স্পেস এক্সের ফ্যালকন হেভির অন্য এক গোপন উদ্দেশ্য, যার কথা খুব কম মানুষই জানে

গত সপ্তাহে স্পেস এক্সের ঐতিহাসিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট উৎক্ষেপণের পর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে স্টারম্যান এবং টেসলা। তবে সেটার পাশাপাশি আরো একটি জিনিস মহাকাশে নিয়ে গেছে ফ্যালকন হেভি যার সম্পর্কে তেমন কারো আগ্রহ দেখা যায়নি।

টেসলা রোডস্টার গাড়িটির ভেতরে লুকানো ছিল বিলিয়ন বছর ধরে টিকে থাকতে সক্ষম ছোট্ট রহস্যময় একটি বস্তু। মহাকাশ কিংবা দূরবর্তী কোনো গ্রহের পৃষ্ঠেও যা থাকবে অটুট। এটার নাম আর্ক । যা দেখতে কয়েনের মতো কোয়ার্টজ ক্রিস্টালের একটা ডিস্ক। এটা তৈরি কিরা হয়েছে প্রচুর পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করে রাখার জন্য।

ফ্যালকন হেভির উৎক্ষেপন; Image Source: spacenews.com

এই প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে আর্ক মিশন ফাউন্ডেশন নামক এক ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। তাদের ভাষ্যমতে আর্ক ডিস্ক স্থান কালের বাঁধা অতিক্রম করে জ্ঞানকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সংরক্ষণ ও ছড়িতে দিতে পারব।

দেখে মনে হতে পারে আর্ক হলো ডিভিডি কিংবা ব্লু রে ডিস্কের মিনিয়েচার, তবে এর সংরক্ষণ ক্ষমতা ঘরের ডিস্কগুলোর চেয়ে হাজার গুন বেশি। এর ধারণক্ষমতা তত্ত্বীয়ভাবে ৩৬০ টেরাবাইট যা প্রায় ৭০০০ ব্লু রে ডিস্কের সমান।

তবে ধারণক্ষমতার চেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো এর আয়ুষ্কাল। আর্কের প্রথম দুটো ভার্শন আর্ক ১.১ এবং আর্ক ১.২ কে বলা হয় মানুষের দ্বারা এযাবতকালের তৈরি সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর এরা ১৪ বিলিয়ন বছর পরেও নষ্ট হবে না। এই ডিস্কে কোয়ার্টজ সিলিকা গ্লাসের গায়ে লেজার ন্যানোস্ট্রাকচারিং এর মাধ্যমে তথ্যগুলো সংরক্ষণ করা হয়।

সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর্ক; Image source: www.sciencealert.com

উৎক্ষেপিত টেসলা গাড়িটি মহাকাশে ঘন্টায় ১২৯০৮ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে, আর তাতে লুকিয়ে রাখা আর্ক ১.২ ডিস্ক বহন করে নিয়ে যাচ্ছে আইজ্যাক আসিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজের তিনটি বইয়ের ডিজিটাল প্রতিরূপ। আর্ক তৈরির সাথে জড়িতরা এই পদক্ষেপের নাম দিয়েছেন “সোলার লাইব্রেরি”। সহ প্রতিষ্ঠাতা নোভা স্পিভ্যাক আশা করেন, এই সোলার লাইব্রেরি বিলিয়ন বছর ধরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। তিনি আরো বলেন “ভেবে নিন এটা সূর্যকে প্রদক্ষিণকারী একটি জ্ঞানের বলয়, যা মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে সৌরজগত এবং এরও বাইরে ছড়িয়ে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ।”

২০২০ এবং ২০৩০ সালে আরো দুটি রকেট উৎক্ষেপনের পরিকল্পনা মাথায় রেখে তারা কাজ করছেন। প্রথমটার উদ্দেশ্য হবে চাঁদ, পরেরটার মঙ্গল। লাল গ্রহে পাঠানোর জন্য যে ডিস্কটি তৈরি হবে সেটার সংরক্ষিত তথ্য সেখানকার উপনিবেশকারীদের স্থানীয় ইন্টারনেট তৈরিতে কাজে লাগবে।

কথাগুলো শুনতে আশ্চর্য শোনালেও সত্যিকার পরিকল্পনা আরো বড়। আর্কের পেছনের মানুষেরা চান এই আর্ক লাইব্রেরিগুলো সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ এবং তার বাইরেও ছডিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদানের বিকেন্দ্রীভূত একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে। বেশ উচ্চাভিলাসি মনে হলেও আপনি নিজেকেই প্রশ্ন করুন তো, কখনো কি ভেবেছিলেন ২০১৮ সালে টেসলা রোডস্টার সূর্যকে প্রদক্ষিন করবে?

featured image: mensxp.com

বিগ ব্যাং নয়, সৃষ্টির শুরুতে হয়েছিল বিগ বাউন্স: দুই দল পদার্থবিদদের নতুন দাবী

বর্তমান আদর্শ জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিগ ব্যাং তত্ত্ব মহাবিশ্বের সৃষ্টির তত্ত্ব হিসেবে নিজের আসন প্রায় স্থায়ী করেই নিয়েছে। জ্যোতিপদার্থবিদরাও এই তত্ত্বকেই মহাবিশ্বের শুরুর সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব হিসেবে মেনে নিয়েছেন। এর বিপরীতের মহাবিশ্বের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব সেই বহুদিন আগেই হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে ইনফ্লেশান তত্ত্বকেও বিগব্যাঙ্গের ভেতরেই ধরা হয় এবং বিগ ব্যাং এর শুরুটা এই ইনফ্লেশান তত্ত্ব দিয়েই সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। ইনফ্লেশানের ফলে আমাদের মহাবিশ্ব অতি ক্ষুদ্র সময়ে অস্বাভাবিক রকম বৃহৎ আকার ধারণ করেছিল।

সময়ের স্কেলে ইনফ্লেশান এবং বিগ ব্যাং; image source: map.gsfc.nasa.gov

যদিও ইনফ্লেশান তত্ত্বের ইনফ্লেশানের শুরু নিয়ে এর বিপক্ষেও বেশ কিছু মতবাদ রয়েছে এবং সরাসরি পরীক্ষার মাধ্যমে এর সপক্ষে এখনো কোন প্রমাণ জোগাড় করা যায়নি। তাই বিগত বেশ কিছু বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা অন্যরকম ব্যাখ্যার নতুন কোন তত্ত্ব খোঁজার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর তারই ফলাফলস্বরুপ তাদের নতুন এক প্রস্তাবনা হলো বিগ বাউন্স মডেল।

তবে বিগ বাউন্সের সমর্থনকারী জ্যোতিপদার্থবিদরাও এর প্রকৃতি নিয়ে মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত। এদের একদল পদার্থবিদ মনে করেন আমাদের মহাবিশ্বটি আমাদের দেহের ফুসফুসের মতো একবার বড় হয় আবার একবার ছোট হয় এবং এই চক্রটি চলতেই থাকে। তবে আমাদের মহাবিশ্ব এই চক্রে ছোট হতে হতে কখনোই একদম শূন্য হয়ে যায় না। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ছোট হওয়ার পর আমাদের মহাবিশ্বটি আবার প্রসারিত হতে শুরু করে। আরেক দল পদার্থবিদ মনে করেন, আমাদের মহাবিশ্বটি বার বার নয় এর আগে শুধু একবারই সঙ্কুচিত হয়েছিল আর তা একটি নির্দিষ্ট আকারে ছোট হওয়ার পর আবার প্রসারিত হতে শুরু করেছে এবং সারা জীবন প্রসারিত হতেই থাকবে।

তবে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি দিয়ে হয়তবা খুব দ্রুতই এই বিতর্কের অবসান করা যাবে। সামনের কয়েক বছরের মাঝেই আমাদের টেলিস্কোপগুলো মহাজাগতিক ইনফ্লেশানের প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়ে যেতে পারে। তবে এ জন্য আমাদের বিগ ব্যাঙ্গের সময় তৈরি হওয়া কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশানে এক ধরনের হালকা ঘূর্ণন বা, পাক সনাক্ত করতে পারতে হবে। তবে যদি সামনের কয়েক দশকেও এই প্রমাণ আমরা না দেখতে পাই তারপরও কিন্তু ইনফ্লেশান তত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণ হয়ে যাবে না। কারণ এই কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশানের এই পাক বা, ঘূর্ণনটি খুবই হালকা কোন যন্ত্রের মাধ্যমে সনাক্ত করার জন্য। তবে ইনফ্লেশানের পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রমাণ না পাওয়া গেলে যুক্তিযুক্তভাবেই বিগ বাউন্সের মডেলটি আরো শক্ত ভিত্তি পাবে। কারণ এই মডেল কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশানে কোনো রকম পাক বা, ঘূর্ণনের ভবিষ্যৎবাণী করে না।

গত বছরই পদার্থবিদরা দুটি নতুন পথের সন্ধান দিয়েছেন যেভাবে বিগ বাউন্স ঘটে থাকতে পারে। এর মাঝে একটি পেপার জার্নাল অভ কসমোলজি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোপার্টিকেল ফিজিক্সে খুব দ্রুতই প্রকাশিত হবে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্না ইজ্জাস এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল স্টেইনহার্ডট এই পেপারটি লিখেছেন। পল স্টেইনহার্ডট বিগ বাউন্সের পক্ষের একজন পরিচিত জ্যোতিপদার্থবিদ।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্না ইজ্জাস; image source: quantamagazine.org

তবে মজার বিষয় হলো, বিগ বাউন্স তত্ত্ব নিয়ে আরো একটি পেপার ফিজিক্যাল রিভিউ ডি’তে প্রকাশ হওয়ার জন্য গৃহীত হয়েছে। এই পেপারটির লেখক পদার্থবিদদের এক বিখ্যাত ত্রিরত্ন পিটার গ্রাহাম, ডেভিড কাপলান এবং সুরজিত রাজেন্দ্রন। তারা মূলত কণা পদার্থবিজ্ঞানের একটি প্রশ্নের দিকে মনোযোগ নিবিষ্ট করেছিলেন, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাদের সমাধান বিগ বাউন্সের দিকে ইঙ্গিত করে।

(বাম থেকে) পদার্থবিদদের এক বিখ্যাত ত্রিরত্ন পিটার গ্রাহাম, ডেভিড কাপলান এবং সুরজিত রাজেন্দ্রন; image source: quantamagazine.org

পদার্থবিদ স্টেইনহার্ডট মনে করেন, বিগ বাউন্স আমাদের মহাবিশ্বের বিভিন্ন ঘটনা বেশ ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে। আমাদের মহাবিশ্বের সর্বত্র যে পদার্থের ঘনত্ব প্রায় একই তা বিগ বাউন্স তত্ত্ব থেকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব এমন একটি পেপার স্টেইনহার্ডট আরো তিনজন পদার্থবিজ্ঞানীর সহায়তায় ২০০১ সালে প্রকাশ করেছিলেন।

আবার বিগ বাউন্সের প্রতিদ্বন্দী ইনফ্লেশান তত্ত্বেরও কিছু বিষয় বেশ বিতর্কিত রয়েছে। ১৯৮০ সালে অ্যালেন গুথ এবং আন্দ্রে লিন্ডে মূলত ইনফ্লেশানের এই তত্ত্ব প্রদান করেন। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে বিগ বাউন্স তত্ত্বের সমর্থক স্টেইনহার্ডটও সেসময় ইনফ্লেশান তত্ত্বের উন্নয়নে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু ইনফ্লেশান তত্ত্ব আসার পরপরই ইনফ্লেশানের ফলাফল হিসেবে মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্বের ধারণা আসলো এবং দেখা গেলো যে, ইনফ্লেশান সত্য হলে আমাদের মহাবিশ্বের বাইরেও আরো অসংখ্য মহাবিশ্ব থাকতেই হবে। এ বিষয়টা অনেক পদার্থবিদই কিছুটা বাড়াবাড়ি বলে মনে করলেন। স্টেইনহার্ডটও তাদেরই একজন ছিলেন, যে কারণে তিনি ইনফ্লেশান তত্ত্ব থেকে বিগ বাউন্স তত্ত্বের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

image source: quantamagazine.org

আমাদের মহাবিশ্ব যে সঙ্কুচিত হতে পারে এই ধারণা ১৯৬০ সালের দিকে বিজ্ঞানীদের মাথায় প্রথম আসতে থাকে। এ সময় ব্রিটিশ পদার্থবিদ রজার পেনরোজ এবং স্টেফেন হকিং ‘সিঙ্গুলারিটি থিওরেম’ নামের একটি থিওরেম প্রমাণ করেন। তারা দেখান, খুব সাধারণ পরিবেশে সঙ্কুচিত হতে থাকা পদার্থ এবং শক্তিগুলো অবধারিতভাবে সিঙ্গুলারিটি নামের একটি অসীম ঘনত্বের বিন্দুতে পরিণত হয়। এই কথাটি শুধু ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রেই সত্য নয়, আমাদের মহাবিশ্বের ক্ষেত্রেও সত্য। তাই আমাদের মহাবিশ্ব সঙ্কুচিত হতে থাকলে তা একসময় সিঙ্গুলারিটি অবস্থার তৈরি করার কথা, যে অবস্থায় আলবার্ট আইনস্টাইনের মহাকর্ষের তত্ত্ব ভেঙ্গে পড়ে এবং আমাদের জানা পদার্থবিজ্ঞান আর কাজ করে না। এখানে আমাদের অবশ্যই কোয়ান্টাম মহাকর্ষের নতুন তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে, যা আমাদের এখনো অজানা।

নতুন আসা বিগ বাউন্সের দুটি মডেলই এই সিঙ্গুলারিটি ধারণার ভেতরে থাকা একটি ছিদ্র বা, সিঙ্গুলারিটি পরিহারের উপায়গুলো নিয়ে নিয়ে কাজ করেছে।

বিগ বাউন্সের পক্ষের জ্যোতিপদার্থবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে, সিঙ্গুলারিটি পরিহার করে বিগ বাউন্স সম্ভব যদি আমাদের মহাবিশ্বের ভেতরে ঋণাত্মক শক্তির উপস্থিতি বা, ঋণাত্মক চাপের কোনো উৎস থেকে থাকে। এই ঋণাত্মক চাপ বা, ঋণাত্মক শক্তি মহাকর্ষের প্রভাবে সবকিছুর যে সঙ্কোচন ঘটে তাকে বাঁধাগ্রস্থ করবে এবং সবকিছুকে সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছানোর পূর্বেই দূরে সরিয়ে দেবে। এভাবে বিগ বাউন্স মডেল সিঙ্গুলারিটিকে ফাঁকি দিয়ে তার সঙ্কোচন প্রসারণ অব্যাহত রাখে। বিগ বাউন্স মডেলের সমর্থকরা বহুদিন ধরেই সিঙ্গুলারিটি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এই পথ অবলম্বনের চেষ্টা করে আসছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, তাদের মডেল অনুসারে আমাদের মহাবিশ্বে ঋণাত্মক শক্তি যোগ করলে আমাদের মহাবিশ্ব খুব বেশি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, যা আমাদের মহাবিশ্বের অস্তিত্বকেই হুমকির মাঝে ফেলে দেয়। উপরন্তু ২০১৬ সালে এসে রাশিয়ান পদার্থবিদ ভ্যালেরি রুবাকোভ এবং আরো কয়েকজন পদার্থবিদ মিলিতভাবে ‘নো গো থিওরেম’ নামে একটি থিওরেম প্রমাণ করে দেখান, যা বিগ বাউন্সের প্রস্তাবিত মডেলগুলোর মাঝের অনেকগুলোকেই সরাসরি বাতিল করে দেয়।

এরপর গত বছর পদার্থবিদ ইজ্জাস এমন এক বিগ বাউন্সের মডেল খুঁজে পান যা ভ্যালেরি রুবাকোভের ‘নো গো থিওরেম’কে ফাঁকি দিতে পারে। আর তার এই মডেল থেকে সৃষ্টি হওয়া মহাবিশ্বও বেশ স্থিতিশীল হয়। যা বিগ বাউন্স মডেলের সমর্থকদের জন্য বেশ স্বস্তিদায়ক এক বিষয়। এখনো পর্যন্ত এই মডেলকেই বিগ বাউন্সের সবচেয়ে সেরা মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আর বিগ বাউন্সের নতুন দুটি প্রস্তাবনার ক্ষেত্রেই যে বিষয়টি একই তা হলো দুটি প্রস্তাবনাই সিঙ্গুলারিটিকে ফাঁকি দিতে পারে, যার অর্থ আমরা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি বা, মহাকর্ষের সাধারণ তত্ত্ব দিয়েই এই বিগ বাউন্সকে ব্যাখ্যা করতে পারি। মহাকর্ষের কোয়ান্টাম চরিত্র নিয়ে চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

এখন দেখার বিষয় পদার্থবিদদের সবচেয়ে পছন্দের এবং এখনো পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব ইনফ্লেশান ভবিষ্যতে সত্য প্রমাণিত হয় নাকি বিগ বাউন্স মডেল সত্য হিসেবে আবির্ভূত হয়।

featured image: quantamagazine.org

স্পেস এক্সের ফ্যালকন হেভির অন্য এক গোপন উদ্দেশ্য, যার কথা খুব কম মানুষই জানে

গত সপ্তাহে স্পেস এক্সের ঐতিহাসিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট উৎক্ষেপণের পর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে স্টারম্যান এবং টেসলা। তবে সেটার পাশাপাশি আরো একটি জিনিস মহাকাশে নিয়ে গেছে ফ্যালকন হেভি যার সম্পর্কে তেমন কারো আগ্রহ দেখা যায়নি।

টেসলা রোডস্টার গাড়িটির ভেতরে লুকানো ছিল বিলিয়ন বছর ধরে টিকে থাকতে সক্ষম ছোট্ট রহস্যময় একটি বস্তু। মহাকাশ কিংবা দূরবর্তী কোনো গ্রহের পৃষ্ঠেও যা থাকবে অটুট। এটার নাম আর্ক । যা দেখতে কয়েনের মতো কোয়ার্টজ ক্রিস্টালের একটা ডিস্ক। এটা তৈরি কিরা হয়েছে প্রচুর পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করে রাখার জন্য।

ফ্যালকন হেভির উৎক্ষেপন; Image Source: spacenews.com

এই প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে আর্ক মিশন ফাউন্ডেশন নামক এক ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। তাদের ভাষ্যমতে আর্ক ডিস্ক স্থান কালের বাঁধা অতিক্রম করে জ্ঞানকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সংরক্ষণ ও ছড়িতে দিতে পারব।

দেখে মনে হতে পারে আর্ক হলো ডিভিডি কিংবা ব্লু রে ডিস্কের মিনিয়েচার, তবে এর সংরক্ষণ ক্ষমতা ঘরের ডিস্কগুলোর চেয়ে হাজার গুন বেশি। এর ধারণক্ষমতা তত্ত্বীয়ভাবে ৩৬০ টেরাবাইট যা প্রায় ৭০০০ ব্লু রে ডিস্কের সমান।

তবে ধারণক্ষমতার চেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো এর আয়ুষ্কাল। আর্কের প্রথম দুটো ভার্শন আর্ক ১.১ এবং আর্ক ১.২ কে বলা হয় মানুষের দ্বারা এযাবতকালের তৈরি সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর এরা ১৪ বিলিয়ন বছর পরেও নষ্ট হবে না। এই ডিস্কে কোয়ার্টজ সিলিকা গ্লাসের গায়ে লেজার ন্যানোস্ট্রাকচারিং এর মাধ্যমে তথ্যগুলো সংরক্ষণ করা হয়।

সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর্ক; Image source: www.sciencealert.com

উৎক্ষেপিত টেসলা গাড়িটি মহাকাশে ঘন্টায় ১২৯০৮ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে, আর তাতে লুকিয়ে রাখা আর্ক ১.২ ডিস্ক বহন করে নিয়ে যাচ্ছে আইজ্যাক আসিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজের তিনটি বইয়ের ডিজিটাল প্রতিরূপ। আর্ক তৈরির সাথে জড়িতরা এই পদক্ষেপের নাম দিয়েছেন “সোলার লাইব্রেরি”। সহ প্রতিষ্ঠাতা নোভা স্পিভ্যাক আশা করেন, এই সোলার লাইব্রেরি বিলিয়ন বছর ধরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। তিনি আরো বলেন “ভেবে নিন এটা সূর্যকে প্রদক্ষিণকারী একটি জ্ঞানের বলয়, যা মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে সৌরজগত এবং এরও বাইরে ছড়িয়ে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ।”

২০২০ এবং ২০৩০ সালে আরো দুটি রকেট উৎক্ষেপনের পরিকল্পনা মাথায় রেখে তারা কাজ করছেন। প্রথমটার উদ্দেশ্য হবে চাঁদ, পরেরটার মঙ্গল। লাল গ্রহে পাঠানোর জন্য যে ডিস্কটি তৈরি হবে সেটার সংরক্ষিত তথ্য সেখানকার উপনিবেশকারীদের স্থানীয় ইন্টারনেট তৈরিতে কাজে লাগবে।

কথাগুলো শুনতে আশ্চর্য শোনালেও সত্যিকার পরিকল্পনা আরো বড়। আর্কের পেছনের মানুষেরা চান এই আর্ক লাইব্রেরিগুলো সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ এবং তার বাইরেও ছডিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদানের বিকেন্দ্রীভূত একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে। বেশ উচ্চাভিলাসি মনে হলেও আপনি নিজেকেই প্রশ্ন করুন তো, কখনো কি ভেবেছিলেন ২০১৮ সালে টেসলা রোডস্টার সূর্যকে প্রদক্ষিন করবে?

featured image: mensxp.com

মানুষের স্মৃতিশক্তিকে নিয়ন্ত্রণের পথে বিজ্ঞান

ভাবুন তো, আমাদের যদি স্মৃতি না থাকত তাহলে কী হতো? একটা ঘটনা ঘটার পরে আমরা আর তা কোনো দিনও মনে করতে পারতাম না। সুস্বাদু বিরিয়ানী খাবার পরে ২য় বার আর তা কখনোই খেতে চাইতাম না। কারণ সেই বিরিয়ানী খাওয়ার কোন স্মৃতিই যে আমাদের মস্তিষ্কে নেই। কিংবা নিজের প্রেমিক বা, প্রেমিকাকেই কিছুক্ষণ পর চিনতে পারতাম না। অর্থাৎ, স্মৃতি যে আমাদের জীবনের কত গুরুত্বপূর্ণ এক অংশ তা আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি। আর বিজ্ঞানীরা এখন আমাদের সেই স্মৃতিকেই নিয়ন্ত্রণের পথে। হয়ত অদূর ভবিষ্যতেই তারা আমাদের অতীতের কোনো স্মৃতিকে ধ্বংস করতে সক্ষম হবেন কিংবা কোনো মিথ্যা স্মৃতিকে আমাদের মস্তিষ্কে সত্য হিসেবে ঢুকিয়েও দিতে পারবেন।

পথের শুরুটা হয়েছিল কার্ল ল্যাশলি নামের একজন বিখ্যাত মনোবৈজ্ঞানিকের হাত ধরে। তিনি ধারণা করেছিলেন যে, আমাদের স্মৃতিগুলো আমাদের মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট অংশের কোষে কিছু নির্দিষ্ট বিন্যাসে সংরক্ষিত হয়ে থাকে। মস্তিষ্কের এই অঞ্চলের কোষের যে সমাবেশ তাকে এনগ্রাম বলে। মস্তিষ্কের এই অংশে পরিবর্তন দেখা যায় যখন আমরা কোন কিছু শিখি আবার মস্তিষ্কের এই অংশ উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে যখন আমরা কোনো কিছু মনে করার চেষ্টা করি। বিভিন্ন ধরনের স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্কের সেই নির্দিষ্ট নিউরন কোষগুলোর মাঝের সংযোগগুলোকে শক্তিশালী করে তোলে। যখন আমাদের মস্তিষ্ক সেই স্মৃতিগুলোকে মনে করার চেষ্টা করে তখন আমাদের মস্তিষ্কের সেই অংশটি আগের সেই সন্নিবেশে উজ্জ্বিবীত হয়।

কার্ল ল্যাশলি; image source: en.calameo.com

ল্যাশলি তার জীবনভর গবেষণায় দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, আমাদের মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট অংশের টিস্যু নষ্ট করে দিলে আমাদের স্মৃতিরও কিছু অংশ সারা জীবনের জন্য নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি তার এই মতবাদ প্রমাণের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু অসাধারণ পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তিনি ইঁদুরদের একটি গোলকধাম বা, গোলকধাঁধা থেকে কীভাবে বের হতে হয় এর উপর প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন এবং তারপর তাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ নষ্ট করে দিচ্ছিলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন তিনি যদি স্মৃতির সেই নির্দিষ্ট অংশ ধ্বংস করতে সক্ষম হন তবে ইঁদুরগুলো তাদের জানা পথ ভুলে যাবে এবং আর গোলকধাম থেকে বের হতে পারবে না। কিন্তু এরপরও ইঁদুরদের মস্তিষ্কের ঠিক কোথায় তাদের স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে তা তিনি বের করতে পারছিলেন না। ল্যাশলী তার সারা জীবন গবেষণার পরেও তার এই মতামতের পক্ষে কোনো প্রমাণ জোগাড় করতে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ১৯৫০ সালের দিকে এসে ল্যাশলি পরাজয় মেনে নেন এবং তার নতুন মত প্রকাশ করেন। নতুন করে তিনি বলেন, আমাদের স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্কের ছোট একটি নির্দিষ্ট অংশে নয় গোটা মস্তিষ্কেই ছড়িয়ে থাকে।

image source: newscientist.com

ল্যাশলির ব্যর্থ গবেষণার প্রায় ৫০ বছর পর এসে টরোন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী শিলা জোসেলিন এক দল ইঁদুরের উপর চালানো একটি পরীক্ষার ফলাফল দেখে বিভ্রান্ত হন এবং ল্যাশলির মতবাদের দিকে নতুনভাবে তাকাতে বাধ্য হন। ইঁদুরের মস্তিষ্কের এক পাশে অ্যামিগডালা নামক অংশে এমন কিছু কোষ রয়েছে যা তাদের স্মৃতির সাথে সংযুক্ত। জোসেলিন দেখলেন অ্যামিগডালা অংশের মাত্র কিছু কোষের বিন্যাস পরিবর্তনে ইঁদুরের স্মৃতিশক্তি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।

ইঁদুরগুলোকে একটা নির্দিষ্ট শব্দ শোনানোর পরে ইলেক্ট্রিক শক দেয়া হতো। এরপর একদল ইঁদুরের অ্যামিগডালা অংশের কোষে পরিবর্তন করা হয়েছিল। আরেক অংশের উপর এই পরিবর্তনের কাজ করা হয়নি। দেখা গেলো, যে ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কের কোষে পরিবর্তন করা হয়েছিল তারা এই ভয়ের স্মৃতি খুব ভালোভাবে মনে রাখতে পারে। কিন্তু অন্য ইঁদুরগুলোর ক্ষেত্রে এই উন্নতি দেখা গেলো না।

image source: thepsychreport.com

এর ফলে আমাদের মস্তিষ্কে স্মৃতিগুলো যে একটি নির্দিষ্ট অংশে থাকে এ ব্যাপারে জোসেলিন একটি আশার আলো দেখতে পেলেন। কিন্তু একটি সত্যিকারের প্রমাণ জোগাড় করতে তার প্রায় ১০ বছর সময় লেগে গেলো।

২০০৯ সালে এসে জোসেলিন এবং তার দল একদল ইঁদুরের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু কোষ ধ্বংস করে দিয়ে তাদের মস্তিষ্ক থেকে কিছু স্মৃতি চিরদিনের জন্য মুছে দিতে সক্ষম হলেন। অবশেষে ল্যাশলির মস্তিষ্কের এনগ্রাম অঞ্চলের খোঁজ শুরুর ১০০ বছরের বেশি সময় পর এসে স্নায়ুবিজ্ঞানী জোসেলিন সেই অঞ্চল খুঁজে পেলেন।

শিনা জোসেলিন; image source: quantamagazine.org

জোসেলিনের দলের এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল এক ধরণের আণবিক যন্ত্র, যা নতুন স্মৃতির সাথে যে নিউরন কোষগুলো উদ্দীপ্ত হত সেগুলোকে চিহ্নিত করতে সক্ষম ছিল।

শব্দ শোনার পর এবং ইলেক্ট্রিক শক দেয়ার আগে ইঁদুরের মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশ উদ্দীপ্ত হয়। সেই অঞ্চলটাকেই খুঁজে বের করল ল্যাশলি এবং তার দল। এরপর ইঁদুরের মস্তিষ্কের সেই অঞ্চলের কোষগুলোকে মস্তিষ্ক থেকে সরিয়ে ফেলা হলো। কিন্তু অন্যান্য কোষগুলোকে আগের মতই রাখা হলো। দেখা গেল ইঁদুরগুলো আর শব্দ শুনে বিচলিত হচ্ছে না। তাদের শব্দ শোনার সাথে সাথে ভয়ের যে অনুভূতির স্মৃতি তা হারিয়ে গেছে।

এরপর আরো উন্নত পরীক্ষাও এসব ইঁদুরদের উপর চালানো হয়েছে। এনগ্রাম অঞ্চলের কোষের কাজ বিশেষ পদ্ধতিতে বন্ধ এবং পুনরায় চালু করে দেখা হয়েছে। এমনকি ইঁদুরদের স্মৃতি শুধু ধ্বংস করতেই বিজ্ঞানীরা সক্ষম হননি, তাদের মস্তিষ্কে মিথ্যা স্মৃতি ঢুকিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও তারা সাফল্য পেয়েছেন।

স্মৃতিকে নিয়ন্ত্রণের পথে এই এগিয়ে চলা একই সাথে অনেক উত্তেজনাপূর্ণ এবং অন্যদিকে খুবই ভীতিজনক। এ ধরনের প্রযুক্তি এতদিন শুধু বিজ্ঞান কল্পকাহিনীতেই দেখা যেত, যেখানে এই প্রযুক্তি কখনো সুখের সন্ধানে আবার কখনও ধোঁকা দিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে এ ধরনের গবেষণা বিভিন্ন স্মৃতিজনিত রোগের চিকিৎসা বা, মাদকাসক্তির চিকিৎসায় অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে গবেষকরা আশাবাদী।

Featured image: humanbrainfacts.org

ঝাঁপ দিন (ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি) ব্ল্যাকহোলে

ব্ল্যাকহোল। মহাজাগতিক এক অন্ধকার দৈত্য। ব্ল্যাকহোলগুলো তৈরি হয় যখন অনেক ভরশালী কোনো তারকা তার সব জ্বালানী নিঃশেষ করে ফেলে এবং তার সব ভর একটা বিন্দুতে এসে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। ব্ল্যাকহোল এমন এক মহাজাগতিক বস্তু যা তার আশেপাশের সবকিছুকে গিলে নেয়। এমনকি আলোকেও। আর এ কারণেই ব্ল্যাকহোল অদৃশ্য এক অন্ধকার জগৎ এবং এর ভেতরে কী আছে তা আমরা শুধু কল্পনায় করতে পারি।

কয়েক বছর আগে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কার করা লাইগোর বিজ্ঞানীরা খুব সম্প্রতি জানতে পেরেছেন যে, আমাদের মহাবিশ্বের ব্ল্যাকহোলগুলো আমাদের আগের ধারণার চেয়েও বেশি ভরসম্পন্ন এবং মহাবিশ্বে এদের সংখ্যাও আমাদের আগের ধারণার চেয়ে অনেক অনেক বেশি।

শিল্প এবং বিজ্ঞানের মিশেলে ব্ল্যাক হোলের একটি চিত্র; image source: resources.perimeterinstitute.ca

তবে আমরা কিন্তু এই রহস্যময় ব্ল্যাক হোলের ভেতরে কী আছে তা এখনো ঠিকমতো জানি না। এর কারণ ব্ল্যাকহোলের ধারণা মূলত আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে আছে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বলে মহাকর্ষ স্থান-কালের বক্রতার ফসল। আর সত্যিকার অর্থেই ব্ল্যাকহোলের ভেতরেও স্থান-কাল খুব মসৃণভাবে বেঁকে গেছে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে (সিঙ্গুলারিটিতে)।

যে তত্ত্বের উপর ভর করে এই ব্ল্যাকহোলের ধারণার জন্ম সেই ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রেই আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব ভেঙ্গে পড়ে। তার এই তত্ত্ব ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে একদমই কাজ করে না। এটা এমন এক বিন্দু যেখানে কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব দুটোর একটা সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। এই সন্নিবেশ ঘটানোর কাজটি এখনো পদার্থবিদদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এই বিন্দুতে কী ঘটে তা জানতে পারলে মহাকর্ষের কোয়ান্টাম প্রকৃতি সম্বন্ধে আমরা জানতে পারব।

ব্ল্যাকহোলকে আরো ভালোভাবে সাধারণ মানুষদের বোঝানোর জন্য, অনুভব করানোর জন্য এবং আরো ভালোভাবে এর চিত্রটা ফুটিয়ে তোলার জন্য খুব সম্প্রতি ব্যান্ডউইথ প্রোডাকশান নামের একটি কোম্পানি কোয়ান্টা ম্যাগাজিনের সাথে মিলিতভাবে এক জোড়া ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষের এক নিখুঁত সিমুলেশান তৈরি করেছে। এ সিমুলেশানে আপনি বিজ্ঞানী হিসেবে একটা আকাশযানে করে ব্ল্যাকহোলের ভেতর থেকে ঘুরে আসতে পারবেন। সংঘর্ষের পরে আকাশযানটি দুটো ব্ল্যাকহোলের মিলিত হওয়ার ফলে সৃষ্টি হওয়া ব্ল্যাকহোলের ভেতরে প্রবেশ করে।

পদার্থবিদ অ্যান্থনি অ্যাগুইরে এবং ডানকান ব্রাউন সিমুলেশানের মাধ্যমে এই ব্ল্যাকহোলটির ভেতরের পরিবেশ সৃষ্টিতে সাহায্য করেছেন। পদার্থবিদ অ্যান্ড্রু হ্যামিলটনের মতে এটিই এ যাবৎকালের সকল ব্ল্যাকহোল সিমুলেশানের মাঝে সবচেয়ে সঠিক চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। এই ভ্রমণে অংশ নেয়ার জন্য আপনাকে আইওএস অ্যাাপ স্টোর বা, গুগল প্লে স্টোর থেকে “ব্ল্যাক হোল ভিআর” অ্যাপটি আপনার ফোনে ডাউনলোড করতে হবে। ডাউনলোড হয়ে গেলে এবার অ্যাপটি ওপেন করুন, আপনার মোবাইলটি ভিআর হেডসেটে ঢোকান আর প্লে বাটনটি চাপুন। এবার ঝাঁপ দিন ব্ল্যাকহোলের রাজ্যে, ঘুরে আসুন ব্ল্যাক হোলের ভেতর থেকে। শুভ কামনা।

ফিচারড ইমেজঃ  quantamagazine.org

পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম শব্দ যা পুরো পৃথিবীকে চারবার প্রদক্ষিণ করেছিল

২৭ আগস্ট, ১৮৮৩। ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া দ্বীপে তখন সকাল ১০ টা বেজে ০২ মিনিট। পৃথিবীর বুক চিরে এক বিকট শব্দ শোনা গেলো। শব্দটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া দ্বীপ। সম্ভবত এই শব্দটিই এ যাবৎকালের পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্রতম শব্দ।

ক্রাকাতোয়া দ্বীপটি জাভা ও সুমাত্রার একদম মাঝামাঝি অবস্থিত একটি দ্বীপ। এখানে উৎপন্ন হওয়া শব্দটি এতটাই তীব্র ছিল যে, ১,৩০০ মাইল দূরের আন্দামান এবং নিকোবার দ্বীপ থেকেও বন্দুকের আওয়াজের মতো তীব্রভাবে এই শব্দটি শোনা গিয়েছিল। এমনকি ২,০০০ মাইল দূরের নিউ গিনি এবং ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া, ৩,০০০ মাইল দূরের ভারতীয় সাগরের রদ্রিগেজ দ্বীপ এবং মৌরিতিয়াস থেকেও এই বিকট শব্দটি শোনা গিয়েছিল। ৫০ এর উপরে ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক এলাকা থেকে এই শব্দ শোনা গিয়েছিল তখন।

কি? এরপরও বিস্ময়কর লাগছে না? তাহলে বলুন তো শব্দের বেগ কত? শব্দের বেগ হলো প্রতি ঘন্টায় ৭৬৬ মাইল। এ হিসেবে ৩,০০০ মাইল পথ পারি দিতে এই শব্দটির লেগেছিল ৪ ঘন্টারও চেয়েও বেশি সময়। এর অর্থ শব্দটি তৈরি হওয়ার পর সেই শব্দটিই ৪ ঘন্টা বাতাসে ভ্রমণ করার পর কোন এক মানুষের কানে গিয়ে পৌঁছেছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে  সংরক্ষিত তথ্য মতে এই শব্দটিই সবচেয়ে দূর থেকে শুনতে পাওয়ার রেকর্ডের অধিকারী।

যেসব এলাকা থেকে ক্রাকাতোয়া বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল তার একটি মানচিত্র; image source: nautil.us

তাহলে চলুন এবার অনুসন্ধান করা যাক যে এই বিকট শব্দের পেছনের কারণ কি? খুব ছোট করে বললে এই প্রশ্নটির উত্তর হলো, একটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত। হ্যাঁ, ক্রাকাতোয়া দ্বীপের একটি আগ্নেয়গিরির বিকট অগ্ন্যুৎপাতের ফলেই এ শব্দ তৈরি হয়েছিল।

শুধু কি শব্দ? এই বিস্ফোরণ একটি অত্যন্ত ভয়াবহ সুনামিও উৎপন্ন করেছিল, যার উচ্চতা ছিল ১০০ ফিট বা, ৩০ মিটার। সমুদ্র তীরবর্তি প্রায় ১৬৫টা গ্রাম এই সুনামিতে সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এই সুনামি ৩৬ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।

বিস্ফোরণের সময় ক্রাকাতোয়ার মাত্র ২০ মাইলের ভেতরে নরম্যান নামের একটি জাহাজ অবস্থান করছিল। জাহাজের ক্যাপ্টেন এই ঘটনার রেকর্ড হিসেবে লিখেছিলেন, ” বিস্ফোরণটি এতই ভয়াবহ ছিল যে, আমার জাহাজের প্রায় অর্ধেক কর্মচারীর কান নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমি আমার স্ত্রীকে শেষবারের মতো বললাম, আমি নিশ্চিত যে, শেষ বিচারের দিন আসন্ন হয়ে এসেছে।”

ক্রাকাতোয়ার আগ্নেয়গিরির এই বিস্ফোরণ এতটাই প্রকট ছিল যে, ১০০ মাইল দূর থেকেও ১৭২ ডেসিবেলের শব্দ শোনার বিষয়টি নথিভুক্ত করা  হয়েছিল। ১৭২ ডেসিবেলের শব্দের মাত্রা সম্বন্ধে কল্পনা করা একটু কঠিনই বটে। আপনার একদম কানের পাশ দিয়ে যদি কোন জেট বিমান চলে যায় তাহলে সেই শব্দের মাত্রা হবে ১৩০ ডেসিবেল।

শিল্পীর চোখে ক্রাকাতোয়ার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত; image source: nautil.us

