in

বিপ্লবী বিটটরেন্ট ফাইল শেয়ারিং এর ইতিকথা

টরেন্ট শেয়ারিং সিস্টেমের পুরোটাই মানুষের কাছে পাইরেসির মূল অস্ত্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ব্যাপারটি তা নয়। কোনোকিছু যখন কেবলমাত্র একটি খাতে অধিক পরিমাণে ব্যবহার করা হয় তখন সেটির পরিচয় বদলে যায় মানুষের মনে। বাংলাদেশে এমনও অনেক মানুষ রয়েছে যাদের কাছে ইন্টারনেট মানেই হলো ফেসবুক। ফেসবুক যে ইন্টারনেটের বড় এক পরিসরের ক্ষুদ্র এক অংশ মাত্র সে ব্যাপারে তাদের জানা নেই।

পাইরেসিতে অধিক হারে ব্যবহার হয় বলে আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছি যে আধুনিক প্রযুক্তির একটি অনন্য সংযোজন হলো টরেন্ট। টরেন্ট কেবলমাত্র পাইরেসির জন্য তৈরি হয়নি। ভিন্নমাত্রার একটি শেয়ারিং প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা থেকে জন্ম হয়েছে এর। এ প্রযুক্তিটি খুবই সূক্ষ্ম ও সুনিপুণভাবে কাজ করে- যেন একদম গল্পের মতো।

টরেন্ট শেয়ারিংয়ের বিস্তারিত বুঝতে হলে আপনাকে আগে জানতে হবে ডাউনলোডিং ও আপলোডিং এর প্রাচীন পদ্ধতিটি সম্পর্কে। এগুলো কম্পিউটারের শুরু থেকেই চলে আসছে। ইন্টারনেটের সংযোগবিহীন দুটি কম্পিউটারকে ক্যাবলের মাধ্যমে জুড়ে দিয়ে যদি আপনি কোনো ফাইল শেয়ার করতে চান, তাহলে আপনাকে এই প্রাচীন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।

প্রেরক কম্পিউটার থেকে প্রথমে একটি লিংক প্রদান করতে হবে প্রাপকক। এ লিংকটি বলে দেবে প্রেরকের কম্পিউটারের কোথায় রয়েছে ফাইলটি। ফাইলটির ঠিকানা ব্যবহার করে সহজেই প্রাপক ফাইলটি নিয়ে নিতে পারবে। এখানে প্রেরক কম্পিউটারটি ব্যবহৃত হয়েছে আপলোডার হিসেবে আর প্রাপক কম্পিউটার ব্যবহৃত হয়েছে ডাউনলোডার হিসেবে।

এক কম্পিউটার থেকে আরেক কম্পিউটারে ফাইল শেয়ারিংয়ে তেমন কোনো জটিলতা সৃষ্টি হয় না। কিন্তু যদি দেখা যায় যে একটি কম্পিউটারে এমন একটি ফাইল রয়েছে যা একশোটি কম্পিউটার ব্যবহারকারীর প্রয়োজন তাহলে কেমন হবে?

একশোটি কম্পিউটারকে আপলোডার কম্পিউটারের সাথে ক্যাবল দিয়ে যুক্ত করতে হবে। সেই কাঙ্ক্ষিত কম্পিউটারটির আপলোডের গতি একশোটি কম্পিউটারের মাঝে ভাগ হয়ে যাবে। সাধারণ একটি কম্পিউটার দিয়ে কখনোই একশোটি কম্পিউটারের এমন বোঝা বহন করা সম্ভব হবে না।

এখানেই প্রয়োজন একটি সার্ভার কম্পিউটার। এধরনের সার্ভার অনেকগুলো কম্পিউটারের অনুরোধ গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে। আপনি আপনার কম্পিউটারকে ব্যবহার করতে পারবেন একটি ওয়েবসাইটের সার্ভার হিসেবে। ওয়েবসাইট প্রকাশ করার পর ব্যবহারকারীরা যখন ওয়েব অ্যাড্রেস দিয়ে আপনার তৈরিকৃত ওয়েবসাইটটি ব্যবহারের অনুরোধ পাঠাবে আপনার কম্পিউটারে, তখন আপনার কম্পিউটার অনুরোধকারীর নিকট পাঠিয়ে দেবে ওয়েবসাইটটিকে।

