মহাকাশে নারী মহাকাশচারীর ঋতুস্রাব জটিলতা

নাসার শুরুর দিকের কাহিনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নাসার প্রকৌশলীদের কাছে নারী মহাকাশচারীদের পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব ছিল বড় ধরনের এক চিন্তার বিষয়। স্যালী রাইড ছিলেন আমেরিকার প্রথম নারী মহাকাশচারী যিনি ১৯৮৩ সালে মহাশূন্যে ভ্রমণ করেন। সাধারণত মহাকাশ ভ্রমণ পরিকল্পনার জন্য অসংখ্য বিষয় মাথায় রাখতে হয়। অসংখ্য বিষয়ের মাঝে ছিল না নারী সংক্রান্ত বিষয়। যেমন টেমপন (তুলার পট্টি) বা স্যানিটারী ন্যাপকিনের বিষয়টি কেবল তখনই মাথায় আসে যখন দেখা যায় মহাকাশচারী একজন নারী। ঠিক করা হলো স্যালি রাইডের এ মিশনের জন্য স্যানিটারী প্যাডের একটা বিশাল সরবরাহ পাঠানো হবে (এক সপ্তাহের জন্য ১০০ টেমপন)। কারণ প্রকৌশলীরা জানতেন না মহাশূন্য নারীর ঋতুস্রাব কেমন আচরণ করবে।

Image result for sally ride
স্যালি রাইড

নাসার মেডিকেল কর্মকর্তারা অনেক সন্দিহান ছিলেন মধ্যাকর্ষণ বল পিরিয়ডের উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে। কী ঘটবে যখন মহাকাশে অবস্থানরত নারীর ঋতুস্রাব হবে? কী কী সম্ভাব্য অসুবিধা ও জটিলতা তৈরি করতে পারে সেখানে? এত ভাবনা ও প্রস্তুতির পর দেখা গেল, পৃথিবীতে ঋতুস্রাব আর মহাকাশে ঋতুস্রাবের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। যুগ যুগ ধরে এখন নারী মহাকাশচারীরা শূন্যে অবস্থান ও কাজ করে আসছেন কোনো ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা ছাড়াই।

তবে একটি সমস্যা কিন্তু রয়েই গিয়েছে। আজ পর্যন্ত যত মহাকাশ ভ্রমণ এবং এ সম্পর্কিত তথ্য রয়েছে সবই অল্প দূরত্বে ভ্রমণের ক্ষেত্রে। গবেষকরা এখন নতুন চিন্তায় পড়েছেন যখন দীর্ঘ যাত্রা হবে তখন কী হবে? ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ঋতুস্রাবের রক্ত নেয়ার মতো পরিকল্পনা করে বানানো নয়। কারণ এখানের টয়লেট সিস্টেম Water Reclamation System এর সাথে সংযোগ করা। যেখানে প্রস্রাবকে রিসাইকেল করে আবার খাবার উপযোগী পানিতে পরিবর্তন করা হয়।

Water Reclamation System in space

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাও এখানে খুব একটা উপযোগী নয়। কারণ এখানে নেই গোসলের সুব্যবস্থা, নেই পানির অফুরন্ত যোগান। সুতরাং পৃথিবীর মতো উপায়ে মহাকাশে চিন্তা করলে চলছে না। যার কারণে নারী মহাকাশচারীরা গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট বা বড়ি খাওয়ার দিকেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এর ফলে মহাকাশ ভ্রমণ এবং প্রশিক্ষণ উভয় সময়েই তাদের ঋতুস্রাব বন্ধ থাকে।সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ট্যাবলেটগুলোর মাঝে অন্যতম হলো প্রোজেস্টেরন ট্যাবলেট।

দ্বিতীয় ব্যবহারবহুল পদ্ধতিটি হচ্ছে IUCD (Intra Uterine Contraceptive Device)। যেটি একজন ডাক্তারের সাহায্যে জরায়ুতে স্থাপন করা হয় এবং ৩-৫ বছর সহজেই সমস্যাবিহীন ভাবে জরায়ুতে থাকতে পারে। তবে সেটি পিরিয়ড বন্ধ করবে কিনা তা নির্ভর করে কোন ধরনের IUCD ব্যবহার করা হচ্ছে তার উপর। ২ ধরনের IUCD রয়েছে। ১) হরমনবিহীন; ও ২) হরমোনযুক্ত। হরমোনযুক্ত IUCD ব্যবহার করলে তা পিরিয়ড বন্ধ রাখতে সক্ষম।

 

এরপর আছে ইনজেকশন পদ্ধতিতে। বিশেষ করে ডেপো শট। ‘ডেপো প্রভেরা’ নামক একটি ইনজেকশন রয়েছে যা প্রজেস্টেরনের সমকক্ষ। এটি প্রতি ১২ সপ্তাহে একবার করে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে দিতে হয় এবং ২-৩ বছর পর্যন্ত সমস্যাবিহীনভাবে ব্যবহার করা যায়। ফ্লোরিডার গাইনী বিশষজ্ঞ ‘ক্রিস্টিন জ্যাকসন’-এর মতে বিশেষ ক্ষেত্রগুলোতে পিরিয়ড বন্ধ রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো জন্মনিরোধক পিল অথবা IUCD। তিনি বলেন, “মেয়েদের পিরিয়ড বন্ধ রাখার এ দুটিই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। অসংখ্য মেয়েরা তাদের পিরিয়ডের সময় অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং এর এমন কোনো জরুরী কারণ নেই যে প্রতি মাসেই একজন মেয়ের পিরিয়ড হতে হবে”

তবে কোন পদ্ধতিটি অন্য পদ্ধতির তুলনায় ভালো, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ প্রতিটি নারীই একজন আরেকজন থেকে আলাদা। যা একজনের উপর ভালোভাবে কাজ করে তা আরেকজনের উপর নাও করতে পারে। আবার ক্ষেত্র বিশেষে পদ্ধতির পরিবর্তন হয়। যেমনঃ ডেপো শট যারা ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা যায়। মহাকাশে অবস্থানরত ব্যাক্তিদের মধ্যে হাড় ক্ষয়ে যাওয়া এমনিতেই একটি চিন্তার বিষয়, তার উপর কেউ যদি ডেপো শট ব্যবহার করে তাহলে তা আরো বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। তাই মহাকাশচারীদের ক্ষেত্রে ডেপো শট ব্যবহার না করাই ভালো।

লন্ডনের কিংস কলেজের একটি গবেষণাপত্রে লেখক Varsha Jain বলেন, “সামরিক বাহিনীতে যেসব মহিলা কর্মরত থাকেন, তারাই তাদের মিশন বা প্রশিক্ষণের সময় পিরিয়ড বন্ধ রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আর মহাকাশচারীদের ব্যাপার, যেখানে জীবন খুব সুবিধার না সেখানে এটি বন্ধ করতে চাওয়া খুবই স্বাভাবিক”

আরেক দল গবেষক আরেকটি সমস্যা খুঁজে বের করলেন। তিন বছরের সরবরাহের জন্য এতগুলো জন্মনিরোধক ট্যাবলেট বহন করে শূন্যে নিয়ে যাওয়া কিন্তু সহজ বিষয় নয়। তিন বছরের জন্য কম করে হলেও এক হাজার ট্যাবলেট প্রয়োজন এবং সেগুলোর প্যাকেজিং করতে আরো কিছু অতিরিক্ত জিনিসপত্র লাগবে। তাছাড়া জন্মনিরোধক পিলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়। সুতরাং মহাকাশচারী নারীদের জন্য IUCD বা Implant সবচেয়ে ভাল ও কার্যকর উপায়। এগুলোর কোনো অতিরিক্ত ঝামেলা নেই। মহাকাশ মিশনের আগে আগে এগুলো করে ফেললে পৃথিবীতে ফিরে না আসা পর্যন্ত আর কোনো চিন্তাও নেই।

মহাকাশে হাড় ক্ষয়ে যাওয়া বা হরমোনের প্রভাব আরো ভাল করে বোঝার জন্য আরো গবেষণা দরকার। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, এ সম্পর্কে যত তাড়াতাড়ি জানা যায় ততোই ভাল। তাহলে হয়ত মানুষ নতুন একটি পৃথিবীতে বসবাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরো একধাপ এগিয়ে যেতে পারবে।

তথ্যসূত্র: সায়েন্স এলার্ট

 

সিলিকন থেকে ট্রানজিস্টর এবং মাইক্রোপ্রোসেসর

আমরা এখন আমাদের চারপাশে ইলেকট্রনিক্স জগতে সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহীর জয়জয়কার দেখে থাকি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত সেমিকন্ডাক্টর হল সিলিকন, যা বালির একটি উপাদান আর তা খুবই সহজলভ্য। সারা পৃথিবীতে কি পরিমাণ বালি আছে তা আর কাউকে না বললেও চলে। সিলিকন এত সহজলভ্য হওয়ার কারণেই প্রযুক্তির এই ক্ষেত্রটা খুব দ্রুত অগ্রসর হয়েছে এবং হচ্ছে।

অর্ধপরিবাহীর একটি ধর্ম হল, তাপমাত্রা বাড়লে এর অভ্যন্তরে ইলেকট্রনের প্রবাহ খুব সহজেই হতে পারে। তবে একটি বিশুদ্ধ সিলিকনের টুকরার আসলে তেমন বিশেষত্ব নেই। সিলিকনের মধ্যে নিয়ন্ত্রিতভাবে ভেজাল মিশিয়ে তৈরি হয় p-type আর n-type অর্ধপরিবাহী। এই দুই প্রকার অর্ধপরিবাহীর সহযোগেই তৈরি হয় ডায়োড আর ট্রানজিস্টর যা এখন কম্পিউটার প্রযুক্তির প্রাণ।

তো ট্রানজিস্টর কিভাবে ইলেকট্রনিক্স প্রযুক্তিকে এত এগিয়ে নিয়ে গেল?

এটা সম্ভব হয়েছে ট্রানজিস্টর দিয়ে সহজেই সুইচিং(switching) কার্যক্রম চালানো যায়। অর্থাৎ, একে সুবিধামত on বা off করা যায়। এতে করে অনেক লজিকাল অপারেশন দ্রুত করা যায়। ব্যাপারটাকে আরো সহজে বোঝা যাক।

কম্পিউটারে আমরা যে বিভিন্ন নির্দেশনা দেই তার জন্য আমরা বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করি। কম্পিউটার কিন্তু ওই প্রোগ্রামিং ভাষাগুলো সরাসরি বুঝতে পারে না। এই প্রোগ্রামিং ভাষায় দেয়া নির্দেশনাগুলো পরে বাইনারি তে রুপান্তরিত হয়। অর্থাৎ ০ আর ১ এ রুপান্তরিত হয়।। এক্ষেত্রে শূন্য বলতে ইলেকট্রনিক্সে off-state বা বন্ধ অবস্থা আর ১ বলতে বোঝায় on-state বা চালু অবস্থা। তাহলে বুঝতেই পারছেন, আপনার একটা নির্দেশনার বিপরীতে কম্পিউটারের একেবারে অভ্যন্তরে চলছে বন্ধ আর চালু হবার খেলা। আর এই বন্ধ-চালু(on-off) এর ব্যাপারটা যেন তেন করে উড়িয়ে দেয়ার ব্যাপার না। শুনলে অবাক হবেন, এখনকার সময়ে আমাদের বাসা-বাড়িতে ব্যবহার্য কম্পিউটারগুলো সেকেন্ডে লক্ষাধিক নির্দেশনা সম্পাদন করে। তার মানে প্রতি সেকেন্ডে কম্পিউটার সার্কিটের বিভিন্ন পয়েন্টে কি পরিমাণ বন্ধ-চালু হওয়ার ঘটনা ঘটছে ভেবে দেখেছেন?

একবার ভাবুন তো, আপনি আপনার বাসার পাখার সুইচ সেকেন্ডে লক্ষ বার অন-অফ করতে পারবেন কিনা! যান্ত্রিক উপায়েও এই পরিমাণ অন-অফ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু ইলেকট্রনিক্সের জগতে এটা খুব সম্ভব! ট্রানজিস্টর দিয়ে এটা করা সম্ভব।

সেমিকন্ডাকটার আর ন্যানোপ্রযুক্তি কতটা বিস্ময়কর হতে পারে তা কিছু সহজ উদাহরণে দেখা যাক। ইলেকট্রনিক্সে ট্রানজিস্টরের প্রতীক নিচে দেখানো হল।

ট্রানজিস্টরের প্রতীক

ইলেকট্রনিক্সে বিভিন্ন কাজ করার জন্য Integrated Circuit(IC) বা সমন্বিত বর্তনী (সংক্ষেপে আইসি) ব্যবহার করা হয়। মূলত বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স উপাদান(electronics component) দিয়ে সার্কিট বানিয়ে একটা প্যাকেজ তৈরি তৈরি করা হয়। এটাই আইসি। সাধারনত আইসিগুলোতে ট্রানজিস্টর আর রোধ থাকে। এখানে আইসি 555 এর সার্কিট ডায়াগ্রাম দেখানো হল।

IC 555 এর সার্কিট ডায়াগ্রাম

সার্কিটটা দেখতে কি একটু জটিল মনে হচ্ছে? এখানে ২৫ টার মত ট্রানজিস্টর আছে। সাথে দুটি ডায়োড আর ১৫ টি রোধ। কিন্তু পুরো প্যাকেজটার আকার খুবই ক্ষুদ্র। দৈর্ঘ্যের দিক থেকে মোটামুটি ১০ মিলিমিটারের মতো। এটুকুর মধ্যেই এতোগুলো ট্রানজিস্টর আর রোধ দিয়ে সার্কিট সাজানো হয়েছে। এই আইসি দিয়ে বেশ কিছু কাজ করা যায়। সহজ যে কাজটা করা যায় তা হল, একটা সময় ব্যবধানে বাতি জ্বলা-নিভা করা।

এবার চলুন কম্পিউটারের মাইক্রোপ্রোসেসরের দিকে তাকানো যাক। মাইক্রোপ্রসেসরও এক ধরনের আইসি। এই প্রোসেসরই হল কম্পিউটারের প্রাণ আর এটা গঠিত কোটি কোটি ট্রানজিস্টর নিয়ে।

Intel Core i7; image source: pcgamer.com

Intel Core i7 প্রসেসরের প্যাকেজের ক্ষেত্রফল মাত্র 42.5mm x 45mm। কিন্তু এতে আছে ৭৩১ মিলিয়ন ট্রানজিস্টর! একটা বাতি টানা এক মিলিয়নবার অন-অফ করতে আপনার হয়তো সময় লেগে যেতে পারে ২৫ বছর। কিন্তু এই প্রোসেসরের লাগবে মাত্র এক সেকেন্ড! চিন্তা করে দেখুন যে, কত জটিল কাজ চোখের নিমিষেই করিয়ে নেয়া সম্ভব এই ছোট্ট একটা প্রোসেসর দিয়ে যার মধ্যে কিনা কোটি কোটি ট্রানজিস্টর সুবিন্যস্ত আছে।

Intel 4004 প্রোসেসর; image source: extremetech.com

ইনটেল কর্পোরেশনের মাইক্রোপ্রোসেসরের যাত্রার প্রথম দিকে তারা যে প্রোসেসর বানিয়েছিল তা ছিল Intel 4004 যাতে ছিল মাত্র ২৩০০০ ট্রানজিস্টর। আর এটি ছিল ১৯৭১ এর দিকের ঘটনা। আর আজ কিনা বাসাবাড়িতে ব্যবহার করা কম্পিউটারের মাইক্রোপ্রোসেসরে ট্রানজিস্টরের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখের মতো! আর এ পর্যন্ত সব থেকে বেশি সংখ্যক ট্রানজিস্টরওয়ালা মাইক্রোপ্রোসেসরে আছে ৩ বিলিয়নের উপর ট্রানজিস্টর! ভাবুন তাহলে! একটুখানি জায়গার মধ্যে কত কত ট্রানজিস্টর সুসজ্জিত করার উপায় বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করে ফেলেছেন।

featured image: arstechnica.com

ইনফ্লুয়েঞ্জা বা, ফ্লু ভ্যাকসিন এবং মহামারী প্রতিরোধের গণিত

গুজব শুনতে তো মজাই লাগে তাই না? আর মানুষের মাঝে গুজব শুনে ভালো লাগার এই বিষয় আছে বলেই চটকদার অনলাইন পত্রিকাগুলোর আজকের এই রমরমা ব্যবসা। ধরুন আপনিও এরকম একটি চটকদার গুজব শুনলেন। আপনি চাচ্ছেন না এই গুজব ছড়িয়ে দিতে। আবার নিজের মনের মাঝে চেপেও রাখতে পারছেন না। আপনি তাই শুধুমমাত্র নিজের খুব পরিচিত এবং কাছের ১ জন মানুষকে এ বিষয়ে জানালেন এবং নিজের মুখ এরপর বন্ধ করে ফেললেন। খুব বড় কোন বিষয় মনে হচ্ছে না। তাই না? কিন্তু আপনি যাকে এই গুজবটি বললেন তিনিও যদি একই নীতি অবলম্বন করেন এবং কেবলমাত্র ১ জনকে এ বিষয়ে বলার জন্য মনোস্থির করেন তাহলে? তাহলেও কিন্তু গুজবটি খুব বেশি ছড়াবে না। যদি প্রতিদিন একজন নতুন মানুষ এই গুজব শুনতে থাকে তাহলে ১ মাস পর গুজবটি ৩১ জন মানুষ জানতে পারবে (আপনিসহ)।

গুজব যেভাবে ছড়ায়; image source: unseminary.com

কিন্তু এখন যদি গুজবটি একজনকে না বলে সবাই ২ জন করে মানুষকে বলার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে? এই ছোট্ট পরিবর্তনেই কিন্তু অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে যায়। যদি প্রতিদিন নতুন যারা গুজবটি শুনছে তারা পরের দিন ২ জন করে নতুন মানুষকে গুজবটি বলে বেড়ায় তাহলে ৩০ দিন পরে পৃথিবীর চার ভাগের এক ভাগের চেয়েও বেশি মানুষ গুজবটি সম্বন্ধে জেনে যাবে। ঠিক ঠিক হিসেব করলে সংখ্যাটি হবে ২^৩১ – ১= ২,১৪,৭৪,৮৩,৬৪৭ জন মানুষ গুজবটি সম্বন্ধে জেনে যাবে। কিভাবে একজন মানুষের বদলে দুইজন মানুষকে বলার মতো একটা ক্ষুদ্র পরিবর্তন এত বিশাল একটি প্রভাব রাখছে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে পরিবর্তনের হারের মাঝে।

১ম দৃশ্যে দেখা যায়, গুজবটি প্রতিদিন মাত্র ১ জন নতুন মানুষই জানছে আর এই নতুন জানা মানুষটি পরের দিন আরেকজন নতুন মানুষকে জানাচ্ছে। প্রতিদিন তাই ১ জন মাত্র মানুষই বিষয়টা জানছে। প্রতিদিন নতুন জানা মানুষের সংখ্যার পরিবর্তনের হার একটি ধ্রুবকই থাকছে।

কিন্তু গুজবটি যদি প্রতিদিন যে পরিমাণ মানুষ জানছে পরের দিন তার দ্বিগুন পরিমাণ নতুন মানুষ জানতে থাকে (যা আমাদের দ্বিতীয় দৃশ্যে দেখা যায়। ১ম দিন ১ জন বলে ২ জনকে, ২য় দিন এই ২জন মোট ৪ জনকে, ৩য় দিন এই ৪ জন মোট ৮ জনকে এবং এভাবেই চলছে) তাহলে গুজবটি এক্সপনেনশিয়ালি বা, সূচকীয়ভাবে বাড়তে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে প্রত্যেকজন যে পরের ২ জনকে বলবে তাদের আগে থেকেই এই গুজব শুনে থাকলে চলবে না এবং ধীরে ধীরে এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। আপাতত এসব নিয়ে আমরা চিন্তিত নই।

কিন্তু এই যে বিশাল একটা পার্থক্য হয়ে যাচ্ছে এর কারণ কি তাহলে? পুরোটাই সরলরৈখিক বৃদ্ধি এবং এক্সপনেনশিয়াল বৃদ্ধির পার্থক্যের কারণে। একই হারে এখানে যে পরিবর্তন ঘটছে তা আসলে সরলরৈখিক পরিবর্তন। কিন্তু এক্সপনেনশিয়াল বৃদ্ধি একই হারে না বেড়ে বরং একই ত্বরণে বাড়তে থাকে। আর এটাই এক মাস পরে ৩১ জন মানুষ না জেনে গুজবটি ২০০ কোটিরও অধিক মানুষের জানার মূল কারণ।

                                                                             image source: quantamagazine.org

এই একই মডেল কিন্তু কাজ করে আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা, বিভিন্ন রোগ জীবাণু ছড়ানোর ক্ষেত্রেও ।

‌ভাইরাসজনিত অসুখগুলো অনেকটাই এই গুজব ছড়ানোর মতো করে ছড়িয়ে থাকে। কেউ নিজে এই ভাইরাসের জীবাণুগুলো বহন করে এবং তা অন্য একজনের দেহেও ভাইরাস অনেকটা গুজব জানানোর মতো করে দিয়ে দেয়। দুটোর মাঝে অবশ্যই কিছুটা পার্থক্য আছে। তবে মূল কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যাবে দুটি ঘটনা প্রায় একইরকম। ভাইরাস যদি একজন থেকে প্রতিদিন মাত্র নতুন ১ জনের ক্ষতি করতে সক্ষম হয় বা, যদি প্রতিদিন নতুন ২ জনের ক্ষতি করতে সক্ষম হয় তাহলে তা ছড়ানোর পার্থক্যটাও সেই গুজব ছড়ানোর মতই হবে।

তবে রোগ জীবাণু ছড়ানোর এই বিষয়টি আবার আরো বেশ কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে। জৈবিক, পরিবেশগত এবং সামাজিক বিষয়গুলোও এর অন্তর্ভুক্ত। মহামারী বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এই অন্যান্য প্রভাবগুলোকে বিবেচনা করে ‘মৌলিক পুনরুৎপাদন সংখ্যা’ নামে একটি সংখ্যা দ্বারা একজন সংক্রামক রোগের রোগী গড়ে কতজনকে এই রোগে সরাসরি আক্রান্ত করতে পারে তা প্রকাশ করে থাকেন। এই সংখ্যাটিকে আমরা R দিয়ে প্রকাশ করতে পারি। আমাদের গুজব ছড়ানোর প্রথম ঘটনার ক্ষেত্রে R=১ ছিল। কারণ, একজন মানুষ শুধুমাত্র নতুন একজনকেই গুজবটি বলছিল। এবং ২য় ঘটনার ক্ষেত্রে R=২ ছিল, কারণ ১ জন মানুষ নতুন ২ জনকে সেই গুজব সম্বন্ধে বলছিল।

পরিচিত সংক্রামক রোগগুলোর মাঝে হামের ক্ষেত্রে এই R এর মান হলো ১২ থেকে ১৮, বসন্তের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৭ এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে ২ থেকে ৩। একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, মৌলিক পুনরুৎপাদন সংখ্যা সব রোগের ক্ষেত্রেই কিন্তু ১ থেকে অনেক বেশি। আর এ কারণেই এই রোগগুলো এত ভয়ঙ্কর। এ কারণেই এই রোগগুলো এক্সপনেনশিয়ালি ছড়িয়ে যেতে থাকে বা, যাওয়ার কথা। আর তাই পৃথিবীর উপর এই রোগগুলোর বেশ প্রভাব রয়েছে। তবে সংক্রামক অসুখের এই এক্সপনেনশিয়াল বৃদ্ধি কি কোনোভাবেই কমানো সম্ভব নয়? এটাকে কোনোভাবেই সরলরৈখিক বৃদ্ধিতে পরিণত করা যায় না? R এর মান কি কোনোভাবেই ১ এ নামিয়ে আনা যায় না?

আর এসব প্রশ্নের উত্তরেই ভ্যাকসিনের বিষয়টি সামনে চলে আসে। ভ্যাকসিন দেয়া হলে মানুষ এসব রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। যদিও এই সাফল্যের হার এদিক ওদিক একটু পরিবর্তন হয়, কিন্তু আমরা আমাদের সুবিধার জন্য ধরে নিচ্ছি যাকে ভ্যাকসিন দেয়া হবে সে সেই রোগ থেকে ১০০% মুক্ত থাকবে। এভাবে ভ্যাকসিন গ্রহণকারী সরাসরি নিজের লাভ করছে নিজেকে রোগ থেকে বাঁচিয়ে। তবে মজার বিষয় সে শুধু নিজের লাভই করছে না, পরোক্ষভাবে গোটা মনুষ্যজাতিরই এক বিশাল উপকার করছে। যদি কোনো এলাকার অনেক মানুষ কোনো রোগের ভ্যাকসিন গ্রহণ করে তবে সেই রোগটি তেমন আর ছড়াতেই পারে না।

এভাবেই ভ্যাকসিনের মাধ্যমে মৌলিক পুনরুৎপাদন সংখ্যার মান ১ এ নামিয়ে আনা যায়। আর এই কাজ করতে কতজন মানুষকে কোনো একটি রোগের ভ্যাকসিন প্রদান করতে হবে? চলুন সেই হিসেবটিই করা যাক।

এক্ষেত্রে আমরা ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগটি নিয়ে কাজ করব। ইনফ্লুয়েঞ্জার জন্য আমরা ধরে নিলাম R এর মান ২ এর সমান। ধরে নেই ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্ত কোনো একজন ১০ জন নতুন মানুষের সংস্পর্শে আসে।

                                                                               image source: quantamagazine.org

অর্থাৎ, ১ জন থেকে ১০ জনেরই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু, যেহেতু, R=২, আমরা ধরে নিতে পারি এদের মাঝে শুধুমাত্র ২ জন ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগে আক্রান্ত হবে।

                                                                          image source: quantamagazine.org

যার অর্থ প্রত্যেকজনের ২/১০ বা, ২০ শতাংশ করে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখন ধরা যাক, এই ১০ জনের মাঝে ২ জনকে ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের ভ্যাকসিন দেয়া আছে। কিন্তু বাকি ৮ জনের কিন্তু এখনো ২০% করে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই গেলো। তার মানে এখন এই ১০ জনের মাঝে ০.২ x ৮= ১.৬ জন এই রোগে আক্রান্ত হবে। 

সুতরাং, দেখা গেলো কাউকেই ভ্যাকসিন না দিলে ১০ জনের মাঝে ২ জন ইনফ্লুয়েঞ্জাতে আক্রান্ত হয়, কিন্তু ১০ জনের মাঝে ২ জনের ভ্যাকসিন দেয়া থাকলে ১০ জনের মাঝে ১.৬ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়। সুতরাং, ভ্যাকসিন দেয়ার ফলে R এর মান ২ থেকে কমে ১.৬ এ নেমে আসল। তাহলে কিভাবে আমরা এই R এর মান ১ এ নামিয়ে আনতে পারি?

ধরি, ১০ জনের মাঝে অজানা ‘ক’ সংখ্যক জনের এই রোগের ভ্যাকসিন আগে থেকেই দেয়া ছিল। সুতরাং, আগের হিসেবের মতই ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগে আক্রান্ত হবে o.২ x (১০-ক) জন। R=১ এর জন্য, o.২ x (১০-ক)=১ সমাধান করে আমরা পাই, ক=৫ জন। অর্থাৎ, ১০ জনের মাঝে ৫ জনের পূর্ব থেকেই ভ্যাকসিন দেয়া থাকলে ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগটি আর এক্সপনেনশিয়ালি না বেড়ে সরলরৈখিকভাবে বাড়বে।

এখন এই গাণিতিক হিসেবটিকে আরেকটু এগিয়ে নেয়া যাক। যদি আমরা ধরে নেই কোনো একটি সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি তার রোগ বহনের সময়কালে N জন নতুন মানুষের সংস্পর্শে আসে তাহলে প্রত্যেকের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা (R/N)। অর্থাৎ, R=২ এবং N=১০ হলে, R/N=০.২, যা ইনফ্লুয়েঞ্জার উপরের উদাহরণে আমরা দেখেছি। কিন্তু যদি এই N সংখ্যক মানুষের  মাঝে ‘ক’ সংখ্যক মানুষের ঐ রোগের ভ্যাকসিন দেয়া থাকে তাহলে সেই N সংখ্যক মানুষের মাঝে এই রোগে আক্রান্ত হবে R/N(N-ক) জন। আমরা চাই গুজবের মতো এক্ষেত্রেও ১ জন শুধুমাত্র নতুন ১ জনকেই রোগে আক্রান্ত করুক। সুতরাং, আমাদের সমীকরণটি দাঁড়াবে, R/N(N-ক)=১। এ সমীকরণ থেকে খুব সহজেই আমরা ক/N=১-(১/R) এই সমীকরণে আসতে পারি। এখানে, ক/N স্পষ্টতই N সংখ্যক মানুষ এবং তাদের মাঝে যতজন মানুষকে ভ্যাকসিন দেয়া হলে আমরা আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাব তার অনুপাত প্রকাশ করছে। আর আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য হলো রোগ ছড়ানোর প্রক্রিয়াকে এক্সপনেনশিয়াল থেকে সরল রৈখিকে পরিণত করা।

হামের ক্ষেত্রে মৌলিক পুনরুৎপাদন সংখ্যা, R=১২, অর্থাৎ, ক/N= ১-(১/R)= ১-(১/১২)= ০.৯১৭ =৯১.৭%। অর্থাৎ, রোগীর নিবিড় সংস্পর্শে যারা আসবে তাদের মাঝে প্রায় ৯২% মানুষের আগে থেকেই হামের ভ্যাকসিন দেয়া থাকলে এই রোগটি আর ভয়ঙ্করভাবে ছড়াতে পারবে না। অন্যদিকে ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে R=২, তাই (১-১/২)= ০.৫ =৫০%। অর্থাৎ, রোগীর নিবিড় সংস্পর্শে যারা আসবে তাদের মাঝে ৫০% এর ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের ভ্যাকসিন দেয়া থাকলেও রোগটি এক্সপনেনশিয়ালি না ছড়িয়ে সরলরৈখিকভাবে বাড়বে।

সুতরাং, ভ্যাকসিন নেয়া শুধু আপনার জন্যই উপকারী নয় এটি নেয়ার মাধ্যমে আপনি নিজের অজান্তেই প্রতিনিয়ত গোটা মানব সমাজের উপকার করেই চলেছেন। আমরা যারা ভ্যাকসিন নিয়েছি তারা শুধু নিজেদেরই উপকার করছি না, যারা এই ভ্যাকসিন নেয়নি তাদেরও এই রোগ থেকে নিরাপদ রাখছি। অনেকটা নিঃস্বার্থ সুপার হিরোর মতো। আর এভাবেই ভ্যাকসিনগুলো মহামারী প্রতিরোধ করছে। সুতরাং, সংক্রামক রোগগুলো না ছড়িয়ে বরং আপনার বন্ধুকে ভ্যাকসিন নেয়ার কথা বলুন। আর একজন বন্ধুকে না বলে অন্তত দুইজন বন্ধুকে বলুন। কি বলবেন তো? 

চাঁদের যত নাম

রাতের আকাশে তাকালে আমরা বেশীরভাগ সময় একটি বস্তু কে দেখতে পাই। আর তা হল হল চাঁদ। ব্ল্যাক মুন, ব্লু মুন, ব্লাড মুন, সুপারমুন- এরকম অনেক চাঁদের নাম আমরা শুনে থাকি বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু এই নামকরণের কারণ কি? এদের মধ্যে পার্থক্য কি? চলুন জেনে নেওয়া যাক। তার আগে আমাদের একটা ব্যাপার মনে রাখতে হবে যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চাঁদের এই নামকরণ এর ক্ষেত্রে বিশাল কোনো মহাকাশীয় তাৎপর্য নেই। বরং এই নামকরণ এর পিছনে অবদান রয়েছে চাঁদের অবস্থান এবং গেগ্রিয়ান  ক্যালেন্ডারের।

ব্ল্যাক মুন

ব্ল্যাক মুন একাধিক অর্থ বহন করে। সাধারণত মাসের ২য় নতুন চাঁদ কে ব্ল্যাক মুন বলা হয়। চাঁদ বেশ কিছু ধাপের মধ্যে দিয়ে একটি পূর্ণ চন্দ্র কলা সম্পন্ন করে এবং পূর্ণিমাতে চাঁদের পুরো গোলক দৃশ্যমান হয়। নতুন চাঁদের শুরুতে চাঁদের এই গোলকের কোনো অংশই দেখা যায় না, কারণ সূর্যের আলো চাঁদের দূরবর্তী অংশে পড়ে এবং ফলাফল হিসাবে চাঁদের অন্ধকার অংশ পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে। তিনি আরো বলেন, যদি কোন মাসে নতুন কোন চাঁদ দেখা না দেয় তাহলে সেটাকেও ব্ল্যাক মুন বলা যায়। কার্‌ চন্দ্র কলা ২৯.৫ দিনের, আর এই ক্ষেত্রে কোন সময় সম্ভবনা থাকে যে ফেব্রুয়ারি মাসে কোন নতুন চাঁদ বা পূর্নিমা দেখা যাবে না। অনেক বিজ্ঞানী আবার অমাবস্যাকেই ব্ল্যাক মুন বলে থাকেন।

ব্ল্যাক মুন; image source: blogs.discovermagazine

 

ব্লু মুন

ব্লু মুন এর নাম দেখে বিভ্রান্ত হয়ে মনে করবেন না যে চাঁদের রঙ নীল হয়ে যায়। বরং একমাসে যদি দুইবার পূর্ন চাঁদ বা পুর্নিমা হয় তবে দ্বিতীয় বার যেই পুর্নিমা হয় তাকেই বলা হয় ব্লু মুন। ব্লু মুন কিন্তু দেখতে একটু বড়ও লাগে।  সাধারণত বছরে ১২ টি পুর্নিমা হয়। তবে এমনও হয় যে কোন মাসে তিনটি পুর্নিমা হয়। এটি গড়ে প্রায় ২.৭ বছর পর পর হয়। গত ২১শে মে ২০১৬ এবং ৩১ শে জানুয়ারি ২০১৮ তে ব্লু মুন হয়েছিল। পরবর্তী ব্লু মন দেখা যাবে ২০১৮ সালে ৩১ শে মার্চে।

ব্লু মুন; image source: hellogiggles.com

 

ব্লাড মুন

ব্লাড মুন দেখা যায় পূর্ন চন্দ্রগ্রহণের সময়। চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মধ্যে চলে আসে। ফলে চাঁদে সূর্যের আলো যেতে পারে না। কিন্তু আলো একেবারে পৌঁছায় না এমনাটাও কিন্তু হয় না। কিছু আলো পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের ধার ঘেঁষে চাঁদে যেয়ে পড়ে। পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ঘেঁষে আলো যাওয়ার সময় পৃথিবী নীল বর্ণ জাতীয় রঙ বেশীরভাগ শোষণ করে নেয়। অবশিষ্ট থাকে কমলা, এবং লালচে আলো।  এই আলোই চাঁদে পৌছানোর পর চাঁদ লাল বর্ণ ধারণ করে। ফলে চাঁদ কিছুটা লাল দেখায়। রেড মুন নিয়ে আছে দেশে দেশে কুসংস্কার। অনেক মনে করেন রেড মুন হচ্ছে পৃথিবী ধ্বংসের সংকেত। আবার অনেকের কাছে রেড মুন মানেই অশুভ শক্তির উদয়। কিছু কিছু হলিউড মুভিতে কাল্পনিক প্রানী ওয়ারউলফ এর জন্য এই ব্লাড মুনকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখানো হয়। যদিও বিজ্ঞান কখনোই এইসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করে না, কিন্তু তবুও মানুষের মধ্যে এগুলো যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।

ব্লাড মুন; image source: nasa.gov

 

সুপারমুন

চাঁদ যখন পৃথিবীর খুব কাছাকাছি চলে আসে এবং সেই অবস্থায় পুর্নিমা হয় তখন তাকে বলা হয় সুপারমুন। সাধারণ মানুষের চোখে একটু বড় লাগে বলেই এই নামকরণ করা হয়েছে। পৃথিবী থেকে চাঁদের  গড় দূরত্ব ৩,৮৫,০০০ কিলমিটার। কিন্তু সুপারমুনের সময় তা ৫০,২০০ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসে।

সুপারমুন এবং মাইক্রোমুন এর মধ্যে পার্থক্য; image source: moon.nasa.gov

মাইক্রোমুন

মাইক্রোমুন হচ্ছে সুপারমুন এর ঠিক উল্টো। সুপারমুন এর সময় চাঁদ যেমন পৃথিবীর অনেক কাছাকাছি চলে আসে, তেমনি মাইক্রোমুন এর সময় চাঁদ পৃথিবী থেকে সবচাইতে দূরে অবস্থান করে। গড় দূরত্ব ৩,৮৫,০০০ কিলোমিটার হলেও মাইক্রোমুন এর সময় তা বেড়ে ৪০৫,৬৯৬ কিলোমিটারে তা পৌঁছায়। ফলে চাঁদ স্বাভাবিক এর চাইতে একটু ছোটো লাগে দেখেতে। যদিও মাইক্রোমুন খালি চোখে অতটা বোঝা যায় না।

গত ৩১ শে জানুয়ারি ২০১৮ তে তিনটি মহাজাগতিক ঘটনা একই সাথে ঘটে। পূর্ন চন্দ্রগ্রহন, ব্লাড মুন এবং ব্লু মুন। এরকম মহাজাগতিক ঘটনা সচরাচর ঘটে না। অনুরুপ মহাজগতিক ঘটনা এর পূর্বে প্রায় ১৫০ বছর আগে হয়েছিল। তাই এবার যারা এটি দেখতে পারেননি তাদের জন্য ব্যাপারটি না দেখা হতাশারই বটে।

featured image: pbs.org

পৃথিবীর তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়লে কী হবে?

মানুষসহ সকল প্রাণির জন্য প্রয়োজন সুন্দর পরিবেশ। তাপমাত্রা বা উষ্ণতা পরিবেশের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। খুব কম তাপমাত্রা যেমন বসবাসের অনুপযোগী ঠিক তেমনি উষ্ণতা বৃদ্ধিও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। শীতের দিনে উষ্ণতা পেতে ভালোই লাগে কিন্তু গরমের দিনে আবার সেই উষ্ণতাই অশান্তির কারণ হয়। বর্তমানে কার্বন ডাই অক্সাইডের নি:সরণ বেশি হওয়ায় তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। পরিবেশবিদদের মতে, বিশ্বের তাপমাত্রা মাত্র ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে নানা প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হবে।

image source: helpsavenature.com

এ কারণেই জলবায়ু বিশ্বের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার পদক্ষেপ হিসাবে আন্তর্জাতিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তি সম্পাদন করেছিল জাতিসংঘ। এই চুক্তির মূল লক্ষ্যই ছিল বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি যেন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম থাকে।

শিল্পায়নের ফলে যখন কারখানার গ্রিন হাউজ গ্যাস বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে, তার ফলশ্রুতিতে পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২০ বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাউন্সিল জি ৮ (যদিও এটা এখন জি ৭) এর নীতি নির্ধারকরা বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সর্বোচ্চ পরিমাণ বেঁধে দিয়েছে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে আবহাওয়া মানুষ ও জীব জগতের সাথে বৈরী আচরণ করবে। কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো অনাবৃষ্টি, দাবানল, সাইক্লোন ও টর্ণেডো প্রভৃতি আঘাত হানবে।

কিন্তু এই দুই ডিগ্রী সেলসিয়াস এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? আমরা জানি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে গ্রীন হাউস গ্যাসের প্রভাবে। কিন্তু এর সাথে আসলে ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসের সম্পর্কটা কি?

প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর একটা নির্দিষ্ট শেষ মান আছে, যে মান পর্যন্ত স্বাভবিক অবস্থা বিরাজ করে। কিন্তু তা অতিক্রম করলেই অবস্থার পরিবর্তন হয়। এই শেষ মানকে থ্রেসহোল্ড বলে। পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির থ্রেসহোল্ড মান হলো ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ১৯৭৫ সালে সর্ব প্রথম এটি নিয়ে আশ্চর্যজনক ভাবে মত প্রকাশ করে অর্থনীতি বিদ ড. ইউলিয়াম নর্দুয়াস বলেছিলেন, বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা । ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর এপ্লাইড সিস্টেম এনালাইসিস এর একটি গ্রুপ যারা আন্তর্জাতিক সীমারেখায় নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কর্মরত, তার সহকর্মিদের তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিভাবে আমরা কার্বন ডাই অক্সাইড নি:সরণ নিয়ন্ত্রণ করবো? নর্দুয়াস বলেন, বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড (মানুষের তৈরি কার্বন ডাই অক্সাইড দ্বারা সৃষ্ট) বৃদ্ধি পেলে তা, পৃথিবীর জলবায়ুকে এমন ভাবে পরিবর্তন করবে যা গত কয়েক লক্ষ বছর ধরে কেউ প্রত্যক্ষ করেনি। এক জন অর্থনীতিবিদ হিসাবে নর্দুয়াস গবেষণা করে দেখেন যে, যেভাবে কার্বন ডাই আক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে তা যদি দুইগুণ হয়, সেটা হবে বিশ্বের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধির সম পরিমান।

image source: wattsupwiththat.com

এখন থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিপদজনক অবস্থায় থাকবে পরিবেশ। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীরা বিশ্ববাসীকে মানুষের তৈরি গ্রিন হাউজ গ্যাসের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ভয়াবহতার ব্যাপারে সর্তক করে আসছেন। ১৯৯২ সালে মানব হস্তক্ষেপের ফলে জলবায়ুর বিপদজনক পরিবর্তন বন্ধের লক্ষ্যে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কনভেনশনটি প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন কমানো বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছেনা।

নর্দুয়াসের গবেষণার ৪০ বছর পর ২০১৬ সালে জাতিসংঘ প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসে রাখার পদক্ষেপ নেয়া হয়। ২০ শতকে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ছিল ১৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ১৮৮০ সালে এই তাপমাত্রা অনেক কম ছিল। ১৯৭৫ সালের পর থেকে প্রতিনিয়ত দশমিক হারে তাপমাত্রা বাড়ছে বলে নর্দুয়াস তার লেখায় উল্লেখ করেছিলেন। ২১ শতকের প্রতিটি বছর, অর্থাৎ, গত ২০ বছর ছিল সর্বোচ্চ উষ্ণতম বছর। ইতোমধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলবায়ুর বৈরি আচরণের স্বীকার বিশ্ববাসী। মানব সৃষ্ট কারণে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ২০১৭ সালে হারিকেন বেশি আঘাত হেনেছে এবং ১০ গুণ বেশি অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় খরা ও গরমের তীব্রতায় কম বৃষ্টিপাত, শুষ্ক মাটি ও দাবানলের সৃষ্টি হয়েছে। যদি তাপমাত্রা ২ ডিগ্রীর বেশি বেড়ে যায় তাহলে পৃথিবী অনেক উষ্ণ হবে যার প্রভাব পড়বে অর্থনীতি, কৃষি, কাঠামো ও পরিবেশের উপর। বাস্তুসংস্থান ব্যবস্থার ধ্বংস এবং প্রবালদ্বীপ এবং আর্কটিক এলাকার অনেক প্রজাতি বিপন্ন হবে। গ্রিনল্যান্ড বরফ এবং আর্টিক বরফ দ্রুত গতিতে গলতে শুরু করলে নিচু উপকূলীয় অঞ্চল ও ছোট ছোট দ্বীপ গুলো নিশ্চিহ্ন হবে। ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস পুরো জাতির অস্তিত্ব নির্ধারণ করতে পারে। সমুদ্র উপকুলীয় পর্যটন শিল্প মারাত্বক ভাবে ভেঙ্গে পড়তে পারে।

বিশ্বের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত কি তাদের কার্বন ডাই আক্সাইডের নিঃসরণ কমিয়ে উষ্ণতা ২ ডিগ্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেনা? পারে। প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন। আই পি সিসির এক গবেষণা বলছে যে তারা ৯৫% ভাগই নিশ্চিত যে, ২১০০ সালের মধ্যে ২ ডিগ্রী তাপমাত্রা বৃদ্ধি ছাড়িয়ে যাবে। তাই তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সচেতন হয়ে বসবাসের উপযোগী পৃথিবী রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

featured image: pbs.org