টেকসই এবং সাশ্রয়ী ব্যাটারী তৈরিতে নতুন পদার্থের সন্ধান

শক্তির চাহিদা উত্তরোত্তর লাফিয়ে বেড়ে চলেছে বিশ্বব্যাপী। প্রযুক্তি, প্রযুক্তিপণ্য এসব কেবল সামগ্রিক চাহিদার অংশ এখন। শক্তির চাহিদা মেটাতে গবেষকদের ঘাম ছুটে যাচ্ছে চাহিদার গতির সাথে পাল্লা দিয়ে আবিষ্কারে ডুব দিতে। শক্তির মোবিলিটির উপর সাথে ব্যাটারির সম্পর্ক সবচেয়ে জোরালো।

সুইজারল্যান্ডের ইটিএচ জুরিখ (ETH Zurich) এবং একই দেশের বস্তু বিজ্ঞানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এম্পার গবেষণায় বিজ্ঞানীরা টেকসই ব্যাটারি আবিষ্কারের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এমন অজৈব উপাদান যা কিনা আবার সাশ্রয়ীও হবে। গবেষকরা দুটি নতুন পদার্থ শনাক্ত করতে পেরেছেন যা অ্যালুমিনিয়ামের ব্যাটারির উন্নয়নে কাজে লাগতে পারে। প্রথমটি হল একটি ক্ষয়-রোধী পদার্থ; দ্বিতীয়টি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের পদার্থ যা ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্তের জন্য যা প্রযুক্তিগত প্রয়োজনের সাথে খাপ খাওয়াতে পারবে।

সক্রিয় তড়িৎবিশ্লেষ্য প্রবাহী পদার্থ

অ্যালুমিনিয়াম ব্যাটারিতে তড়িৎবিশ্লেষ্য প্রবাহী পদার্থ অধিক সক্রিয়তা প্রদর্শন করে। আর স্টেইনলেস স্টিলের ক্ষয়ও ঘটায়, এমনকি দেখা গেছে সোনা এবং প্লাটিনামের ক্ষেত্রেও ক্ষয় করে। বিজ্ঞানীরা তাই ব্যাটারির এই পরিবাহী অংশের জন্য ক্ষয় প্রতিরোধী পদার্থ সন্ধান করছেন। টাইটেনিয়াম নাইট্রাইড (TiN) যা কিনা সিরামিক বা চীনামাটির এক ধরনের পদার্থ। দেখা গেছে, এটি যথেষ্ঠ পরিবাহিতা প্রদর্শন করে। যেহেতু টাইটেনিয়াম এবং নাইট্রোজেন দুটোরই যথেষ্ট প্রাচুর্যতা রয়েছে তাই উৎপাদনেও খরচের দিক থেকে সাশ্রয়ী হবে।

ছবিঃ টাইটেনিয়াম নাইট্রাইড খুলে দিতে পারে টেকসই ব্যাটারির নতুন দুয়ার; Source: mechatronicsly.com

কভালেঙ্কোর দল সফলভাবে গবেষণাগারে টাইটেনিয়াম নাইট্রাইডের তৈরি পরিবাহী অংশ দিয়ে অ্যালুমিনিয়াম ব্যাটারি তৈরি করেছে। এই পদার্থটি খুব সহজেই পাতলা স্তরের আকারে উৎপাদন করা যায়। আবার অন্যান্য পদার্থের উপর সহজে পলিমার ফয়েলের মত আবরণ বা প্রলেপ সৃষ্টি করা যায়। কভেলেঙ্কো মনে করেন, পরিবাহী পদার্থ প্রচলিত বা সুলভ ধাতুগুলো থেকেই উৎপাদন করা সম্ভব। টাইটেনিয়াম নাইট্রাইড যে কেবল অ্যালুমিনিয়াম ব্যাটারির ক্ষেত্রেই কাজে লাগবে তা নয়, এটি ম্যাগনেসিয়াম বা সোডিয়াম ব্যাটারি এমনকি উচ্চ ভোল্টেজের লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

গ্রাফাইটের বিকল্প

দ্বিতীয় নতুন পদার্থটি ব্যবহার করা যাবে অ্যালুমিনিয়াম ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্তের ইলেক্ট্রোড বা তড়িৎদ্বার হিসেবে। সাধারণত যে ব্যাটারির ঋণাত্মক তড়িৎদ্বার অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি সেটির ধনাত্মক তড়িৎদ্বার সাধারণত হয় গ্রাফাইটের। কভেলেঙ্কোর দল বের করেছেন পলিপাইরিন (Polypyrene) নামের এক পদার্থ যা মূলত হাইড্রোকার্বনের জাত পলিমার।গ্রাফাইটের চেয়ে ব্যাটারিতে এটি অধিক শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে সক্ষম। পরীক্ষণ থেকে পাওয়া যায় এই পদার্থের নমুনায় এর আণবিক শিকল বিশৃঙ্খল দশায় থাকে। এই আণবিক শিকলগুলোর মাঝে প্রচুর ফাঁকা জায়গা থেকে যায়। ফলে ফাঁকা জায়গার ফায়দা নিয়ে আগের চেয়ে বড়সড় আয়ন তড়িৎবিশ্লেষ্য প্রবাহী হিসেবে প্রবেশ করানো যাবে। এতে তড়িৎদ্বারও সহজে আহিত হবে।

পলিপাইরিনের (Polypyrene) আণবিক গঠন; Source: Phys.org

পলিপাইরিন ধারণকৃত তড়িৎদ্বারের অন্যতম সুবিধা হল এটিকে সুবিধামত ব্যবহার করতে পারা। বিশেষায়িত ব্যবহারিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটিকে গ্রাফাইটের চেয়ে অধিক সুবিধামত পরিবর্তন করে নেয়া যাবে। কারণ, গ্রাফাইটকে ধাতু হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া বিকল্প থাকে না।

যেহেতু টাইটেনিয়াম নাইট্রাইড এবং পলিপাইরিন উভয়ই নমনীয় পদার্থ তাই এদের কারণে উপযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ছে ব্যাটারি প্রযুক্তিতে। অর্থাৎ থলের মত করেও ব্যাটারি তৈরি সম্ভব।

শক্তি রূপান্তরে ব্যাটারি

সৌরশক্তি এবং বায়ুশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। কিন্তু, যখন সূর্যের আলো থাকবে না– যেমন, রাতে বা কুয়াশাচ্ছন্ন, মেঘমেদুর দিনে এবং বায়ুপ্রবাহ যথেষ্ট হবে না, সে পরিস্থিতিতে নতুন প্রযুক্তির চাহিদা উঁকি দিবেই। তখন ব্যাটারি প্রযুক্তি হতে পারে একটি সমাধান শক্তি সঞ্চয় করে ব্যবহারের জন্য। তবে অবশ্যই সাশ্রয়ী, সহনশীল পর্যায়ের হতে হবে সে প্রযুক্তি। বর্তমানে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির জনপ্রিয়তা রয়েছে একই সাথে হালকা অথচ কার্যকরী মাত্রায় শক্তি সংরক্ষণে করতে পারায়। কিন্তু লিথিয়াম প্রকৃতিতে সুলভ না, একারণে এটি বেশ ব্যয়বহুল। দ্বিতীয়ত বড় স্কেলে লিথিয়াম পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারকও। তৃতীয়ত, এ বিরল মৌল খনি থেকে নিষ্কাশন করাও সহজ না যতটা সহজ অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম বা সোডিয়াম।

লিথিয়াম ব্যতিরেকে বাকি তিন মৌলভিত্তিক ব্যাটারি প্রযুক্তিই ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দুয়ার বলে ভাবা হচ্ছে। ভবিষ্যতের সাথে ফারাক হল এ জাতীয় ব্যাটারি এখনো গবেষণা পর্যায়ে রয়েছে। শিল্পকারখানার দখল এখনো নিতে পারে নি। সে ফারাক হয়তো শীঘ্রই ঘুঁচে যাবে শক্তি গবেষণার প্রচেষ্টায়।

 

Phys.org অবলম্বনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *