জেট ইঞ্জিনের গল্প

চাকার আবিষ্কার মানব সভ্যতার জন্য ছিল বিরাট এক বিপ্লব। এর উদ্ভাবন যোগাযোগকে করেছিল আরো সহজ, আরো গতিময়। চাকা আবিষ্কারের পর থেকেই মানুষ যোগাযোগকে আরো গতিশীল করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো। প্রথম প্রথম বিভিন্ন প্রাণীর পেশি শক্তি ব্যবহার করে যানবাহনগুলো চলাচল করতো। এরপর আসে ইঞ্জিনের ধারণা। যানবাহনে ইঞ্জিনে ব্যবহার মানব সভ্যতার গতিকেই পাল্টে দেয়।

আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির অন্যতম এক বিস্ময় হলো উড়োজাহাজ। যেখানে যেতে মাসের পর মাস সময় লেগে যেতো, উড়োজাহাজের কল্যানে তা আজ এক দিনেরও কম সময়ে যাওয়া সম্ভব। আর উড়োজাহাজের এই প্রচণ্ড গতির পেছনের কারণ এর ইঞ্জিন। শুরুর দিকে উড়োজাহাজে পিস্টন ইঞ্জিন ব্যবহৃত হলেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে পিস্টন ইঞ্জিনের পরিবর্তে উন্নতমানের ইঞ্জিনের দরকার হয়ে পড়ে। জেট ইঞ্জিনের আবিষ্কার মানুষের এ নতুন চাহিদাটি মেটালো। আজ আমরা এই জেট ইঞ্জিন নিয়েই আলোচনা করবো।

খুব সহজ ভাষায়, জেট ইঞ্জিন হলো এমন এক প্রকার ইঞ্জিন যা বায়ুমন্ডলের বাতাসকে এর ভেতরে টেনে নিয়ে প্রথমে ঘনীভূত করে এবং পরে জ্বালানী মিশ্রিত করে বিষ্ফোরণের মাধ্যমে প্রসারিত করে এর পেছন দিক দিয়ে নির্গত করে দেয়। জেট ইঞ্জিন বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। তবে প্রকারভেদ যেমনই হোক, সব জেট ইঞ্জিনই কাজ করে নিউটনের ৩য় সূত্রানুসারে। প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। এটিই হচ্ছে জেট ইঞ্জিনের মূলনীতি।

জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি

ইঞ্জিনের মূল কার্যপদ্ধতিতে যাওয়ার আগে নিউটনের ৩য় সূত্রটি আরো ভালো করে বোঝা প্রয়োজন। একটি বেলুনকে বাতাস দিয়ে ভর্তি করে এর মুখ বন্ধ করে রেখে দিলে বেলুনটি স্থির অবস্থাতেই থাকবে। কারণ ভেতরের বাতাসের চাপ বেলুনটির গায়ে সমানভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা যদি বেলুনটিকে মুখ খোলা অবস্থায় রেখে দেই, তাহলে দেখবো বেলুনটি কিছু বেগ নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে বেলুনের খোলা মুখটি দিয়ে প্রচন্ড বেগে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটি নিউটনের সূত্রের সেই ক্রিয়া। এর ফলে বেলুনটি সামনের দিকে সম-পরিমাণ বল অনুভব করে এবং এগিয়ে যায়। অবাক লাগে, অত্যাধিক জটিল যান্ত্রিক কৌশলের সমন্বয়ে তৈরি একটি জেট ইঞ্জিন এ সহজ নিয়মটি ব্যবহার করেই কাজ করে থাকে।

যাহোক, এবার জেট ইঞ্জিনের মূল কার্যপদ্ধতিতে যাওয়ার আগে এর প্রধান অংশগুলোর সাথে পরিচিত হয়ে নেয়া যাক। একটি জেট ইঞ্জিনের মূল অংশগুলো হচ্ছে- ১. ফ্যান ২. কম্প্রেশর ৩. কমবাস্টশন চেম্বার ৪. টারবাইন। তবে ইঞ্জিনের ধরন অনুযায়ী আরো বিভিন্ন অংশ যোগ করা হতে পারে।

মূল ইঞ্জিনের সামনের অংশে থাকে একটি ফ্যান। ফ্যানটির কাজ বাইরে থেকে বাতাস টেনে ইঞ্জিনের ভেতরে নিয়ে যাওয়া। বিশেষ ডিজাইন সম্পন্ন ফ্যানের সাহায্যে এ কাজটি করা হয়। ফ্যানের ঠিক পেছনেই থাকে কম্প্রেশর। এর কাজ বাইরে থেকে টেনে আনা বাতাসকে চাপ দিয়ে সংকুচিত করা। এ ধাপে বাইরে থেকে টেনে আনা বাতাসের চাপ প্রায় ৮ গুণ বাড়ানো হয় এবং বাতাসের গতি ৬০ ভাগ কমিয়ে ঘন্টায় ৪০০ কিলোমিটার করা হয়।

ইঞ্জিনের ওপরে এয়ারক্রাফটের ডানার নিচে জ্বালানী ট্যাংক থাকে। বাতাসের সংকুচিত অবস্থায়, ট্যাংক থেকে জ্বালানী এনে বাতাসের সাথে মেশানো হয়। এরপর একটি নিয়ন্ত্রিত বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়। এর ফলে প্রচন্ড উত্তপ্ত এগজস্ট গ্যাস (Exhaust Gas) উৎপন্ন হয়। এ সময় এগজস্ট গ্যাসের তাপমাত্রা প্রায় ৯০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড হয়।

প্রচন্ড উত্তাপের ফলে সংকুচিত গ্যাস হঠাৎ প্রসারিত হয়ে যায় এবং ইঞ্জিনের পেছন দিয়ে প্রচন্ড বেগে বাইরে নির্গত হয়। ইঞ্জিনের পেছনে রাখা থাকে বিশেষভাবে বাঁকানো একটি টার্বাইন। হঠাৎ প্রসারিত এগজস্ট গ্যাস এই টার্বাইনের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাইরে নির্গত হয় এবং বায়ু প্রবাহের ফলে টার্বাইনটি ঘুরতে থাকে, অনেকটা উইন্ডমিলের মতো।

ইঞ্জিনের পেছনের এ টার্বাইনটি আবার একটি শ্যাফটের মাধ্যমে কম্প্রেশর ও সামনের ফ্যানের সাথে যুক্ত থাকে। ফলে এগজস্ট গ্যাসের প্রভাবে যখন টার্বাইনটি ঘুরতে শুরু করে, তখন টার্বাইনের সাথে সাথে এর সাথে যুক্ত কম্প্রেশর এবং ফ্যানটিও ঘুরতে থাকে। অর্থাৎ প্রাথমিক অবস্থায় ইঞ্জিনটিকে একবার চালু করে দিলে জ্বালানী সরবরাহ বন্ধ না করা পর্যন্ত ইঞ্জিনটি নিজে নিজেই চলতে থাকবে। সংক্ষেপে এবং খুব সহজে, এভাবেই একটি জেট ইঞ্জিন কাজ করে!

চিত্রঃ জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি।

এবার আসি জেট ইঞ্জিনের প্রকারভেদে। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রকারের জেট ইঞ্জিন তৈরি করা হয়েছে। তবে সব জেট ইঞ্জিনই উপরে বর্ণিত পদ্ধতিতে কাজ করে থাকে। বিভিন্ন প্রকারের জেট ইঞ্জিনের নাম দেয়া হলো- ১. রেম জেট ২. পালস জেট ৩. রকেট জেট ৪. গ্যাস টারবাইন ইত্যাদি।

রেম জেটঃ রেম জেট একেবারেই প্রাথমিক স্তরের জেট ইঞ্জিনের ধারণা মাত্র। বাস্তব ক্ষেত্রে এর কোনো প্রয়োগ এখন আর নেই। শুধুমাত্র জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি সহজভাবে বোঝাতে রেম জেট ব্যবহৃত হয়। রেম জেট ইঞ্জিনকে প্রাথমিকভাবে সামনের দিকে গতিশীল করে এর ভেতরে বাতাস প্রবেশ করানো হয়। এরপর জ্বালানী মিশ্রিত করে নিয়ন্ত্রিত বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়। বিষ্ফোরণের ফলে উৎপন্ন এগজস্ট গ্যাস ইঞ্জিনের পেছনের নজল দিয়ে বের হয়ে আসে এবং নিউটনের ৩য় সূত্রের নিয়মে ইঞ্জিনটিকে সামনের দিকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে দেয়।

পালস জেটঃ পালস জেট অনেকটা রেম জেটের মতোই। তবে এ ইঞ্জিনকে প্রাথমিকভাবে সামনের দিকে গতিশীল করার দরকার হয় না। এর পরিবর্তে ইঞ্জিনটি এর কম্প্রেশর দ্বারা বায়ুমন্ডল থেকে বাতাস টেনে এর ভেতরে নিয়ে যায়। এ ধরনের ইঞ্জিন অনেক টেকসই। তবে পালস-জেট ইঞ্জিনের জ্বালানী খরচ খুব বেশি। মূলত ফাইটার এয়ারক্রাফটে এ ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়।

চিত্রঃ পালস জেট ইঞ্জিন।

রকেট জেটঃ সাধারণ জেট ইঞ্জিনগুলো বায়ুমন্ডলের বাতাসকে ব্যবহার করে জেট তৈরি করে। কিন্তু রকেট জেট বায়ুমন্ডলের বাতাসের পরিবর্তে এর ভেতরে থাকা জ্বালানী আর অক্সিজেনের মিশ্রণ ব্যবহার করে জেট তৈরি করে থাকে। রকেট জেটের থ্রাস্ট খুব শক্তিশালী। তবে এর স্থায়িত্ব স্বল্প সময়ের জন্য হয়। স্পেস শিপ এবং মিসাইলে রকেট জেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়।

চিত্রঃ রকেট জেট ইঞ্জিন।

গ্যাসে টারবাইন ইঞ্জিনঃ গ্যাসে টারবাইন ইঞ্জিন আধুনিক এয়ারক্রাফটগুলোতে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের ইঞ্জিন বায়ুমন্ডল থেকে বাতাস টেনে এর ভেতরে নিয়ে প্রথমে সংকুচিত করে। আমরা জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি এ ধরনের ইঞ্জিনের সাহায্যেই আলোচনা করেছি। গ্যাস টারবাইন ইঞ্জিনকে এর ডিজাইনের উপর উপর ভিত্তি করে আবার ৩ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১. টার্বোজেট ২. টার্বোপ্রপ ৩. টার্বোফ্যান।

টার্বোজেটঃ টার্বোজেট ইঞ্জিনের সামনে একটি কম্প্রেশার থাকে। এর সাহায্যে ইঞ্জিনের ভেতরে প্রতি মিনিটে কয়েক হাজার টন করে বাতাস নিয়ে যাওয়া হয়। টারবাইনের সাথে একটি শ্যাফটের মাধ্যমে ইঞ্জিনের কম্প্রেশারটিও যুক্ত থাকে। ফলে প্রথমে বাহ্যিক একটি শক্তির সাহায্যে কম্প্রেশারটি একবার চালিয়ে দিলে পরবর্তীতে এটি নিজে নিজেই চলতে থাকে এবং ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজনীয় বাতাস টেনে আনতে থাকে।

টার্বোপ্রপ ইঞ্জিনঃ টার্বোপ্রপ জেট ইঞ্জিন অনেকটা টার্বোজেট ইঞ্জিনের মতোই। তবে এ ধরনের ইঞ্জিনের উৎপন্ন এগজস্ট গ্যাসকে ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজনীয় থ্রাস্ট উৎপন্ন করার পরিবর্তে ইঞ্জিনের পেছনে থাকা টারবাইনটি ঘোরানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের ইঞ্জিনের টারবাইন থাকে অনেকগুলো, এগুলো তুলনামূলক ভাবে কিছুটা বড় হয়। ফলে উৎপন্ন জেটের প্রায় সবটুকু শক্তিই ব্যয় হয় এ টারবাইনগুলো ঘোরানোর কাজে।

সামনের দিকে থাকে একটি প্রপেলার। প্রপেলারে সাধারণত ৪-৬ টি করে ব্লেড থাকে। প্রপেলার বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে টারবাইন ও কম্পেশারের সাথে যুক্ত থাকে। টারবাইনের সাথে সাথে প্রপেলারটিও ঘুরে। এ প্রপেলারটিই এয়ারক্রাফটকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় থ্রাস্ট তৈরি করে। ছোট আকারের এয়ারক্রাফটে এ ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়।

টার্বোফ্যানঃ অনেকটা টার্বোজেট ইঞ্জিনের মতোই কাজ করে এমন আরেকটি জেট ইঞ্জিন হচ্ছে টার্বোফ্যান জেট ইঞ্জিন। তবে টার্বোজেটের সাথে টার্বোফ্যান জেট ইঞ্জিনের মূল পার্থক্য হলো, এর সামনে থাকা কম্প্রেশারের ব্লেডগুলো অনেক বড় আকৃতির। ফলে বায়ুমন্ডল থেকে টেনে আনা বাতাসের পুরোটা ইঞ্জিনের ভেতর দিয়ে না গিয়ে কিছু অংশ ইঞ্জিনের বাইরের আবরণের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ বাতাসকে বাইপাস এয়ার বলা হয়। এর মূল সুবিধা হলো, বাইপাস এয়ারের কারণে ইঞ্জিনটি ঠান্ডা থাকে। আবার বিশেষ ব্যবস্থায় এ বাইপাস এয়ারকে জ্বালানী সহকারে বিষ্ফোরিত করে অতিরিক্ত এগজস্ট গ্যাস উৎপন্ন করা হয়। ফলে এয়ারক্রাফটের জন্য অতিরিক্ত থ্রাস্টও পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্রঃ
১. The Jet Engine- Rolls Royce
২. উড়োজাহাজ কেমন করে উড়ে- এ. কে. এম. আতাউল হক
৩. www.nasa.gov

featured image: maya.design

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *