in

ইন্টারনেটের গতির মূল রহস্য কোথায়?

Network switch and ethernet cables,Data Center Concept.

ধীরগতির ইন্টারনেট সংযোগের মতো হতাশাজনক আর কীইবা হতে পারে! একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে ইন্টারনেট গতির ব্যাপারে আমাদের সহনশীলতা প্রায় শূন্যের কোটায়। অথচ বেশি না, মাত্র ১৫ বছর আগেও ইন্টারনেটের কোনো সুবিধা নিতে গেলে হাতে ঘণ্টা কয়েক সময় নিয়ে বসতে হতো, ফেসবুকের পাতায় অলস সময়ক্ষেপণের চিন্তা তো বাদই দিলাম!

ডায়াল-আপ সংযোগের দিনগুলোয়, কম্পিউটার থেকে সংযোগ রিকোয়েস্ট পাঠাবার পর ঘণ্টাখানেক সময় কেবল সংযোগ স্থাপন হতেই চলে যেত। সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হিসেবটা এখন ২ – ১০ মেগাবাইট প্রতি সেকেন্ডে নেমে এসেছে সাধারণ ব্যাবহারকারীদের ক্ষেত্রে। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো আসলে কীভাবে ঘটেছে? বেশ কিছু বিষয় আছে। সবচেয়ে বড় প্রভাবক অবশ্যই সংযোগ পদ্ধতির মাঝে ব্যাবহার করা তারের উপাদান অথবা প্রকৃতি।

এ লেখায় এ দিকটিই আলোচনা করা হবে। উল্লেখ্য এই লেখায় মূলত বহুল প্রচলিত ব্রডব্যান্ড সংযোগ এবং ডায়াল আপ সংযোগের মাঝে তুলনা করা হবে, যারা কিনা তারের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে। তারবিহীন মাধ্যম যেমন ওয়াইফাই, হটস্পট ইত্যাদি এই লেখার পরিধির বাইরে।

চিত্রঃ আদি ডায়াল আপ সংযোগের ইন্টারফেস।

ডায়াল আপ সংযোগের ক্ষেত্রে সাধারণত ৫৬ কিলোবাইট প্রতি সেকেন্ড ছিল গড় সংযোগ গতি।  ব্রডব্যান্ডের ক্ষেত্রে বেড়ে দাঁড়ায় ৫১২-তে। উদাহরণস্বরূপ, একটি অডিও ফাইল নামাতে প্রথম ক্ষেত্রে ১০ মিনিট লাগলে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে কয়েক সেকেন্ড লাগবে মাত্র।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে কপার তারের পরিবর্তে অপটিক্যাল ফাইবার ব্যাবহার করবার মাধ্যমে। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্রমশ উন্নতির ফলে দিনকে দিন গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৪ সালে Technical University Of Denmark–এর একদল গবেষক অপটিক্যাল ফাইবারের মধ্য দিয়ে সেকেন্ডে ৪৩ টেরাবাইট ডাটা পাঠাতে সক্ষম হন। আমাদেরকে এক্ষেত্রে অপটিক্যাল ফাইবারের মূলনীতি সম্পর্কে জানতে হবে। সেই সাথে কপার তারের সমস্যাগুলোও বর্ণনা করা হবে।

কপার তারের মাধ্যমে সংযোগ

আমরা জানি আধুনিক যোগাযোগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল, যেকোনো কিছুকে ০ এবং ১ এর মাধ্যমে প্রকাশ করে বার্তা পাঠানো হয়। কপার তার সংযোগ কাজ করতো বৈদ্যুতিক পালস পাঠাবার মাধ্যমে। তারের মধ্য দিয়ে যে পালস যেতো তা গ্রাহক প্রান্তে ধারণ করা হত তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের পরিবর্তন দ্বারা। একটি নির্দিষ্ট মানের চেয়ে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ক্ষেত্র ধারণ করার অর্থ “১” পাওয়া এবং একইভাবে নির্দিষ্ট মানের চেয়ে কম ক্ষেত্র ধারণ করার অর্থ “০” পাওয়া।

অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে সংযোগ

অপটিক্যাল ফাইবারের ধারণাটা বেশ সহজ। পাশাপাশি দুটো দেয়ালের মতো দুটো আয়না কল্পনা করা যাক। এখন একটি লেজার রশ্মি কৌণিকভাবে আয়নায় ফেললে তা বারবার প্রতিফলিত হয়ে সামনে এগোতে থাকবে। অপটিক্যাল ফাইবারে এই কাজটিই করা হয়, চুলের মতো সূক্ষ্ম একটি ফাইবার যা মূলত কাচ দ্বারা তৈরি তার মধ্যে আলো প্রবেশ করানো হয়, সেই আলো ফাইবারের ভেতর বারংবার পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের মাধ্যমে সামনে এগোতে থাকে।

পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ব্যাপারে আমরা সবাই জানি, আলোক রশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা মাধ্যমে প্রবেশের সময় নির্দিষ্ট মানের চেয়ে বেশি কোণে আপতিত হলে আপতিত আলোকরশ্মি আবার প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে।

অপটিক্যাল ফাইবার কাচ দ্বারা তৈরি। সাধারনভাবে কাচ বলা যায়, কিন্তু আরেকটু ভালোভাবে বলতে গেলে এক্ষেত্রে দুই স্তরের একটি মাধ্যম ব্যাবহার করা হয়, ভেতরের স্তরকে বলা হয় core যা প্রধানত সিলিকন ডাই- অক্সাইড দ্বারা গঠিত, এর বাইরে আরও একটি স্তর আছে। একে বলা হয় cladding। এর উপাদান- সিলিকন ডাই-অক্সাইড, সাথে সামান্য বোরন এবং জার্মেনিয়ামের মিশ্রণ। প্রতিসরণাঙ্ক core অপেক্ষা কিছুটা কমানোর প্রয়োজন হয় এতে। মাত্র ১% প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্যই যথেষ্ট, পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের শর্ত সৃষ্টি করবার জন্য।

চিত্রঃ অপটিক্যাল ফাইবারের গঠন।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো অপটিক্যাল ফাইবার আকৃতিতে যেমন চুলের মতো সূক্ষ্ম, স্থিতিস্থাপকতার দিক দিয়েও তাই। যেভাবেই বাঁকানো হোক, ভেতর দিয়ে পরিবাহিত আলোকরশ্মির ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

 

সহজ কথায় কপার তারের ক্ষেত্রে তথ্য প্রেরণ করা হচ্ছে ইলেকট্রনের প্রবাহ দ্বারা এবং অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে তথ্য প্রেরণ করা হচ্ছে ফোটনের প্রবাহ দ্বারা। মূলনীতি ব্যাখ্যা করা শেষ, এবার আমরা কপার তার এবং অপটিক্যাল ফাইবারের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনায় প্রবেশ করতে পারি।

১. ব্যান্ডউইথ

সহজে বলতে গেলে কোনো channel বা মাধ্যম তার মধ্য দিয়ে যেসকল ফ্রিকোয়েন্সির তথ্য পাঠাতে দেয়, তা-ই হলো সেই মাধ্যমের bandwidth। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে এটি প্রতি সেকন্ডে ১০ গিগাবাইট সাধারণত। এটি কপার তারের চেয়ে অনেক বেশি। আর যত বেশি bandwidth তত বেশি তথ্য পাঠানো সম্ভব।

কপার তারের ক্ষেত্রে বাহক হলো ইলেকট্রন আর অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে আলো বা ফোটন। কপার তারের মধ্য দিয়ে যে সিগন্যাল পরিবাহিত হবে তার গতি আলোর গতিবেগের ৫০% থেকে ৯৯% পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু পার্থক্য-টা হয়ে যায় এই bandwidth এর ক্ষেত্রেই। Multiplexing নামক একটি প্রক্রিয়া দ্বারা ফাইবারের মাধ্যমে বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সির সিগন্যাল পাঠানো যায়, অর্থাৎ এর bandwidth এর পরিধি অনেক বড়। কপার তারের মধ্য দিয়ে এত বড় bandwidth পাঠাতে গেলে উল্লেখযোগ্য পরিমান attenuation বা অপচয় হয়। আলোর ক্ষেত্রে এটি হয় না।

উদাহরণস্বরূপ, ০ ফ্রিকোয়েন্সি থেকে শুরু করে প্রায় ১ গিগাহার্জ পর্যন্ত পরিধির bandwidth কপার তারের মধ্য দিয়ে বেশ অবিকৃতভাবে পাঠানো যায়। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে এই পরিধি ১৭৫ টেরাহার্জ থেকে ২৫০ টেরাহার্জ পর্যন্ত, যা কপারের তুলনায় প্রায় ১ লক্ষ গুণ।

২. রিপিটারের প্রয়োজনীয়তা

বড় দূরত্ব অতিক্রম করতে গেলে সিগন্যাল অপচয় বা attenuate হবার সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে নির্ধারিত দূরত্ব পরপর রিপিটার নামক একটি ডিভাইস বসানো হয়। এটি সিগন্যালের নির্দিষ্ট পরিমাণ একটি শক্তি যা বজায় না রাখলেই নয়, পুরো পথ জুড়ে তা বজায় রাখতে সাহায্য করে। সাধারণত সিগন্যাল দুর্বল হয়ে গেলে রিপিটার তা গ্রহণ করে শক্তি কিছুটা বর্ধিত করে একই সিগন্যাল আবার তার গন্তব্যের দিকে ছুঁড়ে দেয়। নিচের চিত্রটি লক্ষণীয়।

চিত্রঃ অপটিক্যাল ফাইবারের সাথে আরও কিছু মাধ্যমের তুলনা।

দেখা যাচ্ছে যে twisted pair copper cable এর ক্ষেত্রে রিপিটার স্পেসিং ২ কিলোমিটার। অর্থাৎ ২ কিলোমিটার পরপর রিপিটার ডিভাইস বসাতে হয়। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে তা ৪০ কিলোমিটার অর্থাৎ ৪০ কিলোমিটার পরপর রিপিটার বসালেই কাজ হয়ে যাচ্ছে। মনে রাখা দরকার, এই রিপিটার ডিভাইসগুলোর দাম নেহায়েত কম নয়।

৩. আকৃতি, ওজন এবং দৃঢ়তা

চিত্রঃ অপটিক্যাল ফাইবার এবং কপার ক্যাবল

অপটিক্যাল ফাইবারের আরেকটি বড় সুবিধা হলো কপার তারের তুলনায় যথেষ্ট হালকা অথচ ৮ গুণ বল প্রয়োগ করে টানা হলেও ফাইবার ছিঁড়বে না। কোন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির আশেপাশে রাখা যাবে না- এরকম বাধ্যবাধকতা নেই আবার তাপমাত্রার প্রভাবও খুব বেশি নেই, সব দিক দিয়েই ইতিবাচক। কেবল দামের ব্যাপারটা ছাড়া, কপার সস্তা, অপটিক্যাল ফাইবার তুলনামুলকভাবে দামি। কিন্তু যত দামিই হোক কিছু কিছু ক্ষেত্র আছে যেখানে অপটিক্যাল ফাইবার ছাড়া অন্য কিছুর ব্যাবহার অতটা জনপ্রিয় নয়, যেমন শরীরের ভেতরে কোনো পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে।

চিত্রঃ মেডিক্যাল ক্ষেত্রে ফাইবারের ব্যবহার।

তবে যেসকল ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে কপার তারের সংযোগ দেয়া হয়ে গিয়েছে সেখানে নতুন করে অপটিক্যাল ফাইবারের সংযোগ দেয়াটা বেশ খরচের। কিন্তু একথাও অনস্বীকার্য যে আমরা যখন আরো দ্রুতগতির ইন্টারনেটের সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে সামনের দিকে তাকাই, তখন অপটিক্যাল ফাইবার ছাড়া আর কোন শ্রেয় এবং সহজতর মাধ্যম বেছে নেয়ার সুযোগ নেই।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.scienceabc.com/innovation/fibre-optic-copper-faster-better-signal-transmission-bandwidth-speed-cost-fast.html
  2. http://www.abc.net.au/science/articles/2010/10/21/3044463.htm
  3. https://www.quora.com/What-determines-the-bandwidth-of-optical-fiber-versus-copper-wire

 

বিগ ব্যাং এর সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বীঃ স্টেডি স্টেট থিওরি

সকল নীল চোখের মানুষের আছে একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