বিপ্লবী বিটটরেন্ট ফাইল শেয়ারিং এর ইতিকথা

টরেন্ট শেয়ারিং সিস্টেমের পুরোটাই মানুষের কাছে পাইরেসির মূল অস্ত্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ব্যাপারটি তা নয়। কোনোকিছু যখন কেবলমাত্র একটি খাতে অধিক পরিমাণে ব্যবহার করা হয় তখন সেটির পরিচয় বদলে যায় মানুষের মনে। বাংলাদেশে এমনও অনেক মানুষ রয়েছে যাদের কাছে ইন্টারনেট মানেই হলো ফেসবুক। ফেসবুক যে ইন্টারনেটের বড় এক পরিসরের ক্ষুদ্র এক অংশ মাত্র সে ব্যাপারে তাদের জানা নেই।

পাইরেসিতে অধিক হারে ব্যবহার হয় বলে আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছি যে আধুনিক প্রযুক্তির একটি অনন্য সংযোজন হলো টরেন্ট। টরেন্ট কেবলমাত্র পাইরেসির জন্য তৈরি হয়নি। ভিন্নমাত্রার একটি শেয়ারিং প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা থেকে জন্ম হয়েছে এর। এ প্রযুক্তিটি খুবই সূক্ষ্ম ও সুনিপুণভাবে কাজ করে- যেন একদম গল্পের মতো।

টরেন্ট শেয়ারিংয়ের বিস্তারিত বুঝতে হলে আপনাকে আগে জানতে হবে ডাউনলোডিং ও আপলোডিং এর প্রাচীন পদ্ধতিটি সম্পর্কে। এগুলো কম্পিউটারের শুরু থেকেই চলে আসছে। ইন্টারনেটের সংযোগবিহীন দুটি কম্পিউটারকে ক্যাবলের মাধ্যমে জুড়ে দিয়ে যদি আপনি কোনো ফাইল শেয়ার করতে চান, তাহলে আপনাকে এই প্রাচীন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।

প্রেরক কম্পিউটার থেকে প্রথমে একটি লিংক প্রদান করতে হবে প্রাপকক। এ লিংকটি বলে দেবে প্রেরকের কম্পিউটারের কোথায় রয়েছে ফাইলটি। ফাইলটির ঠিকানা ব্যবহার করে সহজেই প্রাপক ফাইলটি নিয়ে নিতে পারবে। এখানে প্রেরক কম্পিউটারটি ব্যবহৃত হয়েছে আপলোডার হিসেবে আর প্রাপক কম্পিউটার ব্যবহৃত হয়েছে ডাউনলোডার হিসেবে।

এক কম্পিউটার থেকে আরেক কম্পিউটারে ফাইল শেয়ারিংয়ে তেমন কোনো জটিলতা সৃষ্টি হয় না। কিন্তু যদি দেখা যায় যে একটি কম্পিউটারে এমন একটি ফাইল রয়েছে যা একশোটি কম্পিউটার ব্যবহারকারীর প্রয়োজন তাহলে কেমন হবে?

একশোটি কম্পিউটারকে আপলোডার কম্পিউটারের সাথে ক্যাবল দিয়ে যুক্ত করতে হবে। সেই কাঙ্ক্ষিত কম্পিউটারটির আপলোডের গতি একশোটি কম্পিউটারের মাঝে ভাগ হয়ে যাবে। সাধারণ একটি কম্পিউটার দিয়ে কখনোই একশোটি কম্পিউটারের এমন বোঝা বহন করা সম্ভব হবে না।

এখানেই প্রয়োজন একটি সার্ভার কম্পিউটার। এধরনের সার্ভার অনেকগুলো কম্পিউটারের অনুরোধ গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে। আপনি আপনার কম্পিউটারকে ব্যবহার করতে পারবেন একটি ওয়েবসাইটের সার্ভার হিসেবে। ওয়েবসাইট প্রকাশ করার পর ব্যবহারকারীরা যখন ওয়েব অ্যাড্রেস দিয়ে আপনার তৈরিকৃত ওয়েবসাইটটি ব্যবহারের অনুরোধ পাঠাবে আপনার কম্পিউটারে, তখন আপনার কম্পিউটার অনুরোধকারীর নিকট পাঠিয়ে দেবে ওয়েবসাইটটিকে।

অনুরোধ পাঠানোর এ কাজটি করে থাকে ওয়েব ব্রাউজার। দুই-একজনের অনুরোধে সাড়া দেবার সামর্থ্য থাকলেও যখন শতাধিক মানুষের অনুরোধ আসবে আপনার কম্পিউটারের পক্ষে তখন আর সেই অনুরোধগুলোতে সাড়া দেয়া সম্ভব হবে না। ফলে আপনার কম্পিউটার ক্র্যাশ করবে।

ডাউনলোডের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। কোনো ফাইলের মালিক একটি সার্ভার কম্পিউটারে ফাইলটিকে রেখে তার ঠিকানাটি লিংকের মাধ্যমে কোনো ওয়েবসাইট কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকেন। ফাইলটি যাদের প্রয়োজন হবে, তারা উক্ত ঠিকানা ব্যবহার করে ফাইলটিকে খুঁজে নেন। অতঃপর ডাউনলোডের জন্য অনুরোধ করেন। সার্ভার কম্পিউটার তখন ডাউনলোডে সাড়া দিয়ে ফাইলটিকে প্রেরণ করতে শুরু করে।

ডাউনলোডার যত বাড়বে, সার্ভার কম্পিউটারের ক্ষমতা আর স্পীড ধীরে ধীরে ডাউনলোডারদের মাঝে ভাগ হয়ে যেতে শুরু করবে। এখন একটি সার্ভার কম্পিউটার ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত করে দেয়া হলো। ডাউনলোডের জন্য ফাইলও রাখা হলো। ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত কোটি কোটি কম্পিউটার এবার ফাইলটির জন্য অনুরোধ করতে সক্ষম। এবার এই বিপুল চাহিদায় সাড়া দিতে হবে সার্ভারকে।

এই পদ্ধতিটির একটি বড় সমস্যা হলো ব্যান্ডউইডথ। যদিও ব্রডব্যান্ডের সহজলভ্যতা আর ফাইলের সাইজ ইদানিং মানুষকে টরেন্ট প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করছে তবুও মানুষ এখনো প্রাচীন পদ্ধতি ব্যবহার করে। সহজ-সরল পদ্ধতি বলে কথা।

যারা ব্যবহার করেন এই প্রাচীন পদ্ধতি কিংবা করতেন, তাদের একটি সমস্যা চোখে পড়ার কথা। সার্ভারে সকল ফাইলের নির্দিষ্ট ব্যান্ডউইডথ থাকে। ব্যান্ডউইডথ শেষ হয়ে গেলে আর সেটি ডাউনলোড করা যায় না। আপলোডারকে তখন নতুন করে ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাথায় রেখে ব্যান্ডউইডথের ব্যবস্থা করতে হয়।

ধরা যাক, একটি সার্ভারের ব্যান্ডউইডথ ৫০০ মেগাবাইট। ফাইলটির সাইজ হলো ১০০ মেগাবাইট। তাহলে মাত্র পাঁচজন ব্যবহারকারী এই ফাইলটিকে ডাউনলোড করতে পারবে। পাঁচবার ডাউনলোড হয়ে যাবার পর যারাই ডাউনলোডের অনুরোধ করবে, সার্ভার তখন ব্যান্ডউইডথ ত্রুটি প্রদর্শন করবে।

ফাইল শেয়ারিংয়ের শুরু থেকেই চলে আসছে এই সরলতম প্রাচীন পদ্ধতি। দিনে দিনে প্রযুক্তিখাত অনেক উন্নতি করেছে, ফাইলের আকার বেড়েছে। আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে কিন্তু ফাইল শেয়ারিং কমেনি, উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপক হারে। বেশি আকারের সাথে সাথে পুরনো পদ্ধতিতে জটিলতাও বেড়েছে।

কিন্তু প্রযুক্তি কখনো পিছিয়ে থাকেনি। সময়ের সাথে আপগ্রেড হতে দেখা গেছে একে। ফাইল শেয়ারিং প্রযুক্তি-ই বা পিছিয়ে কেন থাকবে। আপগ্রেড হয়েছে, আপগ্রেডেড ভার্সন হলো এই বিটটরেন্ট অথবা টরেন্ট প্রযুক্তি।

বহুদিন থেকেই ফাইল শেয়ারিংয়ের নতুন এক প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা সকলের মাঝে বিরাজ করছিল। বিটটরেন্ট কাজ করে peer-to-peer শেয়ারিং এর দ্বারা। peer কী জিনিস, এই প্রশ্ন আবার রয়ে যায়। বিটটরেন্ট সিস্টেমে একজন ডাউনলোডারকে ডাউনলোডার না বলে পিয়ার বলে উল্লেখ করা হয়। আরো মজার ব্যাপার হলো, শেয়ারিং হবে peer-to-peer, অর্থাৎ ডাউনলোডার থেকে ডাউনলোডারের কাছে।

বাফালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা কম্পিউটার প্রোগ্রামার ব্র্যাম কোহেন ভাবলেন, কেবলমাত্র একটি সার্ভার থেকে সকল ব্যবহারকারী ফাইল সংগ্রহ করে থাকে, কেমন হবে যদি সংগ্রহকারী প্রত্যেকেই একেকজন সার্ভারের মতো কাজ করতে পারে। অর্থাৎ যাদের ডাউনলোড শেষ হয়ে যাবে তারা আবার অন্যদের অনুরোধে সাড়া দিতে শুরু করবে। এটিই হলো মূল ধারণা। এর উপর ভিত্তি করেই করেই ব্র্যাম কাজ করতে শুরু করেন।

ধারণাটি সরল কিন্তু এতে জটিলতাও রয়েছে প্রচুর। অনেকগুলো সমস্যা সামনে চলে আসে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করতে হলে। যেমন, একটি সাধারণ কম্পিউটার কখনোই সার্ভারের মতো অনুরোধ সামলাতে পারবে না, এতে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকবে। সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া একটি পূর্ণাঙ্গ ফাইল থেকে কীভাবে অর্ধেক ডাউনলোড হওয়া আরেকটি কম্পিউটার বাকি অর্ধেক ডাউনলোড করবে, কম্পিউটার তো বুঝবে না কতটুক পাওয়া যাবে।

তাছাড়া সার্ভারের মতো কাজ করতে হলে একটি কম্পিউটারকে পুরোপুরি ডাউনলোড শেষ করতে হবে, অন্য সকল অনুরোধের চাপে এই কাজটিও সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়াবে। একটি কম্পিউটার ডাউনলোড শেষ করেছে এই সংবাদটি-ই বা কীভাবে অন্য ডাউনলোডারদের কম্পিউটারে পৌঁছাবে। সুন্দর আইডিয়া কিন্তু সমস্যা বেশ জটিল। জটিল হবার কারণ হলো প্রাচীন ফাইল শেয়ারিং পদ্ধতির প্রোটোকল।

সার্ভার থেকে ব্যবহারকারীদের ফাইল ডাউনলোড
পিয়ার-টু-পিয়ার শেয়ারিং

প্রোটোকলের ব্যাপারে কিছু বলে নেয়া উচিৎ। প্রোটোকলকে ফাইল শেয়ারিংয়ের আইনব্যবস্থা বলা যেতে পারে। ওয়েব ব্রাউজিং আর ফাইল শেয়ারিংয়ের নিয়মকানুন লিপিবদ্ধ থাকে এতে। এটি মেনে চলে সার্ভার ও ওয়েব ব্রাউজার। কয়েকটি প্রোটোকল হলো HTTP (Hyper Text Transfer Protocol), HTTPS (Hyper Text Transfer Protocol Secured), FTP (File Transfer Protocol) ইত্যাদি। ইন্টারনেট ব্রাউজিং এর সময় সবাই HTTP কিংবা HTTPS ব্যবহার করে থাকে। তবে FTP শব্দটিও কিন্তু আপনাদের অপরিচিত নয়।

যারা ব্রডব্যান্ড ব্যবহার করেন তাদের কাছে অতি পরিচিত শব্দ হলো FTP Server। আপনার ব্রডব্যান্ড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে আপনার কম্পিউটার ক্যাবলের মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত রয়েছে, তাই আপনি তাদের নির্দিষ্ট যেকোনো ফাইলের মধ্য থেকে পছন্দের ফাইল ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।

এখানে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ ব্যবহার করতে হচ্ছে না কেননা সরাসরি ক্যাবল দিয়ে আপনার কম্পিউটার সার্ভারের সাথে যুক্ত। ঠিক এজন্যই আপনি নির্ধারিত স্পীডের থেকেও অনেক বেশি স্পীড পেয়ে থাকেন FTP সার্ভার থেকে ডাউনলোডের সময়।

Peer-to-peer শেয়ারিংয়ের সমস্যাগুলো সমাধানে প্রথমবারের মতো নতুন এক প্রোটোকল লেখার কাজে হাত দিলেন ব্র্যাম কোহেন। এই ফাইল শেয়ারিং ব্যবস্থাটি একটি ফাইলকে কয়েক ভাগে ভাগ করে নেয়। বলা যায় Bit বাই Bit ভাগ। এজন্যই প্রযুক্তিটির নাম হয়ে দাঁড়ায় Bittorrent।

প্রোটোকল লেখার পর এবার নির্ধারিত ব্রাউজার প্রোগ্রাম তৈরিতে হাত দিলেন ব্র্যাম। ওয়েব ব্রাউজার সবগুলো কাজ করে HTTP, HTTPS কিংবা FTP প্রোটোকলে। নতুন প্রোটোকল মেনে চলবে এমন এক ব্রাউজার প্রয়োজন ব্রামের। ব্রাউজারটি হলো সকলের পরিচিত Bittorrent Software।

যারা চিনতে পারেননি তারা হয়তো মাইক্রোটরেন্ট সফটওয়্যারটির সাথে পরিচিত। এই মাইক্রোটরেন্ট কিংবা যেটাকে হয়তো ইউটরেন্ট বলে বলেই অভ্যস্থ আপনি, বিটটরেন্ট প্রযুক্তিতে খুবই বিখ্যাত। তবে এটি ইউটরেন্ট নয়, ইউ এর মত দেখে সিম্বলটিকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘মাইক্রো’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে মাইক্রোটরেন্ট আর বিটটরেন্ট ব্রাউজার দুটোই বিটটরেন্ট কর্পোরেশনের অধীনে রয়েছে। এছাড়াও Deluge এবং BitLord এগুলো মোটামুটি পরিচিত টরেন্ট ক্লায়েন্ট অর্থাৎ বিটটরেন্ট ব্রাউজার।

বহুল ব্যবহৃত ও বিখ্যাত মাইক্রোটরেন্ট

বিটটরেন্ট প্রযুক্তিতে আরেকটি টার্মিনোলজি হলো ‘ট্র্যাকার’। ট্র্যাকারের কাজ হিসেবে বলা যায়- সার্ভার, ক্লায়েন্ট, পিয়ার সবাইকে পরস্পরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। সকল টরেন্ট ফাইলেই ট্র্যাকার থাকে।

টরেন্ট ফাইলের কথা যেহেতু এসেছে, একটি ব্যাপারে বলে ফেলা যাক। আপনার কাঙ্ক্ষিত ফাইলটির জন্য টরেন্ট ব্রাউজারকে আপনি আদেশ দেবেন একটি ফাইলের মাধ্যমে। এই ফাইলটির ফরম্যাট হলো ‘টরেন্ট’। এখান থেকেই মানুষের মুখে মুখে টরেন্ট ডাউনলোডিং কথাটি চলে এসেছে।

আরো একভাবে আপনি আদেশ দিতে পারবেন, ম্যাগনেট লিংক এর সাহায্যে। টরেন্ট ফাইল কিংবা ম্যাগনেট লিংক দুটিই কাজ করে থাকে চুম্বকের মতো। চুম্বক যেমন লোহাকে আকর্ষণ করতে শুরু করে, তেমনই ব্রাউজার এই টরেন্ট অথবা ম্যাগনেটকে ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফাইলটির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ ডাউনলোড করে।

ইন্টারনেট যুক্ত সকল কম্পিউটারে সংরক্ষিত পূর্ণাঙ্গ ফাইল থেকে ডাউনলোড করে করে এক জায়গায় একত্র করতে শুরু করে। হাজার হাজার কম্পিউটার থেকেও অল্প অল্প করে গ্রহণ করে নিতে সক্ষম এই টরেন্ট। এজন্য সকল অবস্থাতেই টরেন্ট শেয়ারিং সুবিধাজনক।

ধরা যাক, ১০ মিটার লম্বা একটি লাঠি ডাউনলোডের উদ্দেশ্যে কম্পিউটারে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দিয়ে টরেন্ট তৈরি করা হলো। এতে নির্দিষ্ট ট্র্যাকারও যুক্ত করা হলো। টরেন্ট ফাইল তৈরির সময়ই ব্রাউজার এই লাঠিকে দশ ভাগে ভাগ করে ফেললো। প্রতি ভাগে ১ মিটার করে পড়েছে, প্রতি ভাগের নাম প্রথম, দ্বিতীয়… দশম দেয়া যাক।

তিনজন মানুষের এই লাঠিটি ডাউনলোড করা প্রয়োজন। তিনজন মানুষ ডাউনলোড শুরু করলো। তিনজনই প্রথম খণ্ড থেকে ডাউনলোড শুরু করবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি আপনার টরেন্ট ব্রাউজারে কোনো ফাইল সিলেক্ট করে নিচের দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন, বড় একটা বার ধীরে ধীরে পূর্ণ হচ্ছে, কোথাও ব্লক আছে, কোথাও ফাঁকা। সেগুলো ধীরে ধীরে পূর্ণ হচ্ছে।

প্রথমজন চতুর্থ, সপ্তম, দশম খন্ডগুলো ডাউনলোড করলো; দ্বিতীয়জন প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় খণ্ড ডাউনলোড করলো; তৃতীয়জন পঞ্চম, ষষ্ঠ, অষ্টম, নবম খণ্ডগুলো ডাউনলোড করে নিলো। এবার কিন্তু আর সার্ভারের প্রয়োজনই নেই। ট্র্যাকারের সাহায্য খুবই সহজে একে অপরের কম্পিউটারকে সার্ভার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করবে। পূর্ণাঙ্গ ফাইল যার কম্পিউটারে ডাউনলোড হয়ে যাবে, সে তখন সবগুলো খণ্ডের মালিক, সে সবগুলো খণ্ডের আপলোডার হিসেবে চিহ্নিত হবে।

সর্বশেষে, আরো দুটি টার্মিনোলজি ব্যাখ্যায় যেতে পারি। সীডার ও লীচার। টরেন্ট ফাইল নিয়মিত যারা ব্যবহার করেন, ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করার সময় আপনারা ফাইলের পাশে এ দুটো শব্দ দেখেছেন। আপনি যে ফাইলটি ডাউনলোড করতে চাইছেন তাকে বলা হচ্ছে সীড অর্থাৎ বীজ। অন্য যে সকল কম্পিউটারে ফাইলটি ডাউনলোড হয়েছে, এবং হবার পর আপলোড চলছে, তারা সকলেই আপলোডার বর্তমানে। তাদের সকলের মোট সংখ্যাটাই সীডার হিসেবে দেখাচ্ছে।

চিত্র: একটি ওয়েবসাইটে দেখানো সীডার ও লীচারের সংখ্যা

ঠিক একারণেই পুরনো ফাইলে সীডারের সংখ্যা শূন্য দেখায়। কারণ বেশি পুরনো হয়ে যাওয়াতে তখন কারো কম্পিউটারে সীড করা হচ্ছে না। মূল আপলোডার যদি একা সীড করেন তবুও ফাইলটি আপনার ডাউনলোডের আশা রয়েছে, কিন্তু খুবই ধীরে ধীরে, সপ্তাহও লেগে যেতে পারে। তাই অ্যাক্টিভ সীডার সংখ্যা দেখে ডাউনলোড করুন, সীডার যত বেশি হবে, আপনি তত ভালোভাবে ফাইলটি ডাউনলোড করতে পারবেন।

আর লীচার হলো এমন এক ব্যবহারকারী যিনি কোনো ফাইল কিছুটা ডাউনলোড করেছেন। ফাইলটি সম্পূর্ণ ডাউনলোড হবার আগেই তার যতটুকো আছে তা থেকে তিনি আপলোড শুরু করেছেন। অর্থাৎ এখান থেকে অন্য কেউ ফাইলের অংশবিশেষ ডাউনলোড করতে পারবে কিন্তু সম্পূর্ণটি নয়। আর টরেন্ট যেহেতু অনেকগুলো ভাগে ভাগ করা থাকে তাই অংশবিশেষ ডাউনলোডে কোনো সমস্যা নেই। অন্য কোনো ব্যবহারকারীর সাথে যুক্ত হয়ে ফাইলের বাকি অংশগুলো ডাউনলোড করে নেবে।

অনেকে আছে যারা আপলোড স্পীড কমিয়ে শূন্য কিংবা এক কিলোবাইট পার সেকেন্ডে দিয়ে রাখেন কিংবা কোনোরকমে ফাইলটি পূর্ণাঙ্গরূপে ডাউনলোড শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সীড হতে না দিয়ে ব্রাউজার থেকে টরেন্ট ফাইলটি ডিলেট করে দেন। এরা শুধু স্বার্থপরের মতো নিজের আখের গুছিয়ে কাজ করে নেন, অন্য ডাউনলোডারদের উপকারের জন্য কিছু করেন না। কেউই যদি সীড না করে, তাহলে টরেন্ট ফাইলটিকে আর ব্যবহার উপযোগী রাখা সম্ভব হবে না। তাই মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে।

বিটটরেন্ট প্রযুক্তি পুরোটাই অনেক আপগ্রেডেড, এটি সহজে পুরনো হবার মতোও না। বিটটরেন্টকে মূলত ব্যবহার করা হয় পাইরেসির জন্য, তাই এর প্রতি মানুষের খানিকটা অবৈধ মনোভাব রয়েছে। তবে আপনি ইচ্ছা করলে একে বড় আকারের ফাইল শেয়ারিং এ খুব সহজেই ব্যবহার করতে পারবেন। অন্যথায় আপনার একটি সার্ভার কম্পিউটার লাগতো কিন্তু বিটটরেন্ট ব্যবস্থায় আপনি আপনার সাধারণ কম্পিউটার দিয়েই কাজটি করতে সক্ষম হবেন।

গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নতুন কোনো আপডেট উন্মুক্ত করতে কিংবা মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম ডিস্ট্রিবিউটররা নতুন ভার্সন উন্মুক্ত করতে এই বিটটরেন্ট প্রযুক্তিকেই ব্যবহার করে থাকে। এতে করে ব্যান্ডউইডথে তাদের বাড়তি কোনো খরচ নিয়ে ভাবতে হয় না, এই অর্থটুকু বরং নিজেদের কোম্পানীতেই বিনিয়োগ করা যায়। আরো অনেকভাবেই এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা সম্ভব। এ প্রযুক্তির ব্যাপারে মানুষের জানা নেই বলেই এখান থেকে সৃজনশীল কোনো ব্যবহার এখনো বেরিয়ে আসেনি আমাদের দেশে।

তথ্যসূত্র

১. https://www.howtogeek.com/141257/htg-explains-how-does-bittorrent-work/

২. https://lifehacker.com/285489/a-beginners-guide-to-bittorrent

৩. https://lifehacker.com/5897095/whats-a-private-bittorrent-tracker-and-why-should-i-use-one

৪. https://www.lifewire.com/how-torrent-downloading-works-2483513

৫. https://www.youtube.com/watch?v=urzQeD7ftbI

৬. https://www.youtube.com/watch?v=EkkFT1bRCT0

৭. https://www.youtube.com/watch?v=6PWUCFmOQwQ

featured image: faxcompare.com

জেফ বেজোসঃ অ্যামাজন ডট কমের প্রতিষ্ঠাতা

জেফ বেজোস। পড়াশোনা করেছিলেন ইলেকট্রিক্যাল এন্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। চাকরি বাদ দিয়ে অনলাইন বইয়ের দোকান হিসেবে শুরু করেন amazon.com, তারপর একে একে নতুন নতুন সংযোজন এবং কাস্টোমারের কাছে নিজের কোম্পানি আর ওয়েবসাইটের পরিচিতি বাড়ানো। সেখান থেকেই তিনি আজ ছয় অঙ্কের বেতন হাঁকান আর মালিক হয়েছেন ১০৪.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের।

image source: blog.creativewebo.com

featured image: afr.com

বন্দী হবে গ্রহাণু

গ্রহাণুদেরকে একসময় মহাকাশের ভিলেন হিসেবে দেখা হতো। জ্যোতির্বিদরা দূর নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির কোনো ছবি তুলতে গেলে সেখানে প্রায় সময় ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কোনো এক গ্রহাণু। এদের যন্ত্রণায় নির্ভুল ছবি পাওয়া যায় না। অন্যদিকে গ্রহাণুরা পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে পৃথিবীর প্রাণিজগতের জন্য বিশাল হুমকি হতে পারে। পৃথিবীতে প্রতাপের সাথে দাপিয়ে বেড়ানো ডায়নোসরদের সমস্ত প্রজাতি তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে পৃথিবীতে গ্রহাণুর আছড়ে পড়ার কারণেই।

কিন্তু সময় এখন পাল্টেছে। গ্রহাণু হতে পারে মহাকাশ গবেষণার চমকপ্রদ এক বিষয়। আমাদের সৌরজগতের উৎপত্তি বিকাশ ও বিবর্তনের অনেক তথ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে গ্রহাণু নিয়ে গবেষণা-বিশ্লেষণ করলে। ভবিষ্যতের মহাকাশ বাণিজ্যের এক উল্লেখযোগ্য উপাদান হবার সম্ভাবনা আছে এই গ্রহাণুর।

image source: cnet.com

জাপানের হায়াবুসা মহাকাশযান ২০১০ সালে একটি গ্রহাণু থেকে কিছু পরিমাণ ধূলিকণা নিয়ে ফিরে এসেছিল। নাসা এর চেয়েও বড় এক প্ল্যান করেছিল। একটি মহাকাশযানের মাধ্যমে গ্রহাণু থেকে বড় আকারের নুড়ি নিয়ে আসা ছিল এ প্ল্যানের অংশ। কিন্তু পরবর্তীতে এই প্রজেক্টে নাসার পর্যাপ্ত পরিমাণ বাজেট হয়নি, যার কারণে এটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। কিন্তু তারপরেও গ্রহাণুকে ধরা, এতে অনুসন্ধান ও গবেষণা করার যথেষ্ট ভালো কারণ আছে। নাসা এর পেছনে সময় ও লোকবল দিয়ে খাটছেও।

কীভাবে করা হবে এ কাজ

প্রথমে নাসা কর্তৃপক্ষ রাসায়নিক জ্বালানী সম্বলিত একটি রকেটের সাহায্যে একটি রোবটিক মহাকাশযান প্রেরণ করবে। পাশাপাশি থাকবে খুবই কার্যকর একটি ইলেকট্রিক প্রপালশন সিস্টেম। এই সিস্টেম প্রয়োজনের সময় মহাকাশযানকে উপযুক্ত স্থানে বয়ে নিতে পারবে। সূক্ষ্মভাবে মহাকাশযানকে গ্রহাণুর পৃষ্ঠে অবতরণ করিয়ে সেখান থেকে উপযুক্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কয়েক টন ওজনের একটি নুড়ি তুলে আনবে।

এই নুড়ি তুলে আনতে রোবটিক হাত ব্যবহার করা হবে। ভরের দিক থেকে স্বল্প হবার কারণে গ্রহাণুর অভিকর্ষীয় টান কম। অভিকর্ষীয় টান কম বলে গ্রহাণুর পৃষ্ঠে এই কাজটা করতে কষ্টকর হবে। তবে আশার কথা যে গ্রহাণুর অভিকর্ষ বল কম হলেও একদমই শূন্য নয়। চ্যালেঞ্জ নিয়ে এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।

এরপর নুড়িটিকে সযত্নে চাঁদের কক্ষপথে স্থাপন করা হবে। সম্ভব হলে পৃথিবীতে নিয়ে আসবে। একবার সফলভাবে চাঁদের কক্ষপথে স্থাপন করা গেলে পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা সহজেই ছোটখাটো মিশন নিয়ে এটি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা গবেষণা করতে পারবে।

কেন প্রয়োজন

আজকের যুগে পর্যটকরা যেমন বার্লিন, প্যারিস, কক্সবাজার, সুন্দরবন ঘুরে বেড়ায় তেমনই এমন এক সময় আসবে যখন এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহে যাওয়াও কক্সবাজার-সুন্দরবনের মতোই মামুলি ব্যাপার হয়ে যাবে। এমন ধরনের অল্প দূরত্বের বা অধিক দূরত্বের মহাকাশ ভ্রমণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হচ্ছে পানি।

পৃথিবীতে প্রচুর পানি থাকলেও সৌরজগতের অভ্যন্তরে কিংবা নাক্ষত্রিক ভ্রমণে যথেষ্ট পরিমাণ পানি উড্ডয়নের সময় মহাকাশযানের সাথে করে নিয়ে যাওয়া যায় না। প্রকৌশলগত কিছু সমস্যা আছে তাতে। বেশি পানি নিলে ওজন বেড়ে যাবে, যা মহাকাশযানকে স্বল্প সময়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে বাধার সৃষ্টি করবে।

জ্বালানীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বেশি জ্বালানী নিলে বেশি পথ ভ্রমণ করা যাবে, আবার খুব বেশি নিলে ভর বেড়ে যাবে যা প্রাথমিক মুক্তিবেগ কাটিয়ে উড্ডয়নে সমস্যা করবে কিংবা উড়িয়ে নিতে সমস্যা করবে।

image source: theweek.com

এ সমস্যার মোটামুটি একটি সমাধান দিতে পারে গ্রহাণু। গ্রহাণুগুলোতে প্রচুর পানি বরফায়িত অবস্থায় থাকে। গ্রহাণুর জ্ঞাতি ভাই ধূমকেতু তো সবটাই বরফ। বর্তমানে মহাকাশে প্রতি কেজি পানি বহনে খরচ পড়ে ১০ হাজার ডলার। গ্রহাণু থেকে পানি ব্যবহার করলে খরচের পরিমাণ কমে যাবে দশ গুণ। প্রতি কেজি পানি বহন করতে লাগবে ১ হাজার ডলার।

চিত্রঃ এভাবেই নুড়ির বড় খণ্ডকে নিয়ে আসা হবে।

এখানে উল্লেখ্য যে চাঁদের পৃষ্ঠেও বরফ আছে। কিন্তু চাঁদে বরফ থাকলেও তা থেকে বরফ মুক্ত করে কক্ষপথে নিয়ে আসা যথেষ্ট জটিল কাজ। চাঁদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে সহজে করা যাবে গ্রহাণু থেকে পানি সংগ্রহের কাজ।

একটি গবেষণায় দুই জন বিজ্ঞানী দেখিয়েছেন সৌরজগতে অনেক অনেক গ্রহাণু আছে যারা পানি বহন করে এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের জন্য এগুলো যথেষ্ট। এদের মাঝে অনেক গ্রহাণুই আছে যাদের কাছে সহজে পৌঁছা সম্ভব।  এসব গ্রহাণু থেকে বরফ সংগ্রহ করে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে উপযুক্ত স্থানে নিয়ে আসা এবং সৌরশক্তি বা যান্ত্রিক শক্তি ব্যবহার করে তাদের গলিয়ে পানিতে রূপান্তর করা প্রকৌশলগত দিক থেকে অসম্ভব কিছু না।

যথেষ্ট পরিমাণ প্রযুক্তিগত উন্নতি লাভ করলে গ্রহাণু থেকে মহাকাশযানের জ্বালানীও সংগ্রহ করা যেতে পারে। ওজন বহনের সীমাবদ্ধতার কারণে মহাকাশযানগুলো বেশি জ্বালানী নিতে পারে না, সেক্ষেত্রে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে গ্রহাণু। গ্রহাণুর বরফকে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যাবে অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন।

অক্সিজেন জ্বলতে সাহায্য করে আর হাইড্রোজেন ব্যবহার করা যেতে পারে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ক হিসেবে। যা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। যদিও হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া মানুষের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রক্রিয়াটা অনেক চ্যালেঞ্জিং। উল্লেখ্য সূর্যের সমস্ত শক্তি তৈরি হচ্ছে হাইড্রোজেনের নিউক্লীয় বিক্রিয়ার মাধ্যমেই।

অন্যদিকে  মানুষের জন্য অক্সিজেন কতটা মূল্যবান তা না বললেও চলে। পৃথিবীতে অক্সিজেন অহরহ ও সহজলভ্য হলেও মহাকাশযানে তা সহজলভ্য নয়। পৃথিবীতে যেমন না চাইলেও অক্সিজেনের সাগরে ভেসে থাকা যায় মহাকাশযানে এমন সুবিধা নেই। তাই এখানে মানবিক প্রয়োজনেও গ্রহাণু তথা অক্সিজেন খুব কাজে আসতে পারে।

আরো বেশি কাল্পনিক বাস্তবতার কথা বিবেচনা করলে চলে আসে মহাকাশে কলোনি তৈরির কথা। হাইটেক সায়েন্স ফিকশন। পৃথিবী দূষিত হয়ে গেছে তাই পৃথিবী থেকে বাইরে থাকতে হচ্ছে- এমন পরিস্থিতিতে মানুষের পক্ষে কলোনি তৈরি করা লাগতে পারে। আর কলোনি তৈরি করতে হলে অবশ্যই মাল মশলা লাগবে। এসব ইট পাথর কাঁচামালের যোগান দিতে পারে গ্রহাণুরা। হাজার হাজার বছর আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে ভবিষ্যতে আমাদেরকে সেবা দেবার জন্য।

তবে এখানে সমস্যা কিছু সমস্যা আছে। এই ধরনের মিশন প্রচুর ঝুঁকিপূর্ণ। ছোটখাটো একসিডেন্টে বড় ধরণের মূল্য দিতে হবে। তার উপর গ্রহাণু শিকারে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির দিক থেকে আরো উন্নত হতে হবে পৃথিবীকে। পৃথিবীবাসী হিসেবে এমন একটা দিনের আশা করছি যেখানে মানুষ বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-প্রকৌশলে এমন উন্নতি লাভ করবে যে গ্রহাণু শিকার করা একটা মামুলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

তথ্যসূত্র: IFLScience, University of Glasgow, NASA

কেন জন্মায় রোবটের প্রতি মায়া?

পিক্সার এনিমেশনের চমৎকার সৃষ্টি WALL-E নামের এনিমেটেড চলচ্চিত্র। এ নামে সে মুভিতে চমৎকার একটি রোবট থাকে। আদুরে রোবটটি যখন তার ভালোবাসার সন্ধানে মহাকাশের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ঘুরে বেড়ায় তখন সকলের মন ছুঁয়ে যায়। যদিও WALL-E এখানে নিছকই একটি রোবট কিন্তু তবুও তার সামান্য মানুষের মতো নিষ্পাপ চেহারাটি দর্শকদের মনের কোণে মানবিক অংশে স্থান করে নেয়। সাধারণ মানুষের বেলায় যেমন অনুভব করতো এই রোবটের বেলাতেও তেমনই অনুভব করে।

মজার ব্যাপার হলো দর্শক তার প্রতি হৃদয়ে যে সহানভূতি অনুভব করে তা শুধুমাত্র চলচ্চিত্রটির গল্প ও শৈল্পিকতার কারণে নয়। কয়েকজন মানুষের উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, একজন মানুষকে কষ্টে দেখলে আরেকজন মানুষের মস্তিষ্কে যেসব কার্যক্রম হয়, রোবটকে কষ্টে দেখলেও মস্তিষ্কে একই রকম ঘটনা ঘটে।

জার্মানির ডুইশবার্গ এশেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক fMRI ব্যবহার করলেন ১৪ জন অংশগ্রহনকারী মানুষের উপর। তাদেরকে প্রথমে মানুষ, রোবট এবং প্রাণহীন কিছু বস্তুর ভিডিও দেখানো হলো। সেসব ভিডিওতে তাদের উপর স্নেহপূর্ণ কিংবা রূঢ় আচরণ করা হচ্ছে। fMRI ব্যবহার করে বিজ্ঞানীগণ ভিডিও দেখার পর মানুষগুদের প্রতিক্রিয়া, মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ ইত্যাদি পর্যালোচনা করলেন। গবেষণা দল লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক কনফারেন্সে তাদের ফলাফল প্রকাশ করেন।

ফলাফলে দেখা যায় তারা অংশগ্রহণকারীদেরকে ডায়নোসরের মতো দেখতে Pleo নামের একটি রোবটের ভিডিও দেখান। এটিকে খাওয়ানো হচ্ছে অথবা সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে। তখন দর্শকদের মস্তিষ্কের লিম্বিক অংশ কার্যকর হয়ে উঠে। এ অংশটি অনুভূতির সাথে জড়িত। আবার একইভাবে যখন তাদের মানুষের ভিডিও দেখানো হয়, যাকে ম্যাসাজ করে দেওয়া হচ্ছে, তখনো নিউরনের প্রতিক্রিয়া আগের মতোই হয়।

image source: telegraph.co.uk

এবার উলটো ধরনের ভিডিও দেখানো হলো। মানুষ এবং রোবট উভয়ের সাথে বেশ রুঢ় আচরণ করা হচ্ছে এমন ভিডিও। তাদেরকে ঝাঁকানো হচ্ছে অথবা ফেলে দেওয়া হচ্ছে অথবা প্লাস্টিক ব্যাগ দিয়ে শ্বাসরোধ করা হচ্ছে। আশ্চর্যজনকভাবে, fMRI তে যে ফলাফল পাওয়া গেল তা হলো, মানুষকে খারাপ অবস্থায় দেখার চেয়ে রোবটকে খারাপ অবস্থায় দেখার পর অংশগ্রহনকারীদের লিম্বিক সিস্টেমের প্রতিক্রিয়া অনেক অনেক বেশি।

দেখা যাচ্ছে একজন মানুষ, অন্য মানুষ বা রোবট কিংবা উভয়ের প্রতিই সহানুভূতি অনুভব করে। আমরা এখনো ভালোভাবে জানি না এ সহানুভূতির কারণ আসলে কী।

রোবোটিক্স গবেষণায় বর্তমানে একটি বড় লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে এমন রোবট তৈরি করা। এ ধরনের রোবট বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের দেখাশোনার ক্ষেত্রে বেশ কাজে আসতে পারে। কিছু সায়েন্স ফিকশনে তো রোবটের সাথে মানুষের ঘর বাঁধাও হয়ে গেছে।

দীর্ঘ সময় ধরে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৬ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ২ জন অত্যন্ত সুন্দরভাবে রোবটের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়। তারা রোবটের সাথে কথা বলে, একটি নামে ডাকে, এমনকি তাদেরকে রোবটের সাথে হাসতেও দেখা যায়।

রোবটের জন্য সহানুভূতি হয়তো অনেকটা তাদের শারীরিক গঠনের উপরও নির্ভর করে। তাদের চেহারা, আচরণ, দুই পায়ে হাঁটে কিনা,  ইত্যাদি সবকিছু তাদের সাথে মানুষের স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপনে সাহায্য করে।

এখানে আনক্যানি ভ্যালি তত্ত্বের কথা বলা যায়। এ তত্ত্ব অনুসারে, যেসব রোবট বা অ্যানিমেশন দেখতে মানুষের মতো নয়, দর্শক তাদের কম পছন্দ করে। Roomba নামে একটি রোবটের কথা উল্লেখ করা যায়। সে ঘর সংসারের সকল কাজ করতে পারতো। একদিন সেটি আগুনে পুড়ে যায়। তার চেহারা মানুষের মতো ছিল না, কিন্তু মানুষ ঠিকই তার প্রতি সহানুভূতি অনুভব করেছে। এক্ষেত্রে দেখা যায় চেহারা মানুষের মতো না হলেও সহানুভূতি অনুভব করে মানুষ। মানব মন তথা মানব মস্তিষ্ক বড়ই রহস্যজনক।

তথ্যসূত্র: স্মিথসোনিয়ান ডট কম

featured image: bbport.ru

বিজ্ঞানী পরিচিতিঃ বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা জনকদের মধ্যে একজন। তিনি বিবিধ বিষয়ে দক্ষ ছিলেন। ফ্রাঙ্কলিন একাধারে একজন লেখক, চিত্রশিল্পী, রাজনীতিবিদ, রাজনীতিক, বিজ্ঞানী, সঙ্গীতজ্ঞ, উদ্ভাবক, রাষ্ট্রপ্রধান, কৌতুকবিদ, গণআন্দোলনকারী এবং কূটনীতিক। বিজ্ঞান বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে তার অবদানসমূহ বেশ উল্লেখযোগ্য। তিনি তড়িৎ সংক্রান্ত বিবিধ বিষয়ে তার অবদান রাখেন। তিনি বজ্রনিরোধক দন্ড, বাইফোকাল লেন্স, ফ্রাঙ্কলিনের চুলা, অডোমিটার, ফ্রাঙ্কলিন হারমোনিকা ইত্যাদি উদ্ভাবন করেন।

featured image: nps.gov

যেভাবে এলো বি-কোষ এবং টি-কোষ

উনিশ শতকের প্রথম ভাগে সবার ধারণা ছিল মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সব কিছুই আসলে অ্যান্টিবডির জারিজুরি। তবে ল্যাবরেটরিতে কিংবা হাসপাতালে দৈবাৎ কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটতো যার ব্যাখ্যা অ্যান্টিবডির ধারণা ব্যবহার করে দেয়া সম্ভব হতো না। তখন তারা ভেবে নিতো হয়তো অ্যান্টিবডি সম্পর্কেই এখনো তারা অনেক কিছু জানেন না, তাই ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তবে ১৯৫০ সালের দিকে ব্যতিক্রম ঘটনার সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে, আর উপেক্ষা করা গেল না। যেমন একজনের অঙ্গ আরেক জনের দেহে প্রতিস্থাপনের কথাই ধরা যাক। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সময় দাতা এবং গ্রহীতার মধ্যে রক্তের গ্রুপ সহ কিছু ইমিউনোলজিক্যাল ফ্যাক্টরের মিল না থাকলে গ্রহীতার দেহ দানকৃত অঙ্গটি গ্রহণ করতে পারে না। প্রতিস্থাপিত টিস্যু কিংবা অঙ্গ যখন শরীরে লাগানো হয়, তখন সে অঙ্গের কোষকে বহিরাগত ভেবে নিয়ে তার বিপরীতে সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি হয় গ্রহীতার দেহে।

দেহে কোনো এন্টিজেনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি একবার তৈরি হলে তা সাধারণত বাকী জীবন ঐ অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়ে থাকে। এমনকি সেই অ্যান্টিবডি সমৃদ্ধ রক্তরস যদি এমন কেউ গ্রহণ করে, যার দেহে সেই অ্যান্টিবডি নেই, তখন সে-ও সুরক্ষিত হতে যায়। তবে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ঘটনাটা কেমন যেন গোলমেলে।

ধরা যাক ক এবং খ দুটি ভিন্ন জাতের ইঁদুর। যখন ক ইঁদুরের দেহে খ ইঁদুর থেকে চামড়া প্রতিস্থাপন করা হয়, সম্পূর্ণ অংশটি প্রত্যাখ্যান (Graft Rejection) হতে ১১ থেকে ১৩ দিন লাগে। একই পরীক্ষা দ্বিতীয়বার করা হলে সময় লাগলো ৫ থেক ৭ দিন। সবাই ভাবলো ইমিউনোলজিক্যাল স্মৃতি সংক্রান্ত ঘটনা। তবে প্রত্যাখ্যান যদি আসলেই অ্যান্টিবডির কারণে হয়ে থাকতো, ক ইঁদুরের রক্ত রস নিয়ে তারই কোনো আত্নীয়ের দেহে প্রবেশ করানো হলে এবং তারপর খ ইঁদুরের চামড়া প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করা হলে ৫ থেকে ৭ দিন লাগার কথা। কিন্তু এবারও ১১ থেকে ১৩ দিন লাগলো।

ঘটনা এমন দাঁড়ালো যে যদিও প্রতিস্থাপিত দেহকলা প্রত্যাখ্যানের সময় অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, কিন্তু প্রত্যাখ্যানের পেছনে তেমন একটা প্রভাব রাখে না। ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন ইমিউনলজিতে এটি একটি বড় সমস্যা ছিল বহু বছর। এমনকি এর জন্য অনেকের মনে সন্দেহ হতে থাকে আসলেই দেহকলা প্রত্যাখ্যানে ইমিউন সিস্টেমের হাত আছে কিনা।

কেউই ইমিউন সিস্টেমের নতুন কোনো পদ্ধতি খুঁজতে প্রস্তুত ছিল না। কারণ কেউই জানতো না যে আসলে কী খুঁজতে হবে। কিন্তু কিছু একটা যে রয়েছে তার অস্তিত্বের প্রমাণ বিভিন্ন উৎস থেকে সামনে আসতে থাকে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক উদাহরণের উৎস কিন্তু মানুষ নয়, এমনকি ইঁদুর ও নয়। তবে? মুরগী! ব্রুস গ্লিক নামের ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র মুরগীর পরিপাকতন্ত্রের নীচের দিকে এপেন্ডিক্সের ন্যায় থলেটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। থলেটির নাম বার্সা অব ফ্যাব্রিসিয়াস।

এনাটমিতে নব্য আবিষ্কৃত কোনো বস্তুর অস্তিত্বের হেতু বোঝা না গেলে তাকে আবিষ্কারকের নামের সাথে মিলিয়ে নাম দেয়া হতো। এ জিনিসটির প্রথম বর্ণনা দেন হেরোনিমাস ফ্যাব্রিসিয়াস। আর পরে এর নাম আর পরিবর্তন করা হয়নি।

ব্রুস গ্লিক চিরাচরিত পদ্ধতিতে ভরসা রেখে বিভিন্ন বয়সের মুরগি থেকে বার্সা ফেলে দিলেন (Bursectomy) এবং অপেক্ষা করলেন কী হয় তা দেখার জন্য। কিন্তু পরীক্ষার অন্তর্গত মুরগির সাথে সাধারণ মুরগির কোনো পার্থক্য না দেখে তিনি হতাশ হলেন। যেহেতু মুরগিগুলোতে কোনো দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি নেই তাই সেগুলা স্টকে ফেরত দিয়ে দিলেন।

গ্লিকেরই আরেক বন্ধু, নাম টনি চ্যাঙ্গ-এর কিছু মুরগি দরকার পড়লো সে সময়েই। যা দিয়ে অ্যান্টিবডি উৎপাদন পরীক্ষা করে দেখাবেন অন্য ছাত্রদের। পয়সা বাঁচানোর জন্য তিনি গ্লিকের অঙ্গ কর্তিত মুরগিগুলোই নিলেন।

কিন্তু তাকেও হতাশ করে দিয়ে মুরগিগুলো যথেষ্ট বড়সড় হবার পরেও অ্যান্টিজেনের বিপরীতে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি করলো না। এ পর্যায়ে যে কেউই হয়তো গ্রহ নক্ষত্রের গুষ্টি উদ্ধার করে মুরগিগুলো খেয়ে নিতেন। কিন্তু এ দুই পাণ্ডব বাড়তি খাবারের বাইরেও বিশাল এক সম্ভাবনার আঁচ করতে পারলেন।

তারা আরেক সহকর্মীর সাথে আরো কিছু পরীক্ষা চালালেন যা থেকে প্রথমবারের মতো বোঝা গেলো অ্যান্টিবডি তৈরিতে বার্সার ভূমিকা, যা আগে কেউ জানতো না। একসাথে বসে তারা যে প্রবন্ধটি লিখলেন সেটি ইমিউনলজির ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু পৃথিবী সেটির জন্য তৈরি ছিল না তখন।

স্বনামধন্য জার্নাল সায়েন্স-এর সম্পাদকরা এটি ফিরিয়ে দেন ‘আগ্রহোদ্দীপক নয়’ বলে। শেষ পর্যন্ত পোল্ট্রি সায়েন্স জার্নাল এই প্রবন্ধটি প্রকাশ করে। প্রকাশের পরেও বেশ কয়েক বছর সেটি লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু যখন ইমিউনোলজিস্টরা এর খোজ পেলেন, সেটি হয়ে গেলো ইতিহাসের অন্যতম সংখ্যক উদ্ধৃত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ।

তাদের পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি কিন্তু এটা নয় যে বার্সেক্টমাইজড মুরগী অ্যান্টিবডি তৈরিতে অক্ষম। তারা দেখল যে অ্যান্টিবডি ছাড়াও মুরগীগুলো ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত এবং দেহকলা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। ফলাফল এটাই বলে যে অ্যান্টিজেনের সাথে বোঝাপড়ার জন্য অ্যান্টিবডিই একমাত্র উপায় নয় এবং অ্যান্টিবডির অনুপস্থিতিতেও অপ্রতিম দেহকলা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।

এই পরীক্ষাগুলোর ফলাফল মানুষকে প্রভাবিত করলো যেন তারা ইমিউন সিস্টেমে অ্যান্টিবডির বিকল্প খুঁজে বের করে যার মাধ্যমে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ কিংবা দেহকলা প্রত্যাখ্যানের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার ব্যাখ্যা দেয়া যায়। অন্যান্য গবেষক এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণও অ্যান্টিবডি ব্যতীত দ্বিতীয় ইমিউন মেকানিজমের উপস্থিতির সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করলো।

অনেক দিন পর অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেলো সেই গূঢ় গোবিন্দের। সংক্ষেপে, ইঁদুরের জন্মের পরপরই যদি দেহ থেকে থাইমাস ফেলে দেয়া হয় তখন বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া আগের মতো থাকলেও সেই ইঁদুর আর ভাইরাসের সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা দেহকলা প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। গ্লিক মুরগীর বার্সা ফেলে দেয়ার ফলে যা হয়েছিল ঠিক যেন তার বিপরীত হচ্ছে এবার।

মুরগী আর ইদুরে তো অনেক কিছুই হলো, তাহলে মানুষের ক্ষেত্রে কী ঘটলো? চিকিৎসকরা শিশুদের ইমিউনো-ডেফিসিয়েন্সির কেসগুলোতে দুই ধরনের প্যাটার্ন ধরতে পারলেন। এক ধরনের নাম ব্রুটন’স এগামাগ্লোবিউলিনেমিয়া, যাতে আক্রান্তরা অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে না। তবে তারা ভাইরাসের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রাফট রিজেক্ট করতে পারে।

তাদের অবস্থা বার্সার ফেলে দেয়া মুরগীর মতো। আরেক ধরনের রোগের উদাহরণ ডিগর্গ সিন্ড্রোম যাতে অ্যান্টিবডির প্রতিক্রিয়া কর্মক্ষম থাকলেও ভাইরাসের আক্রমণ কাবু করে দেয়, এদের সাথে থাইমাসবিহীন ইদুরের অবস্থার মিল রয়েছে।

এসবকিছু অবশেষে বুঝালো যে মেরুদণ্ডী প্রাণীর ইমিউন সিস্টেমে দুটি স্বতন্ত্র শাখা রয়েছে। এক শাখার নিয়ন্ত্রক বি-কোষ (B for Bursa)। এর কাজ অ্যান্টিবডি তৈরি করা। আরেক শাখা, যা অপেক্ষাকৃত জটিল তার নিয়ন্ত্রনে আছে থাইমাস। থাইমাস থেকে যেসব কোষ তৈরি হয়ে প্রতিরক্ষায় অংশ নেয় তার নাম টি-কোষ।

মানুষের ক্ষেত্রে বার্সা না থাকলেও, মুরগীতে বার্সা যা করে স্তন্যপায়ীতে একই কাজ করে অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো। এমন নামের ফলে শেষ পর্যন্ত বি কোষের নামের সাথে ‘বি’ রেখে দেওয়াতে মানুষ কিংবা মুরগী কেউই মনঃক্ষুন্ন হয়নি।

প্রতিবেশী গ্যালাক্সির খোঁজে

১৭৮১ সালের শুরুর দিকে চার্লস মেসিয়ের নামে একজন ফরাসী জ্যোতির্বিদ ও ধূমকেতু পর্যবেক্ষক ছিলেন। তিনি ধূমকেতুর মতো দেখতে ১০৩টি নাক্ষত্রিক বস্তুর তালিকা করেন যেন অন্যান্য ধূমকেতু পর্যবেক্ষকরা এদেরকে ধূমকেতু বলে ভুল না করে।

কারণ ধূমকেতু যখন সূর্যের কাছাকাছি থাকে তখন তার লম্বা লেজ বা পুচ্ছ দৃশ্যমান থাকে। ফলে তাদেরকে চেনা যায় সহজে। সূর্য থেকে দূরে অবস্থান করলে লেজ বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে কোনো কোনো পর্যবেক্ষক তাদেরকে ভুলভাবে নক্ষত্র বলে ধরে নেয়। তৎকালীন সময়ে উন্নত যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই তিনি এমন চমৎকার কাজ করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে উইলিয়াম হার্শেল, জন হার্শেল, লুই ড্রেয়ার প্রভৃতি বিজ্ঞানীরা এই তালিকার উন্নয়ন করেন

মেসিয়েরের তালিকার অনেকগুলো বস্তু ছিল আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কি ওয়ের ভেতরের। তবে মেসিয়েরের তালিকার অনেক বস্তুই ছিল মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির বাইরের। তাদের মাঝে একটি হলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। পরিষ্কার আকাশে খালি চোখেই একে দেখা যায়। দেখতে অনেকটা অস্পষ্ট কুয়াশাচ্ছন্ন বস্তু বলে মনে হয়।

৯৬৪ সালে পারস্যের জ্যোতির্বিদ আব্দুর রহমান আল-সুফি তার একটি বইয়ে এর কথা উল্লেখ করেন। বইতে একে ‘একটি ক্ষুদ্র মেঘ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। বইয়ের নাম কিতাব সুয়ার আল কাওয়াকিব (Book of Fixed Stars)। পরে জানা যায় এই মেঘটি আমাদের গ্যালাক্সির মতোই আরেকটি গ্যালাক্সি এবং আকৃতির দিক থেকেও এটি আমাদের মিল্কিওয়ের মতোই সর্পিল। আমাদের গ্যালাক্সির সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীও এটিই।

চিত্র: আব্দুর রহমান আল সুফি তার এক বইয়ে এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কথা উল্লেখ করেছিলেন।

মেসিয়ের, হার্শেল ও ড্রেয়ার কর্তৃক তৈরিকৃত নেব্যুলির প্রকৃতি সম্বন্ধে ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে এবং বিংশ শতকের শুরুর দিকে বড় ধরনের বিতর্ক বিদ্যমান ছিল। কেউ কেউ মনে করতো তাদের তালিকার নাক্ষত্রিক বস্তুর সবগুলোই আমাদের গ্যালাক্সিতে অবস্থিত অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করতো তালিকার কোনো কোনো বস্তুর অবস্থান আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে।

১৭৫৫ সালের দিকে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলেওছিলেন যে, কোনো কোনো গ্যালাক্সির অবস্থান অবশ্যই আমাদের আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে। তিনি আরো বলেছিলেন এসব নেব্যুলির কোনো কোনোটির আকৃতি বৃত্তাকার ডিস্কের মতো। অনেক দূরে অবস্থান করে বলে তাদেরকে অনুজ্জ্বল দেখায়।

১৯২০ ও ১৯৩০ সালের মাঝামাঝিতে আমেরিকান জ্যোতির্বিদ এডউইন পাওয়েল হাবল (১৮৮৯ – ১৯৫৩)-এর মাধ্যমে এই বতর্কের অবসান ঘটে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন অধিকাংশ নেব্যুলির অবস্থানই আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে। তিনি এমন অকাট্যভাবে তা প্রমাণ করেছিলেন যে তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার বা কোনো বিতর্ক তৈরি করার কোনো অবকাশ থাকেনি। তার মাধ্যমে মানুষের মনে মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিস্তৃত একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়। তিনি যুগান্তকারী এই প্রমাণটি করেছিলেন নেব্যুলির লাল সরণ (Red Shift) পরিমাপ করে।

চিত্র: এডউইন হাবল। ছবি: নাসা

এ সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলস শহরের কাছে মাউন্ট উইলসনে একটি ১০০ ইঞ্চি টেলিস্কোপের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। বিজ্ঞানী এডউইন হাবল ঐ সময় এটিকে ব্যবহার করার সুযোগ পান। শক্তিশালী এই টেলিস্কোপটি ব্যবহারের মাধ্যমেই তিনি প্রথমবারের মতো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির প্রকৃতি উদ্ঘাটন করেন। এই গ্যালাক্সিটিতে তিনি একটি সর্পিল আকৃতি খুঁজে পান। উল্লেখ্য আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি যে তা তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এন্ড্রোমিডার সর্পিল গঠনের অংশগুলোতে তিনি কিছু বিষম তারার দেখা পান। কিছু কিছু তারা আছে যাদের উজ্জ্বলতা একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর নিয়মিতভাবে পরিবর্তিত হয়। এধরনের তারাকে বলা হয় বিষম তারা বা Variable star। এরকম তারা অবশ্য আমাদের গ্যালাক্সিতে আরো আগেই আবিষ্কৃত হয়েছিল। এদেরকে সেফিড ভ্যারিয়েবল (Cepheid Variable) নামে ডাকা হতো। এদের মধ্যে বিশেষ কয়েকটিকে বলা হতো ডেলটা সেফাই (Delta Cephei)।

এন্ড্রোমিডার সর্পিল গঠন। ছবি: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এ ধরনের তারার উজ্জ্বলতা বাড়ে-কমে। কেউ যদি সময়ের বিপরীতে উজ্জ্বলতার লেখ চিত্র অংকন করে তাহলে নীচের চিত্রের একটি আকৃতি তৈরি হবে। উজ্জ্বলতার হ্রাস-বৃদ্ধির একটি স্পষ্ট চক্র। সম্পূর্ণ একটি চক্রকে বলা যেতে পারে পর্যায়কাল বা Period।

সময়ের সাথে বিষম তারার উজ্জ্বলতার পরিবর্তন হয়। লেখ থেকে বোঝা যাচ্ছে দ্রুত সময়ে উজ্জ্বল হয় এবং অনুজ্জ্বল হয় তুলনামূলকভাবে ধীর সময়ে। ছবি: TUFOTU

হেনরিয়েটা সোয়ান লেভিট এবং হার্লো শেপলি নামের দুজন আমেরিকান জ্যোতির্বিদ সেফিড তারার প্রকৃত উজ্জ্বলতা ও দৃশ্যমান উজ্জ্বলতার চক্রের মাঝে পারস্পরিক একটি সম্পর্ক খুঁজে পান। প্রকৃত উজ্জ্বলতা বা Intrinsic brightness হলো সেফিড তারার মূল উজ্জ্বলতা। বিজ্ঞানের ভাষায় প্রকৃত উজ্জ্বলতাকে ‘এবসোলুট লুমিনোসিটি’ বলেও ডাকা হয়।

কোনো একটি নাক্ষত্রিক বস্তু সকল দিকে যে পরিমাণ আলো বিকিরণ করে তাকে বলা হয় এবসোলুট লুমিনোসিটি। কিছু কারণবশত আমাদের চোখে এসব তারার মূল উজ্জ্বলতা ধরা দেয় না। এধরনের নাক্ষত্রিক বস্তু আমাদের চোখে আপেক্ষিকভাবে যে পরিমাণ উজ্জ্বল বলে প্রতীয়মান হয় তাকে বলে ‘এপারেন্ট লুমিনোসিটি’। টেলিস্কোপের প্রতি একক ক্ষেত্রফলে নক্ষত্র থেকে যে পরিমাণ আলো এসে আপতিত হয় তাকে বলে এপারেন্ট লুমিনোসিটি বা দৃশ্যমান উজ্জ্বলতা।

বিজ্ঞানী লেভিট ও শেপলি প্রকৃত উজ্জ্বলতা ও দৃশ্যমান উজ্জ্বলতার মাঝে যে সম্পর্ক খুঁজে পান তা লেখচিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করলে অপর পৃষ্ঠায় উল্লেখিত পরবর্তী চিত্রের মতো একটি অবস্থা পাওয়া যাবে। লেখটি একদমই সরল।

লেখ থেকে দেখা যাচ্ছে, কেউ যদি কোনো বিষম তারার উজ্জ্বলতার হ্রাস বৃদ্ধি চক্রের সময় (পর্যায়কাল) সম্পর্কে জানে তাহলে সহজেই এর প্রকৃত উজ্জ্বলতা বের করে নিতে পারবে। বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এই পদ্ধতিতেই এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে বিষম তারার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় লেভিট-শেপলি সম্পর্ক।

এখন কেউ যদি কোনো মহাজাগতিক বস্তুর দৃশ্যমান উজ্জ্বলতা এবং প্রকৃত উজ্জ্বলতা সম্পর্কে জানে তাহলে সেখান থেকে বস্তুটির দূরত্বও নির্ণয় করতে পারবে। কারণ দৃশ্যমান উজ্জ্বলতা কত হবে তা নির্ভর করে দূরত্বের উপর। বস্তুর দূরত্ব যত বেশি হবে তার উজ্জ্বলতা তত কম হবে।

এই পদ্ধতি ব্যবহার করে হাবল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি ৯ লক্ষ আলোক বর্ষ দূরে অবস্থিত। এত বেশি পরিমাণ দূরত্বে থাকলে তার অবস্থান অবশ্যই আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে হবে। কেননা আমাদের সবচেয়ে দূরে যে বস্তুটি অবস্থিত তার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ দূরে অবস্থিত এটি। উল্লেখ্য আমাদের গ্যালাক্সির বিস্তৃত ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ আলোক বর্ষ।

পর্যায়কালের বিপরীতে উজ্জ্বলতার লেখ (সোজা ঢালু রেখাটি)। P যদি হয় উজ্জ্বলতার হ্রাস-বৃদ্ধি চক্রের পর্যায়কাল তাহলে সেখান থেকে অক্ষরেখার উপর লম্ব টেনে তারাটির প্রকৃত উজ্জ্বলতা কত তা বের করা সম্ভব। ছবি: IUFOTU

পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের শেষ দিকে এবং পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে জার্মান বংশোদ্ভব আমেরিকান জ্যোতির্বিদ ওয়াল্টার বেইড (১৮৯৩ – ১৯৫০) এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন এধরনের বিষম তারা আসলে দুই প্রকার। এরা দুই ধরনের নিয়মনীতি মেনে চলে। লেভিট-শেপলি সম্পর্কের আওতার বাইরেও অনেক বিষম তারা আছে। যদিও এই সম্পর্কের মাধ্যমেই এন্ড্রোমিডার দূরত্ব পরিমাপ করেছিলেন এডউইন হাবল, কিন্তু তার পর্যবেক্ষণকৃত বিষম তারা এবং লেভিট কর্তৃক পর্যবেক্ষণকৃত বিষম তারার প্রকৃতি আসলে এক নয়।

হাবল এক্ষেত্রে পর্যায়কাল ও উজ্জ্বলতার ভুল সম্পর্ক ব্যবহার করেছিলেন। যার জন্য তার হিসেবেও ভুল ফলাফল এসেছে। পরবর্তীতে জানা যায় এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির প্রকৃত দূরত্ব দুই মিলিয়ন আলোক বর্ষ, যেখানে হাবল বলেছিলে এই দূরত্ব ৯ লক্ষ আলোক বর্ষ। তবে হিসেবে ভুল হলেও হাবলের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, এন্ড্রোমিডা নেব্যুলা আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে অবস্থিত।

তথ্যসূত্র- Islam, Jamal N. (1983), The Ultimate Fate of the Universe, Page 13-16, Cambridge University Press থেকে অনুবাদকৃত। 

featured image: outerplaces.com

নীল আর্মস্ট্রংদের বাংলাদেশ সফর

চন্দ্রজয় হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। সে বছরই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে সফরে এসেছিলেন চন্দ্রবিজয়ীরা। তেজগাঁও বিমানবন্দরে মানুষের ঢল নেমেছিল সেদিন। সে ঢলের ছবি এটি।

featured image: ibtimes.co.uk

মাল্টিপল অ্যালিল এবং পিতৃত্বের জটিলতা

রক্ত সঞ্চালন থেকে শুরু করে নানাবিধ চিকিৎসা পদ্ধতির জন্য রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরী। মানুষের ক্ষেত্রে বর্তমানে ৩৫ প্রকার ব্লাড গ্রুপ সিস্টেম থাকলেও সর্বাধিক প্রচলিত হলো ABO এবং Rh ফ্যাক্টর ব্লাড গ্রুপ সিস্টেম।

ABO সিস্টেম অনুযায়ী চার ধরনের ব্লাড গ্রুপ বিদ্যমান। A, B, AB এবং O। গ্রুপগুলো মূলত লোহিত রক্ত কণিকার কোষঝিল্লীতে বিদ্যমান গ্লাইকোলিপিডের ধরনের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। A গ্রুপের লোহিত কণিকায় একধরনের গ্লাইকোলিপিড থাকে আর B গ্রুপের ক্ষেত্রে অন্য ধরনের। AB গ্রুপে থাকে উভয় ধরনের আর O গ্রুপে থাকে না কোনোটিই।

জিনতত্ত্ব বলছে সকল বৈশিষ্ট্যের জন্য দ্বায়ী হলো জিন। তেমনই ABO ব্লাড গ্রুপের জন্যও দায়ী হলো জিন। A গ্রুপের জন্য আছে A অ্যালিল, B গ্রুপের জন্য B অ্যালিল, AB গ্রুপের জন্য A ও B উভয় অ্যালিল এবং O গ্রুপের জন্য নাল (শূন্য) অ্যালিল।

অ্যালিল আবার কী জিনিস? গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের তত্ত্ব অনুযায়ী জীবের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জন্য আছে দুটি করে অ্যালিল। উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। তবে এটি অনুধাবন করতে হলে কলেজ পর্যায়ের জিনতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকা চাই।

ধরি কোনো একটি ইঁদুরের লেজ লম্বা। লেজের দৈর্ঘ্যের জন্য জিন আছে। এর জিনোটাইপ (Tt)। এক্ষেত্রে লম্বা লেজ (T), খাটো লেজের (t) উপর প্রকট। ইঁদুরের দেহে লম্বা (T) লেজের জিন এসেছে তার পিতার জনন কোষ থেকে আর খাটো (t) লেজের জিন এসেছে তার মাতার জনন কোষ থেকে। ইঁদুরের লেজের দৈর্ঘ্যের জন্য পিতা (T) এবং মাতা (t) থেকে আগত জিন দুটির একটিকে অপরটির অ্যালিল বলে।

চিত্র: মেন্ডেলের তত্ত্ব অনুযায়ী অ্যালিল সঞ্চারণ

অর্থাৎ মেন্ডেলিয় তত্ত্ব অনুযায়ী প্রতিটি জিনের দুটি করে চেহারা বা রূপ থাকে। প্রতিটি চেহারাকে অ্যালিল বলে। এ দুটির একটি অ্যালিল আসে মাতা থেকে আর অন্যটি আসে পিতা থেকে।

কিন্তু এ নিয়ম ABO ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে গেলেই বাঁধে বিপত্তি। কেননা এখানে লোহিত রক্তকণিকার কোষঝিল্লীতে বিদ্যমান গ্লাইকোলিপিডের জন্য রয়েছে A, B এবং O মোট তিনটি অ্যালিল। তিনটি অ্যালিল কীভাবে একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে? একে মেন্ডেলিয় তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এরূপ ঘটনাকে বলা হয় মাল্টিপল অ্যালিল।

যখন কোনো একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণের জন্য দুইয়ের অধিক অ্যাালিল কাজ করে তখন তাকে মাল্টিপল অ্যালিল বলে। মজার বিষয় হলো কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্য একাধিক অ্যালিল থাকলেও ডিপ্লয়েড জীব বলে আমাদের কোষে কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের জন্য শুধুমাত্র দুটি অ্যালিল থাকা সম্ভব। মাল্টিপল অ্যালিল ব্যাপারটি সামগ্রিক পপুলেশনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

প্যাচ লেগে গেল? তাহলে একটু গল্পের মতো করে বোঝার চেষ্টা করি। ধরি বাসায় ১০ জন মানুষ আছে। সবার জন্য বিস্কুট আনা হলো বাজার থেকে। তিন ধরনের বিস্কুট আছে- অরেঞ্জ বিস্কুট, চকলেট বিস্কুট এবং লেমন বিস্কট। কিন্তু শর্ত হলো প্রতিটি মানুষ শুধুমাত্র দুটি করে বিস্কুট নিতে পারবে। এ শর্তে বিস্কুট বন্টনের পর দেখা যাবে প্রতিটি ব্যক্তির কাছে যেকোনো একধরনের দুটি বিস্কুট (অরেঞ্জ-অরেঞ্জ, চকলেট-চকলেট, লেমন-লেমন) বা দুটি ভিন্ন ধরনের বিস্কুট (অরেঞ্জ-লেমন, অরেঞ্জ-চকলেট, চকলেট-লেমন) বিদ্যমান।

তাহলে সবাই কী ধরনের খাবার পেয়েছে? বিস্কুট পেয়ছে। কিন্তু বিস্কুটের ধরন ছিল ভিন্ন। তাহলে সামগ্রিকভাবে ১০ জনের জন্য কত ধরনের বিস্কুট ছিল? তিন ধরনের। ABO ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনই এক পদ্ধতি বিদ্যমান। সকল মানুষের রক্তের জন্য A, B এবং O মোট তিনটি অ্যালিল বিদ্যমান।

আগের উদাহরণে সবার জন্য যেমন বিস্কুট ছিল তেমনই এ ক্ষেত্রেও সকল মানুষের লোহিত রক্তকণিকার জন্য আছে একটি ABO জিন। কিন্তু বিস্কুটের যেমন তিনটি ধরন ছিল তেমনই মানুষের ক্ষেত্রেও ABO জিনের ধরন তিনটি। এদের নাম হলো A, B এবং O অ্যালিল।

কিন্তু যেহেতু মানুষ ডিপ্লয়েড জীব তাই আমাদের কোষে শুধুমাত্র দুটি অ্যালিল থাকতে পারে। তাই ABO জিনের ক্ষেত্রে তিনিটি অ্যালিল থাকলেও জীনোটাইপ হবে শুধুমাত্র AA, AO, BB, BO, AB এবং OO। মানে মানুষের সামগ্রিক পপুলেশনের ক্ষেত্রে তিনটি অ্যালিল প্রযোজ্য, কিন্তু একটি মাত্র মানুষের দেহে অ্যালিল থাকবে দুটি।

চিত্র: ABO ব্লাড গ্রুপ সিস্টেমে মাল্টিপল অ্যালিল পদ্ধতিতে সন্তানে অ্যালিল সঞ্চারণ

এ নিয়ম অনুযায়ী পিতা যদি হয় A ব্লাড গ্রুপ (জিনোটাইপ AO) এবং মাতা যদি হয় B ব্লাড গ্রুপ (জিনোটাইপ BO) তাহলে সন্তানের ব্লাড গ্রুপ A, B, AB এবং O এই চার ধরনেরই হতে পারে। আর যদি পিতার জিনোটাইপ AA এবং মাতার জিনোটাইপ BO হয় তাহলে সন্তান হবে A এবং AB এই দুই গ্রুপের।

পিতার জিনোটাইপ AA এবং মাতার জিনোটাইপ BB হলে সন্তান হবে শুধুমাত্র AB গ্রুপের। পিতার জিনোটাইপ AO মাতার জিনোটাইপ BB হলে সন্তান হবে AB এবং B ব্লাড গ্রুপের। পিতামাতা উভয় O হলে সন্তান সবাই O হবে।

A ও B জিন দুটি সমান প্রকট হওয়ায় তারা একত্রে থাকলে উভয়েই সমানভাবে প্রকাশ লাভ করে এবং AB ব্লাড গ্রুপ গঠন করে। কিন্তু O জিন প্রচ্ছন্ন হওয়ায় A বা B জিনের সাথে থাকলে প্রকাশ লাভ করে না। শুধুমাত্র O জিন থাকলে প্রকাশ লাভ করে O ব্লাড গ্রুপ গঠন করে।

ABO ব্লাড গ্রুপ কি সবসময় এ নিয়ম মেনে চলে? মাঝে মাঝে এ নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম ঘটতে দেখা যায়। এ নিয়ম অনুযায়ী মাতা B এবং পিতা O ব্লাড গ্রুপ হলে সন্তান B কিংবা O ব্লাড গ্রুপের হওয়া সম্ভব। কিন্তু ১৯৯৭ সালে জাপানের এক পরিবারে দেখা গেল স্বামীর ব্লাড O আর স্ত্রীর ব্লাড B গ্রুপের হলেও সন্তানের ব্লাড গ্রুপ হয়েছে A। বাঁধল ঝামেলা, অভিযোগ আসল উনি এই সন্তানের বাবা নন!

আদালত পর্যন্ত গড়ালে পরে গবেষণা করে জানা গেল উনিই আসল বাবা। কিন্তু এই তথৈবচ ঘটনা কীভাবে ঘটল? মূলত এমন ব্যতিক্রম হয়েছে মিউটেশনের ফলে। কীভাবে? চলুন জেনে আসি।

খুব সহজে বলতে গেলে ডিএনএ’র মাঝে যেকোনো পরিবর্তন হওয়াকে মিউটেশন বলে। কোষ বিভাজনের পূর্বে ডিএনএ অনুলিপনের সময়ও ডিএনএতে কিছু পরিবর্তন সংঘটিত হয়। জন্মের সময় আমাদের দেহে গড়ে প্রায় ১০০ বা তারও বেশি সংখ্যক মিউটেশন ঘটে থাকে।

চিত্র: AO এবং BO জিনোটাইপের পিতামাতার সন্তানের ব্লাড গ্রুপ

আমরা জানি ডিএনএ নিউক্লিওটাইড নামক অংখ্য অণু দ্বারা গঠিত এবং প্রতিটি নিউক্লিওটাইডে থাকে নাইট্রোজেন বেস। জিন হলো একটি রেসিপি যে রেসিপি অনুসরণ করে প্রোটিন বা এনজাইম তৈরি করা হয়। ABO ব্লাড গ্রুপের জন্য A, B এবং O অ্যালিল দায়ী।

এ তিনটি অ্যালিলের মাঝে গাঠনিক পার্থক্যও সামান্য, তাই এদের মধ্যে সামান্য পরিবর্তন ব্লাড গ্রুপের ব্যতিক্রমের কারণ হতে পারে। A ও O অ্যালিলের মধ্যে মাত্র একটি নাইট্রোজেন বেসের পার্থক্য রয়েছে। অন্যদিকে A ও B অ্যালিলের মাঝে পার্থক্য সাতটি নাইট্রোজেন বেসে।

চিত্র: A, B এবং O অ্যালিলের গাঠনিক পার্থক্য

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে একটিমাত্র বেস কম থাকা বা সাতটি ভিন্ন বেস থাকা তেমন কিছু না। কিন্তু কার্যত প্রতিটি জিনের ক্ষেত্রে তিনটি করে বেস একটি জেনেটিক কোড হিসেবে কাজ করে। তাই যেকোনো একটি বেসে পরিবর্তন হলে সম্পূর্ণ কোডটিকেই পরিবর্তন করে দিতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, The old man had one new hat. বাক্যটিতে প্রতিটি শব্দে তিনটি করে অক্ষর আছে। বাক্যের প্রতিটি অক্ষরকে নাইট্রোজেন বেসের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

এখন যদি প্রথম শব্দ থেকে একটি অক্ষর E কমে যায় তাহলে বাক্যটি হয়, Tho ldm anh ado nen ewh am. নতুন বাক্যে যদিও তিনটি করে অক্ষর একত্রিত হয়েছে কিন্তু একটিমাত্র অক্ষর হারিয়ে গেছে বলে বাক্যটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও অর্থহীন। জিনে সামান্য মিউটেশনের ফলে অনেকটা এরূপ ঘটনাই ঘটে থাকে। অল্প একটু পরিবর্তনে বিশাল ফলাফল।

এরকম এক মিউটেশনের ফলেই A ব্লাড গ্রুপ থেকে O ব্লাড গ্রুপের আবির্ভাব হয়েছে। সদূর অতীতে A ব্লাড গ্রুপের জিনের মিউটেশনের ফলে একটি নাইট্রোজেন বেস হারিয়ে গেলেই আবির্ভাব হয় নতুন ব্লাড গ্রুপ O এর।

তাহলে কি B ব্লাড গ্রুপ থেকে A ব্লাড গ্রুপ পাওয়া সম্ভব? হ্যাঁ, মিউটেশনের ফলে এটিও সম্ভব। ধরুণ, আবুল নামের এক ব্যক্তির ব্লাড গ্রুপ B এবং ব্লাড গ্রুপের জিনোটাইপ BO। তাহলে স্বাভাবিক নিয়ম অনু্যায়ী উনার প্রতিটি শুক্রাণুতে হয় B অ্যালিল থাকবে নয়ত O অ্যালিল। কারণ জনন কোষ হলো হ্যাপ্লয়েড তাই কেবল একটি করে অ্যালিল অবস্থান করবে।

আগেই জেনেছি যে O অ্যালিল দেখতে অনেকটা A অ্যালিলের মতো, শুধুমাত্র একটি নাইট্রোজেন বেস কম রয়েছে। তাই আবুল সাহেবের শুক্রাণু গঠনের পূর্বে যদি রিকম্বিনেশনের ফলে B ও O অ্যালিলের মাঝে অংশ বিনিময় হয়, তাহলে O অ্যালিল তার হারানো নাইট্রোজেন বেস ফিরে পেয়ে A অ্যালিল রূপে কাজ করতে পারে। এরূপ মিউটেশন হলে আবুল সাহেবের শুক্রাণু A অ্যালিল বহন করবে। এটি তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব ছিল। এই শুক্রাণু A বা O অ্যালিল বিশিষ্ট্য ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হলে A ব্লাড গ্রুপের সন্তান গঠন হবে।

চিত্র: BO জিনোটাইপের ব্লাডে মিউটেশনের ফলে A গ্রুপ সৃষ্টি

পূর্বে উল্লিখিত জাপানী দম্পতির ক্ষেত্রে ঠিক এরূপ ঘটনাই ঘটেছিল। এ দম্পতির মাঝে স্বামীর যেহেতু ব্লাড গ্রুপ O তাই তার সকল শুক্রাণু O অ্যালিল বহন করবে। কিন্তু স্ত্রীর ব্লাড গ্রুপ B বলে চিত্রে উল্লিখিত মিউটেশন হলে তার ডিম্বাণু B বা O এর পরিবর্তে A অ্যালিল বিশিষ্ট্য হতে পারবে। আবুল সাহেবের মতো একই মিউটেশনের ফলে স্ত্রীর ডিম্বাণু A অ্যালিল বহন করে যা স্বামীর O অ্যালিল বিশিষ্ট্য শুক্রাণুর সাথে মিলিত হয়ে A ব্লাড গ্রুপের সন্তান গঠন করে। যদিও তাত্ত্বিকভাবে সন্তানের B বা O ব্লাড গ্রুপ হওয়ার কথা ছিল।

চিত্র: জাপানী দম্পতির ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ব্যতিক্রম ঘটনা

শেষ বেলায় আরো একটি তথ্য দিতে চাই। শুধুমাত্র ABO ব্লাড গ্রুপ নয়, অন্য কোনো জিনের ক্ষেত্রেও মিউটেশন বা রিকম্বিনেশনের ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে ব্যতিক্রম ঘটনা দেখা যেতে পারে।

উদ্ভিদজগতের অজানা দশ

১. ৮০ হাজারেরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ খাবার যোগ্য

আশ্চর্য হলেও সত্য। ৮০ হাজারেরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ খাওয়ার জন্য উপযোগী। যদি কখনো নতুন কোনো সবজি বা ফল খাওয়ার শখ হয় তাহলে চিন্তা করার কিছু নেই, পৃথিবীর আনাচে কানাচে আপনার জন্য এখনো অনেক সুস্বাদু সবজি ও ফল অপেক্ষা করছে। সেসবের অধিকাংশ আপনি চোখেও দেখেননি।

২. মানুষের ৯০ শতাংশ খাবার আসে মাত্র ৩০টি গাছ থেকে

এটিও যথেষ্ট আশ্চর্যজনক। যেখানে খাওয়ার মতো প্রায় ৮০ হাজারেরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে সেখানে আমরা খাদ্য নির্বাচন করছি মাত্র ৩০টি গাছ থেকে। এক্ষেত্রে আপনি যদি ভেবে থাকেন এই ৩০টি উদ্ভিদের খাদ্য গুনাগুণ সবচেয়ে বেশি তাই আমরা এগুলো বেশি খেয়ে থাকি, তাহলে সেটিও কিন্তু আপনার সম্পূর্ণ ভূল ধারণা। কারণ…

৩. খদ্য গুনাগুণ নয়, সহজলভ্যতার ভিত্তিতে উৎপাদিত হয় শস্য

অধিকাংশ কৃষকই ফসল উৎপাদনের সময় খাদ্যগুণের কথা চিন্তা করে না, করে আর্থিক লাভ লোকসানের হিসাব। যে ফসলগুলো সহজে এবং সল্প সময়ে বেশি উৎপাদন করা যায় সেগুলোই সাধারণত উৎপাদিত হয়ে থাকে। ফলে অধিকাংশ পুষ্টিকর ফল ও শাকসবজিই আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

৪. ৭০ হাজারেরও বেশি উদ্ভিদে রয়েছে ভেষজ গুনাগুণ

রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রেও উদ্ভিদকূলের বৈচিত্র্য কোনো অংশে কম নয়। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এদের অবদান অনেক। চিকিৎসার জন্য বর্তমানে যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয়ে থাকে তাদের অর্ধেকেরও বেশি আসে কোনো না কোনো উদ্ভিদ থেকে। এসব ওষুধী উদ্ভিদের বেশির ভাগই হলো রেইন ফরেস্ট অঞ্চলের। কিন্তু রেইন ফরেস্ট থেকে অধিকাংশ ভেষজ উদ্ভিদ এসে থাকলেও সেগুলো সম্পর্কে এখনো জানার আছে অনেক কিছু। কারণ…

৫. রেইন ফরেস্টের মাত্র ১শতাংশ উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে

চিকিৎসা ও ওষুধের জন্য রেইনফরেস্টগুলো স্বর্গস্বরূপ। সঠিকভাবে গবেষণা করতে পারলে এখনো এমন সব ওষুধ তৈরি করা সম্ভব যা দিয়ে নতুন এবং পুরাতন অসংখ্য রোগের চিকিৎসা ত্বরান্বিত হবে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো এ সম্ভাবনা দিন দিন কমেই যাচ্ছে। কারণ…

৬. ইতোমধ্যে বিশ্বের ৮০ শতাংশ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে

৮ হাজার বছর আগেও যেসব বনাঞ্চল সারা বিশ্ব জুড়ে কর্তৃত্ব করতো তার অধিকাংশই আজ বিলুপ্ত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের ৫ ভাগের ৪ ভাগই মানুষ নিজ হাতে ধ্বংস করেছে। এখান থেকে একটি ব্যাপার অনুধাবন করা যায়। ঐ ৮০ শতাংশ বনাঞ্চল ধ্বংস করার সাথে সাথে আমরা এমন অসংখ্য প্রজাতির উদ্ভিদ ধ্বংস করেছি যাদের সাথে আমরা হয়তো ঠিকমতো পরিচিতও হতে পারিনি। মাঝে মাঝে এক্ষেত্রে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কথা বলা হয়। কিন্তু তা-ও ফলপ্রসূ নয়। কারণ…

৭. মাত্র ১০ শতাংশ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল সংরক্ষণ করা হয়েছে

পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য মাত্র ১০ শতাংশ প্রাকৃতিক বনাঞ্চলকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এখানেও রয়েছে কিছু সমস্যা। মানবসৃষ্ট বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ দূষণ প্রতিনিয়ত জলবায়ু পরিবর্তন করছে। এসব দূষণের প্রভাব সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোতেও পড়ছে। ফলে সংরক্ষণ করার পরও বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়াও উদ্ভিদের বিভিন্ন প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখা আরো কঠিন। কারণ…

. অর্ধেকেরও বেশি প্রজাতি কেবলমাত্র তার নিজস্ব অঞ্চলে টিকতে পারে

বেশিরভাগ উদ্ভিদের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যে উদ্ভিদ পৃথিবীর এক প্রান্তে পাওয়া যায় সেটি অন্য প্রান্তে পাওয়া যায় না। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে নিলে তারা টিকেও থাকতে পারে না। যে হারে উদ্ভিদের বাসস্থান ধ্বংস করা হচ্ছে তাতে কমই আশা করা যায় যে তারা অন্য কোনো এলাকায় হলেও টিকে থাকবে।

৯. পরিচিত উদ্ভিদের ৬৮ শতাংশ আজ বিলুপ্তির হুমকিতে

বিজ্ঞানীরা মোট উদ্ভিদের ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে গবেষণা করতে পেরেছেন। সেই ক্ষুদ্র অংশেরই ৬৮ শতাংশ উদ্ভিদ নিকট ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হয়ে যাবার হুমকির মুখে রয়েছে। উদ্ভিদরা চলাচল করতে পারে না, তাই তাদের বাসস্থানগুলো যখন ধ্বংস করে দেয়া হয় তখন তারা এক স্থান থেকে উঠে গিয়ে অন্য স্থানে আশ্রয়ও নিতে পারে না। তাই প্রাণীকূলের তুলনায় উদ্ভিদকূলের জন্য টিকে থাকা যথেষ্ট কঠিন। আর এ কারণেই…

১০. উদ্ভিদ তার স্বাভাবিক প্রকৃতি থেকে প্রায় ৫ হাজার গুণ দ্রুত গতিতে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে

কেউ কেউ হয়তো বলে থাকবেন, মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া এমনিতেও একসময় না একসময় উদ্ভিদ প্রজাতিগুলো বিলুপ্ত হতো। যেমনটি আগেও হয়ে এসেছে। কথাটি আসলেই সত্য। উদ্ভিদ প্রজাতিগুলো সময়ের সাথে সাথে হয়তো একসময় বিলুপ্ত হতো। এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু চিন্তার বিষয় সেটি নয়, চিন্তার কারণ হলো বিলুপ্তির হার।

বর্তমানে উদ্ভিদ প্রজাতিগুলো তাদের স্বাভাবিক নিয়মের তুলনায় কয়েক হাজার গুণ দ্রুতগতিতে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এটি পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের জন্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখার জন্য বড় ধরনের হুমকি। আর দুঃখজনক হলেও সত্য, এই পরিস্থিতির জন্য আমরা মানুষেরাই দায়ী।

তথ্যসূত্র- ইকোওয়াচ

শ্লথ কেন শ্লথগতির?

থমাস জেফারসন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট। ১৭৭৬ সালে কর্ণেল স্টুয়ার্ট একটি বক্সে করে তাকে ফসিল হয়ে যাওয়া কোনো এক অজানা প্রাণীর অস্থি পাঠান। ভার্জিনিয়ার একটি গুহার ভেতর এই অস্থিগুলো পাওয়া গিয়েছিল।

অস্থিগুলোর ভেতরে বেশ দীর্ঘ ও ধারালো নখযুক্ত পায়ের হাড় থাকায় তিনি ধরে নিয়েছিলেন এগুলো কোনো সিংহের ফসিলের অংশ। তাই ১৭৯৭ সালের মার্চে ফিলাডেলফিয়াতে অনুষ্ঠিত হওয়া আমেরিকান ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির কনফারেন্সে জেফারসন Certain Bones শিরোনামে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেই প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করেন এগুলো বড় আকৃতির কোনো সিংহের অস্থি।

এদের মধ্যে ধারালো নখর বিশিষ্ট অস্থি থাকায় তিনি সিংহের নামকরণ করেন Megalonyx, যার সরল অর্থ Giant Claw। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো জেফারসনের বাক্সের হাড়গুলো কিন্তু সিংহের ছিল না। সেগুলো এসেছিল বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া দানবাকৃতির শ্লথ হতে।

ডাঙ্গায় ঘুরে বেড়ানো প্রাগৈতিহাসিক শ্লথগুলোর আবির্ভাব হয়েছিল প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বছর আগে। উত্তর, দক্ষিণ আর মধ্য আমেরিকা মহাদেশের প্রায় পুরোটা জুড়ে বেশ কয়েক প্রজাতির শ্লথ দেখতে পাওয়া যেত। তখনকার Megalonychidae গোত্রের কিছু শ্লথ এখনো টিকে আছে যেগুলোর আকার বড়সড় বিড়ালের মতো। কিন্তু শ্লথের অধিকাংশ প্রজাতিগুলোই ছিল দানবীয় আকারের। পরবর্তীতে গবেষকরা দেখতে পান, জেফারসনের কাছে যে শ্লথের যে অস্থিগুলো গিয়েছিল সেগুলো ছিল Megalonyx গণের অন্তর্ভুক্ত।


চিত্র: জেফারসন এই ফসিল হয়ে যাওয়া অস্থিগুলোই পেয়েছিলেন

এদের ওজন ছিল প্রায় টন খানেক। এর চেয়েও বড় ছিল Megatherium গণের শ্লথগুলো। এরা ওজনে ছিল প্রায় ছয় মেট্রিক টন আর আকার আকৃতিতেও ছিল প্রমাণ সাইজের হাতির সমান। তারা নিজেদের বাহুর ওপর ভর দিয়ে জঙ্গল কিংবা সাভানার ভেতর দিয়ে চলাফেরা করে বেড়াত। তীক্ষ্ম ও ধারালো নখগুলো তাদের খাবার খেতে ও গাছে উঠতে সাহায্য করত।

চিত্র: Megalonychidae গোত্রভুক্ত শ্লথ

শ্লথেরা বিবর্তনের ধারায় বেশ কয়েক মিলিয়ন বছর টিকে ছিল। কিন্তু প্রায় দশ হাজার বছর আগ থেকে অন্যান্য বেশ কিছু দানবাকৃতির প্রাণীর সাথে সাথে বিলুপ্ত হতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন আসন্ন বরফ যুগ কিংবা ঐ অঞ্চলে ধীরে ধীড়ে মানুষের অনুপ্রবেশের ফলেই স্থলচর দানবাকৃতির শ্লথেরা বিলুপ্ত হতে শুরু করে।

শ্লথেরা উদ্ভিদভোজী হওয়ায় গাছের শীর্ষে তারা খাবার জন্যে প্রচুর পাতার সরবরাহ পায় আর গাছের শীর্ষদেশে থাকলে যেকোনো শিকারি প্রাণী সহজে তাদের আক্রমণ করতে পারবে না- মূলত এই দুটি সুবিধা থেকেই কিছু ছোট আকৃতির শ্লথ গাছের শীর্ষদেশে উঠে সেখানেই বসবাস করতে শুরু করে।

উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার রেইনফরেস্টে বর্তমানে মাত্র ছয় প্রজাতির শ্লথ টিকে আছে।

চিত্র: মানুষের সাপেক্ষে স্থলচর শ্লথগুলোর আকৃতির তুলনা

শ্লথগতির ইতিবৃত্ত

প্রাণীরা খাদ্য থেকে শ্বসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি (ATP) উৎপাদন করে। এ শক্তিই তাকে দৈনন্দিন জীবনের সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সাহায্য করে। এ শক্তির মাধ্যমেই প্রাণী তার সকল জৈবনিক ক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে পরিবেশে টিকে থাকে। তাই শ্বসন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ প্রাণী কর্তৃক গৃহীত খাদ্যের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে।

বিবর্তনের ধারার একটা সময়ে গাছের শীর্ষদেশে বসবাস শুরু করতে থাকা শ্লথ ধীরে ধীরে সে পরিবেশেই অভিযোজিত হতে থাকে। সেই খাদ্যাভ্যাসেই তারা অভ্যস্ত হয়ে যায়। বিশেষত Bradypus গণের শ্লথগুলো খাদ্যের জন্য শুধুমাত্র গাছের পাতার উপর নির্ভর করে থাকে। গাছের পাতা থেকে প্রাপ্ত শক্তির পরিমাণ অন্যান্য ফল মূল কিংবা আমিষ খাদ্য থেকে প্রাপ্ত শক্তির তুলনায় অনেক কম। তাই শুধুমাত্র গাছের পাতা খেয়ে বেঁচে থাকা শ্লথগুলো অন্যান্য প্রাণীগুলোর তুলনায় বেশ কম শক্তি উৎপন্ন করে।

চিত্র: Bradypus শ্লথ

তাই শ্লথদের স্বল্প শক্তি দ্বারা সকল জৈবনিক কার্যাবলী সম্পন্ন করার জন্য তাদের নিজেদের শারীরবৃত্তীয় আচরণে পরিবর্তন এসেছে। সে অনুযায়ী খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্যে তাদেরকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে হয়েছে।

প্রথমত, শ্লথেরা খাদ্য থেকে নির্যাস হিসেবে সর্বোচ্চ শক্তিটুকু গ্রহণ করে। তাদের পুরো শরীরের অর্ধেকেরও বেশি অংশ জুড়ে কয়েক প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট পাকস্থলি রয়েছে। প্রজাতিভেদে একবার খাদ্য গ্রহণ করবার পর তা সম্পূর্ণরূপে পরিপাক করতে শ্লথের পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগে। এভাবে তারা খুব চমৎকার উপায়ে শক্তি সঞ্চয় করে রাখে।

দ্বিতীয়ত, দৈনন্দিন জীবনে তারা যত অল্প সম্ভব ঠিক ততটুকুই শক্তি ব্যয় করে। যেমন এরা না পারতে একদম নড়াচড়া করে না। এরা বেশিরভাগ সময়ই খাদ্য গ্রহণ করে বা বিশ্রাম নিয়ে কিংবা ঘুমিয়ে কাটায়। সপ্তাহে একবার প্রাকৃতিক কর্মের জন্য বিরতি নেয়। বিরতিকর্ম সম্পাদনের জন্য গাছ থেকে নামার সময়েও খুব ধীরে সুস্থে নড়াচড়া করে। এরা এক মিনিটে মোটামুটি পনেরো গজের মতো পাড়ি দেয়। ধীর গতির কারণে তারা মাটিতে নেমে আসলে খুব সহজেই শিকারির আক্রমণের শিকার হতে পারে।

যেহেতু শ্লথের খুব দ্রুত চলাচল করতে হয় না তাই শ্লথের খুব বেশি পেশিরও দরকার পড়ে না। প্রকৃতপক্ষে এদের সমান আকৃতির যেকোনো প্রাণীর চেয়ে এদের পেশির পরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশ কম।

নিজেদের দেহের তাপমাত্রা ধরে রাখতেও খুব বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয় না। কারণ অন্যান্য যেকোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর চেয়ে তাদের শরীরের তাপমাত্রা পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে প্রায় পাঁচ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠানামা করতে পারে।

এই শারীরবৃত্তীয় ও আচরণগত অভিযোজন এবং নিজেদের অর্জিত বৈশিষ্ট্য শ্লথের শক্তির ব্যয় কমিয়ে তা পরিমিত পরিমাণে খরচ করতে সাহায্য করে। প্রসঙ্গত, তিন পায়ের পাতা বিশিষ্ট শ্লথগুলো (Bradypus) প্রাণিজগতের সবচেয়ে ধীর বিপাক হার সম্পন্ন প্রাণী।

শ্লথের এই ধীর গতি তাদেরকে এভাবে শুধুমাত্র পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে তাই-ই নয় বরং বিভিন্ন শ্যাওলা, ছত্রাক ইত্যাদির পোষক হিসেবেও কাজ করে। শ্যাওলার আবরণ আবার বনের ভেতর শিকারির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে ছদ্মবেশ হিসেবে কাজ করে, যা তাদেরকে টিকে থাকার জন্য কিছুটা অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করে।

বিবর্তনের ধারায় শ্লথ হয়তো তার অতিকায় দানবীয় চেহারা হারিয়েছে। কিন্তু শারীরবৃত্তীয় ও আচরণগত বৈচিত্র্যের দিক থেকে শ্লথ কিন্তু কম আকর্ষণীয় নয়।

তথ্যসূত্র

  1. Goaman, Karen, and Amery, Heather. Mysteries and Marvels of the Animal World. London: Usborne, 1983: 30.
  2. Stewart, Melissa (November 2004). “Slow and Steady Sloths”. Smithsonian Zoogoer. Smithsonian Institution. Retrieved 2009-09-14.
  3. Gilmore, D. P.; Da Costa, C. P.; Duarte, D. P. F. (2001-01-01). “Sloth biology: an update on their physiological ecology, behavior and role as vectors of arthropods and arboviruses”. Brazilian Journal of Medical and Biological Research. 34 (1): 9– doi:10.1590/S0100-879X2001000100002. ISSN 0100-879X.

বিজ্ঞানী পরিচিতিঃ স্টিফেন হকিং

মাত্র ২১ বছর বয়সে শারীরিক অক্ষমতা ধরা পড়ে। সে সময় ডাক্তাররা তার আয়ু নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন ২ বছর। ত্রিশ বছর বয়সের আগেই তার নড়াচড়া করার ক্ষমতা অনেকাংশ রহিত হয়ে যায়। হয়ে পড়েন স্থবির। শেষ পর্যন্ত কেবল হাতের একটি আঙ্গুল নাড়ানোর ক্ষমতা ছাড়া সর্বতভাবে অচল হয়ে যান। সে অবস্থায় নিজের দৃঢ় মনোবল আর প্রত্যয় দিয়ে হয়েছেন জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী, হয়ছেন একজন সর্বজন নন্দিত বক্তা। তার লেখা বই বিক্রি হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ। তিনি বিখ্যাত কসমোলজিস্ট স্টিফেন হকিং।

courtesy: bigganpotrika.com

featured image: sciencemag.org

ক্ষুদ্র কণায় বিপুল শক্তি

সম্প্রতি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশও প্রবেশ করেছে পরমাণু যুগের ভেতর। ফলে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র তথা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট এখন সারা দেশের আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে যারা পরিবেশ নিয়ে ভাবছেন কিংবা যারা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে ভাবছেন তারা রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে আলোচনা করছেন।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মূলত অন্য সব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতোই। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল প্রক্রিয়া একই।[1] সবগুলোতেই ট্রান্সফরমার থাকে, জেনারেটর থাকে, টারবাইন থাকে। এদের কর্মপ্রক্রিয়াও প্রায় একই, ভিন্নতা শুধুমাত্র জ্বালানীতে।

জ্বালানী না বলে বলতে হবে শক্তির মূল উৎসতে। কোনো কোনোটিতে শক্তির উৎস হিসেবে পানির বিভব শক্তি[2] ব্যবহার করা হয়, কোনো কোনোটিতে শক্তির জন্য কয়লা কিংবা গ্যাস পুড়ানো হয় আবার কোনো কোনোটিতে অণু-পরমাণুর মাঝে লুকিয়ে থাকা বিশেষ কৌশল ব্যবহার করা হয়।

অন্যান্য তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতোই নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রক্রিয়া। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

পরমাণুর বিশেষ কৌশলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রও বলা হয়। এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরমাণুকে ভেঙে সেখান থেকে শক্তি বের করে আনা হয়। প্রশ্ন হতে পারে পরমাণুকে ভাঙলে কেন শক্তি উৎপন্ন হবে? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদেরকে উঁকি দিতে হবে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরে।

প্রকৃতিতে চার ধরনের মৌলিক বল আছে। মহাকর্ষ বল, তাড়িতচুম্বক বল, দুর্বল নিউক্লীয় বল ও সবল নিউক্লীয় বল।  এদের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী হলো সবল নিউক্লীয় বল।[3] সবল নিউক্লীয় বলের শক্তি কেমন বেশি তা একটি উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যাবে। সাধারণত ধনাত্মক চার্জ আকর্ষণ করে ঋণাত্মক চার্জকে। ঋণাত্মক-ঋণাত্মক কিংবা ধনাত্মক-ধনাত্মক চার্জ কখনো একত্রে অবস্থান করে না।

কিন্তু পরমাণুর নিউক্লিয়াসের গঠনের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সেখানে ধনাত্মক চার্জের প্রোটনগুলো একত্রে অবস্থান করছে। এটা সম্ভব হয়েছে সবল নিউক্লীয় বলের উপস্থিতির ফলে। সবল নিউক্লীয় বলের শক্তি এতই বেশি যে প্রোটনের পারস্পরিক বিকর্ষণকেও কাটিয়ে দিয়ে জোর করে বসিয়ে রাখতে পারে।[4]

প্রবল শক্তি দিয়ে ধনাত্মক চার্জের পরস্পর বিকর্ষণকারী প্রোটনগুলোকেও একত্রে আটকে রাখতে পারে। ছবি: সায়েন্স ব্রেইন ওয়েভ

কিন্তু সবল নিউক্লীয় বলের বড় ধরনের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। এটি খুবই অল্প দূরত্ব পর্যন্ত আকর্ষণ করতে পারে। এর আকর্ষণের পাল্লা খুবই কম।[5] এতই কম যে বড় আকারের পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে একত্রে রাখতে পারে না। বড় পরমাণুর বড় নিউক্লিয়াসে যদি কোনোভাবে আঘাত করা যায় তাহলে খুব সহজেই এদেরকে ভেঙে একাধিক টুকরো করে ফেলা যাবে।

একাধিক টুকরো হলে পরমাণুর আকৃতি কমে আসবে ফলে সেখানে সবল নিউক্লীয় বল দৃঢ়ভাবে প্রভাব রাখতে পারবে। বড় পরমাণুর বেলায় সবল নিউক্লীয় বলের দুর্বলতাকে ভিত্তি করেই মূলত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হয়।

যেহেতু এটি বিদ্যুৎ শক্তি বা তাপ শক্তি তাই শক্তি সম্পর্কিত কোনো না কোনো সূত্রের প্রয়োগ থাকবেই। শক্তি সম্পর্কে আইনস্টাইনের বিখ্যাত একটি সূত্র আছে। সূত্রটি খুবই সহজ, E=mc^2। সচরাচর আমরা দেখি বস্তু কখনো সৃষ্টিও হয় না ধ্বংসও হয় না। এক আকৃতি থেকে আরেক আকৃতিতে রূপান্তরিত করা যায় শুধু। চাল থেকে চালের গুড়ি করা যায়, গুড়ি থেকে রুটি তৈরি করা যায়, রুটি খাওয়া যায়, সে রুটির উপাদানগুলো দেহে মিশে একসময় ভিন্ন রূপে দেহ থেকে বের হয়ে যায়।

এক বস্তু থেকে আরেক বস্তু হচ্ছে কিন্তু ঘুরেফিরে মূল বস্তুর পরিমাণ একই থাকছে। নতুন কোনো বস্তু তৈরি হচ্ছে না কিংবা ধ্বংস হচ্ছে না। শক্তির বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় শুধু, নতুন করে তৈরি কিংবা ধ্বংস করা যায় না। যেমন মোবাইলে কথা বলকে শব্দ শক্তি রূপান্তরিত হয় যান্ত্রিক শক্তিতে, যান্ত্রিক শক্তি আবার অন্য প্রান্তের মোবাইলে গিয়ে শব্দ শক্তিতে পরিণত হয়। যেভাবেই যাক, যতগুলো ধাপ পেরিয়ে যাক মূল শক্তির পরিমাণ একই থাকছে।

এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তরিত হয় শক্তি। ছবি: স্মাগমাগ

কিন্তু আইনস্টাইনের সূত্র বলছে অন্য কথা। এ সূত্র অনুসারে নতুন করে বস্তু তৈরি কিংবা ধ্বংস করা যাবে। উল্টোভাবে নতুন করে শক্তিও তৈরি কিংবা ধ্বংস করা যাবে।  সূত্রে E হলো শক্তি আর m হলো ভর। যেহেতু ভর ও শক্তি একই সূত্রে আছে তারমানে কোনো না কোনো একদিক থেকে তারা পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অনেকে ইতিমধ্যেই ধরে ফেলেছে আইনস্টাইনের সূত্র বলছে ভরকে (অর্থাৎ বস্তুকে) শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায় এবং উল্টোভাবে শক্তিকেও বস্তুতে রূপান্তরিত করা যায়।

সূত্রে আরো একটি অংশ বাকি রয়ে গেছে, । এখানে c হলো আলোর বেগ। এটি গুণক হিসেবে ভরের সাথে আছে। আলোর বেগ অবিশ্বাস্য পরিমাণ বেশি। প্রতি সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার প্রায়। যেহেতু আলোর বেগের মান বেশি এবং এটি এখানে গুণ হিসেবে আছে, তারমানে অল্প পরিমাণ বস্তুকে রূপান্তরিত করলে প্রচুর পরিমাণ শক্তি পাওয়া যাবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সবল নিউক্লীয় বলের দুর্বলতার পাশাপাশি আইনস্টাইনের এই ভর-শক্তি সম্পর্কের সূত্রটিকেও ব্যবহার করা হয়।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম কিংবা প্লুটোনিয়াম মৌল ব্যবহার করা হয়। এ মৌলগুলোর আকার বড় হয়ে থাকে। বাইরে থেকে একটি নিউট্রন দিয়ে যদি এদের নিউক্লিয়াসে আঘাত করে তাহলে নিউক্লিয়াসটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। বিভক্ত হয়ে দুটি মৌল তৈরি করবে। মৌলের পাশাপাশি অতিরিক্ত কিছু নিউট্রনও তৈরি করবে।

নতুন দুটি মৌল এবং নতুন তৈরি হওয়া নিউট্রনের ভর একত্রে যোগ করলে মূল ইউরেনিয়াম কিংবা প্লুটোনিয়ামের ভরের সমান হবার কথা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো এখানে মূল ভর থেকে পরিবর্তিত ভর সামান্য কম থাকে। এই কম ভরটা হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়া ভরটা আইনস্টাইনের সূত্রানুসারে শক্তিতে পরিণত হয়ে গেছে।[6] এই শক্তিকে ব্যবহার করেই টারবাইন ঘোরানো হয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

নিউট্রনের আঘাতে ভেঙে যায় ইউরেনিয়াম পরমাণু। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

তবে প্রক্রিয়াটিকে যত সহজ মনে হচ্ছে বাস্তবে এটি তত সহজ নয়। ছবিটির দিকে খেয়াল করুন। প্রথম একটি নিউট্রন দিয়ে আঘাত করার ফলে পরমাণু ভেঙে আরো কতগুলো নিউট্রন তৈরি হয়েছে। সে নিউট্রনগুলো আবার অন্যান্য পরমাণুকে আঘাত করবে এবং সেসব পরমাণু থেকেও নিউট্রন অবমুক্ত হবে।

সেই নিউট্রন আবার আরো মৌলকে আঘাত করবে। এভাবে একটি চেইন বিক্রিয়ার জন্ম নেবে। এর ভয়াবহতা সহজেই আচ করার কথা। কারণ এটি সমান্তর ধারায়[7] নয়, গুণোত্তর ধারায়[8] অগ্রসর হচ্ছে। এই ঘটনাটি গুণোত্তর ধারায় অগ্রসর হবার মানে হচ্ছে একসময় শক্তির তীব্রতায় তা প্রবল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলবে।

তবে এই চেইন বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এমন কোনোকিছু যদি দিয়ে দেয়া যায় যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিউট্রনকে শোষণ করে নেবে তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ক্যাডমিয়াম নামে একটি মৌল আছে। এরা নিউট্রন শোষণ করতে পারে। নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকটরের মাঝে ক্যাডমিয়ামের রড রেখে দিলে তারা অতিরিক্ত নিউট্রনকে শোষে নিতে পারে।[9]

ক্যাডমিয়ামের নিয়ন্ত্রক রড। ছবি: টকিং আইডেন্টিটি

এখানেও কিছু জ্যামিতিক হিসেব করা যায়। রডের পরিমাণ (ক্ষেত্রফল) যদি বাড়িয়ে দেয়া হয় তাহলে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া বেশি নিয়ন্ত্রিত হবে, ফলে বিদ্যুৎ কম উৎপন্ন হবে। আবার যদি ক্যাডমিয়াম রড কমিয়ে নেয়া হয় তাহলে চেইন রিঅ্যাকশন অধিক হারে হবে, ফলে বিদ্যুৎ বেশি উৎপন্ন হবে।

কিন্তু কেউ যদি বেশি শক্তি উৎপাদনের জন্য কমাতে কমাতে বেশি কমিয়ে ফেলে কিংবা সম্পূর্ণই সরিয়ে ফেলে তাহলে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। রাশিয়ার চেরনোবিল দুর্ঘটনা মূলত নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণেই ঘটেছিল। এধরনের দুর্ঘটনায় এতই তাপ উৎপন্ন হতে পারে যে মুহূর্তের মাঝেই চুল্লিটিকে গলিয়ে ফেলতে পারবে।[10]

একটি বড় মৌলকে ভেঙে দুটি ছোট মৌল তৈরি করার এই ঘটনাকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিশন। পদার্থবিজ্ঞানে খুব গুরুত্বের সাথে নিউক্লিয়ার ফিশন আলোচনা করা হয়। এরকম আরো একটি ঘটনা আছে। দুটি ছোট মৌল একত্র হয়ে বড় একটি তৈরি করা।

একাধিক মৌল মিলে একটি মৌল তৈরি করার ঘটনাকে বলে নিউক্লিয়ার ফিউশন। এতেও প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। এর জাজ্বল্যমান উদাহরণ হচ্ছে আমাদের সূর্য। সূর্য থেকে যত ধরনের শক্তি পাই তার সবই তৈরি হচ্ছে নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে। কোনো তেল নয়, কোনো কাঠ নয়, কোনো গ্যাস নয় শুধুমাত্র নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে সূর্যের বুকে তৈরি হচ্ছে অকল্পনীয় শক্তি।

২য় বিশ্ব যুদ্ধের সময় ভয়ানক ক্ষমতার বোমা বানানোর জন্য পরমাণু প্রযুক্তির উদ্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে মানবকল্যাণে ব্যবহার করার চিন্তা ভাবনা করা হয়। ১৯৫১ সালের ২০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে দ্য এক্সপেরিমেন্টাল ব্রিডার রিঅ্যাকটর ১ থেকে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। পরবর্তীতে এই ধারণা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যায়।

বর্তমানে অনেকগুলো দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। পৃথিবীর সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদার ১৬ শতাংশ আসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে।[11] কোনো কোনো দেশে পারমাণবিক বিদ্যুতের ব্যবহার খুবই বেশি। যেমন ফ্রান্সে বিদ্যুতের সামগ্রিক চাহিদার ৭৭ শতাংশ আসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাত থেকে।[12]

অনেক দেরীতে হলেও বাংলাদেশ রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে এই দৌড়ে যুক্ত হয়েছে। এর পক্ষে বিপক্ষে অনেক মত আছে। পক্ষের মত বিপক্ষের মত উভয়েরই প্রয়োজন আছে। আমরাও চেষ্টা করবো পরমাণু বিদ্যুৎ ও রূপপুর প্রকল্প সম্বন্ধে আরো আলোচনা করতে।

তথ্য সূত্রঃ 

[1] পারমাণবিক বিদ্যুৎ সমস্যা: রূপপুর প্রকল্প ও বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র

[2] বিভব শক্তিকে বলা যেতে পারে সঞ্চিত শক্তি। বাসার ছাদের উপর যদি এক টাংকি পানি থাকে তাহলে ভূমির সাপেক্ষে পানিতে অনেকগুলো শক্তি সঞ্চিত আছে। একইভাবে সমস্ত পৃথিবী থেকে সূর্যের তাপের মাধ্যমে পানির কণাগুলো বাষ্প হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে। তারপর পানিচক্রের মাধ্যমে নদীতে আসে। নদীতে যদি বাধ দিয়ে একপাশের পানি আটকে দেয়া যায় তাহলে একপাশে পানির স্তর উপরে উঠে যাবে এবং অপর পাশে পানির স্তর নীচে নেমে যাবে। তাহলে নীচের অংশের সাপেক্ষে উপরের অংশে শক্তি সঞ্চিত আছে। উপরের পানিকে একটি টানেল দিয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে পড়তে দিয়ে তাকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। একেই বলে বিভব শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন।

[3] Fundamental Forces, http://hyperphysics.phy-astr.gsu.edu/hbase/Forces/funfor.html

[4] https://education.jlab.org/qa/atomicstructure_04.html

[5] http://aether.lbl.gov/elements/stellar/strong/strong.html

[6] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

[7] ১-এর পর ২, ২-এর পর ৩, ৩-এর পর ৪, ৪-এর পর ৫, এভাবে যোগের মতো কোনো ধারা চলমান থাকলে তাকে বলে সমান্তর ধারা।

[8] ১-এর পর ২, ২-এর পর ৪, ৪-এর পর ৮, ৮-এর পর ১৬, ১৬-এর পর ৩২ এভাবে কোনো ধারা গুণ বা সূচকের মতো চলমান থাকলে তাকে বলে গুণোত্তর ধারা।

[9] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

[10] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

[11] পারমাণবিক বিদ্যুৎ সমস্যা: রূপপুর প্রকল্প ও বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র

[12] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

featured image: oilprice.com

ফ্রিৎস হেবার: দানব নাকি দেবদূত?

১৯১৫ এর বসন্ত প্রায় শেষের পথে। বেলজিয়ামের ইপ্রা তেপান্তরে পঁচতে শুরু করেছে হাজারও যুবকের মৃতদেহ। সুরক্ষিত পরিখার নিচে গাদাগাদি করে শুয়ে রয়েছে কাঁদা লেপ্টে থাকা একদল সৈন্য। আর তাদের ঠিক নিচেই গোর দেওয়া লাশগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছি আর ইঁদুর। ইপ্রার এইপাশে বুলেটের ছোঁড়াছুড়ি থামছে না বললেই চলে, সাথে মর্টারের কান ফাটানো শব্দও ঢাকা পড়েছে আহতদের আর্তনাদে।

ইপ্রার জার্মান নাৎসিদের দখলে থাকা প্রান্তটা একটু অন্যরকম। সেদিকে চোখ ফেরালেই দেখা যাবে ছোটখাট টাক মাথার এক ভদ্রলোককে, নাম তার ফ্রিৎস হেবার। পিন্স-নেজ চশমার ফাঁক দিয়ে দেশের শত্রুদের দিকে চোখ বুলাচ্ছেন এই জার্মান-ইহুদী রসায়নবিদ।

হেবারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ৬ হাজার ট্যাংক দাঁড়িয়ে আছে তার হাত নাড়ানোর অপেক্ষায়। সন্ধ্যার দিকে বাতাসের গতিপথটা পরিবর্তন হতেই তার বিশাল গোঁফের নিচে জ্বলতে থাকা ভার্জিনিয়া সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন, হাত নেড়ে সংকেত দিলেন। মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ‘God Punish England’-এর মতো স্বগতোক্তি।

হঠাৎ করেই ইপ্রার তেপান্তর ভেঙে পড়লো বিস্ফোরণের শব্দে। সিলিন্ডারের ভালভগুলো উন্মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়লো ১৬৮ টন ক্লোরিন গ্যাস। সবুজাভ হলুদ রঙের কুয়াশার মতো ক্লোরিন গ্যাসের স্তর যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহের উপর দিয়ে চলে গেলো মিত্রবাহিনীর সৈন্যের দিকে।

গাছের ডাল থেকে পাতা পড়ে যেতে থাকলো, সবুজ ঘাসের উপর ধাতবরঙা আস্তরণ পড়লো, আকাশ থেকে খসে পড়তে শুরু করলো উড়তে থাকা পাখি। এটুকু দেখেই যা বোঝার বুঝে নেয়া উচিৎ ছিল মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের। কিন্তু না, তারা নিজেদের জায়গাতেই বসে থাকল, এরকম জিনিস আগে কখনো দেখা হয়নি তাদের।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেঞ্চে শুয়ে থাকা সৈন্যদের ফুসফুসে আক্রমণ করলো ক্লোরিন গ্যাস। দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যরা হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো, যারা বসে ছিল তারা মাটিতেই শুয়ে পড়লো। অ্যালভিওলাই আর রক্তনালীগুলো ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো, মুখ থেকে গলগল করে রক্ত বের হওয়ার আগে হলুদ মিউকাসে ভেসে গেলো তাদের চেহারা।

তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বলার আর সময় হলো না, মাটিতেই ডুবে মরতে হলো কয়েক হাজার সৈন্যকে। পড়ে যেতে থাকা সহচরদের দেখে ইপ্রা থেকে পিছু হটলো মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা, নিজেদের জীবনের সেরা দৌড়টা দিয়ে পালিয়ে বাঁচলো বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস থেকে।

এটাই ছিল ফ্রিৎস হেবারের পরিকল্পনা। তিনি নিজেই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন এই প্রাণঘাতী পরিকল্পনায়। যুদ্ধক্ষেত্র পরিচালনা করা জার্মান জেনারেলদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই জার্মানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরকে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের দিকে উৎসাহী করে তুলেছিলেন এই রসায়নবিদ।

এর তিন বছরের মাথায় নোবেলের সোনালী পদক গলায় ঝুলিয়ে হাসিমুখে ছবি তুললেন হেবার এবং সেটা অবশ্যই ভালো কারণে। এমনকি আপনি নিজেও হয়তো নিজের জীবনের জন্য এই বিজ্ঞানীর কাছে ঋণী!

হেবার তার ইতিবাচক বৈপ্লবিক আবিষ্কার করার আগ মুহূর্ত পর্যন্তও বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে ছিল জনসংখ্যার আধিক্য। পৃথিবীর দেড় বিলিয়ন মানুষের পেটকে শান্ত রাখা মুখের কথা নয়, যেখানে প্রায় প্রতিদিনই কয়েক হাজার মানুষ দুর্ভিক্ষের আক্রমণে মাটিতে ঢলে পড়ছে। উনিশ শতাব্দীর শেষ দিকে জার্মানির মাঠ তখন ৩ কোটি মানুষের খাবারে পরিপূর্ণ, কিন্তু ফসলের ফলন ভালো না হলে না খেয়ে থাকতে হবে আরো ২ কোটি মানুষকে।

এ সমস্যার সমাধান তাত্ত্বিকভাবে খুবই সহজ। ১৮৪০ এর দশকেই ফন লিবিগ বলেছিলেন উদ্ভিদ কোষের বৃদ্ধির জন্য নাইট্রোজেন অপরিহার্য। ফসল কতোটুকু ফলবে তা-ও নির্ভর করে নাইট্রোজেন সরবরাহের মাত্রার উপর। ৪ হাজার ট্রিলিয়ন টন নাইট্রোজেন গ্যাস ঘোরাফেরা করছে আমাদের বায়ুমণ্ডলে, দখল করে রেখেছে প্রায় ৮০% এলাকা। কিন্তু কে বাতাস থেকে এই নাইট্রোজেনকে টেনে বের করে মাটিতে পুঁতে দেবে?

বাতাস থেকে নাইট্রোজেন আলাদা করার সবচেয়ে বড় বাধাটা হলো এর শক্তিশালী ত্রিযোজী বন্ধন। বায়ুতে উড়তে থাকা নাইট্রোজেন অণুগুলো পরস্পরের সাথে এত দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত যে এগুলোকে আলাদা করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করাও তৎকালীন সময়ে অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল।

ঠিক এই কারণেই দেশগুলোকে খুঁজতে হয়েছিল নাইট্রোজেনের বিকল্প উপায়– সমুদ্রশৈবাল আর পাখির মল থেকে তৈরি সার। কিন্তু এগুলোও এতটা দুর্লভ ছিল যে, পাখির মল ভর্তি দ্বীপ দখলের জন্য যুদ্ধে নামতে হয়েছিল স্পেন-চিলি-পেরুকে। শেষমেশ চিলি যখন যুদ্ধে জয়লাভ করে দ্বীপ দখলে নিলো, তাদের রাজস্ব আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৯০০%-এরও বেশি!

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকেই হেবার এই নাইট্রোজেনের বন্ধন ভাঙার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। পরীক্ষার জন্য তৈরি করলেন বিশাল এক লোহার ট্যাংক, তারমধ্যে বাতাস আর হাইড্রোজেন ঢুকিয়ে দিলেন। দিয়ে প্রচণ্ড চাপ, সাথে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা প্রয়োগ করতে লাগলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নাইট্রোজেনের বন্ধন ভেঙে তিনটি হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি হলো অ্যামোনিয়া, ট্যাংকের নিচ থেকে বের হয়ে এলো তরল সার। অবশেষে উদ্ভাবন হলো বাতাস থেকে নাইট্রোজেন বের করে নিয়ে আসার উপায়, আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পর ১৯০৯ সালে পৃথিবীবাসীর সামনে হেবার প্রকাশ করলেন তার আবিষ্কার।

প্রতিবছর ১০০ মিলিয়ন টনেরও বেশি সার উৎপাদন করা হয় এই প্রক্রিয়ায়। আপনি সহ ৭ বিলিয়নেরও বেশি মানুষের দেহের অর্ধেক নাইট্রোজেনই আসে এই হেবার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বিংশ শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার হিসেবে মনে করা হয় এই হেবার প্রক্রিয়াকে যেটি থামিয়ে দিয়েছে যুদ্ধ, পেটের ক্ষুধা নিবারণ করে মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে এবং আধুনিক সভ্যতার দিকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়েছে।

জনসংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে জার্মানির অর্থনীতির চাকাও ঘুরতে থাকলো দ্রুতগতিতে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী সাম্রাজ্যবাদী জার্মানি তাদের সীমানা বাড়াতে হাত বাড়ালো বেলজিয়ামে, সেখান থেকে ফ্রান্স। শুরু হয়ে গেলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানরা ভেবেছিল খুব অল্প সময়েই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বিধি বাম, মিত্রবাহিনীর নৌবহর সাগর থেকে আসা অস্ত্র-বারুদের কাঁচামালের রসদ আটকে দিল।

বুকে একসাগর দেশপ্রেম নিয়ে বেড়ে ওঠা ফ্রিৎস হেবার সেনাবাহিনীর কাছে চিঠি পাঠালেন। রসায়নের তত্ত্বানুযায়ী নাইট্রোজেনকে ভাঙতে যতোটুকু শক্তি পাওয়া গিয়েছিল, জুড়তে পারলে ঠিক ততোটুকুই শক্তি ফিরে পাওয়া যাবে। যে বিক্রিয়া দিয়ে তিনি হাজারও জীবন রক্ষা করেছেন, তার উল্টোটা করলেই ঝরে পড়বে জার্মানির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা হাজারও মিত্রবাহিনীর সৈন্যের লাশ। তার এই পরিকল্পনার সদ্ব্যবহার করতেই সারা জার্মানিজুড়ে বসানো হলো বিস্ফোরক তৈরির কারখানা, বিশ্বযুদ্ধ স্থায়ী হলো আরো ৩ বছর।

কিন্তু এত পরিকল্পনার পরেও খুব একটা সুবিধা হয়নি জার্মানির। মিত্রবাহিনীর কাছেও রয়েছে একই প্রযুক্তি, বরং তাদের সৈন্যসংখ্যা ঢের বেশি। হেবার এবার তার শেষ পরিকল্পনাটা শোনালেন। ক্লোরিন গ্যাসের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হবে অ্যামোনিয়া, তৈরি হবে শ্বাসরোধ করে ফেলা গ্যাস, মুহূর্তেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে হাজারও সৈন্য। এভাবে মেরে ফেলা নিয়ে হেবারের কোনো আফসোস ছিল না। এই জার্মান ইহুদীর ভাষ্যমতে, যুদ্ধহীন অবস্থায় একজন বিজ্ঞানী পুরো বিশ্বের জন্য, কিন্তু যুদ্ধের সময় তার পুরোটাই দেশের জন্য।

ইপ্রার তেপান্তরে পরীক্ষামূলকভাবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে নতুনভাবে শুরু হলো যুদ্ধ। হেবারকে পদোন্নতি দিয়ে জার্মান বাহিনীর ক্যাপ্টেন বানানো হলো। এদিকে হেগ চুক্তি ভঙ্গের প্রতিশোধ নিতে মিত্রবাহিনীও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার শুরু করলো জার্মানদের উপর। অবশেষে আত্মসমর্পন করলো অক্ষবাহিনী, উভয় পক্ষেরই এক লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছে গ্যাসের আক্রমণে, লক্ষ লক্ষ মানুষ আহত হয়েছে হেবারের পরিকল্পনায় গড়ে ওঠা বিষের আঘাতে।

বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর অন্যান্য জার্মানদের সাথে হেবারও মাথা হেট করে ফিরে আসলো নিজ দেশে। জার্মানি তখন বিধ্বস্ত, মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের বেঁচে থাকাও কষ্টকর হয়ে দাড়িয়েছে। দেশের এই দুঃসময়ে হেবার সাগরের পানি ছেঁকে সোনা বের করার উপায় খুঁজতে থাকলেন। কিন্তু, বাতাস থেকে নাইট্রোজেন বের করা আর সাগরের পানি থেকে সোনা বের করা তো এক জিনিস নয়।

হেবারের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়লো যখন হিটলারের নাৎসি বাহিনী জার্মানির কর্তৃত্ব হাতে পেলো। তার মতো ইহুদীদের বিরুদ্ধে তখন উঠেপড়ে লেগেছে নাৎসিরা। তার হাতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উইলহেম কাইসার বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট তখন ইহুদী বিজ্ঞানীদের আঁতুড়ঘর। হেবারসহ তার ইহুদী সহকর্মীরা উৎখাত হলো জার্মানি থেকে। হেবার এবার পালিয়ে বেড়ালেন ইউরোপের এমাথা থেকে ওমাথা। ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজে অধ্যাপনা করতে গিয়ে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে নাম লেখালেন, ফ্রান্সেও তাই!

এভাবে পালিয়ে বেড়ানোর ফলে শরীর খারাপ হয়ে পড়লো। সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার পথে তার হৃৎপিণ্ড প্রায় থেমে গিয়েছিল। তারপর সেখানে পৌঁছানোর পর হোটেল রুমেই দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাক করে পরলোকে পাড়ি জমালেন ১৯১৮ সালের এই নোবেল বিজয়ী। বিলাসিতায় ডুবে থাকা এই বিজ্ঞানী শেষ বয়সে মারা গেলেন একাকী এবং দেউলিয়া অবস্থায়, যে অশুভ জিনিসকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন তা নিয়ে অনুতপ্ত হয়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই ইহলীলা সাঙ্গ করেছিলেন হেবার, কিন্তু তার আবিষ্কার করা অনেক কিছু তখনও ব্যবহার হচ্ছিল, যার মধ্যে একটি হলো জিকলন নামের হাইড্রোজেন-সায়ানাইড যৌগ। নাৎসি বিজ্ঞানীরা হেবারের এই আবিষ্কারকে সামান্য পরিবর্তন করে এর গন্ধটুকু বের করে নিলেন। আর এই গন্ধহীন গ্যাস বুকে টেনে নিয়ে অসউইটজ ক্যাম্পেই প্রাণ হারালেন হেবারের পরিবার-বন্ধুসহ কয়েক লক্ষ ইহুদী।

ফ্রিৎস হেবারকে নিয়ে ইতিহাসবিদরা এখনো বিতর্ক চালিয়ে যাচ্ছেন। কোটি কোটি লোকের অস্তিত্বই থাকতো না যদি না হেবার থাকতেন। আবার তিনি না থাকলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধও অনেক আগেই শেষ হয়ে যেতে পারতো, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পেও প্রাণ দিতে হতো না লক্ষ লক্ষ মানুষকে। একইসাথে সৃষ্টিশীল এবং ধ্বংসাত্মক, দয়ালু এবং পাষাণহৃদয় এই রসায়নবিদ যেমন নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি মানুষকে পেটভরে খাইয়েছেন, তেমনি প্রতিপক্ষের করুণ আর্তনাদেও উৎফুল্ল হয়ে উঠেছেন।

তার পাপ এবং পুণ্য পরিমাপ করার কোনো সহজ উপায় নেই, হয়তো তা পরিমাপ করার প্রয়োজনও নেই। দিনশেষে তিনি ফ্রিৎস হেবার, বিজ্ঞানের ব্যবহার আর অপব্যবহারের নিখুঁত উদাহরণ।

তথ্যসূত্র

১. https://www.smithsonianmag.com/history/fritz-habers-experiments-in-life-and-death-114161301/

২. https://medium.com/the-mission/the-tragedy-of-fritz-haber-the-monster-who-fed-the-world/
৩. http://www.bbc.com/news/world-13015210

দুঃস্বপ্নের বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ

কেউ আপনাকে ধাওয়া করছে বা আপনার সবগুলো দাঁত পড়ে গেছে। কিংবা নগ্ন অবস্থায় রাস্তার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। এরকম হয়েছে কি কখনো? বাস্তবে নয়, স্বপ্নে। এগুলো আসলে দুঃস্বপ্ন। কিছু কিছু দুঃস্বপ্ন খুবই পরিচিত। পৃথিবীতে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ৩৫ মিলিয়ন স্বপ্ন দেখা হয়। তার মধ্যে দুঃস্বপ্নের পরিমাণই বেশি।

গবেষকদের মতে, মানুষের আচরণের প্রতিফলন হচ্ছে এই স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্নগুলো। এগুলো থেকে খানিকটা হলেও বোঝা যায় মানুষের মনের ভেতর আসলে কী ঘটে চলছে। অনেকের ক্ষেত্রেই ঘটে সেরকম পরিচিত কিছু দুঃস্বপ্ন আসলে কী অর্থ প্রকাশ করে, তা নিয়ে আজকের আলোচনা।

১.দাঁত পড়ে যাওয়া

দাঁত নিয়ে স্বপ্ন দেখা আপনার চেহারা নিয়ে উদ্বিগ্নতাকে প্রকাশ করে। এছাড়া অন্যেরা আপনাকে কীভাবে দেখছে এ নিয়ে চিন্তা করলেও আপনি এ ধরনের স্বপ্ন দেখতে পারেন। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়, লজ্জা কিংবা অনাকর্ষণীয় দেখানোর ভয় থেকেও এ ধরনের স্বপ্ন জন্মাতে পারে।দাঁতকে আমরা ব্যবহার করে থাকি কামড় দিতে, ছিঁড়তে কিংবা চাবাতে। তাই দাঁত হারাবার স্বপ্ন আপনার অক্ষমতার অনুভূতিকে প্রকাশ করে অর্থাৎ আপনি আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছেন।

২)কেউ আপনাকে ধাওয়া করছে

এ ধরনের স্বপ্নের অর্থ আপনার বাস্তব জীবনে ভয় বা সমস্যা সৃষ্টি করছে এমন কিছু থেকে আপনি পালাতে চাচ্ছেন। অর্থাৎ বিশেষ কোনো পরিস্থিতি আপনি এড়িয়ে যেতে চাচ্ছেন। যে আপনাকে ধাওয়া করছে সেও কিন্তু আপনার চিন্তারই প্রতিফলন। হতে পারে আপনার রাগ, অহমিকা, ভয় এসবই আপনাকে তাড়া করছে.

৩)টয়লেট খুঁজে পাচ্ছেন না

আপনি নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিতে আপনার চাহিদাগুলো প্রকাশ করতে পারছেন না, এধরনের স্বপ্নের অর্থ এটাই। হতে পারে, অন্যের চাওয়া পাওয়াগুলোকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আপনি আপনার নিজের দিকটাই ঠিকমত পূরণ করতে পারছেন না। কিংবা আপনি নিজেকে সময় দিতে পারছেন না, আপনার আরো একান্ত সময়, নিজের দিকে খেয়াল প্রয়োজন।

৪)সবার সামনে নগ্ন অবস্থায়

নিজেকে নিয়ে এরকম কিছু দেখলে বুঝতে হবে আপনি অনিশ্চয়তায় ভুগছেন অথবা আপনাকে ভুল কারণে দোষারোপ করা হয়েছে।
কিন্তু যদি নগ্ন অবস্থায় না দেখে অন্য কাউকে দেখেন খারাপ বোধ করেন তবে বুঝতে হবে সেই মানুষটির আসল রূপ নিয়ে আপনি দুশ্চিন্তায় আছেন।

৫)পরীক্ষার হলে অপ্রস্তুতভাবে

পরীক্ষা সর্ম্পকিত স্বপ্নগুলো এত বাস্তব যে, আমরা জেগে উঠেই ভাবি আসলেই হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় ফেল করেছি। কমপক্ষে প্রতি ৫ জনে একজন মানুষ এই স্বপ্নগুলো দেখে থাকেন। পরীক্ষা সর্ম্পকিত এধরনের স্বপ্ন আত্মবিশ্বাসের এবং জীবনের পরবর্তী ধাপে সুদৃঢ় পদক্ষেপের অভাব প্রকাশ করে।

৬)উড়া

উড়তে দেখার অর্থ কেউ অথবা কোনো কিছু আপনাকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা দিচ্ছে।
যদি উড়তে ভয় পাচ্ছেন, এমন কিছু দেখেন তার মানে জীবনে আপনার যে লক্ষ্য স্থির করেছিলেন সেটির সাথে তাল মিলাতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। আপনি একা এবং উড়ার জন্য কসরত করছেন, তার মানে আপনি আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ করছেন।

image source: steemit.com

৭)পড়ে যাওয়া

আপনি কোথাও পড়ে গেলেন এবং ভয় পেলেন তার মানে কোনো পরিস্থিতি নিয়ে আপনি দুশ্চিন্তায় আছেন।
যদি আপনার পড়ে যাওয়া উপভোগ করে থাকেন তবে আপনি পরিবর্তন সর্ম্পকে ততটা ভীত নন।

৮)নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন

গাড়ির স্বপ্ন আমাদের জীবন চালনা এবং তার দিক প্রতিফলিত করে। এসময় আপনি হয়তো অনুভব করছেন আপনি পথবিচ্যুত হয়ে পড়েছেন এবং আপনার পথে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন।

৯)নতুন ঘর খুঁজে পাওয়া

যদি স্বপ্নে আপনি নতুন, অব্যবহৃত ঘর খুঁজে পান তবে তার মানে আপনি নিজের নতুন চেহারা,নতুন ক্ষমতা খুঁজে পেয়েছেন। যদি সেই ঘরের রঙ সাদা হয় তাহলে আপনি একটি নতুন জীবন শুরু করার জন্য প্রস্তুত।

১০)দেরী হয়ে যাওয়া

কোথাও দেরী করে ফেলেছেন এধরনের স্বপ্ন আপনার জীবনের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আপনার ভয় ও দুশ্চিন্তাকে প্রকাশ করে। কিংবা আপনি কিছু করতে চাচ্ছেন, কিন্তু তার জন্য মনে হবে সময় পার হয়ে যাচ্ছে।

আপনি যখন আপনার দুঃস্বপ্নের অর্থ খুঁজতে যাচ্ছেন, তখন আপনাকে সচেতনভাবে মনোযোগসহকারে তা খুঁজে বের করতে হবে। কারণ আপনার অসতর্কতা হয়তো সঠিক অর্থটি থেকে আপনাকে বিচ্যুত করবে

ঘুমানোর সময়, স্বপ্ন দেখার ৫ টি পর্ব তৈরি হয়। এই পর্বগুলো ১৫ থেকে ৪০ মিনিট স্থায়ী হতে পারে। অর্থাৎ ঘুমানোর সময় মোটামুটি আমরা ২ ঘণ্টা সময় স্বপ্ন দেখেই কাটাই।

প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ৭ বিলিয়ন স্বপ্ন দেখক মিলে ৩৫ বিলিয়ন স্বপ্ন তৈরি করে ফেলেন। সবকিছু আসলে আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ। কেউ কেউ আবার বিশ্বাস করেন স্বপ্নগুলো দ্বারা প্রতিফলিত হয় আমরা কী, আমরা কী চাই এবং আমরা কী বিশ্বাস করি।

featured image: ivanyolo.com