আমরা যখন কোন শব্দ করি তখন সেই শব্দ বাতাসের অণুসমূহের কম্পন বা, সামনে পেছনে নড়াচড়ার মাধ্যমে বাতাসের কাল্পনিক স্তর সঙ্কুচিত এবং প্রসারিত হওয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ, বাতসের কোথাও চাপের পরিমাণ বেশি হয় আবার কোথাও কম হয়। এ ঘটনার সময় অণুগুলো সেকেন্ডে কয়েকশতবার পর্যন্ত সামনে পেছনে নড়াচড়া করতে পারে। এরকম পরিস্থিতির একটি চরম অবস্থা রয়েছে। এই চরম অবস্থায় বাতাসের অণুগুলোর নড়াচড়া বা, বাতাসের ভিন্ন ভিন্ন স্তরের চাপের পার্থক্য এতটাই বেড়ে যায় যে বাতাসের কম চাপের অঞ্চলটি একদম বায়ু শূন্য হয়ে যায়। ফলে মহাশূন্যের মতো এক ফাঁকা স্থানের সৃষ্টি হয়। শূন্যের চেয়ে নিচে কোন চাপ থাকতে পারে না। পৃথবীর বায়ুমন্ডলের জন্য শব্দের এই উচ্চতার সীমাটি হলো ১৯৪ ডেসিবেল। তীব্রতা এর চেয়ে বেশি হলে শব্দ শুধু বাতাসের মাধ্যমে সামনেই এগিয়ে যায় না, বাতাসকেই ঠেলে সামনের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। এই ঘটনাকে শক ওয়েভ বলে।

ক্রাকাতোয়ার খুব কাছে শব্দের তীব্রতা এই সীমার অনেক উপরে ছিল। যার ফলে নরম্যান জাহাজের নাবিকদের কান সম্পূর্ণরুপে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতীয় সাগরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শব্দের এই তীব্রতা অনেক কমে যায়। ৩,০০০ মাইল পাড়ি দিতে দিতে এই শব্দের এমন অবস্থা হয় যে মানুষের কান আর সেই শব্দ সনাক্ত করার ক্ষমতা রাখে না। তবে শব্দটি কিন্তু ধ্বংস হয়ে যায়না। শব্দটি বাতাসের মাধ্যমের ভেতর দিয়ে সামনে এগিয়ে চলতেই থাকে। কানে শোনা না গেলেও শব্দটির প্রভাব আমাদের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সনাক্ত করা ঠিকই সম্ভব।

১৮৮৩ সালের দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে ব্যারোমিটার দিয়ে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের চাপের পরিবর্তন মাপার বা, সনাক্ত করার ব্যবস্থা ছিলো। ক্রাকাতোয়ার আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ৬ ঘন্টা ৪৭ মিনিট পর কলকাতার বায়ুমন্ডলের চাপের মানে হঠাত একটা বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। বিস্ফোরণের ৮ ঘন্টা পরে পশ্চিমের মৌরিতিয়াস এবং পূর্বে মেলবোর্ন এবং সিডনীতে একই ধরনের পরিবর্তন সনাক্ত করা হয়। ১২ ঘন্টা পর সেন্ট পিটার্সবার্গে, ১৮ ঘন্টার মাঝে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি এবং টরেন্টোতে বায়ুমন্ডলের চাপের এই অকস্মাত তীব্র পরিবর্তনটি ধরা ধরা পড়ল।

আশ্চর্যজনকভাবে বিস্ফোরণের পর প্রায় ৫ দিন ধরে পৃথিবীর ৫০ টি অঞ্চলের বিভিন্ন আবহাওয়া বিভাগে নিয়মিত বিরতিতে বায়ুচাপ পরিবর্তনের এই সংকেত ধরা পড়তে লাগল। মোটামুটিভাবে ৩৪ ঘন্টা পর পর সংকেতটি একই স্থানের আবহাওয়া বিভাগে ফিরে আসছিল। আর আশ্চর্যজনকভাবে শব্দের বেগে কোনো কিছু চললে তার পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে আসতে প্রায় ৩৪ ঘন্টা সময়ই লাগে।

সবমিলিয়ে এই শব্দটি পৃথিবীর চারদিকে ৩ থেকে ৪ বার ঘুরে এসেছিল। এক্ষেত্রে একটি লক্ষ্যণীয় বিষয় আছে। আর তা হলো, কোন কোন স্থানের ব্যারোমিটারগুলোতে মোট ৭ বার পর্যন্ত এই পরিবর্তন ধরা পড়েছিল। এর কারণ হল, কোন শব্দ তৈরি হওয়ার পর তা প্রায় সমানভাবেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তাই একই উৎস থেকে উৎপত্তি হওয়া শব্দ একই সাথে পূর্ব দিকে আবার পশ্চিম দিকে দুই দিকেই ভ্রমণ শুরু করে। আর এই বিপরীত দিক থেকে আসা শব্দগুলো কোন এক স্থানে দুটি করে বায়ুচাপ পরিবর্তনের সংকেত তৈরি করেছিল।

ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া দ্বীপে উৎপন্ন হওয়া এই শব্দটি এমন এক শব্দ ছিল যা একসময় আর শোনা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার প্রভাব ঠিকই পৃথিবীজুড়ে অনুভব করা যাচ্ছিল। এছাড়াও ভারত, ইংল্যান্ড আর সানফ্রান্সিস্কোতে এই বায়ুচাপের বিশাল পরিবর্তনের সাথে সাথেই সাগরের ঢেউয়ের উচ্চতাতেও বিশাল পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম অসাধারণ ঘটনা এর আগে কখনোই দেখা যায়নি। ১৮৮৩ সালের এই ঘটনাটি বৈজ্ঞানিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এছাড়াও এই আগ্নেয়োগিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর পৃথবীর মানুষ বেশ ভালোভাবেই শব্দের শক্তি অনুভব করতে পেরেছিল।

ফিচারড ইমেজঃ www.altereddimensions.net