in

উড়োজাহাজ যেভাবে ওড়ে

মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল আকাশে ওড়ার। একদিন আকাশে উড়তে শিখলো। তবে পাখির মতো নয়, এজন্য মানুষকে সাহায্য নিতে হয়েছে যন্ত্রের, যাদেরকে বলি আকাশযান। উড়োজাহাজের আবিষ্কার ছিল মানুষের জন্য যুগান্তকারী এক ঘটনা।

আবিষ্কারের পর থেকেই মানুষ বিভিন্ন রকমের আকাশযান তৈরি করেছে। এ আকাশযানগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। বায়ু অপেক্ষা ভারী এবং বায়ু অপেক্ষা হালকা। ঘুড়ি, বেলুন, এয়ারশিপ ইত্যাদি হচ্ছে হালকা আকাশযানের উদাহরণ। উড়োজাহাজ, রকেট, গ্লাইডার, ড্রোন ইত্যাদি হচ্ছে ভারী আকাশযানের উদাহরণ। বায়ু অপেক্ষা ভারী এমন আরেকটি আকাশযান হচ্ছে হেলিকপ্টার,যাকে আদর করে ডাকা হয় উড়ন্ত ফড়িং নামে। উড়ন্ত ফড়িং কীভাবে উড়ে তা নিয়েই আজকের আলোচনা।

সামরিক বা বেসামরিক প্রয়োজনে এমন একটি আকাশযানের প্রয়োজন হয় যা সরাসরি আকাশে উড়তে পারবে এবং প্রয়োজনে আকাশে স্থির অবস্থায় ভাসতে পারবে,যা সাধারণ বিমানগুলো পারে না। এ চাহিদা থেকেই তৈরি করা হয় হেলিকপ্টার।

আজকাল বিভিন্ন সামরিক প্রয়োজনে, যেমন সেনা বা গোলাবারুদ পরিবহন,আকাশ থেকে নজরদারী, নিরাপত্তা বিধানের কাজে কিংবা বিশেষ সেনা অপারেশনে হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হচ্ছে। আবার শান্তিকালীন অবস্থায় মালামাল পরিবহন থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ সরবরাহ কাজেও হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হচ্ছে।

চিত্রঃ যুদ্ধে ব্যবহৃত হেলিকপ্টার

উড্ডয়ন কৌশল

এয়ারক্রাফটের মতোই হেলিকপ্টারও চার ধরনের বলের উপর ভিত্তি করে আকাশে ওড়ে। বল চারটি হচ্ছেঃ ১. লিফট, যা হেলিকপ্টারের উপর ঊর্ধ্বমুখী বল তৈরি করে; ২. থ্রাস্ট, যা হেলিকপ্টারের ওপর সম্মুখী বল তৈরি করে; ৩. ওজন, যা সরাসরি নিচের দিকে ক্রিয়া করে; ও ৪. ড্র্যাগ, যা হেলিকপ্টারের সামনের দিক থেকে পেছনের দিকে থ্রাস্টের বিপরীতে ক্রিয়া করে।

চিত্রঃ হেলিকপ্টারের ওপর ক্রিয়ারত চারটি বল

ওপরের দিকে একটি বিরাট আকৃতির পাখা থাকে, একে প্রপেলার বলা হয়। এতে ২ থেকে ৫ টি ব্লেড থাকে। ব্লেডগুলো বিশেষভাবে বাঁকানো থাকে। একটি শক্তিশালী ইঞ্জিনের সাহায্যে প্রপেলার ঘোরানো হয়। যখন ঘুরতে শুরু করে, তখন ব্লেডগুলো কৌণিকভাবে সমান্তরাল অবস্থায় ঘুরতে থাকে। ঘূর্ণনের ফলে আশেপাশের বাতাস সজোরে ব্লেডের মধ্য দিয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। এর পরবর্তী অবস্থা ব্যাখ্যা করে হয় নিউটনের বিখ্যাত তৃতীয় সূত্র। “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।”

বাতাস যখন সজোরে প্রপেলারের মধ্য দিয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়, তখন নিউটনের তৃতীয় সূত্রানুসারে প্রপেলারের উপর উর্ধ্বমুখী সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া বল প্রয়োগ করে। ফলে প্রপেলারের সাথে সংযুক্ত হেলিকপ্টারটি উড়তে শুরু করে। তবে প্রপেলারের ব্লেডের বিশেষ আকারের জন্য এখানে বার্নলীর সূত্রও কাজ করে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ যে বৈশিষ্ট্যটি হেলিকপ্টারকে অন্য সব আকাশযান থেকে আলাদা করে রেখেছে তা হলো এর হোভারিং ক্ষমতা। হোভারিং বলতে হেলিকপ্টারের স্থির অবস্থায় আকাশে উড্ডয়ন করার ক্ষমতাকে বোঝায়। হেলিকপ্টার আকাশে যে কোনো উচ্চতায় স্থিরভাবে অবস্থান করতে পারে এবং ঐ উচ্চতা থেকেই সরাসরি ডানে-বামে ও সামনে-পেছনে যেতে পারে। হোভারিং করার সময় হেলিকপ্টারের ওপর প্রযুক্ত ওপরের দিকের লিফট, এর নিচের দিকে ক্রিয়ারত ওজনের সমান থাকে এবং সম্মুখমুখী থ্রাস্ট, পশ্চাৎমুখী ড্রাগের সমান থাকে।

এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো হেলিকপ্টার কীভাবে সামনে-পেছনে, ডানে-বামে কিংবা উপরে-নিচে যায়। হোভারিং করা অবস্থায় যদি লিফট ও থ্রাস্টের লব্ধি বল ও ওজন, ড্র্যাগের লব্ধি বলের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে হেলিকপ্টারটি উপরের দিকে উঠে যাবে। আর যদি ওজন ও ড্রাগের লব্ধি বল, লিফট ও থ্রাস্টের লব্ধি বলের তুলনায় বেশি হয় তাহলে হেলিকপ্টারটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামতে থাকবে।

আকাশে স্থির অবস্থায় যদি হেলিকপ্টারটি ডান দিকে যেতে চায়, তাহলে হেলিকপ্টারের মেইন রোটর বা উপরের প্রপেলারটিকে সমান্তরাল অবস্থা থেকে ডানদিকে সামান্য বাঁকিয়ে দিতে হবে। এর ফলে লিফট ও থ্রাস্টের লব্ধি বলের দিক পরিবর্তন হবে এবং হেলিকপ্টারটি ডান দিকে যেতে থাকবে। একইভাবে প্রপেলারটিকে সামান্য বাম দিকে বাঁকিয়ে দিলেই হেলিকপ্টারটি বাম দিকে যেতে থাকবে।

হোভারিং করা অবস্থায় সামনের দিকে যেতে হলে হেলিকপ্টারের উপরের প্রপেলারকে সামান্য সামনের দিকে বাঁকিয়ে দিলেই হবে। এতে লিফট ও থ্রাস্টের লব্ধির দিক পরিবর্তিত হবে এবং হেলিকপ্টারটি সামনের দিকে ছুটতে থাকবে। একইভাবে পেছনের দিকে যেতে চাইলে উপরের প্রপেলারটিকে সমান্তরাল অবস্থা থেকে সামান্য পেছনের দিকে বাঁকিয়ে দিতে হবে। এতে থ্রাস্ট দিক পরিবর্তন করে হেলিকপ্টারের সামনের দিক থেকে পেছনের দিকে ক্রিয়া করে এবং থ্রাস্ট ও লিফটের লব্ধির দিক পরিবর্তনের ফলে হেলিকপ্টারটি পেছনের দিকে যেতে থাকে।

প্রপেলারকে বাঁকানোর কাজটি করা হয় কন্ট্রোল প্যানেলের একটি কন্ট্রোল স্টিকের সাহায্যে। কন্ট্রোল স্টিকটিকে ডানে নিলে প্রপেলার ডানে দিকে বেঁকে যায়, বামে নিলে বামদিকে বেঁকে যায়।

এয়ারক্রাফটের মতো হেলিকপ্টারে কোনো রাডার নেই। তাহলে হেলিকপ্টার দিক পরিবর্তন করে কীভাবে? এ কাজটি করা হয় এর পেছনের ‘টেইল’ এর সাথে সংযুক্ত আরেকটি ছোট প্রপেলারের সাহায্যে। এটি ‘এন্টি টর্ক প্রপেলার’ নামে পরিচিত।

হেলিকপ্টারের মূল প্রপেলার যখন ঘুরতে থাকে, তখন প্রপেলারের ঘূর্ণনের ফলে হেলিকপ্টারের মূল বডিতেও একটি ঘূর্ণন বল তৈরি হয়। প্রপেলার যেদিকে ঘোরে, হেলিকপ্টারের মূল বডি সেদিকে ঘুরতে চায়। এ সমস্যার সমাধান করা হয়েছে এন্টি টর্ক প্রপেলারটি দিয়ে। হেলিকপ্টারের লেজের শেষের দিকে অবস্থান করে এই প্রপেলারটি।

মূল প্রপেলারের ঘূর্ণন বেগের সাথে একটি নির্দিষ্ট অনুপাত বজায় রেখে এন্টি টর্ক প্রপেলারটিকেও ঘোরানো হয়। এতে হেলিকপ্টারের মূল দেহের ঘূর্ণন প্রবণতা দূর হয়। মূলত এন্টি টর্ক প্রপেলারের ঘূর্ণন বেগ নিয়ন্ত্রণ করে এ কাজটি করা হয়। হেলিকপ্টারটি যখন একটি নির্দিষ্ট উচ্চতা বজায় রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যায় তখন মূল প্রপেলারের ঘূর্ণনের ফলে হেলিকপ্টারের মূল বডির ঘূর্ণন প্রবণতা রোধ করে এন্টি টর্ক প্রপেলারটি।

পাইলটের যদি ডান দিকে যাওয়ার ইচ্ছা হয়, তাহলে পাইলট এন্টি টর্ক প্রপেলারের গতি মূল প্রপেলারের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখা গতি থেকে কিছুটা কমিয়ে দেবেন, এর ফলে এন্টি টর্ক প্রপেলারটি হেলিকপ্টারের বডির ঘূর্ণন প্রবণতা আর সম্পূর্ণ রোধ করতে পারবে না। ফলে হেলিকপ্টারটি ডান দিকে ঘুরে যাবে। আবার বামদিকে যাওয়ার প্রয়োজন হলে পাইলট এন্টি টর্ক প্রপেলারের ঘূর্ণন বেগ মূল প্রপেলারের সাথে নির্দিষ্ট অনুপাত বজায় রাখা বেগের থেকে একটু বাড়িয়ে দিবেন। এর ফলে হেলিকপ্টারটি বাম দিকে ঘুরে যাবে।

চিত্রঃ এন্টি টর্ক প্রপেলার

হেলিকপ্টারের উচ্চতা বাড়ানো কমানো নিয়ন্ত্রণ করা হয় এর মূল প্রপেলারের ব্লেডগুলোর কৌণিক অবস্থান বাড়িয়ে কমিয়ে। প্রপেলার ব্লেডের কৌণিক অবস্থান বাড়ালে একই পরিমাণ ঘূর্ণনে প্রপেলার বেশি পরিমাণে লিফট তৈরি করে। তাই উচ্চতা বাড়ানোর প্রয়োজন হলে প্রপেলার ব্লেডের কৌণিক অবস্থান বাড়ানো হয়। পাশাপাশি মূল ইঞ্জিনের গতিও বাড়ানো হয়। ফলে বেশি পরিমাণ লিফট অর্থাৎ ঊর্ধ্বমুখী বল তৈরি হয় এবং হেলিকপ্টারের উচ্চতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একইভাবে উচ্চতা কমানোর প্রয়োজন হলে ব্লেডের কৌণিক অবস্থান কমানোর পাশাপাশি ইঞ্জিনের পাওয়ার কমিয়ে দেয়া হয়। ফলে লিফটের পরিমাণ হ্রাস পায় এবং হেলিকপ্টার ক্রমেই উচ্চতা হারায়।

তথ্যসূত্রঃ

১. উড়োজাহাজ কেমন করে উড়ে- এ কে এম আতাউল হক

২. Theory of Flight

৩. www.helis.com

featured image: sandiegouniontribune.com

নিউটনের কামানে চড়ে কক্ষপথে

কলমের ক্যাপে ছিদ্র থাকে কেনো?