যর কারণে এতটা গুরুত্ব পাচ্ছে

১৯৯২ সালে সৌরজগতের বাইরে প্রথম কোনো গ্রহ আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা। মাঝে চলে গেছে প্রায় বিশটি বছর, এর মধ্যে কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে তিন হাজারেরও বেশি ভিন গ্রহের দেখা মিলেছে। তবে কোনো নক্ষত্রের প্রাণ বান্ধব অঞ্চলে এবং একইসাথে পৃথিবীর এত কাছে থাকা কোনো গ্রহের সন্ধান মিলল এই প্রথম।

যে নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে গ্রহটি ঘোরে তার ভর সূর্যের ভরের মাত্র ১২%। ভর কম হওয়াতে এর হ্যাবিটেবল জোন নক্ষত্রের অনেক কাছ থেকেই শুরু হয়। পৃথিবী সূর্যের যত কাছে অবস্থিত তার চেয়ে ২৫ গুণ কাছে অবস্থিত গ্রহটি। গ্রহটিতে যদি বায়ুমণ্ডল থাকে তাহলে এর তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে হবে যেটি ঐ গ্রহে পানির থাকার সম্ভাবনাকে দৃঢ় করে। কারণ এই তাপমাত্রায় পানি বাষ্পীভূত হবে না। আর পানি থাকলে প্রাণের অস্তিত্ব মিলবে- এমন আশা একদমই উড়িয়ে দেয়া যায় না।

প্রাণ সৃষ্টিতে কিছু অন্তরায় থাকতে পারে

কোনো গ্রহে প্রাণ সৃষ্টির জন্য বায়ুমণ্ডল থাকাটা খুব জরুরি। প্রক্সিমা সেন্টরি-বি গ্রহে বায়ুমণ্ডল আছে কিনা বা তা কোনো কালে ছিল কিনা, সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।

প্রক্সিমা-বি এর নক্ষত্রের অনেক কাছ দিয়ে একে প্রদক্ষিণ করে। নক্ষত্রের চারপাশ দিয়ে ঘোরার সময় নক্ষত্রটির আকর্ষণে ‘টাইডালি লক’ হয়ে শুধুমাত্র এর একটি পৃষ্ঠই নক্ষত্রের দিকে থাকে, যেমনটি চাঁদ পৃথিবীর দিকে এর একপাশ দিয়েই ঘুরতে থাকে। অন্য দিকটিতে নক্ষত্রের আলো বা তাপ সেক্ষেত্রে পৌঁছাতেই পারে না। এমনকি এখানে কোনো দিন-রাত বা আহ্নিক গতি বলে কিছু নেই। যে অক্ষে এটি তার নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরে তা পুরোপুরি গোলাকার হওয়ায় এখানে কোনো ঋতুও নেই।

ঐ ভিন গ্রহের যে দিকটা তার নক্ষত্রের সামনে রয়েছে, তার ওপর অনবরত এসে আছড়ে পড়ে সৌরঝড়, মহাজাগতিক রশ্মি, নানা রকমের বিকিরণ, যা প্রাণ সৃষ্টিতে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। এত প্রতিকূলতার পরেও যদি অতীতে কখনো সেখানে প্রাণের সৃষ্টি হয়েও থাকে বা ভবিষ্যতে সম্ভাবনা থেকে থাকে তাহলে এ সৌরঝড় বা বিকিরণের দরুণ প্রাণের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।

পৃথিবীর দুই মেরুকেও কিন্তু এরকম সৌরঝড় বা মহাজাগতিক রশ্মির মোকাবেলা করতে হয়। কিন্তু পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র খুব শক্তিশালী হওয়ায় তা এই বিপজ্জনক কণাগুলিকে পৃথিবীর অভ্যন্তরে আসতে না দিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। এ ধরনের প্রতিরক্ষা আদৌ আছে কিনা সদ্য আবিষ্কৃত ভিন গ্রহে, সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

পৌঁছানো কি সম্ভব

চার আলোকবর্ষ অনেক দীর্ঘ পথ, ২৫ ট্রিলিয়ন মাইলেরও বেশি। বর্তমানে যে প্রযুক্তির রকেট রয়েছে তাতে এই দূরত্ব পাড়ি দিতে ৮০ হাজার বছর লেগে যাবে। ভবিষ্যতের কোনো অগ্রগতির সময়ে পৃথিবী থেকে মহাকাশচারীদের পদচারণা ঘটতে পারে গ্রহটিতে। কিন্তু তাহলে কি এত বড় আবিষ্কারের পরও বিজ্ঞানীরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন ৮০ হাজার বছর? না, সম্প্রতি নাসা নতুন একটি মহাকাশযান তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন যার মাধ্যমে মাত্র ২০ বছরেই প্রাণের সন্ধানে পৌঁছে যাওয়া যাবে এ গ্রহে।

২০১৫ সালে নাসার নিউ হরাইজনস প্রোব ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫২,০০০ মাইল গতিতে ৯.৫ বছরে ৩ বিলিয়ন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে প্লুটো ভ্রমণ সম্পন্ন করে। নিউ হরাইজনস প্রোবকে প্রক্সিমা-বি তে পাঠিয়ে দিলে এর কক্ষপথে প্রবেশ করতে মহাকাশযানটির লাগবে ৫৪,৪০০ বছর। জুপিটারের কক্ষপথে নাসার জুনো প্রোব ঘণ্টায় ১,৬৫,০০০ মাইল গতি নিয়ে প্রবেশ করে, যা প্রক্সিমা-বি পর্যন্ত যাত্রা করতে সময় নেবে ১৭,১৫৭ বছর। এ সংখ্যাটিও কিন্তু বিশাল।

আশার বাণী হলো ব্রেকথ্রু স্টারশট ইনিশিয়েটিভ-এর প্রতিষ্ঠাতাগণ উচ্চগতির অতি পাতলা এক ধরনের প্রোব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। লেজারের মাধ্যমে একে আলোর ২০% গতিতে ত্বরান্বিত করা সম্ভব (ঘণ্টায় ১৩৪.১২ মিলিয়ন মাইল)। এই গতিতে চললে প্রোবটি ২০-২৫ বছরেই পৌঁছে যাবে প্রক্সিমা সেন্টরি-বি তে। সেখান থেকে পৃথিবীতে সিগনাল আসতে সময় লাগবে ৪.৩ বছর।

এ প্রজেক্টটির পেছনে খরচ হবে ১০ বিলিয়ন ডলার আর মহাকাশযানটি তৈরিতে লেগে যাবে ২০-৩০ বছরের মতো। অর্থাৎ সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির প্রোবটিও প্রস্তুত হতে ও গ্রহটিতে পৌঁছতে মোট সময় লাগবে ৫৫ বছরের মতো অর্থাৎ প্রায় ২০৭০ সাল।

প্রক্সিমা-বি তে যদি পৌঁছে যান তাহলে ২৪ ঘন্টা অতিবেগুনী রশ্মি থেকে বাঁচতে সানস্ক্রিন মেখে ঘোরার সাথে সাথে যাবতীয় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার থেকেও আপনাকে বিরত থাকতে হবে। লাল বামন থেকে উদ্ভুত অগ্নিশিখা এবং অন্যান্য বিপজ্জনক রশ্মি এর পৃষ্ঠে ইলেকট্রনিক এমনকি জৈবকোষও ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই প্রক্সিমা সেন্টরি-বি তে প্রথম পদক্ষেপের জন্য এর অন্ধকার অংশটাই তুলনামূলক নিরাপদ।

আপাতত অবস্থা যেমনই হোক, পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা ভালো কিছুর আশা নিয়েই তাদের গবেষণার পথ পাড়ি দেবেন। বর্তমানে গবেষকগণ এ গ্রহের আবহাওয়াকে নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দশ বছরের মধ্যেই প্রস্তুত হয়ে যাওয়া ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ অথবা আরো পরবর্তীতে চিলি ও হাওয়াইয়ে ভূপৃষ্ঠের উপর নির্মার্ণাধীন (২০-৪০ মিটার ব্যাসের দর্পণ বিশিষ্ট) টেলিস্কোপ গবেষকদের আশার আলো দেখাচ্ছে।

আমরা শুধু অপেক্ষাই করতে পারি। হতে পারে প্রক্সিমা সেন্টরি-বিই হতে যাচ্ছে শত-সহস্র বছর পরের প্রাণের আধার। যখন এ নতুন গ্রহ আবিষ্কারের খবর পেলাম, রাতের আকাশে তাকিয়ে দক্ষিণ গোলার্ধের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টরিকে নিয়ে ভাবছিলাম। কী আছে ওখানে? কে আছে ওখানে? কল্পনা করতে ভালো লাগছিল যে হয়তো মিটমিট করে জ্বলতে থাকা ঐ তারকারাজীর মধ্যেই কোনো একটি গ্রহে বসে কেউ একজন আমাদের সূর্যের দিকে তাকিয়েও ঠিক এভাবেই শিহরিত হচ্ছে।

তথ্যসূত্র

www.space.com/­33932-proxima-b-alien-life-down-the-block.html

www.eso.org/public/­news/eso1629/

www.nature.com/news/earth-sized-planet-around-nearby-star-is-astronomy-dream-come­true-1.20445

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

আপনার হাতের কাছে পৃথিবীর মানচিত্রটি আছে? চলুন আমরা আমাদের এই দ্বিমাত্রিক মানচিত্রকে ত্রিমাত্রিক করার একটু চেষ্টা করি। একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, এই মানচিত্রের অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমারেখাগুলো লম্বভাবে আঁকা, মানে ৯০ ডিগ্রি করে আঁকা। মানচিত্রটি হাতে নিয়ে যদি অক্ষরেখা বরাবর পূর্ব (জাপান) ও পশ্চিম (আমেরিকা) দিক মিলিয়ে দেন তাহলে দেখতে পাবেন আপনার হাতে একটি সিলিন্ডার আকৃতির পৃথিবীর মানচিত্র তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু পৃথিবী তো সিলিন্ডার আকৃতির নয়। এটি গোলাকার বস্তু। তাহলে কাগজের মানচিত্রকে গোলাকার করতে গেলে কী করতে হবে? মানচিত্রের মেরুর দিকের অংশকে কিছুটা বিকৃত করে ভাঁজ করতে হবে।

এবার যদি আপনাকে বলি একটি গোলাকার টেনিস বলকে কেটে তাকে অবিকৃত রেখে সমতল কাগজের মতো বানিয়ে ফেলতে, কীভাবে বানাবেন? একটু ভেবে দেখুন, অবিকৃত রেখে করা সম্ভব নয়, কিছুটা বিকৃত করতেই হবে। আমাদের গোলাকার পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির সময় মানচিত্রকরদের ঠিক একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল এবং এর সমাধান তারা করেছেন কিছু অঞ্চল বিকৃতিকে মেনে নিয়েই।

চিত্রঃ পৃথিবীর প্রচলিত মানচিত্র।

সচরাচর আমরা যে মানচিত্রটি দেখে থাকি তা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং বহুল প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশন দ্বারা গঠিত। মারকেটর প্রজেকশন মানচিত্রের আবিষ্কারক ষোল শতকের জেরারডার্স মারকেটর। তিনি এই মানচিত্র তৈরি করতে পৃথিবীর আকৃতিকে গোলাকার হিসেবে চিন্তা না করে একটি সিলিন্ডারের আকৃতির মতো করে কল্পনা করেছেন। সিলিন্ডারের পৃষ্ঠটিকে কেটে সোজা করলে তা সহজেই আয়তাকৃতির হয়ে যায় এবং চাইলে পুনরায় এর পূর্ব এবং পশ্চিম দিক সহজেই যুক্ত করে দেয়া যায়। এই মানচিত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- সমুদ্রে চলাচলের সময় এ মানচিত্র জাহাজকে সবচেয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারে। আর এ কারণেই প্রথম মানচিত্র তৈরির ৪৪৬ বছরের ইতিহাসে শত শত মানচিত্রের ভিড়ে কেবল এ মানচিত্রটিই আদর্শ মানচিত্র হিসেবে টিকে গেছে।

গোলাকার পৃথিবীকে সরলরেখায় উপস্থাপন করতে গিয়ে মেরুর দিকের অঞ্চলগুলোকে (আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া) তার প্রকৃত আকারের তুলনায় বর্ধিত করে এবং বিষুবীয় অঞ্চলগুলোকে (যেমন আফ্রিকা) ক্ষুদ্র করে দেখাতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মারকেটর প্রজেকশনে গ্রিনল্যান্ডের আকার আফ্রিকার প্রায় সমান দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে গ্রিনল্যান্ডের আয়তন ০.৮ মিলিয়ন বর্গ মাইল, এবং আফ্রিকার আয়তন ১১.৬ মিলিয়ন বর্গ মাইল, যা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় সাড়ে চৌদ্দ গুণ বেশি!

চিত্রঃ মানচিত্রের বিভিন্ন স্থানে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান এবং এর কারণে আকৃতিতে পরিবর্তন।

একইভাবে কানাডাকে মেরু অঞ্চল থেকে বিষুবীয় অঞ্চলে নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার জায়গায় বসালে তাকে আর আগের মতো বিশাল দেখায় না। মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়াকে আমেরিকার চেয়ে অনেক ছোট দেখালেও আসলে এদের আয়তন খুব কাছাকাছি। অস্ট্রেলিয়ার আয়তন ২.৯৭ মিলিয়ন বর্গ মাইল এবং আমেরিকার আয়তন ৩.৮১ মিলিয়ন বর্গ মাইল।

চিত্রঃ অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকাকে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায় তারা প্রায় সমান আকৃতির।

আবার বিপরীতক্রমে বিষুবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে উত্তর মেরুর দিকে নিয়ে বসালে তা আকারে অনেক বড় হয়ে যায়। বর্তমান মানচিত্র থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করার মতো আরেকটি বিষয় হলো কেন এই মানচিত্রে উত্তর দিককে উপর দিকে দেখানো হয়েছে? কেন দক্ষিণ বা অন্য কোনো দিক নয়? এর সহজ উত্তর হলো এটি তৈরি করেছে ইউরোপিয়ানরা। তাই তারা তাদেরকে উপরে রাখতে চেয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রম চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। ১৯৭৯ সালে ম্যাক আর্থারের তৈরি করা ‘ইউনিভার্সাল কারেক্টিভ ম্যাপ’-এ দক্ষিণ দিককে উপরে দেখানো হয়েছে। আবার ১১৫৪ সালে মরোক্কোর মানচিত্রকর মুহাম্মদ আল ইদ্রিসির মানচিত্রে পুরো দিকের ব্যাপারটিকেই অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে উত্তরকে উপরে রেখে মানচিত্র তৈরির পথ সুগম করে গেছেন প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিত টলেমী। তার আঁকা মানচিত্রে উত্তরকে উপরে স্থান দেয়া হয়েছে।

ছবি এবং তথ্য থেকে বোঝা যায়, আসলে সঠিক মানচিত্র বলতে কিছু নেই। কারণ মানচিত্র প্রাকৃতিক নয়। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে এটি তৈরি করেনিয়েছে। আধুনিক বিশ্বের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মতো আমাদের মানচিত্রের স্থিতিবিন্যাসও সম্ভাবনা, প্রযুক্তি এবং রাজনীতির পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে আজ এ অবস্থায় এসেছে। এটিই এখন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

তথ্যসূত্র

  1. boredpanda.com/true-size-countries-mercator-map-projection-james-talmage-damon-maneice/
  2. aljazeera.com/opinions/2014/2/maps-cartographycolonialismnortheurocentricglobe.html
  3. citymetric.com/politics/will-metro-mayors-be-powerful-enough-get-things-done-2371

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

ইতিহাসের উত্তরোত্তর উন্নতির সাথে চিকিৎসাশাস্ত্রেও ঘটে যায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এটি রূপ নিতে থকে এক অভিজাত শিল্প হিসেবে। এর কিছুটা ঝলক বা ছোঁয়া দেখা যায় তৎকালীন পশ্চিম এশিয়ার উর্বর সভ্যতাগুলোতে। বিশেষ করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী মেসোপটেমিয়ান সভ্যতায়। সেইসাথে তুরস্ক, সিরিয়া আর ইরানের উর্বর ভূমিগুলোতেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর আগের সুমেরীয় এবং তার পরবর্তী আক্কাডীয়, অ্যাসেডীয় আর ব্যাবলনীয় সভ্যতার কিছু কীলক-লিপি থেকে সেই সময়কার চিকিৎসাশাস্ত্র এবং এ ব্যাপারে অন্যান্য কাজকর্মের কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তখনকার অনেক চিকিৎসক মনে করতেন অসুখ-বিসুখ হয় মূলত জাদুবিদ্যা বা দুষ্ট প্রেতাত্মা দ্বারা এবং এর প্রতিকারও শুধুমাত্র জাদুবিদ্যা দ্বারাই সম্ভব। তারা তথাকথিত তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ-কবজ আর গাল-মন্দ করে সেই দুষ্ট প্রেতাত্মা তাড়াবার ব্যবস্থা করতেন। এ ধরনের চিকিৎসক বা ওঝাদের নাম ছিল আসিপুস।

আরেক ধরনের চিকিৎসক যারা আসুস নামে পরিচিত ছিলেন তারা বিশ্বাস করতেন কার্যকরী পন্থাগুলোতে। তারা বিভিন্ন ভেষজ তরল মিশ্রণ, ক্ষতস্থান পরিষ্কারকরণ, আক্রান্ত স্থান ম্যাসাজ কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যান্ডেজ ও মলম ব্যবহার করতেন। আসিপুস আর আসুস- এ দু’দলই পাশাপাশি চিকিৎসা চালাতেন। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং সাহায্য-সহায়তাও করতেন। তবে বাণিজ্যিক ব্যাপারগুলো গোপন রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেন।

চিত্রঃ আইনপ্রণেতা হাম্বুরাবি সূর্যদেবতা শামাস থেকে রাজকীয় মর্যাদা নিচ্ছেন।

৩,৮০০ কি ৩,৭৬০ বছর আগে হাম্বুরাবি ছিলেন ব্যাবিলনের শাসক। কীলক-লিপিতে লিখিত আইনশাস্ত্রের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। বিশ্বের প্রথম আইন প্রণেতা হিসেবে তাকেই ধরা হয়। আর এই আইনশাস্ত্রে চিকিৎসা বিষয়ক কিছু ঘোষণাও ছিল। এই ঘোষণাগুলো চিকিৎসকদের সফলতা আর ব্যর্থতা উভয়ের

জন্যই দায়ী ছিল। রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারলে যেমন পুরষ্কারের ব্যবস্থা ছিল, তেমনি ব্যর্থতার জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থাও বলবৎ ছিল। কোনো অভিজাত ব্যক্তির চিকিৎসা করে রোগ সারাতে পারলে ব্রোঞ্জের ল্যান্সেট (বর্তমান ইসরাইলি দশ শেকেলের সমান) দেয়া হতো যা কোনো সওদাগরের এক বছরের আয়েরও অনেক বেশি। আর কোনো দাসের জীবন বাঁচাতে পারলে দেয়া হতো দুই শেকেল। কিন্তু যদি কোনো সার্জনের ছুরির তলায় অভিজাত কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হতো, তাহলে শাস্তি হিসেবে সেই সার্জনের এক হাত কেটে নেয়া হতো। সেই সাথে তাকে একজন দাসও হারাতে হতো।

দুঃখজনক বিষয় এই যে, হাম্বুরাবি আইনে খুব কম নির্দেশনা দেয়া থাকায় ঠিক কী উপায়ে তারা সেই সময় চিকিৎসা চালাতো তা জানা সম্ভব হয়নি। হয়তো জাদুটোনা, দুষ্ট প্রেতাত্মা অথবা পাপের কারণে অসুখ-বিসুখ হয় এই ধারণা থাকায় এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না।

গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন ব্যাবলনীয়দের আরোগ্যদেবী। তাকে চিকিৎসকদের পৃষ্টপোষোকতাকারী দেবীও বলা যায়। নিনকার্ককে সাধারণত এক নারীরূপে দেখানো হতো যার সঙ্গী একটি কুকুর কিংবা কুকুরের মাথার মতো কোন মুর্তিকেও নিনকার্ক হিসেবে দেখা হতো। সেসময় রোগীরা রোগমুক্তির জন্য নিনকার্কের মন্দিরে কুকুরের মুর্তি দিত। মাঝে মাঝে কুকুর বলিও দেয়া হতো বলে জানা যায়। কিছু কিছু সূত্র বলে, গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন নেকড়েমুখো কোনো দানবী। এই নিনকার্কের আবির্ভাব ঘটে প্রায় ৩,৬০০ বছর আগে ক্যাসিটস নামক এক ব্যাবলনীয় সভ্যতার আমলে। নিনকার্কের প্রধান মন্দির ছিল ঈসিনে (বর্ত্মা ইশান-আল বাহরিয়া, ইরাক) এবং নিপ্পুরে (বর্ত্মান নুফফার-ইন আফক, ইরাক)।

ভেষজ ও অন্যান্য গুল্মলতা প্রতিকারক হিসেবে সেসময় ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। রোগ প্রতিকারের জন্য তারা ওয়াইন, আলুবোখারা (পাম ফলের চাটনি) আর পাইন গাছের রস ব্যবহার করতো। এরসাথে টিকটিকির মল মেশানো হতো যা ঔষধ সহজে গিলতে অসুবিধা সৃষ্টি করলেও ওষুধি ভাব আনতে যথেষ্ট কার্যকরী ছিল। এসব ওষুধে অ্যান্টিবায়োটিক গুণাগুণও বিদ্যমান ছিল।

প্রাচীন মিশরের সাধারণ জনগণ ও অভিজাত লোকদের দৈনন্দিন কার্যাবলিতে দেবতা আর আত্মারা এতটা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল যে বর্তমান আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তখনকার চিকিৎসকদের ধর্মীয় এবং তাত্ত্বিক কাজ আলাদাভাবে জানা প্রায় অসম্ভব। ব্যাপারটি আরো জটিল আকার ধারণ করে যখন এই আলোচনায় ইমহোটেপ নামক এক পুরোহিত চিকিৎসক প্রশ্নবিদ্ধ হন। ইমহোটেপের আমল ছিল প্রায় ৪,৬৫০ বছর পূর্বে। ইমহোটেপ মিশরীয় রাজত্বকালের প্রথমদিকে ছিলেন। খুব দ্রুতই চারদিকে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে। তার জনপ্রিয়তা এতোই বেড়ে যায় যে জীবদ্দশাতেই তাকে ঈশ্বরপুত্র (Demi-God) হিসেবে সম্মান দেয়া হতো, যে সম্মান সাধারণ কোনো নাগরিকের পক্ষে পাওয়া নিতান্তই অসম্ভব। সে সময় শুধুমাত্র রাজকীয় লোকদের এ ধরনের সম্মান জানানো হতো।

তিন হাজার বছর পূর্বে, মিশরীয় নতুন রাজত্বকালে তাকে পুরোপুরি দেবতারূপে গণ্য করা হতো। তাকে বলা হতো, তার পুত্র (Son Of Ptah), সৃষ্টির স্রষ্টা অথবা মহাবিশ্বের রূপকার। সেই সাথে কারিগরদের ত্রাণকর্তা বিশেষণও দেয়া হয়। তার সঙ্গী ছিলেন সেকমেট (Sekhmet)।

এ সেকমেট মিশরীয়দের সিংহকেশী সমর ও আরোগ্যের দেবী। সেই সাথে ইমহোটেপের মাও ছিলেন। কিছু ঐতিহাসিকের নথিপত্র ঘাঁটলে জানা যায়, ইমহোটেপ আসলে ছিলেন ঘেঁটে আর সন্ধি বাতের চিকিৎসক। তিনি এক ধরনের তরল মিশ্রণ বানাতে দক্ষ ছিলেন যা এ ধরনের রোগ ভালো করে দিতো। অন্যান্য সূত্র বলে, তিনি নাকি ছিলেন কিছু ধান্দাবাজ ওঝাদের দলনেতা যে তার অধীনস্থদের সফলতার সুফল ভোগ করলেও ব্যর্থতার দায়ভার বা নিন্দা নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন।

চিত্রঃ ইমহোটেপের মা দেবী সেকমেট। তিনি সমর এবং আরোগ্য দেবী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।

প্রাচীন গ্রীসেও ইমহোটেপের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। তবে কখনো কখনো তাকে প্রাচীন গ্রীক আরোগ্যদেবতা অ্যাসলেপিয়াস (Aselepios) এর যমজ ভাই মনে করা হতো। কখনোবা অ্যাসলেপিয়াসকেই ইমহোটেপ বলা হতো।

ইমহোটেপের সময়কালের আরেক বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন হেসি-রা, যিনি ফারাও জোসার এর প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। হেসি-রা দন্ত চিকিৎসক হিসেবেই বেশি বিখ্যাত ছিলেন। শোনা যায়, দাঁত তোলা আর মুখের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে পটুত্ব ছিল তার। সেইসাথে বর্তমানকালে আমরা যাকে ডায়াবেটিস বা বহুমুত্র রোগ বলি সেটা সম্পর্কেও অল্প বিস্তর ধারণা ছিল। রোগীদের বারবার মূত্র বিসর্জন দেখে এ ধারণা তার মাথায় আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে নীলনদ অঞ্চলের হোগলাজাতীয় গুল্ম বা ঘাস জাতীয় প্যাপারি থেকে তৈরি প্যাপিরাস থেকে প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়, যার একটির নাম- ‘স্মিথ প্যাপিরাস’। বিখ্যাত আমেরিকান মিশরীয় বিশেষজ্ঞ এবং সংগ্রাহক এডউইন স্মিথের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। তিনিই প্রাচীন এ নথি ১৮৬২ সালে লুক্সর থেকে উদ্ধার করেন।

স্মিথ প্যাপিরাস একদম অসম্পূর্ণ। দেখলে মনে হবে মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া এটি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বছর পুরনো। কিন্তু হায়ারোগ্লিফিক আর শব্দশৈলী দেখে অনুমান করা হয় এটি আরো প্রাচীন এক নথি থেকে নকল করা হয়েছে। সেই প্রাচীন নথিটি যথাসম্ভব ইমহোটেপের নিজের হাতে লেখা বা তার অধীনে লেখা। সে সময়ের অন্যান্য প্রাচীন প্যাপিরাসের তুলনায় স্মিথ প্যাপিরাস ঐন্দ্রজালিক বা জাদুকরী চিকিৎসার চেয়ে সাধারণ জখম, ক্ষত, পচন আর অস্ত্রোপচার সম্পর্কেই বেশি তথ্য দেয়। শুধুমাত্র একটি স্থানে আরোগ্য লাভের জন্য ঈশ্বর বা দেবতার কৃপা কামনা করা হয়েছে। নথিটিতে মস্তকের সামনের অংশ থেকে পেছনের দিক পর্যন্ত বিস্তৃত বর্ণনা আছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পেশি, হাড়, অস্থিসন্ধি আর রক্তের সরবরাহের বর্ণনা পাওয়া যায়।

প্যাপিরাসটি ৪৮ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগেই একদম পরিচিত আধুনিক পদ্ধতির মতো একেকটি সমস্যার বর্ণনা। কারণ, প্রতিকার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং তা সারাবার বিষয়াদিও বিস্তারিতভাবে আছে।

রোগীকে প্রথমে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা, রোগীর ইতিহাস নেয়া বর্তমানকালের অত্যাধুনিক চিকিৎসার নিয়ম হলেও প্রাচীন গ্রীসে, যেখানে দেবতারা শাসন করতেন, সেখানে এরকম পদ্ধতি ছিল কিছুটা অজ্ঞতার আড়ালে থাকা রহস্যের মতো।

এ স্মিথ প্যাপিরাসেই করোটিসন্ধি সম্পর্কে সবচেয়ে পুরাতন তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া মেনিনজাইটিস (মস্তকের কোষপর্দা) এবং সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা জানা যায়। মাথার ও ঘাড়ের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, বিশেষ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ও পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্যও এতে পাওয়া যায়। স্মিথ প্যাপিরাসে ক্ষতস্থানে সেলাই করা, কাঁচা মাংস ব্যবহার করে রক্তপাত বন্ধ করা এবং মধু ব্যবহার করে রোগ প্রতিকারের কথাও বলা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনটি ব্যাপারের কথা বলা যায়। যেমন- একজন লোক, যার মাথায় ক্ষত হয়েছে, তার জন্য প্রথমে মাথাটাকে সঠিকভাবে জায়গানুসারে বিভিন্ন অংশে সেলাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাজা কাঁচা মাংস ক্ষতস্থানে বেঁধে দিতে হবে। এরপর গ্রীজ, মধু এবং অন্যান্য ভেষজ তরল ব্যবহার করতে হবে যতদিন না লোকটি সুস্থ হয়ে উঠে। স্মিথ প্যাপিরসে মূলত অ্যাক্সিডেন্ট সম্পর্কিত কথা বেশি থাকায় ধারণা করা হয় এটি শুধুমাত্র যুদ্ধাহত সৈন্যদের কিংবা পিরামিড বানানোর কারিগরদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হতো। স্মিথ প্যাপিরাসে বর্ণিত ৪৮টি চিকিৎসা ধরনের মধ্যে ১৪ টিকেই চিকিৎসার অনুপযুক্ত বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ সকল রোগের প্রতিকার সেই সময় তাদের জানা ছিল না।

তখনকার আরেকটি বিখ্যাত পুরাতন নথি বা পুঁথি হলো ইবারস প্যাপিরাস (Ebers Papyrus)। এটি প্রায় স্মিথ প্যাপিরাসের মতোই। এটি ৩,৫০০ বছর আগের বলে গবেষকরা মনে করেন। কিন্তু কেউ কেউ বলেন এটিও অন্য আরেকটি পুঁথির নকল, যথাসম্ভব ইমহোটোপের আমলেরই কোনো নথি হবে।

১৮৭২ সালে জার্মান লেখন এবং মিশরীয় বিশেষজ্ঞ জর্জ ইবারস এ পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। তিনি লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মিশরীয়বিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। সেখানেই এ ইবারস প্যাপিরাস সংরক্ষিত আছে। এতে প্রায় ১১০ পৃষ্ঠা রয়েছে, লম্বায় প্রায় সাড়ে ৬৬ ফুট আর প্রস্থে ১২ ইঞ্চির মতো।

স্মিথ প্যাপিরাসের সাথে তুলনা করলে ইবারস প্যাপিরাসে শত শত জাদুমন্ত্র আর অভিশাপের মাধ্যমে রোগ সারানোর কথা বলা হয়েছে। সেই সাথে ভেষজ ও খনিজ উপাদানের সাহায্যে চিকিৎসার বিবরণ রয়েছে। তবে এটি অন্য নথিগুলোর দিক থেকে সাজসজ্জায় বেশ দুর্বল। তারা জাদুমন্ত্র দিয়ে বাজে, অশুভ প্রেতাত্মা তাড়াবার কৌশল কাজে লাগাতো। পরজীবীর কারণে ঘটিত বাত, ত্বকসমস্যা, আলসার বা পেটের ক্ষত, পায়ু সংক্রান্ত সমস্যা, হৃদরোগ, প্রস্রাবে অসুবিধা, বিভিন্ন ক্ষত এবং প্রসূতিরোগের চিকিৎসার বিবিধ বিধান এতে পাওয়া যায়।

তবে প্রসূতিরোগ সম্পর্কিত প্যাপিরাস হলো ‘কাহুন গাইনোকোলজিক্যাল প্যাপিরাস। প্রায় ৩,৮০০ বছর আগের এ নথিকে চিকিৎসা সম্পর্কিত প্রথম নথিগুলার একটি হিসেবে ধরা হয়। এটি বর্তমানে লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে সংরক্ষিত আছে। এতে মূলত নারীদের প্রজনন বিষয়ক ব্যাপার আলোচনা করা হয়েছে। গর্ভধারণে সক্ষমতা, গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থার পরীক্ষণ এবং গর্ভনিরোধক ইত্যাদি উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া মহিলাদের মাসিক এবং সে সম্পর্কিত ব্যথার কথাও আছে। বলা আছে- যে গর্ভবতী মহিলা সবসময় বিছানায় থাকতে ভালোবাসে, তাকে কখনো উঠানো উচিৎ নয়। বরং তাকে নাড়াচাড়া করাও ঠিক নয়। এতে তার গর্ভের বাচ্চার সমস্যা হতে পারে। তাকে খাওউই নামক একটি জিনিস এক গ্যালনের চতুর্থাংশ খাওয়ানো হয়।

আবার এক চিত্র-বিচিত্র পাত্রকে গর্ভবতীদের জন্য ঐশ্বরিক সুরক্ষা কবজ হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। এতে করে শয়তান আত্মার হাত থেকে গর্ভের বাচ্চাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে প্রাচীনকালের মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো। মজার এবং একই সাথে ভয়ানক এক তথ্য- গর্ভনিরোধক হিসেবে তারা মধু, টক দই আর কুমিরের গোবরের একটা মিশ্রণ নারী যৌনাঙ্গে ব্যবহার করতো।

চিত্রঃ ঐশ্বরিক তাবিজ-কবজ যা অশুভ আত্মার প্রভাব থেকে রক্ষা করে বলে মনে করা হতো।

স্মিথ ও ইবারস প্যাপিরাসের কিছুকাল পরেই দ্য হার্স্ট, ব্রুগশ্চ এবং লন্ডন মেডিক্যাল প্যাপিরাস পাওয়া যায়। সমাধি ভাস্কর্যের আকার-আকৃতি, বিভিন্ন হস্ত নির্মিত তৈজসপত্রের সাথে সাথে মমিকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ত্থেকে পুরানো ইতিহাসের প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

মমিকরণের জন্য মিশরীয় চিকিৎসকরা যে দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গাদিসমূহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন তা এমনিতেই বোঝা যায়। তারা এসব কাজে করাত, ড্রিল মেশিন, সাঁড়াশি, কাঁচি ইত্যাদি নানারকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন।

তবে অপারেশনের বা সার্জারি চিকিৎসা মূলত দূর্ঘটনাসমূহ চিকিৎসার সাথে জড়িত ছিল বেশি। প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসকরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর সুষম খাদ্যাভাসের প্রতিও জোর দিতেন। নকল চোখ, নকল দাঁত- এসব বানাতেও তারা দক্ষ ছিলেন। তারপরও সেই সময়কার মিশরীয় সমাজে আত্মিক এবং ঐন্দ্রজালিক চিকিৎসাই প্রধান ভূমিকা রাখতো। তারা ঘাড়, বাহু, হাত, কব্জি কিংবা গোড়ালিতে মাদুলি ব্যবহার করতো। এতে করে ভৌতিক অপদেবতা হতে রক্ষা পাবে বলে মনে করতো তারা। তবে কেউ যদি ভুলে অসুখে পড়ে যায় তবে যৌক্তিক মেডিক্যাল চিকিৎসার চেয়ে ওঝাদের মাধ্যমে চিকিৎসাই বেশি প্রাধান্য পেতো।

প্রাচীন মিশরের অস্ত্রপচার ব্যবস্থা

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসকদের আলাদাভাবে সম্মান দেয়া হতো। জীবনদানকারী ত্রাতারূপে তাঁদের গণ্য করা হতো সমাজের উঁচু স্তরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা করতো তারা। তারা কাটা অংশ সেলাই করতেন, ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতেন। এছাড়া উইলো গাছের পাতা ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। টিউমার অপারেশনও করা হতো। এসব অপারেশনে নানা রকম ছুরি ব্যবহার হতো। সেইসাথে পাথরের তৈরি ধারালো বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতিও কাজে লাগাতেন চিকিৎসকরা।

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রাচীনকালে ব্যবহৃত নকল পায়ের গোড়ালি পেয়েছেন মিশরে, যার কিছুটা কাঠের আর কিছুটা চামড়ার ও কাপড়ের তৈরি। এ ধরনের প্রস্থেটিক

যন্ত্রপাতি দুর্ঘটনায় অথবা গ্যাংগ্রিনের কারণে অঙ্গ হারানো মানুষদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো। এতে করে রোগীরা সহজে ভারসাম্য রেখে প্রাত্যহিক জীবনযাপন করতে পারতো। বলে রাখা উচিৎ, প্রাচীন মিশরীয়রা ঐতিহ্যগতভাবে পায়ে স্যান্ডেল পরিধান করতো।

চিত্রঃ প্রাচীন মিশরে ব্যবহৃত নকল গোড়ালি।

মমিকরণ

অভিজাত, উঁচু বংশের কিংবা ধনী কেউ মারা গেলে তার মরদেহ মমি করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় দেহের অভ্যন্তরীণ সমস্ত অঙ্গ বের করে ফেলা হতো। মিশরীয়রা মমি করার ব্যাপারে পরবর্তী অন্যান্য সভ্যতাগুলোর মতো কুসংস্কারপূর্ণ ছিল না। কিন্তু ঠিক কী উপায়ে তারা এ মমি করতো তার বিস্তারিত জানা যায়নি।

দ্বিতীয় শতকের রোমান সাম্রাজ্যের কুমির দেবতা সোবেক (Sobek) এর মন্দিরে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত সার্জিক্যাল ছুরি, চিকিৎসার অন্যান্য যন্ত্রপাতি, ওষুধ তৈরির উপকরণ পাওয়া গেছে। তখন বিশাল এক হূঁকের মাধ্যমে নাকের মাঝ দিয়ে মস্তিষ্ক বের করা হতো। আর অন্ত্র, যকৃত, পাকস্থলী, ফুফফুস ইত্যাদি শরীরের বাম পাশ কেটে সরানো হতো। এসব কাজ শরীরে পচন শুরু হবার আগেই সমাধা করা হতো।

হার্ট বা হৃদপিণ্ড, যা আবেগের এবং বুদ্ধিমত্তার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো, তা সরানো হতো না। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য সেটি শরীরের মধ্যেই রেখে দেয়া হতো। আর বাকি সব অঙ্গ বের করে ফেলা হতো।

চিত্রঃ ক্যানোপিক বা অঙ্গ সংরণের পাত্র।

মমিকরণবিদরা শরীর হতে বের করা অঙ্গগুলোকে জলশূন্য করে পুনরায় শরীরে স্থাপন করতেন অথবা ক্যানোপিক (Canopic) নামক এক ধরনের পাত্রে সংরক্ষণ করতেন। এ পাত্রগুলো ছোট আকৃতির কফিনের মতো দেখতে। এগুলো মমিকৃত দেহের কিংবা কবরের পাশাপাশি স্থানে রাখা হতো।

তথ্যসূত্র

The priest physician of Egypt

ছোঁয়াচে প্রাণরসঃ টোবাকো মোজাইক ভাইরাস

 

মেক্সিকান সিটির চিহুয়াহুয়া প্রদেশের ৫০ মাইল দক্ষিণেএকটি শুষ্ক ও মরুময়পর্বত আছে। নাম সিয়েরা দে নাইসা। ২০০০ সালের দিকে কিছু খনি শ্রমিক ঐ পর্বতেএকটিগর্ত খনন করছিল। খনন করেকয়েক হাজার ফুট গভীরে প্রবেশ করার পর তারা এমন এক স্থানের সন্ধান পেল যা দেখে মনে হবে এটি হয়তো ভিন গ্রহের কোনো এলাকা। পৃথিবীতে এরকম স্থানের দেখা পাওয়া যায় না। তখন তাদের অবস্থান৩০ ফুট চওড়া এবং ৯০ ফুট লম্বা একটি প্রকোষ্ঠের ভেতর। উপরে নিচে এবং পুরো দেয়াল জুড়ে মসৃণ এবং স্বচ্ছ জিপসামের স্ফটিক ছড়িয়ে ছিল। এরকম অনেক গুহাতেই স্ফটিক পাওয়া যায় তবে তার কোনোটিই সিয়েরা দে নাইসার মতো নয়। প্রতিটি স্ফটিক ছিল ছত্রিশ ফুট লম্বা এবং ভরে পঞ্চান্ন টন। বুঝা যাচ্ছে এই স্ফটিকগুলো এমন নয় যে গলায় নেকলেস হিসেবে ঝুলনো যাবে। এরা পর্বতের মতো যাতে আরোহণের অপেক্ষায় থাকে প্রত্যেক অভিযাত্রী। একারণে একে স্ফটিকের গুহা বলা হয়।

চিত্রঃ নাইসা মাইনের ভূ-আভ্যন্তরীণ মানচিত্র।

গুহাটি আবিষ্কারের পর অল্প কিছু বিজ্ঞানী এতে পরিদর্শনের অনুমতি পান। জুয়ান মেনুয়েল গার্সিয়া রুইজ নামের ভূতত্ত্ববিদ ছিলেন তাদের একজন। তিনি গবেষণা করে স্ফটিকগুলোর বয়স বের করেন। ২৬ মিলিয়ন বছর আগে যখন আগ্নেয়গিরি থেকে পর্বত তৈরি হচ্ছিল তখনই

স্ফটিকগুলোর জন্ম। ভূ-গর্ভস্থ প্রকোষ্ঠের ভিতরে ছিল গরম খনিজ পানি। আগ্নেয়গিরির ম্যাগমা পানিকে উত্তপ্ত করে ১৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত করে যা খনিজগুলোকে স্থিতি লাভ করতেসাহায্য করে। পানি এরকম উচ্চ তাপমাত্রায়হাজার হাজার বছর ধরে থাকার ফলে তৈরি হয় বিভিন্ন আকারের স্ফটিক।

চিত্রঃ জিপসাম ক্রিস্টাল।

 

২০০৯ সালে বিজ্ঞানী কার্টিস সাটল স্ফটিকের গুহাটি দেখতে যান। সাটল ও তার সহকর্মীরা সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করেন এবং তা ব্রিটিশ কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ল্যাবরেটরিতে এনে পরীক্ষা করেন। সাটলের কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হবে এটা নির্ঘাত পাগলামী। কারণ স্ফটিক নিয়ে কাজ করতে আসা সত্ত্বেও তার স্ফটিক বা খনিজ নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি মূলত ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করেন।

গুহায় কোনো মানুষ থাকতো না। এমনকি কোনো মাছও না। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে গুহাটি কোনো প্রাণের স্পর্শ পায়নি। সাটল যখন গুহার পানি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে পরীক্ষা করলেন তখন দেখলেন পানির প্রতি ফোঁটায় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ভাইরাস আছে।

একই বছর ডানা উইলনার নামের আরেকজন বিজ্ঞানী ভাইরাস অনুসন্ধানের অভিযান চালান। গুহার পরিবর্তে তিনি বেছে নেন মানুষের শরীর। তিনি এবং তার সহকর্মীরা মানুষের কফ নিয়ে পরীক্ষা করেন। কফের ডিএনএগুলো ডাটাবেসে রাখা সিকুয়েন্সের সাথে তুলনা করে দেখেন বেশিরভাগ ডিএনএ মানুষের। আরবাকিগুলো ভাইরাসের। উইলনারের এই পরীক্ষার আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন সুস্থ মানুষের ফুসফুস জীবাণুমুক্ত। কিন্তু উইলনার আবিষ্কার করলেন প্রত্যেক মানুষের ফুসফুসে গড়ে ১৭৪ প্রজাতির ভাইরাস আছে। যার মধ্যে শুধুমাত্র ১০ শতাংশ প্রজাতি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা জানতো। বাকি ৯০ শতাংশ প্রজাতি বিজ্ঞানীদের কাছে তখনো স্ফটিকের গুহার মতোই রহস্যময়।

পরে দেখা গেল বিজ্ঞানীরা যেখানেই খুঁজে দেখছেন সেখানেই ভাইরাসের সন্ধান পাচ্ছেন। সাহারা মরুভূমির উড়ে যাওয়া বালু হতে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তরের মাইলখানেক নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া হ্রদ পর্যন্ত সর্বত্রই ভাইরাসের অবাধ বিচরণ। ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনো শিশু পর্যায়ে রয়ে গেছে। হাজার হাজার বছর ধরে রোগ-বালাই সম্বন্ধে অবগত, কিন্তু রোগ-বালাইয়ের পেছনের হোতা যে ভাইরাস তার সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানতাম না।

ভাইরাস শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে দুটি স্ববিরোধী শব্দ থেকে। রোমান সাম্রাজ্যে সাপের বিষ বা পুরুষের বীর্যকে ভাইরাস বলতো। সৃষ্টি আর ধ্বংস যেন এক শব্দে গাঁথা। কয়েক শতক পরে ভাইরাস শব্দটির অর্থ পাল্টে

গেল। তখন কোনো ছোঁয়াচে পদার্থ যা রোগ সৃষ্টি করতে পারে তাকে ভাইরাস বলা হতো। সেই পদার্থ হতে পারে কোনো ক্ষতের পুঁজ কিংবা কোনো জিনিস যা রহস্যজনকভাবে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এটি একটি কাগজের টুকরোতেও বাসা বাঁধতে পারে এবং তাতে আঙ্গুলের সামান্য ছোঁয়াও হতে পারে রোগের কারণ।

১৮০০ শতকের দিকে ভাইরাস শব্দটি তার আধুনিক অর্থ লাভ করে। এই সময়ে নেদারল্যান্ডে তামাক চাষিরা একটি অজানা রোগ দিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এই রোগে পাতার জীবিত ও মৃত টিস্যু মিলে একধরনের দাগ সৃষ্টি করে। পুরো তামাক চাষ এই রোগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এডলফ মেয়ার

অবশেষে তিনি অসুস্থ গাছের রস নিয়ে তা সুস্থ তামাক গাছে প্রবেশ করালেন। এতেসুস্থ গাছগুলো অসুস্থ হয়ে গেল। মেয়ার বুঝতে পারলেন কোনো আণুবীক্ষণিক জীব গাছগুলোতে বংশবৃদ্ধি করছে। তিনি অসুস্থ গাছ থেকে রস নিয়ে তা ল্যাবরেটরিতে অনুকূল পরিবেশে রাখলেন। তাতে ব্যাকটেরিয়ার কলোনি জন্মাল। তারা ধীরে ধীরে এত বড় হলো যে তিনি এটি খালি চোখেই দেখতে পেলেন। মেয়ার এই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন এবং ব্যাকটেরিয়াগুলো রোগ সৃষ্টি করে কিনা তা দেখার জন্যে বসে রইলেন। কিন্তু গাছগুলোতে কোনো রোগ সৃষ্টি হলো না। এই ব্যর্থতার সাথেই মেয়ারের গবেষণা কিছু সময়ের জন্যে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চলে গেল। ভাইরাসের পৃথিবী তাই তখনো ছিল সবার কাছে অজানা।১৮৭৯ সালে ডাচ কৃষকরা এডলফ মেয়ার নামের একজন তরুণ রসায়নবিদের কাছে সাহায্যের জন্য যান। মেয়ার তামাক গাছগুলো যে পরিবেশে জন্মায় সে পরিবেশ নিয়ে নিরীক্ষা করলেন। যেমন, মাটি, তাপমাত্রা, সূর্যালোক। কিন্তু তিনি সুস্থ ও অসুস্থ গাছকে আলাদা করার কোনো উপায় খুঁজে পেলেন না। তিনি ধারণা করলেন গাছগুলো হয়তো কোনো অদৃশ্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে বলেছেন আলু এবং অন্যান্য উদ্ভিদের রোগের জন্যে ছত্রাক দায়ী থাকতে পারে। তাই মেয়ার তামাক গাছে ছত্রাক খুঁজতে থাকলেন। কিন্তু কোনো ছত্রাক পেলেন না। তিনি পরজীবী পোকাও খুঁজলেন। তাও পেলেন না।

চিত্রঃআক্রান্ততামাকপাতা।

কয়েকবছর পরে আরেক ডাচ বিজ্ঞানী মার্টিনাস বেইজেরিঙ্ক, মেয়ার যেখানে রেখে গিয়েছিলেন ওখান থেকে শুরু করলেন। তিনি ভাবলেন হয়তো তামাক গাছের রোগের জন্য ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও ক্ষুদ্র কোনো জীব দায়ী। তিনি প্রথমে অসুস্থ গাছগুলোকে ছেঁচে তার রস একটা ফিল্টারের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করালেন। ফিল্টারে উদ্ভিদ কোষ এবং ব্যাকটেরিয়া উভয়ই আটকে যায়। তিনি যখন এই ছাঁকনি করা তরলকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন তখন সুস্থ গাছও রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ল।

নতুন আক্রান্ত গাছগুলো থেকে রস নিয়ে তা ফিল্টারের সাহায্যে ছেঁকে আবার সুস্থ গাছে প্রবেশ করিয়ে দেখলেন। সুস্থ গাছগুলো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বেইজেরিঙ্ক বুঝতে পারলেন আক্রান্ত গাছগুলোর রসে এমন কিছু আছে যা বংশবৃদ্ধি করে এবং রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম। ১৮৯৮ সালে বেইজেরিঙ্ক এর নাম দেন ‘ছোঁয়াচে প্রাণরস’।

তবে এই প্রাণরস ছিল বিজ্ঞানীদের চেনা অন্য যেকোনো প্রাণ থেকে আলাদা। আকারে ছোট হবার পাশাপাশি এটা ছিল খুব কঠিন প্রাণ। সহজে মরতে চায় না এমন কই মাছের মতো। বেইজেরিঙ্ক সেই রসে এলকোহল যোগ করলেন, পানির স্ফুটনাঙ্ক তাপমাত্রায় তা গরম করলেন কিন্তু কিছুতেই প্রাণরস কাবু হয়নি। এই তরলে ফিল্টার কাগজ চুবিয়ে তা শুকাতে দিলেন। শুকনো ফিল্টার কাগজতিন মাস পরে পানিতে ভিজিয়ে দেখলেন, এখনো গাছকে আক্রান্ত করতে সক্ষম।

বেইজেরিঙ্ক ভাইরাস শব্দটি দ্বারা ঐ তরলে থাকা রহস্যময় উপাদানটিকে বুঝিয়েছিলেন। তার এই অভিব্যক্তি আমরা এখন ভাইরাস বলতে যা বুঝি তার অনেক কাছাকাছি। তবে ভাইরাস কীসে সম্বন্ধে বলতে পারেননি তিনি। ভাইরাস কী নয় সেটাই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন ভাইরাস প্রাণী, উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া কিংবা ছত্রাক কোনোটিই নয়।

বেইজেরিঙ্ক আবিষ্কৃত ভাইরাস ছিল প্রকৃতিতে থাকা অনেকগুলো ভাইরাসের মাঝে একটি প্রজাতি। ১৯০০ সালের প্রথমদিকে বিজ্ঞানীরা বেইজেরিঙ্কের ফিল্টার পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্যান্য রোগের জন্য দায়ী ভাইরাসকে শনাক্ত করেন। ধীরে ধীরে তারা জীবিত প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের বাইরে ভাইরাস জন্মানোর উপায় বের করেন। তারা এক্ষেত্রে প্লেট বা ফ্লাস্কে রাখা কোষের কলোনি ব্যবহার করেন।

কিন্তু তখনো বিজ্ঞানীরা ভাইরাস কী এ ব্যাপারে একমত হতে পারেননি। কারো কারো মতে ভাইরাস ছিল রাসায়নিক পদার্থ। অন্যরা মনে করতো ভাইরাস হচ্ছে পরজীবী যা কোষের ভিতরে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এ নিয়ে মতবিরোধ এতই বেশি ছিল যে বিজ্ঞানীরা ঠিক করতে পারছিলেন না ভাইরাস জীব নাকি জড়! ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ ভাইরাসবিদ ফ্রেডেরিক টওর্ট ঘোষণা করলেন‘ভাইরাসের প্রকৃতি জানা অসম্ভব’!

কিন্তু বিজ্ঞানে অসম্ভবের প্রতিই সবার নজর থাকে। তাই ভাইরাসের প্রকৃতি জানার জন্যওয়েন্ডেল স্টেনলি নামের একজন রসায়নবিদ কাজ করা শুরু করেন। ১৯২০ সালে ছাত্রাবস্থায় স্টেনলি কীভাবে অণুর গাঠনিক আকারের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে স্ফটিক তৈরি করা যায় তা নিয়ে কাজ করেছিলেন। কোনো পদার্থ সম্বন্ধেস্ফটিক এমনসব তথ্য দিতে সক্ষম যা এমনিতে অজানাই থেকে যায়। বিজ্ঞানীরা প্রথমে স্ফটিকে এক্স-রে নিক্ষেপ করেন,তারপর এক্স-রে যে দিকে প্রতিফলিত হয়েছে তা দেখেন। এক্স-রে দ্বারা তৈরি প্যাটার্নের মাধ্যমে স্ফটিকের মধ্যকার অণুর গঠন সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।

১৯০০ সালের প্রথমদিকে স্ফটিকের মাধ্যমেই জীববিজ্ঞানের অন্যতম রহস্য এনজাইমের গঠন সম্বন্ধে প্রথম জানা যায়। বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই জানতেন প্রাণী ও উদ্ভিদেরা বিভিন্ন ধরনের এনজাইম তৈরি করে এবং এনজাইমরা খাবার ভেঙে ফেলার মতো বিভিন্ন জৈবিক কাজ সম্পাদন করে। কিন্তু এনজাইম স্ফটিকের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পারলেন যে এনজাইম প্রোটিন দ্বারা তৈরি। স্টেনলি ভাবতে থাকলেন ভাইরাস আবার প্রোটিন নয় তো?

তার চিন্তার যথার্থতা প্রমাণের জন্য তিনি ভাইরাসের স্ফটিক বানানো শুরু করলেন। এজন্য তিনি সবচেয়ে পরিচিত টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস ব্যবহার করলেন। স্টেনলি বেইজেরিঙ্কের মতো অসুস্থ তামাক গাছের রস ফিল্টারে প্রবেশ করালেন। ভাইরাসের স্ফটিক তৈরির জন্যে ঐ ফিল্টারকৃত তরল থেকে প্রোটিন ছাড়া অন্য সব ধরনের যৌগ আলাদা করে ফেলেন।

স্ফটিকগুলো ছিল একইসাথে খনিজের মতোরুক্ষ আবার অণুজীবের মতো জীবন্ত। স্টেনলি স্ফটিকগুলোকে স্টোর রুমে রাখা খাবার লবণের মতোই মাসের পর মাস সংগ্রহ করে রেখে দিলেন। স্ফটিকগুলো পানিতে মেশালেই অদৃশ্য ভাইরাসে পরিণত হতো যা আগের মতো তামাক গাছের রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। স্টেলনির এই পরীক্ষা ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয় যা ছিল পুরো পৃথিবীর জন্যে এক বিস্ময়। নিউইয়র্ক টাইমস ঘোষণা দেয় যে ‘জীবওজড়ের মধ্যকার পার্থক্য কিছুটা তার গুরুত্ব হারালো’। এই পরীক্ষার ফলে প্রথমবারের মতো কোনো মানুষ খালি চোখে ভাইরাস দেখতে পেলো।

কিন্তু স্টেনলি তার গবেষণায় একটি ছোট ভুল করেছিলেন। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী নরমান পিরি এবং ফ্রেড বাউডেন আবিষ্কার করেন যে, ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিন নয় বরং এর ৯৫% প্রোটিন কিন্তু বাকি ৫% নিউক্লিক এসিড নামের সূত্রাকার পদার্থ দিয়ে গঠিত। বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে আবিষ্কার করলেন নিউক্লিক এসিড হলো মূলত জিন। এরা প্রোটিন ও অন্যান্য পদার্থ তৈরির নির্দেশনা দেয়। আমাদের কোষ তাদের জিন রাখে দ্বি-সূত্রক নিউক্লিক এসিডে যা DNA নামে পরিচিত। ভাইরাস এক সূত্রক নিউক্লিক এসিড আছে যা RNA নামে পরিচিত।

স্টেনলির টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বানানোর প্রায় চার বছর পর একদল জার্মান বিজ্ঞানী প্রথমবারের মতো কোনো স্ফটিকের সাহায্য ছাড়া ভাইরাস দেখতে পান। ১৯৩০ সালে প্রকৌশলীরা একধরনের অণুবীক্ষণযন্ত্র বানান যা দিয়ে এমন ছোট জিনিস দেখা সম্ভব যা আগে কখনো দেখা যায়নি। গুস্তাভ কসচে, এডগার ফাঙ্কুচ এবং এলমাট রুস্কা টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বিশুদ্ধ পানিতে মিশিয়ে তা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখেন।১৯৩৯ সালে তারা জানান, তাতে ছোট রড আকারের বস্তু দেখেছেন যা ৩০০ ন্যানোমিটার লম্বা। এতক্ষুদ্র কোনো জিনিস কেউ কখনো দেখেনি আগে। ভাইরাসের আকার বুঝানোর জন্য উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে যদি একটি লবণের দানায় ত্বকের দশটি কোষ জায়গা নিবে অথবা একশটি ব্যাকটেরিয়া জায়গা নিবে। আর টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস জায়গা নিবে প্রায় এক হাজারটি।

চিত্রঃরড আকৃতির টোবাকো মোজাইক ভাইরাস।

কয়েক দশকের মধ্যে বিজ্ঞানীরা ভাইরাসেরআভ্যন্তরীণ গঠন বুঝতে সক্ষম হলেন। বিজ্ঞানীরা দেখলেন যদিও ভাইরাসের আমাদের মতো নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন আছে তবুও ভাইরাসের ও আমাদের কোষের মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। মানুষের একটা কোষে লক্ষ লক্ষ বিভিন্ন ধরনের অণু আছে যা

তাকে পরিবেশ সম্বন্ধে ধারণা পেতে, হাঁটা চলায়, খাদ্য গ্রহণে, বৃদ্ধিতে এমনকি প্রয়োজনে নিজের ধ্বংসে সাহায্য করে। কিন্তু ভাইরাসবিদরা দেখলেন ভাইরাস এ তুলনায় অনেক বেশি সরল। ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিনের আবরণ আর তার ভিতরে জিনের সমন্বয়। ভাইরাসের জিন অসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তারা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এজন্যে তারা অন্য জীবের সাহায্য নেয়। তাদের জিন ও প্রোটিন অন্য জীবে প্রবেশ করিয়ে নিজের বংশবৃদ্ধি করে। বংশবৃদ্ধির মাধ্যমেএকটি ভাইরাস থেকে দিনে এক হাজার ভাইরাস পাওয়া সম্ভব।

১৯৫০ সালের দিকে ভাইরাসবিদরা ভাইরাসেরপ্রধান প্রধান দিকগুলো তুলে ধরেন। তাই বলে ভাইরাসবিদ্যা সম্বন্ধে সবকিছু জানা হয়ে গেছে, ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। ভাইরাস কীভাবে মানুষের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করে বিজ্ঞানীরা এ সম্বন্ধে এখনো খুব অল্পই জানেন। পেপিলোমা ভাইরাস কীভাবে ইঁদুরের মাথায় শিং গজায় বা প্রতিবছর হাজার হাজার মহিলার জরায়ুর ক্যান্সার কীভাবে তৈরি করে বিজ্ঞানীরা সে সম্বন্ধে জানতেন না। জানতেন না কিছু ভাইরাস কেন প্রাণঘাতী আর কিছু ভাইরাস কেন তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর। তারা জানতেন না কীভাবে ভাইরাস তার পোষকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয় কিংবা ভাইরাস কীভাবে পৃথিবীর যেকোনো প্রাণীর চেয়ে অনেক দ্রুত বিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

১৯৫০ সালে তারা জানতেন নাHIV নামের একটি ভাইরাস ইতিমধ্যে শিম্পাঞ্জি ও গরিলা থেকে আমাদের প্রজাতিতে প্রবেশ করেছে এবং আগামী ত্রিশ বছরের মধ্যে এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাণঘাতী রোগে পরিণত হবে। হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে এত বিশাল সংখ্যক ভাইরাস থাকা সম্ভব। তারা ধারণা করতে পারেননি পৃথিবীর প্রাণী বৈচিত্র্যের বেশিরভাগই ভাইরাসের মাধ্যমে উৎপত্তি লাভ করেছে। জানতেন না, যে অক্সিজেন আমরা শ্বাসের সাথেগ্রহণ করি তার বেশিরভাগই তৈরি করেছে ভাইরাসেরা। জানতেন না পৃথিবীর তাপ নিয়ন্ত্রণেও ভাইরাসের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।তারা নিশ্চিত জানতেন না আমাদের জিনোমের অংশবিশেষ এসেছে হাজার হাজার ভাইরাসের কাছ থেকে যারা আমাদের পূর্বপুরুষদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত করেছে। এমনকি হয়তো চার বিলিয়ন বছর আগে জীবনের শুরুও হয়েছিল ভাইরাস থেকে।

এখন বিজ্ঞানীরা এসব জিনিস জানেন। তারা জানেন স্ফটিকের গুহা থেকে শুরু করে মানুষের দেহের ভিতরে সব জায়গাতেই ভাইরাস আছে। বলা যেতে পারে পৃথিবী হলো ভাইরাসের আড্ডাখানা। কিন্তু তারপরেও ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের ধারণা এখনোসম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়। বুঝা শুরু হয়েছে ভাইরাসের পৃথিবী।

লেখাটি কার্ল জিমারের বই A plantet of virusএর প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ।

কেলাসিত বরফঃ বিমান যাত্রার অদৃশ্য হুমকি

২০০৯ সালে রিওডিজেনিরো থেকে ছেড়ে যাওয়া প্যারিস গামী ফ্লাইট ৪৪৭ উড্ডয়নের কিছু সময় পরই ঝড়ের কবলে পড়ে। প্রথমে ব্যাপারটি হালকাভাবে নেয়া হলেও যারা সে সময়ের পত্রিকার শিরোনাম গুলোতে চোখ বুলিয়েছিলেন তারা জানেন ব্যাপারটির শেষটা কতটা ভয়াবহ ছিল। এটা ছিল সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে ভয়ানক বিমান দুর্ঘটনা। ২২৮ জন যাত্রীর সকলেরই মৃত্যু ঘটে। আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ থেকে বিমানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারকরতে লেগে যায় প্রায় দুই বছর। যখন ব্ল্যাকবাক্স বের করা হয় তখন সেখান থেকে সফটওয়ার ত্রুটি,পাইলটের অমনোযোগিতা সহ বিভিন্ন কারণ পাওয়া যায়। কিন্তু ছোট্ট একটি কারণ সমগ্র ব্যাপারটিকে নতুন একটি তাৎপর্যপূর্ণ  দিকে  আলোকপাত  করে।

বায়ুর গতিবেগ মাপার জন্য ব্যবহৃত ‘পিটটটিউব’ নামে একটি যন্ত্রাংশে বরফের প্রতিবন্ধকতা পাওয়া যায়। কিন্তু সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৩৫ হাজার ফুট উপরে এমনটি হওয়ার কথা নয়। আবহাওয়া সম্পর্কিত জ্ঞান বলে, সচরাচর এই উচ্চতায় পানি জমে বরফের কেলাস হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু  ফ্লাইট ৪৪৭-ই একা নয়। গত অর্ধ শতাব্দী ধরে

আকাশ থেকে বিমান পতনের সবচেয়ে ভয়ানক কারণ এই বরফের প্রতিবন্ধকতা বা‘কেলাসিত বরফ’।

পঞ্চাশের দশকের আগ পর্যন্ত বিমান পতনের কোনোকারণ বের করা সম্ভব হয়নি। তারপর বেশ কিছু গবেষণা হলেও সেগুলোর ফলাফল স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে। এরপর ১৯৯৪ সালে আমেরিকান ঈগল ফ্লাইট ৪১৪৪ ইন্ডিয়ানার উপর দিয়ে যাবার সময় অজানা জমাট বরফের কারণে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে সয়াবিনেরবাগানে পতিত হলে এ ঘটনা আবারো চিন্তার উদ্রেক করে। উল্লেখ্য,এই দূর্ঘটনায় ৬৩ যাত্রীর সকলেই মৃত্যুবরণ করে। এ ব্যাপারে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন এডমিনিস্ট্রেশন(FAA)তদন্ত শুরু করে এবং পরবর্তীতে আরো ৩২ টি ঘটনা র ক্ষেত্রে এমন ব্যাপার আবিষ্কার করে। তাদের তদন্তে অতিউচ্চতায় ইঞ্জিনের হঠাৎ থেমে যাওয়া,সেন্সরের অদ্ভুতত্রুটি ,রহস্যজনক ভারীবৃষ্টির আবির্ভাব ,আকাশ পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং রাডারে আবহাওয়া পরিবর্তনের কোনো আভাস না পাওয়া ইত্যাদি অদ্ভুত সব সমস্যার দেখা মিলে।

untitled-4

কানাডার আবহ-পদার্থবিদ ওয়াল্টারস্ট্যাপ বলেন ‘লোকজন বুঝতেই পারেনা ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে। অতি উচ্চতায় পানির জমাট বেঁধে যাওয়া নিয়ে বিভিন্নতত্ত্ব আছে।’ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাইলট ১০ হাজার ফুট(৩০০০মিটার) এর নীচে ইঞ্জিনকে আবার চালু করতে সক্ষম হন। এবং যাত্রীরা সেই যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান যদি ও তাদেরকে ভয়ানক ঝাঁকুনির অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে যেতে হয়। তবে একটা ক্ষেত্রে ইঞ্জিন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় আর পাইলট কোনোমতে বিমান কে অবতরণ করতে সক্ষম হন।

FAA-র তদন্তে পাওয়া যায় ইঞ্জিনের সমস্যা দেখা দেয় এক ধরনের জমাট বরফের কারণে।যদিও শুধুমাত্র বিমানের উত্তপ্ত অংশগুলোতেই কেন প্রভাব ফেল তোতা বুঝা যায় নি। সাধারণভাবে পানি জমাট বেঁধে বরফ হবার কারণ হিসেবে ধরা হয়-পানি যখন বিমানের শীতলঅংশে আসে তখন তা অতিহিমায়িত হয়ে বরফে পরিণত হয়। পাইলটরা বিমানের উইনশিল্ডের উপর এ ধরনের জমাট বরফ দেখতে পান। কানাডার ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের বিজ্ঞানী ভ্যানফুয়েলকিবলেন,‘এটা খুবই স্পষ্ট। এটা শুধু মাত্র ২২ হাজার ফুটের নীচে ঘটে এবং জমাট বৃষ্টির ব্যাপারটি রাডারেও দৃশ্যমান হয়।’ আর সে জন্য বিমানে নতুন ধরনের সেন্সর লাগানো হয় যাতে করে পাখা হতে বরফ-অপসারকস্প্রে করা যায়।

কিন্তু এসবের কিছুই কেলাসিত বরফের ক্ষেত্রে খাটে না। স্বাভাবিক বরফজমাট বাঁধার পদ্ধতি থেকে ভিন্ন এক পদ্ধতিতে স্ফটিক বরফ জমাট বাঁধে।এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পানি আর তরল থাকতে পারে না।

মূল সমস্যা সৃষ্টি করে কেলাসিত বরফের ছোট ধূম বা কণা গুলো।এদের ব্যাস ৪০ মাইক্রোমিটারের মতো। এগুলো বৃষ্টিপরিমাপক রাডারে ও ধরা পড়েনা। এই কেলাসগুলো কঠিন হবার দরুন বিমানের উইনশিল্ড এবং অন্যান্য অংশ আঘাত প্রাপ্ত হয়। যখনই বিমানের উত্তপ্ত অংশ যেমন ইঞ্জিন কিংবা পিটটটিউবের সংস্পর্শে আসে তখনই এরা গলতে শুরু করে। মাঝে মাঝে গরম উইনশিল্ডে লেগেও এরা গলে যায় আর ফলশ্রুতিতে একধরনের অদ্ভুত বৃষ্টি দেখা দেয়। এরকথা প্রতিবেদন গুলোতে পাওয়া যায়।

untitled-4

এসব কেলাসের একটি স্তর গলতে শুরু করলে আরো কেলাস তৈরি হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এরা ইঞ্জিনের উপর জমতে থাকে এবং এইস্তূপীকৃত কেলাস গুচ্ছ ইঞ্জিনকে ক্ষতি গ্রস্তকরে দেয়। সেন্সরের মধ্যে সৃষ্টকেলাস আরো ভয়ানক ক্ষতি করে। ফ্লাইট ৪৪৭ এর ক্ষেত্রে বরফের কেলাস পিটটটিউবকে অবরুদ্ধ করে দেয় যার কারণে এটি ভুল পাঠ দেয়া শুরু করে। ফলস্বরূপ অটো-পাইলট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মূল পাইলটরা ও বিভ্রান্ত হয়ে তাদের স্বাভাবিক ট্রেনিং এর বিপরীত ব্যবস্থা নিতে থাকে। তারা মনে করে ছিল বিমানটি তার উচ্চতা হারাচ্ছে। সেই কারণে বিমানটিকে তারা কৌণিক ভাবে উর্দ্ধগামী করে দেন যা বিমানটিকে একেবারে থামিয়ে দেয়।

বিমান দূর্ঘটনার কারণ হিসেবে যতই কেলাসিত বরফকে দায়ীকরা হয় ততই ব্যাপারটি স্পষ্ট হতে থাকে এবং গ্রহণযোগ্য কিছু কারণ ও পাওয়া যায়। ২০১১ সালে প্রকাশিত নাসার একটি প্রতিবেদন FAA এর পূর্বেকার অনুমান সংশোধন করে বলে যে,

১৯৮০ সাল থেকে প্রায় ১৪০ টি ঘটনার সাথে এই কেলাস বরফ সংশ্লিষ্ট এবং প্রতিবেদনটি একে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখার জন্য সাবধান করে দেয়।

সুতরাং বিমানের ইঞ্জিন নতুন ভাবে নকশা করার এটাই উপযুক্ত সময় যেন এ ধরনের কেলাসিত বরফ বিমানের কোনোরূপ ক্ষতি করতে না পারে। এউদ্দেশ্যেই ২০০৬ সালের একটি মাল্টিন্যাশনাল প্রোগ্রামে নাসা ,ন্যাসনালরিসার্চ সেন্টার- কানাডা,এয়ারবাস ও বোয়িং সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যোগ দিয়েছিল। কিন্তু ইঞ্জিন ডিজাইন করার আগে তাদের জানা দরকার ছিল কীভাবে উত্তপ্ত ইঞ্জিনে এই কেলাসিত বরফ দানা বাঁধে। তার মানে ঠিক একই পরিস্থিতি ল্যাবে সৃষ্টি করতে হবে। ওহায়োও’ রক্লিভল্যান্ডে অবস্থিত নাসারল্যাবে হিমশীতল তাপমাত্রা সহ ঘণ্টায় একশত মাইল গতিবেগের বাতাস এবং খুবই অল্প চাপের ব্যবস্থা করা হয় যে রকমটি একটি বিমান ৩০ হাজার ফুট উপরে সহ্য করে।

প্রায় এক বছর কাজকরার পর,কেলাসিত বরফ বিশেষজ্ঞ জুডিভ্যানজ্যান্টে এবং এরোস্পেস প্রকৌশলী অ্যাশলিফ্রেজেল একটি ‘আইসবার’-এর বিন্যাস করতে সক্ষম হন যা মিনিটের মধ্যে কেলাসিত বরফের মতো একইরকম আকৃতি এবং ঘনত্ব বিশিষ্ট কেলাস তৈরি করে ইঞ্জিনের মধ্যে দিয়ে স্প্রে করতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত না সেগুলো গরম ব্লেডের উপর জমতে শুরু করে। কিন্তু পরিকল্পনা মতো কাজ এগোলো না। তারা যখন বরফ-মেঘ জেনারেটর (তৈরিকৃত যন্ত্র) চালু করলেন তাতে একটি প্রতিবন্ধকতা দেখা দিল। সৃষ্টি হওয়া কেলাস বরফগুলো বালু-বিস্ফোরক কণার মতো আচরণ করা শুরু করল এবং সংবেদনশীল পরিমাপক যন্ত্র গুলোকে নষ্ট করে দিল। যে সব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়নি সেগুলো ভুল পরিমাপ দিতে থাকল।ভ্যানজ্যান্টে বলেন ‘আমাদের আরো উন্নত মানের এবং শক্তিশালি কোনো যন্ত্র নির্মাণ করতে হবে।’

তাদের কাজ বরফ জমাট বাঁধার একটি জটিল কাঠামো উন্মোচন করল। বরফের কেলাস গুলো প্রথম দশাতেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং ছোট ছোট কণার মেঘ তৈরি করে। তাদের এই সমীক্ষা ভিত্তিক মডেল কে কার্যকরী মডেলে রূপান্তর করা পদার্থবিদ্যার এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। এখনকার জন্য তারা নতুন একটি সহজ মডেল তৈরি করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন যেন বরফ তৈরির ঝুঁকি কিছুটা কমে আসে।

‘একটি পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক মডেল বানাতে হয়তো আরো বছর দশেক লাগবে’ ফ্রজেল বললেন। এরপর মডেলটিকে ইঞ্জিনে পুনরায় রূপ দিতে প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে। কিন্তু বিমানকে আকাশে উড্ডয়নে ধরে রাখতে এবং এই রহস্যজনক কেলাসিত বরফের সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের একটি তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন।

বোয়িং কোম্পানি পূর্বে এই কেলাসবরফ এবং ক্ষীয় মাণ পরিচলন ঝড়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা চালিয়ে ছিল। এই ঝড় ব্জ্রপাত সহকারে বিশাল পরিমাণ পানি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে যায় যা সাধারণ বৃষ্টিপাতের চেয়ে তিন গুণ বেশি। তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে, এই ঝড় গুলোর জন্য তাপ প্রয়োজন যার কারণে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আসা ঝড়গুলো অপেক্ষাকৃত উষ্ণতর অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে।

টমরাটভ্‌স্কি এবং তার সহকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিলেন,সবচেয়ে ভালো হয় যদি এই ব্যাপারটি একে বারে একই পরিস্থিতিতে সরাসরি বিমানচালিয়ে পর্যবেক্ষণ করা যায়। তারা যুতসই আবহাওয়ায় সেন্সরযুক্ত একটি জেটপ্লেন সমস্যাযুক্ত হটস্পটে চালিয়ে দেখলেন আর ফলাফলও পেলেন। পরিকল্পিত ভাবে জেট প্লেনকে তথাকথিত High Water Ice Condition(HWIC) এর মধ্যে দিয়ে চালিয়ে দেখলেন তাপমাত্রা হিমাংকের ও নীচে নেমে যায় যা কেলাস বরফ সৃষ্টি করার জন্য একদম আদর্শ। রাটভস্কি HWIC এবং পরিচলন ঝড়ের মধ্যকার সম্পর্ককে নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। তিনি আবিষ্কার করেন,পরিচলন ঝড় পানির কণাগুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ অক্ষাংশে তাড়িয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু এব্যাপারটি কেবল মাত্র তখনই ঘটে যখন ঝড় কমতিরদিকে থাকে। কেন কমতির দিকে থাকলে এই ব্যাপারটি ঘটেতা জানা সম্ভব হয় নি। এটা আশা করা যায়,সবগুলো তথ্য এক ত্রক রলে HWIC সম্পর্কিত বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। গবেষকরা স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে কোথায় কোথায় কেলাসিত বরফ সৃষ্টিহতে পারে তার পূর্বাভাস দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সেইসাথে রাডারের মাধ্যমেও এর শনাক্ত করণের জোর চেষ্টা চলছে। আর হয়তো কয়েক বছরের মধ্যের ইঞ্জিনেরপুনঃনকশাও করা যাবে।

অদৃশ্য হত্যাকারী

ফুয়েল কি এবং তার দল সফলভাবে বিদ্যমান যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দুটি সেন্সর তৈরি করতে সক্ষম হন। প্রথমটি, একটি বিয়ার ক্যানের আকৃতির যন্ত্র যারনাম দেয়া হয়েছে পার্টিক্যাল আইস প্রোব,যা বিমানের বাইরের দিকে লাগানো যাবে। এটি বাতাসের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে ছোটছোট কণার উপস্থিতি শণাক্ত করতে পারে। এটি আসলে বিমানের ধ্বংসাবশেষ শণাক্তকরণের জন্য বানানো হয়েছিল। কিন্তু দলটি একে পরিবর্তন করে কেলাসিত বরফের বিশেষ সংকেত শনাক্ত করণের কাজেলাগাতে সক্ষম হয়। অন্য যন্ত্রটি একটি শব্দোত্ত র জমাট-বরফ শনাক্তকরণের সেন্সর। এটি সরাসরি ইঞ্জিনেরভেতর কার জমাট বরফ পরিমাপ করতে পারে। কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।

কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথেসাথে পরিবর্তিত হয়। দুটো যন্ত্রই এতটা উন্নত যে জনাব ফুয়েলকি এগুলো বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়ার কথা ভাবছেন।

কিন্তু বিমানে এই সেন্সর আর রাডার লাগানোর পর ও মূল সমস্যার সমাধান হলো না। একটা কারণ হলো,এখনো কেলাসিত বরফের প্রকৃত পরিমাণ মাপা সম্ভব হয়নি। যার ফলে এখনো বিমান দূর্ঘটনা ঘটেই চলছে। উদাহরণস্বরূপ,২০১৪ সালের এয়ার আলজেরিয়ার ফ্লাইট ৫০১৭ এর কথা বলা যায় যেখানে ১১৬ জনের মতো যাত্রী মারা যায়।

ফ্লাইট ৪৪৭ এর পিটটটিউব অবরুদ্ধ হবার কথা ব্ল্যাকবাক্সের মাধ্যমে জানাসম্ভব হলেও একই রকম অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে সেটাও জানা সম্ভব হয়নি। মাঝে মাঝে বিমানের অল্পবিস্তর ক্ষতি সাধিত হয়ে ইঞ্জিন আবার পুনরায় সচল করা সম্ভব হয়। কিন্তু ঠিক কী কারণে ১০ হাজার ফুটের নীচে আসলেই কেলাসিত বরফের সকল চিহ্ন উধাও হয়ে যায় তা জানা সম্ভব হয়নি।

সমস্যাটি আরো প্রকোপ আকার ধারণ করার সুযোগ আছে। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী দিনদিন উত্তপ্ত হচ্ছে যার ফলে আবহাওয়ার অস্থিরতাও বাড়ছে। আর এমন পরিস্থিতিতে কেলাসিত বরফসৃষ্টি হবার সম্ভাবনা ও প্রবল। যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটিঅবরিডিং’ এর আবহাওয়া বিদ সুগ্রেবলেন, ‘এ অবস্থা আরো সক্রিয় হবে এবং বারবার ঘটবে’। সাম্প্রতিক কালে রোলসরয়েস ইঞ্জিন ল্যাবের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে কেলাসিত বরফ আরো প্রসার লাভ করবে এবং সহজেই সৃষ্ট হতে পারবে। এই কোম্পানির এক ইঞ্জিন বিশেষজ্ঞ ররিক্লার্কসন কোম্পানিকে এক অসুবিধা জনক কিন্তু নিরাপদ উপায় বাতলে দেন।তাহ লো,‘খারাপ আবহাওয়ায় বিমান উড্ডয়ন বন্ধরাখুন’।

তথ্যসূত্র

Hot Ice:The Invisible threat making planes fall out of the sky, New Scientist

https://www.newscientist.com/article/mg23130800-700-hot-ice-the-race-to-understand-a-sinister-threat-to-aircraft/