যেভাবে কাজ করে অপটিক্যাল ফাইবার

পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ব্যাপারে আমরা সবাই কমবেশি জানি। আলোকরশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা মাধ্যমে কৌণিকভাবে প্রবেশের সময় একটি নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে অভিলম্বের ওপর আপতিত হলে, আপতিত আলোর পুরোটাই প্রতিফলিত হয়। প্রতিফলিত হয়ে প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে।

এখান থেকে একটু অগ্রসর হয়ে আমরা একটি পরীক্ষা করে দেখতে পারি। একটি পাত্রকে তরল পদার্থ দ্বারা পূর্ণ করা হলো। ছবিতে দ্রষ্টব্য। এরপর একদিক থেকে একটি লেজার রশ্মি তরলের ভেতর সরলরেখা বরাবর প্রক্ষেপণ করা হলো।

অপরদিকে লেজারের সাপেক্ষে একই উচ্চতায় একটি ছিদ্র করা হলো। ছিদ্র দিয়ে তরল নীচের দিকে প্রাসের গতিপথের মতো পতিত হয়। দেখা যাবে তরলের ভেতর দিয়ে আলো এমনভাবে অগ্রমুখী হচ্ছে যেন এর গতিপথ বক্র। অথচ আলো বা লেজারের গতিপথ কখনোই বক্র নয়। আসলে পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ফলে তরল আর বাতাসের সীমানায় প্রতিফলিত হয়ে হয়ে সামনে এগুচ্ছে।

ঘন তরল মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা বায়ু মাধ্যমে প্রবেশ করতে গেলে, নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে আপতিত আলো তরলের মধ্যেই আটকা পড়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত এই কৌণিক শর্ত পূরণ হতে থাকবে, পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে আলো যে কোনো পথে এগোতে পারবে, এক্ষেত্রে প্রাসের গতিপথ বরাবর এগুচ্ছে।

উপরের চিত্রে তরল হিসেবে প্রোপিলিন- গ্লাইকল ব্যবহার করা হয়েছে। মাধ্যম কতটা ঘন তা refractive index বা প্রতিসরণাঙ্ক নামক একটি ধ্রুবক থেকে বোঝা যায়। এর মান যত বড় হবে, বুঝতে হবে মাধ্যম ততটাই ঘন। এক্ষেত্রে তীর চিহ্ন বরাবর অভিলম্বের সাথে ৪৪.৩৫ ডিগ্রি এর বেশি কোণে আপতিত হলে তরলের ভেতর পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হবে।

উপরে তরল ও লেজার আলোক ব্যবহার করে যে ব্যাপারটি আলোচনা করা হলো তা-ই আসলে অপটিক্যাল ফাইবারের মূলনীতি। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে তরলের বদলে বিশেষ ধরনের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। একে সাধারণভাবে বলা যায় কাচ।

একটু সঠিক করে বলতে গেলে বলা যায় এক্ষেত্রে দুই স্তরের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। ভেতরের স্তরকে বলা হয় core যা প্রধানত সিলিকন ডাই-অক্সাইড দ্বারা গঠিত। বাইরের স্তরকে বলা হয় cladding। এটি সিলিকন ডাই-অক্সাইড দিয়ে গঠিত। এতে সামান্য বোরন এবং জার্মেনিয়ামের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। এটি করা হয় প্রতিসরণাঙ্ক core অপেক্ষা কিছুটা কমানোর জন্য। পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের শর্ত সৃষ্টি করবার জন্য মাত্র ১% প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্যই যথেষ্ট।

এক্ষেত্রে অবশ্যই একটি প্রশ্ন আসতে পারে, যদি আপতিত আলো সঙ্কট কোণের চেয়ে কম কোণে আপতিত হয়? হ্যাঁ এরকম ঘটনা ঘটতে পারে দুই উপায়ে। ১) ফাইবারের ভেতরে কিছুটা বিকৃতি থাকলে এবং ২) একটি সীমাস্থ পরিমাণের চেয়ে বেশি পরিমাণে ফাইবারটিকে বাঁকালে।

চিত্র: ফাইবারের ভেতর বিকৃতি

চিত্র: বেশি পরিমাণে বাঁকানো

এক্ষেত্রে আলোকের নির্দিষ্ট অংশ অপচয় হবে এবং তা সামনে এগুতে পারবে না। তাই এই দুটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

তথ্যকে ডিজাটাল রূপে রূপান্তরিত করে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পাঠানো যায়। যেমন বৈদ্যুতিক মাধ্যমে। এরপর একসময় আসলো অপটিক্যাল ফাইবারের ধারণা। তথ্য যদি বৈদ্যুতিকভাবে না পাঠিয়ে আলো দ্বারা কোনোভাবে পাঠানো যায়, তাহলে তার প্রেরণের গতি নিশ্চয়ই বেশি হবে। কারণ আলোর গতি সবচেয়ে বেশি।

১ এবং ০ এর বদলে আলোর উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি দ্বারাও দুটি অবস্থা প্রকাশ করা যায়। এক্ষেত্রে যেটি করতে হবে, প্রেরক প্রান্তে প্রথমে সিগন্যালকে ০ এবং ১ এর সিরিজে পরিণত করতে হবে। তারপর ১ এর জন্য আলো পাঠানো এবং ০ এর জন্য আলোর অনুপস্থিতি নির্ধারিত থাকবে। প্রাপক প্রান্তে এভাবে বার্তা গ্রহণ করার পর তাকে আবার ১ এবং ০ এর সিরিজে রূপান্তরিত করা হয়। তারপর সেখান থেকে থেকে আবার মূল সিগনালে রূপান্তরিত করা হয়।

অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করার ফলে খুব দ্রুত বেগে (আলোর বেগের ৭০% বেগে) তথ্য আদান প্রদান করতে পারছি। দ্রুততার কারণেই বর্তমানে প্রায় সকল ক্ষেত্রে ফাইবার অপটিক ক্যাবল ব্যবহার করা হয়।

ক্যাবল বলতে আমরা যে দুই স্তর বিশিষ্ট মাধ্যমকে বোঝাচ্ছি, তা আসলে খুবই সরু। বাইরে সুরক্ষা বেষ্টনী ব্যবহার করার কারণে এটি মোটা দেখায়।

চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবলের গঠন
চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবল দেখতে যেমন

একেকটি সরু ফাইবারের বাইরে বেশ কয়েকটি স্তর থাকে। চূড়ান্তভাবে পুরো ক্যাবলটির ব্যাস হয় ১ ইঞ্চির মতো। সর্বপ্রথম যেই ক্যাবল-টি ব্যবহার করা হয়েছিল তা ছিল TAT-8 ক্যাবল। এতে একসাথে ছয়টি ক্যাবল একটি শক্ত ভিত্তিকে কেন্দ্র করে চক্রাকারে সাজানো হয়েছিল। বাইরে আরও বেশ কয়েকটি স্তর ছিল যার ফলে সমুদ্রের ভেতর দিয়ে ৩৫০০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের মধ্যে প্রথম ফাইবার দ্বারা টেলিযোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। এটি একইসাথে ৪০ হাজার কানেকশন/কল স্থাপন করতে পারতো।

আজ এ পর্যন্তই, পরবর্তীতে হাজির হবো ফাইবার অপটিকের নতুন কোনো ম্যাকানিজম নিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *