হিপোক্রেটিস ও প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসাশাস্ত্র

এখন থেকে প্রায় ২৭০০ বছর আগে মূল অলিম্পিক গেমস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাথে সাথে গ্রীক সভ্যতার প্রভাব সমগ্র ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর মাত্র ২০০ বছর সময়ের মধ্যে গ্রিস তার ক্ল্যাসিকাল যুগে প্রবেশ করে। বিখ্যাত এই সভ্যতা তখন রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য আর দর্শনে চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। সেই প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সভ্যতার কেন্দ্রে আবির্ভাব ঘটে চিকিৎসাশাস্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিপোক্রেটিস (৪৬০-৩৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)-এর।

মিশরীয় চিকিৎসাশাস্ত্র থেকে গ্রীক চিকিৎসাশাস্ত্র নানা বিষয় ধার করলেও রোগ-শোক হবার পূর্ববর্তী ধারণা থেকে তারা সরে এসেছিল। আগের ধারণা ছিল রোগবালাই ঐশ্বরিকভাবে প্রদত্ত এক ধরনের শাস্তি। তার বদলে গ্রীক চিকিৎসকরা মনে করতেন চারটি ধাতুর মধ্যে ভারসাম্যহীনতার কারণে অসুখ দেখা দেয়। এই ধাতুগুলোকে হিউমর (Humor) বলা হয়।

image source: apessay.com

এ ধারণাটি পরবর্তী ২০০ বছর ধরে বলবৎ ছিল। এই হিউমরিজমের ধারণা সম্ভবত মিশর কিংবা মেসোপটেমিয়া থেকে গ্রিসে এসেছে। আবার হিপোক্রেটিসের কয়েক দশক আগে দার্শনিক এমপেডক্লেস-এর দেয়া “পৃথিবীর মৌলিক উপাদান মোট চারটি— মাটি, বাতাস, আগুন আর পানি’’— এই ধারণা থেকেও আসতে পারে।

উৎপত্তি যেখান থেকেই হোক, হিউমরিজমের ধারণা অনুসারে মানবদেহে রয়েছে চার ধরনের হিউমর বা ধাতু। এগুলো হলো—রক্ত, হলুদ পিত্ত, কালো পিত্ত এবং কফ। একটি সুস্থ দেহে এই হিউমারগুলি সুষম এবং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে। কিন্তু কোনোভাবে যদি এই ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটে তাহলে অসুস্থতা দেখা দেবে।

চিত্র: হিপোক্র্যাটিস

জীবদেহ থেকে নিঃসৃত রস কিংবা ধাতুগুলোর ভারসাম্যহীনতার ধরণ এবং বিশেষভাবে জড়িত বিশেষ কোনো ধাতু দ্বারা যেকোনো রোগকে সংজ্ঞায়িত করা যায়। কেননা প্রতিটা ধাতুর বিশেষ ও নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং এগুলো শুধু নিজেদের সাথেই নয় দেহের অন্যান্য অংশের সাথেও সম্পর্কযুক্ত।

রক্ত— বায়ু, যকৃত, বসন্তকাল, উষ্ণতা আর আর্দ্রতার সাথে যুক্ত। হলুদ পিত্ত সম্পর্কিত আগুন, প্লীহা, গ্রীষ্মকালের সাথে। কালো পিত্তের সাথে মাটি, পিত্তথলি, শরৎকাল, শীতলতা আর শুষ্কতার সম্পর্ক রয়েছে। এবং কফ সম্পর্কিত আছে পানি, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, শীতকাল, ঠান্ডা এবং ক্লেদাক্ততার সাথে।

উদাহরণস্বরূপ, ধাতু হিসেবে রক্তের পরিমাণ যদি বেড়ে যায় তাহলে অসুস্থতার ধরণ হবে শরীর উষ্ণ এবং আর্দ্র হয়ে যাওয়া। এছাড়া লালভাব, ফোলাভাব, নাড়ির দ্রুত স্পন্দন এবং ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস, ঘাম হওয়া, ঘুমে ব্যাঘাত, প্রলাপ বকা ইত্যাদি উপসর্গও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ এটা কোনো ধরনের সংক্রমণের কারণে হওয়া জ্বর। এর চিকিৎসা হবে রক্তপাত ঘটানো যাতে শরীরের রক্ত এবং এর সাথে সম্পর্কিত অন্য ধাতুর পরিমাণ কমে যায়।

মূলত তৎকালীন ইউরোপে বেশিরভাগ রোগের কারণ রক্তের সাথে সম্পর্কিত বলে ভাবা হতো। যার কারণে রক্ত-ঝরানোর অনুশীলন একদম সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠে তখন। এই ধাতু বা হিউমরগুলোর সাম্যতা বজায় রাখার অন্য পদ্ধতি হচ্ছে ভেষজ উদ্ভিদ এবং খাবারের সাথে বিশেষ ধরনের রস মিশিয়ে দেয়া।

হিউমরের পরিমাণ বাড়ানো হবে নাকি কমানো হবে তার উপর ভিত্তি করে এটি দেয়া হতো। হিপোক্রেটিস হিউমর বা ধাতু সম্পর্কে বিশদভাবে লিখে গেছেন তার ‘হিপোক্রেটিক করপাস’ নামক বিশাল এক সংকলনে। এ সংকলনে প্রায় ৬০ টি লিখিত নথি, বিক্ষিপ্ত নোট এবং ছোট বড় নানারকম যুক্তিসম্পন্ন গবেষণাপত্র ছাড়াও বিভিন্ন রোগীর রোগের ইতিহাসের বর্ণনাও রয়েছে।

তবে এখন ধারণা করা হয় যে এই সবগুলো নথিপত্র হিপোক্রেটিস একা লিখেননি। কেননা এদের রচনাশৈলী, লেখার প্রকৃতি এবং মতামতের মধ্যে ভিন্নতা পাওয়া যায়। এ থেকে বুঝা যায় পরবর্তী তিন থেকে চার শতাব্দী ধরে তার ছাত্র, শিষ্য ও অনুসারীরা এই সংকলনে অবদান রেখেছে।

এই সংকলনগুলোর বিষয়বস্তুতে দার্শনিকতা ও প্রাকৃতিক জ্ঞান থেকে শুরু করে চিকিৎসাশাস্ত্রের জ্বরের উপসর্গ, মহামারীর আক্রমণ, ভাঙ্গা হাড়ের সমস্যা, স্থানচ্যুত অস্থিসন্ধি ইত্যাদি অনেক কিছুই আছে। মহিলাদের বন্ধ্যাত্ব, শিরা, দাঁত, পরিচ্ছন্নতার স্বাস্থ্যবিধি, স্বপ্ন, অর্শ্বরোগ এবং মৃগীরোগ নিয়ে বিশাল পরিসরে বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে।

শেষের রোগটি মানে মৃগীরোগকে অনেক গ্রীক পণ্ডিত ‘পবিত্র রোগ’ হিসেবে চিহ্নিত করতো। অনেকে ভাবতো শয়তান ভর করার কারণে এই রোগ দেখা দেয়। তবে হিপোক্রেটিসের মতামত এই ধারণাকে বাতিল করে দেয়। তিনি বলেন এই রোগ দেখা দেয়ার কারণ শরীরের মধ্যেই নিহিত। মানুষ কেবলমাত্র অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার জন্য একে ঐশ্বরিক রোগ হিসেবে বিশ্বাস করে।

তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে হিপোক্রেটিস সম্পর্কে তেমন বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি সক্রেটিসের সমসাময়িক ছিলেন এবং বিভিন্ন গ্রীক ব্যক্তিত্ব তার নাম উল্লেখ করেছেন নিজেদের গ্রন্থাবলীতে। এদের মধ্যে প্লেটো ও সক্রেটিসও রয়েছেন। হিপোক্রেটিসের মৃত্যুর সময় প্লেটোর বয়স ছিল ৩৫ এবং এরিস্টটল ছিলেন তখন তরুণ। হিপোক্রেটিসের বাবা সম্ভবত চিকিৎসক ছিলেন এবং তিনি তার জন্মস্থান গ্রিসের কস দ্বীপে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হন।

অ্যাস্ক্লেপিয়ন (Asclepeion) হচ্ছে একটি মন্দির যা গ্রীক নিরাময় ও চিকিৎসার দেবতা অ্যাসক্লেপিওসকে উৎসর্গ করে বানানো হয়েছিল। সেখানে অসুস্থদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হতো। অ্যাসক্লেপিওস নিজে হয়তো প্রাচীন মিশরের দেবতা বনে যাওয়া চিকিৎসক ইমহোটোপের গ্রীক সংস্করণ। তার ট্রেডমার্ক ‘দ্য রড অব অ্যাসক্লেপিওস’ বা ‘অ্যাসক্লেপিওসের দণ্ড’ নামে পরিচিত যা একটির লাঠি এবং একে ঘিরে থাকা কুন্ডলিত সাপের প্রতীক। হয়তো সাপের বিষ অল্পমাত্রায় রোগ সারাবার কাজে ব্যবহৃত হতো বলে অথবা সাপের খোলস নির্মোচন পুরনো সমস্যা ও অসুস্থতা দূর করে নতুন জীবনের শুরুর ইঙ্গিত দেয় বলে ট্রেডমার্কটি এমন হয়েছে।

চিত্র: কস দ্বীপে অবস্থিত অ্যাসক্লেপিয়ন মন্দির।

উৎস যাই হোক না কেনো এই লাঠি এবং একে ঘিরে থাকা সর্প যুগযুগ ধরে চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অ্যাস্ক্লেপিওসের দুই মেয়ে ছিল যারা চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিভাষার মাধ্যমে আজও জীবন্ত। হাইজিয়া (Hygieia) সম্পর্কিত হাইজিন ‘Hygiene’ এর সাথে আর প্যানাসিয়া (Panacea) কে সর্বজনীন নিরাময়ের দেবী হিসেবে মনে করা হয়।

চিত্র: অ্যাস্ক্লেপিওসের দণ্ড।

জীবনের বেশ খানিকটা সময় হিপোক্রেটিস সম্ভবত ঈজিয়ান সাগরের উপকূলে এবং এর অন্তর্দেশীয় অঞ্চলে চড়ে বেড়িয়েছেন যা বর্তমানে বুলগেরিয়া ও তুরস্ক নামে পরিচিত। তিনি চিকিৎসক হিসেবে চর্চা করেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, ছাত্র পড়িয়েছেন এবং নিজের চিকিৎসা বিষয়ক ধ্যান-ধারণা-চর্চা নিয়ে মেতে ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, তিনি কুশলী ছিলেন সঙ্গীত, কবিতা, গণিত এমনকি শারীরচর্চাতে।

সম্ভবত এক পর্যায়ে তিনি ২০ বছরের জন্য কারারুদ্ধ হন। কারণ তিনি আত্মা কিংবা দেব-দেবীকে রোগ বালাইয়ের কারণ হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন। সেই সময়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে এই শাস্তি দিয়েছিল যারা নিজেদের মানুষ আর দেব-দেবীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী ভাবতো।

হিপোক্রেটিসের শিক্ষা–দীক্ষা তাদের শক্তিকে ক্ষয় করে তুলছিল। দুঃখের বিষয়—এরপর হিপোক্রেটিসের কী হয়েছিল তা আর জানা যায়নি। এমনকি কোথায় তার মৃত্যু হয় তাও সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে অস্পষ্টভাবে যা জানা যায় তাতে বলা হয়েছে তিনি গ্রীসের উত্তরপশ্চিমের লারিসা নামক স্থানে মারা যান।

আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের অনেক কিছুই হিপোক্রেটিসের বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি থেকে এসেছে। আমরা অসুস্থতাকে তীব্র (হঠাৎ আরম্ভ হয় এবং স্বল্পস্থায়ী) এবং ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী)— এ দুভাগে ভাগ করি। আর রোগবালাইকে এন্ডেমিক (একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বা জনগোষ্ঠী ঘন ঘন দেখা দেয়) এবং এপিডেমিক বা মহামারী (হঠাৎ জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশে ছড়িয়ে পড়ে)— এ দু’শ্রেণীতে বিভক্ত করি। এগুলো এসেছে হিপোক্রেটিস থেকে।

বর্তমানে চিকিৎসা রীতি অনুযায়ী যেভাবে রোগীর রোগের ইতিহাস, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ করা হয় তার মূল পথিকৃৎ হচ্ছে ‘হিপোক্রেটিক স্কুল অব মেডিসিন’। পর্যবেক্ষণ করা সেসময়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে হিপোক্রেটিস এটিকে একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার মাঝে নিয়ে আসেন। প্রতিদিন কমপক্ষে একবার রোগীকে পর্যবেক্ষণ করা হতো যাতে রোগ নির্ণয় এবং রোগের প্রাকৃতিক কারণ জানার মাধ্যমে পরবর্তীতে রোগের অবস্থা সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়া যায় আর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া যায়।

হিপোক্রেটিস মনে করতেন রোগের ব্যাপারে পূর্বাভাস দেয়ার অভ্যাস চর্চা করা একটি চমৎকার ও কার্যকরী ব্যাপার। তার মতে, ‘সেই ভালো চিকিৎসা করতে পারবে যে রোগের বর্তমান উপসর্গ দেখে পরবর্তীতে কী হতে পারে তা ধারণা করে নিতে পারে।’ প্রত্যেক রোগীর জন্য সেসময় নথি রাখা হতো যাতে রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ যেমন— শ্বাস প্রশ্বাসের হার, তাপমাত্রা, ত্বক ও গাত্রবর্ণ, চোখ ও মুখের অবস্থা এবং রেচন পদার্থের প্রকৃতি ইত্যাদি।

মল-মূত্র অর্থাৎ রেচন পদার্থের প্রতি হিপোক্রেটিসের আগ্রহ ছিল কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন শরীরের বিভিন্ন কার্যাবলী জানতে এসব নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে। একজন ব্যক্তির খাবারের অনুপাতের উপর নির্ভর করে দৈনিক এক কি দুইবার- বিশেষ করে সকালে মলত্যাগ হওয়াটাই সুস্থতার লক্ষণ। উদরস্ফীতি হবার চেয়ে নিয়িমিত পায়খানা হওয়াটাই শরীরের পক্ষে ভালো বলে তিনি মনে করতেন।

রেকটাল স্পেকুলাস— চিমটা জাতীয় এক ধরনের যন্ত্র যা শরীরে ক্ষুদ্র ছিদ্র করে শরীরের ভেতরের অবস্থা পর্বেক্ষণে ব্যবহার করা হতো। এটাই এখনকার এন্ডোসকপির প্রাচীনতম সংস্করণ। এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক উপায়ে আভ্যন্তরীণ অংশ দেখা কিংবা উদ্দেশ্যজনকভাবে শরীরে কাটাছেঁড়া করা হতো। এছাড়া কষ্টকর অর্শ্বরোগ থেকে শুধু করে বন্ধ্যাত্ব সব ক্ষেত্রেই ওষুধ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের মলম ব্যবহার করার কথা জানা যায়।

হিপোক্রেটিস পরামর্শ দেন, সকল নথি এমনভাবে লিপিবদ্ধ করা উচিত যাতে তা স্পষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ, বিশৃঙ্খলামুক্ত এবং সহজ-সাবলীল হয়। এতে করে এসকল অভিজ্ঞতায় কাজে লাগিয়ে পরবর্তী চিকিৎসাক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা নেয়া সম্ভব হবে। অন্যান্য চিকিৎসকদের এইসব নথিপত্র কাজে লাগিয়ে চিকিৎসা করার সুযোগ থাকতে হবে।

অবাক হতে হয় সেসময়ে হিপোক্রেটিসের চিকিৎসাপদ্ধতির ধরণ ছিল রোগীর প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে সতর্ক ও সাবধানী হয়ে চিকিৎসা দেয়া যার উপর বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। সবচেয়ে কার্যকরী প্রতিকার ধরা হতো— পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, আরামদায়ক স্থানে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ এবং নিয়মিত পর্বেক্ষণে থাকা যাতে প্রাকৃতিক শক্তিই রোগ নিরাময়ে সহায়ক হয়। ব্যান্ডেজিং, ম্যাসেজিং এবং মলমের ব্যবহার থাকলেও শক্তিশালী ঔষধ আর নিষ্ঠুর ও কষ্টকর কিছু কৌশল ছিল একদম শেষ দিকের অবলম্বন।

চিকিৎসকদের জন্য প্রধান অনুশাসন ছিল- ‘প্রথমত, কোনো ক্ষতি করা যাবে না’। আক্রমণাত্মক এবং নিষ্ঠুর কৌশল যদিও বিরল ছিল। গ্রিসে এবং পরবর্তী প্রাচীন রোমে শারীর শিক্ষা বা চিকিৎসার জন্য মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ করা ছিল নিষিদ্ধ। সার্জারি বা অস্ত্রোপচার শুধুমাত্র ক্ষত এবং আকস্মিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল। এই কারণে মানবদেহের ভেতরটা সেসময় রহস্য হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল।

হিপোক্রেটিসের নিকট পরীক্ষিত এবং বিশ্বাসযোগ্য বেশ কিছু প্রতিকার ব্যবস্থা ছিল। এসবের মধ্যে জলপাই তেল, মধু এবং প্রায় ২০০ রকমের শাকসবজি আর ভেষজ যেমন— ডুমুর, রসুন, পেঁয়াজ, পোস্তদানা, গোলাপ ফুল, ক্যামোমিল, জিরা, জাফরান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

অপরিণামদর্শী ও বোকার মতো খাদ্যগ্রহণ দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতার কারণ হতে পারে বলে মনে করতেন তিনি। হিপোক্রেটিসের মতে, ‘খাদ্যই তোমার ওষুধ এবং ওষুধই তোমার খাদ্য’। অসুস্থ থাকাকালীন সময়ে খাদ্য খাবার ব্যাপারে তিনি মনে করতেন এতে করে রোগটাকেই খাবার খাওয়ানো হচ্ছে!

হিপোক্রিটাসের চিন্তার আরেকটি দিক হলো, রোগীর ‘সঙ্কটাবস্থা’র ধরণ পর্যবেক্ষণ করা। হিপোক্রেটীয় তত্ত্বানুসারে, রোগ শুরু হওয়ার একটি বিশেষ সময় পরেই সঙ্কটের সময় শুরু হয়। এই নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে যদি সঙ্কট মুহুর্ত আসে, তবে তা বারবার ফিরে আসতে পারে। গ্যালেনের মতে, এই ধারণা হিপোক্রেটিস প্রথম প্রচলন করেন, যদিও তার পূর্ব থেকেই এই ধারণা প্রচলিত ছিল এমন মত রয়েছে।

অনেক রোগ আছে যেগুলো বর্ণনা প্রথমে হিপোক্রেটিস ও তার অনুসারীরা দিয়েছিল। নখ ও আঙ্গুল একত্র হয়ে যাওয়া এর মধ্যে একটি। এটি ‘হিপক্রেটিক ফিঙ্গার’ নামে পরিচিত। হিপোক্রেটিসের শিক্ষা ও রীতিনীতি অন্যান্য গ্রীক চিকিৎসকদেরও প্রভাবিত করেছিল। হেরোফিলাস (Herophilus) নামের আলেকজান্দ্রিয়ার এক চিকিৎসক তখন মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ করার অনুমতি পেয়েছিলেন।

তিনি ফুদফুদ, রক্তের নালী, মস্তিষ্ক, চোখ এবং স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তাকেই প্রথম দিককার অন্যতম একজন এনাটোমিস্ট (অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ) হিসেবে গণ্য করা হয়। তার কিছুকাল পরে এরাসিস্ট্রাটোস (Erasistratus) নামের আলেকজান্দ্রিয়ার আরেকজন চিকিৎসক মেডিকেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ফুসফুস ও রক্ত পরিবহন ব্যবস্থার উপর বিশেষ কাজ করেন।

ধীরে ধীরে হিপোক্রেটিক আন্দোলন চিকিৎসকদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলাতে ভূমিকা রেখেছিল। উল্লেখ্য, তৎকালীন সময়ে চিকিৎসকদের সামাজিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। কারণ পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে সমস্যা সমাধানের চেয়ে সমস্যা বৃদ্ধিতেই তাদের ভূমিকা বেশি ছিল। জনমনে ধারণা পরবর্তনে মূল ভূমিকা রেখেছিল অবশ্য বিখ্যাত ‘হিপোক্রেটিক স্বাস্থ্যসেবার আচরণবিধি’।

আমরা হিপোক্রেটিসের শপথের মাধ্যমে এর সম্পর্কে কিছুটা জানতে পারি এবং এর প্রয়োজনীয়তা যে যুগ যুগ ধরে রোগী ও সাধারণ মানুষের জন্য উপকারী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া কে-ই বা চাইবে উন্মাদ, বেপরোয়া, অপরিচ্ছন্ন, খামখেয়ালী, অনৈতিক, অমানবিক এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে যোগাযোগহীন কোনো চিকিৎসকের কাছে যেতে?

‘হিপোক্রেটিক করপাস’-এ চিকিৎসক সম্পর্কিত অংশে একজন আদর্শ চিকিৎসক কেমন হবে তা বলে দেয়া আছে। একজন আদর্শ ডাক্তারকে হতে হবে সৎ, ন্যায়পরায়ণ, দুর্নীতিমুক্ত এবং সেবা করার মানসিকতা সম্পন্ন। তাকে রোগীর সাথে ভদ্রভাবে সৌজন্যতার সাথে কথা বলতে হবে, রোগীর অবস্থার যত্ন নিতে হবে এবং রোগের লক্ষণগুলো গুছিয়ে লিপিবদ্ধ করতে হবে। ডাক্তারখানা হতে হবে পরিষ্কার-পরিপাটি এবং খোলামেলা পরিবেশযুক্ত।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য হিপোক্রেটিক মতাদর্শ হলো, রোগীর গোপনীয় তথ্য বিশ্বস্ততার সাথে গোপন রাখা। এতে চিকিৎসকগণ কেমন পোশাক পরবে কিংবা কীভাবে চলাফেরা করবে সে সম্পর্কেও বলে দেয়া হয়েছে এই নির্দেশনায়। হিপোক্রেটিসের এই আদর্শ ডাক্তারের ধারণা এসেছে হিপোক্রেটিসের শপথের সাথে বিভিন্ন নব্য সংযোজনের মাধ্যমে। শপথটির নানানরকম সংস্করণের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটা এখানে দেয়া হলো-

“আমি শপথ করছি নিরাময়ের দেবতা অ্যাপোলো ও অ্যাস্ক্লেপিয়স, হাইগিয়া এবং প্যানাসিয়ার নামে- সকল দেবতা ও দেবীদের সাক্ষী রেখে আমি আমার সামর্থ্য ও বিচারবুদ্ধি অনুসারে নিম্নলিখিত শপথ পালন করার চেষ্টা করবো।

আমি আমার সাধ্যমতো রোগীর উপকারের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

আমি কখনো কারো ক্ষতি করবো না।

কোনো মারাত্মক পথ্য রোগীকে দেব না।

আমি আমার জীবন এবং অর্জিত জ্ঞানের শুদ্ধতা বজায় রাখবো।

প্রতিটি বাড়িতে আমি শুধুমাত্র রোগীর ভালো করার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করবো।

নিজেকে সকল প্রকার ইচ্ছাকৃত দুর্ব্যবহার এবং মোহাবিষ্ট করা থেকে বিরত থাকবো। বিশেষ করে নারী ও পুরুষ উভয়ের সাথে প্রেম আনন্দ করা থেকে দূরে থাকবো।

যা কিছু আমার জানার গোচরে আসে সেটা আমার পেশার সাথে সম্পর্কিত কিংবা সম্পর্কিত নয় তা আমি অবশ্যই গোপন রাখবো, কখনো কারো নিকট প্রকাশ করবো না।”

চিত্র: ‘হিপোক্রেটিসের শপথ’-এর ইংরেজি রূপ।

সারা বিশ্বজুড়ে মেডিকেল ছাত্ররা তাদের প্রতিষ্ঠান কর্তৃক চয়নকৃত হিপোক্রিটাসের শপথ নিয়ে থাকেন। যদিও মূলের সাথে বর্তমানকালের শপথের অনেকটা অমিল রয়েছে, তবুও এ শপথ নৈতিকতা, সতর্কতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সহানুভূতিশীলতার উপর জোর দিয়ে থাকে যাতে করে রোগীর এবং চিকিৎসক উভয়েরই মঙ্গল সাধিত হয়।

তথ্যসূত্র

১. Hippocrates and Greek Medicine, Kill or Cure: An Illustrated History of Medicine by Steve Parker

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Hippocrates

তৈরি হল ঋণাত্মক ভরের পদার্থ

ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানীরা তৈরি করলেন ঋণাত্মক ভরের ফ্লুইড। খুবই অবাক লাগছে? ভুল পড়েননি। ঘটনা সত্য, আসামী (পদার্থবিজ্ঞানীরা) নির্দোষ!

ট্যাকিওন নামে এক ধরনের অনুমিত কণা আছে যার ভর ঋণাত্মক। যেহেতু এটি হাইপোথেটিক্যাল কণা মানে প্রস্তাবিত বা কল্পিত তাই এর ঋণাত্মক ভরের ব্যাপারটিও কল্পিত। এখনো ট্যাকিওনের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়নি। ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা যে ঋণাত্মক ভরের কথা বলছেন তা কিন্তু ট্যাকিওন নয়। তাদের তৈরি করা ঋণাত্মক ভরের পদার্থটির ভর সত্যিই মাইনাস ‘অমুক’ গ্রাম!

ছবিটি কাল্পনিক; image source: naturphilosophie.co.uk

এই বস্তু স্বাভাবিকভাবেই আমাদের পরিচিত জগতের অন্যান্য বস্তুর মতো নয়। যদি কোনোদিন একে ধাক্কা দেয়ার সুযোগ পান তো দেখবেন সামনের দিকে ধাক্কা দিলে এটি সামনে যাচ্ছে না। পিছন দিকে সরে আসছে। ধনাত্মক বল প্রয়োগে ঋণাত্মক ত্বরণ।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- কোনো কিছুর ভর কিভাবে ঋণাত্মক হতে পারে? এ প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনাটি এমন— তড়িৎ বলের ক্ষেত্রে তড়িৎ আধান যেমন ধনাত্মক বা ঋণাত্মক উভয়ই হতে পারে, তেমনই ভরের ক্ষেত্রেও শুধু ধনাত্মকই নয়, ঋণাত্মক দশাও থাকতে পারে। ভর এবং আধান উভয়ই বস্তুর মৌলিক ধর্ম।

তাত্ত্বিকভাবে ঋণাত্মক ভর তেমন কোনো সমস্যা সৃষ্টি করছে না। কিন্তু বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এটা এখনো বিতর্কের বিষয় যে ঋণাত্মক ভরের বস্তু বাস্তবিকভাবে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম না ভেঙে থাকতে পারে কিনা। যেহেতু সাধারণ ঘটনা ও কারণ দ্বারা আমাদের জ্ঞান-মানস অর্জিত তাই এরকম ব্যতিক্রমী ধারণা মানুষের মস্তিষ্কে জড়িয়ে নেয়া বেশ কঠিন।

আইজ্যাক নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্র বলছে অর্থাৎ বল = ভর × ত্বরণ। এটি প্রতিষ্ঠিত সূত্র। একে ভুল প্রমাণের সুযোগ নেই বললেই চলে। বিজ্ঞানের যেসব সূত্রকে কখনো ভুল প্রমাণ করা যাবে না বলে বিজ্ঞানীরা স্বীকার করে নিয়েছেন সেগুলোকে বলে Law বা নীতি। নিউটনের প্রদান করা তিনটি সূত্রই হচ্ছে এমন নীতি। তাহলে, ধনাত্মক বল প্রয়োগে ঋণাত্মক ত্বরণ ঘটতে দেখলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ভর ঋণাত্মক হবে।

কল্পনা করুন, পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা দিতে বসেছেন, পরীক্ষায় সব প্রশ্ন এসেছে পদার্থবিজ্ঞানের অমিমাংসিত সব বিষয় থেকে। কিছুই লিখতে পারলেন না, সময় শেষ হয়ে গেল। হলের গার্ড আপনার খাতা কেড়ে নিতে যাচ্ছেন। কিন্তু একি! তিনি যতই জোরে টানছেন, খাতা ততই আপনার দিকে ঠেলে চলে আসছে। যতই চেষ্টা করুক খাতা কখনোই টেনে নিতে পারবে না!

ঋণাত্মক ভর!পদার্থবিজ্ঞানকে বাঁচাও! 😛 

এর আগেও ঋণাত্মক ভরের উপর তাত্ত্বিক গবেষণা হয়েছে। শুধুমাত্র অবাস্তব বা অপরিচিত কিংবা পূর্বে ঘটেনি বলে কোনো ঘটনা অসম্ভব হয়ে যাবে এমন কোনো কথা নেই। অতীতের গবেষণার বিভিন্ন নজির থেকে বিজ্ঞানীরা বলেন, সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কিছুমাত্র হেরফের না করেই আমাদের মহাবিশ্বে ঋণাত্মক ভরের অস্তিত্ব সম্ভব।

তাছাড়া পদার্থবিদরা মনে করেন, ঋণাত্মক ভর সম্পর্কিত হতে পারে ডার্ক এনার্জি, ব্ল্যাক হোল এবং নিউট্রন নক্ষত্রের সাথে। তাদের অনেক আচরণ ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে এই ঋণাত্মক ভর। উল্লেখ্য জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, ব্ল্যাকহোল এগুলোই সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিক।

গ্যালাক্সির কেন্দ্রে হিসেব করা মহাকর্ষ বলের সাথে দৃশ্যমান ভরের একটা গাণিতিক ফারাক রয়ে গেছে বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে। সেই ফারাক মিলিয়ে নেয়া হয়েছে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জিকে কল্পনা করে। অথচ ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক এনার্জির কোনো প্রমাণ হাজির করা যায়নি। এক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যাখ্যায় সহায়ক হতে পারে ঋণাত্মক ভর।

রুবিডিয়াম পরমাণুকে শীতল করার মাধ্যমে গবেষকেরা ঋণাত্মক ভরের জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। কতটা শীতল সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। উষ্ণতার পরিমাণ পরম শূন্য তাপমাত্রার চেয়ে এক চুল বেশি বলা যেতে পারে। পরমশূন্য তাপনাত্রা হচ্ছে তাপমাত্রার সর্ব-নিম্নসীমা অর্থাৎ কোনো পদার্থকে এর চেয়ে আর শীতল করা সম্ভব নয়। এর মান হচ্ছে -২৭৩.১৫° সেলসিয়াস বা জিরো কেলভিন।

দশাটির নাম বসু-আইনস্টাইন ঘনীভবন। পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং আইনস্টাইন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এই তাপমাত্রায় পরমাণুসমূহ খুব ধীরে নড়াচড়া করবে এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নীতি মেনে চলবে।

এ অবস্থায় সব পরমাণু সমলয়ে চলবে। সবগুলো পরমাণু এমনভাবে আচরণ করবে যেন তারা সবাই মিলে একটি বড় পরমাণু। একদল মার্চ করা সৈন্যের মতো, সকলেই সমদশা এবং সমলয়ে- একজন যা করে পুরো দলই একইরকম কাজ করে। পরম তাপমাত্রায় কোনো ঘর্ষণ বলও থাকে না। তাই যখন কোনো ফ্লুইড প্রবাহিত হয় তখন তা কোনো শক্তি হারায় না।

চারপাশ থেকে লেজার রশ্মি প্রয়োগ করে পরমাণুকে নিশ্চল করে দেয়ার মাধ্যমে যেভাবে শীতল করা হয় সেভাবে লেজার রশ্মি ব্যবহার করে রুবিডিয়াম পরমাণুগুলোকে শীতল করা হয়। এবং এদেরকে উষ্ণ হতে দেয়া হয়। এর ফলে উচ্চ শক্তির কণারা বাষ্প নির্গমনের মাধ্যমে দূর হয় এবং পুনরায় পদার্থটিকে শীতল করে দেয়।

লেজার রশ্মি দিয়ে পরমাণুগুলোকে কেন্দ্র করে এমনভাবে তাক করা হয় যেন পরমাণুগুলো মাত্র ১০০ মাইক্রন আকারের একটা ক্ষেত্রের মধ্যে আটকে গেছে। সুতরাং পরমাণুরা নড়াচড়া করার সুযোগ পাচ্ছে না। এ পর্যায় পর্যন্ত রুবিডিয়াম সুপারফ্লুইডের স্বাভাবিক ভর বিদ্যমান থাকছে।

ঋণাত্মক ভর তৈরিতে গবেষকরা আরেক সেট লেজার রশ্মি দিয়ে পরমাণুগুলোকে সামনে পেছনে সরিয়ে তাদের ঘূর্ণন বদলে দেন। এ অবস্থায় যদি রুবিডিয়াম পরমাণু যথেষ্ঠ বেগে ঐ সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রের বাইরে ছুটতে যায় তা ঋণাত্মক ভরের মতো আচরণ করবে। দেখা গেছে সেগুলোকে ধাক্কা দিলে বিপরীত দিকে ত্বরণ ঘটে। যেন রুবিডিয়াম কোনো অদৃশ্য দেয়ালে আঘাত পেয়ে ফিরে আসছে।

গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম সেরা জার্নাল Physical Review Letters-এ ১০ই এপ্রিল ২০১৭য়। পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে থাকা গবেষকেরা ইতোমধ্যেই হয়তো পরীক্ষণটি পুনরায় করতে বসে গেছেন। একটি বিষয় পরিষ্কার- পদার্থবিজ্ঞান অদ্ভূত হয়ে চলছেই এবং সে চমকের মাত্রাও ক্রমাগতভাবে এগিয়েই চলেছে। প্রতিনিয়ত, এরপর কী! এরপর কী! একটা হাঁসফাস নিয়ে আগ্রহ চোখে বসে থাকা বিজ্ঞানপ্রেমীদের চিন্তাজগৎ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বেড়াক!

সবিশেষ জ্ঞাতার্থে:এই গবেষণাপত্রটির স্থান-কাল-পাত্র বিদেশ বিভূম ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির সাথে যেটুকু আত্মীয়তা আপনি খুঁজে পেতে পারেন সে মধ্যমণি বাংলাদেশের তরুণ খালিদ হোসেন যিনি মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি এ গবেষণাপত্রটির দ্বিতীয় লেখক। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পদার্থবিজ্ঞান-স্বপ্নের নেতানো চারায় যারা পানি দিতে চান তারা সাহস সঞ্চয় করে নিতে পারেন এখান থেকে পড়ে।

গবেষণাপত্রটির লেখকতালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের যুবা খালিদ হোসেন; source: Physical Review Letters.

হ্যাপি রিডিং! 🙂

তথ্যসূত্র

https://phys.org/news/2017-04-physicists-negative-mass.html

https://journals.aps.org/prl/abstract/10.1103/PhysRevLett.118.155301

সাবমেরিনের ব্যাবচ্ছেদঃ যেভাবে কাজ করে সাবমেরিন

সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ, সুন্দর ও মিষ্টি এই নামটি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের কানে রক্ত শীতল করা শব্দ। ১৫৬২ সালে রাজা পঞ্চম চার্লস-এর উপস্থিতিতে ২ জন গ্রিক প্রথম সাবমারসিবল (অর্ধডুবোজাহাজ)-এর মতো একটি কাঠামো তৈরি করে। এটিকে দাঁড় টেনে চালাতে হতো। পরে ১৫৭৮ সালে ইংরেজ গণিতবিদ ব্রূনো আর ১৫৯৭ সালে স্কটিশ গণিতবিদ নেফিয়ার তাদের বইতে ডুবোজাহাজ নিয়ে কিছু আঁকিবুকি করেন। পরবর্তীতে ১৮ শতকে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি শুরু হয় ডুবোজাহাজের।

গঠনপ্রণালী

সাবমেরিনের নাক থেকে শুরু করা যাক। সাবমেনিরের কাঠামোর চিত্রে যেটা Bow নামে দেখা যাচ্ছে ওটাই নাক। এটা সাবমেরিনের সামনের দিক। সাবমেরিন শুধু সামনের দিকে এবং স্বল্প গতিতে পেছনের দিকেও যেতে পারে। পাশাপাশি যেতে পারে না।

নাকের নিচে Sonar Dome নামে একটি অংশ আছে যা দিয়ে জাহাজটা তার আশেপাশের বস্তুর আকৃতি, দূরত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে ধারণা নেয়। এদের মাঝে আছে চেইন লকার নামে একটি অংশ যা ডুবোজাহাজকে কোথাও নোঙর করতে ব্যবহৃত হয়।

এদের পেছনেই থাকে টর্পেডো কক্ষ (Torpedo Room)। সাধারণত এখানে ৩ টি টর্পেডো নিক্ষেপক (launcher) থাকে। পাশাপাশি কয়েক রাউন্ড বাড়তি টর্পেডো রাখার জায়গাও থাকে। ডুবোজাহাজের পেছনের দিকেও এমন একটি ঘর থাকে। পার্থক্য হলো ঐ ঘরে ২ টি নিক্ষেপক থাকে। তবে উন্নত মডেলে এর পরিমাণ বাড়তে পারে।

টর্পেডো ঘরের পেছনেই অফিসারদের থাকবার জায়গা (Quarters)। এর নিচে থাকে ডুবোজাহাজের ব্যাটারির স্থান। তার নিচেই থাকে জাহাজের চালিকাশক্তির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি। এই তেলের ঘরটি আসলে ওই প্রস্থচ্ছেদের সাবমেরিনের পুরো অংশ জুড়েই খোলসের মতো থাকে। তেল ডুবোজাহাজের ভারসাম্যে রক্ষাতেও অবদান রাখে।

অফিসারদের ঘরের পেছনেই থাকে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (Control Room)। এখান থেকে পুরো সাবমেরিনকে পরিচালনা করা হয়। এর সাথেই থাকে রেডিও রুম আর উপরে থাকে কনিং টাওয়ার। টাওয়ারের অংশ থেকে রেডিও এন্টেনা ও পেরিস্কোপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্যারিস্কোপের মাধ্যমে পানির নিচে থেকেই উপরের স্তরের জাহাজ বা অন্যান্য বস্তুর অবস্থান দেখে নেয়া যায়।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নিচেই পাম্প রুম। যা দিয়ে পানি কমিয়ে বাড়িয়ে ডুবোজাহাজকে ডুবানো বা ভাসানো হয়। এর সাথে লাগোয়া খোলস ঘরটি হচ্ছে ব্যালাস্ট ট্যাংক। সাধারণত সাবমেরিনের মডেল ও আকার ভেদে চারটি বা তার অধিক ব্যালাস্ট ট্যাংক থাকে। সাবমেরিনের দুই পাশে দুটি ট্যাংকের মতো অংশ থাকে। এগুলো হচ্ছে ট্রিম ট্যাংক বা ভারসাম্য শোধন ঘর।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষের পেছনেই থাকে নাবিকদের থাকার কক্ষ (Mess) ও এর সাথে লাগোয়া কর্মচারীদের কক্ষ (Crew’s Quarters)। এদের নিচে একটি ব্যাটারি কক্ষ আছে। এর চারপাশে খোলসঘরে আছে তেল। এর পেছনেই ইঞ্জিন কক্ষ। মোট চার জোড়া ইঞ্জিন থাকে যারা তেল হতে শক্তি দিয়ে ডুবোজাহাজের পেছনের টারবাইন বা পাখা ঘোরায় এবং ব্যাটারী চার্জ করে। ব্যাটারীর চার্জ দিয়ে পানির নিচে নিঃশব্দে চলা যায়।

হালকালের কিছু সাবমেরিন নিউক্লিয়ার শক্তি দিয়ে চালনা করা হচ্ছে ফলে তারা পানির নিচে থাকতে পারে অনেক সময়। কিন্তু সমস্যা হলো এর ইঞ্জিন কখনোই সম্পূর্ণ বন্ধ করা যায় না। ফলে যুদ্ধে শতভাগ শব্দহীনতা এটা দিতে পারে না যা ডিজেল ইঞ্জিন চালিত পুরাতন ডুবোজাহাজগুলি দিতে পারে।

ইঞ্জিনরুমের পেছনেই ম্যানুভারিং রুম নামে একটি অংশ থাকে যেখান থেকে পুরো ডুবোজাহাজের যন্ত্রপাতির অবস্থা, বিদ্যুৎ ও যান্ত্রিক চালিকা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ডুবোজাহাজের পেছনের দিকে রাডার নামে একটা বৈঠা থাকে যা দিয়ে এর গমন দিক নির্ধারণ করা হয়।

খোলসের ঘরগুলোয় যাবার জন্য ডুবজাহাজের উপরের কাঠামো (Deck Casing) হতে কিছু চাকতি আকৃতির দরজা থাকে। টর্পেডো রুম হতে বের হবার জন্যও এ ধরনের দরজা থাকে।

ডুবোজাহাজের কাঠামো সাধারণত এমন ধরনের লোহা সংকরে তৈরি হয় যেন তা পানির নিচে পানির চাপ সহ্য করতে পারে। সামনের দিকের আকৃতি এমন হয় যে তা যেন সহজেই পানি ভেদ করে এগুতে পারে।

সাবমেরিনের চলন পদ্ধতি

প্রথমেই সাবমেরিনের সামনের ব্যালাস্ট ট্যাংকে আল্প পানি প্রবেশ করানো হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে মাঝের দুটি ও পেছনেরটিতে পানি প্রবেশ করানো হয়। তারপর ধীরে ধীরে ডুবা শুরু করলে ট্রিম ট্যাংক-এ পানি কম বেশি করে ডুবোজাহাজের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা হয়। ভাসবার সময় পাম্প হতে উচ্চ চাপের বাতাস প্রবেশ করানো হয় ব্যালাস্ট ট্যাংকে। তা দিয়ে ঠেলে পানিকে বের করে দেয়ার মাধ্যমেই এটা ভেসে ওঠে পানির ওপরে।

নাবিকদের জন্য প্রচুর রসদ, তেল ও সব ধরনের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে পানিতে ডোবার পর Sonar ও রাডারের মাধ্যমে পথ চিনে গুটিগুটি ছন্দে এগোয় গুপ্তবাহন এই ডুবোজাহাজগুলো। হারিয়ে যায় সমুদ্রর অতলে কয়েক মাসের জন্য।

তথ্যসূত্র

মিলিটারি ডট কম, ইউটিউব, উইকিপিডিয়া

featured image: bastion-karpenko.narod.ru

ফটো ফিফটি ওয়ানঃ একের পর এক নোবেল পুরস্কার এসেছে যে ছবির হাত ধরে

যদি বিখ্যাত কোনো স্থিরচিত্র বা ছবির কথা কল্পনা করতে বলা হয় তাহলে আপনার মনে হয়তোবা ছবিই ভাসবে। যেমন সেই আফগান নারীর বিস্ময়কর মায়াবী সবুজ চোখ অথবা খাবারের অভাবে মৃত্যুবরণ করা সেই আফ্রিকান শিশুর কথা। কিংবা এমনই আরো অনেক কিছু।

কিন্তু কখনো কি চিন্তা করেছেন, কোনো একটা ছবির অবদান আধুনিক বিজ্ঞান জগতে কতটুকু হতে পারে? এমনকি সেই ছবির জন্য নোবেল দেওয়ার কথা পর্যন্ত উঠতে পারে? কোনোটার একটাও যদি কখনো কল্পনা করে থাকেন তাহলে আপনাকে এই লেখায় স্বাগতম।

প্রথমেই প্রশ্ন উঠতে পারে কী এই ‘ফটো ৫১’? বিজ্ঞান জগতে কেন এর এত গুরুত্ব যার জন্য নোবেল পুরষ্কারের কথা পর্যন্ত উঠবে? কেমন দেখতে এই ফটো? এর পেছনে রয়েছে এক মহীয়সী নারীর অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা। রয়েছে কিছুটা আক্ষেপ ক্ষোভ আর লজ্জা।

অবদানের কথা যদি বলতেই হয় তাহলে প্রথমেই এটুকু অন্তত বলতে পারি, এই ফটো ৫১ যদি ঐ সময়ে তোলা না হতো তাহলে জীববিজ্ঞানের উন্নতি অনেক পিছিয়ে যেতো। জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার আজ যে মহীয়সী রূপ তা সম্পন্ন হতে আরো অনেক বছর পার হয়ে যেত। কারণ এই ছবি ব্যতীত বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিকের পক্ষে ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল মডেল দেয়া সম্ভব ছিল না।

এই মডেল প্রদান করেই এরা পরবর্তীতে মরিস উইলকিন্সের সাথে ১৯৫৩ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করে। কিন্তু তারচেয়ে বড় প্রশ্ন, ফটো ৫১ এর আসল যে কারিগর, সেই মহীয়সী নারীর ভাগ্যে কী হয়েছিলো? এখানে সে সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করবো।

ফটো ৫১ সম্বন্ধে জানার আগে যে পদ্ধতির মাধ্যমে এটি তোলা হয়েছিল সে সম্বন্ধে জানা উচিৎ। পদ্ধতিটির নাম এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি। সাধারণ ছবি তোলার জন্য যে উপায় অবলম্বন করা হয় এটি তারই মতো তবে এর প্রক্রিয়া খানিকটা জটিল।

নামে যেহেতু এক্স-রে কথাটি আছে তার মানে বুঝতে হবে এখানে এক্স-রে নিয়ে কিছুটা হলেও কারিকুরি আছে। রাদারফোর্ড যে প্রক্রিয়ায় তার পরমাণু মডেলের পরীক্ষা করেছিলেন এটিও অনেকটা সেরকমই। রাদারফোর্ডের পরীক্ষায় আলোক উৎস হিসেবে হিলিয়াম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এখানে আলোক উৎস হিসেবে এক্স-রে ব্যবহার করা হয়।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- ক্রিস্টালের গঠন নির্ণয় করার জন্য পদার্থের স্ফটিকের উপর উৎস থেকে এক্স-রে ফেলা হয়। এরপর বিশেষ ধরনের আলোক সংবেদনশীল পদার্থের উপর বিচ্ছুরিত আলোক রশ্মিকে গ্রহণ করা হয়। এর উপরই উৎস থেকে বিক্ষিপ্ত এক্স-রে নির্দিষ্ট সজ্জায় সজ্জিত হয়। এই সজ্জাকে গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করে উক্ত পদার্থের ত্রিমাত্রিক গঠন ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব।

চিত্রঃ এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি

ডিএনএ’র একক বা মনোমারের চিত্র অত্যন্ত নিখুতভাবে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন। এরপর তার পলিমারের গঠন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন ওয়াটসন ও ক্রিক।

কে এই রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন? ১৯২০ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করা ফ্রাঙ্কলিন ১৯৩৮ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি লাভ করে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। সেখানে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সাথে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে প্রথম মহিলা প্রফেসর হিসাবে যোগদান করেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

প্যারিসের CNRS Lab of Molecular Genetics-এ চার বছর কাজ করেন। সেখানে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফিতে উচ্চতর জ্ঞান লাভ করেন। এই বিষয়ে তিনি এতটাই পারদর্শিতা লাভ করেন যে, তাকে লন্ডনের কিংস কলেজে যোগদান করার জন্য আহ্বান করা হয়। দেশের ডাক উপেক্ষা না করে ১৯৫১ সালে কিংস কলেজে যোগদান করেন।

কিন্তু আহ্বানকারী জন র‍্যানডল একইসাথে একটা সংকটপূর্ণ অবস্থাও তৈরি করলেন। ইতিপূর্বে মরিস উইলকিন্স (পরবর্তীতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী) যে পদে ছিলেন ফ্রাঙ্কলিনকে সেই পদে নিযুক্ত করলেন। পাশাপাশি মরিসের যে পিএইচডি ছাত্র ছিল, তাকেও ফ্রাঙ্কলিনের অধীনে দিয়ে দেন। তাছাড়া ফ্রাঙ্কলিন যে সময়টাতে কিংস কলেজে যোগদান করেন তখন মরিস উইলকিন্স ছুটিতে ছিলেন। ফলে তিনি যখন ফিরে এলেন তখন দেখলেন কোনো ধরনের অপরাধ ছাড়াই প্রথমত, তিনি তার ল্যাবের একক অধিকার হারালেন। তার উপর তিনি তার অধীনস্থ পিএইচডি ছাত্রটিকেও হারালেন।

গবেষণার সাথে যারা জড়িত তারা এ ধরনের ঘটনার গুরুত্ব একজন বিজ্ঞানীর কাছে কতটুকু তা সহজেই অনুমান করতে পারবে। এই ঘটনা আর যাই হোক উইলকিন্সকে অন্তত খুশি করতে পারেনি। তাই প্রথম থেকেই উইলকিন্স এবং ফ্রাঙ্কলিনের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় এবং যার ভবিষ্যত ফল খুব একটা ভালো হয়নি।

চিত্র: উইলকিন্স

ফ্রাঙ্কলিন কিংস কলেজে আসার আগমুহূর্তে উইলকিন্স ডিএনএ’র কিছু ছবি তুলেছিলেন এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সাহায্যে। কিন্তু ছবিগুলো অস্পষ্ট ছিল। তিনি ঐ ছবিগুলো ইতালির নেপলসে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে প্রদর্শন করেন।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেমস ওয়াটসন। তিনি পরে উইলকিন্সের সাথে যোগাযোগ করেন তার অধীনে গবেষণা করার জন্য। অবশ্য তার এ প্রচেষ্টা পূর্ণ হয়নি। ওয়াটসন পরে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে ফ্রান্সিস ক্রিকের অধীনে তার পিএইচডি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। এর ফলশ্রুতিতেই তৈরি হয় ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল মডেল।

অন্যদিকে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন তার কঠোর পরিশ্রমে এক বছরে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেন। ডিএনএ’র নমুনায় আর্দ্রতার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে দেখান যে, A (৭৫%) এবং B দুই প্রকারের ডিএনএ সম্ভব। উপস্থিতির দিকে লক্ষ্য রেখে ফ্রাঙ্কলিন A এর উপর বেশি গুরুত্বারোপ করেন। এই দিকটিকেই ওয়াটসন পরবর্তীতে নিজের আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করেন। কারণ, B ডিএনএ’র ছবি A এর চেয়ে অধিক পরিষ্কার ছিল।

ওয়াটসন ও ক্রিক মূলত B ডিএনএ’র ছবির উপর ভিত্তি করে তাদের ডাবল হেলিক্যাল মডেল প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু আমরা যদি ফ্রাঙ্কলিনের ব্যক্তিগত নোটের দিকে লক্ষ্য করি, যা নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যারন ক্লুগ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, তাহলে আমরা চমকপ্রদ কিছু দেখতে পাই। তার নোটে ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল গঠন সম্পর্কে আশাবাদী ছিলেন এবং কিছুটা কল্পনাও করতে পেরেছিলেন।

চিত্রঃ A এবং B গঠনের ডি এন এ।
চিত্রঃ ডিএনএ’র গঠন সম্পর্কে ফ্রাঙ্কলিনের নোট বইয়ে আঁকা চিত্র।

১৯৫২ সালে ফ্রাঙ্কলিন B প্রকারের ডিএনএ’র যে ছবি তুলেছিলেন সেটিকেই ফটো ৫১ নামে অভিহিত করা হয়। এই পরীক্ষা চালানোর পর ফ্রাল্কলিন কিংস কলেজ ত্যাগ করে লন্ডনের ব্রুক বেক কলেজে যোগদান করেন। সেখানে ১৯৫৩ – ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ভাইরাস রিসার্চ ল্যাবে ভাইরাস গবেষক হিসাবে অতিবাহিত করেন। ঐ সময় উল্লেখযোগ্য কিছু গবেষণাপত্র বের করতে সমর্থ হন যেখান তার সঙ্গী ছিলেন পরবর্তীতে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যারন ক্লুগ।

ইতোমধ্যে ফ্রাঙ্কলিনের পুরোপুরি অজান্তে ফটো ৫১ ওয়াটসন ও ক্রিকের কাছে পৌঁছে যায়। শুধু ফটো ৫১ ই নয়, ফ্রাঙ্কলিনের কাজের সমস্ত নথিপত্র উইলকিন্স, ওয়াটসন ও ক্রিকের কাছে দিয়ে দেন। যা কিনা সম্পূর্ণভাবে অনৈতিক এবং একই সাথে গবেষণা নীতির বিরোধী।

ফটো ৫১ হাতে পাওয়ার সাথে সাথে ওয়াটসন ও ক্রিক দ্রুত গতিতে তাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। কেননা, তখনকার সময় ওয়াটসন ও ক্রিক ব্যতীত আরো অনেক বিজ্ঞানী ডিএনএ’র গঠন ব্যাখ্যা করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন দুবার নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী লিনাস পলিং। কিন্তু পলিং তার সাফল্যের অনেক কাছাকাছি পৌঁছালেও সামান্য কিছু ভুলের জন্য ডিএনএ এর গঠন ব্যাখ্যা করতে পারেননি। আর তাই হয়তবা তিনি তার তৃতীয় নোবেল পুরষ্কারটাও হাতছাড়া করলেন!

ওয়াটসন ও ক্রিক তাদের কাজ খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যান এবং এক সপ্তাহের মধ্যে তারা তাদের মডেল দাঁড় করাতে সক্ষম হন। কিন্তু তাদের মডেল যে সঠিক সেটার জন্য অবশ্যই কোনো বিদগ্ধ বিজ্ঞানীর স্বীকৃতির প্রয়োজন। কিন্তু কাকে তারা দেখাবেন? অবশেষে তারা স্বয়ং রোজালিন্ড ফ্রঙ্কলিনকেই আমন্ত্রণ জানান!

ফ্রাঙ্কলিন ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে গিয়ে তাদের মডেল দেখেন এবং সাথে সাথে তিনি ঐ মডেলের গুরুত্ব বুঝতে পেরে তার স্বীকৃতি দান করেন। ফ্রাঙ্কলিন তখনও জানতেন না যে তার পরিশ্রমের ফটো ৫১ এর উপর ভিত্তি করেই তারা ঐ মডেলটি তৈরি করেছেন। ওয়াটসন এই ঘটনা সম্পর্কে তার বই ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’-এ লিখেছেন “ত্বরিত স্বীকৃতি আমাকে অবাক করেছে”।

চিত্র: ডিএনএ মডেলের রেপ্লিকার সামনে ওয়াটসন ও ক্রিক।

ওয়াটসন ও ক্রিক ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরির প্রধান স্যার লরেন্স ব্রাগকে অবহিত করেন এবং অনুরোধ করেন তাদের গবেষণাপত্র যেন দ্রুত প্রকাশ করা হয়। স্যার লরেন্স ব্রাগ এর পরই ‘নেচার’ সাময়িকীতে অতিদ্রুত তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে দেন। ইতিহাসে আর মাত্র একবারই নেচার এমন কাজ করেছে, হরগোবিন্দ খোরানা এবং তার সহকারীদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করে।

কিন্তু নেচার যে ঘটনার জন্ম দেয় তা অবিশ্বাস্য এবং অভাবনীয়। নেচার তার ১৯৫৩ সালের এপ্রিল ইস্যুতে প্রথমে ওয়াটসন ও ক্রিকের গবেষণাপত্র এবং তারপর উইলকিন্স ও তার সহকারীবৃন্দের এবং সবশেষে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন ও গোসলিং এর গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। কিন্তু এই ক্রমটা কি আসলেই সঠিক? এর দ্বারা কী বোঝানো হচ্ছে? বোঝানো হচ্ছে যে, ফ্রাঙ্কলিন ও গোসলিং এর গবেষণাপত্রের অবদান ওয়াটসন ও ক্রিকের গবেষণাপত্রে খুব কম বা নেই বললেই চলে।

এরপর যা হয় আর কি, তাবৎ দুনিয়া ফ্রাঙ্কলিনকে ভুলেই গেল আর ওয়াটসন ও ক্রিককে নিয়ে মাতামাতি শুরু করে দিল। আর অন্যদিকে ফ্রাঙ্কলিন ডিএনএ ছেড়ে ভাইরাস গবেষণা নিয়ে মেতে উঠলেন আর তিনি এমন কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার করলেন যার জন্য তিনি মূলত ভাইরাস গবেষক হিসেবেই বিজ্ঞানী মহলে সমাদৃত হতে লাগলেন।

কিন্তু স্বীকৃতি আর বেশি দিন তার ভাগ্যে সহ্য হলো না। ১৯৫৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা বিষয়ক কিছু ভ্রমণের পরপরই উদরের ব্যথা অনুভব করেন এবং শীঘ্রই তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।

চিত্রঃ রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন

ধারণা করা হয়, অতিরিক্ত পরিমাণ এক্স-রে তার শরীরের উপর পড়ার কারণেই তিনি এই রোগে আক্রান্ত হন। ইতিহাসে আর মাত্র একজন বিজ্ঞানীই এরকম অতিরিক্ত পরিমাণ তেজস্ক্রিয় রশ্মির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তিনি পদার্থ ও রসায়নে দুবার নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী মহীয়সী নারী মাদাম কুরী। ১৬ ই এপ্রিল ১৯৫৮, রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন মৃত্যুবরণ করেন। মানবসমাজ তার অন্যতম এক কৃতি সন্তানকে হারায়।

তার সমাধির উপর লেখা আছে, তিনি একজন ভাইরাস গবেষক। কিন্তু হায়, মৃত্যুর আগ পর্যন্তও তিনি জেনে যেতে পারলেন না মানব সমাজকে তিনি কী উপহার দিয়ে গেলেন। নেচার যা করেছে সেটা না হয় কাকতালীয় হতে পারে কিন্ত নোবেল কমিটি কী করলো? ফ্রাঙ্কলিনের মৃত্যুর পর ১৯৬২ সালে ওয়াটসন, ক্রিক ও উইলকিন্সকে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয় molecular structure of nucleic acids and its significance for information transfer in living material”

কিন্তু প্রশ্ন হলো ‘molecular structure of nucleic acids’ এর এই কাজটি কার হাত ধরে সূচনা হয়েছিল? এমন দাবী করা হচ্ছে না যে নোবেল কমিটি তাদের নিয়ম ভঙ্গ করে একজন মৃত ব্যক্তিকে পুরষ্কার দিক। কিন্তু ন্যূনতম যে মর্যাদা সেটা তো ফ্রাঙ্কলিনের প্রাপ্য হতেই পারতো। অবশ্য তিনি মৃত্যুবরণ করে নোবেল কমিটিকে তাদের কাজ অনেকটা সহজই করে দিলেন।

আরেকটি ঘটনার অবতারণা এখানে না করলেই নয়। সেটা হলো ওয়াটসন তার বই ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’ এ ফ্রাঙ্কলিনকে খুবই বাজেভাবে উপস্থাপিত করেছেন এবং ওয়াটসন যখন তার বইটি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশের জন্য পাঠান তখন ক্রিক ও উইল্কিন্সের প্রচণ্ড বিরোধিতার কারণে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা বিভাগ তা প্রত্যাখান করে।

উপায় না দেখে তিনি অন্য প্রকাশনা থেকে দ্রুত তার বইটি প্রকাশ করেন। এ সম্পর্কে উইলকিন্স বলেছেন If there was one of thing that was objectionable in the book, it was his portrayal of Rosalind, it was always silly matter about clothing or something, I thought it was pretty inane and they’re not true to say the least was a very presentable person। বুঝুন তাহলে অবস্থাটা।

কিছু কিছু মানুষ হয়তোবা সারাটা জীবন দেওয়ার জন্যই জন্মগ্রহণ করেন, গ্রহণের জন্য নয়।

“In my view, all that necessary for faith, is the belief that doing our best we should success in our aims. The improvement of mankind.” – Franklin.

তথ্যসূত্র

  1. A Brief History of DNA, Integrated DNA Technologies, 1-6.
  2. Chomet, S. ed. 1993. Genesis of a Discovery: DNA Structure, Newman Hemisphere, London (Accounts of the work at Kings College, London).
  3. DNA’s Double Helix: 50 Years of Discoveries and Mysteries An Exhibit of Scientific Achievement, University of Buffalo Libraries, University of Buffalo, The State University of New York.
  4. Dunn, L.C., 1991. A Short History of Genetics: The Development of Some of the Main Lines of Thought, 1864–1939. Iowa State Univ. Press, Ames.
  5. Klug, A., (2004) The Discovery of the DNA Double Helix, J. Mol. Biol 335, 3-26.
  6. Singer, M.F., 1968. 1968 Nobel Laureate in Medicine or Physiology. Science 162, 433–436.
  7. PBS: The Secret of Photo 51
  8. PBS: The Secret of Life

সৌরমডেলের ক্রমান্বয়িক পরিবর্তন

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বা কোনো কিছুর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে আমাদের ইন্দ্রিয়ের সাহায্য নিতে হয়। পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে কোনোকিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হলে আমরা তাকে বলি ‘বাস্তব’। কোনো কিছু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অস্তিত্ব সম্পন্ন হলে তাকে সত্যিকার জিনিস বা সত্যিকার ঘটনা বা বাস্তবতা বলে ধরে নেয়া হয়। যেমন শব্দ বাস্তব, কারণ তা শুনতে পাই। তেঁতুল টক, কারণ তার স্বাদ নিতে পারি। পাতার রঙ সবুজ, কারণ তা দেখতে পাই।

তবে সবসময় সবকিছু ইন্দ্রিয়ে ধরা দেয় না। ধরা না দিলেও তারা বাস্তব বা সত্য হবার দাবী রাখে। যে সকল ক্ষেত্রে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারে না সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা মডেলের সাহায্য নেন।

আশেপাশের বাস্তব জগতের কোনো একটা ক্ষেত্রে কী ঘটে চলছে তার একটা সুচিন্তিত মতামতই হচ্ছে মডেল। আমরা হয়তো সচরাচরই ভাবি আমাদের আশেপাশের এখানটাতে কী হচ্ছে ঐখানটাতে কী ঘটে চলছে। চুলগুলো কীভাবে লম্বা হচ্ছে, নখগুলো কীভাবে বড় হচ্ছে। মনে মনে কিছু একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করি। এই ব্যাখ্যাটাই হচ্ছে মডেল।

এই মডেল সঠিকও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে। একজনের দেয়া মডেল পরবর্তীতে অন্যজন ভুল প্রমাণ করতে পারে। আজকে যে মডেল সঠিক বলে ধরে নেয়া হয়েছে আগামীতে সেটা বাদ যেতে পারে।

চিত্রঃ পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে বাস্তবতা সম্বন্ধে জানা যায়।

মডেলের এরকম নাটকীয় গ্রহণ-বর্জন-পরিবর্তন ঘটেছে সৌরজগতের ক্ষেত্রে। প্রাচীনকাল থেকেই অনেক বিজ্ঞানী অনেকভাবে সৌরজগৎকে ব্যাখ্যা করার জন্য অনেক রকমের মডেল প্রদান করেছেন। তাদের কারো কারোটা ছিল যৌক্তিক, কারো কারোটা ছিল আংশিক যৌক্তিক আবার কারো কারো দেয়া মডেল ছিল একদমই অযৌক্তিক।

সুদূর প্রাচীনকালে মননশীল সত্ত্বার বিকাশের সময় থেকেই মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়েছে, তারাখচিত রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করেছে এবং আকাশজগতকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। আকাশকে ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা হিসেবে সৌরজগৎ তথা বিশ্বজগতের গঠন বর্ণনা করতে বিভিন্ন রকমের মতবাদ বা মডেল প্রদান করেছে সময়ে সময়ে।

সেসব মডেলই যুগ যুগ ধরে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হতে হতে বর্তমান উন্নত অবস্থানে এসেছে। সেই এরিস্টার্কাস-টলেমীর যুগ থেকে শুরু করে বর্তমানে এডুইন হাবল-এলান গুথ পর্যন্ত। যেন ছলনাময়ীর মতো বিশ্বজগতের মডেল কিছুদিন পরপরই তার রূপ পাল্টায়। আজকে সৌরজগতের মডেলের ক্রমান্বয়িক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা রইলো।

প্রাচীন যুগ

প্রাচীন মানুষের বিশ্বাস ছিল তাদের বসবাসের পৃথিবী হচ্ছে সমগ্র বিশ্বজগতের কেন্দ্র। সূর্য সহ অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রগুলো পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। নিজেদের বসবাসের স্থলকে কেন্দ্রে রাখার পেছনে কাজ করেছে মানুষের স্বভাবজাত সেরা হবার প্রবণতা। তখনকার মানুষের একটা অলিখিত নিয়ম ছিল বৃত্তাকার যেকোনো জিনিসই সুন্দর এবং বৃত্তের মাঝে সেরা অংশটি হচ্ছে তার কেন্দ্র। কেন্দ্রই মুখ্য আর কেন্দ্রের বাইরের সমস্ত এলাকা গৌণ।

তার উপর মানুষ নিজেকে প্রাণিজগতের সেরা সৃষ্টি বা দেবতাদের সেরা কৃপা বলে মনে করতো। জাগতিক সবকিছুই সেরা জিনিসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে এটা সাধারণ যুক্তির কথা। এখনো মানুষ নিজেকে সৃষ্টির সেরা হিসেবে ভাবে। আশরাফুল মাখলুকাত নামে চমৎকার একটি টার্মও আছে মানুষকে ঘিরে।

যদিও বিজ্ঞানের দিক থেকে মানুষ সব দিক থেকে সেরা নয়। মানুষের কিছু কিছু দিক আছে উন্নত আবার কিছু কিছু দিক আছে অনুন্নত। কোনো ঘটনা, সময় বা অবস্থানের প্রেক্ষিতে মানুষ সেরা আবার কোনো ঘটনা, সময় বা অবস্থানের প্রেক্ষিতে মানুষের শারীরিক গঠন ও মনন নিম্ন পর্যায়ের। যা হোক এটা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। তবে এটা সত্য যে মানুষ সব সময়ই নিজেকে সেরা হিসেবে ভেবে এসেছে এবং নিজেকে সেরা ভাবতে স্বছন্দ বোধ করে।

নিজেকে সেরা মনে করার প্রভাব থেকে মানুষ নিজেই নিজেদের বসিয়ে দিয়েছে বিশ্বজগতের কেন্দ্রে। কারণ নিজেরা কেন্দ্রে না থাকলে কিংবা অন্য কোনো কিছুকে কেন্দ্রে রেখে নিজেরা বাইরে থেকে ঘুরলে সেটা একদমই মর্যাদাহানিকর ব্যাপার। মহাজাগতিক মান সম্মান বলে কথা!

এরিস্টার্কাস থেকে টলেমী

এতসব প্রভাবের মাঝে থেকেও তখনকার কিছু পর্যবেক্ষণ-দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের নাম শোনা যায়। তাদের একজন এরিস্টার্কাস (খ্রি. পূ. ৩১০-২১০)। এই আয়োনিয়ান (গ্রীক) বিজ্ঞানী খ্রিষ্টের জন্মের অনেক আগেই বলেছিলেন পৃথিবী বিশ্বজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত নয়।

ঐতিহাসিক বিবেচনায় ধারণাটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। এর জন্য তিনি একটি চন্দ্রগ্রহণকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের উপর পৃথিবীর ছায়ার আকার নির্ণয় করে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তের সাহায্যে সিদ্ধান্তে আসেন, সূর্য পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড়। ছোট জিনিস সবসময়ই বড় জিনিসকে কেন্দ্র করে ঘুরে। যেহেতু সূর্য বড় এবং পৃথিবী ছোট তাই পৃথিবী বিশ্বজগতের কেন্দ্র হতে পারে না।

চিত্র: এরিস্টার্কাস

শুধু তাই নয়, তিনি এও ধারণা করেছিলেন, রাতের আকাশে আমরা যে তারাগুলো দেখি সেগুলো দূরবর্তী সূর্য ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের সূর্য পৃথিবী থেকে অনেক বড়, কিন্তু দূরে অবস্থান করার কারণে ছোট থালার সমান বলে মনে হয়। তেমনই তারাগুলোও হয়তো এতটাই বেশি দূরে অবস্থান করছ যে অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও ক্ষুদ্র বিন্দু বলে মনে হয়। এরিস্টার্কাসের অনুমান আজকের আধুনিক মহাকাশবিদ্যার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এত প্রাচীনকালে কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়া এমন সিদ্ধান্তে আসা সত্যিই একটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

এরপর উল্লেখ করা যায় গণিতবিদ টলেমীর (আনুমানিক ৮৫-১৬৫) কথা। প্রাচীন মিশরের জ্ঞানের রাজধানী ছিল আলেক্সান্দ্রিয়া। আলেক্সান্দ্রিয়ার গণিতবিদ ছিলেন টলেমী। টলেমী বিশ্বজগৎ সম্বন্ধে তার করা পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক হিসাব নিকাশ থেকে বলেন, বিশ্বজগতের কেন্দ্র হলো আমাদের পৃথিবী। পৃথিবীর চারপাশেই ঘুরছে বিশ্বজগতের সবকিছু। ভুল হোক বা সঠিক হোক তিনি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণে চমৎকার একটি কাজ করেছিলেন। বিশ্বজগৎ নিয়ে তিনিই প্রথম একটি মডেল তৈরি করেন।

যদিও তার মডেলে পৃথিবী ছিল কেন্দ্রে কিন্তু তারপরেও এটি মডেল এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষায় মডেল গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। পরে হয়তো কোনো মডেল ভুল প্রমাণিত হতে পারে কিন্তু তার মতবাদের সাথে গাণিতিক যুক্তি কিংবা সৌরজগতের অনুমান নির্ভর একটি রেপ্লিকা (প্রতিলিপি) তৈরি করেছিলেন। তার এই মডেলটি পৃথিবীকেন্দ্রিক মডেল বা geocentric model নামে পরিচিত।

চিত্র: টলেমী ও টলেমীর মডেলের রেপ্লিকা। ছবি: westsea.com

উল্লেখ্য, টলেমীর এই মডেলটি ছিল অনেক ঝামেলাপূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। জটিল গাণিতিক হিসাব নিকাশে ভরা। এই মডেল দূরবর্তী তারকাগুলো আসলে কী তার সামান্য ধারণাও দিতে পারে না। এই মডেলে তিনি সকল তারাগুলোকে একত্রে একটি স্তর কল্পনা করেছিলেন এবং সেটিই ছিল বিশ্বজগতের সর্বশেষ স্তর। তারাগুলো ঐ স্তরে থেকেই নিজেরা নিজেদের মাঝে অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। তবে কখনোই অন্য স্তরে যেতে পারে না। আর তারকা স্তরের সকলটা ছিল ফাঁকা স্থান।

চিত্রঃ টলেমীর দৃষ্টিতে বিশ্বজগৎ। এই মডেলে তারার স্তর ছিল বিশ্বজগতের সর্বশেষ সীমা। 

আরো উল্লেখ্য, টলেমীর এই মডেল চার্চ মেনে নিয়েছিল এবং ধর্মীয় সমর্থন পেয়েছিল। মেনে নেবার কারণ এই মডেল বিশ্বজগৎ সম্বন্ধে বাইবেলের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন দেয়। তারার সর্বশেষ স্তরের বাইরে স্বর্গ ও নরকের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা পাওয়া যায়, যা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে খুব দরকারি। ধর্মের প্রতি মানুষের স্বভাবজাত শ্রদ্ধা থাকাতে এবং এই মডেল ধর্মের সমর্থন পাওয়াতে এটি পরবর্তীতে অনেক বছর পর্যন্ত টিকে রয়েছিল।

কোপার্নিকান যুগ

নাম করা যায় একজন বিজ্ঞানীর যিনি অনুমান এবং কল্পনাকে পাশ কাটিয়ে পর্যবেক্ষণের আলোকে বলেছিলেন পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র নয়। সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে না বরং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। ষোড়শ শতাব্দীর এই বিজ্ঞানীর নাম নিকোলাস কোপার্নিকাস। তার দেয়া মতবাদ প্রথম থেকেই বাধার সম্মুখীন হয়। তাদের বক্তব্য ছিল নিজের চোখে এবং খোলা চোখেই তো দেখা যাচ্ছে সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। তাহলে কেন বলবো সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্র?

আর যদি পৃথিবীই ঘুরবে তবে তো ঘূর্ণনের ফলে তার বায়ুমণ্ডল মহাশূন্যে হারিয়ে যাবার কথা। তার উপর যদি পৃথিবীই ঘুরে থাকে তবে তো পাখিরা বাসা ছেড়ে উড়ে যাবার পর বাসায় আর ফিরে আসতে পারতো না। হারিয়ে যেতো। পৃথিবী যদি ঘুরে তবে তার সাথে সাথে গাছপালাও ঘুরবে। গাছপালার সাথে সাথে পাখির বাসাও ঘুরবে। তবে কীভাবে পাখিরা তাদের বাসায় ফিরে যায়? শুধুমাত্র পৃথিবী স্থির থাকলেই এরকমটা সম্ভব।

চিত্র: কোপার্নিকাস

তখন পর্যন্ত এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়নি যে, বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর অভিকর্ষে বাধা এবং পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে সাথে বায়ুমণ্ডলও ঘুরছে। বায়ুর স্তরের পরে আছে শূন্যস্থান। শূন্যস্থানে কোনো কিছুর সংঘর্ষ হবার প্রশ্নই আসে না সেটা বায়ু হোক আর যাই হোক। সংঘর্ষ না হলে বায়ুর মহাশূন্যে হারিয়ে যাওয়াটাও অযৌক্তিক। বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর সাথে সাথেই ঘুরছে। এর সাথে ঘুরছে পাখিরাও। তবে তাদের হারিয়ে যাবার প্রশ্ন কেন?

তাদের বিপক্ষে কোপার্নিকাসের যুক্তি কী ছিল? তিনি আঙুল তুলেছিলেন, যদি পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র হয় তবে কেন বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঋতু দেখা যায়? এবং কেন ঠিক এক বছর পর পর একই ঋতু ফিরে আসে? সূর্য যদি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতো তাহলে এরকমটা পাওয়া যাবার কথা নয়। এরকমটা ব্যাখ্যা করা যায় সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর বার্ষিক গতির মাধ্যমে। অর্থাৎ এই সমস্যার সহজ সমাধান পাওয়া যায় যদি ধরে নেয়া হয় পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।

কোপার্নিকাসের সময়কালে চার্চের বিরুদ্ধে যায় এমন কথা উচ্চারণ করা ছিল মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সমতুল্য। তাই কোপার্নিকাস তার সৌর-মডেল বিষয়ক বইটি প্রকাশ করেছিলেন কথোপকথন আকারে। চার্চের রোষের মুখে যেন না পড়েন সেজন্য বইটি উৎসর্গ করে দেন চার্চের একজন পাদ্রিকে।

বইয়ের কথোপকথনে সূর্যকেন্দ্রীক সৌরজগতে বিশ্বাসী ব্যক্তির তুখোড় যুক্তিতে পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতে বিশ্বাসী ব্যক্তি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। বইটি প্রকাশ করেছিলেন তার জীবনের একদম শেষ পর্যায়ে। যখন বইটি মুদ্রিত হয়ে তার হাতে এসেছিল তখন তিনি বার্ধক্যের শয্যায়। বইটি কয়েকবার নাড়াচাড়া করে দেখতে পেরেছিলেন মাত্র। এর পরপরই তিনি পরলোকগত হন।

চিত্র: জাদুঘরে সংরক্ষিত কোপার্নিকাসের বই।

চার্চের প্রবল প্রতাপের সময় বইটি যিনি প্রকাশ করেছিলেন তার সাহস আছে বলা যায়। তবে এখানে প্রকাশক একটা কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। কথিত আছে, প্রকাশক বইয়ের শুরুতেই বলে দিয়েছিলেন, বইয়ে ব্যবহৃত তত্ত্বগুলো সত্য নয়! এই তত্ত্বগুলোর মাধ্যমে সৌরজগতকে সহজে ব্যাখ্যা করা যায়। জটিলতার পরিমাণ কমে যায়। অপেক্ষাকৃত সহজে ব্যাখ্যা করা যায় বলে এটি প্রকাশ করা হলো। বাস্তবের সাথে এর কোনো মিল নেই।

টলেমীর মডেল প্রায় ১২০০ বছর পর্যন্ত টিকে ছিল। কোপার্নিকাসই প্রথম এর বাইরে গিয়ে মতবাদ প্রদান করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে সৌরজগতের গঠন ব্যাখ্যায় গাণিতিক মডেলসহ তার তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। টলেমীর মডেল যেখানে অনেক জটিলতায় পূর্ণ ছিল সেখানে কোপার্নিকাসের মডেল ছিল অপেক্ষাকৃত সরল। তার দেয়া তত্ত্বটি Heliocentrism নামে পরিচিত। হিলিয়াস অর্থ সূর্য (গ্রিকদের দেবতা), আর সেন্টার অর্থ কেন্দ্র। দুটি মিলে হেলিওসেন্ট্রিজম শব্দের অর্থ হয় সূর্যকেন্দ্রিক।

যাহোক, কোপার্নিকাস মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি যদি জীবিত থাকতেন বা তার জীবনের মাঝামাঝিতে বইটি প্রকাশ করতেন তাহলে গ্যালিলিওর মতো তাকেও অপমানের শিকার হতে হতো। নিজের দাবীগুলোকে ভুল বলে স্বীকার না করলে বা ক্ষমা না চাইলে হয়তোবা জিওর্দানো ব্রুনোর মতো তাকেও পুড়িয়ে মেরে ফেলা হতো।

উল্লেখ্য, কোপার্নিকাসের মডেলেও ত্রুটি ছিল। তার মডেল অনুসারে পৃথিবী সহ সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো বৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরছে। কিন্তু আদতে গ্রহগুলো বৃত্তাকারে নয়, উপবৃত্তাকারে ঘুরছে। সত্যি কথা বলতে কি, তখনকার সময়ে উপবৃত্তের ধারণা এখনকার মতো এতটা প্রতিষ্ঠিত ছিল না। ঐ সময়ে বৃত্তাকার যেকোনো জিনিসকেই সুন্দর বলে মনে করা হতো।

কোনো কিছু বৃত্তাকার, তার মানে হলো এটি সুন্দর ও সুস্থিত। পৃথিবীর গতিপথ উপবৃত্তাকার হতে পারে এই ভাবনাটাই আসেনি তখন। কোপার্নিকাস প্রথা বা প্রভাবের বাইরে গিয়ে বিপ্লবী একটা কাজ করে ফেলেছিলেন, কিন্তু এই তিনিই বৃত্তাকারের প্রভাবের বলয় থেকে বের হতে পারেননি।

চিত্রঃ কোপার্নিকান বৃত্তাকার মডেল। ছবিঃ chronozoom.com

টাইকো ব্রাহে ও কেপলারের যুগ

পরবর্তীতে সৌরমডেলে সর্বপ্রথম উপবৃত্তের ধারণা নিয়ে আসেন ডাচ বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার (১৫৭১-১৬৩০)। কেপলার ছিলেন জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহের শিষ্য। টাইকো ব্রাহে ছিলেন খুব গোছালো মানুষ। তিনি তার জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত সকল পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করে রাখতেন।

তার ব্যক্তিগত একটি মানমন্দির ছিল। বোঝাই যায় পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি কী তখনকার সময়ে কী পরিমাণ সুবিধা পেয়েছিলেন। একটু সন্দেহবাতিকও ছিলেন, তার করা পর্যবেক্ষণগুলো কেপলারকে দিতে চাইতেন না, লুকিয়ে রাখতেন। আবার অন্যদিকে কেপলারকে ছাত্র হিসেবে পেতেও চাইতেন, কারণ কেপলার মেধাবী।

১৬০১ সালে হঠাৎ করে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে টাইকো ব্রাহের মৃত্যু হয়। এর ফলে লিপিবদ্ধ পর্যবেক্ষণগুলো কেপলারের হাতে আসে। কেপলার দেখতে পান মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথের যেসব পর্যবেক্ষণ আছে তা কিছুতেই বৃত্তাকার কক্ষপথের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। তারপর আরো পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্ত নিলেন পৃথিবী ও সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে। গ্রহদের এই ঘূর্ণন সংক্রান্ত ৩ টি সূত্রও প্রদান করেন। একদম পাক্কা আধুনিক বিজ্ঞানীর মতো কাজ। কোনো ঘটনা গাণিতিকভাবে প্রমাণ হয়ে গেলে তাকে আর সহজে বর্জন করা যায় না।

এখানেও উল্লেখ্য যে, কেপলার বিশ্বাস করতেন গ্রহগুলোর অনুভূতি ও চেতনা আছে। অর্থাৎ এদের প্রাণ আছে। এরা কোনো এক সত্তার আদেশে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। গ্রহগুলো কেন ঘুরছে এবং কোনো শক্তির প্রভাবে ঘুরছে সে ব্যাখ্যা কেপলার দিতে পারেনি।

নিউটন-আইনস্টাইনের যুগ

পরবর্তীতে পদার্থবিজ্ঞানী বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন তার মহাকর্ষ সূত্রে এর কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। নিউটন তার মহাকর্ষ সূত্রের মাধ্যমে কেন এবং কীভাবে গ্রহগুলো সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। পরবর্তীতে দেখা গেল তার দেয়া মহাকর্ষের সূত্র সৌরজগতের বাইরে অন্যান্য গ্রহের কক্ষপথের বেলায়ও সঠিক। এই সূত্রের সাহায্যে জোয়ার-ভাটার কারণ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করা যায়। এমনকি এর সাহায্যে পৃথিবীতে বসেই চাঁদের ঘূর্ণন বেগ বের করেছিলেন নিউটন।

চাঁদ কেন ঝুলে আছে? চাঁদ কেন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে? বস্তুগুলো যদি পারস্পরিকভাবে একে অপরকে আকর্ষণ করে তাহলে চাঁদ কেন পৃথিবীর আকর্ষণে পড়ে যাচ্ছে না? তিনি হিসাবের মাধ্যমে দেখালেন চাঁদ আসলে পৃথিবীতে পড়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর আকর্ষণের কারণে সর্বদাই পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই বল ও বেগের পাশাপাশি চাঁদে আরো একটি বেগ কার্যকর।

চাঁদ পৃথিবী থেকে বহির্মুখী একটা বলে সর্বদা পৃথিবী থেকে বাইরের দিকে ছুটছে। সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহ যখন তৈরি হয় কিংবা মহাজাগতিক সংঘর্ষে পৃথিবীর পাশে চাঁদ যখন তৈরি হয় তখন থেকেই বাইরের দিকে এই বেগ কার্যকর ছিল। চাঁদের উপর পৃথিবীর আকর্ষণ বল এবং বাইরের দিকে বহির্মুখী বল পরস্পর কাটাকাটি যাচ্ছে। কাটাকাটি যাবার ফলে এটি একূল ওকূল না গিয়ে চারপাশে ঘুরছে।

চাঁদের ঘূর্ণন বেগ কত হলে তা পৃথিবীর আকর্ষণ দ্বারা নাকচ হতে পারে তা অংকের মাধ্যমে হিসাব করে বের করলেন নিউটন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো পরবর্তীতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পরিমাপকৃত বেগের সাথে তার নির্ণয় করা বেগ প্রায় মিলে যায়। একেই বলে গণিতের শক্তি। বেশিরভাগ সময়েই গণিত অকাট্য হয়।

নিউটনের তত্ত্ব এখনো নির্ভুলভাবে আছে। এখনো পড়ানো হয় দেশে দেশে বিজ্ঞানের সিলেবাসে। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে হলেও সার্বিক বিবেচনায় নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব তার নির্ভুলতা হারায়। মহাকর্ষকে নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য পরবর্তীতে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তার আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব (General Theory of Relativity) প্রদান করেন।

আইনস্টাইনের তত্ত্বটি জটিল হলেও এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে নির্ভুল তত্ত্ব। এই তত্ত্ব প্রদান করার পর অনেকবার এর সত্যতা যাচাই করে দেখা হয়েছিল। সকল ক্ষেত্রেই এর নির্ভুলতা প্রমাণিত হয়েছে।

আধুনিক যুগ

এরপর চলে আসে মহাবিশ্বের উৎপত্তি প্রসঙ্গ। ইতিহাসের সমস্ত সময় জুড়েই ছিল ঐশ্বরিক ধারণার প্রভাব। দেব-দেবতারা মানুষের জন্য জগৎ সৃষ্টি করে দিয়েছে এবং মানুষ এতে বসবাস করছে এর বাইরে যাওয়া বলতে গেলে অসম্ভবই ছিল। এর মানে হচ্ছে আজকে আমরা মহাবিশ্বকে যেমন দেখছি একশো বছর এক হাজার বছর এক লক্ষ বছর আগেও এরকমই ছিল। আজ থেকে শত হাজার লক্ষ বছর পরেও এরকমই থাকবে। মহাবিশ্বের এরকম ধারণার নাম স্টিডি স্টেট মহাবিশ্ব।

এর বাইরে চিন্তাভাবনা করা উচ্চ ও আধুনিক দার্শনিকতার দাবী রাখে বলে ইতিহাসের প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই স্থিতিশীল মহাবিশ্ব জায়গা করে নিয়েছিল। কারণ এর বাইরে চিন্তা করতে গেলে পর্যবেক্ষণ পরীক্ষা নিরীক্ষা তথ্য উপাত্ত লাগবে। আধুনিক টেলিস্কোপ ছাড়া এরকম ভাবনা নিয়ে খেলা করা তো প্রায় অসম্ভবই বলা যায়।

পরবর্তীকালে বিগ ব্যাং তত্ত্বের মাধ্যমে এর গণ্ডি ভাঙে। প্রায় একশত অনেক আগে থেকেই বিগ ব্যাং তত্ত্ব প্রচলিত ছিল, কিন্তু কারো নজর তেমন কাড়েনি। পরবর্তীতে এডুইন হাবল তার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এর সত্যতা খুঁজে পান। এরপর রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যায় এই তত্ত্বটি।

বিগ ব্যাং থিওরি বা মহা বিস্ফোরণ তত্ত্ব মতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল ক্ষুদ্র বিন্দুবৎ অবস্থা থেকে। বিস্ফোরণের ফলে এটি প্রসারিত হয়। প্রসারিত হতে হতে অনেক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আজকের এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে আবার এই অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যাবে।

বর্তমান কালের জনপ্রিয় বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তার ‘কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (A Brief History Of Time)’ বইতে বিগ ব্যাং থিওরির উপর যুক্তি দিয়েছেন। সাম্প্রতিক কালে NASA কর্তৃক উৎক্ষেপিত হাবল টেলিস্কোপের পাঠানো বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও ছবি বিগ ব্যাং থিওরির সত্যতা প্রমাণ করে যাচ্ছে। বিগ ব্যাং থিওরিই সর্বপ্রথম প্রসারমাণ মহাবিশ্ব সম্বন্ধে ধারণা প্রদান করে আমাদের।

তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। বিগ ব্যাং তত্ত্ব প্রদান করার পর থেকে মহাবিশ্বকে ভালোভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারছিল। এবং এর সত্যতার পেছনে সমর্থন দেবার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য-প্রমাণও আছে। তবে প্রচুর তথ্য-প্রমাণ ও সমর্থন থাকলেও তা সকল প্রশ্ন বা সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। যেমন মহাবিশ্বের একদম প্রাথমিক পর্যায়ে অতি-ছোট বিন্দুবৎ অবস্থায় থাকার সময়ের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না বিগ ব্যাং তত্ত্বের মাধ্যমে।

যখন থেকে বিগ ব্যাং তত্ত্বের এই সীমাবদ্ধতা ধরা দেয় তখন থেকেই এর বিকল্প তত্ত্ব অনুসন্ধান শুরু হয়। সময়ে সময়ে মহাবিশ্বকে পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য বেশ কয়েকটি জটিল তত্ত্ব প্রস্তাবও করা হয়। এর মাঝে একটি হচ্ছে ‘বিগ বাউন্স তত্ত্ব’।

এই তত্ত্ব আজ থেকে অনেক আগেই প্রস্তাবিত হয়েছিল। তবে প্রস্তাবিত হলেও যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষক এটি নিয়ে কাজ করে একে অধিকতর উপযুক্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং বলছেন মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য এটি বিগ ব্যাং এর চেয়েও বেশি কার্যকর।

এই তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্ব কোনো একটি বিন্দুবৎ অবস্থা থেকে বিস্ফোরণের মাধ্যমে তৈরি হয়নি। মহাবিশ্ব চিরকালই অস্তিত্ববান ছিল। এই তত্ত্ব শুনতে অনেকটা স্থির মহাবিশ্ব তত্ত্বের মতো হলেও এটি স্থির মহাবিশ্বকে বাতিল করে দেয়।

এই তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্ব সংকোচন ও প্রসারণের চক্রের মাধ্যমে চলছে। অনেকটা বেলুনের মতো, খুব স্থিতিস্থাপক কোনো বেলুনকে ফোলালে ফুলতে ফুলতে একসময় তা ক্রান্তি অবস্থানে এসে পৌঁছাবে। তারপর অল্প অল্প করে বাতাস চলে যেতে দিলে তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হবে।

সর্বনিম্ন পরিমাণ সংকোচনের পর তা আবার প্রসারিত হওয়া শুরু করবে। বিগ বাউন্স অনুসারে মহাবিশ্ব অনেকটা এরকমই। চক্রাকারে সংকুচিত হচ্ছে এবং প্রসারিত হচ্ছে। যখন সংকোচনের ক্রান্তি পর্যায়ে চলে আসে তখন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কিছু নিয়মের প্রভাবে আরো সংকোচিত হয়ে ক্ষুদ্র বিন্দু বা সিঙ্গুলারিটি তৈরি করতে পারে না। ঐ অবস্থান থেকে আবার প্রসারণ শুরু হয়ে যায়।

চিত্র: বিগ ব্যাং তত্ত্বের বিকল্প হিসেবে বিগ বাউন্স তত্ত্বকে ভাবা হচ্ছে।

পরিশিষ্ট

এখানে আরো একজন মহান বিজ্ঞানীর কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি হলেন গালিলিও গ্যালিলি। তিনিই নভো দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা টেলিস্কোপ নির্মাণ করেছিলেন, আজ থেকে ৪০০ বছর আগে ১৬০৯ সালে। নতুন তৈরি করা টেলিস্কোপ চোখে লাগিয়ে দেখতে লাগলেন চাঁদ, সূর্য ও অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্র।

এর সাহায্যে চাঁদের বুকে পাহাড়-পর্বত ও নানা রকম খানাখন্দ দেখতে পেলেন। সূর্যের গায়ে খুঁজে পেলেন কালো কালো দাগ। ১৬১০ সালে বৃহস্পতি গ্রহ পর্যবেক্ষণের সময় দেখতে পেলেন চারটি বস্তু। এগুলো বৃহস্পতির চাঁদ (উপগ্রহ) এবং এরা বৃহস্পতির চারপাশে ঘুরছে।

তখনো পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের ধারণাই প্রবল ছিল। কিন্তু তিনি তো নিজের চোখে দেখলেন সবকিছু পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে না। বৃহস্পতি এর জ্বলন্ত প্রমাণ। তাই তার পর্যবেক্ষণের কথা জানালেন সবাইকে। আর সবাই কেন তার কথা মেনে নিবে? ফলে সকলে বলতে লাগলো, গ্যালিলিও নামের এই লোকটা মাথায় ছিট আছে। হয়তো মানসিক সমস্যায় পড়ে এসব উল্টাপাল্টা জিনিস দেখছে।

তাদেরকে ডেকে এনে টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে দেখালে তারা বলে হয়তো যন্ত্রের মাঝে সমস্যা আছে। চাঁদের মতো সুন্দর জিনিসে খানাখন্দ খালবিল পাহাড় পর্বত কীভাবে থাকবে? সূর্যে কালো দাগ থাকা মানে তো কলঙ্ক হয়ে যাওয়া।

তার এই মতবাদে রোমান ক্যাথলিক চার্চ খুবই নাখোশ হয়। চার্চ তার এই মতবাদ তো গ্রহণ করেইনি উপরন্তু বৃদ্ধ বয়সে গ্যালিলিওকে অমানুষিক শাস্তি দিয়েছিল। জোর করে তাকে বলিয়েছিল এর সব মিথ্যা। নিজ মতামতকে মিথ্যা বলতে এবং বাইবেলের সাথে সামঞ্জস্য নয় এমন কথা বলাতে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য তাকে বাধ্য করা হয়েছিল। বাধ্য না হলে হয়তো তার গর্দান চলে যেত কিংবা তাকে পুড়িয়ে মারা হতো।

কথিত আছে প্রহসন মূলক ক্ষমা প্রার্থনার নাটক ও শাস্তির পর অসুস্থ গ্যালিলিও বিড়বিড় করে বলেছিলেন ‘Eppur si muove’। এর বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘কিন্তু এটি (পৃথিবী) এখনো ঘুরছে।’। অর্থাৎ আমি নিজেও যদি মুখে হাজার বার বলি ‘পৃথিবী স্থির’ তারপরও এটি ঘুরেই চলবে।

কালের প্রবাহে কালের মঞ্চে অনেক নাটকই প্রদর্শিত হয়। কালের শত শত বছরের অতিক্রমের পর দেখা যায় প্রায় ২৮০ বছর পর ১৯৯২ সালে ক্যাথলিক চার্চ স্বীকার করেছে, গ্যালিলিও নির্দোষ ছিলেন। গ্যালিলিওকে দোষী সাব্যস্ত করাটা ভুল ছিল। চার্চ যে এর জন্য তাদের ভুল স্বীকার করেছে এটাই তো অনেক কিছু। এরকম প্রতিষ্ঠান থেকে এরকম কিছু আশা করা যায় না সচরাচর।

চিত্র: গ্যালিলিও

প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা বলা দরকার। আগে ল্যাটিন ছিল আভিজাত্যের ভাষা। ল্যাটিন ছাড়া অন্য ভাষায় কেউ লিখলে তাকে ভালো লেখক বলে গণ্য করা হতো না। গ্যালিলিওই প্রথম পণ্ডিতদের ভাষা ল্যাটিনকে বর্জন করে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা লিখেছিলেন। আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটা গুরুত্বপূর্ণ একটা বার্তা। বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চা অন্য ভাষার মতো বেশি একটা হয় না। ছাত্ররা বাংলায় লেখা বিজ্ঞান বইয়ের অভাব অনুভব করে। এর জন্য বাংলা ভাষায় প্রচুর বিজ্ঞান চর্চা দরকার।

তবে আশার কথা বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা দিন দিন বেড়ে চলছে। এই ধারায় চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে সত্যিই সমৃদ্ধ হয়ে যাবে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা। অন্তত গাণিতিক বাস্তবতা তা-ই বলে।

তথ্যসূত্র

  1. মহিমান্বিত নকশা (The Grand Design), স্টিফেন হকিং ও লিওনার্ড ম্লোডিনো, (অনুবাদ আশরাফ মাহমুদ), রাত্রি প্রকাশনী।
  2. আবিষ্কারের নেশায়, আব্দুল্লাহ আল-মুতী, অনুপম প্রকাশনী।
  3. ইউডক্সাসের গোলক ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, শুদ্ধস্বর, ২০১৩
  4. মহাকাশে কী ঘটছে, আব্দুল্লাহ আল-মুতী, অনুপম প্রকাশনী।
  5. বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী (The 100), মাইকেল এইচ. হার্ট।
  6. বিগ ব্যাং নাকি বিগ বাউন্স, বিজ্ঞান পত্রিকা
  7. http://sciencelearn.org.nz/Contexts/Satellites/Looking-Closer/Our-solar-system-revolutionary-ideas
  8. http://www.tiki-toki.com/timeline/entry/76343/Astronomy-Model-Timeline/
  9. https://en.wikipedia.org/wiki/Copernican_Revolution

featured image: orcadian.co.uk

কেওস থিওরিঃ বিশৃঙ্খলাই যেখানে শৃঙ্খলার পরিচায়ক

শুরুতেই একটি বাস্তব দৃশ্যপট কল্পনা করুন। মাসুদ সাহেব প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। হাতমুখ ধুয়ে একটু শরীরচর্চা করেন, নাস্তা খান, এরপর অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হন। নিত্যদিনের মতো আজও তিনি সব কাজ সেরে নাস্তা করতে বসেছেন কিন্তু বসেই তার মেজাজ গেল বিগড়ে। উনার স্ত্রী অন্যমনস্ক থাকায় নাস্তার রুটি পুড়ে গেছে।

পোঁড়া কালো রুটি দেখে উনার মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠল। এই রাগ তিনি কিছুক্ষণ ঝাড়লেন স্ত্রীর উপর। স্ত্রীও কম যান না, সামান্য ব্যাপার নিয়ে মাসুদ সাহেবের বাড়াবাড়ি দেখে উনিও রাগ করে তখনই ব্যাগ গুছিয়ে চলে গেলেন তার ভাইয়ের বাসায়। অনেকদিন ধরেই স্ত্রীর সাথে বনিবনা হচ্ছিলো না, তাই মাসুদ সাহেবও চললেন তার এক আইনজীবী বন্ধুর বাসায়। এবারে ডিভোর্সটা দিয়েই ছাড়বেন তিনি।

উল্লেখিত দৃশ্যপটের শুরুটা ছিল পুড়ে যাওয়া রুটি নিয়ে। এবং সেটি শেষ হলো একজন স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পরিকল্পনার মাধ্যমে। গণিতের ভাষায় এই ঘটনাকে বলে কেওস (Chaos) বা বিশৃঙ্খলা। আর এ ধরনের বিশৃঙ্খলাকে ব্যাখ্যা করে যে তত্ত্ব, তার নাম কেওস থিওরি।

মার্কিন গণিতবিদ এডওয়ার্ড লরেঞ্জ এই থিওরির প্রতিষ্ঠাতা। কেওস থিওরি অনুসারে পৃথিবীর প্রতিটি বস্তু ও ঘটনা পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। কোনো একটি বিষয়ের সামান্য পরিবর্তনের ফলে অন্য একটি বিষয়ে ব্যাপক পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।

এই থিওরি বলে, কোনো স্থানে প্রজাপতির পাখা ঝাপটানোর মতো অতি সামান্য একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেই স্থান থেকে বহু দূরে টর্নেডোর মতো ভয়ানক দুর্যোগ পর্যন্ত সৃষ্টি হতে পারে। আবহাওয়া, দুর্ঘটনা, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি বিশৃঙ্খল ঘটনা। এ ধরনের ঘটনাকে সাধারণত গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রে ফেলা যায় না। যে সকল ঘটনা সম্পর্কে আপনি অংক কষে সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎবাণী করতে পারবেন না, কেওস থিওরির মাধ্যমে এ ধরনের অনিয়মিত ঘটনাকে ব্যখ্যা করা যায়।

একটি বিশৃঙ্খল সিস্টেমের দুই ধরনের রূপ থাকে। আপাতদৃষ্টিতে তারা অনিয়মিত আচরণ প্রদর্শন করলেও মূল ঘটনাগুলোকে আপনি চাইলেই ঘড়ির কাঁটার মতো চক্রাকারে ঘূর্ণায়মান একটি সমীকরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। আবার এর ঠিক উল্টোটাও ঘটতে পারে, একগুচ্ছ শৃঙ্খলাবদ্ধ ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে ছোট ছোট অসংখ্য বিশৃঙ্খলা। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন কেন হয়? বিশৃঙ্খল এই ঘটনাগুলো কেওস থিওরি মেনে চলেই বা কেন?

একটু গভীরে যাওয়া যাক। একটি সিস্টেম বা ঘটনা বিশৃঙ্খল কিনা, এবং বিশৃঙ্খল হলেও তা কতটুকু বিশৃঙ্খল- সেটা জানার জন্য চলুন কেওস থিওরির কয়েকটি শর্ত সম্পর্কে জেনে নেই।

বাটারফ্লাই ইফেক্ট

১৯৬১ সাল, বিজ্ঞানী লরেঞ্জ সদ্য আবিষ্কৃত একটি মেশিন নিয়ে তার ল্যাবে কাজ করছিলেন। একটি নির্দিষ্ট স্থানের চলমান আবহাওয়া অর্থাৎ তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, আর্দ্রতা ইত্যাদি ফ্যাক্টরগুলোকে ১২ টি ভিন্ন ডিফারেনশিয়াল সমীকরণের মাধ্যমে একত্র করলেন। সেই সমীকরণকে একটি গাণিতিক সংখ্যা আকারে সদ্য আবিষ্কৃত যন্ত্রে ইনপুট দিয়ে দিলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী কিছুদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে পারতো।

ভালোই চলছিল কাজ। একদিন কী মনে করে তিনি প্রথমে সমীকরণ দিয়ে শুরু করার বদলে আগে থেকেই মেশিন হতে প্রাপ্ত কিছু ডাটা নিয়ে পরীক্ষা চালু করেন। শুরু থেকে ইনপুট দিলে যেই ফলাফল আসে, এবারও ঠিক তেমন ফলাফল আসার কথা। কিন্তু দেখা গেল ফলাফল ভিন্ন দেখাচ্ছে। লরেঞ্জ দেখলেন গ্রাফটি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ যাওয়ার পর এলোমেলো বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে।

চিত্রঃ লরেঞ্জের মেশিন হতে প্রাপ্ত গ্রাফ।

প্রথমে এটিকে যান্ত্রিক গোলযোগ ভাবলেও পরে বুঝতে পারলেন সমস্যাটা আসলে অন্য জায়গায়। মেশিনটি কাজ করছিল ৬ ডিজিটের সংখ্যা নিয়ে কিন্তু ফলাফল দেখাচ্ছিল ৩ ডিজিটের সংখ্যার আকারে। ইনপুট হিসেবে মেশিনটি নিয়েছিল ০.৫০৬১২৭- দশমিকের পর ছয় ঘর। কিন্তু আউটপুট রেজাল্টের সময় সংখ্যাটিকে ০.৫০৬ হিসেবে ধরে ফলাফল গ্রাফটি প্রিন্ট করেছিল। দশমিকের পর তিন ঘর। সামান্য ০.০০০১২৭ এর পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়া পূর্বাভাসের গ্রাফে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

লরেঞ্জ এটিকে আখ্যায়িত করেন ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ নামে। তিনি বলেন, আমাজন জঙ্গলে কোনো এক প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর ফলে ভবিষ্যতের কোনো একসময় পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে বিশাল টাইফুনেরও সৃষ্টি হতে পারে। সামান্যতম পরিবর্তনে অসামান্য ফলাফল- এই হচ্ছে বাটারফ্লাই ইফেক্টের মূল কথা।

চিত্রঃ লরেঞ্জের আঁকা বাটারফ্লাই ইফেক্টের ডায়াগ্রাম।

আকর্ষক, আকর্ষণ ও অনিয়মিত আচরণ

একটি প্যাসেঞ্জার বিমান যখন আকাশে উড়ে, ভেতরে থাকা যাত্রী ও কেবিন ক্রুরা সর্বদাই আশা করেন যাতে প্লেনে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। আকাশে যদি ছোটখাটো কোনো দুর্যোগ সৃষ্টিও হয়, প্লেনটি যেন নিজের অবস্থান সর্বদা ধরে রাখতে পারে।

ঠিক তেমনিভাবে, একটি ফাইটার বিমানের পাইলট সর্বদা চান তার প্লেনটি যেন আকাশ ও বায়ুমণ্ডলের তুচ্ছ পরিবর্তনও বুঝতে পারে। পাইলট তার বিমানের অভ্যন্তরীণ গঠন, ইঞ্জিন, উড্ডয়ন কৌশল সম্পর্কে যত ভালো ধারণা রাখবেন, তত ভালোভাবে বিমানটিকে তিনি নিজের আয়ত্তে রাখতে পারবেন।

কেওস থিওরিও অনেকটা বিমানের মতোই কাজ করে। আপনি যদি কোনো ঘটনার কেন্দ্রে থাকা বিশৃঙ্খলাকে বের করতে পারেন তাহলে সেই ঘটনার ভবিষ্যৎ তত নিখুঁতভাবে বলতে পারবেন। পাশাপাশি ঘটনাটির উপর নিজের নিয়ন্ত্রণও আনতে পারবেন।

একটি সিস্টেমের মধ্যে লুকায়িত বিশৃঙ্খলাকে খুঁজে পেতে হলে তার কিছু Behavior বা আচরণসমষ্টিকে জানতে হবে। এগুলোকে গণিতবিদরা নাম দিয়েছেন Attractor বা আকর্ষক। কেওস থিওরিতে আকর্ষকের ভূমিকা অনুধাবন করার জন্য নিম্নোক্ত উদাহরণটি দেয়া যেতে পারে-

আপনার হাতে একটি পিং-পং বল আছে। সাগরের সামনে গিয়ে বলটিকে ছেড়ে দিলেন। পানির উপর থেকে যদি বলটি ছেড়ে দেন তাহলে সেটি পানিতে পড়ে ভাসতে থাকবে। আর যদি পানির তলদেশে গিয়ে বলটিকে ছাড়েন, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাবে এবং উপরের স্তরে এসে ভাসবে। অর্থাৎ যেখান থেকেই বলটি ছাড়া হোক না কেন, সেটি পানিতেই ভেসে থাকবে।

এখানে বলটি হচ্ছে একটি ঘটনা, পানির তল হচ্ছে ঘটনাটির আকর্ষক এবং সাগর হচ্ছে বস্তুজগতের বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা।

যদিও আমরা একটি বিশৃঙ্খল ঘটনার ফলাফল সম্পর্কে পুরোপুরি কখনোই নিশ্চিত হতে পারব না, তবে ঘটনাটির আকর্ষক সম্পর্কে জানা থাকলে আমরা তার ফলাফল ধারণা করতে সক্ষম হবো। একটি শৃঙ্খল ও স্থিতিশীল ঘটনার সাথে আকর্ষকের এই সম্পর্ক সাধারণ একটি জ্যামিতিক লুপ মেনে চলে।

কিন্তু কেওস থিওরির ক্ষেত্রে সেটি ভিন্ন। কেওস থিওরির সাথে আকর্ষক কাজ করে ফ্র্যাকটাল আকারে। (ফ্র্যাকটাল হচ্ছে অনিয়মিত জ্যামিতিক আকার।) অর্থাৎ একই সিস্টেমের মধ্যে থাকা একাধিক ঘটনার আকর্ষক এক হলেও তাদের ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।

চিত্রঃ একটি ফ্র্যাকটাল আকৃতি।

এরকম বিশৃঙ্খলার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে মানুষের হৃৎপিণ্ড। হৃৎপিণ্ডে কোষের সংখ্যা প্রায় ৩ মিলিয়ন। প্রত্যেকটি কোষ তাদের নিজস্ব ছন্দে রক্ত পাম্প করে। কিছু কিছু কোষ একটু আগে সংকুচিত হয়, আবার কিছু কিছু হয় একটু পরে। যদিও এই পরিবর্তন খুবই সামান্য। এখানে সকল কোষ একই সিস্টেমের অংশ, তাদের আকর্ষকও অভিন্ন, কিন্তু তবুও প্রত্যেকটি কোষ তার নিজস্ব বিধি মেনে চলে। এবং কোষগুলোর কম্পনে সামান্য এই পরিবর্তনের কারণে হৃদপিণ্ডের স্থায়িত্ব ও কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

আলপিন থেকে ঐরাবত- বিশৃঙ্খলা রয়েছে সবখানেই

কেওস থিওরি শুধু যে গাণিতিক ব্যাখ্যা দেয় তা কিন্তু নয়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি হতে শুরু করে বস্তুজগতের সবখানেই রয়েছে বিশৃঙ্খলা। আর সেই বিশৃঙ্খলাকে বোধগম্য করতে রয়েছে কেওস থিওরি। দুটি ঘটনা বিবেচনা করুন। এক- একটি আধখোলা পানির কল, যেখান থেকে একটি বালতির মধ্যে টিপটিপ করে পানি পড়ছে। দুই- লার্জ হাড্রন কলাইডারের মধ্যে থাকা হিলিয়াম গ্যাস, যা কলাইডারের শীতক (coolant) হিসেবে কাজ করে।

আপাতদৃষ্টিতে দুটি ঘটনাই নিয়মিত এবং বিশৃঙ্খলাহীন ঘটনা। কিন্তু পানির কলটি যদি ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেন, পানি পড়ার পরিমাণও বাড়তে থাকবে এবং বালতির মধ্যে পানি পড়ার শব্দও পরিবর্তিত হতে থাকবে। ঠিক তেমনই, লার্জ হাড্রন কলাইডারে থাকা হিলিয়ামের তাপমাত্রা যদি বৃদ্ধি করা হয়, সেখানেও আণবিক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করবে। পরিশেষে দুটি শৃঙ্খল ঘটনা থেকে সৃষ্টি হবে অবিরাম পানির স্রোত ও উত্তপ্ত হিলিয়ামের দুটি বিশৃঙ্খলা।

মজার ব্যাপার হলো, একটি শৃঙ্খল অবস্থা থেকে বিশৃঙ্খল ঘটনাতে রূপান্তর সর্বদা একটি ধ্রুবক অনুসারে সংঘটিত হয়ে থাকে। এই ধ্রুবককে বলা হয় ‘ফাইজেনবাম ধ্রুবক’। ফাইজেনবাম ধ্রুবক মূলত দুটি সংখ্যা। এর দ্বারা একটি লিনিয়ার সিস্টেম কী করে নন-লিনিয়ার তথা বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয় তা ব্যাখ্যা করা যায়।

চিত্র: ক্যাওস থিওরির প্রতিষ্ঠাতা এডওয়ার্ড লরেঞ্জ; image source:
thegwpf.com

কেওস থিওরি আমাদের অতি পরিচিত প্রকৃতিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। যেসকল ঘটনাকে আমরা দৈব ঘটনা, দুর্যোগ ইত্যাদি বলে চিনেছি সেগুলো আসলে পূর্বে ঘটে যাওয়া কোনো বিশৃঙ্খলারই ফলাফল।

পরিবেশের সামান্য একটি পরিবর্তন কী সুবিশাল পরিণাম ডেকে আনতে পারে, আপাতদৃষ্টিতে সরল মনে হওয়া কোনো ঘটনার পেছনেও যে থাকতে পারে অতি জটিল গাণিতিক হিসেব- তা অনুধাবন করা যায় কেওস থিওরির মাধ্যমে। কেওস থিওরি আমাদের সামনে বারবার একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে- আমরা আমাদের এই অতি পরিচিত পৃথিবীকে আসলে কতটুকু চিনতে পেরেছি?

তথ্যসুত্র

(i) http://theconversation.com/explainer-what-is-chaos-theory-10620

(ii) https://en.wikipedia.org/wiki/Chaos_theory

(iii) Book: Jurassic Park by Michael Crichton

চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের গল্প

স্ট্যান্ডার্ড মডেলে(১)  বস্তুর গঠনের জন্য দায়ী কণা তথা ম্যাটার পার্টিকেলের মাঝে অন্যতম হলো কোয়ার্ক। ফার্মিয়ন শ্রেণির এই কোয়ার্ক কণাদের সর্বমোট ৬টি ভিন্ন ভিন্ন ফ্লেভার আছে। এদের নাম হলো আপ কোয়ার্ক, ডাউন কোয়ার্ক, চার্ম কোয়ার্ক, স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক, টপ কোয়ার্ক ও বটম কোয়ার্ক। আজকে আমারা চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক সম্পর্কে জানবো। চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক নিয়ে প্রথমেই বলে রাখা ভাল, নামকরণে এদের নামের ইংরেজি অর্থ ভূমিকা রাখে না। এগুলো পরিচয়জ্ঞাপক নাম মাত্র।

কণা-পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে দেখা যায় চার্ম ও স্ট্রেজ কোয়ার্ক ২য় প্রজন্মের(২) কোয়ার্ক কণা। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৪ সালের মাঝে যখন এইট-ফোল্ড তত্ত্ব(৩) গঠিত হয় এবং তা থেকে বিজ্ঞানী মারি গেলম্যান হ্যাড্রনদের(৪) নতুন একটি গাঠনিক মডেল প্রকাশ করেন। তখন কোয়ার্কের ৬টি ফ্লেভারের কথা কেউ জানতো না। মনে করা হতো, সকল হ্যাড্রন কণাই আপ ও ডাউন কোয়ার্ক সমৃদ্ধ এবং কিছু কিছু কণাতে স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক রয়েছে।

এইট ফোল্ড তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ১৯৬৪ সালে মারি গেলম্যান ও জর্জ জিউগ সর্বপ্রথম এই কণার তাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণী করেন। এইট ফোল্ড তত্ত্বের এই ভবিষ্যদ্বাণী অনুসরণ করে ১৯৬৮ সালে স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার একসিলারেটর সেন্টার (SLAC) আপ, ডাউন এবং স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন। স্ট্রেঞ্জ কণার ভবিষ্যদ্বাণীতে কণাদের স্ট্রেঞ্জনেস নামক একটি ধর্মের কথা স্মরণীয়। চার্জ, ভর বা স্পিন যেমন কণাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য তেমনি স্ট্রেঞ্জনেসও কণাদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

চিত্র: স্ট্যান্ডার্ড মডেলে চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের অবস্থান। বাম দিক থেকে ২য় কলামে, উপরের দুটি।

স্ট্রেঞ্জনেস ধর্মকে একটি ফ্লেভার কোয়ান্টাম সংখ্যার সাহায্যে বর্ণনা করা যায়। একে s দ্বারা প্রকাশ করা যায়। কোনো কণার স্ট্রেঞ্জনেস বলতে বোঝায়, ঐ কণার অন্তর্গত স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক কণার সংখ্যা থেকে অ্যান্টি-স্ট্রেঞ্জ কণার সংখ্যা বিয়োগ করে বিয়োগফলের ঋণাত্বক মান।

যেমন, কোনো একটি হ্যাড্রনে xটি স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক কণা ও zটি অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক কণা থাকলে, ঐ কণার স্ট্রেঞ্জনেসের (s) মান হবে, s = -(x – z) অর্থাৎ কণাটিতে যদি স্ট্রেঞ্জনেসের মান ধনাত্বক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি।

আর যদি স্ট্রেঞ্জনেস ঋণাত্বক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক। যেমন: একটি স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের স্ট্রেঞ্জনেস হচ্ছে -১ আবার অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের স্ট্রেঞ্জনেস হচ্ছে +১। একটি প্রোটন বা নিউট্রন, উভয়েরই স্ট্রেঞ্জনেস ০। কেননা স্বাভাবিক অবস্থায় প্রোটন বা নিউট্রনে কোনো স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক বা অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক থাকে না।

স্ট্রেঞ্জনেস নামক কণাদের এই ধর্মের ধারণা প্রদান করেন মারি গেলম্যান ও কাজুহিকো নিশিজিমা। কণাদের বিভিন্ন সংঘর্ষ ও মিথস্ক্রিয়ায় উৎপন্ন কায়ন, হাইপারন, সিগমা ডি মেসন ইত্যাদি কণার আচরণ ব্যাখ্যায় ১৯৫৫ সালের দিকে গেলম্যান-নিশিজিমা সূত্র গঠন করা হয়। এসব কণারা যখন সবল নিউক্লিয় বলের মাধ্যমে মিথস্ক্রিয়া করে তখন তাদের আয়ু হয় অনেক কম। কিন্তু সেই একই কণা যদি দুর্বল নিউক্লিয় বলের মাধ্যমে মিথস্ক্রিয়া করে তখন তাদের আয়ু হয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

এই ঘটনা ব্যাখ্যায় কণাদের স্ট্রেঞ্জনেস ধর্মের উৎপত্তি। যাই হোক, স্ট্রেঞ্জনেস ধারণার পর স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক ও স্ট্রেঞ্জ অ্যান্টিকোয়ার্কের ধারণা আসলেও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক সমৃদ্ধ যৌগিক কণা দেখা যায় অনেক আগেই। ১৯৪৭ সালেই কসমিক রশ্মিতে কায়ন কণার অস্তিত্ব দেখা যায়। স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক আবিস্কারের পর জানা যায়, কায়ন কণা মূলত স্ট্রেঞ্জ কণা দ্বারা গঠিত।

চিত্রঃ কোয়ার্ক মডেল, এইটফোল্ড ওয়ে, স্ট্রেঞ্জনেসসহ কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের গ্রুপ প্রতিসাম্য ভাঙনের সফল ব্যাখ্যাদানকারী বিজ্ঞানী মারি গেল ম্যান।

স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের চার্জ -১/৩ e এবং স্ট্রেঞ্জনেস -১। এই কণার আইসোস্পিন(৫) ০, ব্যারিয়ন সংখ্যা(৬) +১/৩ এবং স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যা +১/২। স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের ভর ৯৫ MeV/c2 অর্থাৎ ভরের দিক থেকে এই কণা ৬টি কোয়ার্কের মাঝে ৪নং স্থানে আছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেলে স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের অবস্থান চার্ম কোয়ার্কের ঠিক নিচেই।

আবিষ্কারের দিক থেকে চার্ম কোয়ার্ক চতুর্থ নম্বর এবং ভরের দিক থেকে ৩ নম্বর। বহুদিন ধরে ভাবা হতো এই ৩টি কোয়ার্কই মৌলিক কণা। কিন্তু চার্ম কোয়ার্ক আবিষ্কার হবার পর এই ধারণা ভেঙে যায়। চার্ম কোয়ার্ক ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক উভয়টিই ২য় প্রজন্মের কোয়ার্ক বলে তাদের বেশ কিছু ধর্মের সাদৃশ্য বিদ্যমান। চার্ম কোয়ার্ক ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের মোট কৌণিক ভরবেগ, আইসোস্পিন, স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যা ও ব্যারিয়ন সংখ্যা একই। আলাদা হলো ভর ও চার্জ। চার্ম কোয়ার্কের ভর ১২৭৫ MeV/c2 এবং চার্জ হলো +২/৩ e।

“ফ্লেভার পরিবর্তক নিরেপেক্ষ প্রবাহ” (Flavor-Changing Neutral Current) নামে কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বে একটি টার্ম আছে। এটি দ্বারা বোঝায় কোনো একটি ফার্মিয়নের(৭) বৈদ্যুতিক চার্জ ঠিক রেখে শুধু ফ্লেভারের পরিবর্তন করা। এটি প্রকৃতিতে ঘটে না। যদিও ল্যাগ্রাঞ্জিয়ান মিথস্ক্রিয়া অনুসারে এটি ঘটার কথা।

এই FCNC ঘটার কথা থাকলেও কেন ঘটে না তার ব্যাখ্যা দিতে মঞ্চে আসে GIM মেকানিজম। ১৯৭০ বিজ্ঞানী শেলডন গ্লাসো, জন ইলোপুলাস ও লুচিয়ানো মায়ানি এই GIM মেকানিজম দ্বারা দেখান যে, কেন FCNC প্রাকৃতিকভাবেই দমিত থাকে।

কিন্তু GIM মেকানিজম সত্যি হতে হলে ৩টি কোয়ার্ক কণা যথেষ্ট ছিল না। আরেকটি কোয়ার্কের তাত্ত্বিক অস্তিত্ব চলে আসছিল। এর কিছুদিন পরেই ১৯৭৪ সালে ব্রুকহ্যাভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানী স্যামুয়েলটিঙ ও স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার একসিলারেটর সেন্টারের বিজ্ঞানী বার্টন রিখটার কর্তৃক চার্ম কোয়ার্ক পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।

চিত্রঃ Stanford Linear Accelerator Center

কণাদের স্ট্রেঞ্জনেসের মতো চার্মনেস বলেও একটি পরিভাষা আছে। তবে একে ঠিক চার্মনেস না বলে চার্ম বলা হয়। অর্থাৎ কোয়ার্কের নামও চার্ম এবং ধর্মের নামও চার্ম। স্ট্রেঞ্জনেসের সাথে চার্ম ধর্মের কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন, কোনো একটি হ্যাড্রনে xটি চার্ম কণা ও zটি অ্যান্টিচার্ম কণা থাকলে, ঐ কণার চার্ম (c) মান হবে, c = x – z অর্থাৎ কণাটিতে যদি চার্ম মান ধনাত্মক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় চার্ম কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি। আর যদি চার্ম মান ঋণাত্বক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় অ্যন্টিচার্ম কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি।

অর্থাৎ চার্ম ধর্ম স্ট্রেঞ্জনেসের পুরো উলটো। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক। একটি চার্ম কোয়ার্কের চার্ম মান হচ্ছে +১ আবার অ্যান্টিচার্ম কোয়ার্কের চার্ম মান হচ্ছে -১। একটি প্রোটন বা নিউট্রন, উভয়েরই চার্ম মান ০। স্ট্রেঞ্জনেসের বেলায় একটি মাইনাস চিহ্ন থাকে, যেটি চার্ম মানের বেলায় থাকে না।

এর কারণ হলো, প্রথাগতভাবে ফ্লেভার চার্জ তথা স্ট্রেঞ্জনেস, চার্ম মান, বটমনেস, টপনেস, আইসোস্পিন ইত্যাদি এবং বৈদ্যুতিক চার্জ- এই দুই চার্জের চিহ্ন একই রাখা হয়। এই নিয়ম মানতে গিয়ে স্ট্রেঞ্জনেস ও বটমনেসের আগে মাইনাস চিহ্ন আসলেও টপনেস ও চার্ম মানের আগে মাইনাস চিহ্ন আসে না।

চার্ম কোয়ার্কযুক্ত হ্যাড্রন কণাদেরও চার্ম কোয়ার্ক আবিষ্কারের আগেই পাওয়া গিয়েছিল। ডি মেসন, জে বাই সাই মেসন, চার্মড সিগমা মেসন ইত্যাদি মেসন কণাতে চার্ম কোয়ার্ক আছে। মেসন কণা বাদেও ব্যারিয়ন কণাতেও চার্ম কোয়ার্ক পর্যবেক্ষিত হয়েছে। চার্ম কোয়ার্কের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই কোয়ার্কের কোয়ার্কোনিয়াম(৮) অবস্থা অনেকগুলো।

অর্থাৎ একটি চার্ম কোয়ার্ক ও আরেকটি চার্ম অ্যান্টিকোয়ার্ক মিলে অনেকগুলি অবস্থা সৃষ্টি করে। যেমন, জে বাই সাই, চার্মড ইটা (1s), সাই (৩৬৮৬), সাই (৩৭৭০) ইত্যাদি। তবে চার্মোনিয়াম এর (একটি চার্ম ও একটি অ্যান্টিচার্ম কোয়ার্ক) ভূমি অবস্থা বা গ্রাউন্ড স্টেট হলো জে বাই সাই মেসন।

চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ- এই দুই কোয়ার্ক কণার আবিস্কার ছিল কণা পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী। কেননা এই দুই কোয়ার্ক কণা একটি নতুন প্রজন্মের কোয়ার্ক কণার যুগ সূচনা করেছিল। একসময় মনে করা হতো সকল কণায় আপ ও ডাউন কোয়ার্কের বিভিন্ন অবস্থার এবং বিভিন্ন অনুপাতের সংমিশ্রণ। আসলে সেটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে এই চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক আবিষ্কারের মাধ্যমেই।

আমরা এখন জানি, অধিকাংশ কণাই আপ ও ডাউন কোয়ার্ক সমৃদ্ধ হলেও কিছু কণা চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক সমৃদ্ধ। প্রোটন ও নিউট্রনে শুধু আপ ও ডাউন কোয়ার্ক কণাই রয়েছে- এই তথ্যটিও ভুল প্রমাণ হয়েছে স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক নিয়ে গবেষণার ফলে।

একটি প্রোটনে দুইটি আপ ও একটি ডাউন কোয়ার্ক ছাড়াও আরো যেকোনো সংখ্যক স্ট্রেঞ্জোনিয়া (স্ট্রেঞ্জোনিয়ামের বহুবচন) থাকতে পারে। প্রোটন ও নিউট্রন দেখতে ঠিক কেমন ও প্রোটন-নিউট্রনের ভেতরের কাহিনী নিয়ে আরেকদিন লেখার ইচ্ছা ব্যক্ত করছি। আজকে চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের কাহিনী বলে কোয়ার্কের জগতের সৌন্দর্য অনুধাবন করার আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় নিলাম।

পাদটীকা

(১) মহাবিশ্বের কণাসমূহের মিথস্ক্রিয়া ব্যাখ্যা প্রদানকারী একটি তত্ত্বের নাম স্ট্যান্ডার্ড মডেল।

(২) স্ট্যান্ডার্ড মডেলের কণাসমূহকে ৩টি প্রজন্মে ভাগ করা যায়। এই ৩টি প্রজন্মকে কীসের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছে, তা এখনও অমিমাংসিত।

(৩) মেসন ও ব্যারিয়ন কণাগুলোকে তাদের বিভিন্ন ধর্ম যেমন চার্জ, স্ট্র্যাঞ্জনেস, স্পিন ইত্যাদির ভিত্তিতে অষ্টকরূপে বিন্যাস করা যায়। য্যুভ্যাল নিম্যান ও মারি গেল ম্যান কর্তৃক প্রদত্ত এই বিন্যাসকে এইট-ফোল্ড তত্ত্ব বলে।

(৪) কোয়ার্ক ও লেপটন মিলে যে যৌগিক কণা তৈরি করে তাকে হ্যাড্রন বলে। হ্যাড্রন ২ প্রকার। হ্যাড্রনের মাঝে যেখানে একটি কোয়ার্ক ও একটি যেকোনো অ্যান্টিকোয়ার্ক থাকে, তাকে মেসন বলে। অন্যপ্রকার হ্যাড্রনে ৩টি কোয়ার্ক থাকে। একে ব্যারিয়ন বলে।

(৫) আইসোস্পিন একটি এককবিহীন কোয়ান্টাম সংখ্যা। সবল নিউক্লিয় বলের মিথস্ক্রিয়ায় এই কোয়ান্টাম সংখ্যাটি অপরিবর্তিত থাকে।

(৬) একটি কণার অন্তর্গত মোট কোয়ার্ক সংখ্যা থেকে প্রতিকোয়ার্ক সংখ্যার বিয়োগফলের এক-তৃতীয়াংশকে ব্যারিয়ন সংখ্যা বলে। একটি কোয়ার্কের ব্যারিয়ন সংখ্যা +১/৩ এবং অ্যান্টিকোয়ার্কের ব্যারিয়ন সংখ্যা -১/৩

(৭) যেসব কণারা ফার্মি-ডিরাক সংখ্যায়ন মেনে চলে তথা যাদের স্পিন পূর্ণসংখ্যা নয়, বরং ভগ্নাংশ, তাদের ফার্মিয়ন বলে। সকল কোয়ার্ক ও লেপটন মিলে ফার্মিয়ন শ্রেণি গঠিত।

(৮) একটি কোয়ার্ক কণা ও ঐ কোয়ার্কেরই প্রতিকণা মিলে যে যৌগিক কণা তৈরি হয়, তাই কোয়ার্কোনিয়াম।

তথ্যসূত্র

  1. http://en.wikipedia.org/wiki/Book:Quarks
  2. http://en.wikipedia.org/wiki/Quark
  3. http://en.wikipedia.org/wiki/Charm_quark
  4. http://en.wikipedia.org/wiki/Strange_quark
  5. http://en.wikipedia.org/wiki/Book:Particles_of_the_Standard_Model
  6. http://en.wikipedia.org/wiki/Eightfold_Way_(physics)
  7. http://en.wikipedia.org/wiki/Quarkonium
  8. http://en.wikipedia.org/wiki/Strangeness
  9. http://en.wikipedia.org/wiki/Charmness
  10. http://en.wikipedia.org/wiki/Flavor-changing_neutral_current

পিঁপড়ার ব্যক্তিত্ব

একটি স্বপ্ন। একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন। একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন। এই স্বপ্নটি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের একটি সাধারণ স্বপ্ন। এই স্বপ্নই মানুষকে অণুপ্রাণিত করেছে সমাজের ছায়াতলে এসে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের। কথাটি শুধু মানবসমাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, ক্ষুদ্রাকার পিপীলিকা সমাজের জন্যও প্রযোজ্য।

সমাজকে সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য সমাজের সদস্যদের সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজন পড়ে। সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সদস্যের মতামতের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। মতামত কেমন হবে তা নির্ভর করে সদস্যটির ব্যক্তিত্ব, রুচিশীলতা প্রভৃতির উপর।

সমাজের প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিত্ব আলাদা। এই ব্যক্তিত্বের বৈচিত্র্যের কারণে তৈরি হওয়া বিচিত্র মতামতকে বিবেচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মানুষ বৈচিত্র্যময় পন্থার কথা ভেবেছে। প্রয়োগও করেছে। তারমধ্যে সর্বাপেক্ষা আলোচিত এবং প্রচলিত পন্থা সম্ভবত ভোট দেয়া। এখন পিঁপড়াদের মধ্যে তো ভোটাভুটির মতো কোনো ব্যাপার প্রচলিত নেই। তাহলে পিঁপড়া সমাজ সিদ্ধান্ত নেবে কীভাবে?

পিঁপড়ারা সিদ্ধান্ত নেয় কোরাম (quoram) করে। মানে কিছু পিঁপড়া কোনো ব্যাপারে একমত হলে দলের অন্যান্য পিঁপড়াও তাদের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করে।

পিঁপড়া সমাজের সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ একটি ব্যাপার। তবে তারচেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে- মানব সমাজের প্রতিটি মানুষের মতো পিপীলিকা সমাজের প্রতিটি পিপীলিকার আচরণে রয়েছে বৈচিত্র্য। প্রতিটি পিঁপড়া চলনে-বলনে অন্যান্য পিঁপড়া থেকে আলাদা। বিষয়টিকে পিঁপড়ার ব্যক্তিত্বও বলা যায়।

পিঁপড়াদের এই ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা মানুষের মতোই পিঁপড়া সমাজের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া না নেয়াকে প্রভাবিত করে। মোটামুটি অবিশ্বাস্য শোনালোও পিঁপড়া নিয়ে নতুন একটি গবেষণায় এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।

রক এন্টদের (Temnothorax albipennis) পাওয়া যায় ইংল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকায়। তারা বাড়ি বানায় পাহাড়ের সরু কোনো ফাটলে। এ ধরনের ফাটল প্রচুর পাওয়া যায় তবে তা সহজেই বিনষ্ট হতে পারে পাথর ধ্বসে বা বৃহৎ প্রাণীদের উৎপাতে। যদি তাদের বাসা ভেঙে যায় বা দলের সন্ধানী পিপীলিকারা নতুন কোনো সুবিধাজনক বাসার সন্ধান পায় তাহলে তারা নতুন বাসায় স্থানান্তরিত হয়।

চিত্র: রক এন্ট বা পাথুরে পিঁপড়া।

ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের এন্ট ল্যাবের থমাস হোয়েলার বলেন, “নতুন বাসা খোঁজার সময় অনুসন্ধিৎসু পিপীলিকারা অনেক প্রয়োজন মাথায় রাখে। তারা এমন বাসার সন্ধান করে যেখানে হালকা আলো থাকবে, বাসার দরজা হবে ১ থেকে ১.৫ মিলিমিটার মাপের, বাসার উচ্চতা হবে ২ মিলিমিটার এবং বাসার ভেতরের জায়গা হবে প্রায় ২০ বর্গসেন্টিমিটার।”

আলাদাভাবে দলের প্রত্যেকটি পিঁপড়া তাদের সম্ভাব্য বাড়ির ব্যাপারে কী ভাবে এবং এটা কীভাবে দলীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে তা পরীক্ষা করতে হোয়েলার ও তার সহকর্মীরা ১০টি ভিন্ন ভিন্ন কলোনী থেকে ১৬টি করে মোট ১৬০টি পিপড়াকে কৃত্রিমভাবে তৈরি বাসায় ছেড়ে দেন। বাসাগুলো ছিল তিন ধরনের। খুব ভালো, তুলনামুলক কম ভালো এবং জীর্ণ।

এতে স্বাভাবিকভাবেই যা ঘটল তা হলো বাসাটা যত ভাল হলো পিঁপড়ারা তত বেশি সময় সেখানে কাটাল এবং দলের সঙ্গীরা যাতে তাদের খুঁজে পায় এজন্য বিশেষ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে রাখল। হোয়েলার বলেন “কোনো একটা বাসায় অবস্থান করে পিঁপড়ারা কার্যকরভাবে কোরামে বা একমত হবার ব্যাপারে ভূমিকা রাখে। যত বেশি সময় একটা পিঁপড়া কোনো বাসায় অবস্থান করবে, তত বেশি পিঁপড়া তার সাথে যোগ দেবে।”

হোয়েলারের গবেষক দল এটি থেকে দেখতে পান কোনো বিশেষ ধরনের বাসায় ভিন্ন ভিন্ন পিঁপড়াদের কাটানো সময় ভিন্ন। হোয়েলার এ সম্পর্কে বলেন, “কিছু পিঁপড়া আছে খুতখুতে, কিছু পিঁপড়া আবার স্বাধীনচেতা। তারা তাদের বর্তমান বাসার চেয়ে ভাল বাসা পেলেই খুশী। অনেকটা মানুষের মতোই।”

কিছু পিঁপড়াকে কখনোই সুখী মনে হয় না, তাদের বাসা যত সুন্দরই হোক না কেন। এই অস্থির স্বভাবের পিঁপড়ারা যে বাসায় বাস করে তারচেয়েও সুন্দর বাসার সন্ধানে থাকে। এটা কোনো সমস্যা নয়, বরং তারা সবসময় নতুন কিছুতে আগ্রহী। কোনো কোনো পিঁপড়া আবার শান্ত স্বভাবের।

গবেষক দল দেখতে পান পিঁপড়ারা নির্বোধই হোক আর চালাকই হোক দুটি ভিন্ন মানের বাসা থেকে একটি বেছে নিতে তাদের নির্বোধ বা চালাক ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা খুব একটা প্রভাব ফেলে না। এক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ মোটামুটি একই গতিতে হয়ে থাকে।

কিন্তু পিপড়ার কলোনীটি যদি দুটি ছন্নছাড়া বাসা থেকে একটি বেছে নিতে চায় সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া (heterogeneity of responses) দেখা যায়। ফলে তারা দ্রুত একটা সিদ্ধান্তে আসতে চায়। একটু কড়া স্বভাবের পিঁপড়ারা কলোনীর বাসিন্দাদের এক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

image source: insider.si.edu

হোয়েলারোর সহকর্মীরা এটাও পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, পিঁপড়ারা তিনটি ভিন্ন মানের বাসা থেকে কোনটি বেছে নেবে তা তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতার উপরও নির্ভর করে। হোয়েলারের ভাষ্যমতে, যদি পিঁপড়ারা খুব ভালো বাসা থেকে অপেক্ষাকৃত কম ভালো বাসায় যায় তাহলে তারা বুঝতে পারে যে এটা আগেরটার মতো ভালো নয়। যদি পিঁপড়ারা জীর্ণ কোনো বাসায় থাকে তাহলে পরে খুঁজে পাওয়া ভাল বাসায় বেশি সময় কাটায় তারা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পিঁপড়াদের এই ব্যক্তিত্বের পার্থক্যের কারণ কী? গবেষক ডর্নহেউস বলেন “অনেক নিয়ামকই এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখত পারে। হরমোনের মাত্রায় পার্থক্য, সেন্সরি রিসেপ্টরের সংখ্যায় পার্থক্য, বয়স, দেহের আকার অনেক কিছুই হতে পারে। নিশ্চিত করে কোনোকিছু বলা মুশকিল।”

এখন সামনে গবেষকদেরকে জানতে হবে পিঁপড়াদের ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তার পেছনে কী দায়ী এবং বিবর্তনের পথে এর ভূমিকা কী। এই গবেষণা অন্তত আমাদের এটুকু জানাতে পেরেছে যে পিঁপড়াদের ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তা আসলে প্রয়োজনীয় এবং তা পিপড়া কলোনীর স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র

Ant’s choosiness reveals that they all have different personalities by Chris Simms, the new scientist, February 1, 2017.

featured image: aquarianonline.com

ডার্ক চকলেট বাড়াবে জীবনীশক্তি

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা বলছে ডার্ক চকলেট খেলে তা দৈনন্দিন জীবনে খুবই উপকার বয়ে আনতে পারে। এটি শরীরের বিভিন্ন ধকল এবং প্রদাহ কমায়, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে, দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও মন মেজাজ ভাল রাখতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের ডার্ক চকলেট থেকে কয়েক ধরনের শারীরিক উপকারিতা লাভ করা সম্ভব। 

সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলোজি-২০১৮ এর একটি কনফারেন্সে এ সংক্রান্ত দুটি গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, ডার্ক চকলেটে প্রচুর পরিমাণ ক্যাকাও (Cacao) থাকে। প্রদাহ ও ধকল কমাতে এবং প্রতিরোধক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি ইত্যাদি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এই ক্যাকাও।

ফ্লাভোনয়েডস নামক একটি মূল্যবান খাদ্য উপাদানের প্রধান উৎস হলো ক্যাকাও। গবেষণায় জানা যায় বুদ্ধিবৃত্তি, রক্তসঞ্চালন, এমনকি দেহের বিভিন্ন নিঃসরনের ক্ষেত্রে ফ্লাভোনয়েডস ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

image source: dietitianrenupreet.com

সাইকোনিউরোইমিউনোলজি এবং ফুড সায়েন্সের গবেষক লি এস বার্ক উপরোক্ত গবেষণাগুলোতে প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। “কয়েক বছর ধরে আমরা নিউরনের উপর ডার্ক চকলেটের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করে এসেছি” বলেন বার্ক। 

পরীক্ষাগুলো থেকে দেখা যায়, যত বেশি ক্যাকাও তত বেশি দেহের বুদ্ধি, স্মৃতি, মন মেজাজ ইত্যাদির উপর ভালো প্রভাব। ক্যাকাও-তে যে ফ্লাভোনয়েডস নামক পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায় তা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রদাহপ্রতিরোধকারী হিসেবে কাজ করে। এটি মস্তিষ্ক এবং হৃৎপিণ্ডের জন্যও বেশ উপকারী।

এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলোজি- ২০১৮ এর কনফারেন্সে উপস্থাপিত কিছু ফলাফল এখানে তুলে ধরা হলো। 

(১)

কোষের প্রতিরক্ষা, স্নায়ুর কার্যকারিতা এবং বিভিন্ন সংবেদনশীলতায় ভুমিকা রাখে

(২)

ডার্ক চকলেট মস্তিষ্কের EEG ক্ষমতা বাড়ায়। মস্তিষ্কে কতটা ইলেকট্রিক্যাল একটিভিটি উৎপন্ন হচ্ছে তা জানা যায় EEG পদ্ধতিতে। নতুন কিছু শেখা, কোনো কিছু মনে করা, সামঞ্জস্যতা, ধ্যান, মস্তিষ্কের নমনীয়তা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপকারী ভূমিকা পালন করে এটি।

 

গবেষক বার্ক বলেন, এটি নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে দেহের প্রতিরক্ষা এবং মস্তিষ্কের কার্যকরিতার উপর এটির কী প্রভাব ফেলে তা জানার জন্য, একটি বড় জনগোষ্ঠীর উপর পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। অধিক মাত্রায় ডার্ক চকলেট গ্রহণ করলে মস্তিষ্ক এবং আচরণের উপর কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা ফেললে তার প্রভাব কেমন হবে এটি এখন গবেষণা করে দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: sciencedaily

দুপুরের হালকা ঘুম— বাড়িয়ে দেয় পড়াশোনার কার্যকারিতা

“ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ারের গবেষকদের করা গবেষণা বলছে দুপুরের ঘুম হতে পারে স্নায়বিক কার্যক্ষমতা ও দক্ষতার সহায়ক যা উপকারে আসতে পারে কিশোরদের বয়ঃসন্ধিকালীন ক্লান্তির সমাধান হিসেবে।” 

ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথের অর্থায়নে সহকারী অধ্যাপক জিয়াওপেঙ জি এবং প্রধান অনুসন্ধানকারী জিয়াংহং লিউ (ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া) চীনা ক্লাসরুমগুলোর উপর একটি গবেষণা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। জিনতান থেকে অংশগ্রহণ করা শিক্ষার্থীদের দুপুরের হালকা ঘুম আর রাতের ঘুমের স্থিতিকাল পরিমাপ করেন। একই সাথে ঘুমের মান অর্থাৎ গভীরতা ও কার্যকারিতা কেমন তাও টুকে নেয়া হয়। কার্যকারিতা পরিমাপে বহুবিধ স্নায়ুভিত্তিক কাজকর্ম করতে দেয়া হয়েছিল শিক্ষার্থীদের।

জিয়াওপেঙ জির মূল লক্ষ্য নিবদ্ধ ছিল ঘুম এবং চেতনা বা বোধশক্তির মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ের। যেকোনো নিবিড় শিক্ষা এবং শিক্ষার চাহিদার জন্য তরুণ সম্প্রদায়ই মূল উৎস। স্নায়বিক চেতনার কার্যক্রমগুলো ভূমিকা রাখে কোনো কিছু শেখা, আবেগ প্রকাশ এবং কেউ কিভাবে আচরণ করবে এ সংক্রান্ত ঘটনায়। তার গবেষণা থেকে দুপুরের হালকা ঘুম আর স্নায়বিক কাজকর্মগুলোর মধ্যে সহায়তা করার বৈশিষ্ট্যে প্রাসঙ্গিকতা পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষত, চীনে দুপুরের দিকে হালকা একটা ঘুম দেয়া তাদের সংস্কৃতি চর্চার অংশ। বাংলাদেশেও কিন্তু গ্রামে ব্যাপারটা প্রচলিত। দুপুরের ভাত খাওয়ার পর আমাদের দেশে এই হালকা ঘুমকে বলে ভাতঘুম।

ঘুমের পৃথিবী কিশোর-দুপুরের। চীনে দুপুরের ঘুম একটি সংস্কৃতি। ; source: asiapacificglobal.com

কিন্তু পশ্চিমাবিশ্বে আবার বিপরীত সংস্কৃতি লক্ষ্যণীয়। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর কোনো বালাই নেই। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে, একটানা ঘুমের ধরণকে মস্তিষ্কের পূর্ণতার জন্য সহায়ক বলে বিশ্বাস করা হয়। চীনে দুপুরঘুমের ব্যাপারটির চল রয়েছে অফিস আদালতে কর্মচারী এবং বিদ্যাপীঠগুলোয় শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার পরবর্তী সময়ে।

জি গবেষণা করেছেন মানুষের ২৪ ঘন্টার দেহঘড়ির সাথে ঘুমের ছন্দ কিভাবে তাল খেলে। বয়ঃসন্ধি বা কৈশোরের ক্রমবিকাশের সময় দেহঘড়ির ছন্দের তাল-লয়ের পরিবর্তন হয়। টিনেজারদের ক্ষেত্রে তাদের প্রাক-কৈশোরের অবস্থার সাপেক্ষে দেহঘড়ির তাল-লয় এক থেকে দুই ঘন্টা পিছিয়ে পড়ে।

আব্বু !উঠে পড়, সারারাত ঘুমিয়েছ! স্কুল আছে!; source: New Scientist

এই দশা পরিবর্তনে দায়ী আসলে কিশোরদের জৈবিক পরিবর্তন। এ দশা পরিবর্তনের সময়, দেহঘড়ির কারণে শারীরিক কিছু অভ্যাস সময়ের সাথে বদলে গিয়ে প্রভাব ফেলতে থাকে দৈনন্দিন জীবনে। যেমন বাচ্চাদের (প্রাক-কৈশোরে) বেশ সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয়। কিন্তু এই জৈবিক পরিবর্তনের কারণে দেহঘড়ির যে বিলম্ব যুক্ত হয় প্রতিদিনিকার রুটিনে, তার কারণে এ বয়সীদের (১৩-১৯ বছর) বিছানায় ঘুমাতে যেতেও দেরী হয়। সকালের ঘুম ভাঙার সময় একই থাকায় ধীরে ধীরে ঘুমের ঘাটতি নিয়মিত হতে থাকে।

জি মনে করেন জৈবিক কারণের এ আকস্মিক পরিবর্তনে ঘুমের সময়সূচির সমস্যা কিশোরদের স্নায়বিক কার্যক্ষমতাকে ব্যাহত করতে পারে। যে কারণে, স্কুলে মনোযোগ দেয়া আরো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ক্ষতি হতে পারে স্মৃতিশক্তি এবং কার্যকারণ দক্ষতারও।

দেহঘড়ি কমজোর হয়ে পড়ে দুপুর ১২টা থেকে ২টার মধ্যকালে। দিনের এ পর্যায়ে কিশোরদের ঘুমভাব চলে আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোর সময়সূচির কারণে কিশোরদের সে সুযোগ পাওয়ার উপায় নেই।

শৈশবের পর্যায় এগুতে এগুতে, আমেরিকার বাচ্চাদের হালকা ঘুমের অভ্যাস হ্রাস পাওয়ার অভিজ্ঞতা হতে থাকে। বাচ্চাদের এমন সময়সূচির মধ্য দিয়ে শৈশব অতিবাহিত হতে থাকে যে তারা  দৈনন্দিন এই নিয়মকানুনের কারণে একসময় দুপুরের হালকা ঘুমের চাহিদা থেকে বিরত থাকতে শিখে যায়। বিপরীত দিকে, চীনে, স্কুলগুলোর সময়সূচিতে এ সুযোগটা আছে। তাই নিয়মকানুনের চাপ ঐ নির্দিষ্ট সময়ের উপর পড়ছে না। ফলত, চীনে কিশোরদের দুপুরের হালকা ঘুমের অভ্যাস সময়ের পরিক্রমায় অপরিবর্তিত থাকছে।

হালকা ঘুমের ব্যাপারে গবেষকদের এসপার ওসপার অবস্থান নিতে দেখা যায়। অনেকে মনে করে দিনের হালকা ঘুম রাতের ঘুমের ঘাটতিকে মিটিয়ে দেয়; আরেক দল মনে করে এটি নিয়মিত হলে রাতের ঘুমের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করে। বহু গবেষণায় ল্যাবরেটরিতে ঘুমের পরিবেশ তৈরি করে এধরনের পরীক্ষার তথ্য নেয়া হয়েছে। কিন্তু ঘরোয়া পরিবেশের সাথে নতুন কৃত্রিম পরিবেশে নিয়মিত অভ্যাসের পার্থক্য হ্রাস করা খুব জটিল ব্যাপার। তাই পরীক্ষায় অংশ নেয়াদের আচরণের প্রভাব কতটা বিশুদ্ধ তা নিয়ে শংকা থাকে। কারণ, আসলে যাচাই করা হচ্ছে অভ্যাসগত ঘুমের প্রভাব। তাই সেই অভ্যাসের সাথে আনুষঙ্গিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজের ঘরের বিছানাসহ ঘুম পরীক্ষার অংশ করে ফেলার কথা ভেবে ফেলেন জি।

পূর্ণবয়স্কদের উপর ঘুম সংক্রান্ত যথেষ্ঠ গবেষণা হলেও, টিনেজারদের ক্ষেত্রে ঘুমসংক্রান্ত গবেষণা অপ্রতুল ছিল। তাই আঁটঘাট বেঁধে নামতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন জি। যেহেতু আমেরিকার স্কুলগুলোর সময়সূচি গবেষণার উদ্দিষ্ট ঘুমের সময়ের পরিপন্থী, সেকারণেই চীনের দ্বারস্থ হতে হয়েছে ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ার এবং ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার যৌথ এ প্রচেষ্টায়।

যা পাওয়া গেল

জি হালকা ঘুমের দুটো পরিমাপক নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন— একটি হল ঘুমের সংখ্যা এবং অপরটি ঘুমের স্থায়ীত্ব। নিয়মিত হালকা ঘুমওয়ালারা— যারা সপ্তাহে ৫ থেকে ৭ দিন হালকা ঘুম ছাড়া থাকতে পারেন না তাদের ওপর কিছু পরীক্ষা করা হয়েছে। দেখা গেছে, তারা দৃষ্টি সংক্রান্ত পরীক্ষা এবং স্থান, পরিপার্শ্বীয় স্মৃতি সংক্রান্ত পরীক্ষায় বেশ ভাল দক্ষতা দেখিয়েছে। এরপর আসে এই হালকা ঘুম কতক্ষণ দীর্ঘ হবে? গবেষণা বলছে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট। এক ঘন্টার চেয়ে দীর্ঘ হয়ে গেলে আবার সে ঘুমের কারণে দেহঘড়ির ছন্দপতন হতে পারে। এ গবেষণার জরিপে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা ৩০ থেকে ৬০ মিনিট ঘুমিয়েছে তারা অধিক কর্মদক্ষতা দেখিয়েছে। একই সাথে একই লোকদের ক্ষেত্রে কাজের গতিও বেশি পাওয়া গেছে। তবে বিকেল ৪টার পর এ ঘুম না নিতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

গবেষকরা দুপুরের হালকা ঘুম এবং নিশিতনিদ্রার মধ্যকার ইতিবাচক সম্পর্ক ধরতে পেরে বেশ অবাক হয়েছেন। দেখা গেছে, হুটহাট হালকা ঘুমের চেয়ে যারা নিয়ম করে নির্দিষ্ট সময়ে হালকা ঘুম দিয়ে থাকেন তারা রাতেও ভাল ঘুমাতে পারেন।

পশ্চিম চায়নার একটি স্কুলের দৃশ্য। বাচ্চাদের ডর্মিটরি বা বাসা একটু দূরে বলে ঘুমচর্চা ক্লাসরুমেই সেরে নিচ্ছে যা চীনে দুপুর-ঘুম সংস্কৃতির আবহমানতা প্রকাশ করে।; source: dailymail.co.uk

আমেরিকার সাথে পার্থক্য তৈরি করছে আসলে মানুষের প্রাত্যহিক রুটিন। দিনের ঘুম রাতের ঘুমের ঘাটতিকে পুষিয়ে দিতে পারে আবার পরের রাতের জন্য ঘাটতির কারণ হতে পারে সেখানে। কারণ, তারা তাদের কাজকর্মের সাথে তাল মিলিয়ে এই অভ্যাসে প্রস্তুত নয়। কিন্তু চীনে নিয়মিত ঘুমানোর সংস্কৃতি থাকায় দুপুরের ঘুমও চলছে আবার রাতের ঘুমেরও কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

জি তার এই গবেষণা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন যে তার কাজ ছিল পর্যবেক্ষণভিত্তিক। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে তিনি এর কার্যকারণের নিগূঢ় তত্ত্ব নিয়ে কিছু বলতে পারছেন না। এতে অবশ্য ফলাফলের পরিবর্তন হতে যাচ্ছে না। তিনি আশা করেন এ কাজ ভবিষ্যত গবেষণায় এবং জনস্বাস্থ্য নীতিতে কাজে লাগতে পারে।

 

— ScienceDaily অবলম্বনে

পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ফেলনা জিনিস

এটা সাধারণ একটা মাথার খুলি হতে পারে, কিন্তু যদি বলি এটা পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ফেলনা জিনিস তাহলে? অবাক হলেও সত্য। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ফেলনা বস্তুটি হচ্ছে এই খুলিটি যার মূল্য ১০০ মিলিয়ন ডলার! কেন? কারণ এটি সাধারণ কোনো খুলি নয়, এটির নাম Damien Hirst diamond skull।

image source: vimeo.com

নাম দেখেই বুঝতে পারছেন হীরার কথা। এটি তৈরি করেন Damien Hirst নামক একজন শিল্পী। তিনি এই অষ্টাদশ শতাব্দীর মাথার খুলিতে যুক্ত করেন প্লাটিনাম আর ৮৬০১ টি হীরক খণ্ড। যার মধ্যে একটি গোলাপি বর্ণের হীরাও রয়েছে যেটি মাত্র ৫২ ক্যারেটের। এই খুলিটির দেখা পেতে হলে আপনাকে পাড়ি জমাতে হবে লন্ডনের White Cube gallery-তে।

ট্রাইএঙ্গুলিনঃ পদার্থবিজ্ঞান যেখানে রসায়নকে হারিয়ে দিল

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রধান দুটি শাখা রসায়ন আর পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ– বিজ্ঞানীদের মধ্যেকার এই দ্বৈরথটি বেশ পুরনো। এই খবরটি পড়ার পর তাই পদার্থবিজ্ঞানের কোনো ছাত্রের একটু আনন্দ লাগতেই পারে যে- একদল পদার্থবিজ্ঞানী পুরো রসায়নবিজ্ঞানকেই বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছে। এই কথাটি কি বেশি বাড়াবাড়ি শোনাচ্ছে? আচ্ছা একটু অন্যভাবে বলি- এই পদার্থবিদেরা আসলে রসায়নের গবেষকদেরকে তাদের নিজেদের শক্তির জায়গাতেই হারিয়ে দিয়েছেন।

আইবিএম-এর একদল পদার্থবিদ ট্রাইএঙ্গুলিন (Triangulene) নামের একটি নতুন ধরনের অণু সংশ্লেষণে সক্ষম হয়েছেন। রসায়নের বহু গবেষক দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করার চেষ্টা করে সফল হতে পারেনি। পদার্থবিদরা সাধারণত রাসয়নিক যৌগ সংশ্লেষণ করে না। এটা রসায়নবিদদের কাজ। এখানে তার উলটোটাই ঘটেছে। এই বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছে, যেখানে রসায়নের অন্য সকল পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছে, ভৌত প্রক্রিয়া ব্যবহার করে সেখানে কোনো কোনো অণু তৈরি করা সম্ভব।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস কর্পোরেশন বা আইবিএম একটি আমেরিকান বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। নিউইয়র্ক ভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটির ১৭০টিরও বেশি দেশে কার্যক্রম রয়েছে। গবেষণাক্ষেত্রেও এই প্রতিষ্ঠানটির অবদান ব্যাপক। গত ২৪ বছর ধরে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্যাটেন্ট করানোর রেকর্ড আইবিএম-এর দখলে।

আমাদের পরিচিত অটোম্যাটেড টেলার মেশিন বা এটিএম, ফ্লপি ডিস্ক বা হার্ড ডিস্ক ড্রাইভ এই আইবিএমের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিজ্ঞানীদের হাতেই আবিষ্কৃত হয়েছিল।

চিত্রঃ বামে একটি প্রায় কাল্পনিক অণু ট্রাইএঙ্গুলিন অণুর গাঠনিক সংকেত ডানে অণুটির ত্রিমাত্রিক চিত্র।

নাম থেকেই যা বোঝা যাচ্ছে এই অণুটি ত্রিভুজাকৃতির। উল্লেখ্য, প্রকৃতিতে এঙ্গেল স্ট্রেইন তথা কৌণিক পীড়নের কারণে ত্রিভুজাকৃতির অণু সাধারণত দেখা যায় না। অণুগুলো বেশ অস্থিতিশীল হয়। রাসায়নিকভাবে এরা বেশ সক্রিয় এবং বিভিন্ন পরিবেশে এগুলি সহজেই ভেঙ্গে অন্য অণুতে পরিণত হয়ে যায়।

বিজ্ঞানের নিয়মই হচ্ছে যেকোনো বস্তু সর্বনিম্ন শক্তি ধারণ করে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকতে চায়। যেহেতু, ত্রিভুজাকৃতির অণুতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে, তাই প্রকৃতিতে ত্রিভুজাকৃতির অণু বেশ দুর্লভ।

বেশ কয়েক বছর ধরে রসায়নের বিভিন্ন গবেষণাতে ক্ষুদ্র ষষ্ঠতলকীয় গঠন থেকে তত্ত্বীয়ভাবে ত্রিভুজাকার ট্রাইএঙ্গুলিনের স্তর তৈরি হওয়ার কথা উল্লেখ হয়ে আসছে। তবে আসলেও প্রচলিত রাসয়নিক পদ্ধতিগুলোতে এই অণুটির স্থিতিশীল কোনো অবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। এরকম অবস্থায় দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘটল আইবিএমের বিজ্ঞানীদের। তারা প্রথমে ইংল্যান্ডের রসায়নবিদদের কাছ থেকে ট্রাইএঙ্গুলিনের একটি জাতক ধার নেন গবেষণার জন্য।

তারা এই যৌগটিকে তামা আর কিছু অন্তরক পাতের উপরে রেখে একটি এটমিক ইমেজিং ডিভাইস (পারমাণবিক চিত্রধারক যন্ত্র)-এ সোনা আর কার্বন মনো-অক্সাইড দিয়ে তৈরি প্রোব দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন। এই একই যন্ত্র দিয়ে পূর্বে অলিম্পিসিনের মতো অদ্ভুত যৌগের অণুর ছবি তোলা হয়েছিল। যদিও এভাবে তোলা ছবি সাধারণত ঝাপসা হয়, তবু এই ছবিতে প্রতিটি পারমাণবিক বন্ধন আলাদা করে শনাক্ত করা যায়।

পরবর্তী ছবিতে দেখা যাচ্ছে অলিম্পিসিন অণুর দ্বিমাত্রিক চিত্র। পাশে এটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপ দিয়ে তোলা অলিম্পিসিন অণুর ছবি। উল্লেখ্য, ২০১০ সালের মার্চ মাসে এন্টোনি উইলিয়ামস এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাহাম রিচার্ডস ২০১২ সালের আসন্ন লন্ডন অলিম্পিকস গেম উদযাপনের অংশ হিসেবে এরকম অণুর অস্তিত্বের ধারণা করেন।

পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অনীশ মিস্ত্রি আর ডেভিড ফক্স সত্যি সত্যি এমন যৌগের সংশ্লেষণে সক্ষম হন। মজার কথা হলো, শেষোক্ত দুই গবেষক ট্রাইএঙ্গুলিন সংশ্লেষণের গবেষণাতেও ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল নেতৃত্ব দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, এই যন্ত্রটি স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ ও এটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। একে সংক্ষেপে STM/AFM বলা হয়। লেখায় সামনে এগোনোর আগে আসুন এই যন্ত্রগুলি আসলে কীভাবে কাজ করে তা একটু দেখি।

আমরা জানি, ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ গবেষণা কাজে ব্যবহৃত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি যন্ত্র। এতে ইলেকট্রনের তরঙ্গ ধর্মকে কাজে লাগানো হয়। সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্রে যে আলো ব্যবহার করা হচ্ছে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অর্ধেকের চেয়ে বেশি ছোট কোনো বস্তু সেই যন্ত্র দিয়ে দেখা যায় না। যেহেতু তড়িৎচুম্বকীয় বর্ণালীর ৪০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য অঞ্চল থেকে দৃশ্যমান আলো শুরু হয়, তাই আমরা ২ × ১০-৭ মিটারের চেয়ে ছোট দৈর্ঘ্যের কোনো বস্তু এই অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে পাই না।

তত্ত্বীয়ভাবে যদিও আমাদের এক্স রে ব্যবহার করে পারমাণবিক স্কেলে বস্তু দেখতে পারার কথা। কিন্ত এক্সরেকে কোনো বিন্দুর উপরে ফোকাস করা যায় না। তাই এভাবে ছবি তোলা গেলেও ভালভাবে তা বোঝা যায় না।

চিত্র: একটি সাধারণ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ

ইলেকট্রন হচ্ছে চার্জিত কণা। এগুলোকে তড়িৎ ক্ষেত্র বা চৌম্বক ক্ষেত্র প্রয়োগ করে ফোকাসও করা যায়। কণা-তরঙ্গ দ্বৈততা নীতি অনুযায়ী, কোনো ইলেকট্রনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য তার বেগের ব্যস্তানুপাতিক। তাই যদি কোনো ব্যবস্থায় ইলেকট্রনের বেগ অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে ০.০৪ ন্যানোমিটার বা তার চেয়ে ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ইলেকট্রন তরঙ্গ পাওয়া যাবে। ফলে এই তরঙ্গ ব্যবহার করে অণুবীক্ষণ যন্ত্র কাজ করলে তা দিয়ে অনেক বেশি ছোট বস্তু যেমন অণু পরমাণুর ছবি তোলা যাবে।

আরেক ধরনের ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র হচ্ছে এই স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ। এখানে ইলেকট্রনের আরেকটি কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে কোনো তলের উপরে পরমাণুর ছবি তোলা হয়। ইলেকট্রন কোনো বাধার উপর দিয়ে অতিক্রম না করে ভিতর দিয়ে গর্ত খুড়ে বা টানেল তৈরি করে শক্তির বাধা পার করতে পারে। একে বলে কোয়ান্টাম টানেলিং।

সামনে একটি দেয়াল আছে, আপনি পার হতে চাইলে তা উপর দিয়ে টপকিয়ে পার হওয়ার কথাই ভাববেন। কিন্ত ক্ষুদ্র কণাগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তাদের সামনে কোনো শক্তির বাধা পড়লে তা না টপকিয়ে ভেতর দিয়ে অপর পাশে চলে যেতে পারে। কণাদের অদ্ভুত এই বৈশিষ্ট্যকেই কোয়ান্টাম টানেলিং বলে।

স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপে টাংস্টেন দিয়ে তৈরি একটি সূচের মতো অংশ থাকে। এর অগ্রভাগ খুবই সূক্ষ্ম। এই অগ্রভাগ থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয়। পরীক্ষার সময় নমুনা তল থেকে সূচের মতো অংশটিকে কয়েক পারমাণবিক ব্যাসার্ধ দূরে রেখে তলের উপর দিয়ে সূচটিকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে সৃষ্ট টানেলিং কারেন্ট মাপা হয়।

তল থেকে দূরত্ব বাড়লে কারেন্ট কমে যায়, তাই সূচটিকে চালানোর সময় তল থেকে এর দূরত্ব সবসময় নির্দিষ্ট রাখার ব্যবস্থা করা হয়। আর এই ব্যবস্থা বজায় রাখতে যে পরিবর্তন করতে হয় তা থেকে নমুনা তলের একটি ত্রিমাত্রিক চিত্র পাওয়া যায়।

চিত্র: একটি স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ।

উল্লেখ্য, এই স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের জন্য ১৯৮৬ সালে জার্মান পদার্থবিদ Gerd Binnig এবং সুইস পদার্থবিদ Heinrich Rohrer পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।

অন্যদিকে এটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপ হচ্ছে এক ধরনের স্ক্যানিং অণুবীক্ষণ যন্ত্র। এতে স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপের মতোই একটি সূচাল অগ্রভাগ থাকে। এই অগ্রভাগ একটি তলের উপর দিয়ে চালিয়ে নেয়া হয় এবং একটি লেজার রশ্মি দিয়ে তলের উপর চলার সময়ে অগ্রভাগটিকে কত উঁচু নিচু পথ অতিক্রম করতে হয়েছে তা পরিমাপ করে ঐ তলের একটি ছবি তৈরি করা হয়।

এভাবে সৃষ্ট ছবির রেজ্যুলেশন এক ন্যানোমিটারের ভগ্নাংশ পর্যন্ত যায়। অর্থাৎ এই যন্ত্র দিয়ে তলের প্রকৃতি একদম পারমাণবিক স্কেলে পরিমাপ করা সম্ভব। বর্তমানে অবশ্য তলের উপর দিয়ে অগ্রভাগ চালিয়ে নেওয়ার বদলে সূচাল অগ্রভাগ উঁচু নিচু করে তা দিয়ে তলের উপরে টোকা (Tap) দেওয়া হয়। এভাবে তলের আরও সঠিক ছবি পাওয়া যায়।

এই যন্ত্রে তলের উপর দিয়ে যাওয়ার সময়ে অগ্রভাগে কতটুকু বল প্রযুক্ত হলো তাও মাপা যায়। এ কারণে এর নাম পারমাণবিক বল অণুবীক্ষণ যন্ত্র (এটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপ) রাখা হয়েছে। এই দুই ধরনের মাইক্রোস্কোপের সমন্বয়েই আমাদের আলোচ্য বিজ্ঞানীদের পারমাণবিক চিত্রধারক যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছিল।

এই যন্ত্রটি পরিবর্তনশীল ভোল্টেজ ব্যবহার করে অণুটির ইলেকট্রনগুলির সাথে সরাসরি মিথস্ক্রিয়াতে অংশ নেয়। এর সাহায্যে গবেষকরা ট্রাইএঙ্গুলিনের জাতক অণুর জটিল আণবিক গঠন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। ছবি তোলার পরপরই এই বিজ্ঞানীদের মাথায় ধারণা আসে যে এই একই মিথস্ক্রিয়ার সাহায্যে হয়তো অণুটির রাসায়নিক গঠনেও পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা তখন আগের পদ্ধতিতেই অণুটির বিভিন্ন স্থানে অতি-সূক্ষ্মভাবে নির্দিষ্ট ভোল্টেজের বিদ্যুৎ চালনা করে ট্রাইএঙ্গুলিনের এই জাতক অণু থেকে অতিরিক্ত দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হন। সরিয়ে নেবার ফলে তৈরি হয় সেই বহুল আরাধ্য ট্রাইএঙ্গুলিন অণু।

এই অণুটি এরপর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে (নিম্ন চাপ ও তাপমাত্রায়) চারদিন টিকে ছিল। এরপর তা এর চেয়ে স্থিতিশীল অন্য অণুতে পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই সময়টা কম নয়। এর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট সময়। বলা যায় প্রয়োজনীয় সময়ের চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী ছিল এটি।

জুরিখে আইবিএমের গবেষক দলের প্রধান লিউ গ্রোস নেচার পত্রিকাকে এক সাক্ষাৎকারে এ আবিষ্কারের ব্যাপারে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন যে ট্রাইএঙ্গুলিনই প্রথম অণু যেটি তারা (পদার্থবিদরা) তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন যেখানে অন্যান্য রসায়নবিদরা তৈরির বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।

১৯৫৩ সালে চেক রসায়নবিদ এরিক ক্লার ট্রাইএঙ্গুলিনের অস্তিত্বের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। উল্লেখের পর থেকেই এটিকে রহস্যময় যৌগ হিসেবে ধরা হতো- এটি সংশ্লেষণের জন্য বহু চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত বিফল হয়েছে।

অবশেষে এই ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এসে ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনীশ মিস্ত্রি ও ডেভিড ফক্সদের গবেষণা দল ও আইবিএম-এর গবেষণা দলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় যৌগটি তৈরি করা সম্ভবপর হলো। নেচার ন্যানোটেকনোলজি পত্রিকার ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ইস্যুতে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র

  1. http://www.iflscience.com/physics/physicists-forge-impossible-molecule-chemists-failed-make/
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/IBM Section 12.7 Baeyer Strain Theory (Page 442), Chapter 12 Alicyclic Hydrocarbons, Organic Chemistry Fifth Edition, Robert Thornton Morrison, Robert Neilson Boyd
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Olympicene#/media/File:Olympicene.svg
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Olympicene#/media/File:Olympicene_AFM.jpg
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Olympicene
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Triangulene https://en.wikipedia.org/wiki/Toluene#/media/File:Toluol.svg https://en.wikipedia.org/wiki/Benzene https://en.wikipedia.org/wiki/Erich_Clar
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/Scanning_tunneling_microscope
  8. https://en.wikipedia.org/wiki/Atomic-force_microscopy
  9. https://en.wikipedia.org/wiki/Radical_(chemistry)
  10. Section 13.2 Structure of benzene (Page 478), Chapter 12 Aromaticity Benzene, Organic Chemistry Fifth Edition, Robert Thornton Morrison, Robert Neilson Boyd

৮১ বছর বয়স্ক নারীর স্মার্টফোন অ্যাপ তৈরি

বয়স তাঁর ৮১ বছর। যে বয়সে চলতে গেলেও অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে, সে বয়সে জাপানি এই নারী একটি স্মার্টফোন অ্যাপ বানিয়ে দেখিয়েছেন। তার নাম মাসাকো ওয়াকামিয়া। তিনি অ্যাপলের জন্য একটি গেম তৈরি করেছেন। গেমটির নাম নাম দিয়েছেন ‘হিনাদান’।

CNN-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন “আমাদের আঙুলের নড়াচড়ার গতি তরুণদের তুলনায় কম হওয়ায় বিভিন্ন গেমে তাদের সঙ্গে খুব সহজেই আমরা হেরে যাই।” বৃদ্ধদের জন্য উপযোগী অ্যাপ তৈরি করার জন্য কিছু মানুষের সাথে যোগাযোগ করেন। কিন্তু তাদের কেউই আগ্রহ প্রকাশ করেনি। তাই নিজেই খেটেখুটে একটা এপ বানিয়ে ফেলেন।

অ্যাপটি সম্পর্কে মাসাকো বলেন “আমি একটি মজার অ্যাপ তৈরি করতে চেয়েছিলাম, যাতে বয়স্ক ব্যক্তিরা স্মার্টফোনের প্রতি আগ্রহী হয়। আর এটি বানাতে আমার প্রায় আধা বছর লেগেছে।”

ওয়াকামিয়া ৬০ বছর বয়স থেকে কম্পিউটার ব্যবহার করছেন। পারিবারিক জটিলতা ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে কম্পিউটার শেখা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা সহজ ছিল না। নতুনদের প্রতি তার পরামর্শ “তোমাকে পেশাদার হয়তো হতে হবে না, কিন্তু সৃজনশীল হতে হবে।”

featured image: riarumi.com

মহাকর্ষ যেভাবে শ্রোডিংগারের বিড়ালকে ধ্বংস করে

অনেকের কাছে বিড়াল বেশ আদুরে। পদার্থবিজ্ঞানেও একটি আদুরে বিড়াল আছে। পৃথিবীর আর সব বিড়ালের সাথে পার্থক্য এটাই যে এর কোনো ভৌত অস্তিত্ব নেই। গালভরা নাম- শ্রোডিংগারের বিড়াল। এই উপমা নিহিত বিড়ালটি পদার্থবিজ্ঞানের চমৎকার শাখা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আচরণ বোঝাতে বর্ণনা করা হয়।

অস্ট্রিয় পদার্থবিদ আরভিন শ্রোডিংগার বিখ্যাত এই মানস-পরীক্ষণের ব্যাখ্যাকার। বিড়াল যদি কোয়ান্টাম তত্ত্বানুযায়ী আচরণ করে, তাহলে এটি একইসাথে একাধিক দশায় অবস্থান করবে। একইসাথে জীবিত এবং মৃত হিসেবে থাকবে। পর্যবেক্ষণ না করে নিশ্চিতভাবে কখনোই বলা সম্ভব না বিড়ালটি কোন দশায় আছে। এই ঘটনাটি অণু-পরমাণুর জগতে ঘটে, যা বাস্তব জগতের একটি বস্তু দিয়ে বোঝানো হয় কোয়ান্টাম জগতে এর আচরণ কেমন।

প্রাত্যহিক জীবনে এমন বিড়াল দূরে থাক, বিড়ালের লেজও তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু কেন পাওয়া যাবে না তার উত্তর কী? দৈনন্দিন পৃথিবীতে কোয়ান্টাম সুপারপজিশন না দেখতে পাওয়ার জন্য পদার্থবিজ্ঞানীরা কারণ হিসেবে আঙুল তুলেন পরিবেশে বিদ্যমান ঘটনার ব্যতিচারকে। সুপারপজিশন? এর মানে হলো কোনো বস্তু একই সময়ে দুটি ভিন্ন স্থানে অবস্থান করা।

ঘটনার ব্যতিচার হচ্ছে যখন দুটো ঘটনা একটি আরেকটিকে নাকচ করে দেয়। যখনই কোনো কোয়ান্টাম বস্তু কোনো বিক্ষিপ্ত বা ইতস্তত পরিভ্রমণরত কণার সাথে মিথষ্ক্রিয়া করে তখন প্রকৃতি কেবল একটি দশাকে বেছে নেয়। আমাদের দৈনন্দিন দৃষ্টিভঙ্গির আদলে কেবল একটি দশাই ফলাফল হিসেবে থাকে। বিড়ালের বাক্স খুলে ফেলা হলো মিথষ্ক্রিয়ার উপমা। বাক্স খোলামাত্র বিড়ালকে একটি দশায় পাওয়া যাবে, কিন্তু খোলার আগে কোনো দশাই নিশ্চিত নয়।

কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানীরা যদি কোনো বৃহৎ বস্তুকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করতে পারতেন কোয়ান্টাম সুপারপজিশনে, এরপরও সেটি একটি দশায় গিয়ে ঠেকবে। ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার গবেষকেরা বলেন, আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে কোয়ান্টাম সংলগ্নতা রক্ষা করার ক্ষেত্রে কোথাও শ্রোডিংগারের বিড়ালের হয়তো একটি সুযোগ থাকতে পারে, কিন্তু পৃথিবী বা কোনো নিকট গ্রহে সেরকম কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। গবেষক ইগোর পাইকোভস্কি বলেন এর কারণ, মহাকর্ষ।

বিজ্ঞানের সেরা জার্নাল নেচারে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে পাইকোভস্কি[] এবং তার সহকর্মীদের এ ধারণা বর্তমানে গাণিতিক যুক্তিতর্কের অধীনে রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের পরীক্ষণ-পদার্থবিদ হেন্ড্রিক আলব্রিক্ট এর পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টার আশাবাদ করেন। তিনি এই গবেষণাপত্রের নিরীক্ষণের দায়িত্বে আছেন। তবে পরীক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করতে এক দশক সময় লেগে যেতে পারে।

অভিকর্ষ কীভাবে বিড়ালকে নাকচ করে দেয়?

সিনেমাপ্রেমী দর্শক যারা ইন্টারস্টেলার মুভিটি দেখেছেন তারা এই গবেষণাপত্রের মূলনীতির সাথে সহজে পরিচিত হতে পারবেন। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের কাছে যাওয়া যাক। যদি কোনো অতিকায় ভরবিশিষ্ট বস্তুর কাছাকাছি কোনো ঘড়ি নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে সেটা খুব ধীরে চলবে। শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেবে।

ইন্টারস্টেলার মুভিতে দেখা যায় অভিযাত্রীরা কৃষ্ণবিবরের কাছে এক গ্রহে অবতরণের পর সেখানকার এক ঘণ্টায় পৃথিবীতে সাত বছর পেরিয়ে যায়।[] শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্র সেখানকার সময়কে শ্লথ করে দিয়েছে। এই সময় শ্লথের বিষয়টি যন্ত্র-নিরপেক্ষ। কাঁটার ঘড়ি হোক, ডিজিটাল ডিসপ্লের ঘড়ি বা কোনো সিজিয়াম পরমাণুর কম্পন দিয়েই মাপা হোক সময়ের পরিমাপ শ্লথই পাওয়া যাবে।

বাস্তবিকভাবেই অত্যন্ত সূক্ষ্মতর স্কেলে পৃথিবীপৃষ্ঠের নিকটে স্থাপিত কোনো অণু পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে দূরে স্থাপিত কোনো অণুর সাথে সময়ের ধীরলয় পাওয়া গেছে।

পাইকোভস্কির দল ধরতে পারে যে, স্থান-কালের উপর মহাকর্ষের প্রভাবে অণুর অন্তঃশক্তি প্রভাবিত হয়। অণুতে কণাসমূহের কম্পনের মাধ্যমে সময়ের সাপেক্ষে সেটা প্রকাশ পাবে। এবার আসছি আসল রাস্তায়- যদি কোনো অণুকে দুটো কোয়ান্টাম সুপারপজিশনে রাখা যায়, এদের অবস্থান এবং অন্তঃশক্তির মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক, দ্বৈততাকে ভেঙে দেবে যাতে অণু একটি অবস্থান বা পথ বেছে নিতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো বাহ্যিক কারণে অসঙ্গতি ঘটে থাকে কিন্তু এখানে অন্তঃকম্পন মিথষ্ক্রিয়া করছে অণুর নিজস্ব গতির সাথেই।

একটি বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা

উৎসের অসঙ্গতির কারণে কেউই এখনো এই প্রভাবকে পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি। যেমন চৌম্বকক্ষেত্র, তাপীয় বিকিরণ এবং কম্পন- এই বিষয়গুলো গতানুগতিকভাবে মহাকর্ষের চেয়ে শক্তিশালী। এর ফলে এরা কোয়ান্টাম প্রক্রিয়াগুলোকে বিলীন করে দেয় মহাকর্ষের প্রভাবকে ছাপিয়ে। কিন্তু পরীক্ষণবিদরা চেষ্টা করতে আগ্রহী।

ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার পরীক্ষণ-পদার্থবিদ মার্কাস আর্ন্ডট ইতোমধ্যেই পরীক্ষা করে ফেলেছেন কোয়ান্টাম সুপারপজিশন পর্যবেক্ষণ করা যাবে কিনা। তিনি কণা-তরঙ্গ (দ্বৈত চরিত্র) ইন্টারফেরোমিটারের মধ্য দিয়ে এমন প্রক্রিয়ায় বড় আকারের অণু পাঠিয়েছেন যেন প্রতিটি অণু চলার পথে দুটো ভিন্ন পথ পায়। চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, একটি অণু কেবল একটি পথেই পরিভ্রমণ করে। কিন্তু একটি কোয়ান্টাম অণু কার্যত উভয় পথেই পরিভ্রমণ করে এবং নিজের সাথেই ব্যতিচার ঘটায়। ছবিতে ব্যতিচারের বৈশিষ্ট্যসূচক তরঙ্গের প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে।

চিত্র: জটিল ও বড় অণু ব্যবহার করে প্রাপ্ত ব্যতিচার

কোয়ান্টাম আচরণ ভেঙে দিতে মহাকর্ষের সক্ষমতা পরীক্ষায় অনুরূপ পরীক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। উল্লম্ব ইন্টারফেরোমিটারের সাথে তুলনা করলে এক পথের সাথে অন্য পথের সাপেক্ষে সময়-প্রসারণের ফলে সুপারপজিশন অসঙ্গত হয়ে পড়বে। ইন্টারফেরোমিটার হচ্ছে ব্যতিচার (Interference) ব্যবহার করে দুটো আলোক রশ্মির সূক্ষ্ম মাপজোখ করার যন্ত্রবিশেষ।

গত বছর যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (যা খুবই সূক্ষ্ম) পাওয়া গিয়েছিল তা খুঁজে পেতেও ইন্টারফেরোমিটার ব্যবহার করা হয়েছিল। মহাকর্ষের প্রভাব পেতে ইন্টারফেরোমিটারের আনুভূমিক সেট আপে সুপারপজিশন দেখা যেতে পারে। আর্ন্ডট ৮১০ পরমাণু বিশিষ্ট বড় অণু পর্যন্ত এই প্রভাব পরীক্ষা করেছেন।[]

বড় অণুগুলো মহাকর্ষীয় প্রভাব পরীক্ষণে সুবিধাজনক। কেননা তারা অধিক সংখ্যক কণা ধারণ করে যারা অন্তঃশক্তিতে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু সূক্ষ্মতর পরীক্ষণগুলোর সতর্কতাও রাখতে হয় তুঙ্গে। এ পরীক্ষা সম্পন্ন করতে যে শুধু বাহ্যিক পরিবেশের প্রভাবককেই দমিয়ে রাখতে হবে তা নয়। তাদের পরীক্ষণে দুটো পথের দূরত্ব রাখা হয় মাইক্রোমিটার সীমায়, হয় এই সীমাকে মিটারে নিয়ে যেতে হবে নয়তো ১০ লক্ষ গুণ বড় অণু ব্যবহার করতে হবে। দুটো বিষয়ই একে অপরের প্রতিকূল বলে এক্সপেরিমেন্ট এগিয়ে নেয়া খুব চ্যালেঞ্জিং।

যদি মহাকর্ষের প্রভাব পৃথিবীতে কোয়ান্টাম আচরণের সীমা টেনে দিতে পারে, বড় বস্তুর জন্য কোয়ান্টাম বাস্তবতা আমাদেরকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র

[১] http://www.nature.com/news/how-gravity-kills-schr%C3%B6dinger-s-cat-1.17773

[২] http://interstellarfilm.wikia.com/wiki/Gargantua

[৩] http://pubs.rsc.org/en/Content/ArticleLanding/2013/CP/c3cp51500a

featured image: phys.org

ইউরি গ্যাগারিনঃ মহাকাশের প্রথম নায়ক

ইউরি গ্যাগারিন। একজন সোভিয়েত বৈমানিক এবং নভোচারী। তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি মহাকাশ ভ্রমণ করেন। ভস্টক নভোযানে করে ১৯৬১ সালের ১২ই এপ্রিল, পৃথিবীর কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করেন।

গ্যাগারিন এর ফলে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নায়কে পরিণত হন। দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার এবং পদক লাভ করেন। ভস্টক ১ তার একমাত্র মহাকাশ যাত্রা হলেও, তিনি সুয়োজ ১ মিশনের ব্যাকআপ হিসেবে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন (যা একটি ধ্বংসাত্মক বিস্ফোরণের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল)। ১৯৬৮ সালে একটি মিগ ১৫ প্রশিক্ষণ বিমান চালনার সময় বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন।

featured image: roblox.com