যারা বাগিয়ে নিলেন ফিল্ডস পদক ২০১৮: সংখ্যাতত্ত্বের জয়জয়কার

চার বছর পর পর চারজন গণিতবিদ বের হয় স্বীকৃতির মুকুটে। সংখ্যাতত্ত্ববিদ পিটার শোলজ ছিলেন জার্মানির সবচেয়ে কমবয়স্ক পূর্ণ অধ্যাপক। তখন তার বয়স মাত্র ২৪ বছর। আর জ্যামিতিবিদ কচের বীর্কার যে কিনা একজন কুর্দিশ শরনার্থী— গণিতের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরষ্কার ফিল্ডস পদক বরণ করেছেন। আরো দুজন— ইতালির আলেসসিও ফিগাল্লি এবং ভারতীয় অক্ষয় ভেঙ্কটেশ যাদের কাজ যথাক্রমে নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ এবং সংখ্যাতত্ত্বের উপর। এই চারজনের নাম একে একে ধ্বনিত হয়েছে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব ম্যাথমেটিসিয়ান্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে।

ফিল্ডস পদক গণিতের শীর্ষ সম্মানজনক স্বীকৃতি যা ভূষিত করা হয় ৪০ বছর অনূর্ধ্ব ব্যক্তিদের গণিতে বিশেষ অবদানের জন্য; ছবি কৃতজ্ঞতা: Stefan Zachow

ফিল্ড পদক প্রদান করে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব ম্যাথমেটিক্স। চার বছর পর পর কনফারেন্সে চারজন তরুণ গণিতবিদকে এই পুরষ্কারে সম্মানিত করা হয়। গণিতের পুরষ্কারে অবশ্য তরুণ বলতে সুনির্দিষ্ট করা রয়েছে— ৪০ বছরের অনুর্ধ্ব। এবারের চারজন একটি ইতিহাস ভাঙার ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। ১৯৩৬ থেকে সেই যে শুরু হয়েছে ফিল্ডস পদক— এই ৮২ বছরে প্রথমবারের মত কোনো আমেরিকান বা ফরাসি গণিতবিদ এবার পুরষ্কার পাননি! এই দুই দেশ মিলে ফিল্ডসের প্রায় অর্ধেক পদক বাগিয়ে বসে আছে। বিজ্ঞান ও গণিতের যুগলের যুগ্মজয়ীর উদাহরণ বুঝি এরাই! আর অদ্যাবধি ৬০ জন পদকজয়ীর মধ্যে সবেধন একমাত্র নারী ২০১৪ এর বিজয়ী মারিয়াম মির্জাখানি।

ইউনিভার্সিটি অব বন, জার্মানিতে পিটার শোলজ। ছবি কৃতজ্ঞতা: Nyani Quarmyne

পিটার শোলজ যে এ বছর ফিল্ডস জিততে যাচ্ছেন এ ব্যাপারে কারও সন্দেহ ছিল না বললেই চলে। বরং হিসেবটা ছিল শোলজের সাথে আর কোন তিনজন এবার এতে ভূষিত হতে যাচ্ছেন? গণিত সম্প্রদায়ের মধ্যে এ প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যেত কবে শোলজের নাম শোনা যাবে। ৩০ বছর বয়সী শোলজ বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন ২২ বছরেই। তখন তিনি গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থী, পাটিগণিতীয় জ্যামিতির একটি বই-সম আকার প্রমাণকে অনেক সংক্ষেপে প্রমাণ করার উপায় বের করে ফেলেন। পাটিগণিতীয় জ্যামিতি বলতে গণিতের যে শাখাকে বোঝায় তা হল বীজগণিতীয় জ্যামিতি আর সংখ্যাতত্ত্বের মাঝামাঝি অবস্থান করে। তখনই তিনি জিতে নেন শাস্ত্র রামানুজন পুরষ্কার

শোলজের অধিকাংশ কাজ সংযুক্ত সংখায়তত্ত্বের সাথে যেগুলো মৌলিক সংখ্যার গবেষণা নিহিত। তিনি ফ্র্যাক্টালের মত কাঠামো নিয়ে পারফেক্টয়েড স্পেসের উপর কাজ করেন। সোজা কথায় একাজ জ্যামিতি এবং টপোগণিতের মধ্যকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য উপযোগী।

শোলজ বর্তমানে এবিসি কনজেকচারের উপর একটি ঢাউশ আকার প্রমাণ যাচাই করছেন। এবিসি কনজেকচার সংখ্যাতত্ত্বের একটি অন্যতম বড়  অসমাধিত কনজেকচার। কনজেকচার হল গাণিতিক অনুমান। এবিসি কনজেকচারটি তিনটি সহমৌলিক সংখ্যার সম্পর্ক বর্ণনা করে যেখানে A+B=C এবং এর তৃতীয় সংখ্যার (C) উৎপাদকের ঘাত প্রথম দুটি সংখ্যার (A এবং B) উৎপাদকের ঘাতের চেয়ে কম হবে। ২০১২ তে শিনিচি মচিজুকি এই কনজেকচারের একটি প্রমাণ প্রকাশ করেন অনলাইনে কিন্তু কেউ নিশ্চিতভাবে এটাকে যাচাই করতে পারেন নি প্রমাণটি সিদ্ধ কিনা। শোলজ এবং তার সহকর্মীরা এই প্রমাণে তাৎপর্যপূর্ণ ত্রুটি পেয়েছেন বলে মনে করছেন। শোলজ ইউনিভার্সিটি অব বনের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। একই সাথে তিনি বন শহরেরই ম্যাক্স-প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ম্যাথমেটিক্সের পরিচালনা করছেন।

কচের বীর্কারের, বয়স ৪০ বছর। তিনি মূলত কুর্দিশ, তার জন্ম ১৯৭৮ এ ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে। ৮০’র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের মাঝে বেড়ে উঠেছেন বীর্কার। তার বাবা-মা ছিল কৃষক-কৃষাণী। সে কারণে তাকেও বেশ দীর্ঘ একটা সময় চাষাবাদ করে কাটাতে হয়েছে। বহু দিক থেকে হিসেব করেও এমন পরিবেশ একটা বাচ্চার গণিতে আগ্রহের জন্য অনুপ্রেরণার ছিল না।

বীর্কার পড়াশোনা করেছেন ইউনিভার্সিটি অব তেহরানে। ২০০০ সালে তিনি ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথমেটিক্স কম্পিটিশন ফর ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টসে তৃতীয় হন। এর পরপরই ইরান থেকে যুক্তরাজ্যে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন। ২০০১-২০০৪ এ পিএইচডি সম্পন্ন করেন ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যাম থেকে। তিনি বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ইউনিভার্সিটির ক্যামব্রিজের অধ্যাপক হিসেবে।

কচের বীর্কার ছোট্ট থাই ড্রামে তুলছেন কুর্দিশ তাল, নিজে নিজেই শিখেছেন। ছবিটি তোলা হয়েছে তার ক্যামব্রিজের বাসায়। ছবি কৃতজ্ঞতা: Philipp Ammon

তিনি ফিল্ডস পেয়েছেন বীজগাণিতিক প্রকরণের শ্রেণীবিন্যাসে বিরাট সাফল্য অর্জন করেছেন বলে। বহুপদী সমীকরণ থেকে জ্যামিতিক বস্তু বর্ণনার কাজই এর বিষয়বস্তু। একটা বহুপদী সমীকরণের উদাহরণ: y = x^2. পদকের ব্যাপারে তিনি নিজের অর্জনকে মনে করেন ৪ কোটি কুর্দির ঠোঁটের কোণে একটু হাসি। নিজ দেশ, মাতৃভূমি ছেড়ে পরদেশে অভিবাসী হিসেবে থাকা যে পরম সুখের নয় তার নাম থেকেই সেটা স্পষ্ট। তার আসল নাম ছিল ফারিইদুউন দারাখশানি। অভিবাসী হয়ে নাম গ্রহণ করেন ‘কুচের বীর্কার’ যে কুর্দিশ শব্দের অর্থ অভিবাসী গণিতবিদ।

৩৬ বছর বয়সী অক্ষয় ভেঙ্কটেশ কাজ করেন সংখ্যাতত্ত্বের চিরায়ত সমস্যাগুলোর উপর। সংখ্যাপদ্ধতি কিভাবে কাজ করে এবং সংখ্যার মূলসমূহ নিয়েও, যেমন- একটি মূলের উদাহরণ √2। তিনি হাতেগোনা অল্প কজন গণিতবিদের মধ্যে একজন যারা কার্ল ফ্রিডরিখ গাউসের করা প্রশ্নের উপর বলিষ্ঠ উন্নয়ন করেছেন। ভেঙ্কটেশের জন্ম ভারতের নয়াদিল্লীতে। অবশ্য বেড়ে উঠেছেন অস্ট্রেলিয়ায়, বর্তমানে কাজ করছেন ইন্সটিটিউট ফর এডভান্সড স্টাডি ইন প্রিন্সটন, নিউ জার্সিতে।

উক্ত তিনজনের কাজ বলতে গেলে পুরোদস্তুর সংখ্যার বিমূর্ত জগতের সাথে। সে তুলনায় এ বছরের অপর ফিল্ডস পদকজয়ী ৩৪ বছর বয়স্ক আলেসসিও ফিগাল্লি কাজ করেন বাস্তব জগতের কাছাকাছি বিষয়ে— অপ্টিমাল ট্রান্সপোর্ট। অর্থাৎ কোনো পরিবহন বা যোগাযোগের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম সমাধান কী হতে পারে সেটা বের করা। অর্থাৎ একটা নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা। ফিগাল্লি এটি আংশিক ডিফারেন্সিয়াল সমীকরণে প্রয়োগ করেন। এ ধরণের সমীকরণ কয়েক একাধিক চলক নিয়ে কাজ করে এবং পদার্থবিজ্ঞানের সাথে অধিক সম্পর্কিত এ ক্ষেত্র। ফিগাল্লির জাতীয়তা ইতালিয়, তিনি কর্মরত জুরিখের সুইস পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে।

 

সায়েন্টিফিক আমেরিকানকোয়ান্টা ম্যাগাজিন অবলম্বনে।