অনুরোধ পাঠানোর এ কাজটি করে থাকে ওয়েব ব্রাউজার। দুই-একজনের অনুরোধে সাড়া দেবার সামর্থ্য থাকলেও যখন শতাধিক মানুষের অনুরোধ আসবে আপনার কম্পিউটারের পক্ষে তখন আর সেই অনুরোধগুলোতে সাড়া দেয়া সম্ভব হবে না। ফলে আপনার কম্পিউটার ক্র্যাশ করবে।

ডাউনলোডের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। কোনো ফাইলের মালিক একটি সার্ভার কম্পিউটারে ফাইলটিকে রেখে তার ঠিকানাটি লিংকের মাধ্যমে কোনো ওয়েবসাইট কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকেন। ফাইলটি যাদের প্রয়োজন হবে, তারা উক্ত ঠিকানা ব্যবহার করে ফাইলটিকে খুঁজে নেন। অতঃপর ডাউনলোডের জন্য অনুরোধ করেন। সার্ভার কম্পিউটার তখন ডাউনলোডে সাড়া দিয়ে ফাইলটিকে প্রেরণ করতে শুরু করে।

ডাউনলোডার যত বাড়বে, সার্ভার কম্পিউটারের ক্ষমতা আর স্পীড ধীরে ধীরে ডাউনলোডারদের মাঝে ভাগ হয়ে যেতে শুরু করবে। এখন একটি সার্ভার কম্পিউটার ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত করে দেয়া হলো। ডাউনলোডের জন্য ফাইলও রাখা হলো। ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত কোটি কোটি কম্পিউটার এবার ফাইলটির জন্য অনুরোধ করতে সক্ষম। এবার এই বিপুল চাহিদায় সাড়া দিতে হবে সার্ভারকে।

এই পদ্ধতিটির একটি বড় সমস্যা হলো ব্যান্ডউইডথ। যদিও ব্রডব্যান্ডের সহজলভ্যতা আর ফাইলের সাইজ ইদানিং মানুষকে টরেন্ট প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করছে তবুও মানুষ এখনো প্রাচীন পদ্ধতি ব্যবহার করে। সহজ-সরল পদ্ধতি বলে কথা।

যারা ব্যবহার করেন এই প্রাচীন পদ্ধতি কিংবা করতেন, তাদের একটি সমস্যা চোখে পড়ার কথা। সার্ভারে সকল ফাইলের নির্দিষ্ট ব্যান্ডউইডথ থাকে। ব্যান্ডউইডথ শেষ হয়ে গেলে আর সেটি ডাউনলোড করা যায় না। আপলোডারকে তখন নতুন করে ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাথায় রেখে ব্যান্ডউইডথের ব্যবস্থা করতে হয়।

ধরা যাক, একটি সার্ভারের ব্যান্ডউইডথ ৫০০ মেগাবাইট। ফাইলটির সাইজ হলো ১০০ মেগাবাইট। তাহলে মাত্র পাঁচজন ব্যবহারকারী এই ফাইলটিকে ডাউনলোড করতে পারবে। পাঁচবার ডাউনলোড হয়ে যাবার পর যারাই ডাউনলোডের অনুরোধ করবে, সার্ভার তখন ব্যান্ডউইডথ ত্রুটি প্রদর্শন করবে।

ফাইল শেয়ারিংয়ের শুরু থেকেই চলে আসছে এই সরলতম প্রাচীন পদ্ধতি। দিনে দিনে প্রযুক্তিখাত অনেক উন্নতি করেছে, ফাইলের আকার বেড়েছে। আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে কিন্তু ফাইল শেয়ারিং কমেনি, উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপক হারে। বেশি আকারের সাথে সাথে পুরনো পদ্ধতিতে জটিলতাও বেড়েছে।

কিন্তু প্রযুক্তি কখনো পিছিয়ে থাকেনি। সময়ের সাথে আপগ্রেড হতে দেখা গেছে একে। ফাইল শেয়ারিং প্রযুক্তি-ই বা পিছিয়ে কেন থাকবে। আপগ্রেড হয়েছে, আপগ্রেডেড ভার্সন হলো এই বিটটরেন্ট অথবা টরেন্ট প্রযুক্তি।

বহুদিন থেকেই ফাইল শেয়ারিংয়ের নতুন এক প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা সকলের মাঝে বিরাজ করছিল। বিটটরেন্ট কাজ করে peer-to-peer শেয়ারিং এর দ্বারা। peer কী জিনিস, এই প্রশ্ন আবার রয়ে যায়। বিটটরেন্ট সিস্টেমে একজন ডাউনলোডারকে ডাউনলোডার না বলে পিয়ার বলে উল্লেখ করা হয়। আরো মজার ব্যাপার হলো, শেয়ারিং হবে peer-to-peer, অর্থাৎ ডাউনলোডার থেকে ডাউনলোডারের কাছে।

বাফালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা কম্পিউটার প্রোগ্রামার ব্র্যাম কোহেন ভাবলেন, কেবলমাত্র একটি সার্ভার থেকে সকল ব্যবহারকারী ফাইল সংগ্রহ করে থাকে, কেমন হবে যদি সংগ্রহকারী প্রত্যেকেই একেকজন সার্ভারের মতো কাজ করতে পারে। অর্থাৎ যাদের ডাউনলোড শেষ হয়ে যাবে তারা আবার অন্যদের অনুরোধে সাড়া দিতে শুরু করবে। এটিই হলো মূল ধারণা। এর উপর ভিত্তি করেই করেই ব্র্যাম কাজ করতে শুরু করেন।

ধারণাটি সরল কিন্তু এতে জটিলতাও রয়েছে প্রচুর। অনেকগুলো সমস্যা সামনে চলে আসে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করতে হলে। যেমন, একটি সাধারণ কম্পিউটার কখনোই সার্ভারের মতো অনুরোধ সামলাতে পারবে না, এতে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকবে। সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া একটি পূর্ণাঙ্গ ফাইল থেকে কীভাবে অর্ধেক ডাউনলোড হওয়া আরেকটি কম্পিউটার বাকি অর্ধেক ডাউনলোড করবে, কম্পিউটার তো বুঝবে না কতটুক পাওয়া যাবে।

তাছাড়া সার্ভারের মতো কাজ করতে হলে একটি কম্পিউটারকে পুরোপুরি ডাউনলোড শেষ করতে হবে, অন্য সকল অনুরোধের চাপে এই কাজটিও সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়াবে। একটি কম্পিউটার ডাউনলোড শেষ করেছে এই সংবাদটি-ই বা কীভাবে অন্য ডাউনলোডারদের কম্পিউটারে পৌঁছাবে। সুন্দর আইডিয়া কিন্তু সমস্যা বেশ জটিল। জটিল হবার কারণ হলো প্রাচীন ফাইল শেয়ারিং পদ্ধতির প্রোটোকল।

সার্ভার থেকে ব্যবহারকারীদের ফাইল ডাউনলোড
পিয়ার-টু-পিয়ার শেয়ারিং

প্রোটোকলের ব্যাপারে কিছু বলে নেয়া উচিৎ। প্রোটোকলকে ফাইল শেয়ারিংয়ের আইনব্যবস্থা বলা যেতে পারে। ওয়েব ব্রাউজিং আর ফাইল শেয়ারিংয়ের নিয়মকানুন লিপিবদ্ধ থাকে এতে। এটি মেনে চলে সার্ভার ও ওয়েব ব্রাউজার। কয়েকটি প্রোটোকল হলো HTTP (Hyper Text Transfer Protocol), HTTPS (Hyper Text Transfer Protocol Secured), FTP (File Transfer Protocol) ইত্যাদি। ইন্টারনেট ব্রাউজিং এর সময় সবাই HTTP কিংবা HTTPS ব্যবহার করে থাকে। তবে FTP শব্দটিও কিন্তু আপনাদের অপরিচিত নয়।

যারা ব্রডব্যান্ড ব্যবহার করেন তাদের কাছে অতি পরিচিত শব্দ হলো FTP Server। আপনার ব্রডব্যান্ড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে আপনার কম্পিউটার ক্যাবলের মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত রয়েছে, তাই আপনি তাদের নির্দিষ্ট যেকোনো ফাইলের মধ্য থেকে পছন্দের ফাইল ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।

এখানে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ ব্যবহার করতে হচ্ছে না কেননা সরাসরি ক্যাবল দিয়ে আপনার কম্পিউটার সার্ভারের সাথে যুক্ত। ঠিক এজন্যই আপনি নির্ধারিত স্পীডের থেকেও অনেক বেশি স্পীড পেয়ে থাকেন FTP সার্ভার থেকে ডাউনলোডের সময়।

Peer-to-peer শেয়ারিংয়ের সমস্যাগুলো সমাধানে প্রথমবারের মতো নতুন এক প্রোটোকল লেখার কাজে হাত দিলেন ব্র্যাম কোহেন। এই ফাইল শেয়ারিং ব্যবস্থাটি একটি ফাইলকে কয়েক ভাগে ভাগ করে নেয়। বলা যায় Bit বাই Bit ভাগ। এজন্যই প্রযুক্তিটির নাম হয়ে দাঁড়ায় Bittorrent।

প্রোটোকল লেখার পর এবার নির্ধারিত ব্রাউজার প্রোগ্রাম তৈরিতে হাত দিলেন ব্র্যাম। ওয়েব ব্রাউজার সবগুলো কাজ করে HTTP, HTTPS কিংবা FTP প্রোটোকলে। নতুন প্রোটোকল মেনে চলবে এমন এক ব্রাউজার প্রয়োজন ব্রামের। ব্রাউজারটি হলো সকলের পরিচিত Bittorrent Software।

যারা চিনতে পারেননি তারা হয়তো মাইক্রোটরেন্ট সফটওয়্যারটির সাথে পরিচিত। এই মাইক্রোটরেন্ট কিংবা যেটাকে হয়তো ইউটরেন্ট বলে বলেই অভ্যস্থ আপনি, বিটটরেন্ট প্রযুক্তিতে খুবই বিখ্যাত। তবে এটি ইউটরেন্ট নয়, ইউ এর মত দেখে সিম্বলটিকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘মাইক্রো’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে মাইক্রোটরেন্ট আর বিটটরেন্ট ব্রাউজার দুটোই বিটটরেন্ট কর্পোরেশনের অধীনে রয়েছে। এছাড়াও Deluge এবং BitLord এগুলো মোটামুটি পরিচিত টরেন্ট ক্লায়েন্ট অর্থাৎ বিটটরেন্ট ব্রাউজার।

বহুল ব্যবহৃত ও বিখ্যাত মাইক্রোটরেন্ট

বিটটরেন্ট প্রযুক্তিতে আরেকটি টার্মিনোলজি হলো ‘ট্র্যাকার’। ট্র্যাকারের কাজ হিসেবে বলা যায়- সার্ভার, ক্লায়েন্ট, পিয়ার সবাইকে পরস্পরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। সকল টরেন্ট ফাইলেই ট্র্যাকার থাকে।

টরেন্ট ফাইলের কথা যেহেতু এসেছে, একটি ব্যাপারে বলে ফেলা যাক। আপনার কাঙ্ক্ষিত ফাইলটির জন্য টরেন্ট ব্রাউজারকে আপনি আদেশ দেবেন একটি ফাইলের মাধ্যমে। এই ফাইলটির ফরম্যাট হলো ‘টরেন্ট’। এখান থেকেই মানুষের মুখে মুখে টরেন্ট ডাউনলোডিং কথাটি চলে এসেছে।

আরো একভাবে আপনি আদেশ দিতে পারবেন, ম্যাগনেট লিংক এর সাহায্যে। টরেন্ট ফাইল কিংবা ম্যাগনেট লিংক দুটিই কাজ করে থাকে চুম্বকের মতো। চুম্বক যেমন লোহাকে আকর্ষণ করতে শুরু করে, তেমনই ব্রাউজার এই টরেন্ট অথবা ম্যাগনেটকে ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফাইলটির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ ডাউনলোড করে।

ইন্টারনেট যুক্ত সকল কম্পিউটারে সংরক্ষিত পূর্ণাঙ্গ ফাইল থেকে ডাউনলোড করে করে এক জায়গায় একত্র করতে শুরু করে। হাজার হাজার কম্পিউটার থেকেও অল্প অল্প করে গ্রহণ করে নিতে সক্ষম এই টরেন্ট। এজন্য সকল অবস্থাতেই টরেন্ট শেয়ারিং সুবিধাজনক।

ধরা যাক, ১০ মিটার লম্বা একটি লাঠি ডাউনলোডের উদ্দেশ্যে কম্পিউটারে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দিয়ে টরেন্ট তৈরি করা হলো। এতে নির্দিষ্ট ট্র্যাকারও যুক্ত করা হলো। টরেন্ট ফাইল তৈরির সময়ই ব্রাউজার এই লাঠিকে দশ ভাগে ভাগ করে ফেললো। প্রতি ভাগে ১ মিটার করে পড়েছে, প্রতি ভাগের নাম প্রথম, দ্বিতীয়… দশম দেয়া যাক।

তিনজন মানুষের এই লাঠিটি ডাউনলোড করা প্রয়োজন। তিনজন মানুষ ডাউনলোড শুরু করলো। তিনজনই প্রথম খণ্ড থেকে ডাউনলোড শুরু করবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি আপনার টরেন্ট ব্রাউজারে কোনো ফাইল সিলেক্ট করে নিচের দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন, বড় একটা বার ধীরে ধীরে পূর্ণ হচ্ছে, কোথাও ব্লক আছে, কোথাও ফাঁকা। সেগুলো ধীরে ধীরে পূর্ণ হচ্ছে।

প্রথমজন চতুর্থ, সপ্তম, দশম খন্ডগুলো ডাউনলোড করলো; দ্বিতীয়জন প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় খণ্ড ডাউনলোড করলো; তৃতীয়জন পঞ্চম, ষষ্ঠ, অষ্টম, নবম খণ্ডগুলো ডাউনলোড করে নিলো। এবার কিন্তু আর সার্ভারের প্রয়োজনই নেই। ট্র্যাকারের সাহায্য খুবই সহজে একে অপরের কম্পিউটারকে সার্ভার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করবে। পূর্ণাঙ্গ ফাইল যার কম্পিউটারে ডাউনলোড হয়ে যাবে, সে তখন সবগুলো খণ্ডের মালিক, সে সবগুলো খণ্ডের আপলোডার হিসেবে চিহ্নিত হবে।

সর্বশেষে, আরো দুটি টার্মিনোলজি ব্যাখ্যায় যেতে পারি। সীডার ও লীচার। টরেন্ট ফাইল নিয়মিত যারা ব্যবহার করেন, ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করার সময় আপনারা ফাইলের পাশে এ দুটো শব্দ দেখেছেন। আপনি যে ফাইলটি ডাউনলোড করতে চাইছেন তাকে বলা হচ্ছে সীড অর্থাৎ বীজ। অন্য যে সকল কম্পিউটারে ফাইলটি ডাউনলোড হয়েছে, এবং হবার পর আপলোড চলছে, তারা সকলেই আপলোডার বর্তমানে। তাদের সকলের মোট সংখ্যাটাই সীডার হিসেবে দেখাচ্ছে।

চিত্র: একটি ওয়েবসাইটে দেখানো সীডার ও লীচারের সংখ্যা

ঠিক একারণেই পুরনো ফাইলে সীডারের সংখ্যা শূন্য দেখায়। কারণ বেশি পুরনো হয়ে যাওয়াতে তখন কারো কম্পিউটারে সীড করা হচ্ছে না। মূল আপলোডার যদি একা সীড করেন তবুও ফাইলটি আপনার ডাউনলোডের আশা রয়েছে, কিন্তু খুবই ধীরে ধীরে, সপ্তাহও লেগে যেতে পারে। তাই অ্যাক্টিভ সীডার সংখ্যা দেখে ডাউনলোড করুন, সীডার যত বেশি হবে, আপনি তত ভালোভাবে ফাইলটি ডাউনলোড করতে পারবেন।

আর লীচার হলো এমন এক ব্যবহারকারী যিনি কোনো ফাইল কিছুটা ডাউনলোড করেছেন। ফাইলটি সম্পূর্ণ ডাউনলোড হবার আগেই তার যতটুকো আছে তা থেকে তিনি আপলোড শুরু করেছেন। অর্থাৎ এখান থেকে অন্য কেউ ফাইলের অংশবিশেষ ডাউনলোড করতে পারবে কিন্তু সম্পূর্ণটি নয়। আর টরেন্ট যেহেতু অনেকগুলো ভাগে ভাগ করা থাকে তাই অংশবিশেষ ডাউনলোডে কোনো সমস্যা নেই। অন্য কোনো ব্যবহারকারীর সাথে যুক্ত হয়ে ফাইলের বাকি অংশগুলো ডাউনলোড করে নেবে।

অনেকে আছে যারা আপলোড স্পীড কমিয়ে শূন্য কিংবা এক কিলোবাইট পার সেকেন্ডে দিয়ে রাখেন কিংবা কোনোরকমে ফাইলটি পূর্ণাঙ্গরূপে ডাউনলোড শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সীড হতে না দিয়ে ব্রাউজার থেকে টরেন্ট ফাইলটি ডিলেট করে দেন। এরা শুধু স্বার্থপরের মতো নিজের আখের গুছিয়ে কাজ করে নেন, অন্য ডাউনলোডারদের উপকারের জন্য কিছু করেন না। কেউই যদি সীড না করে, তাহলে টরেন্ট ফাইলটিকে আর ব্যবহার উপযোগী রাখা সম্ভব হবে না। তাই মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে।

বিটটরেন্ট প্রযুক্তি পুরোটাই অনেক আপগ্রেডেড, এটি সহজে পুরনো হবার মতোও না। বিটটরেন্টকে মূলত ব্যবহার করা হয় পাইরেসির জন্য, তাই এর প্রতি মানুষের খানিকটা অবৈধ মনোভাব রয়েছে। তবে আপনি ইচ্ছা করলে একে বড় আকারের ফাইল শেয়ারিং এ খুব সহজেই ব্যবহার করতে পারবেন। অন্যথায় আপনার একটি সার্ভার কম্পিউটার লাগতো কিন্তু বিটটরেন্ট ব্যবস্থায় আপনি আপনার সাধারণ কম্পিউটার দিয়েই কাজটি করতে সক্ষম হবেন।

গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নতুন কোনো আপডেট উন্মুক্ত করতে কিংবা মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম ডিস্ট্রিবিউটররা নতুন ভার্সন উন্মুক্ত করতে এই বিটটরেন্ট প্রযুক্তিকেই ব্যবহার করে থাকে। এতে করে ব্যান্ডউইডথে তাদের বাড়তি কোনো খরচ নিয়ে ভাবতে হয় না, এই অর্থটুকু বরং নিজেদের কোম্পানীতেই বিনিয়োগ করা যায়। আরো অনেকভাবেই এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা সম্ভব। এ প্রযুক্তির ব্যাপারে মানুষের জানা নেই বলেই এখান থেকে সৃজনশীল কোনো ব্যবহার এখনো বেরিয়ে আসেনি আমাদের দেশে।

তথ্যসূত্র

১. https://www.howtogeek.com/141257/htg-explains-how-does-bittorrent-work/

২. https://lifehacker.com/285489/a-beginners-guide-to-bittorrent

৩. https://lifehacker.com/5897095/whats-a-private-bittorrent-tracker-and-why-should-i-use-one

৪. https://www.lifewire.com/how-torrent-downloading-works-2483513

৫. https://www.youtube.com/watch?v=urzQeD7ftbI

৬. https://www.youtube.com/watch?v=EkkFT1bRCT0

৭. https://www.youtube.com/watch?v=6PWUCFmOQwQ

featured image: faxcompare.com

জেফ বেজোসঃ অ্যামাজন ডট কমের প্রতিষ্ঠাতা

দ্রুত বংশবৃদ্ধির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক