প্রযুক্তি

রোবটের চোখঃ স্পৃহা

‘জিরো টু ইনফিনিটি’র এপ্রিল সংখ্যায় আলোচিত ‘রোবোটাক্ষু’র পরিমার্জিত ও আধুনিক সংস্করণ হিসেবে এবার আমরা নিয়ে এসেছি স্পৃহা বা Speech Recognition Robot for In-house Assistance (SPRRIHA)।

গত বছর আই.ইউ.টি-তে অনুষ্ঠিত প্রজেক্ট শো’তে আমরা অংশগ্রহণ করি। তাছাড়াও আমাদের টিমের ৪ জন সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউরোপিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জে অংশগ্রহণ করে। আমাদের দলের সদস্যরা হচ্ছে নওয়াব আমিনুল হক (ক্যাড ডিজাইন), মোহাম্মাদ মেহেদি হাসান (স্পিচ রিকগনিশন, রাস্পবেরি পাই), আশিক-ই-রাসুল (ইলেক্ট্রনিক্স), ইরফান মোহাম্মাদ আল হাসিব (অবজেক্ট ডিটেকশন, রাস্পবেরি পাই), আব্দুল মুহাইমিন রাহমান (ন্যাভিগেশন, পজিশনিং সিস্টেম, কন্ট্রোল ইঞ্জিনিয়ারিং)। ৫ জনের এই টিমের নাম ‘উন্মাদ’।

স্পৃহার বৈশিষ্ট্য

রোবট যেন খুব দ্রুত কাজ করতে পারে সে ধরনের এলগরিদম বের করার ব্যাপারে প্রচুর টিপস পেয়েছি আমরা। আগে যে রোবট বানিয়েছিলাম সেটার অন্যতম সমস্যা ছিল, সেটাতে ইমেজ প্রসেসিং-এর কাজ করতে অনেক সময় ব্যয় হতো। ম্যাটল্যাবে কাজ করেছিলাম বলে এমন হয়েছিল।

এবার আগের রোবটের থেকেও উন্নত মানের কিছু বৈশিষ্ট্য যোগ করার চেষ্টা করেছি। আগের রোবট ছিল দূর নিয়ন্ত্রিত। এবার দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা বাদ দিয়ে রোবটের ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। যেমন রোবটে স্পিচ রিকগনিশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইংরেজিতে কিছু বললে, সেটা রোবট টেক্সটে কনভার্ট করে বুঝতে পারবে কী কী নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আপাতত খুবই প্রাথমিক কিছু নির্দেশের ব্যবস্থা করেছি। জটিল সব বাক্য গঠনের জন্য ভবিষ্যতে আরো কাজ করা লাগবে।

আরেকটি ফিচার হচ্ছে ‘অবজেক্ট ডিটেকশন’। রোবটটি কোনো রুমে কোনো বস্তুকে ডিটেক্ট করে সেদিকে যেতে পারবে। এখন রোবটে রোবটিক আর্ম লাগানোর জন্য কাজ করছি, যেন কিছুটা দূর থেকে কোনো বস্তুকে ধরে নিয়ে আসতে পারে। এক্ষেত্রে স্পিচ রিকগনিশনের সাথে অবজেক্ট ডিটেকশন পাশাপাশি যুক্ত। কারণ রোবটকে নির্দেশ দিলে সে ঐ নির্দেশ অনুযায়ী বস্তুর অনুসন্ধান শুরু করবে। এক্ষেত্রেও আমরা প্রাথমিক ধাপে রয়েছি, কারণ এই রোবটে ব্যবহার করছি রাস্পবেরি-পাই। এটি একটি অন বোর্ড কম্পিউটার যার প্রসেসিং ক্ষমতা খুব একটা বেশি নয়।

উপরের ফিচারগুলো নিয়ে আমরা অনেক কাজ করলেও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে হয়তোবা আমাদের চেয়েও ভালো কাজ হচ্ছে। কিন্তু এই রোবটের যে বৈশিষ্ট্য নিয়ে খুবই কম কাজ হয়েছে, সেটা হচ্ছে রোবটের জন্য আলাদা ‘পজিশনিং সিস্টেম’। অর্থাৎ রোবটের জন্য আলাদা জিপিএস এর মতো ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। একটিমাত্র ক্যামেরা এবং একটি জাইরোস্কোপের সাহায্যে কোনো রোবট রুমের কোনো অবস্থানে আছে সেটাও বের করতে পেরেছি।

এই পজিশনিং সিস্টেম নিয়েও বেশ কিছু কাজ হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর অনেক সমস্যা রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে রোবটের হিসাব নিকাশে অনেক বেশি সময় ব্যয় হয়। আমাদের পজিশনিং সিস্টেমে একটি সার্ভার কম্পিউটার রোবটের অবস্থান বের করেই তাকে তার স্থানাংক বলে দিচ্ছে। যার ফলে রোবটের কোনো হিসাবনিকাশে বলতে গেলে কোনো সময় ব্যয়-ই হচ্ছে না! বাকি-দুটো ফিচার প্রাথমিক ধাপে থাকলেও এই ফিচারের কাজ অনেক খানি এগিয়ে গিয়েছে। বাসায় পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সময়ও খেয়াল করেছি ত্রুটি আসছে অনেক কম।

তবে যে বৈশিষ্ট্য তুলনামূলকভাবে দুর্লভ, দেশে কম কাজ হয়, নেভিগেশন সিস্টেম নিয়ে বেশ ভালোই কাজ এগিয়েছে। রোবটটিকে তার অবস্থান বাতলে দেবার জন্য আলাদা একটি সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে যা খুব ভালো কাজ করছে।

এই রোবটের আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, পজিশনিং সিস্টেম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ‘ইমেজ প্রসেসিং’-এর এলগরিদম এবং স্ট্রাকচারে কিছু পরিবর্তন এনেছি। একই কাজ করতে ম্যাটল্যাবে অনেক সময় লাগত। ম্যাটল্যাবের সাথে ওপেনসিভি যোগ করে, ৬ গুণ দ্রুততার সাথে করতে সক্ষম হয়েছি।

একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, এই রোবটটি শুধুমাত্র একটি মডেল। এই কাজগুলো শতভাগ দক্ষতার সাথে করার জন্য আরো বড় সেটআপে হাই কনফিগারেশনের জিনিসপত্র লাগবে যেগুলো আমাদের পক্ষে যোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তাই আমরা ছোট মডেলের ব্যবস্থা করি। ব্যবহারিক দিক বলতে অনেক কাজেই ব্যবহার করা সম্ভব। যেমন, শিল্প কারখানাগুলোতে বিভিন্ন স্থানে বস্তু স্থানান্তর করা লাগে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের পজিশনিং সিস্টেম অনেক কাজে লাগতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এই রোবটের কাজ এখনো শেষ হয়নি। খুব বড় কিছু ফিচার ডেভেলপ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আরো কিছু ফিচারের কাজ বাকি আছে। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে সেগুলোও করা হয়ে যাবে। দলের সবারই রোবটিক্স নিয়ে কাজ করে দেশের জন্য ভালো কিছু করার ইচ্ছা অনেক দিনের।

নেপথ্যে অবদান

এক্ষেত্রে Avro HighTech এর দেওয়ান আরিফ ভাইয়ের কথা উল্লেখ করতে হয়। বুয়েটেক.কম এ ফিচার বের হবার পর উনি আমাদের সাথে যোগাযোগ করে আমাদের প্রজেক্টে আর্থিক সহায়তা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

সম্ভাবনা

দেশে এখন রোবটিক্স নিয়ে খুব ভালো মানের কাজ হচ্ছে। এখানে সেখানে বিভিন্ন প্রতিযোগিতাও হচ্ছে। কিন্তু কিছু সমস্যার দেখাও মিলে। আমাদের কাছে মনে হয় ভালো মানের রোবটের জন্য খুব ভালো মানের আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবটিক্স নিয়ে রিসার্চ ল্যাব হলে অথবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রোবট গবেষণার জন্য ফান্ডিং দিলে দেশে রোবোটিক্স আরো অনেক এগিয়ে যাবে।

আগ্রহীদের প্রতি পরামর্শ

যাদের রোবটিক্সে আগ্রহ আছে তাদের জন্য দুটো শব্দই বলব, ‘লেগে থাকো’। প্রথম দিকে রোবট নিয়ে কাজ করার সময় অনেক কথা শুনতে হয়েছে। “এদেশে রোবটিক্স নিয়ে কাজ করে ভবিষ্যৎ নেই”, “চায়না জাপানে যেরকম সুবিধা পাওয়া যায় সেরকম সুবিধা এখানে পাওয়া যায় না” ইত্যাদি ইত্যাদি। ঐসব নেতিবাচক কথাবার্তা পাত্তা দিলে কিছুই হবে না। আমার কাছে চার্চিলের একটা কথা খুবই পছন্দের, “আপনি রাস্তা দিয়ে হাটার সময় ঘেউ ঘেউ করা প্রতিটা কুকুরকে তাড়াতে গেলে রাস্তা দিয়ে আর হাটা হবে না!”

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top