অতীতের কৃষিশিল্পে একই সাথে বিভিন্ন জাতের ফসল উৎপাদন করা হতো, বর্তমানের সাথে যার সাদৃশ্য প্রায় নেই বললেই চলে। আধুনিক প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা কৃষিব্যবস্থা কি আদৌ আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ নাকি তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

বর্তমানে জীববৈচিত্র্যের করুণ অবস্থা নিয়ে আমরা সবাই অবগত। কিন্তু ক্রমশ বিলুপ্তির পথে ধাবিত হওয়া জীববৈচিত্র্যের ফলে যে আমাদের খাদ্যের যোগান ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার উপর অধিকাংশ মানুষই কোনো কর্ণপাত করে না। তবে আশার কথা, হাতে গোনা কয়েকজন এই বিষয়টি উপলব্ধি করেন, এবং এর সমাধানে নানা রকম ভাবনা চিন্তাও করেন।

পূর্বে আমাদের পূর্বপুরুষদের খাদ্য তালিকায় খাদ্যের বৈচিত্র্য বিদ্যমান ছিল, কেননা তাদের সময় হরেক জাতের ফসল ফলানো হতো। কিন্তু সেই বৈচিত্র্য আজকে আমাদের খাদ্য তালিকায় খুঁজে পাওয়া ভার, কারণ সেই কৃষি-ব্যবস্থার লক্ষণীয় পরিবর্তন, যার জন্য পূর্বে উৎপাদিত হওয়া বিভিন্ন রকম শস্যের প্রায় ৭৫ শতাংশ এখন আর উৎপাদনই করা হয় না। বর্তমানে আমাদের উদ্ভিজ্জ খাদ্যের সিংহভাগ আসে মাত্র পনেরো জাতের উদ্ভিদ থেকে। আর পুরো বিশ্বের শর্করা চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি যোগান আসে গম, চাল আর ভুট্টা থেকে।

হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা কৃষি-ব্যবস্থায় কৃষক সমাজ, বিভিন্ন প্রকরণের শস্যের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে উৎপাদন করার এক বিস্ময়কর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন যাকে বলা হতো ‘ল্যান্ডরেস’। স্থানীয় পরিবেশের সাথে উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল এই পদ্ধতিটি। প্রত্যেক নবান্নের সময় কৃষকেরা পরবর্তী বছরে চাষ করার জন্য কিছু বীজ আলাদা করে সংরক্ষণ করে রাখতো, ভবিষ্যতের দুর্যোগ সামাল দেবার উদ্দেশ্যেও এটি কাজ করা হতো।

যেহেতু একই জমিতে একই ফসল বার বার উৎপাদন করা হলে জমির উর্বরা শক্তি হ্রাস পেতে শুরু করে তাই কৃষকেরা প্রতি বছর ফসলের পরিবর্তন করতো। একই জমিতে বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করতো। এতে করে জমি তার উর্বরা শক্তি ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতো। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, যদি কোনো ফসল কীটপতঙ্গ বা রোগ দ্বারা আক্রান্ত হতো, তাহলে তার ক্ষতি নিয়ে কৃষকরা দুশ্চিন্তা করতো না, কারণ ক্ষতি সামাল দিতে আরো বাকি ফসল রয়েছে। এটা ছিল ‘ল্যান্ডরেস’ এর একটি বড় সুবিধা।

কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষাপটের সাথে পূর্বের প্রেক্ষাপটের কোনো মিল তো নেই-ই, বরং একটি যে আরেকটির বিপরীত চিত্র প্রকাশ করে, তা বললে খুব একটা ভুল বোধ হয় হবে না। কারণ বহু জাতের ফসল উৎপাদন যেখানে পূর্বের কৃষি শিল্পে প্রাধান্য ছিলো সেখানে বর্তমানের কৃষিশিল্পের প্রাধান্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এক-ফসলী উৎপাদন বা মনোকালচার।

বর্তমানে খাদ্য উৎপাদন সবচেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত শিল্পোদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম, নিঃসন্দেহে। কিন্তু কঠিন সত্য হচ্ছে, কৃষিশিল্পে অভাবনীয় পরিবর্তন সাধন হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্ব এখনো ‘দুর্ভিক্ষ’ নামক মারাত্মক সমস্যার থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

ব্যাপারটাকে একটু খোলসা করে বলা যাক। প্রতিযোগিতামূলক বাজের টিকে থাকার জন্য এসময়ের ফার্মগুলো কেবল এক জাতের ফসল উৎপাদন করার জন্য অদরকারিভাবে বিশালায়তনের জমি ব্যবহার করছে। আর এর পেছনে যে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে তা সহজেই অনুমেয়।

অত্যাধিক মুনাফা অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো অত্যাধিক পরিমাণে ফসল উৎপাদন। তাই স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে প্রযুক্তির কথা এসে পড়ে। বেশি বেশি ফসল ফলানোর জন্য বেশি পরিমাণে কীটনাশক, সার প্রয়োগের দরকার হয়, উন্নতমানের সেচন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। আধুনিক প্রযুক্তি এই ফার্মগুলোর চাহিদা পূরণ করতে পারে ঠিকই কিন্তু তার পরিবর্তে মাটির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি সাধন করে সাথে সাথে। কেননা অত্যধিক পরিমাণে এসব ব্যবহারের ফলে মাটি একসময় তার বৈশিষ্ট্য হারাতে শুরু করে।

কোন ফসল উৎপাদন করা হবে তা পুরোপুরি কৃষকদের উপর নির্ভর করলেও তারা উৎপাদনের জন্য সেই ফসলই নির্বাচন করে থাকে যা সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীল এবং যা উৎপাদন করলে বাজারের অন্যান্য ফার্মদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে, এবং যেখানে আরো অনেক ফসল আছে যা তাদের পরিবেশের অবস্থা এবং মাটির ধরণ অনুযায়ী উৎপাদনের জন্য অধিক উপযোগী। এর ফলে দেখা যায়, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনের জন্য তাদেরকে অত্যাধিক পরিশ্রম করে বিনিয়োগ চাহিদা মেটাতে হয়। এটা তাদের করতে হতো না যদি না তারা তাদের জমির জন্য উপযোগী অন্যান্য ফসলগুলো চাষ করার সিদ্ধান্ত নিতো। কিন্তু যাদের লক্ষ্য থাকে অন্যান্য ফার্মগুলোকে টেক্কা দিয়ে সবচেয়ে বেশি মুনাফা অর্জন করা, তাদেরকে এটা বুঝাবে এমন সাধ্যি কার?

2 চিত্রঃ এই সবজিগুলো পুষ্টিতে ভরপুর এবং আমাদের খাদ্যের সিংহভাগ যোগান এরাই দিয়ে থাকে। ছবিঃ dumbonyc.

মনোকালচারের একটি পরিণতি হচ্ছে, এর ফলে আমাদের খাদ্যাভ্যাস বড্ড একঘেয়ে হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত এক শতাব্দীতে যত ধরনের শস্যাদি উৎপাদিত হতো, তার মধ্যে মাত্র দশ শতাংশ এখন অবশিষ্ট রয়েছে। আঠারো শতকে প্রায় ৭০০০ প্রজাতির আপেল উৎপাদন করা হতো, আর আজকে কেবল ১০০ প্রজাতির আপেল উৎপাদিত হয়। উৎপাদনকারীরা তাদের স্বার্থ বিবেচনা করে যা উৎপাদন করবে, তাই আমাদের খেতে হবে। আমরা যে এখন তাদের উপরেই নির্ভরশীল- তা বললে অত্যুক্তি হবে না।

মনোকালচারের আরেকটি সুবিধা হলো এটি ফসলের রোগাক্রান্ত হবার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একবার যদি কয়েকটি শস্যদানা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে প্রথমে একটি চারাগাছ আক্রান্ত হবে, এরপর পুরো ফার্ম, এবং এরপর পার্শ্ববর্তী অন্যান্য ফার্মে সেই রোগের সংক্রমণ ঘটবে।

এসব নানাবিধ অসুবিধা নির্মূল করার জন্য কৃষিবিজ্ঞানীদের উচিত ‘ল্যান্ডরেস’ এর জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করা যাতে তারা এমন একটি জিন খুঁজে পায় যা চারাগাছগুলোকে সংক্রমণমুক্ত থাকতে সাহায্য করবে। তবে রোগের সংক্রমণ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনও ফসলের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে বহুল প্রচলিত ‘মনোকালচার’ চলটা বদলানোর জন্য আমাদের হাতে এখনো কিছু সময় আছে। পূর্বে বর্ণিত কৃষকসমাজ ‘ল্যান্ডরেস’ পদ্ধতিটি জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। এখন আমরা যদি ঠিক সেই কাজটির মাধ্যমে আমাদের খাদ্যাভাসে একটু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেই তাহলে বর্তমান কৃষিশিল্প বাধ্য হবে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে। তবে আমরা যদি এজন্য খুব তাড়াতাড়ি কোনো পদক্ষেপ না নিই, তাহলে অচিরেই এ নিয়ে আমাদের বিশাল সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ দ্যা সায়েন্স এক্সপ্লোরার (http://thescienceexplorer.com/nature/why-we-need-biodiversity-our-crops)

লেখিকাঃ কাজী ফাতিহা বিনতে হাবিব
আইডিয়াল কলেজ, মতিঝিল