in ,

কেন জন্মায় রোবটের প্রতি মায়া?

পিক্সার এনিমেশনের চমৎকার সৃষ্টি WALL-E নামের এনিমেটেড চলচ্চিত্র। এ নামে সে মুভিতে চমৎকার একটি রোবট থাকে। আদুরে রোবটটি যখন তার ভালোবাসার সন্ধানে মহাকাশের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ঘুরে বেড়ায় তখন সকলের মন ছুঁয়ে যায়। যদিও WALL-E এখানে নিছকই একটি রোবট কিন্তু তবুও তার সামান্য মানুষের মতো নিষ্পাপ চেহারাটি দর্শকদের মনের কোণে মানবিক অংশে স্থান করে নেয়। সাধারণ মানুষের বেলায় যেমন অনুভব করতো এই রোবটের বেলাতেও তেমনই অনুভব করে।

মজার ব্যাপার হলো দর্শক তার প্রতি হৃদয়ে যে সহানভূতি অনুভব করে তা শুধুমাত্র চলচ্চিত্রটির গল্প ও শৈল্পিকতার কারণে নয়। কয়েকজন মানুষের উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, একজন মানুষকে কষ্টে দেখলে আরেকজন মানুষের মস্তিষ্কে যেসব কার্যক্রম হয়, রোবটকে কষ্টে দেখলেও মস্তিষ্কে একই রকম ঘটনা ঘটে।

জার্মানির ডুইশবার্গ এশেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক fMRI ব্যবহার করলেন ১৪ জন অংশগ্রহনকারী মানুষের উপর। তাদেরকে প্রথমে মানুষ, রোবট এবং প্রাণহীন কিছু বস্তুর ভিডিও দেখানো হলো। সেসব ভিডিওতে তাদের উপর স্নেহপূর্ণ কিংবা রূঢ় আচরণ করা হচ্ছে। fMRI ব্যবহার করে বিজ্ঞানীগণ ভিডিও দেখার পর মানুষগুদের প্রতিক্রিয়া, মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ ইত্যাদি পর্যালোচনা করলেন। গবেষণা দল লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক কনফারেন্সে তাদের ফলাফল প্রকাশ করেন।

ফলাফলে দেখা যায় তারা অংশগ্রহণকারীদেরকে ডায়নোসরের মতো দেখতে Pleo নামের একটি রোবটের ভিডিও দেখান। এটিকে খাওয়ানো হচ্ছে অথবা সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে। তখন দর্শকদের মস্তিষ্কের লিম্বিক অংশ কার্যকর হয়ে উঠে। এ অংশটি অনুভূতির সাথে জড়িত। আবার একইভাবে যখন তাদের মানুষের ভিডিও দেখানো হয়, যাকে ম্যাসাজ করে দেওয়া হচ্ছে, তখনো নিউরনের প্রতিক্রিয়া আগের মতোই হয়।

image source: telegraph.co.uk

এবার উলটো ধরনের ভিডিও দেখানো হলো। মানুষ এবং রোবট উভয়ের সাথে বেশ রুঢ় আচরণ করা হচ্ছে এমন ভিডিও। তাদেরকে ঝাঁকানো হচ্ছে অথবা ফেলে দেওয়া হচ্ছে অথবা প্লাস্টিক ব্যাগ দিয়ে শ্বাসরোধ করা হচ্ছে। আশ্চর্যজনকভাবে, fMRI তে যে ফলাফল পাওয়া গেল তা হলো, মানুষকে খারাপ অবস্থায় দেখার চেয়ে রোবটকে খারাপ অবস্থায় দেখার পর অংশগ্রহনকারীদের লিম্বিক সিস্টেমের প্রতিক্রিয়া অনেক অনেক বেশি।

দেখা যাচ্ছে একজন মানুষ, অন্য মানুষ বা রোবট কিংবা উভয়ের প্রতিই সহানুভূতি অনুভব করে। আমরা এখনো ভালোভাবে জানি না এ সহানুভূতির কারণ আসলে কী।

রোবোটিক্স গবেষণায় বর্তমানে একটি বড় লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে এমন রোবট তৈরি করা। এ ধরনের রোবট বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের দেখাশোনার ক্ষেত্রে বেশ কাজে আসতে পারে। কিছু সায়েন্স ফিকশনে তো রোবটের সাথে মানুষের ঘর বাঁধাও হয়ে গেছে।

দীর্ঘ সময় ধরে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৬ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ২ জন অত্যন্ত সুন্দরভাবে রোবটের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়। তারা রোবটের সাথে কথা বলে, একটি নামে ডাকে, এমনকি তাদেরকে রোবটের সাথে হাসতেও দেখা যায়।

রোবটের জন্য সহানুভূতি হয়তো অনেকটা তাদের শারীরিক গঠনের উপরও নির্ভর করে। তাদের চেহারা, আচরণ, দুই পায়ে হাঁটে কিনা,  ইত্যাদি সবকিছু তাদের সাথে মানুষের স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপনে সাহায্য করে।

এখানে আনক্যানি ভ্যালি তত্ত্বের কথা বলা যায়। এ তত্ত্ব অনুসারে, যেসব রোবট বা অ্যানিমেশন দেখতে মানুষের মতো নয়, দর্শক তাদের কম পছন্দ করে। Roomba নামে একটি রোবটের কথা উল্লেখ করা যায়। সে ঘর সংসারের সকল কাজ করতে পারতো। একদিন সেটি আগুনে পুড়ে যায়। তার চেহারা মানুষের মতো ছিল না, কিন্তু মানুষ ঠিকই তার প্রতি সহানুভূতি অনুভব করেছে। এক্ষেত্রে দেখা যায় চেহারা মানুষের মতো না হলেও সহানুভূতি অনুভব করে মানুষ। মানব মন তথা মানব মস্তিষ্ক বড়ই রহস্যজনক।

তথ্যসূত্র: স্মিথসোনিয়ান ডট কম

featured image: bbport.ru

বিজ্ঞানী পরিচিতিঃ বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন

বন্দী হবে গ্রহাণু