মেসন তত্ত্ব ও একজন ইউকাওয়া

কল্পনা করুন আপনার হাতে দুইটি লোহার দণ্ড আছে। যদি দণ্ড দুটি হাত থেকে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে কী হবে? যদি সেগুলো বেঁধে রাখা না হয় তাহলে আলাদা হয়ে নীচে পড়ে যাবে। কিন্তু সেই লোহার দণ্ডের পরিবর্তে যদি এবার চুম্বকের দণ্ড নেয়া হয় তবে কী ঘটবে? এবার কিন্তু আর আলাদা হয়ে যাবে না। চুম্বকদ্বয় পরস্পর আকর্ষণ বলের সাহায্যে একত্রে লেগে থাকবে। অর্থাৎ কোনোকিছুকে একত্রে রাখতে হলে অবশ্যই একটি আকর্ষণ বলের প্রয়োজন। এবার কল্পনার পরিসীমা বিবর্ধিত করে কোয়ান্টাম জগতে যাওয়া যাক।

কণা হিসেবে পরমাণু হলো নিরপেক্ষ এবং স্থায়ী। এর মাঝে আছে ধনাত্মক নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে এর চারিদিকে ঋণাত্মক ইলেকট্রন প্রদক্ষিণ করছে। ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াস বিপরীত চার্জে চার্জিত বলে তারা পরস্পরকে আকর্ষণ বলে আকর্ষণ করছে। ইলেকট্রন এ কারণেই তার গতির জন্য ছিটকে পরমাণুর বাইরে চলে আসতে পারে না, নিউক্লিয়াসের আকর্ষণে বাঁধা থাকে। কিন্তু নিউক্লিয়াস কোনো মৌলিক কণা নয়। এর মাঝে আছে প্রোটন ও নিউট্রনের সমাহার।

এদের মাঝে নিউট্রন নিরপেক্ষ কণা, আর প্রোটন ধনাত্মক কণা। যেহেতু সমধর্মী চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করে সেহেতু দুটি প্রোটনের মাঝে প্রচণ্ড বিকর্ষণ বল কাজ করে। এতে নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্ব নষ্ট হবার কথা। কিন্তু তা দেখা যায় না বরং ভারী কিছু নিউক্লিয়াস ছাড়া প্রায় সব নিউক্লিয়াসই দীর্ঘস্থায়ী। বিজ্ঞানীরা নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেকদিন ধরে নাকানি-চুবানি খেয়ে অবশেষে ১৯৩২ সালে পরিত্রান পান।

১৯৩২ সালে বিজ্ঞানী চ্যাডউইক কর্তৃক আরেকটি নিউক্লিয়ন (নিউট্রন) আবিষ্কার হবার পর নিউক্লিয়াসের গঠন সম্পর্কেও বিজ্ঞানীরা কিছুটা স্পষ্ট হতে পেরেছিলেন। এর কিছু সময় পরেই এশীয় বিজ্ঞানী হিদেকী ইউকাওয়া তার বিখ্যাত ‘মেসন তত্ত্বে’র মাধ্যমে নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্ব ব্যাখ্যা করেন। নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের জন্য কোনো একধরনের বল দায়ী এবং সেই বলের বাহক কণা হিসেবে কোনো কণা কাজ করে। এই তথ্য ধীরে ধীরে জানা যায়। তবে মেসন তত্ত্ব প্রমাণিত হতে আরো ১৫ বছর সময় লেগে যায়।

১৯০৭ সালের ২৩ জানুয়ারি বিজ্ঞানী হিদেকী ইউকাওয়া জাপানের কিয়োটো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে অবশ্য তার নাম হিদেকী ইউকাওয়া  ছিল না, ছিল হিদেকী ওগাওয়া। স্কুল জীবনে তেমন ভালো ছাত্র না হলেও গণিতের প্রতি হিদেকীর অপার আগ্রহ ছিল। তবে কলেজ পর্যায়ে এসে হিদেকীর গণিতের উপর বিতৃষ্ণা চলে আসে।

একবার তিনি ভিন্ন নিয়মে অঙ্ক করাতে তার শিক্ষক সেটা কেটে দেয়। এতে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে হিদেকী গণিত পড়ার বা গণিতবিদ হবার ইচ্ছা বাদ দেন। আবার কলেজ পর্যায়েই একদিন বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন যার জন্য তাকে ভৎসর্না শুনতে হয়েছিল। তাই রাগ করে ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যা নিয়েও কাজ করবেন না বলে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন।

চিত্রঃ বিজ্ঞানী ইউকাওয়া।

অসম্ভব মেধাবী এবং খামখেয়ালী এই বিজ্ঞানী কোনোমতে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর ঝুঁকে পড়েন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে। ১৯৩২ সালে বিয়ে করার পর নিজের পারিবারিক নাম ‘ওগাওয়া’ থেকে ‘ইউকাওয়া’তে পরিবর্তন করেন এবং ‘হিদেকী ইউকাওয়া’ রূপে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত নিবিড় গবেষণা করে তিনি তার মেসন তত্ত্ব তৈরি করেন। এর মাধ্যমে নিউক্লিয়নের মাঝে আকর্ষণ বল কীরূপে কাজ করে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে কণা-পদার্থবিদরা জানতে পারে নতুন এক শ্রেণির কণার নাম।

নিউক্লিয়াসে পরমাণু ভেদে অনেক সংযুক্তির প্রোটন থাকে এবং কোনো এক অদৃশ্য আকর্ষণ বলের প্রভাবে তারা স্থির বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ বলের বিপরীতে কাজ করতে পারে। এই বলের মাধ্যমে তারা একত্রে থাকতে পারে। এই বলকে বলে রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বল। আরো একপ্রকার সবল নিউক্লীয় বল আছে যা কোয়ার্ক-গ্লুয়ন এর মধ্যে কাজ করে। উল্লেখ্য কোয়ার্ক-গ্লুয়নের অবস্থান প্রোটন ও নিউট্রনের মাঝে। এখানে বিদ্যমান সবল বলের নাম মৌলিক সবল নিউক্লীয় বল।

নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের সাথে মৌলিক সবল নিউক্লীয় বলের কোনো সম্পর্ক নেই। আছে নিউক্লীয়নের উপর কাজ করা রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বলের। হিদেকী ইউকাওয়া দেখেছিলেন এই রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বলের বাহক কণার ভর ইলেকট্রন ও প্রোটনের ভরের মাঝামাঝি হবে। তাই গ্রীক শব্দ ‘মেসো’ অর্থ মাঝামাঝি থেকে এই বাহক কণার নামকরণ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘মেসোট্রন’ কণা। পরবর্তীতে কণা পদার্থবিজ্ঞানের আরেক দিকপাল বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ কর্তৃক কণাটির নাম সংশোধিত হয়ে হয়। তিনি এর পরিবর্তিত নাম প্রদান করেন ‘মেসন’ (Meson) কণা।

মেসন কিন্তু একক কোনো কণা নয়। এটি মূলত কণাদের একটি শ্রেণি। মেসন শ্রেণির কণাদের মাঝে অনেক কণা আছে। যেমনঃ পাই মেসন (পায়ন), কায়ন, রো মেসন ইত্যাদি। হিদেকী ইউকাওয়ার দেয়া মেসন তত্ত্ব বর্তমানে এসে আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। আধুনিক ধারণা মতে সকল মেসন কণারা যেহেতু বল বাহক কণা এবং তাদের সংখ্যায়ন বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়নের সাথে মিলে যায় তাই তারা বোসন শ্রেণির কণা। অর্থাৎ সকল মেসনই বোসন, তবে সকল বোসন মেসন নয়।

বোসন কণারা বলবাহক কণা, অর্থাৎ তারা বল বহন করে। যেকোনো ফার্মিয়ন শ্রেণির কণা থেকে সর্বদাই অগণিত বোসন কণা নির্গত হচ্ছে এবং তা পুনরায় ঐ ফার্মিয়ন কর্তৃকই শোষিত হচ্ছে। কিন্তু যখন একটি ফার্মিয়ন কণার পাশে আরেকটি ফার্মিয়ন কণা চলে আসে তখন এক ফার্মিয়ন কর্তৃক নিঃসৃত বোসন কণা আরেক ফার্মিয়ন কর্তৃক শোষিত হয়। এই সময়ই আকর্ষণ-বিকর্ষণের ঘটনা ঘটে।

নিউক্লিয়াসের প্রতিটি প্রোটন থেকে সর্বদাই মেসন কণা নিক্ষিপ্ত হয়, যে মেসন কণা পুনরায় অপর প্রোটন কর্তৃক শোষিত হয়। ফলে তাদের মাঝে একটি আকর্ষণ বল কাজ করে। সকল পরিস্থিতিতে এরকম হলে দুটি প্রোটনকে কখনোই আলাদা করা যেত না। কিন্তু এরকম হয় না।

প্রোটন-প্রোটনের এই আকর্ষণ বল খুবই অল্প পরিসরে বিরাজমান থাকে। শুধুমাত্র নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরেই এই আকর্ষণ বল কাজ করে। প্রোটন দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব যখন নিউক্লিয়াসের ব্যাসের চেয়ে বড় হয়ে যায় তখন আর এই আকর্ষণ বল কাজ করে না। ঐ পরিস্থিতিতে প্রচণ্ড বিকর্ষণ বল কাজ করবে। কারণ তখন কুলম্বের স্থির বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ বল কাজ করবে।

মেসন শ্রেণির কণাদের আয়ু খুবই কম। এ ধরনের কণা এক প্রোটন হতে নির্গত হয়ে বেশি দূর যেতে পারে না। তাই এদের আয়ুষ্কালে এরা যত দূর যেতে পারে অন্য প্রোটনটি যদি সেই সীমার মাঝে থাকে তবেই আকর্ষণ বল কার্যকর হয়। অন্যথায় এই আকর্ষণ বল কাজ করে না।

আবার প্রশ্ন জাগতে পারে, যখন নিউক্লীয়নগুলো আকর্ষিত হয় তখন কি বিকর্ষণ বল কাজ করে না? অবশ্যই করে। কিন্তু আকর্ষণ বলের মান বিকর্ষণ বলের চেয়ে অনেক বেশি বলে বিকর্ষণ বল লোপ পেয়ে আকর্ষণ বলই সক্রিয় থাকে। অর্থাৎ লব্ধির দিক থেকে আকর্ষণ বল জয়ী হয়।

যেহেতু এই আকর্ষণ বল বিশাল একটি বিকর্ষণ বলের বিরুদ্ধে থেকে নিজের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করে তাই এখান থেকে সহজেই বোঝা যায় এই আকর্ষণ বল কতটা শক্তিশালী। একারণেই এর নাম সবল নিউক্লীয় বল। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত সকল মৌলিক বলগুলির মাঝে এই বল শক্তিশালী।

চিত্রঃ প্রোটন ও নিউট্রনের আভ্যন্তরীণ গঠন।

আধুনিক ধারণা মতে মেসন কণা একটি কোয়ার্ক কণা ও একটি অ্যান্টি-কোয়ার্ক কণা দ্বারা গঠিত। যেমনঃ পায়ন কণা একটি আপ কোয়ার্ক ও একটি ডাউন অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। আবার কোয়ার্কোনিয়ামগুলোও একপ্রকার মেসন কণা।

কোয়ার্কোনিয়াম হচ্ছে একটি কোয়ার্ক ও ঐ কোয়ার্কেরই অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। যেমনঃ একটি বটম কোয়ার্ক ও একটি বটম অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা যে বটমোনিয়াম গঠিত হয় তার নাম এপসিলন মেসন। ইউকাওয়া যে বাহক কণা কল্পনা করেছিলেন তার ভর তিনি ধরেছিলেন ১০০ MeV/c2 এর কাছাকাছি। বর্তমানে দেখা গেছে, সবচেয়ে হালকা মেসনের ভর ১৩৪.৯ MeV/c2 এবং সবচেয়ে ভারী মেসন হলো ৯.৪৬০ GeV/c2 ভরের।

১৯৩৪ সালে আবিষ্কৃত হবার পর ইউকাওয়া কর্তৃক ভবিষ্যদ্বাণীকৃত মেসন কণার খোঁজ শুরু হয়। সর্বপ্রথম ১৯৩৬ সালে কার্ল অ্যান্ডারসন কর্তৃক মিউয়ন কণা আবিষ্কৃত হয়। এর ভর মেসন কণার ভরের কাছাকাছি হওয়ায় অনেকেই একে মেসন মনে করেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেছে এটি ফার্মিয়ন শ্রেণির কণা ২য় প্রজন্মের একটি লেপটন মাত্র। তাই ঐতিহাসিকভাবে মিউয়নকে এখনো ভুল করে অনেকে মিউ মেসন বলে ডেকে থাকে।

সর্বপ্রথম প্রকৃত মেসন কণার খোঁজ পাওয়া যায় ১৯৪৭ সালে। প্রথম জ্ঞাত মেসন কণার নাম হচ্ছে পাই-মেসন। এই মেসন কণা পাবার পরপরই ১৯৪৯ সালে হিদেকী ইউকাওয়াকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

এশিয়ার বিজ্ঞানীদের মাঝে হিদেকী ইউকাওয়ার নাম অত্যন্ত স্মরণীয়। কণা-পদার্থবিদ্যায় হিদেকী ইউকাওয়ার হাত ধরেই উঠে এসেছে বেশ কয়েকজন প্রথিতযশা জাপানি কণা-পদার্থবিদ। তন্মধ্যে ৩য় প্রজন্মের কোয়ার্কের ভবিষ্যদ্বাণী প্রদানকারী মাসাকাওয়া এবং কণাদের স্ট্রেঞ্জনেস নিয়ে গবেষণাকারী বিজ্ঞানী নিশিজিমার নাম অন্যতম।

হিদেকী ইউকাওয়া জাপানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন Yukawa Institute for Theoretical Physics যা এখনো কণা-পদার্থবিদ্যা, স্ট্রিং তত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিপদার্থবিদ্যা, নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যা, কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তত্ত্বের মতো বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা বিদ্যমান। ১৯৮১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর হিদেকী ইউকাওয়া মৃত্যুবরণ করলেও বিজ্ঞানীদের নিকট এখনও তিনি একটি স্মরণীয় নাম।

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Meson
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_mesons
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Strong_interaction
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Nuclear_force
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Pion
  6. https://en. wikipedia.org/wiki/Hideki_Yukawa
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/Yukawa_Institute_for_Theoretical_Physics
  8. http:// curtismeyer.com/material/lecture.pdf
  9. http://minimafisica.biodec.com/Members/k/machleidt-potentials.pdf

featured image: globalfirstsandfacts.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *