‘পাই’ (π) কি তবে ভুল ছিল?

১. বৃত্তের ধ্রুবক

গণিতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা বলা হয়ে থাকে ‘পাই’কে। বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত থেকে আমরা পাইয়ের ধারণা পাই। জ্যামিতিতে বিভিন্ন আকৃতির যেসব বস্তু আমরা কল্পনা করতে পারি, তাদের মধ্যে বৃত্তের গঠনকে সবচেয়ে নিঁখুত ধরা হয়। আর পাই নামের সেই অমূলদ সংখ্যাটি, যেটি বৃত্ত সংক্রান্ত যেকোনো জ্যামিতির হিসাব নিকাশের জন্যে অপরিহার্য। তাই পাই নিয়ে গণিতজ্ঞদের চুলচেরা বিশ্লেষণের শেষ নেই। তবে Bob Palais নামক এক গণিতবিদ Pi is Wrong শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। আমরা এই লেখার মাধ্যমে পাই সম্পর্কে এই গণিতবিদের ধারণাকে পর্যালোচনা করবো।

১.১ অস্বচ্ছ প্রস্তাবনা

পাই সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা রয়েছে, তা পরিবর্তন করতে হলে প্রথমে পাইকে সঠিকভাবে অনুধাবণ করতে হবে। পাই সম্পর্কিত সর্বজনগৃহীত সংজ্ঞা হচ্ছ, পাই বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত।

π = C/D = 3.14159265… (C = বৃত্তের পরিধি, D = বৃত্তের ব্যাস)

পাইয়ের অনেক চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা একে বেশি পরিমাণে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। যেমন: পাই সংখ্যাটি অমূলদ। অর্থাৎ, একে দুটি সংখ্যার ভগ্নাংশ আকারে প্রকাশ করা যায় না। এবং এটি একটি তুরীয় সংখ্যা (Transcendental Number)। যেসকল সংখ্যাকে কোনো বহুপদী সমীকরণের চলকসমূহের মূল (root) হিসেবে প্রকাশ করা যায় না, সেটাই তুরীয় সংখ্যা। এরকম অনেক গাণিতিক বিশেষত্ব নিয়ে পাই সংখ্যাটি বিশেষভাবে আলোচিত।

আসলে পাই সংখ্যাটি যে ভুল- ব্যাপারটি আদৌ এমন নয়। কিন্তু সত্যটি হলো, পাই সংখ্যাটি সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। তাই যখন আমরা বলি, ‘পাই ভুল’, তার অর্থ এই যে, বৃত্তের একটি ধ্রুবক হিসেবে পাই সংখ্যাটি কিছুটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। আরো স্পষ্ট করতে বলতে গেলে, বৃত্ত হচ্ছে অসংখ্য বিন্দুর সমষ্টি, যে বিন্দুগুলো অপর একটি নির্দিষ্ট বিন্দু (বৃত্তের কেন্দ্র) হতে সর্বদা সমদূরবর্তী। এই সমদূরত্বটিই ঐ বৃত্তের ব্যাসার্ধকে নির্দেশ করে। বলে রাখা প্রয়োজন, ব্যাস হলো বৃত্তের পরিধির উপরিস্থ যেকোনো দুটি বিপরীত বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব। অন্যদিকে ব্যাসার্ধ হলো, বৃত্তের কেন্দ্র এবং পরিধির উপরিস্থ যেকোনো বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব। এখন নিচের চিত্রটা থেকে দেখা যায়, ব্যাসকে ধ্রুবক রেখে অসংখ্য আকৃতি গঠন করা সম্ভব। কিন্তু ব্যাসার্ধকে ধ্রুবক রাখলে কেবল একটি আকৃতি আসে। ফলে, এটি অনেক বেশি গঠনমূলক বৃত্তের ধ্রুবক তৈরি করে।

যেহেতু বৃত্তের ব্যাস এর ব্যাসার্ধের দ্বিগুণ, তাই নতুন এই ধ্রুবকটি হবে পাইয়ের দ্বিগুণ (ব্যাসার্ধ হর হিসেবে থাকায়)। পাইয়ের মতো এটিও তুরীয় এবং অমূলদ সংখ্যা হবে।

খেয়াল করলে দেখা যায় গণিত, পদার্থবিদ্যার অনেক সূত্রে 2π ব্যবহার করা হয়। Pi is Wrong প্রবন্ধে লেখক বৃত্তের ধ্রুবকের জন্যে ব্যাসার্ধ সংক্রান্ত সংজ্ঞাটিই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন। তিনি একে বৃত্তের এক চক্র বা one turn বলে পরিচিত করেছেন। এবং চিহ্ন হিসেবে τ (tau) ‘কে বেছে নিয়েছেন।

τ = C/r = 6.283185307179586… (C = বৃত্তের পরিধি, r = বৃত্তের ব্যাসার্ধ)

১.২ পাই (π)-য়ের জনপ্রিয়তা

বৃত্তের ধ্রুবক হিসেবে যে টাউ (τ)-য়ের ব্যবহারই স্বাভাবিক হতে পারত, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে আমরা দেখে নিতে পারি- আমাদের মাঝে পাই কতটা জনপ্রিয়। প্রথমেই আমাদের এই সত্যটি স্বীকার করে নিতে হবে যে, প্রায় এক শতাব্দী জুড়ে আমাদের মাঝে পাইয়ের জনপ্রিয়তা একটা অন্ধ বিশ্বাসের মাধ্যমে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাই এর গুণাবলি নিয়ে উচ্চ প্রশংসা করে বিভিন্ন বইও লেখা হয়েছে। এমনকি পাইয়ের জন্যে অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রয়েছে ঈশ্বরের মতো ভক্তি-শ্রদ্ধা। যেমন: ২০১০ সালে গুগল পাই দিবসকে উদযাপন করেছে, তাদের লোগো পরিবর্তনের মাধ্যমে।

গুগলের বিশেষ লোগো

কিছু কিছু পাইপ্রেমী মানুষ পাইয়ের মান শতক বা হাজার ঘর পর্যন্ত মুখস্ত করে ফেলে! তাই সত্যি কথা বলতে, টাউকে পাইয়ের মতো একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে। যদিও আমরা টাউ ব্যবহারের ক্ষেত্রেই বেশি যৌক্তিক পক্ষে অবস্থান করি।

২. টাউ সংখ্যাটি কী?

উপরের ১.১ অংশে আমরা দেখেছি ‘টাউ’ (τ)-কে 2π হিসেবে লেখা যায়। গণিতের বিভিন্ন সূত্রে আমরা এই 2π কে দেখতে পাই। যেমন:

$latex \int_0^{2\pi}\int_0^\infty f(r,\theta)\,r\,dr\,d\theta$

এই সূত্রে পোলার স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় একটি স্থানের সমাকলন করার সময় আমরা শূন্য (0) থেকে 2π ব্যবধানের মান বের করি।

$latex \frac{1}{\sqrt{2\pi}\sigma}e^{-\frac{(x-\mu)^2}{2\sigma^2}},$

২য় সূত্রটি পরিমিত বিন্যাস সম্পর্কিত। একে গসিয়ান ডিস্ট্রিবিউশনও বলা হয়। ‘পরিমিত বিন্যাস’ ব্যাপারটি একটি সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে। যেমন: বাংলাদেশের একজন পুরুষকে যদি দৈবচয়নে নির্বাচন করা হয়, তাহলে তার উচ্চতা ৫ ফুট থেকে ৫.৫ ফুটের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা কত? এই সম্ভাবনা বের করার জন্য যে সূত্র, সেক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাই 2π কে।

$latex f(x) = \int_{-\infty}^\infty F(k)\, e^{2\pi ikx}\,dk$
$latex F(k) = \int_{-\infty}^\infty f(x)\, e^{-2\pi ikx}\,dx$

৩য় সূত্রটি ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম-এর। বিভিন্ন ধরণের তরঙ্গের কম্পাঙ্ক, অনুপাত ইত্যাদি বের করার জন্যে সূত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সূত্রেও 2π রয়েছে।

$latex f(a) = \frac{1}{2\pi i}\oint_\gamma\frac{f(z)}{z-a}\,dz,$

৪র্থ’টি গণিতবিদ অগাস্টিন লুইস কচির বিখ্যাত একটি সূত্র। জটিল সংখ্যা (complex number) ’কে ব্যবহার করে যে ফাংশন তৈরি করা হয়, তার সমাকলন করার জন্যে এই সূত্রটি ব্যবহৃত হয়। স্বাভাবিকভাবেই এখানেও 2π দেখা যাচ্ছে।

$latex z^n = 1 \Rightarrow z = e^{2\pi i/n},$

৫ নম্বরে এককের n তম বর্গমূল বের করার জন্যে e এর পাওয়ার হিসেবে 2π ব্যবহার করা হয়েছে।

$latex \zeta(2n)=\sum_{k=1}^\infty \frac{1}{k^{2n}}=\frac{B_n}{2(2n)!}\,(2\pi)^{2n}.\qquad n=1,2,3,\ldots$

সবশেষে, গণিতের একটি অসাধারণ সূত্র রেইম্যান-জেটা ফাংশন। বাস্তব অথবা জটিল সংখ্যা ব্যবহার করে একটি অসীম ধারা তৈরি করা হয়েছে, যা রেইম্যান-জেটা ফাংশন নামে পরিচিত। উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এখানেও 2π ব্যবহার করা হয়েছে।

[রেইম্যান-জেটা ফাংশনটি 2n এর পরিবর্তে -১ ব্যবহার করলে যে ধারাটি পাওয়া যায়, সেটি হলো ১+২+৩+৪+৫…∞,অর্থাৎ সমস্ত স্বাভাবিক সংখ্যার যোগফল। সূত্রের ফলাফল হিসেবে মানটি আসে -১/১২ । মজার ব্যাপার হলো, ভারতীয় গণিতবিদ রামানুজন আরেকটি ভিন্ন উপায়ে খুব সহজেই এই একই মান বের করেন।]

এখন কেউ কেউ ভাবতে পারেন উপরের এই সূত্রগুলো আমরা বেছে-বেছে নিয়েছি, যেখানে 2π -ই রয়েছে। কিন্তু আপনি যদি আপনার গণিত অথবা পদার্থবিদ্যার বইটা খুলে দেখেন, তাহলে দেখবেন সেখানে অসংখ্য সূত্র রয়েছে, যেগুলোতে 2π ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এই রহস্যের সমাধান করতে আমাদেরকে বৃত্তের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিশদ ধারণা লাভ করতে হবে। যদিও কমবেশি সবারই বৃত্তের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রয়েছে, তারপরও ‘টাউ’ সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারনা পেতে আমাদেরকে বৃত্তের উপর একবার নতুন করে চোখ বুলিয়ে নিতেই হবে।

২.১ বৃত্ত এবং কোণ

বৃত্ত এবং কোণের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। নিচের ছবিতে একই কেন্দ্র বিশিষ্ট দু’টি ভিন্ন ব্যাসার্ধের বৃত্ত দেখা যাচ্ছে। যাদের পরিধি থেকে ভিন্ন দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট দু’টি অংশ বা ‘চাপ’ (arc lengths) কেটে নিলেও তাদের মধ্যবর্তী কোণের পরিমাণ (θ) একই থাকে। অন্যভাবে বলা যায়, বৃত্তের ‘চাপ’ পরিমাপ করার সময় ব্যাসার্ধ এবং কোণ পরস্পর স্বাধীনভাবে আচরণ করে। তবে যখন আমরা শুধুমাত্র একটি বৃত্ত নিয়ে বিভিন্ন পরিমাপ করতে চাই, তখন ব্যাসার্ধটি অবশ্যই অপরিবর্তনীয় থাকে এবং ঐ বৃত্তের দু’টি ব্যাসার্ধের মধ্যবর্তী অংশকে পরিমাপ করার জন্যেই আমরা ‘কোণ’ মেপে থাকি।

চিত্র- i

সম্ভবত কোণ পরিমাপের সবচেয়ে প্রাথমিক পদ্ধতি হলো ‘ডিগ্রি’। এটা বৃত্তকে ৩৬০ ভাগে ভাগ করে। নিচের ছবিতে ত্রিকোণমিতিতে ব্যবহৃত কিছু প্রচলিত কোণের পরিমাপ দেখানো হলো-

চিত্র- ii

কোণ পরিমাপের আরেকটি মৌলিক পদ্ধতি হলো, কোনো বৃত্তের চাপের দৈর্ঘ্যের সাথে ঐ বৃত্তের ব্যাসার্ধের অনুপাত বের করা। একে রেডিয়ান পদ্ধতি বলা হয়। উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বৃত্তের চাপ এবং ব্যাসার্ধ পরস্পরের সামাণুপাতিক। এবং সেখানে ধ্রুবক হলো ‘কোণ’। এখানে খেয়াল রাখতে হবে, যেহেতু ‘চাপ’ এবং ব্যাসার্ধ উভয়ের দৈর্ঘ্যের এককই সমান, তাই এর কোনো একক নেই। রেডিয়ান কোণের ব্যবহার গণিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করা সমাকলন বা ব্যবকলন করার সময় যে কোণের হিসাব করা হয়, সেগুলো সবই রেডিয়ান কোণ। যেমন: sinθ-কে যদি θ এর সাপেক্ষে ব্যবকলন করা হয়, তাহলে আমরা cosθ পাই। এখানে θ দ্বারা রেডিয়ান কোণই নির্দেশ করা হয়েছে। এবং এই ব্যবকলন শুধুমাত্র রেডিয়ান কোণের জন্যেই সঠিক হবে।

সাধারণত, ত্রিকোণমিতিতে কোণের হিসাব করার জন্যে রেডিয়ান কোণই ব্যবহার করা হয়। আমরা উচ্চমাধ্যমিকে ত্রিকোণমিতির যে বিশেষ কোণগুলোর (30, 45, 60, 90…) মান মনে রাখার চেষ্টা করতাম, সেগুলো আসলে ‘পাই-রেডিয়ান’ সিস্টেমে লেখা ছিল।

চিত্র- iii
চিত্র- iv

এখন আমরা সেই ‘পাই-রেডিয়ান’ সিস্টেমের একটা অন্যরূপ দেখাতে পারি। যেখানে আমাদের পরিচিত কোণগুলোকে লেখা হবে একটা বৃত্তের বিভিন্ন ভগ্নাংশরূপে। আর এই পদ্ধতি আমাদেরকে রেডিয়ান কোণ পরিমাপের সংজ্ঞাকে নতুনভাবে যাচাই করতে সাহায্য করবে। এখানে আমরা বৃত্তের চাপের (s) পরিবর্তে পুরো বৃত্তের পরিধির (C) ভগ্নাংশ (f)-কে লিখতে পারি। তাহলে, s = fC :

θ = s/r = fC/r = f (C/r) ≡ fτ

খেয়াল করলে দেখা যায়, খুব স্বাভাবিকভাবেই এখানে ‘টাও (τ)’ চলে এসেছে। যদি সত্যিকার অর্থেই আপনার ‘পাই’ এর প্রতি একটা অন্ধবিশ্বাস থেকে থাকে, তাহলে আমার আশঙ্কা- উপরের এই চিত্র এবং সমীকরণ আপনার সেই বিশ্বাসের মূলে একটা চিড় ধরাতে পেরেছে।

চিত্র- v

যদিও ‘টাও’ এর পক্ষে অনেক যুক্তিই রয়েছে, কিন্তু উপরের ছবিটা বোধহয় সবচেয়ে মারত্মক যুক্তি। এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি Bob Palais এর সেই ‘এক চক্র’-র বাস্তব রূপ। যার সংজ্ঞাটা এখন সহজেই করা যাবে: ‘টাও’ হলোরেডিয়ান পদ্ধতিতে বৃত্তের এক চক্র পরিমাপের একটি একক। আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ‘টাও’কে মুখস্ত করার কিছু নেই। বৃত্তের বারো চক্রের একভাগ হলো τ/১২, আট চক্রের একভাগ হলো τ/৮ । তাই ‘টাও’ এর ব্যবহার আমাদেরকে বৃত্তের কোণ-ব্যাসার্ধ সম্পর্কে একটা বাস্তব ধারণা তৈরি করতে অত্যন্ত সহায়ক এবং হিসাবের নিকাশের জন্যেও সহায়ক। যেমন: τ/১২ কেবলমাত্র একটা সংখ্যাকে নির্দেশ করে-

বারো চক্রের একভাগ = τ/ ১২ ≈ ৬.২৮৩১৮৫…/১২ = ০.৫২৩৫৯৮৮…

সবশেষে আমরা আরেকবার, চিত্র-iii এবং চিত্র-v থেকে দেখে নিতে পারি যে, ২π ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঝামেলাটা আসলে কোথায়। যদিও বৃত্তের এক চক্র ১τ মানে কিন্তু ২π –ই। তাই সংখ্যাগত দিক থেকে এই দুটি জিনিস এক হলেও, বাস্তবসম্মত চিন্তা করার ক্ষেত্রে ‘পাই’ এবং ‘টাও’ এর মধ্যে রয়েছে বিস্তার ফারাক।

featured image: supertv.it

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে আসছে নেচারের নতুন জার্নাল

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বিশিষ্ট জার্নালগুলোর মাঝে নেচার-এর অবস্থান সবার উপরে। নেচার থেকে প্রকাশিত প্রায় সবগুলো জার্নালই উঁচু দরের। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে নেচার কর্তৃপক্ষ থেকে আগে কোনো গবেষণাপত্র প্রকাশ পেতো না। সামান্য কিছু পেলেও সেগুলো অন্য জার্নালগুলোতে পেতো। আলাদা করে একক কোনো জার্নাল ছিল না।

কিন্তু এবার নেচার থেকে আসলো সুসংবাদ। নেচার মেশিন ইন্টেলিজেন্স নামে একটি জার্নাল নেচার থেকে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছর অর্থাৎ, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এই জার্নালটির যাত্রা শুরু হতে হচ্ছে। বিগ ডাটা এবং এআই এর যুগে প্রযুক্তি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে নতুন নতুন গবেষণা করার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু নেচারের মতো খ্যাতনামা প্রকাশনীর এ বিষয়ের উপর কোনো একক গবেষণা সাময়িকী বা জার্নাল প্রকাশিত হতো না। এবার থেকে সেই দরজা খুলে গেলো।

image source: medium.com

মূলত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, রোবটিক্স, ডাটা মাইনিং ইত্যাদি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা সংবলিত গবেষণাপত্র ছাপা হবে এখানে। তাছাড়া মানুষ এবং রোবটের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার অন্যান্য বিষয়ের উপর কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এগুলো নিয়েও গবেষণা প্রকাশ করা যাবে।

সম্পাদক লিজবেথ ভেনামা; Image Source: twitter.com

এই জার্নালে মৌলিক গবেষণা, রিভিউ আর্টিকেল, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার তত্ত্ব বিষয়ক গবেষণা, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক সংবাদ, মতামত, চিঠিপত্র কিংবা মন্তব্য ইত্যাদি বিষয়াদিও প্রকাশ করা যাবে। লিজবেথ ভেনামা হচ্ছেন এই জার্নালের সম্পাদক। এর আগে তিনি নেচার ফিজিক্স-এর সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন।

ফিচার ইমেজ: The Economist

যেভাবে শনাক্ত করা হলো মহাকর্ষীয় তরঙ্গ

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ দেখতে কেমন

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ প্রচলিত অনুপ্রস্থ বা অনুদৈর্ঘ্য কোনো তরঙ্গই না। এটিকে বলা হয় কোয়াড্রুপল ওয়েভ। কোয়াড্রুপল ওয়েভ প্রবাহিত হয় স্থান-কালকে সঙ্কুচিত ও প্রসারিত করে, আবার সামনের দিকেও ধাবিত হয়। অর্থাৎ যখন পৃথিবীর মাঝে দিয়ে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যাবে, তখন পৃথিবী একবার সঙ্কুচিত, আরেকবার প্রসারিত হবে, যার মান ১০-২১ বা প্রোটনের ব্যাসের ১০ লাখ ভাগের একভাগ।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সন্ধানে যখন শতাব্দীপ্রাচীন যন্ত্রের দ্বারস্থ

সেই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষা মনে আছে, যেটা ব্যবহার করে ইথারের অসারতা ও আলোর গতিবেগের ধ্রুবতা পরীক্ষা করেছিলেন? লাইগো (LIGO) ইনস্টিটিউট মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সন্ধানে সেই একই যন্ত্র ব্যবহার করল ভিন্ন পদ্ধতিতে।

১০০ বছর আগে লেজারের অস্তিত্ব ছিল না, যার সূচনাও করেছিলেন স্বয়ং আইনস্টাইন। একটি সাদা আলোক উৎস থেকে লেজার নিক্ষেপ করা হয় মাইকেলসনের ইন্টারফেরোমিটারে। একটি বীম স্প্লিটার আলোকে তার কম্পাঙ্ক অনুযায়ী আলাদা করে ফেলে। এরপরে ৯০ ডিগ্রি বরাবর দুটি আয়না রাখা আছে ৪ কিলোমিটার বরাবর যা আসলে ৩০-৩৫০ হার্জ তরঙ্গের শনাক্তকরণের জন্য ৪০০ বার প্রতিফলন ঘটানো হয়।

এর ফলে যদি পথ পার্থক্য বা দশা পার্থক্যের সৃষ্টি হয় তাহলে আলোর উপরিপাতনে ধ্বংসাত্মক ব্যতিচারের ফলে অন্ধকার পট্টি দেখতে পাব। এখন আলোর পথ পার্থক্য আরো অনেক কারণে ঘটতে পারে। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো- ১. অতি দুর্বল ভূমিকম্প; ২. কয়েক মাইল দূরে চলা গাড়ির কম্পন ৩. কাছাকাছি কোনো পাখির উড়ে যাওয়া! ৪. অণুর কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন (কেইসমীর ইফেক্ট) এর ফলে সৃষ্ট নয়েজ ইত্যাদি।

তাহলে আসল সিগনালকে যাচাই করা হবে কীভাবে?

মহাকর্ষীয় তরঙ্গে স্থান-কাল একবার প্রসারিত, আবার তারপরেই সঙ্কুচিত হতে থাকে, ফলে ধ্বংসাত্মক ব্যতিচার ঘটলে তা হবে একেবারেই আলাদা, অন্ধকার পট্টির আকার পরিবর্তন হতে থাকবে। তারপরেও ভালোভাবে যাচাই করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রেই ২ টি ইন্টারফেরোমিটার বসানো হয়েছে। একটি হল হ্যানফোর্ডে ও আরেকটি লুইজিয়ানার লিভিংস্টোনে। এতে অন্তত একই সিগনালের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব। সাথে সহযোগিতায় VIRGO এর একটি গবেষণাগার।

কখন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরি হয়?

এমনটা ঘটে দুটি নিউট্রন তারার বাইনারি সিস্টেম যখন পরস্পরকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে তখন কিংবা দুটি ব্ল্যাকহোল যখন একে অন্যকে প্রদক্ষিণ করে তখন। এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা আমাদের আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ে ছায়াপথেই ১০ হাজার বছরে একটি। কিন্তু আকাশে থাকা লাখ লাখ গ্যালাক্সিতেই গত ১৩০০ কোটি বছর ধরেই এমন ঘটনা ঘটেছে বহুবার। তাহলে যন্ত্রের ক্ষমতা যদি যথেষ্ট থাকে তাহলে একসময় আমরা আমাদের ছায়াপথ ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারব।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের শনাক্তকরণ

লাইগো’র বিজ্ঞানীরা আসল সিগনালের সত্যতা যাচাই করার জন্য নকল সিগনাল যন্ত্রে ঢুকিয়ে ড্রিল করান। এই নকল সিগনালের ব্যাপারে জানা থাকে মাত্র ৩ জন বৈজ্ঞানিকের। বিভিন্ন যাচাই বাছাই করার পরে ঘোষণা দেয়া হয় সিগনালটি আসলে ড্রিল ছিল।

অবশেষে ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর শনাক্ত করা হয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। যাচাই বাছাই করার পরে জার্নালটি লিখে রিভিউ করার জন্য দেয়া হলে গুজব ভেসে আসতে থাকে। অক্টোবর, ডিসেম্বর জানুয়ারির দিকে গুজবটি সত্যি হচ্ছে বলেই জানান একজন বিজ্ঞানী। অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তে ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স’এ প্রকাশিত হলে পুরো বিশ্বে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। প্রায় সাথে সাথে ওয়েব পেজটি ডাউন হয়ে যায়।

image source: skyandtelescope.com

প্রথমে যেটি শনাক্ত করা হয় তা হল স্থান-কালের সঙ্কোচন-প্রসারণের ফলে ঘটা আলোর পথ পার্থক্যের নিশ্চিতকরণ। এটি একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ। এখানে ১০-২১ মাত্রার পীড়ন মাপা হয়েছিল।

এরপরে বাতাসের সঙ্কোচন-প্রসারণে সৃষ্ট শব্দ। যখন আলোর পথ পার্থক্য ঘটে, তখনই শব্দতরঙ্গের সৃষ্টি। এটি দ্বিতীয় প্রত্যক্ষ প্রমাণ। শব্দ তরঙ্গটি ৩৫-৩৫০ হার্জের। মাত্র ২ টি লাইগো ল্যাব থাকার জন্য আকাশের ঠিক কোথায় ঘটেছিল তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও এটুকু বলা যায় আমাদের ছায়াপথের গ্রেট ম্যাজেলানিক ক্লাউডের কোনো স্থানে ১৩০ কোটি বছর আগে দুইটি ব্ল্যাকহোলের মিলনের সময় এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উৎপত্তি ঘটেছিল।

দুটি ব্ল্যাকহোলের ভর ছিল ২৯ সৌর ভর ও ৩৬ সৌর ভরের সমান। এদের ব্যাস ছিল ১৫০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। নতুন ব্ল্যাকহোলটি হতে ৬২ সৌর ভরের ও ৩ সৌর ভরের সমপরিমাণ শক্তি বিকিরিত হয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে।

এর মাধ্যমে হকিং এর আরেকটি উপপাদ্য প্রমাণিত হল, যা হকিং নিজেও তার ফেসবুক পেজে উল্লেখ করেছেন, তা হল “হকিং এর ক্ষেত্রফল উপপাদ্য”, যা বলেছিল, দুটি ব্ল্যাকহোল মিলিত হলে নতুন ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রফল, আগের দুটি ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রফলের সমষ্টির সমান হবে। এজন্য আগে থেকে অতিরিক্ত ভর থাকলে তা শক্তি আকারে বিকিরিত হবে।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের পরোক্ষ শনাক্তকরণ

ইতোপূর্বে একবার মহাকর্ষীয় তরঙ্গের পরোক্ষভাবে শনাক্তকরণ করে নোবেল প্রাইজও পেয়ে গেছেন দুই বিজ্ঞানী- রাসেল এ. হালস এবং জোসেফ এইচ টেইলর জুনিয়র। ১৯৯৩ সালের নোবেল প্রাইজটি দেয়া হয়েছিল দুটি নিউট্রন তারা বা বাইনারি পালসার পরস্পরকে প্রদক্ষিণ করতে করতে মিলিত হবার আগে শক্তি বিকিরণ করার আবিষ্কারের জন্য, যা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সৃষ্টির অন্যতম উৎস।

ভবিষ্যত

লাইগো গবেষণাগার আরো শক্তিশালী করা হবে ও বিশ্বের আরো অনেক জায়গায় যেন গবেষণাগার স্থাপন করা হয় তার চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০০২-২০১০ পর্যন্ত প্রাথমিক সক্ষমতায় লাইগো চলেছিল, ঐ সময় কোনো ধরনের সিগনাল শনাক্ত করতে পারেনি। ফেব্রুয়ারি ২০১৫ নাগাদ হানফোর্ড ও লিভিংস্টোন এর ইন্টারফেরোমিটার দুইটি অনলাইনে আনা হয়।

সেপ্টেম্বর ১৮ তারিখে ৪ গুণ সক্ষমতায় কাজ করানো শুরু করানো হয়, এর নাম দেয়া হয় এডভান্সড লাইগো। এর সক্ষমতা বাড়াতে বাড়াতে ২০২১ সাল নাগাদ ২০০ মেগাপারসেক বা ৬৫০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ করা হবে। তুলনা করার জন্য বলা যায়, নিকটবর্তী এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি ০.৭৮ মেগাপারসেক ও ভারগো সুপারক্লাস্টার ১৬.৫ মেগাপারসেক দূরে আছে। এছাড়া এর শনাক্তকরণ ক্ষমতা ১০ হার্জ থেকে ১০০০ হার্জ পর্যন্তও করা হবে। ভারতে একটি লাইগো ল্যাব স্থাপনের প্রস্তাব বিবেচনাধীন আছে।

ভারতে ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ তারিখে লাইগোর ৩য় ল্যাব বানানোর প্রস্তাব পাশ করা হয়েছে। এই প্রস্তাব ৪ বছর ধরে ঝুলে ছিল। এই ল্যাব আকাশে নির্ভুলভাবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উৎস কোথায় তা জানতে সাহায্য করবে। এর সাথে আরো যুক্ত হবে Italy’s Virgo, Germany’s GEO600 এবং জাপানে নির্মিতব্য KAGRA detector.

বিজ্ঞানীরা আগে শুধু আলো দেখতে পেতেন, এখন ব্ল্যাকহোল, পালসার থেকে আসা শব্দ বা সুপারনোভার শব্দ শুনতে পাবেন। ফলে নতুন আঙ্গিকে দুনিয়াকে আমরা দেখতে পাব। উল্লেখ্য, আমরা বিভিন্ন গ্যালাক্সি ও নেবুলার অভূতপূর্ব ছবিগুলা দেখছি কিন্তু হাবল ও চন্দ্র টেলিস্কোপের কল্যাণে। তেমনি একটি লাইগো গবেষণাগারই সামনের দশকে মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের ধারণাই বদলে দেবে।

তথ্যসূত্রঃ

১। সাধারণ আপেক্ষিকতা ও বিশ্বসৃষ্টিতত্ত্ব, এ, এম, হারুন অর রশীদ ও মোঃ নুরুল ইসলাম, প্রকাশকাল, জানুয়ারি ১৯৯৯।

২। Forbes website, Youtube, Physical Review Letters, LIGO website, LIGO press briefing.

featured image: sciencenews.org

সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গের আদ্যোপান্ত

আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (থিওরি অব রিলেটিভিটি) সম্ভবত বিংশ শতকে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় আবিষ্কার। যারা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের তেমন কিছুই জানেন না তারাও হালকা গোঁফ, উঁচু কপাল, এলোমেলো চুলের একজন বিজ্ঞানীকে খুব ভালমতো চেনেন, যিনি ১৯০৫ সালে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানের জগতেও আপেক্ষিকতা তত্ত্বের গুরুত্ব একটু অন্যরকম। এই একটিমাত্র তত্ত্ব প্রায় ১০০ বছর আগে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তা এখনো শেষ হয়নি।

আইনস্টাইন আপেক্ষিকতাকে বর্ণনা করেছেন দুই ভাগে। একবার ১৯০৫ সালে ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’, পরের বার ১৯১৫ সালে ‘আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব’। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিশেষ তত্ত্ব নিশ্চয়ই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কাজ করবে, আর সাধারণ তত্ত্ব সাধারণভাবে সকল ঘটনার জন্য কাজ করবে। বিশেষ তত্ত্বের বিশেষ ক্ষেত্র বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে তা বুঝতে হলে প্রসঙ্গ কাঠামো বা রেফারেন্স ফ্রেম নিয়ে একটু ধারণা দরকার হয়। নাম শুনে যতটা কঠিন আর খটমটে মনে হয় সত্যিকার অর্থে প্রসঙ্গ কাঠামোর ধারণা ঠিক ততটাই সহজ আর সরল।

ধরা যাক, ভোরবেলা দুজন মানুষ পার্কে দৌড়াচ্ছে, একজনের চেয়ে অন্যজন একটু দ্রুত। এখন পার্কের বেঞ্চিতে বসে থাকা যে কেউ কোনোরকম যন্ত্রপাতি ছাড়া শুধুমাত্র দেখেই বলে দিতে পারবে তাদের মধ্যে কে দ্রুত দৌড়াচ্ছে। যখন আমরা শুধু চোখে দেখে কোনো গতি বোঝার চেষ্টা করি তখন নিজের অজান্তেই একটা কাজ করতে থাকি, আশেপাশের কোনো স্থির বস্তুর সাথে সাথে সেই গতিশীল বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে কিনা তা খেয়াল করি। যদি আমাদের বস্তুটি স্থির বস্তুটিকে রেখে (আমরা যে বস্তুটিকে মনে মনে স্থির বলে ধরে নেই) সরে যেতে থাকে তবে আমরা বুঝি আমাদের বস্তুটি গতিশীল, যে বস্তুটি যত দ্রুত সরে যাচ্ছে তার গতি তত বেশি। এখানে এই স্থির বস্তুটি, যার সাথে তুলনা করে আমরা গতিশীলতা বুঝতে পারলাম তাকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলবেন প্রসঙ্গ কাঠামো।

যেকোনো কিছুই প্রসঙ্গ কাঠামো হতে পারে, যদি কেউ একজন ল্যাবে বসে একটা পরীক্ষা করে তাহলে সে পুরো ল্যাবটাকে প্রসঙ্গ কাঠামো ধরতে পারে, আবার চলন্ত গাড়িতে বসে একই পরীক্ষাটা করতে চাইলে পরীক্ষকের সাপেক্ষে ‘স্থির’ গাড়ির কামরাকেই প্রসঙ্গ কাঠামো হিসেবে ধরে নেয়া যায়।

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বে আইনস্টাইন দুটি সূত্র দিয়েছিলেন, ১. সকল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো একইরকম। ২. সব জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে আলোর গতি সমান। জড় প্রসঙ্গ কাঠামো হলো বিশেষ ধরনের কিছু প্রসঙ্গ কাঠামো যারা একে অন্যের সাপেক্ষে ধ্রুব বেগে গতিশীল।

প্রথম সূত্রটিতে বলা হয়েছে প্রসঙ্গ কাঠামো যদি জড় হয় তবে পদার্থবিজ্ঞানের সব সূত্র একরকম হবে। অর্থাৎ সব জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে সবসময় ভরের সাথে ত্বরণ গুন করে বল বের করে ফেলা যাবে। খুবই সোজা সরল কথা। সে তুলনায় দ্বিতীয় সূত্রটা মেনে নিতে কষ্ট হয়।

অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখি দুজন মানুষ যদি একই দিকে দৌড়াতে থাকে তবে তাদের একজনের সাপেক্ষে আরেকজনের যে গতি, সে তুলনার স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কারো সাপেক্ষে তাদের গতি বেশি হবে। আবার তাদের বিপরীত দিক থেকে দৌড়ে আসা কারো সাপেক্ষে তাদের গতিবেগ আরো বেশি হবে। এটাই আমাদের পরিচিত আপেক্ষিক গতি। একটা গতি থেকে অন্য গতি বিয়োগ করে এই আপেক্ষিক গতিটা বের করে ফেলা যায়। কিন্তু দ্বিতীয় সূত্রটা বলছে আলোর বেলায় আমাদের পরিচিত আপেক্ষিক গতির ধারণাটা কাজ করবে না।

তার মানে কেউ যদি স্থির দাঁড়িয়ে থেকে আলোর গতি মাপে তাহলে দেখবে আলো সেকেন্ডে একলক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে ছুটে যাচ্ছে। আবার কেউ যদি সেকেন্ডে ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে ছুটে যেতে যেতে আলোর গতি মাপে তাহলেও কিন্তু আলোর গতিবেগ আমাদের জানাশোনা পুরনো পদ্ধতি অনুযায়ী  সেকেন্ডে একলক্ষ মাইল পাবে না, একলক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইলই পাবে। দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে ব্যাপারটা মেনে নিতে কষ্ট হলেও বিজ্ঞানীরা অসংখ্যবার পরীক্ষা করার পরেও সূত্রটাতে কোনো ভুল পাওয়া যায়নি।

এই সূত্র দুটি মেনে নিয়ে যদি এগিয়ে যাওয়া হয় তাহলে দেখা যায় সময়, দূরত্ব আর ভরকে আমরা যেমন অপরিবর্তনীয় ভাবি, তেমনটা নয়। দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝতে পারি না, তার কারণ আমরা কখনোই আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ছোটাছুটি করি না। কিন্তু কেউ একজন যদি স্থির অবস্থায় থেকে আর অন্য একজন যদি আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ছুটতে ছুটতে দুটি একই ঘটনার মধ্যবর্তী সময়ের পার্থক্য মাপতে চেষ্টা করেন তাহলে দেখা যাবে ঘটনা দুটির সাপেক্ষে যিনি আলোর কাছাকাছি বেগে ছুটে যাচ্ছিলেন তার মাপা সময়ের পার্থক্য যিনি স্থির ছিলেন তার মাপা সময়ের পার্থক্যের চেয়ে বেশি হবে!

আবার ধরে নেয়া যাক একজন মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার সামনে দিয়ে একটা গাড়ি ছুটে চলে যাচ্ছে, গাড়িটার গতিবেগ যদি আলোর কাছাকাছি হয় তাহলে মাটিতে দাঁড়ানো ব্যক্তি দেখবেন গতিশীল গাড়িটা যেন সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। এইটুকুই কিন্তু শেষ না, গাড়িটাতে যদি যাত্রী থাকেন তাহলে তার সাপেক্ষে কিন্তু গাড়িটা স্থির এবং মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা আলোর কাছাকাছি বেগে সরে যাচ্ছে, কাজেই যাত্রী দেখবেন মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা সঙ্কুচিত হয়ে গেছেন!

আইনস্টাইন আরেকটা কাজ করলেন। আমাদের জগতটা ত্রিমাত্রিক অর্থাৎ সবকিছুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা এই তিনটা মাত্রা আছে। যেকোনো স্থানে কোনো বস্তুকে যদি কেউ খুঁজে বের করতে চায় তাহলে কোনো একটা প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে বস্তুটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা বরাবর দূরত্বগুলো জেনে নিতে হবে।

চিত্রঃ প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা জানা থাকলে বস্তুকে চট করে খুঁজে বের করে ফেলা যায়।

আইনস্টাইন যুক্তি দেখালেন কেউ শুধু দূরত্বগুলো জেনে নিলেই সবসময় বস্তুটি খুঁজে বের করতে পারবে না। কারণ বস্তুটি যদি গতিশীল হয় তাহলে কোনো সময়ে প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে বস্তুটির দূরত্ব কত হচ্ছে তা জানতে হবে। অর্থাৎ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতার মতো সময়ও একটা মাত্রা, শুধু পার্থক্য হলো সময়কে আমরা একটু ভিন্নভাবে অনুভব করি। আইনস্টাইন একে বললেন স্পেস-টাইম বাংলায় বললে স্থান-কাল। আগের তিনটা মাত্রার সাথে সময়কে জুড়ে দিলে দেখতে কেমন হয়?

ব্যাপারটা খুব সহজে বোঝার জন্য ধরে নেই স্থানের মাত্রা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা এই তিনটা না, স্থানের মাত্রা শুধু একটা যাকে আমরা একটা সুতার সাথে তুলনা করতে পারি। আর সময় তো নিজেই একটা মাত্রা, একেও একটা সুতার সাথে তুলনা করি। এবার যদি এই দুটি সূতা দিয়ে একটা কাপড় বুনে ফেলা হয় তাহলে দেখতে নিচের ছবিটার মতো হওয়ার কথা।

চিত্রঃ হালকা রঙের সুতাগুলো সময়ের জন্য আর গাড় রঙের সুতোগুলো স্থানের জন্য। (সহজে বোঝার জন্য তিনটা মাত্রাকে একটা ধরে নেয়াতে কিন্তু তেমন কোনো সমস্যা নেই, বিজ্ঞানীরাও হরহামেশাই এভাবে বর্ণনা করেন।)

এই ছিল মোটামুটি ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’। এতক্ষণে নিশ্চয় অনেকেই ধরে ফেলেছেন বিশেষ তত্ত্ব কেন বিশেষ। কারণ এই তত্ত্বের সূত্রগুলো কাজ করবে শুধুমাত্র যতক্ষণ প্রসঙ্গ কাঠামোগুলোর মধ্যে গতির পরিবর্তন (ত্বরণ) হবে না ততক্ষণ।

কিন্তু প্রকৃতিতে সবসময়ই সবকিছুতেই ত্বরণ হচ্ছে। তার মানে হচ্ছে তত্ত্বটা অসম্পূর্ণ এবং প্রকৃতিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে চাইলে আরো বড় পরিসরে চিন্তা করে করে তত্ত্বকে নতুন করে দাঁড় করাতে হবে, সোজা কথায় প্রসঙ্গ কাঠামোর শুধু ধ্রুব বেগের জন্য কাজ করলে হবে না, ত্বরণের জন্যও ‘আপেক্ষিকতা তত্ত্ব’ বের করতে হবে। তাই ১৯০৫ সালে বিশেষ তত্ত্ব দেয়ার পর পরই আইনস্টাইন নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন কীভাবে ত্বরণের জন্য আসল আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বের করা যায়।

প্রকৃতিতে ত্বরণের কথা ভাবতে গেলে প্রথমেই মাথায় আসবে মহাকর্ষজ ত্বরণের কথা। পৃথিবীতে উপর থেকে ফেলে দিলে যেকোনো বস্তুর ত্বরণ হয় বা বেগ বাড়তে থাকে। প্রতি সেকেন্ডে এই বেগ বাড়াটাই হল মহাকর্ষজ ত্বরণ। এই ব্যাপারটা নিয়ে নিউটন ভাবনা-চিন্তা করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যেহেতু বল প্রয়োগ করলে ত্বরণ হয় তার মানে মহাকর্ষজ ত্বরণও নিশ্চয়ই কোনো বলের কারণে হচ্ছে। তিনি এর নাম দিলেন মহাকর্ষ বল। অবশ্য এই বলের উৎস সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

মহাকর্ষ বল কেমন হতে পারে, তার জন্য গাণিতিক সমীকরণ কেমন হতে পারে সব নিউটন ভেবে ভেবে বের করে রেখেছিলেন এবং এসব সমীকরণ দিয়ে প্রকৃতিকে বেশ ভালোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল। আইনস্টাইন তার আশেপাশে গেলেন না। একদিন অফিসের জানালা দিয়ে পাশের বিল্ডিঙের ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মাথায় এল কেউ যদি হঠাৎ পা পিছলে ছাদ থেকে পড়ে যায় এবং অভিকর্ষের প্রভাবে ত্বরণ নিয়ে নিচে পড়তে থাকে তাহলে মাটিতে পড়ার আগে সে কেমন অনুভব করবে? আইনস্টাইন ভাবনাটা আরেকটু এগিয়ে নিয়ে গেলেন, ভাবলেন কেউ যদি একটা বাক্সের ভেতর থাকেন এবং তাকে যদি বাক্সটা সহ ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয় তখন কী হবে? লিফটের কর্ড ছিঁড়ে গেলে ঠিক এই অবস্থাটাই হয়।

বাক্সটি ফেলে দেয়ার আগ পর্যন্ত লোকটি বাক্সের ভিতরে দাঁড়িয়ে বাক্সের তলায় ওজনের সমান বল প্রয়োগ করছিলেন, তাই বাক্সটিও তার ওজনের সমান এবং বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া বল ব্যক্তিটির উপর প্রয়োগ করছিল বলে তিনি তার ওজনটা অনুভব করছিলেন। যখনই বাক্সটাকে ফেলে দেয়া হবে সাথে সাথে বাক্সের ভেতরের মানুষটা মহাকর্ষজ ত্বরণের জন্য নিচে পড়তে থাকবেন এবং প্রতি সেকেন্ডে তার বেগ ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড করে বাড়তে থাকবে। কিন্তু বাক্সটাও মহাকর্ষজ ত্বরণের প্রভাবে পড়ে যাচ্ছে তাই পড়তে পড়তে সেটার বেগও প্রতিসেকেন্ডে ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড করে বাড়তে থাকবে, অর্থাৎ বাক্সটি মানুষটার পায়ের নিচ থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড বেগে সরে যেতে থাকবে। তার মানে কিন্তু মানুষটা আর বাক্সটার তলায় বল প্রয়োগ করতে পারছেন না ফলে কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই, তাই তিনি নিজের ওজনটাও অনুভব করতে পারছেন না।

ব্যাপারটা কেমন হলো? বাক্স এবং মানুষ দুজনেরই ত্বরণ হচ্ছে কিন্তু তারা কেউই কোনো বল অনুভব করছে না। মহাকর্ষ বলহীন কোনো স্থানে স্থির অবস্থায় থাকলে যে অনুভূতি হবে, পৃথিবীতে মহাকর্ষজ ত্বরণের সমান ত্বরণে পড়তে থাকলে ঠিক সেই অনুভূতি হবে। ঠিক এই ভাবনাটাকেই একটু উল্টো করে ভাবলে বলা যায় বাক্সটা যদি শূন্যস্থানে কোনোরকম আকর্ষণের আওতায় না থেকে মহাকর্ষজ ত্বরণের সমান ত্বরণ নিয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে তাহলে ভিতরের কোনো মানুষ যেমন অনুভব করবে, পৃথিবীর পৃষ্ঠে স্থির অবস্থায় থাকলেও ঠিক তেমনই অনুভব করবে।

আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন মহাকর্ষ বল আর ত্বরণ আসলে একই জিনিষ এবং একে বললেন, “the happiest thought in my life”। এই মহাকর্ষ আর ত্বরণ সমান হওয়াকে নাম দিলেন “equivalence principle”।

এবার উপরের ছবিটা একটু দেখা যাক। আইনস্টাইন ঠিক এই থট এক্সপেরিমেন্টটাই করেছিলেন ভেবে ভেবে। দেখা যাচ্ছে লিফটের বাইরের লোকটা সামনের দিকে একটা আলোকরশ্মি নিক্ষেপ করেছেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির সাপেক্ষে যখন লিফটটা স্থির (চিত্রের প্রথম অংশে) তখন লিফটের ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোক রশ্মিটা একপাশ থেকে এসে সোজা অন্য পাশের দেয়ালে আঘাত করছে। বাইরের ব্যক্তির সাপেক্ষে লিফটটা যখন ধ্রুব বেগে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে তখন ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোকরশ্মিটা চিত্রের মতো বেঁকে যাচ্ছে এবং পাশের দেয়ালে আঘাত করার আগে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হচ্ছে, সময়ও বেশি লাগছে (ধ্রুব বেগের জন্য যে এমনটা হয় তা আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব থেকে আমরা আগেই জেনে গেছি)।

বাইরের ব্যক্তির সাপেক্ষে লিফটটার যখন উপরের দিকে ত্বরণ হচ্ছে তখন ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোকরশ্মিটা বেঁকে যাচ্ছে এবং পাশের দেয়ালে আঘাত করার আগে, আগের চেয়েও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করছে, সময়ও বেশি লাগছে। এর কারণ কী হতে পারে? আইনস্টাইন ভাবলেন, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি যেহেতু আলোক রশ্মিটাকে কখনোই বেঁকে যেতে দেখবেন না কিন্তু লিফটের সাথে ত্বরণে ছুটে চলা মানুষটা যেহেতু দেখবেন, আলোকরশ্মিটা বেশি সময় ধরে বেঁকে গিয়ে গিয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলছে তার মানে নিশ্চয়ই স্থির ব্যক্তির স্থান-কালের তুলনায় ত্বরণে থাকা ব্যক্তির স্থান-কালটাই বেঁকে যাচ্ছে। ত্বরণের জন্য স্থান-কাল বেঁকে যাচ্ছে। আবার “equivalence principle” অনুযায়ী যেহেতু ‘মহাকর্ষ’ আর ‘ত্বরণ’ একই জিনিস সেহেতু অভিকর্ষের জন্যও স্থান-কাল এভাবে বেঁকে যাবে।

অর্থাৎ আমরা যদি বলি, মহাকর্ষ বল বলে কিছু নেই কিংবা ‘ভারী বস্তুর মহাকর্ষ বল বেশি, হালকা বস্তুর মহাকর্ষ বল কম- এমনটা সত্য হবে না। ভারী বস্তু আসলে তার চারপাশের স্থান-কালকে বেশি করে বাঁকায় আর হালকা বস্তু কম বাঁকায়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। শুনে মনে হতে পারে গালগল্প কিন্তু আইনস্টাইন সত্যি সত্যি এই বাঁকানো স্থান-কালের ধারণা দিয়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করে ফেললেন। যেমন সূর্য যদি পৃথিবীকে আকর্ষণ না করে শুধু স্থান-কালকে বাঁকিয়ে বসে থাকে তাহলে পৃথিবী কেন সূর্যের চারিদিক ঘুরবে না?

চিত্রঃ সূর্যের চারিদিকে বাঁকানো স্থান-কালে আটকা পড়ে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে।

 

ঠিক যে কারণে পানি গড়িয়ে নিচু জায়গায় পড়ে যেতে চায় সেই একই কারণে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে বাঁকা স্থান-কালের মধ্যে পড়ে ঘুরতে থাকে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলে, পরবর্তী ছবির মতো করে একটা টানটান করে রাখা চাদরের মাঝখানে ভারী কিছু রেখে আরেকটু হালকা একটা গোলককে কিছু গতি দিয়ে ছেড়ে দিয়ে দেখতে পারেন। এখানে চাদরটা স্থান-কালের মতো ভারী বস্তুটার ভরের জন্য বেঁকে যাবে। পৃথিবী কেমন করে সূর্যকে ঘিরে ঘুরতে থাকে, হালকা গোলকটার গতি দেখলেই সেটা বুঝে ফেলা সম্ভব।

এখানে অবশ্য চাদরের সাথে গোলকের ঘর্ষণে শক্তি কমতে কমতে একটা সময় গোলকটা মাঝখানের ভারী বস্তুতে গিয়ে আঘাত করবে, কিন্তু পৃথিবী যেহেতু শূন্যস্থানে ঘুরছে তাই তার সাথে কোনোকিছুর ঘর্ষণে গতিশক্তি কমে যায় না, পৃথিবীও সূর্যে গিয়ে আঘাত করে না।

আইনস্টাইন ত্বরণের জন্য আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বের করতে গিয়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করে ফেললেন। নিউটনের পুরনো তত্ত্বকে পাশ কাটিয়ে আইনস্টাইন তার এই নতুন তত্ত্বটি দিয়ে ভরযুক্ত বস্তুর পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় আলোক রশ্মির বেঁকে যাওয়া (Gravitational Lensing), ভরযুক্ত বস্তুর কাছে সময়ের ধীর হয়ে যাওয়া (time dilation), ঘূর্ণায়মান ভরের দিকে স্থান-কালের টান ইত্যাদি ঘটনা ব্যাখ্যা করে ফেললেন, যেগুলো নিউটনের মহাকর্ষ বলের ধারণা দিয়ে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না।

আইনস্টাইন কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে শুধুমাত্র ভেবে ভেবেই বের করে ফেলেছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা অনেকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এই তত্ত্বের সবগুলো ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য প্রমাণ করেছিলেন। শুধু একটা ছাড়া। সেটি “মহাকর্ষীয় তরঙ্গ”।

আইনস্টাইন তার নতুন তত্ত্বটা দিয়ে অনেক কিছুই ঠিকঠিক ব্যাখ্যা করে ফেললেন কিন্তু ভারী বস্তু যে ভরের জন্য সত্যি সত্যিই চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে তা সরাসরি প্রমাণ করা যায় কীভাবে? আইনস্টাইন আবার ভেবে ভেবে বের করলেন, দুটি ভারী বস্তু যদি একে অন্যকে ঘিরে ঘুরতে ঘুরতে কাছাকাছি আসতে থাকে তবে তারা যে তাদের ভরের জন্য স্থান-কালকে বাঁকিয়ে রেখেছিল সেই বাঁকানো ভাবটার খুব দ্রুত একটা পরিবর্তন ঘটবে।

এই দ্রুত পরিবর্তনটার জন্য একটা খুব শক্তিশালী তরঙ্গ উৎপন্ন হয়ে হয়ে ছড়িয়ে পড়ার কথা, এই তরঙ্গটাকে তিনি নাম দিলেন ‘মহাকর্ষীয় তরঙ্গ’। কোনোভাবে যদি এইরকম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুঁজে পাওয়া যায় তাহলেই প্রমাণ হয়ে গেল যে ভারী বস্তু আসলেই স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে এত এত লেখালেখি হচ্ছে যে সেগুলো পড়ে পড়ে আমরা সবাই এ সম্পর্কে কমবেশি জানি।

সবাই অনুপ্রস্থ তরঙ্গ চিনি। যে তরঙ্গ নিচের ছবির মতো মাধ্যমের কণাগুলোকে উপরে নিচে কাঁপাতে কাঁপাতে কণার গতির দিকের সাথে সমকোণে এগিয়ে যায় সেটাই অনুপ্রস্থ তরঙ্গ। যেমন পানির ঢেউ।

চিত্রঃ অনুপ্রস্থ তরঙ্গ।

আবার যে তরঙ্গ মাধ্যমের কণাগুলোকে সামনে পিছনে কাঁপাতে কাঁপাতে কণার গতির দিকে সমান্তরাল দিকে এগিয়ে যাবে তাকে আমরা বলি অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ। যেমন শব্দের তরঙ্গ।

চিত্রঃ অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ।

তবে মহাকর্ষ তরঙ্গ কিন্তু আমাদের পরিচিত অনুপ্রস্থ বা অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ না, একটু বিশেষ ধরনের তরঙ্গ। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘কোয়াড্রুপল তরঙ্গ’। এই তরঙ্গ স্থানকে মাধ্যম হিসেবে ব্যাবহার করে এবং অনুপ্রস্থ আর অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের মতোই মাধ্যমের সংকোচন প্রসারণ করে আলোর বেগে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কোয়াড্রুপল তরঙ্গ স্থানের মধ্য দিয়ে ছুটে চলার সময় স্থানকে যদি আনুভূমিক দিকে সংকুচিত করে তবে উলম্ব দিকে সম্প্রসারিত করে। একইভাবে, যদি আনুভূমিক দিকে সম্প্রসারিত করে তবে উলম্ব দিকে সংকুচিত করে, নিচের ছবির মতো। বোঝার সুবিধার জন্য এখানেও ধরে নিলাম স্থানের মাত্রা দুটি, দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ।

চিত্রঃ প্রথম চিত্রে স্থান-কাল আনুভূমিক দিকে প্রসারিত, উলম্ব দিকে সংকুচিত হয়েছে। দ্বিতীয় চিত্রে ঠিক উল্টো ঘটনাটা ঘটেছে।

কিন্তু এই কোয়াড্রুপল মহাকর্ষজ তরঙ্গ এত বেশি দুর্বল যে, যত সহজে মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্তকরণের কথা বলা হলো, সত্যি সত্যি সনাক্ত করতে গেলে ঠিক ততটাই সূক্ষ্ম আর সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি দরকার। আইনস্টাইনের সময় এত সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির কথা চিন্তাও করা যেত না।

বেশ কিছু বছর পরে পদার্থবিজ্ঞানী Ray Weiss মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার জন্য একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি বের করলেন। তার পদ্ধতিটা সহজ, এতে থাকবে দুটি সমান দৈর্ঘ্যের টানেল, যেগুলো পরস্পর সমকোণে অবস্থান করবে। প্রত্যেকটি টানেলের শেষ মাথায় লাগানো থাকবে প্রতিফলক আয়না, দুটি টানেলের দৈর্ঘ্য খুব সূক্ষ্মভাবে সমান হতে হবে। টানেলগুলো দিয়ে আলোর ব্যতিচার মাপা হবে কাজেই সূক্ষ্মভাবে সমান করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

একটি লেজার বিমকে বিশেষ কৌশলে দুইভাগে ভাগ করে টানেলগুলো দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হলে (নিচের ছবির মতো) লেজার রশ্মিগুলো টানেলের শেষ মাথার প্রতিফলক আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে। বিজ্ঞানীরা অনেক বছর ধরে অনেক খেটেখুটে টানেল দুটিকে খুব সূক্ষ্মভাবে সমান করে তৈরি করেছেন তাই ফিরে আসা রশ্মি দুটো ব্যতিচার করে পরস্পরকে নাই করে দিবে।

চিত্রঃ LIGO Interferometer.

এখন যদি পৃথিবীর মধ্য দিয়ে মহাকর্ষ তরঙ্গ ছুটে যায় তাহলে স্থানের একবার সংকোচন আরেকবার প্রসারণ হবে। যেহেতু এই যন্ত্রটিও স্থানের মধ্যেই আছে সেহেতু টানেল দুটিতেও নিচের চিত্রের মতো সংকোচন-প্রসারণ হবে।

চিত্রঃ উলম্ব টানেলটা সংকুচিত আর আনুভূমিক টানেলটা প্রসারিত হচ্ছে।
চিত্রঃ উলম্ব টানেলটা প্রসারিত আর আনুভূমিক টানেলটা সংকুচিত হচ্ছে।

এই সংকোচন প্রসারণের জন্যই আগের মতো প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসা রশ্মি দুটো ব্যতিচারের মাধ্যমে আর পরস্পরকে নাই করে দিতে পারবে না। রশ্মি দুটো মিলে আরেকটু বেশি শক্তিশালী রশ্মি তৈরি করে শনাক্তকারকে আঘাত করবে (নিচের ছবি)। শনাক্তকারক থেকে এই রশ্মির তীব্রতা মাপা আর মহাকর্ষ তরঙ্গ মাপা আসলে একই কথা।

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ বেঙ্গলেনসিস (ইমতিয়াজ আহমেদ)।

বাস্তবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে গিয়ে কিন্তু বিজ্ঞানীদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। কারণ মহাকাশের অনেক অনেক দূরে পরস্পরকে ঘিরে ঘুরতে থাকা দুটি নিউট্রন তারা বা ব্ল্যাকহোল থেকে আসা মহাকর্ষ তরঙ্গ পৃথিবীতে স্থানকে এত কম বিচ্যুত করবে যে তা শনাক্ত করতে হলে প্রায় অসাধ্য সাধন করতে হবে। তাই তারা প্রত্যেকটি টানেলকে ৪ কিলোমিটার লম্বা করে তৈরি করলেন (টানেলের দৈর্ঘ্য যত বেশি হবে বিচ্যুতি ধরতে পারার সম্ভাবনাও তত বাড়ে)।

এতটুক পড়ে এসে অনেকে নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন, এতটা সংবেদনশীল করে তৈরি করার একটা অসুবিধাও আছে, যন্ত্রটার কাছাকাছি খুব অল্প কোনো নয়েজও যন্ত্রটাতে প্রভাব ফেলবে। যন্ত্রটার সংবেদনশীলতা এতই বেশি যে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে একটা তালি দিলেই একটা বিক্ষেপ দেখা যাবে। এই সমস্যাটা যাতে না হয় এবং পৃথিবীর কোনো নয়েজকে যাতে মহাকর্ষ তরঙ্গ ভেবে ভুল না হয় তাই বিজ্ঞানীরা দুটি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় দুটি একইরকম যন্ত্র তৈরি করে রেখে দিয়েছিলেন কারণ দুই জায়গায় দুটি ভিন্ন যন্ত্রে একই সাথে বাইরে থেকে একই পরিমাণ নয়েজ ঢুকে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এই ধরনের ব্যবস্থা আর এত এত সতর্ক পদ্ধতি নিয়ে ২০০১ সালে LIGO প্রকল্প শুরু হয়েছিল। ২০১০ পর্যন্ত এর মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার মতো সংবেদনশীলতা ছিল না। শেষপর্যন্ত ২০৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করে এর সংবেদনশীলতা ১০ গুন বাড়িয়ে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আবার চালু করা হয়। নতুন আপগ্রেডেড যন্ত্রপাতি নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসেই বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করে ফেললেন।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করে শুধুমাত্র আইনস্টাইনের বক্র স্থান-কালের ধারণা প্রমাণ করা হলো কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের সামনে একটা বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে গেল। ব্ল্যাকহোল থেকে কোনো তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ বের হতে পারে না। আমরা যেহেতু এতদিন শুধু তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গকেই যোগাযোগের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হিসেবে জানতাম তাই ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণাও হালে খুব একটা পানি পায়নি।

আবার বিগ ব্যাং এর পরে একটা নির্দিষ্ট সময় পর থেকে মহাবিশ্ব কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা আমরা জানি। কিন্তু বিগ ব্যাং এর ঠিক পর পরই মহাবিশ্বের ঘনত্ব এত বেশি ছিল যে সেখান থেকে কোনো রকম তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ বের হতে পারেনি। তাই বিগ ব্যাং এর ঠিক পর পরই মহাবিশ্ব কেমন ছিল তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গের আচরণ থেকে তার কোনোরকম তথ্য পাওয়া যায় না।

কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা নেই, মহাবিশ্বের একেবারে শুরুতে উচ্চ ঘনত্ব যেমন এই তরঙ্গকে আটকে রাখতে পারেনি তেমনি ব্ল্যাক হোলের উচ্চ ঘনত্বেও এই তরঙ্গ আটকা পড়ে থাকবে না। তাই এই সংক্রান্ত গবেষকদের কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে গেল। আমাদের জীবদ্দশাতেই হয়ত আমরা জানতে পারবো মহাবিশ্ব একেবারে জন্মের সময়টা কীভাবে পার করেছে অথবা ব্ল্যাক হোলের ভিতরে কেমন সব আশ্চর্য ঘটনা ঘটে চলছে।

তথ্যসূত্রঃ

১. https://blog.mukto-mona.com/2016/02/12/48439/

২. https://blog.mukto-mona.com/2016/02/12/48447/

৩. https://www.youtube.com/watch?v=J9Zs-CjybTc

৪. http://csep10.phys.utk.edu/astr161/lect/history/einstein.html

৫. http://www.ceder.net/def/quadruple.php4?language=usa

৬. http://www.pitt.edu/~jdnorton/Goodies/Chasing_the_light/

৭. http://www.einstein-online.info/spotlights/equivalence_principle

৮. https://www.youtube.com/watch?v=RzZgFKoIfQI

featured image: rsi.ch

“হাল ছেড়ো না বন্ধু”- আইনস্টাইন যেভাবে ‘আইনস্টাইন’ হয়ে উঠলেন

ফেব্রুয়ারি ১১ তারিখ, যেদিন মহাকর্ষ তরঙ্গের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, অনেকের মতো আমিও এ বিষয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠি। মহাকর্ষ তরঙ্গ বলে একটা জিনিস যে আছে তা প্রায় একশ বছর আগে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে বলে গেছেন। আবদুল গাফফার রনির “থিওরি অব রিলেটিভিটি” (অন্বেষা, ২০১৬) বইটি পড়ে ফেলি। লেখক সাবলীল ভাষায় এ তত্ত্বটির মূল ধারণাগুলোর সহজবোধ্য বর্ণনা দিয়েছেন। বইটি পদার্থবিজ্ঞানের বই হলেও বেশ উপভোগ্য, গাণিতিক সূত্রের ছড়াছড়ি নেই। এই জটিল বিষয়ে প্রাথমিক সাক্ষরতা লাভের জন্য বইটি বেশ চমৎকার।

আইনস্টাইন, যাকে বলা হয় বিজ্ঞানের পোস্টারবয়, বিজ্ঞানের রঙিন জগতের একজন তারকা, তিনি আরেকবার জিতলেন। তার তত্ত্বটিতে কী বলা হয়েছে, কিংবা মহাকর্ষ তরঙ্গ জিনিসটা আসলে কী- এসব বিষয় নিয়ে আমি কিছুই লিখবো না। কারণ বাংলা ভাষায় অনেকেই এ বিষয়গুলো নিয়ে খুব ভালো লিখছেন। আমার আগ্রহ হলো অন্য জায়গায়: আইনস্টাইন কীভাবে ‘আইনস্টাইন’ হয়ে উঠলেন, তার উপর।

আমরা যে শুনি, তিনি তৎকালীন নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানের ভিত নড়িয়ে দিয়ে নতুন ধরনের পদার্থবিজ্ঞান চালু করেছেন- এরকম বিদ্রোহী কি একেবারে শুরু থেকেই ছিলেন? তিনি কাজ করতেন কীভাবে? তার কাছ থেকে তরুণরা কী শিখতে পারেন?

শৈশবের আইনস্টাইন; image source: biography.com

যে কোনো বড়সড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, কিংবা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পেছনে একটি প্রস্তুতির বিষয় থাকে। আমরা সেই বিরাট আবিষ্কার বা পরিবর্তন দেখে এতোটাই বিস্মিত হয়ে যাই, ঘটনার নায়কের প্রচলিত জীর্ণ-নিয়ম ভেঙে ফেলা বিদ্রোহের সাফল্যে এতোটাই উদ্বেলিত হয়ে পড়ি যে, পেছনের দীর্ঘ প্রস্তুতির পরিশ্রমটা চোখেই পড়ে না। আর সে প্রস্তুতি যে প্রচলিত রীতিমাফিকই হয়ে থাকে, সে কথাটাও ভুলে যাই।

অনেক দিন আগে কাল নিউপোর্টের ব্লগে এ প্রসঙ্গে একটি লেখা পড়ি যেখানে তিনি আইনস্টাইনের প্রস্তুতির উপর আলো ফেলেছিলেন। সেখান থেকে একটা গল্প এখানে বলবো।

আইনস্টাইনের এই কাহিনীটা প্রায় সবাই শুনেছেন। গল্পটা এরকম-আইনস্টাইন শিক্ষাগত জীবনে বিদ্রোহী ছাত্র ছিলেনগতানুগতিক পড়াশুনা তার ভালো লাগতো নাফলে পরীক্ষায় খারাপ নাম্বার পেতেনবিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা শেষ হয়ে গেলোকিন্তু তখনকার শিক্ষায়তন তার প্রতিভা উপেক্ষা করে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিতে অস্বীকার করেফলে বেকার আইনস্টাইন অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা সর্বস্বান্ত হয়ে প্যাটেন্ট অফিসে ক্লার্ক হিসেবে নিচু পদের চাকরীতে যোগ দেন তবে চাকরী তার জন্য হিতেবিপরীত হয়ে দাঁড়ায়গতানুগতিক জ্ঞানচর্চার গণ্ডি থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সাহসী ও মৌলিক চিন্তাভাবনা করার সুযোগ পানপরবর্তীতে চিন্তাভাবনা তাবৎ পৃথিবীর পদার্থবিজ্ঞানকে বদলে দেয়

তবে বাস্তবতা এর চেয়ে জটিল ছিল আইনস্টাইন বিদ্রোহী ছাত্র ছিলেন। কিন্তু তিনি স্কুলে ও এন্ট্রান্স পরীক্ষায় গণিত ও পদার্থবিদ্যায় সব সময়েই উচ্চ নাম্বার পেতেন। কলেজের পর আইনস্টাইনকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছিল। তবে অধ্যাপনার আবেদন করায় তাকে সেখানে নেয়া হয়নি- ঘটনা এমন নয়। তিনি গ্রাজুয়েশনের পর ইউনিভার্সিটি এসিস্টেন্টশিপ পদে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু পাননি।

ইউনিভার্সিটি এসিস্টেন্টশিপ মূলতঃ গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীর ডক্টরাল গবেষণা চালানোর সময় জীবিকা নির্বাহের আর্থিক উৎস হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রাজুয়েট শিক্ষার ক্ষেত্রে যাকে বলা হয় গবেষণা সহযোগী বা রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট।

এমন না আইনস্টাইনের প্রতিভা অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। বরং আইনস্টাইন ‘অসামান্য প্রতিভার ছাপ’ রাখার মতো কোনো কাজই তখনো করেননি, তার কর্মজীবনের মাত্র শুরু তখন। গ্রাজুয়েশনের পর কৈশিক প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি যে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন সেটাও ছিল মাঝামাঝি মানের। বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগী হিসেবে কাজ না পাওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল একজন অধ্যাপকের নেতিবাচক সুপারিশ; যিনি আবার আইনস্টাইনকে পছন্দ করতেন না।

এই গল্পে যে কথা অনুপস্থিত তা হলো প্যাটেন্ট অফিসের ক্লার্ক থাকা অবস্থাতেও আইনস্টাইন তার ডক্টরাল ডিগ্রির জন্য গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তার একজন উপদেষ্টাও ছিলেন। ডক্টরাল-উপদেষ্টার সাথে আইনস্টাইন নিয়মিত একটি পাঠচক্রে দেখা করতেন, লেখালেখিও করতেন একে অপরকে (ছবি দ্রষ্টব্য)।

যে বছর আইনস্টাইন বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বটি প্রকাশ করেন (১৯০৫), এই বছরেও তিনি অভিসন্দর্ভ জমা দেন এবং PhD ডিগ্রী পেয়ে যান। এর পরেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার জন্য সুযোগ পেয়ে যান ও তার একাডেমিক কর্মজীবন শুরু হয়।

অন্যভাবে বলা যায়, আইনস্টাইনকে পিএইচডি গবেষণা চালানোর পাশাপাশি একটা চাকরী করতে হতো জীবিকা নির্বাহের জন্য। পিএইচডি গবেষণার পাশাপাশি চাকরী করা খুবই ঝামেলার একটা ব্যাপার এবং গবেষকের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। তবুও আইনস্টাইনের স্নাতক পড়াশুনা থেকে শুরু করে অধ্যাপনার কাজে নিয়োগ হওয়ার সময়টা মোটামুটি রীতিমাফিক পথ ও প্রতিষ্ঠিত সময়সীমা ধরেই চলেছে।

এই গল্প বলার পেছনে কারণ হলো এখান থেকে আমাদের একটা (বদ)অভ্যাস ধরা পড়ে, আমরা উদ্ভাবক-আবিষ্কারকদের আগন্তুক হিসেবে দেখতে ভালোবাসি। আগন্তুক, কারণ তারা প্রথাকেন্দ্রীক প্রতিষ্ঠানের বাঁধন ছিড়ে মুক্ত মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হন, পৃথিবীকে বদলে দেন। আগন্তুক, কারণ তারা প্রচলিত নিয়ম ভাঙেন, অনেকটা হঠাৎ করেই নতুন কিছু তৈরি করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো বৈপ্লবিক আবিষ্কার বা ভিন্ন ধর্মী কাজ করতে হলে এর আগে রীতিমাফিক প্রশিক্ষণ বা তালিমের দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করে আসতে হয়।

আইনস্টাইন মেধাবী ও মৌলিক চিন্তার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ গ্রাজুয়েট শিক্ষা সম্পূর্ণ করার আগ পর্যন্ত তিনি যথেষ্ট পদার্থবিজ্ঞান জানতেন না; পদার্থবিজ্ঞানকে সামনে এগিয়ে নেয়া ছিল আরো পরের ব্যাপার। অন্যান্য আবিষ্কারকদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। স্টিভ জবস প্রথমে অ্যাপল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকে বের হয়ে আসেন, দশ বছর অন্যান্য ব্যবসা করে আবার অ্যাপলে ফিরেন।

দ্বিতীয়বার অ্যাপলে ফিরে আসা ছিল তার ভাগ্য ঘুরিয়ে দেয়ার ঘটনা- এর পর থেকে তিনি সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠতে থাকেন। কারণ মাঝখানের দশ বছর তিনি কঠিন সময় পার করেছেন ব্যবসা বিষয়ে ওস্তাদ হতে, দরকারি বিভিন্ন দক্ষতা শানিয়ে নিতে। এ দীর্ঘ সময় রূঢ় বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে তৈরি করার পরেই কেবল অ্যাপল-২ তে তার মেধা প্রযুক্তির বাজার বদলে দেয়ার একটি ক্ষেত্র পায়।

আইনস্টাইন প্রথমেই বিপ্লবী বিজ্ঞানী হিসেবে আবির্ভূত হননি। তাকে নিজেকে তৈরি করে নিতে হয়েছে, স্নাতকের পর পিএইচডি করতে হয়েছে প্রচলিত রীতি অনুসারেই। যে কোনো যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্পর্কে এটা তিক্ত সত্য। আমরা যদি অন্যান্যদের পৃথিবী বদলানোর জন্য উৎসাহিত করতে চাই, প্রথমে তাদেরকে ভেতর থেকে ভিত শক্ত করার জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করতে হবে।

এক্ষেত্রে সবচাইতে কৌশলের জায়গা হলো প্রাতিষ্ঠানিক প্রথা, রীতি বা ঐতিহ্যমতো প্রশিক্ষণ বা তালিম নিয়ে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি নিজের মধ্যে ভিন্নভাবে ভাবার স্ফুলিঙ্গ বাঁচিয়ে রাখা। নতুন কিছু করা, নতুনভাবে চারপাশকে দেখার ইচ্ছেটা একটি দীর্ঘ সময় ধরে জিইয়ে রাখা, যতক্ষণ না সেই ভিন ধারার কাজটি করার জন্য ‘যথেষ্ট-ভালো’ একটি পর্যায়ে যাওয়া না যায়। কবীর সুমনের গানের কলি মনে পড়ে-

বন্ধু তোমার ভালোবাসার স্বপ্নটাকে রেখো,/ বেঁচে নেবার স্বপ্নটাকে জাপটে ধরে থেকো,

দিন বদলের স্বপ্নটাকে হারিয়ে ফেলো না,/ পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনো গেলো না,

…হাল ছেড়ো না…

featured image: nytimes.com 

লজ্জায় কেন আপনার গাল লাল হয়ে ওঠে?

মাঝে মাঝেই আমাদের এমন হয় যে, আমরা মারাত্মক রেগে গেছি কিংবা লজ্জায় পড়ে গেছি কোনো বিষয়ে আর সেই সাথে আক্ষরিক অর্থেই লাল হয়ে গেছে আমাদের গাল দুটো। বিশেষত ফর্সা মানুষদের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটি আরো বেশি লক্ষ্য করা যায়। আর সেই মানুষটি যদি মনের মানুষ হয় তাহলে তো কথাই নেই; শুধুই তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছা করে তখন!

আমাদের মুখের ত্বকের নিচের রক্তনালীকাগুলোতে অধিক পরিমাণে রক্ত চলাচলের ফলেই লালচে গালের দেখা মেলে। উত্তাপ,অসুস্থতা, অ্যালার্জি,অ্যালকোহল ছাড়াও বিভিন্ন অনুভূতির প্রকাশক হিসেবেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যখন আমরা কোনো কারণে উত্তেজিত হয়ে যাই অথবা লজ্জাকর পরিস্থিতিতে পড়ি, তখন আমাদের দেহ থেকে অ্যাড্রেনালিন ক্ষরিত হয়। এ হরমোনটি এরপর ধাপে ধাপে বেশ কিছু কাজ করতে থাকে।

১. শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর করে আনে;

২. হৃদকম্পন ক্রমশ এমনভাবে বাড়াতে থাকে যেন বুকের ভেতর কেউ ড্রাম বাজাচ্ছে;

৩. চোখের মণিগুলো এরপর ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করে যেন আশেপাশের পরিবেশ সম্পর্কে যতোটা বেশি সম্ভব সজাগ থাকা যায়;

৪. হজম প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়ে, যায় যেন শক্তিটুকু আমাদের পেশীতে এসে জমা হয়।

৫. আমাদের রক্ত-নালীকাগুলোও ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে যায় যেন রক্তপ্রবাহ আর অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়ে। এ সময়ই মূলত আরক্তিম গালের দেখা পাই। তখন কেমিক্যাল ট্রান্সমিটার অ্যাডেনাইলিল সাইক্লেজ এর সিগনাল পেয়ে মুখের চামড়ার নিচে থাকা রক্তনালীকাগুলো প্রসারিত হয়ে যায়। ফলে রক্তপ্রবাহ বেড়ে গিয়ে গালগুলো লাল হয়ে যায়।

অনেকে আবার এ লাল হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটিকে ভয়ও পেয়ে থাকেন। এ ভয়কে বলা হয় এরিথ্রোফোবিয়া। এন্ডোথোরাসিক সিমপ্যাথেকটমি সার্জারির সাহায্যে এ প্রভাব কমিয়ে আনা সম্ভব। দিন শেষে আমরা সবাই আবেগের ফেরিওয়ালা।

featured image: dethroningyourinnercritic.com

পৃথিবীর সবচেয়ে ঠান্ডা অণু

সম্প্রতি এমআইটির পদার্থবিদরা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ঠাণ্ডা ও স্থিতিশীল অণুটির সন্ধান পেয়েছেন। এ উদ্দেশ্যে সোডিয়াম-পটাশিয়াম গ্যাসকে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা করে এর তাপমাত্রা প্রায় ০ কেলভিনে (-২৭৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস) নামিয়ে আনা হয়েছিল।

ইতিপূর্বে রাসায়নিকভাবে অস্থিতিশীল মৌলসমূহ শীতল করে স্থিতিশীল করার যে রেকর্ড তৈরি করা হয়েছিল এ উদ্ভাবনটি সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। বিজ্ঞানদের এমন ঠাণ্ডা অণু তৈরি করার মূল উদ্দেশ্য হলো অণুসমূহের উত্তেজিত অবস্থা এবং তাদের কোয়ান্টাম সিস্টেম ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা।

অণুদের উত্তেজিত অবস্থায় গবেষকেরা ‘সুপার ফ্লুইড ক্রিস্টাল’ অবস্থা পর্যবেক্ষণের আশা করছেন। সুপার ফ্লুইড ক্রিস্টাল অবস্থাকে তারা এমন এক অবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছেন যখন কোনো ঘর্ষণ বল ক্রিয়া করবে না। এ অবস্থা যদিও দেখা যায়নি তবে ধারণা করা হচ্ছে তারা সেটি দেখতে পারবেন।

অন্যদিকে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা অণু কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া ক্রিপ্টোগ্রাফিতে কোয়ান্টাম কম্পিউটেশন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং একটি সাধারণ কম্পিউটারে কোনো সমস্যার সমাধান করতে যে অত্যাধিক লম্বা সময় লাগতো তা এক্ষেত্রে আর লাগবে না।

এ পরীক্ষায় এক সেট লেজার ব্যবহার করেন সোডিয়াম এবং পটশিয়াম অণুগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে ঠাণ্ডা করে একটি জালে ফেলার জন্য। এরপর সেখানে চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করা হয় যাতে করে অণুগুলোর মধ্যে দূর্বল বন্ধন তৈরি হয়। অণুগুলোর মধ্য থেকে তাপ শুষে নেওয়ার জন্য আরেক সেট লেজার ব্যবহার করা হয়েছিল। পরীক্ষার পরবর্তী ধাপ হিসেবে গবেষকদের পরিকল্পনা আছে যেন অণুসমূহের এই ঠাণ্ডা বেশি সময় ঠিকে থাকে।

তথ্যসূত্রঃ লাইভ সায়েন্স

featured image: thechronicleherald.ca

পর্যায় সারণীর চারটি নতুন মৌলের স্বীকৃতি

পর্যায় সারণীতে নতুন ৪ টি মৌল যুক্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সংস্থা IUPAC যা পর্যায় সারণী সংক্রান্ত সবরকমের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে সেই ৪ টি মৌলের আবিষ্কারের সত্যতা যাচাই করার পরে এ সিদ্ধান্ত নিলেন। এর মাধ্যমে ২০১১ সালের পরে এই প্রথম পর্যায় সারণীতে মৌল অন্তর্ভুক্তির ঘটনা ঘটল। এর মাধ্যমে সারণীর ৭ম সারিটি সম্পূর্ণ হলো।

সকল মানবসৃষ্ট মৌলকে আপাতত পর্যায় সারণীতে স্থানদখলকারী সংখ্যার ভিত্তিতে নামকরণ করা হবে। ১১৩ নং মৌল আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেয়া জাপানের হচ্ছে RIKEN ইনস্টিটিউটকে। মৌল ১১৫,১১৭, ১১৮ নম্বরের আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেয়া হচ্ছে জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ ইন ডুবনা, রাশিয়া এবং ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স রিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির একদল বিজ্ঞানীকে।

অত্যধিক ভারী মৌল আবিষ্কার কষ্টসাধ্য, কারণ এগুলো খুবই ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু এই ভারী মৌল আবিষ্কার করতে গিয়ে দেখা গেছে এগুলো আগের মৌলগুলো থেকে একটু বেশিই স্থায়ী হয়েছে।

রাইকেন ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী কসুকে মরিতা ১১৩ তম মৌলের আবিষ্কারের সময় জানিয়েছিলেন,“তার দলটি এখন পর্যায় সারণির অজানা এলাকা ১১৯ তম মৌল ও তার চেয়েও ভারী মৌলের আবিষ্কারের জন্য চেষ্টা করবেন।” (বিবিসি)

ভালোবাসা- শারীরবৃত্তীয় রাসায়নিক প্রক্রিয়া ছাড়া যা আর কিছুই নয়

“তোমরা যে বলো দিবস রজনী, ভালোবাসা, ভালোবাসা
সখী ভালোবাসা কারে কয়?”

‘তোরা যে যা বলিস ভাই’ ভালোবাসা কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা শারীরবৃত্তীয় রাসায়নিক প্রক্রিয়া ছাড়া তেমন কিছু না। বিশ্বাস হচ্ছে না? চলুন তাহলে ঘুরে আসি এক লম্বা সফরে। বিজ্ঞানীগণ ভালোবাসা নিয়ে কী বলেন-জেনে আসি। তবে এই যাত্রায় যাওয়ার আগেই বলে রাখি আমরা এই যাত্রাপথক প্রেমের আবেগ, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের উদ্দীপতা এবং হরমোনঘটিত পরিবর্তন অনুযায়ী তিন পর্বে ভাগ করে তবেই এগুচ্ছি।

প্রথম পর্বঃ প্রেমে পড়া বা “পলক তবু কেনো আর পড়ে না” ধাপ

আপনাদের ঐ গল্পটা জানা আছে? ঐ যে এক ছাত্র পরীক্ষার জন্য শিখে গেলো ‘ধান’ রচনা, কিন্তু পরীক্ষায় আসলো ‘রেলভ্রমণ’। ছাত্র লেখা শুরু করলো, “রেলে চড়ে আমরা একবার মামাবাড়ি গিয়েছিলাম। আদিগন্ত বিস্তৃ্ত ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে চলার সময় রেল লাইনচ্যুত হয়ে পড়লো ধানক্ষেতের মাঝে। সোনালী রঙ্গে ভরা সেই ধানক্ষেত হরেক ধানে পরিপূর্ণ। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-আউশ, আমন, বিরি ইত্যাদি। এই ধান আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা পূরণ করে। ….”

image source: theconversation.com

প্রেমের প্রথমদিকে মানুষের আচরণও ঠিক এই রকমই হয়ে যায়। নিজে প্রেমে পড়লে বা ঘনিষ্ঠ কোনো প্রেমাক্রান্ত বন্ধুকে লক্ষ্য করলে দেখবেন, এই সময় আমরা/তারা নিজের ভালোবাসার মানুষটার কথা বলা বা ভাবা ছাড়া আর তেমন কিছু করতে পারে না। এই সময়টায় প্রতিদিনকার ছোটোখাট কাজকর্মে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়াটাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

ব্যাপারটা আমাদের আমজনতার কাছে যতটা রোমান্টিক, স্নায়ুবিজ্ঞানীদের কাছে ঠিক ততটাই মানসিক অসংলগ্নতার সমার্থক। এমনকি অনেক বিজ্ঞানীরা ভালোবাসাবাসির প্রথম প্রহরগুলোকে Obsessive Compulsive disorder নামক খটোমটো মানসিক ব্যাধির সাথে তুলনা করতেও পিছপা হন না।

এ তো গেলো কথার কথা, কিন্তু আসলেই কি বিজ্ঞানীদের কাছে এ ব্যাপারে প্রমাণ আছে? দুঃখের কথা হচ্ছে, আছে। বিজ্ঞানী ভন স্টিন-বার্গেন এবং তার দল ৪৩ জন সদ্য প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছেন এমন ছাত্র-ছাত্রীর (২৩ জন ছাত্রী, ২০ জন ছাত্র) উপর পরীক্ষা চালান। তারা কী গভীর প্রেমে নিমগ্ন তা বুঝতে প্রথমে বিজ্ঞানীরা সাহায্য নেন Passionate Love scale এর।

হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন, এরকম একটা স্কেল আছে বৈকী! এরপর আসল পরীক্ষায় যাবার আগে পরীক্ষণের পাত্রদের কিছু রোমান্টিক গান শোনানো হয় এবং তাদের সঙ্গীর সাথে কাটানো ভালো মুহূর্তগুলোর কথা ভাবতে বলা হয়। সকল ভাবাভাবি, গান শোনানো শেষে তাদের কিছু কাজ করতে দেওয়া হয় যেখানে তাদের নিজ নিজ চিন্তাশক্তি ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অসংখ্য অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য, সংখ্যা, চিহ্নের ভেতর থেকে সংগতিপূর্ণ সবকিছু বেছে নিতে হবে। এই পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, যারা Passionate Love scale এ উচ্চ নম্বর প্রাপ্ত তারা চিন্তাশক্তি ব্যবহার করে কাজ করতে তুলনামূলক অপারদর্শী।

এখন কি আপনি ভয় পেয়ে পুরো প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা শুরু করছেন? ভয় পাওয়ার কিছু নেই। “Nothing lasts forever….” আপনি সময়ের সাথে সাথে যত বেশি সম্পর্কের পরিপক্কতার দিকে এগুবেন, ততই আপনার বোধশক্তি ব্যবহার করে কাজ করার ক্ষমতা পুনরায় আগের মতো হয়ে পড়বে।
এই যে প্রথমের আকুলি-বিকুলি প্রেম, তারপর সময়ের সাথে সাথের স্বাভাবিকতা- এখানে কিউপিডের ভূমিকা কোথায় বলুন তো? উত্তর হচ্ছে, মানব প্রেমের ক্ষেত্রে এই ভালোবাসার তীর হাতে কিউপিড দেবতার কোনো ভূমিকাই নেই।

আপনার এই সমস্ত অভিজ্ঞতার নিয়ন্ত্রক আপনার মস্তিষ্ক, যা এই কাজটা করে হরমোন নামক কিছু রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে। হরমোন সম্পর্কে সবাই মোটামুটি কম বেশি জানি, তাও কিছুটা বলে রাখি। হরমোন হচ্ছে আমাদের শরীরের বিভিন্ন রস বা কেমিক্যাল যা শরীরের বিভিন্ন পরিবর্তনকালে পরিমাণগতভাবে পরিবর্তিত হয়। অথবা বলা যায় এদের পরিমাণগত পরিবর্তনের কারণে শরীরের বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে।

প্রেমের প্রথম দিকে কর্টিসল নামক হরমোনের প্রভাব খুব বেশি থাকে। এই হরমোন নতুন বা অপরিচিত কিছু গ্রহণ করার প্রাথমিক যে ভীতি তা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। এই সময় সেরোটোনিন নামক এক নিউরোট্রান্সমিটারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ভালোবাসার প্রথম প্রহরের আচ্ছন্নতার পিছনে সেরোটোনিনের পরিমাণ কমে যাওয়া বড়ো কালপ্রিট হিসেবে কাজ করে। এমনকি মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের পরীক্ষাও এই ঘটনার পক্ষে সাক্ষী দেয়। ফ্রন্টাল কর্টেক্স নামক মস্তিষ্কের অঞ্চল এই সময় হ্রাসকৃত কার্যক্ষমতা দেখায়, যা আপনাকে আপনার সঙ্গীর আচরণ ও চরিত্র সঠিকভাবে যাচাই করার ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে; পড়িয়ে রাখে আপনাকে একটি রঙিন চশমা।

দ্বিতীয় ধাপঃ আবেগপূর্ণ ভালোবাসা

এই ধাপটা ভালোবাসার কিছুটা অস্থির পর্যায়ের পর কিছুটা স্থিরতা এনে দেয়। এই সময় সম্পর্কের মাঝে নিরাপত্তা, দৃঢ়তা আর ভারসাম্য আসে। আবেগ থাকে; সাথে সাথে ঘনিষ্টতা। এই সময়ে অঙ্গীকার বাড়ে। একদিকে কর্টিসল, সেরোটোনিনের পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে আসে, অন্যদিকে অক্সিটোসিন আর ভেসোপ্রেসিনের পরিমাণ বাড়তে থাকে।

এই অক্সিটোসিন আর ভেসোপ্রেসিন করে টা কী? পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে নিঃসরণের পর এই হরমোনগুলো মস্তিষ্কের বিভিন্ন রিসেপ্টরের বা গ্রাহক প্রোটিনের সাথে বন্ধন তৈরি করতে চায়। ভেসোপ্রেসিন আর অক্সিটোসিনের রিসেপ্টর বা গ্রাহক প্রোটিনগুলো থাকে মস্তিষ্কের এমন এক অঞ্চলে যা ভালো লাগার অনুভূতি তৈরির জন্য কাজ করে। যখন এই হরমোন আর রিসেপ্টরের মিলন ঘটে, ডোপামিন নামে আরেকটি নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণ হয় এবং প্রেমিক যুগল আনন্দ, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরে উঠে।

অক্সিটোসিন আর ভেসোপ্রেসিন যে একদম একই কাজ করে তা কিন্তু না। নারীদের অক্সিটোসিন তুলনামূলক বেশি থাকে এবং তা সঙ্গীর সাথে নিবিড় বন্ধনে জড়াতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, পুরুষদের বেশি থাকে ভেসোপ্রেসিন, যা কিনা যেকোনো ভীতিকর ও চাপদায়ক পরিস্থিতি মোকাবেলায় সাহায্য করে।
একটু চিন্তা করলে বুঝতে পারবেন, এই হরমোনগুলো আদিকাল থেকে চলে আসা মাতা-পিতা-সন্তানের ভালোবাসার পেছনেও ভূমিকা রাখতো। যেখানে মা বাচ্চার যত্ন নিতেন এবং বাবা বাচ্চার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করতেন।

তৃতীয় ধাপঃ “আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে” ধাপ

সব সম্পর্ক অবশ্য বিষাদে শেষ হয় না। তবে আজ আমরা এই দিকটা নিয়েই একটু আলোচনা করি। আপনাদের কখনো এমন হয়েছে- দীর্ঘ দিনের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ায় বুকে ব্যথা? (গায়ক আসিফের গানের বুকের ব্যথা না, আক্ষরিক অর্থেই বুকের ব্যথা) এমনটি হয়ে থাকলে জেনে রাখুন, এ আপনাদের মনের ভুল নয়। বিজ্ঞানীরা আমাদের জানাচ্ছেন, শারীরিক ব্যথার সময় মস্তিষ্কের যে নেটওয়ার্কগুলো কাজ করে মানসিক ব্যথার সময়ও ঠিক একই নেটওয়ার্ক উদ্দীপ্ত হয়, তাই তখন এরকম বুকে ব্যথা হতে পারে, যা মোটে ও “বাজিলো বুকে সুখের মতন ব্যথা” নয়। যেকোনো বিষয়ে বিলম্বে সাড়া দেওয়ার মতো মানসিক পরিবর্তনও ঘটে এ সময়। কর্টিসল, এ্যাড্রেনালিনের মতো কিছু স্ট্রেস হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। ক্লিনিকাল ডিপ্রেশনের ঝুকিতে ভুগতে থাকেন বেশিরভাগ বিষাদগ্রস্ত যুবক-যুবতী।

অনেক হলো ভালোবাসার বৈজ্ঞানিক ব্যাখার গল্প। এখন ভালোবাসার ত্রিভুজতত্ত্বের প্রবক্তা স্টার্নবার্গের একটি মতামত দিয়ে শেষ করি। চিরস্থায়ী সুখের ভালোবাসার সম্পর্ক নির্ভর করে আবেগ, ঘনিষ্টতা এবং অঙ্গীকার- এই তিনটিকে কাজে রূপান্তর করার মধ্যে। শুভকামনা সবার জন্য।

ক্যান্সারের কারণ ও এর প্রতিরোধ

যিশু খ্রিষ্টের জন্মের ৪০০ বছর আগে হিপোক্রিটাস বলেছিলেন,আমাদের দেহ চার ধরনের তরলে গঠিত। এ চার ধরনের তরলের মধ্যে সবসময় ভারসাম্য বজায় থাকে,যা নষ্ট হলেই নানাবিধ অসুখ হয়। এর মাঝে ব্ল্যাক বাইল নামক তরলের পরিমাণ বেড়ে গেলে যেটা হয় তাকে কার্সিনোস এবং কার্সিনোমা বলে বলে ডাকতেন তিনি। যার উৎপত্তি গ্রীক ‘Karkinos’ থেকে। এর অর্থ হচ্ছে কাঁকড়া। আক্রান্ত টিস্যু থেকে চারপাশে রক্তনালীগুলোর ছড়িয়ে পড়া দেখতে অনেকটা কাঁকড়ার থাবার মতো বলেই এ নামকরণ। ধীরে ধীরে একসময় ক্যান্সার নামটি প্রচলিত হয়।

এখন ২০১৫ সালে এসে এতগুলো বছরের গবেষণা,এতগুলো মলাটবদ্ধ প্রকাশনা, এতগুলো পরীক্ষা-নীরিক্ষা, বস্তা বস্তা টাকা ঢালার পরও কেন ক্যান্সারের কোনো প্রতিষ্ঠিত নিরাময় নেই? কারণ ক্যান্সারকে কোনো সূত্রে বাধা সম্ভব নয়। সকাল বিকাল আমরা এক নামে একে ডাকলেও প্রতিটি ক্যান্সার আলাদা,প্রতিটি ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর গল্প আলাদা।

ক্যান্সার এতটাই রহস্যময় যে,প্রায়ই দেখা যায়, যে চিকিৎসায় একজন রোগী সুস্থ হয়ে গেছেন,সেই একই ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত আরেকজনের ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থা আর কাজ করে না। দেহের যেকোনো টিস্যুকে আক্রান্ত করতে সক্ষম এ ক্যান্সারের কারণ হিসেবে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে শুরু করে সূর্য রশ্মি পর্যন্ত হাজার হাজার এজেন্ট ছড়িয়ে আছে।

আগেই বলেছি,ক্যান্সারকে যেহেতু আমরা এক নামে চিনি সেই কারণে একে একক কিছু ভাবলে ভুল হবে। ক্যান্সার আসলে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি যাদের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্যে মিল রয়েছে। এ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন যা শুরু হয় কিছু জিনের মাঝে আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে।

আমাদের দেহের গঠন ও অন্যান্য কারিগরিতে জড়িত থাকে নানা ধরনের প্রোটিন। প্রতিনিয়ত এসব প্রোটিন তৈরি হচ্ছে,আবার কাজ শেষে নষ্টও হয়ে যাচ্ছে। কোন প্রোটিন কেমন হবে সেই তথ্য থাকে আমাদের জিনগুলোতে। তাই জিনের পরিবর্তন প্রোটিনকেও প্রভাবিত করে। এ পরিবর্তনের ফলে যে বাটারফ্লাই ইফেক্ট শুরু হয়ে যায়,শেষ পর্যন্ত তার ফলাফল মোটামুটি একই। লাগামছাড়াভাবে কিছু কোষ বিভাজিত হচ্ছে, দেহের বিভিন্ন প্রান্তে দুষ্ট কোষগুলো ছড়িয়ে যাচ্ছে,অন্যান্য টিস্যুকে আক্রমণ করছে এবং পুরো ব্যাপারটিই খুব ভয়ংকর।

জিনের এ পরিবর্তনকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে মিউটেশন। দুই ধরনের জিনে মিউটেশনের কারণে ক্যান্সার হয়। একটিকে বলে অনকোজিন,আরেকটিকে বলে টিউমার সাপ্রেসর জিন। তবে আসলে মিউটেশন হবার পরে একে অনকোজিন বলে,এর আগে এর নাম প্রোটো-অনকোজিন। প্রোটো-অনকোজিন থাকা অবস্থায় এরা স্বাভাবিক জিনের মতোই আচরণ করে। যাদের কাজ হচ্ছে এমন প্রোটিন তৈরি করা যা কোষের বিকাশ ও বিভাজনে সাহায্য করে। কিন্তু একটি মিউটেশন এদেরকে এতটাই পাগল করে দেয় যে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো যায় না। কোষের মাঝে এরা ক্রমাগত চেচামেচি করতে থাকে, “বড় হ,বিভাজিত হ! বড় হ,বিভাজিত হ!”

মিউটেশনের ফলে এ জিন যে প্রোটিন তৈরি করার কথা তার আকৃতি যায় বদলে। সে এমন একটি অবস্থায় আটকে যায় যে ক্রমাগত কোষে বড় হবার সংকেত দিতে থাকে। এ নতুন আকৃতির কারণে অন্যান্য যেসব প্রোটিনের কথা ছিল কাজ শেষ হলে এদের আটকানোর তারাও চিনতে পারে না। তাই কোষগুলো ক্রমগত বড় হয়ে বিভাজিত হতে হতে একটি টিউমারে পরিণত হয়।

‘টিউমার সাপ্রেসর’ নাম থেকেই বোঝা যায় এর কাজ হলো বিপথে যাওয়া কোষগুলোকে রুখে দেয়া। সকল জিনের মতো আমাদের প্রতিটি কোষেও দুই কপি করে টিউমার সাপ্রেসর জিন থাকে। যদি এক কপিতে কোনো কারণে মিউটেশন হয়ে কাজ করা বন্ধ করে দেয় তখনো অন্য কপি ঠিকই কাজ করতে থাকে। দেখা গেছে যে,একই লোকাসে অবস্থিত দুটি টিউমার সাপ্রেসরের যেটিতে মিউটেশন হয় সেটি প্রচ্ছন্ন হয়ে পড়ে,কিন্তু একই লোকাসে অবস্থিত অনকোজিনে মিউটেশন হলে সেটি হয়ে যায় প্রকট এবং অন্য কপিকে আর সুস্থভাবে কাজ করতে দেয় না। যাই হোক,ক্যান্সারের প্রবৃত্তিই হলো সব রকম প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থার ফাঁক গলে বের হয়ে যাওয়া। কখনো এমনও হতে পারে যে দুটো কপিতেই মিউটেশন হলো কিংবা একটি কপিতে মিউটেশন হলেও অন্য সুস্থ কপি কোনো কারণে হারিয়ে গেল। তখন আর টিউমারকে আটকানোর মত কেউ থাকে না।

এখানেই শেষ নয়। একটা দুটো মিউটেশন হলেই তা ক্যান্সার হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোষের নিজস্ব মেরামত ব্যাবস্থা ডিএনএ’র ছোটোখাটো মিউটেশনগুলোকে ঠিক করে নিতে পারে কিংবা খারাপ অবস্থায় চলে গেলে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা আক্রান্ত কোষটিকে ধ্বংস করে ফেলে। একটি সুস্থ কোষকে ক্যান্সারে পরিণত হবার জন্য কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ টি মিউটেশনের শিকার হতে হয়।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ‘মিউটেশন অর্ডার’অর্থাৎ কোনো জিনের মিউটেশন আগে,কোনো জিনের মিউটেশন পরে হলে সেটিও ক্যান্সারের তীব্রতাকে প্রভাবিত করে। আমাদের দেহের স্বাভাবিক কোষগুলো প্রতিবার বিভাজিত হবার সময় এর ক্রোমোজোমের এক প্রান্ত ছোট হতে থাকে। একসময় কোষটি মরে যায় এবং নতুন সুস্থ কোষ দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়। কিন্তু ক্যান্সার কোষ এ ব্যাবস্থাকে ঠকিয়ে নিজের ক্রোমোজোমকে খুব যত্ন করে আগলে রাখে। ফলে ক্যান্সার কোষগুলো বলা চলে অমর হয়ে যায়।

যেহেতু প্রতিটি টিউমার ভিন্ন পথ অবলম্বন করে বিকশিত হয়, এটা চিকিৎসক এবং গবেষকদের জন্য কঠিন যে কোন পথকে আসলে টার্গেট করতে হবে। তাহলে কোন কোন উচ্ছন্নে যাওয়া জিনের কারণে টিউমার হয়েছে সেটাকে না জেনে কীভাবে তারা এর বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেবেন? একটি উপায় হতে পারে ছুরি নিয়ে টিউমারটি ঘ্যাঁচ করে কেটে ফেলা। কিন্তু সেটা তো সব সময় সম্ভব হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে কেটে ফেলার পরেও টিউমার ফিরে আসে।

অনেক দিন ধরে ক্যান্সার চিকিৎসার সবচেয়ে ভালো সমাধান ছিল দেহে কিছু একটা প্রয়োগ করা যা সমস্ত দ্রুত বিভাজনশীল কোষকে আক্রমন করবে। যেমন কেমোথেরাপী কিংবা রেডিওথেরাপী। রেডিওথেরাপীতে এমন ধরনের তেজস্ক্রিয়তা প্রয়োগ করা হয় যা কোষের ডিএনএ ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কিন্তু সমস্যা হলো এ তেজস্ক্রিয়তা আশেপাশে সুস্থ কোষেরও ক্ষতি করে। তাই চিকিৎসকরা প্রয়োগ করার সময় খুব চেষ্টা করেন যাতে যথাসম্ভব কম ক্ষতি হয়।

কেমোথেরাপী রয়েছে একাধিক ধরনের। তবে এরা যেহেতু রক্তের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়,এদের কারণে সারা দেহ প্রভাবিত হতে পারে। কিছু কিছু কেমো ডিএনএ’র গাঠনিক এককের ছদ্মবেশে থাকে। ক্যান্সার কোষ বিভাজিত হবার সময় তা নতুন ডিএনএ সূত্রক তৈরি করে এবং এদেরকে নতুন ডিএনএ-তে যুক্ত করে ফেলে। কিন্তু সেই ডিএনএ আর সঠিক কার্যক্ষম থাকে না। অনেকটা বিষটোপ দিয়ে শত্রুনাশের মতো ব্যাপার। কিছু কিছু কেমো আবার কোষের অন্তঃকংকালকে নষ্ট করে দেয়। এর ফলে কোষটি আর বিভাজিত হতে পারে না।

কেমোথেরাপী ক্যান্সারের বৃদ্ধি দমাতে পারলেও আমাদের দেহে প্রচুর সুস্থ কোষও আছে যাদের বিভাজিত হওয়া প্রয়োজন। যেমন চুলের ফলিকল বিভাজিত না হলে চুলের বৃদ্ধি হবে না। আবার হজমের সময় নিঃসৃত এসিডের কারণে অন্ত্রের আস্তরনের যে ক্ষয় হয় সেটিও পূরণ করা দরকার।

এ কারণেই কেমোথেরাপীর ফলে চুল পড়ে যায়,হজমে সমস্যা দেখা যায়। এরকম হাজারো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে সাথে নিয়ে কেমোথেরাপী কাজ করে। ক্যান্সার রোগীর শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি প্রচন্ড মানসিক চাপেরও সৃষ্টি করে। তাই ন্যাড়া মাথার কাউকে দেখে মজা করার আগে সবসময় খেয়াল করবেন তার চোখে ভ্রু আছে কিনা।

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যে অস্ত্রটিকে বিজ্ঞানীরা কয়েক বছর ধরে উন্নত করার চেষ্টা করে আসছেন তা হলো জিনোম সিকোয়েন্সিং। এ প্রক্রিয়াটি এখন এতটাই দ্রুত আর সস্তা যা দশ বছর আগেও শুধু স্বপ্নেই সম্ভব ছিল। এখন এটি সরাসরি রোগীদের সাহায্য করতে প্রস্তুত।

বর্তমানে কয়েক দিনের ব্যাবধানে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার কোষের জিনোম সিকোয়েন্স করে তার কোথায় এবং কীভাবে মিউটেশন ঘটেছে তা বের করা সম্ভব। এ তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াই পার্সোনালাইজড মেডিসিন দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তির, নির্দিষ্ট ক্যান্সারের জন্য চিকিৎসা সম্ভব।

যে দুটো বড় প্রজেক্ট এ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছে তারা হলো- ১. ক্যান্সার জিনোম প্রজেক্ট ও ২. ক্যান্সার সেল লাইন এনসাইক্লোপিডিয়া।

তারা নানা ধরনের ক্যান্সার কোষের বিপরীতে বিভিন্ন ধরনের ওষুধের প্রভাব পরীক্ষা করেছে। গবেষকরা দেখেছেন, কিছু কিছু ওষুধ বিশেষ বিশেষ ক্যান্সার কোষের বিপরীতে ভালো কাজ করে। তারা মিউটেশনের ধরনের উপর ভিত্তি করে কোনো ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে অনুমান করতে পারেন। তাই ক্যান্সারের জন্য ওষুধ নির্বাচন এখন আর অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মত নয়। অন্তত তত্ত্ব সেটাই বলে।

ক্যান্সার প্রতিরোধে আরেকটি কার্যকর অস্ত্র হতে পারে ন্যানোটেকনোলজি। ১ থেকে ১০০ ন্যানোমিটার স্কেলে যে টেকনোলজি কাজ করে সেটাই অল্প কথায় ন্যানোটেকনোলজি। বেশির ভাগ সূক্ষ্ম জৈবিক প্রক্রিয়া এবং যেসব প্রক্রিয়া ক্যান্সারের কারণ হতে পারে সেগুলোও ন্যানোস্কেলে সংঘটিত হয়। তাই ন্যানোটেকনোলজির মাধ্যমে ক্যান্সার শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে নিরাময় পর্যন্ত সকল পর্যায়েই বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের সুবিধা পাওয়ার কথা।

ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য বায়োপসি করার আগে সাধারণত ইমেজিং কিংবা স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া হয়। ন্যানোটেকনোলজি দুটো পদ্ধতিকেই আরো দক্ষ করে তুলতে পারে। যেমন ইমেজিং এর কথা যদি বলি,এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে তখনই ক্যান্সার নির্ণয় করা যায় তখন বিপুল সংখ্যক কোষের ক্যান্সারে রূপান্তরের কারণে টিস্যুতে দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনো পরিবর্তন আসে। তবে ততক্ষণে হয়তো হাজার হাজার ক্যান্সার কোষ এদিক ওদিকে ছড়িয়ে গেছে। আবার দেখা গেলেও সেটা কতোটা মারাত্মক সেটা বোঝার জন্য বায়োপসি ছাড়া উপায় নেই।

ইমেজিংকে কার্যকর করার জন্য দুটি জিনিস দরকার। এমন কিছু যেটা একদম খাপে খাপ ক্যান্সার কোষকে চিনে নিতে পারবে এবং স্ক্যানিং ডিভাইসকে চেনাতে সাহায্য করবে। দুটোই ন্যানোটেকনোলজির দ্বারা অর্জন করা সম্ভব। যেমন, যেসব অ্যান্টিবডি ক্যান্সার কোষের রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হতে পারে তাদেরকে ন্যানো আকারের ধাতব অক্সাইডের গায়ে লেপে দিলে তারা MRI কিংবা CT Scan এ স্পষ্টতর সংকেত তৈরি করতে পারে।

ন্যানোটেকনোলজির ভিত্তিতে যেসব ওষুধ তৈরি করা হচ্ছে সেগুলো সাধারণের তুলনায় বিভিন্ন প্রেক্ষিতে ভালো কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এসবের অর্ধায়ু, স্থায়ীত্ব, আক্রান্ত কোষ চেনার ক্ষমতা অধিক এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা ন্যানোপার্টিকেল ব্যবহার করে মাল্টিড্রাগ ডেলিভারি সিস্টেম তৈরির চেষ্টা করছেন যেগুলো দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্যান্সারের বিপক্ষে শক্তিশালী ব্যবস্থা নিতে সক্ষম।

ক্যান্সার নিয়ে আসলেই অনেক কাজ হচ্ছে সারা বিশ্বে। গুগল ট্রেন্ডে গিয়ে যদি ক্যান্সার এবং এইডস এই দুটি রোগের নাম সার্চ আইটেম হিসেব লিখেন তাহলে এরকম একটি গ্রাফ পাবেনঃ

এটা কিন্ত এদের আপেক্ষিক গুরুত্ব নয় বরং ইন্টারনেটে এদের জনপ্রিয়তার একটা তুলনা। যদিও এইডস রোগটি কম ভয়ানক নয়,ইন্টারনেটে এর জনপ্রিয়তা যে কারণেই হ্রাস পাক,ক্যান্সার কিন্তু বিগত কয়েক বছরে স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। তো আমরা ধরে নিতেই পারি যে,সামাজিক নেটওয়ার্ক,ব্লগ ও নিউজপোর্টালগুলো ছাড়াও বৈজ্ঞানিক জার্নাল-গুলোতেও ক্রমাগত এ শব্দটি বারবার এসেছে। তবে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো যে ধরনের অগ্রগতি সাধন করেছে,আমরা তার কতোটা আমদানী করতে পেরেছি?

আমাদের ক্যান্সার আক্রান্তরা কেমন সেবা পাচ্ছে সেটাও ভাবার বিষয়। ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৪ কোটি মানুষের মধ্যে ক্যান্সার আক্রান্ত প্রায় ১৫ লক্ষ। এত বিশাল সংখ্যক আক্রান্ত জনগোষ্ঠী মানেই বিশাল একটা ব্যবসা। তাই রথী-মহারথীদের ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের জন্য নতুন নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবন ও প্রদানের মাধ্যমে সংবাদপত্রের হেডলাইন হতে ও টাকা কামাতে যতটা উৎসাহ, ততটা কি পুরোপুরি নিরাময় লক্ষ্যে কাজ করাতে আছে?

তথ্যসূত্রঃ

১. Mutation order reveals what cancer will do next by Andy Coghlan, New Scientist Magazine

২. nano.cancer.gov

৩. Fighting Cancer with Nanomedicine by Dean Ho, The Scientist Magazine.

৪. Syed Md Akram Hussain, Comprehensive update on cancer scenario of Bangladesh, South Asian Journal of Cancer.

৫. The Cancer Industry is Too Prosperous to Allow a Cure By John P. Thomas, The Health impact News.

featured image: trans4mind.com

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন চা পাওয়া গেলো চীনা রাজার কবরে

এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন চায়ের নমুনা খুঁজে পাওয়া গিয়েছে চীনে। হান রাজবংশের সম্রাট জিং ডি’র সাথে ১৪১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এগুলো সমাহিত করা হয়। এ আবিষ্কারের ফলে এটা নিশ্চিত হওয়া গেলো যে আজ থেকে প্রায় ২,১৫০ বছর আগেও চীনের রাজপরিবারে চা সমাদৃত পানীয় ছিল।

চাইনিজ একাডেমি অফ সায়েন্সেস এর একদল গবেষক পাতার পৃষ্ঠের ক্রিস্টাল পর্যবেক্ষণ করে এবং মাস স্পেকট্রোমেট্রির (Mass Spectrometry) সহায়তায় নিশ্চিত হয়েছেন যে এগুলো চায়ের পাতাই ছিলো।

জিং ডির সেই কবরে আরো ছিলো ভুট্টা, চাল, অস্ত্রশস্ত্র, ছোট ছোট পাথরের মূর্তি, সিরামিকের তৈরি পশুপাখি, এমনকি বেশ কয়েকটি আস্ত যুদ্ধের রথও ছিল।

featured image: ndtv.com

জেট ইঞ্জিনের গল্প

চাকার আবিষ্কার মানব সভ্যতার জন্য ছিল বিরাট এক বিপ্লব। এর উদ্ভাবন যোগাযোগকে করেছিল আরো সহজ, আরো গতিময়। চাকা আবিষ্কারের পর থেকেই মানুষ যোগাযোগকে আরো গতিশীল করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো। প্রথম প্রথম বিভিন্ন প্রাণীর পেশি শক্তি ব্যবহার করে যানবাহনগুলো চলাচল করতো। এরপর আসে ইঞ্জিনের ধারণা। যানবাহনে ইঞ্জিনে ব্যবহার মানব সভ্যতার গতিকেই পাল্টে দেয়।

আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির অন্যতম এক বিস্ময় হলো উড়োজাহাজ। যেখানে যেতে মাসের পর মাস সময় লেগে যেতো, উড়োজাহাজের কল্যানে তা আজ এক দিনেরও কম সময়ে যাওয়া সম্ভব। আর উড়োজাহাজের এই প্রচণ্ড গতির পেছনের কারণ এর ইঞ্জিন। শুরুর দিকে উড়োজাহাজে পিস্টন ইঞ্জিন ব্যবহৃত হলেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে পিস্টন ইঞ্জিনের পরিবর্তে উন্নতমানের ইঞ্জিনের দরকার হয়ে পড়ে। জেট ইঞ্জিনের আবিষ্কার মানুষের এ নতুন চাহিদাটি মেটালো। আজ আমরা এই জেট ইঞ্জিন নিয়েই আলোচনা করবো।

খুব সহজ ভাষায়, জেট ইঞ্জিন হলো এমন এক প্রকার ইঞ্জিন যা বায়ুমন্ডলের বাতাসকে এর ভেতরে টেনে নিয়ে প্রথমে ঘনীভূত করে এবং পরে জ্বালানী মিশ্রিত করে বিষ্ফোরণের মাধ্যমে প্রসারিত করে এর পেছন দিক দিয়ে নির্গত করে দেয়। জেট ইঞ্জিন বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। তবে প্রকারভেদ যেমনই হোক, সব জেট ইঞ্জিনই কাজ করে নিউটনের ৩য় সূত্রানুসারে। প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। এটিই হচ্ছে জেট ইঞ্জিনের মূলনীতি।

জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি

ইঞ্জিনের মূল কার্যপদ্ধতিতে যাওয়ার আগে নিউটনের ৩য় সূত্রটি আরো ভালো করে বোঝা প্রয়োজন। একটি বেলুনকে বাতাস দিয়ে ভর্তি করে এর মুখ বন্ধ করে রেখে দিলে বেলুনটি স্থির অবস্থাতেই থাকবে। কারণ ভেতরের বাতাসের চাপ বেলুনটির গায়ে সমানভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা যদি বেলুনটিকে মুখ খোলা অবস্থায় রেখে দেই, তাহলে দেখবো বেলুনটি কিছু বেগ নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে বেলুনের খোলা মুখটি দিয়ে প্রচন্ড বেগে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটি নিউটনের সূত্রের সেই ক্রিয়া। এর ফলে বেলুনটি সামনের দিকে সম-পরিমাণ বল অনুভব করে এবং এগিয়ে যায়। অবাক লাগে, অত্যাধিক জটিল যান্ত্রিক কৌশলের সমন্বয়ে তৈরি একটি জেট ইঞ্জিন এ সহজ নিয়মটি ব্যবহার করেই কাজ করে থাকে।

যাহোক, এবার জেট ইঞ্জিনের মূল কার্যপদ্ধতিতে যাওয়ার আগে এর প্রধান অংশগুলোর সাথে পরিচিত হয়ে নেয়া যাক। একটি জেট ইঞ্জিনের মূল অংশগুলো হচ্ছে- ১. ফ্যান ২. কম্প্রেশর ৩. কমবাস্টশন চেম্বার ৪. টারবাইন। তবে ইঞ্জিনের ধরন অনুযায়ী আরো বিভিন্ন অংশ যোগ করা হতে পারে।

মূল ইঞ্জিনের সামনের অংশে থাকে একটি ফ্যান। ফ্যানটির কাজ বাইরে থেকে বাতাস টেনে ইঞ্জিনের ভেতরে নিয়ে যাওয়া। বিশেষ ডিজাইন সম্পন্ন ফ্যানের সাহায্যে এ কাজটি করা হয়। ফ্যানের ঠিক পেছনেই থাকে কম্প্রেশর। এর কাজ বাইরে থেকে টেনে আনা বাতাসকে চাপ দিয়ে সংকুচিত করা। এ ধাপে বাইরে থেকে টেনে আনা বাতাসের চাপ প্রায় ৮ গুণ বাড়ানো হয় এবং বাতাসের গতি ৬০ ভাগ কমিয়ে ঘন্টায় ৪০০ কিলোমিটার করা হয়।

ইঞ্জিনের ওপরে এয়ারক্রাফটের ডানার নিচে জ্বালানী ট্যাংক থাকে। বাতাসের সংকুচিত অবস্থায়, ট্যাংক থেকে জ্বালানী এনে বাতাসের সাথে মেশানো হয়। এরপর একটি নিয়ন্ত্রিত বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়। এর ফলে প্রচন্ড উত্তপ্ত এগজস্ট গ্যাস (Exhaust Gas) উৎপন্ন হয়। এ সময় এগজস্ট গ্যাসের তাপমাত্রা প্রায় ৯০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড হয়।

প্রচন্ড উত্তাপের ফলে সংকুচিত গ্যাস হঠাৎ প্রসারিত হয়ে যায় এবং ইঞ্জিনের পেছন দিয়ে প্রচন্ড বেগে বাইরে নির্গত হয়। ইঞ্জিনের পেছনে রাখা থাকে বিশেষভাবে বাঁকানো একটি টার্বাইন। হঠাৎ প্রসারিত এগজস্ট গ্যাস এই টার্বাইনের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাইরে নির্গত হয় এবং বায়ু প্রবাহের ফলে টার্বাইনটি ঘুরতে থাকে, অনেকটা উইন্ডমিলের মতো।

ইঞ্জিনের পেছনের এ টার্বাইনটি আবার একটি শ্যাফটের মাধ্যমে কম্প্রেশর ও সামনের ফ্যানের সাথে যুক্ত থাকে। ফলে এগজস্ট গ্যাসের প্রভাবে যখন টার্বাইনটি ঘুরতে শুরু করে, তখন টার্বাইনের সাথে সাথে এর সাথে যুক্ত কম্প্রেশর এবং ফ্যানটিও ঘুরতে থাকে। অর্থাৎ প্রাথমিক অবস্থায় ইঞ্জিনটিকে একবার চালু করে দিলে জ্বালানী সরবরাহ বন্ধ না করা পর্যন্ত ইঞ্জিনটি নিজে নিজেই চলতে থাকবে। সংক্ষেপে এবং খুব সহজে, এভাবেই একটি জেট ইঞ্জিন কাজ করে!

চিত্রঃ জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি।

এবার আসি জেট ইঞ্জিনের প্রকারভেদে। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রকারের জেট ইঞ্জিন তৈরি করা হয়েছে। তবে সব জেট ইঞ্জিনই উপরে বর্ণিত পদ্ধতিতে কাজ করে থাকে। বিভিন্ন প্রকারের জেট ইঞ্জিনের নাম দেয়া হলো- ১. রেম জেট ২. পালস জেট ৩. রকেট জেট ৪. গ্যাস টারবাইন ইত্যাদি।

রেম জেটঃ রেম জেট একেবারেই প্রাথমিক স্তরের জেট ইঞ্জিনের ধারণা মাত্র। বাস্তব ক্ষেত্রে এর কোনো প্রয়োগ এখন আর নেই। শুধুমাত্র জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি সহজভাবে বোঝাতে রেম জেট ব্যবহৃত হয়। রেম জেট ইঞ্জিনকে প্রাথমিকভাবে সামনের দিকে গতিশীল করে এর ভেতরে বাতাস প্রবেশ করানো হয়। এরপর জ্বালানী মিশ্রিত করে নিয়ন্ত্রিত বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়। বিষ্ফোরণের ফলে উৎপন্ন এগজস্ট গ্যাস ইঞ্জিনের পেছনের নজল দিয়ে বের হয়ে আসে এবং নিউটনের ৩য় সূত্রের নিয়মে ইঞ্জিনটিকে সামনের দিকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে দেয়।

পালস জেটঃ পালস জেট অনেকটা রেম জেটের মতোই। তবে এ ইঞ্জিনকে প্রাথমিকভাবে সামনের দিকে গতিশীল করার দরকার হয় না। এর পরিবর্তে ইঞ্জিনটি এর কম্প্রেশর দ্বারা বায়ুমন্ডল থেকে বাতাস টেনে এর ভেতরে নিয়ে যায়। এ ধরনের ইঞ্জিন অনেক টেকসই। তবে পালস-জেট ইঞ্জিনের জ্বালানী খরচ খুব বেশি। মূলত ফাইটার এয়ারক্রাফটে এ ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়।

চিত্রঃ পালস জেট ইঞ্জিন।

রকেট জেটঃ সাধারণ জেট ইঞ্জিনগুলো বায়ুমন্ডলের বাতাসকে ব্যবহার করে জেট তৈরি করে। কিন্তু রকেট জেট বায়ুমন্ডলের বাতাসের পরিবর্তে এর ভেতরে থাকা জ্বালানী আর অক্সিজেনের মিশ্রণ ব্যবহার করে জেট তৈরি করে থাকে। রকেট জেটের থ্রাস্ট খুব শক্তিশালী। তবে এর স্থায়িত্ব স্বল্প সময়ের জন্য হয়। স্পেস শিপ এবং মিসাইলে রকেট জেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়।

চিত্রঃ রকেট জেট ইঞ্জিন।

গ্যাসে টারবাইন ইঞ্জিনঃ গ্যাসে টারবাইন ইঞ্জিন আধুনিক এয়ারক্রাফটগুলোতে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের ইঞ্জিন বায়ুমন্ডল থেকে বাতাস টেনে এর ভেতরে নিয়ে প্রথমে সংকুচিত করে। আমরা জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি এ ধরনের ইঞ্জিনের সাহায্যেই আলোচনা করেছি। গ্যাস টারবাইন ইঞ্জিনকে এর ডিজাইনের উপর উপর ভিত্তি করে আবার ৩ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১. টার্বোজেট ২. টার্বোপ্রপ ৩. টার্বোফ্যান।

টার্বোজেটঃ টার্বোজেট ইঞ্জিনের সামনে একটি কম্প্রেশার থাকে। এর সাহায্যে ইঞ্জিনের ভেতরে প্রতি মিনিটে কয়েক হাজার টন করে বাতাস নিয়ে যাওয়া হয়। টারবাইনের সাথে একটি শ্যাফটের মাধ্যমে ইঞ্জিনের কম্প্রেশারটিও যুক্ত থাকে। ফলে প্রথমে বাহ্যিক একটি শক্তির সাহায্যে কম্প্রেশারটি একবার চালিয়ে দিলে পরবর্তীতে এটি নিজে নিজেই চলতে থাকে এবং ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজনীয় বাতাস টেনে আনতে থাকে।

টার্বোপ্রপ ইঞ্জিনঃ টার্বোপ্রপ জেট ইঞ্জিন অনেকটা টার্বোজেট ইঞ্জিনের মতোই। তবে এ ধরনের ইঞ্জিনের উৎপন্ন এগজস্ট গ্যাসকে ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজনীয় থ্রাস্ট উৎপন্ন করার পরিবর্তে ইঞ্জিনের পেছনে থাকা টারবাইনটি ঘোরানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের ইঞ্জিনের টারবাইন থাকে অনেকগুলো, এগুলো তুলনামূলক ভাবে কিছুটা বড় হয়। ফলে উৎপন্ন জেটের প্রায় সবটুকু শক্তিই ব্যয় হয় এ টারবাইনগুলো ঘোরানোর কাজে।

সামনের দিকে থাকে একটি প্রপেলার। প্রপেলারে সাধারণত ৪-৬ টি করে ব্লেড থাকে। প্রপেলার বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে টারবাইন ও কম্পেশারের সাথে যুক্ত থাকে। টারবাইনের সাথে সাথে প্রপেলারটিও ঘুরে। এ প্রপেলারটিই এয়ারক্রাফটকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় থ্রাস্ট তৈরি করে। ছোট আকারের এয়ারক্রাফটে এ ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়।

টার্বোফ্যানঃ অনেকটা টার্বোজেট ইঞ্জিনের মতোই কাজ করে এমন আরেকটি জেট ইঞ্জিন হচ্ছে টার্বোফ্যান জেট ইঞ্জিন। তবে টার্বোজেটের সাথে টার্বোফ্যান জেট ইঞ্জিনের মূল পার্থক্য হলো, এর সামনে থাকা কম্প্রেশারের ব্লেডগুলো অনেক বড় আকৃতির। ফলে বায়ুমন্ডল থেকে টেনে আনা বাতাসের পুরোটা ইঞ্জিনের ভেতর দিয়ে না গিয়ে কিছু অংশ ইঞ্জিনের বাইরের আবরণের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ বাতাসকে বাইপাস এয়ার বলা হয়। এর মূল সুবিধা হলো, বাইপাস এয়ারের কারণে ইঞ্জিনটি ঠান্ডা থাকে। আবার বিশেষ ব্যবস্থায় এ বাইপাস এয়ারকে জ্বালানী সহকারে বিষ্ফোরিত করে অতিরিক্ত এগজস্ট গ্যাস উৎপন্ন করা হয়। ফলে এয়ারক্রাফটের জন্য অতিরিক্ত থ্রাস্টও পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্রঃ
১. The Jet Engine- Rolls Royce
২. উড়োজাহাজ কেমন করে উড়ে- এ. কে. এম. আতাউল হক
৩. www.nasa.gov

featured image: maya.design

আপনার ‘মল’ আপনাকে কী বলছে শুনেছেন কি?

চলুন, আজকে আপনার ‘ইয়ে’র সম্পর্কে কিছু জেনে নেয়া যাক। প্রতিদিন কম করে হলেও একবার ‘ইয়ে’র সাথে আপনার দেখা হয়। কিন্তু সমস্যা হলো বেশির ভাগ মানুষই তার ‘ইয়ে’কে ভালো মতো দেখে না। আর দেখবেই বা কেন? ‘ইয়ে’ তো আর অনন্য সুন্দর কিছু না যে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকতে হবে। ‘ইয়ে’ হলো স্টুল (Stool), শুদ্ধ বাংলা ভাষায় যাকে বলে ‘মল’।

দেখতে খারাপ হলেও এ স্টুলই আপনাকে জানিয়ে দিতে পারে আপনার শরীরের কলকব্জার কোনোটি বিদ্রোহ করল কিনা। শরীরের অবস্থা সম্পর্কে জানার শর্টকাট উপায়। কীভাবে বুঝবেন? খুব সোজা, স্টুলেও কালার দেখে বোঝা যায় ঠিক কোথায় সমস্যা হচ্ছে। তাই বলে একগাদা লাল শাক খেয়ে ভাববেন না, ‘ইয়া আল্লাহ, লাল স্টুল! আমি তো গেছি।’ এ লেখায় আপনি দুটো জিনিস শিখতে পারবেন- (১) স্টুলের বিভিন্ন রঙ দিয়ে আসলে কী বুঝায় এবং (২) স্টুল ত্যাগ করার সঠিক পজিশন কী।

রঙ বেরঙ এর দুনিয়া

হালকা বাদামিঃ দারুণ! আপনি সুস্থ আছেন। অধিকাংশ মানুষের ধারণা স্টুলের স্বাভাবিক রঙ বুঝি হলুদ। এটা একেবারেই ভুল ধারণা। স্টুলের স্বাভাবিক রঙ হালকা বাদামি। আর এ রংয়ের জন্য দায়ী বিলিরুবিন। স্বাভাবিক স্টুলে অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ হয় না।

সবুজঃ এটা একইসাথে দুটো জিনিস বোঝাচ্ছে। হয় আপনি খুব বেশি পরিমাণে সবুজ শাক সবজি খাচ্ছেন যার কারণে বাদামি স্টুল হয়ে গেছে সবুজ, অথবা যদি শাক সবজি খাওয়া ছাড়াই স্টুল সবুজ হয় তাহলে বুঝতে হবে শরীরে কোথাও গড়বড় আছে। আপনি যে খাবার খাচ্ছেন সেটা ঠিকমতো পরিপাক হচ্ছে না। যা খাচ্ছেন সেটি খুব দ্রুত স্টুলে পরিণত হচ্ছে।

image source: mamanatural.com

যেমন ধরুন, কোনো খাবার খেয়ে ঠিকমতো পরিপাক হয়ে স্টুল হতে সময় লাগে ২ মিনিট যার ভেতর ১ মিনিট সে থাকে বৃহদান্ত্রে। কোনো কারণে যদি অন্ত্র তাকে ১ মিনিট ধরে রাখতে অস্বীকার করে এবং পরের ধাপে পাঠিয়ে দেয় তাহলেই আপনার স্টুল হয়ে যাবে সবুজ। জিনিসটা খুব একটা ভালো না, কারণ আমাদের বেশির ভাগ পুষ্টি এ স্তরে শোষিত হয়।

হলুদঃ কখনো খেয়াল করেছেন কিনা, এ ধরনের হলুদ স্টুলে বাজে গন্ধ বেশি হয়! যারা মোটাসোটা, তাদের দেহে অধিক পরিমাণ চর্বি জমে আছে। সাধারণত তাদের স্টুল হলুদ হবার প্রবণতা থাকে। আর এ বিচ্ছিরি রকমের হলুদ স্টুল দিয়ে বোঝায়, আপনার শরীরে চর্বির শোষণে গোলমাল হয়েছে। জন্ডিস হলেও স্টুল ক্যাটকেটে হলুদ হয়ে যায়।

কালোঃ টানা কিছু দিন আঠালো কালো স্টুল হচ্ছে? এখনই ডাক্তারের কাছে দৌড় দিন। এ জিনিস খুব একটা ভালো না। কারণ কালো স্টুল ইঙ্গিত করে আলসার বা ক্যান্সারের কারণে আপনার পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তবে মাঝে মাঝে কিছু ড্রাগ,ভিটামিন সাপ্লিমেন্টও স্টুলের কালো রঙয়ের জন্য দায়ী।

সাদাঃ স্টুলের সাধারণ রঙের জন্য যে দায়ী উপাদান বিলিরুবিন ঠিকমতো খাবারের সাথে মিশতে পারছে না। সাদা রংয়ের স্টুল দিয়ে বোঝায়, বিলিরুবিন আসার জন্য যে নালীকা আছে সেটায় কোনো বাধার সৃষ্টি হয়েছে। তাই বেশ কিছুদিন সাদাটে ধূসর কিংবা সাদা স্টুল দেখলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যান।

লাল/উজ্জ্বল লালঃ কালো স্টুলের মতো আরেকটি বাজে ও বিপজ্জনক স্টুলের রঙ হলো লাল। এর মানে হলো আপনার পায়ুপথ বা পরিপাকতন্ত্রের কোথাও রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যদি কখনো দেখেন স্টুল লাল দেখাচ্ছে বা স্টুলের সাথে রক্ত যাচ্ছে, তাহলে এক মিনিটও দেরি না করে সাথে সাথেই ডাক্তারের কাছে চলে যাবেন।
ত্যাগ

রংয়ের ব্যাপার তো গেলো। এবার আসি স্বাস্থ্যসম্মতভাবে কীভাবে মল ত্যাগ করবেন সেই আলোচনায়। প্রশ্ন করতে পারেন ‘আরে, এটা আর এমন কী ব্যাপার?’ সত্যি কথা হচ্ছে, এটা আসলে অনেক কিছু। কমোড আমাদের দেশে দুই ধরনের হয়ে থাকে, নিচু কমোড ও হাই কমোড।

আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষ নিচু কমোডেই অভ্যস্ত। তাদের নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই, কারণ এভাবে বসার পজিশনই সবচেয়ে ভালো। কিছুটা পা ভাঁজ করে বসার ফলে যে কোণ তৈরি হয় সেটি মলনালী থেকে স্টুল বের হবার জন্য আদর্শ। কিন্তু যারা হাই কমোডে বসে মল ত্যাগ করতে পছন্দ করেন তারা এবার একটু চোখ ফেরান।

হাই কমোডে বসে মল ত্যাগ করা অনেকটা চেয়ারে বসে থাকার মতো। কেউ যখন চেয়ারে বসে থাকে তখন পায়ুপথের স্ফিংটারগুলো একটি বাকানো লুপ তৈরি করে যা পায়ু ছিদ্রকে ওপরের দিকে চাপ দেয়। সোজা ভাষায় স্টুলটিকে রেকটামের ভেতরে সুন্দর করে ধরে রাখে।

কেউ মল ত্যাগ করছে কিন্তু তার স্ফিংটার যতটুকু রিল্যাক্স হবার দরকার ছিল ঠিক ততটুকু হতে পারছে না। এ পজিশন ঠিক স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কারণ মল বের হবার জন্য যতটুকু জায়গা দরকার ততটুকু পাচ্ছে না।

যারা অসুস্থ, নিচু কমোডে বসতে সমস্যা তাদের বেলায় তাহলে কী হবে? একটা উপায় আছে। মল ত্যাগের সময় পায়ের নিচে উঁচু কিছু দিয়ে রাখতে পারেন। এতে বসার পজিশন ঠিক সেভাবেই থাকবে যেটা মল ত্যাগের জন্য সবচেয়ে ভালো।

সবার সুস্বাস্থ্য কামনা করে এখানেই শেষ করছি।

featured image: factinate.com

প্রজাপতির পাখা কেন রঙিন?

হঠাৎ করে যদি কেউ প্রশ্ন করে রঙ-বেরঙের কোনো প্রাণীর নাম বলতে, তাহলে নিঃসন্দেহে সবার মনেই প্রজাপতির ছবি ভেসে উঠবে। কারণ এতো বেশি রঙের সমাহার প্রজাপতি ছাড়া আর কোন প্রাণীরই বা আছে? এই গুনের কারণে এদের দেখলে মুহূর্তের মধ্যেই চোখ জুড়িয়ে যায়,মনে হয় একবার ছুঁতে পারলে দারুণ হতো।

মেলানিন বা এমন ধরনের কিছু ধরনের রঞ্জকের উপস্থিতির কারণে আমরা বিভিন্ন প্রাণীকে বিভিন্ন রঙে দেখে থাকি। কিন্তু শুনলে অবাক হতে হয় যে, প্রজাপতির শরীরে এমন ধরনের কোনো বর্ণকণিকা নেই। অর্থাৎ প্রজাপতির নিজস্ব কোনো রঙ নেই! ব্যাপারটি আসলেই অবাক করে দেবার মতো। তাহলে প্রজাপতির পাখাতে রঙে এতো ভিন্নতা আসলো কীভাবে?

সকল প্রজাপতি ‘লেপিডপ্টেরা’ বর্গের অন্তর্গত। লেপিডপ্টেরা হচ্ছে একটি ল্যাটিন শব্দ যা দুটি গ্রীক শব্দ ‘লেপিস’ ও ‘টেরন’ এর সমন্বয়ে গঠিত। ‘লেপিস’ অর্থ স্কেল বা আঁশ এবং ‘টেরন’ অর্থ উইং বা পাখা। অর্থাৎ শাব্দিকভাবে লেপিডপ্টেরা মানে হচ্ছে আঁশযুক্ত পাখা। এ বর্গের অধীনে আরো একধরনের পতঙ্গ আছে যেগুলো হচ্ছে মথ। মথেরা হচ্ছে প্রজাপতির জাত ভাই।

আমরা অনেক সময় খেলার ছলে কিংবা অন্য কোনো কাজে প্রজাপতি ধরেছি বা পাখাতে হাত লেগেছে। সবাই-ই হয়তো একটি ব্যাপার লক্ষ্য করেছেন,ঐ সময়ে হাতে এক ধরনের রঙিন কিছু লেগে গেছে। এগুলোই হচ্ছে প্রজাপতির শরীরের আঁশ। এদের আঁকার এতটাই ক্ষুদ্র যে, একটি ছোট প্রজাপতির পাখাতে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি আঁশ থাকে।

মূলত এদের উপস্থিতির কারণেই প্রজাপতিকে বিভিন্ন রঙে দেখে থাকি। প্রজাপতির রঙের উৎস হচ্ছে এসব আঁশ। প্রজাতিভেদে এসব আঁশের সজ্জাতে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। এ কারণে যখন পাখাতে আলো এসে পড়ে তখন তাতে প্রতিসরণ ও বিচ্ছুরণের মাত্রার অনেক বেশি হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে। ভিন্ন ভিন্ন এজন্যই আমরা একেক প্রজাতির প্রজাপতিকে একেক রঙে দেখে থাকি। আলোর এ ধর্মকে ইরিডিসেন্ট বলে।

প্রকৃতপক্ষে প্রজাপতির পাখা হচ্ছে স্বচ্ছ,বর্ণহীন পর্দা যাতে বিভিন্ন ধরনের আঁশ বিভিন্নভাবে সজ্জিত হয়ে আলোর ইরিডিসেন্ট ধর্মের মাধ্যমে নানা রঙের সৃষ্টি করে। গড়ে এ আঁশগুলো লম্বায় ১০০ মাইক্রোমিটার ও প্রস্থে ৫০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আলো যখন বিভিন্ন স্তরে সজ্জিত এসব আঁশের ওপরে এসে পড়ে তখন বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বিচ্ছুরণ করে। ফলে আমাদের চোখে বিভিন্ন রঙ এসে ধরা পড়ে।

অনেক সময় দেখা যায়,একই প্রজাতির প্রজাপতি মূককীট থেকে বের হবার পরে এক রঙ, আবার কিছুদিন যাবার পরে আরেকটু গাঢ় রঙের হয়ে থাকে। এটাও এসব আঁশের কারণেই হয়ে থাকে। বয়সের সাথে সাথে এদের পাখাতে আঁশের পরিমাণ কমতে থাকে। আবার সূর্যের আলোর তীব্রতার কারণে এদের বিচ্ছুরণ ক্ষমতার অনেক হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে।

মিলনের স্বকীয়তায় প্রজাপতি

শহুরে মানুষের কাছে একটুখানি সবুজ অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক। যার কারণে সময় পেলেই শহরের ইট-পাথরের দেয়াল ছেড়ে কোথাও বেড়িয়ে পড়ি। কোথাও ঘুরতে গেলে প্রকৃতির রঙবেরঙের পতঙ্গের মাঝে সবচে বেশি যে পতঙ্গটির দেখা মেলে তা হচ্ছে প্রজাপতি। নানা বর্ণে সজ্জিত হবার কারণে এরা যে কারো মনোযোগ মুহুর্তেই কেড়ে নিতে সক্ষম। কোথাও বাগান থাকলে তো এদের দেখা মেলেই তার উপর মাঝে মাঝে শহরের যানজটপূর্ণ পরিবেশেও এদের উড়ে চলতে দেখা যায়।

Pale Grass Blue (Pseudozizeeria maha)

প্রজাপতির জীবনচক্রে চারটি দশা থাকে- ডিম, শূককীট, মূককীট ও পরিণত প্রজাপতি। আমরা সাধারণত যেটা দেখি তা হচ্ছে পরিণত প্রজাপতি। সর্বসাকুল্যে এদের গড় আয়ু মাত্র দেড় মাস। না ভূল পড়েননি, ডিম থেকে শুরু করে পরিণত অবস্থাতে আসার পরে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এরা মাত্র দেড় মাস বাঁচে। এই স্বল্প জীবনের মাঝেই খাবার সংগ্রহ, মধু সংগ্রহ, প্রজনন, ডিম পাড়া এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ চলতে থাকে।
যাই হোক, মূল বিষয়ে আসা যাক। আজ এখানে প্রজাপতির প্রজনন নিয়ে আলোচনা করব।

প্রজনন হচ্ছে এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো প্রজাতি তার বংশের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। যেকোনো প্রাণী অপেক্ষা বিভিন্ন পতঙ্গ তথা প্রজাপতি এমন কিছু বৈশিষ্টের অবতারণা করে যা তাদেরকে অন্য এক ধরনের স্বকীয়তা দিয়েছে।

অন্যান্য প্রাণীদের মতো পুরুষ ও স্ত্রী প্রজাপতি মিলনে অংশ নিয়ে থাকে। একটা প্রজাপতির লার্ভার কাজ যেমন শুধু খাবার গ্রহণ করা ঠিক তেমনি পরিণত প্রজাপতির কাজ বলতে বিপরীত লিঙ্গের সদস্যের সাথে মিলনে অংশ নেয়া। মিলনের পূর্বে স্ত্রী প্রজাপতি এক ধরনের ফেরোমন নিঃসৃত করে যা সেক্স ফেরোমন নামে পরিচিত। জেনে রাখা ভালো যে, ফেরোমন হচ্ছে এমন এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা বিভিন্ন প্রাণী সংবাদ আদান-প্রদানে ব্যবহার করে থাকে।

Common Rose (Pachliopta aristolochiae)

স্ত্রী প্রজাপতি কর্তৃক নিঃসৃত এই ফেরোমনের গন্ধ পুরুষ প্রজাপতিগুলো মুহুর্তের মধ্যেই পেয়ে যায় এবং অনেক দূরে থাকলেও গন্ধ পেলে ঠিকই ঐ পুরুষ প্রজাপতি মিলনের জন্য স্ত্রী প্রজাপতির কাছে চলে আসবে। স্ত্রী প্রজাপতির কাছে আসার পরে পুরুষ প্রজাপতি নানান ধরনের অঙ্গভঙ্গি দেখিয়ে প্রলুব্ধ করতে চেষ্টা করবে, যদি স্ত্রী প্রজাপতি মনে করে যে, ঐ পুরুষটি তার জন্য যথার্থ তাহলেই সে মিলনে অংশ নিবে, অন্যথায় নয়।

Common Mormon

মিলনের আগে পুরুষ প্রজাপতিটিকে অনেকভাবে পরীক্ষা দিতে দেখা যায়। কোনো কোনো সময় স্ত্রী প্রজাপতিটি একস্থানে বসে থাকে এবং পুরুষ প্রজাপতিটি শূন্যে একস্থানে স্থির থেকে পাখা নাড়তে থাকে। স্ত্রী প্রজাপতিটি রাজী না হওয়া পর্যন্ত এরা এরকম করতে থাকে। এছাড়াও দেখা যায়, পুরুষ প্রজাপতিটি স্ত্রী প্রজাপতির চারপাশে উড়ছে কিংবা একই তালে উড়ে চলেছে।

মিলনের আগে স্ত্রী প্রজাপতিটির ফেরোমন নিঃসরণ থেকে শুরু করে মিলন পর্যন্ত সময়কালকে ‘কোর্টশিপ’ বলা হয়। অনেকেই হয়তো মনে করছেন, মিলনের পূর্বে এতো পরীক্ষা নেবার কী আছে? কিন্তু এটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা একটু পরেই বুঝতে পারবেন।

পরিণত অবস্থায় রূপান্তরের পর এরা মাত্র দু’সপ্তাহ বেঁচে থাকে যার কারণে এমনভাবে এদের সময় পার করতে হয় যাতে করে একটুও সময় নষ্ট না করে অধিক পরিমাণ বংশধর তৈরি করতে পারে। আর প্রজাতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য অবশ্যই যোগ্য শুক্রাণু দরকার, যোগ্য শুক্রাণু না হলে বাচ্চার সুস্থ থাকার ব্যাপারটা নিশ্চিত হয় না। যার কারণে এতো কিছু।

মিলনের পরে এরা একস্থানে অনেকটা সময় বসে থাকে। জেনিটালিয়া একসাথে লাগিয়ে রেখে এরা প্রজনন পদার্থ আদান-প্রদান করতে থাকে। পুরুষ প্রজাপতিগুলো তাদের ক্লাস্পারের সাহায্যে স্ত্রী প্রজাপতিকে আঁকড়ে ধরে রাখে। অনেক সময় ঘন্টার পর ঘন্টা মিলন-পর্ব চলতে থাকে। কিন্তু কোনো কারণে এরা বিরক্ত হলে কিংবা কোনো ক্ষতির আভাস পেলে স্থান পরিবর্তন করে। বিরক্তের মাত্রা খুব বেশি হলে জেনিটালিয়া আলাদা হয়ে যায় অর্থাৎ মিলন শেষ না হবার আগেই পুরুষ ও স্ত্রী প্রজাপতি আলাদা হয়ে যায়।

Common Grass Yellow (Eurema hecabe)

অনেক সময় কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যেমন, পুরুষ ও স্ত্রী প্রজাপতির মিলনের সময়ে এদের মাঝে আরেকটি পুরুষ প্রজাপতি এসে তার জেনিটালিয়া ঐ স্ত্রী প্রজাপতির জেনিটালিয়ার সাথে স্থাপন করতে যায় কিংবা ঐ মেটিংরত যুগলের চারপাশে ঘুরতে থাকে। ফেরোমন নিঃসরণের কারণেই এমনটা ঘটে।
আবার অনেকসময় জোরপূর্বক কোনো পুরুষ প্রজাপতি মূককীট থেকে সদ্য বের হওয়া প্রজাপতির সাথে মিলনে অংশ নেয়। এই ঘটনা ‘পিউপাল মেটিং’ নামে পরিচিত।

মিলন সমাপ্ত হলে স্ত্রী প্রজাপতি ডিম পাড়ার জন্য লার্ভার জন্য ফুড প্লান্ট খুঁজতে থাকে এবং তার লার্ভা যে গাছের পাতা খেয়ে বাঁচতে পারবে সে গাছেই সে ডিম পাড়ে। এভাবেই প্রজাপতির জীবনের চক্র চলতে থাকে।
বিঃ দ্রঃ এই লেখায় ব্যবহৃত ছবিগুলোর আলোকচিত্রী লেখক নিজে।‏

featured image: gardensdecor.com