in

সিলিকন থেকে ট্রানজিস্টর এবং মাইক্রোপ্রোসেসর

আমরা এখন আমাদের চারপাশে ইলেকট্রনিক্স জগতে সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহীর জয়জয়কার দেখে থাকি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত সেমিকন্ডাক্টর হল সিলিকন, যা বালির একটি উপাদান আর তা খুবই সহজলভ্য। সারা পৃথিবীতে কি পরিমাণ বালি আছে তা আর কাউকে না বললেও চলে। সিলিকন এত সহজলভ্য হওয়ার কারণেই প্রযুক্তির এই ক্ষেত্রটা খুব দ্রুত অগ্রসর হয়েছে এবং হচ্ছে।

অর্ধপরিবাহীর একটি ধর্ম হল, তাপমাত্রা বাড়লে এর অভ্যন্তরে ইলেকট্রনের প্রবাহ খুব সহজেই হতে পারে। তবে একটি বিশুদ্ধ সিলিকনের টুকরার আসলে তেমন বিশেষত্ব নেই। সিলিকনের মধ্যে নিয়ন্ত্রিতভাবে ভেজাল মিশিয়ে তৈরি হয় p-type আর n-type অর্ধপরিবাহী। এই দুই প্রকার অর্ধপরিবাহীর সহযোগেই তৈরি হয় ডায়োড আর ট্রানজিস্টর যা এখন কম্পিউটার প্রযুক্তির প্রাণ।

তো ট্রানজিস্টর কিভাবে ইলেকট্রনিক্স প্রযুক্তিকে এত এগিয়ে নিয়ে গেল?

এটা সম্ভব হয়েছে ট্রানজিস্টর দিয়ে সহজেই সুইচিং(switching) কার্যক্রম চালানো যায়। অর্থাৎ, একে সুবিধামত on বা off করা যায়। এতে করে অনেক লজিকাল অপারেশন দ্রুত করা যায়। ব্যাপারটাকে আরো সহজে বোঝা যাক।

কম্পিউটারে আমরা যে বিভিন্ন নির্দেশনা দেই তার জন্য আমরা বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করি। কম্পিউটার কিন্তু ওই প্রোগ্রামিং ভাষাগুলো সরাসরি বুঝতে পারে না। এই প্রোগ্রামিং ভাষায় দেয়া নির্দেশনাগুলো পরে বাইনারি তে রুপান্তরিত হয়। অর্থাৎ ০ আর ১ এ রুপান্তরিত হয়।। এক্ষেত্রে শূন্য বলতে ইলেকট্রনিক্সে off-state বা বন্ধ অবস্থা আর ১ বলতে বোঝায় on-state বা চালু অবস্থা। তাহলে বুঝতেই পারছেন, আপনার একটা নির্দেশনার বিপরীতে কম্পিউটারের একেবারে অভ্যন্তরে চলছে বন্ধ আর চালু হবার খেলা। আর এই বন্ধ-চালু(on-off) এর ব্যাপারটা যেন তেন করে উড়িয়ে দেয়ার ব্যাপার না। শুনলে অবাক হবেন, এখনকার সময়ে আমাদের বাসা-বাড়িতে ব্যবহার্য কম্পিউটারগুলো সেকেন্ডে লক্ষাধিক নির্দেশনা সম্পাদন করে। তার মানে প্রতি সেকেন্ডে কম্পিউটার সার্কিটের বিভিন্ন পয়েন্টে কি পরিমাণ বন্ধ-চালু হওয়ার ঘটনা ঘটছে ভেবে দেখেছেন?

একবার ভাবুন তো, আপনি আপনার বাসার পাখার সুইচ সেকেন্ডে লক্ষ বার অন-অফ করতে পারবেন কিনা! যান্ত্রিক উপায়েও এই পরিমাণ অন-অফ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু ইলেকট্রনিক্সের জগতে এটা খুব সম্ভব! ট্রানজিস্টর দিয়ে এটা করা সম্ভব।

সেমিকন্ডাকটার আর ন্যানোপ্রযুক্তি কতটা বিস্ময়কর হতে পারে তা কিছু সহজ উদাহরণে দেখা যাক। ইলেকট্রনিক্সে ট্রানজিস্টরের প্রতীক নিচে দেখানো হল।

ট্রানজিস্টরের প্রতীক

ইলেকট্রনিক্সে বিভিন্ন কাজ করার জন্য Integrated Circuit(IC) বা সমন্বিত বর্তনী (সংক্ষেপে আইসি) ব্যবহার করা হয়। মূলত বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স উপাদান(electronics component) দিয়ে সার্কিট বানিয়ে একটা প্যাকেজ তৈরি তৈরি করা হয়। এটাই আইসি। সাধারনত আইসিগুলোতে ট্রানজিস্টর আর রোধ থাকে। এখানে আইসি 555 এর সার্কিট ডায়াগ্রাম দেখানো হল।

IC 555 এর সার্কিট ডায়াগ্রাম

সার্কিটটা দেখতে কি একটু জটিল মনে হচ্ছে? এখানে ২৫ টার মত ট্রানজিস্টর আছে। সাথে দুটি ডায়োড আর ১৫ টি রোধ। কিন্তু পুরো প্যাকেজটার আকার খুবই ক্ষুদ্র। দৈর্ঘ্যের দিক থেকে মোটামুটি ১০ মিলিমিটারের মতো। এটুকুর মধ্যেই এতোগুলো ট্রানজিস্টর আর রোধ দিয়ে সার্কিট সাজানো হয়েছে। এই আইসি দিয়ে বেশ কিছু কাজ করা যায়। সহজ যে কাজটা করা যায় তা হল, একটা সময় ব্যবধানে বাতি জ্বলা-নিভা করা।

এবার চলুন কম্পিউটারের মাইক্রোপ্রোসেসরের দিকে তাকানো যাক। মাইক্রোপ্রসেসরও এক ধরনের আইসি। এই প্রোসেসরই হল কম্পিউটারের প্রাণ আর এটা গঠিত কোটি কোটি ট্রানজিস্টর নিয়ে।

Intel Core i7; image source: pcgamer.com

Intel Core i7 প্রসেসরের প্যাকেজের ক্ষেত্রফল মাত্র 42.5mm x 45mm। কিন্তু এতে আছে ৭৩১ মিলিয়ন ট্রানজিস্টর! একটা বাতি টানা এক মিলিয়নবার অন-অফ করতে আপনার হয়তো সময় লেগে যেতে পারে ২৫ বছর। কিন্তু এই প্রোসেসরের লাগবে মাত্র এক সেকেন্ড! চিন্তা করে দেখুন যে, কত জটিল কাজ চোখের নিমিষেই করিয়ে নেয়া সম্ভব এই ছোট্ট একটা প্রোসেসর দিয়ে যার মধ্যে কিনা কোটি কোটি ট্রানজিস্টর সুবিন্যস্ত আছে।

Intel 4004 প্রোসেসর; image source: extremetech.com

ইনটেল কর্পোরেশনের মাইক্রোপ্রোসেসরের যাত্রার প্রথম দিকে তারা যে প্রোসেসর বানিয়েছিল তা ছিল Intel 4004 যাতে ছিল মাত্র ২৩০০০ ট্রানজিস্টর। আর এটি ছিল ১৯৭১ এর দিকের ঘটনা। আর আজ কিনা বাসাবাড়িতে ব্যবহার করা কম্পিউটারের মাইক্রোপ্রোসেসরে ট্রানজিস্টরের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখের মতো! আর এ পর্যন্ত সব থেকে বেশি সংখ্যক ট্রানজিস্টরওয়ালা মাইক্রোপ্রোসেসরে আছে ৩ বিলিয়নের উপর ট্রানজিস্টর! ভাবুন তাহলে! একটুখানি জায়গার মধ্যে কত কত ট্রানজিস্টর সুসজ্জিত করার উপায় বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করে ফেলেছেন।

featured image: arstechnica.com

ইনফ্লুয়েঞ্জা বা, ফ্লু ভ্যাকসিন এবং মহামারী প্রতিরোধের গণিত

মহাকাশে নারী মহাকাশচারীর ঋতুস্রাব জটিলতা