ক্ষমতাধর এক অঙ্গভঙ্গির সাতকাহন

আনন্দ বা খুশির স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হলো হাসি। প্রিয় মানুষের মুখে হাসি দেখার চেয়ে সুখের কিছু আর হয় না। প্রতিনিয়তই হেসে যাই কিন্তু কখনো কি এটি নিয়ে একটু প্রশ্ন করে দেখেছি? আমরা কেন হাসি? কেনই বা আমরা প্রিয় কারো হাসি দেখে খুশি হই?

যেকোনো ঘটনার পেছনেই থাকে কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। বিজ্ঞান হাসিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে?

হাসির আগমন

যখন কোনো প্রাণী তার মুখের মাংসপেশি শক্ত করে দাঁত বের করে, তখন বোঝা যায় সে অন্য কোনো প্রাণীকে আক্রমণ করতে যাচ্ছে। হতে পারে সে ভীত, কিংবা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, কিংবা সে ফাঁদে পড়েছে কিন্তু বের হতে পারছে না। বেশিরভাগ প্রাণী দাঁত বের করে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চায় বা অন্য কোনো প্রাণীকে হুমকি দিতে চায়। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা। মানুষের ক্ষেত্রে এটি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ। যখন কেউ এক পাটি দাঁত বের করে আপনার দিকে তাকাবে, তখন নিঃসন্দেহে বুঝবেন তিনি হাসছেন।

ধারণা করা হয়, এই বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি আসলে বিবর্তনের ধারায় এসেছে প্রাণীদের আক্রমণাত্মক ভঙ্গি থেকে। জেনিস পোর্টেয়াস নামের একজন দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক গবেষণা করেছেন হাস্যরস ও হাসির বিবর্তন নিয়ে। তার মতে, উচ্চতর প্রাণী যেমন রেসাস বানরদের ক্ষেত্রে হাসির উদাহরণ দেখা যায়।

বানরদের কোনো দলের অধস্তন সদস্যরা ঊর্ধ্বস্তন সদস্যদের প্রতি এরকম দাঁত প্রদর্শন করে। যখন তারা এমন কোনো স্থান দখল করে যেটা সেই ঊর্ধ্বতন বা প্রভাবশালী প্রাণীরা দখল করতে চায়। এই ভঙ্গি দিয়ে তারা ঊর্ধ্বস্তন সদস্যদের মন পরিবর্তন করার চেষ্টা করে যেন কোনো ঝগড়া বা বিবাদ সৃষ্টি না হয়। অর্থাৎ কিছুটা হাসির মতো ভঙ্গিমা দিয়ে তারা একইসাথে কর্তৃত্ব মেনে নেয়া এবং কিছুটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বোঝায়। এই উদাহরণ দিয়ে মানুষের হাসির কিছুটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

আমাদের মাঝে অনেকেই ভয়ে কিংবা নার্ভাস থাকার সময় অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসে। আবার অনেকসময় বাচ্চারা বকা খাওয়ার পরেও হাসি থামাতে পারে না। রেসাস বানর দলের সেই ঘটনা দিয়ে এই ব্যাপারগুলো ব্যাখ্যা করা যায়। জেনিস পোর্টেয়াসের মতে, এই হাসিও বড়দের কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা সহজ করে তোলার জন্যই।

চিত্র: প্রাণীদের আক্রমণাত্মক ভঙ্গি থেকে হাসির আগমন বলে ধারণা করা হয়।

তাছাড়া বিজ্ঞানীরা শিম্পাঞ্জিদের মতো উন্নত প্রাণীদের মাঝেও এরকম দাঁত বের করে হাসির মতো ভঙ্গি খুঁজে পেয়েছেন। এতে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় কীভাবে হাসি মানুষের মাঝে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে প্রকাশ পেলো।

হাসি কেউ জন্মের পর শেখে না, বরং এটাকে একটা প্রিপ্রোগ্রামড ব্যবহার বলা যায় যা কিনা বিবর্তনের মাধ্যমেই আমাদের মাঝে এসেছে, এর এক অন্যতম উদাহরণ হল, যেসব মানুষ জন্ম থেকেই অন্ধ, তারাও স্বাভাবিক মানুষের মতোই একই পরিস্থিতিতে একইরকমভাবে হাসে।

হাসি কেন সংক্রামক?

ঘরভর্তি মানুষের মাঝে যদি কেউ হাসে, তাহলে দেখা যাবে, আশেপাশের প্রত্যেকে কিছুটা হলেও ভালো অনুভব করছে। প্রতিটা মানুষই যেন চেতনভাবে কিংবা অবচেতনে হাসছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কেউ কারো দিকে তাকিয়ে হাসে তখন অপরপক্ষের ব্যক্তির মুখের কাঠিন্য বজায় রাখা কঠিন। কাউকে হাসতে দেখতে আমাদের মিরর নিউরন উদ্দীপিত হয়। মিরর নিউরন হলো মস্তিষ্কের বিশেষ এক ধরনের কোষ। ব্যক্তি নিজে কোনো কাজ করলে মস্তিষ্ক যেভাবে সাড়া দিতো, ঠিক একইভাবে সাড়া দেয় কাজটি কাউকে করতে দেখলে।

এর সাধারণ কোনো উদাহরণ দিলে দেখানো যায়, কোনো দুঃখী মানুষকে দেখে আমাদের সহানুভূতি তৈরি হয়, কিংবা কাউকে ভয় পেতে দেখলে কিছুটা ভয় আমাদেরকেও স্পর্শ করে। কাউকে হাসতে দেখলে মিরর নিউরনের প্রভাবে আমাদের মুখের পেশীর উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। না চাইলেও আমরা প্রিয় মানুষের হাসি দেখে নিজেদের অজান্তেই হেসে ফেলি। তাই হাসি সংক্রমিত হয়, এই কথাটি একদম বিজ্ঞানসম্মত।

তো এরপর থেকে মন খারাপ থাকলে হাসিখুশি মানুষের সাথে মিশুন। তাদের সাথে সময় কাটান। বিজ্ঞান বলছে, তাদের সংস্পর্শে আপনার মুখেও হাসি ফুটবে।

নেপথ্য বিজ্ঞান

যখন কেউ হাসে তখন কী পরিবর্তন ঘটে তার মস্তিষ্কে? একটি পরিস্থিতি কল্পনা করা যাক। ধরুন, সারাদিনের পরিশ্রম শেষে ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। দেখলেন আপনার টেবিলের উপর রঙিন কাগজে মোড়া একটা উপহার। উপরে লেখা আছে প্রিয় কোনো মানুষের নাম। মুখের রেখা বদলে গিয়ে হাসি ফুটে উঠবে নিশ্চয়।

অপ্রত্যাশিত বা ভালো লাগার মতো কোনো ঘটনা ঘটলে মস্তিষ্কের কর্টেক্স থেকে স্নায়ুর সংকেত যায় প্রথমে ব্রেইনস্টেমে। সেখান থেকে প্রক্রিয়া শেষে এই সিগন্যাল যায় মুখের স্মাইলিং মাসলে। মুখে তখন ফুটে ওঠে প্রথম হাসির রেখা। এই কাজটির পেছনে ভূমিকা রাখে এনডরদিন নামক এক উপাদান।

সেই হাসি আবার শুরু করে পজিটিভ ফিডব্যাক চক্র। যখন প্রথম স্মাইলিং মাসল কাজ করে, তখন মস্তিষ্কে আবার সিগন্যাল যায়। এটি মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমকে উদ্দীপিত করে। ফলে আরো বেশি এনডরফিন নিঃসৃত হয়। সেটি আবার কাজ করে স্মাইলিং মাসলে। তারপর আবার সিগন্যাল যায় মস্তিষ্কে। এভাবে একটা চক্র চলতে থাকে। যখন আমরা হাসি তখন আমাদের মস্তিষ্ক ভালো অনুভব করে। ফলে আমরা আরো হাসি, এবং তাতে মস্তিষ্ক আরো সুখী হয়। এভাবে হাসি চলতে থাকে দীর্ঘ সময়।

যেহেতু হাসিতে আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম উদ্দীপিত হয়, তাই একে তুলনা দেওয়া যায় হঠাৎ উপহার পাওয়া বা চকলেট খাওয়া কিংবা লটারি পাওয়ার মতো কোনো অনুভূতির সাথে। এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, হাসির মাধ্যমে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম ততটা উদ্দীপিত হওয়া সম্ভব যতটা হতে পারে ২ হাজারটি চকলেট কিংবা কয়েক লক্ষ টাকা পেলে।

সুখী হওয়ার জন্য টাকা কিংবা চকলেটের মতো জিনিসের প্রয়োজন নেই। আপনার প্রাণখোলা হাসিই পারে আপনাকে সেই আনন্দ দিতে। ‘কোটি টাকার হাসি’ কথাটার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে বলা যায়! তাই নিজেকে ভালো রাখতে হাসুন মন খুলে। এমনকি হাসি না পেলেও মিথ্যা হাসি হাসুন। এটি পজিটিভ ফিডব্যাক লুপের মাধ্যমে রিওয়ার্ড সিস্টেমকে সচল করে আপনাকে এনে দিতে পারে ভালো লাগার অনুভূতি। জীবনে হাসিখুশি মানুষের সঙ্গ তাই খুব জরুরী।

নকল হাসি

আমরা যখন হাসি, তখন প্রধানত মুখের দুই ধরনের পেশী সক্রিয় হয়। একটি হলো জাইগোম্যাটিকাস মেজর মাসল। এটি গালের ঠিক দুই পাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। যখন এটিই শুধু কাজ করে তখন সেটা আসলে সত্যিকারের হাসি নয়। একে সামাজিক হাসি বলা যায়। যেমন অপ্রিয় কোনো মানুষের সাথে দেখা হলেও ভদ্রতার খাতিরে আমরা যে ধরনের হাসি হেসে থাকি তা।

দ্বিতীয়টি হলো অরবিক্যুলারিস অক্যুলি মাসল, যা আমাদের চোখের চারপাশ ঘিরে থাকে। যখন আমাদের হাসিতে আন্তরিকতা থাকে, কিংবা আমরা সত্যিই খুশি হই, তখন এই মাসল কাজ করে। সেই হাসিই বিশুদ্ধ যে হাসিতে আমাদের চোখও হাসে।

চিত্র: সত্যিকারের হাসি এবং সামাজিক হাসিতে মুখের ভিন্ন ভিন্ন মাংসপেশি কাজ করে।

স্বাস্থ্যের উপর হাসির প্রভাব

গবেষকরা বলছেন, ক্লান্তিকর অবস্থায় হাসিমুখে কাজ করা ইতিবাচক। কেননা, হাসি ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। আপনি যখন হাসিমুখে কাজ করবেন, আপনার মস্তিষ্ক তখন ভেবে নেবে আপনি ভালো আছেন এবং সুখী আছেন। ফলে আপনার মুড ভালো থাকবে, কাজের প্রতি মনোযোগও বাড়বে, বাড়বে কর্মদক্ষতা।

বলা হয়ে থাকে, মন খুলে হাসলে শরীর এবং মন দুটোই অনেকটা সতেজ হয়। একে একটা ভালো ঘুমের পরের অবস্থার সাথে তুলনা দেয়া যায়। মানুষ যখন শিশুদের সংস্পর্শে থাকে, তখন অনেক বেশি সুখী অনুভব করে। কারণ বাচ্চারা বড়দের তুলনায় বেশি হাসে। ফলে তারাও হাসে। পজিটিভ ফিডব্যাক লুপের মাধ্যমে এটি আমাদের মাঝে আরো পজিটিভ ইমোশন তৈরি করে। গড়ে শিশুরা দিনে প্রায় ৪০০ বার হাসে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে হাসির সংখ্যা দিনে মাত্র ২০ বার।

বায়োকেমিক্যাল-এর দৃষ্টিকোণ থেকেও এর ব্যাখ্যা দেয়া যায়। ক্লান্তির ফলে স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। মানসিক অবসাদগ্রস্থতা থেকে শুরু করে স্থূলতা, হার্ট ডিসিসের মতো ভয়ংকর রোগের সূচনা করতে পারে এটি। হাসলে পরে হাসি সেই হরমোনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। তাছাড়া হাসি উচ্চ রক্তচাপ কমাতেও সাহায্য করে।

মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের উপর হাসির ইতিবাচক কিছু প্রভাব আছে। নিউরোট্রান্সমিটার হলো কিছু শক্তিশালী রাসায়নিক উপাদান। এগুলো আমাদের শারীরিক, মানসিক এবং কগনিটিভ কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

ঘুম, ব্যথা, ওজন এমনকি মানসিক অবস্থাও এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই নিউরোট্রান্সমিটারের কোনো ধরনের ভারসাম্যহীনতা কিংবা সমস্যা দেখা দিলে তা থেকে স্থূলতা, অ্যালকোহল, ক্যাফেইন ও নিকোটিনের প্রতি আসক্তি, হতাশা, প্যানিক অ্যাটাক, বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো আরো অনেক ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

যেহেতু নিউরোট্রান্সমিটারের উপর হাসির কিছু প্রভাব আছে, তাই সাধারণ হাসিখুশি জীবন আপনাকে শারীরিক ও মানসিক অনেক ধরনের জটিল সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। সব মিলিয়ে আপনার দীর্ঘজীবী হওয়ার পেছনে হাসির একটা বড় ভূমিকা আছে।

আপনার হাসিমুখ আপনাকে অন্যদের কাছে আরো বেশি বিশ্বাসযোগ্য, আন্তরিক এবং আকর্ষণীয় করে তোলে। স্কটল্যান্ডের ফেইস রিসার্চ ল্যাবরেটরির এক পরীক্ষায় একদল নারী এবং পুরুষকে কিছু মানুষের ছবি দেখিয়ে তাদের আকর্ষণীয়তার উপর রেটিং করতে বলা হয়।

দেখা যায়, ছবিতে যারা হাসিমুখে আছে তারা এগিয়ে আছে। যারা একদমই হাসেনি তাদের থেকে আকর্ষণীয়তার দিক থেকে বেশি রেটিং পেয়েছে। টিভিতে আমরা সেলিব্রিটিদের যেকোনো ইন্টারভিউ কিংবা অনুষ্ঠানে ঘন ঘন হাসতে দেখি। এতে তাদেরকে একইসাথে বেশি তারুণ্যময় ও বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।

মাদার তেরেসার একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে শেষ করছি। We shall never know all the good that a simple smile can do”। তাই হাসিকে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলুন। হাসুন, সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.livescience.com/34056-evolution-smiling.html
  2. https://www.auraortho.com/a-brief-history-of-smiling-laughter/amp/
  3. https://sunwarrior.com/healthhub/15-health-benefits-of-smiling
  4. https://www.scientificamerican.com/article/how-did-the-smile-become-a-friendly-gesture-in-humans/
  5. https://www.pickthebrain.com/blog/the-science-behind-smiling/
  6. https://blog.bufferapp.com/the-science-of-smiling-a-guide-to-humans-most-powerful-gesture
  7. https://www.britishcouncil.org/voices-magazine/famelab-whats-science-behind-smile
  8. http://www.apa.org/monitor/oct05/mirror.aspx
  9. https://www.sciencedaily.com/releases/2016/02/160211140428.htm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *