অরিগ্যামির আকাশ জয়

কাগজের ভাঁজে নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসায়নি কিংবা প্লেন বানিয়ে বাতাসে উড়ায়নি, এমন মানুষ মনে হয় না খুঁজে পাওয়া যাবে। এক টুকরো কাগজ ভাঁজ করে বিভিন্ন আকৃতিতে রূপ দেওয়ার এই শিল্পকে বলা হয় অরিগ্যামি। এর জন্ম জাপানে। ধারণা করা হয়, ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা জাপানে কাগজ নিয়ে আসার পরপরই আবির্ভাব ঘটে এই শিল্পের।

তখনকার সময়ে কাগজের মূল্য বেশি হওয়ায় কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতেই ব্যবহার হতো এ শিল্প। সেই থেকে শুরু করে এখন অবধি অরিগ্যামি শিল্পটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রসারতা পেয়েছে। এটি যে সারা বিশ্বে বেশ জনপ্রিয় তার নজির মেলে অরিগ্যামি ভিত্তিক বেশকিছু সংগঠন দেখলেই।

উদাহরণস্বরূপ দেখানো যায় The British Origami Society কিংবা OrigamiUSA–র নাম। পাশাপাশি অরিগ্যামিকে আরো বৈচিত্র্যময় কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন নাসা সম্প্রতি মহাকাশযানের ডিজাইন করেছে অরিগ্যামির কৌশল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। কেন? জানতে হলে প্রবেশ করতে হবে গভীরে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন মহাকাশের প্রতিটি নক্ষত্রে কম করে হলেও একটি গ্রহ রয়েছে। এর মধ্যে অনেক গ্রহ আছে যেগুলো প্রাণ ধারণের উপযোগী। প্রাণের বসবাসের উপযোগী যে গ্রহগুলো আমাদের সৌরজগতের বাইরে অবস্থান করছে তাদের বলা হয় এক্সোপ্লানেট। জ্যোতির্বিদরা এখন অবধি ৩৭০৮টি এক্সোপ্লানেটের সন্ধান পেয়েছেন।

বেশিরভাগ গ্রহই আবিষ্কৃত হয়েছে পরোক্ষভাবে। গ্রহটি কোনো নক্ষত্রকে আবর্তন করার সময় টেলিস্কোপ তাক করা হলে যদি সেটি টেলিস্কোপ ও নক্ষত্রের মাঝে বাধা হিসেবে অবস্থান করে তাহলে নক্ষত্রের একটি অংশ অন্ধকার থাকবে। এবং সে অংশটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে। যেহেতু গ্রহটি আবর্তন করছে সেহেতু অন্ধকার অংশটি এগিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। এরকম ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা পরোক্ষভাবে বলতে পারেন সেখানে একটি গ্রহের উপস্থিতি আছে।

গ্রহ শনাক্ত করার এ পদ্ধতিটিকে বলা হয় অতিক্রমণ পদ্ধতি (Transit method)। এ পদ্ধতির পাশাপাশি আরো কিছু পদ্ধতি আছে, যেগুলো ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা পরোক্ষভাবে বেশকিছু গ্রহ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে সরাসরি ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে অল্প কিছু গ্রহের। ফলে বাকি গ্রহদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি এখনো।

চিত্র: ট্রানজিটের মাধ্যমে জানা যায় গ্রহের অস্তিত্ব

কোনো গ্রহের ছবি সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রধান একটি বাঁধা হচ্ছে গ্রহটির আশেপাশে কোনো নক্ষত্রের তীব্র উজ্জ্বল আলো। আলোর প্রচণ্ড বিচ্ছুরণ টেলিস্কোপের লেন্সে এসে পড়ে। প্রবল আলোর কারণে ছবির অনেক অংশ মুছে যায়। আলোর ঝলকানিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্রহটিকে দেখাই যায় না। ঠিক যেমন তীব্র রোদে কারো ছবি তুলতে গেলে ছবির অনেক কিছুই আলোর তীব্রতায় ঢাকা পড়ে যায়।

নক্ষত্রগুলোর উজ্জ্বলতা তাদের গ্রহগুদের তুলনায় বিলিয়ন বিলিয়ন গুণ বেশি। ফলে সে এলাকার ছবি তুলতে গেলে ঐ উজ্জ্বল জিনিসই চলে আসবে সবার আগে, অনুজ্জ্বল গ্রহ আর স্থান পাবে না নক্ষত্রের প্রাবল্যে।

এ সমস্যার সমাধানের জন্য নাসার বিজ্ঞানীরা একটি চমৎকার ভাবনা ভাবছেন। টেলিস্কোপকে যদি নক্ষত্রের আলো থেকে ঢেকে দেওয়া যায় তাহলে কেমন হয়? বাস্তব জীবনে আমরা প্রায় সময়ই এই পদ্ধতিটা ব্যবহার করি। দূরে কোথাও যদি তাকাতে চাই এবং তখন যদি প্রবল সূর্যালোক থাকে তখন কপালের উপর হাত দিয়ে আলোটা ঢেকে নিয়ে বিশেষভাবে তাকাই। এতে আলো সরাসরি চোখে লাগে না বলে লক্ষ্যবস্তুটি দেখা যায়। নাসার বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনাও অনেকটা সেরকম।

এর জন্য বিজ্ঞানীদের তৈরি করতে হবে বিশাল আকৃতির একধরনের চাকতি। এর নাম তারা দিয়েছেন স্টারশেড। এর আকৃতি হবে অনেকটা সূর্যমূখী ফুলের মতো। বিশাল গোলাকার গঠন আর কিনারায় পাপড়ির ন্যায় অবয়ব।

স্টারশেডের ধারণার উদ্ভাবক মূলত মহাকাশ টেলিস্কোপের জনক লেইম্যান স্পিটযার। সূর্যগ্রহণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ১৯৬২ সালে ধারণাটি প্রস্তাব করেন। স্টারশেডের এমন আকৃতির উদ্ভাবকও তিনিই।

বিভিন্ন মডেল নিয়ে পরীক্ষা করে তারা ধারণা করছেন স্টারশেডের এরূপ আকৃতি পৃথিবীসম কোনো গ্রহের ছবি তোলার জন্য টেলিস্কোপকে ভালোভাবে ঢেকে দিতে পারবে। এটি টেলিস্কোপের লেন্সকে নক্ষত্রের আলো থেকে বিশেষভাবে ঢেকে দেবে। তবে বিশেষ প্রক্রিয়ায় গ্রহের দিকে ঠিকই নজর দেয়া যাবে। গ্রহ থেকে আসা আলো আরো ভালভাবে দৃশ্যমান হবে। প্রয়োজনে এটি তার অবস্থান পরিবর্তন করে ভিন্ন ভিন্ন নক্ষত্র থেকে আলো আসতে বাঁধা দিতে পারবে। বিজ্ঞানীদের ধারণা গ্রহ পর্যবেক্ষণ ছাড়াও অন্যান্য মহাকাশ গবেষণায়ও এধরনের স্টারশেড কাজে লাগানো যাবে।

এক্ষেত্রে তাদের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যেমন, নক্ষত্র আর টেলিস্কোপের মাঝে কীভাবে একে ঠিক অবস্থানে বসানো হবে, এত বড় একটি বস্তুকে কীভাবে মহাকাশে নিয়ে যাওয়া হবে। একটি স্টারশেডের ব্যাস হবে প্রায় ১০০ ফুট বা ৩০ মিটার। যা একটি বাস্কেটবল কোর্টের সমান। যথেষ্ট বড়।

অন্যদিকে কোনো রকেটের ব্যাস খুব বেশি হলে ৫মিটার। ৫ মিটারের রকেটে করে ৩০ মিটারের বস্তু নিয়ে যাওয়া? কীভাবে? রকেটে করে একে মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার এক সহজ সমাধান খুঁজে পেয়েছেন তারা। সেটি হলো অরিগ্যামির ও গণিতের কিছু কলাকৌশল।

অরিগামির সেই বিশেষ শাখাটির নাম রিজিড অরিগ্যামি। এতে কাগজের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় দৃঢ় পাত। দৃঢ় পাত যেহেতু ভাঁজ করা যায় না তাই যেখানে ভাঁজের প্রয়োজন সেখানে আলাদা আলাদা পাতকে কবজা দিয়ে জোড়া লাগানো হয়। ফলে বস্তুর আকৃতির কোনো পরিবর্তন হবে না। শুধু কাগজের স্থলে হবে দৃঢ় পাত।

রিজিড অরিগ্যামিকে কাজে লাগিয়ে বিশাল আকৃতির স্টারশেডকে ভাঁজ করে রকেটে বহন উপযোগী আকারে নিয়ে আসা হবে। এক্ষেত্রে যে প্যাটার্নে ভাঁজ করা হবে সেটি হলো আইরিশ ফোল্ডিং প্যাটার্ন। এভাবে মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার পর আবার ভাঁজ খুলে ফেলা হবে। প্রত্যেকটি ভাঁজ বেশ সূক্ষ্মভাবে খুলতে হবে যাতে এর কিনারা পর্যন্ত প্রতিটি অংশ মিলিমিটার পর্যায়ে সঠিক অবস্থানে থাকে। সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞানীরা এই ভাঁজ সঠিকভাবে খুলতে পারার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন।

চিত্র: বিজ্ঞানীরা ভাজগুলো নিয়ে কাজ করছেন

মহাকাশ গবেষণায় অরিগ্যামিকে কাজে লাগানো এটাই প্রথম নয়। এর আগেও কিছু যন্ত্রে অরিগ্যামির ভাঁজ করার নীতিকে কাজে লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সোলার প্যানেল এবং স্যাটেলাইট। মহাকাশ গবেষণা ছাড়াও বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার দেখা যায়। অল্প অল্প করে এভাবেই সীমিত গণ্ডি থেকে বের করে এনে অরিগ্যামিকে কাজে লাগানো হচ্ছে বিজ্ঞানের বিশাল জগতে।

তথ্যসূত্র

১) https://exoplanets.nasa.gov/resources/1015/

২) https://www.youtube.com/watch?v=XYNUpQrZISc

৩) https://www.youtube.com/watch?v=Ly3hMBD4h5E

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *