অট্টহাসি রোগ ও অনিষ্টের রূপ

কখনো কখনো আমরা সবকিছু ভিন্ন চোখে দেখতে বাধ্য হই। তবে এটা মোটেও সহজ নয়। মানুষ অভ্যাসের দাস। তাই আমরা প্রথম দর্শনে যা ভাবতে অভ্যস্ত হই তার শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে যাই। প্রিয়নদের ব্যপারে ঠিক এরকমই ঘটেছে। প্রিয়ন এক ধরনের প্রোটিন। এদের আকার নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে বদলে যায়। ফলাফলে এরা মারাত্মক রোগের মূল কারণ হয়ে পড়ে। কোনো প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন বদলে গেলে তা অনেক ব্যাধির কারণ হতে পারে। তাই প্রিয়ন-প্রোটিনের আকার বদলে গিয়ে রোগের কারণ হয়ে যাওয়াটা অণুপ্রাণবিজ্ঞানে নতুন কোনো ধারণা নয়। যে ধারণা নতুন তা হলো প্রোটিন নিজেই রোগ সংক্রমণের মূল কারণ হতে পারে।

সংক্রমক বলতে একটি অস্তিত্বকে বোঝানো হয় যা কোনো জীব থেকে অন্য জীবে (বা এক কোষ থেকে অন্য কোষে) ছড়ানোর মাধ্যমে রোগ বিস্তারে ভূমিকা রাখে। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া কোনো জীবে সংক্রমিত হওয়ার সময় নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধি করে। এসময় বিভিন্ন কোষ মেরে ফেলে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। যেমন উদাহরণ টানা যায় মেনিনজাইটিস, ফ্লু কিংবা এইডস রোগের ক্ষেত্রে। তেমনি কিছু কিছু প্রিয়ন প্রোটিন আছে যাদের আকার বদলে গেলে সংক্রমণশীল হয়ে পড়ে। ফলে ভেড়ার স্ক্র্যাপি বা মানুষের ক্রুয়েটজফেল্ড-জ্যাকব রোগের মতো স্নায়ু্ক্ষয়জনিত অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এরা। সম্প্রতি এমন একটি প্রিয়ন আবিষ্কৃত হয়েছে যার স্বভাব ভিন্ন প্রকৃতির। এটি নিজের রূপ বদলাতে চায় না। এর নাম PrP V127

প্রচলিত মতের বিপরীতে প্রিয়ন (PrP) মাত্রই যে ক্ষতিকর এমনটা নয়। বিভিন্ন জীবে এরা প্রাকৃতিকভাবেই

বিরাজ করে (PrPc)– বিশেষত মগজে। কোষ দৃঢ়সংলগ্ন হয়ে লেগে থাকাতে আর কোষের ভেতরে সংকেত পরিবহনে এরা ভূমিকা পালন করে বলে ভাবা হয়। তবে ত্রিমাত্রিক গঠন ভুলভাবে ভাঁজ হয়ে গেলে (PrPSc) এরা অনিষ্টকারী হয়ে পড়ে। রূপের পরিবর্তনের কারণে কেন এরা নির্দোষ থেকে অনিষ্টকারীতে পরিণত হয় তা এখনো বোঝা যায়নি। হয়তো কোনো তাপগতীয় বাঁধ রয়েছে যার ফলে নির্দোষ ভাজ বদলে রূপটি অনিষ্টকারী রূপে পরিবর্তিত হয়ে যায়। তখন নির্দোষ রূপে (PrPc) ফেরত যাবার জন্য দরকারী তাপ এতো বেশি যে অনিষ্টকারী রূপটি (PrPSc) এর নতুন আকৃতিতে আটকা পড়ে যায়। এ দুই আকৃতি এতটাই ভিন্ন যে তা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। PrPc একদিকে আলফা হেলিক্সের প্যাঁচ দিয়ে পূর্ণ, অন্যদিকে PrPSc বিটা শিটের আস্তরনে স্ফীত।

এই গাঠনিক পার্থক্যটি লক্ষণীয় কারণ এদের অ্যামিনো এসিড অনুক্রমে (বা প্রোটিন সিকোয়েন্স) কোনো পরিবর্তন হয় না। ভুলভাবে ভাঁজ হওয়া প্রিয়ন তারপর জমা হতে থাকে। প্রথমে একটি PrPSc বীজ হিসেবে কাজ করে যা এই প্রিয়নের অনিষ্টকারী রূপটিকে স্থিতিশীল করে। এ প্রক্রিয়া খুব দ্রুতগতিতে চলতে থাকে। একসময় ছোট ছোট অলিগোমার ফাইব্রিলের তন্তুতে রূপ নেয়, যারা পরে একে অপরে জড়ো হয়ে বৃহত্তর জমায়েতে পরিণত হয়। এ বৃহত্তর জমায়েত মস্তিষ্কে থোক তৈরি করে করে স্নায়ু ক্ষয়কে এগিয়ে নিতে থাকে।

প্রিয়ন প্রোটিন আবিষ্কারের বহু আগেই এর কারণে সৃষ্ট অসুখ সম্পর্কে জানা যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে স্প্যানিশ মেষপালকরা তাদের মেরিনো জাতের ভেড়ায় অদ্ভূত আচরণ খেয়াল করেন।

চিত্রঃ PrPC প্রিয়নে চারটি প্যাঁচালো আলফা হেলিক্স দেখা যাচ্ছে (a)। এটি যখন PrPSc-তে রূপান্তরিত হয় তখন চারটি বিটা শিটের আস্তরণ তৈরি হয় (b)। দুইটির গঠনে ভিন্নতা লক্ষ্যণীয়।

ভেড়াগুলোর হাঁটার চাল বদলে যায়, চাটাচাটি বেড়ে যায় আর তীব্র চুলকানি দৃষ্টিগোচর হয়। এরা ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করে বেড়ার গায়ে নিজেদের দেহ ঘষাতে। স্পানিশ রাখালরা এ রোগের নাম দিয়েছিল ‘স্ক্র্যাপি’। এর প্রায় দুইশ’ বছর পর জার্মান স্নায়ুবিদ এইচ.জি. ক্রুটজফেল্ড ও এ.এম. জ্যাকব এক ধরনের স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগ চিহ্নিত করেন যার লক্ষণ ছিল স্ক্রাপির অনুরূপ। এ রোগের নাম দেয়া হয় ক্রুটজফেল্ড-জ্যাকব রোগ (সিজেডি)। এই রোগটি ধীরগতির হলেও সময়ের সাথে সাথে অবস্থার অবনতি হতে থাকতো। এ ধরনের ধীরগতির অবনতির পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? কোনো কোনো বিজ্ঞানী ভাবলেন হয়তো কোনো ‘ঢিলা ভাইরাস’ এর পেছনে দায়ী।

১৯৬৭ সালে ব্রিটিশ জৈবপদার্থবিদ জে.এস. গ্রিফিথ প্রস্তাব করলেন যে স্ক্র্যাপির পেছনে সম্ভবত প্রোটিন নির্মিত কোনোকিছু দায়ী। তবে সংক্রামক প্রতিনিধি হিসেবে প্রোটিন দায়ী এ মতামতটি সংশয়ের মুখে পড়ে। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মতটি উপেক্ষা করা হচ্ছিল। প্রোটিনরা যে সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে, বিশ বছর পর এই ধারণাটিকে পুনরিজ্জীবিত করেন আমেরিকান স্নায়ুবিদ এস.বি. প্রুশিনার ও সুইস অণুপ্রাণবিজ্ঞানী চার্লস উইসম্যান।

শেষ পর্যন্ত গত শতাব্দীর শেষ দিকে আর একবিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে বিশেষতঃ ম্যাড কাউ রোগের প্রাদুর্ভাবের সাথে সাথে প্রোটিন নির্মিত সংক্রামক কণার ধারণাটি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। অবশ্য কয়েকজন বিজ্ঞানী এখনো এ বিষয়টিতে সন্দেহমুক্ত নন। তবে সম্প্রতি প্রিয়নের সূক্ষ্মতর প্রকারভেদ করা গেছে। মানুষে প্রিয়ন-ভিত্তিক ব্যাধির সংক্রমণ অত্যন্ত দূর্লভ। শুধুমাত্র টিস্যুকলা প্রতিস্থাপন, শল্যচিকিৎসার

অস্ত্র বা দূষিত মাংস-পণ্য থেকে প্রিয়নের সংক্রমণ হয়। যেমন এখন মানুষে প্রিয়নের ব্যাধিকে সংক্রমণশীল হিসেবে ধরা হয় না। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে এ ব্যাধিকে ধরা হয় এমন শারিরীক বিপর্যয় হিসেবে যেখানে মস্তিষ্কের ভেতরে দলা তৈরি ও জমা হতে থাকে। এ প্রক্রিয়াটি অন্যান্য স্নায়ুক্ষয়ী রোগের অনুরূপ।

তবে অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানী মাইকেল আলপের্স ১৯৬০-র দশকে কুরু নামক স্নায়ুক্ষয়ী প্রিয়ন রোগের কথা উল্লেখ করেছিলেন। পাপুয়া নিউগিনির ফোর নৃজাতিগোষ্ঠীর উপর মাঠ পর্যায়ের গবেষণা থেকে তিনি এ রোগের কথা জানতে পারেন। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ করে অট্টাহাসি হাসা শুরু করতো। তাই ঐ জাতির মধ্যে এ রোগটি ‘অট্টহাসি রোগ’ নামে পরিচিত ছিল। কুরু শব্দটির আক্ষরিক অর্থই হলো ‘ঝাঁকানো’। পরবর্তীতে দেখা গেল আত্মীয়ের মৃত্যুর পর তার মাংস খাওয়া থেকে এ রোগটি ছড়ায়। ফোর নৃজাতিগোষ্ঠী সমাধিসংক্রান্ত অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে মৃতের মাংশ ও মগজ কাঁচা খাওয়া হতো।

এই মহামারীর শুরু হয়েছিল সম্ভবত ১৯০০-শতকের শুরুর দিকে যখন ঐ জনগোষ্ঠীর কোনো সদস্য CJD রোগের একটি ধরণে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে অবশ্য এখন এ রোগটি নেই। এ রোগে ২০০৫ সালে সর্বশেষ মৃত্যু হয়। বিস্ময়ের ব্যপার হলো পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে কিছু কিছু ব্যক্তি কুরু রোগে একেবারেই অপ্রভাবিত ছিল। তারা একধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছিল। দেখা গেল PrP V127 নামক PrP-র একটি ভিন্ন প্রকরণের কারণে এমনটা হচ্ছে। PrP V127 তে ১২৭ নম্বর অ্যমিনো এসিডে গ্লাইসিনের স্থলে ভ্যালিন স্থানান্তরিত হয়েছিল। ইঁদুরে জেনেটিক পরিবর্তন করে দেখা গেছে তাদের PrP V127 প্রিয়ন তৈরি হলে তা কুরু ও ধ্রুপদী CJD প্রিয়ন প্রতিরোধ করে। কিন্তু কীভাবে? PrP V127 রূপ বদলিয়ে PrP-র অনিষ্টকারী চেহারায় বদলায় না। ফলে এই প্রকরণ বহন করা ব্যক্তি স্নায়ুক্ষয় রোগে আক্রান্ত হয় না।

আরেকটি PrP প্রকরণের কথা জানা যায় যা বিক্ষিপ্ত CJD রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে মানুষকে রক্ষা করে। তবে এর কর্মকৌশল PrP V127 এর মতো নয়। বরং এটি প্রিয়ন উৎপাদন চলমান থাকা অবস্থায় প্রোটিন-প্রোটিন মিথষ্ক্রিয়া আটকে রাখে। কীভাবে PrP V127 প্রিয়নের রূপ-বদলানো প্রতিরোধ করে তা বুঝতে পারলে বিজ্ঞানীরা প্রিয়নের রোগতত্ব ও উৎপাদনের প্রাণ-রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি উপলদ্ধি করতে পারবেন। এছাড়াও ঔষুধ তৈরিতেও এটি অন্তর্দৃষ্টি দেবে। স্বজাতিভক্ষণ নিষিদ্ধ করে দেয়ার ফলে ফোর জনগোষ্ঠি চলমান কুরু মহামারী থেকে বেঁচে যায়। তবে PrP V127 প্রকরণের উপস্থিতি এটাই নির্দেশ করে যে সময়ের সাথে সাথে কুরু-প্রতিরোধি ব্যক্তির সংখ্যা বাড়তে থাকতো। এটা মহামারীর পাল্টা জবাব হিসেবে প্রাকৃতিক বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার মধ্যমেই হতো। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকৃতির নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে।

তথ্যসূত্র

  • এক্সপ্যাসি প্রোটিন স্পটলাইটের ১৭৯ ইস্যু The shape of harm-র অনুবাদ। লেখকঃ ভিভিয়েন বেইলি গ্যারিস্টেন।
  • org/spotlight/back_issues/179/

নিমগ্নতার সুখ

আমরা জীবনে সুখের হরিণের পেছনে ছুটে বেড়াই। গড়পড়তা সাধারণ মানুষ তো বটেই, কবি-লেখক-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে ধর্মবেত্তা-দার্শনিক সকলেই সুখ পাখিটা ধরতে চায়। তবে যারা সুখ জিনিসটা কী তা বোঝার চেষ্টা করেন তাদের অনুসন্ধানটা ভিন্ন। তারা সুখকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন। এ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরাও পিছিয়ে নেই। বিজ্ঞান হয়তো বলবে এন্ডরফিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামক হরমোন নিঃসৃত হলে মানুষ সুখানুভূতি পায়, তবে তারপরও কাজের সাথে সুখানুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এক জন মনোবিজ্ঞানীর গবেষণা থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাক।

কখনো কি এমন কোনো কাজে ডুবে গিয়েছিলেন যে নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন? বেলা গড়িয়ে কখন সন্ধ্যা হয়েছে টের পাননি? কিংবা রাতে খাবার পর কাজে বসে হঠাৎ টের পেয়েছেন যে ভোর হয়ে গেছে? কাজে এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলেন যে, সময় পার হবার অনুভূতি লোপ পেয়েছিল, ক্ষুধা অনুভব করেননি? এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জীবনেই একবার না একবার হয়েছে। বিশেষ করে যখন হাতের কাজটি চ্যালেঞ্জিং আর আগ্রহোদ্দীপক কিছু হয়ে থাকে।

টানটান উত্তেজনাপূর্ণ কোনো খেলা দেখার সময়েও এরকম একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আমাদের। যারা কম্পিউটারে গেম খেলে, অনেক সময় মজার অথচ জটিল কোনো গেম খেলার মধ্যে ডুবে গেলেও এ অবস্থা তৈরি হয়। অনেক প্রোগ্রামার রাতে কাজ করতে পছন্দ করেন। কারণ রাতে সাধারণত অন্য কেউ কথা বলে না, ডাক দেয় না, বিরক্ত করে না। তখন তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো সমস্যা সমাধানে কাটিয়ে দিতে পারে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ফ্লো’ (Flow)। বাংলায় একে আমরা নিবিষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা নিমগ্নতা বলতে পারি।

এখানে নিমগ্ন দশার সাথে সুখের সম্পর্কটা কী? এ প্রসঙ্গে ফ্লো তত্ত্বের জনক চেক মনোবিজ্ঞানী মিহাই চিকসেন্টমিহাইয়ের গবেষণা সম্পর্কে আলোকপাত করি।[১] ১৯৫৬ সালে এক জরিপে প্রায় ৩০ শতাংশ আমেরিকান উল্লেখ করেন যে, তারা জীবন নিয়ে অত্যন্ত সুখী (গ্রাফ দ্রষ্টব্য)। তখন থেকে কয়েক বছর পরপর নিয়মিত এ জরিপটি করা হয়েছে। দেখা গেছে ১৯৫৬ সালের পরে আমেরিকানদের গড়পড়তা আয় দুই থেকে তিনগুণ বাড়লেও ‘সুখী’ আমেরিকানদের অনুপাত বাড়েনি। তার মানে, দারিদ্র্যসীমার নীচে আয় থাকলে তা অবশ্যই দুঃখের কারণ হবে। কিন্তু আয় অনেক বাড়লে সুখানুভূতি বাড়বে এমন কোনো কথা নেই। অর্থাৎ অধিক উপার্জন মানুষকে অধিক সুখী করে তুলতে পারে না।

চিত্রঃ আমেরিকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সুখের সম্পর্ক।

২০০৫ সালে আমেরিকানদের গড় ক্রয় ক্ষমতা ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। সে তুলনায় সুখী মানুষের অনুপাতের কোনো পরিবর্তন হয়নি।[২] ছোট কালো বিন্দু দিয়ে উপার্জনের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে। বড় চতুষ্কোণ বিন্দু দিয়ে সুখী মানুষের অনুপাত বোঝানো হচ্ছে।

এই প্রেক্ষিতে মিহাই সুখ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। দৈনন্দিন জীবনে আমরা কি আসলেই সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করি? এটিই ছিল তার অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন। তিনি প্রথমে সৃজনশীল ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিল শিল্পী, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশার মানুষজন। তাদের সাক্ষাৎকারে যখন তারা নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে অন্যরকম ভাবাবেশের কথা উল্লেখ করেন তখন বার বার একটি অনুভূতির কথা উঠে আসে। সাক্ষাৎকারে অংশ নেয়া অধিকাংশ ব্যক্তিই তাদের সৃজনশীল কাজের মধ্যে একটি উচ্ছসিত আনন্দের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। সৃজনশীল কাজটি সহজে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে এরকম অবস্থায় এ আনন্দময় দশাটি তৈরি হবার কথা উঠে আসে তাদের সাক্ষাৎকারে।

সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি মিহাই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজের মধ্যে থাকা

অবস্থায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার অনুভূতি কেমন সেই তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করেন। তার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের পেজার নামক একটি যন্ত্র সরবরাহ করা হয়। পেজার মূলত মোবাইল ফোনের পূর্বপুরুষ। অংশগ্রহণকারীদের নিত্যদিনের কাজের মাঝে বিভিন্ন সময়ে এ পেজারটি বেজে উঠতো। অংশগ্রহণকারী ঐ মুহূর্তে কী কাজ করছেন, কাজ করতে কেমন লাগছে, কাজটি কোথায় করা হচ্ছে, কাজ করার সময় কী নিয়ে চিন্তা করছেন এসব তথ্য তিনি লিপিবদ্ধ করেন।

এ ছাড়াও আরো দুটি পরিমাপ করা হয়। প্রথমত, অংশগ্রহণকারী যে কাজটি করছেন তা কতটুকু কঠিন। দ্বিতীয়ত, কাজটি সম্পন্ন করার জন্য অংশগ্রহণকারী কতটুকু দক্ষ। এ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন সময়ে করা বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হয়। এভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে মিহাই

একটি ডায়াগ্রাম তৈরি করেন। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর কাছে দিনভর কাজ কতটুকু সহজ বা কঠিন মনে হয় এবং বিভিন্ন কাজের জন্য তার কতটুকু দক্ষতা আছে, এ দুটি পরিমাপের মাঝামাঝি একটি বিন্দু ঠিক করা যায়। এ কেন্দ্রবিন্দু থেকে বোঝা সম্ভব কখন একজন অংশগ্রহণকারী ‘মগ্নতা‘ দশায় প্রবেশ করবেন।

চিত্রঃ কাজ কতটা চ্যালেঞ্জিং ও মানুষের দক্ষতা কতটুকু এবং এর সাথে সম্পর্কিত অনুভূতির চার্ট।

যখন আমাদের হাতের কাজটি খুব কঠিন, কিন্তু সে কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকে তখন আমরা উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা অনুভব করি। আর যখন কাজটা খুব সহজ হয় আর কাজের জন্য দরকারী দক্ষতা পর্যাপ্ত থাকে, তখন আমরা বেশ আরামে থাকি। তবে যখন কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয় আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দরকারী দক্ষতাও উপস্থিত থাকে, তখন আমরা মগ্নদশায় প্রবেশ করি। এই নিমগ্ন অবস্থায় কাজের চ্যালেঞ্জকে টক্কর দেবার সাথে সাথে একধরনের ভাবাবেশ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়।

তখন ক্ষুধা, সময় ইত্যাদির অনুভূতি থাকে না, আমরা ডুবে যাই কাজের ধারায়, লাভ করি চ্যালেঞ্জ খণ্ডনের তৃপ্তিময় আনন্দ। যখন হাতের কাজটি খুবই সোজা, আর সেটি করতেও তেমন কোনো দক্ষতা লাগে না, তখন মানুষ অনীহা/ঔদাসীন্য/বিরক্তি অনুভব করে। দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার সময় মানুষ এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়। (ব্যক্তিগতভাবে আমি ফেসবুকে ফিড ঘাঁটার সময়ে এরকম বোধ করি।)

‘নিমগ্ন’ দশার মূল বৈশিষ্ট্য হলো- আমরা যে কাজটি করছি তাতে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে নিবদ্ধ থাকে ঐ কাজে। এছাড়া এ অবস্থার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।[৩] যেমনঃ

১. নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে তৃপ্তিময় ভাবাবেশের অন্যরকম অনুভূতি পাওয়া যায়।

২. মনের ভেতরে স্বচ্ছতার অনুভূতি থাকে। আপনি জানেন কী করা দরকার। আর আপনি কাজটা ঠিক মতো করছেন কি না, তা নিজে থেকেই বুঝতে পারেন।

৩. আপনি জানেন কাজটি শেষ করা সম্ভব। অর্থাৎ কর্মসম্পাদনের দরকারী দক্ষতা আপনার আছে।

৪. নিজের সম্পর্কে কোনো খেয়াল থাকে না। আপনার সকল উদ্বেগ ও ভাবনা দূরে সরে যায়।

৫. আপনি সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আর কেবল বর্তমানে হাতের কাজটিতে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেন।

৬. কাজের মধ্যে একটা প্রণোদনা লুকানো থাকে। নিমগ্ন অবস্থাটি যে কাজের মাধ্যমেই তৈরি হোক না কেন, কাজ করাটাই তখন পুরষ্কার হিসেবে আবির্ভূত হয়।

মানুষের মনোনিবেশ করার ক্ষমতা সীমিত। মিহাই উল্লেখ করেন, মানব মস্তিষ্ক সেকেন্ডে ১১০ বিট তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। এই পরিমাণটি বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু নিত্যদিনের ছোট ছোট কাজে অনেক তথ্য প্রয়োজন হয়। যেমন কথার অর্থ উদ্ধার করতে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ বিট তথ্য লেগে যায়। এ কারণে কারো সাথে কথা বলার সময় অন্য কোনো বিষয়ে খেয়াল রাখা যায় না। ক্ষুধাবোধ, সময়জ্ঞান এগুলোও তথ্য যা বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও স্নায়ুপথের মাধ্যমে মস্তিষ্কে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এগুলোকে প্রক্রিয়াজাত না করলে

এ সম্পর্কে আমরা সচেতন হই না। নিমগ্ন অবস্থায় আমাদের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা পুরোটাই ব্যবহৃত হয় হাতের কাজটি সম্পন্ন করার জন্য। তাই নাওয়া-খাওয়া ও সময়ের কথা আমাদের খেয়াল থাকে না। এরকম অবস্থায় দেহের অনুভূতি বোঝার জন্য কোনো মনোযোগ অবশিষ্ট থাকে না।

নিমগ্নতা একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো এ দশায় ইচ্ছে হলেই প্রবেশ করা যায় না। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছতে হলে কাজের দক্ষতা বাড়ানো আবশ্যক। কিংবা এমন কোনো দুরূহ কাজ হাতে নেয়া যায়, যা চ্যলেঞ্জিং হলেও সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা আমাদের রয়েছে। অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির পেছনে না ছুটে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা জীবনে আনন্দময় সুখ লাভের নিশ্চিত উপায় হতে পারে।

তথ্যসূত্র

[১] Flow, the secret to happiness. TED-talk by Mihaly Csikszentmihalyi.http://ted.com

[২] Happiness data from National Opinion Research Center General Social Survey; income data from Historical Statistics of the United States and Economic Indicators.

[৩] What Is Flow? Understanding the Psychology of Flow.https://www.verywell.com

ইন্দ্রিয়ের এলোমেলো অবস্থান

মানবদেহের প্রতিটা অঙ্গেরই নির্দিষ্ট কিছু কাজ আছে। পা দিয়ে হাঁটি, হাত দিয়ে লিখি, পেট দিয়ে খাবার হজম করি। যেসব অঙ্গের মাধ্যমে পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা লাভ করি তাদের বলি ইন্দ্রিয়। চোখ দিয়ে দেখি, চোখ আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়। কান দিয়ে শুনি, কান আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয়। কখনো কিন্তু চামড়া দিয়ে ঘ্রাণ নেয়া, কিংবা পাকস্থলি দিয়ে স্বাদ নেয়ার কথা ভাবি না। ভাবার দরকারও পড়ে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, এক ইন্দ্রিয়ের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কোষ অন্য অঙ্গেও থাকে। আমরা যদিও তাদেরকে ইচ্ছা অনুসারে ব্যবহার করতে পারি না, কিন্ত তারা আমাদের অজান্তে কাজ করে যাচ্ছে ঠিকই। এরকম কয়েকটি ব্যাপার নিয়েই আজকের এই লেখাটি।

গন্ধ শুকে চলো

নাক দিয়ে ঘ্রাণ নিই। ঘ্রাণ নিতে পারার ক্ষমতার সাথে জড়িত আছে বিভিন্ন ধরনের সংগ্রাহী অংশ বা receptor। এদের গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরিতে যেসব জিন জড়িত তার প্রথম বর্ণনা দেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড অ্যাক্সেল এবং লিন্ডা বাক। তা প্রায় আজ থেকে ২৫ বছর আগে ১৯৯১ সালে।

স্বাভাবিকভাবেই সে সময়ে ধারণা ছিল এই ঘ্রাণজ সংগ্রাহী (olfactory receptor) শুধুমাত্র নাকের মধ্যে থাকে। কিন্তু তার কিছুদিন পরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে অন্যান্য টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর খোঁজ পাওয়া যেতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৯২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের কথা। তাতে ব্রাসেলসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কুকুরের শুক্রাণুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। তবে তা শুধু তৈরি হয়েই বসে আছে, নাকি কোনো কাজ করছে সেটা তখনো অজানা ছিল।

এই ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে জার্মানির রাহর বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যান্স হ্যাটস সিদ্ধান্ত নেন, মানুষের শুক্রাণুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহী আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখবেন। অনেক পরিশ্রম করে শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে তিনি

সফল হন এমনকি এটাও দেখতে পান ঘ্রাণ অণুর উপস্থিতিতে এরা ঠিক নাকের মতোই সক্রিয় থাকে। তবে প্রথমদিকে অন্যান্য বিজ্ঞাণীদের এটা বিশ্বাস করানো বেশ কষ্টকর ছিল যে নাক ছাড়াও অন্য টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহী থাকতে পারে। পরের দশকে হ্যাটসের দল এবং অন্যান্য অনেকে বিভিন্ন টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর উপস্থিতি আবিষ্কার করেন। যেমনঃ ফুসফুস, লিভার, চামড়া, হৃৎপিন্ড ও অন্ত্র। এমনকি কিছু কিছু টিস্যুতে ঘ্রানজ সংগ্রাহীগুলোই সবচেয়ে বেশি মাত্রায় প্রকাশিত জিন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বিভিন্ন টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলো কী করছে? সমস্যা হলো এদের কাজ বুঝতে হলে আগে বের করতে হবে কীসের মাধ্যমে এরা সক্রিয় হয়। মানুষের রয়েছ ৩৫০ ধরনের ঘ্রাণজ সংগ্রাহী, অন্যদিকে ইঁদুরের মধ্যে এর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার। এখন পর্যন্ত গবেষকরা এদের মাত্র ১০-২০ শতাংশের জন্য সক্রিয়ক ঘ্রাণ অণু খুঁজে পেয়েছেন।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

হ্যাটস এবং তার দল স্যান্ডালোর নামের আরেকটি কৃত্রিম সুগন্ধী পেয়েছেন যার প্রভাবে চামড়াতে যেসব ঘ্রাণজ সংগ্রাহী রয়েছে সেগুলো সক্রিয় হয়। এদের সক্রিয়করণের ফলে ধারণকারী কোষগুলো উদ্দীপ্ত হয়ে দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করে এবং ক্ষত পূরণে নিযুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রেও মানবদেহে এর প্রাকৃতিক প্রতিরূপ এখনো আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে।হ্যাটস তার পরীক্ষায় জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে মানুষের পরীক্ষামূলক কোষে বিকাশিত ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলোকে হাজার রকমের ঘ্রাণ অণুর সংস্পর্শে নিয়ে আসেন। বেশিরভাগই বাণিজ্যিক কৃত্রিম সুগন্ধী যেগুলো পারফিউম এবং কসমেটিক্সে ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে তিনি একটি ঘ্রাণ অণু পেয়েছেন যেটা শুক্রাণুর ঘ্রাণজ সংগ্রাহীকে সক্রিয় করতে পারে। এই গন্ধ Lily of Valley ফুলের মতো। দেখা গেছে শুক্রাণু এই গন্ধের দিকে সাঁতার কেটে যায় এবং গন্ধের মাত্রা বাড়ালে শুক্রাণুর গতিও বাড়ে। হ্যাট অনুমান করেন, এই বৈশিষ্ট্য শুক্রাণুকে ডিম্বাণুর দিকে ধাবিত হতে প্রভাবিত করে। তবে গবেষকরা এখনো এই অণুকল্প প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় আছেন। ব্যাপারটি এখনো সর্বজন সমর্থিত নয়।

অন্যান্য টিস্যুতে পাওয়া কিছু কিছু ঘ্রাণজ সংগ্রাহীও প্রায় একইরকম কাজ করে। এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেস পাভলাথ গবেষণা করছিলেন কীভাবে একাধিক পেশীতন্তু একীভূত হয়ে বহু নিউক্লিয়াস সমৃদ্ধ কোষ তৈরি করে। সেসময় তিনি দেখতে পান পেশীতে একটি ঘ্রাণজ সংগ্রাহী বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হচ্ছে যে ব্যাপারটা হ্যাটস দেখতে পেয়েছিলেন শুক্রাণুতে।

গ্রেস বর্ণনা করেন, এই সংগ্রাহীগুলোর কারণে পেশীতন্তুগুলো একটি বিশেষ ঘ্রাণের দিকে স্থানান্তরিত হয় এবং পুনর্যোজনে (regeneration) অংশ নেয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই সংগ্রাহী ছাড়া ইঁদুরে পেশীতন্তুগুলো ক্ষয়প্রবণ হয় এবং দূর্বল পুনর্যোজন দেখায়। এই গ্রাহকের সক্রিয়ক প্রাকৃতিক প্রতিরূপ খুজে পেলে পেশী পুনর্যোজনের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে গবেষকরা বিভিন্ন ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর জন্য প্রাকৃতিক প্রতিরূপ পেয়ে গেছেন। যেমন কিডনিতে Olfr78 নামক ঘ্রাণজ সংগ্রাহী সক্রিয় হয় অন্ত্রে বসবাসরত ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা নিঃসৃত বিশেষ ধরনের

ফ্যাটি এসিডের প্রভাবে। এই সংগ্রাহী ‘শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড’-এর উপস্থিতিতে সক্রিয় হয় এবং রক্তচাপ বৃদ্ধির জন্য সংকেত পাঠায়। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলো শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড তৈরি করে যখন তারা আঁশ জাতীয় খাবার হজম করে। তাই একসময় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আঁশ জাতীয় খাবারের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

হ্যান্স হ্যাটস তার গবেষণায় এমন কিছু ঘ্রাণ সংগ্রাহী পেয়েছেন যেগুলো ক্যান্সার কোষে থাকে এবং তাদের সক্রিয় করার ফলে ক্যান্সার টিস্যুর সংকোচিত হয়ে যায়। যদিও সত্যিকারের ক্যান্সার থেরাপিতে এদের নিয়ে আসার জন্য আরো বহু গবেষণা প্রয়োজন। সুদূর ভবিষ্যতে আমরা হয়তো সুগন্ধি মেখেই ক্যান্সার দূর করতে, কেটে যাওয়া ক্ষত পূরণ করতে কিংবা প্রজনন ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হতে পারবো।

আলোয় উপশম

আমাদের চোখে অনেক ধরনের আলোক সংবেদী কোষ থাকে। এরা হচ্ছে অপসিন, রোডপসিন, মেলানোপসিন। এদের আবিষ্কার কিন্তু ধাপে ধাপে হয়েছে। যেমন ১৯৯০ সালের শেষের দিকে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইগনাসিও প্রভেন্সিও স্তন্যপায়ী প্রাণীতে মেলানোপসিন খোঁজা শুরু করেন। তখন পর্যন্ত ধারণা ছিল যে মেলানোপসিন সাধারণত উভচরের চোখে পাওয়া যায়, তাই সেসময় দৃষ্টি নিয়ে যারা কাজ করেছেন তাদের দৃষ্টিতে ইগনাসিওর কাজ ছিল নিতান্তই দূরদৃষ্টির অভাব। তবে ১০ বছর পর তিনি মানুষের রেটিনাতেও রড এবং কোন কোষে অপসিনের পাশাপাশি মেলানোপসিনের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। এর পর মানবদেহে মেলানোপসিনের কাজ সম্পর্কে ধীরে ধীরে তথ্য উন্মোচিত হতে থাকে। এটা ঘুম জাগরণ চক্র, চোখের তারার সংকোচন, দক্ষতা অর্জন এমনকি বিপাকেও ভূমিকা রাখে।

তবে রেটিনা ছাড়াও অন্যত্র যে মেলানোপসিন থাকতে পারে সেটা চমৎকার একটি ঘটনার মাধ্যমে বের হয়। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যান বার্কোভিৎজ তার ল্যাবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য স্বয়ংক্রিয় বাতি লাগান, যেগুলো মানুষের উপস্থিতিতে জ্বলে উঠে। তার এক ছাত্র একদিন লক্ষ্য করলেন গবেষণার জন্য যে রক্তনালীতে ফোর্স ট্রান্সডিউসার লাগানো যা সারাক্ষণই তথ্য দিতে থাকে, সেটাতে বাতি জ্বলে উঠলে রক্তচাপ কমে যায়!

যদিও ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফটোরিলাক্সেশন ব্যপারটার অস্তিত্ব বিজ্ঞানী মহলে পরিচিত কিন্তু অন্তর্নিহিত রহস্যটা কারো জানা ছিল না। বার্কোভিৎজ এবং তার দল এরপরে অনুসন্ধান করে সেই রক্তনালীতে মেলানোপসিন প্রোটিন এবং তার সৃষ্টির জন্য দায়ী জিন Opn4 কে শনাক্ত করেন। নীল আলোর প্রভাবে মেলানোপসিনের উপস্থিতিতে রক্তনালী প্রসারিত হয় যার ফলে রক্তচাপ কমে যায়। জেনে রাখা ভালো মেলানোপসিন নীল আলো সংবেদী এবং ঘুম জাগরণের সাথে জড়িত বলেই ঘুমানোর আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার

চিত্রঃ আলোক সংবেদী মেলানোপসিন

ইঁদুরের লেজকে নীল আলোয় আলোকিত করে দেখা যায় আসলেই তখন লেজের রক্তচাপ কমে যায়। কিন্তু ঘটনা হলো ইঁদুরের লেজের রক্তনালীগুলো চামড়ার কাছকাছি যার ফলে আলো প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ রক্তনালীই দেহের এত ভেতরে যেখানে কোনোভাবেই আলো প্রবেশ করতে পারে না। নিষেধ করা হয়।

তাহলে সেখানে এই আলোকীয় সংগ্রাহী কীভাবে কাজ করতে পারে? বার্কোভিৎজ বলেন, এটা হতে পারে বিবর্তনের পদচিহ্ন কিংবা আলো ছাড়াও দেহে এমন কিছু আছে যেটা এদের সক্রিয় করতে পারে অথবা কোনো অজানা পদ্ধতিতে দেহের ভেতরেই নীল আলো তৈরি হয় হয়তো! যা আমরা জানি না।

এর সত্যিকার কাজ সম্পর্কে সন্দেহ থাকলেও বার্কোভিৎজ চেষ্টা করছেন এমন কোনো বুদ্ধি বের করতে যাতে রক্তচাপ জনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় এই মেলানোপসিন সংক্রান্ত ফটোরিলাক্সেশনকে কাজে লাগানো যায়। রেনড’স ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঠাণ্ডার প্রভাবে হাত ও পায়ের আঙ্গুলে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়ে যায় এবং তারা অবশ কিংবা ব্যথা অনুভব করেন।

তারা এমন মোজা পড়তে পারেন যা তাদের আঙুল নীল আলোয় আলোকিত করে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করে আনবে ও ব্যথার উপশম ঘটাবে। নবজাতক শিশুরা যারা পালমোনারি হাইপারটেনশনে ভোগে তাদের ক্ষেত্রেও আলোকীয় চিকিৎসা কাজে লাগতে পারে। রক্তচাপ জনিত রোগগুলোতে বর্তমানে যেসব ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা চালানো হয় তাতে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তাই আলো হতে পারে এসব ক্ষেত্রে একটি নিরাপদ বিকল্প। তবে তার জন্য আমাদের কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তা আগে থেকেই বলা যাচ্ছে না।

স্বাদেই নিস্তার

খাওয়ার সময় যে বিভিন্ন খাবারের স্বাদ নেই, সেই স্বাদ নেয়ার কাজটি করে থাকে বিভিন্ন স্বাদ সংগ্রাহক কোষ। নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন এইবার বলবো এরা মুখ ছাড়াও দেহের অন্য কোথায় কোথায় আছে। তারা পেটের ভেতরে আছে, শুক্রাণুতে আছে, শুক্রাশয়ে আছে, চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে দেহের ভেতর এদের কাজটা বের করা। কিছু কিছু কাজ অবশ্য জানা গেছে, যেমন পেটের ভেতরে যেসব স্বাদ সংগ্রাহী আছে তারা খাবারের পুষ্টি উপাদান শনাক্ত করে। আবার কিছু কিছু কাজ অর্ধেক জানা গেছে, যেমন ইঁদুরের শুক্রাশয়ে যেসব স্বাদ গ্রাহক আছে তাদের নিষ্ক্রিয় করে দিলে ইঁদুরগুলোর প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। কেন এমন হয়? তার উত্তর জানা নেই।

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস ফিঙ্গার শুরুর দিকে মাছে একধরনের সংবেদনশীল কোষ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন যা জৈবরাসায়নিক এবং গাঠনিক দিক থেকে আমাদের স্বাদ কোড়কের সাথে সাদৃশ্যতা দেখায়। তিনি এর নাম দেন নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ (solitary chemosensory cell)। ২০০৩ সালে তিনি দেখতে পান একই ধরনের কোষ স্তন্যপায়ীদের নাকেও আছে। তবে আমাদের চিন্তা এর নিঃসঙ্গতা নিয়ে নয়। জেনে রাখা ভালো আমরা যে টক, ঝাল, মিষ্টি বিভিন্ন স্বাদ গ্রহণ করি তার জন্য আলাদা আলাদা স্বাদ সংগ্রাহী আছে। ২০০৩ সালে ফিংগার ইঁদুরের শ্বাসনালীর উপরের দিকে অবস্থিত নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষের মধ্যে তেতো স্বাদ সংগ্রাহী শনাক্ত করেন যেগুলো গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া নিঃসৃত এক ধরনের রাসায়নিকের প্রভাবে সক্রিয় হয়।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক, ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

কোহেন শনাক্ত করেন মিষ্টি স্বাদ গ্রাহক। ধারণা করা হয় এরা একই সাথে কাজ করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে।ইঁদুরে সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তীতে ফিংগার মানুষের উচ্চতর শ্বাসনালীর নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষেও তেতো স্বাদ সংগ্রাহী খুঁজে পান। অন্যদিকে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নোয়াম

গ্লুকোজ কিংবা সুক্রোজের মাধ্যমে মিষ্টি স্বাদ সংগ্রাহী সক্রিয় হলে একই কোষের তেতো স্বাদ সংগ্রাহী নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কোহেন দেখেন যে স্বাভাবিক স্বল্প মাত্রার গ্লুকোজই তেতো স্বাদ সংগ্রাহীকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। শ্বাসনালীতে ব্যাকটেরিয়া প্রধানত গ্লুকোজ খেয়ে বেঁচে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকলে গ্লুকোজ কমতে কমতে এক সময় তেতো স্বাদ গ্রাহক মুক্ত হয়ে গেলে এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। সাইনুসাইটিস কিংবা ডায়বেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শ্বাসনালীতে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকায় তারা প্রায়ই এ ধরনের সংক্রমণের শিকার হন যা সহজে সাড়ে না।

নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ ছাড়াও আরেক জায়গায় তেতো সংগ্রাহী পাওয়া যায়। উচ্চতর শ্বাসতন্ত্রে চুলের ন্যায় একধরনের কোষ থাকে যাদের সিলিয়া বলে, এরা ব্যাকটেরিয়া এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর জিনিস যুক্ত মিউকাস বাইরে বের করে দেয়। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল সিলিয়াতেও তেতো স্বাদ গ্রাহকের অস্তিত্ব পেয়েছেন যেগুলো ব্যাকটেরিয়ার খোঁজ পেলে অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া শুরু করতে পারে। এই অবস্থায় মিউকাস বের করে দেবার গতিও বাড়ে। কোহেন একটি বিশেষ তেতো স্বাদ সংগ্রাহী T2R38 নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন। ধারণা করা হয় এই সংগ্রাহীর উপস্থিতিই কিছু কিছু মানুষকে সুপার-টেস্টার বানিয়ে দেয়। এরা অতি অল্প মাত্রায় তেতো পদার্থের উপস্থিতিও সাথে সাথে ধরে ফেলতে পারে। মজার বিষয় হলো এদের সিলিয়া অতি সামান্য ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও ধরে ফেলে। ফলে ওনারা ভাগ্যবান যে তাদেরকে খুব কমই গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের শিকার হতে হয়।

কোহেন বলেন, কোনো ব্যাক্তিতে নিরাপদ তেতো পদার্থের স্বাদ গ্রহণ করতে দিয়ে বলতে পারি তিনি কতটা তেতো অনুভব করছেন। এই তথ্য থেকে খুব সহজেই বলা সম্ভব হতে পারে তিনি কতটা সংবেদনশীল। যে বেশি তেতো অনুভব করবেন, তার অনাক্রম্যতা বা প্রতিরোধ ক্ষমতা এক্ষেত্রে তত শক্তিশালী। অদূর ভবিষ্যতে এটা এমনও হতে পারে তিক্ততার মাত্রা যাচাইয়ের মাধ্যমে আক্রমণকারী অণুজীবের পরিচয় জানা যাবে। নাকের মধ্যে তেতো কিছু ঢুকিয়ে দিয়ে অনাক্রম্যতা বা শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উত্তেজিত করে চিকিৎসাও সম্ভব হতে পারে।

শ্বাসনালী ছাড়াও সাম্প্রতিক কালে পেটের ভেতরে স্বাদ সংগ্রাহী পাওয়া গেছে। এরাও অনাক্রম্যতায় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্ত্রের টাফট কোষে স্বাদ সংগ্রাহী থাকে, ধারণা করা হতো এদের কাজ হয়তো খাদ্যের সাথে কোনো বিক্রিয়া করা।

পরিশেষে অনুসন্ধ্যিৎসু মনে অনেক অনেক প্রশ্ন নিয়েই শেষ করতে হচ্ছে। তবে প্রশ্ন করতে হবে, মানুষ প্রশ্ন করতে পেরেছিল বলেই এতদূর আসতে পেরেছে। প্রচলিত গণ্ডির বাইরে এসে কেউ কেউ ভাবতে পেরেছে বলেই আমরা জানতে পেরেছি আমাদের দেহেই গণ্ডির বাইরে কত ঘটনা ঘটে। অনেক কিছুই এখনো অজানা, কীভাবে এরা সক্রিয় হয়, কী কাজ করে। তবে পরীক্ষাগারে এদের নিয়ে কাজ হচ্ছে, দিগন্তে উকি দিচ্ছে আরো চমকপ্রদ চিকিৎসা প্রযুক্তি। আমরা যদি সভ্য থাকি, বিজ্ঞান আমাদের সুন্দর একটা ভবিষ্যত উপহার দেবে, ভাবতে দোষ কি?

তথ্যসূত্র

  1. Senses in unlikely places, Sandeep Ravindran, The Scientist, September, 2016
  2. http://the-scientist.com/?articles.view/articleNo/46831/title/What-Sensory-Receptors-Do-Outside-of-Sense-Organs/

 

 

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ও আমাদের স্বাস্থ্যসেবা

এবারের জাতিসংঘের সাধারণ সভায় এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ সভার ৭০ বছরের ইতিহাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা হয়েছে এবার নিয়ে মাত্র চার বার। ২০১১ সালে এইচআইভি ও এইডস প্রতিরোধ বিষয়ে এবং সে বছরের শেষের দিকে ক্যান্সার ও ডায়াবেটিস অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধ বিষয়ে, ২০১৪ সালে ইবোলার বিস্তার থামানোর জন্য করণীয় বিষয়ে এবং এবার ২০১৬ সালে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধে কী করণীয় সেই বিষয়ে। জাতিসংঘের সবগুলো সদস্য রাষ্ট্র যখন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তখন সেই বিষয়টির গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।

মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে প্রতি বছর ক্যান্সারের চেয়েও বেশি লোক মারা যায়। সমস্ত পৃথিবীতে বছরে প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ১০ মিলিয়নে। এছাড়া ২০৫০ সাল নাগাদ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধজনিত কারণে সারা বিশ্বব্যাপী অপচয় গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এসব অপচয়ের পেছনে থাকবে চিকিৎসা সেবাদানের খরচ, কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনে হ্রাস সহ আরো অনেক কিছু।

বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে যখন এন্টিবায়োটিক ওষুধ বেশ জনপ্রিয়তা পায় তখন সবাই মনে করতো এটি ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগের প্রতিরোধক হিসেবে সবসময় কাজ করবে। সে সময়ে অনেক লোকের জীবন বাঁচলেও বর্তমানের বাস্তবতা ভিন্ন রকম। কারণ অধিকাংশ জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া প্রচলিত সব

ধরনের ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়ে এইসব ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর নির্মূল করা আর সম্ভব নয়।

এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলার ফলে মানুষের মৃত্যু হতে থাকবে ওষুধ আবিষ্কারের আগের সময়ের মতো। যেমন, বর্তমানে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ লোক বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগে আক্রান্ত হয়। এই রোগগুলোকে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দ্বারা সারানো যায় না, ফলে প্রায় ২৩ হাজারের মতো লোক মারা যায় প্রতিবছর শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন আগামী দিনগুলোতে এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। যদি এরকম হয় (এরকম হবারই কথা) তাহলে তা মানুষের জন্য শতাব্দীর সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিবে।

আগে এন্টিবায়োটিকের মাধ্যমে যেসব রোগের চিকিৎসা সফলভাবে করা যেত সেসব রোগের ক্ষেত্রেও এই প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীর অনেক স্থানে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে যৌন-বাহিত রোগ গনেরিয়া প্রায় চিকিৎসার অসাধ্য হয়ে উঠেছে।

এছাড়া ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার একটি প্রকরণ পাওয়া গেছে যেগুলো বিদ্যমান সকল প্রকার এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সকল এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে ফেলেছে, এই খবরটি অবশ্যই আশঙ্কাজনক। এমনকি সাধারণ ছোটখাটো সংক্রমণের ক্ষেত্রেও সমগ্র বিশ্বে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে।

ক্ল্যামেডিয়া, সিফিলিস ইত্যাদির মতো মূত্রনালীর সংক্রমণ ও যৌনরোগ, যেগুলো আগে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দ্বারা নিরাময়যোগ্য ছিল সেগুলো এখন একদমই অপ্রতিরোধ্য। কোনোভাবেই এদেরকে বশ মানানো যায় না। ফলে প্রতি বছর এসব রোগে মারা যাচ্ছে অনেক মানুষ। রোগগুলো দেখতে হয়তো ক্যানসার বা এইডসের মতো ভয়াবহ নায় কিন্তু তারপরেও অপ্রতিরোধ্য হবার কারণে কেড়ে নিচ্ছে প্রচুর মানুষের প্রাণ। ক্যানসার বা এইডস না হওয়াতে এগুলো মানুষের নজরও কেড়ে নিতে পারছে না।

প্রশ্ন হতে পারে, ঠিক কীভাবে এই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এইসব জীবাণুগুলো। মূলত মানুষ ও গৃহপালিত পশুপাখির চিকিৎসায় যেমন খুশি তেমনভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা ছাড়াই যত্রতত্র ওষুধ ব্যবহারের

কারণে জীবাণুর এরকম শক্তিশালী প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে। সাধারণভাবে বললে ব্যাপারটি এরকম- মনে করুন ব্যাকটেরিয়া-জনিত কারণে আপনার একটি চর্মরোগ হয়েছে। এর প্রতিকারের জন্য আপনি একধরনের এন্টিবায়োটিক মলম ব্যবহার করলেন। আপনার ডাক্তার বলেছিল যে অন্তত সাতদিন ব্যবহার করতে। চারদিনের মাথায় দেখলেন যে আপনার চর্মরোগ ভালো হতে শুরু করেছে। ভালো দেখে আপনি মলমটি ব্যবহার করা বন্ধ করে দিলেন এবং মলমটি আবর্জনার সাথে ফেলে দিলেন।

চর্মরোগ ভালো হতে শুরু করলেও হয়তো দেখা যেতে পারে আসলে সকল ব্যাকটেরিয়া মরেনি। যেসব ব্যাকটেরিয়া বেঁচে গেছে তাদের পরবর্তী বংশধর ঐ ওষুধ প্রতিরোধের জন্য সুরক্ষা গড়ে তুলবে। অর্থাৎ যে আঘাত আপনাকে মারতে পারে না সে আঘাত আপনাকে আরো শক্তিশালী করে তোলে- এই প্রবাদের মতো। এছাড়া আপনার ফেলে দেয়া এন্টিবায়োটিক ওষুধটি বাইরের পরিবেশের অনেক ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুকে মেরে ফেলবে, এবং একই সাথে দেহের মতো কিছু কিছু জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া টিকে থাকার তাগিদে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

একেকটি ওষুধ তৈরির পেছনে লাগে অনেক গবেষণা, বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম, জ্ঞানের পরিসর এবং অনেক বছরের কাজ। কিন্তু একটি এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে  প্রতিরোধ গড়ে তুলতে একটি জীবাণুর কয়েক দিন সময় লাগে মাত্র। ব্যবহারকারীরা যদি অসাবধান হয় এবং ডাক্তার বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিকভাবে ব্যবহার না করে তাহলে বিশ্বকে ক্ষুদ্র দানবের সৃষ্টি করে চরম মূল্য দিতে হয়। অথচ যে এন্টিবায়োটিক তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের বছরের পর বছর সময় লেগেছিল, অনেক অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়েছিল, অনেক অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়েছিল, সেখানে ব্যবহারকারীর অবহেলার কারণে এই মূল্যবান শ্রম, অর্থ ও সময়গুলো ভেস্তে যাচ্ছে এক নিমেষেই। এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সক্ষম জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদেরকে ‘সুপারবাগ’ (Superbugs) বলা হয়।

মানব শরীর প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কোষ ‘মানব’ দ্বারা এবং ৩৯ ট্রিলিয়ন অন্যান্য জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার কোষ দ্বারা গঠিত। এসব জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এসব জীবাণু আমাদের খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে, অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণু থেকে সুরক্ষা দেয়, ত্বক পরিষ্কার রাখে এবং আরো অনেক উপকারী কাজ করে।

সমস্যা হচ্ছে যে, ক্ষতিকর জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদের দমন করতে গিয়ে আমরা মেরে ফেলছি ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোকেও। যেমন নিউমোনিয়া থেকে নিরাময়ের জন্য নিউমোনিয়ার জীবাণুর পাশাপাশি মেরে ফেলা হচ্ছে অন্ত্র বা পেটের অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও আণুবীক্ষণিক জীবকে। এরা আমাদের পেটের প্রদাহ রোধ করে কিংবা কোষ্ঠকাষ্ঠিন্য দূর করে

গবেষণায় দেখা গেছে যে, পেট ও শরীরের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, বিষণ্ণতা সহ অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক রোগ সৃষ্টি হতে পারে। শুধু তাই নয়, পরিবেশের যাবতীয় সব চক্রে (যেমন, পানি চক্র, অক্সিজেন চক্র, কার্বন ও নাইট্রোজেন চক্র ইত্যাদি) জীবাণুদের অবদান রয়েছে। বলা হয়ে থাকে মানুষ যত অক্সিজেন গ্রহণ করে তার অনেকটাই জীবাণুদের দ্বারা নির্গত। বিভিন্ন বিপাক ও জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়া ও জটিল চক্রের মাধ্যমে তারা এই কাজটি করে।

চিত্রঃ ক্ষুদ্র জীবাণুগুলো অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এখান থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে আমাদের জীবন ও পরিবেশের জন্য জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদের গুরুত্ব কতটা দরকারি। তাই টিকে থাকার জন্যই তাদেরকে আমাদের দরকার। সেজন্য আমাদের সকলেরই উচিৎ এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতন হওয়া।

ব্যাকটেরিয়া সব জায়গায় আছে, এবং এসব ব্যাকটেরিয়ার অধিকাংশ ক্ষতিকর নয়। ক্ষেত্র বিশেষে কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া উপকারী, এগুলো অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলোকে চাপের মুখে রাখে। যখন আপনি অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করেন তখন খারাপ ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোও মরে যায়। অথচ দেহের জন্য এরাই সবচেয়ে যোগ্য ওষুধ।

এন্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরি করা হয় সাধারণত প্রকৃতিতে সহজলভ্য বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা। অথবা অন্যান্য জীবাণুদের নির্যাস বা নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ থেকে। যেমন ছত্রাক থেকে বানানো পেনিসিলিন। কিন্তু এসব সহজলভ্য প্রাকৃতিক উপাদানগুলো প্রায় ‘শেষ’ হয়ে এসেছে। বলা হয়ে থাকে আমরা এসব প্রাকৃতিক ওষুধের অধিকাংশই কোনো না কোনো ওষুধের মাধ্যমে ব্যবহার করে ফেলেছি। তাই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ বানাতে। কিন্তু এটি বেশ সময়সাধ্য ব্যাপার।

অন্যান্য প্রাণীর মতো ব্যাকটেরিয়ার DNA-তেও বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন ঘটে। অধিকাংশ সময় এসব পরিবর্তন খারাপ কিছু নয়। এগুলো তাদের অভিযোজনের জন্য তেমন সহায়ক হয় না। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে এসব বিক্ষিপ্ত পরিবর্তনের কোনো কোনোটি ব্যাকটেরিয়াদের দুর্গম বা প্রতিকুল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য শক্তি দান করে। যখন আপনি যত্রতত্র এন্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করেন তখন টিকে থাকার জন্য ব্যাকটেরিয়াতে বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন ঘটে এবং প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বংশগতির সূত্রানুসারে প্রবাহিত হয়। এছাড়া ব্যাকটেরিয়াসমূহ পরষ্পরের সাথে তাদের ডিএনএ শেয়ার করতে পারে, ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা এক ব্যাকটেরিয়া থেকে অন্য ব্যাকটেরিয়াতেও সঞ্চালিত হয়।

চিত্রঃ ব্যাকটেরিয়া পরস্পরের সাথে ডিএনএ আদান প্রদান করতে পারে।

অনেকে ধারণা করতেন নিত্যনতুন ওষুধ আবিষ্কার ও প্রযুক্তির কল্যাণে ব্যাকটেরিয়াদের এই প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে সহজে। তবে বাস্তবতা অন্যরকম, কারণ প্রয়োজনীয় অর্থ ও বিনিয়োগ থাকলেও চাইলেই নিত্যনতুন ওষুধ তৈরি করা যায় না। যেহেতু একেকটি গবেষণার পেছনে প্রচুর সময় লাগে এবং অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়ার নিত্যনতুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা বেশ দ্রুত তাই তাদের ঠেকিয়ে রাখা সম্ভবপর হয়ে উঠে না।

অনেক ওষুধ কোম্পানিও ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে তাল মিলিয়ে ওষুধ তৈরি করতে পারছে না। ক্ষেত্র বিশেষে দেখা যায়, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে একটি নতুন ওষুধ আনলেও সেটির বিরুদ্ধে জীবাণুরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে কয়েক বছরের ভেতরেই। ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলো এখন লোকসানের ভয়ে গবেষণায় বিনিয়োগের ব্যাপারে অনেক সতর্ক।

এছাড়া, যেসব দেশে ওষুধের দাম কীরকম হবে সেই ব্যাপারে নির্দিষ্ট নীতিমালা বা আইন আছে, কিংবা যেসব দেশে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অধীনে এন্টিবায়োটিক বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় (যেমন, কানাডা) সেসব দেশে প্রত্যাশিত লাভ পায় না ওষুধ কোম্পানিগুলো। তাই ওষুধ কোম্পানি কিছু একটা উপায় বের করে ওষুধ নামিয়ে ফেলবে, এরকম ভাবনায় আশা পেয়ে লাভ নেই। আমাদের নিজেদেরকেই এর জন্য নেমে আসতে হবে। জীবাণুগুলোর শক্তিশালী হয়ে ওঠে ঠেকাতে আমাদেরকেই এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের আচরণ পাল্টাতে হবে। সতর্ক ও বিবেক সম্পন্ন হতে হবে।

এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোর বিকল্প নেই, শুধুমাত্র গুরুতর রোগ ও সংক্রমণের জন্যই এর ব্যবহার সীমিত করা উচিৎ। এই কাজটি করতে হবে আমাকে, আপনাকে। সচেতনা ও সদিচ্ছা ছাড়া উপায় নেই। রোগ নির্ণয়ের জন্য ভালো উপায়ের ব্যবহার এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। এভাবে দীর্ঘ সময়ে হয়তো যেসব ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে সেগুলোকে ঠেকানোর উপায় পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

সামান্য হাত পা কাটলেই কিংবা সাধারণ ফোস্কা ইত্যাদি হলেই এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার কমাতে হবে বা সীমিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক না নিয়ে এর বিকল্প চিকিৎসা নিতে হবে। যেমন ভাইরাসের দ্বারা ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলার থেরাপি রয়েছে। এছাড়া গাদ পদার্থ প্রতিস্থাপনের

(fecal matter transplants) মাধ্যমেও আন্ত্রিক বা পেটের সংক্রামণের চিকিৎসা করা যায়। অর্থাৎ, কোনো রোগ হলেই এন্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে এই ধারণার পরিহার জরুরী।

অন্য আরেকটি ব্যাপার এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের পেছনে দায়ী- এন্টিবায়োটিক ওষুধের পাশাপাশি অতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক সাবান, এন্টিবায়োটিক শ্যাম্পু ও প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবহারও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের দেহে ও আশেপাশে সাধারণ যেসব ব্যাকটেরিয়া থাকে সেগুলোর জন্য এন্টিবায়োটিক সাবান ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা ভালোগুলোকে মেরে ফেলি এবং খারাপগুলো আরো বেশি প্রতিরোধী করে তুলি। জীবাণুনাশক হ্যান্ডওয়াশের পরিবর্তে সাধারণ সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করলেই চলে দৈনন্দিন কাজকর্মে। এগুলোও শিক্ষিত মননের সচেতনতার অংশ।

শুধুমাত্র খামার, হাসপাতাল বা এরকম দূরবর্তী স্থানে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায় এমন নয়, আমাদের আশেপাশে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা হচ্ছে এদের স্বর্গরাজ্য। কারণ যাবতীয় বর্জ্য, ওষুধ ইত্যাদি পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় এসে মেশে। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে যে, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ক্রটির কারণে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলো আমাদের যাপিত পরিবেশে সহজেই মিশে যেতে পারে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে চীনে এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার এতো বেশি যে পানির ট্যাপ কিংবা বাড়ির খাবারের পানিতেও এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি আছে। চীনের কয়েকটি নদীর পানির নমুনায় প্রায় ৬০ টিরও বেশি এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে! ধারণা করা যায় আমাদের দেশে বুড়িগঙ্গা ও কিংবা শহর সংলগ্ন অনেক নদীর ক্ষেত্রেও এইরকম হবে। চীনের একটি ওষুধ কোম্পানির কারখানার নিকটবর্তী জলাশয়ে মানুষের চিকিৎসা মাত্রায় প্রায় ১০ হাজার গুণ বেশি পরিমাণের এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে। শুধু চীন নয়, ভারত, নিউ ইয়র্ক ইত্যাদি দেশ ও শহরে-ও কম বেশি একই অবস্থা। আমাদের দেশে ওষুধ কোম্পানিগুলোর কারখানা ও বর্জ্য নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে কী করা হয় তা অনুসন্ধান ও প্রয়োজনে সমাধান করা জরুরি।

চিত্রঃ ওষুধ কোম্পানিগুলোর আশেপাশের এলাকা অনুসন্ধান জরুরী।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার অন্যতম স্থান হতে পারে বুড়িগঙ্গা নদী। অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার কারণে বুড়িগঙ্গা আজ স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের অন্যতম স্থান। এছাড়া আমাদের দেশে যাবতীয় শিল্পকারখানার বর্জ্য, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বর্জ্য কিন্তু শেষ পর্যন্ত গিয়ে মেশে নদী ও প্রবাহিত পানিতে। যেহেতু শহরাঞ্চলে পানির সরবরাহের অন্যতম উৎস নদী তাই এসব পানি নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। একবার আমাদের খাদ্য ও পানি চক্রে এইসব ব্যাকটেরিয়ার প্রবেশ ঘটে গেলে

কিংবা এসব ব্যাকটেরিয়া মানুষের মাঝে সংক্রমিত হলে এর নির্মূল কঠিন হয়ে যাবে। কারণ বাংলাদেশ অনেক ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ, তাই রোগের সংক্রমণ দ্রুত ঘটার সম্ভাবনা বেশি।

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ সমস্যা পরিমাপের জন্য রয়েছে ওষুধ প্রতিরোধ সূচক (Drug Resistance Index), এই সূচকের মান ০ থেকে ১০০ পর্যন্ত হয়। ০ বলতে বোঝায় কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠনি, অর্থাৎ সব এন্টিবায়োটিক কাজ করে। এবং অন্যদিকে ১০০ বলতে বোঝায় জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াসমূহ পুরোপুরি প্রতিরোধী। ইউরোপের ২৭ টি দেশের মধ্যে ২২ টি দেশেই (জার্মানি ও সুইডেন ছাড়া) গত চৌদ্দ বছরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ অনেক বেড়েছে। ভারতের অবস্থা-ও বেশ নাজুক, অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া জনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে প্রচলিত এন্টিবায়োটিক কাজ করে না। যেহেতু অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো বাংলাদেশে এসব বিষয়ে উপাত্ত নেই তাই বাংলাদেশের অবস্থা কী তা সঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে যেহেতু প্রতিবেশি দেশ ভারতের নাজুক অবস্থা তাই বলা চলে বাংলাদেশের অবস্থা-ও ভালো নয়।

চিত্রঃ বাংলাদেশের নদীগুলোও ব্যাপকভাবে ‘এন্টিবায়োটিক দূষিত’ হতে পারে।

একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে জাতিসংঘের সাধারণ সভা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বিষয়ে অনেক দিকনির্দেশনা প্রদান ও আলোচনা করলেও এসব সুপারিশ প্রয়োগ করার দায়িত্ব সদস্য রাষ্ট্রগুলোর। সদস্য রাষ্ট্রগুলোকেই তাদের জনগণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে কী করছে, কিংবা এ ব্যাপারে অভিহিত আছে কিনা সেটি দেখার বিষয়।

অনেক লোকই রোগ হলে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ওষুধ দোকানগুলোতে গিয়ে দোকানদার, ক্ষেত্র বিশেষে ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ ও এন্টিবায়োটিক নেন, কিন্তু মনে রাখা দরকার যে এইসব দোকানদারের প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ নেই বা ফার্মাসিস্টরা-ও সনদপ্রাপ্ত ডাক্তার নন। তাই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন, এবং একজন সচেতন রোগী হিসেবে নিজের ওষুধপত্র সম্পর্কে ধারণা রাখুন।

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

ইতিহাসের উত্তরোত্তর উন্নতির সাথে চিকিৎসাশাস্ত্রেও ঘটে যায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এটি রূপ নিতে থকে এক অভিজাত শিল্প হিসেবে। এর কিছুটা ঝলক বা ছোঁয়া দেখা যায় তৎকালীন পশ্চিম এশিয়ার উর্বর সভ্যতাগুলোতে। বিশেষ করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী মেসোপটেমিয়ান সভ্যতায়। সেইসাথে তুরস্ক, সিরিয়া আর ইরানের উর্বর ভূমিগুলোতেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর আগের সুমেরীয় এবং তার পরবর্তী আক্কাডীয়, অ্যাসেডীয় আর ব্যাবলনীয় সভ্যতার কিছু কীলক-লিপি থেকে সেই সময়কার চিকিৎসাশাস্ত্র এবং এ ব্যাপারে অন্যান্য কাজকর্মের কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তখনকার অনেক চিকিৎসক মনে করতেন অসুখ-বিসুখ হয় মূলত জাদুবিদ্যা বা দুষ্ট প্রেতাত্মা দ্বারা এবং এর প্রতিকারও শুধুমাত্র জাদুবিদ্যা দ্বারাই সম্ভব। তারা তথাকথিত তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ-কবজ আর গাল-মন্দ করে সেই দুষ্ট প্রেতাত্মা তাড়াবার ব্যবস্থা করতেন। এ ধরনের চিকিৎসক বা ওঝাদের নাম ছিল আসিপুস।

আরেক ধরনের চিকিৎসক যারা আসুস নামে পরিচিত ছিলেন তারা বিশ্বাস করতেন কার্যকরী পন্থাগুলোতে। তারা বিভিন্ন ভেষজ তরল মিশ্রণ, ক্ষতস্থান পরিষ্কারকরণ, আক্রান্ত স্থান ম্যাসাজ কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যান্ডেজ ও মলম ব্যবহার করতেন। আসিপুস আর আসুস- এ দু’দলই পাশাপাশি চিকিৎসা চালাতেন। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং সাহায্য-সহায়তাও করতেন। তবে বাণিজ্যিক ব্যাপারগুলো গোপন রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেন।

চিত্রঃ আইনপ্রণেতা হাম্বুরাবি সূর্যদেবতা শামাস থেকে রাজকীয় মর্যাদা নিচ্ছেন।

৩,৮০০ কি ৩,৭৬০ বছর আগে হাম্বুরাবি ছিলেন ব্যাবিলনের শাসক। কীলক-লিপিতে লিখিত আইনশাস্ত্রের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। বিশ্বের প্রথম আইন প্রণেতা হিসেবে তাকেই ধরা হয়। আর এই আইনশাস্ত্রে চিকিৎসা বিষয়ক কিছু ঘোষণাও ছিল। এই ঘোষণাগুলো চিকিৎসকদের সফলতা আর ব্যর্থতা উভয়ের

জন্যই দায়ী ছিল। রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারলে যেমন পুরষ্কারের ব্যবস্থা ছিল, তেমনি ব্যর্থতার জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থাও বলবৎ ছিল। কোনো অভিজাত ব্যক্তির চিকিৎসা করে রোগ সারাতে পারলে ব্রোঞ্জের ল্যান্সেট (বর্তমান ইসরাইলি দশ শেকেলের সমান) দেয়া হতো যা কোনো সওদাগরের এক বছরের আয়েরও অনেক বেশি। আর কোনো দাসের জীবন বাঁচাতে পারলে দেয়া হতো দুই শেকেল। কিন্তু যদি কোনো সার্জনের ছুরির তলায় অভিজাত কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হতো, তাহলে শাস্তি হিসেবে সেই সার্জনের এক হাত কেটে নেয়া হতো। সেই সাথে তাকে একজন দাসও হারাতে হতো।

দুঃখজনক বিষয় এই যে, হাম্বুরাবি আইনে খুব কম নির্দেশনা দেয়া থাকায় ঠিক কী উপায়ে তারা সেই সময় চিকিৎসা চালাতো তা জানা সম্ভব হয়নি। হয়তো জাদুটোনা, দুষ্ট প্রেতাত্মা অথবা পাপের কারণে অসুখ-বিসুখ হয় এই ধারণা থাকায় এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না।

গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন ব্যাবলনীয়দের আরোগ্যদেবী। তাকে চিকিৎসকদের পৃষ্টপোষোকতাকারী দেবীও বলা যায়। নিনকার্ককে সাধারণত এক নারীরূপে দেখানো হতো যার সঙ্গী একটি কুকুর কিংবা কুকুরের মাথার মতো কোন মুর্তিকেও নিনকার্ক হিসেবে দেখা হতো। সেসময় রোগীরা রোগমুক্তির জন্য নিনকার্কের মন্দিরে কুকুরের মুর্তি দিত। মাঝে মাঝে কুকুর বলিও দেয়া হতো বলে জানা যায়। কিছু কিছু সূত্র বলে, গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন নেকড়েমুখো কোনো দানবী। এই নিনকার্কের আবির্ভাব ঘটে প্রায় ৩,৬০০ বছর আগে ক্যাসিটস নামক এক ব্যাবলনীয় সভ্যতার আমলে। নিনকার্কের প্রধান মন্দির ছিল ঈসিনে (বর্ত্মা ইশান-আল বাহরিয়া, ইরাক) এবং নিপ্পুরে (বর্ত্মান নুফফার-ইন আফক, ইরাক)।

ভেষজ ও অন্যান্য গুল্মলতা প্রতিকারক হিসেবে সেসময় ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। রোগ প্রতিকারের জন্য তারা ওয়াইন, আলুবোখারা (পাম ফলের চাটনি) আর পাইন গাছের রস ব্যবহার করতো। এরসাথে টিকটিকির মল মেশানো হতো যা ঔষধ সহজে গিলতে অসুবিধা সৃষ্টি করলেও ওষুধি ভাব আনতে যথেষ্ট কার্যকরী ছিল। এসব ওষুধে অ্যান্টিবায়োটিক গুণাগুণও বিদ্যমান ছিল।

প্রাচীন মিশরের সাধারণ জনগণ ও অভিজাত লোকদের দৈনন্দিন কার্যাবলিতে দেবতা আর আত্মারা এতটা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল যে বর্তমান আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তখনকার চিকিৎসকদের ধর্মীয় এবং তাত্ত্বিক কাজ আলাদাভাবে জানা প্রায় অসম্ভব। ব্যাপারটি আরো জটিল আকার ধারণ করে যখন এই আলোচনায় ইমহোটেপ নামক এক পুরোহিত চিকিৎসক প্রশ্নবিদ্ধ হন। ইমহোটেপের আমল ছিল প্রায় ৪,৬৫০ বছর পূর্বে। ইমহোটেপ মিশরীয় রাজত্বকালের প্রথমদিকে ছিলেন। খুব দ্রুতই চারদিকে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে। তার জনপ্রিয়তা এতোই বেড়ে যায় যে জীবদ্দশাতেই তাকে ঈশ্বরপুত্র (Demi-God) হিসেবে সম্মান দেয়া হতো, যে সম্মান সাধারণ কোনো নাগরিকের পক্ষে পাওয়া নিতান্তই অসম্ভব। সে সময় শুধুমাত্র রাজকীয় লোকদের এ ধরনের সম্মান জানানো হতো।

তিন হাজার বছর পূর্বে, মিশরীয় নতুন রাজত্বকালে তাকে পুরোপুরি দেবতারূপে গণ্য করা হতো। তাকে বলা হতো, তার পুত্র (Son Of Ptah), সৃষ্টির স্রষ্টা অথবা মহাবিশ্বের রূপকার। সেই সাথে কারিগরদের ত্রাণকর্তা বিশেষণও দেয়া হয়। তার সঙ্গী ছিলেন সেকমেট (Sekhmet)।

এ সেকমেট মিশরীয়দের সিংহকেশী সমর ও আরোগ্যের দেবী। সেই সাথে ইমহোটেপের মাও ছিলেন। কিছু ঐতিহাসিকের নথিপত্র ঘাঁটলে জানা যায়, ইমহোটেপ আসলে ছিলেন ঘেঁটে আর সন্ধি বাতের চিকিৎসক। তিনি এক ধরনের তরল মিশ্রণ বানাতে দক্ষ ছিলেন যা এ ধরনের রোগ ভালো করে দিতো। অন্যান্য সূত্র বলে, তিনি নাকি ছিলেন কিছু ধান্দাবাজ ওঝাদের দলনেতা যে তার অধীনস্থদের সফলতার সুফল ভোগ করলেও ব্যর্থতার দায়ভার বা নিন্দা নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন।

চিত্রঃ ইমহোটেপের মা দেবী সেকমেট। তিনি সমর এবং আরোগ্য দেবী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।

প্রাচীন গ্রীসেও ইমহোটেপের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। তবে কখনো কখনো তাকে প্রাচীন গ্রীক আরোগ্যদেবতা অ্যাসলেপিয়াস (Aselepios) এর যমজ ভাই মনে করা হতো। কখনোবা অ্যাসলেপিয়াসকেই ইমহোটেপ বলা হতো।

ইমহোটেপের সময়কালের আরেক বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন হেসি-রা, যিনি ফারাও জোসার এর প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। হেসি-রা দন্ত চিকিৎসক হিসেবেই বেশি বিখ্যাত ছিলেন। শোনা যায়, দাঁত তোলা আর মুখের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে পটুত্ব ছিল তার। সেইসাথে বর্তমানকালে আমরা যাকে ডায়াবেটিস বা বহুমুত্র রোগ বলি সেটা সম্পর্কেও অল্প বিস্তর ধারণা ছিল। রোগীদের বারবার মূত্র বিসর্জন দেখে এ ধারণা তার মাথায় আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে নীলনদ অঞ্চলের হোগলাজাতীয় গুল্ম বা ঘাস জাতীয় প্যাপারি থেকে তৈরি প্যাপিরাস থেকে প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়, যার একটির নাম- ‘স্মিথ প্যাপিরাস’। বিখ্যাত আমেরিকান মিশরীয় বিশেষজ্ঞ এবং সংগ্রাহক এডউইন স্মিথের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। তিনিই প্রাচীন এ নথি ১৮৬২ সালে লুক্সর থেকে উদ্ধার করেন।

স্মিথ প্যাপিরাস একদম অসম্পূর্ণ। দেখলে মনে হবে মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া এটি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বছর পুরনো। কিন্তু হায়ারোগ্লিফিক আর শব্দশৈলী দেখে অনুমান করা হয় এটি আরো প্রাচীন এক নথি থেকে নকল করা হয়েছে। সেই প্রাচীন নথিটি যথাসম্ভব ইমহোটেপের নিজের হাতে লেখা বা তার অধীনে লেখা। সে সময়ের অন্যান্য প্রাচীন প্যাপিরাসের তুলনায় স্মিথ প্যাপিরাস ঐন্দ্রজালিক বা জাদুকরী চিকিৎসার চেয়ে সাধারণ জখম, ক্ষত, পচন আর অস্ত্রোপচার সম্পর্কেই বেশি তথ্য দেয়। শুধুমাত্র একটি স্থানে আরোগ্য লাভের জন্য ঈশ্বর বা দেবতার কৃপা কামনা করা হয়েছে। নথিটিতে মস্তকের সামনের অংশ থেকে পেছনের দিক পর্যন্ত বিস্তৃত বর্ণনা আছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পেশি, হাড়, অস্থিসন্ধি আর রক্তের সরবরাহের বর্ণনা পাওয়া যায়।

প্যাপিরাসটি ৪৮ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগেই একদম পরিচিত আধুনিক পদ্ধতির মতো একেকটি সমস্যার বর্ণনা। কারণ, প্রতিকার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং তা সারাবার বিষয়াদিও বিস্তারিতভাবে আছে।

রোগীকে প্রথমে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা, রোগীর ইতিহাস নেয়া বর্তমানকালের অত্যাধুনিক চিকিৎসার নিয়ম হলেও প্রাচীন গ্রীসে, যেখানে দেবতারা শাসন করতেন, সেখানে এরকম পদ্ধতি ছিল কিছুটা অজ্ঞতার আড়ালে থাকা রহস্যের মতো।

এ স্মিথ প্যাপিরাসেই করোটিসন্ধি সম্পর্কে সবচেয়ে পুরাতন তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া মেনিনজাইটিস (মস্তকের কোষপর্দা) এবং সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা জানা যায়। মাথার ও ঘাড়ের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, বিশেষ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ও পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্যও এতে পাওয়া যায়। স্মিথ প্যাপিরাসে ক্ষতস্থানে সেলাই করা, কাঁচা মাংস ব্যবহার করে রক্তপাত বন্ধ করা এবং মধু ব্যবহার করে রোগ প্রতিকারের কথাও বলা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনটি ব্যাপারের কথা বলা যায়। যেমন- একজন লোক, যার মাথায় ক্ষত হয়েছে, তার জন্য প্রথমে মাথাটাকে সঠিকভাবে জায়গানুসারে বিভিন্ন অংশে সেলাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাজা কাঁচা মাংস ক্ষতস্থানে বেঁধে দিতে হবে। এরপর গ্রীজ, মধু এবং অন্যান্য ভেষজ তরল ব্যবহার করতে হবে যতদিন না লোকটি সুস্থ হয়ে উঠে। স্মিথ প্যাপিরসে মূলত অ্যাক্সিডেন্ট সম্পর্কিত কথা বেশি থাকায় ধারণা করা হয় এটি শুধুমাত্র যুদ্ধাহত সৈন্যদের কিংবা পিরামিড বানানোর কারিগরদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হতো। স্মিথ প্যাপিরাসে বর্ণিত ৪৮টি চিকিৎসা ধরনের মধ্যে ১৪ টিকেই চিকিৎসার অনুপযুক্ত বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ সকল রোগের প্রতিকার সেই সময় তাদের জানা ছিল না।

তখনকার আরেকটি বিখ্যাত পুরাতন নথি বা পুঁথি হলো ইবারস প্যাপিরাস (Ebers Papyrus)। এটি প্রায় স্মিথ প্যাপিরাসের মতোই। এটি ৩,৫০০ বছর আগের বলে গবেষকরা মনে করেন। কিন্তু কেউ কেউ বলেন এটিও অন্য আরেকটি পুঁথির নকল, যথাসম্ভব ইমহোটোপের আমলেরই কোনো নথি হবে।

১৮৭২ সালে জার্মান লেখন এবং মিশরীয় বিশেষজ্ঞ জর্জ ইবারস এ পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। তিনি লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মিশরীয়বিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। সেখানেই এ ইবারস প্যাপিরাস সংরক্ষিত আছে। এতে প্রায় ১১০ পৃষ্ঠা রয়েছে, লম্বায় প্রায় সাড়ে ৬৬ ফুট আর প্রস্থে ১২ ইঞ্চির মতো।

স্মিথ প্যাপিরাসের সাথে তুলনা করলে ইবারস প্যাপিরাসে শত শত জাদুমন্ত্র আর অভিশাপের মাধ্যমে রোগ সারানোর কথা বলা হয়েছে। সেই সাথে ভেষজ ও খনিজ উপাদানের সাহায্যে চিকিৎসার বিবরণ রয়েছে। তবে এটি অন্য নথিগুলোর দিক থেকে সাজসজ্জায় বেশ দুর্বল। তারা জাদুমন্ত্র দিয়ে বাজে, অশুভ প্রেতাত্মা তাড়াবার কৌশল কাজে লাগাতো। পরজীবীর কারণে ঘটিত বাত, ত্বকসমস্যা, আলসার বা পেটের ক্ষত, পায়ু সংক্রান্ত সমস্যা, হৃদরোগ, প্রস্রাবে অসুবিধা, বিভিন্ন ক্ষত এবং প্রসূতিরোগের চিকিৎসার বিবিধ বিধান এতে পাওয়া যায়।

তবে প্রসূতিরোগ সম্পর্কিত প্যাপিরাস হলো ‘কাহুন গাইনোকোলজিক্যাল প্যাপিরাস। প্রায় ৩,৮০০ বছর আগের এ নথিকে চিকিৎসা সম্পর্কিত প্রথম নথিগুলার একটি হিসেবে ধরা হয়। এটি বর্তমানে লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে সংরক্ষিত আছে। এতে মূলত নারীদের প্রজনন বিষয়ক ব্যাপার আলোচনা করা হয়েছে। গর্ভধারণে সক্ষমতা, গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থার পরীক্ষণ এবং গর্ভনিরোধক ইত্যাদি উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া মহিলাদের মাসিক এবং সে সম্পর্কিত ব্যথার কথাও আছে। বলা আছে- যে গর্ভবতী মহিলা সবসময় বিছানায় থাকতে ভালোবাসে, তাকে কখনো উঠানো উচিৎ নয়। বরং তাকে নাড়াচাড়া করাও ঠিক নয়। এতে তার গর্ভের বাচ্চার সমস্যা হতে পারে। তাকে খাওউই নামক একটি জিনিস এক গ্যালনের চতুর্থাংশ খাওয়ানো হয়।

আবার এক চিত্র-বিচিত্র পাত্রকে গর্ভবতীদের জন্য ঐশ্বরিক সুরক্ষা কবজ হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। এতে করে শয়তান আত্মার হাত থেকে গর্ভের বাচ্চাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে প্রাচীনকালের মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো। মজার এবং একই সাথে ভয়ানক এক তথ্য- গর্ভনিরোধক হিসেবে তারা মধু, টক দই আর কুমিরের গোবরের একটা মিশ্রণ নারী যৌনাঙ্গে ব্যবহার করতো।

চিত্রঃ ঐশ্বরিক তাবিজ-কবজ যা অশুভ আত্মার প্রভাব থেকে রক্ষা করে বলে মনে করা হতো।

স্মিথ ও ইবারস প্যাপিরাসের কিছুকাল পরেই দ্য হার্স্ট, ব্রুগশ্চ এবং লন্ডন মেডিক্যাল প্যাপিরাস পাওয়া যায়। সমাধি ভাস্কর্যের আকার-আকৃতি, বিভিন্ন হস্ত নির্মিত তৈজসপত্রের সাথে সাথে মমিকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ত্থেকে পুরানো ইতিহাসের প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

মমিকরণের জন্য মিশরীয় চিকিৎসকরা যে দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গাদিসমূহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন তা এমনিতেই বোঝা যায়। তারা এসব কাজে করাত, ড্রিল মেশিন, সাঁড়াশি, কাঁচি ইত্যাদি নানারকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন।

তবে অপারেশনের বা সার্জারি চিকিৎসা মূলত দূর্ঘটনাসমূহ চিকিৎসার সাথে জড়িত ছিল বেশি। প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসকরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর সুষম খাদ্যাভাসের প্রতিও জোর দিতেন। নকল চোখ, নকল দাঁত- এসব বানাতেও তারা দক্ষ ছিলেন। তারপরও সেই সময়কার মিশরীয় সমাজে আত্মিক এবং ঐন্দ্রজালিক চিকিৎসাই প্রধান ভূমিকা রাখতো। তারা ঘাড়, বাহু, হাত, কব্জি কিংবা গোড়ালিতে মাদুলি ব্যবহার করতো। এতে করে ভৌতিক অপদেবতা হতে রক্ষা পাবে বলে মনে করতো তারা। তবে কেউ যদি ভুলে অসুখে পড়ে যায় তবে যৌক্তিক মেডিক্যাল চিকিৎসার চেয়ে ওঝাদের মাধ্যমে চিকিৎসাই বেশি প্রাধান্য পেতো।

প্রাচীন মিশরের অস্ত্রপচার ব্যবস্থা

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসকদের আলাদাভাবে সম্মান দেয়া হতো। জীবনদানকারী ত্রাতারূপে তাঁদের গণ্য করা হতো সমাজের উঁচু স্তরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা করতো তারা। তারা কাটা অংশ সেলাই করতেন, ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতেন। এছাড়া উইলো গাছের পাতা ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। টিউমার অপারেশনও করা হতো। এসব অপারেশনে নানা রকম ছুরি ব্যবহার হতো। সেইসাথে পাথরের তৈরি ধারালো বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতিও কাজে লাগাতেন চিকিৎসকরা।

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রাচীনকালে ব্যবহৃত নকল পায়ের গোড়ালি পেয়েছেন মিশরে, যার কিছুটা কাঠের আর কিছুটা চামড়ার ও কাপড়ের তৈরি। এ ধরনের প্রস্থেটিক

যন্ত্রপাতি দুর্ঘটনায় অথবা গ্যাংগ্রিনের কারণে অঙ্গ হারানো মানুষদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো। এতে করে রোগীরা সহজে ভারসাম্য রেখে প্রাত্যহিক জীবনযাপন করতে পারতো। বলে রাখা উচিৎ, প্রাচীন মিশরীয়রা ঐতিহ্যগতভাবে পায়ে স্যান্ডেল পরিধান করতো।

চিত্রঃ প্রাচীন মিশরে ব্যবহৃত নকল গোড়ালি।

মমিকরণ

অভিজাত, উঁচু বংশের কিংবা ধনী কেউ মারা গেলে তার মরদেহ মমি করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় দেহের অভ্যন্তরীণ সমস্ত অঙ্গ বের করে ফেলা হতো। মিশরীয়রা মমি করার ব্যাপারে পরবর্তী অন্যান্য সভ্যতাগুলোর মতো কুসংস্কারপূর্ণ ছিল না। কিন্তু ঠিক কী উপায়ে তারা এ মমি করতো তার বিস্তারিত জানা যায়নি।

দ্বিতীয় শতকের রোমান সাম্রাজ্যের কুমির দেবতা সোবেক (Sobek) এর মন্দিরে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত সার্জিক্যাল ছুরি, চিকিৎসার অন্যান্য যন্ত্রপাতি, ওষুধ তৈরির উপকরণ পাওয়া গেছে। তখন বিশাল এক হূঁকের মাধ্যমে নাকের মাঝ দিয়ে মস্তিষ্ক বের করা হতো। আর অন্ত্র, যকৃত, পাকস্থলী, ফুফফুস ইত্যাদি শরীরের বাম পাশ কেটে সরানো হতো। এসব কাজ শরীরে পচন শুরু হবার আগেই সমাধা করা হতো।

হার্ট বা হৃদপিণ্ড, যা আবেগের এবং বুদ্ধিমত্তার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো, তা সরানো হতো না। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য সেটি শরীরের মধ্যেই রেখে দেয়া হতো। আর বাকি সব অঙ্গ বের করে ফেলা হতো।

চিত্রঃ ক্যানোপিক বা অঙ্গ সংরণের পাত্র।

মমিকরণবিদরা শরীর হতে বের করা অঙ্গগুলোকে জলশূন্য করে পুনরায় শরীরে স্থাপন করতেন অথবা ক্যানোপিক (Canopic) নামক এক ধরনের পাত্রে সংরক্ষণ করতেন। এ পাত্রগুলো ছোট আকৃতির কফিনের মতো দেখতে। এগুলো মমিকৃত দেহের কিংবা কবরের পাশাপাশি স্থানে রাখা হতো।

তথ্যসূত্র

The priest physician of Egypt

সন্ন্যাসরোগঃ প্যারালাইসিসের প্রধান কারণ

মানব মস্তিষ্কের ১৫০০ ঘন সেন্টিমিটারে প্রায় ১০ বিলিয়ন নিউরন কর্মরত। চিন্তা, বুদ্ধি, ইচ্ছা প্রভৃতি মানসিক বোধের নিয়ন্ত্রক এটি। এছাড়া শ্রবণ, দৃষ্টি, ঘ্রাণ, স্পর্শ, বাকশক্তি, আবেগ, দেহের ভারসাম্য থেকে শুরু করে মানবদেহের সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করছে দেড় কেজি ওজনের এ অঙ্গটি। কিন্তু মাঝে মাঝে এই মস্তিষ্ক এমন কিছু সমস্যার সামনে ব্যর্থ হয় যার কারণে আমাদের শারীরিক কাজে বিরূপ প্রভাব পড়ে। এসব সমস্যার মধ্যে মস্তিষ্ক সংক্রান্ত স্ট্রোক তথা সন্ন্যাসরোগ অন্যতম। যা প্যারালাইসিসের সবচেয়ে বড় কারণ।

সন্ন্যসরোগ কী?

কোনো ধরনের আঘাত ব্যতীত মস্তিষ্কের কাজে ব্যঘাত ঘটার নামই হলো সন্ন্যাসরোগ। এটি সেরেব্রাল স্ট্রোক নামেও পরিচিত। ধরুন আপনার সাথে একজন লোক কথা বলছে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে তিনি একটা শ্বাসরুদ্ধকর শব্দ করে আপনার সামনে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। তখন ধরে নিবেন তার উপর সন্ন্যাসরোগ ভর করেছে। অনেকে হয়ত মৃগী রোগীকেও এর আওতায় নিয়ে আসেন। মৃগী রোগের সাথে সন্নাসরোগ বা অ্যাপোপ্লেক্সির লক্ষণের দিক দিয়ে কিছুটা মিল আছে বটে। কিন্তু কারণের দিক দিয়ে এদের মাঝে বেশ কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন মৃগী রোগ সৃষ্টি হয় ব্রেন টিউমার থেকে। আর অ্যাপোপ্লেক্সির সৃষ্টি সম্পূর্ণ অন্য কারণে।

সন্ন্যাসরোগ কেন হয়?

সন্ন্যাসরোগ প্রধানত রক্ত প্রবাহের বাঁধার কারণে হয়ে থাকে। হৃৎপিন্ড থেকে সেরেব্রাল ধমনীর মাধ্যমে রক্ত মস্তিষ্কে পৌঁছায়। কোনো কারণে যদি এ পথে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় তবে সেরেব্রাল স্ট্রোকের সৃষ্টি হয়। এ কারণটা আরো গভীরভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য বিজ্ঞানীরা মূল তিনটা কারণের কথা উল্লেখ করেন।

১. সেরেব্রাল থ্রম্বোসিস

নামটা দেখেই বোঝা যায় এটা রক্ত জমাট বাঁধার কথা বলছে। মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহের পথে যখন রক্ত জমাট বাঁধা শুরু করে তখন তাকে সেরেব্রাল থ্রম্বোসিস বলে। এক্ষেত্রে মধ্য মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধতে বেশি দেখা যায়। সেরেব্রাল থ্রম্বোসিস হওয়ার প্রধান কারণ হলো নিম্ন রক্তচাপ। যখন আমাদের রক্ত প্রবাহের গতি কমে আসে তখন সেরেব্রাল ধমনীতে রক্ত জমা হতে থাকে। পরিণামে সেখানে ধীরে ধীরে রক্ত জমাট বেঁধে যায় এবং একসময় দেখা যায় জমাটকৃত রক্তপিন্ড ধমনীটি আটকে ফেলে রক্ত প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে নির্দিষ্ট স্থানে রক্ত পৌঁছাতে না পারার কারণে মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ করে না এবং স্ট্রোকের দেখা দেয়। সাধারণত এর প্রভাব বেশি দেখা যায় ৬০-৬২ বৎসর বয়সে।

চিত্রঃ রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধার দৃশ্য।

২. সেরেব্রাল হ্যামোরেজঃ

মস্তিষ্ক পথের রক্তনালী ফেটে যাবার কারণে সেরেব্রাল হ্যামোরেজের সৃষ্টি হয়। যখন রক্তচাপ বেড়ে যায় তখন অতিরিক্ত রক্তপ্রবাহ রক্তনালী সহ্য করতে পারে না। যার ফলে ফাটল ধরে রক্ত নালীতে। পরে বের হয়ে যাওয়া রক্ত জমাট বেঁধে উক্ত স্থানের লসিকার মুখে আঁটকে থাকে। ফলে রক্ত উক্ত কোষে প্রবেশ করতে পারে না এবং কোষটি মারা যায়। এভাবে বেশ কিছু কোষ নষ্টের কারণে মস্তিষ্কের কাজ ব্যাহত হয়। ফলে দেখা দেয় স্ট্রোক। সাধারণত মাদক দ্রব্য গ্রহণের সময় এর প্রভাবটা বেশি হয়। কারণ তখন রক্তচাপ অসম্ভব রকম বেড়ে যায়। কাশি, হাঁচি এবং আপনার কোনো বন্ধু আপনাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেও এর সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাছাড়া ইমোশনাল কারণেও সেরেব্রাল হ্যামোরেজ হয়ে থাকে। যেমন হঠাৎ করে কোনো দুঃসংবাদ অথবা এমন আনন্দ সংবাদ শুনা যা আপনার কল্পনাও ছিল না।

৩. সেরেব্রাল এমবোলিজমঃ

এ ব্যাপারটা থ্রম্বোসিসের সাথে সম্পর্কযুক্ত। হৃৎপিন্ড থেকে সেরেব্রাল ধমনী পথের জমাট বাঁধা রক্তপিন্ড যখন রক্ত প্রবাহের সাথে পরিবহণ করে, তখন এ পিন্ড অপেক্ষাকৃত ছোট রক্তনালী অথবা লসিকা দিয়ে যেতে না পেরে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। যার ফলে সৃষ্টি হয় স্ট্রোকের। এটি সরাসরি হৃৎপিন্ডের রোগের সাথে জড়িত। রক্তপিন্ডটা হৃৎপিন্ডের অলিন্দ হতেও আসতে পারে। অর্থাৎ শরীরের কোনো স্থানের জমাটকৃত রক্তপিন্ড নালীর মাধ্যমে যদি হৃৎপিন্ডে পৌঁছে যায়, তবে এ পিন্ডটা আবার

রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে সেরেব্রাল ধমণীতেও আসতে পারে। যার ফলে সেরেব্রাল এমবোলিজমের হয়ে যায়। এর প্রভাবটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ১৫-৩০ বৎসর বয়সে।

সন্ন্যাসরোগের লক্ষণ

সাধারণত সন্ন্যাসরোগের লক্ষণ ধীরে ধীরে দেখা যায়। তবে মাঝে মাঝে খুব দ্রুত এর উপসর্গ প্রকাশ পায়। প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরা, চোখ ব্যথা করা, চোখ লাল হওয়া, চোখ জ্বালা করা, রণন, চোখে কম দেখা, ত্বক লাল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। তাছাড়া এর প্রভাবে কথা বলতেও অনেকের অসুবিধা দেখা দেয়। অনেকটা তোতলামিতে কথা বলার মতো। সাময়িক দুর্বলতার জন্যও সন্ন্যাসরোগের ভূমিকা রয়েছে। অনেক সময় একে নীরব ঘাতকও বলা হয়ে থাকে। কারণ এ রোগের লক্ষণগুলো খুবই সাধারণ, যা আমাদের প্রায় রোগের ক্ষেত্রে দেখা দেয়। যেমন জ্বর হলে আমদের মাথা ব্যথা, চোখ লাল হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়।

সেরেব্রাল হ্যামোরেজের ফলে ধীরে ধীরে আমাদের চোখে-মুখে, ঘাড়ে রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণ দেখা যায়। তখন আমাদের চোখ-মুখে লাল রঙের একটা আভা তৈরি হয়। নিচের ছবিটার দিকে লক্ষ্য করলে হয়ত বুঝতে পারবেন।

সন্ন্যাসরোগের দ্বারা সৃষ্ট প্যারালাইসিস

সচারচর দেখা যায় কিছু মানুষের কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গ বা দেহের কোনো একটা পাশ অবশ হয়ে যায়। যাকে বলা হয় প্যারালাইসিস। প্যারালাইসিস হওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত কারণ হলো সন্ন্যাসরোগ। বিভিন্ন ধরনের অঙ্গবিকৃতির মধ্যে হ্যামিপ্লেজিয়া ও মনোপ্লেজিয়া হলো অন্যতম। হ্যামিপ্লেজিয়া হলো আমাদের দেহের পুরো এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া। বিশেষ করে মাথার এক পাশ, হাত এবং পা।

সন্ন্যসরোগ যখন ব্রেনের এক পাশ নষ্ট করে দেয় তখন তার ফলে অঙ্গবিকৃতি হয় ঠিক নষ্ট হওয়া ব্রেনের বিপরীত পাশে। অর্থাৎ ডান ব্রেন নষ্ট হলে অঙ্গবিকৃতি বাম পাশে দেখা দেয়। দেহের ডান পাশ প্যারালাইজড হওয়ার কারণে অনেকে বাকশক্তি হারায় এবং মুখমন্ডল যদি এ অঙ্গবিকৃতির আওতায় পড়ে তবে আমাদের মুখ দিয়ে লালা ঝরতে থাকে। আর মনোপ্লেজিয়াটা হলো শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ প্যারালাইজড হওয়া। যেমন হাত, পা বা শরীরের যেকোনো একটা অঙ্গ।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার

সন্ন্যাসরোগের কারণে সৃষ্ট রোগের মধ্যে অঙ্গবিকৃতিই প্রধান। যা ইতিমধ্যে জেনেছি। সারাজীবন আপনার হাঁটা, চলা, কথা বলা ইত্যাদি স্বাভাবিক কাজ করা থেকে দূরে সরিয়ে দিবে এ নীরব ঘাতক। তাই এর প্রতিরোধ ব্যাবস্থাটা জানা আমাদের অতীব জরুরী।

সন্ন্যাসরোগ প্রতিরোধ করার প্রধান দিকটা হলো আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখা। যদি দেখেন আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই তখন বিশ্রাম নেয়াটা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে বিশ্রামটা হলো এ রোগের জন্য সবচে বড় ওষুধ। কারণ একমাত্র বিশ্রামের মাধ্যমে আমাদের রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে ভালো হবে। তাছাড়া আপনি শারিরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে এর প্রতিরোধ করতে পারেন। তবে ব্যায়ামটা যেন বেশি পরিশ্রমের না হয়। কারণ এক্ষেত্রে রক্তচাপ বেড়ে সেরেব্রাল হ্যামোরেজ হতে পারে।

কোনো আঘাত ছাড়া যদি বেশ কিছুদিন ধরে সন্ন্যাসরোগের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় তবে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। যেমন অনেক দিন ধরে মাথা ব্যাথা করা, চোখ দিয়ে পানি পড়া, চোখ ব্যাথা করা, চোখ লাল হওয়া ইত্যাদি।

মাছ, মাংস, শাক-সবজি ইত্যাদি খাবার পরিমাণমতো খেতে হবে। মাদক দ্রব্য ব্যবহার করলে এ রোগ আপনার বন্ধুর মতো আপনাকে জাপটে ধরবে। তাই যতটা সম্ভব মাদক দ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। অনেক সময় আমরা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া মেডিসিন ব্যবহার করে থাকি। যা সবচেয়ে বেশি মারাত্মক। কারণ বিনা কারণে মেডিসিন আপনার দেহের জন্য ড্রাগ হিসেবে ব্যবহার হবে। যা আপনার জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিবে।

এ পর্বে এটুকু লিখলাম। সেরেব্রাল স্ট্রোকের কারণে আরো বেশ কিছু রোগ সৃষ্টি হয়। যা পরবর্তীতে লিখার চেষ্টা করব।

তথ্যসূত্র

১. Health & Medicinal journal, The Independent. (6 June, 2016)

২. https://www.wikipedia.org/apoplexy

৩. https://www.wikipedia.org/stroke

৪. https://www.wikipedia.org/paralysis

অণুজীব পরিচিতিঃ ই-কোলাই

ইশেরেকিয়া কোলাই বা ই. কোলাই হলো অণুজীব জগতের তারকা-নায়ক। যারা খুব অল্প কয়েকটি অণুজীবের সাথে পরিচিত, তাদের অল্প কয়েকটির মাঝে অবশ্যই ই. কোলাই অণুজীবটি থাকে। ১৮৮৫ সালে জার্মান-অস্ট্রিয়ান শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ Theodor Escherich মানুষের মলে ই. কোলাই আবিষ্কার করেন। তিনি খেয়াল করে দেখেন অনেক শিশু ডায়রিয়ায় মারা যাচ্ছে। জার্ম থিওরি তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এশেরিখ ধারণা করলেন জার্ম থিওরির মাধ্যমেই এই রোগের কারণ বের করা যাবে। তিনি শিশুদের মল সংগ্রহ করে তা কালচার করলেন এবং তাতে রড আকারের এক ধরনের অণুজীব দেখলেন। তিনি তার নাম দিলেন Bacillus communis coli। এশেরিখের মৃত্যুর পর তার সম্মানে অণুজীবটির নাম রাখা হলো Escherichia Coli

চিত্রঃ থিওডর এশেরিখ।

ই. কোলাই রড আকারের একটি গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া। এরা fecultative anaerobic ধরনের। এ কথাটির মানে হলো, এরা অক্সিজেনের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি উভয় অবস্থাতেই টিকে থাকতে পারে। এরা উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণীর অন্ত্রে বাস করে। মাত্র বিশ মিনিটে ই. কোলাই বংশবৃদ্ধি করতে পারে। ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হলো এদের জন্যে অনুকূল তাপমাত্রা। ই. কোলাই মূলত কোলিফর্ম (Coliform) গোত্রের অণুজীব। কোলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া তারাই যারা ল্যাকটোজকে ফার্মেন্ট করতে পারে।

চিত্রঃ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে ই. কোলাই।

আমাদের শরীরে কিছু অণুজীব এমনিতেই থাকে। এরা আমদের কোনো ক্ষতি করে না। উল্টো আমাদের শরীরবৃত্তীয় নানা কাজে সাহায্য করে। এদেরকে বলা হয় Normal Microbiota। ই. কোলাই নরমাল মাইক্রোবায়োটার অংশ। জন্মগ্রহণের সময় মানব শিশুর দেহে কোনো মাইক্রোবায়োটা

থাকে না। মায়ের দুধ থেকে, নার্স কিংবা আশেপাশের অন্যান্য মানুষ থেকে প্রায় হাজার ধরনের অণুজীব শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। তাদের মাঝে একটি হলো ই. কোলাই।

জেনেটিক্স এবং অণুজীববিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে ই. কোলাইকে প্রায়ই ব্যবহার করা হয়। Cohen এবং Herbert Boyer ই. কোলাইকে ব্যবহার করে রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরি করেছিন। এভাবে ই. কোলাইকে জেনেটিক দিক থেকে পরিবর্তন করে ভ্যাক্সিন তৈরি সহ নানা ধরনের এনজাইম তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এই প্রক্রিয়ার একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার হলো ই. কোলাই ব্যবহার করে ইনসুলিন তৈরি, যা লাখ লাখ ডায়েবেটিস রোগীর জীবনকে সহজ করেছে।

চিত্রঃ বায়ো আর্ট পদ্ধতিতে ই. কোলাই দিয়ে আঁকা আলবার্ট আইনস্টাইন।

নানাবিধ সুবিধা থাকার কারণে ই. কোলাইকে মডেল অর্গানিজম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। Joshoua Lederberg এবং Edward Tatum ১৯৪৬ সালে ই. কোলাই ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়ার কনজুগেশন আবিষ্কার করেন। T2 ফাজ ভাইরাসের জেনেটিক্স বোঝার জন্যেও ই. কোলাই বিশাল বড় ভূমিকা রেখেছে। Carl Zimmer এক ইন্টারভিউতে বলছিলেন, তিনি জানতে চাচ্ছিলেন জীবন কী? জীবনের প্রকৃতি কী? তো তিনি একটা বই লিখতে চাইলেন এ বিষয়ে। তিনি দেখলেন এ বিষয় নিয়ে বই লিখতে গেলে হাজার হাজার পৃষ্ঠা লেগে যাবে। তো এটাকে ফোকাস করার জন্যে লিখলেন “Microcosm: E. Coli and the New Science of Life” যেখানে তিনি একটি বিষয় নিয়েই লিখেছেন কিন্তু তা শুধুমাত্র ই. কোলাই এর উপরে। একটি মাত্র অণুজীব নিয়ে আস্ত একটি বই, অবিশ্বাস্য!

প্রতিটি ই. কোলাইতে প্রায় ৪ হাজারের মতো জিন আছে। যেখানে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ায় জিনের সংখ্যা মাত্র কয়েকশ’। ১৯৯৭ সালে সর্বপ্রথম ই. কোলাইয়ের ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করা হয়। দেখা গেছে ই. কোলাইয়ের বিভিন্ন স্ট্রেইনের মধ্যে ২০% জিনের মিল আছে। বাকি ৮০% মিল নেই। এ ৮০% মিউটেশন ও অন্য প্রজাতি থেকে জিন ট্রান্সফারের মাধ্যমে হয়েছে। ই. কোলাইয়ের প্রতিটি জিনকে চারটি অক্ষর দ্বারা প্রকাশ করা হয়। রিকম্বিনেশনের জন্যে দায়ী জিনকে recA দ্বারা প্রকাশ করা হয়। একইভাবে রয়েছে recB, recC, recD ইত্যাদি। আর প্রোটিনগুলোকে লেখা হয় বড় হাতের অক্ষর দিয়ে যেমনঃ RecA, RecB, RecC ইত্যাদি। জিন সিকোয়েন্সিং করার পর জিনগুলোকে সংখ্যা দ্বারা লেখা হয়। যেমনঃ b2819 দিয়ে recD জিনকে বোঝায়।

ই. কোলাই আমাদের জন্যে ভিটামিনকে তৈরি করে। ই. কোলাই অন্ত্রের অক্সিজেন ব্যবহার করে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে ফেলে যা অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার জন্যে সহায়ক। ওসব ব্যাকটেরিয়া তখন নানা ধরনের খাবার ভেঙ্গে দিয়ে হজমে সাহায্য করে। ই. কোলাই এর সব স্ট্রেইন রোগ সৃষ্টি করে না। কয়েক ধরনের ই. কোলাই রোগ সৃষ্টি করে। প্রত্যেকটা ধরণকে এক একটা ভিরোটাইপ (Virotype) বলে। নিচে ভিরোটাইপগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে বলার চেষ্টা করা হলো।

১. ETEC অর্থাৎ Enterotoxigenic E coli। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এরা টক্সিন তৈরি অর্থাৎ বিষক্রিয়ার মাধ্যমে রোগ সৃষ্টি করে। এরা শিশুদের ডায়েরিয়া সৃষ্টি করে। সাথে তৈরি করে ট্র্যাভেলার্স ডায়েরিয়া। ২. এরপর আসে EPEC। EPEC মানে হলো Enteropathogenic E. Coli। এরা কোনো বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে না। এদের রোগ সৃষ্টির প্রক্রিয়া অনেকটা Shigella অণুজীবের মতো। এরা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডায়েরিয়া সৃষ্টি করে। ৩. EHEC বা Enterohemorrhagic E. coli। এদের কারণে রক্ত ডায়েরিয়া হয়। ৪. EIEC বা Enteroinvasive E. coli এবং EAEC বা Enteroaggregative E. coli, এ দুই ভিরোটাইপের জন্যেও ডায়েরিয়া হয়।

ই. কোলাই দ্বারা আক্রান্ত হলে পেট ব্যথা, পাতলা পায়খানা, গ্যাস, ক্ষুধামন্দা, বমি ভাব, জ্বর এই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়। রোগ আরো খারাপ পর্যায়ে গেলে প্রস্রাবে রক্ত যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। ই. কোলাই ঘটিত ডায়েরিয়ার জন্যে মূলত সালফোনামাইডস, এম্পিসিলিন, সেফালোসপরিন, ফ্লোরোকুইনোলোন্স, এমিনোগ্লাইকো-সাইড ব্যবহার করা হয়। তার সাথে রোগীকে যথেষ্ট পরিমাণে পানি, স্যালাইন খেতে হবে ও প্রচুর বিশ্রাম নিতে হবে। উপসর্গ যদি খারাপের দিকে যায় তাহলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ারও দরকার হতে পারে।

এ ধরনের রোগ থেকে বাঁচার জন্যে খাবার ভালো করে ধুয়ে খেতে হবে ও বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। হাসপাতালে যাতে ই. কোলাই এর সংক্রমণ না হয় সে জন্যে সেখানে সবসময় জীবাণুমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।

আগামী লেখায় টাইফয়েড রোগের জীবাণু Salmonella Typhi নিয়ে আলোচনা থাকবে। সে পর্যন্ত সবাই ই. কোলাই এর সংক্রমণ থেকে বেঁচে থাকুন।

তথ্যসূত্র

 

নিমগ্নতার সুখ

আমরা জীবনে সুখের হরিণের পেছনে ছুটে বেড়াই। গড়পড়তা সাধারণ মানুষ তো বটেই, কবি-লেখক-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে ধর্মবেত্তা-দার্শনিক সকলেই সুখ পাখিটা ধরতে চায়। তবে যারা সুখ জিনিসটা কী তা বোঝার চেষ্টা করেন তাদের অনুসন্ধানটা ভিন্ন। তারা সুখকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন। এ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরাও পিছিয়ে নেই। বিজ্ঞান হয়তো বলবে এন্ডরফিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামক হরমোন নিঃসৃত হলে মানুষ সুখানুভূতি পায়, তবে তারপরও কাজের সাথে সুখানুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এক জন মনোবিজ্ঞানীর গবেষণা থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাক।

কখনো কি এমন কোনো কাজে ডুবে গিয়েছিলেন যে নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন? বেলা গড়িয়ে কখন সন্ধ্যা হয়েছে টের পাননি? কিংবা রাতে খাবার পর কাজে বসে হঠাৎ টের পেয়েছেন যে ভোর হয়ে গেছে? কাজে এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলেন যে, সময় পার হবার অনুভূতি লোপ পেয়েছিল, ক্ষুধা অনুভব করেননি? এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জীবনেই একবার না একবার হয়েছে। বিশেষ করে যখন হাতের কাজটি চ্যালেঞ্জিং আর আগ্রহোদ্দীপক কিছু হয়ে থাকে।

টানটান উত্তেজনাপূর্ণ কোনো খেলা দেখার সময়েও এরকম একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আমাদের। যারা কম্পিউটারে গেম খেলে, অনেক সময় মজার অথচ জটিল কোনো গেম খেলার মধ্যে ডুবে গেলেও এ অবস্থা তৈরি হয়। অনেক প্রোগ্রামার রাতে কাজ করতে পছন্দ করেন। কারণ রাতে সাধারণত অন্য কেউ কথা বলে না, ডাক দেয় না, বিরক্ত করে না। তখন তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো সমস্যা সমাধানে কাটিয়ে দিতে পারে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ফ্লো’ (Flow)। বাংলায় একে আমরা নিবিষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা নিমগ্নতা বলতে পারি।

এখানে নিমগ্ন দশার সাথে সুখের সম্পর্কটা কী? এ প্রসঙ্গে ফ্লো তত্ত্বের জনক চেক মনোবিজ্ঞানী মিহাই চিকসেন্টমিহাইয়ের গবেষণা সম্পর্কে আলোকপাত করি।[১] ১৯৫৬ সালে এক জরিপে প্রায় ৩০ শতাংশ আমেরিকান উল্লেখ করেন যে, তারা জীবন নিয়ে অত্যন্ত সুখী (গ্রাফ দ্রষ্টব্য)। তখন থেকে কয়েক বছর পরপর নিয়মিত এ জরিপটি করা হয়েছে। দেখা গেছে ১৯৫৬ সালের পরে আমেরিকানদের গড়পড়তা আয় দুই থেকে তিনগুণ বাড়লেও ‘সুখী’ আমেরিকানদের অনুপাত বাড়েনি। তার মানে, দারিদ্র্যসীমার নীচে আয় থাকলে তা অবশ্যই দুঃখের কারণ হবে। কিন্তু আয় অনেক বাড়লে সুখানুভূতি বাড়বে এমন কোনো কথা নেই। অর্থাৎ অধিক উপার্জন মানুষকে অধিক সুখী করে তুলতে পারে না।

চিত্রঃ আমেরিকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সুখের সম্পর্ক।

২০০৫ সালে আমেরিকানদের গড় ক্রয় ক্ষমতা ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। সে তুলনায় সুখী মানুষের অনুপাতের কোনো পরিবর্তন হয়নি।[২] ছোট কালো বিন্দু দিয়ে উপার্জনের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে। বড় চতুষ্কোণ বিন্দু দিয়ে সুখী মানুষের অনুপাত বোঝানো হচ্ছে।

এই প্রেক্ষিতে মিহাই সুখ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। দৈনন্দিন জীবনে আমরা কি আসলেই সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করি? এটিই ছিল তার অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন। তিনি প্রথমে সৃজনশীল ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিল শিল্পী, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশার মানুষজন। তাদের সাক্ষাৎকারে যখন তারা নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে অন্যরকম ভাবাবেশের কথা উল্লেখ করেন তখন বার বার একটি অনুভূতির কথা উঠে আসে। সাক্ষাৎকারে অংশ নেয়া অধিকাংশ ব্যক্তিই তাদের সৃজনশীল কাজের মধ্যে একটি উচ্ছসিত আনন্দের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। সৃজনশীল কাজটি সহজে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে এরকম অবস্থায় এ আনন্দময় দশাটি তৈরি হবার কথা উঠে আসে তাদের সাক্ষাৎকারে।

সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি মিহাই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজের মধ্যে থাকা

অবস্থায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার অনুভূতি কেমন সেই তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করেন। তার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের পেজার নামক একটি যন্ত্র সরবরাহ করা হয়। পেজার মূলত মোবাইল ফোনের পূর্বপুরুষ। অংশগ্রহণকারীদের নিত্যদিনের কাজের মাঝে বিভিন্ন সময়ে এ পেজারটি বেজে উঠতো। অংশগ্রহণকারী ঐ মুহূর্তে কী কাজ করছেন, কাজ করতে কেমন লাগছে, কাজটি কোথায় করা হচ্ছে, কাজ করার সময় কী নিয়ে চিন্তা করছেন এসব তথ্য তিনি লিপিবদ্ধ করেন।

এ ছাড়াও আরো দুটি পরিমাপ করা হয়। প্রথমত, অংশগ্রহণকারী যে কাজটি করছেন তা কতটুকু কঠিন। দ্বিতীয়ত, কাজটি সম্পন্ন করার জন্য অংশগ্রহণকারী কতটুকু দক্ষ। এ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন সময়ে করা বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হয়। এভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে মিহাই

একটি ডায়াগ্রাম তৈরি করেন। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর কাছে দিনভর কাজ কতটুকু সহজ বা কঠিন মনে হয় এবং বিভিন্ন কাজের জন্য তার কতটুকু দক্ষতা আছে, এ দুটি পরিমাপের মাঝামাঝি একটি বিন্দু ঠিক করা যায়। এ কেন্দ্রবিন্দু থেকে বোঝা সম্ভব কখন একজন অংশগ্রহণকারী ‘মগ্নতা‘ দশায় প্রবেশ করবেন।

চিত্রঃ কাজ কতটা চ্যালেঞ্জিং ও মানুষের দক্ষতা কতটুকু এবং এর সাথে সম্পর্কিত অনুভূতির চার্ট।

যখন আমাদের হাতের কাজটি খুব কঠিন, কিন্তু সে কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকে তখন আমরা উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা অনুভব করি। আর যখন কাজটা খুব সহজ হয় আর কাজের জন্য দরকারী দক্ষতা পর্যাপ্ত থাকে, তখন আমরা বেশ আরামে থাকি। তবে যখন কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয় আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দরকারী দক্ষতাও উপস্থিত থাকে, তখন আমরা মগ্নদশায় প্রবেশ করি। এই নিমগ্ন অবস্থায় কাজের চ্যালেঞ্জকে টক্কর দেবার সাথে সাথে একধরনের ভাবাবেশ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়।

তখন ক্ষুধা, সময় ইত্যাদির অনুভূতি থাকে না, আমরা ডুবে যাই কাজের ধারায়, লাভ করি চ্যালেঞ্জ খণ্ডনের তৃপ্তিময় আনন্দ। যখন হাতের কাজটি খুবই সোজা, আর সেটি করতেও তেমন কোনো দক্ষতা লাগে না, তখন মানুষ অনীহা/ঔদাসীন্য/বিরক্তি অনুভব করে। দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার সময় মানুষ এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়। (ব্যক্তিগতভাবে আমি ফেসবুকে ফিড ঘাঁটার সময়ে এরকম বোধ করি।)

‘নিমগ্ন’ দশার মূল বৈশিষ্ট্য হলো- আমরা যে কাজটি করছি তাতে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে নিবদ্ধ থাকে ঐ কাজে। এছাড়া এ অবস্থার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।[৩] যেমনঃ

১. নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে তৃপ্তিময় ভাবাবেশের অন্যরকম অনুভূতি পাওয়া যায়।

২. মনের ভেতরে স্বচ্ছতার অনুভূতি থাকে। আপনি জানেন কী করা দরকার। আর আপনি কাজটা ঠিক মতো করছেন কি না, তা নিজে থেকেই বুঝতে পারেন।

৩. আপনি জানেন কাজটি শেষ করা সম্ভব। অর্থাৎ কর্মসম্পাদনের দরকারী দক্ষতা আপনার আছে।

৪. নিজের সম্পর্কে কোনো খেয়াল থাকে না। আপনার সকল উদ্বেগ ও ভাবনা দূরে সরে যায়।

৫. আপনি সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আর কেবল বর্তমানে হাতের কাজটিতে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেন।

৬. কাজের মধ্যে একটা প্রণোদনা লুকানো থাকে। নিমগ্ন অবস্থাটি যে কাজের মাধ্যমেই তৈরি হোক না কেন, কাজ করাটাই তখন পুরষ্কার হিসেবে আবির্ভূত হয়।

মানুষের মনোনিবেশ করার ক্ষমতা সীমিত। মিহাই উল্লেখ করেন, মানব মস্তিষ্ক সেকেন্ডে ১১০ বিট তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। এই পরিমাণটি বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু নিত্যদিনের ছোট ছোট কাজে অনেক তথ্য প্রয়োজন হয়। যেমন কথার অর্থ উদ্ধার করতে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ বিট তথ্য লেগে যায়। এ কারণে কারো সাথে কথা বলার সময় অন্য কোনো বিষয়ে খেয়াল রাখা যায় না। ক্ষুধাবোধ, সময়জ্ঞান এগুলোও তথ্য যা বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও স্নায়ুপথের মাধ্যমে মস্তিষ্কে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এগুলোকে প্রক্রিয়াজাত না করলে

এ সম্পর্কে আমরা সচেতন হই না। নিমগ্ন অবস্থায় আমাদের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা পুরোটাই ব্যবহৃত হয় হাতের কাজটি সম্পন্ন করার জন্য। তাই নাওয়া-খাওয়া ও সময়ের কথা আমাদের খেয়াল থাকে না। এরকম অবস্থায় দেহের অনুভূতি বোঝার জন্য কোনো মনোযোগ অবশিষ্ট থাকে না।

নিমগ্নতা একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো এ দশায় ইচ্ছে হলেই প্রবেশ করা যায় না। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছতে হলে কাজের দক্ষতা বাড়ানো আবশ্যক। কিংবা এমন কোনো দুরূহ কাজ হাতে নেয়া যায়, যা চ্যলেঞ্জিং হলেও সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা আমাদের রয়েছে। অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির পেছনে না ছুটে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা জীবনে আনন্দময় সুখ লাভের নিশ্চিত উপায় হতে পারে।

তথ্যসূত্র

[১] Flow, the secret to happiness. TED-talk by Mihaly Csikszentmihalyi.http://ted.com

[২] Happiness data from National Opinion Research Center General Social Survey; income data from Historical Statistics of the United States and Economic Indicators.

[৩] What Is Flow? Understanding the Psychology of Flow.https://www.verywell.com

নিমগ্নতার সুখ

আমরা জীবনে সুখের হরিণের পেছনে ছুটে বেড়াই। গড়পড়তা সাধারণ মানুষ তো বটেই, কবি-লেখক-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে ধর্মবেত্তা-দার্শনিক সকলেই সুখ পাখিটা ধরতে চায়। তবে যারা সুখ জিনিসটা কী তা বোঝার চেষ্টা করেন তাদের অনুসন্ধানটা ভিন্ন। তারা সুখকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন। এ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরাও পিছিয়ে নেই। বিজ্ঞান হয়তো বলবে এন্ডরফিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামক হরমোন নিঃসৃত হলে মানুষ সুখানুভূতি পায়, তবে তারপরও কাজের সাথে সুখানুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এক জন মনোবিজ্ঞানীর গবেষণা থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাক।

কখনো কি এমন কোনো কাজে ডুবে গিয়েছিলেন যে নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন? বেলা গড়িয়ে কখন সন্ধ্যা হয়েছে টের পাননি? কিংবা রাতে খাবার পর কাজে বসে হঠাৎ টের পেয়েছেন যে ভোর হয়ে গেছে? কাজে এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলেন যে, সময় পার হবার অনুভূতি লোপ পেয়েছিল, ক্ষুধা অনুভব করেননি? এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জীবনেই একবার না একবার হয়েছে। বিশেষ করে যখন হাতের কাজটি চ্যালেঞ্জিং আর আগ্রহোদ্দীপক কিছু হয়ে থাকে।

টানটান উত্তেজনাপূর্ণ কোনো খেলা দেখার সময়েও এরকম একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আমাদের। যারা কম্পিউটারে গেম খেলে, অনেক সময় মজার অথচ জটিল কোনো গেম খেলার মধ্যে ডুবে গেলেও এ অবস্থা তৈরি হয়। অনেক প্রোগ্রামার রাতে কাজ করতে পছন্দ করেন। কারণ রাতে সাধারণত অন্য কেউ কথা বলে না, ডাক দেয় না, বিরক্ত করে না। তখন তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো সমস্যা সমাধানে কাটিয়ে দিতে পারে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ফ্লো’ (Flow)। বাংলায় একে আমরা নিবিষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা নিমগ্নতা বলতে পারি।

এখানে নিমগ্ন দশার সাথে সুখের সম্পর্কটা কী? এ প্রসঙ্গে ফ্লো তত্ত্বের জনক চেক মনোবিজ্ঞানী মিহাই চিকসেন্টমিহাইয়ের গবেষণা সম্পর্কে আলোকপাত করি।[১] ১৯৫৬ সালে এক জরিপে প্রায় ৩০ শতাংশ আমেরিকান উল্লেখ করেন যে, তারা জীবন নিয়ে অত্যন্ত সুখী (গ্রাফ দ্রষ্টব্য)। তখন থেকে কয়েক বছর পরপর নিয়মিত এ জরিপটি করা হয়েছে। দেখা গেছে ১৯৫৬ সালের পরে আমেরিকানদের গড়পড়তা আয় দুই থেকে তিনগুণ বাড়লেও ‘সুখী’ আমেরিকানদের অনুপাত বাড়েনি। তার মানে, দারিদ্র্যসীমার নীচে আয় থাকলে তা অবশ্যই দুঃখের কারণ হবে। কিন্তু আয় অনেক বাড়লে সুখানুভূতি বাড়বে এমন কোনো কথা নেই। অর্থাৎ অধিক উপার্জন মানুষকে অধিক সুখী করে তুলতে পারে না।

চিত্রঃ আমেরিকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সুখের সম্পর্ক।

২০০৫ সালে আমেরিকানদের গড় ক্রয় ক্ষমতা ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। সে তুলনায় সুখী মানুষের অনুপাতের কোনো পরিবর্তন হয়নি।[২] ছোট কালো বিন্দু দিয়ে উপার্জনের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে। বড় চতুষ্কোণ বিন্দু দিয়ে সুখী মানুষের অনুপাত বোঝানো হচ্ছে।

এই প্রেক্ষিতে মিহাই সুখ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। দৈনন্দিন জীবনে আমরা কি আসলেই সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করি? এটিই ছিল তার অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন। তিনি প্রথমে সৃজনশীল ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিল শিল্পী, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশার মানুষজন। তাদের সাক্ষাৎকারে যখন তারা নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে অন্যরকম ভাবাবেশের কথা উল্লেখ করেন তখন বার বার একটি অনুভূতির কথা উঠে আসে। সাক্ষাৎকারে অংশ নেয়া অধিকাংশ ব্যক্তিই তাদের সৃজনশীল কাজের মধ্যে একটি উচ্ছসিত আনন্দের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। সৃজনশীল কাজটি সহজে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে এরকম অবস্থায় এ আনন্দময় দশাটি তৈরি হবার কথা উঠে আসে তাদের সাক্ষাৎকারে।

সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি মিহাই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজের মধ্যে থাকা

অবস্থায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার অনুভূতি কেমন সেই তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করেন। তার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের পেজার নামক একটি যন্ত্র সরবরাহ করা হয়। পেজার মূলত মোবাইল ফোনের পূর্বপুরুষ। অংশগ্রহণকারীদের নিত্যদিনের কাজের মাঝে বিভিন্ন সময়ে এ পেজারটি বেজে উঠতো। অংশগ্রহণকারী ঐ মুহূর্তে কী কাজ করছেন, কাজ করতে কেমন লাগছে, কাজটি কোথায় করা হচ্ছে, কাজ করার সময় কী নিয়ে চিন্তা করছেন এসব তথ্য তিনি লিপিবদ্ধ করেন।

এ ছাড়াও আরো দুটি পরিমাপ করা হয়। প্রথমত, অংশগ্রহণকারী যে কাজটি করছেন তা কতটুকু কঠিন। দ্বিতীয়ত, কাজটি সম্পন্ন করার জন্য অংশগ্রহণকারী কতটুকু দক্ষ। এ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন সময়ে করা বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হয়। এভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে মিহাই

একটি ডায়াগ্রাম তৈরি করেন। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর কাছে দিনভর কাজ কতটুকু সহজ বা কঠিন মনে হয় এবং বিভিন্ন কাজের জন্য তার কতটুকু দক্ষতা আছে, এ দুটি পরিমাপের মাঝামাঝি একটি বিন্দু ঠিক করা যায়। এ কেন্দ্রবিন্দু থেকে বোঝা সম্ভব কখন একজন অংশগ্রহণকারী ‘মগ্নতা‘ দশায় প্রবেশ করবেন।

চিত্রঃ কাজ কতটা চ্যালেঞ্জিং ও মানুষের দক্ষতা কতটুকু এবং এর সাথে সম্পর্কিত অনুভূতির চার্ট।

যখন আমাদের হাতের কাজটি খুব কঠিন, কিন্তু সে কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকে তখন আমরা উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা অনুভব করি। আর যখন কাজটা খুব সহজ হয় আর কাজের জন্য দরকারী দক্ষতা পর্যাপ্ত থাকে, তখন আমরা বেশ আরামে থাকি। তবে যখন কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয় আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দরকারী দক্ষতাও উপস্থিত থাকে, তখন আমরা মগ্নদশায় প্রবেশ করি। এই নিমগ্ন অবস্থায় কাজের চ্যালেঞ্জকে টক্কর দেবার সাথে সাথে একধরনের ভাবাবেশ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়।

তখন ক্ষুধা, সময় ইত্যাদির অনুভূতি থাকে না, আমরা ডুবে যাই কাজের ধারায়, লাভ করি চ্যালেঞ্জ খণ্ডনের তৃপ্তিময় আনন্দ। যখন হাতের কাজটি খুবই সোজা, আর সেটি করতেও তেমন কোনো দক্ষতা লাগে না, তখন মানুষ অনীহা/ঔদাসীন্য/বিরক্তি অনুভব করে। দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার সময় মানুষ এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়। (ব্যক্তিগতভাবে আমি ফেসবুকে ফিড ঘাঁটার সময়ে এরকম বোধ করি।)

‘নিমগ্ন’ দশার মূল বৈশিষ্ট্য হলো- আমরা যে কাজটি করছি তাতে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে নিবদ্ধ থাকে ঐ কাজে। এছাড়া এ অবস্থার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।[৩] যেমনঃ

১. নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে তৃপ্তিময় ভাবাবেশের অন্যরকম অনুভূতি পাওয়া যায়।

২. মনের ভেতরে স্বচ্ছতার অনুভূতি থাকে। আপনি জানেন কী করা দরকার। আর আপনি কাজটা ঠিক মতো করছেন কি না, তা নিজে থেকেই বুঝতে পারেন।

৩. আপনি জানেন কাজটি শেষ করা সম্ভব। অর্থাৎ কর্মসম্পাদনের দরকারী দক্ষতা আপনার আছে।

৪. নিজের সম্পর্কে কোনো খেয়াল থাকে না। আপনার সকল উদ্বেগ ও ভাবনা দূরে সরে যায়।

৫. আপনি সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আর কেবল বর্তমানে হাতের কাজটিতে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেন।

৬. কাজের মধ্যে একটা প্রণোদনা লুকানো থাকে। নিমগ্ন অবস্থাটি যে কাজের মাধ্যমেই তৈরি হোক না কেন, কাজ করাটাই তখন পুরষ্কার হিসেবে আবির্ভূত হয়।

মানুষের মনোনিবেশ করার ক্ষমতা সীমিত। মিহাই উল্লেখ করেন, মানব মস্তিষ্ক সেকেন্ডে ১১০ বিট তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। এই পরিমাণটি বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু নিত্যদিনের ছোট ছোট কাজে অনেক তথ্য প্রয়োজন হয়। যেমন কথার অর্থ উদ্ধার করতে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ বিট তথ্য লেগে যায়। এ কারণে কারো সাথে কথা বলার সময় অন্য কোনো বিষয়ে খেয়াল রাখা যায় না। ক্ষুধাবোধ, সময়জ্ঞান এগুলোও তথ্য যা বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও স্নায়ুপথের মাধ্যমে মস্তিষ্কে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এগুলোকে প্রক্রিয়াজাত না করলে

এ সম্পর্কে আমরা সচেতন হই না। নিমগ্ন অবস্থায় আমাদের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা পুরোটাই ব্যবহৃত হয় হাতের কাজটি সম্পন্ন করার জন্য। তাই নাওয়া-খাওয়া ও সময়ের কথা আমাদের খেয়াল থাকে না। এরকম অবস্থায় দেহের অনুভূতি বোঝার জন্য কোনো মনোযোগ অবশিষ্ট থাকে না।

নিমগ্নতা একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো এ দশায় ইচ্ছে হলেই প্রবেশ করা যায় না। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছতে হলে কাজের দক্ষতা বাড়ানো আবশ্যক। কিংবা এমন কোনো দুরূহ কাজ হাতে নেয়া যায়, যা চ্যলেঞ্জিং হলেও সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা আমাদের রয়েছে। অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির পেছনে না ছুটে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা জীবনে আনন্দময় সুখ লাভের নিশ্চিত উপায় হতে পারে।

তথ্যসূত্র

[১] Flow, the secret to happiness. TED-talk by Mihaly Csikszentmihalyi.http://ted.com

[২] Happiness data from National Opinion Research Center General Social Survey; income data from Historical Statistics of the United States and Economic Indicators.

[৩] What Is Flow? Understanding the Psychology of Flow.https://www.verywell.com

নিমগ্নতার সুখ

আমরা জীবনে সুখের হরিণের পেছনে ছুটে বেড়াই। গড়পড়তা সাধারণ মানুষ তো বটেই, কবি-লেখক-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে ধর্মবেত্তা-দার্শনিক সকলেই সুখ পাখিটা ধরতে চায়। তবে যারা সুখ জিনিসটা কী তা বোঝার চেষ্টা করেন তাদের অনুসন্ধানটা ভিন্ন। তারা সুখকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন। এ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরাও পিছিয়ে নেই। বিজ্ঞান হয়তো বলবে এন্ডরফিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামক হরমোন নিঃসৃত হলে মানুষ সুখানুভূতি পায়, তবে তারপরও কাজের সাথে সুখানুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এক জন মনোবিজ্ঞানীর গবেষণা থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাক।

কখনো কি এমন কোনো কাজে ডুবে গিয়েছিলেন যে নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন? বেলা গড়িয়ে কখন সন্ধ্যা হয়েছে টের পাননি? কিংবা রাতে খাবার পর কাজে বসে হঠাৎ টের পেয়েছেন যে ভোর হয়ে গেছে? কাজে এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলেন যে, সময় পার হবার অনুভূতি লোপ পেয়েছিল, ক্ষুধা অনুভব করেননি? এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জীবনেই একবার না একবার হয়েছে। বিশেষ করে যখন হাতের কাজটি চ্যালেঞ্জিং আর আগ্রহোদ্দীপক কিছু হয়ে থাকে।

টানটান উত্তেজনাপূর্ণ কোনো খেলা দেখার সময়েও এরকম একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আমাদের। যারা কম্পিউটারে গেম খেলে, অনেক সময় মজার অথচ জটিল কোনো গেম খেলার মধ্যে ডুবে গেলেও এ অবস্থা তৈরি হয়। অনেক প্রোগ্রামার রাতে কাজ করতে পছন্দ করেন। কারণ রাতে সাধারণত অন্য কেউ কথা বলে না, ডাক দেয় না, বিরক্ত করে না। তখন তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো সমস্যা সমাধানে কাটিয়ে দিতে পারে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ফ্লো’ (Flow)। বাংলায় একে আমরা নিবিষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা নিমগ্নতা বলতে পারি।

এখানে নিমগ্ন দশার সাথে সুখের সম্পর্কটা কী? এ প্রসঙ্গে ফ্লো তত্ত্বের জনক চেক মনোবিজ্ঞানী মিহাই চিকসেন্টমিহাইয়ের গবেষণা সম্পর্কে আলোকপাত করি।[১] ১৯৫৬ সালে এক জরিপে প্রায় ৩০ শতাংশ আমেরিকান উল্লেখ করেন যে, তারা জীবন নিয়ে অত্যন্ত সুখী (গ্রাফ দ্রষ্টব্য)। তখন থেকে কয়েক বছর পরপর নিয়মিত এ জরিপটি করা হয়েছে। দেখা গেছে ১৯৫৬ সালের পরে আমেরিকানদের গড়পড়তা আয় দুই থেকে তিনগুণ বাড়লেও ‘সুখী’ আমেরিকানদের অনুপাত বাড়েনি। তার মানে, দারিদ্র্যসীমার নীচে আয় থাকলে তা অবশ্যই দুঃখের কারণ হবে। কিন্তু আয় অনেক বাড়লে সুখানুভূতি বাড়বে এমন কোনো কথা নেই। অর্থাৎ অধিক উপার্জন মানুষকে অধিক সুখী করে তুলতে পারে না।

চিত্রঃ আমেরিকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সুখের সম্পর্ক।

২০০৫ সালে আমেরিকানদের গড় ক্রয় ক্ষমতা ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। সে তুলনায় সুখী মানুষের অনুপাতের কোনো পরিবর্তন হয়নি।[২] ছোট কালো বিন্দু দিয়ে উপার্জনের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে। বড় চতুষ্কোণ বিন্দু দিয়ে সুখী মানুষের অনুপাত বোঝানো হচ্ছে।

এই প্রেক্ষিতে মিহাই সুখ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। দৈনন্দিন জীবনে আমরা কি আসলেই সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করি? এটিই ছিল তার অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন। তিনি প্রথমে সৃজনশীল ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিল শিল্পী, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশার মানুষজন। তাদের সাক্ষাৎকারে যখন তারা নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে অন্যরকম ভাবাবেশের কথা উল্লেখ করেন তখন বার বার একটি অনুভূতির কথা উঠে আসে। সাক্ষাৎকারে অংশ নেয়া অধিকাংশ ব্যক্তিই তাদের সৃজনশীল কাজের মধ্যে একটি উচ্ছসিত আনন্দের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। সৃজনশীল কাজটি সহজে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে এরকম অবস্থায় এ আনন্দময় দশাটি তৈরি হবার কথা উঠে আসে তাদের সাক্ষাৎকারে।

সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি মিহাই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজের মধ্যে থাকা

অবস্থায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার অনুভূতি কেমন সেই তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করেন। তার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের পেজার নামক একটি যন্ত্র সরবরাহ করা হয়। পেজার মূলত মোবাইল ফোনের পূর্বপুরুষ। অংশগ্রহণকারীদের নিত্যদিনের কাজের মাঝে বিভিন্ন সময়ে এ পেজারটি বেজে উঠতো। অংশগ্রহণকারী ঐ মুহূর্তে কী কাজ করছেন, কাজ করতে কেমন লাগছে, কাজটি কোথায় করা হচ্ছে, কাজ করার সময় কী নিয়ে চিন্তা করছেন এসব তথ্য তিনি লিপিবদ্ধ করেন।

এ ছাড়াও আরো দুটি পরিমাপ করা হয়। প্রথমত, অংশগ্রহণকারী যে কাজটি করছেন তা কতটুকু কঠিন। দ্বিতীয়ত, কাজটি সম্পন্ন করার জন্য অংশগ্রহণকারী কতটুকু দক্ষ। এ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন সময়ে করা বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হয়। এভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে মিহাই

একটি ডায়াগ্রাম তৈরি করেন। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর কাছে দিনভর কাজ কতটুকু সহজ বা কঠিন মনে হয় এবং বিভিন্ন কাজের জন্য তার কতটুকু দক্ষতা আছে, এ দুটি পরিমাপের মাঝামাঝি একটি বিন্দু ঠিক করা যায়। এ কেন্দ্রবিন্দু থেকে বোঝা সম্ভব কখন একজন অংশগ্রহণকারী ‘মগ্নতা‘ দশায় প্রবেশ করবেন।

চিত্রঃ কাজ কতটা চ্যালেঞ্জিং ও মানুষের দক্ষতা কতটুকু এবং এর সাথে সম্পর্কিত অনুভূতির চার্ট।

যখন আমাদের হাতের কাজটি খুব কঠিন, কিন্তু সে কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকে তখন আমরা উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা অনুভব করি। আর যখন কাজটা খুব সহজ হয় আর কাজের জন্য দরকারী দক্ষতা পর্যাপ্ত থাকে, তখন আমরা বেশ আরামে থাকি। তবে যখন কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয় আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দরকারী দক্ষতাও উপস্থিত থাকে, তখন আমরা মগ্নদশায় প্রবেশ করি। এই নিমগ্ন অবস্থায় কাজের চ্যালেঞ্জকে টক্কর দেবার সাথে সাথে একধরনের ভাবাবেশ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়।

তখন ক্ষুধা, সময় ইত্যাদির অনুভূতি থাকে না, আমরা ডুবে যাই কাজের ধারায়, লাভ করি চ্যালেঞ্জ খণ্ডনের তৃপ্তিময় আনন্দ। যখন হাতের কাজটি খুবই সোজা, আর সেটি করতেও তেমন কোনো দক্ষতা লাগে না, তখন মানুষ অনীহা/ঔদাসীন্য/বিরক্তি অনুভব করে। দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার সময় মানুষ এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়। (ব্যক্তিগতভাবে আমি ফেসবুকে ফিড ঘাঁটার সময়ে এরকম বোধ করি।)

‘নিমগ্ন’ দশার মূল বৈশিষ্ট্য হলো- আমরা যে কাজটি করছি তাতে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে নিবদ্ধ থাকে ঐ কাজে। এছাড়া এ অবস্থার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।[৩] যেমনঃ

১. নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে তৃপ্তিময় ভাবাবেশের অন্যরকম অনুভূতি পাওয়া যায়।

২. মনের ভেতরে স্বচ্ছতার অনুভূতি থাকে। আপনি জানেন কী করা দরকার। আর আপনি কাজটা ঠিক মতো করছেন কি না, তা নিজে থেকেই বুঝতে পারেন।

৩. আপনি জানেন কাজটি শেষ করা সম্ভব। অর্থাৎ কর্মসম্পাদনের দরকারী দক্ষতা আপনার আছে।

৪. নিজের সম্পর্কে কোনো খেয়াল থাকে না। আপনার সকল উদ্বেগ ও ভাবনা দূরে সরে যায়।

৫. আপনি সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আর কেবল বর্তমানে হাতের কাজটিতে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেন।

৬. কাজের মধ্যে একটা প্রণোদনা লুকানো থাকে। নিমগ্ন অবস্থাটি যে কাজের মাধ্যমেই তৈরি হোক না কেন, কাজ করাটাই তখন পুরষ্কার হিসেবে আবির্ভূত হয়।

মানুষের মনোনিবেশ করার ক্ষমতা সীমিত। মিহাই উল্লেখ করেন, মানব মস্তিষ্ক সেকেন্ডে ১১০ বিট তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। এই পরিমাণটি বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু নিত্যদিনের ছোট ছোট কাজে অনেক তথ্য প্রয়োজন হয়। যেমন কথার অর্থ উদ্ধার করতে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ বিট তথ্য লেগে যায়। এ কারণে কারো সাথে কথা বলার সময় অন্য কোনো বিষয়ে খেয়াল রাখা যায় না। ক্ষুধাবোধ, সময়জ্ঞান এগুলোও তথ্য যা বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও স্নায়ুপথের মাধ্যমে মস্তিষ্কে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এগুলোকে প্রক্রিয়াজাত না করলে

এ সম্পর্কে আমরা সচেতন হই না। নিমগ্ন অবস্থায় আমাদের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা পুরোটাই ব্যবহৃত হয় হাতের কাজটি সম্পন্ন করার জন্য। তাই নাওয়া-খাওয়া ও সময়ের কথা আমাদের খেয়াল থাকে না। এরকম অবস্থায় দেহের অনুভূতি বোঝার জন্য কোনো মনোযোগ অবশিষ্ট থাকে না।

নিমগ্নতা একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো এ দশায় ইচ্ছে হলেই প্রবেশ করা যায় না। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছতে হলে কাজের দক্ষতা বাড়ানো আবশ্যক। কিংবা এমন কোনো দুরূহ কাজ হাতে নেয়া যায়, যা চ্যলেঞ্জিং হলেও সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা আমাদের রয়েছে। অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির পেছনে না ছুটে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা জীবনে আনন্দময় সুখ লাভের নিশ্চিত উপায় হতে পারে।

তথ্যসূত্র

[১] Flow, the secret to happiness. TED-talk by Mihaly Csikszentmihalyi.http://ted.com

[২] Happiness data from National Opinion Research Center General Social Survey; income data from Historical Statistics of the United States and Economic Indicators.

[৩] What Is Flow? Understanding the Psychology of Flow.https://www.verywell.com

প্রজেরিয়াঃ শৈশবেই বার্ধক্য

পাশের ছবিতে যাকে দেখতে পাচ্ছেন তার নাম অ্যাডালিয়া রোজ। বলুন তো কত হতে পারে তার বয়স? ৮০-৯০ বছর? একটু কম বললাম কি? ১০০ বছর? বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, মেয়েটির বয়স মাত্র ৯ বছর! তার জন্ম ২০০৬ সালের ১০ই ডিসেম্বর। আসলে অ্যাডালিয়া রোজ প্রজেরিয়া (progeria) নামক এক ধরনের বিরল রোগে আক্রান্ত।

চিত্রঃ অ্যাডালিয়া রোজ

প্রজেরিয়া মূলত এক ধরনের বিরল জেনেটিক ডিজঅর্ডার। প্রজেরিয়া শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ ‘Progeras’ থেকে, যার অর্থ অপ্রাপ্তবয়স্ক বৃদ্ধ (Pro অর্থ পূর্বে বা অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং Geras অর্থ বার্ধক্য)। ১৮৮৬ সালে সর্বপ্রথম ড. জোনাথন হাচিনসন এবং পরবর্তীতে ১৮৯৭ সালে ড. হেস্টিংস গিলফোর্ড এ রোগ সম্পর্কে ধারণা প্রদান করেন। তাই তাদের নাম অনুসারে একে হাচিনসন-গিলফোর্ড প্রজেরিয়া সিনড্রমও বলা হয়। এলএমএনএ (LMNA) নামক এক ধরনের জিন শরীরে ল্যামিন-এ (Lamin A) নামক প্রোটিন তৈরি করে যা কোষের ভেতরের নিউক্লিয়াসকে ধরে রাখে। এই LMNA জিনের মিউটেশনের কারণে যে পরিবর্তিত ল্যামিন-এ প্রোটিন তৈরি হয় তা কোষের নিউক্লিয়াসকে অস্থিতিশীল করে ফেলে। ফলশ্রুতিতে দেহের কোষ খুব দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং বয়োবৃদ্ধির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। জিনের মিউটেশনের কারণে প্রজেরিয়া হয়ে থাকলেও এটি মূলত বংশাণুক্রমিক বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোনো রোগ নয়। অর্থাৎ সন্তান রোগটি তার মা বাবার কাছ থেকে পায় না এবং তারা এ রোগের জিনও বহন করেন না। এ রোগে আক্রান্তরা গড়ে সাধারণত ১৩ বছর বেঁচে থাকে এবং প্রায় ৯০% ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো সমস্যায় প্রজেরিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে।

শিশুর জন্মের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যে এ রোগের প্রাথমিক লক্ষণ প্রকাশ পায়। ১৮ থেকে ২৪ মাস বয়সে আরো লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এ রোগের লক্ষণ প্রকট হয়ে ধরা দেয়। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরের বৃদ্ধি চলতে থাকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে, মাথা শরীরের তুলনায় অনেক বেশি বড় হয়, বয়স বাড়ার সাথে সাথে চামড়ায় ভাঁজ পড়তে শুরু করে। এক কথায়, বেড়ে ওঠার আগেই বুড়িয়ে যেতে থাকেন তারা। জিনগত মিউটেশনের কারণে প্রজেরিয়া সৃষ্টি হওয়ায় এ রোগের এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ কার্যকরী কোনো চিকিৎসা নেই। তবে আশার কথা, এটি অত্যন্ত বিরল রোগ। প্রতি ৮০ লক্ষ শিশুর মধ্যে ১ জন শিশুর এ রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রজেরিয়া নিয়ে বলিউডে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। অমিতাভ বচ্চন, অভিষেক বচ্চন, বিদ্যা বালান প্রমুখ অভিনীত চলচ্চিত্রটির নাম হল ‘পা’ (Paa)। ২০০৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ ছবিতে অমিতাভ বচ্চনকে অভিষেক বচ্চনের ছেলের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়। যদিও বাস্তব জীবনে অমিতাভ বচ্চন হলেন অভিষেক বচ্চনের বাবা।

অতিসম্প্রতি মৃত্যুবরণ করেন প্রজেরিয়া রোগে আক্রান্ত ভারতের মুম্বাইয়ের নিহাল বিটলা। মাত্র ১৫ বছর বয়সে মারা যান তিনি। নিহাল বিটলা প্রজেরিয়া সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালাতেন। প্রজেরিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তিনি #হ্যাটসঅনফরপ্রজেরিয়া নামে প্রচারণা চালিয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র

https://en.wikipedia.org/wiki/Progeria

https://en.wikipedia.org/wiki/Paa_(film)

মহাজগতের জ্যামিতি

মহাবিশ্বের আকার সম্পর্কে যুগে যুগে প্রচলিত রূপকথার সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। কখনো হাতির মাথায় থাকা পৃথিবী, কখনো কচ্ছপের পিঠে থাকা, কখনো বা বিরাট পানির আধারে ডুবে থাকার গল্প প্রচলিত ছিল প্রাচীন যুগের মানুষদের মাঝে। গ্রীকরা মনে করতো, মাথার উপর আকাশের শেষ প্রান্তে আছে এক গুহা, যেখানে দেবতা জিউসের তেজী ঘোড়াগুলো থাকতো। সকালে ঘোড়াগুলো আকাশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে দৌড়ে যেত, তাই পৃথিবী আলোয় ভরে যেত। কয়েক শতাব্দী আগ পর্যন্তও মানুষের ধারণা ছিল,

মহাবিশ্ব মানে বোধহয় সৌরজগতটাই। কিন্তু যখনই মানুষ জানলো সৌরজগত আসলে মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র অংশ, তখন থেকেই প্রশ্ন জমতে লাগলো, মহাজগত কী আকারে সসীম হতে পারে? যদি তা হয়, তাহলে মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? দুটি প্রশ্নই এক বিন্দুতে গিয়ে মিলে- ‘মহাবিশ্বের আকার আসলে কেমন?’

এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আগে জেনে নেয়া উচিৎ তলের বক্রতা (ধনাত্মক, ঋণাত্মক বা সমতল) এবং মহাবিশ্বের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে। যেমন, এর উপাদানগুলো কীভাবে একে অন্যের সাথে যুক্ত। গোলকাকৃতির পৃষ্ঠের বক্রতা হলো ধনাত্মক বক্রতা। পাম্পে ফুলানো একটা চাকার ভেতরের দিকটা হলো ঋণাত্মক বক্রতা বিশিষ্ট। যেহেতু আমরা মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কে জানি না, কাজেই এর সম্ভাব্য অনেক আকৃতিই আমরা ধরে নিতে পারি- গোলকাকৃতি, সিলিন্ডার আকৃতি, ঘনকাকৃতি অথবা অনির্দিষ্ট সংখ্যক বিন্যাস বিশিষ্ট ভুজ আকৃতি বা বিভিন্ন বক্রতল ও মোচড়বিশিষ্ট আকৃতি, কিংবা এমন কোনো অনির্দিষ্ট আকৃতি যার কোনো বিপরীত তল নেই।

প্রথমে আমরা আমাদের পরিচিত তিনটি আকৃতি নিয়ে চিন্তা করি। এই তিনটি আকৃতি হলো সমতল আকৃতি (flat shape), গোলকীয় আকৃতি (spherical shape) এবং বক্রতলীয় আকৃতি (hyperbolic shape)।

তলগুলোর বৈশিষ্ট্য বোঝার আগে একটি বিশেষ ধরনের জ্যামিতির সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। এটি হলো রেইম্যানের জ্যামিতি (Reiman’s Geometry)। আমরা সাধারণত যে জ্যামিতিক আকৃতিগুলো নিয়ে আলোচনা করি, যেমন ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, বৃত্ত বা সরলরেখা, তার সবই কিন্তু আলোচনা করা হয় সমতল ক্ষেত্রের সাপেক্ষে। এটি আসলে ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি। কিন্তু যদি ক্ষেত্রটি গোলকীয় বা বক্রতল হয়? এটিই হচ্ছে অমর গণিতবিদ গাউসের সুযোগ্য ছাত্র রেইম্যানের কীর্তি!

রেইম্যান প্রথম গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন, ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি গোলকীয় পৃষ্ঠে দুই সমকোণের চেয়ে বেশি এবং বক্রতলীয় ক্ষেত্রে দুই সমকোণের চেয়ে কম হবে। তিনি এটাও বলেন যে, গোলক বা বক্রপৃষ্ঠে দুটি বিন্দুর মধ্যে সর্বনিম্ন দূরত্ব হবে একটি বক্ররেখা। খটকা লাগতে পারে, কেননা প্রচলিত জ্যামিতিতে আমরা জানি দুটি বিন্দুর সর্বনিম্ন দূরত্ব হলো সরলরেখা। কিন্তু সরলরেখা কল্পনা করলে তো সেটা সমতল ক্ষেত্রে চলে যায়, কাজেই সেটা ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির আওতাধীন হয়ে যায়। রেইম্যান জ্যামিতি থেকে আরও দেখা যায়, সমতল ক্ষেত্রের দুটি সমান্তরাল রেখাকে যদি গোলকীয় ক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে তারা একসময় নিজেদের ছেদ করবে। আবার বক্রতলে নিয়ে যাওয়া হলে তারা পরস্পর থেকে দূরে সরে যাবে।

এখন দেখা যাক কোন আকৃতিতে মহাবিশ্ব কেমন হওয়ার কথা। আমরা জানি, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে আকর্ষণ করছে। সে হিসেবে একটা নির্দিষ্ট সময় পর সব বস্তুই আবার একীভূত হয়ে যাওয়ার কথা। এখন যদি মহাবিশ্ব সমতল হয়, তবে সেক্ষেত্রে বলা যায় মহাবিশ্ব একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সমতলভাবে বিস্তৃত হবে এবং এক পর্যায়ে আবার একটি বিন্দুর দিকে ফিরে আসবে।

কিন্তু সেক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। মহাবিশ্ব সমতল হতে গেলে মহাবিশ্বের সর্বত্র শক্তিঘনত্ব এক হওয়া প্রয়োজন। যেমন, কাগজের উপর ছড়িয়ে থাকা লোহার গুঁড়ার কাছাকাছি যদি দুটি ভিন্ন শক্তির চুম্বক রাখা হয়, তাহলে দেখা যাবে লোহার গুঁড়াগুলো যে তলে বিন্যস্ত হয়েছে সেটা সমতল থাকে না। মহাবিশ্বের

সব বস্তুর ঘনত্ব সমান নয়, এ কারণে তাদের শক্তি ঘনত্বেরও তারতম্য ঘটে। মহাবিশ্বের ঘনত্ব নির্ণয়ের একটা সুন্দর নাম আছে- Density Parameter। সমতল ভূমির ক্ষেত্রে এর মান হওয়ার কথা ১, অর্থাৎ কোনো একটাকে আদর্শ ধরে নিলে তার তুলনায় অন্য সবারই এই মান একই হবে। কিন্তু এটা সত্য নয়, কাজেই বলে দেয়া যায় মহাবিশ্ব সমতল নয়।

এবার আসি ‘মহাবিশ্ব গোলকাকার’ এ ধারণায়। প্রাকৃতিকভাবে আমরা দেখি, সব তরল বা গ্যাসই চেষ্টা করে গোলকীয় অবস্থায় থাকতে। এর কারণ, তরল বা গ্যাসের প্রতিটি ফোঁটায় যে অণু আছে তাদের মধ্যবর্তী আকর্ষণ বল তাদের ছড়িয়ে পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় বলের চেয়ে বেশি। সেক্ষেত্রে, মহাবিশ্ব সসীম হওয়ার কথা কিন্তু তার কোনো শেষ আমরা বের করতে পারবো না। যেমন একটা ফুটবলের ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি না কোনো বিন্দুতে তার শুরু এবং কোনো বিন্দুতে শেষ।

তবে এখানেও প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা জানি, মহাবিশ্ব এখনো প্রসারিত হচ্ছে এবং এ প্রসারণের হার ক্রমশ বেড়েই চলেছে। কিন্তু মহাবিশ্ব যদি গোলকাকৃতির হয় তবে এই প্রসারণের হার বাড়া তো সম্ভব নয়, কেননা এই প্রসারণকে অতিক্রম করেই তো গোলক হতে হবে! রেইম্যানের জ্যামিতি থেকেও দেখা যায়, ধনাত্মক বক্রতার কোনো পৃষ্ঠে যেকোনো বল কেন্দ্রের দিকেই বেশি ক্রিয়াশীল হয়, ফলে Density Parameter এর মান ১ এর বেশি হয়। তাহলে মহাবিশ্বের প্রসারণ কমতে কমতে একসময় শূন্য এবং তারপর সংকোচন শুরু হওয়ার কথা, প্রসারণের মাত্রা বাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

তাহলে শেষ আর একটি প্রকৃতিই বাকি থাকলো, ঋণাত্মক বক্রতাবিশিষ্ট ক্ষেত্র অর্থাৎ Hyperbolic Space। হাইপারবোলিক স্পেস এ Density Parameter এর মান ০ থেকে ১ এর মধ্যে হয়। কাজেই দেখা যাচ্ছে, ‘মহাবিশ্বের সর্বত্র শক্তি ঘনত্ব সমান নয়’-এই তত্ত্ব একমাত্র হাইপারবোলিক স্পেসের ক্ষেত্রেই সম্ভব। তাছাড়া রেইম্যান জ্যামিতি থেকে দেখা যায়, একমাত্র ঋণাত্মক বক্রতাবিশিষ্ট ক্ষেত্রেই দুটি বস্তুর দূরে সরে যাওয়ার মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে পারে।

তবে এই প্রশ্নের উত্তর যে এখানেই শেষ, তা বলা যায় না। অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন, মহাবিশ্ব সমতল ক্ষেত্রের উপর বিস্তৃত। এর সপক্ষে তারা উপস্থাপন করেন অ্যানিসোট্রপিক স্পেকট্রাম থেকে প্রাপ্ত মহাজাগতিক পরিব্যাপন এর চিত্র। যা দেখে কিছুটা মনে হয়, মহাবিশ্ব সম্ভবত সমতল।

চিত্রঃ অ্যানিসোট্রপিক স্পেকট্রাম থেকে প্রাপ্ত মহাজাগতিক পরিব্যাপন।

আরেকটা প্রশ্ন এখনো বাকি, মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? এ প্রশ্নের কোনো জোর উত্তর বিজ্ঞানীরা আজও দিতে পারেননি। তবে রেইম্যানের জ্যামিতি থেকে বিজ্ঞানীরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, মহাবিশ্বের মাত্রা যদি তিনটির চেয়ে বেশি হয়, তবে এর সঠিক আকৃতি আমাদের তিন মাত্রার কল্পনা দিয়ে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। যেমনঃ দ্বিমাত্রিক কাগজের পৃষ্ঠের উপর চলমান একটি পিঁপড়া তার তলের শুরু এবং শেষ বুঝতে পারবে। কিন্তু যদি সেই কাগজ পেঁচিয়ে ত্রিমাত্রিক সিলিন্ডার বানানো হয়, তবে পিঁপড়া সেই সিলিন্ডারের কোনো আদি-অন্ত খুঁজে পাবে না। অধুনা প্রতিষ্ঠিত ‘স্ট্রিং থিওরি’র অন্যতম বিজ্ঞানী জাপানের মিচিও কাকু গাণিতিকভাবে দেখিয়েছেন, মহাবিশ্ব দশ মাত্রার। আমাদের দৃশ্যমান তিনটি মাত্রা ছাড়া অন্য

মাত্রাগুলো এতই সূক্ষ্ম যে আমরা সেগুলো বুঝতে পারি না। যেমন, ত্রিমাত্রিক লোহার টুকরোকে সুক্ষ্ম করতে করতে যদি পাতে পরিণত করা হয়, তবে সেটা আমাদের কাছে দ্বিমাত্রিকই মনে হয়।

যা হোক, স্ট্রিং থিওরীর বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ দশ মাত্রাকে গাণিতিক সমীকরণের আওতায় আনতে পারলেই মহাবিশ্বের আকৃতি ও এর সীমা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা যাবে। মানুষের জ্ঞান যত বিস্তৃত হচ্ছে, মহাবিশ্বই ততই হয়ে উঠছে রহস্যময়!

তথ্যসূত্র

১. জেমস সমবার্ট, ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনঃ http://abyss.uoregon.edu/~js/cosmo/lectures/lec15.html

২. ইউনিভার্সিটি অব টেনেসিঃ http://csep10.phys.utk.edu/astr162/lect/cosmology/geometry.html

৩. প্রফেসর বারবারা রীডেন, ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটিঃ http://www.astronomy.ohio-state.edu/~ryden/ast162_9/notes40.html

৪. স্ট্রীং থিওরি, লেখকঃ হিমাংশু কর

নিমগ্নতার সুখ

আমরা জীবনে সুখের হরিণের পেছনে ছুটে বেড়াই। গড়পড়তা সাধারণ মানুষ তো বটেই, কবি-লেখক-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে ধর্মবেত্তা-দার্শনিক সকলেই সুখ পাখিটা ধরতে চায়। তবে যারা সুখ জিনিসটা কী তা বোঝার চেষ্টা করেন তাদের অনুসন্ধানটা ভিন্ন। তারা সুখকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন। এ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরাও পিছিয়ে নেই। বিজ্ঞান হয়তো বলবে এন্ডরফিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামক হরমোন নিঃসৃত হলে মানুষ সুখানুভূতি পায়, তবে তারপরও কাজের সাথে সুখানুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এক জন মনোবিজ্ঞানীর গবেষণা থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাক।

কখনো কি এমন কোনো কাজে ডুবে গিয়েছিলেন যে নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন? বেলা গড়িয়ে কখন সন্ধ্যা হয়েছে টের পাননি? কিংবা রাতে খাবার পর কাজে বসে হঠাৎ টের পেয়েছেন যে ভোর হয়ে গেছে? কাজে এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলেন যে, সময় পার হবার অনুভূতি লোপ পেয়েছিল, ক্ষুধা অনুভব করেননি? এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জীবনেই একবার না একবার হয়েছে। বিশেষ করে যখন হাতের কাজটি চ্যালেঞ্জিং আর আগ্রহোদ্দীপক কিছু হয়ে থাকে।

টানটান উত্তেজনাপূর্ণ কোনো খেলা দেখার সময়েও এরকম একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আমাদের। যারা কম্পিউটারে গেম খেলে, অনেক সময় মজার অথচ জটিল কোনো গেম খেলার মধ্যে ডুবে গেলেও এ অবস্থা তৈরি হয়। অনেক প্রোগ্রামার রাতে কাজ করতে পছন্দ করেন। কারণ রাতে সাধারণত অন্য কেউ কথা বলে না, ডাক দেয় না, বিরক্ত করে না। তখন তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো সমস্যা সমাধানে কাটিয়ে দিতে পারে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ফ্লো’ (Flow)। বাংলায় একে আমরা নিবিষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা নিমগ্নতা বলতে পারি।

এখানে নিমগ্ন দশার সাথে সুখের সম্পর্কটা কী? এ প্রসঙ্গে ফ্লো তত্ত্বের জনক চেক মনোবিজ্ঞানী মিহাই চিকসেন্টমিহাইয়ের গবেষণা সম্পর্কে আলোকপাত করি।[১] ১৯৫৬ সালে এক জরিপে প্রায় ৩০ শতাংশ আমেরিকান উল্লেখ করেন যে, তারা জীবন নিয়ে অত্যন্ত সুখী (গ্রাফ দ্রষ্টব্য)। তখন থেকে কয়েক বছর পরপর নিয়মিত এ জরিপটি করা হয়েছে। দেখা গেছে ১৯৫৬ সালের পরে আমেরিকানদের গড়পড়তা আয় দুই থেকে তিনগুণ বাড়লেও ‘সুখী’ আমেরিকানদের অনুপাত বাড়েনি। তার মানে, দারিদ্র্যসীমার নীচে আয় থাকলে তা অবশ্যই দুঃখের কারণ হবে। কিন্তু আয় অনেক বাড়লে সুখানুভূতি বাড়বে এমন কোনো কথা নেই। অর্থাৎ অধিক উপার্জন মানুষকে অধিক সুখী করে তুলতে পারে না।

চিত্রঃ আমেরিকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সুখের সম্পর্ক।

২০০৫ সালে আমেরিকানদের গড় ক্রয় ক্ষমতা ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। সে তুলনায় সুখী মানুষের অনুপাতের কোনো পরিবর্তন হয়নি।[২] ছোট কালো বিন্দু দিয়ে উপার্জনের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে। বড় চতুষ্কোণ বিন্দু দিয়ে সুখী মানুষের অনুপাত বোঝানো হচ্ছে।

এই প্রেক্ষিতে মিহাই সুখ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। দৈনন্দিন জীবনে আমরা কি আসলেই সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করি? এটিই ছিল তার অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন। তিনি প্রথমে সৃজনশীল ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিল শিল্পী, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশার মানুষজন। তাদের সাক্ষাৎকারে যখন তারা নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে অন্যরকম ভাবাবেশের কথা উল্লেখ করেন তখন বার বার একটি অনুভূতির কথা উঠে আসে। সাক্ষাৎকারে অংশ নেয়া অধিকাংশ ব্যক্তিই তাদের সৃজনশীল কাজের মধ্যে একটি উচ্ছসিত আনন্দের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। সৃজনশীল কাজটি সহজে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে এরকম অবস্থায় এ আনন্দময় দশাটি তৈরি হবার কথা উঠে আসে তাদের সাক্ষাৎকারে।

সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি মিহাই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজের মধ্যে থাকা

অবস্থায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার অনুভূতি কেমন সেই তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করেন। তার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের পেজার নামক একটি যন্ত্র সরবরাহ করা হয়। পেজার মূলত মোবাইল ফোনের পূর্বপুরুষ। অংশগ্রহণকারীদের নিত্যদিনের কাজের মাঝে বিভিন্ন সময়ে এ পেজারটি বেজে উঠতো। অংশগ্রহণকারী ঐ মুহূর্তে কী কাজ করছেন, কাজ করতে কেমন লাগছে, কাজটি কোথায় করা হচ্ছে, কাজ করার সময় কী নিয়ে চিন্তা করছেন এসব তথ্য তিনি লিপিবদ্ধ করেন।

এ ছাড়াও আরো দুটি পরিমাপ করা হয়। প্রথমত, অংশগ্রহণকারী যে কাজটি করছেন তা কতটুকু কঠিন। দ্বিতীয়ত, কাজটি সম্পন্ন করার জন্য অংশগ্রহণকারী কতটুকু দক্ষ। এ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন সময়ে করা বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হয়। এভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে মিহাই

একটি ডায়াগ্রাম তৈরি করেন। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর কাছে দিনভর কাজ কতটুকু সহজ বা কঠিন মনে হয় এবং বিভিন্ন কাজের জন্য তার কতটুকু দক্ষতা আছে, এ দুটি পরিমাপের মাঝামাঝি একটি বিন্দু ঠিক করা যায়। এ কেন্দ্রবিন্দু থেকে বোঝা সম্ভব কখন একজন অংশগ্রহণকারী ‘মগ্নতা‘ দশায় প্রবেশ করবেন।

চিত্রঃ কাজ কতটা চ্যালেঞ্জিং ও মানুষের দক্ষতা কতটুকু এবং এর সাথে সম্পর্কিত অনুভূতির চার্ট।

যখন আমাদের হাতের কাজটি খুব কঠিন, কিন্তু সে কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকে তখন আমরা উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা অনুভব করি। আর যখন কাজটা খুব সহজ হয় আর কাজের জন্য দরকারী দক্ষতা পর্যাপ্ত থাকে, তখন আমরা বেশ আরামে থাকি। তবে যখন কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয় আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দরকারী দক্ষতাও উপস্থিত থাকে, তখন আমরা মগ্নদশায় প্রবেশ করি। এই নিমগ্ন অবস্থায় কাজের চ্যালেঞ্জকে টক্কর দেবার সাথে সাথে একধরনের ভাবাবেশ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়।

তখন ক্ষুধা, সময় ইত্যাদির অনুভূতি থাকে না, আমরা ডুবে যাই কাজের ধারায়, লাভ করি চ্যালেঞ্জ খণ্ডনের তৃপ্তিময় আনন্দ। যখন হাতের কাজটি খুবই সোজা, আর সেটি করতেও তেমন কোনো দক্ষতা লাগে না, তখন মানুষ অনীহা/ঔদাসীন্য/বিরক্তি অনুভব করে। দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার সময় মানুষ এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়। (ব্যক্তিগতভাবে আমি ফেসবুকে ফিড ঘাঁটার সময়ে এরকম বোধ করি।)

‘নিমগ্ন’ দশার মূল বৈশিষ্ট্য হলো- আমরা যে কাজটি করছি তাতে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে নিবদ্ধ থাকে ঐ কাজে। এছাড়া এ অবস্থার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।[৩] যেমনঃ

১. নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে তৃপ্তিময় ভাবাবেশের অন্যরকম অনুভূতি পাওয়া যায়।

২. মনের ভেতরে স্বচ্ছতার অনুভূতি থাকে। আপনি জানেন কী করা দরকার। আর আপনি কাজটা ঠিক মতো করছেন কি না, তা নিজে থেকেই বুঝতে পারেন।

৩. আপনি জানেন কাজটি শেষ করা সম্ভব। অর্থাৎ কর্মসম্পাদনের দরকারী দক্ষতা আপনার আছে।

৪. নিজের সম্পর্কে কোনো খেয়াল থাকে না। আপনার সকল উদ্বেগ ও ভাবনা দূরে সরে যায়।

৫. আপনি সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আর কেবল বর্তমানে হাতের কাজটিতে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেন।

৬. কাজের মধ্যে একটা প্রণোদনা লুকানো থাকে। নিমগ্ন অবস্থাটি যে কাজের মাধ্যমেই তৈরি হোক না কেন, কাজ করাটাই তখন পুরষ্কার হিসেবে আবির্ভূত হয়।

মানুষের মনোনিবেশ করার ক্ষমতা সীমিত। মিহাই উল্লেখ করেন, মানব মস্তিষ্ক সেকেন্ডে ১১০ বিট তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। এই পরিমাণটি বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু নিত্যদিনের ছোট ছোট কাজে অনেক তথ্য প্রয়োজন হয়। যেমন কথার অর্থ উদ্ধার করতে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ বিট তথ্য লেগে যায়। এ কারণে কারো সাথে কথা বলার সময় অন্য কোনো বিষয়ে খেয়াল রাখা যায় না। ক্ষুধাবোধ, সময়জ্ঞান এগুলোও তথ্য যা বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও স্নায়ুপথের মাধ্যমে মস্তিষ্কে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এগুলোকে প্রক্রিয়াজাত না করলে

এ সম্পর্কে আমরা সচেতন হই না। নিমগ্ন অবস্থায় আমাদের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা পুরোটাই ব্যবহৃত হয় হাতের কাজটি সম্পন্ন করার জন্য। তাই নাওয়া-খাওয়া ও সময়ের কথা আমাদের খেয়াল থাকে না। এরকম অবস্থায় দেহের অনুভূতি বোঝার জন্য কোনো মনোযোগ অবশিষ্ট থাকে না।

নিমগ্নতা একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো এ দশায় ইচ্ছে হলেই প্রবেশ করা যায় না। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছতে হলে কাজের দক্ষতা বাড়ানো আবশ্যক। কিংবা এমন কোনো দুরূহ কাজ হাতে নেয়া যায়, যা চ্যলেঞ্জিং হলেও সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা আমাদের রয়েছে। অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির পেছনে না ছুটে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা জীবনে আনন্দময় সুখ লাভের নিশ্চিত উপায় হতে পারে।

তথ্যসূত্র

[১] Flow, the secret to happiness. TED-talk by Mihaly Csikszentmihalyi.http://ted.com

[২] Happiness data from National Opinion Research Center General Social Survey; income data from Historical Statistics of the United States and Economic Indicators.

[৩] What Is Flow? Understanding the Psychology of Flow.https://www.verywell.com

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ও আমাদের স্বাস্থ্যসেবা

এবারের জাতিসংঘের সাধারণ সভায় এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ সভার ৭০ বছরের ইতিহাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা হয়েছে এবার নিয়ে মাত্র চার বার। ২০১১ সালে এইচআইভি ও এইডস প্রতিরোধ বিষয়ে এবং সে বছরের শেষের দিকে ক্যান্সার ও ডায়াবেটিস অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধ বিষয়ে, ২০১৪ সালে ইবোলার বিস্তার থামানোর জন্য করণীয় বিষয়ে এবং এবার ২০১৬ সালে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধে কী করণীয় সেই বিষয়ে। জাতিসংঘের সবগুলো সদস্য রাষ্ট্র যখন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তখন সেই বিষয়টির গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।

মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে প্রতি বছর ক্যান্সারের চেয়েও বেশি লোক মারা যায়। সমস্ত পৃথিবীতে বছরে প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ১০ মিলিয়নে। এছাড়া ২০৫০ সাল নাগাদ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধজনিত কারণে সারা বিশ্বব্যাপী অপচয় গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এসব অপচয়ের পেছনে থাকবে চিকিৎসা সেবাদানের খরচ, কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনে হ্রাস সহ আরো অনেক কিছু।

বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে যখন এন্টিবায়োটিক ওষুধ বেশ জনপ্রিয়তা পায় তখন সবাই মনে করতো এটি ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগের প্রতিরোধক হিসেবে সবসময় কাজ করবে। সে সময়ে অনেক লোকের জীবন বাঁচলেও বর্তমানের বাস্তবতা ভিন্ন রকম। কারণ অধিকাংশ জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া প্রচলিত সব

ধরনের ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়ে এইসব ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর নির্মূল করা আর সম্ভব নয়।

এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলার ফলে মানুষের মৃত্যু হতে থাকবে ওষুধ আবিষ্কারের আগের সময়ের মতো। যেমন, বর্তমানে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ লোক বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগে আক্রান্ত হয়। এই রোগগুলোকে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দ্বারা সারানো যায় না, ফলে প্রায় ২৩ হাজারের মতো লোক মারা যায় প্রতিবছর শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন আগামী দিনগুলোতে এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। যদি এরকম হয় (এরকম হবারই কথা) তাহলে তা মানুষের জন্য শতাব্দীর সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিবে।

আগে এন্টিবায়োটিকের মাধ্যমে যেসব রোগের চিকিৎসা সফলভাবে করা যেত সেসব রোগের ক্ষেত্রেও এই প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীর অনেক স্থানে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে যৌন-বাহিত রোগ গনেরিয়া প্রায় চিকিৎসার অসাধ্য হয়ে উঠেছে।

এছাড়া ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার একটি প্রকরণ পাওয়া গেছে যেগুলো বিদ্যমান সকল প্রকার এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সকল এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে ফেলেছে, এই খবরটি অবশ্যই আশঙ্কাজনক। এমনকি সাধারণ ছোটখাটো সংক্রমণের ক্ষেত্রেও সমগ্র বিশ্বে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে।

ক্ল্যামেডিয়া, সিফিলিস ইত্যাদির মতো মূত্রনালীর সংক্রমণ ও যৌনরোগ, যেগুলো আগে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দ্বারা নিরাময়যোগ্য ছিল সেগুলো এখন একদমই অপ্রতিরোধ্য। কোনোভাবেই এদেরকে বশ মানানো যায় না। ফলে প্রতি বছর এসব রোগে মারা যাচ্ছে অনেক মানুষ। রোগগুলো দেখতে হয়তো ক্যানসার বা এইডসের মতো ভয়াবহ নায় কিন্তু তারপরেও অপ্রতিরোধ্য হবার কারণে কেড়ে নিচ্ছে প্রচুর মানুষের প্রাণ। ক্যানসার বা এইডস না হওয়াতে এগুলো মানুষের নজরও কেড়ে নিতে পারছে না।

প্রশ্ন হতে পারে, ঠিক কীভাবে এই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এইসব জীবাণুগুলো। মূলত মানুষ ও গৃহপালিত পশুপাখির চিকিৎসায় যেমন খুশি তেমনভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা ছাড়াই যত্রতত্র ওষুধ ব্যবহারের

কারণে জীবাণুর এরকম শক্তিশালী প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে। সাধারণভাবে বললে ব্যাপারটি এরকম- মনে করুন ব্যাকটেরিয়া-জনিত কারণে আপনার একটি চর্মরোগ হয়েছে। এর প্রতিকারের জন্য আপনি একধরনের এন্টিবায়োটিক মলম ব্যবহার করলেন। আপনার ডাক্তার বলেছিল যে অন্তত সাতদিন ব্যবহার করতে। চারদিনের মাথায় দেখলেন যে আপনার চর্মরোগ ভালো হতে শুরু করেছে। ভালো দেখে আপনি মলমটি ব্যবহার করা বন্ধ করে দিলেন এবং মলমটি আবর্জনার সাথে ফেলে দিলেন।

চর্মরোগ ভালো হতে শুরু করলেও হয়তো দেখা যেতে পারে আসলে সকল ব্যাকটেরিয়া মরেনি। যেসব ব্যাকটেরিয়া বেঁচে গেছে তাদের পরবর্তী বংশধর ঐ ওষুধ প্রতিরোধের জন্য সুরক্ষা গড়ে তুলবে। অর্থাৎ যে আঘাত আপনাকে মারতে পারে না সে আঘাত আপনাকে আরো শক্তিশালী করে তোলে- এই প্রবাদের মতো। এছাড়া আপনার ফেলে দেয়া এন্টিবায়োটিক ওষুধটি বাইরের পরিবেশের অনেক ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুকে মেরে ফেলবে, এবং একই সাথে দেহের মতো কিছু কিছু জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া টিকে থাকার তাগিদে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

একেকটি ওষুধ তৈরির পেছনে লাগে অনেক গবেষণা, বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম, জ্ঞানের পরিসর এবং অনেক বছরের কাজ। কিন্তু একটি এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে  প্রতিরোধ গড়ে তুলতে একটি জীবাণুর কয়েক দিন সময় লাগে মাত্র। ব্যবহারকারীরা যদি অসাবধান হয় এবং ডাক্তার বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিকভাবে ব্যবহার না করে তাহলে বিশ্বকে ক্ষুদ্র দানবের সৃষ্টি করে চরম মূল্য দিতে হয়। অথচ যে এন্টিবায়োটিক তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের বছরের পর বছর সময় লেগেছিল, অনেক অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়েছিল, অনেক অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়েছিল, সেখানে ব্যবহারকারীর অবহেলার কারণে এই মূল্যবান শ্রম, অর্থ ও সময়গুলো ভেস্তে যাচ্ছে এক নিমেষেই। এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সক্ষম জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদেরকে ‘সুপারবাগ’ (Superbugs) বলা হয়।

মানব শরীর প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কোষ ‘মানব’ দ্বারা এবং ৩৯ ট্রিলিয়ন অন্যান্য জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার কোষ দ্বারা গঠিত। এসব জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এসব জীবাণু আমাদের খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে, অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণু থেকে সুরক্ষা দেয়, ত্বক পরিষ্কার রাখে এবং আরো অনেক উপকারী কাজ করে।

সমস্যা হচ্ছে যে, ক্ষতিকর জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদের দমন করতে গিয়ে আমরা মেরে ফেলছি ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোকেও। যেমন নিউমোনিয়া থেকে নিরাময়ের জন্য নিউমোনিয়ার জীবাণুর পাশাপাশি মেরে ফেলা হচ্ছে অন্ত্র বা পেটের অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও আণুবীক্ষণিক জীবকে। এরা আমাদের পেটের প্রদাহ রোধ করে কিংবা কোষ্ঠকাষ্ঠিন্য দূর করে

গবেষণায় দেখা গেছে যে, পেট ও শরীরের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, বিষণ্ণতা সহ অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক রোগ সৃষ্টি হতে পারে। শুধু তাই নয়, পরিবেশের যাবতীয় সব চক্রে (যেমন, পানি চক্র, অক্সিজেন চক্র, কার্বন ও নাইট্রোজেন চক্র ইত্যাদি) জীবাণুদের অবদান রয়েছে। বলা হয়ে থাকে মানুষ যত অক্সিজেন গ্রহণ করে তার অনেকটাই জীবাণুদের দ্বারা নির্গত। বিভিন্ন বিপাক ও জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়া ও জটিল চক্রের মাধ্যমে তারা এই কাজটি করে।

চিত্রঃ ক্ষুদ্র জীবাণুগুলো অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এখান থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে আমাদের জীবন ও পরিবেশের জন্য জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদের গুরুত্ব কতটা দরকারি। তাই টিকে থাকার জন্যই তাদেরকে আমাদের দরকার। সেজন্য আমাদের সকলেরই উচিৎ এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতন হওয়া।

ব্যাকটেরিয়া সব জায়গায় আছে, এবং এসব ব্যাকটেরিয়ার অধিকাংশ ক্ষতিকর নয়। ক্ষেত্র বিশেষে কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া উপকারী, এগুলো অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলোকে চাপের মুখে রাখে। যখন আপনি অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করেন তখন খারাপ ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোও মরে যায়। অথচ দেহের জন্য এরাই সবচেয়ে যোগ্য ওষুধ।

এন্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরি করা হয় সাধারণত প্রকৃতিতে সহজলভ্য বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা। অথবা অন্যান্য জীবাণুদের নির্যাস বা নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ থেকে। যেমন ছত্রাক থেকে বানানো পেনিসিলিন। কিন্তু এসব সহজলভ্য প্রাকৃতিক উপাদানগুলো প্রায় ‘শেষ’ হয়ে এসেছে। বলা হয়ে থাকে আমরা এসব প্রাকৃতিক ওষুধের অধিকাংশই কোনো না কোনো ওষুধের মাধ্যমে ব্যবহার করে ফেলেছি। তাই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ বানাতে। কিন্তু এটি বেশ সময়সাধ্য ব্যাপার।

অন্যান্য প্রাণীর মতো ব্যাকটেরিয়ার DNA-তেও বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন ঘটে। অধিকাংশ সময় এসব পরিবর্তন খারাপ কিছু নয়। এগুলো তাদের অভিযোজনের জন্য তেমন সহায়ক হয় না। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে এসব বিক্ষিপ্ত পরিবর্তনের কোনো কোনোটি ব্যাকটেরিয়াদের দুর্গম বা প্রতিকুল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য শক্তি দান করে। যখন আপনি যত্রতত্র এন্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করেন তখন টিকে থাকার জন্য ব্যাকটেরিয়াতে বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন ঘটে এবং প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বংশগতির সূত্রানুসারে প্রবাহিত হয়। এছাড়া ব্যাকটেরিয়াসমূহ পরষ্পরের সাথে তাদের ডিএনএ শেয়ার করতে পারে, ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা এক ব্যাকটেরিয়া থেকে অন্য ব্যাকটেরিয়াতেও সঞ্চালিত হয়।

চিত্রঃ ব্যাকটেরিয়া পরস্পরের সাথে ডিএনএ আদান প্রদান করতে পারে।

অনেকে ধারণা করতেন নিত্যনতুন ওষুধ আবিষ্কার ও প্রযুক্তির কল্যাণে ব্যাকটেরিয়াদের এই প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে সহজে। তবে বাস্তবতা অন্যরকম, কারণ প্রয়োজনীয় অর্থ ও বিনিয়োগ থাকলেও চাইলেই নিত্যনতুন ওষুধ তৈরি করা যায় না। যেহেতু একেকটি গবেষণার পেছনে প্রচুর সময় লাগে এবং অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়ার নিত্যনতুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা বেশ দ্রুত তাই তাদের ঠেকিয়ে রাখা সম্ভবপর হয়ে উঠে না।

অনেক ওষুধ কোম্পানিও ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে তাল মিলিয়ে ওষুধ তৈরি করতে পারছে না। ক্ষেত্র বিশেষে দেখা যায়, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে একটি নতুন ওষুধ আনলেও সেটির বিরুদ্ধে জীবাণুরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে কয়েক বছরের ভেতরেই। ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলো এখন লোকসানের ভয়ে গবেষণায় বিনিয়োগের ব্যাপারে অনেক সতর্ক।

এছাড়া, যেসব দেশে ওষুধের দাম কীরকম হবে সেই ব্যাপারে নির্দিষ্ট নীতিমালা বা আইন আছে, কিংবা যেসব দেশে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অধীনে এন্টিবায়োটিক বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় (যেমন, কানাডা) সেসব দেশে প্রত্যাশিত লাভ পায় না ওষুধ কোম্পানিগুলো। তাই ওষুধ কোম্পানি কিছু একটা উপায় বের করে ওষুধ নামিয়ে ফেলবে, এরকম ভাবনায় আশা পেয়ে লাভ নেই। আমাদের নিজেদেরকেই এর জন্য নেমে আসতে হবে। জীবাণুগুলোর শক্তিশালী হয়ে ওঠে ঠেকাতে আমাদেরকেই এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের আচরণ পাল্টাতে হবে। সতর্ক ও বিবেক সম্পন্ন হতে হবে।

এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোর বিকল্প নেই, শুধুমাত্র গুরুতর রোগ ও সংক্রমণের জন্যই এর ব্যবহার সীমিত করা উচিৎ। এই কাজটি করতে হবে আমাকে, আপনাকে। সচেতনা ও সদিচ্ছা ছাড়া উপায় নেই। রোগ নির্ণয়ের জন্য ভালো উপায়ের ব্যবহার এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। এভাবে দীর্ঘ সময়ে হয়তো যেসব ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে সেগুলোকে ঠেকানোর উপায় পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

সামান্য হাত পা কাটলেই কিংবা সাধারণ ফোস্কা ইত্যাদি হলেই এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার কমাতে হবে বা সীমিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক না নিয়ে এর বিকল্প চিকিৎসা নিতে হবে। যেমন ভাইরাসের দ্বারা ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলার থেরাপি রয়েছে। এছাড়া গাদ পদার্থ প্রতিস্থাপনের

(fecal matter transplants) মাধ্যমেও আন্ত্রিক বা পেটের সংক্রামণের চিকিৎসা করা যায়। অর্থাৎ, কোনো রোগ হলেই এন্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে এই ধারণার পরিহার জরুরী।

অন্য আরেকটি ব্যাপার এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের পেছনে দায়ী- এন্টিবায়োটিক ওষুধের পাশাপাশি অতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক সাবান, এন্টিবায়োটিক শ্যাম্পু ও প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবহারও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের দেহে ও আশেপাশে সাধারণ যেসব ব্যাকটেরিয়া থাকে সেগুলোর জন্য এন্টিবায়োটিক সাবান ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা ভালোগুলোকে মেরে ফেলি এবং খারাপগুলো আরো বেশি প্রতিরোধী করে তুলি। জীবাণুনাশক হ্যান্ডওয়াশের পরিবর্তে সাধারণ সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করলেই চলে দৈনন্দিন কাজকর্মে। এগুলোও শিক্ষিত মননের সচেতনতার অংশ।

শুধুমাত্র খামার, হাসপাতাল বা এরকম দূরবর্তী স্থানে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায় এমন নয়, আমাদের আশেপাশে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা হচ্ছে এদের স্বর্গরাজ্য। কারণ যাবতীয় বর্জ্য, ওষুধ ইত্যাদি পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় এসে মেশে। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে যে, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ক্রটির কারণে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলো আমাদের যাপিত পরিবেশে সহজেই মিশে যেতে পারে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে চীনে এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার এতো বেশি যে পানির ট্যাপ কিংবা বাড়ির খাবারের পানিতেও এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি আছে। চীনের কয়েকটি নদীর পানির নমুনায় প্রায় ৬০ টিরও বেশি এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে! ধারণা করা যায় আমাদের দেশে বুড়িগঙ্গা ও কিংবা শহর সংলগ্ন অনেক নদীর ক্ষেত্রেও এইরকম হবে। চীনের একটি ওষুধ কোম্পানির কারখানার নিকটবর্তী জলাশয়ে মানুষের চিকিৎসা মাত্রায় প্রায় ১০ হাজার গুণ বেশি পরিমাণের এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে। শুধু চীন নয়, ভারত, নিউ ইয়র্ক ইত্যাদি দেশ ও শহরে-ও কম বেশি একই অবস্থা। আমাদের দেশে ওষুধ কোম্পানিগুলোর কারখানা ও বর্জ্য নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে কী করা হয় তা অনুসন্ধান ও প্রয়োজনে সমাধান করা জরুরি।

চিত্রঃ ওষুধ কোম্পানিগুলোর আশেপাশের এলাকা অনুসন্ধান জরুরী।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার অন্যতম স্থান হতে পারে বুড়িগঙ্গা নদী। অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার কারণে বুড়িগঙ্গা আজ স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের অন্যতম স্থান। এছাড়া আমাদের দেশে যাবতীয় শিল্পকারখানার বর্জ্য, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বর্জ্য কিন্তু শেষ পর্যন্ত গিয়ে মেশে নদী ও প্রবাহিত পানিতে। যেহেতু শহরাঞ্চলে পানির সরবরাহের অন্যতম উৎস নদী তাই এসব পানি নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। একবার আমাদের খাদ্য ও পানি চক্রে এইসব ব্যাকটেরিয়ার প্রবেশ ঘটে গেলে

কিংবা এসব ব্যাকটেরিয়া মানুষের মাঝে সংক্রমিত হলে এর নির্মূল কঠিন হয়ে যাবে। কারণ বাংলাদেশ অনেক ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ, তাই রোগের সংক্রমণ দ্রুত ঘটার সম্ভাবনা বেশি।

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ সমস্যা পরিমাপের জন্য রয়েছে ওষুধ প্রতিরোধ সূচক (Drug Resistance Index), এই সূচকের মান ০ থেকে ১০০ পর্যন্ত হয়। ০ বলতে বোঝায় কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠনি, অর্থাৎ সব এন্টিবায়োটিক কাজ করে। এবং অন্যদিকে ১০০ বলতে বোঝায় জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াসমূহ পুরোপুরি প্রতিরোধী। ইউরোপের ২৭ টি দেশের মধ্যে ২২ টি দেশেই (জার্মানি ও সুইডেন ছাড়া) গত চৌদ্দ বছরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ অনেক বেড়েছে। ভারতের অবস্থা-ও বেশ নাজুক, অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া জনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে প্রচলিত এন্টিবায়োটিক কাজ করে না। যেহেতু অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো বাংলাদেশে এসব বিষয়ে উপাত্ত নেই তাই বাংলাদেশের অবস্থা কী তা সঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে যেহেতু প্রতিবেশি দেশ ভারতের নাজুক অবস্থা তাই বলা চলে বাংলাদেশের অবস্থা-ও ভালো নয়।

চিত্রঃ বাংলাদেশের নদীগুলোও ব্যাপকভাবে ‘এন্টিবায়োটিক দূষিত’ হতে পারে।

একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে জাতিসংঘের সাধারণ সভা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বিষয়ে অনেক দিকনির্দেশনা প্রদান ও আলোচনা করলেও এসব সুপারিশ প্রয়োগ করার দায়িত্ব সদস্য রাষ্ট্রগুলোর। সদস্য রাষ্ট্রগুলোকেই তাদের জনগণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে কী করছে, কিংবা এ ব্যাপারে অভিহিত আছে কিনা সেটি দেখার বিষয়।

অনেক লোকই রোগ হলে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ওষুধ দোকানগুলোতে গিয়ে দোকানদার, ক্ষেত্র বিশেষে ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ ও এন্টিবায়োটিক নেন, কিন্তু মনে রাখা দরকার যে এইসব দোকানদারের প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ নেই বা ফার্মাসিস্টরা-ও সনদপ্রাপ্ত ডাক্তার নন। তাই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন, এবং একজন সচেতন রোগী হিসেবে নিজের ওষুধপত্র সম্পর্কে ধারণা রাখুন।

ইন্দ্রিয়ের এলোমেলো অবস্থান

মানবদেহের প্রতিটা অঙ্গেরই নির্দিষ্ট কিছু কাজ আছে। পা দিয়ে হাঁটি, হাত দিয়ে লিখি, পেট দিয়ে খাবার হজম করি। যেসব অঙ্গের মাধ্যমে পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা লাভ করি তাদের বলি ইন্দ্রিয়। চোখ দিয়ে দেখি, চোখ আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়। কান দিয়ে শুনি, কান আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয়। কখনো কিন্তু চামড়া দিয়ে ঘ্রাণ নেয়া, কিংবা পাকস্থলি দিয়ে স্বাদ নেয়ার কথা ভাবি না। ভাবার দরকারও পড়ে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, এক ইন্দ্রিয়ের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কোষ অন্য অঙ্গেও থাকে। আমরা যদিও তাদেরকে ইচ্ছা অনুসারে ব্যবহার করতে পারি না, কিন্ত তারা আমাদের অজান্তে কাজ করে যাচ্ছে ঠিকই। এরকম কয়েকটি ব্যাপার নিয়েই আজকের এই লেখাটি।

গন্ধ শুকে চলো

নাক দিয়ে ঘ্রাণ নিই। ঘ্রাণ নিতে পারার ক্ষমতার সাথে জড়িত আছে বিভিন্ন ধরনের সংগ্রাহী অংশ বা receptor। এদের গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরিতে যেসব জিন জড়িত তার প্রথম বর্ণনা দেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড অ্যাক্সেল এবং লিন্ডা বাক। তা প্রায় আজ থেকে ২৫ বছর আগে ১৯৯১ সালে।

স্বাভাবিকভাবেই সে সময়ে ধারণা ছিল এই ঘ্রাণজ সংগ্রাহী (olfactory receptor) শুধুমাত্র নাকের মধ্যে থাকে। কিন্তু তার কিছুদিন পরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে অন্যান্য টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর খোঁজ পাওয়া যেতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৯২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের কথা। তাতে ব্রাসেলসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কুকুরের শুক্রাণুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। তবে তা শুধু তৈরি হয়েই বসে আছে, নাকি কোনো কাজ করছে সেটা তখনো অজানা ছিল।

এই ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে জার্মানির রাহর বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যান্স হ্যাটস সিদ্ধান্ত নেন, মানুষের শুক্রাণুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহী আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখবেন। অনেক পরিশ্রম করে শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে তিনি

সফল হন এমনকি এটাও দেখতে পান ঘ্রাণ অণুর উপস্থিতিতে এরা ঠিক নাকের মতোই সক্রিয় থাকে। তবে প্রথমদিকে অন্যান্য বিজ্ঞাণীদের এটা বিশ্বাস করানো বেশ কষ্টকর ছিল যে নাক ছাড়াও অন্য টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহী থাকতে পারে। পরের দশকে হ্যাটসের দল এবং অন্যান্য অনেকে বিভিন্ন টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর উপস্থিতি আবিষ্কার করেন। যেমনঃ ফুসফুস, লিভার, চামড়া, হৃৎপিন্ড ও অন্ত্র। এমনকি কিছু কিছু টিস্যুতে ঘ্রানজ সংগ্রাহীগুলোই সবচেয়ে বেশি মাত্রায় প্রকাশিত জিন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বিভিন্ন টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলো কী করছে? সমস্যা হলো এদের কাজ বুঝতে হলে আগে বের করতে হবে কীসের মাধ্যমে এরা সক্রিয় হয়। মানুষের রয়েছ ৩৫০ ধরনের ঘ্রাণজ সংগ্রাহী, অন্যদিকে ইঁদুরের মধ্যে এর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার। এখন পর্যন্ত গবেষকরা এদের মাত্র ১০-২০ শতাংশের জন্য সক্রিয়ক ঘ্রাণ অণু খুঁজে পেয়েছেন।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

হ্যাটস এবং তার দল স্যান্ডালোর নামের আরেকটি কৃত্রিম সুগন্ধী পেয়েছেন যার প্রভাবে চামড়াতে যেসব ঘ্রাণজ সংগ্রাহী রয়েছে সেগুলো সক্রিয় হয়। এদের সক্রিয়করণের ফলে ধারণকারী কোষগুলো উদ্দীপ্ত হয়ে দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করে এবং ক্ষত পূরণে নিযুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রেও মানবদেহে এর প্রাকৃতিক প্রতিরূপ এখনো আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে।হ্যাটস তার পরীক্ষায় জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে মানুষের পরীক্ষামূলক কোষে বিকাশিত ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলোকে হাজার রকমের ঘ্রাণ অণুর সংস্পর্শে নিয়ে আসেন। বেশিরভাগই বাণিজ্যিক কৃত্রিম সুগন্ধী যেগুলো পারফিউম এবং কসমেটিক্সে ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে তিনি একটি ঘ্রাণ অণু পেয়েছেন যেটা শুক্রাণুর ঘ্রাণজ সংগ্রাহীকে সক্রিয় করতে পারে। এই গন্ধ Lily of Valley ফুলের মতো। দেখা গেছে শুক্রাণু এই গন্ধের দিকে সাঁতার কেটে যায় এবং গন্ধের মাত্রা বাড়ালে শুক্রাণুর গতিও বাড়ে। হ্যাট অনুমান করেন, এই বৈশিষ্ট্য শুক্রাণুকে ডিম্বাণুর দিকে ধাবিত হতে প্রভাবিত করে। তবে গবেষকরা এখনো এই অণুকল্প প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় আছেন। ব্যাপারটি এখনো সর্বজন সমর্থিত নয়।

অন্যান্য টিস্যুতে পাওয়া কিছু কিছু ঘ্রাণজ সংগ্রাহীও প্রায় একইরকম কাজ করে। এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেস পাভলাথ গবেষণা করছিলেন কীভাবে একাধিক পেশীতন্তু একীভূত হয়ে বহু নিউক্লিয়াস সমৃদ্ধ কোষ তৈরি করে। সেসময় তিনি দেখতে পান পেশীতে একটি ঘ্রাণজ সংগ্রাহী বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হচ্ছে যে ব্যাপারটা হ্যাটস দেখতে পেয়েছিলেন শুক্রাণুতে।

গ্রেস বর্ণনা করেন, এই সংগ্রাহীগুলোর কারণে পেশীতন্তুগুলো একটি বিশেষ ঘ্রাণের দিকে স্থানান্তরিত হয় এবং পুনর্যোজনে (regeneration) অংশ নেয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই সংগ্রাহী ছাড়া ইঁদুরে পেশীতন্তুগুলো ক্ষয়প্রবণ হয় এবং দূর্বল পুনর্যোজন দেখায়। এই গ্রাহকের সক্রিয়ক প্রাকৃতিক প্রতিরূপ খুজে পেলে পেশী পুনর্যোজনের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে গবেষকরা বিভিন্ন ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর জন্য প্রাকৃতিক প্রতিরূপ পেয়ে গেছেন। যেমন কিডনিতে Olfr78 নামক ঘ্রাণজ সংগ্রাহী সক্রিয় হয় অন্ত্রে বসবাসরত ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা নিঃসৃত বিশেষ ধরনের

ফ্যাটি এসিডের প্রভাবে। এই সংগ্রাহী ‘শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড’-এর উপস্থিতিতে সক্রিয় হয় এবং রক্তচাপ বৃদ্ধির জন্য সংকেত পাঠায়। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলো শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড তৈরি করে যখন তারা আঁশ জাতীয় খাবার হজম করে। তাই একসময় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আঁশ জাতীয় খাবারের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

হ্যান্স হ্যাটস তার গবেষণায় এমন কিছু ঘ্রাণ সংগ্রাহী পেয়েছেন যেগুলো ক্যান্সার কোষে থাকে এবং তাদের সক্রিয় করার ফলে ক্যান্সার টিস্যুর সংকোচিত হয়ে যায়। যদিও সত্যিকারের ক্যান্সার থেরাপিতে এদের নিয়ে আসার জন্য আরো বহু গবেষণা প্রয়োজন। সুদূর ভবিষ্যতে আমরা হয়তো সুগন্ধি মেখেই ক্যান্সার দূর করতে, কেটে যাওয়া ক্ষত পূরণ করতে কিংবা প্রজনন ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হতে পারবো।

আলোয় উপশম

আমাদের চোখে অনেক ধরনের আলোক সংবেদী কোষ থাকে। এরা হচ্ছে অপসিন, রোডপসিন, মেলানোপসিন। এদের আবিষ্কার কিন্তু ধাপে ধাপে হয়েছে। যেমন ১৯৯০ সালের শেষের দিকে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইগনাসিও প্রভেন্সিও স্তন্যপায়ী প্রাণীতে মেলানোপসিন খোঁজা শুরু করেন। তখন পর্যন্ত ধারণা ছিল যে মেলানোপসিন সাধারণত উভচরের চোখে পাওয়া যায়, তাই সেসময় দৃষ্টি নিয়ে যারা কাজ করেছেন তাদের দৃষ্টিতে ইগনাসিওর কাজ ছিল নিতান্তই দূরদৃষ্টির অভাব। তবে ১০ বছর পর তিনি মানুষের রেটিনাতেও রড এবং কোন কোষে অপসিনের পাশাপাশি মেলানোপসিনের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। এর পর মানবদেহে মেলানোপসিনের কাজ সম্পর্কে ধীরে ধীরে তথ্য উন্মোচিত হতে থাকে। এটা ঘুম জাগরণ চক্র, চোখের তারার সংকোচন, দক্ষতা অর্জন এমনকি বিপাকেও ভূমিকা রাখে।

তবে রেটিনা ছাড়াও অন্যত্র যে মেলানোপসিন থাকতে পারে সেটা চমৎকার একটি ঘটনার মাধ্যমে বের হয়। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যান বার্কোভিৎজ তার ল্যাবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য স্বয়ংক্রিয় বাতি লাগান, যেগুলো মানুষের উপস্থিতিতে জ্বলে উঠে। তার এক ছাত্র একদিন লক্ষ্য করলেন গবেষণার জন্য যে রক্তনালীতে ফোর্স ট্রান্সডিউসার লাগানো যা সারাক্ষণই তথ্য দিতে থাকে, সেটাতে বাতি জ্বলে উঠলে রক্তচাপ কমে যায়!

যদিও ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফটোরিলাক্সেশন ব্যপারটার অস্তিত্ব বিজ্ঞানী মহলে পরিচিত কিন্তু অন্তর্নিহিত রহস্যটা কারো জানা ছিল না। বার্কোভিৎজ এবং তার দল এরপরে অনুসন্ধান করে সেই রক্তনালীতে মেলানোপসিন প্রোটিন এবং তার সৃষ্টির জন্য দায়ী জিন Opn4 কে শনাক্ত করেন। নীল আলোর প্রভাবে মেলানোপসিনের উপস্থিতিতে রক্তনালী প্রসারিত হয় যার ফলে রক্তচাপ কমে যায়। জেনে রাখা ভালো মেলানোপসিন নীল আলো সংবেদী এবং ঘুম জাগরণের সাথে জড়িত বলেই ঘুমানোর আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার

চিত্রঃ আলোক সংবেদী মেলানোপসিন

ইঁদুরের লেজকে নীল আলোয় আলোকিত করে দেখা যায় আসলেই তখন লেজের রক্তচাপ কমে যায়। কিন্তু ঘটনা হলো ইঁদুরের লেজের রক্তনালীগুলো চামড়ার কাছকাছি যার ফলে আলো প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ রক্তনালীই দেহের এত ভেতরে যেখানে কোনোভাবেই আলো প্রবেশ করতে পারে না। নিষেধ করা হয়।

তাহলে সেখানে এই আলোকীয় সংগ্রাহী কীভাবে কাজ করতে পারে? বার্কোভিৎজ বলেন, এটা হতে পারে বিবর্তনের পদচিহ্ন কিংবা আলো ছাড়াও দেহে এমন কিছু আছে যেটা এদের সক্রিয় করতে পারে অথবা কোনো অজানা পদ্ধতিতে দেহের ভেতরেই নীল আলো তৈরি হয় হয়তো! যা আমরা জানি না।

এর সত্যিকার কাজ সম্পর্কে সন্দেহ থাকলেও বার্কোভিৎজ চেষ্টা করছেন এমন কোনো বুদ্ধি বের করতে যাতে রক্তচাপ জনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় এই মেলানোপসিন সংক্রান্ত ফটোরিলাক্সেশনকে কাজে লাগানো যায়। রেনড’স ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঠাণ্ডার প্রভাবে হাত ও পায়ের আঙ্গুলে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়ে যায় এবং তারা অবশ কিংবা ব্যথা অনুভব করেন।

তারা এমন মোজা পড়তে পারেন যা তাদের আঙুল নীল আলোয় আলোকিত করে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করে আনবে ও ব্যথার উপশম ঘটাবে। নবজাতক শিশুরা যারা পালমোনারি হাইপারটেনশনে ভোগে তাদের ক্ষেত্রেও আলোকীয় চিকিৎসা কাজে লাগতে পারে। রক্তচাপ জনিত রোগগুলোতে বর্তমানে যেসব ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা চালানো হয় তাতে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তাই আলো হতে পারে এসব ক্ষেত্রে একটি নিরাপদ বিকল্প। তবে তার জন্য আমাদের কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তা আগে থেকেই বলা যাচ্ছে না।

স্বাদেই নিস্তার

খাওয়ার সময় যে বিভিন্ন খাবারের স্বাদ নেই, সেই স্বাদ নেয়ার কাজটি করে থাকে বিভিন্ন স্বাদ সংগ্রাহক কোষ। নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন এইবার বলবো এরা মুখ ছাড়াও দেহের অন্য কোথায় কোথায় আছে। তারা পেটের ভেতরে আছে, শুক্রাণুতে আছে, শুক্রাশয়ে আছে, চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে দেহের ভেতর এদের কাজটা বের করা। কিছু কিছু কাজ অবশ্য জানা গেছে, যেমন পেটের ভেতরে যেসব স্বাদ সংগ্রাহী আছে তারা খাবারের পুষ্টি উপাদান শনাক্ত করে। আবার কিছু কিছু কাজ অর্ধেক জানা গেছে, যেমন ইঁদুরের শুক্রাশয়ে যেসব স্বাদ গ্রাহক আছে তাদের নিষ্ক্রিয় করে দিলে ইঁদুরগুলোর প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। কেন এমন হয়? তার উত্তর জানা নেই।

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস ফিঙ্গার শুরুর দিকে মাছে একধরনের সংবেদনশীল কোষ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন যা জৈবরাসায়নিক এবং গাঠনিক দিক থেকে আমাদের স্বাদ কোড়কের সাথে সাদৃশ্যতা দেখায়। তিনি এর নাম দেন নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ (solitary chemosensory cell)। ২০০৩ সালে তিনি দেখতে পান একই ধরনের কোষ স্তন্যপায়ীদের নাকেও আছে। তবে আমাদের চিন্তা এর নিঃসঙ্গতা নিয়ে নয়। জেনে রাখা ভালো আমরা যে টক, ঝাল, মিষ্টি বিভিন্ন স্বাদ গ্রহণ করি তার জন্য আলাদা আলাদা স্বাদ সংগ্রাহী আছে। ২০০৩ সালে ফিংগার ইঁদুরের শ্বাসনালীর উপরের দিকে অবস্থিত নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষের মধ্যে তেতো স্বাদ সংগ্রাহী শনাক্ত করেন যেগুলো গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া নিঃসৃত এক ধরনের রাসায়নিকের প্রভাবে সক্রিয় হয়।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক, ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

কোহেন শনাক্ত করেন মিষ্টি স্বাদ গ্রাহক। ধারণা করা হয় এরা একই সাথে কাজ করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে।ইঁদুরে সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তীতে ফিংগার মানুষের উচ্চতর শ্বাসনালীর নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষেও তেতো স্বাদ সংগ্রাহী খুঁজে পান। অন্যদিকে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নোয়াম

গ্লুকোজ কিংবা সুক্রোজের মাধ্যমে মিষ্টি স্বাদ সংগ্রাহী সক্রিয় হলে একই কোষের তেতো স্বাদ সংগ্রাহী নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কোহেন দেখেন যে স্বাভাবিক স্বল্প মাত্রার গ্লুকোজই তেতো স্বাদ সংগ্রাহীকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। শ্বাসনালীতে ব্যাকটেরিয়া প্রধানত গ্লুকোজ খেয়ে বেঁচে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকলে গ্লুকোজ কমতে কমতে এক সময় তেতো স্বাদ গ্রাহক মুক্ত হয়ে গেলে এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। সাইনুসাইটিস কিংবা ডায়বেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শ্বাসনালীতে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকায় তারা প্রায়ই এ ধরনের সংক্রমণের শিকার হন যা সহজে সাড়ে না।

নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ ছাড়াও আরেক জায়গায় তেতো সংগ্রাহী পাওয়া যায়। উচ্চতর শ্বাসতন্ত্রে চুলের ন্যায় একধরনের কোষ থাকে যাদের সিলিয়া বলে, এরা ব্যাকটেরিয়া এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর জিনিস যুক্ত মিউকাস বাইরে বের করে দেয়। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল সিলিয়াতেও তেতো স্বাদ গ্রাহকের অস্তিত্ব পেয়েছেন যেগুলো ব্যাকটেরিয়ার খোঁজ পেলে অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া শুরু করতে পারে। এই অবস্থায় মিউকাস বের করে দেবার গতিও বাড়ে। কোহেন একটি বিশেষ তেতো স্বাদ সংগ্রাহী T2R38 নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন। ধারণা করা হয় এই সংগ্রাহীর উপস্থিতিই কিছু কিছু মানুষকে সুপার-টেস্টার বানিয়ে দেয়। এরা অতি অল্প মাত্রায় তেতো পদার্থের উপস্থিতিও সাথে সাথে ধরে ফেলতে পারে। মজার বিষয় হলো এদের সিলিয়া অতি সামান্য ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও ধরে ফেলে। ফলে ওনারা ভাগ্যবান যে তাদেরকে খুব কমই গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের শিকার হতে হয়।

কোহেন বলেন, কোনো ব্যাক্তিতে নিরাপদ তেতো পদার্থের স্বাদ গ্রহণ করতে দিয়ে বলতে পারি তিনি কতটা তেতো অনুভব করছেন। এই তথ্য থেকে খুব সহজেই বলা সম্ভব হতে পারে তিনি কতটা সংবেদনশীল। যে বেশি তেতো অনুভব করবেন, তার অনাক্রম্যতা বা প্রতিরোধ ক্ষমতা এক্ষেত্রে তত শক্তিশালী। অদূর ভবিষ্যতে এটা এমনও হতে পারে তিক্ততার মাত্রা যাচাইয়ের মাধ্যমে আক্রমণকারী অণুজীবের পরিচয় জানা যাবে। নাকের মধ্যে তেতো কিছু ঢুকিয়ে দিয়ে অনাক্রম্যতা বা শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উত্তেজিত করে চিকিৎসাও সম্ভব হতে পারে।

শ্বাসনালী ছাড়াও সাম্প্রতিক কালে পেটের ভেতরে স্বাদ সংগ্রাহী পাওয়া গেছে। এরাও অনাক্রম্যতায় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্ত্রের টাফট কোষে স্বাদ সংগ্রাহী থাকে, ধারণা করা হতো এদের কাজ হয়তো খাদ্যের সাথে কোনো বিক্রিয়া করা।

পরিশেষে অনুসন্ধ্যিৎসু মনে অনেক অনেক প্রশ্ন নিয়েই শেষ করতে হচ্ছে। তবে প্রশ্ন করতে হবে, মানুষ প্রশ্ন করতে পেরেছিল বলেই এতদূর আসতে পেরেছে। প্রচলিত গণ্ডির বাইরে এসে কেউ কেউ ভাবতে পেরেছে বলেই আমরা জানতে পেরেছি আমাদের দেহেই গণ্ডির বাইরে কত ঘটনা ঘটে। অনেক কিছুই এখনো অজানা, কীভাবে এরা সক্রিয় হয়, কী কাজ করে। তবে পরীক্ষাগারে এদের নিয়ে কাজ হচ্ছে, দিগন্তে উকি দিচ্ছে আরো চমকপ্রদ চিকিৎসা প্রযুক্তি। আমরা যদি সভ্য থাকি, বিজ্ঞান আমাদের সুন্দর একটা ভবিষ্যত উপহার দেবে, ভাবতে দোষ কি?

তথ্যসূত্র

  1. Senses in unlikely places, Sandeep Ravindran, The Scientist, September, 2016
  2. http://the-scientist.com/?articles.view/articleNo/46831/title/What-Sensory-Receptors-Do-Outside-of-Sense-Organs/