অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমঃ প্রাচীন সভ্যতার অত্যাধুনিক উদ্ভাবন

জ্যোতি:পদার্থবিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞান আমাদের সকলেরই আকর্ষণের বিষয়। আলপিনতুল্য মানব সম্প্রদায় তার উৎপত্তিলগ্ন থেকেই ঐরাবতসম মহাকাশ ও তার সৃষ্টিরহস্য ভেদে বিভোর হয়ে আছে। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী টেলিস্কোপ ও শক্তিশালী কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিনিয়তই মহাকাশবিজ্ঞানের অজানা সব তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে। বহু আলোকবর্ষ দূরে থাকা গ্রহ নক্ষত্রের নির্ভুল তথ্য আমরা এখন পৃথিবীতে বসেই জানতে পারি।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা যে কম্পিউটার ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি লক্ষ্য করছি, এর রূপরেখা আজ থেকে প্রায় ২০০০ বছর আগেই প্রাচীন গ্রীসের প্রকৌশলীরা তৈরী করেছিলেন। অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম নামের এ প্রযুক্তিকে বলা হয় মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম অ্যানালগ কম্পিউটার।

১৯০০ সালের কথা। গ্রীসের একদল স্পঞ্জ ডাইভার দেশটির অ্যান্টিকিথেরা দ্বীপের কাছে একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করে। খুঁজে পান বহু বছরের প্রাচীন সব অলংকার, মূর্তি, মুদ্রা ইত্যাদি। ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধারকৃত সকল বস্তুই তারা গবেষণার জন্য পাঠিয়ে দেন গ্রীসের ন্যাশনাল আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়ামে।

প্রাপ্ত বস্তুগুলোর মধ্যে কিছু ব্রোঞ্জ ও পাথরের পিণ্ডের মতো অনিয়মিত আকারের জিনিস ছিল। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ প্রথমে সেগুলোর দিকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে তারা উদ্ধারকৃত অন্যান্য জিনিসগুলোর প্রতি মনোনিবেশ করেন। এর কারণে উদ্ধারের প্রায় দুই বছর পর্যন্ত সেগুলো নিয়ে কেউ গবেষণা করেনি। সত্যিকার অর্থে, সবুজ শ্যাওলা পড়া জিনিসগুলোর প্রতি আদপে তারা খুব একটা আগ্রহবোধ করেনি। কিন্তু কে জানতো? এই মাটির ঢিবি সদৃশ বস্তুগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার আশ্চর্য এক উদ্ভাবন!

চিত্র: অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের অংশ বিশেষ

দুই বছর পর ১৯০২ সালে গ্রিক আর্কিওলজিস্ট ভ্যালেরিওস স্টাইস জিনিসগুলি নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা শুরু করেন। তিনি আবিষ্কার করেন, উদ্ধারকৃত পাথর ও ব্রোঞ্জের পিণ্ডগুলোর একটির মধ্যে ঘুর্নায়মান চাকা রয়েছে।

প্রথমে তিনি একে ঘড়ি ভাবলেও পরে আরো গভীর পর্যপেক্ষণের মাধ্যমে এর মধ্যে জটিল এক যন্ত্রকৌশল আবিষ্কার করেন। স্টাইসের আবিষ্কারের পর বহুদিন পর্যন্ত এ নিয়ে গবেষণা বন্ধ ছিল। মূলত এই গবেষণা হতে ফলপ্রসু কিছু পাওয়া যাবে না- এ কথা ভেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর অর্থায়ন করতে অপারগতা প্রকাশ করে।

পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ডেরেক প্রাইস এটি নিয়ে পুনরায় নাড়াচাড়া শুরু করেন। তিনি এটিকে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়ের যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এক্স রে ও গামা রে ইমেজিংয়ের মাধ্যমে তিনি এর সম্ভাব্য ৮২টি টুকরোর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে তিনি এ আবিষ্কারের উপর ৭০ পৃষ্ঠার একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমকে বলা হয় পৃথিবীর সর্বপ্রথম অ্যানালগ কম্পিউটার। প্রফেসর প্রাইসের ভাষ্যমতে, এটি খ্রিষ্টপূর্ব ৮৭ সালের দিকে তৈরী করা হয়েছিল। এর মূল উপাদান ছিল ব্রোঞ্জ এবং অল্প পরিমাণ টিন। এছাড়া পাথর ও কাঠের বিভিন্ন কাঠামোও এতে ব্যবহার করা হয়। গঠনশৈলী দেখে ধারণা করা হয় হেলেনিস্টিক সময়কালে (খ্রী: পূ: ৩২৩ – খ্রী: পূ: ৩১) এই যন্ত্রের ব্যবহার প্রচলিত ছিল।

যন্ত্রটি দেখতে অনেকটা ছোটখাট ঘড়ির মতো। এতে অনেকগুলো ডায়াল এবং কাঁটা বিদ্যমান। ডায়ালগুলো চন্দ্র, সূর্য এবং পাঁচটি গ্রহকে নির্দেশ করে। এগুলো ছাড়াও এর মাঝে কয়েকটি সংখ্যা খচিত ব্লক রয়েছে। এগুলোর সাহায্যে জ্যোতির্বিদ্যার জটিল হিসাব করা যেত সহজেই।

চিত্র: অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের কম্পিউটারাইজড থ্রিডি মডেল

প্রাইসের শনাক্ত করা ৮২টি টুকরোর মধ্যে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে ৭টি টুকরো। ১৬টি পাওয়া গেছে ভগ্ন অবস্থায়। বাকিগুলো হয় এখনো সাগরতলেই লুকায়িত রয়েছে, না হয় কালের বিবর্তনে ধ্বংস হয়ে গেছে।

অক্ষত ৭টি টুকরোকে মেজর ফ্র্যাগমেন্ট এবং বাকি টুকরোগুলোকে মাইনর ফ্র্যাগমেন্ট বলা হয়। মেজর ফ্র্যাগমেন্টগুলোকে A, B, C, D, E, F এবং G- এ সাত ভাগে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অংশ A-এর দৈর্ঘ্য ১৮০ মিলিমিটার, প্রস্থ ১৫০ মিলিমিটার। প্রতিটি অংশেই বিভিন্ন গিয়ার, ডায়াল ও ঘড়ির চাকতি সদৃশ বস্তুর সন্ধান মিলেছে। এছাড়া ফ্র্যাগমেন্টগুলোর গায়ে বিভিন্ন সাংকেতিক লিপি খোদাই করা আছে। মাইনর ফ্র্যাগমেন্টগুলোর কাজ এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত না হলেও এদের পৃষ্ঠেও বিভিন্ন চিহ্ন দেখা যায়।

প্রাচীন গ্রিসের লোকেরা গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করতেন। চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে তাদের অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় অনেক দূর এগিয়েছিলেন। গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তনের সূক্ষ্ম হিসাব রাখতে তারা অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম ব্যবহার করতেন বলে ধারণা করা হয়। যন্ত্রটির সামনের দিকে দুটো ডায়াল দেখা যায় যেগুলো রাশিচক্র ও সৌর বছরকে চিহ্নিত করে। সেখান থেকে আরো দুটো রেখার মতো দাগ বের হয়েছে যেগুলো চন্দ্র ও সুর্যের সম্যক অবস্থাকে নির্দেশ করে।

চিত্র: সাগরের তলদেশ হতে প্রাপ্ত যন্ত্রের বিভিন্ন অংশ

যন্ত্রটির পেছনে দুটি ঘূর্ণায়মান রেখা যথাক্রমে সারস ও ক্যালিপিক চক্র নির্ধারণ করতে ব্যবহৃত হতো। এ চক্র দুটি প্রতি ১৮ ও ৭৬ বছরে চন্দ্রগ্রহণের সময়কাল বের করতে পারতো। মূল যন্ত্রের সাথে একটি L আকৃতির হাতল যুক্ত ছিল যার সাহায্যে একটি তারিখ নির্দিষ্ট করা হলে যন্ত্রটি সঙ্গে সঙ্গে সেই তারিখের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করতে পারত। যন্ত্রের গঠনশৈলী থেকে বোঝা যায় তৎকালীন গ্রিক পণ্ডিতরা সূর্যকে সৌরজগতের কেন্দ্র হিসেবে ধরে নিয়েই এ যন্ত্রের নকশা করেছিলেন।

এত ছোট একটি যন্ত্র এত জটিল সব হিসেব কীভাবে সম্পাদন করতো, সে রহস্য আজও গবেষকরা পুরোপুরি ভেদ করতে পারেননি। তাদের মতে, সূক্ষ্ম এবং সঠিক মাপের গিয়ারের ব্যবহারই যন্ত্রটির আকার কমিয়ে এর কার্যকারিতা অনেকাংশে বাড়িয়ে দিত। অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের গিয়ারের বিন্যাস নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানী ভিন্ন ভিন্ন মডেল প্রদান করেছেন। এদের মধ্যে রাইট প্রপোজাল, ইভান’স প্রপোজাল ও ফ্রিথ প্রপোজাল অন্যতম।

শুধু যে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি নির্ধারণ করতেই এ যন্ত্র ব্যবহৃত হতো, তা কিন্তু না। ২০০৮ সালে করা এক গবেষণায় জানা যায়, এ যন্ত্র তৎকালীন বিভিন্ন উৎসব, যেমন প্রাচীন অলিম্পিক গেমস এর দিনক্ষণের হিসেবও রাখতো। যন্ত্রটির গায়ে থাকা লিপিগুলো বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এর সাথে একটি পূর্ণ সৌর মডেল যুক্ত ছিল যেখানে বিভিন্ন গোলকের মাধ্যমে গ্রহগুলোকে চিহ্নিত করা হতো। লিপিগুলোতে থাকা মাসের নাম ও ক্যালেন্ডার দেখে ধারণা করা হয় গ্রীসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের করিন্থিয়া অঞ্চলে এ যন্ত্রের প্রচলন ছিল।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে এখনো। বিজ্ঞানীরা পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এর পেছনে থাকা জটিল কৌশলগুলোর পুরোপুরি ব্যাখ্যা খুঁজে বের করতে। দুই হাজার বছর আগে যেখানে প্রযুক্তির অপ্রতুলতা ছিল প্রকট, জ্ঞানের পরিধি ছিল সীমিত, সেখানে সামান্য ব্রোঞ্জ, কাঠ ও পাথর দিয়ে তখনকার প্রকৌশলীরা এত নির্ভুল একটি যন্ত্র কীভাবে তৈরী করলেন, এ প্রশ্ন এখনো মানুষকে তাক লাগিয়ে দেয়।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম তাই শুধুই একটি যন্ত্রের ধ্বংসাবশেষ নয়, এটি তৎকালীন গ্রীক বিজ্ঞানীদের চিন্তাধারা বিশ্লেষণের নতুন এক দ্বারও উন্মোচন করেছে।

তথ্যসূত্র

  1. http://age-of-the-sage.org/archaeology/antikythera_mechanism.html
  2. https://smithsonianmag.com/history/decoding-antikythera-mechanism-first-computer-180953979
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Antikythera_mechanism

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *