রাইনো ভাইরাসের পৃথিবী জয়

আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা। মিসরীয় এক পণ্ডিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ ‘এবারস পাপিরাস’ লিখছলেন। তার বইয়ে বর্ণীত অনেক রোগের মাঝে একটি রোগের নাম ছিল ‘রেশ’। রোগের নাম অদ্ভুত হলেও তার উপসর্গ ছিল আমাদের চিরচেনা কফ ও সর্দি। এর রেশ হলো সাধারণ সর্দিজ্বর। এক হিসাবে দেখা গেছে একজন মানুষ তার জীবনের গোটা একটা বছর শুধু ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়ে বিছানায় শুয়েই কাটিয়ে দেয়।

চিত্রঃ এবারস পেপিরাসের অংশ।

এই ধরনের সাধারণ সর্দিজ্বর হবার কারণ হচ্ছে রাইনো ভাইরাস। রোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে রাইনো ভাইরাসগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ভাইরাস।

গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস বিশ্বাস করতেন হাসি ঠাট্টা করার ক্ষমতা নষ্ট হলে ঠাণ্ডা লাগে। দুই হাজার বছর পরে ঊনিশ শতকের প্রথমদিকেও আমাদের জ্ঞানের খুব একটা উন্নতি ঘটেনি। ঐ সময় শরীরতত্ত্ববিদ

লিওনার্ড হিল বলেছিলেন সকালে বাইরে হাঁটাহাঁটি করলে কিংবা গরম থেকে ঠাণ্ডা পরিবেশে গেলে ঠাণ্ডা লাগে।

চিত্রঃ রাইনো ভাইরাস

প্রথমে অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করেছিলেন যে এটা হয়তো কোনো ব্যাকটেরিয়া হবে। কিন্তু মার্কিন চিকিৎসক এলফন্স ডচেজ ১৯২৭ সালে এই ধারণা উড়িয়ে দেন। তিনি মানুষের সর্দি ফিল্টার করেন। ফিল্টারের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া সরিয়ে ফেলার পরেও তা রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম ছিল। ব্যাকটেরিয়া আকারে তুলনামূলকভাবে বড় হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার পক্ষে এই ফিল্টার ভেদ করে পার পাওয়া সম্ভব নয়। শুধুমাত্র অতি-ক্ষুদ্র ভাইরাসের মাধ্যমেই তা সম্ভব।জার্মান অণুজীববিজ্ঞানী ওয়ালথার ক্রুস ১৯১৪ সালে সাধারণ ঠাণ্ডা জ্বরের কারণ সম্বন্ধে প্রথম সঠিক অনুমান করেন। তিনি তার সহকারীর সর্দি নিয়ে তা লবণের দ্রবণে দ্রবীভূত করেন। এরপর তা ফিল্টার করেন। ফিল্টারকৃত সর্দি আরো বারো জন সহকর্মীর নাকে প্রবেশ করান। তাদের মধ্যে চার জন সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হয়। তিনি একই কাজ ত্রিশ জন শিক্ষার্থীদের মাঝেও করেন। তাদের মধ্যে পনেরো জন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়। তিনি আরো পঁয়ত্রিশ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখেন যাদের উপর কোন পরীক্ষা চালানো হয়নি। তাদের মধ্যে কেবল একজন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হন। এর ফলে মোটামুটিভাবে প্রমাণ হলো আক্রান্ত সর্দি অন্য কারো নাকে প্রবেশ করালেই কেবল রোগ ছড়াচ্ছে। ক্রুসের এই পরীক্ষা থেকে ধারণা পাওয়া গেল যে সর্দিজ্বরের জন্য কোনো একটি ক্ষুদ্র জীবাণু দায়ী যা রোগীর সর্দিতে উপস্থিত থাকে।

বিজ্ঞানীদের আরো তিন দশক লেগে যায় কাঙ্ক্ষিত এই ভাইরাসের পরিচয় জানতে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল রাইনো ভাইরাস। ‘রাইনো’ শব্দটির মানে হলো নাক। প্রতিটি রাইনো ভাইরাসে দশটি করে জিন আছে। অন্যদিকে মানুষের প্রায় ২০ হাজার জিন আছে। তবে রাইনো ভাইরাস তার অল্প সংখ্যক জিন নিয়েই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

নাক থেকে সর্দি ঝাড়ার মাধ্যমে রাইনো ভাইরাস চারদিকে ছড়িয়ে যায়। মানুষ যখন নাক ঝাড়ে তখন জীবাণু হাতে লেগে যায়। হাত থেকে আবার দরজার হাতলে লাগে। এভাবে সে যেখানেই ছোঁয় রাইনো সেখানেই ছড়িয়ে যায়। একইভাবে কোন মানুষকে ছুঁলে তা ঐ মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এধরনের ভাইরাস মানুষের নাক, গলা এবং ফুসফুসের কোষ ভেদ করতে পারে। এরা কোষের ভেতরে ঢুকে পোষকের কোষকে ব্যবহার করে তার ডিএনএ’র কপি এবং তার প্রোটিন আবরণ তৈরি করে। তারপর পোষক কোষ ভেঙ্গে নতুন রাইনো ভাইরাস বেরিয়ে আসে শয়ে শয়ে।

চিত্রঃ ভাইরাসের প্রতিলিপিকরন

এবারস পেপারাসের লেখক রেশের চিকিৎসা লিখে যান। চিকিৎসাটি হলো মধু, লতাপাতা ও ধোঁয়া মিশিয়ে নাকে মালিশ করা। এরকম আরো অদ্ভুত অদ্ভুত চিকিৎসার কথা পাওয়া যায় এখানে। পনেরো শতকের দিকে রোমান পণ্ডিত প্লিনি বললেন যে নাকে ইঁদুর ঘষলে ঠাণ্ডা সেরে যাবে। সতেরো শতকে ইংল্যান্ডে ধারণা ছিল বারুদ, ডিম, গরুর মল এবং চর্বি একসাথে মিশিয়ে খেলে রোগ সেরে যাবে। লিওনার্ড হিল মনে করতেন তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে ঠাণ্ডা লাগে। তার মতে বাচ্চারা সকাল সকাল গোসল করলে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে পারবে।রাইনো ভাইরাস তুলনামূলক-ভাবে খুব কম কোষকে আক্রান্ত করে। কিন্তু তাও ঠাণ্ডা লাগলে আমাদের এত অস্বস্তি লাগে কেন? এর জন্যে যদি কাউকে দোষ দিতে হয় তাহলে তা আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই দিতে হবে। আক্রান্ত কোষ কিছু সিগন্যাল অণু তৈরি করে যাদের সাইটোকাইন বলে। সাইটোকাইন নিকটবর্তী প্রতিরক্ষা কোষকে নিয়ে আসে। ওই প্রতিরক্ষা কোষগুলোর কারণে আমাদের অস্বস্তি অনুভূত হয়। এই কারণে আমাদের গলায় খুসখুসে অনুভূতি সৃষ্টি হয়। সাথে তৈরি হয় কফ। তাই ঠাণ্ডা থেকে মুক্তি পেতে কেবল ভাইরাস থেকে মুক্তি পেলেই হবে না। সাথে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি শান্ত হওয়ার জন্যেও অপেক্ষা করতে হবে।

এই ধারণাগুলো নিয়ে হাঁসি পেতে পারে। মনে হতে পারে সেকালের মানুষেরা কত অদ্ভুত ছিল। আর কত উদ্ভট ছিল তাদের চিন্তাভাবনা। সত্যি কথা বলতে এখানে নিজেদেরকে আধুনিক ভাবার কিছু নেই। কারণ এখনো আমাদের কাছে সর্দি-জ্বরের উপযুক্ত ওষুধ নেই। সর্দিজ্বরের কোনো প্রতিষেধক এখনো আমাদের জানা নেই ।

এসবের মাঝে জিংক এক্ষেত্রে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জিংক রাইনো ভাইরাসের বংশবিস্তার বন্ধ করে দেয়। যারা ঠাণ্ডা লাগার এক দিনের মধ্যেই জিঙ্ক নেয় তারা অন্যদের চেয়ে দুয়েক দিন আগেই সুস্থ হয়ে যায়। বাবা মা অনেক সময় ঠাণ্ডা লাগলে বাচ্চাদের কফ সিরাপ দেয়। দেখা গেছে কফ সিরাপ ঠাণ্ডায় কোন উপকার করে না বরং উলটো এর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তার মধ্যে খিঁচুনি, হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যাওয়া অন্যতম। এমনকি এতে মৃত্যুও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ অধিদপ্তর শিশুদের কফ সিরাপ খাওয়ার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছে।

বেশিরভাগ সময় ডাক্তাররা ঠাণ্ডা লাগলে রোগীদের এন্টিবায়োটিক দেন। এই ধরনের চিকিৎসা পুরোপুরি বিবেচনাহীন। কারণ এন্টিবায়োটিক কাজ করে ব্যাকটেরিয়ার উপর। ভাইরাসের উপর এদের কোন কার্যকরিতা নেই। ডাক্তাররা এন্টিবায়োটিক দেবার একটি কারণ হলো তারা নিশ্চিতভাবে জানে না এটা সাধারণ ঠাণ্ডা নাকি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। অনেক সময় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অবিভাবকের চাপে পড়ে চিকিৎসকরা এন্টিবায়োটিক দেন। কিন্তু এন্টিবায়োটিকের এধরনের যথেচ্ছ ব্যবহার খুবই ভয়ঙ্কর। এতে আমাদের শরীরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি হয়। ফলে পরবর্তীতে ডাক্তারদের দেয়া এন্টিবায়োটিক তো কাজ করেই না উলটো আমাদের জন্যে মরণঘাতি হয়ে ওঠে।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক আসলে ভালো কোনো সমাধান নয়।

সাধারণ সর্দিজ্বরের কোন চিকিৎসা না থাকার একটা কারণ হলো রাইনো ভাইরাসকে আমরা খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। রাইনো ভাইরাসকে অনেক রূপে পাওয়া যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা সবেমাত্র রাইনো ভাইরাসের জেনেটিক বৈচিত্র্য বুঝতে শুরু করেছেন। বিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের প্রায় বারোটি স্ট্রেইন শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এদের মধ্যে দুটো হচ্ছে HRA-A এবং HRA-B।

কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান লিপকিন এবং থমাস ব্রিজ মিলে নিউইয়র্ক শহরের এমন কিছু বাসিন্দাদের নিয়ে গবেষণা করেন যাদের ঠাণ্ডার কারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস নয়। তারা গবেষণা করে দেখেন যে ঐসব লোকের রোগের কারণ HRA-A এবং HRA-B নয় বরং রাইনো ভাইরাসের অন্য আরেকটি স্ট্রেইন। তারা এর নাম দেন HRA-C। বিভিন্ন স্থানের HRA-C স্ট্রেইনের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। এ থেকে এটা বোঝা যায় যে এই স্ট্রেইন উদ্ভুত হয়েছে বেশিদিন হয়নি। বেশি দিন না হওয়া সত্ত্বের এটি খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের যতই স্ট্রেইন আবিষ্কার করছেন ততোই তাদের বিবর্তন সম্বন্ধে জানছেন। সকল রাইনো ভাইরাস কিছু সাধারণ জিনোম বহন করে। সাধারণ বা কমন জিনোমগুলো সকল প্রকার স্ট্রেইনের রাইনো ভাইরাসে বিদ্যমান। রাইনো ভাইরাসের এই অংশ বিবর্তনে খুব অল্পই পরিবর্তিত হয়েছে। বাকি জিনোমগুলো অনবরত পরিবর্তিত হয়ে চলছে। জিনোমের এই অংশগুলো রাইনো ভাইরাসকে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে দেহের ক্ষতি সাধন করে। আমাদের দেহ যখন এক স্ট্রেইনের জন্য এন্টিবডি তৈরি করে তখন অন্য স্ট্রেইনগুলো পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কারণ এন্টিবডিগুলো রাইনো ভাইরাসে যুক্ত হওয়ার জন্য উপযুক্ত সারফেস প্রোটিন পায় না। ফলে তা ঐ স্ট্রেইনের ভাইরাসগুলোকে মারতে পারে না।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করে ভাইরাসগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠলে তা মারাত্মক সমস্যায় পরিণত হবে।

রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা এত কঠিন হওয়া স্বত্বেও বিজ্ঞানীরা এর প্রতিরোধের ব্যাপারে আশাবাদী। আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল রাইনো ভাইরাসের একটা সাধারণ জিনোম আছে যার খুব একটা পরিবর্তন হয় না। বিজ্ঞানীরা এমন একটি ভ্যাক্সিন তৈরি করতে চাইছেন যা রাইনো ভাইরাসের জিনোমের এই অংশকে আক্রমণ করে ধ্বংস করতে পারবে। ফলে রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।রাইনো ভাইরাসের এই বৈচিত্র্যের ফলে এর উপযুক্ত প্রতিরোধ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি ভ্যাক্সিন যদি একটি স্ট্রেইনের জন্য কার্যকর হয় দেখা যায় তা অন্য আরেকটি স্ট্রেইনের জন্য কাজ করছে না। আবার কোনো স্ট্রেইনের যদি সেই ভ্যাক্সিনের বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকে তাহলে পরবর্তীতে মিউটেশনের মাধ্যমে সেটা আরো শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা তাকে ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী করে তোলে।

রাইনো ভাইরাসের এই সাধারণ জিনোম অংশটি দেখতে অনেকটা লবঙ্গের মতো। বিজ্ঞানীদের গবেসনায় প্রত্যেক রাইনো ভাইরাসে এই লবঙ্গের গঠনটি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা যদি এই লবঙ্গের মতো গঠনকে ভেঙ্গে দিতে পারেন তাহলে তারা পৃথিবীর সকল সর্দি-জ্বর প্রতিরোধে সক্ষম হবেন।

কিন্তু তা কি আসলেই ঠিক হবে? উত্তর এখনো অজানা। রাইনো ভাইরাসের ফলে আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। ঠাণ্ডা তো বাধায়ই, পাশাপাশি এটি অন্যান্য ভাইরাসকে আক্রমণের সুযোগও করে দেয়। কিন্তু রাইনো ভাইরাস নিজে আসলে আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি করে না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এধরনের ছোটখাটো ও তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর রোগ আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পরিণত ও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে তা আমাদের নানা ধরনের ইমিউন ডিজঅর্ডার রোগ যেমন এলার্জি ও ক্রন হওয়া থেকে বাঁচায়। তাই রাইনো ভাইরাসকে আমাদের পুরনো শত্রু না ভেবে পুরনো শিক্ষক হিসেবে ভাবা উচিৎ।

তথ্যসূত্র

A planet of viruses (Second edition), Carl Zimmer, 2015

https://en.wikipedia.org/wiki/Walther_Kruse

 

 

ফুলেরা কীভাবে জানে কখন ফুটতে হবে?

শীতপ্রধান দেশগুলোয় শুভ্র তুষারের খাঁজ ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে ফুলের পাপড়ি – এ দৃশ্যটি একটি আনন্দের খবর ইঙ্গিত করে। বসন্ত আসছে শীঘ্রই। কী বুদ্ধি! ফুলের পাপড়ির উঁকি দেখে আমরা মানুষেরা বলে দিবো বসন্ত আসছে। কিন্তু উদ্ভিদকে কে বলে দিল যে এখন ফুল ফোটার সময় হয়েছে? ড্যাফোডিল কেন বসন্ত এলেই ফুটতে যায়, গোলাপ কেন গ্রীষ্মের কাছে ধরা দেয়?

উদ্ভিদের এ ফুল ফোটানোর ছদ্মবেশী বৌদ্ধিক প্রবৃত্তির পেছনে আসলে কাজ করছে জিনগত জটিল প্রক্রিয়া।

এপেটেলা১ (Apetala1) নামের জিন উদ্ভিদকে ফুল ফোটানোর কাজটি করতে বলে বা এ জিনের মধ্যে ফুল ফোটার সময়ের সূত্রটি দেয়া থাকে, যেভাবেই বলা হোক আর কি।

প্রভুসুলভ এ একাকী জিনটি উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধিজনিত কর্মকান্ড শুরু করার জন্য হুকুম করে বলা চলে। অনেকটা আমাদের ঘড়ি বা ফোনে এলার্ম দিয়ে রাখার মতো। সময় হলে যেমন ঘড়ি বা ফোন নিজে থেকে বেজে উঠে আমাদের জানিয়ে দেয়, তেমনি এপেটেলা১ জিনটি এলার্মের মতো উদ্ভিদকে ফুল ফোটানোর সময়টা বলে দেয়। আর ফুল ফোটা মানেই বংশবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুতি। আর এ এলার্মিং এর কাজটি এপেটালা১ একাই করে ফেলে, অন্য কোনো জিনের সাহায্য ছাড়াই।

উদ্ভিদের মাঝে আবার এপেটেলা১ জিনের সক্রিয়তা নিষ্ক্রিয়তার ব্যাপার আছে। এ জিন সক্রিয় থাকলে ফুল ফোটে, আর যে উদ্ভিদে নিষ্ক্রিয় সেটায় ফুল ফোটা বিরল প্রায়। ইতিবাচকভাবে কিছু ঘটলে যেটুকু হয় তা হলো তখন ফুল-পাপড়ির বদলে কান্ড পত্রবহুল হয়ে ওঠে।

আগেই বলেছি এপেটেলা১ একটি প্রভুসুলভ একাকী জিন। এটি প্রোটিন তৈরি করে, যার ফলে সে প্রোটিনগুলো আরো ১০০০টি জিনকে ফুল ফোটানো সংক্রান্ত কাজে লিপ্ত করে। এ তথ্যটি আবিষ্কার করেছেন ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের প্ল্যান্ট ডেভেলাপমেন্টাল জেনেটিক্স গবেষণাগারের গবেষকরা।

প্রায় এক দশক আগে এপেটেলা১-কে উদ্ভিদের পুষ্পায়নের পেছনে দায়ী গুরু নিয়ন্ত্রক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এবারই প্রথম বিজ্ঞানীরা এপেটেলা১ কীভাবে অন্যান্য বর্ধমান জিনদের সাথে যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ করে তা দেখতে সক্ষম হলেন। গত শতাব্দীর ৩০ এর দশকে রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা পুষ্পায়পনের জন্য কল্পনা করেছিলেন কোনো এক রহস্যজনক পদার্থ দায়ী, যার ফলে ফুলের কুঁড়ির আবির্ভাব হয় গাছে। সে পদার্থটির নাম দিয়েছিলেন ফ্লোরিজেন (florigen)।

ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের স্মার্ফিট ইনস্টিটিউট অব জেনেটিক্সের ডক্টর ফ্রাঙ্ক ওয়েলমার গবেষণাপত্রটির একজন শীর্ষ লেখক। তিনি বলেন, “আমাদের আবিষ্কারটি ফুলের ক্রমবিকাশের জিনগত প্রক্রিয়ায় এক নতুন এবং বিস্তারিত অন্তর্দৃষ্টির সূত্রপাত করেছে। আমরা এখন জানি কোনো জিনটি নিয়ন্ত্রণ করে উদ্ভিদের পুষ্পায়ন ঘটানো বা থামানো সম্ভব। এ ঘটনাটি উত্তেজনাকর এজন্য যে, আমরা বুঝতে শুরু করছি ফুল ফোটার মাধ্যমে কীভাবে উদ্ভিদ প্রজনন দশায় প্রবেশ করে।”

বিষয়টির চমক পাঠককে ধরিয়ে দিচ্ছি। ধরুন, একটি শহরের যত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আছে তার প্রতিটি যন্ত্রপাতির জন্য একটি করে সুইচ আছে। আর সবগুলো সুইচ একত্রে আপনার কাছে আছে, লক্ষ লক্ষ! আর আপনি এর মধ্যে থাকা একটি সুইচ যেটা কিনা হয়ত শহরের সাইরেনের সুইচ সেটা চিনে গেলেন। মানে হচ্ছে একটি বিরাট অজানা সংখ্যক সুইচ থেকে আপনি হয়ত কাজের একটা সুইচ বের করে ফেললেন, বা সেটি আপনার ঘরের বাতির সুইচও হতে পারে। জানা না থাকলে হয়ত আপনি নিজের ঘরের আলো জ্বালতে গিয়ে আরেকজনের ঘরের এয়ার কুলার ছেড়ে দিতেন!

এপেটেলা১ জিন হলো ফুল ফোটানোর সুইচের মতো। যখন এপেটেলা১ জিনটি সক্রিয় হয় (সুইচ অন করে), তখন অন্যান্য জিনদের প্রতি এর প্রথম কমান্ড হলো উদ্ভিদের ভাজক টিস্যুদেরকে একটি ‘স্টপ’ সংকেত পাঠানো, যাতে উদ্ভিদের পাতার উৎপাদন থেমে যায়। উদ্ভিদের বর্ধনশীল অঞ্চলগুলোয় থাকা ভাজক টিস্যুগুলো তখন সতর্ক হয়ে যায় এবং পাতার পরিবর্তে ফুলগঠনের দিকে ব্যস্ত হয়।

উদ্ভিদের বিভিন্ন সময়ে ফুল ফোটানোর জন্য কিছু বাহ্যিক নিয়ামক রয়েছেঃ আবহাওয়া, তাপমাত্রা, উদ্ভিদ কর্তৃক গৃহীত সূর্যালোকের পরিমাণ প্রজননের বিকাশে প্রভাব রাখে। এ পারিপার্শ্বিক প্রভাবের তথ্যগুলো এপেটেলা১ এর কাছে পৌছে যায়। আর এপেটেলা১ বুঝে যায় যে ফুল ফোটানোর কাজ শুরু করে দিতে হবে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন নাটকীয়ভাবে প্রভাব রাখছে ফুল ফোটার সময়ের উপর। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেন এমন সময়ে ফুল ফোটার ঘটনা ঘটেছে, যা কিনা ২৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শীঘ্রতম। তথ্যটি নেয়া হয়েছে নেচার ক্যালেন্ডারের উপাত্ত থেকে। জাতীয় পর্যায়ে ব্রিটেন এই জরিপের কাজটি করেছে উডল্যান্ড ট্রাস্ট এর সহায়তায় Centre for Ecology & Hydrology (CEH) এর অধীনে।

ব্রিটেনের নাগরিকদের দেয়া তথ্য দিয়ে একটি সূচক তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে CEH এর গবেষকরা ৪০৫টি ফুলের প্রজাতির ফুল ফোটার তারিখের তথ্য বের করেছেন। তা থেকে গবেষকরা উদ্ভিদের জীবনচক্রের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণার এ শাখাটির নাম জলবায়ুবিদ্যা। তারা বলেছেন, বছরের শেষের দিকের ফুলের প্রজাতিগুলোর চেয়ে বসন্তে ফোটা ফুলের প্রজাতিগুলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন, এ গবেষণার লাভটা কী? ফুলের ফোটার সময়ের কারণ জেনে আমরা কী করব?

উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে এপেটেলা১ এর ভূমিকা ধরে ফেলার মাধ্যমে আমরা আমরা জিন প্রকৌশলের দিকে আরো একধাপ এগিয়ে গেলাম। প্রজননকারী এবং চাষীদের সক্ষমতা তৈরি হবে আকাঙ্ক্ষিত সময়ে ফুল, আরেক অর্থে বললে ফসলের উৎপাদন করতে। উদ্ভিদের প্রজননকে নিয়ন্ত্রণ করে ফল/ফসলের উৎপাদনের সময়ও হ্রাস করে আনা সম্ভব হবে।

ওয়েলমার বলেন, “ফুল ফোটার উপর বিস্তারিত জ্ঞান প্রজননকারীদের নিপুণভাবে উদ্ভিদের ক্রমবিকাশ ও বৃদ্ধিতে কাজে লাগাতে সহায়তা করবে। পরবর্তীতে অধিক ফসল উৎপাদনের জন্য দক্ষ চাষাবাদের সুযোগ বাড়বে।”

– শাহরিয়ার কবির পাভেল

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ,শাবিপ্রবি

 

তথ্যসূত্র:

http://www.livescience.com/32529-how-do-flowers-know-when-to-bloom.html

http://www.livescience.com/377-mystery-solved-plants-flower.html

 

মাঁয়াজালের পদার্থবিজ্ঞান

‘ম্যাজিশিয়ান’ বা ভেল্কিবাজ বলতে সাধারণ দৃষ্টিতে কোনো সুপারন্যাচারাল ক্যারেক্টারকে বোঝালেও এটা মানতেই হবে যে সত্যিকার অর্থে তারা বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিকের একজন অভিজ্ঞ প্রয়োগকারী। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে- তারা পদার্থের কিছু বিশেষ ধর্ম ও অদ্ভুত আচরণ এমন অভিজ্ঞতার সাথে আয়ত্ব এবং সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করেন যা সাধারণ মানুষের অজানা এবং তাদের কাছে অতিপ্রাকৃত বলে মনে হয়। চলুন দেখে নেই বর্তমান সময়ের কিছু সহজ ও জনপ্রিয় ম্যাজিক বা ‘অতিপ্রাকৃত’ ঘটনায় ব্যবহৃত পদার্থ, তাদের আচরণ এবং তাদের পেছনের বিজ্ঞান সম্পর্কে।

১. ম্যাগনেটিক ফ্লুইডঃ

ফেরোম্যাগনেটিক ফ্লুইড হলো এক ধরনের চৌম্বকীয় তরল যা চৌম্বক পদার্থের প্রতি আকর্ষণ করে বেয়ে চলে। খুব সহজেই এটি তৈরি করতে পারেন। যা যা লাগবে- প্রিন্টার টোনার (কালি), ভোজ্য তেল, ও শক্তিশালী প্রাকৃতিক চুম্বক। একটা জারে ৫০ মিলি টোনার এবং ২ চা চামচ ভোজ্য তেল নিয়ে মেশাতে হবে। এবার জারের গায়ে চুম্বক ধরলে দেখা যাবে টোনার ওই চুম্বকের সাথে সাথে ওঠানামা করছে একই সাথে তার পৃষ্ঠতলও খাঁজকাটা আকার ধারণ করেছে।

এখানে বলে রাখা ভালো সনাতন প্রিন্টারের কালিতে এটি হবে না। কারণ এগুলো হলো প্লাস্টিক সিন্থেটিক, যা স্থিতিক তড়িতের সাহায্যে কালি কাগজে ছাপে। বর্তমান প্রায় সকল লেজার প্রিন্টারে ‘Photoconductor Metering Magnet’ রোলার ব্যবহার করা হয় যার

জন্য টোনার তৈরি করা হয় Coated Magnetic Carrier হিসাবে। তাই এটি চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয়। আর এই চৌম্বক কণাগুলো একটা আরেকটার উপর বসে পিরামিড গঠন করে, যার ফলে খাঁজকাটা আকৃতি তৈরি হয়। আর তেল ব্যবহার করা হয় টোনারের ঘনত্ব কমিয়ে একে আরো পাতলা করতে।

২. ইন্সট্যান্ট আইসঃ

এটাও ঘরে বসে খুব সহজে তৈরি করা যায়। এর জন্য লাগবে শুধু ১৬.৯ আউন্সের বুদবুদ বিহীন পরিশোধিত পানি ভর্তি বোতল, যা আগে কখনোই খোলা হয়নি। এবার এটিকে ২ ঘন্টা ৪৫ মিনিট রেফ্রিজারেটরে রেখে দিতে হবে। বের করে সজোরে আঘাতের পর ধীরে ধীরে পানি ঢাললে দেখা যাবে তরল পানি পড়ার সাথে সাথেই বরফ হয়ে যাচ্ছে। আরো অদ্ভুত বিষয় হলো সামান্য এক টুকরা বরফ যদি পানির গ্লাসের এক কোণায় দেওয়া হয় তবে পুরো গ্লাসের পানিই বরফ হয়ে যাবে।

এর কারণ হলো ‘নিউক্লিয়েশন’ (Nucleation process), যার মাধ্যমে পানির অণু ক্রিস্টাল আকার ধারণ করে। এর প্রয়োজনীয় শক্তি আসে আঘাত থেকে। প্রথমে একটা ক্রিস্টাল নিউক্লিয়াস তৈরি হয় তারপর একটা চেইন রিএকশনের মাধ্যমে পুরো বোতলে ছড়িয়ে পড়ে। গ্লাসের ক্ষেত্রে, ঐ ফেলানো বরফ টুকরোটাই নিউক্লিয়াসের কাজ করে। আর পড়ার আঘাতটা চেইন বিক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো গ্লাসের পানিকে বরফ করে দেয়।

৩. ফ্যারাডে কেজ/সুইটঃ

ফ্যারাডে কেজ হলো একটা বদ্ধ বেষ্টনী, যার বহির্পৃষ্ঠ তড়িৎ পরিবাহক হিসেবে কাজ করে। এটি গোলক, সিলিন্ডার বা বক্স যে কোনো আকৃতির হতে পারে। যা লাগবে- একটি কার্ডবোর্ড বা কাঠের তৈরি বাক্স বা অন্য যেকোনো তড়িত অপরিবাহক পদার্থ এবং অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বা যেকোনো তড়িৎ পরিবাহক পদার্থ। ভেতরের দিকে অপরিবাহক দিয়ে তার গায়ে পরিবাহক পদার্থ সেটে দেওয়া হয়। ফলে এই সুইট বা কেজ এ আবদ্ধ ব্যক্তি তার উপর দিয়ে হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতে পারেন। এই কৌশল দেখিয়ে ম্যাজিশিয়ান Wayne Houchin, 2013 সালে শত শত লন্ডনবাসীকে আভিভূত করে দিয়াছিলেন।

 

এটা সাধারণত পরিবাহক লেয়ারে আগত তড়িৎক্ষেত্র প্রতিফলিত করে, পরিবাহক আগত শক্তিকে শোষণ করে, এবং খাঁচাটা বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে। যখন কোনো বহিরাগত তড়িৎক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয়, পদার্থের

ইলেকট্রনগুলো একপাশে সরে গিয়ে নেগেটিভ চার্জ প্রদান করে। তখন অসমতা পূরণের জন্য নিউক্লিয়াই পজিটিভ চার্জ প্রদান করে। এই প্রভাবিত চার্জগুলো একটি বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে যা পুর্বে প্রদত্ত বহিরাগত তড়িৎ ক্ষেত্র কে সরিয়ে দেয়।

. বেন্ডিং ওয়াটারঃ

নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে এই কৌশলটি Houchin দেখিয়েছিলেন। একটি কাঠি দিয়ে তিনি স্বাভাবিকভাবে পতিত পানির প্রবাহকে ইচ্ছামতো বাঁকাতে, ঘুরাতে, ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করতে এমনকি বিপরীত দিকেও প্রবাহিত করতে পারতেন। তবে সেক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেছিলেন কয়েক লক্ষ ভোল্ট। এর সরলীকৃত রূপটা এভাবে তৈরি করা যেতে পারে- একটি প্লাস্টিকের চিরুনী বা বেলুনকে চুলে ঘষে নিয়ে একে ট্যাপের খুব সূক্ষ্ম পানি প্রবাহের নিকট ধরলে দেখা যাবে পানি প্রবাহ ঐ বেলন বা চিরুনির প্রান্তের দিকে বেঁকে আসছে। এর কারণ ঘর্ষণের ফলে চিরুনী ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত হয় যা পানির ধণাত্বক চার্জকে আকর্ষণ করে, তাই পানি বেঁকে যায়। একই জিনিস যখন, উচ্চ ঋণাত্বক বিভবে করা হয় তখন তা আরো তাৎপর্যমন্ডিত হয়ে ওঠে।

. বোতলের মেঘঃ

এটি তৈরি করতে যা যা ব্যবহার করা হয়- ১ লিটারের পানির বোতল, গরম পানি, ও দিয়াশলাই। গরম পানি বোতলের কিছুদুর পর্যন্ত ভর্তি করে এর ভেতর জ্বলন্ত দিয়াশলাই এর কাঠি ধরা হয়। যখন সম্পূর্ণ বোতল ধোঁয়া দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায় তখন এর ছিপি আটকে দেয়া হয়। ঐ অবস্থায় একে দু হাত দিয়ে সজোরে চাপ দিয়া কয়েকবার সংকুচিত করা হয়। এরপর স্বাভাবিক অবস্থায় রাখলে দেখা যায় ভেতরে ঘন মেঘের কুন্ডুলি তৈরি হয়েছে। এর ব্যাখ্যা হলো, বোতল যখন সংকুচিত করা হয় তখন এর মধ্যকার গ্যাসও সংকুচিত হয়, ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। আবার ছেড়ে দিলে গ্যাস প্রসারিত হয়, ফলে তাপমাত্রা কমে যায়। তাপমাত্রা যখন কুয়াশা বিন্দুর নিচে চলে যায়, তখন বাষ্প মেঘে পরিণত হয়।

৬. অদৃশ্য কালিঃ

লাল কালি প্রস্তুতের জন্য ফেনলফ্যথালিন (.10 g) ও ইথানল (10 ml) পানির (90ml) সাথে মেশানো হয়। এরপর গাঢ় লাল না হওয়া অবধি এতে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড ড্রপার দিয়ে যোগ করা হয়। সাধারণত 3M ঘনমাত্রার ২০ টা ড্রপ। কালি প্রস্তুত হয়ে যাবে। কোনো কাপড়ে দাগ দিলে কয়েক সেকেন্ড পর তা আর দেখা যাবে না। এরূপ হবার কারণ হলো, কালি যখন দেয়া হয় এর পানি বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইডের সাথে কার্বনিক এসিড তৈরি করে। এই কার্বনিক এসিড সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের সাথে নিউট্রালাইজেশন বিক্রিয়া করে সোডিয়াম কার্বনেট তৈরি করে। এবং ক্ষারকের এই নিউট্রাল অবস্থাই রঞ্জকের বর্ণ পরিবর্তন করে কালির দাগ অদৃশ্য করে দেয়।

৭. কাগজের ব্যাগে পানি ফুটানোঃ

জিনিসটাকে আরো আকর্ষণীয় করতে এটাকে উন্মুক্ত বুনসেন বার্নারের শিখায় করা হয়। বার্নারের উপর একটা রিং স্ট্যান্ড দিয়ে তার উপর শক্ত পর্দা দেওয়া হয় তাপ ভালোভাবে ছড়ানোর জন্য। প্রায় ৪”-৬” পেপার ব্যাগে ২০০ মিলি পানি নিয়ে এর উপর রাখলেই নির্দিষ্ট সময় পর ফুটতে আরম্ভ করবে। এটা হয় কারণ, কাগজ খুব কম তাপ পরিবাহক। এটি তাপ ধীরে প্রবাহিত করে। কিন্তু পানির তাপমাত্রা বাড়তে থাকে এবং একসময় স্ফূটনাঙ্কে পৌছে যায়। এই তাপই পানিকে কাগজ ভেদ করে বাইরে আসতে বাধা দেয়, এবং পানির উচ্চ তাপ ধারকত্ব, তাপ ধরে রেখে কাগজকে পুড়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখে।

৮. ফায়ার ব্রেথিংঃ

অধিকাংশই মুখে জ্বালানি নিয়ে করা হয়ে থাকে। কিন্তু এটি নিরাপদ ও বিজ্ঞান সম্মত নয়। সবচেয়ে নিরাপদ উপায়ে করার জন্য দরকার পড়বে- কর্ন স্টার্চ, বড় একটা চামচ, ও অগ্নিশিখা। চামচ ভর্তি কর্ন স্টার্চ মুখে নিয়ে শ্বাস বন্ধ রাখা হয়। এরপর একটা শিখার উপর এটি ফু দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। তখন ঐ প্রবাহিত স্টার্চ পুড়ে মুখ পর্যন্ত আগ্নিপ্রবাহ তৈরি করে। এর কারণ হলো কর্ন স্টার্চ কখনো একত্র অবস্থায় সহজে পুড়ে না। কিন্তু যখন এর গুড়া মুখ দিয়া স্প্রে করা হয় তখন এটি জ্বালানীর মতো পুড়তে থাকে। কারণ স্টার্চ হল কার্বোহাড্রেট যার গুড়া খুব দ্রুত পুড়ে যায়।

এরকম আরো অজস্র উদাহরণ আছে যেগুলো অসাধারণ হয়ে উঠে শুধু তার উপস্থাপনের কৌশল এবং তাদের সাধারণ ধর্মের কারণে। বিভিন্ন পদার্থের ধর্মগুলো যদি একে অন্যের সাথে কোনো তাৎপর্যের ভিত্তিতে সংযুক্ত কারা যায় তাহলে দেখা যাবে, নতুন কোনো অসাধারণ ঘটনার জন্ম হয়েছে। যা আমরা সাধারণ মানুষেরা চিন্তা করি না, ম্যাজিশিয়ানরা তা ব্যবহার করেই আমাদের দৃষ্টিভ্রম করেন।

তথ্যসূত্র

http://chemistry.about.com/od/chemistrymagic/tp/Water-Tricks.htm

http://the.richest.com/amaging_experiment_you_can_do_at_home

https://en.wikipedia.org/wiki/Faraday_cage

http://iflscience.com/chemistry/turn-water-ice-instantly

http://thesurvivalistblog.net/build-your-own-faraday-cage-heres-how/

http://michaelkriss-2015-technology-and-engineering

অট্টহাসি রোগ ও অনিষ্টের রূপ

কখনো কখনো আমরা সবকিছু ভিন্ন চোখে দেখতে বাধ্য হই। তবে এটা মোটেও সহজ নয়। মানুষ অভ্যাসের দাস। তাই আমরা প্রথম দর্শনে যা ভাবতে অভ্যস্ত হই তার শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে যাই। প্রিয়নদের ব্যপারে ঠিক এরকমই ঘটেছে। প্রিয়ন এক ধরনের প্রোটিন। এদের আকার নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে বদলে যায়। ফলাফলে এরা মারাত্মক রোগের মূল কারণ হয়ে পড়ে। কোনো প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন বদলে গেলে তা অনেক ব্যাধির কারণ হতে পারে। তাই প্রিয়ন-প্রোটিনের আকার বদলে গিয়ে রোগের কারণ হয়ে যাওয়াটা অণুপ্রাণবিজ্ঞানে নতুন কোনো ধারণা নয়। যে ধারণা নতুন তা হলো প্রোটিন নিজেই রোগ সংক্রমণের মূল কারণ হতে পারে।

সংক্রমক বলতে একটি অস্তিত্বকে বোঝানো হয় যা কোনো জীব থেকে অন্য জীবে (বা এক কোষ থেকে অন্য কোষে) ছড়ানোর মাধ্যমে রোগ বিস্তারে ভূমিকা রাখে। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া কোনো জীবে সংক্রমিত হওয়ার সময় নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধি করে। এসময় বিভিন্ন কোষ মেরে ফেলে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। যেমন উদাহরণ টানা যায় মেনিনজাইটিস, ফ্লু কিংবা এইডস রোগের ক্ষেত্রে। তেমনি কিছু কিছু প্রিয়ন প্রোটিন আছে যাদের আকার বদলে গেলে সংক্রমণশীল হয়ে পড়ে। ফলে ভেড়ার স্ক্র্যাপি বা মানুষের ক্রুয়েটজফেল্ড-জ্যাকব রোগের মতো স্নায়ু্ক্ষয়জনিত অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এরা। সম্প্রতি এমন একটি প্রিয়ন আবিষ্কৃত হয়েছে যার স্বভাব ভিন্ন প্রকৃতির। এটি নিজের রূপ বদলাতে চায় না। এর নাম PrP V127

প্রচলিত মতের বিপরীতে প্রিয়ন (PrP) মাত্রই যে ক্ষতিকর এমনটা নয়। বিভিন্ন জীবে এরা প্রাকৃতিকভাবেই

বিরাজ করে (PrPc)– বিশেষত মগজে। কোষ দৃঢ়সংলগ্ন হয়ে লেগে থাকাতে আর কোষের ভেতরে সংকেত পরিবহনে এরা ভূমিকা পালন করে বলে ভাবা হয়। তবে ত্রিমাত্রিক গঠন ভুলভাবে ভাঁজ হয়ে গেলে (PrPSc) এরা অনিষ্টকারী হয়ে পড়ে। রূপের পরিবর্তনের কারণে কেন এরা নির্দোষ থেকে অনিষ্টকারীতে পরিণত হয় তা এখনো বোঝা যায়নি। হয়তো কোনো তাপগতীয় বাঁধ রয়েছে যার ফলে নির্দোষ ভাজ বদলে রূপটি অনিষ্টকারী রূপে পরিবর্তিত হয়ে যায়। তখন নির্দোষ রূপে (PrPc) ফেরত যাবার জন্য দরকারী তাপ এতো বেশি যে অনিষ্টকারী রূপটি (PrPSc) এর নতুন আকৃতিতে আটকা পড়ে যায়। এ দুই আকৃতি এতটাই ভিন্ন যে তা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। PrPc একদিকে আলফা হেলিক্সের প্যাঁচ দিয়ে পূর্ণ, অন্যদিকে PrPSc বিটা শিটের আস্তরনে স্ফীত।

এই গাঠনিক পার্থক্যটি লক্ষণীয় কারণ এদের অ্যামিনো এসিড অনুক্রমে (বা প্রোটিন সিকোয়েন্স) কোনো পরিবর্তন হয় না। ভুলভাবে ভাঁজ হওয়া প্রিয়ন তারপর জমা হতে থাকে। প্রথমে একটি PrPSc বীজ হিসেবে কাজ করে যা এই প্রিয়নের অনিষ্টকারী রূপটিকে স্থিতিশীল করে। এ প্রক্রিয়া খুব দ্রুতগতিতে চলতে থাকে। একসময় ছোট ছোট অলিগোমার ফাইব্রিলের তন্তুতে রূপ নেয়, যারা পরে একে অপরে জড়ো হয়ে বৃহত্তর জমায়েতে পরিণত হয়। এ বৃহত্তর জমায়েত মস্তিষ্কে থোক তৈরি করে করে স্নায়ু ক্ষয়কে এগিয়ে নিতে থাকে।

প্রিয়ন প্রোটিন আবিষ্কারের বহু আগেই এর কারণে সৃষ্ট অসুখ সম্পর্কে জানা যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে স্প্যানিশ মেষপালকরা তাদের মেরিনো জাতের ভেড়ায় অদ্ভূত আচরণ খেয়াল করেন।

চিত্রঃ PrPC প্রিয়নে চারটি প্যাঁচালো আলফা হেলিক্স দেখা যাচ্ছে (a)। এটি যখন PrPSc-তে রূপান্তরিত হয় তখন চারটি বিটা শিটের আস্তরণ তৈরি হয় (b)। দুইটির গঠনে ভিন্নতা লক্ষ্যণীয়।

ভেড়াগুলোর হাঁটার চাল বদলে যায়, চাটাচাটি বেড়ে যায় আর তীব্র চুলকানি দৃষ্টিগোচর হয়। এরা ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করে বেড়ার গায়ে নিজেদের দেহ ঘষাতে। স্পানিশ রাখালরা এ রোগের নাম দিয়েছিল ‘স্ক্র্যাপি’। এর প্রায় দুইশ’ বছর পর জার্মান স্নায়ুবিদ এইচ.জি. ক্রুটজফেল্ড ও এ.এম. জ্যাকব এক ধরনের স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগ চিহ্নিত করেন যার লক্ষণ ছিল স্ক্রাপির অনুরূপ। এ রোগের নাম দেয়া হয় ক্রুটজফেল্ড-জ্যাকব রোগ (সিজেডি)। এই রোগটি ধীরগতির হলেও সময়ের সাথে সাথে অবস্থার অবনতি হতে থাকতো। এ ধরনের ধীরগতির অবনতির পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? কোনো কোনো বিজ্ঞানী ভাবলেন হয়তো কোনো ‘ঢিলা ভাইরাস’ এর পেছনে দায়ী।

১৯৬৭ সালে ব্রিটিশ জৈবপদার্থবিদ জে.এস. গ্রিফিথ প্রস্তাব করলেন যে স্ক্র্যাপির পেছনে সম্ভবত প্রোটিন নির্মিত কোনোকিছু দায়ী। তবে সংক্রামক প্রতিনিধি হিসেবে প্রোটিন দায়ী এ মতামতটি সংশয়ের মুখে পড়ে। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মতটি উপেক্ষা করা হচ্ছিল। প্রোটিনরা যে সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে, বিশ বছর পর এই ধারণাটিকে পুনরিজ্জীবিত করেন আমেরিকান স্নায়ুবিদ এস.বি. প্রুশিনার ও সুইস অণুপ্রাণবিজ্ঞানী চার্লস উইসম্যান।

শেষ পর্যন্ত গত শতাব্দীর শেষ দিকে আর একবিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে বিশেষতঃ ম্যাড কাউ রোগের প্রাদুর্ভাবের সাথে সাথে প্রোটিন নির্মিত সংক্রামক কণার ধারণাটি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। অবশ্য কয়েকজন বিজ্ঞানী এখনো এ বিষয়টিতে সন্দেহমুক্ত নন। তবে সম্প্রতি প্রিয়নের সূক্ষ্মতর প্রকারভেদ করা গেছে। মানুষে প্রিয়ন-ভিত্তিক ব্যাধির সংক্রমণ অত্যন্ত দূর্লভ। শুধুমাত্র টিস্যুকলা প্রতিস্থাপন, শল্যচিকিৎসার

অস্ত্র বা দূষিত মাংস-পণ্য থেকে প্রিয়নের সংক্রমণ হয়। যেমন এখন মানুষে প্রিয়নের ব্যাধিকে সংক্রমণশীল হিসেবে ধরা হয় না। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে এ ব্যাধিকে ধরা হয় এমন শারিরীক বিপর্যয় হিসেবে যেখানে মস্তিষ্কের ভেতরে দলা তৈরি ও জমা হতে থাকে। এ প্রক্রিয়াটি অন্যান্য স্নায়ুক্ষয়ী রোগের অনুরূপ।

তবে অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানী মাইকেল আলপের্স ১৯৬০-র দশকে কুরু নামক স্নায়ুক্ষয়ী প্রিয়ন রোগের কথা উল্লেখ করেছিলেন। পাপুয়া নিউগিনির ফোর নৃজাতিগোষ্ঠীর উপর মাঠ পর্যায়ের গবেষণা থেকে তিনি এ রোগের কথা জানতে পারেন। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ করে অট্টাহাসি হাসা শুরু করতো। তাই ঐ জাতির মধ্যে এ রোগটি ‘অট্টহাসি রোগ’ নামে পরিচিত ছিল। কুরু শব্দটির আক্ষরিক অর্থই হলো ‘ঝাঁকানো’। পরবর্তীতে দেখা গেল আত্মীয়ের মৃত্যুর পর তার মাংস খাওয়া থেকে এ রোগটি ছড়ায়। ফোর নৃজাতিগোষ্ঠী সমাধিসংক্রান্ত অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে মৃতের মাংশ ও মগজ কাঁচা খাওয়া হতো।

এই মহামারীর শুরু হয়েছিল সম্ভবত ১৯০০-শতকের শুরুর দিকে যখন ঐ জনগোষ্ঠীর কোনো সদস্য CJD রোগের একটি ধরণে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে অবশ্য এখন এ রোগটি নেই। এ রোগে ২০০৫ সালে সর্বশেষ মৃত্যু হয়। বিস্ময়ের ব্যপার হলো পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে কিছু কিছু ব্যক্তি কুরু রোগে একেবারেই অপ্রভাবিত ছিল। তারা একধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছিল। দেখা গেল PrP V127 নামক PrP-র একটি ভিন্ন প্রকরণের কারণে এমনটা হচ্ছে। PrP V127 তে ১২৭ নম্বর অ্যমিনো এসিডে গ্লাইসিনের স্থলে ভ্যালিন স্থানান্তরিত হয়েছিল। ইঁদুরে জেনেটিক পরিবর্তন করে দেখা গেছে তাদের PrP V127 প্রিয়ন তৈরি হলে তা কুরু ও ধ্রুপদী CJD প্রিয়ন প্রতিরোধ করে। কিন্তু কীভাবে? PrP V127 রূপ বদলিয়ে PrP-র অনিষ্টকারী চেহারায় বদলায় না। ফলে এই প্রকরণ বহন করা ব্যক্তি স্নায়ুক্ষয় রোগে আক্রান্ত হয় না।

আরেকটি PrP প্রকরণের কথা জানা যায় যা বিক্ষিপ্ত CJD রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে মানুষকে রক্ষা করে। তবে এর কর্মকৌশল PrP V127 এর মতো নয়। বরং এটি প্রিয়ন উৎপাদন চলমান থাকা অবস্থায় প্রোটিন-প্রোটিন মিথষ্ক্রিয়া আটকে রাখে। কীভাবে PrP V127 প্রিয়নের রূপ-বদলানো প্রতিরোধ করে তা বুঝতে পারলে বিজ্ঞানীরা প্রিয়নের রোগতত্ব ও উৎপাদনের প্রাণ-রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি উপলদ্ধি করতে পারবেন। এছাড়াও ঔষুধ তৈরিতেও এটি অন্তর্দৃষ্টি দেবে। স্বজাতিভক্ষণ নিষিদ্ধ করে দেয়ার ফলে ফোর জনগোষ্ঠি চলমান কুরু মহামারী থেকে বেঁচে যায়। তবে PrP V127 প্রকরণের উপস্থিতি এটাই নির্দেশ করে যে সময়ের সাথে সাথে কুরু-প্রতিরোধি ব্যক্তির সংখ্যা বাড়তে থাকতো। এটা মহামারীর পাল্টা জবাব হিসেবে প্রাকৃতিক বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার মধ্যমেই হতো। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকৃতির নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে।

তথ্যসূত্র

  • এক্সপ্যাসি প্রোটিন স্পটলাইটের ১৭৯ ইস্যু The shape of harm-র অনুবাদ। লেখকঃ ভিভিয়েন বেইলি গ্যারিস্টেন।
  • org/spotlight/back_issues/179/

অন্ধকার দুনিয়ায় স্বাগতম

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে Google-এর নাম শুনেনি এমন মানুষ বোধহয় Google-এ সার্চ করেও খুঁজে পাওয়া যাবে না! যে কোনো তথ্যের জন্য আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল এই জায়ান্ট সার্চ ইঞ্জিন Google। আমি এবার আপনাদের একটু চমকিত করব। আপনি জানেন কি, ইন্টারনেট দুনিয়ার অর্ধেকের চেয়েও বেশি তথ্যের খোঁজ গুগলের কাছে নেই!

ইন্টারনেট দুনিয়ার এই তথ্যসম্ভারকে আমরা দুই ভাগে করতে পারি। ১. Surface web বা Visible web। এটা হলো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের সেই অংশ যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে এ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। ২. Deep web বা Invisible web। এটা surface web এর উল্টো। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের যে অংশ স্ট্যান্ডার্ড সার্চ ইঞ্জিনে লিপিবদ্ধ করা নেই, সেগুলোই হলো deep web এর অন্তর্ভুক্ত।

ডিপ ওয়েবের ছোট একটা অংশকে বলা হয় ডার্ক ওয়েব। এটা হলো ইন্টারনেটের সেই অংশ যেখানে আপনি সাধারণ নিয়মে ঢুকতে পারবেন না। প্রচলিত ব্রাউজারগুলো সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। সেখানে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে বিশেষ সফটওয়্যার ও কনফিগারেশনের সাহায্য নিতে হবে।

আমাদের আজকের আলোচনা ডার্ক ওয়েবকে কেন্দ্র করে। তার আগে একটা তথ্য জেনে নেই, সার্চ ইঞ্জিন কেন ডিপ ওয়েব বা ডার্ক ওয়েবের তথ্য হাজির করতে পারে না? সার্চ ইঞ্জিনগুলো সার্চ করার কাজটি করে থাকে web crawler-এর মাধ্যমে। Web crawer-কে web robot-ও বলা হয়। এটি এক ধরনের প্রোগ্রাম বা স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিপ্ট (ইন্টারনেট বট) যা একটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ব্রাউজ করে। কোনো একটা ওয়েবসাইট যেন সার্চ ইঞ্জিন খুঁজে না পায় তার জন্য robots exclusion

protocol ব্যবহার করা হয়, যেটি web crawlers-কে সাইটগুলো লিপিবদ্ধ করা বা খুঁজে পাওয়া থেকে বিরত রাখে।

ডার্ক ওয়েবের সাইটগুলো সার্ফেস ওয়েবের সাইটগুলোর মতো সাধারণ কোনো ডোমেইন (যেমন .com)  ব্যবহার করে না। এরা ব্যবহার করে pseudo top-level domain। এই ডোমেইনের মধ্যে আছে .bitnet, .csnet, .onion ইত্যাদি। Pseudo top-level domain এর বিশেষত্ব হচ্ছে এটি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড অফিশিয়াল Domain Name System-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে এখানে প্রবেশ যায় না। শুধুমাত্র Tor gateway-র মাধ্যমেই এখানে প্রবেশ করা সম্ভব। ডার্ক ওয়েবের ওয়েব এড্রেসগুলোও বেশ জটিল, যেমন http://zqktlwi4fecvo6ri.onion

ডার্কনেটে পণ্য কেনাবেচা হয় বিটকয়েন (Bitcoin)-এর মাধ্যমে। বিটকয়েন হলো peer-to-peer ‘cryptocurrency’ system. বিটকয়েন ব্যবহারের সুবিধা হলো এখানে কারো ব্যক্তিগত আইডেন্টিটি জরুরী না। একইসাথে কোনো থার্ড পার্টির লেনদেন ট্র্যাক করার সুযোগ নেই। ফলে tax ধার্য করারও উপায় নেই। বিটকয়েনের মূল্যমান কিন্তু অনেক বেশি। বর্তমানে ১ বিটকয়েন = ৪৪৫ ডলার!

কীভাবে সৃষ্টি হলো ?

ডার্ক ওয়েব বা ডিপ ওয়েবের জন্ম নিয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অনেক আগে থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন কমিউনিটি এমন একটি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আসছিল যেখানে তারা খুব গোপনীয়তার সাথে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। সামরিক বাহিনী, বিপ্লবী, ব্যবসায়ী, হ্যাকার, এমনকি খোদ প্রশাসনই এমন এক ব্যবস্থা চেয়েছে যেখানে তারা খুব গোপনে, নিরাপদে নিজেদের ভেতর তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে।

আপনি যদি ভেবে থাকেন অনলাইনে আপনার উপর কেউ নজরদারি করছে না, তাহলে ভুল ভাবছেন। আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ডাউনলোড-আপলোড নজরে রাখছে আপনার ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার। যে কোনো প্রয়োজনে তারা সেই তথ্য সরবরাহ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। তাই স্বভাবগত চাহিদার প্রেক্ষিতেই এমন এক ব্যবস্থার কথা চিন্তা করতে হয়েছে যেখানে প্রশাসন তদারকি

করতে পারবে না। এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে ডিপ ওয়েব তথা ডার্ক ওয়েবের। যদিও সিকিউরিটি এজেন্সির নজরদারি থেকে বাঁচতে এটির জন্ম, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এখানে অপরাধের বেশ বড় একটা শাখা গ্রথিত হয়েছে।

কী আছে এখানে?

কী নেই এখানে? এখানে এমন সব জিনিস আছে, যেটা হয়তো আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। মাদকদ্রব্য থেকে শুরু করে এমনকি পেশাদার খুনিও ভাড়া করা যায় এখানে। উইকিলিকসের শুরু হয়েছিল ডার্ক ওয়েবেই। এখানে রয়েছে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ চাইল্ড পর্নোগ্রাফির মতো বিকৃত রুচির বিনোদন। রয়েছে পতিতা ভাড়া করার সুযোগ। নিষিদ্ধ এবং কপিরাইট আইনের কারণে সার্ফেস ওয়েবে নেই এমন সব বইয়ের অসাধারণ সংগ্রহ পাবেন এখানে। Apple, Microsoft-এর বিভিন্ন প্রোডাক্ট স্বল্প দামে কিনতে চান? সেটাও পারবেন ডার্ক ওয়েবে। যে কোনো দেশের অবৈধ পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স যোগার করতে পারবেন ডার্ক ওয়েব থেকে। কিনতে পারবেন অবৈধ অস্ত্র। এমনকি বোমা-বারুদ তৈরির যাবতীয় টিউটোরিয়ালও পাবেন অনেক ওয়েবসাইটে। এখানে প্রোফেশনাল কিলারের মতো প্রফেশনাল হ্যাকারও ভাড়া করা যায়।

মাদক দ্রব্য বেচাকেনার সবচেয়ে বিখ্যাত অনলাইন ব্ল্যাক মার্কেট ‘Silk Road’-এর ডার্ক ওয়েবে যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। ২০১৩ সালে FBI ওয়েবসাইটটিকে বন্ধ করে দেয় এবং এর প্রতিষ্ঠাতা রস উইলিয়াম উলব্রিচকে গ্রেফতার করে। জানেন কি তারা এই দুই বছরে কত টাকার ব্যবসা করেছে? প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের!

চিত্রঃ বিশ্বখ্যাত অনলাইন ব্ল্যাক মার্কেট ‘Silk Road’।

ডার্ক ওয়েবের ডার্ক সাইডের কিছু উদাহরণ স্ক্রিনশটের মাধ্যমে তুলে ধরছি।

চিত্রঃ ডার্ক ওয়েবে ভাড়াতে খুনিও পাওয়া যায়।
চিত্রঃ স্বল্প দামে আইফোন বিক্রয়ের ওয়েবসাইট।

এতসব খারাপ জিনিসের ভিড়ে এবার একটা ভালো জিনিসের খবর দিচ্ছি। বিভিন্ন ধরনের রিসার্চ পেপার ডাউনলোড করতে Sci-Hub এর কোনো বিকল্প নেই। যারা প্রজেক্ট বা থিসিস নিয়ে কাজ করছেন, তারা এর গুরুত্ব ভালভাবে বুঝতে পারবে। যদি কখনো সার্ফেস ওয়েবে Sci-Hub ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে ডার্ক ওয়েবের http://scihub22266oqcxt.onion/ এই এড্রেসটা মনে রাখুন, কাজে লাগবে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবস্থা নিচ্ছে না, নাকি নিতে পারছে না- এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের জানতে হবে কীভাবে এই নেটওয়ার্ক কাজ করে। ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করতে হয় অনিয়ন (onion) নেটওর্য়াকের সাহায্যে। এর pseudo top-level domain হল .onion। এই নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে আপনাকে ব্যবহার করতে হবে একটা বিশেষ ব্রাউজার, এর নাম Tor। তবে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে

এখানে প্রবেশ করা যাবে না- ব্যাপারটা এমন নয়। কিছু ওয়েবসাইট আছে যারা Tor-এর proxy ব্যবহার করে তাদের রাউটারের মাধ্যমে সাধারণ ব্রাউজার দিয়েই অনিয়ন নেটওয়ার্কে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়।

Tor ব্রাউজারের default settings আপনার পরিচয় লুকিয়ে রাখবে। যখন আপনি এটি দিয়ে কোনো সাইটে ঢুকতে যাবেন, তখন Tor আপনার রিকোয়েস্ট জটিল এনক্রিপশনের মধ্য দিয়ে অনিয়ন প্রক্সিতে পাঠাবে। অনিয়ন প্রক্সি এই ডাটা নিয়ে অনিয়ন রাউটারে যাবে। সেখানে যাবার আগে অনিয়ন নেটর্য়াকের প্রবেশ পথে এই ডাটা আবার এনক্রিপশনের ভেতর দিয়ে যায় এবং অনিয়নের একাধিক রাউটারগুলোর মধ্য দিয়ে যাবার সময় সেটি আবারো এনক্রিপ্টেড হয়। ফলে এখানে ডাটা চুরি করে এর প্রেরক ও প্রাপককে চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। এ কারণে এখানকার ব্যক্তিরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

এখন আপনাদেরকে আরো একটা চমৎকার তথ্য দিচ্ছি। ২০১১ তে একবার টরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছিল যে টর আসলে CIA-র একটা স্লিপার নেটওয়ার্ক। এটা সত্য কিনা সে ব্যাপারে যদিও কোনো তথ্য নেই, তবে CIA নিজেরাই যে এমন গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করে পাবলিকের কাছে সার্ভিস দিচ্ছে না, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি? তাছাড়া সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না এরা কীভাবে ডিপ কভার অপারেশন চালায়। Silk Road বন্ধ করে দেয়াই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ডার্ক ওয়েবে যদি আপনি আপনার আসল আইডেন্টিটি নিয়ে ঢুকেন অথবা কোনোভাবে আপনার আইডেন্টিটি ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে ইন্টারপোলের ঝামেলায় পর্যন্ত পড়তে পারেন!

নিজেদের প্রয়োজনেই কোনো জিনিসের ভালো এবং খারাপ দুটো দিকই জানতে হয়। ভুল পথে পা বাড়ানোর আগে পা-টা সরিয়ে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই জেনে বুঝে কেউ ডার্ক ওয়েবের অন্ধকার দিকে পা বাড়াবেন না এই প্রত্যাশায় শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

১. https://en.wikipedia.org/wiki/Dark_web

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Pseudo-top-level_domain

৩. http://www.investopedia.com/ask/answers/100314/what-are-advantages-paying-bitcoin.asp

৪. http://www.coindesk.com/calculator/                                                                 

৫. https://en.wikipedia.org/wiki/Silk_Road_%28marketplace%29

৬. http://torlinkbgs6aabns.onion/

৭. https://en.wikipedia.org/wiki/Tor_%28anonymity_network%29

৮. http://www.networkworld.com/article/2228873/microsoft-subnet/no-conspiracy-theory-needed--tor-created-for-u-s--gov-t-spying.html

দগ্ধ পৃথিবীঃ ২২০০ খ্রিষ্টাব্দ

 

জলবায়ুর পরিবর্তন পরাস্ত করেছে মানুষের দাপট। মাত্র পঞ্চাশ কোটি পৃথিবীবাসী অবশিষ্ট উত্তরের জীবন-তরীতে। কীভাবে বেঁচে আছে তারা?

অভেদ্য, নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার সুউচ্চ বহুতল ভবনের ৩০০ তলায় ক্ষুদ্র ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে তাকাই। মাটির আধামাইল উপরে আমার ফ্ল্যাট। এখান থেকে মনোমুগ্ধকর বীথিদৃশ্য চোখে পড়ে। বেশ কিছু বাংলো, ছিমছাম উঠান, পান্না-সবুজ রাঙা খেলার মাঠ, সূর্যের আলো ঝিলিক দেয়া সুইমিং পুল, আর দীর্ঘ বেলাভূমির ওপারে তৈরি কিছু প্রাসাদসম অট্টালিকা। দৃশ্যগুলো লস এঞ্জেলস শহরের স্মৃতি মনে করিয়ে আকুল করে দেয়। শহরটি এখন অস্তিত্বহীন, যেখানে শান্তিপূর্ণ সময়ে বড় হয়েছেলিন আমার দাদার-দাদা, যখন নবজাতকের জন্মদান কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো না, আর সাতশ’ কোটি মানুষ মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতো পৃথিবী বুকে।

এখন পৃথিবীতে আমরা মাত্র পঞ্চাশ কোটি মানুষ বেঁচে আছি, জলবায়ুর পরিবর্তন এ গ্রহের ধারণ ক্ষমতা (carrying capacity) কমিয়ে এনেছে। একটি পরিবেশে জনসংখ্যা সর্বোচ্চ কতটুকু বাড়তে পারবে তা নির্দিষ্ট করে দেয়া। এর বাইরে যাওয়া যাবে না। বিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেমস লাভলক যাকে বলেছিলেন জীবন-তরী, এখন তার মাঝেই উত্তরমেরুর দূরপ্রান্তে বসবাস করছে বেশিরভাগ মানুষ। একসময় এখানে ছিল কানাডা, চীন, রাশিয়াসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো। জলবায়ুর পরিবর্তন একটু হলেও সহনশীল এদিকটায়। একসময় এখানেই কোটি কোটি মরিয়া উদ্বাস্তুকে স্থান দিতে নিমেষেই তৈরি করা হয়েছিলো অনুপযোগী শহর।

জানলার বাইরে যে দৃশ্য আমি ‘দেখছি’ তা আসলে বিভ্রম। আমার আবেগী মস্তিষ্কে তার একটি কোমল ও অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু কঠোর বাস্তবতায় অবিচলিত থাকা যায় না। যতদূরে দৃষ্টি যায় চোখে পড়ে কাঁচ দিয়ে ঘেরা সভ্যতার উচ্ছ্বিষ্ট। বুলেট ট্রেনকে পারাপার করার জন্যে ফিতার মতো রাজপথ ঘিরে আছে এই প্রকাণ্ডপুরীকে। আকাশভেদী কয়েক শত তলা উঁচু ভবন, যেখানে ঠাঁসাঠাসি করে বসবাস করছে কোটি কোটি মানুষ। গ্রীনহাউসের ভেতর বিস্তৃত জমিতে রাসায়নিক-পুষ্টিতে বাড়ছে ফল-মূল-শাক-সবজি। চরে বেড়ানো গবাদিপশু কিংবা বসন্তের রৌদ্রজ্জ্বল দিনে হেঁটে বেড়ানোর জন্য কৃত্রিম গ্রামীণ পরিবেশ।

ভীষণ-বিপর্যয়ের ভূকম্পীয় আঘাতের আগে মানুষের চলাচল ছিল বন্ধনহীন। মুক্তবায়ুতে তারা নিঃশ্বাস নিতে পারতো। ঘুরে বেড়াতে পারতো জঙ্গলে। বাচ্চাদের বল খেলা দেখতে পারতো মাঠে। বিস্তৃত ভূমিগুলো এখন নিষিদ্ধ এলাকা। সে অঞ্চলে বিভিন্ন রোগ ও দূর্যোগের প্রবল প্রভাব বিদ্যমান। প্রবল বৃষ্টির উপদ্রব সাথে নিয়ে ঝড়ো হাওয়া ঘণ্টায় শত কিলোমিটার বেগে আর্তনাদ করে বেড়ায়। বৃষ্টি না থাকলে রুক্ষ ধুলি-ঝড় হামলে পড়ে। যেখানে একসময় ছিল যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মরুভূমি থেকে গম্ভীর গুড়গুড় শব্দে ভূমি-সুনামি ঢেকে দেয় বিশাল অঞ্চল। বন্য-আবহাওয়া যখন খানিকটা বিরাম নেয়, তখন দাহক সূর্য অবিরত পুড়িয়ে দেয় বায়ুমন্ডলকে। দিনের মাঝভাগে তাপমাত্রা উঠে যায় ১৮০ ডিগ্রী ফারেনহাইটেরও ওপরে। বিশেষ-দেহবর্ম ও অক্সিজেন ট্যাঙ্ক ছাড়া বাইরে বের হওয়া তখন অসম্ভব হয় যায়।

আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও বদলে গেছে। ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো জায়গায় ধর্মীয় ও সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ-কেন্দ্রিক ক্ষমতা কর্তৃত্ব করতো। এখন তা ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ, কারণ পৃথিবীতে ঐ অঞ্চলগুলো এখন আর নেই।

উপরের কথা হয়তো কোনো রোগীর জ্বরের ঘোরে দুঃস্বপ্নদুষ্ট প্রলাপ মনে হতে পারে। তবে এখন থেকে তিন হাজার বছর আগেও জলবায়ুর পরিবর্তন অগ্রসর সভ্যতা পতনের সূচনা হিসেবে কাজ করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে দেড়শ বছর ধরে ঘটে চলা ভূমিকম্প, খরা ও দূর্ভিক্ষের মতো দূর্যোগ-পরম্পরা নির্ধারণ করে দিয়েছিল পূর্ব-ভূমধ্য অঞ্চলে শেষ ব্রোঞ্জ যুগে টিকে থাকা রাজ্যগুলোর ভাঙ্গনের গতিপথ। এখন যেখানে রয়েছে গ্রীস, ইসরায়েল, লেবানন, তুরস্ক ও সিরিয়া। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা নিদর্শন অনুযায়ী পৃথিবীর ঐ অঞ্চল অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রয়োগিক উন্নতির স্পন্দনের মধ্য দিয়ে গেছে তিন শতাব্দীর বেশি সময় ধরে। প্রাচীন মাইসেনিয়া, মিনোয়া থেকে হিট্টাইট, অসিরিয়া, সমাজ ছিল সাইপ্রিয়ট ও মিশরীয়দের পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। তারা চিকিৎসক, সংগীতজ্ঞ ও কারিগরদের সেবা বিনিময় করতো। বিকশিত-বাণিজ্যপথে ব্রোঞ্জ তৈরিতে দরকারী টিনের মতো পণ্যদ্রব্য, বিভিন্ন মালামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদও বিনিময় করতো।

তবে ২০১২ সালের একটি গবেষণায় খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে ভূমধ্য সাগরের পৃষ্ঠীয় তাপমাত্রা খুব দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে যাবার খবর উঠে আসে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলছে এ ঘটনা তীব্র খরাকে ত্বরান্বিত করে, যার ফলে দেখা দেয় খাদ্য সঙ্কট, গণহারে দেশত্যাগ, কৃষক-বিদ্রোহ। পরিণামে এক সময়ের জৌলুশপূর্ণ ব্রোঞ্জযুগীয় সমাজের কেন্দ্রীয় শহরগুলো বহিরাগত সৈন্যবাহিনীর আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, যে বাহিনীর সেনারা সম্ভবত নিজেরাই খরা-পিড়ীত স্বদেশ ছেড়ে পলায়ন করে। বিনাশ হয় সংস্কৃতির, ভাষার ও প্রযুক্তির। ফলাফল হিসেবে দেখা দেয় প্রথম অন্ধকার যুগ। হয় ব্রোঞ্জ যুগের পতন। এক সময়ের পরিশীলিত ও সূক্ষ্ম সমাজের অস্তিত্ব নাশ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবার পুননির্মাণ ও পুনরুদ্ধারে করতে চলে যায় কয়েক শতাব্দী।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ও 1177 BC: The Year Civilization Collapsed বইয়ের লেখক এরিক এইচ ক্লিন বলেন –

“তখনকার সময় সেটি ছিল একটি বিশ্বায়িত সমাজ, প্রত্যেকেই অন্যের সাথে সংযুক্ত ছিল, নির্ভর করতো

একে অপরের ওপর। ফলে আপনারা একটা ডমিনো প্রভাব লক্ষ্য করবেন, একটি সংস্কৃতি দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে পড়লে তা ধারাবাহিকভাবে বাকিদের ক্ষতিগ্রস্থ করতে থাকে। মিশর টিকে যায় কারণ তারা প্রস্তুতি নিতে তুলনামুলক সক্ষম ছিল। কিন্তু সে বিজয় ছিল বহু বিপর্যয়ের, কারণ তাদের সকল বাণিজ্য-অংশীদার হারিয়ে গেছে। এক শতাব্দীর ভেতর তাদের সকল জানা বিশ্বের পতন হয়েছে।”

এর আগে সতের’শ শতাব্দীর দিকে পৃথিবীর বুকে যখন ৫০ কোটি মানুষ বসবাস করতো সে সময়ে ফিরে তাকালে শিক্ষণীয় কিছু পাওয়া যায়। কাকতালীয়ভাবে তখনো ছিল জলবায়ু-প্ররোচিত ভীষণ অভ্যূত্থান-কাল। একইসাথে সময়টাকে ধরা হয় আধুনিক ইউরোপের ভোর। ভাবুন নিউটন, রেমব্রানৎস, গ্যালিলিও কিংবা ষোড়ষ লুইসের কথা। তখন যা ঘটেছিল আর আজকে আমরা যেরকম চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি তাদের মধ্যে মিল লক্ষ্যণীয়। ইতিহাসবিদরা সে সময়টাকে বলেন সর্বজনীন সংকটের যুগ, কারণ সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছিল ক্রমাগত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ত্রিশ বছরের যুদ্ধ, চীনে মিং রাজবংশ ও ইংল্যান্ডে স্টুয়ার্ট রাজতন্ত্রের পতন।

তার উপরে সময়টা ছিল সেই শতাব্দী, যখন শিশু-তুষার যুগ সবচেয়ে তীব্র হয়ে এই গ্রহের শীতলীকরণে নের্তৃত্ব দিচ্ছিল। এর প্রভাব উত্তর-গোলার্ধে বসবাসকারী মানুষজন টের পাচ্ছিল ভালোভাবেই। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেফরি পার্কারের মতে সতের’শ শতাব্দীর বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের পেছনে আবহাওয়ার ভীষণ পরিবর্তনকে প্রভাবক হিসেবে পাওয়া যাবে। শীতল আবহাওয়া, ঝড় তৈরি করা এল-নিনোর বাড়তি পর্যায়- যার পরিণাম বন্যা, কৃষি বিপর্যয়, খরা ও দূর্ভিক্ষ। যার পরিণাম সামাজিক অস্থিরতা, বিদ্রোহ ও যুদ্ধ। টানা সংকট স্পেন, রাশিয়া ও অটোমান সাম্রাজ্যের মতো কর্তৃত্বশালী রাজ্যগুলোকে দূর্বল করে দেয়। মৃত্যু হয় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার।

ক্লাইনের ভাষায়, “অতীতের সমাজের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তারা টিকে থাকার জন্য প্রকৃতিমাতার দৈবানুগ্রহের উপর নির্ভরশীল ছিলে। (তার বিপরীতে) আমরা নিজেদের পতনের জন্য দায়ী হবো কিনা সেটা দেখা এখনো দেখার বাকি আছে। আমাদের পূর্বে যেসব সভ্যতা এসেছিল শেষ পর্যন্ত ধ্বসে গেছে। আমরা কেন ভাবছি যে আমরা নিরাপদ?”

আমরা পরিবেশ-প্রতিবেশের যে পরিমাণ ক্ষতি করবো, তার ফলে পরিবর্তিত জলবায়ুতে প্রথমে স্বপ্নের মতো করে বলা বিজ্ঞানী লাভলকের কল্পিত জীবনতরীতে নিজেদেরকে যেকোনোভাবে বাঁচাতে পারবো এমন চিন্তা করাটা এক ধরনের ঔদ্ধ্যত্য। জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন গাণিতিক মডেল অনুযায়ী চলতি শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাবে অন্তত চার ডিগ্রী সেলসিয়াস, কিংবা তার চেয়েও বেশি। এ অবস্থাকে গবেষক কেভিন এন্ডারসন বর্ণনা করেছেন “যে কোনো সংগঠিত, ন্যায়নিষ্ঠ ও সভ্য বিশ্ব-সমাজের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।”

প্রিন্সটনের এন.পি.ও. ক্লাইমেট সেন্টারের প্রধান বিজ্ঞানী হেইডি কুলেন বলেন, “মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে কোনো তাপমাত্রার চেয়ে বেশি তাপমাত্রা আমরা পরিলক্ষিত করব- যে তাপমাত্রার জন্য আমরা কোনোভাবেই অভিযোজিত নই।” তিনি আরো বলেন, “আমাদের জন্য কল্পনা করা কঠিন যে পৃথিবীর একটা বিশাল অঞ্চল মানব-বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।”

তাপমাত্রা চার ডিগ্রী বাড়লে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে আর্দ্র কিছু অঞ্চল থেকে গণদেশান্তর দেখতে পাবো। আমাজন, ভারতের কিছু অঞ্চল ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চল এর আওতায় পড়বে। সাগরতল উচ্চতায় চার ফুট কিংবা তার চেয়েও বেশি বাড়বে। টোকিও থেকে মুম্বাইয়ের মতো উপকূলীয় শহর হিংস্র ঝড়ের বন্যায় ভেসে যাবে। বাংলাদেশ ও ফ্লোরিডার মতো নিচু অঞ্চলগুলো পানিতে অর্ধনিমজ্জিত হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ হবে বাস্তুচ্যুত।

অন্যদিকে মধ্য চীন থেকে শুরু করে ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চল, আফ্রিকা, আস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও

ল্যাটিন আমেরিকার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল এলাকাগুলো এ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশুষ্ক হয়ে পড়বে। সেসব এলাকায় ভূপৃষ্ঠের উপরিতলে যেটুকু পানি ছিল তা শুষে নিবে। ধ্বংস হবে ফসল, যার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে লক্ষ লক্ষ মানুষ। অজস্র গবেষণা ও তাদের ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, পৃথিবীবাসীর অর্ধেক, অন্তত চার’শ কোটি মানুষ পানির দুঃসহ সংকটে আর অনাহারে ভুগবে।

ঝলসে দেয়া তাপীয় প্রবাহ আর ভয়াবহ অগ্নিকান্ড খাদ্য-দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ ও গণদেশান্তর উসকে দেবে। দ্রুত বেড়ে গিযে কীট-পতঙ্গেরা টাইফাস, কলেরা, পীতজ্বর, ডেঙ্গু ও ম্যালিরিয়াসহ দীর্ঘদিন ধরে সুপ্ত থাকতে সক্ষম জীবাণু, এমনকি একেবারে নতুন জীবাণু দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। বিস্তার ঘটবে অজস্র মহামারীর, যা পৃথিবীকে আবার ব্ল্যাক ডেথের কথা মনে করিয়ে দিবে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যে প্লেগ-মহামারী ইউরোপের প্রায় ২০ কোটি মানুষ মেরে ফেলেছিল। এক সময়ের জমজমাট মহানগরগুলো পরিণত হবে নিস্তেজ ভূতুড়ে শহরে। ভেবে দেখুন ম্যানহাটন, টোকিও, সাও পাওলো পানির নিচে চলে গেছে। এলোমেলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো কলোনিতে বেঁচে থাকছে কয়জন টিকে যাওয়া কষ্টসহিষ্ণু মানুষ যারা অন্ধকারাচ্ছন্ন বদ্ধ জায়গায় খুব সাবধানে বেঁচে থাকছে গল্পের ভ্যাম্পায়ারের মতো। কেবল রাত হলেই বাইরে আসছে যখন তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে।

পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। গড় তাপমাত্রা সাত ডিগ্রী বেড়ে গিয়েই স্থিতিশীল হবে না, আরো বাড়বে। ইতিমধ্যে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে নিঃসরিত হয়েছে সেগুলোর তাপের অধিক ধারণক্ষমতার কারণে জলবায়ু একশো বছরেও নতুন ভারসাম্যে পৌঁছাবে না। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ জেমস হ্যানসেন বলেন, “বায়ুমণ্ডলে ইতিমধ্যে নিঃসরিত গ্যাসের জন্যে জলবায়ুর যে পরিবর্তন হবে তার খুব সামন্যই আমরা অনুভব করছি। আরো গ্যাস বায়ুস্তরে ছড়াবে, কারণ পৃথিবীর জলবায়ুর বিশাল জাড্যতা রয়েছে বলে তা খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয় না।” মানব সভ্যতার বেশিরভাগকে বিদায়-চুম্বন জানানোর আগ পর্যন্ত এই গ্রহ তাই ক্রমাগত উত্তপ্ত হতে থাকবে। চলমান জলবায়ু পরিবর্তনে চক্রাকারে যোগাতে থাকবে আরো বেশি ইন্ধন।

দ্বিবিংশতম শতাব্দীতে যখন আমরা প্রবেশ করব, পৃথিবীর ফুসফুস বলে পরিচিত ক্রান্তীয় রেইন ফরেস্ট মরু-আবৃত হয়ে পড়বে। ছোট ছোট বনসমূহ দাবানলের রোষে রুষ্ট হবে। বৈজ্ঞানিক জার্নাল সায়েন্সে ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জীববিজ্ঞানী রডলফ ডিরাজো ও সহকর্মীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আমরা এই পৃথিবীর ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির প্রান্তে আছি, যা পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতীর মাঝে ৯০ শতাংশকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে। পৃথিবীর বিষুবীয় এলাকায় যে সব পশু-পাখিরা ঘুরে বেড়ায় তারা হারিয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়া পুনরায় মনুষ্যবিহীন গনগনে মরুভূমিতে পরিণত হবে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলি- হাওয়াই থেকে ফিজি, চলে যাবে সাগরতলে।

এত কিছুর পরেও ইতিহাস আমাদের প্রজাতীর বেঁচে থাকার জন্য একটা পথ দেখায়। পার্কার তার তথ্যবহুল গবেষণার বিশ্লেষণে এক চমকপ্রদ উপসংহার টেনেছেন। সপ্তদশ-শতাব্দীর বঞ্চনা কল্যাণ-রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে দেয়, যা উনবিংশ শতাব্দীতে সকল আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর রাষ্ট্রসমূহের মূল-বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। তিনি উল্লেখ করেন, “সপ্তদশ-শতাব্দীর মতোই একবিংশ-শতাব্দীতেও ব্যাপক মাত্রায় বিপর্যয় সামলাতে হলে যে সম্পদ লাগবে তা কেবল কেন্দ্রীয় সরকারই ব্যবস্থা করতে পারবে।”

আগামীর মহাবিপর্যয়ের চিত্র কল্পনা করে অনেকে যে শঙ্কিত, সে তুলনায় আমরা মানুষ প্রযুক্তিতে অনেক-উন্নত। আশা করা যায়, সামাজিকভাবে পরিশীলিতও বটে। তাই জলবায়ু বিপর্যয় বর্বরদের মতো মোকাবেলা না করে মনুষ্যপ্রজাতির বেঁচে যাওয়া সদস্যরা কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত খাবার খেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের উঁচু ভবনের মাঝে ভিড় করবে, ভূমি থেকে বহু উপরে যেখানে তারা পুনর্বার তৈরি করবে পৃথিবীর নতুন সংস্কৃতি।

তথ্যসূত্র

মূল লেখাঃ Scorched Earth, 2200 AD by Linda Marsa. Published in Aeon (online magazine). 10 February 2015.

লেখক পরিচিতিঃ লিন্ডা মার্সা ডিসকভার ম্যাগাজিনের অবদানকারী-সম্পাদক, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলসের লেখক প্রোগ্রামের শিক্ষক ও ২০১৩ সালে প্রকাশিত Fevered: Why a Hotter Planet Will Hurt Our Health বইটির লেখক।

খাবার কেন পচে?

খাদ্য যে খাওয়ার অযোগ্য বা নষ্ট হয়ে গেছে তা খাবারের বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ প্রভৃতি দেখে সহজেই আঁচ করা যায়। কোনো খাবার তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়, কোনোটা আবার অনেকদিন ভালো থাকে। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই ঘটে। কেন হচ্ছে এরকম পচনশীলতার তারতম্য? বুঝতে হলে চিনতে হবে সৃষ্টির সেই অংশকে যাদের একটি বড় অংশ আমাদের খালি চোখে সাধারণত দৃশ্যমান নয়।

বিভিন্ন অণুজীব খাবার নষ্টের জন্য দায়ী। খাবারে যেসব পুষ্টি উপাদান থাকে এরা সেগুলোকে ভেঙ্গে ফেলে ছোট ছোট অংশে। এসব খাবারের ক্ষুদ্রাংশ সহজেই তাদের কোষ প্রাচীরের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারে। এতে খাবারের স্বাভাবিক গঠন আর আগের মতো থাকে না। এ প্রক্রিয়ার ফলে যেসব উপজাত তৈরি হয় সেগুলোই মূলত দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে এবং খাবারকে বিস্বাদ করে একেবারেই খাওয়ার অনুপযোগী করে তোলে।

অণুজীবগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক (ঈস্ট, মোল্ড) ইত্যাদি। খাবারে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে মোল্ড। মোল্ডের সূক্ষ্ম শাখাতন্তু হাইফির বর্ধিষ্ণু অগ্রভাগে একপ্রকার এনজাইম তৈরি হয় যা সেলুলোজ বা স্টার্চ এর মতো মজবুত অণুকে ভেঙ্গে কম মজবুত নরম পদার্থে রূপান্তর করে। খাবারের গায়ে বা ওপরে যে দাগ এবং স্তর দেখা যায় তা প্রকৃতপক্ষে জালের মতো পরষ্পর সংযুক্ত বৃহৎ হাইফি কলোনি, যা খাদ্য দ্রব্যের পৃষ্ঠদেশের উপরে থেকে বেড়ে চলে।

ঈস্ট এবং ব্যাকটেরিয়াও খাবার নষ্টের ব্যপারে কম যায় না। খাবারের বারোটা বাজাতে ঈস্ট বেছে নেয় গাঁজন প্রক্রিয়া। আচারের উপর আমরা যে শুকনো স্তর জমতে দেখি তা মহামান্য ঈস্টেরই কাণ্ড। বিভিন্ন স্পোর এবং নন-স্পোর গঠনকারী ব্যাকটেরিয়াও খাদ্যকে অখাদ্য বানাতে কম ভূমিকা রাখে না।

কিছু কিছু খাবার যেমন- দুধ, মাংস, মাছ প্রভৃতি খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। আবার কিছু কিছু ফল, শস্য এবং সবজি অনেকদিন ভালো থাকে। এর কারণ হলো অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য পূরণ হওয়া চাই কিছু শর্ত- সঠিক তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, অক্সিজেনের উপস্থিতি, পুষ্টি, খাদ্যদ্রব্যের ভেদ্যতা ইত্যাদি। ৪০-১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য অনুকূল। কিছু কিছু ফল বা সবজির বহিরাবরণ অণুজীবের জন্য দুর্ভেদ্য। তাই সেগুলো দেরিতে পচে। আবার খাবারে পানির পরিমাণ বেশি হলে সেটি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। কেননা এ পানিকে অণুজীব তাদের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার রসদ হিসেবে ব্যবহার করে।

শুকনো শস্য বা খাবারে পানি কম থাকায় সেটি অনেক দিন ভালো থাকে। অনুরূপভাবে অক্সিজেনের উপস্থিতি পচনকে ত্বরান্বিত করে। শুষ্ক ফল ও উচ্চমাত্রায় চিনি বা লবণযুক্ত খাবার অনেকদিন ভালো থাকে। কেননা শুষ্ক ফলে পানি খুবই কম থাকে আর উচ্চমাত্রার চিনি, এসিড কিংবা লবণযুক্ত খাবারে অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় অণুজীবের কোষ ধ্বংস হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করার কারণেই ৫ হাজার বছর পুরনো মিশরীয় ফারাওয়ের পিরামিড থেকে আবিষ্কৃত মধু অদ্যাবধি অক্ষত আছে!

খাবার পচানোর একচ্ছত্র অধিপতি কিন্তু অণুজীব নয়, খাদ্যের ভেতরের এনজাইমসমূহের নানা কার্যক্ষমতাও খাবার পচাতে ভূমিকা রাখে। যেমন- কলা কেটে রাখলে তার সাথে বাতাসের অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় তৈরি হয় মেলানিন, যা কলার গায়ে বাদামী রঙ সৃষ্টির জন্য দায়ী। আপেল কুচির বাদামী হয়ে যাওয়ার নেপথ্যেও রয়েছে অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া।

এতক্ষণে কি দুষতে শুরু করেছেন ‘খলনায়ক’ অণুজীবদের? এই বেলা অণুজীবদের নায়কোচিত অবদানের কথা দিয়ে শেষ করছি। অণুজীবগুলোর মহান কীর্তিকলাপে খাবার নষ্ট হলেও এই অণুজীব ব্যবহার করেই তৈরি করা যায় সুস্বাদু সব খাবার। দই থেকে শুরু করে সয়া সস কিংবা মুখরোচক পনির থেকে শুরু করে দামি ওয়াইন, বিয়ার সবই তৈরি হয় অণুজীবের সাহায্যে। সুস্বাদু বেকারী পণ্য থেকে শুরু করে জিভে জল আনা চকলেট তৈরিতেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

তথ্যসূত্র

১। https://www.leaf.tv/articles/how-does-food-decompose/

২। http://www.wonderpolis.org/wonder/why-does-food-rot/

৩। https://www.reference.com/food/food-rot-b4d00189173c0c70

৪। http://www.eng.buffalo.edu/shaw/student/m2_design/01_home/ksb/ KSB_S2/old_FoodSpoilage.htm

সোঁদা মাটির মন মাতানো গন্ধের উৎস

অনেকেই বৃষ্টির গন্ধ পছন্দ করে। বৃষ্টির মিষ্টি গন্ধ অনেকের কাছে সজীবতা, পরিচ্ছন্নতা বা আর্দ্রতার প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়। কিন্ত পানির তো নিজস্ব কোনো গন্ধ নেই, তাহলে এই ভেজা সুগন্ধটি কোথা থেকে আসে?

বৃষ্টির গন্ধের একটি সুন্দর বৈজ্ঞানিক নাম আছে- পেট্রিকোর (petrichor)। ১৯৬৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ এর দুই গবেষক ইসাবেল জয় বেয়ার এবং রিচার্ড জি. থমাস নেচার পত্রিকায় বৃষ্টির গন্ধ নিয়ে তাঁদের গবেষণা প্রবন্ধ Nature of Argillaceous Odor লেখার সময় এই নামটি প্রদান করেন। এর বাংলা করলে দাঁড়াবে ‘মৃন্ময় গন্ধের প্রকৃতি’। এই শব্দটি গ্রীক petra (বা পাথর) আর ichor (গ্রীক দেবতাদের শরীরে রক্তের মতো যে পদার্থ প্রবাহিত হয়) এর সমন্বয়ে তৈরি।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, যদিও বৃষ্টির গন্ধের মাঝে আমরা একটি সজীব পরিচ্ছন্ন ভাব খুঁজে পাই, কিন্ত এই গন্ধ আসলে মাটির ধুলা-ময়লা আর পাথর থেকে তৈরি হয়। অবশ্য পাথর নিজেও এই গন্ধের উৎস নয়, পাথর এখানে গন্ধের বাহক হিসেবে ভূমিকা রাখে। এই গন্ধের পেছনে দায়ী যৌগগুলো আসে প্রধানত বিভিন্ন গাছপালা থেকে। সাধারণত শুষ্ক আবহাওয়ায় বিশেষ করে যখন দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টি হয় না, তখন কিছু উদ্ভিদ উদ্বায়ী ফ্যাটি এসিডে সমৃদ্ধ তেল মাটিতে নিঃসরণ করে। এই ফ্যাটি এসিডগুলোর কয়েকটি আমাদের বেশ পরিচিত। এদের কোনো কোনোটি যেমন পামিটিক বা স্টিয়ারিক এসিড আমাদের খাবারে পাওয়া যায়।

অবশ্য, এই তেলের সব উপাদান এখনো পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি। ১৯৭০ এর দশকে বিজ্ঞানী ন্যান্সি এন. জার্বার এই তেল থেকে ‘২-আইসোপ্রোপাইল-৩-মিথোক্সি পাইরাজিন’ পৃথক করেন। এই যৌগটির বেশ তীব্র ‘বৃষ্টির মতো’ গন্ধ আছে।

২-আইসোপ্রোপাইল-৩-মিথোক্সি পাইরাজিন

শুষ্ক আবহাওয়ায় মাটিতে পানির পরিমাণ যখন খুব কমে যায়, তখন কিছু গাছপালা টিকে থাকার জন্য এই তেল নিঃসরণ করে। সময়ের সাথে সাথে মাটি এবং পাথরে তেল জমতে থাকে। এমন অবস্থায় বৃষ্টি হলে সেগুলো মাটি থেকে বাতাসে ব্যাপিত হয়ে ভেঙে সুগন্ধি উদ্বায়ী যৌগ তৈরি করে। ফলে আমরা সেই সজীব, উদ্ভিজ্জ আর সবমিলিয়ে সুন্দর গন্ধটি পাই।

জিওস্মিন

কিন্ত এই সুগন্ধি উদ্ভিজ্জাত তেল অবশ্য বৃষ্টির গন্ধের একমাত্র উপাদান নয়। পেট্রিকোরের আরেকটি বড় উপাদান হচ্ছে জিওস্মিন (geosmin) নামের একটি যৌগ। গ্রীক ভাষায় জিওস্মিন শব্দের অর্থ ‘পৃথিবীর গন্ধ’। মাটিতে থাকা কিছু ব্যাকটেরিয়া (যেমন একটিনোব্যাকটেরিয়া) এই যৌগটি উৎপাদন করে আর এই যৌগটিই মাটির নিজস্ব গন্ধের জন্য দায়ী। মানুষের নাক এই যৌগের গন্ধে খুবই সংবেদনশীল, বাতাসে এর পরিমাণ প্রতি ট্রিলিয়নে ৫ ভাগ, অর্থাৎ প্রতি কেজি বাতাসে মাত্র ৫ ন্যানোগ্রাম (৫ × ১০-৯ গ্রাম) থাকলেই মানুষের নাক তা শনাক্ত করতে পারে।

রসায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে জিওস্মিন যৌগটি আসলে একধরনের অ্যালকোহল। এতে –OH গ্রুপ উপস্থিত আছে। জিওস্মিন আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। কিন্ত ওয়াইনে এই যৌগের উপস্থিতি ওয়াইনের স্বাদে কিছুটা ‘স্যাঁতসেঁতে’ ভাব এনে দেয় যা তার গুনাগুণ বা গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। একইভাবে, পানিতে এই যৌগ উপস্থিত থাকলে পানির স্বাদ ‘কর্দমাক্ত’ হয়ে যায়, যা ঐ পানির পানযোগ্যতা কমিয়ে দেয়।

মাটিতে উপস্থিত কিছু ব্যাকটেরিয়া মারা গেলে বা সুপ্তাবস্থায় যাবার সময় মাটিতে জিওস্মিন নিঃসরণ করে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে খরা চললে এই নিঃসরণের হার আরো বেড়ে যায়। এরপর যখন বৃষ্টি হয় তখন এই যৌগটি মাটি থেকে নির্গত হয়ে মিহি কুয়াশার মতো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

চিত্রঃ বৃষ্টির মন মাতানো গন্ধ আসলে মাটির গন্ধ।

যেহেতু দীর্ঘদিন খরা চললে মাটিতে এসব যৌগের ঘনত্ব বেড়ে যেতে থাকে, তাই অনেকদিন পর বৃষ্টি হলে এর গন্ধও তীব্র হয়। বৃষ্টির গন্ধের আরো একটি উৎস বাকি আছে, যার গন্ধ আমরা এমনকি বৃষ্টি শুরু হবার আগে থেকেই পাওয়া শুরু করি। এটি হচ্ছে ওজোন গ্যাস। এর গন্ধ এতোই আলাদা যে এর নাম থেকেই তা অনুমান করা যাবে। এর নাম এসেছে গ্রীক শব্দ Ozein থেকে, যার অর্থ To smell।

বাতাসে বিদ্যুৎক্ষরণ ঘটালে ঝাঁঝালো গন্ধের এই ওজোন গ্যাস তৈরি হয়

3O2 (g) → 2O3 (g)

উল্লেখ্য, জিওস্মিনের মতো মানুষের নাক ওজোনের গন্ধের প্রতিও খুবই সংবেদনশী। বাতাসে এর পরিমাণ প্রতি বিলিয়নে মাত্র ১০ ভাগ হলেই অর্থাৎ প্রতি কেজি বাতাসে ওজোন গ্যাসের পরিমাণ মাত্র ১০ মাইক্রোগ্রাম থাকলেই আমরা যৌগটির গন্ধ শনাক্ত করতে পারি।

বজ্র-বৃষ্টির সময় বজ্রপাতের বিদ্যুৎ বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন গ্যাসের অণুকে ভেঙে ফেলে। কিছু পরিমাণ নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন একত্রে যুক্ত হয়ে নাইট্রিক অক্সাইড (NO) তৈরি করে। এই নাইট্রিক অক্সাইড পরে বায়ুমণ্ডলের অন্যান্য যৌগের সাথে বিক্রিয়া করে ওজোন গ্যাস উৎপন্ন করে।এই গ্যাস পরে নিম্নমুখী বাতাসে ভেসে আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়। আর আমরা এর গন্ধ পেয়ে বৃষ্টি হবার আগেই বুঝতে পারি যে কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি হবে।

মানুষের গন্ধের ইন্দ্রিয় কয়েক ট্রিলিয়ন পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন গন্ধ শনাক্ত করতে পারে। এর অনেক গন্ধই আমাদের স্মৃতিতে জমা হয়ে যায়। যেমন আপনার মায়ের গায়ের ঘ্রাণ, আপনার প্রথম পোষা প্রাণীটির ঘ্রাণ, অথবা বৃষ্টির এই গন্ধ (পেট্রিকোর) ইত্যাদি।

চিত্রঃ মানুষের ইন্দ্রিয় কয়েক ট্রিলিয়ন পরিমাণ গন্ধ শনাক্ত করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পেট্রিকোর পুরনো স্মৃতি জাগিয়ে দিয়ে আমাদের শুধু আনমনাই করে না, এটি অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রাণীর জীবনচক্রেও ভূমিকা রাখে। যেমন, কোনো কোনো জীববিজ্ঞানী ধারণা করেন, জলপথে পেট্রিকোর ছড়িয়ে পড়লে তা মিঠাপানির মাছদের ডিম পাড়ার সংকেত দেয়। যেমন আমরা জানি প্রতিবছর হালদা নদীতে একটি বিশেষ মূহুর্তে ও বিশেষ পরিবেশে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউস ও কার্প জাতীয় মাছ প্রচুর পরিমাণ ডিম ছাড়ে। মা মাছেরা এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত শুধু অমাবস্যা বা পূর্ণিমার তিথিতে অনুকূল পরিবেশে ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার এই বিশেষ সময়কে স্থানীয়রা ‘জো’ বলে।

জো হবার জন্য অমাবস্যা বা পূর্ণিমা হবার সাথে সাথে প্রচণ্ড বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হতে হয়। অর্থাৎ হালদা নদীতে মাছের ডিম পাড়ার সময় বৃষ্টির গন্ধের ভূমিকা থাকতে পারে, যা ঐ জীববিজ্ঞানীদের সন্দেহকেই সমর্থন করে। আবার ইংল্যান্ডের জন ইনস সেন্টারের অণুজীববিজ্ঞানী কিথ চেটার প্রস্তাব করেন, জিওস্মিনের গন্ধ হয়তো মরুভূমিতে উটকে মরূদ্যান খুঁজে পেতে সংকেতের মতো কাজ করে।

সেই হিসেবে বৃষ্টির এই গন্ধ কি মানুষের জীবনযাত্রাতেও এভাবে প্রভাব রাখে? অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ডানা ইয়াং অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমির আদিবাসীদের উপরে গবেষণা চালিয়ে দেখতে পান এই সম্প্রদায়ের কাছে শীতকাল আর গ্রীষ্মকালের প্রথম বৃষ্টির গুরুত্ব অনেক। এই বৃষ্টির ফলে ক্যাঙ্গারু আর ইমু প্রাণীদের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং মরুভূমিতে গাছপালা জন্মে সবুজ ভূপ্রকৃতির সৃষ্টি হয়। ইয়াং বলেন, এই জনগোষ্ঠীর কাছে বৃষ্টির গন্ধ তাই ‘সবুজ রঙ’য়ের সাথে সম্পর্কিত।

এখানের আলোচনার সারকথা হলো উদ্ভিজ্জাত তেল, ব্যাকটেরিয়া ও ওজোন গ্যাসের সমন্বয়ে পেট্রিকোর গঠিত। কিন্ত পেট্রিকোরের গন্ধ মাটি থেকে আমাদের নাকে এসে পৌঁছায় কেমন করে?

২০১৫ সালে এম.আই.টি’র বিজ্ঞানীরা হাই স্পিড ক্যামেরা (প্রতি সেকেন্ডে ২৫০ বা ১০০০ এর উপরে ফ্রেম ধারণ করতে পারে) ব্যবহার করে বাতাসে সুগন্ধের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য গবেষণা চালান। এই গবেষণায় প্রায় ২৮ টি ভিন্ন ভিন্ন পৃষ্ঠতল, ১২ টি কৃত্রিম পৃষ্ঠতল এবং ১৬ টি মাটির নমুনার উপরে ৬০০ টি পরীক্ষা চালানো হয়।

আবার বিভিন্ন ধরনের বৃষ্টির জন্য সুগন্ধের চলাচল পর্যবেক্ষণ করেন। বৃষ্টির পানি যত উপর থেকে ফেলা হয় মাটিতে পড়ার আগে তার গতি তত বেশি হয়। এতে দেখা যায়, যখন বৃষ্টির ফোঁটা কোনো সচ্ছিদ্র পৃষ্ঠতলের (যেমন মাটি) উপরে এসে পড়ে, তখন ছিদ্রের বাতাসের সাথে মিশে বুদবুদ তৈরি হয়। বুদবুদে করে সুগন্ধের পাশাপাশি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া এরোসল আকারে বাতাসে নিঃসৃত হয়। এ পরীক্ষায় আরো দেখা যায়, বৃষ্টির ফোঁটার গতি কম হলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া এরোসলের পরিমাণ বেড়ে যায় কারণ গতি বেশি হলে বুদবুদ তৈরি হবার সময় হয় না। এ কারণেই হাল্কা বৃষ্টির পরে পেট্রিকোরের তীব্রতা বেশি থাকে।

কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন আমাদের পূর্বপুরুষদের টিকে থাকার জন্য বৃষ্টির উপরে নির্ভর করতে হতো, যার কারণে আমাদের কাছে বৃষ্টির গন্ধ এতো ভাল লাগে।

বিজ্ঞানীরা এখনো কৃত্রিমভাবে পেট্রিকোর তৈরির উপায় বের করতে পারেননি। কারণ এর রাসয়নিক গঠন এত জটিল আর এর কিছু উপাদান এত অল্প পরিমাণে থাকে যে আমাদের নাক তা শনাক্ত করতে পারলেও কোনো মেশিন তা আলাদা করতে পারে না। তাই এই মিষ্টি সুবাস বোতলজাত অবস্থায় বাজারে থরে থরে সাজানো অবস্থায় দেখা যায় না। বাজারে সজ্জিত দেখতে হলে আরো বেশ কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।

এর পর থেকে যখন বৃষ্টি উপভোগ করবেন, তখন আপনাকে আনমনা করে দেওয়া ঐ বৃষ্টির গন্ধের জন্য এর পেছনের রসায়নকেও একটা ধন্যবাদ দিতে ভুলবেন না।

তথ্যসূত্র

  1. https://youtube.com/watch?v=PDrElHWBT6A
  2. http://winespectator.com/drvinny/show/id/5453
  3. http://winespectator.com/drvinny/show/id/5453
  4. Section 21.5 Oxygen and Sulfur, Subsection: Ozone (Page 916) Chemistry (Ninth Edition) Raymond Chang
  5. https://youtube.com/watch?v=K8_05IpT7cA
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Petrichor
  7. https://youtube.com/watch?v=DyFm-UQ5-ag
  8. http://climatecentral.org/news/thunderstorms-ozone-atmosphere-18600
  9. http://huffingtonpost.com/2012/07/19/rain-smells-approaching-storm_n_html
  10. http://smithsonianmag.com/science-nature/what-makes-rain-smell-so-good-13806085/
  11. http://todayifoundout.com/index.php/2014/05/causes-smell-rain/

কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের কারসাজি

পৃথিবীপৃষ্ঠে বসিয়ে রাখা একটি রকেট নিয়ে চিন্তা করতে করতেই কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের প্রভাব বুঝে ফেলা যায়। কিছুক্ষণ পরেই তা করতে যাচ্ছি আমরা। তবে তার আগে কিছু কথা বলে রাখা জরুরী।

এরিস্টটল মনে করতেন, স্থান ও কাল দুটোই পরম। কোনো ঘটনা কোথায় এবং কখন ঘটেছে সে সম্পর্কে সকল পর্যবেক্ষক একমত হবেন। নিউটন এসে পরম স্থানের ধারণাকে বিদায় জানিয়ে দেন। পরবর্তীতে আইনস্টাইন এসে বিদায় দেন পরম সময়কেও। তবে পরম সময়ের কফিনে মাত্র একটি পেরেক ঠুকে তার মন ভরেনি। ১৯০৫ সালে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রকাশ করে বলেছিলেন, আলোর কাছাকাছি বেগে গতিশীল অভিযাত্রীর সময় চলবে তুলনামূলকভাবে অনেক ধীরে। ১৯১৫ সালে তিনি প্রকাশ করেন আরো যুগান্তকারী একটি তত্ত্ব। এটিই হলো মহাকর্ষের সর্বাধুনিক তত্ত্ব যাকে বলা হয় সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General theory of relativity)। অবশ্য উচ্চ গতির মতো মহাকর্ষও যে কাল দীর্ঘায়ন ঘটাতে সক্ষম তা তিনি ১৯০৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধেই অনুমান করেন।

আপেক্ষিক তত্ত্বের দুই রূপেই একটি করে মৌলিক নীতি মেনে চলা হয়। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে সেটি হলো আপেক্ষিকতার মৌলিক স্বীকার্য। এর বক্তব্য হলো- মুক্তভাবে গতিশীল সকল পর্যবেক্ষকের কাছে বিজ্ঞানের সূত্রগুলো একই থাকবে। বেগ যাই হোক তাতে কিছু আসে যায় না। এখানে ত্বরণ সম্পর্কে কিছু বলা হয় না। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের মৌলিক নীতিটি হলো সমতুল্যতার নীতি (Principle of equivalence)। এ নীতির বক্তব্য হলো- যথেষ্ট ক্ষুদ্র স্থানের অঞ্চলে অবস্থান করে এটি বলা সম্ভব নয় যে, আপনি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছেন, নাকি শূন্য স্থানে সুষম হারের ত্বরণ নিয়ে চলছেন।

এই গুরুগম্ভীর কথাটি বুঝতে অসুবিধা হলে সমস্যা নেই। বরং চলুন একটি উদাহরণ দেখি। মনে করুন, আপনি মহাশূন্যের মধ্যে এমন একটি লিফটে আছেন, যেখানে মহাকর্ষ বল অনুপস্থিত। ফলে এখানে উপর

বা নিচ বলতে কিছু নেই। আপনি মুক্তভাবে ভেসে আছেন। একটু পর লিফটটি সমত্বরণে চলা শুরু করলো। এখন কিন্তু হঠাৎ করে আপনি ওজন অনুভব করবেন। লিফটের এক প্রান্তের দিকে একটি টান অনুভব করবেন। এখন এ দিকটিকেই আপনার কাছে মেঝে বলে মনে হবে!

এখন হাত থেকে একটি আপেল ছেড়ে দিলে এটি মেঝের দিকে চলে যাবে। আসলে এখন আপনার মতোই লিফটের ভেতরের সব কিছুর ত্বরণ হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন আসলে লিফটটি মোটেই গতিশীল নয়, বরং এটি একটি সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছে। আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন যে, ট্রেনের ভেতরে বসে যেমন আপনি বলতে পারেন না যে আপনি সমবেগে চলছেন নাকি চলছেন না, তেমনি লিফটের ভেতরে বসেও আপনি বুঝতে পারবেন না আপনি সুষম ত্বরণে চলছেন, নাকি কোনো সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্যে আছেন। আইনস্টাইনের এ চিন্তার ফলাফলই হলো সমতুল্যতার নীতি।

সমতুল্যতার নীতি এবং এর উপরের উদাহরণটি সত্য হলে বস্তুর জড় ভর ও মহাকর্ষীয় ভরকে অবশ্যই একই জিনিস হতে হবে। বল প্রয়োগের ফলে কতটুকু ত্বরণ হবে তা নির্ভর করে জড় ভরের ওপর। এই ভর নিয়েই বলা হয়েছে নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্রে। অন্য দিকে মহাকর্ষীয় ভরের কথা আছে নিউটনের মহাকর্ষীয় সূত্রে। আপনি কতটুকু মহাকর্ষীয় বল অনুভব করবেন তা নির্ভর করে এ ভরের ওপর।

সমতুল্যতার নীতি জানলাম। আইনস্টাইনের যুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবার একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। থট এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে যে পরীক্ষা বাস্তবে করা যায় না, চিন্তা করে করে বুঝতে হয়। এখানের থট এক্সপেরিমেন্ট বা চিন্তন পরীক্ষা আমাদেরকে দেখাবে মহাকর্ষ সময়কে কীভাবে প্রভাবিত করে।

মহাশূন্যে অবস্থিত একটি রকেটের কথা চিন্তা করুন। সুবিধার জন্যে মনে করুন রকেটটি এত বড় যে এর শীর্ষ থেকে তলায় আলো পৌঁছতে এক সেকেন্ড লাগে, অর্থাৎ এর দৈর্ঘ্য ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। আরো মনে করুন, রকেটের সিলিং ও মেঝেতে একজন করে দর্শক আছেন। দুজনের কাছেই অবিকল একই রকম একটি করে ঘড়ি আছে যা প্রতি সেকেন্ডে একটি করে টিক দেয়।

মনে করুন, সিলিংয়ের দর্শক ঘড়ির টিকের অপেক্ষায় আছেন। টিক পেয়েই তিনি মেঝের দর্শকের দিকে একটি আলোক সঙ্কেত পাঠালেন। পরে ঘড়িটি আবারো টিক দিলে তিনি আরেকটি সঙ্কেত পাঠালেন। এ অবস্থায় প্রতিটি সঙ্কেত এক সেকেন্ড পর মেঝের দর্শকের কাছে পৌঁছায়। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যাবধানে দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত দুটি পাবে।

মহাশূন্যে মুক্তভাবে ভেসে না চলে রকেটটি যদি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানের মধ্যে থাকতো তাহলে কী ঘটতো? নিউটনীয় তত্ত্বানুযায়ী এ ঘটনায় মহাকর্ষের কোনো হাত নেই। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের মধ্যেই তা পাবেন। কিন্তু সমতুল্যতার নীতি ভিন্ন কথা বলে। চলুন দেখা যাক নীতিটি কাজে লাগিয়ে আমরা মহাকর্ষের বদলে সুষম ত্বরণ নিয়ে চিন্তা করে কী পাই। নিজের মহাকর্ষ থিওরি তৈরি করতে আইনস্টাইন সমতুল্যতা নীতিকে যেভাবে কাজে লাগিয়েছেন এটি হলো তার একটি উদাহরণ।

মনে করুন রকেটটি ত্বরণ নিয়ে চলছে। অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তে এর বেগ বেড়ে যাচ্ছে। আমরা আপাতত ধরে নিচ্ছি এর ত্বরণের মান ক্ষুদ্র, তা না হলে এটি আবার একসময় আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে! রকেটটি উপরের দিকে গতিশীল বলে প্রথম সঙ্কেতটিকে আগের চেয়ে (যখন রকেট স্থির ছিল) কম দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। কাজেই সঙ্কেতটি এখন এক সেকেন্ড পার হবার আগেই নীচে পৌঁছে যাবে। রকেটটি যদি নির্দিষ্ট বেগে (ত্বরণহীন) চলতো, তাহলে আগে-পরের সব সঙ্কেত এক সেকেন্ড পরপরই পৌঁছাতো। কিন্তু এখানে ত্বরণ আছে বলে দ্বিতীয় সঙ্কেতকে আরো কম দূরত্ব পার হতে হবে। ফলে এটি পৌঁছতেও আরো কম সময় লাগবে। কাজেই মেঝের দর্শক দুই সঙ্কেতের মাঝে সময় ব্যাবধান পাবেন এক সেকেন্ডের চেয়ে কম। অথচ সিলিং-এর দর্শক তা পাঠিয়েছেন ঠিক এক সেকেন্ড পরে। হয়ে গেলো সময়ের গরমিল।

ত্বরণপ্রাপ্ত রকেটের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটা নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে না। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে যে, সমতুল্যতার নীতি বলছে রকেটটি যদি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রেও স্থির থাকে তবু একই ঘটনা ঘটবে। অর্থাৎ রকেটটি যদি ত্বরণপ্রাপ্ত না-ও হয় (যেমন ধরুন এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে উৎক্ষেপণের জন্যে বসিয়ে রাখা আছে) তাহলেও সিলিং এর দর্শক এক সেকেন্ড পর দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শক তা পাবেন এক সেকেন্ডের কম সময়ের মধ্যেই। এবার অদ্ভুত লাগছে, তাই না!

হয়তো মাথায় প্রশ্ন আসবে, এর অর্থ তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে- মহাকর্ষ কি সময়কে বিকৃত করছে, নাকি ঘড়িকে অচল করে দিচ্ছে? ধরুন, মেঝের দর্শক উপরে উঠে সিলিংয়ের দর্শকের সাথে ঘড়ি মিলিয়ে নিলো। দেখা গেলো দুটো ঘড়ি অবিকল একই রকম। তারা এটিও নিশ্চিত যে, দুজনে এক সেকেন্ড বলতে সমান পরিমাণ সময়কেই বোঝেন। মেঝের দর্শকের ঘড়িতে কোনো ঝামেলা নেই। এটি যেখানেই থাকুক, তা তার স্থানীয় সময়ের প্রবাহই মাপবে। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব আমাদের বলছে, ভিন্ন বেগে চলা দর্শকের জন্য সময় ভিন্ন গতিতে চলে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব বলছে, একই মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের গতি আলাদা। সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বানুসারে, মেঝের দর্শক এক সেকেন্ডের চেয়ে কম সময় পেয়েছেন, কারণ পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছে সময় অপেক্ষাকৃত ধীরে চলে। মহাকর্ষ ক্ষেত্র শক্তিশালী হলে এ প্রভাবও হবে বেশি। নিউটনের গতি সূত্রের মাধ্যমে বিদায় নিয়েছিল পরম স্থানের ধারণা। এবার আপেক্ষিক তত্ত্ব পরম সময়কেও বিদায় জানিয়ে দিলো।

১৯৬২ সালে এই অনুমান একটি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। একটি ওয়াটার টাওয়ারের উপরে ও নীচে দুটি অতি সূক্ষ্ম ঘড়ি বসানো হয়। দেখা গেল নীচের ঘড়িটিতে (যেটি পৃথিবীর পৃষ্ঠের বেশি কাছে আছে) সময় ধীরে চলছে, ঠিক সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব যেমনটি অনুমান করেছিল তেমনই। এ প্রভাব খুব ক্ষুদ্র। সূর্যের পৃষ্ঠে রাখা কোনো ঘড়িও পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় মাত্র এক মিনিট পার্থক্য দেখাবে। কিন্তু পৃথিবীর উপরের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের এ ক্ষুদ্র পার্থক্যই বর্তমানে বাস্তব ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্যাটেলাইট থেকে আসা সঙ্কেতের মাধ্যমে আমাদের নেভিগেশন সিস্টেমকে ঠিক রাখার জন্যে এর প্রয়োজন হয়। এ প্রভাব উপেক্ষা করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অবস্থান বের করলে ভুল হয়ে যাবে কয়েক মাইল!

সময়ের প্রবাহের পার্থক্য ধরা পড়ে আমাদের শরীরেও। এমন এক জোড়া যমজের কথা চিন্তা করুন, যাদের একজন বাস করছে পাহাড়ের চূড়ায় এবং আরেকজন সমুদ্র সমতলে। প্রথম জনের বয়স অপরজনের চেয়ে দ্রুত বাড়বে। দুজনে আবার দেখা করলে দেখা যাবে একজনের বয়স আরেকজনের চেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য যদিও খুব ক্ষুদ্র হবে, কিন্তু তারপরেও এটি একটি পার্থক্য। অন্যদিকে এদের একজন যদি আলোর কাছাকাছি গতিতে মহাকাশযানে করে দীর্ঘ ভ্রমণ করে ফিরে আসে তাহলে দেখা যাবে যমজের চেয়ে তার বয়স অনেক বেশি পরিমাণে কম হচ্ছে।

বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে পৃথিবী থেকে দূরে গিয়ে অনেক বেশি বেগে ভ্রমণ করে এলে আপনার বয়স অপেক্ষাকৃত কম হবে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বে আপনি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে দূরে অবস্থান করলে বয়স

দ্রুত বাড়বে। একটি প্রভাব আপাত দৃষ্টিতে আরেকটি থেকে উল্টোভাবে কাজ করে। অবশ্য বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব কার্যকর হবার জন্যে আপনাকে রকেটে চড়ে মহাশূন্যেই যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি যদি পৃথিবীতেই একটি অসম্ভব দ্রুতগামী ট্রেনে চড়েও ভ্রমণ করেন, তবু ট্রেনের বাইরে থাকা আপনার বন্ধুর চেয়ে আপনার বয়স কম হবে।

একে বলা হয় টুইন প্যারাডক্স। তবে মাথার মধ্যে পরম সময়ের ধারণাকে স্থান দিলে তবেই একে প্যারাডক্স (পরস্পর বিরোধী বা আপাত দৃষ্টিতে অসম্ভব ঘটনা) মনে হবে। আপেক্ষিক তত্ত্বে একক পরম সময় বলতে কিছু নেই। বরং প্রত্যেক দর্শক তার নিজের মতো করে সময় মাপেন। এটি মেনে নিলেই আর কোনো প্যারাডক্স থাকে না।

নিমগ্নতার সুখ

আমরা জীবনে সুখের হরিণের পেছনে ছুটে বেড়াই। গড়পড়তা সাধারণ মানুষ তো বটেই, কবি-লেখক-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে ধর্মবেত্তা-দার্শনিক সকলেই সুখ পাখিটা ধরতে চায়। তবে যারা সুখ জিনিসটা কী তা বোঝার চেষ্টা করেন তাদের অনুসন্ধানটা ভিন্ন। তারা সুখকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন। এ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরাও পিছিয়ে নেই। বিজ্ঞান হয়তো বলবে এন্ডরফিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামক হরমোন নিঃসৃত হলে মানুষ সুখানুভূতি পায়, তবে তারপরও কাজের সাথে সুখানুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এক জন মনোবিজ্ঞানীর গবেষণা থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাক।

কখনো কি এমন কোনো কাজে ডুবে গিয়েছিলেন যে নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন? বেলা গড়িয়ে কখন সন্ধ্যা হয়েছে টের পাননি? কিংবা রাতে খাবার পর কাজে বসে হঠাৎ টের পেয়েছেন যে ভোর হয়ে গেছে? কাজে এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলেন যে, সময় পার হবার অনুভূতি লোপ পেয়েছিল, ক্ষুধা অনুভব করেননি? এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জীবনেই একবার না একবার হয়েছে। বিশেষ করে যখন হাতের কাজটি চ্যালেঞ্জিং আর আগ্রহোদ্দীপক কিছু হয়ে থাকে।

টানটান উত্তেজনাপূর্ণ কোনো খেলা দেখার সময়েও এরকম একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আমাদের। যারা কম্পিউটারে গেম খেলে, অনেক সময় মজার অথচ জটিল কোনো গেম খেলার মধ্যে ডুবে গেলেও এ অবস্থা তৈরি হয়। অনেক প্রোগ্রামার রাতে কাজ করতে পছন্দ করেন। কারণ রাতে সাধারণত অন্য কেউ কথা বলে না, ডাক দেয় না, বিরক্ত করে না। তখন তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো সমস্যা সমাধানে কাটিয়ে দিতে পারে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ফ্লো’ (Flow)। বাংলায় একে আমরা নিবিষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা নিমগ্নতা বলতে পারি।

এখানে নিমগ্ন দশার সাথে সুখের সম্পর্কটা কী? এ প্রসঙ্গে ফ্লো তত্ত্বের জনক চেক মনোবিজ্ঞানী মিহাই চিকসেন্টমিহাইয়ের গবেষণা সম্পর্কে আলোকপাত করি।[১] ১৯৫৬ সালে এক জরিপে প্রায় ৩০ শতাংশ আমেরিকান উল্লেখ করেন যে, তারা জীবন নিয়ে অত্যন্ত সুখী (গ্রাফ দ্রষ্টব্য)। তখন থেকে কয়েক বছর পরপর নিয়মিত এ জরিপটি করা হয়েছে। দেখা গেছে ১৯৫৬ সালের পরে আমেরিকানদের গড়পড়তা আয় দুই থেকে তিনগুণ বাড়লেও ‘সুখী’ আমেরিকানদের অনুপাত বাড়েনি। তার মানে, দারিদ্র্যসীমার নীচে আয় থাকলে তা অবশ্যই দুঃখের কারণ হবে। কিন্তু আয় অনেক বাড়লে সুখানুভূতি বাড়বে এমন কোনো কথা নেই। অর্থাৎ অধিক উপার্জন মানুষকে অধিক সুখী করে তুলতে পারে না।

চিত্রঃ আমেরিকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সুখের সম্পর্ক।

২০০৫ সালে আমেরিকানদের গড় ক্রয় ক্ষমতা ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। সে তুলনায় সুখী মানুষের অনুপাতের কোনো পরিবর্তন হয়নি।[২] ছোট কালো বিন্দু দিয়ে উপার্জনের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে। বড় চতুষ্কোণ বিন্দু দিয়ে সুখী মানুষের অনুপাত বোঝানো হচ্ছে।

এই প্রেক্ষিতে মিহাই সুখ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। দৈনন্দিন জীবনে আমরা কি আসলেই সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করি? এটিই ছিল তার অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন। তিনি প্রথমে সৃজনশীল ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিল শিল্পী, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশার মানুষজন। তাদের সাক্ষাৎকারে যখন তারা নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে অন্যরকম ভাবাবেশের কথা উল্লেখ করেন তখন বার বার একটি অনুভূতির কথা উঠে আসে। সাক্ষাৎকারে অংশ নেয়া অধিকাংশ ব্যক্তিই তাদের সৃজনশীল কাজের মধ্যে একটি উচ্ছসিত আনন্দের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। সৃজনশীল কাজটি সহজে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে এরকম অবস্থায় এ আনন্দময় দশাটি তৈরি হবার কথা উঠে আসে তাদের সাক্ষাৎকারে।

সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি মিহাই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজের মধ্যে থাকা

অবস্থায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার অনুভূতি কেমন সেই তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করেন। তার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের পেজার নামক একটি যন্ত্র সরবরাহ করা হয়। পেজার মূলত মোবাইল ফোনের পূর্বপুরুষ। অংশগ্রহণকারীদের নিত্যদিনের কাজের মাঝে বিভিন্ন সময়ে এ পেজারটি বেজে উঠতো। অংশগ্রহণকারী ঐ মুহূর্তে কী কাজ করছেন, কাজ করতে কেমন লাগছে, কাজটি কোথায় করা হচ্ছে, কাজ করার সময় কী নিয়ে চিন্তা করছেন এসব তথ্য তিনি লিপিবদ্ধ করেন।

এ ছাড়াও আরো দুটি পরিমাপ করা হয়। প্রথমত, অংশগ্রহণকারী যে কাজটি করছেন তা কতটুকু কঠিন। দ্বিতীয়ত, কাজটি সম্পন্ন করার জন্য অংশগ্রহণকারী কতটুকু দক্ষ। এ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন সময়ে করা বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হয়। এভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে মিহাই

একটি ডায়াগ্রাম তৈরি করেন। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর কাছে দিনভর কাজ কতটুকু সহজ বা কঠিন মনে হয় এবং বিভিন্ন কাজের জন্য তার কতটুকু দক্ষতা আছে, এ দুটি পরিমাপের মাঝামাঝি একটি বিন্দু ঠিক করা যায়। এ কেন্দ্রবিন্দু থেকে বোঝা সম্ভব কখন একজন অংশগ্রহণকারী ‘মগ্নতা‘ দশায় প্রবেশ করবেন।

চিত্রঃ কাজ কতটা চ্যালেঞ্জিং ও মানুষের দক্ষতা কতটুকু এবং এর সাথে সম্পর্কিত অনুভূতির চার্ট।

যখন আমাদের হাতের কাজটি খুব কঠিন, কিন্তু সে কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকে তখন আমরা উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা অনুভব করি। আর যখন কাজটা খুব সহজ হয় আর কাজের জন্য দরকারী দক্ষতা পর্যাপ্ত থাকে, তখন আমরা বেশ আরামে থাকি। তবে যখন কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয় আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দরকারী দক্ষতাও উপস্থিত থাকে, তখন আমরা মগ্নদশায় প্রবেশ করি। এই নিমগ্ন অবস্থায় কাজের চ্যালেঞ্জকে টক্কর দেবার সাথে সাথে একধরনের ভাবাবেশ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়।

তখন ক্ষুধা, সময় ইত্যাদির অনুভূতি থাকে না, আমরা ডুবে যাই কাজের ধারায়, লাভ করি চ্যালেঞ্জ খণ্ডনের তৃপ্তিময় আনন্দ। যখন হাতের কাজটি খুবই সোজা, আর সেটি করতেও তেমন কোনো দক্ষতা লাগে না, তখন মানুষ অনীহা/ঔদাসীন্য/বিরক্তি অনুভব করে। দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার সময় মানুষ এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়। (ব্যক্তিগতভাবে আমি ফেসবুকে ফিড ঘাঁটার সময়ে এরকম বোধ করি।)

‘নিমগ্ন’ দশার মূল বৈশিষ্ট্য হলো- আমরা যে কাজটি করছি তাতে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে নিবদ্ধ থাকে ঐ কাজে। এছাড়া এ অবস্থার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।[৩] যেমনঃ

১. নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে তৃপ্তিময় ভাবাবেশের অন্যরকম অনুভূতি পাওয়া যায়।

২. মনের ভেতরে স্বচ্ছতার অনুভূতি থাকে। আপনি জানেন কী করা দরকার। আর আপনি কাজটা ঠিক মতো করছেন কি না, তা নিজে থেকেই বুঝতে পারেন।

৩. আপনি জানেন কাজটি শেষ করা সম্ভব। অর্থাৎ কর্মসম্পাদনের দরকারী দক্ষতা আপনার আছে।

৪. নিজের সম্পর্কে কোনো খেয়াল থাকে না। আপনার সকল উদ্বেগ ও ভাবনা দূরে সরে যায়।

৫. আপনি সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আর কেবল বর্তমানে হাতের কাজটিতে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেন।

৬. কাজের মধ্যে একটা প্রণোদনা লুকানো থাকে। নিমগ্ন অবস্থাটি যে কাজের মাধ্যমেই তৈরি হোক না কেন, কাজ করাটাই তখন পুরষ্কার হিসেবে আবির্ভূত হয়।

মানুষের মনোনিবেশ করার ক্ষমতা সীমিত। মিহাই উল্লেখ করেন, মানব মস্তিষ্ক সেকেন্ডে ১১০ বিট তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। এই পরিমাণটি বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু নিত্যদিনের ছোট ছোট কাজে অনেক তথ্য প্রয়োজন হয়। যেমন কথার অর্থ উদ্ধার করতে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ বিট তথ্য লেগে যায়। এ কারণে কারো সাথে কথা বলার সময় অন্য কোনো বিষয়ে খেয়াল রাখা যায় না। ক্ষুধাবোধ, সময়জ্ঞান এগুলোও তথ্য যা বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও স্নায়ুপথের মাধ্যমে মস্তিষ্কে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এগুলোকে প্রক্রিয়াজাত না করলে

এ সম্পর্কে আমরা সচেতন হই না। নিমগ্ন অবস্থায় আমাদের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা পুরোটাই ব্যবহৃত হয় হাতের কাজটি সম্পন্ন করার জন্য। তাই নাওয়া-খাওয়া ও সময়ের কথা আমাদের খেয়াল থাকে না। এরকম অবস্থায় দেহের অনুভূতি বোঝার জন্য কোনো মনোযোগ অবশিষ্ট থাকে না।

নিমগ্নতা একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো এ দশায় ইচ্ছে হলেই প্রবেশ করা যায় না। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছতে হলে কাজের দক্ষতা বাড়ানো আবশ্যক। কিংবা এমন কোনো দুরূহ কাজ হাতে নেয়া যায়, যা চ্যলেঞ্জিং হলেও সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা আমাদের রয়েছে। অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির পেছনে না ছুটে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা জীবনে আনন্দময় সুখ লাভের নিশ্চিত উপায় হতে পারে।

তথ্যসূত্র

[১] Flow, the secret to happiness. TED-talk by Mihaly Csikszentmihalyi.http://ted.com

[২] Happiness data from National Opinion Research Center General Social Survey; income data from Historical Statistics of the United States and Economic Indicators.

[৩] What Is Flow? Understanding the Psychology of Flow.https://www.verywell.com

প্রজেক্ট সীলঃ সমুদ্রের বুকে মানবসৃষ্ট সুনামী

২০০৪ সালের কথা। তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সেদিন খবর দেখতে টিভি চালু করেই বেশ বড় রকমের ধাক্কা খেলাম। স্ক্রিনের নীচে ভেসে চলা ব্রেকিং নিউজে দেখাচ্ছে ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সুনামির খবর। একটু পরেই ঢেউয়ের তোড়ে গাড়ি-বাড়ি-নৌকা-মানুষ ভেসে যেতে দেখে আমার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষমতা যে এত ভয়াবহ হতে পারে সেদিন স্বচক্ষে দেখেও যেন তা বিশ্বাস হচ্ছিল না। ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ সংঘটিত সেই দুর্যোগের জন্য দায়ী ছিল ৯.১ – ৯.৩ মাত্রার ভূমিকম্প, যার ফলশ্রুতিতে মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২ লক্ষ ৩০ হাজার থেকে ২ লক্ষ ৮০ হাজারের মতো। নীচের ছবিগুলো দেখলেই সুনামিটির ভয়াবহতা আঁচ করা সম্ভব।

‘সুনামি’ একটি জাপানী শব্দ যার অর্থ পোতাশ্রয়ে ঢেউ। ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, সমুদ্রের তলদেশে কোনো বিষ্ফোরণ, আগ্নেয়গিরির উদ্‌গীরণ ইত্যাদির প্রভাবে নদী, সাগর প্রভৃতি জলাধারে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসকে বলে সুনামি।

প্রজেক্ট সীলের শিরোনামে কেন সুনামির কথা বলছি? এর উত্তর কিছু দূর গেলেই পাওয়া যাবে। তার আগে প্রাসঙ্গিক আরেকটি বিষয় সম্পর্কে জেনে নেই। ‘টেকটোনিক ওয়েপন’ এটি এমন একটি হাইপোথেটিক্যাল যন্ত্র বা প্রক্রিয়া যার সাহায্যে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে চাহিদামতো ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্ম দেয়া যাবে! ১৯৯২ সালে রুশ বিজ্ঞান একাডেমির অ্যালেক্সে সেভোলোভিদিচ নিকোলায়েভ এটির সংজ্ঞা

দিয়েছিলেন এভাবে- “A tectonic or seismic weapon would be the use of the accumulated tectonic energy of the Earth’s deeper layers to induce a destructive earthquake”।

‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ এই শব্দ দুটি কানে গেলেই মানসপটে দু’জোড়া শব্দ ভেসে ওঠে- ‘অ্যাডল্‌ফ হিটলার’ এবং ‘পারমাণবিক বোমা’। হিটলার কিংবা পারমাণবিক বোমা যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরই প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে তা বোধহয় না বললেও চলে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানুষ তার স্বজাতির উপর কত রকম অমানবিক অত্যাচার, নির্যাতন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে তার ইতিহাস কম-বেশি আমাদের সবারই জানা। আবার এক পক্ষ অপর পক্ষকে ঘায়েল করতে আশ্রয় নিয়েছিল নানান রকমের কৌশলের। পাশাপাশি উদ্ভাবন করেছিল ভয়ানক সব মারণাস্ত্র। প্রজেক্ট সীল ছিল তেমনই এক মারণাস্ত্র উদ্ভাবনের পরিকল্পনা।

প্রায় ৭০ বছর আগেকার কথা। ১৯৪৪ সালের দিকে মার্কিন নৌবাহিনীর কমান্ডার ই. এ. গিবসন এক অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলেন। তিনি দেখলেন, সাগরের পানিতে ডুবে থাকা বিভিন্ন প্রবাল প্রাচীর দূরীকরণে যে বিষ্ফোরণ ঘটানো হয় তার ফলে বেশ বড় রকমের ঢেউয়ের উৎপত্তি ঘটে। এখান থেকেই তার মাথায় অন্য এক পরিকল্পনা জন্ম নিল- আচ্ছা, এ ঢেউকে কাজে লাগিয়ে কি শত্রুপক্ষের কোনো নির্দিষ্ট এলাকাকে ভাসিয়ে দেয়া যায় না? যেমন চিন্তা তেমন কাজ। সাথে সাথেই যোগাযোগ করলেন নিউজিল্যান্ডের চিফ অব জেনারেল স্টাফ স্যার এডওয়ার্ড পুটিকের সাথে, খুলে বললেন তার বিস্তারিত পরিকল্পনা। গিবসনের পরিকল্পনাটি মনে ধরলো পুটিকের। তাই তিনি যুদ্ধ পরিষদের পরবর্তী সভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। সেখানেও প্রস্তাবটিকে সমর্থন করে সবাই। ফলে সিদ্ধান্ত হলো আমেরিকা এবং নিউজিল্যান্ড যৌথভাবে নিউ ক্যালিডোনিয়ায় প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবে।

এখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল প্রজেক্ট সীল। এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল- ‘আক্রমণের উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে তৈরী জলোচ্ছ্বাসের সাহায্যে প্লাবন তৈরির সম্ভাব্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধান করা’।

প্রজেক্ট সীলের গবেষণাগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস লীচ। গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো হচ্ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার কমান্ডার অ্যাডমিরাল হ্যালসিকে। হ্যালসি প্রাথমিক পরীক্ষার ফলাফলে এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, নিউজিল্যান্ডের কর্তৃপক্ষকে তিনি অনুরোধ জানিয়েছিলেন প্রজেক্টটি যথাসম্ভব এগিয়ে নিতে। তিনি চাইছিলেন মানবসৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের সাহায্যে শত্রুপক্ষের বিভিন্ন স্থাপনা যতদূর সম্ভব ভাসিয়ে দিতে। এজন্য তিনি লিখেছিলেন- “আমার মতে- এ পরীক্ষাগুলোর ফলাফল বলছে যে, উভচর যুদ্ধে শত্রুপক্ষের এলাকা প্লাবিত করে দেয়া বেশ সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী এক সম্ভাবনময় আক্রমণাত্মক যুদ্ধাস্ত্র হতে পারে।

প্রজেক্ট সীলের গবেষণামূলক কাজগুলো বেশ দ্রুততার সাথেই এগোচ্ছিল। ১৯৪৪ সালের ৫ মে নিউজিল্যান্ডের যুদ্ধ পরিষদে হ্যালসির প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। প্রফেসর লীচের নেতৃত্বে গঠন করা হয় অ্যারে রিসার্চ ইউনিট, যার কাজ ছিল একেবারেই নতুন ঘরানার এ বোমাটি নিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো। প্রায় ১৫০ জন ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল এই ইউনিটটি। তাদের কাজের জন্য ঠিক করা হয়েছিল হ্যাঙ্গাপারাওয়া উপদ্বীপে অবস্থিত একটি দূর্গ। এখানেই গোপনীয়তার সাথে এগিয়ে চলেছিল প্রজেক্ট সীলের কাজকারবার। এগোচ্ছিল স্বজাতিকে শেষ করার আরো কার্যকরী পদ্ধতি উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা। প্রজেক্টের কাজগুলো মূলত নিউজিল্যান্ডের প্রকৌশলীরাই করতেন কিন্তু বিষ্ফোরক সরবরাহ করা কিংবা আদেশ দেয়ার কাজটি করে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রই।

প্রজেক্টটি সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে বিপুল পরিমাণ বিশেষায়িত উপকরণের প্রয়োজন ছিল। এগুলোর মাঝে ছিল রিমোট-ওয়েভ রেকর্ডিং ডিভাইস, রেডিও কন্ট্রোল্‌ড ফায়ারিং মেকানিজম, মেরিন এক্সপ্লোসিভ ইত্যাদি। ব্রিটিশ ও মার্কিন বিজ্ঞানীদেরও সমুদ্রে বিষ্ফোরণ ঘটানোর এ মহাযজ্ঞ নিয়ে আগ্রহের কমতি ছিল না। তাই একদল ব্রিটিশ ও মার্কিন বিজ্ঞানীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল প্রজেক্টটির অগ্রগতি দেখে যাবার জন্য।

নতুন আঙ্গিকে গঠিত হবার পর প্রজেক্ট সীলের প্রথম পরীক্ষামূলক বিষ্ফোরণটি ঘটানো হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ৬ জুন। আর এটি চলেছিল পরের বছরের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।

প্রজেক্ট সীলের পুরো সময়কাল জুড়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ টি সুনামি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। বোমাগুলো দিয়ে কৃত্রিমভাবে সুনামির মতো পরিস্থিতি তৈরি করাই ছিল উদ্দেশ্য, তাই এগুলোর এরূপ নামকরণ করা হয়েছিল। বোমাগুলোতে বিষ্ফোরকের পরিমাণ কয়েক গ্রাম থেকে শুরু করে ৩০০ কেজি পর্যন্ত পরিবর্তন করে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। বিষ্ফোরক হিসেবে মূলত টিএনটি ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে কখনো কখনো নাইট্রো-স্টার্চ কিংবা গেলিগনাইটও ব্যবহার করা হতো।

শুরুতে অবশ্য প্রজেক্ট সীলের গবেষকেরা ভুল উপায়ে পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। ব্রিটিশরাও সমুদ্রের তলদেশে বিষ্ফোরণ নিয়ে কাজ চালাচ্ছিল। তাদের কাজ থেকে ধারণা করা হচ্ছিল যে, বোমটি সমুদ্রের যত তলদেশে থাকবে, বিষ্ফোরণের ফলে সৃষ্ট গ্যাসের বুদবুদ ততটাই কার্যকর উপায়ে নির্ধারিত এলাকায় প্লাবন ঘটাতে সক্ষম হবে। অবশ্য পরবর্তীতে প্রজেক্ট সীলের অনেক অনেক গবেষণার পর ব্রিটিশদের সেই তত্ত্বটি বাতিল হয়ে যায়। তারা দেখান, বোমটি সমুদ্রপৃষ্ঠের যত কাছাকাছি থাকবে, এটি ততই কার্যকর ঢেউ তৈরি করে প্লাবনের উদ্ভব ঘটাতে সক্ষম হবে। গবেষকেরা সেই সাথে বুঝেছিলেন, মাত্র একটি বোমার বিষ্ফোরণ দিয়ে সৃষ্ট ঢেউয়ের সাহায্যে কেবল ঢেউয়ের বুকে সার্ফিং করাই সম্ভব, শত্রুর স্থাপনা ভাসিয়ে নেয়া তো বহু দূরের কথা। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিলেন একসাথে অনেকগুলো সুনামি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানোর।

এজন্য প্রায় ২০ লক্ষ কেজি বিষ্ফোরক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। বিষ্ফোরককে সমান ১০ ভাগে ভাগ করে সমুদ্র উপকূল থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে বিষ্ফোরিত করলেই তা সমুদ্রের বুকে ভয়াবহ আলোড়ন তুলতে সক্ষম হবে। এর ফলে ১০ – ১২ মিটার উচ্চতার যে ঢেউ তৈরি হবে সেটিই ভাসিয়ে দিবে শত্রুর সব স্থাপনা। তবে এখানেও সমস্যা ছিল। গবেষকরা দেখেছিলেন, সমুদ্রের কতটা তলদেশে বোমটি রাখা হচ্ছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। কারণ উচ্চতার সামান্য হেরফেরও ঢেউয়ের শক্তি অনেকখানি কমিয়ে দিচ্ছিল।

প্রজেক্ট সীল যখন শৈশব থেকে কৈশোরের দিকে যাচ্ছিল, তখন একে পারমাণবিক বোমার বিকল্প হিসেবেই ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু ১৯৪৫ সালের শুরুর দিকে এসে দৃশ্যপট পাল্টে যেতে শুরু করে। তখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মিত্রপক্ষের আধিপত্য বিস্তার পেতে শুরু করে। এর ফলে ধীরে ধীরে প্রজেক্ট সীলের মাধ্যমে তৈরি সুনামি বোমার সাহায্যে কৃত্রিম সুনামী তৈরির প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে ১৯৪৫ সালের ৮ জানুয়ারি প্রজেক্টটি বন্ধই করে দেয়া হয়। তখন পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য কোনো সুনামী বোমা বানানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি, সবই ছিল পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। তাই বাস্তবক্ষেত্রে এ বোমাটির কার্যকারিতা কেমন হতে পারে তা আসলে কেউই আর বলতে পারবে না।

প্রজেক্ট সীলের আয়ু ফুরিয়ে গেলেও ১৯৫০ সালে অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের চল্লিশের দশকের সেই প্রজেক্টটি নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে দেখা গেছে। রিপোর্টটির শিরোনাম ছিল- The Generation of Waves by Means of Explosives।

১৯৯৯ সালে নিউজিল্যান্ডের মিনিস্ট্রি অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স এন্ড ট্রেড প্রজেক্ট সীলের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কিত তথ্য সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। বর্তমানে এ সংক্রান্ত তথ্যাদি ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের জাতীয় আর্কাইভে এবং ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগোতে অবস্থিত স্ক্রিপ্‌স ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফি আর্কাইভসে রাখা আছে।

এতক্ষণ ধরে একবারও বলিনি ঠিক কোনো দেশকে আক্রমণ করতে এ বোমাটি বানানো হচ্ছিল। প্রতিবার শুধু ‘শত্রুপক্ষ’ কথাটি লিখেই পার পেয়ে গেছি। আসলে ১৯৯৯ সালে যে গোপন নথিগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল, সেখানেও বিশেষ কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে এ ব্যাপারে মুখ খুলেছিলেন তখন বেঁচে থাকা প্রজেক্ট সীলেরই এক সদস্য। ১৯৯৯ সালে তার বয়স ছিল ৮৭ বছর।

তার মতে, প্রজেক্টটিতে কাজ করা সবাই জানতো যে এই বোমা জাপানকে ভাসিয়ে দিতেই তৈরি করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র

 (১) en.wikipedia.org/wiki/Tsunami_bomb
 (২) nbr.co.nz/article/best-kept-secret-world-war-two-—-project-seal-tsunami-bomb-ck-134614
 (৩) cnsnews.com/news/article/new-details-emerge-world-war-ii-tsunami-bomb-project

ইন্দ্রিয়ের এলোমেলো অবস্থান

মানবদেহের প্রতিটা অঙ্গেরই নির্দিষ্ট কিছু কাজ আছে। পা দিয়ে হাঁটি, হাত দিয়ে লিখি, পেট দিয়ে খাবার হজম করি। যেসব অঙ্গের মাধ্যমে পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা লাভ করি তাদের বলি ইন্দ্রিয়। চোখ দিয়ে দেখি, চোখ আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়। কান দিয়ে শুনি, কান আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয়। কখনো কিন্তু চামড়া দিয়ে ঘ্রাণ নেয়া, কিংবা পাকস্থলি দিয়ে স্বাদ নেয়ার কথা ভাবি না। ভাবার দরকারও পড়ে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, এক ইন্দ্রিয়ের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কোষ অন্য অঙ্গেও থাকে। আমরা যদিও তাদেরকে ইচ্ছা অনুসারে ব্যবহার করতে পারি না, কিন্ত তারা আমাদের অজান্তে কাজ করে যাচ্ছে ঠিকই। এরকম কয়েকটি ব্যাপার নিয়েই আজকের এই লেখাটি।

গন্ধ শুকে চলো

নাক দিয়ে ঘ্রাণ নিই। ঘ্রাণ নিতে পারার ক্ষমতার সাথে জড়িত আছে বিভিন্ন ধরনের সংগ্রাহী অংশ বা receptor। এদের গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরিতে যেসব জিন জড়িত তার প্রথম বর্ণনা দেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড অ্যাক্সেল এবং লিন্ডা বাক। তা প্রায় আজ থেকে ২৫ বছর আগে ১৯৯১ সালে।

স্বাভাবিকভাবেই সে সময়ে ধারণা ছিল এই ঘ্রাণজ সংগ্রাহী (olfactory receptor) শুধুমাত্র নাকের মধ্যে থাকে। কিন্তু তার কিছুদিন পরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে অন্যান্য টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর খোঁজ পাওয়া যেতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৯২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের কথা। তাতে ব্রাসেলসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কুকুরের শুক্রাণুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। তবে তা শুধু তৈরি হয়েই বসে আছে, নাকি কোনো কাজ করছে সেটা তখনো অজানা ছিল।

এই ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে জার্মানির রাহর বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যান্স হ্যাটস সিদ্ধান্ত নেন, মানুষের শুক্রাণুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহী আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখবেন। অনেক পরিশ্রম করে শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে তিনি

সফল হন এমনকি এটাও দেখতে পান ঘ্রাণ অণুর উপস্থিতিতে এরা ঠিক নাকের মতোই সক্রিয় থাকে। তবে প্রথমদিকে অন্যান্য বিজ্ঞাণীদের এটা বিশ্বাস করানো বেশ কষ্টকর ছিল যে নাক ছাড়াও অন্য টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহী থাকতে পারে। পরের দশকে হ্যাটসের দল এবং অন্যান্য অনেকে বিভিন্ন টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর উপস্থিতি আবিষ্কার করেন। যেমনঃ ফুসফুস, লিভার, চামড়া, হৃৎপিন্ড ও অন্ত্র। এমনকি কিছু কিছু টিস্যুতে ঘ্রানজ সংগ্রাহীগুলোই সবচেয়ে বেশি মাত্রায় প্রকাশিত জিন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বিভিন্ন টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলো কী করছে? সমস্যা হলো এদের কাজ বুঝতে হলে আগে বের করতে হবে কীসের মাধ্যমে এরা সক্রিয় হয়। মানুষের রয়েছ ৩৫০ ধরনের ঘ্রাণজ সংগ্রাহী, অন্যদিকে ইঁদুরের মধ্যে এর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার। এখন পর্যন্ত গবেষকরা এদের মাত্র ১০-২০ শতাংশের জন্য সক্রিয়ক ঘ্রাণ অণু খুঁজে পেয়েছেন।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

হ্যাটস এবং তার দল স্যান্ডালোর নামের আরেকটি কৃত্রিম সুগন্ধী পেয়েছেন যার প্রভাবে চামড়াতে যেসব ঘ্রাণজ সংগ্রাহী রয়েছে সেগুলো সক্রিয় হয়। এদের সক্রিয়করণের ফলে ধারণকারী কোষগুলো উদ্দীপ্ত হয়ে দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করে এবং ক্ষত পূরণে নিযুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রেও মানবদেহে এর প্রাকৃতিক প্রতিরূপ এখনো আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে।হ্যাটস তার পরীক্ষায় জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে মানুষের পরীক্ষামূলক কোষে বিকাশিত ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলোকে হাজার রকমের ঘ্রাণ অণুর সংস্পর্শে নিয়ে আসেন। বেশিরভাগই বাণিজ্যিক কৃত্রিম সুগন্ধী যেগুলো পারফিউম এবং কসমেটিক্সে ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে তিনি একটি ঘ্রাণ অণু পেয়েছেন যেটা শুক্রাণুর ঘ্রাণজ সংগ্রাহীকে সক্রিয় করতে পারে। এই গন্ধ Lily of Valley ফুলের মতো। দেখা গেছে শুক্রাণু এই গন্ধের দিকে সাঁতার কেটে যায় এবং গন্ধের মাত্রা বাড়ালে শুক্রাণুর গতিও বাড়ে। হ্যাট অনুমান করেন, এই বৈশিষ্ট্য শুক্রাণুকে ডিম্বাণুর দিকে ধাবিত হতে প্রভাবিত করে। তবে গবেষকরা এখনো এই অণুকল্প প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় আছেন। ব্যাপারটি এখনো সর্বজন সমর্থিত নয়।

অন্যান্য টিস্যুতে পাওয়া কিছু কিছু ঘ্রাণজ সংগ্রাহীও প্রায় একইরকম কাজ করে। এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেস পাভলাথ গবেষণা করছিলেন কীভাবে একাধিক পেশীতন্তু একীভূত হয়ে বহু নিউক্লিয়াস সমৃদ্ধ কোষ তৈরি করে। সেসময় তিনি দেখতে পান পেশীতে একটি ঘ্রাণজ সংগ্রাহী বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হচ্ছে যে ব্যাপারটা হ্যাটস দেখতে পেয়েছিলেন শুক্রাণুতে।

গ্রেস বর্ণনা করেন, এই সংগ্রাহীগুলোর কারণে পেশীতন্তুগুলো একটি বিশেষ ঘ্রাণের দিকে স্থানান্তরিত হয় এবং পুনর্যোজনে (regeneration) অংশ নেয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই সংগ্রাহী ছাড়া ইঁদুরে পেশীতন্তুগুলো ক্ষয়প্রবণ হয় এবং দূর্বল পুনর্যোজন দেখায়। এই গ্রাহকের সক্রিয়ক প্রাকৃতিক প্রতিরূপ খুজে পেলে পেশী পুনর্যোজনের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে গবেষকরা বিভিন্ন ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর জন্য প্রাকৃতিক প্রতিরূপ পেয়ে গেছেন। যেমন কিডনিতে Olfr78 নামক ঘ্রাণজ সংগ্রাহী সক্রিয় হয় অন্ত্রে বসবাসরত ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা নিঃসৃত বিশেষ ধরনের

ফ্যাটি এসিডের প্রভাবে। এই সংগ্রাহী ‘শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড’-এর উপস্থিতিতে সক্রিয় হয় এবং রক্তচাপ বৃদ্ধির জন্য সংকেত পাঠায়। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলো শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড তৈরি করে যখন তারা আঁশ জাতীয় খাবার হজম করে। তাই একসময় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আঁশ জাতীয় খাবারের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

হ্যান্স হ্যাটস তার গবেষণায় এমন কিছু ঘ্রাণ সংগ্রাহী পেয়েছেন যেগুলো ক্যান্সার কোষে থাকে এবং তাদের সক্রিয় করার ফলে ক্যান্সার টিস্যুর সংকোচিত হয়ে যায়। যদিও সত্যিকারের ক্যান্সার থেরাপিতে এদের নিয়ে আসার জন্য আরো বহু গবেষণা প্রয়োজন। সুদূর ভবিষ্যতে আমরা হয়তো সুগন্ধি মেখেই ক্যান্সার দূর করতে, কেটে যাওয়া ক্ষত পূরণ করতে কিংবা প্রজনন ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হতে পারবো।

আলোয় উপশম

আমাদের চোখে অনেক ধরনের আলোক সংবেদী কোষ থাকে। এরা হচ্ছে অপসিন, রোডপসিন, মেলানোপসিন। এদের আবিষ্কার কিন্তু ধাপে ধাপে হয়েছে। যেমন ১৯৯০ সালের শেষের দিকে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইগনাসিও প্রভেন্সিও স্তন্যপায়ী প্রাণীতে মেলানোপসিন খোঁজা শুরু করেন। তখন পর্যন্ত ধারণা ছিল যে মেলানোপসিন সাধারণত উভচরের চোখে পাওয়া যায়, তাই সেসময় দৃষ্টি নিয়ে যারা কাজ করেছেন তাদের দৃষ্টিতে ইগনাসিওর কাজ ছিল নিতান্তই দূরদৃষ্টির অভাব। তবে ১০ বছর পর তিনি মানুষের রেটিনাতেও রড এবং কোন কোষে অপসিনের পাশাপাশি মেলানোপসিনের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। এর পর মানবদেহে মেলানোপসিনের কাজ সম্পর্কে ধীরে ধীরে তথ্য উন্মোচিত হতে থাকে। এটা ঘুম জাগরণ চক্র, চোখের তারার সংকোচন, দক্ষতা অর্জন এমনকি বিপাকেও ভূমিকা রাখে।

তবে রেটিনা ছাড়াও অন্যত্র যে মেলানোপসিন থাকতে পারে সেটা চমৎকার একটি ঘটনার মাধ্যমে বের হয়। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যান বার্কোভিৎজ তার ল্যাবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য স্বয়ংক্রিয় বাতি লাগান, যেগুলো মানুষের উপস্থিতিতে জ্বলে উঠে। তার এক ছাত্র একদিন লক্ষ্য করলেন গবেষণার জন্য যে রক্তনালীতে ফোর্স ট্রান্সডিউসার লাগানো যা সারাক্ষণই তথ্য দিতে থাকে, সেটাতে বাতি জ্বলে উঠলে রক্তচাপ কমে যায়!

যদিও ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফটোরিলাক্সেশন ব্যপারটার অস্তিত্ব বিজ্ঞানী মহলে পরিচিত কিন্তু অন্তর্নিহিত রহস্যটা কারো জানা ছিল না। বার্কোভিৎজ এবং তার দল এরপরে অনুসন্ধান করে সেই রক্তনালীতে মেলানোপসিন প্রোটিন এবং তার সৃষ্টির জন্য দায়ী জিন Opn4 কে শনাক্ত করেন। নীল আলোর প্রভাবে মেলানোপসিনের উপস্থিতিতে রক্তনালী প্রসারিত হয় যার ফলে রক্তচাপ কমে যায়। জেনে রাখা ভালো মেলানোপসিন নীল আলো সংবেদী এবং ঘুম জাগরণের সাথে জড়িত বলেই ঘুমানোর আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার

চিত্রঃ আলোক সংবেদী মেলানোপসিন

ইঁদুরের লেজকে নীল আলোয় আলোকিত করে দেখা যায় আসলেই তখন লেজের রক্তচাপ কমে যায়। কিন্তু ঘটনা হলো ইঁদুরের লেজের রক্তনালীগুলো চামড়ার কাছকাছি যার ফলে আলো প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ রক্তনালীই দেহের এত ভেতরে যেখানে কোনোভাবেই আলো প্রবেশ করতে পারে না। নিষেধ করা হয়।

তাহলে সেখানে এই আলোকীয় সংগ্রাহী কীভাবে কাজ করতে পারে? বার্কোভিৎজ বলেন, এটা হতে পারে বিবর্তনের পদচিহ্ন কিংবা আলো ছাড়াও দেহে এমন কিছু আছে যেটা এদের সক্রিয় করতে পারে অথবা কোনো অজানা পদ্ধতিতে দেহের ভেতরেই নীল আলো তৈরি হয় হয়তো! যা আমরা জানি না।

এর সত্যিকার কাজ সম্পর্কে সন্দেহ থাকলেও বার্কোভিৎজ চেষ্টা করছেন এমন কোনো বুদ্ধি বের করতে যাতে রক্তচাপ জনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় এই মেলানোপসিন সংক্রান্ত ফটোরিলাক্সেশনকে কাজে লাগানো যায়। রেনড’স ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঠাণ্ডার প্রভাবে হাত ও পায়ের আঙ্গুলে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়ে যায় এবং তারা অবশ কিংবা ব্যথা অনুভব করেন।

তারা এমন মোজা পড়তে পারেন যা তাদের আঙুল নীল আলোয় আলোকিত করে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করে আনবে ও ব্যথার উপশম ঘটাবে। নবজাতক শিশুরা যারা পালমোনারি হাইপারটেনশনে ভোগে তাদের ক্ষেত্রেও আলোকীয় চিকিৎসা কাজে লাগতে পারে। রক্তচাপ জনিত রোগগুলোতে বর্তমানে যেসব ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা চালানো হয় তাতে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তাই আলো হতে পারে এসব ক্ষেত্রে একটি নিরাপদ বিকল্প। তবে তার জন্য আমাদের কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তা আগে থেকেই বলা যাচ্ছে না।

স্বাদেই নিস্তার

খাওয়ার সময় যে বিভিন্ন খাবারের স্বাদ নেই, সেই স্বাদ নেয়ার কাজটি করে থাকে বিভিন্ন স্বাদ সংগ্রাহক কোষ। নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন এইবার বলবো এরা মুখ ছাড়াও দেহের অন্য কোথায় কোথায় আছে। তারা পেটের ভেতরে আছে, শুক্রাণুতে আছে, শুক্রাশয়ে আছে, চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে দেহের ভেতর এদের কাজটা বের করা। কিছু কিছু কাজ অবশ্য জানা গেছে, যেমন পেটের ভেতরে যেসব স্বাদ সংগ্রাহী আছে তারা খাবারের পুষ্টি উপাদান শনাক্ত করে। আবার কিছু কিছু কাজ অর্ধেক জানা গেছে, যেমন ইঁদুরের শুক্রাশয়ে যেসব স্বাদ গ্রাহক আছে তাদের নিষ্ক্রিয় করে দিলে ইঁদুরগুলোর প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। কেন এমন হয়? তার উত্তর জানা নেই।

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস ফিঙ্গার শুরুর দিকে মাছে একধরনের সংবেদনশীল কোষ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন যা জৈবরাসায়নিক এবং গাঠনিক দিক থেকে আমাদের স্বাদ কোড়কের সাথে সাদৃশ্যতা দেখায়। তিনি এর নাম দেন নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ (solitary chemosensory cell)। ২০০৩ সালে তিনি দেখতে পান একই ধরনের কোষ স্তন্যপায়ীদের নাকেও আছে। তবে আমাদের চিন্তা এর নিঃসঙ্গতা নিয়ে নয়। জেনে রাখা ভালো আমরা যে টক, ঝাল, মিষ্টি বিভিন্ন স্বাদ গ্রহণ করি তার জন্য আলাদা আলাদা স্বাদ সংগ্রাহী আছে। ২০০৩ সালে ফিংগার ইঁদুরের শ্বাসনালীর উপরের দিকে অবস্থিত নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষের মধ্যে তেতো স্বাদ সংগ্রাহী শনাক্ত করেন যেগুলো গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া নিঃসৃত এক ধরনের রাসায়নিকের প্রভাবে সক্রিয় হয়।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক, ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

কোহেন শনাক্ত করেন মিষ্টি স্বাদ গ্রাহক। ধারণা করা হয় এরা একই সাথে কাজ করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে।ইঁদুরে সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তীতে ফিংগার মানুষের উচ্চতর শ্বাসনালীর নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষেও তেতো স্বাদ সংগ্রাহী খুঁজে পান। অন্যদিকে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নোয়াম

গ্লুকোজ কিংবা সুক্রোজের মাধ্যমে মিষ্টি স্বাদ সংগ্রাহী সক্রিয় হলে একই কোষের তেতো স্বাদ সংগ্রাহী নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কোহেন দেখেন যে স্বাভাবিক স্বল্প মাত্রার গ্লুকোজই তেতো স্বাদ সংগ্রাহীকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। শ্বাসনালীতে ব্যাকটেরিয়া প্রধানত গ্লুকোজ খেয়ে বেঁচে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকলে গ্লুকোজ কমতে কমতে এক সময় তেতো স্বাদ গ্রাহক মুক্ত হয়ে গেলে এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। সাইনুসাইটিস কিংবা ডায়বেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শ্বাসনালীতে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকায় তারা প্রায়ই এ ধরনের সংক্রমণের শিকার হন যা সহজে সাড়ে না।

নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ ছাড়াও আরেক জায়গায় তেতো সংগ্রাহী পাওয়া যায়। উচ্চতর শ্বাসতন্ত্রে চুলের ন্যায় একধরনের কোষ থাকে যাদের সিলিয়া বলে, এরা ব্যাকটেরিয়া এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর জিনিস যুক্ত মিউকাস বাইরে বের করে দেয়। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল সিলিয়াতেও তেতো স্বাদ গ্রাহকের অস্তিত্ব পেয়েছেন যেগুলো ব্যাকটেরিয়ার খোঁজ পেলে অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া শুরু করতে পারে। এই অবস্থায় মিউকাস বের করে দেবার গতিও বাড়ে। কোহেন একটি বিশেষ তেতো স্বাদ সংগ্রাহী T2R38 নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন। ধারণা করা হয় এই সংগ্রাহীর উপস্থিতিই কিছু কিছু মানুষকে সুপার-টেস্টার বানিয়ে দেয়। এরা অতি অল্প মাত্রায় তেতো পদার্থের উপস্থিতিও সাথে সাথে ধরে ফেলতে পারে। মজার বিষয় হলো এদের সিলিয়া অতি সামান্য ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও ধরে ফেলে। ফলে ওনারা ভাগ্যবান যে তাদেরকে খুব কমই গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের শিকার হতে হয়।

কোহেন বলেন, কোনো ব্যাক্তিতে নিরাপদ তেতো পদার্থের স্বাদ গ্রহণ করতে দিয়ে বলতে পারি তিনি কতটা তেতো অনুভব করছেন। এই তথ্য থেকে খুব সহজেই বলা সম্ভব হতে পারে তিনি কতটা সংবেদনশীল। যে বেশি তেতো অনুভব করবেন, তার অনাক্রম্যতা বা প্রতিরোধ ক্ষমতা এক্ষেত্রে তত শক্তিশালী। অদূর ভবিষ্যতে এটা এমনও হতে পারে তিক্ততার মাত্রা যাচাইয়ের মাধ্যমে আক্রমণকারী অণুজীবের পরিচয় জানা যাবে। নাকের মধ্যে তেতো কিছু ঢুকিয়ে দিয়ে অনাক্রম্যতা বা শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উত্তেজিত করে চিকিৎসাও সম্ভব হতে পারে।

শ্বাসনালী ছাড়াও সাম্প্রতিক কালে পেটের ভেতরে স্বাদ সংগ্রাহী পাওয়া গেছে। এরাও অনাক্রম্যতায় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্ত্রের টাফট কোষে স্বাদ সংগ্রাহী থাকে, ধারণা করা হতো এদের কাজ হয়তো খাদ্যের সাথে কোনো বিক্রিয়া করা।

পরিশেষে অনুসন্ধ্যিৎসু মনে অনেক অনেক প্রশ্ন নিয়েই শেষ করতে হচ্ছে। তবে প্রশ্ন করতে হবে, মানুষ প্রশ্ন করতে পেরেছিল বলেই এতদূর আসতে পেরেছে। প্রচলিত গণ্ডির বাইরে এসে কেউ কেউ ভাবতে পেরেছে বলেই আমরা জানতে পেরেছি আমাদের দেহেই গণ্ডির বাইরে কত ঘটনা ঘটে। অনেক কিছুই এখনো অজানা, কীভাবে এরা সক্রিয় হয়, কী কাজ করে। তবে পরীক্ষাগারে এদের নিয়ে কাজ হচ্ছে, দিগন্তে উকি দিচ্ছে আরো চমকপ্রদ চিকিৎসা প্রযুক্তি। আমরা যদি সভ্য থাকি, বিজ্ঞান আমাদের সুন্দর একটা ভবিষ্যত উপহার দেবে, ভাবতে দোষ কি?

তথ্যসূত্র

  1. Senses in unlikely places, Sandeep Ravindran, The Scientist, September, 2016
  2. http://the-scientist.com/?articles.view/articleNo/46831/title/What-Sensory-Receptors-Do-Outside-of-Sense-Organs/

 

 

প্রাণিবৈচিত্র্যে বিচ্ছিন্নতার শক্তিশালী অবদান

উদ্ভিদ বা প্রাণী প্রজাতির DNA অনেকটা ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের মতো, ভাষা তার অবস্থান থেকে বিচ্যুত হলে শব্দের মাঝে একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। এই বিচ্ছিন্নতা থেকে ধীরে ধীরে একটি ভাষা থেকে আরেকটি নতুন ভাষার জন্ম হয়। ভাষা যেমন তার অবস্থান থেকে বিচ্যুত হলে শব্দের মাঝে একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় তেমনই প্রাণীরাও তাদেরর অবস্থান থেকে বিচ্যুত হলে DNA-র মাঝে একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।

দেশ, অঞ্চল ও আবহাওয়াভেদে ভাষার পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রজাতির ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা কেন ঘটে? কী কারণে পৃথকীকরণ সম্পন্ন হয়? এর প্রধান একটি কারণ ও উদাহরণ হচ্ছে সমুদ্র। ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপের প্রজাতিরা একে অপরের সংস্পর্শে আসতে পারে না। তাই এমন পরিস্থিতিতে তাদের পরস্পরের মাঝে বিচ্ছিন্নতা তৈরির জোর সম্ভাবনা থাকে। আলাদা থাকার কারণে নতুন প্রজাতির উৎপত্তির ক্ষেত্রে দ্বীপ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে কাজ করে।

এখানে দ্বীপের ধারণাটা একটু পরিষ্কার করা দরকার। এখানে দ্বীপ বলতে শুধু সমুদ্রের মাঝখানে চারদিকে জল দিয়ে ঘেরা এক টুকরো ভূমিকেই বোঝানো হচ্ছে না, এর পাশাপাশি অন্যান্য জিনিসকেও বোঝানো হচ্ছে। নিঃসঙ্গ মরুভূমিতে বিচ্ছিন্নভাবে একটি ব্যাঙ থাকলে ধরা যায় ঐ ব্যাঙটি দ্বীপে আছে। চারদিকে বালু দিয়ে ঘেরা, এর সাথে অন্যান্য সদস্যদের কোন যোগাযোগ নেই। মাছের ক্ষেত্রে একটি পুকুর হচ্ছে দ্বীপ। একটি পুকুরে বাস করা প্রজাতির সাথে অন্য পুকুরে বাস করা প্রজাতির কোনো যোগাযোগ নেই। একটুখানি পানি আর চারদিকে মাটি দিয়ে ঘেরা স্থান, এটাও একধরনের দ্বীপ। ভাষা ও প্রজাতির পরিবর্তনে দ্বীপই

আসল জিনিস, দ্বীপের বিচ্ছিন্নতার কারণে দ্বীপবাসীরা অন্য এলাকার সদস্যদের সাথে মিশতে পারে না, ফলে আলাদা আলাদা বিচ্ছিন্ন এলাকায় আলাদা আলাদাভাবে ভাষা ও প্রাণীর পরিবর্তন হয়। প্রত্যেক এলাকাই তার নিজের সুবিধামতো স্বাধীনভাবে পরিবর্তিত হয়।

এরকম একটি ঘটনার কথা বলি। ৪ অক্টোবর ১৯৯৫ সালে একটি উপড়ে যাওয়া গাছ ভাসতে ভাসতে এসে হাজির হয় ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপে। গাছটির সাথে ভেসে আসে ১৫ টি সবুজ ইগুয়ানা। (ইগুয়ানা হচ্ছে একধরনের গিরগিটি সদৃশ প্রাণী, এরা নিজেদের রঙ পরিবর্তন করতে পারে। যখন যে পরিবেশে যে রঙ থাকে সে পরিবেশ অনুসারে গায়ের রঙ পরিবর্তন করার চমৎকার দক্ষতা আছে এদের।)

চিত্রঃ ইগুয়ানা। ছবিঃ পিন্টারেস্ট।

এর কিছুদিন আগে ঐ এলাকার আশেপাশে দুটি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। ধারণা করা হয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ১৬০ মাইল দূরের আরেক দ্বীপ গুয়াডেলুপ থেকে তারা ভেসে ভেসে এখানে এসেছিল। এই প্রজাতির ইগুয়ানাগুলো গাছে চড়তে পছন্দ করে। হয়তো গাছে থাকা অবস্থায় ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটায় গাছ উপড়ে গিয়েছিল এবং গাছ ছেড়ে ঐ মুহূর্তে অন্য কোথাও যাবার উপায় ছিল না। শেষমেশ জীবিত অবস্থায় ১৫ টি সদস্য এসে পৌঁছায় ক্যারিবীয় দ্বীপে। এই দ্বীপে আবার আগে থেকে কোনো ইগুয়ানা ছিল না। একদমই নতুন পরিবেশ। পরিবেশ নতুন হলেও তারা তাদের সনাতন জীবন-যাপন ছেড়ে ঐ দ্বীপের সাথে মানানসই হয়ে নিজেদের মাঝে বংশবিস্তার শুরু করেছিল।

তারা যে এখানে এসেছিল এই ব্যাপারটা আমরা জানি কারণ স্থানীয় মাছ শিকারিরা এদেরকে দেখেছিল। কেউ যদি না দেখতো তাহলে জানা হতো না ১৯৯৫ সালে এরা এখানে ভেসে এসেছিল। ওরা যেখান থেকে এসেছে সেখানেও হয়তো এমনই কোনো ঘটনা ঘটেছিল। কয়েক শতাব্দী আগের কোনো এক সময়ে কোনো একভাবে গুয়াডেলুপ দ্বীপে এসে পৌঁছেছিল ইগুয়ানার কিছু সদস্য। এদের পৌঁছার দৃশ্য হয়তো তখন কেউ দেখেনি। এই লেখাটির পরবর্তী অংশে এই দ্বীপ সম্পর্কিত বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করা হবে। তবে তার জন্য আমরা বেছে নেব অন্য একটি দ্বীপকে, এটি ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপটির নাম গ্যালাপাগোস। এই দ্বীপের প্রাণবৈচিত্র্যই চার্লস ডারউইনকে বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে ভাবতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল।

গ্যালাপাগোস আসলে অনেকগুলো দ্বীপের সমাহার। সবগুলোকে একত্রে বলা হয় ‘গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ’। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ৫০০ মাইল দূরে বিষুবরেখার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে এদের অবস্থান। এরা আসলে আগ্নেয়গিরিজাত দ্বীপ। সমুদ্রতলের আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত তথা লাভা উদগিরণের ফলে এই দ্বীপপুঞ্জের সৃষ্টি হয়েছিল। পৃথিবীর বয়সের সাথে তুলনা করলে এই দ্বীপের বয়স খুব একটা বেশিও না। মাত্র কয়েক মিলিয়ন বছর মাত্র। অর্থাৎ একসময় এই দ্বীপের সমস্তটাই জলের নীচে ছিল। সমুদ্রতল থেকে আগ্নেয়গিরির ঊর্ধ্বমুখী চাপে ধীরে ধীরে ভূমি উপরে ভেসে উঠেছে। তার মানে এখন যদি এই দ্বীপে প্রাণের অস্তিত্ব থাকে তাহলে ঐ প্রাণ বাইরে থেকে কোনো না কোনো একভাবে এখানে এসেছিল। সম্ভবত দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে কোনো এক দুর্ঘটনায় এখানে এসে পৌঁছেছিল প্রাণী ও উদ্ভিদের বীজ। অনেক দূরের মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপপুঞ্জের কোনো একটা দ্বীপে প্রাণী বা উদ্ভিদ এসে পৌঁছে গেলে বাকি দ্বীপগুলোতে ছড়িয়ে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। কারণ এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়।

চিত্রঃ গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ। ছবিঃ mqltv.com

গ্যালাপাগোসেও অনেক ইগুয়ানা আছে। কেউই জানে না প্রথম ইগুয়ানাটি কখন এই দ্বীপে আরোহণ করেছিল। ১৯৯৫ সালের ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের ইগুয়ানার মতো তারাও হয়তো মূল ভূখণ্ড থেকে ভেসে ভেসে এসে পৌঁছেছিল। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে এখনকার সময়ে মূল ভূখণ্ড থেকে সবচেয়ে কাছের দ্বীপটি হলো ‘স্যান ক্রিস্টোবাল’। স্যান ক্রিস্টবালে আজকের দিনে আমরা একটি মাত্র দ্বীপ দেখতে পাই, কিন্তু লক্ষ লক্ষ বছর আগে আরো কতগুলো দ্বীপের অস্তিত্ব ছিল, এরা এখন পানির নীচে নিমগ্ন। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে সময়ের সাথে সাথে পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়াতে এরা ধীরে ধীরে পানির নীচে নিমগ্ন হয়ে যায়।

মূল ভূখণ্ড থেকে কিছু ইগুয়ানা এসে পৌঁছানোর পর সেখানে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা তথা প্রচুর পরিমাণে জন্ম লাভ করে বিস্তৃত হবার অফুরন্ত সুযোগ আছে। এখানকার পরিবেশ মূল ভূখণ্ড থেকে একদমই আলাদা। আগ্নেয়গিরির এলাকা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে একদমই ভিন্ন। কোনো একভাবে তারা নতুন পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পেরেছিল।

অন্য দিকে এক দ্বীপের সাথে আরেক দ্বীপের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। তাই কোনো এক দ্বীপে আশ্রয় পাওয়া ইগুয়ানা নানা ধরনের প্রাকৃতিক কারণে সহজেই অন্য দ্বীপে পৌঁছে যেতে পারবে। মূল ভূখণ্ড থেকে কোনো দুর্ঘটনায় এখানে প্রাণী এসে পৌঁছার সম্ভাবনা হয়তো লক্ষ লক্ষ বছরে একবার, কিন্তু সেই তুলনায় কয়েক শত বছরের মাঝেই এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যাবার সম্ভাবনা বাস্তব।

চিত্রঃ সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে ভাষা ও প্রাণী প্রজাতির মাঝে অনেক মিল আছে।

এর ফলাফল হিসেবে আজকে আমরা দেখতে পাই গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে ল্যান্ড ইগুয়ানা (Land iguana)-র তিনটি প্রজাতি আছে। এদের কেউই কারো সাথে মিলে সন্তান উৎপাদনে সক্ষম নয়। উল্লেখ্য সারা পৃথিবীতে শুধুমাত্র গ্যালাপাগোসেই ল্যান্ড ইগুয়ানা পাওয়া যায়। ল্যান্ড ইগুয়ানা পরিবারের প্রজাতি কনোলোফাস পেলিডাস (Conolophus pellidus) পাওয়া যায় শুধুমাত্র সান্টা ফে দ্বীপে। কনোলোফাস সাবক্রিসটাটাস (Conolophus subcristatus) বেশ কয়েকটি দ্বীপে বাস করে। এর মধ্যে ফার্নান্দিনা, ইসাবেলা ও সান্টা ক্রুজ অন্যতম। ধারণা করা হয় এই দ্বীপগুলোতে কনোলোফাস সাবক্রিসটাটাস বিভক্ত হয়ে কয়েকটি ভিন্ন প্রজাতি তৈরি হবার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় হয়তো এদের মাঝেও প্রজাতিগত ভিন্নতা দেখা দিবে। তৃতীয় প্রকার ল্যান্ড ইগুয়ানা কনোলোফাস মার্থি (Conolophus marthae) পাওয়া যায় একদম উত্তরের দিকের ইসাবেলা দ্বীপে। এই দ্বীপ পাঁচটি আগ্নেয়গিরির একটি সারি নিয়ে গঠিত। এই দ্বীপটি আকারে অন্য দ্বীপের তুলনায় কিছুটা বড়।দ্বীপগুলোর পরিবেশ আবার একটির তুলনায় আরেকটি ভিন্ন। ভিন্ন ভিন্ন হবার কারণে এবং যোগাযোগ না থাকার কারণে দূরত্ব কম হলেও পরিবেশ অনুসারে তারা ভিন্ন ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়েছে। যেমনটা সাধারণত দেখা যায় ভাষার ক্ষেত্রে। দূরত্ব কম হলেও শক্ত সীমানা বা বিচ্ছিন্নতার ফলে একটি ভাষা থেকে উপভাষা কিংবা নতুন আরেকটি ভাষার জন্ম হয়। ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের সাথে নিজেদেরকে উপযুক্তভাবে মানিয়ে নেবার জন্য অর্থাৎ আরোপিত প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য দ্বীপের ইগুয়ানাগুলো ভিন্ন ভিন্নভাবে নিজেদেরকে পরিবর্তন করে নিয়েছে। ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন এত বেশি হয়ে গেছে যে ভিন্ন দ্বীপের সদস্যরা মিলে যৌন প্রজননে অংশগ্রহণ করলে কোনো সন্তান উৎপাদিত হয় না। পরস্পর মিলে সন্তান উৎপাদন করতে না পারার অর্থ হচ্ছে এরা পরস্পর ভিন্ন প্রজাতি। অথচ এরা একই পূর্বপুরুষ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছিল।

এই দ্বীপটি আরো একটি আগ্রহোদ্দীপক বিষয় সম্পর্কে ইঙ্গিত করে। সমুদ্রে যদি পানির স্তর আরো উপরে উঠে যায় তাহলে ইসাবেলার নিচু ভূমির সম্পূর্ণটা ডুবে যাবে। অর্থাৎ এখানে পাঁচটি আগ্নেয়গিরিকে ঘিরে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপের সৃষ্টি হবে। ফলে তৈরি হবে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ। পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের প্রভাবে একই প্রাণী বিশ্লিষ্ট হতে পারে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিতে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা

পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হচ্ছে ঠিক একই প্রক্রিয়ায় পৃথিবীতে রাজত্ব করে বেড়ানো বৈচিত্র্যময় প্রজাতির সবগুলোরই উৎপত্তি হয়েছিল।

কিছু দিক থেকে গ্যালাপাগোস দ্বীপের পরিবেশ একদমই ব্যতিক্রমী। এই দ্বীপ প্রাণবৈচিত্র্যে এমন কিছু প্রজাতি উপহার দিয়েছে, যা দ্বীপের পরিবেশতাত্ত্বিক গুরুত্বকে বাড়িয়ে তুলেছে। দ্বীপপুঞ্জের কোনো একটি দ্বীপের পরিবেশ ল্যান্ড ইগুয়ানার স্বভাব চরিত্র একদমই বদলে দিয়েছিল। পরিবেশগত কারণে হয়তো তারা একসময় অগভীর সমুদ্রতলের শৈবাল খেতে শিখেছিল। ডুব দিয়ে দিয়ে শৈবাল সংগ্রহ করতো। ডুব দেবার দক্ষতা তাদেরকে প্রকৃতিতে টিকে থাকতে বাড়তি উপযোগ প্রদান করেছিল। এদের থেকেই স্থায়ী পরিবর্তনের মাধ্যমে উৎপত্তি ঘটেছে জলজ ইগুয়ানা বা Marine iguana-র। জলজ ইগুয়ানাও গ্যালাপাগোস ব্যতীত পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।

তাদের এমন কতগুলো ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য আছে যা তাদেরকে অন্য প্রজাতি থেকে একদমই ভিন্ন সারিতে ফেলে দিয়েছে। একদিন হয়তো এমন দৃশ্য দেখা যাবে যেখানে জলজ ইগুয়ানারাই একাধিক প্রজাতিতে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং জলজ ইগুয়ানার নতুন গণ (Genus) তৈরি হয়েছে।

গ্যালাপাগোসের অন্যান্য প্রজাতির বেলাতেও একই গল্প প্রযোজ্য। যে কারণে ইগুয়ানার বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে একই কারণে বৃহৎ কচ্ছপ, লাভা লিজার্ড, মকিং বার্ড, ফিঞ্জ সহ অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে গ্যালাপাগোস দ্বীপে।

চিত্রঃ জলজ ইগুয়ানা। ছবিঃ lemon.hu

একই ধরনের প্রক্রিয়া ঘটেছে সমগ্র বিশ্বে, সমস্ত বিশ্বের প্রাণীজগৎ ও উদ্ভিদজগতে। গ্যালাপাগোস হচ্ছে ছোট একটি এলাকার ছোট একটি উদাহরণ মাত্র। গ্যালাপাগোসের মতো অন্যান্য কত এলাকায় এমন বিচিত্র ঘটনা ঘটে চলছে তার কোনো হিসেব নেই। শুধু বিচ্ছিন্ন দ্বীপই নয়, খাল-বিল-নদী-পাহাড়-মরুভূমির কারণেও নতুন নতুন প্রজাতির উৎপত্তি হয়। প্রশস্ত ও বহমান একটি নদীও প্রজাতিকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। নদীর দুই পাশের জলবায়ু ও এলাকা এক হলেও তাদের এক পারের সদস্যরা আরেক পারে যাওয়া খুব কষ্টকর ব্যাপার (বুদ্ধিমান মানুষের কথা বাদ দিলাম)। বিচ্ছিন্ন হবার কারণে এক পারের সদস্যদের

তুলনায় অন্য পারের সদস্যদের মাঝে কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়। অনেকটা ভাষার মতো। যেমন করে বিচ্ছিন্নতার কারণে একটি ভাষা থেকে একটি উপভাষার সৃষ্টি হয়, একসময় উপভাষা যেমন ভিন্ন একটি ভাষায় পরিণত হয় তেমনই আরো পরিবর্তনের মাধ্যমে নদীর দুই পারও পরস্পর ভিন্ন প্রজাতির এলাকায় পরিণত হয়। কোনো একভাবে এদেরকে একত্র করলে দেখা যাবে এদের দিয়ে আর সন্তান উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ তারা প্রজাতিগতভাবে ভিন্ন হয়ে গেছে। যদিও তাদের উভয়ের পূর্বপুরুষ একসময় একই প্রজাতির সদস্য ছিল।

বিস্তৃত পর্বতমালাও নদীর মতো বিচ্ছিন্নকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশাল এলাকাব্যাপী ধু ধু মরুভূমিও এই ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের ইঁদুর এবং কানাডার ইঁদুর দেখতে হয়তো এক কিন্তু তারা যদি পরিবর্তিত হয় তাহলে নিশ্চয়ই নিজ নিজ পরিবেশ অনুসারে পরিবর্তিত হবে। এক অঞ্চলের পরিবর্তনের ধারা আরেক অঞ্চলের পরিবর্তনের ধারা থেকে ভিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক।

গ্যালাপাগোস দ্বীপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনের মাধ্যমে তিন প্রজাতির ল্যান্ড ইগুয়ানার উৎপত্তি হতে কয়েক হাজার বছর লেগেছে মাত্র। কয়েক মিলিয়ন বছর পর্যন্ত যদি অপেক্ষা করি পরিবর্তিত হওয়া ঐ সময়ের প্রাণীগুলোর সাথে যদি আজকের তুলনা করে দেখি তাহলে উভয়ের পার্থক্য হবে কল্পনাতীত পরিমাণ বিশাল। অনেকটা তেলাপোকার সাথে কুমিরের তুলনা করে দেখার মতো। এখানেও আবার উল্লেখ করছি এই ব্যাপারটাই ঘটেছে সমস্ত জীবজগতের ক্ষেত্রে। এটা সত্য যে তেলাপোকার দাদার দাদার দাদার … … … দাদা’র এমন একটি পূর্বপুরুষ ছিল যে কিনা আজকের কুমিরেরও দাদার দাদার দাদার … … … দাদা’র পূর্বপুরুষ। তেলাপোকা ও কুমির একই পূর্বপুরুষ থেকে বিশ্লিষ্ট হয়েছিল, কিন্তু আজ তাদের মাঝে আকাশ পাতাল পার্থক্য।

সময়ের উল্টোদিকে এগিয়ে যেতে থাকলে একসময় না একসময় তেলাপোকা ও কুমিরের পূর্বপুরুষ একই সদস্যে গিয়ে মিলিত হবে। এর জন্য হয়তো আমাদেরকে বিলিয়ন বিলিয়ন বছর পরিমাণ পেছনে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু তারপরেও অনেক পূর্বপুরুষ অতিক্রম করে তেলাপোকা ও কুমিরের একই পূর্বপুরুষের দেখা পাবো।

এত বছর আগে তাদের প্রজাতিগত বিভাজনের জন্য কোন পরিবেশটি বাধা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল তা এতদিন পরে এসে ঠিক ঠিকভাবে জানা কষ্টকর। যেভাবেই এটা হয়ে থাকুক তা হয়েছে সমুদ্রের পরিবেশে। কারণ তখন ডাঙায় কোনো প্রাণীর অস্তিত্বই ছিল না। সম্ভবত তেলাপোকা ও কুমিরের অতি-আগের পূর্বপুরুষের সন্তান অগভীর সমুদ্রের শৈবাল সম্বলিত এলাকায় বসবাস করেছিল এবং অনুধাবন করেছিল গভীর সমুদ্রের বৈরি পরিবেশের তুলনায় এই পরিবেশ বেশ উত্তম। অন্তত তাদের জন্য উত্তম। অগভীর সমুদ্র থেকেই ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তন ও অভিযোজনের মাধ্যমে ডাঙায় এসেছিল তেলাপোকার পূর্বপুরুষ।

মাত্র ৬ মিলিয়ন বছর আগে ফিরে গেলেই আমরা মানুষের এমন পূর্বপুরুষের দেখা পাবো যে কিনা আজকের শিম্পাঞ্জীদেরও পূর্বপুরুষ। এই সময়টা খুব একটা বেশি নয়। ফলে তেলাপোকা ও কুমিরের মতো এখানে মানুষ ও শিম্পাঞ্জীদের বিভাজনে বাধা হিসেবে কী কাজ করেছে তার সম্পর্কে ধারণা লাভ করা খুব একটা কঠিন নয়। ধারণা করা হয় আফ্রিকার গ্রেট রিফট ভ্যালি এখানে বাধা হিসেবে কাজ করেছিল। গ্রেট রিফট ভ্যালি হচ্ছে ৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উপত্যকা যা এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ হতে শুরু করে আফ্রিকা মহাদেশের পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত।

চিত্রঃ গ্রেট রিফট ভ্যালির পরিবেশ। ছবিঃ Zohar African Safaris

গ্রেট রিফট ভ্যালির পূর্বদিকে বিবর্তিত হয়েছে মনুষ্য প্রজাতি আর পশ্চিম দিকে বিবর্তিত হয়েছে শিম্পাঞ্জী প্রজাতি। পরবর্তীতে শিম্পাঞ্জীদের ধারা দুটি ভাগে বিভক্ত হয় সাধারণ শিম্পাঞ্জী ও পিগমি শিম্পাঞ্জীতে (বেবুন)। ধারণা করা হয় বিভক্ত হবার জন্য কঙ্গো নদী তাদের মাঝে বাধা হিসেবে কাজ করেছিল। এই হিসেবে ১৮৫ মিলিয়ন বছর আগের সময়ে গেলে আমরা এমন এক প্রাণীর দেখা পাবো যে কিনা আজকের যুগের সকল প্রকার স্তন্যপায়ী প্রাণীর পূর্বপুরুষ।

স্তন্যপায়ীরা প্রাণিজগতে তুলনামূলকভাবে উন্নত মস্তিষ্কের অধিকারী। অতি-আগের পূর্বপুরুষের বংশধরদের মাঝে প্রজাতিগতভাবে একের পর এক বিভাজন সম্পন্ন হয়েছে। অল্প সময়ের মাঝেই স্তন্যপায়ীর হাজার হাজার প্রজাতিতে ছেয়ে গেছে সমস্ত পৃথিবী। স্তন্যপায়ীর ঘরে আছে ২৩১ প্রজাতির মাংসাশী (কুকুর, বিড়াল, বাঘ, ভালুক ইত্যাদি), ২ হাজার প্রজাতির ইঁদুর জাতীয় প্রাণী বা Rodent, ৮৮ প্রজাতির তিমি ও হাঙর জাতীয় প্রাণী, ১৯৬ প্রজাতির দ্বি-খণ্ডিত ক্ষুর বিশিষ্ট প্রাণী (গরু, ভেড়া, হরিণ, শূকর ইত্যাদি- এদের পায়ের ক্ষুর দ্বি-খণ্ডিত বা দুই ভাগে বিভক্ত থাকে), ১৬ প্রজাতির ঘোড়া জাতীয় প্রাণী (ঘোড়া, জেব্রা, গণ্ডার ইত্যাদি), ৮৭ প্রজাতির খরগোশ জাতীয় প্রাণী, ৯৭৭ প্রজাতির বাদুড়, ৬৮ প্রজাতির ক্যাঙ্গারু, ১৮ প্রজাতির এপ (এদের মাঝে মানুষও আছে), এবং অন্যান্য অনেক অনেক অনেক প্রজাতি যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এত পরিমাণ স্তন্যপায়ী প্রাণীর পূর্বপুরুষ যিনি তার দেখা যদি পেতাম তাহলে বাংলাদেশের সাংবাদিক ধাঁচে প্রশ্ন করতাম “সমস্ত পৃথিবী তো আণ্ডাবাচ্চা দিয়ে ছেয়ে ফেলেছেন! পৃথিবী ভরিয়ে দেয়া এত পরিমাণ প্রজাতির পূর্বপুরুষ হতে পেরে আপনার অনুভূতি কী?”

লক্ষ লক্ষ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের উপস্থিতিতে পৃথিবীতে বিরাজ করছে চমৎকার এক বৈচিত্র্য। আর এই বৈচিত্র্যময়তার পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে কাজ করেছে বিচ্ছিন্নতা। একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে থাকা। বিচ্ছিন্নতা নেতিবাচক, আমরা কেউ বিচ্ছিন্ন হতে চাই না। কিন্তু তারপরেও বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর জন্য বিচ্ছিন্নতার শক্তিকে ধন্যবাদ দিতে হয়।

তথ্যসূত্র

১. The Magic of Reality, D Richard, Free Press, New York, 2011 (3rd Chapter)

২. সাগরের বুকে ডারউইনের পাঁচটি বছর, মাসিক জিরো টু ইনফিনিটি, আগস্ট ২০১৩

৩. https://thenanitesolution.wordpress.com/2015/08/18/islands-of-the-galapagos-archipelago-part-ii/

 

 

নক্ষত্র যাত্রাঃ সায়েন্স ফিকশন থেকে বাস্তবতায়

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের ফিল্ড ইকুয়েশন অনুসারে আলোর চেয়ে বেশি গতিতে ভ্রমণ করা অসম্ভব নয়। এই সূত্রের উপর ভরসা করে স্টারট্রেক সিনেমার ওয়ার্প ড্রাইভ বা কৃত্রিম ওয়ার্মহোল নিয়ে গবেষকরা দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এধরনের প্রযুক্তি মানুষের আয়ত্বে আসলে এখনো অনেক সময় বাকি। তবে তার মধ্যে কিছু আশার কথাও শোনা যায়। যেমন ১৯০৩ সালে রাইট ব্রাদার্স মানবজাতির প্রথম ফ্লাইট সম্পন্ন করে। এর পরের ১০০ বছরে তাদের সেই আনাড়ি উড্ডয়নের অকল্পনীয় উন্নয়ন হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই মানুষ এখন এই দেশ থেকে ঐ দেশে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে। কোটি কোটি কিলোমিটার দূরের গ্রহে নভোযান পাঠাচ্ছে অনায়াসে। এরকম উদাহরণ থেকে বলা যায় সৌরজগতের বাইরে দূরের কোনো নক্ষত্রে পৌঁছার কল্পনা আজকে অবাস্তব বলে মনে হলেও সময়ের প্রবাহের সাথে সাথে আগামী কয়েক শতকের মাঝে তা মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে।

সঠিক গ্রহ নির্বাচন

খোলা চোখেই হাজার হাজার নক্ষত্রম দেখা যায়। টেলিস্কোপ দিয়ে তাকালে নক্ষত্রের পরিমাণ তো প্রায় অসীমের পর্যায়ে চলে যায়। এক্ষেত্রে দূরের বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র আর তাদের মধ্যে জীবন ধারনের উপযোগী সঠিক গ্রহটি খুঁজে বের করাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। জীবন ধারণের উপযোগী পৃথিবী সদৃশ কোনো গ্রহ যদি পাওয়া যায় এবং সেটিকে টার্গেট করা হয় তাহলে সেই মিশনে প্রচুর অর্থ আর সময় দরকার হয়। সাথে দরকার হয় হাজার হাজার গবেষকের মেধা। তার উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্বদিচ্ছাও থাকতে হবে। কারণ অর্থ সরবরাহ করতে তারা অস্বীকৃতি জানালে মিশন আটকে যাবে।

এরকম মিশনে সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণ বিষয় হলো কম দুরত্বের মাঝে পৃথিবী সদৃশ গ্রহ খুঁজে পাওয়া। দূরত্ব যত বেশি হবে অর্থ ও সময়ও তত বেশি লাগবে। কাছে কোনো প্রাণবান্ধব এলাকায় গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেলে তাহলে তা সময় ও অর্থ উভয়ই বাঁচিয়ে দেবে।

মানুষ তার মহাকাশ অভিযানের প্রথম ধাপ অতিক্রম করেছে চাঁদে অবতরণের মধ্যে দিয়ে। স্থায়ীভাবে বসবাস না করলেও সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে গবেষণা করার মতো ঘাঁটি এই শতকের ভেতরেই তৈরি সম্ভব। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে নক্ষত্রের সংখ্যা ১০ হাজার কোটিরও বেশি। ১৫-২০ আলোক বর্ষের ভেতর নক্ষত্র আছে ৬০-৬৫ টি। প্রাথমিক অবস্থায় কাছের এই নক্ষত্রের দিকেই যাত্রা করতে হবে।

সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশি নক্ষত্র হচ্ছে আলফা সেন্টারি। কম দূরত্ব মানে ৪.৩৭ আলোকবর্ষ। প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার করে গেলেও সেখানে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে ৪ বছর লেগে যাবে। ২০১২ সালে আলফা সেন্টারির পাশে একটি পৃথিবী সদৃশ গ্রহের অস্তিত্ব খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা। গ্রহটি পৃথিবী সদৃশ হলেও জীবন ধারনের জন্য যে অতিরিক্ত উত্তপ্ত হবে সেটা প্রায় নিশ্চিত। মিশনের আগে গ্রহের তাপমাত্রা সম্পর্কে জানা জরুরি। নক্ষত্রের আকৃতি, বয়স, তাপমাত্রা, চম্বুকত্বের তীব্রতা ইত্যাদির উপর গ্রহের অবস্থা নির্ভর করে। মিশনের আগে এগুলোও জানা জরুরী। ২০১৮ সালে নাসার পরিকল্পনামতো জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) উৎক্ষেপণ করা হলে এসব অজানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে বলে আশা করেন গবেষকরা।

চিত্রঃ যেমন ওয়েবার স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে অনেক নক্ষত্রের অজানা তথ্য। ছবিঃ Northrup Gruman

রকেট প্রোপালশন 

মহাকাশ নিয়ে আগ্রহ নেই এমন জাতি সম্ভবত একটিও পাওয়া যাবে না। তবে শুধু আগ্রহ দিয়ে হবে না, মহাকাশ নিয়ে ভালো কিছু করতে হলে বিশাল অর্থ ভাণ্ডারও দরকার। এযাবৎ কালে মহাকাশে সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢেলে আসা দেশটি হলো যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৪৬ সালে পারমাণবিক বোমা নিয়ে কাজ করা ম্যানহাটন প্রজেক্টের একজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম নিউক্লিয়ার বোমার বিপুল শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর প্রস্তাব করেন। নিউক্লিয়ার বোমাগুলো হবে ছোট আকারের। যুদ্ধের জন্য বানানো বোমার মতো এত বড় ও বিধ্বংসী না। ষাটের দশকে ‘ওরিয়ন’ নামে একটি গোপন প্রজেক্ট শুরু করে নাসার গবেষকরা। এখানে বিজ্ঞানীরা শিপের জ্বালানী হিসেবে নিউক্লিয়ার পালস ইউনিটের কথা ভাবেন অর্থাৎ পারমাণবিক শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। নীল গ্রহ পৃথিবী থেকে লাল গ্রহ মঙ্গলে যাওয়া এবং আসা মিলে মাত্র ১২৫ দিন লাগতো তাদের প্রস্তাবিত নিউক্লয়ার শক্তি চালিত নভোযানে। এ ধরনের স্পেসশিপে বিস্ফোরণ গ্রাহক অংশে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। নভোচারীদের থাকার স্থান বিস্ফোরণ অংশ থেকে কিছুটা দূরে থাকবে যেন তাদের নিরাপত্তাজনিত সমস্যা না হয়। ওরিয়ন বিস্ফোরণের শক্তিকে ব্যবহার করে স্পেসশিপকে সামনে ঠেলে দিতো। নিউক্লিয়ার শক্তি ব্যবহার করে এধরনের স্পেসশিপ আলোর গতির ৫% গতি অর্জন করতে সক্ষম। ওরিয়ন স্পেসশিপ সেকেন্ডে ৩০কিমি অর্জন করতে পারবে বলে বিজ্ঞানীরা হিসাব করেন। কিন্তু ১৯৬৩ সালে পারমাণবিক বিস্ফোরণ বিরোধী চুক্তি এবং ১৯৬৭ সালে এরকমই আরেকটি চুক্তি অনুসারে মহাশূন্যে কোনো ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো যাবে না। তাই এধরনের কাজে বেশ জটিলতা তৈরি হয় এবং পরে সোভিয়েত রাশিয়া ও আমেরিকা এ সম্পর্কিত গবেষণা গুটিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে ওরিয়নের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায় এবং এই গবেষণার মৃত্যু ঘটে।

নিউক্লয়ার শক্তি বিপজ্জনক। এ থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সরানোও ঝামেলার কাজ। তাছাড়া স্পেসশিপ পরিচালনার জন্য যে নিউক্লয়ার ইঞ্জিন হতে হবে তার ভর সাধারণ ইঞ্জিন থেকে ১০ গুণ বেশি, যা উড্ডয়নের সময় সমস্যা সৃষ্টি করবে। পাস্পাশি এর রক্ষণাবেক্ষণও বেশ ঝামেলার।

ব্রিটিশ ইন্টারপ্ল্যানেটারি সোসাইটি ৭০ এর দশকে প্রজেক্ট ডায়েডেলাস হাতে নেয়। লক্ষ্য আলফা সেন্টারি ছাড়িয়ে দ্বিতীয় নিকটবর্তী নক্ষত্র বার্নার্ডা পৌঁছানো। আলোর ১২% গতি লাভ করতে সক্ষম এধরনের যান ৪০ বছরে আলফা সেন্টারি পৌছাতে পারে।

এই ধরনের স্পেসশিপের নকশা অনুসারে ইঞ্জিনের পারমাণবিক চেম্বারে থার্মোনিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ ঘটানো হবে। বিস্ফোরণে পারমাণবিক ভাঙন হবে এবং এতে উত্তপ্ত প্লাজমা হতে প্রচণ্ড শক্তিশালী প্রবাহ মহাকাশযানের পেছন দিয়ে নিঃসরিত হবে। প্রবাহের উল্টমুখি ধাক্কার ফলে স্পেসশিপ সামনে এগিয়ে যাবে নিউটনের ৩য় সূত্র অনুসারে।

অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প

সুবিধা থাকলেও এরকম ভারী মহাকাশযান উৎক্ষেপণের জন্য কোনো স্টেশন তৈরি হয়নি এবং অদূর ভবিষ্যতে তৈরির সম্ভাবনাও নেই। এর একটি সমাধান হতে পারে বাসার্ড র‌্যামস্কোপ এর ধারণা। আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট বাসার্ডের নাম থেকেই বাসার্ড র‌্যামস্কোপের উৎপত্তি।

মহাকাশের বিশাল শূন্যতার পরতে পরতে হাইড্রোজেন ভেসে বেড়াচ্ছে। যদি মহাকাশযান এমন হয় যে এটি কোনো একভাবে মহাকাশ থেকেই হাইড্রোজেন সংগ্রহ করবে এবং ইঞ্জিনের রিঅ্যাক্টরে হাইড্রোজেনের বিস্ফোরণ ঘটাবে, আর এই শক্তিকেই মহাকাশযানের জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। মহাকাশের সবখানে হাইড্রোজেন পাওয়া গেলেও এর ঘনত্ব এত বেশি নয়। প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে একটি বা দুটি কণা আছে বড়জোর। মহাকাশযানের শক্তিশালী ইঞ্জিন চালাতে যে পরিমাণ হাইড্রোজেন লাগবে তা সংগ্রহ করতে বিশাল আকারের সংগ্রাহক লাগবে। সংগ্রাহককে হতে হবে অনেকটা মাছের হাঁ আকৃতির জাল বা ফাঁদের মতো মতো। মাত্র কয়েকশো মিটারের নয়, এই ফাঁদ হতে হবে কয়েক হাজার কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী। ছোট্ট র‌্যামজেটের বিশাল সংগ্রাহক নিয়ে চলা অসম্ভব। আর সংগ্রাহকে হাইড্রোজেনের পাশাপাশি অন্যান্য অণু পরমাণুও ধরা পড়বে। এসব কণাগুলোকে নিয়ে কী করা যায় তার ভালো কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। এমন বিশাল আকৃতির র‌্যামজেট বানানোও প্রায় অসাধ্য। তাত্ত্বিককভাবেই এই ধারণাটি অনেক সীমাবদ্ধ।

জেনারেশন স্টারশিপ

দূর দূরান্তের নক্ষত্ররাজ্যে এক জীবনে কি যাওয়া সম্ভব? এমন প্রশের মুখে দূর নক্ষত্রে যাবার জন্য দুটো উপায় খোলা আছে। মহাকাশযানকে হতে হবে অনেক বেশি গতি-সম্পন্ন, যেন চোখের পলকে আলোকবর্ষ পরিমাণ দূরত্ব পার হয়ে যাওয়া যায়। অথবা মহাকাশযানেই এক বা একাধিক প্রজন্ম তৈরি করে লম্বা সময় নিয়ে যাওয়া। যুগের পর যুগ স্পেসশিপ মহাকাশ ভ্রমণ করে বেড়াবে আর এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম তার দায়িত্ব নিবে। এভাবে চলতে চলতে একদিন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।

বলতে যতটা সহজ আসলে তা কিন্তু মোটেও এত সহজ না। স্টারশিপকে পৃথিবীর পরিবেশের মতো করে তৈরি করতে হবে যেন সেখানে উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল থাকে। উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল ছাড়া জেনারেশান স্টারশিপ অনেকটা ডাঙ্গায় মাছ উঠে আসার মতো হবে। মাধ্যাকর্ষণ বল আনতে স্টারশিপের মডেলটি হতে হবে চাকতি আকৃতির। চাকতির ভেতরটি হবে ফাঁপা এবং ভেতরে হাজার খানেক মানুষের স্থান থাকতে হবে। শুধু মানুষ নয় সঙ্গী হিসেবে কিছু প্রাণীরও দরকার হবে। কৃত্তিম উপায়ে চাষাবাদ, অক্সিজেন সরবরাহ, বর্জ্য নিষ্কাশন, বিনোদনের সুবিধাও থাকতে হবে। আর গন্তব্যে পৌঁছানোর পর নতুন গ্রহে কলোনি স্থাপনের সব উপকরণও থাকা চাই।

চিত্রঃ কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ তৈরির জন্য স্টারশিপগুলো হতে হবে চাকতি আকৃতির।

এবার সামাজিক সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করা উচিৎ। স্টারশিপে গড়ে উঠবে বিচ্ছিন্ন ও নিজস্ব একটি সংস্কৃতি। নির্ধারিত গ্রহে যেতে ১০ হাজার বছর সময়ও লেগে যেতে পারে। এমনও হতে পারে পৃথিবী থেকে তাদের যাত্রা শুরুর কিছুদিন পর পৃথিবী থেকেই তাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এমন অবস্থায় স্টারশিপের ছোট্ট গণ্ডিই নিজেদের সব।

নিজেদের মধ্যে বিবাদ তৈরি করে মিশনের দায়িত্ব পালন না করে কেউ যেন বিচ্যুত হয়ে না যায় তাও গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, স্টারশিপে লোকবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্টারশিপে লক্ষ্য থাকবে নতুন কোনো গ্রহে কলোনি স্থাপন করে বসবাসযোগ্য আরেকটি পৃথিবী তৈরি করা। কলম্বাস যেমন সামনে কোনো ডাঙ্গা আছে কিনা না জেনেই বেড়িয়ে গিয়েছিলেন জেনারেশান স্টারশিপের ব্যাপারটাও অনেকটা তেমন। সীমাহীন মহাকাশে আদৌ কিছু মিলবে কিনা তা না জেনেই বেড়িয়ে পড়া।

এগশীপ

এগশীপ স্টারশিপেরই অন্য আরেকটি রূপ। এখানে বেশিরভাগ কাজ করবে সুপার কম্পিউটার অথবা পৃথিবীর কোনো নিয়ন্ত্রক। স্টারশিপে দূরের কোনো গন্তব্যে যাবে কিন্তু কলোনি স্থাপন বা আনুষঙ্গিক কাজগুলো কে করবে? এই সমস্যায় এগশিপ মডেলের মহাকাশযানের হিমাগারে সংরক্ষিত থাকবে মানব ভ্রূণ। সময়মতো তাদেরকে কৃত্তিম জন্ম দেয়া হবে। জৈব প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে মাতৃহীন জন্ম সম্ভবত কয়েক দশকের ভেতরেইই রপ্ত হয়ে যাবে। তবে সেটাকে মহাকাশ ভ্রমণে ব্যাবহার খুব সহজ নয়। হাজার খানেক ভ্রূণ কৃত্তিম জরায়ুতে পুষ্টি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা এবং দৈনিক তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ বেশ চ্যালেঞ্জিং কাজ। রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃত্রিম জরায়ু, সুপার কম্পিউটারের সক্ষমতা এবং সবশেষে সদ্য জন্ম নেয়া মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই এগশীপ এখনো একটি কল্পকাহিনী।

সাসপেনশন অ্যানিমেশন

এটি একটি বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। কোনো প্রাণকে আকস্মিকভাবে যদি স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় পৌঁছে দেয়া যায় তাহলে ঐ প্রাণের যাবতীয় কর্মকাণ্ড মুহূর্ত থেমে যাবে। আক্ষরিক অর্থে সে মৃত। হৃদযন্ত্র এবং কোষ বিভাজন বন্ধ। ফলে তার আয়ু থেমে যাবে অর্থাৎ বয়স বাড়বে না। এধরনের কারিগরি দিকের একটি সম্ভাবনা হলো সদ্য মৃত জীবদেহকে তাৎক্ষণিকভাবে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি তাপমাত্রার নাইট্রোজেনে ডুবিয়ে রাখলে এবং উপযুক্ত পদ্ধতি আয়ত্বে থাকলে কোনো একদিন ঐ জীবের প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সাসপেনডেড অ্যানিমেশন থেকে জাগিয়ে তোলার পদ্ধতি হচ্ছে আকস্মিকভাবে তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলা। এতে জীবটির জৈবিক ক্রিয়া আবার শুরু হতে পারে। সফলভাবে সম্পন্ন হলে মনে হবে একটা দারুণ লম্বা ঘুম দিয়ে উঠেছে সে। মনেই হবে না যে ঘুমিয়ে শত বছর পার করে দিয়েছে।

তবে দুঃখের বিষয় যে এটা এখনো কল্পনা। কিছুক্ষণের জন্য জীবদেহের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হলেও স্থায়ীভাবে তা করা সম্ভব নয়। যেমন সাপ বা ব্যাঙ গোটা শীতকাল ঘুমিয়ে কাটায়। দেহের কার্যক্রম একদম সীমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু একেবারে থেমে যায় না। এরা ছাড়া অন্যান্য অনেক প্রাণীর মধ্যেই এই শীতনিদ্রা দেখা যায়। এদের কেউই একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না। মানুষকে এখনো শীতনিদ্রায় পাঠানো সম্ভব হয়নি। ক্যালিফোর্নিয়ার ক্রায়োনিক সোসাইটি বিশ্বাস করে আগামী কয়েক দশকেই এধরনের কোনো প্রযুক্তি আবিস্কার হবে যা দিয়ে মানুষকে শীতনিদ্রায় পাঠানো যাবে। বাস্তবে এখন পর্যন্ত সম্ভব না হলেও মানুষের দীর্ঘ শীতনিদ্রা নিয়ে মুভি-সিনেমা কম তৈরি হয়নি।

সাসপেনডেড অ্যানিমেশন সম্ভব হলে স্পেস মিশনে যে বিপ্লব আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্পেসশিপে প্রাথমিক কিছু কাজ করে সুপার কম্পিউটারের হাতে নিয়ন্ত্রণ দিয়ে ঘুমিয়ে যাও তারপর যখন দরকার কম্পিউটারই ডেকে তুলবে। দিনের পর দিন কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসে বুড়িয়ে যাবার প্রয়োজন নেই।

এই ধরনের প্রজেক্ট আরো একটি উচ্চাভিলাশী চিন্তা। তবে উচ্চাভিলাশ থেকেই বিজ্ঞান অগ্রগতি। আজকের সায়েন্স ফিকশনই আগামী দিনের বাস্তবতা।

তথ্যসূত্র

  1. http://blogs.discovermagazine.com/crux/2016/08/10/interstellar-warp-drive-space-travel/#.WCV_ydJ97IX
  2. http://www.eyewitnesstohistory.com/wright.htm
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/General_relativity
  4. http://earthsky.org/brightest-stars/alpha-centauri-is-the-nearest-bright-star
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/James_Webb_Space_Telescope
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Project_Orion_(nuclear_propulsion)
  7. https://www.youtube.com/watch?v=pBenHWEGozE
  8. http://i4is.org/the-starship-log/interstellar-ramjets
  9. https://www.youtube.com/watch?v=Z-Zs0q6cDPI
  10. http://www.sf-encyclopedia.com/entry/generation_starships
  11. https://www.kirkusreviews.com/features/generation-starships-fiction-and-fact/
  12. http://www.eetimes.com/author.asp?doc_id=1285658
  13. http://www.astrosociology.org/Library/PDF/Caroti_SPESIF2009.pdf
  14. http://www.mybestbuddymedia.com/2016/03/9-reasons-space-dreams-will-die.html
  15. https://en.wikipedia.org/wiki/Suspended_animation

 

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলাধার

পৃথিবী বসবাসযোগ্য গ্রহ হবার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পানি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাণের সব দিককে প্রভাবিত করছে পানি। পানি ছাড়া পৃথিবীতে কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী থাকতো না। বর্তমানে যেমন দেখতে তাই তার তুলনায় গ্রহটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ৭১% পানি দ্বারা আচ্ছাদিত, যার প্রায় ৯৬.৫% পানি সমুদ্রগুলো ধারণ করছে। এছাড়া নদীনালা, হ্রদ, বাতাসের জলীয় বাষ্প, হিমবাহ, মাটির আর্দ্রতা এবং আপনার-আমার মধ্যেও পানি রয়েছে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধারের অবস্থান ভূপৃষ্ঠের উপরে কোথাও নয়, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ মাইল অভ্যন্তরে এর অবস্থান।

পৃথিবীকে ভূতাত্ত্বিকভাবে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায় Crust, Mantle ও Core। এগুলোর মধ্যে Mantle স্তরটি খানিকটা জটিল। এর নিজেরই আবার স্বতন্ত্র চারটি স্তর রয়েছে- Lithosphere, Athenosphere, Upper mantle ও Lower mantle। এ স্তরগুলোর মধ্যেও আবার বৈচিত্র্য লক্ষ্যণীয়। এগুলোর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। Mantle এর শেষোক্ত দুইটি স্তরের মধ্যবর্তী অংশকে বলা হয় Transition zone। এ অংশেই রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধার।

যে জলাধারের কথা বলছি তা ভূ-পৃষ্ঠের উপরের জলাশয়গুলোর মতো নয় যেখানে আমরা মাছ চলাচল করতে দেখি। পানির যে তিনটি রূপের সাথে আমরা পরিচিত, এটি তার থেকে আলাদা। বলা যেতে পারে পানির চতুর্থ অবস্থা সেটি। ভু-অভ্যন্তরে এত গভীরে অত্যাধিক তাপমাত্রা ও চাপের কারণে পানি বিভাজিত হয়ে হাইড্রক্সিল মুলক (OH¯) আকারে থাকে যা এক ধরনের শিলার মধ্যে আণবিক স্তরে চাপা পড়ে আছে। এ শিলার নাম দেয়া হয়েছে Ringwoodite। শিলাটি অনেকটা পানি দ্বারা সিক্ত স্পঞ্জের ন্যায় আচরণ করে। শিলাটির বিশেষ স্ফটিক গঠন হাইড্রোজেনকে আকর্ষণ করে পানিকে আটকে ফেলতে পারে। Ringwoodite পানির এক সুবিশাল আধার। Transition zone এর এই শিলার যদি এক শতাংশও গঠনগতভাবে তরল পানি হয় তাহলে তার দ্বারা পৃথিবীর সমুদ্রগুলোকে প্রায় তিন বার প্রতিস্থাপিত করা যাবে।

ভূ-অভ্যন্তরে এই সুবিশাল জলাধারের সন্ধান পেয়ে বিজ্ঞানীদের এখন ধারণা, ভূপৃষ্ঠের এ বিশাল সমুদ্রগুলোর পানির উৎস আসলে ভূ-অভ্যন্তরে আটকে থাকা পানিই। যদিও পূর্বে সর্বাধিক স্বীকৃত ধারণা ছিল- প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন বছর আগে বরফতুল্য ধূমকেতু ও গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ থেকেই এ সমুদ্রগুলোর উৎপত্তি হয়েছে। তবে এখন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভূতাত্তিক কার্যকলাপ এবং অত্যাধিক চাপের কারণে ভু-অভ্যন্তরের আটকে থাকা পানির অণুগুলো ভূপৃষ্ঠের দিকে উঠে এসে এই সমুদ্রগুলোর জন্ম দিয়েছে। এর থেকে বিজ্ঞানীদের ধারণা পানি চক্র কেবল ভূ-পৃষ্ঠ এবং বায়ুমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভু-অভ্যন্তরের অনেক গভীরে পর্যন্ত প্রসারিত। এছাড়াও ধারণা করা হয় ভু-অভ্যন্তরের এই পানিই বাফার হিসেবে ক্রিয়া করছে যার জন্য কোটি কোটি বছরেও সমুদ্রের উচ্চতার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

আমাদের সৌভাগ্য যে এই সুবিশাল জলরাশি পৃথিবীর অভ্যন্তরেই চাপা পরে আছে। নতুবা যদি তা সম্পূর্ণভাবে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসতো তাহলে আমরা স্থলভাগ বলতে কেবল পর্বতচূড়াগুলোকেই দেখতে পেতাম।