দুধসহ চা, দুধ ছাড়া চা: বিজ্ঞান কোনটার পক্ষে?

চা। আমাদের অতি পছন্দের একটি পানীয়। পৃথিবীর ২০০ কোটির উপরে মানুষ চা পান করে থাকে। শুধু ব্রিটেনেই প্রতিদিন ১৬ কোটি ৫ লাখ কাপ চা পান করা হয়ে থাকে। যার অর্থ ব্রিটেনের প্রতিটি মানুষ দিনে গড়ে ৩ কাপ করে চা পান করে থাকে। কেউ চা খায় ঘুম তাড়াতে, কেউ চা খায় স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে, কেউ চা খায় বন্ধুদের সঙ্গ দিতে আর কেউবা নিছকই অভ্যাসবশতই খেয়ে থাকে। চা পান অনেকে মানুষকে বিভিন্ন চিন্তা থেকেও দূরে রাখে। চা পানকারীদের মধ্যেও আছে নানা রকম বিভাজন। কেউ পছন্দ করে দুধ চা, আবার কেউ দুধ ছাড়া রঙ চা খেতেই স্বাছন্দ্য বোধ করে বেশি। কেউ গ্রীন টি বা, সবুজ চা আবার কেউ উলং চা খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু এই ৪ ধরনের চা কিন্তু আসে একই গাছ থেকে। সেই গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া সাইনেসিস

কিন্তু কোন ধরণের চা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারি? দুধ চা নাকি রঙ চা? চলুন উত্তর খোঁজা যাক। কিন্তু সাধারণভাবে নয়, একটু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে।

রঙ চা বনাম দুধ চা; image source: medianp.net

চায়ের মাঝে অ্যান্টিওক্সিডেন্ট এবং ভিটামিনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। এছাড়াও চা পানকারীরা খুব সাধারণভাবেই হৃদরোগের সম্ভাবনা থেকে বেশ কিছুটা মুক্ত থাকেন। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, চা পানকারীদের এসকল সুবিধা সম্পূর্ণরুপে বাতিল হয়ে যায় যদি তারা অধিকাংশ চা পানকারীদের মতো চায়ের সাথে দুধ মিশিয়ে খান।  

চা কে অনেক আগে থেকেই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। চা যেমন হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়, তেমনি আবার ক্যান্সার প্রতিরোধেও এর ভূমিকা রয়েছে। আবার দেহের বাড়তি মেদ কমাতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, দেহের কোষের সুরক্ষা প্রদানেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু জার্মানীর এক দল গবেষকের ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নালে কয়েক বছর আগে  প্রকাশিত এক পেপারে দেখানো হয়েছে যে, চায়ে দুধের ব্যবহার ক্যান্সারের বিরুদ্ধে চায়ের যে উপকারিতা তার অনেকগুলোকেই নষ্ট করে দেয়।

চায়ে ক্যাটেচিন্স নামের এক ধরণের উপাদান থাকে। এই ক্যাটেচিন্সকেই চায়ের সেই উপাদান হিসেবে ধারণা করা হয় যা আমাদের হৃদপিন্ডকে সুরক্ষিত রাখে এবং আমাদের রক্তচাপ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে চায়ের সাথে দুধ মেশালে এই প্রভাব কমে যেতে থাকে। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যারিটে হসপিটালের একদল বিজ্ঞানী এই গবেষণার কাজটি পরিচালনা করেছেন।

রঙ চা; image source: lifehack.org

এই গবেষণা ১৬ জন সুস্থ মহিলার উপর পরিচালনা করা হয়। তাদেরকে আধা লিটার চা দুধসহ এবং দুধ ছাড়া পান করতে দেয়া হয়েছিল। চা খাওয়ার পরে তাদের বাহুর মাঝ দিয়ে রক্ত চলাচল আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়েছিল।

রঙ চা খাওয়ার পরে মহিলাদের রক্ত চলাচলের বেশ উন্নতি লক্ষ্য করা গেল। কিন্তু এই উন্নতির কোনো লক্ষণ দুধ চায়ের মাঝে দেখা গেল না। এরপর গবেষকরা এক দল ইঁদুরের উপরও একই পরীক্ষা চালালেন। এক্ষেত্রেও একই রকম ফলাফল লক্ষ্য করা গেল।

মূলত দুধে অবস্থান করা ক্যাসেইন্স নামের এক দল প্রোটিন চায়ের সাথে বিক্রিয়া করে এবং চায়ে থাকা ক্যাটেচিন্সের পরিমাণ অনেক কমিয়ে দেয়। যদিও সকল বিজ্ঞানীরা এখনো এটা বিশ্বাস করেন না যে চায়ের সাথে দুধ মেশালে সেটি খুব বেশি পরিমাণে এই প্রভাবগুলো কমিয়ে দেয়।

দুধ চা; image source: Healthmania.org

তবে এই ফলাফলের ঠিক বিপরীত ফলাফলও আছে। ১৯৯৮ সালে নেদারল্যান্ডে একদল বিজ্ঞানী ১২ জন মানুষের উপর একটি পরীক্ষা চালান। দুধসহ এবং দুধ ছাড়া চা পান করার পর তাদের দেহের ক্যাটেচিন্সের (যে উপাদানের কারণে দেহের রক্ত চলাচলের উন্নতি দেখা যায়) পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। তারা দুধসহ এবং দুধ ছাড়া চায়ের মাঝে তেমন কোন পার্থক্য দেখলেন না। কিন্তু এই গবেষণা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ একটি গবেষণা ছিল। এই গবেষণাটি মূলত ইউনিলিভার কোম্পানির অর্থায়নে হয়েছিল। চায়ের ব্যবসার ক্ষেত্রে ইউনিলিভার বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানি। লিপ্টন, পি জি টিপস তাদের চায়ের ব্র্যান্ড। গবেষণার ক্ষেত্রেও শুধুমাত্র ইউনিলিভার ব্র্যান্ডের চাগুলোই ব্যবহার করা হয়েছিল, যা বৈজ্ঞানিকগবেষণার কোনোভাবেই আদর্শ হতে পারে না।

২০১১ সালেও আরো একটি গবেষণায় উপরের ফলাফলের মতো আরো একটি ফলাফল পাওয়া যায়। তবে এবারো এই গবেষণার অর্থায়নে ছিল ইউনিলিভার এবং শুধুমাত্র তাদের ব্র্যান্ডের চাকেই ব্যবহার করা হয়েছিল।

তবে ২০০২ এবং ২০০৬ সালে হওয়া পৃথক ৩টি গবেষণার ৩টিই চায়ের সাথে দুধ মিশিয়ে খাওয়ার চেয়ে রঙ চা খাওয়াকে বেশি উপকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে এরপরও যদি কেউ একান্তই দুধ ছাড়া চা না খেতে পারে তবে সে সাধারণ দুধের পরিবর্তে সয়া দুধ ব্যবহার করতে পারেন। সয়া দুধে লেসিথিন রয়েছে, যার আণবিক গঠন ক্যাসেইন্সের চেয়ে সম্পূর্ণরুপে আলাদা। এই লেসিথিনের ক্যাটেচিনের সাথে বিক্রিয়া করার সম্ভাবনা ক্যাসেইন্সের চেয়ে অনেক কম থাকে। তাই এক্ষেত্রে দুধ চা পানকারীদের ভালো বিকল্প হতে পারে সয়া দুধ।

যদিও এটা সত্য যে, খাবারের কাছে এসে এসব বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা বা, বাঁধা নিষেধ মেনে চলা বেশ কঠিন একটা কাজ। আমাদের স্বাদের অনুভবের কাছে বিজ্ঞানের এসব নির্দেশনা ধূলোয় লুটিয়ে পড়ে। কিন্তু সুস্থ থাকতে হলে বিজ্ঞানের নির্দেশ অমান্য করলেও যে চলে না। এরপর থেকে চায়ে দুধ মেশানোর আগে আরেকটিবার ভাববেন কি? অন্তত নিজের জন্য?

ফিচারড ইমেজঃ medianp.net

স্পেস এক্সের ফ্যালকন হেভির অন্য এক গোপন উদ্দেশ্য, যার কথা খুব কম মানুষই জানে

গত সপ্তাহে স্পেস এক্সের ঐতিহাসিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট উৎক্ষেপণের পর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে স্টারম্যান এবং টেসলা। তবে সেটার পাশাপাশি আরো একটি জিনিস মহাকাশে নিয়ে গেছে ফ্যালকন হেভি যার সম্পর্কে তেমন কারো আগ্রহ দেখা যায়নি।

টেসলা রোডস্টার গাড়িটির ভেতরে লুকানো ছিল বিলিয়ন বছর ধরে টিকে থাকতে সক্ষম ছোট্ট রহস্যময় একটি বস্তু। মহাকাশ কিংবা দূরবর্তী কোনো গ্রহের পৃষ্ঠেও যা থাকবে অটুট। এটার নাম আর্ক । যা দেখতে কয়েনের মতো কোয়ার্টজ ক্রিস্টালের একটা ডিস্ক। এটা তৈরি কিরা হয়েছে প্রচুর পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করে রাখার জন্য।

ফ্যালকন হেভির উৎক্ষেপন; Image Source: spacenews.com

এই প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে আর্ক মিশন ফাউন্ডেশন নামক এক ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। তাদের ভাষ্যমতে আর্ক ডিস্ক স্থান কালের বাঁধা অতিক্রম করে জ্ঞানকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সংরক্ষণ ও ছড়িতে দিতে পারব।

দেখে মনে হতে পারে আর্ক হলো ডিভিডি কিংবা ব্লু রে ডিস্কের মিনিয়েচার, তবে এর সংরক্ষণ ক্ষমতা ঘরের ডিস্কগুলোর চেয়ে হাজার গুন বেশি। এর ধারণক্ষমতা তত্ত্বীয়ভাবে ৩৬০ টেরাবাইট যা প্রায় ৭০০০ ব্লু রে ডিস্কের সমান।

তবে ধারণক্ষমতার চেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো এর আয়ুষ্কাল। আর্কের প্রথম দুটো ভার্শন আর্ক ১.১ এবং আর্ক ১.২ কে বলা হয় মানুষের দ্বারা এযাবতকালের তৈরি সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর এরা ১৪ বিলিয়ন বছর পরেও নষ্ট হবে না। এই ডিস্কে কোয়ার্টজ সিলিকা গ্লাসের গায়ে লেজার ন্যানোস্ট্রাকচারিং এর মাধ্যমে তথ্যগুলো সংরক্ষণ করা হয়।

সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর্ক; Image source: www.sciencealert.com

উৎক্ষেপিত টেসলা গাড়িটি মহাকাশে ঘন্টায় ১২৯০৮ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে, আর তাতে লুকিয়ে রাখা আর্ক ১.২ ডিস্ক বহন করে নিয়ে যাচ্ছে আইজ্যাক আসিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজের তিনটি বইয়ের ডিজিটাল প্রতিরূপ। আর্ক তৈরির সাথে জড়িতরা এই পদক্ষেপের নাম দিয়েছেন “সোলার লাইব্রেরি”। সহ প্রতিষ্ঠাতা নোভা স্পিভ্যাক আশা করেন, এই সোলার লাইব্রেরি বিলিয়ন বছর ধরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। তিনি আরো বলেন “ভেবে নিন এটা সূর্যকে প্রদক্ষিণকারী একটি জ্ঞানের বলয়, যা মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে সৌরজগত এবং এরও বাইরে ছড়িয়ে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ।”

২০২০ এবং ২০৩০ সালে আরো দুটি রকেট উৎক্ষেপনের পরিকল্পনা মাথায় রেখে তারা কাজ করছেন। প্রথমটার উদ্দেশ্য হবে চাঁদ, পরেরটার মঙ্গল। লাল গ্রহে পাঠানোর জন্য যে ডিস্কটি তৈরি হবে সেটার সংরক্ষিত তথ্য সেখানকার উপনিবেশকারীদের স্থানীয় ইন্টারনেট তৈরিতে কাজে লাগবে।

কথাগুলো শুনতে আশ্চর্য শোনালেও সত্যিকার পরিকল্পনা আরো বড়। আর্কের পেছনের মানুষেরা চান এই আর্ক লাইব্রেরিগুলো সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ এবং তার বাইরেও ছডিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদানের বিকেন্দ্রীভূত একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে। বেশ উচ্চাভিলাসি মনে হলেও আপনি নিজেকেই প্রশ্ন করুন তো, কখনো কি ভেবেছিলেন ২০১৮ সালে টেসলা রোডস্টার সূর্যকে প্রদক্ষিন করবে?

featured image: mensxp.com

পৃথিবীর মতো অণুজীব পাওয়া যেতে পারে লাল গ্রহে

হেল অন আর্থ। কখনো শুনেছেন এরকম ? দক্ষিন আমেরিকার পশ্চিম উপকূল ঘেঁষে একটি বৃহৎ মরুভূমি আছে, যাকে পৃথিবীর নরক বলা হয়। কিন্তু এই নরকের সাথে আরেকটি লাল রঙে আচ্ছাদিত এক স্থানের মিল দেখে বিজ্ঞানীরা একই সাথে উত্তেজিত এবং চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

চিলির আটাকামা মরুভূমি হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে শুষ্কতম স্থানের মধ্যে অন্যতম। এই মরুভূমি এতই শুষ্ক যে কোনো কোনো সময় কয়েক দশক বা শতক ধরেও এখানে কোনো বৃষ্টির দেখা যায় না। আর এই প্রতিকূল স্থানকে আমরা পৃথিবীর মধ্যে এক টুকরো মঙ্গল গ্রহ বলতে পারি এবং বিজ্ঞানীরা এই স্থানের ব্যাপারে এক মস্ত আবিষ্কার করে ফেলেছেন।

চিলির আটাকামা ম্রুভূমি; image source: dailygalaxy.com

এই প্রথমবাবের মত গবেষকরা আটামাকার অস্বাভাবাবিক শুষ্ক মরুভূমিতে মাইক্রোবায়াল প্রাণীকে বেঁচে থাকতে দেখেছেন। শুধু তাই নয়, এই শুষ্ক এবং অত্যন্ত গরম পরিবেশে সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাদের একটি নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রও আছে। তাই মঙ্গল গ্রহের প্রাণের আবিষ্কারের পূর্বে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি আবিষ্কার।

“এটা আমাকে সবসময়ই অবাক করে দেয় যে, মানুষ যেখানে চিন্তাও করত পারে না এইরকম একটা স্থানে কোনো প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে সেইরকম পরিবেশেও দেখা যায় যে জীবন ঠিকই সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বেঁচে আছে।” বলেন ওয়াশিংটন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহ বিজ্ঞানী ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক।

তিনি আরো বলেন যে, “জীবন যদি পৃথিবীর সবচাইতে শুষ্ক পরিবেশে লড়াই করে বেঁচে থাকতে পারে তাহলে বেশ একটা ভালো সম্ভাবনা আছে যে, একইভাবে মঙ্গল গ্রহেও জীবনের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।”

যদিও এর আগে বিজ্ঞানীরা আটাকামা মরুভূমিতে জীবাণু খুঁজে পেয়েছিলেন। পূর্বের গবেষণায় বলা হয়েছিল যে, বালিমাটিতে যে সকল প্রাণের আবিষ্কার হবে তা হয় আগেই মারা গেছে বা, মৃতপ্রায় টেকসই কোষের অবশিষ্টাংশ হঠাৎ বায়ুমন্ডলীয় প্রক্রিয়ায় জমা থাকবে।

কিন্তু এইবার তারা আসলেই প্রমাণ পেয়েছেন দলবদ্ধ এবং বিপাকীয়ভাবে সক্রিয় এক ধরনের জীবাণুর যারা বর্ধনশীল বা অন্তত টিকে থাকার চেষ্টা করছে প্রতিকূল পরিবেশে।

২০১৫ সালে ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক এবং তার সাথে গবেষকারা আটাকামা মরুভূমিতে পৌঁছানোর কিছু পরেই আকাশে বৃষ্টির দেখা দেয় যা কিনা খুবই দূর্লভ ঘটনা। এতটাই দূর্লভ যে ৪০ বছর আগেও মনে হয় এত বৃষ্টিপাত হয়নি বা তা রেকর্ড করা হয়নি।

এই অভাবনীয় বৃষ্টিপাতের পর পরই গবেষকরা মরুভূমির মাটিতে অস্বাভাবিক জীবত্বাত্তিক বিস্ফোরণ দেখতে পান। তারা অন্তত ৮ টি যায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন এবং একই ফলাফল দেখতে পান।

এর পর তারা ফিরে আসেন এবং পর পর ২০১৬ ও ২০১৭ সালে আবার অনুসন্ধান চালান। কিন্তু পরবর্তীতে তারা কোনো রকম বৃষ্টির দেখা পাননি এবং জীবন এর চিহ্ন পরবর্তী নমুনা গুলোতে ক্রমশ হারিয়ে গিয়েছিল।

আটাকামা মরুভূমিতে গবেষনায় ব্যাস্ত বিজ্ঞানীরা; image source: sciencealert.com

তবুও তারা জীনগত এবং কিছু রাসায়নিক পরীক্ষা করেন এবং টেস্টের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে বলেন যে, এই জীবাণুরা এই বিশেষ পরিবেশে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল।

এইসকল কষ্টসহিষ্ণু ব্যাক্টেরিয়া দলবদ্ধভাবে মরুভূমির মাটির বেশ কয়েক হাত নিচে অনেক দিন পর্যন্ত পানি ছাড়া ঘুমিয়ে থাকে এবং যখন আবার বৃষ্টিপাত হয় তখন তাদের বিপাকীয় কার্যক্রম আবার চালু হয়ে যায়।

“আটাকামার মরুভূমির মত এত প্রতিকূল পরিবেশে এত অটলভাবে বেঁচে থাকা কোনো জীবকে এই প্রথম কেউ খুঁজে পেল” বলেন ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক।

তিনি আরো বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি এই সকল অণুজীব যেভাবে শত শত এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে সুপ্ত অবস্থায় চিলির নরকের মতো মরুভূমিতে বেঁচে থাকতে পারে ঠিক তেমনি মঙ্গল গ্রহেও এরকম অণুজীব পাওয়া সম্ভব যারা অনেক বছর ধরে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।”

কিন্তু আমাদের একটা কথা মাথায় রাখা উচিত যে চিলির আটাকাম মরুভূমি যতই রুক্ষ প্রকৃতির হোক না কেন মঙ্গল গ্রহ তার চাইতে কল্পনাতীত বেশি রুক্ষ এবং ঠান্ডা।

আটাকামা মরুভূমি এবং মঙ্গল গ্রহের মধ্যে সাদৃশ্য; image source: sciencealert.com

তারপরেও যদি বিজ্ঞানীরা মঙ্গল গ্রহে প্রাণের আশা করে থাকেন তবে চিলির মরুভূমিতে আবিষ্কৃত অণুজীব গুলোই হবে মানদণ্ড স্বরূপ, কেননা মঙ্গল গ্রহের পরিবেশ হয়তবা এরকম কোন অনুজীবকে হয়ত বাঁচতে দিবে তার মাটির কয়েক স্তরের নিচে।

নাসার বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে প্রমাণ পেয়েছেন যে ৪,০০,০০০ বছর আগেও মঙ্গল গ্রহে বরফ যুগ ছিল । এখনো মঙ্গলের মাটির নিচে বরফ আছে বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছে এবং তা আছে এই গ্রহের দুই মেরুতে।

“আমরা জানি যে মঙ্গলের মাটিতে পানি জমাট বেঁধে আছে এবং সাম্প্রতিক গবেষণায় রাতের বেলায় মঙ্গলে বরফ পড়ে তার একটা শক্ত ধারণা আমরা পেয়েছি। ফলে রাতের বেলায় এই লাল গ্রহের মাটিতে আর্দ্রতা সম্পৃক্ত ঘটনা ঘটে যার ফলে আমাদের আশংকা যে এখনো এখানে হয়ত মাটির নিচে পাওয়া যেতে পারে পৃথিবীর মতোই কিন্তু পৃথিবীর চাইতে কয়েক গুন বেশী সহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন অণুজীব।” বলেন ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক ।

যদি কখনো মঙ্গলে প্রাণের সন্ধান পাওয়া যায় তবে তা হয়ত রুক্ষ-শুষ্ক মাটির নিচের আরেকটি স্তরে পাওয়া যাবে। আর তখন এসব গবেষণায় হয়ে থাকবে পথিকৃৎ।

featured image: the-martian.wikia.com

হারিয়ে যাওয়া অ্যান্টিম্যাটার বা, প্রতিপদার্থের খোঁজে

মহাবিশ্বে যা কিছু আছে, তা হোক কোনো ছায়াপথ বা, গ্রহ বা, হোক তা নক্ষত্র সবকিছুই এক অপরিহার্য উপাদান দিয়ে তৈরি। আর তা হচ্ছে বস্তু। ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাংগ হওয়ার সাথে সাথে মহাবিশ্বে বস্তু (matter) এবং বস্তুর বিপরীত সত্ত্বা প্রতিবস্তু (antimatter) সমান ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বস্তু এবং প্রতিবস্তুর ধর্মই ছচ্ছে তারা একে অপরকে ধ্বংস করবে। তাই সে হিসাবে সদ্য নির্মিত তৎকালীন মহাবিশ্বে শুধু শক্তি ছাড়া আর কিছুই থাকার কথা না, কারণ বস্তু এবং প্রতিবস্তুর সংঘর্ষে শক্তি নির্গত হয়। কিন্তু এই ভারসাম্য মহাবিশ্ব তার প্রারম্ভিক দিকে ধরে রাখতে পারেনি এবং দুই স্বত্বার মধ্যে থেকে সে বস্তু কে বেছে নেয়।

কিন্তু কেনো এই পক্ষপাতিত্ব? তা জানার জন্যই বিজ্ঞানীরা অতিপারমাণবিক কণা নিউট্রিনো নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন। যদি নিউট্রিনো তার নিজের প্রতিবস্তু হয় তাহলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে মহাবিশ্ব কেনো বস্তুর পক্ষ বেছে নিয়েছিল তার উত্তর এখান থেকেই পাওয়া যাবে।

তাই বিজ্ঞানীরদের অক্লান্ত চেষ্টাটাও শুরু হয়ে গেছে এটা প্রমাণ করার জন্য। এ পর্যন্ত চারটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়ে গেছে কিন্তু তারা কোনো আশার আলো দেখতে পাননি। তবুও তারা দমে যাওয়ার পাত্র নন। ইতোমধ্যে তারা আরো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে তাদের লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেছেন। আর নতুন এই পরীক্ষার নামকরণ করা হয়েছে, KamLAND-Zen NEUTRINOLESS DOUBLE BETA DECAY

বস্তু এবং প্রতিবস্তুর উভয়ের রয়েছে একে অপরের বিপরীত ইলেক্ট্রিক বা, বৈদ্যুতিক চার্জ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ইলেকট্রনের প্রতিবস্তু বা, প্রতিপদার্থ হচ্ছে পজিট্রন এবং প্রোটনের প্রতিবস্তু হচ্ছে অ্যান্টিপ্রোটন। কিন্তু এই নিয়ম খাটে না নিউট্রিনোর ক্ষেত্রে, যার কোনো ইলেক্ট্রিক চার্জ নেই। নিউট্রিনো পদার্থবিজ্ঞানী জেসন ডেটউইলার বলেন, “নিউট্রিনো হচ্ছে একটি অদ্বিতীয় অতিপারমাণবিক কণা যার মতো অন্য কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না।”

যেভাবে কাজ করে  KamLAND-Zen NEUTRINOLESS DOUBLE BETA DECAY

সাধারণ বেটা ডিকে ঘটার সময় (বামের চিত্র) একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকা নিউট্রন প্রোটনে পরিণত হয় এবং একটি ইলেক্ট্রন (নীল) এবং একটি অ্যান্টিনিউট্রিনো (লাল) ছেড়ে দেয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাবল বেটা ডিকে ঘটে থাকে বা, বেটা ডিকে একই সময়ে দুইবার ঘটে। কিন্তু যদি নিউট্রিনো নিজের প্রতিবস্তু হয় তাহলে বেটা ডিকের সময় উৎপন্ন হওয়া নিউট্রিনো দুটি নিজেদের কখনো কখনো ধ্বংসও করে ফেলবে, যার ফলে কোনো কোনো ডাবল বেটা ডিকেতে আমরা শুধু দেখবো নিউক্লিয়াস দুটি ইলেক্ট্রন ছেড়ে দিচ্ছে। কোনো অ্যান্টিনিউট্রিনো নেই।

যেভাবে কাজ করে KamLAND-Zen neutrino-less double beta decay ; image source: www.sciencenews.org

কিন্তু এই পরীক্ষা টি এত সহজ নয় কারণ এর জন্য অনেক দূষ্প্রাপ্য আইসোটপের প্রয়োজন হয়।

আগের পরীক্ষাগুলোতে KamLAND-Zen পানিতে নিমজ্জিত Xenon-136 আইসোটোপ এর ক্ষয় পর্যবেক্ষন করত। কিন্তু এখন KamLAND-Zen এ নতুন এবং অত্যাধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে যেখানে আগের চাইতে ২ গুন Xenon ব্যবহার করা হবে যার ফলে আরো দূর্লভ ক্ষয়ের সন্ধান হয়ত পাওয়া যাবে।

নতুন সন্ধানের খোঁজে

নতুন ধরণের আইসোটোপ, যা থাকবে পরিষ্কার, ধুলাবালি থেকে মুক্ত এমন কিছুই খুজছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু তার জন্য আরও বৃহৎ গবেষণা হওয়া উচিত। “আমরা যেই আইসোটোপের ক্ষয় খুঁজছি তা খুবই, খুবই, খুবই, খুবই দূর্লভ”,বলেন ইটালির পাওডা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিকার্ডো ব্রাগনেরা। খুবই ছোট একটি ব্যাপারও এরকম পরীক্ষার ফলাফল বদলে দিতে পারে। KamLAND-Zen NEUTRINOLESS DOUBLE BETA DECAY এখন পর্যন্ত সফল না হলেও তার দেখাদেখি অনেক বিজ্ঞানীরাই আরো বড় পরিসরে এই পরীক্ষাগুলো নতুন করে চালাতে চাচ্ছেন। তার মধ্যে বড় একটি প্রজেক্ট হচ্ছে LEGENDএই নতুন প্রজেক্টে নতুন বিজ্ঞানীরা ছাড়াও আগের প্রজেক্টেরও বেশ কয়েকজন থাকবেন।

KamLAND-Zen এর একটি ডিডেকটর যা Xenon-136 এর Double Beta Decay পর্যবেক্ষন করে; image source: https://www.sciencenews.org

 

বদলে যেতে পারে মহাবিশ্ব সৃষ্টির ধারণা

যদি বিজ্ঞানীরা এটা প্রমাণ করে ফেলতে পারেন যে, নিউট্রিনোরাই তাদের নিজদের প্রতিবস্তু, তাহলে অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিবস্তু কেন এত দূর্লভ তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এছাড়া নিউট্রিনো কেনো অন্যান্য অতিপারমাণবিক কণার চেয়ে হালকা সেটাও বোঝা যাবে। “এক ঢিলে দুই পাখি মারার মত আবিষ্কার হবে এটি”, বলেন কনরাড নামক বিজ্ঞানী।

তাত্ত্বিক পদার্থবিদরা ধারণা করেন যে, নিউট্রিনোরা যদি নিজেরা নিজেদের প্রতিবস্তু হয় তাহলে দেখতে না পাওয়া ভারী নিউট্রিনো হয়ত হালকা নিউট্রনের (যা আমরা দেখতে পাই) সাথে জোড়ায় থাকে। কিন্তু যদি এটা প্রমানিত হয়ে যায় যে নিউট্রিনোরা নিজেরা নিজেদের প্রতিবস্তু তাহলে তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের অনেক তত্ত্বই আর টিকবে না।

কনরাড বলেন, “মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো যে কে এই অ্যান্টিম্যাটার বা, প্রতিবস্তুগুলোকে চুরি করল। এর চাইতে বড় চুরি আর কখনো হয়নি।”

featured image: socratic.org

বিগ ব্যাং নয়, সৃষ্টির শুরুতে হয়েছিল বিগ বাউন্স: দুই দল পদার্থবিদদের নতুন দাবী

বর্তমান আদর্শ জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিগ ব্যাং তত্ত্ব মহাবিশ্বের সৃষ্টির তত্ত্ব হিসেবে নিজের আসন প্রায় স্থায়ী করেই নিয়েছে। জ্যোতিপদার্থবিদরাও এই তত্ত্বকেই মহাবিশ্বের শুরুর সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব হিসেবে মেনে নিয়েছেন। এর বিপরীতের মহাবিশ্বের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব সেই বহুদিন আগেই হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে ইনফ্লেশান তত্ত্বকেও বিগব্যাঙ্গের ভেতরেই ধরা হয় এবং বিগ ব্যাং এর শুরুটা এই ইনফ্লেশান তত্ত্ব দিয়েই সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। ইনফ্লেশানের ফলে আমাদের মহাবিশ্ব অতি ক্ষুদ্র সময়ে অস্বাভাবিক রকম বৃহৎ আকার ধারণ করেছিল।

সময়ের স্কেলে ইনফ্লেশান এবং বিগ ব্যাং; image source: map.gsfc.nasa.gov

যদিও ইনফ্লেশান তত্ত্বের ইনফ্লেশানের শুরু নিয়ে এর বিপক্ষেও বেশ কিছু মতবাদ রয়েছে এবং সরাসরি পরীক্ষার মাধ্যমে এর সপক্ষে এখনো কোন প্রমাণ জোগাড় করা যায়নি। তাই বিগত বেশ কিছু বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা অন্যরকম ব্যাখ্যার নতুন কোন তত্ত্ব খোঁজার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর তারই ফলাফলস্বরুপ তাদের নতুন এক প্রস্তাবনা হলো বিগ বাউন্স মডেল।

তবে বিগ বাউন্সের সমর্থনকারী জ্যোতিপদার্থবিদরাও এর প্রকৃতি নিয়ে মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত। এদের একদল পদার্থবিদ মনে করেন আমাদের মহাবিশ্বটি আমাদের দেহের ফুসফুসের মতো একবার বড় হয় আবার একবার ছোট হয় এবং এই চক্রটি চলতেই থাকে। তবে আমাদের মহাবিশ্ব এই চক্রে ছোট হতে হতে কখনোই একদম শূন্য হয়ে যায় না। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ছোট হওয়ার পর আমাদের মহাবিশ্বটি আবার প্রসারিত হতে শুরু করে। আরেক দল পদার্থবিদ মনে করেন, আমাদের মহাবিশ্বটি বার বার নয় এর আগে শুধু একবারই সঙ্কুচিত হয়েছিল আর তা একটি নির্দিষ্ট আকারে ছোট হওয়ার পর আবার প্রসারিত হতে শুরু করেছে এবং সারা জীবন প্রসারিত হতেই থাকবে।

তবে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি দিয়ে হয়তবা খুব দ্রুতই এই বিতর্কের অবসান করা যাবে। সামনের কয়েক বছরের মাঝেই আমাদের টেলিস্কোপগুলো মহাজাগতিক ইনফ্লেশানের প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়ে যেতে পারে। তবে এ জন্য আমাদের বিগ ব্যাঙ্গের সময় তৈরি হওয়া কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশানে এক ধরনের হালকা ঘূর্ণন বা, পাক সনাক্ত করতে পারতে হবে। তবে যদি সামনের কয়েক দশকেও এই প্রমাণ আমরা না দেখতে পাই তারপরও কিন্তু ইনফ্লেশান তত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণ হয়ে যাবে না। কারণ এই কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশানের এই পাক বা, ঘূর্ণনটি খুবই হালকা কোন যন্ত্রের মাধ্যমে সনাক্ত করার জন্য। তবে ইনফ্লেশানের পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রমাণ না পাওয়া গেলে যুক্তিযুক্তভাবেই বিগ বাউন্সের মডেলটি আরো শক্ত ভিত্তি পাবে। কারণ এই মডেল কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশানে কোনো রকম পাক বা, ঘূর্ণনের ভবিষ্যৎবাণী করে না।

গত বছরই পদার্থবিদরা দুটি নতুন পথের সন্ধান দিয়েছেন যেভাবে বিগ বাউন্স ঘটে থাকতে পারে। এর মাঝে একটি পেপার জার্নাল অভ কসমোলজি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোপার্টিকেল ফিজিক্সে খুব দ্রুতই প্রকাশিত হবে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্না ইজ্জাস এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল স্টেইনহার্ডট এই পেপারটি লিখেছেন। পল স্টেইনহার্ডট বিগ বাউন্সের পক্ষের একজন পরিচিত জ্যোতিপদার্থবিদ।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্না ইজ্জাস; image source: quantamagazine.org

তবে মজার বিষয় হলো, বিগ বাউন্স তত্ত্ব নিয়ে আরো একটি পেপার ফিজিক্যাল রিভিউ ডি’তে প্রকাশ হওয়ার জন্য গৃহীত হয়েছে। এই পেপারটির লেখক পদার্থবিদদের এক বিখ্যাত ত্রিরত্ন পিটার গ্রাহাম, ডেভিড কাপলান এবং সুরজিত রাজেন্দ্রন। তারা মূলত কণা পদার্থবিজ্ঞানের একটি প্রশ্নের দিকে মনোযোগ নিবিষ্ট করেছিলেন, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাদের সমাধান বিগ বাউন্সের দিকে ইঙ্গিত করে।

(বাম থেকে) পদার্থবিদদের এক বিখ্যাত ত্রিরত্ন পিটার গ্রাহাম, ডেভিড কাপলান এবং সুরজিত রাজেন্দ্রন; image source: quantamagazine.org

পদার্থবিদ স্টেইনহার্ডট মনে করেন, বিগ বাউন্স আমাদের মহাবিশ্বের বিভিন্ন ঘটনা বেশ ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে। আমাদের মহাবিশ্বের সর্বত্র যে পদার্থের ঘনত্ব প্রায় একই তা বিগ বাউন্স তত্ত্ব থেকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব এমন একটি পেপার স্টেইনহার্ডট আরো তিনজন পদার্থবিজ্ঞানীর সহায়তায় ২০০১ সালে প্রকাশ করেছিলেন।

আবার বিগ বাউন্সের প্রতিদ্বন্দী ইনফ্লেশান তত্ত্বেরও কিছু বিষয় বেশ বিতর্কিত রয়েছে। ১৯৮০ সালে অ্যালেন গুথ এবং আন্দ্রে লিন্ডে মূলত ইনফ্লেশানের এই তত্ত্ব প্রদান করেন। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে বিগ বাউন্স তত্ত্বের সমর্থক স্টেইনহার্ডটও সেসময় ইনফ্লেশান তত্ত্বের উন্নয়নে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু ইনফ্লেশান তত্ত্ব আসার পরপরই ইনফ্লেশানের ফলাফল হিসেবে মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্বের ধারণা আসলো এবং দেখা গেলো যে, ইনফ্লেশান সত্য হলে আমাদের মহাবিশ্বের বাইরেও আরো অসংখ্য মহাবিশ্ব থাকতেই হবে। এ বিষয়টা অনেক পদার্থবিদই কিছুটা বাড়াবাড়ি বলে মনে করলেন। স্টেইনহার্ডটও তাদেরই একজন ছিলেন, যে কারণে তিনি ইনফ্লেশান তত্ত্ব থেকে বিগ বাউন্স তত্ত্বের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

image source: quantamagazine.org

আমাদের মহাবিশ্ব যে সঙ্কুচিত হতে পারে এই ধারণা ১৯৬০ সালের দিকে বিজ্ঞানীদের মাথায় প্রথম আসতে থাকে। এ সময় ব্রিটিশ পদার্থবিদ রজার পেনরোজ এবং স্টেফেন হকিং ‘সিঙ্গুলারিটি থিওরেম’ নামের একটি থিওরেম প্রমাণ করেন। তারা দেখান, খুব সাধারণ পরিবেশে সঙ্কুচিত হতে থাকা পদার্থ এবং শক্তিগুলো অবধারিতভাবে সিঙ্গুলারিটি নামের একটি অসীম ঘনত্বের বিন্দুতে পরিণত হয়। এই কথাটি শুধু ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রেই সত্য নয়, আমাদের মহাবিশ্বের ক্ষেত্রেও সত্য। তাই আমাদের মহাবিশ্ব সঙ্কুচিত হতে থাকলে তা একসময় সিঙ্গুলারিটি অবস্থার তৈরি করার কথা, যে অবস্থায় আলবার্ট আইনস্টাইনের মহাকর্ষের তত্ত্ব ভেঙ্গে পড়ে এবং আমাদের জানা পদার্থবিজ্ঞান আর কাজ করে না। এখানে আমাদের অবশ্যই কোয়ান্টাম মহাকর্ষের নতুন তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে, যা আমাদের এখনো অজানা।

নতুন আসা বিগ বাউন্সের দুটি মডেলই এই সিঙ্গুলারিটি ধারণার ভেতরে থাকা একটি ছিদ্র বা, সিঙ্গুলারিটি পরিহারের উপায়গুলো নিয়ে নিয়ে কাজ করেছে।

বিগ বাউন্সের পক্ষের জ্যোতিপদার্থবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে, সিঙ্গুলারিটি পরিহার করে বিগ বাউন্স সম্ভব যদি আমাদের মহাবিশ্বের ভেতরে ঋণাত্মক শক্তির উপস্থিতি বা, ঋণাত্মক চাপের কোনো উৎস থেকে থাকে। এই ঋণাত্মক চাপ বা, ঋণাত্মক শক্তি মহাকর্ষের প্রভাবে সবকিছুর যে সঙ্কোচন ঘটে তাকে বাঁধাগ্রস্থ করবে এবং সবকিছুকে সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছানোর পূর্বেই দূরে সরিয়ে দেবে। এভাবে বিগ বাউন্স মডেল সিঙ্গুলারিটিকে ফাঁকি দিয়ে তার সঙ্কোচন প্রসারণ অব্যাহত রাখে। বিগ বাউন্স মডেলের সমর্থকরা বহুদিন ধরেই সিঙ্গুলারিটি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এই পথ অবলম্বনের চেষ্টা করে আসছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, তাদের মডেল অনুসারে আমাদের মহাবিশ্বে ঋণাত্মক শক্তি যোগ করলে আমাদের মহাবিশ্ব খুব বেশি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, যা আমাদের মহাবিশ্বের অস্তিত্বকেই হুমকির মাঝে ফেলে দেয়। উপরন্তু ২০১৬ সালে এসে রাশিয়ান পদার্থবিদ ভ্যালেরি রুবাকোভ এবং আরো কয়েকজন পদার্থবিদ মিলিতভাবে ‘নো গো থিওরেম’ নামে একটি থিওরেম প্রমাণ করে দেখান, যা বিগ বাউন্সের প্রস্তাবিত মডেলগুলোর মাঝের অনেকগুলোকেই সরাসরি বাতিল করে দেয়।

এরপর গত বছর পদার্থবিদ ইজ্জাস এমন এক বিগ বাউন্সের মডেল খুঁজে পান যা ভ্যালেরি রুবাকোভের ‘নো গো থিওরেম’কে ফাঁকি দিতে পারে। আর তার এই মডেল থেকে সৃষ্টি হওয়া মহাবিশ্বও বেশ স্থিতিশীল হয়। যা বিগ বাউন্স মডেলের সমর্থকদের জন্য বেশ স্বস্তিদায়ক এক বিষয়। এখনো পর্যন্ত এই মডেলকেই বিগ বাউন্সের সবচেয়ে সেরা মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আর বিগ বাউন্সের নতুন দুটি প্রস্তাবনার ক্ষেত্রেই যে বিষয়টি একই তা হলো দুটি প্রস্তাবনাই সিঙ্গুলারিটিকে ফাঁকি দিতে পারে, যার অর্থ আমরা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি বা, মহাকর্ষের সাধারণ তত্ত্ব দিয়েই এই বিগ বাউন্সকে ব্যাখ্যা করতে পারি। মহাকর্ষের কোয়ান্টাম চরিত্র নিয়ে চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

এখন দেখার বিষয় পদার্থবিদদের সবচেয়ে পছন্দের এবং এখনো পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব ইনফ্লেশান ভবিষ্যতে সত্য প্রমাণিত হয় নাকি বিগ বাউন্স মডেল সত্য হিসেবে আবির্ভূত হয়।

featured image: quantamagazine.org

বাংলাদেশে তৈরি হলো প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত কিবোর্ড

এবার বাংলাদেশে তৈরি হলো প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত কিবোর্ড। আর এই কিবোর্ডটি তৈরি করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মিলিত একটি দল। দেশের সর্বপ্রথম মোবাইলে ভর্তি কার্যক্রম, প্রথম বাংলা সার্চ ইঞ্জিন ‘পিপীলিকা’, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক, দেশের প্রথম বাংলায় কথা বলা রোবট রিবোর পর এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কিবোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মুকুটে নতুন পালক যুক্ত করবে।

প্রথম দিকে এই কিবোর্ডটির কোনো নাম ছিল না। কিবোর্ডটির কাজ মোটামুটি একটি ভালো পর্যায়ে যাওয়ার পরে লেখক, অধ্যাপক এবং শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এক ভিডিওবার্তায় কিবোর্ডটির জন্য সুন্দর একটি নাম প্রস্তাব করার জন্য সবার কাছে আহ্বান জানান। উনার আহ্বানে সারা দিয়ে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। প্রতিযোগীদের পছন্দের তালিকায় সবার উপরে থাকে ‘একুশে বাংলা কীবোর্ড’ নামটি। তারপর সবার দেয়া নামে কিবোর্ডটির নামকরণ করা হয় ‘একুশে বাংলা কিবোর্ড’।

একুশে বাংলা কিবোর্ড টিমের সাথে অধ্যাপক ডক্টর মুহম্মদ জাফর ইকবাল

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বিশ্বপ্রিয় চক্রবর্তী এবং ২০১২-২০১৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী উ খ্যই নু এবং রনিত দেবনাথ আকাশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত বাংলা কিবোর্ড তৈরির প্রকল্প হাতে নেন। পরবর্তিতে উ খ্যই নু এবং রনিত দেবনাথ আকাশ চাকরি পেয়ে ঢাকা চলে যান। এরপর এই প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত হন একই বিভাগের ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী গৌতম চৌধুরী ও বুদ্ধ চন্দ্র বনিক। দলেরর সবার কঠোর পরিশ্রমে তৈরি হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত কিবোর্ড। কিবোর্ডটির ইউজার ইন্টারফেস তৈরি করেন ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল হক।

image source: play.google.com

কিবোর্ডটির সুবিধা

  • ইংরেজি QWERTY কিবোর্ড লে-আউটের সাথে আমরা সবাই কম বেশি পরিচিত। তাই কিবোর্ডে ইংরেজি এই লেআউটই ব্যবহার করা হয়েছে।
  • দ্রুত লেখার জন্য টাইপের পাশাপাশি কিবোর্ডে বর্ণগুলোর উপর আঙ্গুল ঘুরিয়ে বা, swipe করে লেখার ব্যবস্থা রয়েছে এই কিবোর্ডে । swipe করে লিখলে সময় যেমন কম লাগে আবার খুব সহজে এক হাতেও লেখা যায় ।
  • এই কিবোর্ডে সবসময় সব কিছু লেখার প্রয়োজনও নেই। এই কিবোর্ডটি তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নিজেই বুঝে ফেলবে আপনি কি লিখতে চাচ্ছেন। যেমন: আপনি লিখলেন, “আমি ভালো” এই কিবোর্ডটি তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বুঝে ফেলবে যে, আপনি লিখতে চাচ্ছেন “আমি ভালো আছি ” অথবা, “আমি ভালো নেই”। সময়ের সাথে সাথে কিবোর্ডের বুদ্ধি বাড়তে থাকবে। কিবোর্ড যত বুদ্ধিমান হবে আপনাকে তত কম লিখতে হবে আর আপনার পরিশ্রম ততই কমে যাবে ।
  • একজন ব্যবহারকারী বাংলা ও ইংরেজী দুটি ভাষাতেই খুব সহজে লিখতে পারবেন। মাত্র একটা ক্লিকেই ভাষা পরিবর্তন করা যায় এই কিবোর্ডে।

কিবোর্ডটির অসুবিধা

  • এটি এন্ড্রোয়েড ছাড়া অন্য অপারেটরে চালানো যায় না।
  • এই কিবোর্ডে শর্টকাট নির্দেশনা(Cut,Copy, Paste) নেই।

featured image: samakal.com

 

যে গভীরতায় এভারেস্টও হার মানে

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ একটি অর্ধচন্দ্রাকার খাঁদ, যা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের গুয়াম অঞ্চলের মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের কাছে অবস্থিত। এর আশাপাশের পরিবেশ কিন্তু বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম খাঁদটি মারিয়ানা ট্রেঞ্চে অবস্থিত। মারিয়ানা ট্রেঞ্চের দক্ষিন অংশের নাম হচ্ছে চ্যালেঞ্জার ডিপ এবং এটিই মহাসাগরের সবচেয়ে গভীরতম বিন্দু। এর একদম সঠিক গভীরতা নির্ণয় করা একটু কষ্টসাধ্যই বটে, কিন্তু আধুনিক পরিমাপক দ্বারা নিখুঁত মাপ পাওয়া না গেলেও অনেকাংশে সঠিক পরিমাপ বের করা সম্ভব হয়েছে।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের ভৌগলিক অবস্থান; image source: earth.google

২০১০ সালে চ্যালেঞ্জার ডিপের গভীরতা ৩৬,০৭০ ফিট (১০,৯৯৪ মিটার) পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছিল শব্দের কম্পন/প্রতিধ্বনি দ্বারা এবং জরিপটি করেছিল National Oceanic and Atmosphere Administration (NOAA)। বিখ্যাত মুভি ডিরেক্টর জেমস ক্যামেরন ২০১২ সালে তার গভীর সমুদ্রের অভিযান হিসাবে চ্যালেঞ্জার ডিপের উদ্দেশ্যে গমন করেন এবং তিনি ৩৫,৭৫৬ ফিট (১০,৮৯৮ মিটার) পর্যন্ত পৌঁছান। ২০১৪ সালে ইউনিভার্সিটি অফ হ্যাম্পশায়ারের কিছু গবেষক সমুদ্রের তলদেশের একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন এবং চ্যালেঞ্জার ডিপ ৩৬,০৩৭ ফিট (১০,৯৮৪ মিটার) বলে ঘোষণা দেন। মহাসাগরের দ্বিতীয় গভীরতম স্থানটিও মারিয়ানা ট্রেঞ্চেই অবস্থিত যার নাম দ্য সিরেনা ডিপ। এটি চ্যালেঞ্জার ডিপ থেকে ১২৪ মাইল (২০০ কিলোমিটার) পূর্বে অবস্থিত এবং ৩৫,৪৬২ ফিট (১০,৮০৯ মিটার) গভীর। যদি মাউন্ট এভারেস্টের সাথে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তুলনা করা হয় তাহলে মাউন্ট এভারেস্ট অনায়াসে হেরে যাবে। কারণ মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা ২৯,০২৯ ফিট, আর অপর দিকে মারিয়ানা ট্রেঞ্চ ৩৬,০৭০ ফিট গভীর। ফলে এভারেস্টকে যদি মারিয়ানা ট্রেঞ্চে নিমজ্জিত করা হয় তাহলে তার চূড়ারও খোঁজ পাওয়া যাবে না।

এভারেস্ট বনাম মারিয়ানা ট্রেঞ্চ; image source: thinglink.com

রক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ ১,৫৮০ মাইল (২,৫৪২ কিলোমিটার) দীর্ঘ যা ৫ টি গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের চাইতেও বড় কিন্তু প্রস্থে মাত্র ৪৩ মাইল (৬৯ কিলোমিটার)। যেহেতু গুয়াম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন এবং ১৫ টি মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথের সাথে যুক্ত তাই আইনগতভাবে মারিয়ানা ট্রেঞ্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীন। ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিও বুশ মারিয়ানা ট্রেঞ্চকে জাতীয় সামুদ্রিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসাবে ঘোষণা দেন। যার ফলে ১,৯৫,০০০ বর্গ মাইল (৫,০৬,০০০ বর্গ মিটার) পর্যন্ত সমুদ্রের তলদেশে এবং পানির চারপাশের বিছিন্ন দ্বীপগুলো সুরক্ষিত সামুদ্রিক রিজার্ভের আওতায় পড়ে যায়। এর মধ্যে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের বেশীরভাগ দ্বীপ এবং পানির নিচের ২১ টি আগ্নেয়গিরিও অন্তর্ভুক্ত।

কিভাবে তৈরি হয়েছিল এই খাঁদ?

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ তৈরি হয়েছিল এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যা সাবডাকশন বলয়ে ঘটে থাকে। (নোটঃ সাবডাকশন বলয় হচ্ছে এককেন্দ্রমুখি প্লেট, যেখানে অন্তত একটি টেকটনিক প্লেট হচ্ছে সামুদ্রিক ভূ-ত্বকের।) সাবডাকশন বলয়ে একটি সামুদ্রিক প্লেটকে অপর প্লেটের সাথে চাপ দেওয়া হয়, ফলে একটি প্লেট আরেকটি প্লেটের নিচে চলে যায়  এবং সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।  যেখানে এই সংঘর্ষটি হয় সেখানে বিশাল খাঁদের সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে প্রশান্ত মহাসাগরের প্লেটটি ফিলিপাইনের প্লেটের সাথে চাপ লেগে বেঁকে যাচ্ছে। খাঁদ গভীর হলেও সেটা যে পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকবে এমনটা কিন্তু নয়। যেমন ইকুয়েটর অঞ্চলে পৃথিবী হচ্ছে স্ফীত আর মেরু অঞ্চলের প্লেট পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছাকাছি, তাই চ্যালেঞ্জার ডিপ গভীর হলেও তা কিন্তু পৃথিবীর কাছাকাছি নয়।খাঁদের তলদেশে পানির চাপ অত্যাধিক বেশি, প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে প্রায় ৮ টন (৭০৩ কিলোগ্রাম প্রতি বর্গ মিটারে)। এটি সমুদ্রের পৃষ্ঠের চাপের চাইতে প্রায় ১০০০ গুন বেশি বা, ৫০ টি জাম্বো জেট প্লেন একজন মানুষের উপর স্তুপ করে রাখার সমান।

যেভাবে তৈরি হয়েছিল এই খাঁদ; image source: worldbeneaththewaves.com

অস্বাভাবিক আগ্নেয়গিরি সমূহ

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের সারিবদ্ধ যেসব আগ্নেয়গিরি সমুদ্রের উপর মাথা তুলে আছে তারাই অর্ধচন্দ্রাকৃতির মারিয়ানা দ্বীপের সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও সমুদ্রের নিচে কিছু অদ্ভুত আগ্নেয়গিরি দেখা যায়, যেমন – এইফুকু সমুদ্রগর্ভস্থ আগ্নেয়গিরি তরল কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত করে। যে তরল এখান থেকে বের হয়ে আসে তার তাপমাত্রা ১০৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দাইকোকু সমুদ্রগর্ভস্থ আগ্নেয়গিরি বিগলিত সালফার নির্গমন করে, যা আর পৃথিবীর কোথাও দেখেতে পাওয়া যায় না।

খাঁদে যাদের বসবাস

সাম্প্রতিক কিছু অভিজানের পর অবাক করে দেওয়া বিচিত্র জীবনযাত্রার খোঁজ পাওয়া গেছে খাঁদের কঠিন পরিবেশে। যেসকল জীব মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীর অঞ্চলে বসবাস করে তারা অত্যাধিক চাপ এবং নিকষ কালো অন্ধকারে থাকে। মারিয়ানা ট্রেঞ্চে খাবার খুবই সীমিত, কারণ পানির উপরিভাগের খাবার এত গভীরে পৌঁছাতে পারে না। তাই পানির নিচে জীবাণু ও ছোট প্রাণীরা রাসায়নিক পদার্থ, যেমন: মিথাইন বা সালফার এর ওপর নির্ভর করে থাকে। সাধারণত তিন ধরণের জীব দেখা যায় মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে, সেগুলো হল – জেনোফাইওফোরস, অ্যাম্ফিপডস এবং সি কিউকাম্বার।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের প্রধান তিন ধরণের প্রানী; image source: zmescience.com,pinterest.com,deepseanews.com

জেনোফাইওফোরস হচ্ছে এককোষী কিন্তু বৃহৎ আকারের অ্যামিবা এবং তারা আশেপাশে যা পায় তাই খায়। অ্যাম্ফিপড হচ্ছে চকচকে কিছুটা চিংড়ি মাছের মতো দেখতে এবং তারা ময়লা আবর্জনা খেয়ে বেঁচে থাকে। এদেরকেই মূলত খাঁদে বেশি দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা দুইশতাধিক বিভিন্ন ধরণের অনুজীবের সন্ধান পেয়েছেন সেখান থেকে কাদা তুলে আনার পর। এছাড়াও ২০১২ সালের জেমস ক্যামেরন এর অভিযানের সময় বিজ্ঞানীরা মাইক্রোবায়াল ম্যাট সনাক্ত করেন চ্যালেঞ্জার ডিপে। মাইক্রোবায়াল ম্যাট হাইড্রোজেন এবং মিথাইন শোষণ করে বেঁচে থাকে। সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা কিছু অদ্ভুত ধরণের মাছও এখানে দেখতে পাওয়া যায় এবং এরাই কিন্তু এখানে খাদ্য শিকল এর উপরের স্তরে রয়েছে। এই সকল জীব সাধারণত ২৬,২০০ ফিট (৮,০০০ মিটার) গভীরে দেখতে পাওয়া যায় যেখানে সূর্যের আলো একদমই পৌঁছায় না। এ কারণেই এরা দেখতেও অদ্ভুত এবং এদের শারীরিক কাঠামোও আলদা।

এই গভীরেও রয়েছে দূষন

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এই গভীর খাঁদেও পাওয়া গেছে মানুষের তৈরি দূষণের চিহ্ন। ১৯৭০ সালে যে সকল ক্ষতিকর রাসায়নিক নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তা এখনো সমুদ্রের গভীরতম অংশে ওঁত পেতে আছে। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ থেকে নিয়ে আসা অ্যাম্ফিপড পরীক্ষা করার সময় একদল বিজ্ঞানী এরমধ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অস্তিত্ব খুঁজে পান। এই সব রাসায়নিক ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত ব্যবহার হয়েছিল এবং পরে তা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়।

“এত গভীর এবং এত দুর্ভেদ্য অঞ্চলে মানুষের তৈরি অতিমাত্রার দূষণ খুঁজে পাওয়া খুবই দুঃখজনক এবং এটার একটা বিধ্বংসী প্রভাব পড়বে সমগ্র মানবজাতির উপরে দীর্ঘ সময়ের জন্য” বলে মন্তব্য করেন নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লেখক জেইমসিন।

গবেষকরা বলছেন যে, পরবর্তী ধাপ বুঝে কাজ করতে হবে এবং আগে যা কিছু হয়েছে তার ফলাফলের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ এটি আমাদের বাস্তুতন্ত্রের একটি অংশ।

featured image: eoimages.gsfc.nasa.gov

সৌরজগতের সবচেয়ে বড় ঝড়ের জীবনকাল শেষ হয়ে আসছে

আপনি যদি বৃহস্পতি গ্রহের গ্রেট রেড স্পট না দেখে থাকেন তাহলে আপনার জন্য রয়েছে দুঃসংবাদ। গ্রেট রেড স্পট, যা আসলে বৃহস্পতি গ্রহে চলমান বৃহৎ ঝড়, তা আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে এবং তা আপনার জীবদ্দশাতেই হয়ত হারিয়ে যাবে।

নাসার ১ বিলিয়ন ডলারের জুনো প্রোব জুলাই ২০১৭ তে গ্রেট রেড স্পটের বেশ কিছু অনিন্দ্য সুন্দর ছবি তুলেছিল বেশ কাছ থেকে। এই ছবিগুলোর বিস্তারিত দেখে বিজ্ঞানীরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন কারণ তারা এর আগে এত কাছ থেকে এবং এত পরিষ্কারভাবে কখোনই গ্রেট রেড স্পটকে দেখেননি।

জুনোর চোখে গ্রেট রেড স্পট; image source: sciencealert.com

বৃহস্পতির এই ভয়ানক ঝড় পৃথিবীর ঝড়ের চেয়ে বেশ কয়েকগুন বড়। ঝড়টি সম্ভবত ১৬০০ সাল থেকে ঘুরেই চলেছে। তার তুলনায় পৃথিবীর সবচাইতে বড় ঝড় ছিল হ্যারিকেন জন, যা হয়েছিল ১৯৯৪ সালে এবং এর স্থায়িত্ব ছিল ৩১ দিন।

জুনো মিশনের দলের সদস্য এবং নাসার গ্রহ বিজ্ঞানী গ্লেন অরটনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কেন বৃহস্পতির ঝড় এত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। উত্তরে তিনি বলেন, “ঝড় গুলো এত দীর্ঘ সময় ধরে থাকে না, অন্তত সবগুলো নয়।”

তিনি আরো বলেন, “ধরুন গ্রেট রেড স্পট হচ্ছে একটা ঘুর্ণায়মান চাকা যা চলতেই থাকে কারণ এটি দুটো বেল্টের মধ্যে আটকা পড়েছে যা পরস্পর বিপরীত দিকে চলছে। আর এ কারনেই গ্রেট রেড স্পট ঘুরতেই থাকে। কারণ তা অবিরাম চলমান বেল্টের মতো জায়গাতে আটকা পড়ে গেছে।”

বৃহস্পতির বাতাসের দমকা হাওয়ার বেগ প্রায় ৩০০ মাইল প্রতি ঘন্টা বা, ৫০০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা। ফলে তা যখন কোনো ঝড়ের সাথে যুক্ত হয় তখন তা বড় ধরণের একটা প্রভাব ফেলে। ফলে দ্রুত গতিতে চলা এই গ্রহের বিপরীত দিকে ঘুরতে থাকা এই ঝড় কখনোই বন্ধ হয় না।

জুনো পরবর্তীতে এই দানব ঝড়কে দেখতে পাবে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে, তারপর আবার ২০১৯ সালের জুলাই এবং সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু তবুও ২০১৭ সালে যত কাছে এবং যত বিস্তারিতভাবে দেখা গিয়েছিল সেইভাবে আর দেখেতে পাবে না জুনো। ফলে বিজ্ঞানীদের কাছে এই ছবিগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি।

কখন হারিয়ে যাবে এই দানব ঝড় ?

পৃথিবীতে কখনোই বৃহস্পতির মত শত শত বছর ধরে ঝড় চলতে পারবে না। কারণ বৃহস্পতি গ্রহে পৃথিবীর মত সুবিন্যস্ত স্থলভাগ বা সাগর নেই। ফলে ঝড় বাধা দেওয়ার মত কিছুই নেই।

অন্যদিকে আমাদের গ্রহের ভূ-গঠন আলাদা হওয়ার কারনে ঝড় বেশিদিন টিকতে পারে না। এছাড়াও আমাদের গ্রহের ঘূর্ণন অনেক আস্তে, যেখানে পৃথিবী প্রতি ২৪ ঘন্টায় নিজের অক্ষের ওপর একবার ঘোরে সেখানে বৃহস্পতি নিজের অক্ষের ওপরে ১০ ঘন্টায় একবার ঘোরে।বৃহস্পতির এইসব গুনাবলি আমাদের গ্রহে নেই বলেই দমকা হাওয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে না।

কিন্তু যার শুরু আছে তার শেষও আছে। গ্রেট রেড স্পট এবং বৃহস্পতি গ্রহের কোনো কিছুই চিরকাল থাকবে না। গ্রেট রেড স্পটও দীর্ঘ সময় ধরে আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে।

১৮০০ শতকের শেষের দিকে এই ঝড়টি সম্ভবত ৩০ ডিগ্রী দ্রাঘিমাংশের সমান অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল। যা প্রায় ৩৫,০০০ মাইল (৫৬,০০০ কিলমিটার) এবং এটা পৃথিবীর চাইতে প্রায় চার গুনেরও বেশি বড়। তাই যদি ভুল করেও পৃথিবী এই গ্রেট স্পটের কবলে পড়ে তবে আর রক্ষা নেই। যদিও এটা কখনোই হওয়া সম্ভব নয়।

পৃথিবী এবং গ্রেট রেড স্পটের তুলনা; image source: universetoday.com

নিউক্লিয়ার শক্তিতে চালিত মহাকাশযান ভয়েজার-২ যখন ১৯৭৯ সালে বৃহস্পতি গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে গিয়েছিল তখন এই গ্রেট রেড স্পটের আয়তন হয়তবা পৃথিবীর দ্বিগুনের চাইতে একটু বড় ছিল।

এখন তা ১৩ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশের সমান প্রশস্থ এবং তা পৃথিবীর চাইতে মাত্র ১.৩ গুন বড়। অর্থাৎ, এই ঝড়ও চিরদিন থাকবে না।

নেপচুন গ্রহেরও একটি বিশেষ ঝড় আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, যা হাবল টেলিস্কোপে ধরা পড়েছে। এই ঝড়টির আকারও নেহাত কম ছিল না। পৃথিবীর একটি মহাদেশের সমান এই ঝড়টিও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে একেবারে বিলীন হয়ে যাবে।

বৃহস্পতির গ্রেট রেড স্পটেরও সময়ও ফুরিয়ে আসছে। অরটন বলেন, “গ্রেট রেড স্পট আগামী এক বা দুই দশকের মধ্যে গ্রেট রেড সার্কেলে পরিণত হবে এবং তার পরবর্তিতে থাকবে শুধুই গ্রেট রেড মেমোরি”

বৃহস্পতি গ্রহ; image source: nasa.gov

কিন্তু নাসা গডার্ড ফ্লাইট সেন্টারের এমি সাইমন্স বলেন যে, “এটা হয়ত একসময় হারিয়ে যাবে, কিন্তু তা যে হবেই তা কিন্তু কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না।”

কারণ হিসাবে তিনি বলেন, যে কারণে এই দানবীয় ঝড়টি এতদিন ধরে টিকেছিল তা যদি আবার শক্তি যোগায় তাহলে হয়ত তা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে না। একটা নির্দিষ্ট আয়তন জুড়ে হয়ত আরো কিছুদিন থাকতে পারে। তাই এখন সময়ই বলে দেবে যে কি হতে চলেছে এই গ্রেট রেড স্পটের ভাগ্যে।

featured image: nasa.com

 

সাইবেরিয়ার ২,০০,০০০ বছরের পুরোনো পাতালপুরীর দরজা

এটি এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সাইবেরিয়ার ভূগর্ভস্থ চিরহিমায়িত অঞ্চল পাতলা বরফ দ্বারা আবৃত। এই অবস্থা জায়গাভেদে এতই মারাত্বক আকার ধারণ করেছে যে, বিশাল বিশাল গর্ত হঠাৎ করে জেগে উঠছে। স্থানীয় ইয়াকুশান লোকদের কাছে এই এলাকার সবচেয়ে বড় খাঁদটি “পাতালপুরীর দরজা” হিসেবেই পরিচিত এবং তা এত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে যে বরফের নিচ থেকে ২,০০,০০০ বছরের পুরোনো জঙ্গল, পশুপাখির মৃতদেহ বেরিয়ে আসছে।

 

ব্যাটাগাইকা খাঁদ; image source: sciencealert.com

ব্যাটাগাইকা খাঁদ নামে পরিচিত হলেও অফিশিয়ালি এগুলোকে বলা হয় “মেগাস্লাম্প” বা “থারমোকার্স্ট”।

সাম্প্রতিক সময়ে এরকম বেশকিছু মেগাস্লাম্প সাইবেরিয়া জুড়ে দেখা গেলেও, গবেষকদের ধারণা ব্যাটাগাইকা এই অঞ্চলের মেগাস্লাম্পগুলো অন্য গুলোর তুলনায় অস্বাভাবিক। এই অঞ্চলটি ইয়াকুটস্ক শহরের ৬৬০ কিলোমিটার (৪১০ মাইল) উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত।

এই খাঁদ টি যে শুধুই বড় তা কিন্তু না। প্রায় ১ কিলোমিটার লম্বা এবং ৮৬ মিটার (২৮২ ফিট) গভীর এই খাঁদটি ক্রমবর্ধমান।

২০১৬ সালের একটি গবেষনায় জার্মানির আলফ্রেড ওয়েজেনার ইনস্টিটিউট এর ফ্র্যাঙ্ক গানথার প্রকাশ করেন যে, গত এক দশকে এই খাঁদটি প্রতি বছরে গড়ে প্রায় ১০ মিটার করে বেড়ে চলছে এবং অপেক্ষাকৃত গরম সময়ে প্রতি বছরে এর বৃদ্ধি ৩০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে।

তিনি আরো আশংকা করেন, ভবিষ্যতে উত্তর গোলার্ধের তাপমাত্রার বৃদ্ধির জন্য খাঁদের আকার বৃদ্ধি পেতে পারে এবং তা পার্শ্ববর্তী উপত্যকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর ফলে বরফের উপরে তৈরি হওয়া ভূমির ধ্বস হতে পারে।

বিবিসি হতে আগত মেলিসাকে গানথার বলেন,“গড়ে অনেক বছর আমরা এমনও দেখেছি যে খাঁদ এর বৃদ্ধির হার খুব বেশি বাড়েও নি আবার কমেও নি, কিন্তু এর গভীরতা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।”

প্রতিবছর ই বেড়ে চলেছে এই খাঁদ; image source :eoimages.gsfc.nasa.gov

আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য এটি খুব ভালো সংবাদ নয়। এই খাঁদের গঠন প্রথম শুরু হয় ১৯৬০ সালে নিকটবর্তী বিশাল অরন্যের বিনাশ ঘটানোর পরে।

২০০৮ সালে ভয়াবহ বন্যা এই বরফের গলনকে আরো ত্বরান্বিত করে এবং খাঁদের বৃদ্ধিতে অবদান রাখে।

এই এলাকার অস্থায়িত্ব শুধুমাত্র স্থানীয়দের জন্য বিপজ্জনক নয়। উদ্বেগের বিষয় যে, এই খাঁদ যত গভীর হবে তত এটি কার্বনের ভান্ডার উন্মুক্ত করে দেবে, যা হাজার হাজার বছর ধরে চাপা পড়ে ছিল।

বিবিসিকে গানথার বলেন, “বায়ুমন্ডলে যে পরিমান কার্বন রয়েছে তা সমগ্র ভূগর্ভস্থ চিরহিমায়িত অঞ্চল এ চাপা পড়ে থাকা কার্বনের সমান।”

খাঁদের বরফ যত গলতে থাকবে ততই এটি বায়ুমন্ডলে গ্রীনহাউস গ্যাস ছাড়তে থাকবে এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরো বেড়ে যাবে।

“এটাকেই আমরা বলি ধনাত্নক প্রতিক্রিয়া”, যোগ করলেন গানথার। “উষ্ণতা বাড়ায় উষ্ণতা, এবং এই প্রতিক্রিয়া অন্যান্য স্থানেও হতে পারে।”

কিন্তু সব খারাপ খবরের মধ্যেও কিছু ভালো খবর আছে।  ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি তে এক গবেষণায় বলা হয় যে, খাঁদে যেসকল লেয়ার আবিষ্কার হয়েছে বা হচ্ছে তাতে ২০০,০০০ বছরের পুরোনো আবহাওয়ার তথ্য সংরক্ষিত আছে।

এছাড়াও এখানে বরফে জমে থাকা অনেক পুরোনো বন-জঙ্গল, পরাগরেণুর নমুনা এবং এমনকি ষাঁড়, ম্যামথ এবং ৪,৪০০ বছর পুরোনো ঘোড়ার অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে।

জুলিয়ান মুরটনের আবিষ্কৃত গাছের গুড়ি; image source : sciencealert.com

এই রিসার্চ টি ইউনিভার্সিটি অফ সাসেক্স এর জুলিয়ান মুরটন করেছিলেন, যিনি বলেছেন এইসকল আবিষ্কৃত পলিমাটি আমাদের বুঝতে সহায়তা করবে যে সাইবেরিয়ার আবহাওয়া পূর্বে কিভাবে পরিবর্তন হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা কিভাবে হবে।

যেখানে বিগত ২০০,০০ বছরে পৃথিবী উষ্ণ এবং ঠান্ডা উভয় অবস্থার মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করেছে সেখানে সাইবেরিয়ার আবহাওয়ার ইতিহাস একেবারেই অজানা।

কিন্তু মুরটন এর ভাষ্যমতে সাইবেরিয়ায় শেষ এই ধরনের স্লাম্পিং হয়েছিল প্রায় ১০,০০০ বছর আগে যখন পৃথিবী তার শেষ বরফ যুগ থেকে বের হয়ে আসছিল।

বায়ুমন্ডলে গ্রীনহাউজ গ্যাসের মাত্রা সেই সময়ের চাইতে এখন অনেক বেশি। আমরা ৪০০ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম) কার্বন-ডাই-অক্সাইড পার করে ফেলেছি যেখানে সর্বশেষ বরফ যুগ যখন শেষ হয় তখন তা ছিল ২৪০ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম)।

ব্যাটাগাইকার এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বরফের লেয়ার রয়েছে যেখানে দুইটি পুরু বন-জঙ্গলের আস্তরন আছে যা পুর্বের উষ্ণ থেকে উষ্ণতর আবহাওয়ার নির্দেশ করে বর্তমান সময়ের আবহাওয়ার চাইতে।

ওপরের বন-জঙ্গলের আস্তরনটি আরেকটি পুরোনো মাটির আস্তরনের উপর আছে যা সম্ভবত পূর্বে যখন আবহাওয়া উষ্ণ হয়েছিল তখন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গলে গিয়েছিল। তবে গলে কি হয়েছিল তা জানতে পারলে হয়ত আমরা পরবর্তীতে যখন এরকম হবে তার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারবো।

কাছে থেকে ব্যাটাগাইকা খাঁদ দেখতে যেমন; image source : inhabitat.com

কিন্তু এ বিষয়ে আরো গবেষনা দরকার, “কারণ খাঁদে আবিষ্কৃত পলিমাটির সঠিক বয়স আমরা এখনো জানি না” বলেন মুরটন।

তিনি এখন এই অঞ্চলে গর্ত খনন করার চিন্তা করছেন, এতে করে তিনি প্রাপ্ত পলিমাটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বুঝতে পারবেন অতীতে আসলেই কি হয়েছিল এখানে।

“সর্বশেষভাবে, আমরা আসলে দেখতে চাচ্ছি সাইবেরিয়াতে শেষ বরফ যুগে যা হয়েছিল তা উত্তর অ্যাটলান্টিক এর সাথে মিল আছে কি না।” – মুরটন ।

সাইবেরিয়ার ব্যাটাগাইকা খাঁদেই হয়ত হাজার বছরের পুরোনো পৃথিবীর রহস্য লুকিয়ে আছে। এখন শুধু তা সবার সামনে আসার অপেক্ষা করছে মাত্র।

featured image: news.nationalgeographic.com

স্পেস এক্সের ফ্যালকন হেভির অন্য এক গোপন উদ্দেশ্য, যার কথা খুব কম মানুষই জানে

গত সপ্তাহে স্পেস এক্সের ঐতিহাসিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট উৎক্ষেপণের পর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে স্টারম্যান এবং টেসলা। তবে সেটার পাশাপাশি আরো একটি জিনিস মহাকাশে নিয়ে গেছে ফ্যালকন হেভি যার সম্পর্কে তেমন কারো আগ্রহ দেখা যায়নি।

টেসলা রোডস্টার গাড়িটির ভেতরে লুকানো ছিল বিলিয়ন বছর ধরে টিকে থাকতে সক্ষম ছোট্ট রহস্যময় একটি বস্তু। মহাকাশ কিংবা দূরবর্তী কোনো গ্রহের পৃষ্ঠেও যা থাকবে অটুট। এটার নাম আর্ক । যা দেখতে কয়েনের মতো কোয়ার্টজ ক্রিস্টালের একটা ডিস্ক। এটা তৈরি কিরা হয়েছে প্রচুর পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করে রাখার জন্য।

ফ্যালকন হেভির উৎক্ষেপন; Image Source: spacenews.com

এই প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে আর্ক মিশন ফাউন্ডেশন নামক এক ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। তাদের ভাষ্যমতে আর্ক ডিস্ক স্থান কালের বাঁধা অতিক্রম করে জ্ঞানকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সংরক্ষণ ও ছড়িতে দিতে পারব।

দেখে মনে হতে পারে আর্ক হলো ডিভিডি কিংবা ব্লু রে ডিস্কের মিনিয়েচার, তবে এর সংরক্ষণ ক্ষমতা ঘরের ডিস্কগুলোর চেয়ে হাজার গুন বেশি। এর ধারণক্ষমতা তত্ত্বীয়ভাবে ৩৬০ টেরাবাইট যা প্রায় ৭০০০ ব্লু রে ডিস্কের সমান।

তবে ধারণক্ষমতার চেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো এর আয়ুষ্কাল। আর্কের প্রথম দুটো ভার্শন আর্ক ১.১ এবং আর্ক ১.২ কে বলা হয় মানুষের দ্বারা এযাবতকালের তৈরি সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর এরা ১৪ বিলিয়ন বছর পরেও নষ্ট হবে না। এই ডিস্কে কোয়ার্টজ সিলিকা গ্লাসের গায়ে লেজার ন্যানোস্ট্রাকচারিং এর মাধ্যমে তথ্যগুলো সংরক্ষণ করা হয়।

সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর্ক; Image source: www.sciencealert.com

উৎক্ষেপিত টেসলা গাড়িটি মহাকাশে ঘন্টায় ১২৯০৮ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে, আর তাতে লুকিয়ে রাখা আর্ক ১.২ ডিস্ক বহন করে নিয়ে যাচ্ছে আইজ্যাক আসিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজের তিনটি বইয়ের ডিজিটাল প্রতিরূপ। আর্ক তৈরির সাথে জড়িতরা এই পদক্ষেপের নাম দিয়েছেন “সোলার লাইব্রেরি”। সহ প্রতিষ্ঠাতা নোভা স্পিভ্যাক আশা করেন, এই সোলার লাইব্রেরি বিলিয়ন বছর ধরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। তিনি আরো বলেন “ভেবে নিন এটা সূর্যকে প্রদক্ষিণকারী একটি জ্ঞানের বলয়, যা মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে সৌরজগত এবং এরও বাইরে ছড়িয়ে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ।”

২০২০ এবং ২০৩০ সালে আরো দুটি রকেট উৎক্ষেপনের পরিকল্পনা মাথায় রেখে তারা কাজ করছেন। প্রথমটার উদ্দেশ্য হবে চাঁদ, পরেরটার মঙ্গল। লাল গ্রহে পাঠানোর জন্য যে ডিস্কটি তৈরি হবে সেটার সংরক্ষিত তথ্য সেখানকার উপনিবেশকারীদের স্থানীয় ইন্টারনেট তৈরিতে কাজে লাগবে।

কথাগুলো শুনতে আশ্চর্য শোনালেও সত্যিকার পরিকল্পনা আরো বড়। আর্কের পেছনের মানুষেরা চান এই আর্ক লাইব্রেরিগুলো সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ এবং তার বাইরেও ছডিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদানের বিকেন্দ্রীভূত একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে। বেশ উচ্চাভিলাসি মনে হলেও আপনি নিজেকেই প্রশ্ন করুন তো, কখনো কি ভেবেছিলেন ২০১৮ সালে টেসলা রোডস্টার সূর্যকে প্রদক্ষিন করবে?

featured image: mensxp.com

মানুষের স্মৃতিশক্তিকে নিয়ন্ত্রণের পথে বিজ্ঞান

ভাবুন তো, আমাদের যদি স্মৃতি না থাকত তাহলে কী হতো? একটা ঘটনা ঘটার পরে আমরা আর তা কোনো দিনও মনে করতে পারতাম না। সুস্বাদু বিরিয়ানী খাবার পরে ২য় বার আর তা কখনোই খেতে চাইতাম না। কারণ সেই বিরিয়ানী খাওয়ার কোন স্মৃতিই যে আমাদের মস্তিষ্কে নেই। কিংবা নিজের প্রেমিক বা, প্রেমিকাকেই কিছুক্ষণ পর চিনতে পারতাম না। অর্থাৎ, স্মৃতি যে আমাদের জীবনের কত গুরুত্বপূর্ণ এক অংশ তা আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি। আর বিজ্ঞানীরা এখন আমাদের সেই স্মৃতিকেই নিয়ন্ত্রণের পথে। হয়ত অদূর ভবিষ্যতেই তারা আমাদের অতীতের কোনো স্মৃতিকে ধ্বংস করতে সক্ষম হবেন কিংবা কোনো মিথ্যা স্মৃতিকে আমাদের মস্তিষ্কে সত্য হিসেবে ঢুকিয়েও দিতে পারবেন।

পথের শুরুটা হয়েছিল কার্ল ল্যাশলি নামের একজন বিখ্যাত মনোবৈজ্ঞানিকের হাত ধরে। তিনি ধারণা করেছিলেন যে, আমাদের স্মৃতিগুলো আমাদের মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট অংশের কোষে কিছু নির্দিষ্ট বিন্যাসে সংরক্ষিত হয়ে থাকে। মস্তিষ্কের এই অঞ্চলের কোষের যে সমাবেশ তাকে এনগ্রাম বলে। মস্তিষ্কের এই অংশে পরিবর্তন দেখা যায় যখন আমরা কোন কিছু শিখি আবার মস্তিষ্কের এই অংশ উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে যখন আমরা কোনো কিছু মনে করার চেষ্টা করি। বিভিন্ন ধরনের স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্কের সেই নির্দিষ্ট নিউরন কোষগুলোর মাঝের সংযোগগুলোকে শক্তিশালী করে তোলে। যখন আমাদের মস্তিষ্ক সেই স্মৃতিগুলোকে মনে করার চেষ্টা করে তখন আমাদের মস্তিষ্কের সেই অংশটি আগের সেই সন্নিবেশে উজ্জ্বিবীত হয়।

কার্ল ল্যাশলি; image source: en.calameo.com

ল্যাশলি তার জীবনভর গবেষণায় দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, আমাদের মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট অংশের টিস্যু নষ্ট করে দিলে আমাদের স্মৃতিরও কিছু অংশ সারা জীবনের জন্য নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি তার এই মতবাদ প্রমাণের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু অসাধারণ পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তিনি ইঁদুরদের একটি গোলকধাম বা, গোলকধাঁধা থেকে কীভাবে বের হতে হয় এর উপর প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন এবং তারপর তাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ নষ্ট করে দিচ্ছিলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন তিনি যদি স্মৃতির সেই নির্দিষ্ট অংশ ধ্বংস করতে সক্ষম হন তবে ইঁদুরগুলো তাদের জানা পথ ভুলে যাবে এবং আর গোলকধাম থেকে বের হতে পারবে না। কিন্তু এরপরও ইঁদুরদের মস্তিষ্কের ঠিক কোথায় তাদের স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে তা তিনি বের করতে পারছিলেন না। ল্যাশলী তার সারা জীবন গবেষণার পরেও তার এই মতামতের পক্ষে কোনো প্রমাণ জোগাড় করতে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ১৯৫০ সালের দিকে এসে ল্যাশলি পরাজয় মেনে নেন এবং তার নতুন মত প্রকাশ করেন। নতুন করে তিনি বলেন, আমাদের স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্কের ছোট একটি নির্দিষ্ট অংশে নয় গোটা মস্তিষ্কেই ছড়িয়ে থাকে।

image source: newscientist.com

ল্যাশলির ব্যর্থ গবেষণার প্রায় ৫০ বছর পর এসে টরোন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী শিলা জোসেলিন এক দল ইঁদুরের উপর চালানো একটি পরীক্ষার ফলাফল দেখে বিভ্রান্ত হন এবং ল্যাশলির মতবাদের দিকে নতুনভাবে তাকাতে বাধ্য হন। ইঁদুরের মস্তিষ্কের এক পাশে অ্যামিগডালা নামক অংশে এমন কিছু কোষ রয়েছে যা তাদের স্মৃতির সাথে সংযুক্ত। জোসেলিন দেখলেন অ্যামিগডালা অংশের মাত্র কিছু কোষের বিন্যাস পরিবর্তনে ইঁদুরের স্মৃতিশক্তি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।

ইঁদুরগুলোকে একটা নির্দিষ্ট শব্দ শোনানোর পরে ইলেক্ট্রিক শক দেয়া হতো। এরপর একদল ইঁদুরের অ্যামিগডালা অংশের কোষে পরিবর্তন করা হয়েছিল। আরেক অংশের উপর এই পরিবর্তনের কাজ করা হয়নি। দেখা গেলো, যে ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কের কোষে পরিবর্তন করা হয়েছিল তারা এই ভয়ের স্মৃতি খুব ভালোভাবে মনে রাখতে পারে। কিন্তু অন্য ইঁদুরগুলোর ক্ষেত্রে এই উন্নতি দেখা গেলো না।

image source: thepsychreport.com

এর ফলে আমাদের মস্তিষ্কে স্মৃতিগুলো যে একটি নির্দিষ্ট অংশে থাকে এ ব্যাপারে জোসেলিন একটি আশার আলো দেখতে পেলেন। কিন্তু একটি সত্যিকারের প্রমাণ জোগাড় করতে তার প্রায় ১০ বছর সময় লেগে গেলো।

২০০৯ সালে এসে জোসেলিন এবং তার দল একদল ইঁদুরের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু কোষ ধ্বংস করে দিয়ে তাদের মস্তিষ্ক থেকে কিছু স্মৃতি চিরদিনের জন্য মুছে দিতে সক্ষম হলেন। অবশেষে ল্যাশলির মস্তিষ্কের এনগ্রাম অঞ্চলের খোঁজ শুরুর ১০০ বছরের বেশি সময় পর এসে স্নায়ুবিজ্ঞানী জোসেলিন সেই অঞ্চল খুঁজে পেলেন।

শিনা জোসেলিন; image source: quantamagazine.org

জোসেলিনের দলের এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল এক ধরণের আণবিক যন্ত্র, যা নতুন স্মৃতির সাথে যে নিউরন কোষগুলো উদ্দীপ্ত হত সেগুলোকে চিহ্নিত করতে সক্ষম ছিল।

শব্দ শোনার পর এবং ইলেক্ট্রিক শক দেয়ার আগে ইঁদুরের মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশ উদ্দীপ্ত হয়। সেই অঞ্চলটাকেই খুঁজে বের করল ল্যাশলি এবং তার দল। এরপর ইঁদুরের মস্তিষ্কের সেই অঞ্চলের কোষগুলোকে মস্তিষ্ক থেকে সরিয়ে ফেলা হলো। কিন্তু অন্যান্য কোষগুলোকে আগের মতই রাখা হলো। দেখা গেল ইঁদুরগুলো আর শব্দ শুনে বিচলিত হচ্ছে না। তাদের শব্দ শোনার সাথে সাথে ভয়ের যে অনুভূতির স্মৃতি তা হারিয়ে গেছে।

এরপর আরো উন্নত পরীক্ষাও এসব ইঁদুরদের উপর চালানো হয়েছে। এনগ্রাম অঞ্চলের কোষের কাজ বিশেষ পদ্ধতিতে বন্ধ এবং পুনরায় চালু করে দেখা হয়েছে। এমনকি ইঁদুরদের স্মৃতি শুধু ধ্বংস করতেই বিজ্ঞানীরা সক্ষম হননি, তাদের মস্তিষ্কে মিথ্যা স্মৃতি ঢুকিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও তারা সাফল্য পেয়েছেন।

স্মৃতিকে নিয়ন্ত্রণের পথে এই এগিয়ে চলা একই সাথে অনেক উত্তেজনাপূর্ণ এবং অন্যদিকে খুবই ভীতিজনক। এ ধরনের প্রযুক্তি এতদিন শুধু বিজ্ঞান কল্পকাহিনীতেই দেখা যেত, যেখানে এই প্রযুক্তি কখনো সুখের সন্ধানে আবার কখনও ধোঁকা দিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে এ ধরনের গবেষণা বিভিন্ন স্মৃতিজনিত রোগের চিকিৎসা বা, মাদকাসক্তির চিকিৎসায় অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে গবেষকরা আশাবাদী।

Featured image: humanbrainfacts.org

গোঁফ কেটে স্ট্রোকের চিকিৎসা

স্ট্রোকে আক্রান্ত হবার পর সুস্থ্য হতে কতদিন লাগবে কিংবা আদৌ সুস্থ হবেন কি না তা ঠিক আগে থেকেই বলা যায়না। কিন্তু কিছু কিছু কার্যকলাপ যদি বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে মস্তিষ্ক নিজেই নিজেকে সুস্থ করতে পারে।

সম্প্রতি ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন মু লি উদ্ভাবন করেছেন যে, ইঁদুরের গোঁফ ছোট করে দিলে তারা স্ট্রোক থেকে অপেক্ষাকৃত দ্রুত সুস্থ হয়। তিনি বলেছেন “এটাই প্রথম গবেষণা যাতে মগজের বিশেষ কিছু অংশকে পুনর্বিন্যাসের প্রতি সংবেদনশীল করা গেছে।”

তাদের পরীক্ষায় লি ও তার দল ইঁদুরের মস্তিষ্কের সামনের ডান পায়ের স্নায়বিক নিয়ন্ত্রক অংশে কৃত্রিমভাবে স্ট্রোক ঘটান। এরপর অর্ধেক সংখ্যক ইদুরের গোঁফ ছোট করে ৮ সপ্তাহ রাখেন।

image source: flickriver.com

দেখা গেল ছোট গোঁফের ইদুরগুলো ৫ সপ্তাহের মধ্যে নিরাময় লাভ করলো এবং ডান পাটিকে সম্পুর্নরূপে ব্যবহার করতে শুরু করলো। অন্যদিকে লম্বা গোঁফের ইদুরগুলোর ৭ সপ্তাহে পুরো সুস্থ্য হয়নি আর কখনোই ডান পা কে ঠিক মত ব্যবহার করতে পারেনি।

ছবি তুলে জানা গেছে ছোট গোঁফের ইঁদুরের মস্তিষ্কের রিম্যাপিং ঘটেছে। যেই অংশ আগে গোঁফ থেকে আগত স্নায়বিক সংকেত নিয়ে কাজ করতো সেটা এখন সামনের পায়ের স্নায়ু নিয়ন্ত্রনের কাজও করছে। এটা অন্য ইদুরগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু হয়নি। যখন গোঁফ পুনরায় বড় হলো, রিম্যাপ হওয়া অংশ একই সাথে পা এবং গোঁফের স্নায়বিক সংকেত নিয়ে কাজ করতে পারছে।

লি বলেন, অন্ধ প্রাণি কিংবা মানুষের ক্ষেত্রে যা ঘটে, রিম্যাপিং আসলে সেটাই। যখন চোখ থেকে কোন সংকেত আসেনা তখন তার জন্য সংরক্ষিত মস্তিষ্কের অংশ শব্দ, ভাষা কিংবা গণিতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

লি আশা করেন এই নতুন অনুধাবন রোগীদের জন্য নতুন ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবনে কাজে দেবে।

ব্যাঙ যখন বোকা শিকারী

১৯৯৭ সালে বের হওয়া অ্যানাকোন্ডা মুভিতে গল্পের খাতিরে বেশ কিছু অবৈজ্ঞানিক ব্যাপার দেখানো হয়েছিলো। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো যে, অ্যানাকোন্ডা তার গিলে ফেলা শিকারকে জ্যান্ত উগড়ে বের করে দেয় আরেকবার হত্যার রোমাঞ্চ পেতে। প্রকৃতপক্ষে অ্যানাকোন্ডার গেলার সময় শিকারকে যে ধরনের সংকোচন প্রসারণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, বের হবার সময় তাতে আর প্রাণপাখির পালকটাও থাকে না।

bombardier beetle
ফোরসেপ দিয়ে উত্যক্ত করায় বোম্বার্ডিয়ার বিটলের ঘটানো বিস্ফোরন; image source: Nbcnews

তবে কিছু কিছু পান্ডব আছে, যারা শিকারির পেটের ভিতর থেকে ঘুরে আসতে পারে। এরকম একটি হচ্ছে বোম্বার্ডিয়ার বিটল। এরা এক ধরনের জ্বালাময় রাসায়নিক নিক্ষেপ করে বলে তাদের এমন নাম। দুটো আলাদা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত আপাত নিষ্ক্রিয় দুই ধরনের রাসায়নিক উপাদান যখন মিশ্রিত হয় তখন এক ধরনের বিস্ফোরণ হয়। এই বিটলরা সেকেন্ডে প্রায় ৫০০ বার এমন বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। যার ফলে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার রাসায়নিক তার শরীর থেকে ঘন্টায় ২২ মাইল বেগে বের হয়।

ঘটনার আকস্মিকতায় বেশিরভাগ শিকারি ভয় পেয়ে গেলেও ব্যাঙ এর কাছে বোম্বার্ডিয়ার কিছুটা অসহায়। কারণ ব্যাঙ এত দ্রুত তার জিহবা দিয়ে ছোঁ মারে যে পোকাটি কিছু বুঝে উঠার আগেই পেটের ভিতর চলে যায়। তবে এরপর পোকাটি ব্যাঙের পেটের ভিতরই যখন তার অস্ত্র চালায় তখন বাইরে থেকেও তার শব্দ পাওয়া যায়। এই রাসায়নিক বিষাক্ত না হলেও এতটাই বিচ্ছিরি যে ব্যাং তাকে উগলে দিতে বাধ্য হয়। তবে, ব্যাঙের কিন্তু আমাদের মতো গ্যাগ রিফ্লেক্স নেই যার কারণে সে বমি করতে পারে না। তাদের একমাত্র উপায় পাকস্থলিকে উল্টে ফেলা। যা করতে তার ৪৫ মিনিট সময় লাগে। এই পোকাগুলো নিজেরা কিন্তু বিষাক্ত নয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, ফোরসেপ দিয়ে বেশ কয়েকবার বিরক্ত করার পর যখন তাদের বিস্ফোরক সম্পুর্ণ্রুপে নিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, তারপর কিন্তু ব্যাঙ এদের আরামেই খেয়ে নিতে পারে। অন্যদিকে বোম্বার্ডিয়ারের মধ্যেও কিন্তু পাকস্থলির এসিডপূর্ণ পরিবেশেও বহুক্ষণ টিকে থাকার ক্ষমতা রয়েছে।

ব্যাঙের পেট থেকে ছাড়া পাবার আরো কিছু ঘটনা রয়েছে। ২০০২ সালে পূর্ব তিমুরে অভিযানের সময় মার্ক’ও শেয়া তার ল্যাবের দরজা খোলা রাখার জন্য একটা পাথর খুঁজতে যান। একটাকে সুবিধাজনক মনে হওয়ায় যখন সেটা তুলতে গেলেন দেখা গেলো পেছনে একটা কোলাব্যাঙ এবং তার পিছন দিয়ে বের হয়ে আছে একটা ব্রাহ্মিনি সাপ। এই সাপটি দেখতে অনেকটা কেঁচোর মতো। ফুলের টবে লুকিয়ে থাকার স্বভাবের কারণে এরা সারা দুনিয়াতেই ছড়িয়ে গেছে। অন্ধকার, অক্সিজেন শূন্য কিংবা সংকোচনশীল পরিবেশে এরা টিকে থাকতে পারলেও ব্যাঙের পশ্চাৎদেশ এদের প্রাকৃতিক আবাসন নয়। ব্যাঙটি হয়তো তাকে কেঁচো ভেবে গিলে ফেলেছিল এবং সর্পসাহেব তার ভক্ষকের সম্পূর্ণ পরিপাকতন্ত্র ঘুরে এসে পেছন দিয়ে বের হতে চেষ্টা করছে। ও’শিয়া এদেরকে ধরে নিয়ে আলাদা হতে সাহায্য করেন। সাপটি অবশ্য এর পর আর কয়েক ঘন্টার বেশি বাঁচতে পারেনি।

brahminy blind snake
ব্রাহ্মিনি সাপ, image source: californiaherps.com

কিছু কিছু প্রাণীর জন্য কিন্তু ভক্ষিত হওয়া সুবিধাজনক। বহু শামুক পাখির পেটে গেলেও বেঁচে থাকে আর এভাবে করে দূর দূরান্তে ছড়াতে পারে। যদিও ডাঙ্গার শামুকের চলাচলের প্রকৃতি খুবই ধীর, কিন্তু পাখির মাধ্যমে তারা ভিন্ন মহাদেশেও পৌঁছে যেতে পারে, যে সম্ভাবনার কথা ডারউইন বলে গিয়েছিলেন আর বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন।

epomis beetle infesting on frog
ইপোমিস বিটলের লার্ভা দ্বারা আক্রান্ত ব্যাঙ

কখনো কখনো কিন্তু ভক্ষিত প্রাণী তার ভক্ষনকারীর অবস্থা নাস্তানাবুদ করে দিতে পারে। গিল উইজেন এবং আভিতাল গাসিথ এমনই এক নজির পেয়েছেন ইপোমিস বিটল সম্পর্কে জানতে গিয়ে। এই পোকারা ব্যাঙ ছাড়া কিছু খায় না। ব্যাঙ যখন এদের ধরার জন্য জিভ ছোটায় তখন এরা সুকৌশলে আক্রমণকারীর মুখ কামড়ে ধরে এবং ধীরে ধীরে তাকে খেয়ে নেয়। বিজ্ঞানীদের প্রায় ৪০০ পর্যবেক্ষণে প্রতিটাতেই জিতেছিলো ইপোমিস। শুধু একটা ঘটনায় প্রথমে ইপোমিস হেরে যায়। কিন্তু ২ ঘন্টা পর ব্যাঙটি ইপোমিসকে উগড়ে দেয়ার পর নাটকীয়ভাবে সে তার খাদককে খেতে শুরু করে।

ঝাঁপ দিন (ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি) ব্ল্যাকহোলে

ব্ল্যাকহোল। মহাজাগতিক এক অন্ধকার দৈত্য। ব্ল্যাকহোলগুলো তৈরি হয় যখন অনেক ভরশালী কোনো তারকা তার সব জ্বালানী নিঃশেষ করে ফেলে এবং তার সব ভর একটা বিন্দুতে এসে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। ব্ল্যাকহোল এমন এক মহাজাগতিক বস্তু যা তার আশেপাশের সবকিছুকে গিলে নেয়। এমনকি আলোকেও। আর এ কারণেই ব্ল্যাকহোল অদৃশ্য এক অন্ধকার জগৎ এবং এর ভেতরে কী আছে তা আমরা শুধু কল্পনায় করতে পারি।

কয়েক বছর আগে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কার করা লাইগোর বিজ্ঞানীরা খুব সম্প্রতি জানতে পেরেছেন যে, আমাদের মহাবিশ্বের ব্ল্যাকহোলগুলো আমাদের আগের ধারণার চেয়েও বেশি ভরসম্পন্ন এবং মহাবিশ্বে এদের সংখ্যাও আমাদের আগের ধারণার চেয়ে অনেক অনেক বেশি।

শিল্প এবং বিজ্ঞানের মিশেলে ব্ল্যাক হোলের একটি চিত্র; image source: resources.perimeterinstitute.ca

তবে আমরা কিন্তু এই রহস্যময় ব্ল্যাক হোলের ভেতরে কী আছে তা এখনো ঠিকমতো জানি না। এর কারণ ব্ল্যাকহোলের ধারণা মূলত আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে আছে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বলে মহাকর্ষ স্থান-কালের বক্রতার ফসল। আর সত্যিকার অর্থেই ব্ল্যাকহোলের ভেতরেও স্থান-কাল খুব মসৃণভাবে বেঁকে গেছে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে (সিঙ্গুলারিটিতে)।

যে তত্ত্বের উপর ভর করে এই ব্ল্যাকহোলের ধারণার জন্ম সেই ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রেই আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব ভেঙ্গে পড়ে। তার এই তত্ত্ব ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে একদমই কাজ করে না। এটা এমন এক বিন্দু যেখানে কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব দুটোর একটা সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। এই সন্নিবেশ ঘটানোর কাজটি এখনো পদার্থবিদদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এই বিন্দুতে কী ঘটে তা জানতে পারলে মহাকর্ষের কোয়ান্টাম প্রকৃতি সম্বন্ধে আমরা জানতে পারব।

ব্ল্যাকহোলকে আরো ভালোভাবে সাধারণ মানুষদের বোঝানোর জন্য, অনুভব করানোর জন্য এবং আরো ভালোভাবে এর চিত্রটা ফুটিয়ে তোলার জন্য খুব সম্প্রতি ব্যান্ডউইথ প্রোডাকশান নামের একটি কোম্পানি কোয়ান্টা ম্যাগাজিনের সাথে মিলিতভাবে এক জোড়া ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষের এক নিখুঁত সিমুলেশান তৈরি করেছে। এ সিমুলেশানে আপনি বিজ্ঞানী হিসেবে একটা আকাশযানে করে ব্ল্যাকহোলের ভেতর থেকে ঘুরে আসতে পারবেন। সংঘর্ষের পরে আকাশযানটি দুটো ব্ল্যাকহোলের মিলিত হওয়ার ফলে সৃষ্টি হওয়া ব্ল্যাকহোলের ভেতরে প্রবেশ করে।

পদার্থবিদ অ্যান্থনি অ্যাগুইরে এবং ডানকান ব্রাউন সিমুলেশানের মাধ্যমে এই ব্ল্যাকহোলটির ভেতরের পরিবেশ সৃষ্টিতে সাহায্য করেছেন। পদার্থবিদ অ্যান্ড্রু হ্যামিলটনের মতে এটিই এ যাবৎকালের সকল ব্ল্যাকহোল সিমুলেশানের মাঝে সবচেয়ে সঠিক চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। এই ভ্রমণে অংশ নেয়ার জন্য আপনাকে আইওএস অ্যাাপ স্টোর বা, গুগল প্লে স্টোর থেকে “ব্ল্যাক হোল ভিআর” অ্যাপটি আপনার ফোনে ডাউনলোড করতে হবে। ডাউনলোড হয়ে গেলে এবার অ্যাপটি ওপেন করুন, আপনার মোবাইলটি ভিআর হেডসেটে ঢোকান আর প্লে বাটনটি চাপুন। এবার ঝাঁপ দিন ব্ল্যাকহোলের রাজ্যে, ঘুরে আসুন ব্ল্যাক হোলের ভেতর থেকে। শুভ কামনা।

ফিচারড ইমেজঃ  quantamagazine.org

ব্যাক্টেরিয়ার ন্যানোফাঁদ

পৃথিবীতে সাতশ প্রজাতির মাংশাসী গাছ রয়েছে। তাদেরই মধ্যে অন্যতম ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ। যুগে যুগে এই উদ্ভিদ বিজ্ঞানী, লেখক, শিল্পী এবং আলোকচিত্রকরদের আগ্রহের বস্তু ছিলো। আর কিছুদিন আগে একদন বিজ্ঞানী ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে বানিয়েছেন ব্যাক্টেরিয়া ধরার ন্যানোফাঁদ।

venus flytrap
চিত্রঃ ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ

যখন ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া রক্তে প্রবেশ করে তখন তারা দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করে মারাত্বক সব রোগ তৈরি করে। এই অবস্থায় অ্যান্টিবায়োটিক যদিও কার্যকর সমাধান, তবে আর কতদিন? কিছুদিন পরপরই তো অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সুপারবাগের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। আবার আক্রান্ত রক্ত যদি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত করা হয় তখন ফিল্টারের মাধ্যমে ব্যাক্টেরিয়া আলাদা করা গেলেও দ্রুত প্রবাহমান ধারা অনেকসময় আটকে যাওয়া ব্যাক্টেরিয়াকে আবার রক্তে টেনে নেয়।

dialysis vs nanotrap
চিত্রঃ ডায়ালাইসিসে জীবাণু ছুটে গেলেও ন্যানোফাঁদে ছুটবেনা

চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সের সো টিয়ে এবং তার সহকর্মীরা তাই ফ্লাইট্র্যাপের মত এক ধরনের ন্যানোফাঁদ বানিয়েছেন যা আরো দক্ষভাবে ব্যাক্টেরিয়া ধরতে পারে। এই ফাঁদের চারদিকে রয়েছে বাঁকানো ন্যানো তন্তু, সেই তন্তু গায়ে রয়েছে লেকটিনের আবরণ। লেকটিন এক ধরণের প্রোটিন যা ব্যাক্টেরিয়ার গায়ের কার্বোহাইড্রেটের সাথে সহজেই বন্ধন তৈরি করে। তন্তুগুলো ব্যাক্টেরিয়ার সাথে জড়িয়ে তাকে একটা সূক্ষ্ম খাঁচায় আটকে ফেলে।

টাইফয়েডসহ নানা রোগের জনক সালমোনেলা নিয়ে করা পরীক্ষায় দেখা গেছে এই ন্যানোফাঁদ ৯৭ শতাংশ জীবাণুকে আলাদা করতে পারে। আবিষ্কারকরা বলছেন একই পদ্ধতিতে ভাইরাস, ক্যান্সার কোষ এসবের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রপিকাল মেডিসিনের রিচার্ড স্টলবার বলেন, এই পদ্ধতি অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে কাজে লাগতে পারে। কারণ এরকম জটিল ন্যানোমেশিনকে ফাঁকি দেয়ার উপায় বের করা ব্যাক্টেরিয়ার জন্য অত্যন্ত কঠিন।